📄 বাইতুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ক’টি বৈশিষ্ট্য
১. পেশাব-পায়খানা করার সময় বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে কিংবা পিঠ দিয়ে বসা হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, 'তোমাদের কেউ যদি পেশাব পায়খানার জন্য উন্মুক্ত মাঠে যায়, সে যেন আল্লাহর কিবলার সম্মান করে এবং কিবলামুখি হয়ে না বসে।'
২. কা'বা শরীফে সিল্কের পর্দা বা গেলাফ ব্যবহার করা জায়েয। ইমাম গাযালী (রাহ.) তাঁর ফতোয়ায় বলেছেন, কুরআন শরীফকে সোনা দিয়ে এবং কা'বা শরীফকে সিল্ক দিয়ে সাজানো জায়েয আছে। কা'বা ব্যতিত অন্য কিছুতে তা জায়েয নেই। পুরুষের জন্য সিল্ক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কা'বা সাজানো উত্তম। আল্লাহ বলেছেন, 'বল আল্লাহর সৌন্দর্যকে হারাম করেছে? বিশেষ করে অহংকার ও গর্ব প্রকাশের জন্য না হলে, স্বাভাবিক সৌন্দর্য প্রকাশের বেলায় তা অবশ্যই জায়েয।
৩. হযরত আয়িশা (রা.) বলেছেন, আমার নিকট কা'বা শরীফে সোনা রূপা উপহার দেয়ার চেয়ে কা'বা শরীফে সুগন্ধি লাগানো অপেক্ষাকৃত বেশী উত্তম। তিনি বলেছেন, তোমরা কা'বা শরীফে সুগন্ধি লাগাও, এটি কা'বাকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার অন্তর্ভুক্ত। এ বলে তিনি কুরআনের একটি নির্দেশের দিকে ইঙ্গিত দেন। সেটি হচ্ছে: 'আমার ঘরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর'। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা.) কা'বা শরীফের ভিতরের সকল অংশে সুগন্ধি মেখেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন যুগে কা'বার বাইরে তওয়াফের ও ভিতরে সুঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া দেয়ার প্রথা চালু ছিল। ভিতরেও সুঘ্রাণযুক্ত ধোয়া দেয়া হত। এতে করে তওয়াফের লোকেদের ভাল হত। দেহ ও মনের খুশি সঞ্চার হত।
৪. আল্লাহ কা'বাকে কুচক্রী ও ধ্বংসাত্মক লোকদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং কা'বা ধ্বংসকারীদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। সূরা ফীলে আবরাহা বাদশাহর হস্তীবাহিনীকে তিনি ধ্বংস করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা এ ঘরের ক্ষতি করতে চাইবে আল্লাহ তাদেরকে উন্মুক্ত ময়দানে ধ্বংস করে দিবেন।'
হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, আমরা শুনে আসছিলাম যে, আসাফ ও নায়েলা জোরহাম গোত্রের দু'জন নারী ও পুরুষ ছিল। তারা কা'বার অঙ্গনে অন্যায় কাজ করায় আল্লাহ তাদেরকে দুটো পাথরে পরিণত করে দিয়েছেন। জাহেলিয়াতের যুগে একজন মেয়েলোক কা'বায় এসে স্বামীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় কামনা করছিল। এক ব্যক্তি তার দিকে খারাপ নিয়তে হাত বাড়ালে, তাঁর হাত অবশ হয়ে যায়। আয্যাওয়ী বলেছেন, সে ব্যক্তিটি ছিল হুয়াইতাব। আমি তাকে ইসলামী যুগেও অবশ দেখেছি। কেননা, সে কা'বার সম্মান রক্ষা করেনি।
এক ব্যক্তি কা'বার তওয়াফ করছিল। তখন তওয়াফে এক সুন্দরী রমণীর খোলা হাত বিদ্যুতের মত চমকাতে দেখে তার হাতের উপর নিজের হাত রেখে যৌনাকর্ষণ উপভোগ করতে লাগলো। এতে দু'জনের হাত এমনভাবে লেগে গেল যে আর খোলা যাচ্ছিল না। ঐ দু'জন অন্য এক নেককার ব্যক্তির কাছে গিয়ে তাদের হাত খোলার জন্য দোয়ার অনুরোধ জানালো। তিনি দু'জনকে তাদের হাত আটকে যাওয়ার ঘটনাটি জিজ্ঞেস করায় তারা তা খুলে বলল। তিনি দু'জনকে উপদেশ দিলেন, তোমরা যে জায়গায় ঐ পাপ কাজটি করেছ সে জায়গায় ফিরে যাও এবং আল্লাহর কাছে তওবা ও অঙ্গীকার কর যে, তোমরা আর কখনও অনুরূপ কাজ করবে না। তারা ঐ রকম তওবা করায়, শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিল।
