📄 নেতৃত্বের অনন্য আদর্শ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনেক বড়ো মিশন ছিল বটে, কিন্তু তিনি কোনো ভাববিলাসী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বাস্তবিক সংস্কারক। তিনি অনুসারীদের যা উপদেশ দিতেন, তা আগে নিজে করে দেখাতেন। এতে তাঁরা উদ্বুদ্ধ হতেন। তাবুকের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'সর্বোত্তম নির্দেশিকা হলো তা, যা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়।'১০১
নেতৃত্বের ওপর আধুনিক গবেষণার ফলাফল বলে-অনুসারীরা সেই নেতার প্রতি বেশি প্রত্যাশী থাকে, যিনি তার কথাকে কাজে পরিণত করে দেখাতে পারেন। নেতার প্রতি বিশ্বাস অর্জনের প্রথম ধাপ হিসেবে লোকেরা আগে তাঁর কথা শোনে। তারপর দেখে-সে কথাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না। এর ফলাফল কী হচ্ছে; সেদিকেও তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা তাঁর স্বর্ণালি নেতৃত্ব দেখতে পাই। তিনি যা করতেন, তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন। কথায় আছে— 'যেই কথা সেই কাজ।' রাসূলুল্লাহ (সা.) সবাইকে নামাজ আদায়ের কথা বলতেন, আবার তিনিই প্রথমে নামাজে লেগে যেতেন। তিনি আল্লাহকে ভয় করতে বলতেন, আবার তিনিই প্রথম আল্লাহকে ভয় করতেন। মানুষকে দান-সাদাকা করার কথা বলে তিনি নিজেই প্রথমে দান-সাদাকা করতে লেগে যেতেন। যুদ্ধের জন্য সবাইকে আহ্বান করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং যুদ্ধের ময়দানে প্রথম সারিতেই তিনি দাঁড়াতেন। ১০২
টিকাঃ
১০১ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, মুসনাদ, নাসিরুদ্দিন আল খাত্তাব অনুদিত।
১০২ আয়াজ আল কারনি, Mercy to Humanity, trans. by Faisal ibn Muhammad Shafeeq (Riyadh: International Islamic Publishing House, 2013), p.517.
📄 নমনীয় নেতৃত্ব
'নম্রতা' নেতৃত্বের অনিবার্য একটি গুণ। ড. রবার্ট হোগান বলেন-'নম্রতা কার্যকর নেতৃত্বের পূর্বাভাসের জানান দেয়। '১০৩
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ দুটি সুযোগের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার অনুমতি দেন। যথা- ১. রাজা ও রাসূল হওয়া (দাউদ ও সোলায়মান আ.-এর মতো)। ২. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হওয়া।
তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল হিসেবে থাকাকেই বেছে নেন, যেন বেশি বেশি আল্লাহর ইবাদত করতে এবং বিনয়ী হতে পারেন। ১০৪
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'খ্রিষ্টানরা যেমন মরিয়মপুত্রের প্রশংসা করে, তেমন আমার ওপর প্রশংসা করো না। আমি আল্লাহর দাস, তাই তোমরা বলো- আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। '১০৫
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিনয় প্রকৃতিগতভাবেই চলে এসেছে। কারণ, তিনি সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলতেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।' সূরা ফুরকান: ৬৩
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন-
'আল্লাহ আমাকে ওহির মাধ্যমে জানিয়েছেন- “তুমি নম্রতা অবলম্বন করো, যেন কেউ অন্যের ওপর জুলুম না করে, আবার কেউ যেন নিজেকে অন্যের ওপরে না ধরে।”১০৬
পশ্চিমা বিশ্ব নেতৃত্বকে নয়টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে-
১. রূপান্তরমূলক ২. লেনদেনমূলক ৩. বিনয়ী ৪. স্বৈরাচারী ৫. অবাধনীতি ৬. গণতান্ত্রিক ৭. আমলাতান্ত্রিক ৮. ক্যারিশমাটিক এবং ৯. পরিস্থিতি প্রেক্ষিত নেতৃত্ব। ১০৭
