📄 মহামারী থেকে বাঁচার দুআ
মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ যদি কাউকে রক্ষা না করেন, তবে কেউ তাকে বাঁচাতে পারে না। এমনকি সে যদি মজবুত দূর্গেও আশ্রয় গ্রহণ করে কিংবা দুনিয়ার সমস্ত ডাক্তার-কবিরাজ একত্রিত হয়েও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, তবুও তাকে বাঁচানো যায় না। এমর্মে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন:
أَيْنَ مَا تَكُونُوا يُدْرِكُكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ
অর্থাৎ, তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের ধরবেই, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো। (সূরা নিসা-৭৮)
আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয় মদিনার কতিপয় মুনাফিক সম্পর্কে। তারা ওহুদের শহীদগণ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলো যে, তাঁরা যদি আমাদের কথা মেনে চলতো এবং সেখানে গমন থেকে বিরত থাকতো, তবে কেউ মরতো না। তাদের জবাবে আল্লাহ পাক এ আয়াত নাযিল করেন। (তাফসীরে জালালাইন, নূরুল কুরআন)
অপর এক আয়াতে আরো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ
অর্থাৎ, আপনি বলে দিন, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন করার চেষ্টা করছো, তা তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। (সূরা জুমুআ-৮)
উপরোক্ত আয়াতদ্বয় থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ যদি কাউকে পাকড়াও করেন, কেউ তাকে রক্ষা করতে পারে না। আর তিনি যাকে রক্ষা করেন, কেউ তার ক্ষতিও করতে পারে না। তাই একমাত্র আল্লাহকেই সকল ক্ষমতার মালিক মনে করতে হবে এবং এই আযাব থেকে বাঁচার জন্য তাঁর কাছেই আশ্রয় চাইতে হবে। তবে সুন্নাহ হিসেবে কয়েকটি আমল বাতলে দেয়া হলো:
১ম আমল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর (সম্ভব হলে জায়নামাজে বসে) ৩ বার এই দুআটি পাঠ করবে: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَضِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ “আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল বারাছি, অল-জুনূনী, অল-জুযামী, অমিন সাইয়িইল আছকম”। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি ধ্বল (শ্বেত) রোগ, উম্মাদনা, কুষ্ঠ রোগ ও সকল প্রকার দূরারোগ্য (মহামারী) থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। (আবু দাউদ- ১৫৫৪, নাসাঈ-৫৪৯৩, মুসনাদে আহমাদ-১৩০০৪, দুআর শব্দাবলী আবু দাউদের)
হাদীসের দলিল عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ : اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ অর্থ: হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কালীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য) এই দুআটি পাঠ করতেন। اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّنِ الْأَسْقَامِ 'হে আল্লাহ! আমি ধ্বল (শ্বেত) রোগ, উম্মাদনা, কুষ্ঠ রোগ ও সকল প্রকার দূরারোগ্য (মহামারী) থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।' (আবু দাউদ- ১৫৫৪, নাসাঈ-৫৪৯৩, মুসনাদে আহমাদ-১৩০০৪, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদের)
২য় আমল প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর ৭ বার এবং মাগরিবের নামাজের পর ৭ বার এই দুআ পাঠ করবে:
حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ অর্থ: আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তিনিই আরশে আজীমের মালিক। (সূরা তাওবাহ-১২৯, আবু দাউদ-৫০৮৩)
হাদীসের দলিল
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: مَنْ قَالَ إِذَا أَصْبَحَ وَإِذَا أَمْسَى: حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ : سَبْعَ مَرَّاتٍ كَفَاهُ اللَّهُ مَا أَهَمَّهُ صَادِقًا كَانَ بِهَا أَوْ كَاذِبًا অর্থ: হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় ইখলাসের সাথে এই দুআটি-
حَسْبِيَ اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ (আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তিনিই আরশে আজীমের মালিক)। ৭ বার পাঠ করবে, তার সকল প্রকার চিন্তা ও মুসিবত দূর করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন। চাই সে ফযীলতের কথা জেনে পাঠ করুক অথবা এমনিতেই। (সূরা তাওবাহ-১২৯, আবু দাউদ-৫০৮৩)
