📄 নীতিনির্ধারক নেতৃত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহ প্রদত্ত নীতি ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক নীতি; দুটোই বাস্তবে অনুসরণ করেছেন এবং সবার জন্য তা উদাহরণ হিসেবে পেশ করে গেছেন। আমেরিকার শিক্ষাবিদ স্টিফেন কোভি তার ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উন্নয়নের জন্য নীতিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। ৮৬ তিনি বলেন-
'একজন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ মান তার বাস্তবিক কাজের ভিত্তি তৈরি করে।'
এটাই আল্লাহর সকল নবি-রাসূলের পথ। আল্লাহর পথে চলতে হলে আন্তরিকতার সাথে চলতে হবে। মালয়েশিয়ার ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ইসমাইল নুর লিখেছেন-
'নীতিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ভিত্তি হচ্ছে নৈতিকতা এবং নীতিমালার সমন্বয়। যেমন: স্বচ্ছতা, সমঅধিকার, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, বিশ্বস্ততা হলো সর্বজনীন আইন। নীতিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব যারা পরিচালনা করেন, তারা সবার আগে তাদের জীবনে, সম্পর্কে, সমাজে, চুক্তিতে, মিশনে এসব নীতি প্রয়োগ করে গেঁথে নেন।
বিশ্বাসই হলো নেতৃত্বের মূলমন্ত্র। যখন কারও প্রতি বিশ্বাসের মান অনেক বেশি থাকে, তখন আমরা তাকে খুব সহজেই গ্রহণ করি, আপ্যায়ন করি, সহজেই তার সাথে একটা বোঝাপড়ায় চলে যাই। যখন মানুষ তাঁর ব্যক্তিত্বের চেয়ে চরিত্রের দিকে বেশি নজর দেয়, তখন সম্পর্ক বেশি দিন টেকে।
ব্যক্তিত্ব হলো নতুন কোনো কিছুতে দক্ষতা অর্জন কিংবা নিজেকে অন্যরূপে উপস্থাপন করা। আর চরিত্রের উন্নতি বলতে বোঝায়- অভ্যাস পরিবর্তন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, গুণাবলির উন্নয়নে মনোনিবেশ এবং ওয়াদা রক্ষা করা। সুতরাং চারিত্রিক উন্নয়ন হলো নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি। ৮৭
রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে বলেন- 'চারিত্রিক গুণাবলিকে নিখুঁত করার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। '৮৮
আরও দুটি উদাহরণ আছে, যা পড়লে আমরা বুঝতে পারব-রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নীতিতে অটল ছিলেন। অবস্থা কিংবা পরিস্থিতি যা-ই থাকুক না কেন, তিনি কিছুতেই তাঁর নীতিতে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না।
'তারা কামনা করে-যদি তুমি আপসকামী হও, তবে তারাও আপসকারী হবে।' সূরা কলম : ৯
জাবির ও আত-তাবারানি থেকে বর্ণিত আছে- 'মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এসে প্রস্তাব দিলো-“এক বছর আমরা তোমার ঈশ্বরের ইবাদত করব, আরেক বছর তুমি আমাদের ঈশ্বরের ইবাদত করবে।” ইবনে ইসহাক (রহ.) বলেন-“আল আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুগিরা, উমাইয়া ইবনে খালাফ, আশআস ইবনে ওয়ায়েল আস-শামি এবং আরও কয়েকজন মুশরিক মিলে কাবা প্রাঙ্গণে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাদের ঈশ্বরের ইবাদত করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল।”
তারা আরও বলল-“আমাদের ঈশ্বরের চেয়ে তোমার ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হলে তা আমাদের জন্যই তো ভালো। কিন্তু যদি তোমার ঈশ্বরের চেয়ে আমাদের ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হয়, তাহলে তুমি তা থেকে সুবিধা পেতে বঞ্চিত হলে।””৮৯
আল্লাহ এর সাথে সাথে সূরা কাফিরুন নাজিল করে তাদের জানিয়ে দিলেন-