আরেকটি প্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে, ইয়েমেনের বাদশাহ তুব্ব'র ঘটনা। তাঁর আসল নাম ছিল আসআদ। তিনি প্রাচ্যের কোন দেশে গিয়েছিলেন। মক্কা ও মদীনার পথে স্বদেশে রওনা হন। মদীনা থেকে বিরাট সেনাবাহিনীসহকারে মক্কার দিকে রওনা হলে পথে হোজাইল গোত্রের একটি দলের সাথে তাঁর দেখা হয়। তাঁরা তাকে মক্কার কাবা ধ্বংস করে, এর পরিবর্তে ইয়েমেনে অনুরূপ একটি কাবা তৈরির জন্য উৎসাহিত করে এবং বলে যে, এখন থেকে যদি ইয়েমেনে হজ্জের ব্যবস্থা করা হয়, এতে বাদশাহর আয় ও মর্যাদা বাড়বে এবং তাঁর দেশ পূর্ণ আবাদ হবে। একথা শুনে, বাদশাহ রাজী হন এবং কা'বা শরীফ ভাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু তার কাফেলার একটি পশুও চলল না। ঘোর অন্ধকার নেমে আসল এবং প্রচ ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। বাদশাহ বিভিন্ন রোগ শোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ল এবং তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হল। বাদশার দু'চোখ থেকে পানি বের হল এবং গালের উপর দিয়ে বইতে শুরু করল। তাঁর মাথায় এমন এক বীভৎস রোগ শুরু হল যে, তা থেকে পঁচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হতে লাগল। দুর্গন্ধের কারণে তার কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। তাঁর সাথে যে সকল পাদ্রী ও ডাক্তার ছিল, তারা বাদশাহর রোগ ও বীভৎস দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। মৃত গাধার পঁচা দুর্গন্ধের মতই বাদশার মাথা থেকে পুঁজের দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। তারা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বাইতুল্লাহর ব্যাপারে কোন খারাপ পরিকল্পনার চিন্তা করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তারপর তিনি তাঁর পরিকল্পনা তাদের কাছে প্রকাশ করলেন এবং হোজাইল গোত্রের একদল লোকের পরামর্শ সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করলেন।
এসব শুনে তাঁরা বলল, হোজাইল গোত্র আপনাকে, আপনার সেনাবানিীকে এবং আপনার সাথে আরো যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়েছেন। এটি হচ্ছে আল্লাহর ঘর। কেউ এ ঘরের ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেই ছাড়েন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন এখন উপায় কি? তারা জবাবে বলল, এখন আপনি এ ঘরের কল্যাণ কামনা করুন, এর সম্মান করুন, এতে গিলাফ পরান, এ ঘরের কাছে কুরবানী করুন এবং এ ঘরের অধিবাসীদের সাথে ভাল ব্যবহার করুন। বাদশাহ তাই করলেন। ফলে অন্ধকার চলে গেল, ঝড় বন্ধ হয়ে গেল, সওয়ারী পশুগুলো চলা শুরু করল, রাজার চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে এলো, তার মাথা সুস্থ হয়ে উঠলো। বাদশাহ খারাপ নিয়ত থেকে তওবা করলেন এবং সেনাবাহিনীকে ইয়েমেনের দিকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নিজে মক্কায় কিছুদিন থাকলেন এবং প্রত্যেক দিন একশত উট কুরবানী করে মক্কার বাসিন্দাদেরকে খাওয়ালেন। তিনি কা'বা শরীফে গিলাফ পরালেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সাতশত বছর আগে এ ঘটনা ঘটেছিল। আল্লাহ তাঁর ঘরকে যে কোন যালিমের হাত থেকে রক্ষা এবং একে সর্বাবস্থায় সুরক্ষিত রাখেন। এজন্য এ ঘরের অপর নাম হচ্ছে 'আতীক'। কেউ এ ঘর ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ কুরআন মাজীদে বলেছেন, 'কেউ অন্যায়ভাবে এতে কুফরী করলে, আমি তাদেরকে কষ্টদায়ক আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাব'।
৫. যে ব্যক্তি কাবা শরীফকে স্বপ্নে দেখবে, তার সে স্বপ্ন সঠিক, (তাবারানী)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে আমাকে ঠিকই দেখে কেননা শয়তান আমার এবং কা'বার ছবি ধারণ করতে পারে না অর্থাৎ শয়তান এ দুটো জিনিসের রূপ ধারণ করতে পারে না।