একটি আশ্চর্য ঘটনা তাফসীরে রুহুল মাআনীতে উল্লেখ আছে: মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব রহ. বর্ণনা করেন যে, একবার একটি ফৌজি কাফেলা রোমের দিকে যাচ্ছিল। তাদের এক ব্যক্তি ঘোড়ার পৃষ্ঠ হতে পড়ে গিয়ে তার উরুর একটি হাড্ডি ভেঙ্গে যায়। কিন্তু সঙ্গীগণ তাকে বহণ করে নেয়ার মতো কোনো কিছু পেলেন না। অতঃপর কিছু খাদ্য-পানীয় ও কিছু সামান-পত্রের ব্যবস্থা করে তাকে সেখানে রেখে সকলে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একজন (গায়েবী) লোক এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন: আমার উরুর হাড্ডি ভেঙ্গে গেছে এবং আমার সাথীগণও আমাকে ফেলে চলে গেছেন। লোকটি বললো, যেখানে ভেঙ্গে গেছে সেখানে হাত রেখে তুমি এই আয়াতটি পাঠ করো: حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ -
"আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত আর কোনো মা'বুদ নেই। আমি তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করলাম, তিনিই আরশে আজীমের মালিক।”
তিনি ক্ষতস্থানে হাত রেখে উক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। এরপর নিজের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে গন্তব্যে ফিরে এলেন। (তাফসীরে রুহুল মাআনী-১১/৫৪)
৩য় আমল
প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর ৩ বার এবং মাগরিবের নামাজের পর ৩ বার এই দুআ পাঠ করবে: اللَّهُمَّ لَا يَأْتِ بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ, وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ, وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া আর কেউ কল্যাণ দিতে পারে না এবং আপনি ছাড়া কেউ অকল্যাণ থেকে রক্ষাও করতে পারে না। আর কল্যাণ লাভ এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তি একমাত্র আপনার হাতেই (অর্থাৎ, আপনার সাহায্য ছাড়া কেউ অমঙ্গল থেকে বাঁচতে পারে না এবং আপনার তাওফিক ছাড়া কেউ ভালো কাজ করতে পারে না)। (আবু দাউদ-৩৯১৯, ৩৯২১)
হাদীসের দলিল عَنْ عُرْوَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ ذُكِرَتِ الطَّيَرَةُ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: أَحْسَنُهَا الْفَأْلُ, وَلَا تَرُدُّ مُسْلِمًا, فَإِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مَا يَكْرَهُ, فَلْيَقُلِ : اللَّهُمَّ لَا يَأْتِ بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ, وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ, وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
অর্থ: হযরত উরওয়াহ ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অশুভ লক্ষণ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হলো। তিনি বললেন: এর মধ্যে ভালো হলো 'ফাল'। অশুভ লক্ষণ কোনো মুসলমানকে ভালো কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। তোমাদের কেউ যখন খারাপ কিছু দেখবে, তখন সে যেন এই দুআ পাঠ করে:
اللَّهُمَّ لَا يَأْتِ بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ ...... وَلَا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ
'হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কেউ কল্যাণ দিতে পারে না এবং আপনি ছাড়া কেউ অকল্যাণ থেকে রক্ষা করতে পারে না। আর কল্যাণ লাভ এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তি একমাত্র আপনার হাতেই (অর্থাৎ, আপনার সাহায্য ছাড়া কেউ অমঙ্গল থেকে বাঁচতে পারে না এবং আপনার তাওফিক ছাড়া কেউ ভালো কাজ করতে পারে না)। (আবু দাউদ-৩৯১৯, ৩৯২১)
৪র্থ আমল: সূরা ফাতিহা ৭ বার পড়ে সমস্ত শরীর মাসেহ করবে
ফজরের নামাজের পর সূরা ফাতিহা বিসমিল্লাহ সহ ৭ বার পড়ে দুই হাত কোষবদ্ধ করে ফু দিয়ে সমস্ত শরীর মাসেহ করবে এবং পানিতে দম করে পান করবে ও গোসল করবে। সম্ভব হলে সাতদিন এরূপ করবে। ইনশাআল্লাহ করোনা ভাইরাস সহ যেকোনো কঠিন রোগ থেকে আল্লাহ হেফাজত করবেন।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (١) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (۲) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (۳) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (٤) اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (٥) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ (٦) غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ (۷)
