📄 ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্য, যিনি পরম করুণাময়, বিশ্বজগতের স্রষ্টা; যিনি তাঁর প্রজ্ঞার মাধ্যমে জগতের সবকিছু পরিপূর্ণরূপে সৃষ্টি করেছেন, মানবতার মুক্তির জন্য পাঠিয়েছেন তাঁর প্রিয় হাবিব রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে।
একজন মুসলিম ভালোবাসার ক্ষেত্রে নিজের এবং পরিবারের চেয়েও রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বেশি প্রাধান্য দেবে-এমন শিক্ষাই তিনি আমাদের দিয়েছেন। এটা প্রজ্ঞাময় অনুপ্রেরণা। আমরা যদি রাসূল (সা.)-কে বেশি ভালোবাসি, তাহলেই কেবল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর হব।
নবিজি শুধু একটি নির্দিষ্ট দেশের, নির্দিষ্ট কিছু মানুষের, নির্দিষ্ট সময়ের নেতা ছিলেন না; বরং তিনি সমগ্র পৃথিবীর সকল যুগের সকল মানুষের একমাত্র নিঃশর্ত অনুসরণযোগ্য নেতা। এই বইয়ে তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্বের অসাধারণ এক স্কেচ আঁকা হয়েছে; অমুসলিম পাঠকরাও যা থেকে লাভবান হতে পারবেন।
পশ্চিমা লেখকগণ একজন সফল নেতার যে গুণাবলি দাবি করেন, বইটিতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সে গুণাবলির প্রতিই দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। তাদের প্রণীত নেতৃত্বের কষ্টিপাথরেও যে তিনি নিখাদ প্রমাণিত হন, বইটিতে তা দেখানো হয়েছে। এ ছাড়াও মুসলিমদের মধ্যে এখনও যারা রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্ব সম্পর্কে সন্দিহান, তাদের জন্য এই বইটি হতে পারে একটি নতুন দিগন্তের নব উন্মোচন।
এই বই লেখার পেছনের গল্পটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। 'মুহাম্মাদ (সা.): দ্যা আল্টিমেট লিডার' শিরোনামে ২০০৮ সালে আমি মুসলিম তরুণদের সামনে একটি বক্তব্য রেখেছিলাম। বক্তব্যটি বেশ সাড়া ফেলেছিল। শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনেকেই এই বিষয়ে বই লিখতে উৎসাহিত করলেন। কিন্তু নানাবিধ কারণে লেখা হয়ে ওঠেনি।
এরপর গড়িয়েছে অনেক বছর। প্রায় ভুলেই গিয়েছি বই লেখার কথা। হঠাৎ তরুণদের উদ্দেশে একই বিষয়ে আরও একটি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এলো। বক্তব্য শেষ করার পর আমার মুসলিম ও অমুসলিম; সকল ধর্মাবলম্বী কলিগগণ বিষয়টিকে মলাটবদ্ধ করার জন্য জোর করে চেপে ধরলেন।
কী আর করার! লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু কয়েকটি অধ্যায় লেখা শেষ হওয়ার পর আমার মনে হতে লাগল-এমন একজন মহান মানুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে লেখার জন্য আমি প্রস্তুত নই। একই সঙ্গে ভাবলাম-বাজারে তো এ রকম বই আরও পাওয়া যাচ্ছে। থেমে গেলাম। বন্ধ হয়ে গেল বই লেখা।
কয়েক বছর পর ২০১৮ সালে আবারও আমার বক্তৃতা দারুণ সাড়া ফেলল। এরপর আমি আর আমার শুভাকাঙ্ক্ষীদের কথা এড়াতে পারিনি। ফলে বইটি শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলাম। মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য প্রকাশনী 'হাজি কয়া কুট্টি অব ইসলামিক বুক ট্রাস্ট' প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মাধ্যমেই বইটি প্রকাশ পেল।
মজার ব্যাপার হলো-একই দিনে আমি ব্রিসবনে যাওয়ায় কাকতালীয়ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর ইয়েমেনের তারিম অঞ্চলে বসবাসরত জনপ্রিয় আলিম হাবিব খাদিম সাকাফের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গিয়েছিল।
বই লেখার জন্য বিভিন্ন প্রামাণিক উৎসের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কুরআন, হাদিস ও সিরাত; যেখানে জীবনী ও বার্তাসমূহ বর্ণনা করা আছে, সেগুলোর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
সিরাত সম্পর্কে সিরিয়ান স্কলার মুস্তফা আস-সিবাই (১৯১৫-১৯৬৮, রাহিমাহুল্লাহ) জোর দিয়ে বলেন-
'আল্লাহর প্রেরিত যেকোনো নবি কিংবা সংস্কারকের জীবন এক সুন্দর বিবরণ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী সুস্থ অ্যাকাডেমিক পদ্ধতি এবং শক্তিশালী প্রমাণের মাধ্যমে আমাদের কাছে হাজির হয়েছে। এটা আমাদের মধ্যে কোনো প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি করে না; এমনকি তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বড়ো বড়ো ঘটনাগুলোও।'১
সিরাত ও হাদিস এতটাই নিখুঁত যে, আমাদের কাছে তাঁর জীবনের সবকিছুই ছবির মতো সজ্জিত আছে।
'তিনি কীভাবে পান করতেন, খাওয়া-দাওয়া করতেন, বসতেন, পরিধান করতেন; কীভাবে কথা বলতেন এবং পরিবারের সাথে আচরণ করতেন; কীভাবে তিনি ইবাদত করতেন এবং দুআ করতেন; কীভাবে সাহাবিদের সাথে আচরণ করতেন; এমনকি এটাও বর্ণিত রয়েছে—তাঁর পবিত্র মাথায় ও দাড়িতে কয়টি সাদা চুল ছিল।'২
আস-সিবাই (রহ.) আরও বলেন—
'রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী আমাদের এটা বলে—তিনি এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যাকে আল্লাহ রাসূল হিসেবে মনোনীত করে সম্মানিত করেছেন। সিরাত তাঁকে একজন মানুষের চেয়ে বেশি কিছু বানানোর চেষ্টা করে না। মিথ কিংবা মিথ্যা কাহিনি তাঁর জীবনে রচনা করে না। তাঁর কাছে কোনো ঐশ্বরিকত্বও নেই।'৩
আমাদের মতো মানুষ হয়েও তিনি এমন ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্ব করেন, যার কর্মপরিধি ও বৈশিষ্ট্যকে আমরা নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করি।
'প্রত্যেক দাঈ, প্রত্যেক নেতা, প্রত্যেক বাবা, প্রত্যেক স্বামী, প্রত্যেক বন্ধু, প্রত্যেক শিক্ষক, প্রত্যেক রাজনীতিবিদ, প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শের আধার ছিলেন তিনি।'৪
আরনেস্ট রেমান মন্তব্য করেন—'অন্য ধর্মগুলো যেখানে রহস্যে আবদ্ধ ছিল, ইসলাম তাদের মতো নয়। ইসলাম ইতিহাসের পূর্ণ আলোতে জন্মগ্রহণ করেছিল। এর (ইসলামের) শিকড় ভূপৃষ্ঠের স্তরে রয়েছে। এর প্রতিষ্ঠাতার (রাসূলুল্লাহর) জীবনী আমাদের কাছে ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় সংস্কারকদের জীবনীর মতো পরিচিত।'৫
লিগ অব আরব স্টেট সংস্থার সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রহমান আজ্জাম বলেন-
'আমাদের কাছে ঐতিহাসিক তথ্যের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কোনো নবি বা ধর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্যরা এত কম জানে না, যা দেখা যায় শুধু মুহাম্মাদ (সা.)-এর বেলায় এবং ইসলামের বেলায়।'৬
ব্রিটিশ এঞ্জেলিকান মিনিস্টার মন্টগোমেরি ওয়াট বলেন-
'ইতিহাসের কোনো মহান ব্যক্তিকে পশ্চিম এত ছোটো করে দেখেনি, যা হয়েছে মুহাম্মাদ (সা.)-এর বেলায়।'৭
আশা করা যায়, এই বইটি মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা তৈরিতে সহায়তা করবে।
রাসূলের প্রতি গভীর ভালোবাসা লেখকের হৃদয়ে রয়েছে। উপরন্তু তিনি এই বইয়ের অ্যাকাডেমিক বস্তুনিষ্ঠতা ও ভারসাম্যপূর্ণতার দিকে নজর দিয়েছেন। তিনি কোনো বিষয়ে একপেশে হতে চাননি। কুরআনে আল্লাহ বিশ্বাসীদের বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।' সূরা নিসা : ১৩৪
কিছু অমুসলিম লেখক সমালোচনা করতে গিয়ে ইসলামকে একটি সহিংস ধর্ম হিসেবে তুলে ধরেছেন। সম্ভবত তারা মদিনায় হিজরত করার পর নবিজির জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক যুদ্ধের ব্যাখ্যা ভালোমতো পড়েননি; অথচ লেখক হিসেবে এগুলোর ব্যাখ্যা জানাটা তাদের জন্য জরুরি ছিল।
এ সকল সমালোচনার জবাব দিয়ে সাম্প্রতিক দুজন অমুসলিম বুদ্ধিজীবী বই লিখেছেন। সেখানে তাঁরা নবিজীবনের সুষম ও ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। বইগুলো হলো-কারেন আর্মস্ট্রং-এর Muhammad : Prophet For Our Time এবং জুয়ান কোলের Muhammad : Prophet of Peace Amid The Clash of Empires.
আমি বিশেষভাবে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার ইমাম আহমেদ নাফফা এবং ব্রিসবনের কুরাবি মসজিদের সম্মানিত ইমামকে আমার বই পর্যবেক্ষণ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড সিভিলাইজেশনের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাহিল ইউসেল আমাকে লেখার ক্ষেত্রে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন।
আমার হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে সহধর্মিণী লেইলার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছি। আমার কাজের বিষয়ে তার ধৈর্য অবশ্যই প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে আমার ছেলে উমর ইয়াহইয়ার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। সে প্রথমেই আমার লেখার খসড়া পড়ে। এরপর তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বের অনুশীলনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাকে পরামর্শ দেয়।
টিকাঃ
১ মুস্তাফা আস-সিবাই, The Life of Prophet Muhammad; Highlights and Lessons, English Edition 2 (Riyad : International Islamic Publication House, 2005), পৃষ্ঠা-২১।
২ আস-সিবাই, The Life of Prophet Muhammad, পৃষ্ঠা-২৪
৩ প্রাগুক্ত
৪ আস-সিবাই, The Life of Prophet Muhammad, পৃষ্ঠা-২৫
৫ আবদুর রহমান আজ্জাম, The Eternal Message of Muhammad (London: Quarter Book, ১৯৭৯), পৃষ্ঠা-৩
৬ আজ্জাম, Eternal Message of Muhammad, পৃষ্ঠা-৪
৭ ডব্লিউ মন্টগোমেরি ওয়াট, Muhammad at Mecca (Oxford: Clarendon Press, ১৯৫৩), পৃষ্ঠা-৫২
৮ কারেন আর্মস্ট্রং, Muhammad: Prophet for our time (London: Harperpress, ২০০৬)
৯ জুয়ান কোলে, Muhammad : Prophet of Peace Amid the Clash of Empires (New York: Nation Books, ২০১৮)