৬. কা'বা শরীফ একটি আবাদকৃত ঘর। মানুষ তওয়াফের মাধ্যমে সর্বদা একে আবাদ করে। মুহাম্মদ বিন আব্বাস বিন জাফর কিবলার দিকে মুখ করে বলতেন, 'আমার রব এর একটি মাত্র ঘর, কি সুন্দর, তিনি মনোরম! আল্লাহর শপথ, এটি আবাদকৃত ঘর'। কেউ কেউ বলেছেন, বাইতুল মা'মুর হচ্ছে সে ঘর যা হযরত আদম (আ.) প্রথমেই দুনিয়ায় এসে নির্মাণ করেন। হযরত নূহ (আ.) এর প্লাবনের সময় সে ঘরটিকে আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং দৈনিক ৭০ হাজার ফিরিশতা এর তওয়াফ করে। আরবীতে, (ফিরিশতা) শব্দের একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে দূরে অবস্থানকারী। ফিরিশতাদের তওয়াফের ঘর যমীন থেকে আসমানে সরিয়ে দেয়ার কারণে, ফিরিশতারাই যেন দূরে সরে গেল। তাই তাদেরকে দূরে অবস্থানকারী' বলা হয়। আবু তোফায়েল (রা.) বলেন, হযরত আলীকে (রা.) 'বাইতুল মামুর' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, সেটাতো কা'বা শরীফ বরাবর দূরে অবস্থিত। এতে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং তাঁরা এতে কিয়ামত পর্যন্ত ২য় বার আর প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। 'বাইতুল মামুর' কোন আসমানে অবস্থিত তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, প্রথম আসমানে, কারো মতে, ৪র্থ আসমানে, কারো মতে, ৬ষ্ঠ আসমানে, কারো মতে, ৭ম আসমানে এবং কেউ কেউ অন্যমত পোষণ করেন। বুখারীতে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি বাইতুল মা'মুরে ৭০ হাজার ফিরিশতাকে প্রবেশ করতে দেখেছেন এবং তাঁরা এতে আর ২য় বার ফিরে আসবে না।' এইভাবে প্রত্যেকদিন ৭০ হাজার ফিরিশতা এ ঘরে আসে।
৭. ইবনে হিশাম তাঁর সীরাতুন্নবী বইতে লিখেছেন, হযরত নূহ (আ.) এর সময়ের বন্যার পানিতে কা'বা শরীফের আশ-পাশ পানিতে ডুবে গেলে, কা'বা শরীফ আসমানের নীচে বাতাসের মাঝে শূন্যে বিরাজ করতে থাকে। তখন হযরত নূহ (আ.) এর নৌকা কা'বা শরীফের চার দিকে তওয়াফ করতে থাকে। নূহ (আ.) নৌকার যাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, "তোমরা আল্লাহর হারামে এবং আল্লাহর ঘরের পার্শ্বে আছ, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য ইহরাম কর এবং কেউ যেন কোন মেয়েলোক স্পর্শ না করে। তিনি পুরুষ ও মেয়েলোকের মাঝখানে পর্দা করে দিলেন।
৮. হাশরের দিন কা'বা শরীফকে বিবাহিতা সুসজ্জিতা কনের মত উঠানো হবে। যত লোক হজ্জ করেছে তাঁরা এর গিলাফ ধরে থাকবে এবং এর চতুষ্পার্শ্বে চলতে থাকবে যে পর্যন্ত না কা'বা শরীফ জান্নাতে প্রবেশ করে। তখন তারা সবাই একই সাথে বেহেশতে প্রবেশ করবে। ইমাম গাযালী এহইয়াউল উলুম গ্রন্থে এ হাদীসটিকে 'বাইতুল্লাহ ও মক্কার ফযীলত' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।
৯. এ ঘর সৃষ্টির পর থেকে এর ইবাদত এবং তওয়াফ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ নেই। মানুষ, জীন কিংবা ফিরিশতাদের অনেকেই সর্বদা এর তওয়াফ করেই যাচ্ছে।
📄 হিজরে ইসমাইলের/হাতীমের মর্যাদা
বিশুদ্ধ ও মশহুর রেওয়াতে বর্ণিত আছে, কুরাইশরা অর্থাভাবে কা'বা নির্মাণের সময় উত্তর পার্শ্বে সাড়ে ছয় হাত কা'বার অংশ ছেড়ে দেয় এবং সে অংশটুকু হিজরে ইসমাঈলের সাথে যোগ করে দেয়। হিজরে ইসমাঈলের অপর নাম হচ্ছে হাতীমে কা'বা। হাতীম শব্দের অর্থ হচ্ছে ভাঙ্গা বা ভগ্নাংশ। হাতীমে কা'বার অর্থ হচ্ছে কা'বার ভগ্নাংশ তথা কাবার বাইরের অবশিষ্টাংশ। আযরাকী বর্ণনা করেছেন যে, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহীম এবং যমযম কূপের মধ্যবর্তী স্থানকে হাতীম বলা হয়। এখানে দোয়া কবুল হয় বলে লোকেরা বেশী ভিড় করে। অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ইসমাঈল (আ.) কে হিজরে ইসমাঈলে দাফন করা হয়েছে। তিনি ১৩০ বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর মা হাজেরাকেও একই স্থানে দাফন করা হয়েছে। হিজরে ইসমাঈলে হযরত ইসমাঈল (আ.) এবং হযরত হাজেরার