📄 মক্কার ইতিহাস
মক্কার অনেক ফযীলত রয়েছে। নাসায়ী, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ বিন আদী বিন হামরা থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কায় সওয়ারীর উপর আরোহণ করা অবস্থায় মক্কাকে লক্ষ্য করে বলতে শুনেছি, "আল্লাহর শপথ, তুমি আল্লাহর যমীনের মধ্যে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ। যদি আমাকে তোমার কাছ থেকে বের করে দেয়া না হত, তাহলে আমি কিছুতেই বের হতাম না।" ইমাম তিরমিযী এ হাদীসকে হাসান বা উত্তম বলেছেন।
নাসায়ী গ্রন্থে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযওয়ারা নামক বাজারে বলেছেন, 'হে মক্কা, আল্লাহর শপথ, তুমি আল্লাহর উত্তম যমীন এবং আল্লাহর প্রিয় শহর; যদি তোমার কওম, আমাকে তোমার কাছ থেকে বিতাড়িত না করত, তাহলে আমি কখনও অন্যত্র বাস করতাম না। ইবনে আসীর বলেছেন, হাযওয়ারা মক্কার একটি জায়গার নাম। এ জায়গাটি বাবে ইবরাহীমের পশ্চিমে। এটি বর্তমানে মসজিদে হারামের নতুন সম্প্রসারণের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম তিরমিযী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। 'তুমি মক্কা, কতইনা ভাল এবং আমার নিকট কতইনা প্রিয়! যদি তোমার লোকেরা আমাকে বের করে না দিত, তাহলে আমি তোমার থেকে দূরে অন্য কোথাও বাস করতাম না।' বর্ণিত হাদীসসমূহের দ্বারা মক্কার সম্মান ও মর্যাদা বুঝা যায়। তবে এ নিরাপদ নগরীর সবচাইতে বড় মর্যাদা মসজিদে হারামের অস্তিত্বের কারণেই হয়েছে।
আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে এরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ কা'বাকে সম্মানিত ঘর এবং মানুষের টিকে থাকার কারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।' বাইতুল হারামের এ সম্মানিত এলাকা বলতে হারাম সীমান্তের ভিতরের সকল এলাকাকে বুঝায়। হারাম এলাকার চারদিকের সীমান্তের মধ্যে স্তম্ভ নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ গোটা হারাম এলাকার মর্যাদা অনুরূপ করে দিয়েছেন। এতে করে কাবার সম্মান বাড়ানোই আল্লাহর উদ্দেশ্য। শরীয়তের বিধি-নিষেধ উভয় জায়গার জন্যই সমান করে দেয়া হয়েছে। ইমাম যুহরী বলেছেন, হারাম এলাকার সীমানা সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আ.) নিজেই নির্ধারণ করেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) এর নির্দেশক্রমেই তিনি সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ শেষ করেন। তারপর কুসাই বিন কিলাব তা পুনঃনির্ধারণ করেন। এরপর মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তামীম বিন উসাইদ আল খোযায়িকে তা পুনঃনির্ধারণ এর জন্য পাঠান। তিনি সেগুলোর পুনঃসংস্কার করেন। এভাবেই শত শত বছর ধরে হারাম শরীফের সীমানার হিফাযত করা হচ্ছে।
আল্লাহ আদম ও হাওয়া (আ.) কে বেহেশত থেকে দুনিয়ায় পাঠান। তাঁরা দুনিয়ার কোন জায়গায় অবতরণ করেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইবনে জারীর আততাবারী লিখেছেন, আদম (আ.) কে ভারতবর্ষে অবতরণ করানো হয়। বেহেশত থেকে ভারত ভূখণ্ডে অবতরণের কারণে ভারতের গাছপালা বেহেশতী সুঘ্রাণে মোহিত হয়। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) এর মতে, আদম (আ.) কে ভারতে এবং হাওয়া (আ.) কে জেদ্দায় অবতরণ করানো হয়। দুনিয়াতে একাকী অবতরণ করার পর পরই আদম (আ.) তাঁর সঙ্গিণী হাওয়াকে খুঁজতে থাকেন। এক পর্যায়ে আদম (আ.) আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হন এবং সেখানে হাওয়া (আ.) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হাওয়া (আ.) মুযদালিফায় আদম (আ.) এর সাথে মিলিত হন। অভিধানে আরাফাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিচয় বা জানাশুনা এবং মুযদালিফা শব্দের অর্থ হচ্ছে মিলিত হওয়া। আল্লাহর ইচ্ছায় এ সকল ঘটনা সবই সম্ভব। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, আদম (আ.) সরন্দ্বীপ (বর্তমান শ্রীলংকার) চুজ নামক পাহাড়ে (Adam Hill) এবং হাওয়া (আ.) জেদ্দায় অবতরণ করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ উলঙ্গ আদম ও হাওয়ার সতর ঢাকার উদ্দেশ্যে বেহেশত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে তা যবেহ করার নির্দেশ দেন। এরপর তাঁরা উভয়ে দুম্বার পশম দিয়ে নিজেদের কাপড় তৈরী করেন। আদম (আ.) নিজের জন্য একটা জুব্বা এবং হাওয়া নিজের জন্য একটি লম্বা জামা ও ওড়না তৈরি করেন। তাঁরা বেহেশতে থাকা অবস্থায় পোশাক পরেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার কারণে তাদের বেহেশতী পোশাক খসে পড়ে। তাই তাঁরা বেহেশতের পাতা দিয়ে সতর ঢাকার চেষ্টা করেন। দুনিয়াতে অবতরণের পর তাঁদের সেই বেহেশতী অভ্যাস বজায় রাখার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁদের পোশাকের ব্যবস্থা করেছেন। তাই যে সকল ঐতিহাসিক মানব ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়কে পুরাতন ও নতুন পাথর যুগ এই দুই ভাগে ভাগ করে বলেন, প্রাথমিক যুগের মানুষ অসভ্য ছিল, তারা পোশাক না পরে উলঙ্গ থাকত-তা নিতান্ত আন্দাজ-অনুমান ও ভিত্তিহীন বক্তব্য। আদম (আ.) নবী ছিলেন। তাই প্রথম আদিম মানুষটি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সভ্য। কেননা, সভ্যতার জ্ঞানদানকারী স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশের ভিত্তিতেই তিনি দুনিয়ায় মানব জীবন ও সভ্যতা সূচনা করেন।
ইবনে জারীর উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ, আদম (আ.) এর কাছে ওহী পাঠিয়ে বলেন, আমার আরশ বরাবর নীচে একটি হারাম বা সম্মানিত জায়গা আছে। তুমি সেখানে গিয়ে আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি ঘর তৈরি কর এবং আমার আরশের চারপাশে তওয়াফকারী ফেরেশতাদের মত তুমিও এর তওয়াফ কর। সেখানে আমি তোমার ও তোমার সন্তানদের দোয়া কবুল করব। হযরত আদম (আ.) জবাবে বলেন, হে আল্লাহ! সে জায়গাটি তো আমি চিনি না। তারপর একজন ফিরিশতা তাঁকে সেখানে নিয়ে যান। তিনি পাঁচ পাহাড়ের পাথর দিয়ে মক্কায় আল্লাহর ঘর কা'বা তৈরি করেন। পাহাড়গুলো হচ্ছে, ১) তুরে সিনাই, ২) তুরে যাইতুন বা যাইতা, ৩) লুবনান পাহাড়, ৪) যুদী পাহাড় ও ৫) হেরা পাহাড়। তিনি প্রথমোক্ত ৪টি পাহাড়ের পাথর দিয়ে কাবার দেয়াল এবং হেরা পাহাড়ের পাথর দিয়ে এর ভিত্তি নির্মাণ করেন। তারপর ফিরিশতা তাঁকে আরাফাতে নিয়ে যান এবং হজ্জের সকল নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেন। তিনি এক সপ্তাহ যাবত আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করেন। ইবনে জারীর আততাবারী আরেকটি বর্ণনায় উল্লেখ করেন, আরাফাতে ফিরিশতারা আদম (আ.) কে বলেনঃ হে আদম! আমরা আপনার হাজার হাজার বছর আগে এ ঘরে হজ্জ আদায় করেছি। আদম (আ.) বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আসার সময় সাথে করে হাজারে আসওয়াদ নিয়ে আসেন। এটি তখন ধবধবে সাদা ছিল। তিনি তা কা'বায় লাগান। ইবনে জারীর আত-তাবারী এবং আযরাকী আবদুর রহমান বিন সাবেত সহ অন্যান্য তাবেঈদের বরাত দিয়ে এক হাদীসের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন যে, মসজিদে হারামে নূহ (আ.) এর কবর অবস্থিত। এ মতটিই বেশী শক্তিশালী। হাদীসে উল্লেখ আছে যে, হযরত হূদ (আ.)ও মক্কায় এসেছেন এবং হজ্জ পালন করেছেন। হযরত আলী থেকে ইয়েমেনে হযরত হূদের কবরের অবস্থার বর্ণনা উল্লেখ আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিদায় হজ্জকালীন সময়ে বর্ণিত হাদীসে হযরত সালেহ (আ.) এর মক্কায় আগমন ও হজ্জ করার কথা উল্লেখ আছে।
