📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)

📄 ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)


পূর্ণ বয়স্কদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাজ কি? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দেন, হে আবু বকর আমার যে কাজ, তোমারও উচিত সে কাজের অনুসরণ করা অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো। তিনি সে মুহূর্ত থেকে দাওয়াত ও তাবলীগ শুরু করেন এবং প্রথম দিনেই ছয় মতান্তরে চার জন বিখ্যাত সাহাবীকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আবু বকরের আমলের পাল্লা, সারা উম্মতে মুহাম্মদীর আমলের পাল্লার চেয়েও ওজনদার। কেননা, তিনি ইসলামের প্রথম দিন থেকে শুরু করে সবচেয়ে সফলভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। এমনকি পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় দশ সাহাবী, যারা বেহেশতের সুসংবাদ পেয়েছেন; তাদের ছয়জনই আবু বকরের (রা.) অর্জন। তিনি ছিলেন দাওয়াত ও তাবলীগের মহীরুহ (বটবৃক্ষ)।

আবু বকর (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অহী নাযিলের ঘটনা শোনামাত্র চিৎকার করে কলেমা পাঠ করেন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। বালক আলীর (রা.) পর তিনিই প্রথম পুরুষ, যিনি বিনাবাক্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকর (রা.) ছিলেন আরবের খ্যাতনামা ব্যক্তি। বন্ধুমহলে তাঁর প্রচুর খ্যাতি ও গ্রহণ যোগ্যতা ছিল। তাই আবু বকর (রা.) বন্ধু মহলে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করে সফল হন। ওসমান, সায়াদ ইবনে ওয়াক্কাস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, তালহা, জুবায়ের (রা.) এর মত মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ প্রধানগণ আবু বকরের দাওয়াত ও তাবলীগের ফসল।

আবু বকর (রা.) শতসহস্র দাস-দাসীর মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগ করেন এবং সফল হন। তিনি শত শত দাস-দাসীকে যুলুম থেকে উদ্ধার করেন। এদের মাঝে জগৎ বিখ্যাত সাহাবী বিলাল, খাব্বাব, আমর ইবনে ইয়াসের (রা.) প্রমুখ রয়েছেন। যাদেরকে উচ্চমূল্যে তাঁদের নিষ্ঠুর মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করে মুক্ত করে দিয়েছিলেন কোমল প্রাণের অধিকারী আবু বকর (রা.)।

তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে ভয়াবহ অর্থকষ্ট ছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে আহবান জানালেন। ওসমান এবং ওমর (রা.) তাঁদের সম্পদের অর্ধেক পেশ করলেন। আর আবু বকর তাঁর পুরো সম্পদ দান করে বললেন, আমি ঘরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি। তখন ওমর (রা.) বলেছিলেন, ইসলামের সেবায় কেউ আবু বকরকে (রা.) অতিক্রম করতে পারবে না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মি'রাজের ঘটনা মক্কাবাসীর মাঝে ব্যক্ত করলেন, তখন সকলেই তাঁকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা শুরু করল। এ ঘটনায় কেউ হতবাক হলেন, কেউ বিস্মিত হলেন, কেউ দ্বিধান্বিত হলেন, কেউ চিন্তিত হলেন। আর কাফিররা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাগল বলতে লাগল (নাউযু বিল্লাহ)। সবাই আবু বকরের (রা.) কাছে গেল। তিনি মি'রাজের ঘটনা শুনে বললেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন তা সত্য। আবু বকর (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এতটুকু নিশ্চিত হলেন যে, তিনি ঐ কথা বলেছেন কিনা? এরপর উচ্চৈঃস্বরে আবু বকর (রা.) কলেমা পাঠ করলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূল যা বলেন সবই সত্য। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বললেন, তিনি সিদ্দিক (সত্যবাদী ও বিশ্বাসী)। এরপর থেকেই আবু বকরের (রা.) নাম সিদ্দিক হয়ে যায়।

মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয়সাথী আবু বকরকে নিয়ে মদীনার পথে হিজরত করেন। পথিমধ্যে গুহার মাঝে তিনদিন অবস্থান করেন। গুহায় বিষধর সর্পের দংশনে আবু বকর (রা.) কাতর হয়ে যান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুখের লালা দংশিত স্থানে লাগান এবং আবু বকর (রা.) সুস্থ হয়ে উঠেন। আবু বকর গুহায় চিন্তিত হলে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ বলে আশ্বাস দেন যে, তুমি চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। এ ব্যাপারে আবু বকর (রা.) ও বিশ্বনবীকে নিয়ে আল-কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে। (তওবা : ৪০)

আবু বকর (রা.) কে স্বয়ং আল্লাহপাক সালাম পেশ করেছেন। জিব্রাঈল (আ.) সে সালাম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন। মসজিদে নববীতে আবু বকরের (রা.) দরজা সব সময় খোলা ছিল ও থাকবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আমি প্রেম ও ভক্তিতে আবু বকরকেই (রা.) শ্রেষ্ঠ মনে করি। এ মসজিদের সমস্ত দরজা বন্ধ থাকবে, কেবল মাত্র খোলা থাকবে আবু বকরের (রা.) দরজা।

ওহুদের যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্তে পড়ে গেলে, আবু বকর (রা.) তাকে টেনে তোলেন। যুদ্ধে আবুবকর (রা.) তাঁর ছেলেকে (তখনও সে মুসলমান হয়নি) হত্যা করতে উদ্ধত হন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরকে বারণ করেন। ইসলামের সেবায় আবু বকর এতটাই দৃঢ়চেতা ও নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। পরিখার (খন্দকের) যুদ্ধে আবু বকর নিজের জামায় বেঁধে মাটি উত্তোলন করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়, সকল সাহাবারা যখন মন কষ্টে চুপ করে থাকেন। তখনও একমাত্র আবুবকর (রা.) বিশ্বনবীকে অনুসরণ করেন। সকলকে বুঝাতে থাকেন ও বুঝাতে সক্ষম হন যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ইঙ্গিতেই এ সন্ধিতে সম্মতি দিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের দিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই উটে বসেছিলেন আবুবকর (রা.), ঠিক যেভাবে একই উটে বসে মক্কা থেকে মদিনার পথে হিজরত করেছিলেন। এভাবে সুখে দুখে সবসময়ই আবু বকর (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থেকেছেন।

বিশ্বনবীর জীবদ্দশাতেই মসজিদে নববীতে ১৭ ওয়াক্ত নামাযের ইমামতি করেন আবু বকর (রা.)। এমনকি তিনি স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে ইমামতির সুযোগ পেয়েছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন জীবন সায়াহ্নে। জুমার নামাযে ইমামতি করছেন আবু বকর (রা.)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামাগুড়ি দিয়ে, সাহাবাদের কাঁধে ভর দিয়ে পিছনে নামায পড়তে এলেন। আবু বকর (রা.) ইমামতির স্থান ত্যাগ করতে চাইলে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে নামায পরিচালনার নির্দেশ দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পাশে বসে নামায আদায় করেন। এভাবেই সেদিন আবু বকর (রা.) পূর্ণ মানবের পরিপূর্ণ প্রতিনিধি হয়ে ইসলামের দুর্লভ সম্মানের অধিকারী হয়ে যান। তিনি ইসলামের অদ্বিতীয় ইমাম। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সময় বলেন, আমি যদি আল্লাহকে ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে নিজের অবর্তমানে আবু বকর (রা.)-কে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করে যান।

কথিত আছে একবার জিব্রাইল (আ.) আবু বকরের কাছে মানুষের আকৃতিতে এসে প্রশ্ন করেন, হে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) আপনি কি বলতে পারবেন, এ মুহূর্তে জিব্রাঈল (আ.) কোথায়? আবু বকর (রা.) চোখ বন্ধ করলেন এবং তাকালেন। বললেন, আমি আকাশ ও যমীনে কোথাও জিব্রাঈল (আ.) কে খুঁজে পেলাম না। আর আমি যেহেতু আবু বকর; অতএব আপনিই ফিরিশতা জিব্রাঈল (আ.)। আল্লাহপাক আবু বকর (রা.) কে এতটাই যোগ্যতা দিয়েছিলেন। ফিরিশতা জিব্রাঈল (আ.) আবু বকরের এমন আধ্যাতিক যোগ্যতা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান। দাওয়াতের ময়দানে কুরবানী করতে করতে আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সবসময় জুড়ে থাকার কারণে আবু বকরের (রা.) ভিতর তাকওয়া, দ্বীনকে মানা এবং ঈমানের এমন এক যোগ্যতা অর্জিত হয়েছিল, যা অন্য কোন মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ যাকে ভালবাসেন, মহাবিশ্ব তাকে মর্যাদা করে এবং দুনিয়া তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। এটাই জগতের নিয়ম। আবু বকর (রা.) এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

