📄 আল্লাহর সাথে রাসূল (সা.)-এর সম্পর্ক
আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)-কে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন, যা আমরা কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাই। আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং ফেরেশতারা তাঁর ওপর সালাম পেশ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বিশ্বাসী মানুষদেরও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য রহমতের দুআ করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব : ৫৬
নবিজির মধ্যে আমরা এমন এক মানুষকে খুঁজে পাই, যিনি ইসলামে বর্ণিত জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ। কোনো সন্দেহ নেই, নবিজি ছিলেন একজন মানুষ। তবে তিনি অন্য মানুষদের মতো সাধারণ ছিলেন না। কারণ, আল্লাহ তাঁকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন-
'বলো, আমি তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয়-তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ।' সূরা কাহাফ: ১১০
কাজেই আমরা তাঁর মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বুকে পোষণ করি এবং তাঁকে অনুসরণ করতে পারি। আল্লাহ এটাও বলে দিয়েছেন-রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি রয়েছে। তাই তাঁকে যে মান্য করল, সে যেন আল্লাহকেই মান্য করল। আর এই মান্যকারী লোকেরাই সফল।২৫
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
'সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নুর নাজিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ করে; তারাই সফলকাম।' সূরা আ'রাফ: ১৫৭
আল্লাহর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পর্ক ভালো করে বুঝতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে। এই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ-
• সকল অবস্থায় তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা রাখতেন।
• তিনি সব সময় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
• তিনি সর্বদা অবিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন। তাঁর বোধশক্তি থাকত সদা জাগ্রত।
• তাঁর শক্তি ও মনের স্থিরতার মৌলিক উৎস ছিল ইবাদত ও জিকিরে লেগে থাকা। ২৬
• তিনি প্রতিনিয়ত আল্লাহর দেওয়া রহমত ও সুরক্ষার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেন, যা তাঁর চিন্তাধারা ও কাজকে প্রভাবিত করত।
• আল্লাহ ছাড়া কোনো ক্ষমতাধর ও শক্তিধর আর কেউ নেই বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
• দুঃখ কিংবা আনন্দ; সকল অবস্থাতেই তিনি বিনয়ের সাথে পরম করুণাময় আল্লাহর আশ্রয়ের দ্বারস্থ হতেন。
১০ বছরের মাদানি জীবনে নবিজি ৫০টিরও অধিক সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছেন। এর মধ্যে ২৬টি যুদ্ধে তিনি নিজেই নেতৃত্ব দেন, যেগুলো আরব ভূখণ্ডের মধ্যে সংগঠিত হয়েছিল। সেসব অভিযানে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অনুসারীদের দৈনন্দিন জীবনে ও প্রাত্যহিক প্রয়োজনে আধ্যাত্মিক চেতনাকে হৃদয়ে লালন করার শিক্ষা দিতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
'যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম করে বলছি-আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সব সময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে পড়ে থাকতে, তাহলে অবশ্যই ফেরেশতারা বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতেন। '২৭
নবিজি এমনভাবে চলাফেরা করতেন, দেখে মনে হতো যেন তিনি দুই জগতের বাসিন্দা। দুনিয়ার জগৎকে তাঁর ইন্দ্রিয় দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং অদেখা জগতের সাথে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'পার্থিব বস্তুর মধ্যে স্ত্রী ও সুগন্ধি আমার নিকট পছন্দনীয় করা হয়েছে এবং নামাজে রাখা হয়েছে আমার নয়নের প্রশান্তি।'২৮
এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি-তিনি নিজেকে কেবল এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার অংশ ভাবতেন না, সেইসঙ্গে আধ্যাত্মিক জগতেরও অংশ ভাবতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সাথে যোগাযোগ। মানুষের সাথে ব্যবহারের সময় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত।
আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজের জীবনের চেয়েও তাঁকে বেশি ভালোবাসতে। হাদিসে এসেছে-
'একদিন আমরা নবিজির সাথে ছিলাম। নবিজি উমর (রা.)-এর হাত ধরা ছিলেন। উমর (রা.) বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! আপনি আমার কাছে সবকিছুর থেকে প্রিয়, তবে আমার জীবন ছাড়া। তখন নবিজি বললেন, না উমর। এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম! ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জীবনের চেয়েও প্রিয় হই। পরক্ষণেই উমর (রা.) বললেন, হ্যাঁ, এখন তা হয়েছে।'২৯
আল্লাহর বার্তাবাহকের দায়িত্ব পালন করার কারণে নবিজির মধ্যে নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছিল। যেমন: মিশনের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ও দৃঢ়প্রত্যয় থাকা। এ ছাড়াও লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ মনোযোগী এবং অটল সংকল্পবদ্ধ হওয়া। লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো প্রকার ব্যক্তিগত ধনসম্পদ কিংবা ক্ষমতার ব্যাপারে তোয়াক্কা না করে একদম সাধারণ জীবনযাপন করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সংস্কারক বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি মানবজাতির জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদানসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে বলেছেন। তিনি বলেন-
'রাসূলুল্লাহ (সা.) চিরসুখের সংবাদ, আল্লাহর রহমত, সার্বভৌমত্বের সুসংবাদ প্রচার করেন। আল্লাহর ভান্ডারে থাকা তাঁর বিশেষ নামসমূহ আমাদের কাছে জানিয়ে দেন। আপনি যদি তাঁকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে দেখেন, তাহলে ভালোবাসার রোলমডেল, করুণার প্রতীক, মানবতার গর্ব এবং সৃষ্টির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখবেন। আবার আপনি যদি তাঁকে রাসূল হিসেবে দেখেন, তাহলে তাঁর মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন। সত্যের আলো এবং সুখের মাধ্যম হিসেবে উপলব্ধি করবেন। তাঁর নিয়ে আসা আলোর বার্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিদ্যুতের মতো ঝলমল করে জ্বলছে। পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষ তাঁকে পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তা তাদের জীবনে সংরক্ষণ করে চলেছে। তাহলে কেন আমাদের খারাপ ও শয়তান মন তা গ্রহণ করে না, যার মিশনের সারমর্ম হলো—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই?'৩০
টিকাঃ
২৫ সূরা নিসা: ৮০
২৬ আল কুরআন ১৩: ২৮ 'আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।'
২৭ মুসলিম : ৬৬২৩
২৮ ইমাম নাসায়ি, নাসায়ি, মুহাম্মাদ ইকবাল সিদ্দিকি অনুদিত (Lahore: Kazi Publications, 1994), হাদিস ৩৯৩৯, হাদিসটি সহিহ।
২৯ বুখারি: ৬২৮
৩০ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর।
📄 পবিত্র কুরআনের মুজিজা: তাঁর নবুয়তের প্রমাণাদি
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বিভিন্ন ভাগে কুরআন নাজিল করা হয়েছিল। এগুলো পরে সংগ্রহ ও যাচাই করে একসাথে জড়ো করা হয়, যা আজ বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ তিলাওয়াত করছে। এই কুরআনই নবুয়তের একটি বড়ো প্রমাণ। মহাগ্রন্থ আল কুরআন যে একটি নিদর্শন, এর সপক্ষে চারটি শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে—
প্রথমত, আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন—রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন পৃথিবীতে আসা শেষনবি ও রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
