📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 নবি-রাসূলের বার্তার উৎস ছিল এক

📄 নবি-রাসূলের বার্তার উৎস ছিল এক


আল্লাহ ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীতে নবি-রাসূল প্রেরণ করেছেন। উদ্দেশ্য-তাঁরা যেন মানবজাতিকে মহান আল্লাহর ইবাদতের শিক্ষা দিতে পারেন। মানুষ যদি এই শিক্ষাগুলো গ্রহণ করতে পারে, তাহলে তাদের করা হবে পুরস্কৃত। আর যদি অস্বীকার করে, তাহলে তাদের চিরকালের জন্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।

বিশিষ্ট আমেরিকান স্কলার শাইখ নুহ কেলের নবিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন- 'তাঁরা ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য, বুদ্ধিমান, সত্যবাদী এবং আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানোর নিষ্ঠাবান বার্তাবাহক। আল্লাহ তাঁদের গুনাহ ও সকল প্রকার মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। তাঁরা আমাদের মতোই খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, চলাফেরা, বিবাহসহ যাবতীয় স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। সমস্ত মানুষের মধ্যে তাঁরাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। আবার তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ (সা.), যাঁকে আল্লাহ শেষনবি হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন।'

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়ে আসা শরিয়াহ পূর্ববর্তী নবি-রাসূলের শরিয়াহ রহিত করে দেয়; যদিও বিশ্বাসের দিক থেকে এসব ছিল অভিন্ন। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
'কেউ যেন এমন না বলে, আমি নবি ইউনুসের থেকে শ্রেষ্ঠ।'১৬

ইউনুস (আ.) তাওহিদের বাণী প্রচার করতে গিয়ে গভীর সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়েছিলেন।১৭ অতঃপর তাঁকে মাছের পেটে যেতে হয়েছিল; যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তাওহিদের বাণী প্রচারের সময়কার সমস্যার চেয়ে কম ছিল না। তাঁদের আনীত বার্তার আলো ভিন্ন নয়; বরং একই। এটা সমর্থন করে কুরআন বলে-
'আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে কোনো তারতম্য করি না।' সূরা বাকারা: ২৮৫

এই আয়াতের বক্তব্য অনুসারে পূর্ববর্তী নবিদের বিধানগুলোর বিশ্বাস একই ছিল, যদিও শরিয়াহর দিক থেকে কিছুটা ভিন্নতা থেকেছে। কিন্তু ইসলাম আসার ফলে পূর্ববর্তী সকল বিধান রহিত হয়েছে, যা ছিল তাঁদের সময়কালে অকাট্য।

আল্লাহ বলেন-
'ওই রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে কারও সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং কারও ওপর কারও মর্যাদা উঁচু করেছেন।' সূরা বাকারা: ২৫৩

অতএব, প্রত্যেক নবির জন্য স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ উপাধি রয়েছে। যেমন: ইবরাহিম (আ.)-কে খলিলুল্লাহ, ঈসা (আ.)-কে কালামুল্লাহ/রুহুল্লাহ এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হাবিবুল্লাহ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।১৮

যদিও এই বইয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে একজন চূড়ান্ত নেতা হিসেবে খুঁজে পাব, কিন্তু আমরা তাঁকে 'সবার সেরা' বলব না। একজন সাহাবি তাঁকে এমনটি বলে প্রশংসা করলে বলেছিলেন- 'তিনি হলেন ইবরাহিম (আ.)।'১৯

টিকাঃ
১৬ বুখারি ৪১৯৩: ৩৪২১
১৭ আবদুল কাদির আস-সুফি, The way of Muhammad
১৮ আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ (সা.)-কে হাবিবুল্লাহ নামে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ৩১ নং আয়াতে বলেছেন- 'যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন।' এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবিজির নেতৃত্ব ও চরিত্রকে অনুসরণ করতে বলেছেন। নবিজি বলেন-'ইবরাহিম (আ.) হলেন খালিলুল্লাহ, মুসা (আ.) হলেন সাফিউল্লাহ এবং আমি হলাম হাবিবুল্লাহ।' (মুকাদ্দামা আল মুসনাদ আদ দারিমি, বৈরুত)
১৯ মুসলিম: ২৩৬৯।

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 মুহাম্মদ (সা.); সর্বশেষ নবি

📄 মুহাম্মদ (সা.); সর্বশেষ নবি


রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আল ইনসান, আল কামিল (নিখুঁত মানুষ) বলা হয়েছে। তিনি ছিলেন মানবজাতিকে আলোর পথে পরিচালিত করার সর্বশেষ বার্তাবাহক। এরপর আর কোনো নবি আসবেন না। কুরআন বলেছে-
'তোমাদের কাছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ।' সূরা মায়েদা : ১৫

