📄 তাওবার ফযীলত
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ حَدَّثَهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمْ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لا يَحْتَسِبُ
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আবশ্যক করে নেয়, (বেশী বেশী তাওবাহ করে) আল্লাহ তাকে সকল সঙ্কট থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তাকে সকল দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দেন এবং এমন স্থান থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করে দেন, যা সে অনুভবও করতে পারে না। (আবু দাউদ-১৫১৮, আহমাদ-২২৩৪, ইবনে মাজাহ-৩৮১৯, তাবারানী-১০৬৬৫, বায়হাকী-৬৪২১, তারগীব-১১৫৪, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদের)
📄 তাওবাকারীর কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না
عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ -
অর্থ: হযরত উবায়দা ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: গুনাহ থেকে (খালেসভাবে) তাওবাকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহ-ই নেই। (ইবনে মাজাহ-৪২৫০ মিশকাত-২৩৬৩, শরহুস সুন্নাহ-১৩০৭, তারগীব-৩১৪৫, তাবারানী-১০২৮১, বায়হাকী-২০৫৬১, হাদীসের শব্দাবলী ইবনে মাজার)
নোট: তাওবার সময় মনে মনে এরূপ খেয়াল করবে যে, আল্লাহ পাক আমার সামনে আসন গ্রহণ করে আছেন। আমি তাঁর কুদরতি কদম মোবারক জড়িয়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি কান্নাকাটি করে বলছি, 'হে আমার মালিক! আমি বড় অপরাধী, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি ছাড়া আর কোনো ক্ষমাকারী নেই। এভাবে তাঁর কুদরতি পা জড়িয়ে ধরে কান্না করছি আর বার বার ক্ষমা চাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, এই নিয়মে তাওবাহ করলে তাঁর দুআ কবুল হবেই।
📄 ঘুমের পূর্বে কয়েকটি সুন্নাত ও আদব
আমাকে যদি প্রশ্ন করেন যে, “আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার উপায়” নামক এ কিতাবে 'ঘুমানোর সুন্নাত' লিখলেন কেন? হয়তো এ প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো না, তবে একটি ঘটনা আপনাদেরকে শুনাতে পারবো।
আমার এক চাচাতো ভাই, নাম আকরাম হুসাইন। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। টিপটপ পরিপাটি সংসার। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ঈর্ষণীয়। গত ধানের মৌসুমের কথা। দিনের বেলা স্বামী-স্ত্রী দু'জনই ধান মাড়াই করেছেন। রাতে শোবার সময় স্ত্রীকে বলছেন, আমি তাহাজ্জুদের সময় উঠতে পারলে তোমাকে জাগিয়ে দিবো, আর তুমি আগে উঠলে আমাকে জাগিয়ে তুলবে।
ক্লান্ত দেহ, তাই কেউ-ই তাহাজ্জুদের সময় উঠতে পারেনি। চাচাতো ভাই ঘুম থেকে জেগে দেখেন, জামাআতের আর বেশি বাকি নেই। তাই পাঞ্জাবীটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন এবং যাবারকালে স্ত্রীকে খোঁচা দিয়ে বললেন, "সূর্যোদয়ের আর বেশি বাকি নেই। আমি মসজিদে চলে গেলাম, তুমি দ্রুত উঠে নামাজ পড়ে নাও।”
চাচাতো ভাই মসজিদ থেকে এসেই স্ত্রীর প্রতি ভীষণভাবে রেগে গেলেন। কারণ, সে কাথামুড়া দিয়ে এখানো শুয়ে আছে। তাই কর্কশ ভাষায় তাকে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু সে ডাকে সাড়া দেয় না। এরপর গায়ে ধাক্কা দিতে লাগলেন, উঠো, উঠো.....কিন্তু না, এ যেন আর কখনো উঠবে না। এ তো চিরনিদ্রা। এ নিদ্রা যেন আর কখনো ভাঙ্গবে না। এ দৃষ্টি আর কখনো সন্তানের মায়াবী চেহারা দেখবে না। আহ! এই তো মানুষের যিন্দেগী!
একসাথে একই চাদরের নিচে স্বামী-স্ত্রী দু'জন শুয়ে রইলেন। কিন্তু স্ত্রী কখন তাকে ফাঁকি দিয়ে পরপারে চলে গেল, তা বুঝতেই পারলেন না।
📄 আরেকটি ঘটনা
আমার মসজিদের পাশেই সনি প্লাষ্টিক কারখানা। অন্য জায়গার তুলনায় শ্রমিকরা বেশ ভালো ও নামাজী। কয়েকদিন আগের কথা। ফজরের নামাজের পর ছেলেদের হাউমাউ কান্নার আওয়াজ। কি হয়েছে? একজন বললো, হুজুর! কারখানার একজন শ্রমিক, বয়স মাত্র বিশ-বাইশ বছর। রাতে খাবার খেয়ে বারটা-একটা পর্যন্ত গল্প করেছে। তারপর বন্ধুদের সাথে ঘুমিয়েছে। এখন? এখন সে আর নেই। ঘুমিরে মধ্যেই দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।'
আহা! এই তো তোমার খেল-তামাশার যিন্দেগী। এ জীবন নিয়ে এতো বড়াই কেন? তুমি কি নিশ্চিত যে, আগামীকাল সকালে তুমি ঘুম থেকে উঠতে পারবে? তাহলে নামাজ না পড়ে ঘুমাও কেন? তুমি কি সুনিশ্চিত যে, জাহান্নাম থেকে তোমাকে নাজাত দেয়া হয়েছে? তাহলে মোবাইলে অশ্লীল ছবি দেখতে দেখতে ঘুমালে কেন?
