📄 প্রধান বিচারক
রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দেওয়া কুরআন, সুন্নাহ ও শরিয়াহর আলোকে আইন প্রণয়ন করে সে মোতাবেক বিচারকার্য পরিচালনা করার নির্দেশ দেন। এর নাম 'ইসলামি শরিয়াহ'। মদিনা ও আশেপাশের বিচারকার্য তিনি নিজেই করতেন। অন্যান্য অঞ্চলে সাহাবিদের কাজি বা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করে পাঠাতেন। সেখানকার বিচারকার্য তাঁরাই করতেন। ৪৩
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিচারিক ফয়সালার পরিমাণ এত বেশি ছিল, সেসব একত্রিত করে বিশাল আকারের একটি গ্রন্থ প্রস্তুত করা সম্ভব। তিনি তাঁর নিয়োগকৃত বিচারকদের বিচারকার্যে সহানুভূতিশীল ও ক্ষমাশীল হওয়ার পরামর্শ দিতেন। হাদিসে এসেছে-
'মুসলমানদের ওপর নির্ধারিত শাস্তির চাপ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত এবং যদি কোনো উপায় থাকে, তবে একজন মানুষকে ছেড়ে দেওয়ার কারণ খোঁজা দরকার। কারণ, একজন নেতার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ক্ষমা করা ভালো।' ৪৪
টিকাঃ
৪৩ নাদভি, ভলিউম ৩, পৃ.-৪০
৪৪ তিরমিজি, ৩৫৭০
📄 শিক্ষক ও পরিচালক
আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মানবজাতির জন্য শিক্ষক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কুরআনে বর্ণিত আছে—
'আমি তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, যিনি তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তোমাদের পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। আর তোমাদের শিক্ষা দেন এমন কিছু, যা তোমরা জানতে না।' সূরা বাকারা : ১৫১
সিরাতের মাধ্যমে তাঁর জীবনী এবং হাদিসের মাধ্যমে তাঁর বাণী সাহাবিদের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বইয়ে রূপান্তর করা হয়। এই সিরাত ও হাদিস যুগের পর যুগ মানুষকে আলোকিত করে আসছে। আজও নবিজির শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এবং সন্দেহাতীতভাবে ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।
ড. দাউদ শাহের লেখা Prophet Muhammad (pbuh) as a Teacher নামক চমৎকার বই থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কিত কিছু বিষয় আলোকপাত করা হলো-
'মক্কা ও মদিনা; দুই এলাকায় তাঁর দুই ধরনের ভূমিকা ছিল। মক্কায় থাকাকালীন মুসলিমরা ছিল নির্যাতিত। তাদের ওপর নির্মম অত্যাচার করা হতো। এমনই এক পরিবেশে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াতি কাজ করতেন। যদিও মুসলিমদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল, তবু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা তাঁদের টিকে থাকার বড়ো উৎস হিসেবে কাজে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তিনি সবার সামনেই সাহাবিদের শিক্ষাদান করতেন।
মদিনায় মুহাজির ও আনসার; দুই দলের জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) হয়ে ওঠেন একমাত্র নেতা। মসজিদ ছিল তৎকালীন শিক্ষালয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববিতে বসেই সকলকে শিক্ষাদান করাতেন। একপর্যায়ে তা ইসলামের শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো মুসলিম বিশ্বের নানান প্রান্তে। এটাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর তিনি সাহাবিদের সাথে বসতেন এবং তাঁদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। মহিলাদের জন্যও সপ্তাহে এক দিন বৈঠকের ব্যবস্থা ছিল। এই প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত সফল ইসলামি শিক্ষার বিপ্লবী সূচনা।
নবুয়তপ্রাপ্তির ১৩ বছর পর মদিনায় হিজরত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাকার্যক্রম মদিনাবাসীর জীবন হতে যাবতীয় কলুষতা দূর করতে শুরু করে, তাদের যাবতীয় অনাচার, অপকর্ম থেকে বিরত রাখে। কুসংস্কার, মদ্যপান, জুয়া, সুদ, চুরি, ব্যভিচার, পতিতাবৃত্তি, শিশুহত্যা, সীমাহীন বহুবিবাহ, দাসত্ব ইত্যাদি নির্মূল করার জন্য তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে সফল হন।
