📄 বিরে মাউনায় ৭০জন সাহাবীকে যেভাবে শহীদ করা হলো
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَاهُ رِعْلٌ، وَذَكْوَانُ وَعُصَيَّةٌ، وَبَنُو لَحْيَانَ، فَزَعَمُوا أَنَّهُمْ قَدْ أَسْلَمُوا، وَاسْتَمَدُّوهُ عَلَى قَوْمِهِمْ فَأَمَدَّهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعِينَ مِنَ الأَنْصَارِ، قَالَ أَنَسٌ : كُنَّا نُسَمِّيْهِمُ القُرَّاءَ يَحْطِبُونَ بِالنَّهَارِ وَيُصَلُّونَ بِاللَّيْلِ ، فَانْطَلَقُوا بِهِمْ ، حَتَّى بَلَغُوا بِئْرَ مَعُونَةً ، غَدَرُوا بِهِمْ وَقَتَلُوهُمْ ، فَقَنَتَ شَهْرًا يَدْعُو عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ، وَبَنِي لَحْيَانَ، قَالَ قَتَادَةُ: وَحَدَّثَنَا أَنَسٌ : أَنَّهُمْ قَرَءُوا بِهِمْ قُرْآنَا : أَلا بَلِّغُوا عَنَّا قَوْمَنَا بِأَنَّا قَدْ لَقِينَا رَبَّنَا. فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا، ثُمَّ رُفِعَ ذَلِكَ بَعْدُ
অর্থ: আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট 'রিল, যাকওয়ান, উসাইয়া ও বনূ লাহইয়ান গোত্রের কিছু লোক এসে বললো, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। এরপর তারা তাঁর নিকট তাদের কওমের মোকাবেলায় সাহায্য প্রার্থনা করলো। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৭০জন আনসার সাহাবীকে পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করলেন। আনাস রাযি. বলেন, আমরা তাদের ক্বারী নামে আখ্যায়িত করতাম। তারা দিনের বেলা লাকড়ী সংগ্রহ করতেন আর রাতে সালাতে মগ্ন থাকতেন। তারা তাঁদের নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। যখন তাঁরা 'বীরে মাউনা' নামক স্থানে পৌঁছালো, তখন তারা আনসার সাহাবীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো এবং তাঁদেরকে হত্যা করলো। এ সংবাদ শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিল, যাকওয়ান ও বনূ লাহইয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে একমাস পর্যন্ত কুনূতে নাযেলার মাধ্যমে বদ-দুআ করেছিলেন। কাতাদা রহ. বলেন, আনাস রাযি. আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাঁদের সম্পর্কে কিছুকাল যাবৎ কুরআনের এ আয়াতটি পড়তে থাকেন: আমাদের সংবাদ আমাদের কওমের নিকট পৌঁছে দাও যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত পেয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন। এরপর এ আয়াত পাঠ করা বন্ধ করে দেয়া হয় অর্থাৎ আয়াতটি মানসুখ হয়ে যায়। (বুখারী-৩০৬৪, ২৮০১, ২৮১৪, ৩১৭০, ৪০৮৮, ৪০৮৯, ৪০৯০, ৪০৯১, ৪০৯২, ৪০৯৩, ৪০৯৪, ৪০৯৫, ৪০৯৬, ৬৩৯৪, ইফা.-২৮৪৮, মুসলিম-৬৭৭, নাসাঈ-১০৭০, ১০৭১, ১০৭৭, আবু দাউদ-১৪৪৪, ইবনে মাজাহ-১১৮৩, ১১৮৪, আহমাদ-১১৪৭, ১১৭৪২, ১২২৪৪, ১২২৯৪, ১২৪৩৮, ১২৫০০, ১৩০৫০, ১৩৬৬০, দারিমী-১৫৯৬, ১৫৯৯, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
নোট: আলোচ্য পরিচ্ছেদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, ইত্যাদির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনী (রিজার্ভ ফোর্স) পাঠিয়ে সাহায্য করা জায়েয। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে বর্ণিত চারটি গোত্রের লোকদেরকে দ্বীনী শিক্ষা এবং কওমের অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সাহায্যের জন্য সত্তর জন হাফেজে কুরআন সাহাবীকে প্রেরণ করেছিলেন। তারা যখন 'বীরে মাউনা' নামক স্থানে পৌঁছালেন তখন ঐসব মুনাফিক বিশ্বাসঘাতকতা করে সাহাবীদেরকে শহীদ করে ফেলে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে এ সংবাদ শোনার পর রি'ল, যাকওয়ান ও বনূ লাহইয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে একমাস পর্যন্ত কুনূতে নাযেলার মাধ্যমে বদ-দুআ করেছিলেন। হযরত আনাস রাযি. বলেন, 'বীরে মাউনা'র কাছে শাহাদাৎবরণকারী সাহাবীদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এই আয়াতটি নাযিল হয়-
