📄 কুরআন কি বলে?
قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
অর্থ: আপনি বলে দিন, 'আমাদেরকে শুধু তা-ই আক্রান্ত করবে, যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের তাওয়াক্কুল করা উচিত। (সূরা তাওবাহ-৫১)
অপর এক আয়াতে উল্লেখ আছে-
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلًا
অর্থাৎ, এ কথা সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে যে, কোনো প্রাণীই আল্লাহর হুকুম ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে না। (সূরা আলে-ইমরান-১৪৫)
নোট: আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যার তাকদিরে যতটুকু লিখে রেখেছেন, ঠিক ততটুকুই পৌঁছবে। এক চুল পরিমাণও এদিক- সেদিক হবে না। অতএব আল্লাহ যদি কারো ভাগ্যে রোগ-বিপদ না লিখেন, তবে কস্মিণকালেও তার উপর তা আপতিত হবে না। এমনকি সংক্রমিত ব্যক্তিকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও সে আক্রান্ত হবে না। কারণ, রোগের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।
📄 হাদীস কি বলে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোঁয়াচে রোগ ও শুভ-অশুভ নির্ণয় পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বাতিল ও কুসংস্কার ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে যা কিছু হয়, ভালো-মন্দ সব আল্লাহর হুকুমেই হয়ে থাকে। এর বাইরে কিছুই হয় না। নিম্নে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো:
১ম হাদীস عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ، وَيُعْجِبُنِي الفَأْلُ, قَالُوا: وَمَا الفَأْلُ؟ قَالَ : كَلِمَةٌ طَيِّبَةٌ
অর্থ: হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ছোঁয়াচে রোগ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে আমার নিকট 'ফাল' গ্রহণ করা পছন্দনীয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'ফাল' কী? তিনি বললেন, 'উত্তম কথা' (উত্তম পরামর্শ, যা বিপদের কেউ প্রদান করে)। (বুখারী-৫৭৭৬, ৫৭৫৬, ইফা.-৫২৪৮, মুসলিম-২২২৪, তিরমিযী-১৬১৫, আবু দাউদ-৩৯১৬, ইবনে মাজাহ-৩৫৩৭, আহমাদ-১১৭৬৯, ১১৯১৪, ১২১৫৪, ১২৩৬৭, ১২৪১১, ১৩২২১, ১৩৫০৮, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
২য় হাদীস عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ، وَالنُّؤْمُ فِي ثَلَاثٍ: فِي المَرْأَةِ، وَالدَّارِ، وَالدَّابَّةِ
অর্থ: হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ছোঁয়াচে রোগ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। অশুভ লক্ষণ বলতে কিছু থাকলে তা তিনটি জিনিসের মধ্যে থাকতো- (ক). স্ত্রী লোক (খ). ঘর-বাড়ি (গ). জীব-জন্তু। (বুখারী-৫৭৫৩, ২০৯৯, ২৮৫৮, ৫০৯৩, ৫০৯৪, ৫৭৭২, ইফা.-৫২২৯, মুসলিম-২২২৫, তিরমিযী-২৮২৪, নাসাঈ-৩৫৬৮, ৩৫৬৯, আবু দাউদ-৩৯২২, ইবনে মাজাহ-১৯৯৫, ৩৫৪০, মালিক-১৮১৭, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
নোট: উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ে জাহেলী যুগের দুটো কুসংস্কারকে খণ্ডন করা হয়েছে। স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ছোঁয়াচে রোগ ও অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই। এগুলো মনগড়া, ভিত্তিহীন ও মানুষের ধারণা প্রসূত। এতে বিশ্বাস করা নিষেধ।
৩য় হাদীস عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَامَ فِيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : خَلَقَ اللَّهُ كُلَّ نَفْسٍ وَكَتَبَ حَيَاتَهَا وَرِزْقَهَا وَمَصَائِبِهَا
অর্থ: হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে বললেন: আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার হায়াত, রিযিক ও বিপদাপদ সবকিছু লিখে দিয়েছেন। (তিরমিযী-২১৪৩, সহীহাহ-১১৫২, হাদীসের শব্দাবলী তিরমিযীর, হাদীসটি সহীহ)