এক বর্ণনায় এসেছে, কিয়ামতের পর হাশরের ময়দানে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। মানুষ নিজেদের ঘামে সাঁতার কাটতে থাকবে। সবাই বলতে থাকবে আমার কি হবে? আমার কি হবে (ইয়া নাফসী! ইয়া নাফসী!)। সূর্য মাথার কাছাকাছি চলে আসবে। ঘিলু বা ব্রেইন টগবগ করে ফুটতে থাকবে। আল্লাহপাক ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করবেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কাহহার; কঠিন হিসাব গ্রহণকারী; যথার্থ প্রতিদানকারী। কে আছ? কাকে আমার সামনে পেশ করবে? কে বিচারের জন্য প্রস্তুত? নবী রাসূলরা দিশেহারা হয়ে যাবেন। সকল নবী রাসূলরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরণাপন্ন হবেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সামনে যাবেন এবং বিচারের জন্য আবু বকরকে আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। ফলশ্রুতিতে সেদিন কঠিন ও ভয়ঙ্কর মেজাযের আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাঁর কাহহার মূর্তি হতে অতি শীতল হয়ে যাবেন। আল্লাহ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলবেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তুমি কাকে আমার কাছে পেশ করলে? আমি আবু বকরের প্রতি এত বেশী রাজিখুশী যে, তাঁর বিচার করতে লজ্জাবোধ করছি। যে আবু বকর দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য; ইসলামের জন্য; নিজের জান, মাল, সময় দিল, দিমাক ও হিকমতকে শতভাগ কুরবানী করে দিয়েছে। সে আবু বকরের কি বিচার করব আমি? মহান আল্লাহপাকের এ উক্তিতে বিশ্বের সকল নবী রাসূলরা অভিভূত ও লজ্জিত হয়ে যাবেন। উম্মতে মুহাম্মদীর মর্যাদা এবং কুরবানী আল্লাহপাকের কাছে কতটাই পছন্দনীয়। আর এ আবু বকরের (রা.) পিছে লক্ষ কোটি মুসলমান- যারা তার দ্বারা হিদায়াত পেয়েছে এবং পরবর্তীতে এ সিলসিলা চালু রেখেছে; সকলেই বিশাল কাফেলার আকারে বেহেশতে প্রবেশ করবে। অন্যান্য নবী রাসূলরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবেন। ভাববেন এ আবার কোন নবী? তার তো কোন নাম শুনিনি। হযরত আবু বকর দাওয়াত ও তাবলীগের কুরবানীর বিনিময়ে এতটাই মর্যাদা লাভ করেছেন এবং হাশরের ময়দানে পুনরায় মর্যাদার চূড়ায় অবস্থান করবেন।