أَلا بَلِّغُوا عَنَّا قَوْمَنَا بِأَنَّا قَدْ لَقِيَنَا رَبَّنَا ، فَرَضِيَ عَنَّا وَأَرْضَانَا
“আমাদের সংবাদ আমাদের কওমের নিকট পৌঁছে দাও যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত পেয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকে সন্তুষ্ট করেছেন।” উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে এ আয়াতটি মানসুখ হয়ে যায়। (তোহফাতুল বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী-৩য় খন্ড)
📄 যে ঘটনা পড়লে চোখ অশ্রুসিক্ত হবেই
عَنْ بُرَيْدَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: أَنَّ مَاعِزَ بْنَ مَالِكِ الأَسْلَمِي أَتَى رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم : فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي قَدْ ظَلَمْتُ نَفْسِي وَزَنَيْتُ وَإِنِّي أُرِيدُ أَنْ تُطَهِّرَنِي. فَرَدَّهُ فَلَمَّا كَانَ مِنَ الْغَدِ أَتَاهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي قَدْ زَنَيْتُ. فَرَدَّهُ الثَّانِيَةَ فَأَرْسَلَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ , أَتَعْلَمُونَ بِعَقْلِهِ بَأْسًا تُنْكِرُونَ مِنْهُ شَيْئًا فَقَالُوا مَا نَعْلَمُهُ إِلَّا وَفِي الْعَقْلِ مِنْ صَالِحِينَا فِيمَا نُرَى فَأَتَاهُ الثَّالِثَةَ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِمْ أَيْضًا فَسَأَلَ عَنْهُ فَأَخْبَرُوهُ أَنَّهُ لَا بَأْسَ بِهِ وَلَا بِعَقْلِهِ فَلَمَّا كَانَ الرَّابِعَةً حَفَرَ لَهُ حُفْرَةٌ ثُمَّ أَمَرَ بِهِ فَرْجِمَ . قَالَ فَجَاءَتِ الْغَامِدِيَّةُ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي قَدْ زَنَيْتُ فَطَهِّرْنِي. وَانَّهُ رَدَّهَا فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ لِمَ تَرُدُّنِي لَعَلَّكَ أَنْ تَرُدَّنِي كَمَا رَدَدْتَ مَاعِرًا فَوَاللَّهِ إِنِّي لَحُبْلَى. قَالَ ، إِمَّا لَا فَاذْهَبِي حَتَّى تَلِدِي . فَلَمَّا وَلَدَتْ أَتَتْهُ بِالصَّبِيِّ فِي خِرْقَةٍ قَالَتْ هَذَا قَدْ وَلَدْتُهُ. قَالَ اذْهَبِي فَأَرْضِعِيهِ حَتَّى تَفْطِمِيهِ ، فَلَمَّا فَطَمَتُهُ أَتَتْهُ بِالصَّبِيِّ فِي يَدِهِ كِسْرَةُ خُبْرٍ فَقَالَتْ هَذَا يَا نَبِيَّ اللَّهِ قَدْ فَطَمْتُهُ وَقَدْ أَكَلَ الطَّعَامَ. فَدَفَعَ الصَّبِيَّ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَحُفِرَ لَهَا إِلَى صَدْرِهَا وَامَرَ النَّاسَ فَرَجَمُوهَا فَيُقْبِلُ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ بِحَجَرٍ فَرَمَى رَأْسَهَا فَتَنَضَّحَ الدَّمُ عَلَى وَجْهِ خَالِدٍ فَسَبَّهَا فَسَمِعَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَبَّهُ إِيَّاهَا فَقَالَ ، مَهْلاً يَا خَالِدُ فَوْالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا صَاحِبُ مَكْسٍ لَغْفِرَ لَهُ, ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَصَلَّى عَلَيْهَا وَدُفِنَتْ
অর্থ: হযরত বুরাইদা রাযি. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: মায়েজ ইবনে মালিক আসলামী রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করলো। তারপর বললো, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই আমি আমার আত্মার উপর যুলুম করেছি এবং ব্যভিচার করেছি। আমি আশা করি, আপনি আমাকে পবিত্র করবেন। তখন তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পরের দিন সে পুনরায় তাঁর কাছে আগমন করলো এবং বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করেছি। তখন দ্বিতীয়বারও তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক ব্যক্তিকে তার সম্প্রদায়ের লোকের