কবর সম্পর্কে, ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর তাবারী এবং ইবনে কাসীর প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি একবার বাইতুল্লাহর ভেতর ঢুকে নামায পড়তে চেয়েছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে হিজরে ইসমাঈলে প্রবেশ করিয়ে দেন এবং বলেন, "এখানেই নামায পড়, যদি তুমি কা'বার ভেতর নামায পড়তে চাও; কেননা, এটি কা'বারই অংশ বিশেষ।" হযরত আলী বিন আবী তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "হিজরে ইসমাঈলের এক দরজায় একজন ফিরিশতা দাঁড়িয়ে এতে প্রবেশ করে দু'রাকাত নামায আদায়কারী লোকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, 'তোমার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা হয়ে গেছে; এখন থেকে নতুনভাবে আ'মল কর।' এর অন্য দরজায় দুনিয়া সৃষ্টির পর থেকে কিয়ামতের সময় ঐ ঘর উঠিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত দণ্ডায়মান আরেকজন ফিরিশতা, নামায শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, সকল মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যদি তুমি উম্মতে মুহাম্মদের সত্যিকার অনুসারী হও, তাহলে তুমি রহমতপ্রাপ্ত।
📄 যমযম কূপের ইতিহাস
যমযম কূপ হলেও তার সেবা ও পানি একটি নদীর সমান। নদীর অসীম পানির মতই যমযমের পানি গোটা দুনিয়ায় পান করা হচ্ছে এবং হাজীরা দূর থেকে দুরান্তে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে হজ্জ মওসুমে প্রতিদিন ১৯ লাখ লিটার যমযমের পানি সেবন করা হয়। দুনিয়ার অন্য যে কোন কূপ থেকে এর উৎপাদন ও সরবরাহ অপন্দনীয় ও বহুগুনে বেশী। ফাকেহী উল্লেখ করেন যে, যমযম কূপ আবিষ্কারের পর হযরত ইবরাহীম (আ.) তা খনন করে একে প্রশস্ত করে কূপের রূপ দান করেন। তখন তাঁর সাথে জুলকারনাইনের সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয়। জুলকারনাইন কূপটির দখল নিয়ে নেন। এরপর ঘটনার বর্ণনাকরী উসমান বলেন, সম্ভবতঃ জুলকারনাইন, ইব্রাহীম (আ.) এর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। ইব্রাহীম (আ.) বলেন, এটা কিভাবে হয়? তোমরা আমার কূপটি নষ্ট করেছ। জুলকারনাইন বলেন, সেটা আমার হুকুমে হয়নি। এরপর দু'জনের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইব্রাহীম (আ.) জুলকারনাইনকে ৭টি ভেড়াসহ কয়েকটি গরু উপহার দেন। জুলকারনাইন জিজ্ঞেস করেন, হে ইব্রাহীম! ভেড়াগুলো কেন উপহার দিচ্ছেন? তখন হযরত ইব্রাহীম জবাব দেন, এগুলো কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দেবে যে এটি হচ্ছে ইব্রাহীমের কূপ। বাইবেলে বলা হয়েছে যে, হযরত ইসমাঈল (আ.) খৃষ্টপূর্ব ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের বছরই ইব্রাহীম (আ.) ইসমাঈল (আ.) এবং হাজেরাকে (আ.) মক্কায় নির্বাসনে রেখে যান। সে বছরেই যমযম কূপের আবির্ভাব হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের ২৫৭২ বছর পূর্বে যমযম কূপের আবির্ভাব ঘটে। এ হিসাব অনুযায়ী এখন থেকে প্রায় ৪ হাজার বছর আগে যমযম কূপের উৎপত্তি হয়। এ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যমযম কূপের ইতিহাসে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে এবং যমযমের পানি সরবরাহের ব্যাপারে বহু পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া গৃহীত হয়েছে।
