📄 রাসূল (সা.)-এর ওফাতের সময় মদীনায় তাঁর পরিবার
নবি মুহাম্মাদ ﷺ
স্ত্রীগণ
সাওদা (রা.) হাফসা (রা.) জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) উম্মে হাবিবা (রা.) মাইমুনা (রা.) আয়িশা (রা.) উম্মে সালমা (রা.) জুয়াইরিয়া (রা.) সাফিয়া (রা.)
মেয়ে জামাতা ফাতিমা (রা.) আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)
নাতি-নাতনি হাসান (রা.) হুসাইন (রা.) উমামাহ (রা.) কুলসুম (রা.) জয়নাব (রা.)
📄 ব্যবসায়ী
নবুয়তের পূর্বে নবিজি তাঁর কর্মজীবনকে আমাদের সামনে রোলমডেল হিসেবে পেশ করেন। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি মক্কার কাছাকাছি পাহাড় এবং বিভিন্ন উপত্যকায় ভেড়া ও ছাগল চরানোর কাজ করতেন। তাঁর জন্য এই সময়টি ছিল জীবন, প্রকৃতি এবং বাস্তবতাকে নিয়ে চিন্তা করার সময়।
আমরা যদি মেষপালকের দিকে তাকাই, তাহলে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে। একজন মেষপালককে তার মেষগুলো চারণ ও দেখভাল করতে হয়, যেন সেগুলো পথভ্রষ্ট না হয় কিংবা শিকারি তাদের আক্রমণ করতে না পারে। এই বিষয়টি একজন নবির কাজকে প্রতিফলিত করে; যিনি মানবজাতিকে বাঁচাতে ও ভালোর পথে পরিচালন করতে চান। পূর্বের নবিরাও মেষপালক ছিলেন। যেমন: মুসা ও দাউদ (আ.)-কে এই মেষপালনের মাধ্যমে প্রাথমিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছিল।
মক্কা ছিল ট্রান্স-আরবীয় ব্যাবসায়িক বাণিজ্য পথের একটি মূল কেন্দ্র। এর দক্ষিণ দিকে ইয়েমেন এবং পূর্ব আফ্রিকা যাওয়ার পথ। উত্তর দিকে ছিল শাম (সিরিয়া), বসরা, মিশর, রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যে যাওয়ার পথ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স যখন ১২, তখন তাঁর চাচা আবু তালিব সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। সিরিয়াতে ব্যাবসায়িক কাজে যাওয়ার সময় তিনি নবিজিকে রেখে যাওয়ার চিন্তা করলেন। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হলেন নবিজি। তাই তিনি চাচাকে জোর করতে লাগলেন তাঁকেও সঙ্গে নেওয়ার জন্য।
এতিম ভাতিজা। আবু তালিব না বলতে পারলেন না। ফলে তিনি নবিজিকে নিয়েই রওনা হন। বলা হয়ে থাকে, এই যাত্রায় খ্রিষ্টান পাদরির সাথে তাঁর দেখা হয়, যিনি তাঁকে শেষনবি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কারণ, তাদের কিতাবে শেষনবির আগমনি বার্তা হিসেবে ভবিষ্যদ্বাণী করা আছে। তবে খ্রিষ্টান পাদরির এই ঘটনা নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় তাঁর ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। একজন ব্যবসায়ীকে ব্যাবসা করতে গিয়ে নানান ধরনের মানুষের সাথে লেনদেন, মোয়ামেলাত করতে হয়। মানুষকে চিনতে হয়। মানুষের নাড়ি-নক্ষত্র বুঝতে হয়। তাদের রুচি, অভ্যাস, চিন্তার ভিন্নতা সম্পর্কে জানতে হয়। সুতরাং ব্যাবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নবিজিও মানুষের আচরণের ব্যাপারে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। এই বিষয়টি তাঁর নেতৃত্বগুণকে আরও বেশি পরিপক্ব করে তোলে।
যাহোক, নবিজির বিশুদ্ধ চরিত্র ও সহনশীল আচরণের জন্য মক্কার সকলেই তাঁকে একই সুরে আল আমিন ও আল সাদিক উপাধি দিয়েছিল; যার অর্থ বিশ্বাসযোগ্য ও সত্যবাদী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স তখন ২৫। আবু তালিব হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এরই মধ্যে খবর পেলেন মক্কার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী খাদিজা (রা.) তাঁর বাণিজ্যিক কাফেলার পরিচালনা করার জন্য মানুষ খুঁজছেন।