কাছে প্রেরণ করলেন। তিনি সেখানে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি মনে করেন যে, তার বুদ্ধির বিভ্রাট ঘটেছে (পাগল হয়েছে) এবং সে মন্দ কাজে লিপ্ত হয়েছে। তারা প্রতি উত্তরে বললেন, আমরা তো তার বুদ্ধির বিভ্রাট সম্পর্কে কোনো কিছু জানিনা। আমরা তো জানি যে, সে সম্পূর্ণ সুস্থপ্রকৃতির। এরপর মায়েজ তৃতীয়বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আগমন করলো। তখন তিনি আবারও একজন লোককে তার গোত্রের কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রেরণ করলেন। তখনো তারা তাকে জানালো যে, আমরা তার সম্পর্কে খারাপ কোনো কিছু জানি না এবং তার বুদ্ধিরও কোনো বিভ্রাট ঘটেনি।
এরপর যখন চতুর্থবার সে আমগন করলো, তখন তার জন্য একটি গর্ত খনন করা হলো এবং তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি প্রদানের) নির্দেশ প্রদান করলেন। তখন তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হলো।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর গামেদী (গোত্রের) এক মহিলা আগমন করলো এবং বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করেছি, আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তখন তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। পরবর্তী দিন পুনরায় ঐ মহিলা আগমন করলো এবং বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি কি আমাকে সেভাবে ফিরিয়ে দিতে চান, যেভাবে আপনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মায়েজকে। আল্লাহর কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি গর্ভবতী। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যদি ফিরে যেতে না চাও, তবে এখন চলে যাও এবং সন্তান প্রসব পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
রাবী বলেন, এরপর যখন সে সন্তান প্রসব করলো তখন সে ঐ সন্তানকে এক টুকরা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করলো এবং বললো, এই সন্তান আমি প্রসব করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এখন চলে যাও এবং তাকে (সন্তানকে) দুধ পান করাও। দুধপান করানোর সময় উত্তীর্ণ হলে পরে এসো। এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় সমাপ্ত হলো তখন ঐ মহিলা শিশু সন্তানটিকে নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করলো এমন অবস্থায় যে, শিশুটির হাতে এক টুকরা রুটি ছিল। এরপর বললো, হে আল্লাহর নবী! এইতো সেই শিশু, যাকে আমি দুধপান করানোর কাজ শেষ করেছি। সে এখন খাদ্য খায়। তখন শিশু সন্তানটিকে তিনি কোনো একজন মুসলিমকে প্রদান করলেন। এরপর তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি) প্রদানের নির্দেশ দিলেন।
মহিলার বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করানো হলো, এরপর জনগণকে (তার প্রতি পাথর নিক্ষেপের) নির্দেশ দিলেন। তারা তখন তাকে পাথর মারতে শুরু করলো। খালিদ ইবনে ওয়ালীদ রাযি. একটি পাথর নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং মহিলার মাথায় নিক্ষেপ করলেন, তাতে রক্ত ছিঁটকে পড়লো খালিদ রাযি. এর মুখমণ্ডলে। তখন তিনি মহিলাকে গালি দিলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গালি শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, সাবধান! হে খালিদ! সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, জেনে রেখো! নিশ্চয়ই সে এমন তাওবাহ করেছে, যদি কোনো 'হক্কুল ইবাদ' বিনষ্টকারী ব্যক্তিও এমন তাওবাহ করতো, তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেতো। এরপর তার জানাযার নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিলেন এবং তিনি তার জানাযায় নামাজ আদায় করলেন। এরপর তাকে দাফন করা হলো। (সহীহ মুসলিম-৪৫২৮, ৪৫২৭, ৪৩২৩, ৪৩২৪, ইফা, ৪২৮৩, তিরমিযী-১৪৩৫, নাসাঈ-১৯৫৭, আবু দাউদ-৪৪৪০, ইবনে মাজাহ-২৫৫৫, আহমাদ-১৯৩৬০, ১৯৪০২, ১৯৪২৪, ১৯৪৫২, দারিমী-২৩২৫, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