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে, হযরত আদম (আ.) প্রথমে মক্কায় আসেন, কা'বা ঘর নির্মাণ করেন এর তওয়াফ করেন ও হজ্জের নিয়ম-কানুন শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর বংশধর কাবিলসহ অনেকেই আরব ভূখে বাস করেন। হযরত নূহ (আ.), হূদ (আ.) ও সামুদ (আ.) আরব ভূখেই বাস করেছেন এবং সকলে মক্কায় আগমন করেছেন। তাই মক্কার ইতিহাসের সাথে সবাই সম্পৃক্ত। এরপর মক্কার ইতিহাসের সাথে সর্বাপেক্ষা বেশী জড়িত হচ্ছেন হযরত ইবরাহীম (আ.)। মক্কায় হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.) এর আগমনের পূর্বে আমালি সম্প্রদায়ের লোকেরা বাস করত বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ইসমাঈল (আ.) এর মা হাজেরার অনুমতিক্রমে জোরহাম গোত্র মক্কায় বসবাস শুরু করে এবং মক্কায় তাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তারাই আমালিক সম্প্রদায়ের লোকদের মক্কা থেকে বিতাড়িত করে এবং মক্কায় তাদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর ঘরের স্থানটি একটি লাল পাহাড়ের মত উঁচু ছিল। তখন মক্কা উপত্যকায় কেউ বাস করত না। তারপর থেকেই সেখানে অবিচ্ছিন্ন জীবনধারা শুরু হয়। হযরত ইবরাহীম (আ.) থেকেই মক্কা নগরীর মূল ইতিহাসের সূচনা হয়েছে। এর আগে ফিরিশতা, জীন, হযরত আদম (আ.) এবং আমালিক সম্প্রদায়ের লোকেরাসহ অন্যরা মক্কায়, পবিত্র কা'বা শরীফকে কেন্দ্র করে আল্লাহর ইবাদত করেছেন। সত্যিকার অর্থে, ঐ উপত্যকায় মানুষের বসবাস শুরু হয় হযরত ইসমাঈল ও তাঁর মা হাজেরার আগমনের পর থেকেই। তারপর, ক্রমান্বয়ে তা মানব সভ্যতার লীলাভূমিতে পরিণত হয় এবং মক্কা গড়ে ওঠে একটি নগররাষ্ট্র হিসেবে।
কিভাবে পবিত্র মক্কা নগরীর গোড়াপত্তন হয় এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী (রহঃ) বুখারী শরীফে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বুখারী শরীফের 'কিতাবুল আম্বিয়া' অধ্যায়ে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে একটি লম্বা হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সে হাদিসের শেষাংশে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : "একদিন হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী সারা, (মিসরে) এক যালেম শাসকের (ফিরআউনের) এলাকায় এসে পৌঁছলেন। শাসনকর্তাকে জানানো হল যে, এ এলাকায় একজন বিদেশী লোক এসেছেন এবং তাঁর সাথে রয়েছে এক শ্রেষ্ঠা সুন্দরী রমণী। রাজা তখন ইবরাহীম (আ.) এর কাছে লোক পাঠায় এবং তাঁকে মহিলাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; এ মহিলাটি কে? ইবরাহীম (আ.) জবাব দিলেন, সে আমার (দ্বীন) বোন। তারপর তিনি সারার কাছে আসলেন এবং বললেন, হে সারা, আমি এবং তুমি ছাড়া, যমীনের উপর আর কোন মুমিন নেই। এ রাজা আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি তাকে বলেছি, তুমি আমার (দ্বীন) বোন। সুতরাং, তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। রাজা সারাকে তার কাছে আনার জন্য লোক পাঠালো। সারা যখন রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন, তখন রাজা তাঁর দিকে হাত বাড়াল এবং সাথে সাথে আল্লাহর গযবে আটকা পড়ল। যালেম রাজা (অবস্থা বেগতিক দেখে) সারাকে বলল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কর, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দেব না। সারা আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। ফলে সে মুক্তি পেল। যালেম আবারও তাঁর প্রতি হাত বাড়াল এবং এবারও আগের মত কিংবা আরো ভয়াবহ গযবে পতিত হল। এবারও সে বলল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কর, আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না। সারা আবারও দোয়া করলেন এবং রাজা আবারও মুক্তি পেল। পরে রাজা কোন একজন দারোয়ানকে ডাকলো এবং বলল, তোমরা আমার কাছে কোন মানুষকে আননি, এনেছ একজন শয়তানকে। রাজা সারার খেদমতের জন্য 'হাজেরা' নামক এক মহিলাকে দান করল। এরপর সারা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর কাছে আসলেন। তখন তিনি দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন এবং হাতের ইশারায় সারাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি ঘটেছে? সারা বলল, 'আল্লাহ যালেম কাফিরের চক্রান্ত তারই বুকে পাল্টা নিক্ষেপ করেছেন (অর্থাৎ অসদুদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিয়েছেন) এবং সে 'হাজেরা'-কে আমার খেদমতের জন্য দান করেছেন।' এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, "হে আকাশের পানির সন্তানরা! এ 'হাজেরা'-ই তোমাদের আদি মাতা।" এ হাদীস থেকে আমরা মক্কার ইতিহাসের অন্যতম উৎস হচ্ছে, হযরত ইসমাঈল (আ.) এর মা 'হাজেরা' সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা করতে পারি। শিশু ইসমাঈল ও তাঁর মা 'হাজেরা' মক্কায় বসবাস শুরু করার পর এ শহরের সূচনা হয়।
ইসমাঈলের মার নাম হচ্ছে 'হাজেরা'। 'সোহায়লী বলেছেন, "মহিলাদের মধ্যে হযরত 'হাজেরা'ই সর্বপ্রথম কান ছিদ্র করেছিলেন এবং পরনের কাপড়ের আঁচল পেঁচিয়েছেন। কেননা, হযরত সারা তাঁর উপর রাগ করেছিলেন এবং তার শরীরের তিনটি অঙ্গ কেটে ফেলার শপথ করেছিলেন। তখন হযরত ইবরাহীম (আ.) 'হাজেরা'-কে হযরত সারার শপথ পূরণ করার উদ্দেশ্যে নিজের কান ছিদ্র করার নির্দেশ দেন। তখন থেকেই, এ কাজ মহিলাদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে পড়ে। মাতাপিতাহারা 'হাজেরা' মিসরের বাদশাহ ফিরআউনের কাছে ছিলেন। বাদশাহ সারার উদ্দেশ্যে 'হাজেরা'-কে উপহার দেয়। অপরদিকে, সারা ছিলেন ইবরাহীম (আ.) এর চাচাতো কিংবা ফুফাতো বোন। পরে সারা 'হাজেরা'-কে ইবরাহীম (আ.) এর নিকট উপহার দেন। প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ থেকে বর্ণিত।
ইবরাহীম (আ.) দুগ্ধপোষ্য শিশু (১/২ বছর) ইসমাঈলসহ সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি মক্কায় আল্লাহর ঘর কা'বার স্থান সম্পর্কে নির্দেশ পান। নির্দেশ দেয়া হয়, আপনি সে স্থানকে পাক-সাফ করে তওয়াফ ও নামায দ্বারা আবাদ করবেন। ঐ আদেশের প্রেক্ষিতে জিব্রাঈল (আ.) বোরাক নিয়ে আসেন এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল ও হাজেরাকে নিয়ে রওনা হন। পথে কোন জনপদ দেখলেই ইব্রাহীম (আ.) জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করতেন: আমাদেরকে কি এখানেই অবস্থানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে? জিব্রাঈল বলতেন: না আপনার গন্তব্যস্থান আরও সামনে। অবশেষে তাঁরা মক্কা আসলেন। এখানে কাঁটাযুক্ত বন-জঙ্গল বাবলা গাছ ছাড়া কিছুই ছিল না। এ ভূখণ্ডের আশেপাশে কিছু জনবসতি ছিল। তাঁরা ছিল আমালিক সম্প্রদায়ের লোক। আল্লাহর ঘরটি তখন টিলার আকারে বিদ্যমান ছিল। এখানে পৌছে ইবরাহীম (আ.) জিব্রাঈলকে জিজ্ঞেস করেন, আমাদের কি এখানেই বাস করতে হবে? জিব্রাঈল বলেন: হ্যাঁ। ইবরাহীম (আ.) শিশুপুত্র ও 'হাজেরা'সহ এখানে অবতরণ করেন। কা'বা গৃহের কাছে একটি কুড়েঘর তৈরী করে তাতে ইসমাঈল ও 'হাজেরা'-কে রেখে যান। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্যই, ইবরাহীম (আ.) হাজেরা ও ইসমাঈল (আ.) কে মক্কায় রেখে যান। তিনি তাদের উপর যুলুম করেননি এবং কোন কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা প্রর্দশন করেননি। শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন করেছেন। এ বিষয়ে বুখারী শরীফের 'কিতাবুল আম্বিয়া' অধ্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "নারী জাতি সর্বপ্রথম হযরত ইসমাঈল (আ.) এর মা (হাজেরা) থেকেই কোমরবন্ধ বানানো শিখেছে। হাজেরা সারা থেকে নিজ নিদর্শনাবলী (গর্ভধারণের) গোপন করার উদ্দেশ্যে কোমরবন্ধ বা কোমরে রশি বাঁধতেন। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ.) হাজেরা ও তাঁর শিশুপুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে (নির্বাসন দেয়ার উদ্দেশ্যে) বের হলেন। পথে হাজেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। শেষ পর্যন্ত ইবরাহীম (আ.) তাঁদের উভয়কে নিয়ে কা'বা ঘরের কাছে উপস্থিত হলেন এবং মসজিদে হারামের উঁচু দিকে যমযম কূপের উপর এক বড় গাছের নিচে তাঁদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় কোন লোকজন ছিল না এবং পানিও ছিল না। তিনি তাঁদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে অল্প পানি দিয়ে গেলেন। এরপর ইবরাহীম (আ.) নিজ অবস্থানের দিকে ফিরে চললেন। ইসমাঈলের মা (হাজেরা) তার পিছু পিছু ছুটে আসলেন এবং ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন? তিনি বার বার তা বলতে লাগলেন কিন্তু ইবরাহীম (আ.) সেদিকে ফিরে তাকালেন না। তখন হাজেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কি আপনাকে এ (নির্বাসনের) নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। জবাব শুনে হাজেরা বললেন, তাহলে (ঠিক আছে) আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। তারপর তিনি ফিরে আসলেন। হযরত ইবরাহীম (আ.) (পিছনে না তাকিয়ে) সামনে চললেন। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে এসে পৌঁছলেন এবং স্ত্রী-পুত্র আর তাকে দেখতে পাচ্ছিল না, তখন তিনি কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দু'হাত তুলে এ দোয়া করলেন: "হে আমাদের রব, তোমার পবিত্র ঘরের কাছে এমন এক উপত্যকায় আমার সন্তান ও পরিবারের বসতি স্থাপন করেছি যা কৃষির অনুপযোগী। হে রব, উদ্দেশ্য এই, তারা নামায কায়েম করবে; অতএব তুমি অন্যান্য লোকের মনকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দাও এবং প্রচুর ফলফলাদি দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দাও। যাতে করে তারা (তোমার নিয়ামতের) শুকরিয়া আদায় করতে পারে।"