আরব সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রয়োগ করেছিলেন, তা হলো-গরিবদের জাকাত প্রদান, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সর্বজনীন করা, মানবাধিকারের ঘোষণা, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ঘোষণা ইত্যাদি।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, একজন রাসূল হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলি, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর অবদান, মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য তাঁর সুশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় শাস্তি দেওয়ার নিয়মকানুন ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে ব্যাপক কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।’৪৬
ইবাদতের বেলায়ও রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী; শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী। চলুন একটি হাদিস দেখি-
'নবিজি একদিন মসজিদে প্রবেশ করে সাহাবিদের দুটি দলে বিভক্ত হয়ে বসে থাকতে দেখলেন। প্রথম দল ছিলেন আল্লাহর ইবাদত ও জিকিরে মনোযোগী। আর দ্বিতীয় দল একজন আরেকজনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইলম অর্জন করে নিচ্ছিলেন। নবিজি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন- “সকলেই কল্যাণকর তৎপরতায় রত আছে। কিন্তু আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি।” এ কথা বলে তিনি দ্বিতীয় দলের সমাবেশে বসলেন। '৪৭
সাহাবিদের জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদানে অনুপ্রাণিত করতে নবিজি কুরআনকে সামনে তুলে ধরতেন। পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনকে উৎসাহিত করে কুরআনের প্রথম নাজিলকৃত আয়াত হলো-
'পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে “আলাক” থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।' সূরা আলাক : ১-৫
উম্মি নবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর সাহাবিদের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে শিখিয়েছিলেন। তাঁদের শিখতে ও শেখাতে অনুপ্রাণিত করে তা অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ৪৮ অতঃপর সাহাবিগণ পূর্ণ উদ্যমে ইসলামের বার্তা সর্বত্র পৌঁছে দেন।
আল্লাহ ও নবির আদেশ মান্য করার প্রতিদান হিসেবে পুরস্কার অর্জন করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'আমার সমস্ত অনুসারী জান্নাতে যাবে, তবে যারা আমাকে অস্বীকার করেছে তারা ব্যতীত। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো-“হে আল্লাহর রাসূল! এমন ব্যক্তি কে হবে?” নবিজি ব্যাখ্যা করলেন- “যে আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং যে আমাকে অমান্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”৪৯
তিনি ছিলেন একজন চমৎকার শিক্ষক। ধর্মীয় চিন্তাগুলোকে সবার বুঝ উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করতেন, যেন সহজে সবাই বুঝতে পারে। তিনি বলেছেন- 'ধর্ম শিক্ষা দাও এবং সেটাকে সহজ করো।'৫০
তিনি জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে বলেন- 'প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ।'৫১
জ্ঞানার্জনের বিনিময়ে জান্নাত লাভের আশ্বাস দিয়েছেন- 'যে কেউ জ্ঞান অন্বেষণের পথ অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাঁর জন্য জান্নাতকে সহজ করে দেবেন।'৫২
ঈসা (আ.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাদানের তুলনা করতে গিয়ে লেখক দাউদ শাহ লিখেছেন-
'ঈসা (আ.)-এর মিশন তিন বছর স্থায়ী থাকলেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিশন ছিল ২৩ বছর পর্যন্ত, যা শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে বিস্তৃতিলাভ করার জন্য এবং রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছিল যথাযথ।'৫৩
নবিজির মহান শিক্ষণীয় কৃতিত্ব হলো-বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ মুসলিম এবং তাদের মধ্যে সে শিক্ষা আজও প্রতিফলিত।
টিকাঃ
৪৫ এস. দাউদ শাহ Prophet Muhammad (pbuh) as a Teacher (Riyadh : Darussalam, n.d.)
৪৬ শাহ, পৃ.-২৮০-২৮১
৪৭ ইবনে মাজাহ (New Delhi : Kitab Bhavan, 2004), Vol. 1, Hadith 229.
৪৮ Shah, pp.76-77
৪৯ বুখারি; ইমাম নববি দ্বারা বর্ণিত; রিয়াদুস সালেহিন, ভলিওম ১, এস এম মাদানি আব্বাসি অনূদিত (Beirut : Dar Al Arabia, n.d.), Chapter 16, Hadith 158.