নোট: সুবহানাল্লাহ! এই ঘটনা পড়ার পর কারো চোখে অশ্রু না এসে পারে না। আসলে খাঁটি মানুষ ছিলেন তাঁরা। দুনিয়ার জীবন এবং দুঃখ-কষ্টকে কিছুই মনে করতেন না; বরং তাঁদের নিকট আখেরাতই ছিলো আসল। তারা জানতেন যে, এই শাস্তি আখেরাতের তুলনায় কিছুই না। তাই পরকালীন শাস্তি থেকে বাঁচার জন্যেই এভাবে নিজেকে সোপর্দ করেছিলেন।
নোট: ব্যভিচার ও ব্যভিচারীনীকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে পাথর মেরে হত্যা করাকে ইসলামী পরিভাষায় 'রজম' বলে। বাহ্যিকভাবে 'রজম' দৃষ্টিকটু ও অমানবিক মনে হলেও এটি লাখো-কোটি মা-বোনের জান, মাল ও ইজ্জত রক্ষার অত্যন্ত কার্যকরী ঔষধ। যদি সঠিকভাবে মাত্র দুই/চারটি শাস্তি কার্যকর করা যায় এবং দেশের সকল প্রচার মাধ্যমগুলোতে তা প্রচার করা হয়, তবে অল্প দিনের মধ্যেই সারা দেশ থেকে 'ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো মরণব্যাধি চিরতরে খতম হয়ে যাবে। 'রজম' এর শাস্তি কার্যকর করার দ্বারা যদিও একজন অমানুষের মৃত্যু ঘটে, তবে এর দ্বারা লাখো মা-বোনের জীবন রক্ষা পায়। তাই সমাজে শান্তি ও জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্যে এই শাস্তি কার্যকর করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
📄 দুআ করার সাথে সাথে বিরাট পাথর সরে গেলো
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ: خَرَجَ ثَلاثَةُ نَفَرٍ يَمْشُونَ فَأَصَابَهُمُ المَطَرُ، فَدَخَلُوا فِي غَارٍ فِي جَبَلٍ، فَانْحَطَّتْ عَلَيْهِمْ صَخْرَةٌ، قَالَ: فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : ادْعُوا اللَّهَ بِأَفْضَلِ عَمَلٍ عَمِلْتُمُوهُ، فَقَالَ أَحَدُهُمْ : اللَّهُمَّ إِنِّي كَانَ لِي أَبَوَانِ شَيْخَانِ كَبِيرَانِ، فَكُنْتُ أَخْرُجُ فَأَرْعَى، ثُمَّ أَجِيءُ فَأَحْلُبُ فَأَجِيءُ بِالحِلابِ، فَآتِي بِهِ أَبَوَيَّ فَيَشْرَبَانِ، ثُمَّ أَسْقِي الصِّبْيَةَ وَاهْلِي وَامْرَأَتِي، فَاحْتَبَسْتُ لَيْلَةً، فَجِئْتُ فَإِذَا هُمَا نَائِمَانِ، قَالَ: فَكَرِهْتُ أَنْ أُوقِظَهُمَا، والصِّبْيَةُ يَتَضَاغَوْنَ عِنْدَ رِجْلَيَّ، فَلَمْ يَزَلْ ذَلِكَ دَأُبِي وَدَأْبَهُمَا، حَتَّى طَلَعَ الفَجْرُ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ، فَاخْرُجُ عَنَّا فُرْجَةً نَرَى مِنْهَا السَّمَاءَ، قَالَ: فَفُرِجَ عَنْهُمْ ، وَقَالَ الآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي كُنْتُ أُحِبُّ امْرَأَةً مِنْ بَنَاتِ عَنِّي كَأَشَدِ مَا يُحِبُّ الرَّجُلُ النِّسَاءَ، فَقَالَتْ: لَا تَنَالُ ذَلِكَ مِنْهَا حَتَّى تُعْطِيَهَا مِائَةَ دِينَارٍ، فَسَعَيْتُ فِيهَا حَتَّى جَمَعْتُهَا، فَلَمَّا فَعَدْتُ بَيْنَ رِجْلَيْهَا قَالَتْ: اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تَفُضَّ الخَاتَمَ إِلَّا بِحَقِّهِ، فَقُمْتُ وَتَرَكْتُهَا، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ ، فَاخْرُجْ عَنَّا فُرْجَةً، قَالَ: فَفَرَجَ عَنْهُمُ الثُّلُثَيْنِ، وَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي اسْتَأْجَرْتُ أَجِيرًا بِفَرَقٍ مِنْ ذُرَةٍ فَأَعْطَيْتُهُ، وَأَبَى ذَاكَ أَنْ يَأْخُذَ ، فَعَمَدْتُ إِلَى ذَلِكَ الفَرَقِ فَزَرَعْتُهُ، حَتَّى اشْتَرَيْتُ مِنْهُ بَقَرًا وَرَاعِيهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: يَا عَبْدَ اللهِ أَعْطِنِي حَقِي ، فَقُلْتُ: انْطَلِقُ إِلَى تِلْكَ البَقَرِ وَرَاعِيهَا فَإِنَّهَا لَكَ ، فَقَالَ: أَتَسْتَهْزِئُ بِي؟ قَالَ: فَقُلْتُ: مَا أَسْتَهْزِئُ بِكَ وَلَكِنَّهَا لَكَ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ، فَاخْرُجُ عَنَّا فَكُشِفَ عَنْهُمْ