আবু তালিব এই খবর রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানালেন এবং যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিলেন। অন্যদিকে খাদিজা (রা.) যখন শুনলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনা করবেন, তখন তিনি আর ভিন্ন কোনো চিন্তা না করে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন। আর হবেনই-বা না কেন! তিনি তো জানতেন তাঁর নৈতিকতা সম্পর্কে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে সিরিয়া গেলেন এবং অন্যবারের চেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করে মক্কায় ফিরলেন। খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময়ে কুরাইশদের মধ্যে খাদিজা (রা.)-এর বংশ, মর্যাদা ও সম্পদে সবচেয়ে ধনী হওয়ার কারণে তিনি ছিলেন সম্মানিত মহিলা। ৬৬
রাসূলুল্লাহ (সা.) ব্যাবসা-বাণিজ্য করার সময় কিছু নীতিমালা প্রয়োগ করেছিলেন। এই সংক্রান্ত হাদিসগুলো উল্লেখ করা হলো-
'আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যে নম্রতার সাথে ক্রয়-বিক্রয় করে ও পাওনা ফিরিয়ে চায়।'৬৭
'ক্রেতা-বিক্রেতা যতক্ষণ পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হয়, ততক্ষণ তাদের এখতিয়ার থাকবে (ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করা বা বাতিল করা)। যদি তারা সত্য বলে এবং অবস্থা ব্যক্ত করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে আর যদি মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত মুছে ফেলা হয়।'৬৮
'ঘাম শুকানোর পূর্বেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।'৬৯ 'ঘুসখোর ও ঘুসদাতার প্রতি আল্লাহর অভিশাপ।'৭০
'কিয়ামতের দিন সৎ ব্যবসায়ীরা আরশের নিচে স্থান পাবে এবং নবি, সিদ্দিক ও শহিদদের কাতারে থাকবে।'৭১
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাবসায়িক নীতি ছিল-ক্রেতা ও বিক্রেতা দুপক্ষই নিজেদের সুবিধার জন্য সংযোগ বা সম্পর্ক স্থাপন করবেন। একজন ব্যবসায়ীর অন্যতম প্রধান গুণ হলো-তার কথা ঠিক থাকা। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন কথা ঠিক রাখার মূর্তপ্রতীক। আবদুল্লাহ ইবনে আবুল হাওসা এমন একটি ঘটনার বর্ণনা করেছিলেন।
ঘটনাটি নবুয়তের পূর্বের। আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একটি আমানত রেখেছিলেন। কোনো এক কারণে আবদুল্লাহ ফিরে আসবেন বলে চলে গেলেও ফিরে আসতে ভুলে যান। তিন দিন পর তাঁর মনে হলে দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখেন-রাসূলুল্লাহ (সা.) ওই একই জায়গায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। আবদুল্লাহ তাঁর কথা রাখতে ব্যর্থ হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ওপর বিরক্ত বোধ করেননি। তিনি শুধু আবদুল্লাহকে বলেছিলেন-'তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ, তিন দিন ধরে আমি এখানে অপেক্ষা করছিলাম।'৭২
নবুয়তলাভের পূর্বে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ব্যাবসা-বাণিজ্য চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের ও খাদিজা (রা.)-এর সম্পত্তি ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। আর নবুয়তলাভের পর তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবি হিসেবেই জীবন পার করেছেন। নবি হিসেবে তিনি যে সময়কাল (২৩ বছর) অতিবাহিত করেছেন, তার থেকে বেশি সময় (২৫ বছর) অতিবাহিত করেছেন একজন ব্যবসায়ী হিসেবে।
টিকাঃ
৬৫ সিদ্দিকি, মুহাম্মাদের জীবনী, পৃ. ৫২
৬৬ ইবনে ইসহাক। মুহাম্মাদের জীবনী, edited by Michael Edwards (London: Folio Society, 1964), p.26.