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত ঘটনাদ্বয় কেন উল্লেখ করলাম? বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর অবস্থা অত্যন্ত নাযুক। রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত, কেউ কেউ সুবহে সাদিক পর্যন্ত ফেসবুক-ইন্টারনেটে ডুবে থাকে। এরপর যখন ফজরের আযান হয়, তখন সুইচটা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে।
আল্লাহ না করুক, যদি কোনো ব্যক্তি টেলিভিশন কিংবা ফেসবুকে অশ্লীল ছবি দেখে তাওবাহ না করে ঘুমায়, আর এই রাতেই তার মৃত্যু হয়, তার মৃত্যু কি ঈমানের উপর গণ্য হবে? কক্ষণো নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট বলেছেন:
مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
অর্থাৎ, যার শেষ কথা হবে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সে সোজা জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসলিম-২১৬২, আবু দাউদ-৩১১৮ ও ৩১১৯, আহমাদ-২১৫২৯, ২১৬২২, সহীহ ইবনে হিব্বান-৩০০৪, ইরওয়াউল গালীল-৬৮৭, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদের)
হাদীসটি অত্যন্ত পরিস্কার। "যার শেষ কথা হবে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সে সোজা জান্নাতে প্রবেশ করবে।” অর্থাৎ, ঘুমের আগে কেউ যদি দুআ-দূরূদ পড়ে আল্লাহ পাকের যিকির করতে করতে ঘুমায় এবং এই ঘুমের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়, তাহলে তার শেষ কথা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' ধর্তব্য হবে এবং ঈমানের উপরই মৃত্যু হয়েছে বলে গণ্য হবে।
তাছাড়া ঐ রাতে যদি তার মৃত্যু নাও হয়, তবুও দুআ-দূরূদ পড়ে যিকির করতে করতে ঘুমানোর কারণে তার আমলনামায় সারারাত ইবাদতের সওয়াব লেখা হবে।
পক্ষান্তরে, কেউ যদি টেলিভিশন কিংবা ফেসবুকে অশ্লীল ছবি দেখে বা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে, তবে তার আমলনামায় সারারাত গুনাহ লেখা হয়। যদি ঘুমের পূর্বে তাওবাহ না করে এবং ঐ রাতেই তার মৃত্যু হয়, তাহলে তার মৃত্যু কালিমার উপর গণ্য হবে না।
প্রিয় পাঠক! সম্ভবত বুঝতেই পারছেন যে, 'আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার উপায়' নামক কিতাবে 'ঘুমানোর সুন্নাত' কেন লিখলাম। আজ জাতির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। 'করোনা ভাইরাস' এর আঘাতে হয়তো কিছু সংখ্যক লোক মারা যাবে। কিন্তু “ফেসবুক-ইন্টারনেট” নামক এই ভাইরাস গোটা মুসলিম উম্মাহর 'চরিত্র' এবং 'ঈমান' দুটোই ধ্বংস করে ফেলবে। আর ইতোমধ্যে অনেকটা হয়েও গেছে।
হয়তো চেষ্টা-তদবির করলে আল্লাহর মেহেরবানীতে একসময় 'করোনা ভাইরাস' থাকবে না, তার আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু চরিত্র ও ঈমান বিধ্বংসী ইন্টারনেটের আক্রমণ থেকে কি বাঁচা সম্ভব হবে?
করোনা ভাইরাসের আক্রমণে একজন মানুষের বেশির থেকে বেশি মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু ফেসবুক-ইন্টারনেটে আক্রান্ত ব্যক্তির 'ঈমান' এবং 'চরিত্র' দুটোরই মৃত্যু ঘটে, তারপর? তারপর তাকে চিরশাস্তির ঠিকানা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।
হয়তো আমাকে প্রশ্ন করবেন, তাহলে আপনি কি 'ফেসবুক-ইন্টারনেট' এর বিরোধী? আমি বলবো, কক্ষণো নয়। তবে হ্যাঁ, যতটুকু চরিত্র ও ঈমান বিধ্বংসী ততটুকুর বিরোধী। বাকি যতটুকু ঈমানের সহায়ক ও জনকল্যাণকর ততটুকুর বিরোধী নয়।
হয়তো আবারো প্রশ্ন তুলবেন, ঈমানের সহায়ক ও জনকল্যাণকর অংশটুকু রেখে, খারাপ অংশ কি বন্ধ করা সম্ভব? আমি বললো, শতভাগ সম্ভব। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে মাত্র একদিনেই সকল ভাইরাস দূর করা সম্ভব। কারণ, প্রতিটি ছবি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। যারা এমন নোংরা ছবি ছেড়ে মানুষের চরিত্র ও ঈমান ধ্বংস করছে, সরকার ইচ্ছা করলে তাদের শেকড়সহ উপড়ে ফেলতে পারে।
দুআ করি, আল্লাহ পাক যেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সেই হিম্মত দান করেন এবং দুনিয়াতে করোনা ও আখেরাতে জাহান্নাম থেকে হেফাজত করেন।-আমীন
একনজরে ঘুমানোর পূর্বে কতিপয় সুন্নাত
রাতে ঘুমানোর পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুন্নাত ও আদব রয়েছে। যেমন- অজু করে দু'রাকাআত নামাজ পড়া। তারপর একবার সূরা ফাতিহা, তিনবার সূরা ইখলাস, একবার করে সূরা ফালাক ও নাস পড়া। তারপর কয়েকবার দুরূদ শরীফ ও ইস্তিগফার পড়া। তারপর ডান কাতে শুয়ে ঘুমের মাসনূন দুআগুলো পাঠ করা। তারপর শেষরাতে উঠে তাহাজ্জুদ কিংবা ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে পড়ার নিয়ত রেখে আল্লাহ পাকের যিকির করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া ইত্যাদি।