অর্থ: হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: একদা তিন ব্যক্তি (সফরে) হেঁটে চলছিল। এমন সময় প্রবল বর্ষণ শুরু হলে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করলো। হঠাৎ একটি পাথর গড়িয়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ করে দেয়। তাদের একজন আরেকজনকে বললো, তোমরা যে সব আমল করেছ, তার মধ্যে উত্তম আমলের ওয়াসীলা করে মহান আল্লাহর নিকট দুআ করো। তাদের একজন (এই বলে) দুআ করলো, হে আল্লাহ! আমার পিতা-মাতা অতিবৃদ্ধ ছিলেন, আমি (প্রতিদিন সকালে) মেষ চরাতে বের হতাম। তারপর ফিরে এসে দুধ দোহন করতাম এবং এ দুধ নিয়ে আমার পিতা- মাতার নিকট উপস্থিত হতাম, আর তাঁরা তা পান করতেন। তারপরে আমি শিশুদের, পরিজনদের এবং আমার স্ত্রীকে পান করতে দিতাম। এক রাতে আমি আটকা পড়ে যাই (আসতে বিলম্ব হয়ে যায়)। তারপর আমি যখন এলাম তখন তাঁরা দু'জন (পিতা-মাতা) ঘুমিয়ে পড়েছেন। সে বললো, আমি তাদের ঘুম থেকে জাগ্রত করা পছন্দ করলাম না। আর তখন শিশুরা আমার পায়ের কাছে (ক্ষুধায়) চিৎকার করছিল। এ অবস্থায়ই আমার এবং পিতা-মাতার ফজর হয়ে গেল (অর্থাৎ আমার বাচ্চাদের খেতে দিলাম না)। হে আল্লাহ! আমি যদি এ কাজটি শুধুমাত্র আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করে থাকি, তাহলে আপনি আমাদের গুহার মুখ এতোটুকু ফাঁক করে দিন, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পারি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন একটু ফাঁকা হয়ে গেল। এরপর আরেকজন বললো, হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমি আমার এক চাচাতো বোনকে এতো অধিক ভালোবাসতাম, যা একজন পুরুষ নারীকে ভালোবেসে থাকে। চাচাতো বোন বললো, তুমি আমার থেকে সে মনস্কামনা (দৈহিক মিলন) হাসিল করতে পারবে না, যতক্ষণ আমাকে একশ' দীনার না দেবে। আমি চেষ্টা করে তা সংগ্রহ করলাম। এরপর আমি যখন তার দু'পায়ের মাঝে (লজ্জাস্থানের উপর) উপবেশন করলাম, তখন সে বললো, আল্লাহকে ভয় করো। বৈধ অধিকার ছাড়া মোহরকৃত বস্তুর সীল ভাঙ্গবে না (অর্থাৎ আমার সাথে ব্যভিচার করো না)। তখন আমি তাকে ছেড়ে দিলাম এবং উঠে গেলাম। হে আল্লাহ! আমি যদি তা আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই করে থাকি, তবে আমাদের থেকে পাথরটি আরেকটু ফাঁক করে দিন। তখন তাদের থেকে (গুহার মুখের) দুই-তৃতীয়াংশ ফাঁক হয়ে গেল। অপরজন বললো, হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, এক ফারাক (পরিমাণ) শস্য দানার বিনিময়ে আমি একজন মজুর (শ্রমিক) রেখেছিলাম। আমি তাকে তা দিতে গেলে সে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। তারপর আমি সে এক ফারাক শস্য দানা দিয়ে চাষ করে ফসল উৎপন্ন করি এবং তা দিয়ে গরু খরিদ করি ও রাখাল নিযুক্ত করি। কিছুকাল পরে সে মজুর এসে বললো, হে আল্লাহর বান্দা, আমাকে আমার পাওনা পরিশোধ করে দাও। আমি বললাম, এই গরুগুলো ও রাখাল নিয়ে যাও। সে বললো, তুমি কি আমার সাথে উপহাস করছ? আমি বললাম, আমি তোমার সাথে উপহাস করছি না, বরং এ সবকিছুই তোমার। হে আল্লাহ! তুমি জানো, আমি যদি তা শুধু তোমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করে থাকি, তবে আমাদের থেকে গুহার মুখ উন্মুক্ত করে দাও। তখন তাদের থেকে গুহার মুখ উন্মুক্ত হয়ে গেল। (বুখারী-২২১৫, ২২৭২, ২৩৩৩, ৩৪৬৫, ৫৯৭৪, ইফা.-২০৭৪, মুসলিম-২৭৪৩, আহমাদ-৫৯৮১, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