৬৭ বুখারি: ১৯৭০
৬৮ বুখারি: ২৯৩
৬৯ ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩
৭০ আবু দাউদ, আহমাদ হাসান অনূদিত (New Delhi : Kitab Bhavan, 1990), Hadith 1595.
৭১ তিরমিজি: ১২০৯
৭২ আবু দাউদ: ৪৯৯৬
📄 মিলিটারি কমান্ডার
মদিনায় হিজরত করলেন নবিজি। এতে মক্কা থেকে আগত সাহাবিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ হলো। কিন্তু থেমে থাকল না কুরাইশদের ষড়যন্ত্র। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিমদের ধ্বংস করে দিতে চাওয়া কুরাইশদের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সশস্ত্র সংঘর্ষ বেঁধে গেল। নবিজি সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করতে লাগলেন, যেন শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। এ সময়ই আল্লাহ মুসলিমদের আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দিয়ে ওহি নাজিল করলেন-
'যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদের, যাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ, তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের বিজয়দানে সক্ষম। যাদের তাদের নিজ বাড়ি-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেওয়া হয়েছে যে, তারা বলে- “আমাদের রব আল্লাহ।”' সূরা হজ: ৩৯-৪০
রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৪টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। আর এর মধ্যে ২৬টিতে স্বয়ং তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। নবিজি বেশি অভিযানে না যাওয়ার কারণ হিসেবে বলেছেন-
'আল্লাহর কসম! যদি আমি এটাকে মুসলমানদের জন্য কষ্ট মনে না করতাম, তাহলে প্রতিটি সামরিক অভিযানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতাম না। কিন্তু আমার কাছে যথেষ্ট বাহন নেই।'৭৩
বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ, বনু নাজিরকে উৎখাত, আহজাবের যুদ্ধ, বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে অভিযান, হুদাইবিয়ার সন্ধি, খায়বারের যুদ্ধ, মুতার যুদ্ধ, মক্কা বিজয়, হুনাইনের যুদ্ধ এবং তাবুকের মতো প্রখ্যাত যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ৭৪ এই অভিযানগুলোর ফলাফল হিসেবে সমস্ত আরবে ইসলাম কায়েম হয়।
তিনি সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার সাথে সাথে মুজাহিদদের নৈতিক আচরণ ও আধ্যাত্মিকতার দিকে লক্ষ রাখতেন, যা ইসলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। মুজাহিদদের তিনি ইসলামি শরিয়াহ অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দেন; এমনকি তিনি শত্রুদের প্রতি একটুও রূঢ় ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন। ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-কে সিরিয়া অভিযানে প্রেরণ করার সময় আবু বকর (রা.) তাকে এই বলে উপদেশ দেন-
'আমি তোমাকে ১০টি উপদেশ দিচ্ছি—কোনো মহিলা, শিশু কিংবা বৃদ্ধ বয়সের কাউকে হত্যা করবে না। ফল দেয় এমন গাছ বিনা কারণে কাটবে না। কোনো বাসস্থান ধ্বংস করবে না। খাওয়া ব্যতীত কোনো মেষ কিংবা উটকে জবেহ করবে না। মৌচাকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাদের বিক্ষিপ্ত করবে না। গনিমত থেকে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখবে না এবং কাপুরুষ হবে না।' ৭৫