নবিজি ছিলেন নমনীয় নেতৃত্বের মূর্তপ্রতীক। এই নেতৃত্বকে 'Alturistic নেতৃত্ব'-ও বলা হয়।১০৮ নেতৃত্বে যারা সেবাকে মূলমন্ত্র হিসেবে বেছে নেন, দিনশেষে তারাই হয়ে ওঠেন প্রকৃত নেতা। তারা কর্মীদের মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করেন। তাদের যোগ্যতার বিকাশে ঘটাতে পালন করেন অপরিসীম ভূমিকা। একজন প্রকৃত নেতার মৌলিক বৈশিষ্ট্যই হলো-কর্মীদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ সহজ করে দেওয়া। ১০৯
পরসেবা এবং পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষমতায়নকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমেই সেবামূলক নেতৃত্ব তৈরি হওয়া সম্ভব। ১১০ শুধু দিকনির্দেশনা দেওয়ার নাম নেতৃত্ব নয়। অনুসারীরা চায় না-নেতা এসে তাদের সামনে কেবল নেতাগিরি দেখাক। তারা চায় সমান মর্যাদা, যেখানে সবাই একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য একত্রে লড়ে যাবে। তাই একজন প্রকৃত নেতা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে অবশ্যই অনুসারীদের অনুভূতি, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রাখবেন।১১১
রাসূলুল্লাহ (সা.) ধনী-গরিব সবাইকে সমানভাবে দেখেছেন, কোনো ভেদাভেদ করেননি। তিনি অনুসারীদের মাঝে এমনভাবে থেকেছেন, যেন তিনি নিজেই একজন অনুসারী। ভ্রাতৃত্ব কাকে বলে, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিনয়ী। এ সম্পর্কে ক্বাদি আইয়্যাদের আশ-শিফা গ্রন্থে লেখা আছে-'তিনি গরিবদের কাছে যেতেন এবং তাদের সাথে বসে কথা বলতেন। কোনো দাস তাঁকে দাওয়াত দিলে গ্রহণ করতেন; তাঁদের সাথে নিবিড়ভাবে মিশতেন। সভায় যেখানে তিনি জায়গা পেতেন, সেখানেই অনুসারী কারও সাথে বসে পড়তেন।
তিনি বাড়ির কাজে ঘরের মানুষদের সাহায্য করতেন। নিজের কাপড়-জুতা নিজেই সেলাই করতেন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতেন, উটদের সেবা-যত্ন করতেন। উটচারণ করতেন এবং তাঁর দাসদের সাথে বসে খাবার খেতেন। তাঁদের সাথে বসে যব পিষতেন এবং নিজ হাতে বাজার করে নিয়ে আসতেন। মক্কা বিজয়ের পর সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রবেশ করার সময় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথাটা এতটাই নুইয়ে দিয়েছিলেন যে, তা উটের পিঠে লেগে যাচ্ছিল।'১১২
খন্দক যুদ্ধে পরিখা খনন করার সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে সাধারণ একজন শ্রমজীবী মানুষের মতো অনুসারীদের সাথে কাজ করেন। এটি তাঁর দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি, সমতা ও বিনয়ের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে রয়ে গিয়েছে, যা ছিল একজন নবির গুণাবলি। ১১৩
একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের মনোমালিন্য চলাকালীন মসজিদে অবস্থান করছিলেন। উমর (রা.) তখন তাঁর কাছে যান। খেজুরগাছের ডালে রাসূলুল্লাহ (সা.) শুয়ে ছিলেন। উমর (রা.) আসায় তিনি উঠে দাঁড়ালেন। এতে উমর (রা.) দেখলেন-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পিঠে দাগ পড়ে গেছে। তিনি তা দেখে কান্না শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কান্নার কারণ জানতে চাইলে উমর (রা.) উত্তর দেন-'ইয়া রাসূলুল্লাহ! কিসরা ও কায়সাররা কত আরাম-আয়েশের জীবনযাপন করছে। আপনি তো আল্লাহর রাসূল, আপনি এমন দৈন্যদশা নিয়ে বসবাস করছেন।' রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসিমুখে উমর (রা.)-কে বললেন-
'হে উমর! এটা ভেবে তুমি কী খুশি নও—তারা দুনিয়াতে উদ্যাপন করুক আর আমরা আখিরাতে?'১১৪
টিকাঃ
১০৩ ক্যারেন হিগিংটন, The Value of Humility in Leadership (Jul 18, 2018).
১০৪ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৬
১০৫ বুখারি: ৩২৬১
১০৬ ইমাম আন নবাবি, রিয়াদুস-সালিহিন, মাদানি আব্বাসি অনূদিত
১০৭ ইভান ডি, '9 common leadership styles. Which type of leader are you?' (Dec 5, 2018).