📄 খুবাইব রাযি. ফাঁসিতে মঞ্চে দাঁড়িয়েও হক কথা বললেন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشَرَةَ رَهْطٍ سَرِيَّةً عَيْنًا، وَأَمَّرَ عَلَيْهِمْ عَاصِمَ بْنَ ثَابِتٍ الْأَنْصَارِيَّ جَدَّ عَاصِمِ بْنِ عُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ، فَانْطَلَقُوا حَتَّى إِذَا كَانُوا بِالهَدَأَةِ، وَهُوَ بَيْنَ عُسْفَانَ وَمَكَّةَ، ذُكِرُوا لِحَيِّ مِنْ هُذَيْلٍ ، يُقَالُ لَهُمْ بَنُو لَحْيَانَ، فَنَفَرُوا لَهُمْ قَرِيبًا مِنْ مِائَتَيْ رَجُلٍ كُلُّهُمْ رَامٍ، فَاقْتَضُوا آثَارَهُمْ حَتَّى وَجَدُوا مَأْكَلَهُمْ تَمْرًا تَزَوَّدُوهُ مِنَ المَدِينَةِ. فَقَالُوا: هَذَا تَمْرُ يَثْرِبَ فَاقْتَضُوا آثَارَهُمْ ، فَلَمَّا رَآهُمْ عَاصِمٌ وَأَصْحَابُهُ لَجَثُوا إِلَى فَدْفَدٍ وَأَحَاطَ بِهِمُ القَوْمُ ، فَقَالُوا لَهُمْ : انْزِلُوا وَأَعْطُونَا بِأَيْدِيكُمْ، وَلَكُمُ العَهْدُ والمِيثَاقُ، وَلَا نَقْتُلُ مِنْكُمْ أَحَدًا ، قَالَ عَاصِمُ بْنُ ثَابِتٍ أَمِيرُ السَّرِيَّةِ: أَمَّا أَنَا فَوَاللَّهِ لَا أُنْزِلُ اليَوْمَ فِي ذِمَّةِ كَافِرٍ ، اللَّهُمَّ أَخْبِرْ عَنَّا نَبِيَّكَ، فَرَمَوْهُمْ بِالنَّبْلِ فَقَتَلُوا عَاصِمًا فِي سَبْعَةٍ، فَنَزَلَ إِلَيْهِمْ ثَلَاثَةُ رَهْطٍ بِالْعَهْدِ وَالمِيثَاقِ، مِنْهُمْ خُبَيْبٌ الأَنْصَارِيُّ، وَابْنُ دَيْنَةَ، وَرَجُلٌ آخَرُ ، فَلَمَّا اسْتَمْكَنُوا مِنْهُمْ أَظْلَقُوا أَوْتَارَ قِسِيِّهِمْ فَأَوْثَقُوهُمْ ، فَقَالَ الرَّجُلُ الثَّالِثُ : هَذَا أَوَّلُ الغَدْرِ، وَاللَّهِ لَا أَصْحَبُكُمْ إِنَّ لِي فِي هَؤُلاءِ لَأُسْوَةً يُرِيدُ القَتْلَى، فَجَزَرُوهُ وَعَالَجُوهُ عَلَى أَنْ يَصْحَبَهُمْ فَأَبَى فَقَتَلُوهُ، فَانْطَلَقُوا بِخُبَيْبٍ، وَابْنِ دَيْنَةً حَتَّى بَاعُوهُمَا بِمَكَّةَ بَعْدَ وَقْعَةِ بَدْرٍ ، فَابْتَاعَ خُبَيْبًا بَنُو الحَارِثِ بْنِ عَامِرِ بْنِ نَوْفَلِ بْنِ عَبْدِ مَنَافٍ، وَكَانَ خُبَيْبٌ هُوَ قَتَلَ الْحَارِثُ بْنَ عَامِرٍ يَوْمَ بَدْرٍ ، فَلَبِثَ حُبَيْبٌ عِنْدَهُمْ أَسِيرًا، فَأَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عِيَاضٍ، أَنَّ بِنْتَ الحَارِثِ أَخْبَرَتْهُ: أَنَّهُمْ حِينَ اجْتَمَعُوا اسْتَعَارَ مِنْهَا مُوسَى يَسْتَحِلُّ بِهَا، فَأَعَارَتْهُ، فَأَخَذَ ابْنَا لِي وَأَنَا غَافِلَةٌ حِينَ أَتَاهُ قَالَتْ: فَوَجَدْتُهُ مُجْلِسَهُ عَلَى فَخِذِهِ وَالمُوسَى بِيَدِهِ، فَزِعْتُ فَزْعَةً عَرَفَهَا خُبَيْبٌ فِي وَجْهِي، فَقَالَ: تَخْشَيْنَ أَنْ أَقْتُلَهُ؟ مَا كُنْتُ لِأَفْعَلَ ذَلِكَ، وَاللَّهِ مَا رَأَيْتُ أَسِيرًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ خُبَيْبٍ، وَاللَّهِ لَقَدْ وَجَدْتُهُ يَوْمًا يَأْكُلُ مِنْ قِطْفِ عِنَبٍ فِي يَدِهِ، وَإِنَّهُ لَمُوثَقٌ فِي الحَدِيدِ، وَمَا بِمَكَّةَ مِنْ ثَمَرٍ وَكَانَتْ تَقُولُ: إِنَّهُ لَرِزْقٌ مِنَ اللَّهِ رَزَقَهُ خُبَيْبًا، فَلَمَّا خَرَجُوا مِنَ الحَرَمِ لِيَقْتُلُوهُ فِي الحِلِّ، قَالَ لَهُمْ خُبَيْبٌ: ذَرُونِي أَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ، فَتَرَكُوهُ، فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ قَالَ: لَوْلا أَنْ تَظُنُّوا أَنَّ مَا بِي جَزَعٌ لَطَوَّلْتُهَا اللَّهُمَّ أَحْصِهِمْ عَدَدًا وَلَسْتُ أَبَالِي حِينَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا * عَلَى أَيِّ شِقٍّ كَانَ لِلَّهِ مَصْرَعِي وَذَلِكَ فِي ذَاتِ الإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ * يُبَارِكْ عَلَى أَوْصَالِ شِلْوِ مُمَزَّعِ فَقَتَلَهُ ابْنُ الحَارِثِ فَكَانَ خُبَيْبٌ هُوَ سَنَّ الرَّكْعَتَيْنِ لِكُلِّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ قُتِلَ صَبْرًا، فَاسْتَجَابَ اللَّهُ لِعَاصِمِ بْنِ ثَابِتٍ يَوْمَ أُصِيبَ، فَأَخْبَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْحَابَهُ خَبَرَهُمْ، وَمَا أُصِيبُوا ، وَبَعَثَ نَاسٌ مِنْ كُفَّارِ قُرَيْشٍ إِلَى عَاصِمٍ حِينَ حُدِّثُوا أَنَّهُ قُتِلَ، لِيُؤْتَوْا بِشَيْءٍ مِنْهُ يُعْرَفُ، وَكَانَ قَدْ قَتَلَ رَجُلًا مِنْ عُظَمَائِهِمْ يَوْمَ بَدْرٍ، فَبُعِثَ عَلَى عَاصِمٍ مِثْلُ الظُّلَّةِ مِنَ الدَّبْرِ، فَحَمَتُهُ مِنْ رَسُولِهِمْ، فَلَمْ يَقْدِرُوا عَلَى أَنْ يَقْطَعَ مِنْ لَحْمِهِ شَيْئًا