৫০ বুখারি, মুহাম্মাদ মহসিন খান অনুদিত, (Madinah: Al Maktabat Al Salafiat, 1971), Vol. 1, p.60.
৫১ ইবনে মাজাহ: ২২৪
৫২ মুসলিম: ২৬৯৯
৫০ শাহ, পৃ. ২৭১
📄 পরিবারের কর্তা
রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন নবি ইবরাহিম (আ.)-এর ছেলে ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর। ইসমাইল (আ.)-কে কোলের বাচ্চা অবস্থায় তাঁর মা হাজেরাসহ মক্কায় রেখে যান ইবরাহিম (আ.)। তারপর আল্লাহর কাছে দুআ করেন-
'হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমি আমার বংশধরদের ফসলহীন উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করালাম। হে আমাদের রব! তারা যেন সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদের রিজিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে। আশা করা যায়, তারা শুকরিয়া আদায় করবে।' সূরা ইবরাহিম : ৩৭
রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হিশাম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররা ইবনে কাব ইবনে লুওয়াই ইবনে গালিব ইবনে ফিহর ইবনে মালিক ইবনে আন-নাদর ইবনে কিনানা ইবনে খুজায়মা ইবনে মুদরিকা ইবনে ইলিয়াস ইবনে নাজর ইবনে মাআদ ইবনে আদনানের পুত্র। আদনান হলেন ইসমাইলের বংশধর। রাসূল-এর বংশ তালিকা
কুরাইশ (ফিহর ইবনে মালেক)
হারিস মাহারিব গালিব তিম খালজ (জন্ম: ২৪১ খ্রি.) 1 লুওয়াই (জন্ম: ২৭৪ খ্রি.)
আদি কাব (জন্ম: ৩০৭ খ্রি.) (উমর (রা.)-এর পূর্বপুরুষ) 1 মুররাহ (জন্ম: ৩৪০ খ্রি.) তাইম 1 (আবু বকর (রা.)-এর পূর্বপুরুষ) কিলাব (জন্ম: ৩৭৩ খ্রি.) 1 কুসাই (জন্ম: ৪০০ খ্রি.)
আবদে উজ্জা আবদে দার আবদে মানাফ (জন্ম: ৪৩০ খ্রি.)
মুত্তালিব হাশিম আবদে শামস নওফেল (মৃত্যু: ৫২০ খ্রি.) (৪৬৪-৫০৬ খ্রি.) 1 1 আবদুল মুত্তালিব উমাইয়া (শাইবা: ৪৯৭-৫৭৮ খ্রি.) হারব 1 আবু সুফিয়ান মুয়াবিয়া (রা.)
জোবায়ের হারিস আবু লাহাব হামজা (রা.) আব্বাস (রা.) আবদুল্লাহ আবু তালিব (৫৪৫-৫৭০ খ্রি.)
মুহাম্মদ (জন্ম: ৫৭০ খ্রি.) 1 ফাতিমা (রা.) আলি (রা.) আকিল জাফর (রা.) 1 হাসান (রা.) হুসাইন (রা.) মুসলিম
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মায়ের নাম আমিনা, যিনি ছিলেন বিনতে ওয়াহহাব ইবনে আবদে মানাফ ইবনে জুহরাহ ইবনে কিলাব ইবনে মুররার কন্যা। ৫৪ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একই বছরে ইয়েমেনের হস্তিবাহিনী কাবাঘরে আক্রমণ করতে এসে ব্যর্থ হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মা গর্ভবতী থাকাকালীন স্বামীকে হারান। জন্মের পর দুই বছর ধরে মরুভূমির এক বেদুইন পরিবারে দুধমাতার কাছে বেড়ে উঠতে থাকেন নবিজি। ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান তিনি এবং তাঁর দেখভালের দায়িত্ব নেন দাদা আবদুল মুত্তালিব।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবের প্রখ্যাত কুরাইশ বংশের মানুষ, যাদের দায়িত্ব ছিল কাবাঘর রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজিদের সেবা করা। আট বছর বয়সে তিনি তাঁর দাদাকেও হারান। তারপর তাঁর দায়িত্ব নেন প্রিয় চাচা আবু তালিব।
চাচা আবু তালিব তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাসূল (সা.)-কে আগলে রাখেন। নিজে ঈমান না আনলেও বিরূপ পরিস্থিতিতেও নবিজির হাত ছেড়ে দেননি। এ জন্য তাকে সহ্য করতে হয়েছে কুরাইশদের নানামুখী চাপ ও কূটচাল।
মক্কায় রাসূল ﷺ-এর পরিবার
খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পূর্বে মক্কায় রাসূল ﷺ-এর পরিবার
নবি মুহাম্মাদ ﷺ
খাদিজা (রা.)