১০৮ ইসমাইল নুর, Altruistic Leadership : Prophet Muhammad's Model (Singapore: Partridge Publishing, 2015).
১০৯ ড্যান ক্যাবল, 'How Humble Leadership Really Works', Harvard Business Review (April 23, 2018)
১১০ নুর, Altruistic Leadership
১১১ নুর নবি মুহাম্মাদের নেতৃত্ব, পৃ.-৫-৬
১১২ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৬৭-৬৮
১১৩ সিদ্দিক, মুহাম্মদের জীবনী, পৃ.-২০৪
১১৪ বুখারি: ৪৩৫
📄 আনুগত্য
লিও বগি বলেন-'মহত্ত্বই হলো শ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের চাবিকাঠি। আত্মত্যাগ অনেক উপকারী। এটা আমাদের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, চাপ কমায়, সম্পর্ক অটুট রাখে এবং একটি লম্বা সুখী জীবনের জানান দেয়। '১১৫
ব্রুনা মার্টিনুজি নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন-'নেতার প্রধান কর্তব্য হলো উদার হৃদয় দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং মনের আভিজাত্য দ্বারা পরিচালিত হওয়া। একজন উদার নেতার কাছে ইতিবাচকতা ছড়ানোর জাদু রয়েছে।'
তিনি আরও যোগ করে বলেন-'মহৎ হওয়ার আরেকটি অর্থ হলো পরোপকারী হওয়া। পরোপকারের গুণাবলি অর্জন করলে আপনি কিছু না কিছু নিশ্চয়ই ফেরত পাবেন। সকলের মধ্যে পরিচিতিও বাড়বে। সব সময় মনে একধরনের প্রশান্তি কাজ করবে। সময়, জ্ঞান, পরোপকারিতা ধারণ করে থাকা অনেক উপভোগ্য।'১১৬
সমাজের দায়বদ্ধতাবিষয়ক গবেষক মেগান হোল্টজার বলেন-'আত্মত্যাগ সমাজে একটি ঊর্ধ্বমুখী শৃঙ্খল তৈরির মাধ্যমে সমাজের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে।'১১৭
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহত্ত্বের নীতি ছিল অনেকটাই ভিন্ন, যা উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে আর তিনি 'না-বোধক' উত্তর দিয়েছেন-এমন ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।১১৮ থাকলে তিনি তা দিয়ে দিতেন, আর না থাকলে উত্তম কোনো কথা বলতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন-
‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে কিছু চাইল। তিনি তাকে দুই পর্বতের মাঝখানে যতগুলো মেষ ছিল, সবগুলো দিয়ে দিলেন। লোকটি তার সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলল—“ইসলাম গ্রহণ করো। তিনি কখনো অভাবের ভয় করেন না। এই দেখো তিনি আমাকে এসব দিয়েছেন”। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেক মানুষকে ১০০টির বেশি উট দিয়েছেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে তিনি প্রথমে ১০০, তারপর আরও ১০০, তারপর আরও ৩০০টি উট দিয়েছিলেন।১১৯
তারপর আরেকজন এসে তাঁর কাছে চাইল। তখন তিনি বললেন— “আমার কাছে আর কিছু নেই। তবে আমার নাম নিয়ে কিছু নিয়ে নিতে পারো। আমি পরে তা চুকিয়ে দেবো।” উমর (রা.) বললেন— “আপনি যা করতে পারবেন না, তা করতে তো আল্লাহ আপনাকে বাধ্য করেননি।” রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই উক্তি পছন্দ করলেন না। এক আনসারি সাহাবি তখন বললেন—“ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনি হ্রাস পাওয়ার চিন্তা না করে আল্লাহর ধনভাণ্ডার হতে দান করুন।” আল্লাহর রাসুল এবার হাসলেন এবং বললেন—“আমাকে তা করতে আদেশ করা হয়েছে!”১২০
আয়িশা (রা.) বলেন— ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক গুণ ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। যখনই তাঁকে ঘরের কেউ কিংবা সাহাবিরা তাঁর সাহায্য চেয়েছেন, তাঁরা তা পেয়েছেন।১২২
আনাস (রা.) আরও বলেন— ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার কারণে তিনি কখনো আগামীকালের জন্য ঘরে কোনো কিছু জমিয়ে রাখতেন না।১২২