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের রব * যিনি দয়াময়, পরম দয়ালু * যিনি বিচার দিবসের মালিক * আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই সাহায্য চাই * আমাদেরকে সরল পথ দেখান * তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন * তাদের পথ নয়, যাদের উপর আপনার ক্রোধ আপতিত এবং যারা পথভ্রষ্ট।
হাদীসের দলিল সূরা ফাতিহার অপর নাম সূরাতুশ শিফা। শিফা অর্থ রোগমুক্তি। হযরত সাহাবায়ে কিরামের নিয়ম ছিলো তারা কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে সূরা ফাতিহা পড়ে দম করতেন এবং এতেই আল্লাহ তায়ালা সুস্থ করে দিতেন। এমর্মে সহীহ বুখারীতে একটি দীর্ঘ হাদীস উল্লেখ আছে-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: انْطَلَقَ نَفَرٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفْرَةٍ سَافَرُوهَا، حَتَّى نَزَلُوا عَلَى حَدٍ مِنْ أَحْيَاءِ العَرَبِ. فَاسْتَضَافُوهُمْ فَأَبَوْا أَنْ يُضَيِّفُوهُمْ ، فَلُدِغَ سَيِّدُ ذَلِكَ الحَيِّ، فَسَعَوْا لَهُ بِكُلِّ شَيْءٍ لَا يَنْفَعُهُ شَيْء ...... اقْسِمُوا، وَاضْرِبُوا لِي مَعَكُمْ سَهُمَا فَضَحِكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
অর্থ: হযরত আবু সাঈদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৩০ জন সাহাবীর একটি কাফেলা কোথাও সফরে যান। সেখানকার অধিবাসীরা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকৃতি জানায়। ঘটনাক্রমে তখন তাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করে। অধিবাসীরা তার আরোগ্যর জন্যে সব ধরনের চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই উপকার হলো না। তখন তাদের কেউ বললো, এ কাফেলায় যারা এসেছে হয়তো তাদের কেউ এর চিকিৎসা দিতে পারবে। তখন তারা কাফেলার কাছে গিয়ে বললো, হে যাত্রীদল। আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব ধরণের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কাছে এর চিকিৎসা আছে কি? সাহাবীদের একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা তা করোনি। সুতরাং আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করবো না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্যে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে। তখন তারা এক পাল (ত্রিশটি) বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলো। তারপর তিনি গিয়ে (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ العَالَمِينَ .......)সূরা ফাতিহা) পাঠ করে দম (ফুঁ) দিতে লাগলেন। ফলে সে এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠলো যেন বন্ধন থেকে মুক্ত হলো এবং সে এমনভাবে চলতে লাগল যেন তার কোনো কষ্টই ছিলো না। তারপর তারা তাদের পারিশ্রমিক পুরোপুরি প্রদান করলো। সাহাবীদের কেউ কেউ বললেন, এগুলো বণ্টন করে দাও। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন, তিনি বললেন, নবী কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত না করা পর্যন্ত আমরা কিছুই করবো না। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কিভাবে অবগত হলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দুআ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। এগুলো বণ্টন করো এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখো। এ বলে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু মুচকি হাসলেন। (বুখারী-২২৭৬, ৫০০৭, ৫৭৩৬, ৫৭৪৯, ইফা.-২১৩২, মুসলিম-২২০১, তিরমিযী-২০৬৩, আবু দাউদ-৩৪১৮, ৩৯০০, ইবনে মাজাহ-২১৫৬, আহমাদ-১০৬৭৬, ১১০০৬, ১১০৮০, ১১৩৭৮, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
মাসআলা: এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ বলেন যে, কুরআন-হাদীস পড়িয়ে অর্থাৎ মাদরাসায় শিক্ষকতা করে, মসজিদে আযান দিয়ে ও ইমামতি করে ইমাম-মুয়াজ্জিনগণ পারিশ্রমিক (বেতন-ভাতা) গ্রহণ করতে পারবেন। এটা তাকওয়ার পরিপন্থী হবে না। তারা বলেন, প্রাচীনযুগে বাইতুল মাল থেকে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু সেই ব্যবস্থা নেই, তাই জনসাধারণের উপরই তাদের দায়িত্ব বর্তাবে। (তোহফাতুল বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী-৩য় খণ্ড)