কন্যা
জয়নাব (রা.) রুকাইয়া (রা.) উম্মে কুলসুম (রা.) ফাতিমা (রা.)
জামাতা
আবুল আস (রা.) উসমান ইবনে আফফান (রা.)
রাসূল -এর ওফাতের সময় মদিনায় তাঁর পরিবার
নবি মুহাম্মাদ ﷺ
স্ত্রীগণ
সাওদা (রা.) হাফসা (রা.) জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) উম্মে হাবিবা (রা.) মাইমুনা (রা.) আয়িশা (রা.) উম্মে সালমা (রা.) জুয়াইরিয়া (রা.) সাফিয়া (রা.)
মেয়ে জামাতা ফাতিমা (রা.) আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)
নাতি-নাতনি হাসান (রা.) হুসাইন (রা.) উমামাহ (রা.) কুলসুম (রা.) জয়নাব (রা.)
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরও বিশদভাবে জানতে হলে লেখক আবদুল হামিদ সিদ্দিকির (১৯৮০) লেখা Life of Muhammad৫৫, আদিল সালাহির (২০০১) লেখা Muhammad : Man and Prophet৫৬, আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরীর (২০১১) লেখা আর-রাহিকুল মাখতুম৫৭ নামক এবং মাজিদ আলি খানের লেখা মুহাম্মাদ দ্যা ফাইনাল ম্যাসেঞ্জার৫৮ চমৎকার বইগুলো পড়ে দেখা যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের কুরআনে 'বিশ্বাসীদের মা' বলে সম্মান দেওয়া হয়েছে। ৫৯ রাসূলুল্লাহ (সা.) বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত দুই শ্রেণির নারীদের বিয়ে করেছেন এবং অন্যদেরও বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারীদের বিয়ে করতে উৎসাহ দিয়েছেন। নবিজির অনেকগুলো বিয়ে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার সাথে সম্পর্কিত। আর অন্যগুলো ছিল পরাজিত গোত্রকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসতে এবং গণ্যমান্য নারীকে সম্মানিত করার জন্য।
তাঁর কয়েকটি বিয়ে সেই স্ত্রীদের গোত্রের জন্য ছিল অত্যন্ত সম্মানের। যেমন: গোত্রের সর্দার হারিস ইবনে আবু দিরারের মেয়ে জুয়াইরিয়া (রা.)-কে বিয়ে করার ফলে তাঁর গোত্রের সবার মুক্তির ব্যবস্থা হয়। ৬০ সাফিয়া (রা.)-কে বিয়ের মাধ্যমে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে বর্ণবিদ্বেষ বিলুপ্ত করা হয়। আবার মারিয়া কিবতিয়া নামক দাসীকে বিয়ের মাধ্যমে এটা দেখিয়ে দেওয়া হয়-দাসী হওয়া সত্ত্বেও সব মানুষের সহজাত সমতা রয়েছে। আর আয়িশা (রা.)-কে কম বয়সে বিয়ে করার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর শিক্ষার্জনের সুযোগ করে দেওয়া, যিনি পরবর্তী সময়ে উম্মাহর অন্যতম একজন আলিমা হয়ে ওঠেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যকার সম্পর্ক, ভালোবাসা, সম্মান এবং মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে অনেক দিক থেকেই বিপ্লবের সূচনা করেছিল। নিম্নে নবিজির স্ত্রীগণকে নিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো-
১. খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.); রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী; যার সাথে তিনি ২৫ বছর সংসার করেছিলেন। বয়সে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বড়ো। ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে নবিজি তাঁকে বিয়ে করেন। তিনি হলেন প্রথম মুসলিম এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তি মিশনের প্রথম সমর্থক, যিনি মৃত্যু অবধি তাঁর পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ছয়জন সন্তান উপহার দেন। তাঁরা হলেন পুত্র আল কাসিম; মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২-৩ বছর। কন্যা জয়নাব; ৩০ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন। কন্যা রুকাইয়া; ২৩ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন। কন্যা উম্মে কুলসুম; মৃত্যুকালে বয়স ছিল ২৭-এর মতো। পুত্র আবদুল্লাহ; মৃত্যুকালে বয়স চারের মতো ছিল এবং কন্যা ফাতিমা; ২৮ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন।