জাকারিয়া বাসিয়ের রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে 'দুর্দান্ত মিলিটারি কমান্ডার এবং চৌকশ কৌশলবিদ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গুপ্তচরের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি তাঁর কৌশল নির্ধারণ করতেন। এটা তাঁর দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। বরাবরই শত্রুদের জানান দিয়ে সামনে থেকে আক্রমণ করতেন। তবে কদাচিৎ আচমকা আক্রমণ করতেন। দুভাবেই সফল হয়েছেন। মাঝেমধ্যে শত্রুদের অবাক করে দিয়ে আগেভাগে আক্রমণ করে বসতেন।
এসব সম্ভব হয়েছিল তাঁর যুদ্ধের কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার কারণে। তাঁর দলে ছিল বাঘাবাঘা দুর্দান্ত যোদ্ধা, যারা মরুর বুকে দাঁপিয়ে বেড়াতেন। তিনি তাঁর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য গোপন রেখে ময়দানে যেতেন, এতে সহজে কেউ তাঁর গন্তব্য কিংবা উদ্দেশ্য টের পেত না। এই শিক্ষাগুলো তাঁর অনুসারীদের শৃঙ্খলবদ্ধ হতে সাহায্য করেছিল। আর সাথে ছিল আল্লাহর সাহায্য। ফলে এক মাসের পদযাত্রার দূরত্বে থাকা প্রতিপক্ষের হৃদয়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ত। ৭৬
আমেরিকান মিলিটারি ইতিহাসবিদ রিচার্ড গ্যাব্রিয়েল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামরিক দক্ষতার প্রশংসা করে বলেন—'তিনি সত্যিই একজন শ্রেষ্ঠ সেনানায়ক ছিলেন। এক যুগের মধ্যেই তিনি আটটি বড়ো বড়ো যুদ্ধ করেন। ১৮টি অভিযান এবং আরও ৩৮টি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা, যেগুলোর নেতৃত্ব তিনি সরাসরি দেননি; সেসব যুদ্ধের পুরো কলাকৌশল তিনিই ঠিক করে দিয়েছিলেন। যুদ্ধে দুবার আহত হয়েছিলেন। প্রতিপক্ষের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েও যুদ্ধে দাবার গুটি পালটে দিয়ে তাঁর অনুসারীদের বিজয় উপহার দিয়েছিলেন বহুবার।
তিনি শুধু কৌশলী ও ময়দানের সেনানায়ক নন; একই সঙ্গে সামরিক তাত্ত্বিক, সাংগঠনিক সংস্কারক, কৌশলী কমান্ডার, রাজনৈতিক-সামরিক নেতা, বীর সৈনিক এবং একজন বিপ্লবীও ছিলেন। তিনি হলেন বিদ্রোহ যুদ্ধের আবিষ্কারক এবং ইতিহাসের সফল পরিকল্পনাকারী। '৭৭
নবুয়তের আগে সংঘটিত হওয়া ফিজার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে কিছুটা হলেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। ৭৮ আরবের একের পর এক অঞ্চল বিজয়ের সর্বাধিনায়ক রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই ছিলেন। গ্যাব্রিয়েল বিশ্বাস করেন-মুহাম্মাদ (সা.) যদি আরবে সামরিক বিপ্লব না আনতেন, তাহলে হয়তো ইসলাম নিজেও আরবে টিকে থাকত না। ৭৯
২৫ বছর ধরে ব্যাবসা-বাণিজ্য করার ফলে পরিকল্পনা ও রসদ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়েছিলেন। এগুলো ছিল তাঁর জন্য সহায়ক শক্তি। তিনি একটি সমন্বিত সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন, যারা যুদ্ধের পরিকল্পনা ও নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যধিক আত্মবিশ্বাসী। ফলে সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-নবিজি ও ইসলামের প্রতি সাহাবিদের অটল বিশ্বাস ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- 'যুদ্ধ কেবল একটি বিজয়ী কৌশল বা একটি ভালো পরিকল্পনা। ৮০