আল্লাহ তায়ালা তাঁর করুণার দুনিয়ায় নবি ও রাসূলদের পাঠিয়েছেন, যেন তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে পারেন। যারা তাঁদের ডাকে সাড়া দেবে, তাদের সুসংবাদ দেবেন এবং যারা খারিজ করবে, তাদের সতর্ক করবেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেষনবি হিসেবে আল কুরআনের বার্তা নিয়ে আগমন ছিল তাঁর পূর্বপুরুষ ইবরাহিম (আ.)-এর দুআর ফল। নবিজি দুনিয়াতে আসার কয়েক হাজার বছর পূর্বে ইবরাহim (আ.) নবুয়তি মিশন পরিচালনা করেন। একদিন তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেন। তাঁর দুআর বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহ যেন মক্কায় তাঁর মনোনীত কাউকে পাঠান। কুরআনে এসেছে-
'হে আমাদের রব! তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে আর তাদের পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' সূরা বাকারা : ১২৯

রাসূলুল্লাহ (সা.) যে আল্লাহর প্রেরিত শেষনবি, তা বিশ্বাস করা ইসলামের অপরিহার্য দাবি। কুরআনে বর্ণিত আছে-
'(মুহাম্মাদ) তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষনবি। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।' সূরা আহজাব : ৪০২০

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনেকগুলো উপাধি দ্বারা সম্মানিত করেছেন। যেমন: আলো, উজ্জ্বল প্রদীপ, সতর্ককারী, সুসংবাদদাতা, স্পষ্ট সত্য, রহমত, বিশ্বাসযোগ্য, সত্যবাদী, রহমাতুল্লিল আলামিন, সত্যের পথপ্রদর্শক, উদার ইত্যাদি। তিনটি কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নবুয়তের শুরু থেকে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আসা সকল মানবজাতির জন্য আদর্শ-

প্রথমত, তাঁকে অন্য নবিদের মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য না পাঠিয়ে বরং দুনিয়ার সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠানো হয়েছে। কুরআন বলেছে-
'আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি।' সূরা সাবা : ২৮

দ্বিতীয়ত, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা পূর্ববর্তী সকল ধর্মকে ছাড়িয়ে গেছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন–
'একে (ইসলাম) সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন।'২১ সূরা তাওবা : ৩৩

তৃতীয়ত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভূমিকা এতটাই গভীর ছিল যে, মানুষ জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বকে আদর্শ হিসেবে নিতে সক্ষম।

টিকাঃ
২০ মুহাম্মদ (সা.) তাই ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর নবুয়তের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। তিনি বলেছিলেন- 'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার ব্যাপারে শুনেছে, অথচ আমাকে যা প্রেরণ করা হয়েছে তার ওপর ঈমান না এনেই (কুফরির ওপর) মৃত্যুবরণ করেছে, সে জাহান্নামের অধীবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' (মুসলিম : ২৮৪)
২১ নুহ হা-মিম কেলার Sea Without Shore : A Manual of the Sufi Path, (Amman, Jordan: Sunna Books, 2011), pp.85-86. Also see Reference 13.

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: জন্মগত নাকি অর্জিত

📄 রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: জন্মগত নাকি অর্জিত


মুসলিম বিশ্বের একজন জনপ্রিয় বিচারক কাজি আয়াজ (রহ.) দ্বাদশ শতাব্দীতে আশ-শিফা ২২ শিরোনামে একটি বই লেখেন। এই বইতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মানুষের চরিত্রে পাওয়া অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে তিনি দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
১. জন্মগত, ২. অর্জিত

জন্মগতভাবে পাওয়া গুণের ওপর কারও হাত নেই। যেমন: সৌন্দর্য, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, স্পষ্ট করে কথা বলার ক্ষমতা, বোঝার ক্ষমতা, অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ ইত্যাদি। অন্যদিকে সুশৃঙ্খল প্রচেষ্টা এবং সেই গুণগুলো অনুশীলন করার মধ্য দিয়ে অনেক ভালো গুণ অর্জন করা যায়। যেমন: জ্ঞান, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয়, উদারতা, সাহসিকতা এবং ভালো আচার-আচরণ ইত্যাদি। এগুলো সবই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি। নেতৃত্বের এসব বিশেষ গুণাবলি অর্জনে পাঠকদের উৎসাহিত করাই হলো দ্যা আল্টিমেট লিডার বইয়ের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