মক্কায় যমযম কূপের অস্তিত্বের কারণে, ইয়েমেন ও জোরহোম গোত্রের কিছুসংখ্যক লোক হযরত হাজেরার অনুমতিক্রমে এবং যমযম কূপের উপর তাঁর মালিকানার স্বীকৃতির শর্তে মক্কায় বসবাস শুরু করে। পরে ইসমাঈল (আ.) বড় হন এবং জোরহোম গোত্রে বিয়ে করেন। তারপর থেকে জোরহোম গোত্র 'যমযম' কূপসহ মক্কার শাসনভার পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন যাবত তথা যমযম কূপের সূচনালগ্ন থেকেই তারা যমযম কূপের পানি পান করতে থাকেন। এক পর্যায়ে যমযম কূপ শুকিয়ে যায় ও মাটির নীচে চাপা পড়ে যায় এবং এর সকল চিহ্ন বা নিদর্শন বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কুরাইশ গোত্রের মধ্যে ১৫টি দায়িত্বপূর্ণ পদ ছিল। ঐ সকল দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কুরাইশরা নিজেদের এবং হাজীদের সেবা করত। এর মধ্যে 'কা'বার সেবক' এ পদটি সবচাইতে বেশী সম্মানিত ছিল। কা'বার সেবকের কাছে কা'বার দরজার চাবি থাকত। তিনি লোকদের জন্য কা'বার দরজা খুলতেন এবং বন্ধ করতেন। ২য় গুরুত্বপূর্ণ পদটি ছিল পানি 'পান করানো'। হাজীদের পানি পান করানো খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। কেননা, মক্কার পানি স্বল্পতার কারণে, এ দায়িত্ব পালনকারী বনি হাশেম বিন আবদে মন্নাফ গোত্রকে কা'বার পার্শ্বে চামড়ার মশকে পানি জমা করতে হত এবং ঐ সকল পানি মক্কার বাইরে থেকে উটের পিঠে বহন করে আনতে হত। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের উপর অর্পিত হাজীদের পানি 'পান করানো' দায়িত্ব তিনি এতো যোগ্যতার সাথে পালন করেন, যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। এর ফলে তাঁর সম্মান ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তখন পর্যন্ত যমযম কূপ অনাবিষ্কৃত থাকে। কিন্তু পরে তিনি স্বপ্নে যমযমের অবস্থান সংক্রান্ত লক্ষণের উপর ভিত্তি করে তা খুঁড়ে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এতে করে তাঁর সুনাম ও যোগ্যতা আরো অনেক বৃদ্ধি পায়।
আযরাকী আবদুল মুত্তালিবের যমযম কূপ সংক্রান্ত স্বপ্নটি বর্ণনা করে বলেন, আবদুল মুত্তালিবের বড় ছেলে হারেস বড় হওয়ার পর আবদুল মুত্তালিব রাতে স্বপ্নে দেখেন যে, কেউ তাকে নির্দেশ দিচ্ছে, 'কা'বার সামনে অবস্থিত মূর্তি বরাবর পিঁপড়ার বসতিতে ময়লা ও রক্তের মাঝে কাকের ঠোকরে সৃষ্ট ছিদ্রের মধ্যে খনন করে যমযম কূপ আবিষ্কার হবে।' তিনি মসজিদে হারামে যান এবং স্বপ্নের লক্ষণগুলো দেখার জন্য সেখানে অপেক্ষা করেন। তখন মসজিদে হারামের বাইরে হাযওয়ারা নামক স্থানে একটি গাভী যবেহ করা হয়। গাভীটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে কসাই-এর কাছ থেকে ছুটে যমযমের স্থানে এসে পড়তে সক্ষম হয়। পরে কসাই সেখানেই গাভীটির যবেহ কাজ সমাপ্ত করে এবং গোশত বহন করে নিয়ে যায়। তখন একটি কাক এসে গাভীর ময়লার উপর বসে এবং পিঁপড়ার বাসা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
এ সকল লক্ষণ দেখার পর আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ খনন শুরু করেন। খনন কাজ দেখে কুরাইশরা আবদুল মুত্তালিবের কাছে ছুটে আসে এবং বলে, আমরা তো আপনাকে মূর্খ মনে করি না; কিন্তু আপনি কেন আমাদের মসজিদে হারামের কাছে খনন কাজ করে মসজিদটিকে নষ্ট করছেন? আবদুল মুত্তালিব জবাব দেন, আমি একাজ অব্যাহত রাখবো এবং কেউ আমাকে বাধা দিলে তার মুকাবিলা করবো। তিনি তাঁর একমাত্র ছেলে হারেসকে নিয়ে খনন কাজ অব্যাহত রাখায় কুরাইশরা তাঁর সাথে ঝগড়া শুরু করে। কিছু সংখ্যক কুরাইশ তাঁর যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও বংশের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে বিরোধীদেরকে বিরত রাখে। শেষ পর্যন্ত তিনি কূপটি খনন করতে সক্ষম হন। কূপটি খনন করার সময়কার বাধা-বিপত্তি এবং কষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি তা সহজ করার জন্য আল্লাহর কাছে মান্নত করেন যে, যদি তার ১০টি ছেলে সন্তান হয় তাহলে তিনি একটিকে আল্লাহর নামে কুরবানী করবেন। এরপর আবদুল মুত্তালিব কয়েকটি বিয়ে করেন এবং ১০টি ছেলে-সন্তান লাভ করেন। তিনি আল্লাহর কাছে বলেন, হে আল্লাহ! আমি আমার এক সন্তানকে তোমার উদ্দেশ্যে কুরবানী করার মান্নত করেছিলাম। এখন আমি তাদের মধ্যে লটারী দিয়ে ঠিক করবো