তিনি উত্তম কৌশল ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছিলেন। গ্যাব্রিয়েল আরও বলেন-'মুহাম্মাদ প্রথমদিকে ছোটো একটি গেরিলা বাহিনী তৈরি করেছিলেন। এই বাহিনী তাৎক্ষণিক আক্রমণ চালিয়ে সরে পড়ার মতো যথেষ্ট শক্তিধর ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাঁর দলের অনুসারী বাড়তে থাকে। আর এক দশক পর যখন তিনি মক্কা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন সেই ছোটো গেরিলা বাহিনী বৃহত্তর সেনাবাহিনীতে পরিণত হলো। এই সমন্বিত অশ্বারোহী বাহিনী এবং পদাতিক সৈন্যদলেরা বড়ো আকারের যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম ছিল। এটি ছিল আরব ইতিহাসের প্রথম কোনো জাতীয় সামরিক বাহিনী। ফলে সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করে তাঁর অনুসারীরা একটি মহান সাম্রাজ্য তৈরি করতে পেরেছিলেন।'
একের পর এক সামরিক অভিযানে সৈন্যসংখ্যা যে জ্যামিতিক হারে বাড়ছিল, তা সৈন্যসংখ্যা দেখলে স্পষ্ট হয়ে যাবে। বদর যুদ্ধে ৩১৩ জন (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ), উহুদ যুদ্ধে ১ হাজার (৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ), খায়বারের যুদ্ধে ২০ হাজার (৬২৮), মক্কা বিজয়ে ১০ হাজার (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ), হুনাইন যুদ্ধে ১২ হাজার (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ), এবং তাবুক যুদ্ধে ২০-৩০ হাজার জন (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ)।৮১
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাহিনী শত্রুদের মুখোমুখি হতে গিয়ে ভয়ংকর প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতেন। কারণ, শত্রুসংখ্যা তাদের চেয়ে কমপক্ষে তিনগুণ বেশি ছিল। অনুপাত করলে ৩ : ১-এ এসে দাঁড়ায়। বদরে ৩১৪ বনাম ১ হাজার; উহুদে ১ হাজার বনাম ৩ হাজার; আহজাবের যুদ্ধে ৩ হাজার বনাম ১০ হাজার ৮২।
সাহাবিদের শক্তি আর সাহসের উৎস ছিল কেবল আল্লাহর প্রতি সীমাহীন ভরসা আর রাসূল (সা.)-এর সম্মোহনী নেতৃত্ব। কুরআনে আল্লাহ ওয়াদা করে বলেন—
'অতএব, যদি তোমাদের মধ্যে ১০০ জন ধৈর্যশীল থাকে, তাঁরা ২০০ জনকে পরাস্ত করবে এবং যদি তোমাদের মধ্যে এক হাজারজন থাকে, তাঁরা আল্লাহর হুকুমে দুই হাজারজনকে পরাস্ত করবে এবং আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।' সূরা আনফাল : ৬৬
শত্রুদের বিশালসংখ্যক সেনা থাকলেও এত কম সময়ে মুসলিমদের একের পর এক বিজয় অর্জনই প্রমাণ করে-মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আল্লাহর প্রেরিত শেষনবি ও রাসূল এবং আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম।
টিকাঃ
৭৩ মুসলিম, মুহাম্মাদ ইউসুফ কান্ধলভি লিখিত, হায়াতুস সাহাবা
৭৪ আস-সিবাই, মুহাম্মাদের জীবনী, পৃ.-৮৫
৭৫ ইমাম মালিক, আল মুয়াত্তা, বই ২১, হাদিস ২১.৩.১০
৭৬ জাকারিয়া বাশির, মদিনার আলোকোজ্জল (Leicester, UK: The Islamic Foundation, 1990), p.93.
৭৭ Richard A Gabriel. Muhammad: The Warrior Prophet.
৭৮ জাকারিয়া বাশির, মদিনার আলোকোজ্জ্বল, পৃ.-৯২
৭৯ Gabriel.
৮০ বুখারি : ২৬৯
৮১ Gabriel.
৮২ Gabriel. Also Dugdale-Pointon, T (22 January 2008), Battle of Mount Uhud 23rd March 625 AD