কাজি আয়াজ (রহ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে নিখুঁত গুণবান এবং উৎকৃষ্টতর ব্যক্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- এ সকল গুণই রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আদর্শিক করে তুলেছে। নিখুঁত গুণ; যেগুলো অর্জন করা যায় না, সেগুলো একমাত্র আল্লাহর তরফ থেকে তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তা না হলে নবিজির পক্ষে নিখুঁত গুণগুলো অর্জন করা সম্ভব হতো না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে জানতেন-উত্তম চরিত্রের দিকে ধাবিত হয়ে মানুষ নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে। আরও অনেক গুণাবলি আছে, যেগুলো জন্মগতভাবে পাওয়া না গেলেও সময়ের সাথে সাথে অর্জন করা যায়। এজন্য প্রয়োজন আত্মোৎসর্গ করার মনন আর কঠিন প্রচেষ্টা। নবিজি বলেন-
'নৈতিক চরিত্রকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে আমাকে পাঠানো হয়েছে।'২৩

কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।' সূরা রা'দ : ১১

নবিজির গুণাবলি নিজের মধ্যে আয়ত্ত করতে চেষ্টারত প্রতিটি মানুষের জন্য কুরআনের এই ঘোষণা প্রবল উৎসাহ হিসেবে কাজ করবে।

নেতৃত্ব সম্পর্কিত আধুনিক লেখিকা বিনা ব্রাউন একই মন্তব্য করেছেন-'কিছু মানুষ অনন্যসাধারণ যোগ্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, যা তাদের মহান নেতায় পরিণত করে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষকে এর ওপর টিকে থাকতে ক্রমাগত অনুশীলন করে যেতে হয়।'২৪

টিকাঃ
২২ কাজি ইয়াজ ইবনে মুসা আল ইয়াহসুবি Muhammad: Messenger of Allah (Ash-Shifa Bi Tarifi Huquqil Mustafa), Tr. by 'Aisha 'Abdarrahman Bewley (Granada, Spain: Madinah Press, 1991)
২৩ ইমাম মালেক, আল মুয়াত্তা, আয়েশা আবদুর রহমান আত তারজুমা এবং ইয়াকুব জনসন অনূদিত (Norwich: Diwan Press, 1982): ৪৭.৮
২৪ বিনা ব্রাউন Follow My Lead (Virgin Blue magazine, March 2011), p.119

📘 মুহাম্মাদ ﷺ দ্যা আল্টিমেট লিডার > 📄 আল্লাহর সাথে রাসূল (সা.)-এর সম্পর্ক

📄 আল্লাহর সাথে রাসূল (সা.)-এর সম্পর্ক


আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)-কে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন, যা আমরা কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন আয়াতে দেখতে পাই। আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং ফেরেশতারা তাঁর ওপর সালাম পেশ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বিশ্বাসী মানুষদেরও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবির প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির জন্য রহমতের দুআ করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।' সূরা আহজাব : ৫৬

নবিজির মধ্যে আমরা এমন এক মানুষকে খুঁজে পাই, যিনি ইসলামে বর্ণিত জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ। কোনো সন্দেহ নেই, নবিজি ছিলেন একজন মানুষ। তবে তিনি অন্য মানুষদের মতো সাধারণ ছিলেন না। কারণ, আল্লাহ তাঁকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন-
'বলো, আমি তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার নিকট ওহি প্রেরণ করা হয়-তোমাদের ইলাহই এক ইলাহ।' সূরা কাহাফ: ১১০

কাজেই আমরা তাঁর মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বুকে পোষণ করি এবং তাঁকে অনুসরণ করতে পারি। আল্লাহ এটাও বলে দিয়েছেন-রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি রয়েছে। তাই তাঁকে যে মান্য করল, সে যেন আল্লাহকেই মান্য করল। আর এই মান্যকারী লোকেরাই সফল।২৫

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
'সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নুর নাজিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ করে; তারাই সফলকাম।' সূরা আ'রাফ: ১৫৭

আল্লাহর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পর্ক ভালো করে বুঝতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে। এই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ-

• সকল অবস্থায় তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা রাখতেন।
• তিনি সব সময় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
• তিনি সর্বদা অবিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন। তাঁর বোধশক্তি থাকত সদা জাগ্রত।
• তাঁর শক্তি ও মনের স্থিরতার মৌলিক উৎস ছিল ইবাদত ও জিকিরে লেগে থাকা। ২৬
• তিনি প্রতিনিয়ত আল্লাহর দেওয়া রহমত ও সুরক্ষার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেন, যা তাঁর চিন্তাধারা ও কাজকে প্রভাবিত করত।
• আল্লাহ ছাড়া কোনো ক্ষমতাধর ও শক্তিধর আর কেউ নেই বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
• দুঃখ কিংবা আনন্দ; সকল অবস্থাতেই তিনি বিনয়ের সাথে পরম করুণাময় আল্লাহর আশ্রয়ের দ্বারস্থ হতেন。