অর্থ: আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসাবে সংবাদ সংগ্রহের জন্যে প্রেরণ করেন এবং আসিম ইবনে সামিত আনসারী রাযি.-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করেন। যিনি ছিলেন আসিম ইবনে উমর ইবনে খাত্তাবের নানা। তাঁরা রওয়ানা হয়ে গেলেন। যখন তাঁরা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী 'হাদআত' নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন হুযায়েল গোত্রের একটি প্রশাখা যাদেরকে 'লেহইয়ান' বলা হয় তাদের কাছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। তারা প্রায় দু'শত তীরন্দাজকে তাদের পিছু (ধাওয়া করার জন্যে) প্রেরণ করে। এরা তাঁদের চিহ্ন অনুসরণ করে চলতে থাকে। সাহাবীগণ মদীনা থেকে সাথে নিয়ে আসা খেজুর যেখানে বসে খেয়েছিলেন, অবশেষে এরা সে স্থানের সন্ধান পেয়ে গেল। তখন এরা বললো, ইয়াসরিবের খেজুর। এরপর এরা তাঁদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলতে লাগল। যখন আসিম ও তার সাথীগণ এদের দেখলেন, তখন তাঁরা একটি উচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আর কাফিররা তাঁদের ঘিরে ফেলল এবং তাঁদেরকে বলতে লাগল, তোমরা অবতরণ করো এবং স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব বরণ করো। আমরা তোমাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমরা তোমাদের কাউকে হত্যা করবো না। তখন গোয়েন্দা দলের নেতা আসিম ইবনে সাবিত রাযি. বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তো আজ কাফিরদের নিরাপত্তায় অবতরণ করবো না। হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌঁছে দিন। অবশেষে কাফিরগণ তীর নিক্ষপ করতে শুরু করলো। আর তারা আসিম রাযি.-সহ সাতজনকে শহীদ করলো। এরপর অবশিষ্ট তিনজন খুবাইব আনসারী, যায়েদ ইবনে দাসিনা রাযি. ও অপর একজন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর বিশ্বাস করে তাদের নিকট অবতরণ করলেন। যখন কাফিররা তাদেরকে আয়ত্বে নিয়ে নিল, তখন তারা তাদের ধনুকের রশি খুলে ফেলে তাঁদের বেধে ফেললো। তখন তৃতীয়জন বলে উঠলেন, সূচনাতেই বিশ্বাসঘাতকতা! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সাথে যাবো না, আমি তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবো, যারা শাহাদাত বরণ করেছে। কাফিররা তাঁকে তাদের সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। তখন তারা তাঁকে শহীদ করে ফেলে এবং তারা খুবাইব ও ইবনে দাসিনাকে নিয়ে চলে যায়। অবশেষে তাদের উভয়কে মক্কায় বিক্রয় করে ফেলে। এটা বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। তখন খুবাইবকে হারিস ইবনে আমিরের পুত্রগণ খরিদ করে নেয়। আর বদর যুদ্ধের দিন খুবাইব রাযি. হারিস ইবনে আমিরকে হত্যা করেছিলেন। খুবাইব রাযি. কিছু দিন তাদের নিকট বন্দী থাকেন। ইবনে শিহাব রাযি. বলেন, আমাকে উবাইদুল্লাহ ইবনে আয়ায অবহিত করেছেন, তাঁকে হারিসের কন্যা জানায় যে, যখন হারিসের পুত্রগণ খুবাইব রাযি.-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তাঁর নিকট থেকে ক্ষৌর কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন।