৪র্থ হাদীস হযরত আমর ইবনে দীনার রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত ইবনে ওমর রাযি. অতি পিপাসা রোগে আক্রান্ত একটি উট খরিদ করেন। পরে বিক্রেতা তাঁকে এই ত্রুটির কথা জানিয়ে উটটি ফেরৎ নিতে চাইলেন। তখন ইবনে ওমর রাযি. বললেন: رَضِينَا بِقَضَاءِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَا عَدْوَى
অর্থাৎ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফায়সালায় সন্তুষ্ট। তা হচ্ছে ইসলামে কোনো সংক্রমণ (ছোঁয়াচে রোগ) নেই। (বুখারী-২০৯৯, ২৮৫৮, ৫০৯৩, ৫৯০৪, ৫৭৫৩, ৫৭৭২, ইফা.-১৯৬৯, মুসলিম-২২২৫, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
নোট: সম্মানিত পাঠক! উপরোক্ত ৪টি হাদীসই প্রমাণ করে যে, ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলতে কোনো কিছু নেই। এগুলো মনগড়া ও ভিত্তিহীন। বরং পৃথিবীতে যাকিছু হয়, সব আল্লাহর হুকুমেই হয়। কোনো রোগেরই নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আশা করি নিম্নের হাদীসদ্বয় থেকে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।
৫ম হাদীস عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لا عَدْوَى وَلا طِيَرَةً وَلَا هَامَةً فَقَامَ إِلَيْهِ رَجُلٌ أَعْرَابِي فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ الْبَعِيرَ يَكُونُ بِهِ الْجَرَبُ فَيُجْرِبُ الإِبِلَ كُلَّهَا قَالَ ذَلِكُمُ الْقَدَرُ فَمَنْ أَجْرَبَ الأَوَّلَ
অর্থ: হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ছোঁয়াচে বলতে কোনো রোগ নেই, অশুভ লক্ষণ বলতে কিছুই নেই এবং হামাহ (পেঁচার ডাক) বলতে কিছুই নেই। তখন তার সামনে এক গ্রাম্য লোক দাঁড়িয়ে বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কী মত যে, চর্মরোগে আক্রান্ত একটি উট সুস্থ উটের সংস্পর্শে এসে সকল উটকে আক্রান্ত করে? তিনি বললেন: এটাই তোমাদের তাকদির। আচ্ছা! তাহলে প্রথম উটটিকে কে সংক্রমিত করলো? (বুখারী-৫৭৭৬, ৫৭৫৬, ইফা.- ৫২৪৮, মুসলিম-২২২৪, তিরমিযী-১৬১৫, আবু দাউদ-৩৯১৬, ইবনে মাজাহ-৮৬, আহমাদ-৪৭৬১, ৬৩৬৯, ১১৭৬৯, ১১৯১৪, ১২১৫৪, ১২৩৬৭, ১২৪১১, ১৩২২১, ১৩৫০৮, ১৩৫৩৭, হাদীসের শব্দাবলী ইবনে মাজার)
৬ষ্ঠ হাদীস عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّلَمِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي حَدِيثُ عَهْدٍ بِجَاهِلِيَّةٍ, وَقَدْ جَاءَ اللَّهُ بِالإِسْلَامِ, وَإِنَّ مِنَّا رِجَالاً يَأْتُونَ الْكُهَانَ, قَالَ, فَلَا تَأْتِهِمْ قُلْتُ, وَمِنَّا رِجَالٌ يَتَطَيَّرُونَ, قَالَ, ذَاكَ شَيْءٌ يَجِدُونَهُ فِي صُدُورِهِمْ فَلَا يَصُدَّ نَّهُمْ
অর্থ: হযরত মুআবিয়া হাকাম সুলামী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমার যুগটি জাহিলিয়াতের খুব নিকটবর্তী। আল্লাহ সবেমাত্র আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করেছেন। আমাদের মধ্যকার কিছু লোক (গায়েবী সংবাদ জানতে) গণকের কাছে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি তাদের কাছে যেওনা। আমি বললাম, আমাদের কেউ কেউ পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয় করে। তিনি বললেন: এগুলো শুধু তাদের মনের কল্পনা। এতে কোনো কাজে বাধার সৃষ্টি না করে। (মুসলিম-১২২৭, ১০৮৬, ইফা.-১০৮০, আবু দাউদ-৯৩০, ৯৩১, ৩২৮২, ৩৯০৯, নাসাঈ- ১২১৮, আহমাদ-২৩২৫০, ২৩২৫৬, দারিমী-১৫০২, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
📄 তাকদীরের উপর ঈমান রাখা ফরয
৭ম হাদীস তাকদীরের উপর ঈমান রাখা ফরয عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَّلَ بِالرَّحِمِ مَلَكًا يَقُولُ: يَا رَبِّ نُطْفَةٌ ، يَا رَبِّ عَلَقَةٌ، يَا رَبِّ مُضْغَةً. فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقْضِيَ خَلْقَهُ قَالَ: أَذَكَرُ أَمْ أُنْثَى شَقِيٌّ أَمْ سَعِيدٌ، فَمَا الرِّزْقُ وَالأَجَلُ فَيُكْتَبُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ
অর্থ: হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ তা'আলা মাতৃগর্ভের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিয়েছেন। সে (ভ্রুণ গঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে) বলতে থাকে, হে প্রভু! এখন বীর্য-আকৃতিতে আছে। হে প্রভু! এখন জমাট রক্তে পরিণত হয়েছে। হে প্রভু! এখন মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে। এরপর আল্লাহ তা'আলা যখন তাকে পূর্ণাঙ্গ করতে চান, তখন জিজ্ঞেস করেন: পুরুষ, নাকি নারী? সৌভাগ্যবান, নাকি হতভাগা? রিযিক ও বয়স কী পরিমাণ? (নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এসব বিষয়ে) তার মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ই লিখে দেয়া হয়। (উল্লেখ্য যে, এ সব বিষয়ের উপর ঈমান রাখা জরুরী)। (বুখারী-৩১৮, ৩৩৩৩, ৬৫৯৫, ইফা.-৩১২, মুসলিম-২৬৪৬, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
নোট: এসব হাদীসে পরিস্কার বলা হয়েছে যে, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছুই নেই। সংক্রমিত ব্যক্তিকে স্পর্শ করার দ্বারা যদি কেউ আক্রান্ত হয়, তাহলে মনে করতে হবে যে, এটাই তার তাকদির। অর্থাৎ, তার তাকদিরে এরূপই লেখা ছিলো। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ধারণা অনুযায়ী যদি মহামারী ছোঁয়াচে রোগ হয়, তাহলে প্রথম ব্যক্তিকে বা প্রথম উটকে কে সংক্রমিত করলো? অতএব, ছোঁয়াচে বলতে কিছু নেই। এটা শুধু মানুষের ধারণা মাত্র। এরূপ আকিদা বর্জন করা জরুরী।
📄 কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কিত হাদীসের অপব্যাখ্যা ও জবাব
“ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই” এমর্মে অসংখ্য সহীহ হাদীস থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে কিছু লোক তথাকথিত আধুনিক বিজ্ঞানীদের সাথে ছোঁয়াচে রোগের পক্ষে ছাপাই গাইতে শুরু করেছে। তাদের দলিল সাকীফ গোত্রের সেই কুষ্ঠ রোগী, যাকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসতে বারণ করেছিলেন। পাঠকবৃন্দের সুবিধার্থে হাদীসখানা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
عَنْ عَمْرُو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ. فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ارْجِعْ فَقَدْ بَايَعْتُكَ
অর্থ: হযরত আমর রাযি. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'সাকীফ' গোত্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে এক ব্যক্তি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ছিলো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি নির্দেশ পাঠালেন যে, "তুমি চলে যাও, আমি তোমাকে বাইআত করে নিলাম।” (মুসলিম-২২৩১, নাসাঈ- ৪১৮২, ইবনে মাজাহ-৩৫৪৪, আহমাদ-১৮৯৭৪, ১৮৯৮০, ১৯৪৯২, বায়হাকী-১৪০২২, জামেউল আহাদীস-৩১৪০, হাদীসের শব্দাবলী নাসাঈর, হাদীসটি সহীহ)
ব্যাখ্যা : ارْجِعُ فَقَدْ بَايَعْتُكَ "তুমি চলে যাও, আমি তোমাকে বাইআত করে নিলাম।” এ বাক্যের একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। কেউ কেউ বলেছেন, সাকীফ গোত্রের ঐ লোকটি খুব অসুস্থ ছিলেন। মজলিস পর্যন্ত হেঁটে আসা তাঁর জন্য অনেক কষ্টকর ছিলো। তাই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ পাঠালেন যে, 'তোমার আসতে হবে না, তুমি চলে যাও, আমি তোমাকে বাইআত করে নিলাম।"
এটিই উত্তম ব্যাখ্যা। কারণ এ রোগটি যে ছোঁয়াচে নয়, তা পরবর্তীতে হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়।