আবু বকর (রা.) মৃত্যুর সময় কন্যা আয়িশাকে (রা.) বলেন, আমার গায়ে দু'টুকরা কাপড় আছে, আরেক টুকরা যোগাড় করে কাফন দিও (তিন টুকরাতে কাফন হবে)। তিনি সোমবার দিন অতি দ্বীনহীনভাবে আয়িশার (রা.) কোলে মাথা রেখে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার সম্পদ হিসেবে ছিল, একজন হাবশী গোলাম, একখণ্ড বস্ত্র ও একটি উট। তিনি মাত্র দু'বছর খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৩ হিজরী বা ৬৩৪ খ্রীঃ মাগরিব ও এশার নামাযের মাঝামাঝি সময় রোজ সোমবার ৬৩ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। সমগ্র মুসলিম জগতে স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া যেকোন সংকটময় মুহূর্তে, যে কোন সমস্যার সমাধান কল্পে, পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি প্রয়োগে আবু বকরের (রা.) মত এত পারদর্শী কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ তাফসীরকারক, শ্রেষ্ঠ মুফতী এবং অন্যতম সংস্কারক।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত (ইন্তিকালের) পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় সাহাবাদের মাঝে চরম বিশৃংখলা দেখা দেয়। এমনকি ওমর (রা.) খোলা তরবারী নিয়ে চিৎকার করতে থাকেন। যে বলবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেই; তাকে আমি কতল করে ফেলব। ঠিক তখন আবু বকর (রা.) শক্ত হাতে দৃঢ় মনোবলের সাথে সমস্ত ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেন। আবু বকর (রা.) বলেন, তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদত করে; সে জানুক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিশ্চয় ইন্তিকাল করেছেন এবং তোমাদের মাঝে যে, আল্লাহর ইবাদত করে, সে জানুক আল্লাহ চিরজীবিত; তিনি কখনও মরেন না। তিনি আল-কুরআনের দু'টি আয়াত পাঠ করেন। "মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নবী ব্যতীত কিছু নন; তাঁর পূর্বেও বহু নবী গত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন, তাহলে কি তোমরা বিমুখ হবে? যারা বিমুখ হবে, তারা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহ সত্বর কৃতজ্ঞ বান্দাদের প্রতিদান দেন." "হে মুহাম্মদ; তোমাকে এবং তাদের সকলকেই মরতে হবে." এরপর সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সবাই একে একে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য দোয়া করেন। আবু বকর (রা.) তার মেধা, দৃঢ়তা ও ঈমানী শক্তি দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামের পর তিনিই প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন এবং সফলভাবে দ্বীনের কাজ করেন। তার দাওয়াতের কর্মকাণ্ডে ও শাসনামলে বিধর্মীরা দলে দলে ইসলামে দীক্ষা লাভ করে। আবু বকরই ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সেবক, শ্রেষ্ঠ খলিফা, শ্রেষ্ঠ নবী প্রেমিক, শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ সিদ্দিক বা বিশ্বাসী এবং শ্রেষ্ঠ মুসলমান। তিনি উম্মে মুহাম্মদীর সর্বশ্রেষ্ঠ দায়ী।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)

📄 ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)


তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। আবু বকরের (রা.) ইন্তিকালের সময়, মুসলিমদের খেলাফতের জন্য একজন দাবীদার ছিলেন। ইনি হলেন হযরত তালহা (রা.)। তিনি সম্পর্কে আবু বকরের (রা.) আত্মীয় ছিলেন। তিনি যোগ্যও ছিলেন বটে। তিনি আবু বকরের নিকট গিয়ে বললেন, খলিফা, আপনি ওমর (রা.) কে ২য় খলিফা হিসেবে মনোনীত করতে যাচ্ছেন। আপনি কি জানেন না, ওমর কত রূঢ়। তার ব্যবহার কত কঠিন? আপনি এব্যাপারে আল্লাহর কাছে কি জবাব দিবেন? তালহার (রা.) এ কথা শুনে আবু বকর (রা.) উত্তেজিত হয়ে জবাব দিলেন, তুমি কি আমাকে আল্লাহর ভয় দেখাতে এসেছ? আমি আল্লাহর নামে শপথ করেই বলছি, আমি আল্লাহকে গিয়ে বলব একজন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে এসেছি। এই হচ্ছে ওমর (রা.)। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের সনদ দিচ্ছেন, বিশ্বের আরেক শ্রেষ্ঠ মনীষী আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমিই শেষনবী। এরপর যদি নবী থাকতো, তবে ওমর (রা.) হত সে নবী। দাওয়াতের ময়দানে কাজ করতে করতে তিনি এত বড় যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, শ্রেষ্ঠ বিচারক, শ্রেষ্ঠ ইসলাম প্রচারক তথা ইসলামী রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্প্রসারণকারী হলেন ওমর (রা.)। আরব দেশে একটি প্রবাদ বাক্য খুবই প্রচলিত ছিল, সব লম্বা লোকই বোকা একমাত্র ওমর ব্যতীত। পা থেকে মাথা পর্যন্ত অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ওমর (রা.) যেমন জ্ঞানী ছিলেন, তেমনি বীর ও শক্তিশালী ছিলেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সকল নবীর দু'জন করে আসমানী ও যমিনী উজির বা উপদেষ্টা থাকে। আমার দু'জন আসমানী উপদেষ্টা হলেন জিব্রাঈল ও মিকাইল (আ.) এবং যমিনী উপদেষ্টা হলেন আবু বকর ও ওমর ফারুক (রা.)।