যে, কাকে কুরবানী করবো। তুমি তোমার পছন্দ অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রহণ কর। লটারীতে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় সন্তান আবদুল্লাহর নাম উঠে। তারপর আবদুল মুত্তালিব বলেন, হে আল্লাহ! তুমি আবদুল্লাহ এবং একশত উটের মধ্যে যেটাকে পছন্দ কর সেটাকে গ্রহণ কর। তারপর এর মধ্যে লটারীতে পর্যায়ক্রমে একশত উট উঠায় আবদুল মুত্তালিব ১০০ উট কুরবানী করেন। এভাবে আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মদাতা পিতাকে হিফাযত করেন এবং তার ঔরসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মকে সুনিশ্চিত করেন। আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে পরবর্তীতে যমযম কূপের সংস্কার করেছিলেন।
📄 যমযমের পানির বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত
ওহাব বিন মোনাব্বিহ (রাহ) যমযম সম্পর্কে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহর কিতাবে লিখিত আছে এটি উত্তম, কল্যাণকর, নেককারদের পানীয়, ক্ষুধা নিবৃত্তকারী এবং রোগের চিকিৎসা। ইবনে খায়সাম বর্ণনা করেছেন, একবার ওহাব বিন মোনাব্বিহ (রা.) আমাদের কাছে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে ছিল কিছু যমযমের পানি। আমরা বললাম, আপনি কিছু মিষ্টি পানি (স্বাভাবিক পানি) কেন পান করছেন না? যমযমের পানি তো বেশ লবণাক্ত। তখন তিনি জবাব দেন, আমার অসুখ ভালো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অন্য কোন পানি পান করবো না।
যার হাতে ওহাবের প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, আল্লাহর কিতাবে এটি যমযম হিসেবে লিখিত; এটি কখনও শুকাবে না এবং ক্ষতিকর হবে না; এটি আল্লাহর কিতাবে উপকারী এবং নেককার লোকদের পানি হিসেবে লিখিত আছে এটি আল্লাহর কিতাবে উত্তম বলে বিবেচিত; ক্ষুধা নিবারণ এবং রোগের চিকিৎসা হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। ওহাবের প্রাণ যে সত্তার হাতে, তাঁর শপথ করে বলছি, কেউ যদি পেট ভর্তি করে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ত করে তা পান করে, অবশ্যই তাঁর রোগের চিকিৎসা হবে এবং সে রোগমুক্ত হবে। মুজাহিদ (রা.) বলেন, যমযমের পানি যে যে নিয়তে পান করবে তাঁর সে নিয়ত পূরণ হবে; তুমি যদি রোগমুক্তির জন্য তা পান কর তাহলে, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। যদি তুমি পিপাসা মিটাবার জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ তোমার পিপাসা পূরণ করবেন। যদি তুমি ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে পান কর, তাহলে আল্লাহ তোমার ক্ষুধা দূর করে তৃপ্তি দান করবেন। এটি জিব্রাঈলের পায়ের গোঁড়ালীর আঘাতে হযরত ইসমাঈল (আ.) এর পানীয় হিসেবে তৈরী হয়েছে।
ইবনে আবী হুসাইন বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোহাইল বিন আমরের কাছে যমযমের পানি উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। ইকরামা বিন খালিদ বলেন, একদিন গভীর রাতে আমি যমযমের পার্শ্বে বসা ছিলাম। তখন একদল সাদা কাপড় পরিহিত লোক কা'বার তওয়াফ করছিলেন। এমন ধবধবে সাদা কাপড় আমি আর কখনও দেখিনি। তওয়াফ শেষে তাঁরা আমার কাছে নামায পড়লেন এবং একজন তাঁর অন্য সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, চল আমরা নেক লোকের পানীয় পান করি। তাঁরা যমযমে প্রবেশ করলেন। আমি ভাবলাম, আমি তো তাঁদেরকে তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারি। তারপর আমি তাদের কাছে গেলাম, দেখলাম সেখানে কোন মানুষের নাম গন্ধও নেই (আযরাকী)। হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাহেলিয়াতের সময় লোকেরা একবার ভীষণ অভাবের সম্মুখীন হয়। ফলে খাবার সংগ্রহ তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তখন লোকেরা যমযমের