'এমন কোনো নবি নেই, যাকে নিদর্শন ছাড়া পাঠানো হয়েছে। ফলে লোকেরা তাঁকে বিশ্বাস করেছিল। আমাকে দেওয়া হয়েছে ওহি, যা আল্লাহ আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন এবং আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন আমার সর্বাধিকসংখ্যক অনুসারী থাকবে।'৩২
আল্লাহ অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন-
'বলো, যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারবে না; যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮৮
কাজি আবদুল জব্বার ব্যাখ্যা করেন- 'রাসূলুল্লাহ (সা.) অমুসলিমদের কাছে কুরআনের মাধ্যমে নিজের নবুয়তের প্রমাণ দেন। আর এটি তাদের অনুসরণ ও মান্য করতে এবং তাঁর কাছে নিজেদের সঁপে দিতে বাধ্য করেছিল। আরবরা ছিল তাদের বাগ্মিতার জন্য বেশ নামকরা। কোনো কিছুকে ঘৃণা বা অহংকার করার ক্ষেত্রে তাদের ছিল নিজস্ব রীতি। নিজ গোত্রপ্রধানের প্রতি আনুগত্যের জন্য যেকোনো কিছু করতে তারা ছিল প্রস্তুত। এজন্য তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মিথ্যা নবি প্রমাণের সব ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। কিন্তু শেষমেশ কুরআনের মতো কোনো কিছু নিয়ে আসতে না পারায় তারা আত্মসমর্পণ করে। আর এটাই আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর নবি হওয়ার অন্যতম নিদর্শন।'৩৩
দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী নবি-রাসূলদের মুজিজার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী পরাভূত হয়েছিল। যেমন: মুসা (আ.)-এর সময়কার জাদুকর, ঈসা (আ.)-এর সময়ের ডাক্তাররা। কিন্তু পবিত্র কুরআন পুরো একটা জাতির ওপর বিজয়ী হয়।
তৃতীয়ত, কুরআন এমন এক জাতির কাছে পাঠানো হয়েছিল, যারা সাহিত্যকর্মে ও বাগ্মিতায় ছিল দুর্দান্ত। এই লোকদের কাছে তাদের ভাষা আরবিতেই কুরআন নাজিল হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের সাবলীল বাক্য ও বাক্যের অলংকারশাস্ত্র শুনে তারা বুঝতে সক্ষম ছিল-মানুষের পক্ষে এমন কিছু তৈরি করা অসম্ভব। এটি অবশ্যই আল্লাহর তরফ থেকে নাজিলকৃত, যিনি এই দুনিয়ার মালিক।
চতুর্থত, আল্লাহর কালাম কুরআনের আরেকটি মুজিজা হলো-এটি চিরস্থায়ী এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। এর বাণী মানুষের হৃদয়কে প্রভাবিত করে কাছে টেনে নেয়। তাই আজও বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম প্রভাব বিস্তারকারী ধর্মের নাম ইসলাম।৩৪
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের প্রমাণ হিসেবে সাইদ নুরসি (রহ.) বলেন-
'কোনো নবি কিংবা নেককারদের ক্ষেত্রে কিছু নিদর্শন প্রমাণ হিসেবে থাকে। তিনি যে আল্লাহর নবি; তার প্রমাণের জন্য হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। এটা ইনজিল, তাওরাত দ্বারা প্রমাণিত। তাঁর নবুয়তের সময় হাজারও নিদর্শন হাজির হয়েছিল। গায়েবি আওয়াজ শুনতে পাওয়ার বিখ্যাত ঘটনা, জাদুকরদের সর্বসম্মত সাক্ষ্য ছাড়াও অনেক নিদর্শন ছিল। যেমন: চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করা, শরিয়াহ আইনের ন্যায়পরায়ণতা। একইভাবে তাঁর প্রশংসনীয় গুণাবলি তাঁকে পূর্ণতার চূড়ায় নিয়ে যায়। মিশনের প্রতি দৃঢ়প্রত্যয় এবং তা অর্জনে বুদ্ধিমত্তার সাথে বিচরণ, আল্লাহর ভয়, ইবাদতে মশগুল, প্রশান্তিতে থাকা, দৃঢ়তা-এসবই তাঁর বিশ্বাসের শক্তিবল, নিশ্চয়তা ও সম্পূর্ণ অবিচলতার প্রমাণ চোখের সামনে দেখিয়ে দেয়।'৩৬
টিকাঃ
৩১ আবদুল রাদি মুহাম্মাদ আবদুল মোহসেন, মুহাম্মাদের নবুয়ত : বাস্তবিক না বিভ্রান্তি, মুহাম্মাদ আল মাহদি অনূদিত (Riyadh : International Islamic Publishing House, 1999), p.131.
৩২ বুখারি: ৭২৭৪
৩৩ আবদুল রাদি, মুহাম্মাদের নবুয়ত, পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৫
৩৪ টড এম. জনসন এবং বিরান জে. গ্রিম, বিশ্বে ধর্মের জরিপ: ধর্মীয় জনসংখ্যার একটি আন্তর্জাতিক ভূমিকা (Hoboken, New Jersey : Wiley-Blackwell, 2013)
৩৫ সাইদ নুরসি, The Nineteenth Letter, Part-2; The Miracle of the Splitting of the Moon
৩৬ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর। The Nineteenth Word, p.248.