আরবের বীর ও সাহসী যুবক ওমর (রা.) যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেন, সেদিন প্রথম মুসলমানরা দলগতভাবে কা'বা তাওয়াফ করে সেখানে নামায আদায় করেন। মুসলমানরা প্রকাশ্যে নিজেদের মুসলমান হওয়ার ব্যাপার ঘোষণা করতে থাকেন। সেদিন থেকেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে স্বমহিমায় ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। মক্কায় এতে স্পষ্ট পার্থক্য ফুটে উঠে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজন্যে ওমর (রা.) কে 'ফারুক' বা পার্থক্যকারী উপাধিতে ভূষিত করেন অর্থাৎ ওমরের (রা.) ইসলামে যোগদান করায় মুসলমানদের কাজে-কর্মে ও দ্বীন প্রচারে নতুন জোয়ার আসে।

ওমরের (রা.) দশ বছরের শাসনামলে পবিত্র মক্কার উত্তর দিকে ১৩৬ মাইল এবং পূর্বের পুরাটাই বিজিত হয়। প্রায় সাড়ে বাইশ লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় ইসলাম কায়েম হয়। তিনি তীক্ষ্ম বুদ্ধি, দূরদর্শী, বীর যোদ্ধা ও আল্লাহপাকের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন।

ওমর (রা.) বিশ্বনবীর সাথে ২৩টি যুদ্ধ ও অভিযানের সবগুলোতেই অংশগ্রহণ করে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যখন ভয়াবহ শোচনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়। যে সময় খালিদ বিন ওয়ালিদ (তিনি তখনও মুসলমান হননি) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের উপর অতর্কিত হামলা করেন। এ সময় কয়েকজন আনসারকে নিয়ে ওমর (রা.) প্রতিহত করে, খালিদকে তাড়িয়ে দেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন।

ওহুদ ও হুদাইবিয়ার সন্ধিসহ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওমর (রা.) বিশ্বনবীর মতের বিপরীতে মত পোষণ করেন। আল্লাহপাক প্রায় সকল ক্ষেত্রে ওমরের (রা.) দৃঢ়তার এবং বিচক্ষণ পরামর্শের ব্যাপারে একমত পোষণ করে আয়াত নাযিল করেছেন। এতে ওমরের (রা.) দূরদর্শী, বিচক্ষণতা, দৃঢ় ঈমান এবং আল্লাহ প্রেমের নিদর্শন ফুটে উঠে। তাবুকের যুদ্ধের সময় প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ থাকা সত্ত্বেও ওমর (রা.) তার সম্পদের অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন।

ওমরের (রা.) মহানুভবতা, ঈমানী জোশ, কঠোর পরিশ্রম, কঠিন সংযম, চরম ন্যায় বিচার এবং অতি সাধারণ জীবন যাপনের ফলে তাঁর দশ বৎসরের শাসনামলে বহু রাজ্য জয় হয় এবং ইসলামের আওতায় আসতে বাধ্য হয়। ওমর (রা.) শাসন ও কর্মকর্তা নিয়োগের সময় এ শপথ বাক্য পাঠ করাতেন: আমি কোনদিন মিহি কাপড়ের পোশাক পরব না; মিহি আটার রুটি খাব না; দরজায় দারোয়ান নিযুক্ত করব না; জনসাধারণের জন্য দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রাখব; তুর্কী ঘোড়ায় সওয়ার হব না (অর্থাৎ দামী যানবাহন ব্যবহার করব না)। কতটুকু সৎ ও জনদরদী হলে, কোন বাদশা এমনটি করতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়।