এরপরই ইসমাঈলের মা, ইসমাঈলকে (নিজের বুকের) দুধ পান করাতেন আর নিজে একটা মশক থেকে পানি পান করতেন। (ঐ পানি পান করার সাথে সাথে শিশু পুত্রের জন্য তাঁর দুধে জোয়ার আসতো)। শেষ পর্যন্ত মশকের পানি শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি নিজেও পিপাসায় কাতর হলেন এবং (বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়ায়) তাঁর শিশু-পুত্রটিও পিপাসায় ছটফট করতে থাকে। তিনি শিশুর প্রতি দেখতে লাগলেন যে পিপাসায় শিশুর বুক ধড়ফড় করছে। শিশুপুত্রের এ করুণ অবস্থার দিকে তাকানো তাঁর জন্য অসহ্য হয়ে উঠল। তিনি সরে পড়লেন এবং সাফা পাহাড়কেই একমাত্র নিকটতম পাহাড় হিসেবে পেলেন। তারপর তিনি এর উপর উঠলেন এবং ময়দানের দিকে মুখ করলেন। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলেন, কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু না, তিনি কাউকে দেখলেন না। তখন তাড়াতাড়ি সাফা পাহাড় থেকে নেমে পড়লেন। যখন তিনি নিচে ময়দানে নামলেন তখন আপন জামা এদিকে তুলে একজন ক্লান্ত ব্যক্তির মত দৌড়ে চললেন।
তারপর উপত্যকা অতিক্রম করে মারওয়া পাহাড়ে আসলেন এবং উপরে উঠলেন। তারপর চারদিকে নজর করলেন, কাউকে দেখা যায় কিনা? তিনি (পাহাড় দু'টির মধ্যে) এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ জন্যই (হজ্জের সময়) মানুষ এ পাহাড় দু'টির মধ্যে ৭ বার সায়ী করে (জোরে হাটে) এবং এটা হজ্জের একটি অংগ। তারপর তিনি যখন (শেষবার) মারওয়া পাহাড়ের উপর উঠলেন, তখন একটি আওয়াজ শুনলেন। তখন নিজে নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর; (মনোযোগ দিয়ে শুনি) তিনি মনোযোগের সাথে ঐ আওয়াজের দিকে কান দিলেন। আবারও আওয়াজ শুনলেন। তখন বললেন, তোমার আওয়াজতো শুনিয়েছ। যদি তোমার কাছে কোন সাহায্যকারী থাকে, তাহলে আমাকে সাহায্য কর। হঠাৎ তিনি যমযমের জায়গায় একজন ফিরিশতা দেখতে পেলেন। সে ফিরিশতা আপন পায়ের গোঁড়ালী দ্বারা আঘাত করলেন কিংবা আপন ডানা দ্বারা আঘাত হানলেন। ফলে (আঘাতের স্থান থেকে) পানি উপচে উঠতে লাগলো। হযরত হাজেরা পানির উৎসের চারপার্শ্বে আপন হাতে বাঁধ দিয়ে তাকে কূপের আকার দান করলেন এবং অঞ্জলী ভরে তার মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। হযরত হাজেরার অঞ্জলী ভরার পরে পানি উথলে উঠতে লাগল। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ ইসমাঈলের মাকে রহম করুন, যদি তিনি যমযমকে (বাঁধ না দিয়ে ঐভাবে) ছেড়ে দিতেন কিংবা তিনি বলেছেন, যদি তিনি অঞ্জলী ভরে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম (কূপ না হয়ে) একটি প্রবাহমান ঝর্ণাধারায় পরিণত হত এবং পৃথিবীময় ছড়িয়ে যেত।
এরপর হযরত হাজেরা পানি পান করলেন এবং শিশু পুত্রকে দুধ পান করালেন। তখন ফিরিশতা তাঁকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন ভয় করবেন না। কেননা, এখানে আল্লাহর ঘর রয়েছে; এ শিশু তার পিতার সাথে এ ঘরটি পুনঃনির্মাণ করবেন। আল্লাহ তাঁর পরিজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। তখন আল্লাহর ঘরের ভিটিটি যমীন থেকে বেশ উঁচু ছিল। বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট বন্যায় এর ডানে-বায়ে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। হযরত হাজেরা এভাবেই দিন অতিবাহিত করছিলেন। শেষে একদিন ইয়েমেনের জোরহাম গোত্রের কিছু লোক কাবার পথে এসেছিলেন। তারা মক্কার দিকে অবতরণ করলেন। তারা দেখলেন যে, কতগুলো পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তাঁরা ভাবলেন, নিশ্চয়ই এ পাখিগুলো পানির উপরেই ঘুরছে। অথচ তারা এ ময়দানে বহুকাল কাটিয়েছে, কিন্তু কোন পানি সেখানে ছিল না। এরপর তারা এক বা দু'জন লোককে সেখানে পাঠালেন। তারা গিয়ে পানি দেখতে পেলেন।
তাঁরা ফিরে এসে অপেক্ষমান সবাইকে পানির খবর দিলেন। খবর শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হলেন। ইসমাঈলের মা পানির কাছে বসা ছিলেন। তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দেবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, তবে এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা সবাই 'হ্যাঁ' বলে প্রস্তাবে রাজী হলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মায়ের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিল। তিনিও মানুষের সাহচার্য কামনা করছিলেন। তারপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও খবর পাঠাল; তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সেখানে তাদের কয়েকটি প্রজন্ম অবস্থান করল। ইসমাঈলও আস্তে আস্তে বড় হলেন এবং তাদের কাছ থেকে তাদের ভাষা আরবী শিখলেন। যুবক হওয়ার পর তিনি তাদের কাছে অধিকতর প্রিয়পাত্রে পরিণত হলেন। তিনি যৌবনপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁরা তাদেরই এক মেয়েকে তাঁর কাছে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর ইসমাঈলের মা হাজেরা ইন্তিকাল করেন।
ইসমাঈলের বিয়ের পর ইবরাহীম (আ.) তাঁর নির্বাসিত পরিবারকে দেখার জন্য মক্কায় আসেন। কিন্তু এসে ইসমাঈলকে পেলেন না। ফলে পুত্রবধূর কাছে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী বললেন, তিনি আমাদের খাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম (আ.) পুত্রবধূকে তাদের সংসার জীবনের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। পুত্রবধূ হযরত ইবরাহীম (আ.) এর কাছে তাঁদের অভাব সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তিনি পুত্রবধূকে বললেন, তোমার স্বামী ঘরে ফিরে আসলে তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠটি বদলিয়ে ফেলে।
ইসমাঈল (আ.) যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তিনি যেন হযরত ইবরাহীম (আ.) এর আগমন সম্পর্কে কিছু একটা আভাষ পেলেন। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কাছে কেউ এসেছিলেন কি? স্ত্রী বলল, হ্যাঁ, এমন আকৃতির একজন বুড়ো লোক এসেছিলেন এবং আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার খবর জানিয়েছি। তিনি আবার আমাকে আমাদের সংসার জীবনের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাঁকে বললাম, আমরা দুঃখ-কষ্টে ও অভাবে আছি।
ইসমাঈল জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন ওসীয়ত করে গেছেন? স্ত্রী জবাব দিল, হ্যাঁ, তিনি আমাকে বলেছেন আমি যেন আপনাকে তার সালাম পৌছাই এবং আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ বদলিয়ে নেন। ইসমাঈল (আ.) বললেন, উনি আমার আব্বা। ঐ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন; যেন তোমাকে আমি পৃথক করে দেই অর্থাৎ তালাক দেই। সুতরাং তুমি তোমার বাপের বাড়িতে আপন লোকের কাছে চলে যাও। এ বলে হযরত ইসমাঈল (আ.) স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ বংশের অপর একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। তারপর আল্লাহ যতদিন চাইলেন, ইবরাহীম (আ.) ততদিন তাদের থেকে দূরে রইলেন।