'বলো-“হে কাফিররা! তোমরা যার ইবাদত করো, আমি তার ইবাদত করি না এবং আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও। আর তোমরা যার ইবাদত করছ, আমি তার ইবাদতকারী হব না। আর আমি যাঁর ইবাদত করি, তোমরা তাঁর ইবাদতকারী হবে না। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমার জন্য আমার দ্বীন।”” সূরা কাফিরুন : ১-৬
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে ছাড় না দেওয়ার আরেকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। এমন একটি ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় তায়েফের বনু সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ করার সময়। তারা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য জাকাত না দেওয়ার শর্ত দিলো। অনেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ছাড় দেওয়ার জন্য বললে তিনি তা দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিলেন। আর সবার উদ্দেশে বললেন-'যে সালাত ও জাকাতের মধ্যে বিচ্ছেদ করে, সে মুসলিম নয়।'
এই ঘটনা প্রমাণ করে-রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নীতিতে ছিলেন অটল এবং কারও মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দ্বীনে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। আল্লাহর প্রেরিত নবি হওয়ার অন্যতম গুণ এটি। নবি-রাসূলগণ জানেন, দ্বীনে ছাড় দেওয়ার কোনো অধিকার তাঁদের নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নানাবিধ নৈতিক ও মানসিক চাপ ছিল। কারণ, এই মুশরিকরা তাঁরই আত্মীয়স্বজন। তারা হাতছাড়া হয়ে যাওয়াটা ছিল কষ্টকর। তবুও তিনি দ্বীনের প্রশ্নে কুরাইশদের দাবি মেনে নেননি। দ্বীনের কাজের বেলায় তিনি ছিলেন একদম অটল-অবিচল।১০
টিকাঃ
৮৬ স্টিফেন কাভারি, Principle Centred Leadership (New York: Simon and Schuster, 1991)
৮৭ ইসমাইল নুর, নবি মুহাম্মাদের নেতৃত্ব
৮৮ আল মুয়াত্তা, অধ্যায় ভালো চরিত্রের, হাদিস ৮
৮৯ আজমান হুসাইন, রোজহান উসমান এবং তারেক আল সুওয়াইদায়ান, নবি মুহাম্মাদ : ১০
১০ মির্জা ইয়াওর বেগ, রাসূলের জীবন থেকে নেতৃত্বের অনুশীলন
📄 মুহাম্মদ (সা.); মানবজাতির রহমত
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে 'মানবজাতির জন্য রহমত' বলেছেন-
'আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।' সূরা আম্বিয়া: ১০৭
এই আয়াত বোঝায়-রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশন পুরো বিশ্বের জন্য। এখানে 'আলামিন' শব্দটি সর্বজনীন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; মানুষ, পশু-পাখি, বৃক্ষরাজি ও জিনদের জন্যও। এটি নাস্তিক ও সংশয়বাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। এক বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী বলেছেন-
'দুনিয়ার জীবন যেখানে বিশৃঙ্খল ও কষ্টকর, সেখানে অনুসারীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ক্ষমা ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
একজন নেতার ক্ষমা কেমন হওয়া উচিত, নিচের আয়াতটি তা জানিয়ে দেয়-
'তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদের ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো। আর কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর যখন সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।' সূরা আলে ইমরান : ১৫৯
নবুয়তের ১০ বছর পর نবিজি তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মক্কা বিজয় করলেন। অতঃপর অগ্রসর হলেন তায়েফের দিকে। এর আগে ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তায়েফবাসীকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে গেলেন, কিন্তু তারা তাঁকে গ্রহণ করেনি; বরং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের পাথরের আঘাতে তাঁর ও জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)-এর শরীর রক্তাক্ত হয়েছে। এমন অবস্থায়ও তিনি আল্লাহর দিকে হাত তুলে দুআ করে বললেন-