নবিজির নাতি হাসান (রা.) বলেন— ‘তিনি মানুষের কারণে অনেক সময় না খেয়ে থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর পর্যন্ত বেঁধেছেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে—টানা তিন দিন কোনো খাবারই খাননি।১২৩
আবু তালহা (রা.) বর্ণনা করেন-
'একদা ক্ষুধার জ্বালায় আমরা রাসূল (সা.)-এর কাছে গিয়ে এ বিষয়ে বর্ণনা করি এবং পেটে যে পাথর বেঁধেছি, তা দেখাই। তিনি তা দেখে তাঁর শরীরে উন্মুক্ত করে দেখান। সেখানে আমরা দুটি পাথর দেখতে পাই।'১২৪
এসবই বলে দেয়-রাসূলুল্লাহ (সা.) যা শিখিয়েছেন, তা নিজে আগে পালন করেছেন। হাদিসে আছে-
'ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করবে।'১২৫
উদারতা নেতৃত্বের অন্যতম গুণ। রাসূল (সা.) একবার একটি গোত্রের নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেন। কারণ, সেই নেতা উদার ছিলেন না। একবার একটি প্রতিনিধিদল এলে রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাস করলেন-
'হে বনু সালামা! তোমাদের নেতা কে?' তারা উত্তর দিলো-'বিশির ইবনে কিয়াস! যদিও সে অনেক হৃদয়হীন নেতা।' রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'হৃদয়হীন হওয়ার চেয়ে আর কোনো খারাপ অসুখ আছে কি?' তখন তাঁরা বলল-'তাহলে কে হবে আমাদের নেতা?' তিনি বলেন- 'বিশির ইবনে বারা ইবনে আল মারওয়ান।'১২৬
টিকাঃ
১১৫ লিও জে বগি, III-'5 Reasons Generosity is the Key to Great Leadership' (Dec 6, 2016)
১১৬ ব্রুনা মার্তিনজ্জি, 'Why Being a Generous Leader Can Make You a Great Leader.'
১১৭ মেগান হাল্টজার, What is generous leadership? (Nov 7, 2018)
১১৮ মুসলিম: ৫৭২৬
১১৯ মুসলিম : ৫৭০০
১২০ তিরমিজি, কুদি আইয়াদের আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৮
১২১ আবু নুআইম, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৬২
১২২ তিরমিজি, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৮
১২৩ হায়াতুস-সাহাবা, পৃষ্ঠা-৩৭৬
১২৪ আততারগিব ওয়াত-তারহিব, পৃষ্ঠা ১৫৬
১২৫ বুখারি: ১২
১২৬ আল হাইসাম, মাজমাউল জাওয়াইদ, হাদিস : ৯.৩১৫
📄 উদারতা ও ক্ষমাশীলতা
উদারতাকে নেতৃত্বের উচ্চমানের গুণ হিসেবে উল্লেখ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রুশবেথ কান্টার বলেন-'নেতৃত্বের সবচেয়ে সাহসী কাজ হচ্ছে-প্রতিপক্ষে থাকা মানুষদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তাধারাকে শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যারা কোনো সমস্যা করে বা ক্ষমতা টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।'১২৭
শাওয়েন বলেন- 'যখন ক্ষমা একটি নেতৃত্বের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়, তখন আপনি আনুগত্যের জন্ম দেন, সৃষ্টিশীলতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করেন।'১২৮
রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দেওয়া আদেশ পালন করেন এবং তা আগে নিজের ওপর প্রয়োগ করেন। আল্লাহ বলেছেন-
'মন্দকে প্রতিহত করো ভালো কিছুর মাধ্যমে। ফলে যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে।' সূরা হা-মিম সাজদা: ৩৪
আয়িশা (রা.) বলেন- 'রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কখনো কারও ওপর প্রতিশোধ নিতে আমি দেখিনি। তিনি কারও ওপর হাত তোলেননি; শুধু আল্লাহর রাস্তায় করা যুদ্ধ ব্যতীত।'১২৯
আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন- 'রাসূলুল্লাহ (সা.) আর আমি একসাথে হাঁটছিলাম। তাঁর পরনে ছিল নাজরানি পোশাক। একজন বেদুইন এসে সেই কাপড় এমনভাবে টানতে শুরু করল, যার কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) কাঁধে ব্যথা অনুভব করছিলেন। তারপর সে সেটা চাইল। নবিজি তাঁকে তা উপহার হিসেবে দিয়ে দিলেন।'১৩০
ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অসহনীয় কষ্ট সইতে হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দুটি দাঁত ভেঙে যায়। সাহাবিরা তাঁকে এই অবস্থায় দেখে কষ্টে বলে ফেলেন-'আপনি যদি তাদের বিরুদ্ধে শুধু একটি দুআ করতেন!' তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- 'আমাকে তা করতে পাঠানো হয়নি। আমাকে মানবতার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।'১৩১
এমনকি আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে নিয়ে আসা হলে তাকেও তিনি শর্তহীনভাবে ক্ষমা করে দিয়ে দুনিয়ার বুকে ক্ষমাশীলতার অনন্য উদাহরণ রেখে যান। অথচ এই আবু সুফিয়ান বারবার তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছে, তাঁর আপন চাচাকে হত্যা করেছে, সাথে সাহাবিদেরও।
তিনি আবু সুফিয়ানকে বলেন-'হে আবু সুফিয়ান! তোমার কি এখনও সময় আসেনি এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার?' সে তখন জবাব দেয়-'আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক। কতই-না দয়াবান ও উদার আপনি, যিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখেন!'১৩২
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি রক্তপাতহীন বিজয়ের চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি এমন এমন মানুষদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যা চিন্তা করাও অকল্পনীয়। অথচ ওই লোকগুলো তাঁকে প্রাণে মারতে চেয়েছিল। কাবা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন-'হে কুরাইশ! আজ তোমরা প্রতিদান হিসেবে কী চাও?' তাঁরা জবাব দেয়- 'হে আমাদের ভাই! আমরা আপনার থেকে ভালোটাই আশা রাখি।' তাদের জবাব শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন-'আজ কোনো অভিযোগ নেই। যাও তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হলো, তোমরা যা ইচ্ছা করো।'১৩৩
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উদারতার চূড়ান্ত উদাহরণ আরও আছে। তাঁর জানশত্রু ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করেছে, তাকেও ক্ষমা করা হয়। ওয়াশিকে ক্ষমা করে দেন, যে তাঁর প্রিয় চাচা হামজা (রা.)-কে হত্যা করেন। হিন্দাকে ক্ষমা করে দেন, অথচ সে হামজা (রা.)-এর শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে তারপর কলিজা মুখে নিয়ে চর্বণ করে। হাব্বার ইবনে আল আসওয়াদকে ক্ষমা করে দেন, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর মেয়ে জয়নাব (রা.)-এর উটকে খেপিয়ে দিয়ে তাঁকে ফেলে দেন। ফলে তাঁর গর্ভপাত হয়। এর কারণেই তিনি বেশি দিন বাঁচতে পারেননি।
মাত্র চারজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। তারা হলো-আল হুয়াইরিত, যে জয়নাব (রা.)-কে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, মদিনা থেকে মুসলিম হত্যা করে পালিয়ে আসা দুই যুবক এবং ইবনে খাতালের একজন দাসী। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
'হে বালক! কারও মনে কোনো প্রকার আঘাত কিংবা কষ্ট না দিয়ে তুমি যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পার করতে পারো, তাহলে সেটাই করো। এটাই আমার সুন্নাহ। আর যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে যেন আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।'১৩৪
টিকাঃ
১২৭ মারিসা লেভিন, The Secret of Great Leadership: Forgiveness (June 15, 2017)
১২৮ লেভিন, The Secret of Great Leadership : Forgiveness
১২৯ মুসলিম ও বুখারি, আশ-শিফা গ্রন্থে বর্ণিত, পৃ.-৫৬; বুখারি: খণ্ড-৪, হাদিস ৭৬০
১০০ বুখারি: ৩৩৭
১৩১ আশ-শিফা, ক্বাদি আইয়্যাদ, পৃ.-৫৫
১৩০২ আত তাবারানি ও আল বায়হাকি, ক্বাদি আইয়্যাদের আশ-শিফায় বর্ণিত, পৃ.-৫৭
১০০ জাদুল মাআদ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৯৪
১৩৪ তিরমিজি, আশ-শিফা, পৃ.-২২৭