বর্ণিত আছে, একবার মদীনার কোথাও আগুন লাগলে ওমর (রা.) আগুনকে চিরকুট লিখে দেন- হে আগুন আল্লাহর হুকুমে নিভে যাও এবং সত্যি সত্যিই আগুন নিভে যায়। ইতিহাসে বর্ণিত আছে মিশরের নীল নদে প্রতিবছর একজন করে যুবতীকে হত্যা করে রক্তে রঞ্জিত করা হত, যেন নীল নদ বহমান থাকে। অন্যথায় নীলনদ শুকিয়ে যেত। এরপর মিশর যখন ওমরের (রা.) শাসনের অন্ত র্ভুক্ত হয় তখন মিশরের গভর্নরের কাছে ওমর (রা.) একটি চিঠি লিখে পাঠান। যেখানে নির্দেশ ছিল: ওমরের (রা.) লেখা নীলনদকে নির্দেশ দেয়া চিঠি নীলনদে ফেলতে হবে। চিঠিতে লেখা ছিল: এটা মুসলিম জাহানের খলিফার কাছ থেকে লেখা চিঠি। এখন থেকে আল্লাহর হুকুমে হে নীলনদ, তুমি প্রবাহিত হতে থাকবে।

এরপর লক্ষ জনতার সামনে ওমরের (রা.) সে চিঠি নীলনদে নিক্ষেপ করা হলে, নীলনদ ফুসে উঠে বইতে থাকে এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত বইতে থাকবে। আল্লাহর সাথে কি ধরনের সম্পর্ক থাকলে এ কাজ সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। এ হচ্ছে মুসলিম জগতের ২য় খলিফা ওমর ফারুক (রা.)। ওমর (রা.) ৬৪৪ খ্রিঃ রোজ বুধবার ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রায় দশ বছর হুয়ামস ইসলামের খলিফা ছিলেন। তাঁর চরিত্র খোদাভীতি ও তাকওয়া ছিল পরিপূর্ণ। তিনি সমাজের মধ্যে পদ-পদবী ও ছোট বড়র মাঝে সাম্যের নমুনা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। রোম ও পারস্য সম্রাটের দূতেরা মদিনায় এসে খলিফা ও সাধারণ লোকের মাঝে পার্থক্য করতে পারত না। বর্ণিত আছে ওমর (রা.) গাছের নিচে ইঁট মাথায় দিয়ে ঘুমাতেন। রাতের গভীরে প্রজাদের অবস্থা নিজ চোখে দেখতে একাকী বের হতেন। এত কম ও অতিসাধারণ খাদ্য খেতেন যে, তাঁর গায়ের চামড়া খসখসে হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলতেন, “ওমরের রাজ্যে যদি একটা কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তবে হাশরের ময়দানে ওমরকে জবাবদিহি করতে হবে। এমন ন্যায়পরায়ণ বাদশা, ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান গনি (রা.)

📄 ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান গনি (রা.)


ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান (রা.) মক্কার গোত্রপতি, নেতা, ধনী এবং বংশীয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর চরিত্র এত মহৎ ছিল যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার তৃতীয় কোন মেয়ে থাকলে ওসমানের নিকট বিবাহ দিতাম।” উল্লেখ্য ওসমান (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’কন্যাকে পর পর (একজনের মৃত্যুর পর অপরজনকে) বিয়ে করেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দু’কন্যাই রাসূলের জীবদ্দশায় মারা যান। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরের মন্তব্য করেছিলেন।

ওসমান (রা.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সফরকারী বা হিজরতকারী দলের প্রধান ছিলেন। মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে ৬ষ্ঠ হিজরীতে মুসলমানদের প্রথম দল যখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করে, তখন সে দলের অন্যতম সঙ্গী হন ওসমান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী নবীকন্যা রুকাইয়া (রা.)। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী এবং দ্বীন রক্ষার জন্য হিজরতকারী হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে এটিই মুসলমানদের প্রথম কাফেলা।

ওসমান গণি (রা.) সর্বপ্রথম কুরআনকে পূর্ণ পুস্তক আকারে পেশ ও সংরক্ষণ করেন। জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনায় তিনি চুপ হয়ে যেতেন। আর কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমের সময় তিনি এত বেশী কাঁদতেন যে, তাঁর দাঁড়ি মোবারক ভিজে যেত। তিনি আরবের নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন। আরবে তাঁর চেয়ে বড় ও ধনী ব্যবসায়ী কেউ ছিল না। অধিক সম্পদের মালিক হওয়ার কারণে তাঁকে গণি বলা হত। তিনি প্রায় সকল সম্পদ ইসলামের খেদমতে পেশ করেছিলেন।