'হে আল্লাহ! আমার অক্ষমতা ও সহায়-সম্বলহীনতা এবং মানুষের কাছে আমার নগণ্যতার জন্য আমি আপনারই কাছে ফরিয়াদ করছি। হে পরম দয়াময়! আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক। আপনি আমার রব। আপনি আমাকে কার হাতে সোপর্দ করেছেন? আমার প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করে, সেই অনাত্মীয়ের হাতে? নাকি সেই শত্রুর হাতে, যাকে আমার ওপর কর্তৃত্ব দান করেছেন? আমার প্রতি যদি আপনার অসন্তুষ্টি না থাকে, তবে আমি কোনো কিছুর পরোয়া করি না। আপনার প্রদত্ত নিরাপত্তাই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। আমার প্রতি আপনার ক্রোধ কিংবা অসন্তুষ্টি থেকে আমি আপনার নুরের আশ্রয় চাই, যা দ্বারা সকল অন্ধকার তিরোহিত হয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্যাসমূহের সুরাহা হয়। সবকিছুর শেষ পরিণাম আপনিই। আপনি ছাড়া আর কারও ক্ষতি প্রতিহত করার এবং উপকার করার ক্ষমতা নেই। '৯২
একটি আঙুর বাগানে বিশ্রাম নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও জায়েদ (রা.) রওনা দিলেন মক্কার দিকে। পথে 'কারনে মানাজেল' নামক স্থানে তাঁরা থামলেন। সেখানে আল্লাহর হুকুমে জিবরাইল (আ.) এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতারা। জিবরাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন-'আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যা বলেছে এবং যে আচরণ করেছে, আল্লাহ সবকিছু শুনেছেন এবং দেখেছেন। এখন তিনি পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতাগণকে আপনার খেদমতে প্রেরণ করেছেন। আপনি তাঁদের যা ইচ্ছে নির্দেশ প্রদান করুন।'
এরপর পর্বতের ফেরেশতারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সালাম দিয়ে বললেন-'হে মুহাম্মাদ (সা.)! কথা একটাই, আপনি যদি চান এদের আমরা দুই পাহাড় একত্রিত করে পিষে মারি, তাহলে তা-ই হবে।' আমাদের নবি যে সত্যই রহমতের নবির উদাহরণ, এই ঘটনা তার বড়ো নজির। আসুন আমরা দেখি, কী ছিল তাঁর উত্তর? রাসূলুল্লাহ (সা.) তারপর বললেন-
'না, বরং আমার আশা-মহান আল্লাহ এদের পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন, যারা একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে এবং অন্য কাউকেই তাঁর অংশীদার ভাববে না। '৯৩
আহত শরীর আর ভগ্নহৃদয় নিয়েও তিনি প্রতিশোধের চিন্তা করেননি। সীমাহীন ঔদার্যের নজরানা স্থাপন করে ক্ষমাশীল হৃদয় নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুআ করলেন, যারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস আনবে। পরবর্তী সময়ে আয়িশা (রা.) একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন- 'উহুদের চেয়ে আপনার জীবনে কঠিনতম দিন এসেছিল কি?' তিনি বললেন- 'হ্যাঁ, তায়েফের ঘটনা।'
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এই ক্ষমার গুণাবলিই অনুসারীদের মধ্যে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন জীবনভর। হাদিসে আছে-
'অবশ্যই আল্লাহ দয়াশীল, তিনি দয়াশীলদের ভালোবাসেন। যে কঠোরতা অবলম্বন করে না, তাঁকে আল্লাহ উপহার দান করেন। '৯৪
আরেকটি হাদিসে আছে-
'যখন দয়া দেখানো হয়, তখন তা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আর যখন দেখানো হয় না, তখন তা পরিস্থিতি নষ্ট করে দেয়। ১৯৫
মক্কা বিজয়ের পর মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানো হলো। পথমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উপদেশ দিলেন-