পানির জন্য ছুটে আসে, পরিবারসমূহ শিশুদেরকে নিয়ে ভোরে যমযমে হাজির হত। তখন শিশুদের বাঁচানোর জন্য যমযমকে একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হত। হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যমযমের পানি যে, যে নিয়তে পান করবে তার সে নিয়ত পূরণ হবে।' (ইবনে মাজাহ) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যমযমের পানি যে, যে মকসুদে পান করবে, তার সে মকসুদ পূরণ হবে; যদি তুমি এ পানি রোগমুক্তির জন্য পান কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন; যদি তুমি পিপাসা মিটাবার জন্য এ পানি পান কর তাহলে আল্লাহ তোমার পিপাসা দূর করবেন; এটি জিবাঈলের পায়ের আঘাতে ইসমাঈলের পানীয় হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'পেট ভর্তি করে যমযমের পানি পান করা মুনাফিকী থেকে মুক্তির কারণ।'
হযরত আবু জর গিফারী (রা.) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নবুওয়াতের খবর জানতে পেরে তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে নিজ গোত্র থেকে মক্কায় রওনা হন। মক্কায় এসে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করলে কাফিররা তাঁকে পাথর মেরে বেহুশ করে ফেলে এবং তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি যমযমের কাছে গিয়ে পানি দিয়ে রক্ত ধুয়ে ফেললাম এবং যমযমের পানি পান করলাম। আমি সেখানে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষায় ৩০ দিন (অন্য রেওয়ায়েতে ১৪ দিন) অবস্থান করি। কিন্তু সেখানে যমযম ছাড়া আমার অন্য কোন খাবার ছিল না। অথচ, আমি মোটাসোটা হয়ে গেলাম এবং পেটের চামড়া ভাজ পড়ে গেল। এমনকি আমি পেটে সামান্য ক্ষুধাও অনুভব করতাম না। দীর্ঘ একমাস কা'বার পার্শ্বে ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁকে বুঝতে পেরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এতোদিন এখানে কি খেয়েছিলে? তিনি জবাব দিলেন, আমি যমযমের পানি পান করা ছাড়া আর কিছুই খাইনি। এতে আমি মোটা হয়ে গেছি এবং আমার পেটের চামড়ার উপরে ভাঁজ পড়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এটি ক্ষুধার সময় খাবারের কাজ করে।' সহীহ ইবনে হিব্বানে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন : 'যমীনের উপর সর্বোত্তম পানি হচ্ছে যমযমের পানি।'
হযরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত জিব্রাঈল (আ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুক চিরে হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড বের করে এনে সোনার প্লেটে রাখেন। সেখান থেকে একটি রক্তের চাকা ফেলে দিয়ে বলেন, এটি তোমার মধ্যে শয়তানের একটি অংশ ছিল। তারপর যমযমের পানি দিয়ে হৃৎপিণ্ড ধুয়ে তিনি তা যথাস্থানে রেখে দেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঠে তাঁর অন্য সাথীদের সাথে খেলাধুলা করছিলেন। হাফেয ইরাকী বলেছেন, যমযমের পানি দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্ষদেশ ধোয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনি যেন আসমান-যমীন এবং বেহেশত-দোযখ দেখার মত শক্তি লাভ করেন। কেননা, যমযমের পানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা অন্তরকে শক্তিশালী ও ভয় মুক্ত করে। যমযমের পানির আরেক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে যমযমের পানি দ্বারা জ্বর দূর হয়েছে। নাসাঈ শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। দাহ্হাক বিন মোযাহেম বলেন, মাথা-ব্যথার সময় যমযমের পানি পান করলে মাথা-ব্যথা দূর হয় এবং যমযমের দিকে তাকালে দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়।