পরে আবার এদেরকে দেখতে আসলেন কিন্তু ইসমাঈল (আ.) কে পেলেন না। তিনি নতুন পুত্রবধূর ঘরে ঢুকলেন এবং ইসমাঈল (আ.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী জানালেন, তিনি আমাদের খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন। হযরত ইবরাহীম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছ? পুত্রবধূ জবাব দিলেন, আমরা ভাল আছি ও সুখে আছি এবং পুত্রবধূ আল্লাহর প্রশংসাও করলেন। ইবরাহীম (আ.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের প্রধান খাবার কি? পুত্রবধূ জবাবে বললেন, 'গোশত।' তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের পানীয় কি? তিনি জবাব দিলেন, 'পানি।' ইবরাহীম (আ.) দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ, তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দান কর।'
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হত না। যদি হত হযরত ইবরাহীম (আ.) সে ব্যাপারেও তাদের জন্য দোয়া করতেন। কোন লোকই মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও শুধু গোশত ও পানি দ্বারা জীবন যাপন করতে পারে না। কারণ, শুধু গোশত ও পানি সবসময় মেজাযের অনুকূল হতে পারে না। ইবরাহীম (আ.) আলাপ শেষে পুত্রবধূকে বললেন, তোমার স্বামী যখন আসবে, তখন তাকে আমার সালাম জানাবে এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে হুকুম করবে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে।
এরপর ইসমাঈল (আ.) যখন বাড়ি আসলেন, স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, বাড়িতে কেউ কি এসেছিলেন? স্ত্রী বললেন, হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বুড়ো লোক এসেছিলেন। স্ত্রী তাঁর প্রশংসা করলেন ও বললেন, আমি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আমরা সুখে-শান্তিতে আছি। ইসমাঈল জানতে চাইলেন তিনি কি তোমাকে আর কোন ব্যাপারে আদেশ দিয়ে গেছেন? স্ত্রী বললেন, হ্যাঁ, আপনাকে সালাম করে, এ নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন আপনি আপনার ঘরের চৌকাঠ বহাল রাখেন।
ইসমাঈল (আ.) বললেন, উনিই আমার বাবা। আর তুমি হলে চৌকাঠ। তিনি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে বহাল রাখার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
ইবরাহীম (আ.) আবারও কিছুদিন তাদের কাছ থেকে দূরে রইলেন এরপর আবার তাদের কাছে আসলেন। এসে দেখলেন, ইসমাঈল (আ.) যমযমের কাছে একটি গাছের নীচে বসে নিজের তীর মেরামত করছেন। বাবাকে আসতে দেখে পুত্র দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। ইব্রাহীম (আ.) বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের হুকুম করেছেন। ইসমাঈল (আ.) জবাব দিলেন, আপনার প্রভু আপনাকে যা আদেশ করেছেন, আপনি তা করে ফেলুন। ইব্রাহীম (আ.) বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে, এর চারপাশে ঘেরাও করে একটি ঘর তৈরী করতে নির্দেশ দিয়েছেন; এ বলে তিনি উঁচু পাহাড়টির দিকে ইশারা করে তাঁকে স্থানটি দেখালেন। তারপর তাঁরা কা'বা ঘরের দেয়াল উঠাতে শুরু করলেন।
ইসমাঈল (আ.) পাথর যোগান দিতেন এবং ইবরাহীম (আ.) গাঁথুনী করতেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আ.) 'মাকামে ইব্রাহীম নামক মশহুর পাথরটি আনলেন এবং ইব্রাহীম (আ.) এর জন্য তা রাখলেন। ইব্রাহীম (আ.) এর উপর দাঁড়িয়ে ইমারত তৈরী করতে লাগলেন এবং ইসমাঈল (আ.) তাঁকে পাথর যোগান দিতে লাগলেন। তাঁরা উভয়েই এ দোয়া করলেন, “হে আমদের প্রতিপালক, আমাদের কাছ থেকে এটি কবুল করুন! নিশ্চয়ই আপনি বেশী শোনেন এবং বেশী জানেন।
ইসমাঈল (আ.) এর মা হাজেরা ছিলেন সারার উপহারপ্রাপ্ত একজন যুবতী কন্যা। সারার কোন সন্তান না থাকায় তিনি তাকে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সাথে বিয়ে দেন। পরে সারার সাথে হাজেরার সতীনসুলভ মনোভাব সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। এরপর হাজেরা গর্ভবতী হন। কিন্তু সারা তা সহ্য করতে পারেননি। তাই সারা সর্বক্ষণ হাজেরার পেটের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। কেননা বার্ধক্য পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরও সারার ঘরে কোন সন্তান না হওয়ায় হঠাৎ করে সারার মনে প্রতিহিংসা জাগ্রত হয়। অবশ্য ইসমাঈলের জন্মের অনেক পরে সারার ঘরে হযরত ইসহাক (আ.) জন্মগ্রহণ করে। হাজেরা নিজ পেটের নিদর্শন গোপন করার জন্য কোমরবন্ধ কষে পরতেন; যেন পেট বড় না দেখা যায়। অতপর হযরত ইসমাঈল (আ.) হাজেরার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ.) হাজেরা (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কে মক্কার নির্বাসন দেয়ার পর ফিরে যান। ইতোমধ্যে ৯০ বছর বয়সে হাজেরা মারা যান। তিনি কুরবানীর ঘটনা, কা'বা নির্মাণ এবং নির্বাসিত পরিবারের খোঁজ নেয়ার জন্য পরবর্তীতে চারবার মক্কায় আসেন। দু'বার ইসমাঈল (আ.) কে না পেয়ে তাঁর দুই স্ত্রীর সাথে আলাপ করে তাদের পরিবারের খোঁজ খবর নেন। ইসমাঈল (আ.) জোরহাম গোত্রে বিয়ে করার পর তাদের সাথেই তার সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তা গড়ে ওটে। এইভাবে, ইসমাঈল (আ.) কে কেন্দ্র করে মক্কায় মানুষের পূর্ণাঙ্গ আবাদ শুরু হয় এবং যমযম কূপের পানিই তাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন হয়। যমযম কূপ না হলে জোরহাম গোত্রের মক্কায় বসবাস করার কোন সম্ভাবনা ছিল না। কেননা, যমযমের পানির কারণেই তারা এখানে বাস করতে আকৃষ্ট হয় এবং এর ফলে মক্কায় বসতি গড়ে উঠে। হযরত ইবরাহীম (আ.) ৪র্থ বার মক্কা সফরে এসে হযরত ইসমাঈল (আ.) কে নিয়ে কা'বা শরীফ তৈরী করেন।
হযরত ইবরাহীম (আ.) নিজ ছেলে ইসমাঈল (আ.) কে নিয়ে কাবা শরীফ তৈরীর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ৫ম পূর্বপুরুষ কুসাই বিন কিলাবের হাতে মক্কার শাসনভার আসার আগ পর্যন্ত, মসজিদে হারাম বলতে শুধু কা'বা শরীফকেই বুঝানো হত। কিন্তু কুসাই-এর হাতে ক্ষমতা আসার পর তিনি কা'বা শরীফের চারপাশে প্রশস্ত কিছু জায়গা খালি রাখেন। সে খালি জায়গাটুকুকেই মসজিদে হারাম বলা হত। তখন কা'বার চারপাশে বৃহদাকারের ঘর-বাড়ি ছিল না এবং মসজিদে হারামের চার দিকেও সীমানা চিহ্নিতকারী কোন দেয়াল ছিল না। ইতোপূর্বে আমালিকা সম্প্রদায়, জোরহোম, খোযাআ' ও কুরাইশ গোত্রের লোকেরা মক্কার দুই পাহাড়ের মাঝে ঢালু পাদদেশে বাস করত। কাবার সম্মানে তারা কা'বার পাশে কোন ঘর ও দেয়াল নির্মাণ করার সাহস করেনি। কুরাইশরা কা'বার চারপাশে ঘর তৈরী করে এবং কা'বামুখী দরজা লাগায়। তওয়াফকারীদের তওয়াফের জন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়া হয়। প্রতি দুই ঘরের মাঝে রাস্তা নির্মাণ করা হয় এবং মাতাফে আসার জন্য একটি দরজা রাখা হল। প্রত্যেক ঘর গোলাকৃতির ছিল, কোনাটাই চার কোণবিশিষ্ট ছিল না। যাতে করে চতুর্ভুজ বিশিষ্ট কা'বার সাথে তাদের ঘরের কোন সাদৃশ্য সৃষ্টি না হয়। তবে তারা কা'বার উচ্চতার চেয়ে অপেক্ষাকৃত নীচু করে ঘর তৈরি করে। কা'বার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নীচু করে ঘর করায়, মক্কার প্রায় সকল দিক থেকে কা'বা শরীফ নজরে পড়ত। কা'বার পাশে যারা ঘর তৈরী করেছে তাদেরকে 'অভ্যন্তরীণ কুরাইশ' বলা হত। কুরাইশদের বংশ বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের বাড়ি-ঘরও বৃদ্ধি পায়। রাসূলুল্লাহর যুগে, মক্কার দুই পাহাড়ের ঢালু পাদদেশ পর্যন্ত তাদের ঘর-বাড়ি সম্প্রসারিত হয়। আযরাকী, ফার্সী, কুতুবুদ্দিন হানাফী এবং মক্কার অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ আইয়ামে জাহেলিয়াতে মসজিদে হারামের উপরোক্ত বর্ণনা দিয়েছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, জাহেলিয়াতের সময় মসজিদে হারামের কোন উল্লেখ ছিল না। কেননা, তখন নামায পড়ার বিধান ছিল না বলে তাদের মসজিদেরও দরকার হত না। জাহেলিয়াতের যুগে শুধু তাওয়াফের প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে তারা সকাল সন্ধ্যায় কাবার পার্শ্বে আসর জমাতো এবং কা'বার ছায়ায় বসত। এ সকল আসরে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত ও সাধারণ আলোচনা করত। ছায়া সরে গেলে কুরাইশরাও সরে যেত। মসজিদে হারাম তথা তওয়াফের স্থানটি তাদের জনসাধারণের জন্য কাউন্সিলের মত ব্যবহার হত এবং এতে পরস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ আলোচনা হত।