'নম্র থাকবে, কঠোর হবে না। মানুষের কাছে সুসংবাদ পৌঁছে দেবে। যখন ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তোমার কাছে আসবে, তখন তাঁরা তোমাকে “জান্নাতের চাবি কী?” জিজ্ঞেস করবে। বলবে-“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং তাঁর কোনো অংশীদার নেই।””৯৬
টিকাঃ
জর্ডান পিটারসন, 12 Rules for Life : An Antidote to Chaos (New York: Allen Lane, 2018), pp.201 and 227
৯২ সিদ্দিকি, মুহাম্মাদের জীবনী, পৃ.-৭৩
৯৩ বুখারি : ৩০৫৯ ও মুসলিম : ১৭৫৯
৯৪ বুখারি : ৬৯২৭ ও মুসলিম: ৬৯২৭, ২৫৯৩
৯৫ মুসলিম: ২৫৯৪
১৬ ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবি, পৃ.১৬৬
📄 অনুসারীদের নিয়ে উপদেশ
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত থাকতেন। তাঁদের পরবর্তী জীবনের জন্য খুশি আর কল্যাণ কামনা করতেন। আল্লাহ নিজেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই গুণাবলির সাক্ষ্য দিয়েছেন-
'নিশ্চয়ই তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, যিনি তোমাদের দুঃখ-দূর্দশায় কষ্ট পান। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।' সূরা তাওবা : ১২৮
এখানে 'হারিসুন' (حَرِيصٌ) শব্দের অর্থ হলো অন্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে কল্যাণ চাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'আমি ও আমার উম্মাহর উপমা এমন-আগুন জ্বলছে আর তাতে পোকামাকড় ঝাঁপিয়ে পড়ছে একে একে। আমি দাঁড়িয়ে তাদের সেখানে যাওয়া থেকে আটকাচ্ছি, কিন্তু তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে হলেও যেতে চাইছে।'৯৭
তিনি আরও বলেন-
'তোমাদের মধ্যে সে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী নয়, যে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে না।'৯৮
আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) তাঁর ছেলে হুসাইন (রা.)-কে সাহাবিদের সাথে করা নবিজির আচরণ সম্পর্কে বলেন-
'তিনি তাঁর কাছে থাকা যেকোনো কিছু সবার সাথে ভাগাভাগি করতেন। একেকজনকে এত সম্মান দিতেন, দেখে মনে হতো-আরেকজনের চেয়ে তাকে বেশি সম্মান দেওয়া হয়েছে। কেউ যখন তাঁর কাছে কিছু চাইত, হয় সে তা নিয়ে ফেরত যেত আর নাহয় এর চেয়ে ভালো কিছু নিয়ে যেত। তাঁর ব্যবহার সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল, যেমনটা একজন পিতা তার পুত্রের সাথে করে।
সবাই তাঁর কাছ থেকে সমান অগ্রাধিকার পেত। তাঁর সভা ছিল শ্রেষ্ঠত্ব, ধৈর্য ও বিশ্বাসে ভরপুর। তিনি কথা বলার সময় কোনো শব্দ হতো না, সবাই তাঁর কথা মন দিয়ে শুনত। সভার সদস্যরা হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করত এবং বিনীত থাকত। বৃদ্ধদের সম্মান দেওয়া হতো আর ছোটোদের ভালোবাসা। প্রয়োজনের সময় আগন্তুককেও সাহায্য করতে পিছপা হতেন না。
হুসাইন (রা.) তাঁর বাবাকে রাসুল (সা.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
‘আল্লাহর রাসুল (সা.) খুব উৎফুল্ল, শান্ত, ঠান্ডা মেজাজের ছিলেন। তিনি কর্কশ ভাষায় কথা বলতেন না। চিৎকার করে কথা বলতেন না। কথার সাথে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন না। কারও খুঁত খুঁজতেন না এবং কারও অতি প্রশংসা করতেন না। অনেক সময় তিনি অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করে ভুলে যেতেন।
তিনি নিজেকে তিনটি জিনিস থেকে বিরত রাখতেন - কুটিলতা, অগোছালো ভাব এবং সেই জিনিস, যা তাঁর নাগালের বাইরে রয়েছে। অন্যদের প্রতি সম্মান রেখে তিনি নিজেকে আরও তিনটি জিনিস থেকে বিরত রাখতেন - কারও পেছনে লেগে থাকা, কাউকে গালমন্দ করা এবং কারও গোপন বিষয়ে জানতে চাওয়া।