ইবনে বদরুদ্দিন বিন সাহেব মিশরী বলেছেন, শরীয়াহ এবং চিকিৎসার দৃষ্টিতে, যমযমের পানি পৃথিবীর যে কোন পানির চাইতে উত্তম। তিনি বলেন, আমি যমযমের পানি এবং মক্কার অন্য কূপের সমপরিমাণ পানি ওজন করে দেখেছি, যমযমের পানির ওজন বেশী। কথিত আছে যে, শাবান মাসের রাতে যমযমের পানি মিষ্টি হয়ে যায় এবং তা নেককার লোক ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না। ওয়াহেদী তাঁর তাফসীরে হযরত জাবের (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কা'বা শরীফে সাত চক্কর তওয়াফ করবে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়বে এবং যমযম কূপের পানি পান করবে, তাঁর গুনাহ যত বেশী হোক না কেন তা মাফ হয়ে যাবে। যমযমের উৎপত্তি হয়েছে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ছেলে ইসমাঈলের (আ.) সাহায্যের জন্য। আজও যদি কেউ ইখলাসের সাথে সে পানি ব্যবহার করে তাহলে সেও আল্লাহর সাহায্য লাভ করবে। হাকীম, তিরমিযী বলেন, যমযমের পানি থেকে উপকার পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে নিয়তের গভীরতা ও পরিপক্বতার উপর। খালেস নিয়তে এ পানি ব্যবহার করলে তাঁর উপকার অবশ্যম্ভাবী।
যমযমের পানির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচিত হচ্ছে:
১. আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে এ উষর মরুভূমিতে আল্লাহর হুকুমে জিব্রাঈল (আ.) হযরত ইসমাঈল (আ.) এর জন্য এ কূপটি বের করেন।
২. এটি কা'বা এবং মহান নিদর্শন সাফা-মারওয়ার দিক থেকে উৎসারিত।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করার পর মক্কা থেকে যমযমের পানি মদীনায় পাঠানোর জন্য বলেন।
৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পানি উদর ভর্তি করে পান করার জন্য উৎসাহিত করেন।
৫. যমযমের পানি খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা এবং অন্য যে কোন নিয়তে পান করা হবে, তা পূরণ হবে মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একাধিক হাদীস বর্ণিত আছে।
৬. হযরত জিব্রাঈল (আ.) যমযমের পানি দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুক চিরে হৃৎপিণ্ড/হৃদয় ধুয়েছেন।
৭. বহু সংখ্যক নবী, নেক বান্দাহ, আলেম, ইমাম ও বুজুর্গানে দ্বীন এ পানি পান করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত মানুষ এ পানি পান করবেন। যমযমের পানির রং অন্য পানির রং এর মত হওয়া সত্ত্বেও এর পানি অন্য যে কোন পানির চাইতে ভিন্ন। এর রয়েছে অগণিত কল্যাণ ও উপকার। প্রশ্ন হচ্ছে, রোগ জীবাণু কি এ যুগেই প্রবেশ করেছে, না আগেও ছিল? অতীতে যমযমের পানি পান করার কারণে লোক অসুস্থ হয়েছে বলে কোন প্রমাণ নেই। বরং অতীতে, লোকেরা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনকে সামনে রেখে যমযমের পানি পান করে উপকার পেয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান যুগেও যারা অনুরূপ নিয়ত করে যমযমের পানি পান করছে তারাও সমান উপকার পাচ্ছে। এখনও যে কোন লোক তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। অথচ অতীত থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যমযমের পানি পান করার কারণে ক্ষতি হওয়ার কোন রেকর্ড নেই। যদি ধরেও নেয়া হয় যে, বন্যা বা বৃষ্টির পানিতে এতে রোগ জীবাণু প্রবেশ করেছে, তথাপি সেটা আল্লাহর কুদরতী কূপে তারই ইশারায় নষ্ট হয়ে যায়। এতে যমযমের পানির উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি এবং পড়বেও না।
৮. ইতিহাসে উল্লেখ বেদুঈনরা তাদের যেসব পশুকে নিয়ে যমযমের পানি পান করাতো; সেই সকল পশুর গায়ে কোন মারাত্মক রোগ ছিল না। কিন্তু তার পরও যমযমের পানি দূষিত হয়নি বরং তা সবার জন্য উপকারীই প্রমাণিত হয়েছে। এটা হচ্ছে আগের যুগের কথা, যখন যমযম কূপের পরিচ্ছন্নতার মজবুত ব্যবস্থা ছিল না। অবশ্যই বর্তমান যুগে এর সুষ্ঠু পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।