ইসলামের প্রথমদিকে মক্কার নওমুসলিমগণ মুশরিকদের অত্যাচার ও নির্যাতনের ভয়ে নিজেদের ঘরে গোপনে নামায আদায় করত। এ অবস্থা দীর্ঘ তের বছর অর্থাৎ হিজরতের আগ পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে। ঐ সময়ের মধ্যে খুবই নগণ্য সংখ্যক মুসলমান কাবার পার্শ্বে গিয়ে নামায পড়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) সহ গুটিকতক লোক সেখানে নামায পড়েছেন। নামায পড়ার কারণে তাদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতন করা হতো। কুরাইশদের অত্যাচারে, অনেকে মক্কা থেকে হাবশায় (ইথিওপিয়ায়) হিজরত করেন এবং অবশিষ্ট লোকেরা মদীনায় হিজরত করেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরত করেন। তখন দুর্বল মুসলমানরা ব্যতীত কেউ মক্কায় ছিলেন না এবং মক্কা প্রায় মুসলমানশূন্য হয়ে গিয়েছিল।
হিজরী ৮ সালে, মক্কা বিজয়ের আগ পর্যন্ত মুসলমানরা মসজিদে হারামে নামায পড়ার সুযোগ পায়নি। মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মুসলমানদের হিজরত বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন থেকে তারা মসজিদে হারামে প্রকাশ্যে নামায পড়া শুরু করে। মক্কার মুসলমানরা ইসলামী সেনাবাহিনীতে যোগদান করে ইসলামের শত্রুদের মুকাবিলা করায় এবং পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এলাকার বাইরে অবস্থান করায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় এবং স্বয়ং হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খিলাফত আমলে মক্কায় তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম ছিল। সেজন্য তাওয়াফের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নামাযের সংকুলান হয়ে যেত। তাই তখন মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের কোন প্রয়োজন দেখা দেয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকরের আমলেও তওয়াফের জন্য নির্ধারিত স্থানকেই মসজিদে হারাম বলা হত। পবিত্র কুরআন মজীদের ১৫ জায়গায় ঐ স্থানটুকুকেই মসজিদে হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিজরী ১৭ সালে, হযরত উমর (রা.) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ.) এর পর থেকে হযরত উমর (রা.) এর আগ পর্যন্ত আর কেউ মসজিদে হারামের সম্প্রসারণ করেননি।
এরপর একবার মক্কার উচ্চভূমিতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে মসজিদে হারামের নিম্নভূমিতে 'উম্মে নহশল' নামক এক ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় এবং বন্যার পানি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে মাকামে ইবরাহীমকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং পানি শুকানোর পর তা মক্কার নিম্নভূমিতে পাওয়া যায়। পরে তা সেখান থেকে এনে কা'বা শরীফের সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়। এ বন্যায় মাকামে ইবরাহীম স্থানচ্যুত হওয়ার খবর খলীফা উমরের কাছে পৌঁছার পর তিনি এটাকে ভয়াবহ সমস্যা বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি ১৭ হিজরীর রমযান মাসে উমরাহর নিয়তে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং মসজিদে হারামে ঢুকে মাকামে ইবরাহীমের কাছে দাঁড়ান। তিনি আল্লাহর কসম দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তির কাছে মাকামে ইব্রাহীমের স্থানের সঠিক জ্ঞান আছে সে যেন তা প্রকাশ করে। তখন আবদুল মুত্তালিব বিন আবি ওয়াদা' আস-সাহমী (রা.) বলেন, 'হে আমীরুল মুমেনিন! এ বিষয়ে আমি সঠিক ওয়াকিবহাল। আমার একবার এরকম আশংকা হয়েছিল যে, কোন সময় যদি এরকম দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে তার সঠিক পরিমাণ হেফাযত করা দরকার হবে, আমি মাকামে ইবরাহীমের অবস্থান থেকে বাবুল কাবা এবং যমযমের দূরত্ব একটি রশি দ্বারা মেপে রেখেছি। সে রশিটি আমার ঘরে মওজুদ আছে।' হযরত উমর বলেন, তুমি আমার কাছে বস এবং একজনকে রশিটি আনার জন্য পাঠিয়ে দাও। তিনি বসলেন এবং একজনকে পাঠিয়ে রশি আনালেন। পরে রশি দিয়ে মেপে তা পূর্বের যথার্থ স্থানে রাখলেন। আজকে আমরা যেখানে তা দেখছি এটিই সে স্থান। পরে মাকামে ইব্রাহীমকে মজবুতভাবে সেখানে বসানো হয়। আযরাকী এবং মাওয়ারদীসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকরা এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। হযরত সুয়ূতী তাঁর 'আওয়ায়েল কিতাবে' লিখেন যে, মাকামে ইবরাহীমকে পুনর্বহাল করার পর এর পিছনে সর্বপ্রথম হযরত উমর (রা.) নামায পড়েন।
মাকামে ইব্রাহীমের পুনর্বহাল কাজ শেষ করার পর হযরত উমর (রা) মসজিদে হারাম তথা তওয়াফের নির্দিষ্ট স্থানে মুসল্লীদের প্রচ ভিড় লক্ষ্য করেন। তাই তিনি মসজিদে হারামের নিকটবর্তী ঘরগুলো কিনে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলেন এবং সে সকল জায়গাকে মসজিদে হারামের অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে, মসজিদে হারাম পূর্বের চেয়ে বড় ও সম্প্রসারিত হয়। কিছু সংখ্যক ঘরের মালিক ঘর বিক্রি করতে এবং মূল্য নিতে অস্বীকার করায় হযরত উমর (রা.) সে সকল ঘরের মূল্য নির্ধারণ করে সে অর্থ কাবার অর্থভা ারে রেখে দেন এবং বলেন, "তোমরা কাবার আঙ্গিনায় এসেছ এবং ঘর বেঁধেছ, তোমরা এর মালিক নও; কিন্তু কাবা তোমাদের আঙ্গিনায় আসেনি।" তারা হযরত উমরের দৃঢ় সংকল্প দেখে পরে মূল্য গ্রহণ করে। এরপর হযরত উমর (রা.) মসজিদে হারামের চার পার্শ্বে মাথা থেকে নীচু দেয়াল নির্মাণ করেন এবং পূর্বের ঘরগুলোর কা'বামুখী দরজাসমূহ বরাবর দেয়ালের দরজা রাখেন। ঐ দেয়ালের উপর বাতি জ্বালানো হত। হযরত উমর ফারুক (রা.) সর্বপ্রথম মসজিদে হারামের চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করেন। মসজিদে হারামের সম্প্রসারণের পর হযরত উমর ফারুক (রা.) মসজিদে হারামের উপর দিয়ে প্রবাহিত সর্বনাশা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম হাতে নেন। তিনি কাবা শরীফ থেকে আধা মাইল দূরে 'মোদ্দাআ' নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। ফলে মসজিদে হারাম বন্যার কবল থেকে মুক্ত হয়ে যায়। বড় বড় পাথর ও হাড় দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং এর উপর মাটি ফেলা হয়। পরে বন্যায় কোন সময় এ বাঁধের ক্ষতি সাধন করতে পারেনি। তবে ২০২ হিজরীর বিরাট বন্যা সে বাঁধের কিছু বড় বড় পাথর খসিয়ে ফেলে। এটি ছিল মক্কার বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রথম বাঁধ।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মসজিদে হারামের উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একমাত্র সূরা বাকারার ৬ জায়গাতেই মসজিদে হারামের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কুরআনে সূরা মায়েদায়, আনফালে, তওবার তিন জায়গায়, বনী ইসরাঈলে, হজ্জে, আল-ফাতহের দু'জায়গায় মসজিদে হারামের উল্লেখ রয়েছে। মাওয়ারদী তাঁর আল-হাওরী কিতাবের 'জিযইয়া' অধ্যায়ে লিখেছেন, এক জায়গা ব্যতীত কুরআনে উল্লিখিত সকল জায়গায় 'মসজিদে হারাম' বলতে 'হারাম এলাকাকে' বুঝানো হয়েছে। এ আয়াতে শুধু মসজিদে হারাম বলতে কা'বা শরীফকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতটির অর্থ হচ্ছে: "তোমরা মুখম লকে মসজিদে হারামের দিকে ফিরাও।” ইবনে আবিস সাইফ আল-ইয়ামানী কুরআনের পনের জায়গার কথা উল্লেখ করে বলেন, এসকল আয়াতের কোনটিতে 'মসজিদে হারাম' বলতে 'কা'বা' শরীফকে বুঝানো হয়েছে। যেমন উপরোক্ত আয়াত। কোন আয়াতে 'মসজিদে হারাম' বলতে 'মক্কা'কে বুঝানো হয়েছে। যেমন, "সে আল্লাহর জন্য পবিত্রতা যিনি তাঁর বান্দাহকে রাত্রে মসজিদে হারাম থেকে মি'রাজে নিয়ে গেছেন।" আবার কোন আয়াতে 'মসজিদে হারাম' বলতে গোটা 'হারাম এলাকা'-কে বুঝানো হয়েছে। যেমন, 'মুশরিকরা অপবিত্র, তারা যেন (মসজিদে) হারামের নিকটে না যায়।' 'আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। বিশ্বনবী বলেন, আমার মসজিদে এক ওয়াক্ত নামায মসজিদে হারাম ছাড়া অন্য মসজিদ অপেক্ষা ১ হাজার গুণ উত্তম।' (মুসলিম)। যে তিন মসজিদ যিয়ারতের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে তার মধ্যে মসজিদে হারাম হচ্ছে প্রথম। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তিন মসজিদ ব্যতীত অতিরিক্ত সওয়াবের উদ্দেশ্যে আর কোথাও সফর করা যায় না। সেগুলো হল, মসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ (নববী) এবং মসজিদে আকসা।' (মুসলিম) ইবনে মাজা'র এক রেওয়ায়াতে এসেছে, মক্কায় নামাযের ফযীলত ১ লাখ গুণ বেশী। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মক্কার সকল মসজিদ ঐ ফযীলতের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে বর্ণিত 'মসজিদে হারাম' শব্দের ভেতর কা'বা, মক্কা এবং পুরো হারাম এলাকা, এই সব কটি অর্থই অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে সাধারণভাবে, মসজিদে হারাম বলতে সে মসজিদকেই বুঝায়, যার তওয়াফ করা হয়।
📄 বাইতুল্লাহর প্রতি দৃষ্টির ফযীলত
বাইতুল্লাহর প্রতি নজর করা একটি ইবাদত। যাঁরা বাইতুল্লাহকে দেখে এবং এর প্রতি নজর দেয় তাঁরা সওয়াব পান। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কা'বা শরীফ দেখা একটি ইবাদত। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এ ঘরের বিভিন্ন প্রকার ইবাদতের ব্যাপারে আল্লাহর রহমতের যে বণ্টনের কথা উল্লেখ করেছেন তাতে আল্লাহর ঘরের প্রতি দৃষ্টিদানকারীদের জন্য ২০টি রহমত নির্ধারণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এ কাবা ঘরের উপর প্রত্যেক দিন ও রাতে ১২০টি রহমত নাযিল হয়। এর মধ্যে তওয়াফকারীদের জন্য ৬০টি, মসজিদে হারামে এতেকাফকারীদের জন্য ৪০টি এবং কা'বার প্রতি দৃষ্টিদানকারীদের জন্য ২০টি রহমত নাযিল হয়। অন্য এক বর্ণনায় নামাযীদের জন্য ৪০টি রহমত নাযিলের কথা এসেছে। ঐ রেওয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ, মক্কার মসজিদের লোকদের জন্য ১২০টি রহমত নাযিল করেন। সাখাওয়ী তাঁর মাকাসেদ হাসানা গ্রন্থে, তাবারানী তাঁর মায়াযেম গ্রন্থে, আজরাকী, বায়হাকী এবং হারেস তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে এ হাদীসটির উল্লেখ করেছেন। ঐ রহমত নাযিলের দু'টো ব্যাখ্যা আছে : প্রথমটি হচ্ছে, ঐ রহমত বর্ণিত তিন দলের প্রত্যেকের উপর সমানভাবে নাযিল হবে, তা তাদের কম বা বেশী আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। এ আলোকে প্রত্যেক তওয়াফকারী ৬০টি, প্রত্যেক কাবা দর্শনকারী ২০টি এবং প্রত্যেক নামাযী ৪০টি রহমত পাবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এ রহমত আমলের পরিমাপ, (কম-বেশী আমল) এবং আমলের গুণগতমানের উপর নির্ভর করে নাযিল হবে। এ ব্যাখ্যাটিই বেশী প্রসিদ্ধ। এ ব্যাখ্যার আলোকে, সকল তওয়াফকারী ৬০টি, সকল কাবা দর্শনকারী ২০টি এবং সকল মুসল্লী ৪০টি রহমত পাবে। এতে করে উপরোল্লিখিত তিনদলের প্রত্যেক দলের বহুসংখ্যক লোক আল্লাহর ঐ রহমতের সুশীতল ছায়া পাবে এবং প্রতিটি লোক বহুসংখ্যক রহমতের অধিকারী হবে।
আল-কোরা কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'কা'বা শরীফ দেখা ইবাদত' এর সমর্থনে হযরত আয়িশার বর্ণিত হাদীসটিও উল্লেখযোগ্য। আমাদের অতীতের বুজুর্গদের অনেকেই এই ইবাদতটির ফযীলতের ব্যাপারে নিজেদের রুচি, জ্ঞান এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলেছেন। আযরাকী এ বিষয়ের ৪টি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।
১. হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: কা'বার দিকে নজর করা খালেস ঈমানের পরিচয়। মুজাহিদ বলেছেন, কা'বার দিকে নজর করা ইবাদত।
২. সাইদ বিন মুসাইয়েব বলেছেন, যে ঈমান ও সত্য বিশ্বাসের সাথে কা'বা শরীফের দিকে তাকায়, সে গুনাহ থেকে নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়।
৩. আতা বলেছেন, কাবার দিকে নজর করা এক বছরের নামায তথা কিয়াম, রুকু ও সিজদা থেকে উত্তম।
৪. ইবনুস সায়েব আল-মাদানী বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সত্য বিশ্বাসসহকারে কাবার দিকে তাকায়, গাছ থেকে যেমন পাতা ঝরে পড়ে, তেমনি তাঁর গুনাহও ঝরে পড়ে। (মুসীরুল গারাম) কা'বার দিকে নজর করা ইবাদত। কা'বার প্রতি নজরকারী ব্যক্তির মর্যাদা হচ্ছে, সার্বক্ষণিক রোযাদার এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুজাহিদের সমান।
📄 বাইতুল্লাহর তওয়াফের ফযীলত
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : 'যে ব্যক্তি হিসাব করে, এক সপ্তাহব্যাপী কাবা শরীফ তওয়াফ করে সে একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাবে।' আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরও বলতে শুনেছি, "সে ব্যক্তির প্রতি কদমে আল্লাহ তাঁর অপরাধ ক্ষমা করেন এবং নেক লেখা হয়।" তিরমিযী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে আরো একটি হাদীস বর্ণিত রয়েছে : 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে কা'বার তওয়াফ করবে এবং দু'রাকাত নামায পড়বে, সে একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাবে।' নাসায়ী শরীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। 'যে সাত চক্কর তওয়াফ শেষ করবে সে একটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাবে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে মক্কায় আসার পর সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল বাইতুল্লাহ শরীফের তওয়াফ করা।
হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে বাইতুল্লাহ শরীফের সাত চক্কর তওয়াফ করবে, মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়বে এবং যমযমের পানি পান করবে তার গুনাহ যত বেশীই হউক না কেন, তা মাফ করে দেয়া হবে।' এক রেওয়ায়াতে এসেছে, কোন ব্যক্তি তওয়াফের নিয়তে ঘর থেকে বের হলে সে আল্লাহর রহমত পাওয়ার নিকটবর্তী হয়। সে যখন তওয়াফে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে ফেলে। তারপর প্রতি কদমের উঠা-নামার সাথে সাথে আল্লাহ তার জন্য পাঁচশ' নেকী লিখেন, পাঁচশ পাপ মোচন করেন এবং পাঁচশ মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। তওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু'রাকাত নামায পড়লে সে সদ্যপ্রসূত নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায়, আওলাদে ইসমাঈলের ১০টি গোলাম আযাদ করার বিনিময় পায় এবং হাজরে আসওয়াদের একজন ফিরিশতা তাকে স্বাগত জানায় এবং বলে : যে কাজে তোমাকে স্বাগত জানানো হয়, সে কাজ পুনরায় কর; তবে যা করেছ তা অতীতের গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট এবং তার পরিবারের সত্তর জনের জন্য সুপারিশ করা হবে।' এক রেওয়াতে এসেছে, 'যে ভাল করে অজু করে হাজারে আসওয়াদে চুমু দেয়ার উদ্দেশ্যে আসবে সে আল্লাহর রহমতে প্রবেশ করল। তারপর যখন চুমু দিল এবং দোয়া পড়ল তখন রহমত তাকে ঢেকে ফেলল। তারপর বাইতুল্লাহর তওয়াফ করলে, তার প্রতি কদমে আল্লাহ সত্তর হাজার নেক লিখবেন, সত্তর হাজার গুনাহ মাফ করবেন, সত্তর হাজার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তার বংশের সত্তর হাজার লোকের জন্য সুপারিশ করবেন। তারপর মাকামে ইবরাহীমের পিছনে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে দু'রাকাত নামায পড়লে আল্লাহ তার জন্য আওলাদে ইসমাঈলের ১৪ জন গোলাম আযাদ করার সওয়াব লিখবেন এবং সদ্যপ্রসূত নিষ্পাপ শিশুর মত গোনাহমুক্ত করবেন। অন্য এক রেওয়াতে এসেছে যে, 'একজন ফিরিশতা এসে বলবে, তুমি তোমার ভবিষ্যতের জন্য আমল কর, যা করেছ তা অতীতের অপরাধের ক্ষমার জন্য যথেষ্ট।'
হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ ফিরিশতাদের নিকট তওয়াফকারীদের ব্যাপারে গর্ব করে থাকেন।' হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে। 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ৫০ বার বাইতুল্লাহর তওয়াফ করে সে সদ্য ভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ শিশুর মত পাপমুক্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি দিন ও রাতে, বাইতুল্লাহর প্রতি ১২০টি রহমত নাযিল হয়। এর মধ্যে ৬০টি হচ্ছে তওয়াফকারীদের জন্য, ৪০টি হচ্ছে এ ঘরের নামাযীদের জন্য এবং ২০টি হচ্ছে এ ঘরের প্রতি নজরকারীদের জন্য। হযরত আদম (আ.) সাত সপ্তাহ রাতে এবং পাঁচ সপ্তাহ যাবত দিনে তওয়াফ করেছেন। তিনি তওয়াফের সময় এ দোয়া করেছেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার বংশধরদের মধ্য থেকে এ ঘরের আবাদকারী লোক তৈরী কর। তখন আল্লাহ তাঁর কাছে ওহী পাঠান এবং বলেন, 'আমি তোমার বংশধরদের মধ্য থেকে এ ঘরের আবাদকারী একজন নবী পাঠাবো; তাঁর নাম হবে ইব্রাহীম। তাঁর হাতে আমি এ ঘর নির্মাণ করাবো, এর পানি পান করানোর সব আঞ্জাম দেব, তাঁকে এর হারাম ও হালাল এলাকা এবং এ ঘরের যর্থাথ স্থান দেখাব; তাঁকে এখানকার পবিত্র স্থানসমূহ এবং এর বিধি বিধান শিখিয়ে দেব।' এক রেওয়াতে এসেছে, আল্লাহ দুনিয়াতে কোন কাজের জন্য কোন ফিরিশতা পাঠাতে চাইলে, সে ফিরিশতা আল্লাহর কাছে প্রথমে বাইতুল্লাহর তওয়াফের অনুমতি চায়। পরে সে ফিরিশতা নেমে আসে। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.) উল্লেখ করেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: এ ঘর থেকে উপকৃত হও, এ ঘর দু'বার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তৃতীয়বারে তা তুলে নেয়া হবে।' (ইবনে হিব্বান) হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এ ঘর উঠিয়ে নেয়ার আগে এবং এ ঘরের অবস্থান সম্পর্কে মানুষের ভুলে যাওয়ার পূর্বে, তোমরা এ ঘরের বেশী যিয়ারত কর; কুরআন উঠিয়ে নেয়ার আগে বেশী করে কুরআন তিলাওয়াত কর। তাঁকে লোকেরা প্রশ্ন করল, কাগজে লিখিত কুরআন তুলে নেয়া সম্ভব হলেও মানুষের মন থেকে কিভাবে তা তুলে নেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেন, মানুষ রাতে অন্তরে কুরআনসহকারে থাকবে সকাল বেলায় তাদের অন্তর থেকে কুরআন মুছে যাবে, এমনকি তারা তখন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এ কালেমাটিও ভুলে যাবে। তখন মানুষ আবার যাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যাবে এবং বিভিন্ন জাহেলী জিনিসের অনুসরণ করবে। (আযরাকী) হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেছেন, 'একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তওয়াফ করছিলাম। হঠাৎ করে তিনি থেমে গেলেন এবং মৃদু হাসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি প্রথমে থেমে গেলেন এবং মৃদু হাসলেন! তখন রাসূলুল্লাহ (রা.) বললেন, আমার সাথে ঈসা বিন মরিয়মের দেখা হল, তিনি তওয়াফ করছেন এবং তাঁর সাথে দু'জন ফিরিশতা রয়েছে। তিনি আমাকে সালাম দিলেন এবং আমি সালামের জবাব দিলাম।' এ ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় যে, পবিত্র কা'বার তওয়াফের জন্য সবাই আগ্রহী।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বাইতুল্লাহর তওয়াফ নামাযের সমতুল্য। সাবধান! এতে ব্যতিক্রম হচ্ছে, এতে আল্লাহ কথা বলা জায়েয করেছেন, কেউ কথা বললে সে যেন ভাল কথা ছাড়া খারাপ কথা না বলে।' হাজ্জাজ বিন আবি রোকাইয়া বলেন, আমি কা'বা শরীফের তওয়াফ করছিলাম। তখন আমি ইবনে উমর (রা.) কে দেখি। ইবনে উমর বলেন, হে ইবনে আবি রোকাইয়া, বেশী বেশী করে তওয়াফ কর, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে এ ঘরের তওয়াফ করতে করতে পা ব্যথা করে ফেলেছে, বেহেশতে তার পা'কে আরাম দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। ফকেহী কা'আব থেকে উল্লেখ করেছেন যে, তিনশত রাসূল বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেছেন এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন তাদের সর্বশেষ রাসূল। এ ছাড়াও ১২ হাজার বুজুর্গ লোক এ ঘরের তওয়াফ করেছেন; মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ার আগে তারা হিজরে ইসমাঈলের নামায পড়েছেন। তাঁদের কেউ তওয়াফে আল্লাহর যিকির ব্যতীত অন্য কোন কথা-বার্তা বলেননি। তাওয়াফে, তাঁদের কেউ আসরের নামাযের পর এবং মাগরিবের আগে নামায পড়েননি। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর যিকর কায়েমের জন্যই বাইতুল্লাহর তওয়াফের বিধান চালু করা হয়েছে।।' হযরত আলী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তওয়াফকারী মানুষের দিকে তাকালেন এবং বললেন, হে মানুষেরা! আল্লাহর হামদ ও তাকবীর বল। তওয়াফকারীরা ঐ কথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণ-গান করলেন। (ফাকিহী) আ'তা বিন আবী রেহাব বলেছেন যে, জীবিত ও মৃত লোকের পক্ষ থেকে তওয়াফ করা যায়। হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর 'কাসওয়া' নামক উটের উপর সওয়ার ছিলেন এবং একটি কালো চাদর পরা ছিলেন। তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল। তওয়াফের সময় সে লাঠি দিয়ে তিনি হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীর উপর আরোহণ করে বাইতুল্লাহ তওয়াফ এবং সাফা মারওয়ার সাঈ করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভিড়ের ভিতর যেন তিনি সবাইকে দেখেন এবং লোকেরা যেন তাঁকে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারে। (ফাকেহী) আল্লাহর ঘর-বাইতুল্লাহ তথা কা'বা শরীফ যমীনের উপর আল্লাহর বিরাট নিদর্শন। এটি একটি বরকতপূর্ণ স্থান। এ স্থানের মর্যাদা ও পবিত্রতার জন্যই আল্লাহ এখানে এতো ফযীলতের ব্যবস্থা রেখেছেন।
📄 বাইতুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ক’টি বৈশিষ্ট্য
১. পেশাব-পায়খানা করার সময় বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে কিংবা পিঠ দিয়ে বসা হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, 'তোমাদের কেউ যদি পেশাব পায়খানার জন্য উন্মুক্ত মাঠে যায়, সে যেন আল্লাহর কিবলার সম্মান করে এবং কিবলামুখি হয়ে না বসে।'
২. কা'বা শরীফে সিল্কের পর্দা বা গেলাফ ব্যবহার করা জায়েয। ইমাম গাযালী (রাহ.) তাঁর ফতোয়ায় বলেছেন, কুরআন শরীফকে সোনা দিয়ে এবং কা'বা শরীফকে সিল্ক দিয়ে সাজানো জায়েয আছে। কা'বা ব্যতিত অন্য কিছুতে তা জায়েয নেই। পুরুষের জন্য সিল্ক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কা'বা সাজানো উত্তম। আল্লাহ বলেছেন, 'বল আল্লাহর সৌন্দর্যকে হারাম করেছে? বিশেষ করে অহংকার ও গর্ব প্রকাশের জন্য না হলে, স্বাভাবিক সৌন্দর্য প্রকাশের বেলায় তা অবশ্যই জায়েয।
৩. হযরত আয়িশা (রা.) বলেছেন, আমার নিকট কা'বা শরীফে সোনা রূপা উপহার দেয়ার চেয়ে কা'বা শরীফে সুগন্ধি লাগানো অপেক্ষাকৃত বেশী উত্তম। তিনি বলেছেন, তোমরা কা'বা শরীফে সুগন্ধি লাগাও, এটি কা'বাকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার অন্তর্ভুক্ত। এ বলে তিনি কুরআনের একটি নির্দেশের দিকে ইঙ্গিত দেন। সেটি হচ্ছে: 'আমার ঘরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কর'। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রা.) কা'বা শরীফের ভিতরের সকল অংশে সুগন্ধি মেখেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন যুগে কা'বার বাইরে তওয়াফের ও ভিতরে সুঘ্রাণযুক্ত ধোঁয়া দেয়ার প্রথা চালু ছিল। ভিতরেও সুঘ্রাণযুক্ত ধোয়া দেয়া হত। এতে করে তওয়াফের লোকেদের ভাল হত। দেহ ও মনের খুশি সঞ্চার হত।
৪. আল্লাহ কা'বাকে কুচক্রী ও ধ্বংসাত্মক লোকদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং কা'বা ধ্বংসকারীদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। সূরা ফীলে আবরাহা বাদশাহর হস্তীবাহিনীকে তিনি ধ্বংস করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যারা এ ঘরের ক্ষতি করতে চাইবে আল্লাহ তাদেরকে উন্মুক্ত ময়দানে ধ্বংস করে দিবেন।'
হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, আমরা শুনে আসছিলাম যে, আসাফ ও নায়েলা জোরহাম গোত্রের দু'জন নারী ও পুরুষ ছিল। তারা কা'বার অঙ্গনে অন্যায় কাজ করায় আল্লাহ তাদেরকে দুটো পাথরে পরিণত করে দিয়েছেন। জাহেলিয়াতের যুগে একজন মেয়েলোক কা'বায় এসে স্বামীর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় কামনা করছিল। এক ব্যক্তি তার দিকে খারাপ নিয়তে হাত বাড়ালে, তাঁর হাত অবশ হয়ে যায়। আয্যাওয়ী বলেছেন, সে ব্যক্তিটি ছিল হুয়াইতাব। আমি তাকে ইসলামী যুগেও অবশ দেখেছি। কেননা, সে কা'বার সম্মান রক্ষা করেনি।
এক ব্যক্তি কা'বার তওয়াফ করছিল। তখন তওয়াফে এক সুন্দরী রমণীর খোলা হাত বিদ্যুতের মত চমকাতে দেখে তার হাতের উপর নিজের হাত রেখে যৌনাকর্ষণ উপভোগ করতে লাগলো। এতে দু'জনের হাত এমনভাবে লেগে গেল যে আর খোলা যাচ্ছিল না। ঐ দু'জন অন্য এক নেককার ব্যক্তির কাছে গিয়ে তাদের হাত খোলার জন্য দোয়ার অনুরোধ জানালো। তিনি দু'জনকে তাদের হাত আটকে যাওয়ার ঘটনাটি জিজ্ঞেস করায় তারা তা খুলে বলল। তিনি দু'জনকে উপদেশ দিলেন, তোমরা যে জায়গায় ঐ পাপ কাজটি করেছ সে জায়গায় ফিরে যাও এবং আল্লাহর কাছে তওবা ও অঙ্গীকার কর যে, তোমরা আর কখনও অনুরূপ কাজ করবে না। তারা ঐ রকম তওবা করায়, শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিল।
আরেকটি প্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে, ইয়েমেনের বাদশাহ তুব্ব'র ঘটনা। তাঁর আসল নাম ছিল আসআদ। তিনি প্রাচ্যের কোন দেশে গিয়েছিলেন। মক্কা ও মদীনার পথে স্বদেশে রওনা হন। মদীনা থেকে বিরাট সেনাবাহিনীসহকারে মক্কার দিকে রওনা হলে পথে হোজাইল গোত্রের একটি দলের সাথে তাঁর দেখা হয়। তাঁরা তাকে মক্কার কাবা ধ্বংস করে, এর পরিবর্তে ইয়েমেনে অনুরূপ একটি কাবা তৈরির জন্য উৎসাহিত করে এবং বলে যে, এখন থেকে যদি ইয়েমেনে হজ্জের ব্যবস্থা করা হয়, এতে বাদশাহর আয় ও মর্যাদা বাড়বে এবং তাঁর দেশ পূর্ণ আবাদ হবে। একথা শুনে, বাদশাহ রাজী হন এবং কা'বা শরীফ ভাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু তার কাফেলার একটি পশুও চলল না। ঘোর অন্ধকার নেমে আসল এবং প্রচ ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। বাদশাহ বিভিন্ন রোগ শোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ল এবং তীব্র মাথা ব্যথা শুরু হল। বাদশার দু'চোখ থেকে পানি বের হল এবং গালের উপর দিয়ে বইতে শুরু করল। তাঁর মাথায় এমন এক বীভৎস রোগ শুরু হল যে, তা থেকে পঁচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হতে লাগল। দুর্গন্ধের কারণে তার কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। তাঁর সাথে যে সকল পাদ্রী ও ডাক্তার ছিল, তারা বাদশাহর রোগ ও বীভৎস দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। মৃত গাধার পঁচা দুর্গন্ধের মতই বাদশার মাথা থেকে পুঁজের দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। তারা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি বাইতুল্লাহর ব্যাপারে কোন খারাপ পরিকল্পনার চিন্তা করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তারপর তিনি তাঁর পরিকল্পনা তাদের কাছে প্রকাশ করলেন এবং হোজাইল গোত্রের একদল লোকের পরামর্শ সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করলেন।
এসব শুনে তাঁরা বলল, হোজাইল গোত্র আপনাকে, আপনার সেনাবানিীকে এবং আপনার সাথে আরো যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়েছেন। এটি হচ্ছে আল্লাহর ঘর। কেউ এ ঘরের ক্ষতি করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেই ছাড়েন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন এখন উপায় কি? তারা জবাবে বলল, এখন আপনি এ ঘরের কল্যাণ কামনা করুন, এর সম্মান করুন, এতে গিলাফ পরান, এ ঘরের কাছে কুরবানী করুন এবং এ ঘরের অধিবাসীদের সাথে ভাল ব্যবহার করুন। বাদশাহ তাই করলেন। ফলে অন্ধকার চলে গেল, ঝড় বন্ধ হয়ে গেল, সওয়ারী পশুগুলো চলা শুরু করল, রাজার চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে এলো, তার মাথা সুস্থ হয়ে উঠলো। বাদশাহ খারাপ নিয়ত থেকে তওবা করলেন এবং সেনাবাহিনীকে ইয়েমেনের দিকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নিজে মক্কায় কিছুদিন থাকলেন এবং প্রত্যেক দিন একশত উট কুরবানী করে মক্কার বাসিন্দাদেরকে খাওয়ালেন। তিনি কা'বা শরীফে গিলাফ পরালেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সাতশত বছর আগে এ ঘটনা ঘটেছিল। আল্লাহ তাঁর ঘরকে যে কোন যালিমের হাত থেকে রক্ষা এবং একে সর্বাবস্থায় সুরক্ষিত রাখেন। এজন্য এ ঘরের অপর নাম হচ্ছে 'আতীক'। কেউ এ ঘর ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ কুরআন মাজীদে বলেছেন, 'কেউ অন্যায়ভাবে এতে কুফরী করলে, আমি তাদেরকে কষ্টদায়ক আযাবের স্বাদ গ্রহণ করাব'।
৫. যে ব্যক্তি কাবা শরীফকে স্বপ্নে দেখবে, তার সে স্বপ্ন সঠিক, (তাবারানী)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে আমাকে ঠিকই দেখে কেননা শয়তান আমার এবং কা'বার ছবি ধারণ করতে পারে না অর্থাৎ শয়তান এ দুটো জিনিসের রূপ ধারণ করতে পারে না।
৬. কা'বা শরীফ একটি আবাদকৃত ঘর। মানুষ তওয়াফের মাধ্যমে সর্বদা একে আবাদ করে। মুহাম্মদ বিন আব্বাস বিন জাফর কিবলার দিকে মুখ করে বলতেন, 'আমার রব এর একটি মাত্র ঘর, কি সুন্দর, তিনি মনোরম! আল্লাহর শপথ, এটি আবাদকৃত ঘর'। কেউ কেউ বলেছেন, বাইতুল মা'মুর হচ্ছে সে ঘর যা হযরত আদম (আ.) প্রথমেই দুনিয়ায় এসে নির্মাণ করেন। হযরত নূহ (আ.) এর প্লাবনের সময় সে ঘরটিকে আল্লাহ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং দৈনিক ৭০ হাজার ফিরিশতা এর তওয়াফ করে। আরবীতে, (ফিরিশতা) শব্দের একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে দূরে অবস্থানকারী। ফিরিশতাদের তওয়াফের ঘর যমীন থেকে আসমানে সরিয়ে দেয়ার কারণে, ফিরিশতারাই যেন দূরে সরে গেল। তাই তাদেরকে দূরে অবস্থানকারী' বলা হয়। আবু তোফায়েল (রা.) বলেন, হযরত আলীকে (রা.) 'বাইতুল মামুর' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, সেটাতো কা'বা শরীফ বরাবর দূরে অবস্থিত। এতে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং তাঁরা এতে কিয়ামত পর্যন্ত ২য় বার আর প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। 'বাইতুল মামুর' কোন আসমানে অবস্থিত তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, প্রথম আসমানে, কারো মতে, ৪র্থ আসমানে, কারো মতে, ৬ষ্ঠ আসমানে, কারো মতে, ৭ম আসমানে এবং কেউ কেউ অন্যমত পোষণ করেন। বুখারীতে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি বাইতুল মা'মুরে ৭০ হাজার ফিরিশতাকে প্রবেশ করতে দেখেছেন এবং তাঁরা এতে আর ২য় বার ফিরে আসবে না।' এইভাবে প্রত্যেকদিন ৭০ হাজার ফিরিশতা এ ঘরে আসে।
৭. ইবনে হিশাম তাঁর সীরাতুন্নবী বইতে লিখেছেন, হযরত নূহ (আ.) এর সময়ের বন্যার পানিতে কা'বা শরীফের আশ-পাশ পানিতে ডুবে গেলে, কা'বা শরীফ আসমানের নীচে বাতাসের মাঝে শূন্যে বিরাজ করতে থাকে। তখন হযরত নূহ (আ.) এর নৌকা কা'বা শরীফের চার দিকে তওয়াফ করতে থাকে। নূহ (আ.) নৌকার যাত্রীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, "তোমরা আল্লাহর হারামে এবং আল্লাহর ঘরের পার্শ্বে আছ, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশের জন্য ইহরাম কর এবং কেউ যেন কোন মেয়েলোক স্পর্শ না করে। তিনি পুরুষ ও মেয়েলোকের মাঝখানে পর্দা করে দিলেন।
৮. হাশরের দিন কা'বা শরীফকে বিবাহিতা সুসজ্জিতা কনের মত উঠানো হবে। যত লোক হজ্জ করেছে তাঁরা এর গিলাফ ধরে থাকবে এবং এর চতুষ্পার্শ্বে চলতে থাকবে যে পর্যন্ত না কা'বা শরীফ জান্নাতে প্রবেশ করে। তখন তারা সবাই একই সাথে বেহেশতে প্রবেশ করবে। ইমাম গাযালী এহইয়াউল উলুম গ্রন্থে এ হাদীসটিকে 'বাইতুল্লাহ ও মক্কার ফযীলত' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।
৯. এ ঘর সৃষ্টির পর থেকে এর ইবাদত এবং তওয়াফ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ নেই। মানুষ, জীন কিংবা ফিরিশতাদের অনেকেই সর্বদা এর তওয়াফ করেই যাচ্ছে।