নোট: তিরমিযীর এক বর্ণনায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি সেই সত্তার কসম করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন-মরণ, সূরা ফাতিহার দৃষ্টান্ত তাওরাত, ইনজীল ও যাবুরসহ কোনো আসমানী কিতাবেই নেই, এমনকি পবিত্র কুরআনেও এর দৃষ্টান্ত নেই। তিনি আরো বলেছেন, 'সূরা ফাতিহা' প্রত্যেক রোগের মহৌষধ (very efficacious drug)। (তিরমিযী, তাফসীরে মাজহারী)
৫ম আমল: ৬টি আয়াতে শিফা পড়ে পানিতে ফুঁক দিবে পবিত্র কুরআনে ৬টি আয়াতে শিফা রয়েছে। সেই ৬ টি আয়াত পড়ে শরীর মাসেহ করলে এবং পানিতে দম করে তা সেবন ও গোসল করলে আল্লাহর মেহেরবানীতে যেকোনো কঠিন থেকে কঠিন রোগও দূর হয়ে যায়। আয়াতে শিফা-১
يَأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَّوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَاءُ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (سورة يونس: ٥٧) আয়াতে শিফা-২
يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاء لِلنَّاسِ (سورة نحل : ٦٩)
আয়াতে শিফা-৩ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّلِمِينَ إِلَّا خَسَارًا ( سورة بني اسرائيل: ۸২)
আয়াতে শিফা-৪ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ (سورة التوبة :)
আয়াতে শিফা-৫ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (سورة شعراء :)
আয়াতে শিফা-৬ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ (سورة حم السجدة :)
৬ষ্ঠ আমল: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল
পূর্বেও বলেছি যে, 'করোনাভাইরাস ও অন্যান্য মহামারী আমাদেরই হাতের কামাই। আমাদের পাপের কারণেই আল্লাহ পাক এই 'আযাব' নাযিল করেছেন। এর থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হচ্ছে যিনি এই আযাব নাযিল করেছেন তাঁর দিকেই রুজু হওয়া। তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, খাঁটি অন্তরে তাওবাহ-কান্নাকাটি করা, অতীতের পাপসমূহ বর্জন করার পাক্কা ইরাদা করা, ভবিষ্যতে আর কখনো পাপ না করার অঙ্গীকার করা এবং বাকী জীবন আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের তরিকা মোতাবেক চলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এ ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই। পবিত্র কুরআনেও সেই কথা বলা হয়েছে যে, “মানুষের পাপের কারণেই জলে-স্থলে আল্লাহ আযাব নাযিল করেন, যাতে মানুষ সতর্ক হয় এবং لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ তাঁর কাছেই ফিরে আসে। (সূরা রূম-৪১)
আমি আজও জুমআর বয়ানে বলেছি যে, যিনি এই আযাব নাযিল করেছেন, তাঁকেই বলতে হবে এটা উঠিয়ে নেয়ার জন্য। তাঁর কাছেই বিনীত হয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। তাঁর নিকটই বাঁচার আকুতি জানাতে হবে। তিনি ছাড়া আর কেউ-ই এটা ফিরাতে পারবে না।
প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! আমি গতকালও একটি উদাহরণ দিয়েছি যে, আপনি কোনো আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। কিন্তু তার গেইটের কাছে যেতেই একটি বড় কুকুর ঘেউ ঘেউ করে আপনার দিকে ধেয়ে আসলো। এখন আপনি কি করবেন? কুকুরের মোকাবেলা করবেন? নাকি আত্মীয়কে ডেকে বলবেন যে, বিয়াই সাহেব! আপনার কুকুর ঠেকান।
আপনি অবশ্যই জবাব দিবেন যে, আমি কুকুরের মোকাবেলা করতে পারবো না; বরং কুকুরের মালিককে ডেকে বলবো যে, কুকুর থামান। মালিক যদি কুকুরকে ডেকে বলে, হে কুকুর থাম! এ আমার আত্মীয়। তখন এমনিতেই কুকুর থেমে যাবে।
প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! এই 'করোনাভাইরাস' ও অন্যান্য মহামারী আমাদেরই হাতের কামাই। আমাদের অন্যায় ও নাফরমানীর কারণেই আল্লাহ এরূপ আযাব নাযিল করেন। এমর্মে হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাযি. বলেছেন: مَا نَزَلَ بَلَاءُ إِلَّا بِذَنْبٍ وَلَا رُفِعَ إِلَّا بِتَوْبَةٍ অর্থাৎ, যেকোনো আযাবই নাযিল হোক না কেন, তা মানুষের পাপের কারণেই নাযিল হয়। আর তা তাওবাহ ছাড়া উঠিয়ে নেয়া হয় না।
অতএব, এর থেকে বাঁচার একটাই পথ- খাঁটি অন্তরে আল্লাহর নিকট তাওবাহ-কান্নাকাটি করা। যদি আমরা খাঁটি দিলে তাওবাহ-কান্নাকাটি করি এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পাপকাজ না করার পাক্কা ইরাদা করি, ইনশাআল্লাহ, অতিশীঘ্রই আল্লাহ এই আযাব দূর করে দিবেন।
এ কারনেই বলছি যে, প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর ১০০ বার এবং মাগরিব অথবা ইশার নামাজের পর ১০০ বার নিম্নোক্ত তাওবাহ পাঠ করবেন।
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
"আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি ঐ আল্লাহ তায়ালার নিকট, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব-সুপ্রতিষ্ঠিত। আমি তাঁর কাছেই তাওবাহ করছি।” (আবু দাউদ-১৫১৯, তিরমিযী-৩৫৭৭, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদের)
হাদীসের দলিল
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ
অর্থ: ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ করো। কেননা, আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক একশ' বার তাওবাহ করে থাকি। (বুখারী-৬৩০৭, ইফা.-৫৭৫৪, মুসলিম-৭০৩৪, ইফা.-৬৬১৩, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিম)
📄 তাওবার ফযীলত
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ حَدَّثَهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمْ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لا يَحْتَسِبُ
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আবশ্যক করে নেয়, (বেশী বেশী তাওবাহ করে) আল্লাহ তাকে সকল সঙ্কট থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তাকে সকল দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দেন এবং এমন স্থান থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করে দেন, যা সে অনুভবও করতে পারে না। (আবু দাউদ-১৫১৮, আহমাদ-২২৩৪, ইবনে মাজাহ-৩৮১৯, তাবারানী-১০৬৬৫, বায়হাকী-৬৪২১, তারগীব-১১৫৪, হাদীসের শব্দাবলী আবু দাউদের)
📄 তাওবাকারীর কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না
عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ -
অর্থ: হযরত উবায়দা ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: গুনাহ থেকে (খালেসভাবে) তাওবাকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যার কোনো গুনাহ-ই নেই। (ইবনে মাজাহ-৪২৫০ মিশকাত-২৩৬৩, শরহুস সুন্নাহ-১৩০৭, তারগীব-৩১৪৫, তাবারানী-১০২৮১, বায়হাকী-২০৫৬১, হাদীসের শব্দাবলী ইবনে মাজার)
নোট: তাওবার সময় মনে মনে এরূপ খেয়াল করবে যে, আল্লাহ পাক আমার সামনে আসন গ্রহণ করে আছেন। আমি তাঁর কুদরতি কদম মোবারক জড়িয়ে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি কান্নাকাটি করে বলছি, 'হে আমার মালিক! আমি বড় অপরাধী, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি ছাড়া আর কোনো ক্ষমাকারী নেই। এভাবে তাঁর কুদরতি পা জড়িয়ে ধরে কান্না করছি আর বার বার ক্ষমা চাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, এই নিয়মে তাওবাহ করলে তাঁর দুআ কবুল হবেই।
📄 ঘুমের পূর্বে কয়েকটি সুন্নাত ও আদব
আমাকে যদি প্রশ্ন করেন যে, “আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার উপায়” নামক এ কিতাবে 'ঘুমানোর সুন্নাত' লিখলেন কেন? হয়তো এ প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো না, তবে একটি ঘটনা আপনাদেরকে শুনাতে পারবো।
আমার এক চাচাতো ভাই, নাম আকরাম হুসাইন। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। টিপটপ পরিপাটি সংসার। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ঈর্ষণীয়। গত ধানের মৌসুমের কথা। দিনের বেলা স্বামী-স্ত্রী দু'জনই ধান মাড়াই করেছেন। রাতে শোবার সময় স্ত্রীকে বলছেন, আমি তাহাজ্জুদের সময় উঠতে পারলে তোমাকে জাগিয়ে দিবো, আর তুমি আগে উঠলে আমাকে জাগিয়ে তুলবে।
ক্লান্ত দেহ, তাই কেউ-ই তাহাজ্জুদের সময় উঠতে পারেনি। চাচাতো ভাই ঘুম থেকে জেগে দেখেন, জামাআতের আর বেশি বাকি নেই। তাই পাঞ্জাবীটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন এবং যাবারকালে স্ত্রীকে খোঁচা দিয়ে বললেন, "সূর্যোদয়ের আর বেশি বাকি নেই। আমি মসজিদে চলে গেলাম, তুমি দ্রুত উঠে নামাজ পড়ে নাও।”
চাচাতো ভাই মসজিদ থেকে এসেই স্ত্রীর প্রতি ভীষণভাবে রেগে গেলেন। কারণ, সে কাথামুড়া দিয়ে এখানো শুয়ে আছে। তাই কর্কশ ভাষায় তাকে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু সে ডাকে সাড়া দেয় না। এরপর গায়ে ধাক্কা দিতে লাগলেন, উঠো, উঠো.....কিন্তু না, এ যেন আর কখনো উঠবে না। এ তো চিরনিদ্রা। এ নিদ্রা যেন আর কখনো ভাঙ্গবে না। এ দৃষ্টি আর কখনো সন্তানের মায়াবী চেহারা দেখবে না। আহ! এই তো মানুষের যিন্দেগী!
একসাথে একই চাদরের নিচে স্বামী-স্ত্রী দু'জন শুয়ে রইলেন। কিন্তু স্ত্রী কখন তাকে ফাঁকি দিয়ে পরপারে চলে গেল, তা বুঝতেই পারলেন না।