পরবর্তী হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, একদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন কুষ্ঠ রোগীর সাথে মুসাফাহা করেছেন এবং তাকে সাথে নিয়ে একই প্লেটে খাবারও খেয়েছেন। সুতরাং এটি যদি ছোঁয়াচে রোগ হতো, তবে তিনি অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকতেন :
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ بِيَدِ رَجُلٍ مَجْذُومٍ, فَأَدْخَلَهَا مَعَهُ فِي الْقَصْعَةِ, ثُمَّ قَالَ كُلِّ ثِقَةٌ بِاللَّهِ وَتَوَكُلا عَلَى اللَّهِ
অর্থ: হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন কুষ্ঠ রোগীর হাত ধরলেন, তারপর তা নিজের খানার প্লেটে রেখে বললেন: আল্লাহর উপর আস্থা রেখে খাও এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো। (তিরমিযী-১৮১৭, আবু দাউদ-৩৯২৫, ৩৯২৭, ইবনে মাজাহ-৩৫৪২, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদ ও ইবনে মাজার)
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো, কেউ কেউ বলেছেন, কুষ্ঠ রোগীকে দেখার পর দূর্বল ঈমানের লোকেরা হয়তো একথা বলে ফেলতে পারে যে, “এ ব্যক্তিই আমাদের সর্বনাশ করবে, এর কারণেই আমরা আক্রান্ত হতে পারি।” আর এটা শিরকী কথা। কারণ আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না।
তাই দূর্বল লোকেদের ঈমান হেফাজতের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আসতে বারণ করেছিলেন।
উভয় ব্যাখ্যাই যুক্তিযুক্ত। কারণ, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে তাকে আসতে বারণ করবেন এটা কল্পনাও করা যায় না। আর এটা তাঁর শানেরও খেলাফ। আর এটা যদি ছোঁয়াচে রোগ হতো, তাহলে তিনি কুষ্ঠ রোগীকে নিয়ে একই প্লেটে খাবার খেলেন কেন?
নোট: আসল কথা হলো, শুধু সাকীফ গোত্রের সেই কুষ্ঠ রোগীই নয়; বরং তাঁর নিকট হেঁটে আসা কারো জন্য কষ্টকর মনে হলে কিংবা দূরদেশ থেকে কেউ বাইআত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আসতে নিষেধ করতেন এবং লোক মারফত কিংবা পত্রযোগে তাকে বাইআত করে নিতেন। যেমন- বাদশাহ নজ্জাশীর ঘটনা সকলেরই জানা। তিনি পত্রযোগে তাকে বাইআত করে নিয়েছিলেন।
এমনিভাবে সাহাবায়ে কিরামের মাঝেও এই আমল চালু ছিলো যে, দূরের লোকদেরকে পত্রযোগে বাইআত করতেন। যেমন সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. এর কথাও উল্লেখ আছে যে, তিনি পত্রযোগে খলিফা আবদুল মালিকের নিকট বাইআত হয়েছিলেন। হাদীসটি নিম্নরূপ: عَنْ عَبْدِ اللهِ بْن دِينَارٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: لَمَّا بَايَعَ النَّاسُ عَبْدَ المَلِكِ كَتَبَ إِلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ : إِلَى عَبْدِ اللَّهِ عَبْدِ المَلِكِ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ إِنِّي أُقِرُ بِالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ لِعَبْدِ اللَّهِ عَبْدِ المَلِكِ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى سُنَّةِ اللَّهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ، فِيمَا اسْتَطَعْتُ
অর্থ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে দিনার রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা যখন আবদুল মালিকের নিকট বাইআত হলো, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. তার কাছে পত্র লিখলেন যে, আমি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদর্শ অনুযায়ী আল্লাহর বান্দা, আমীরুল মুমিনীন আবদুল মালিকের, কথা যথাসাধ্য শোনা ও তাঁর আনুগত্য করার অঙ্গীকার করছি। (সহীহ বুখারী-৭২০৫, ৭২০৩, ৭২০৪, ৭২৭২, ইফা.-৬৭১০, ৬৭১২)
অতএব, এসব ঘটনা থেকে আমরা পরিস্কার বলতে পারি যে, সংক্রমিত হওযার ভয়ে সাকীফ গোত্রের ঐ লোকটিকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসতে নিষেধ করেননি; বরং তার কষ্টের প্রতি লক্ষ্য রেখে তিনি নিষেধ করেছিলেন। অতএব এই হাদীসকে ছোঁয়াচে রোগের পক্ষে দলিল বানানো জায়েয হবে না। والله اعلم