১০ বছরের মাদানি জীবনে নবিজি ৫০টিরও অধিক সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছেন। এর মধ্যে ২৬টি যুদ্ধে তিনি নিজেই নেতৃত্ব দেন, যেগুলো আরব ভূখণ্ডের মধ্যে সংগঠিত হয়েছিল। সেসব অভিযানে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর অনুসারীদের দৈনন্দিন জীবনে ও প্রাত্যহিক প্রয়োজনে আধ্যাত্মিক চেতনাকে হৃদয়ে লালন করার শিক্ষা দিতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
'যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম করে বলছি-আমার কাছে থাকাকালে তোমাদের যে অবস্থা হয়, যদি তোমরা সব সময় এ অবস্থায় অনড় থাকতে এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকিরে পড়ে থাকতে, তাহলে অবশ্যই ফেরেশতারা বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতেন। '২৭

নবিজি এমনভাবে চলাফেরা করতেন, দেখে মনে হতো যেন তিনি দুই জগতের বাসিন্দা। দুনিয়ার জগৎকে তাঁর ইন্দ্রিয় দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং অদেখা জগতের সাথে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
'পার্থিব বস্তুর মধ্যে স্ত্রী ও সুগন্ধি আমার নিকট পছন্দনীয় করা হয়েছে এবং নামাজে রাখা হয়েছে আমার নয়নের প্রশান্তি।'২৮

এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি-তিনি নিজেকে কেবল এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার অংশ ভাবতেন না, সেইসঙ্গে আধ্যাত্মিক জগতেরও অংশ ভাবতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সাথে যোগাযোগ। মানুষের সাথে ব্যবহারের সময় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত।

আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজের জীবনের চেয়েও তাঁকে বেশি ভালোবাসতে। হাদিসে এসেছে-
'একদিন আমরা নবিজির সাথে ছিলাম। নবিজি উমর (রা.)-এর হাত ধরা ছিলেন। উমর (রা.) বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! আপনি আমার কাছে সবকিছুর থেকে প্রিয়, তবে আমার জীবন ছাড়া। তখন নবিজি বললেন, না উমর। এতে হবে না। যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম! ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার জীবনের চেয়েও প্রিয় হই। পরক্ষণেই উমর (রা.) বললেন, হ্যাঁ, এখন তা হয়েছে।'২৯

আল্লাহর বার্তাবাহকের দায়িত্ব পালন করার কারণে নবিজির মধ্যে নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছিল। যেমন: মিশনের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ও দৃঢ়প্রত্যয় থাকা। এ ছাড়াও লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণ মনোযোগী এবং অটল সংকল্পবদ্ধ হওয়া। লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো প্রকার ব্যক্তিগত ধনসম্পদ কিংবা ক্ষমতার ব্যাপারে তোয়াক্কা না করে একদম সাধারণ জীবনযাপন করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর সংস্কারক বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি মানবজাতির জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদানসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে বলেছেন। তিনি বলেন-

'রাসূলুল্লাহ (সা.) চিরসুখের সংবাদ, আল্লাহর রহমত, সার্বভৌমত্বের সুসংবাদ প্রচার করেন। আল্লাহর ভান্ডারে থাকা তাঁর বিশেষ নামসমূহ আমাদের কাছে জানিয়ে দেন। আপনি যদি তাঁকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে দেখেন, তাহলে ভালোবাসার রোলমডেল, করুণার প্রতীক, মানবতার গর্ব এবং সৃষ্টির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখবেন। আবার আপনি যদি তাঁকে রাসূল হিসেবে দেখেন, তাহলে তাঁর মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন। সত্যের আলো এবং সুখের মাধ্যম হিসেবে উপলব্ধি করবেন। তাঁর নিয়ে আসা আলোর বার্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিদ্যুতের মতো ঝলমল করে জ্বলছে। পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষ তাঁকে পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তা তাদের জীবনে সংরক্ষণ করে চলেছে। তাহলে কেন আমাদের খারাপ ও শয়তান মন তা গ্রহণ করে না, যার মিশনের সারমর্ম হলো—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই?'৩০

টিকাঃ
২৫ সূরা নিসা: ৮০
২৬ আল কুরআন ১৩: ২৮ 'আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।'
২৭ মুসলিম : ৬৬২৩
২৮ ইমাম নাসায়ি, নাসায়ি, মুহাম্মাদ ইকবাল সিদ্দিকি অনুদিত (Lahore: Kazi Publications, 1994), হাদিস ৩৯৩৯, হাদিসটি সহিহ।
২৯ বুখারি: ৬২৮
৩০ সাইদ নুরসি, রিসালায়ে নূর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00