২. সাওদা বিনতে জামআ (রা.); তিনি বিধবা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সন্তানাদি দেখভালে সাহায্য করার জন্য তাঁকে বিয়ে করেন।
৩. আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.); তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় বন্ধু আবু বকর (রা.)-এর মেয়ে, যাকে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন। আয়িশা (রা.) ছিলেন অনেক বুদ্ধিমতী ও বিদ্বান, হাদিসশাস্ত্রে যার বিশাল অবদান রয়েছে।
৪. জয়নাব বিনতে খুজায়মা (রা.); তিনি একজন বিধবা নারী ছিলেন, যাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন। তাঁকে সবাই 'গরিবদের মা' নামে চিনত।
৫. হাফসা বিনতে উমর (রা.); যিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর মেয়ে এবং একজন বিধবা নারী। নবিজি তাঁকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন। তিনি খলিফা উসমান (রা.)-এর সময়কালে কুরআনের পাণ্ডুলিপির জিম্মাদার ছিলেন।
৬. উম্মে সালামা বিনতে আবু উমাইয়া (রা.); তিনি একজন বিধবা নারী। নবিজির সাথে তাঁর বিয়ে হয় ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি শিক্ষিত নারী ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ফতোয়া প্রদান করতেন।
৭. জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.); একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ফুফাতো বোন, নবিজি যাকে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন।
৮. জুয়াইরিয়া বিনতে হারিস (রা.); তিনি ছিলেন পরাজিত গোত্রের সর্দারের মেয়ে। নবিজি তাঁকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন।
৯. সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.); তিনি পরাজিত ইহুদি গোত্রের সর্দারের কন্যা ছিলেন, যাকে নবিজি ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন।
১০. মারিয়া কিবতিয়া (রা.); মিশরের আলেকজেন্দ্রিয়ার বিশপ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এই কপ্টিক খ্রিষ্টান নারীকে উপহার হিসেবে পাঠায়। তিনি পরে মুসলিম হয়ে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে নবিজিকে বিয়ে করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তিনি পুত্র সন্তান উপহার দেন, যার নাম ইবরাহিম। মৃত্যুকালে ইবরাহিমের বয়স ছিল ১৬-১৮ মাসের মতো।
১১. উম্মে হাবিবা (রামলা) বিনতে আবু সুফিয়ান (রা.); তিনি ছিলেন একজন তালাকপ্রাপ্ত ও প্রভাবশালী কুরাইশ ব্যক্তির কন্যা। অবশ্য তাঁর পিতা পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে আবিসিনিয়ায় থাকাকালীন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিয়ে করেন।
১২. মায়মুনা বিনতে হারিস (রা.); তিনি ছিলেন একজন বিধবা নারী, যাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন ফিকহি বিষয়ে দুর্দান্ত পারদর্শী। এ ছাড়াও নারী দাসীদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে তিনি ছিলেন সর্বদা উদ্গ্রীব।
মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে ঐতিহাসিকভাবে শাসক ও নবি-রাসূলগণ প্রায়ই অধিক স্ত্রী গ্রহণ করতেন। যেমন : বাইবেলে সোলায়মান (আ.) ৭০০-এর মতো স্ত্রী ছিলেন বলে বর্ণিত আছে। ৬১ সেই তুলনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) তো অনেক কম স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। তবে পবিত্র কুরআন মুসলিমদের জন্য চারজন স্ত্রীর বেশি গ্রহণ করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আল্লাহ বরং একজনেই সীমাবদ্ধ থাকতে উৎসাহিত করেছেন, যদি স্বামী চারজনের মধ্যে ইনসাফ করতে ভয় পায়।৬২
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রী, সন্তানাদি ও সেবকদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত কোমল। তিনি বলেছেন-
'তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।'৬৩
আয়িশা (রা.) নবিজির বাড়িতে করা কাজসমূহ বর্ণনা করে বলেন-
'তিনি ছিলেন তোমাদের মতোই একজন, কিন্তু তবুও তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিনয়ী এবং উদার। তাঁর উৎফুল্লতা থাকত সর্বদা তুঙ্গে, সব সময় হাসিখুশি, অনেক সময় উচ্চহাসিতেও এসে যোগ দিতেন। স্ত্রীর কাজে সাহায্য করতেন, সেটা যত সাধারণ কাজই হোক না কেন। নিজের কাপড়, জুতা ইত্যাদি নিজেই সেলাই করতেন। আর মসজিদে যখন আজান দেওয়া হতো, তখন সব কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি মসজিদে চলে যেতেন। '৬৪
টিকাঃ
৫৪ : ইবনে আলি জায়েদ আল কায়রাওয়ানি। একটি মাদানি দৃষ্টি : সুন্নাহ, সৌজন্যতা, প্রজ্ঞা, যুদ্ধ ও ইতিহাস; আবদুস সামাদ অনূদিত (London: Ta-Ha Publishers, 1999), p.36
৫৫ আবদুল হামিদ সিদ্দিকি, মুহাম্মাদের জীবন, ১৫ এডিশন (Lahore : Islamic Publications, 1980)
৫৬ আদিল সালাহি : মুহাম্মাদ : মানুষ ও নবি (Markfield, Leicestershire: The Islamic Foundation, 2002).
৫৭ সাইফুর রহমান আল মুবারকপুরী, দ্য সিলড নেকটার (রিয়াদ : দারুস-সালাম, ২০১১)
৫৮ মাজিদ আলী খান, মুহাম্মাদ : দ্যা ফাইনাল ম্যাসেঞ্জার (ইসলামিক বুক সার্ভিস, ২০১২)
৫৯ আল কুরআন ৩৩:৬
৬০ সালাহি, মুহাম্মাদ : মানুষ ও নবি, পৃ.-৪৮৪
৬১ দেখুন, বাইবেল, ১ কিংস ১১: ৩
৬২ আল কুরআন ৪:৩
৬৩ তিরমিজি এবং ইবনে মাজাহ
৬৪ ইবনে সাদ, তাবাকাত আল কুবরা (The Book of the Major Classes), trans. by S. Moninul Haq (Karachi : Pakistan Historical Society, 1967), Vol. 1, pp.364-6
📄 রাসূল (সা.)-এর বংশ তালিকা
কুরাইশ (ফিহর ইবনে মালেক)
হারিস মাহারিব গালিব তিম খালজ (জন্ম: ২৪১ খ্রি.) 1 লুওয়াই (জন্ম: ২৭৪ খ্রি.)
আদি কাব (জন্ম: ৩০৭ খ্রি.) (উমর (রা.)-এর পূর্বপুরুষ) 1 মুররাহ (জন্ম: ৩৪০ খ্রি.) তাইম 1 (আবু বকর (রা.)-এর পূর্বপুরুষ) কিলাব (জন্ম: ৩৭৩ খ্রি.) 1 কুসাই (জন্ম: ৪০০ খ্রি.)
আবদে উজ্জা আবদে দার আবদে মানাফ (জন্ম: ৪৩০ খ্রি.)
মুত্তালিব হাশিম আবদে শামস নওফেল (মৃত্যু: ৫২০ খ্রি.) (৪৬৪-৫০৬ খ্রি.) 1 1 আবদুল মুত্তালিব উমাইয়া (শাইবা: ৪৯৭-৫৭৮ খ্রি.) হারব 1 আবু সুফিয়ান মুয়াবিয়া (রা.)
জোবায়ের হারিস আবু লাহাব হামজা (রা.) আব্বাস (রা.) আবদুল্লাহ আবু তালিব (৫৪৫-৫৭০ খ্রি.)
মুহাম্মদ (জন্ম: ৫৭০ খ্রি.) 1 ফাতিমা (রা.) আলি (রা.) আকিল জাফর (রা.) 1 হাসান (রা.) হুসাইন (রা.) মুসলিম