তিনি এমন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, যাতে আল্লাহ তাঁকে সওয়াব দান করেন। তাঁর কথা মানুষ এত মনোযোগ দিয়ে শুনত যে, তাঁদের মাথার ওপর যদি কোনো পাখিও এসে বসত, তাহলেও তাঁরা তা টের পেত না। তিনি নীরব থাকলে সাহাবিরা কথা বলতেন। তাঁর সামনে কেউ ঝগড়ায় জড়াতো না। যখন কেউ তাঁর সাথে কথা বলতেন, তখন বাকিরা চুপচাপ বসে শুনতেন।
দারুণ সব বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো। কোনো বিষয় নিয়ে তিনি হাসলে সাহাবিরাও হাসতেন। কোনো বিষয়ে অবাক হলে সাহাবিরাও অবাক হতেন। কর্কশ আর বেদুইনদের সাথে তিনি অত্যন্ত কোমল স্বরে কথা বলতেন। তিনি একদা বললেন - “যখন তুমি কাউকে তোমার কাছে চাইতে দেখবে, তখন তাঁকে তা দান করো যা সে চায়।”
কথোপকথন কিংবা প্রশংসার ক্ষেত্রে তিনি ভারসাম্য পছন্দ করতেন। অন্য লোকের কথা শেষ না হওয়া অবধি কিংবা শেষ করে বসা থেকে না ওঠা অবধি তাঁর কথার মাঝখানে কোনো ব্যাঘাত ঘটাতেন না।”
বিনা ব্রাউন নেতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করেন-
'বিখ্যাত নেতারা সামাজিক অনুষ্ঠানে বেশি বেশি অংশগ্রহণ করতেন। ফলে তাঁরা সমাজের মানুষের আবেগ ও উৎফুল্লতার কথা সহজেই বুঝতেন।'১০০
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে সাহাবিদের নিয়ে বসে আলোচনার ফলাফল এতটাই ফলপ্রসূ ছিল যে, তাঁর জীবদ্দশাতেই সমগ্র আরবে তা ছড়িয়ে পড়ে। আর তাঁর মৃত্যুর পর সেই শাশ্বত বাণী ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বের আনাচে-কানাচে। আজও তা মানুষের মন জয় করে নিচ্ছে, মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করছে।
টিকাঃ
*৯৭ মুসলিম: ১৮
*৯৮ বুখারি, ভলিওম ১, বই ২, হাদিস ১৩
>> সুফিয়ান ইবনে উকায়নার বর্ণিত হাদিস, কাদি আইয়াদের আশ-শিফায় বর্ণিত, পৃ.-৮২-৮৩
১০০ ব্রাউন, ফলো মাই লিড, পৃ.-১২০
📄 নেতৃত্বের অনন্য আদর্শ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনেক বড়ো মিশন ছিল বটে, কিন্তু তিনি কোনো ভাববিলাসী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বাস্তবিক সংস্কারক। তিনি অনুসারীদের যা উপদেশ দিতেন, তা আগে নিজে করে দেখাতেন। এতে তাঁরা উদ্বুদ্ধ হতেন। তাবুকের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'সর্বোত্তম নির্দেশিকা হলো তা, যা বাস্তবে প্রয়োগ করা হয়।'১০১
নেতৃত্বের ওপর আধুনিক গবেষণার ফলাফল বলে-অনুসারীরা সেই নেতার প্রতি বেশি প্রত্যাশী থাকে, যিনি তার কথাকে কাজে পরিণত করে দেখাতে পারেন। নেতার প্রতি বিশ্বাস অর্জনের প্রথম ধাপ হিসেবে লোকেরা আগে তাঁর কথা শোনে। তারপর দেখে-সে কথাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না। এর ফলাফল কী হচ্ছে; সেদিকেও তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা তাঁর স্বর্ণালি নেতৃত্ব দেখতে পাই। তিনি যা করতেন, তা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন। কথায় আছে— 'যেই কথা সেই কাজ।' রাসূলুল্লাহ (সা.) সবাইকে নামাজ আদায়ের কথা বলতেন, আবার তিনিই প্রথমে নামাজে লেগে যেতেন। তিনি আল্লাহকে ভয় করতে বলতেন, আবার তিনিই প্রথম আল্লাহকে ভয় করতেন। মানুষকে দান-সাদাকা করার কথা বলে তিনি নিজেই প্রথমে দান-সাদাকা করতে লেগে যেতেন। যুদ্ধের জন্য সবাইকে আহ্বান করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং যুদ্ধের ময়দানে প্রথম সারিতেই তিনি দাঁড়াতেন। ১০২
টিকাঃ
১০১ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, মুসনাদ, নাসিরুদ্দিন আল খাত্তাব অনুদিত।
১০২ আয়াজ আল কারনি, Mercy to Humanity, trans. by Faisal ibn Muhammad Shafeeq (Riyadh: International Islamic Publishing House, 2013), p.517.