তখন হারিসের কন্যা তাকে এক খানা ক্ষুর ধার দিল। (সে বলেছে) সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে যায় এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি খুব ভয় পেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি ভয় পাচ্ছি। তখন তিনি বললেন, তুমি কি এ ভয় করো যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করবো না। (হারিসের কন্যা বললো) আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের ন্যায় উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদিন দেখলাম, তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় আঙ্গুর ছড়া থেকে খাচ্ছেন, যা তার হাতেই ছিলো। অথচ এ সময় মক্কায় কোনো ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না। হারিসের কন্যা বলতো, এ তো ছিলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। এরপর তারা খুবাইবকে শহীদ করার উদ্দেশ্যে হерем থেকে হিল্লের দিকে নিয়ে বের হয়ে পড়ল। তখন খুবাইব রাযি. তাদের বললেন, আমাকে দু'রাকাআত সালাত আদায় করতে দাও। তারা তাঁকে অনুমতি প্রদান করলো। তিনি দু'রাকাআত সালাত আদায় করে নিলেন। তারপর তিনি বললেন, তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি তবে আমি সালাতকে দীর্ঘায়িত করতাম। হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করুন। তারপর তিনি এ কবিতা দু'টি আবৃত্তি করলেন:
যখন আমি মুসলিম হিসাবে শহীদ হচ্ছি তখন আমি কোনরূপ ভয় করি না, আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমাকে যেখানেই মাটিতে লুটিয়ে ফেলা হোক না কেন। আমার এ মৃত্যু আল্লাহ তাআলার জন্যেই হচ্ছে তিনি যদি ইচ্ছা করেন, তবে আমার দেহের প্রতিটি খন্ডিত জোড়াসমূহে বরকত সৃষ্টি করে দিবেন।
অবশেষে হারিসের পুত্র তাঁকে শহীদ করে। বস্তুত যে মুসলিম বন্দী অবস্থায় শহীদ হয়, তার জন্যে দু'রাকাত সালাত আদায়ের এ রীতি খুবাইব রাযি.-ই প্রবর্তন করে গেছেন। যেদিন আসিম রাযি. শাহাদাত বরণ করেছিলেন, সেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করেছিলেন। সেদিনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবাগণকে তাঁদের সংবাদ ও তাঁদের উপর যা' যা' আপতিত হয়েছিল সবই অবহিত করেছিলেন। আর যখন কুরাইশ কাফিরদেরকে এ সংবাদ পৌঁছানো হলো যে, আসিম রাযি.-কে শহীদ করা হয়েছে, তখন তারা তাঁর নিকট এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করে, যাতে সে ব্যক্তি তাঁর মরদেহ থেকে কিছু অংশ কেটে নিয়ে আসে। যেন তারা তা দেখে চিনতে পারে। কারণ, বদর যুদ্ধের দিন আসিম রাযি. কুরাইশদের এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। আসিমের মরদেহের (হেফাজতের) জন্যে মৌমাছির ঝাঁক প্রেরিত হয়েছিলো। (এসব মৌমাছি) তাঁর দেহ আবৃত করে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করেছিলো। ফলে তারা তাঁর দেহ থেকে সামান্য টুকরাও কেটে নিতে সক্ষম হয়নি। (বুখারী-৩০৪৫, ৩৯৮৯, ৪০৮৬, ৭৪০২, ইফা.-২৮৩১, আবু দাউদ-২৬৬০, আহমাদ-৭৮৬৯, ৮০৩৫, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
নোট: ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, কাফিররা হযরত খুবাইব রাযি.-কে শূলিবিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রেখেছিলো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সংবাদ শোনার পর হযরত যুবাইর ও হযরত মিকদাদ রাযি.-কে গোপনে তার মরদেহ আনার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। তারা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন, তখনও খুবাইব রাযি. এর লাশ কোনোরূপ বিকৃত হয়নি, বরং সম্পূর্ণ তাজা ছিলো। এমনকি তার দেহ মোবারক থেকে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো তা ছিলো কস্তুরীর ন্যায় সুগন্ধিযুক্ত। হযরত যুবাইর ও মিকদাদ রাযি. যখন তার মরদেহ শূলিকাষ্ঠ থেকে নামিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন, তখন ৭০জন কাফির তাদের পিছু ধাওয়া করলো।
যুবাইর রাযি. যখন দেখলেন যে, কাফিররা পিছন থেকে ধাওয়া করছে তখন তিনি লাশটি মাটিতে রেখে দিলেন। আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে সাথে সাথেই লাশটি মাটিতে গ্রাস করে ফেললো। অর্থাৎ জমীন ফাঁক হয়ে ভিতরে চলে গেল। এ কারণে হযরত খুবাইব রাযি. কে بلع الارض (বালিউল আরদ) তথা 'জমীনের গলধঃকরণ' বলা হয়।