আল-কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় তিনি শহীদ হন। তার রক্তে আল-কুরআনের যে আয়াতটি রঞ্জিত হয়েছিল তা হল : আল্লাহ তোমার জন্য যথেষ্ট; তিনি শ্রবণকারী ও জ্ঞাত। বিদ্রোহীরা ওসমানকে (রা.) তার বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখে। তাকে খাবার পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর তার গৃহে প্রবেশ করে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল, ওসমানের (রা.) ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বেই বলে গেছেন, একটি ফিৎনায় তাকে নিরপরাধভাবে হত্যা করা হবে (তিরমিযী) এবং তাই হয়েছিল। এ সবই আল্লাহর ইচ্ছা।

ওসমান (রা.) যেমনি ধনী এবং দানবীর ছিলেন, তেমনি মিতব্যয়ী ছিলেন। একবার জনৈক লোক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে কিছু সাহায্য চাইলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে, ওসমানের (রা.) কাছে পাঠালেন। লোকটি ওসমানের (রা.) বাড়িতে এসে দেখেন, তিনি পিঁপড়ার মুখ থেকে সামান্য শস্য দানা সংগ্রহ করছেন। লোকটি ওসমানকে (রা.) কৃপণ ভেবে পুনরায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে পুনরায় ওসমানের (রা.) কাছে প্রেরণ করেন। লোকটি এবার ওসমানের (রা.) কাছে সাহায্য চাইলেন (সওয়াল করলেন)। এসময় ওসমানের (রা.) কাফেলা আসছিল। ওসমান (রা.) শস্যভর্তি উটের কাফেলার প্রথম উটটিকে দান করে দিলেন। লোকটি বিস্ময় এবং খুশীতে উট নিয়ে রওনা হলেন। কিন্তু দেখা গেল কাফেলার সমস্ত উট প্রথম উটের পিছে রওনা হয়েছে। দানবীর ওসমান (রা.) হেসে বললেন, ওহে বিদেশী, ঐ সমুদয় উটের কাফেলাই তোমার। লোকটি ওসমানের (রা.) এতবড় হৃদয় এবং দানশীলতা দেখে অভিভূত হয়ে তখনই দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যান।

একবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদ পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ওহুদ! শান্ত হও! তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং দু'জন শহীদ রয়েছে। এসময় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আবু বকর (রা.); ওমর (রা.) এবং ওসমান (রা.) ছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বাস্তবে পরিণত হয়। ওমর (রা.) কাফির গোলামের হাতে এবং ওসমান (রা.) বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। (বুখারী)

ওসমান (রা.) উন্নত শাসন ব্যবস্থা ও কর প্রবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ওসমান (রা.) কোমল প্রকৃতির ও সুন্দর ব্যবহারের মানুষ ছিলেন। তার সে সরলতা ও কোমলতার সুযোগে অনেকেই তার খিলাফতের সময় নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করত। তার মধ্যে কোন কঠোরতা ছিল না। তিনি সবাইকে সহজে বিশ্বাস করতেন এবং সরল জীবন যাপন করতেন। তিনি ইসলামের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন।

ওসমান (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সকল সামরিক যুদ্ধে ও অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এসব যুদ্ধ ও অভিযানে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ দান করেন। তাবুকের অভিযানে তার মত আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী লোক নিজস্ব সকল সম্পদের অর্ধেক সম্পদ দান করে ছিলেন।

ওসমান (রা.) মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আরবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আরবদের কাছে তার একটা প্রতিষ্ঠিত গ্রহণযোগ্যতা ছিল। হুদাইবিয়ার অভিযানেও তিনি কুরাইশদের সাথে মধ্যস্থতা করতে গিয়েছিলেন এবং বন্দী হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার সাহস, বীরত্ব ও বলিষ্ঠতার প্রকাশ অনুসরণযোগ্য। কেননা শত্রুদের কাছে এভাবে একাকী যাওয়াটা বীরত্বেরই বহিঃপ্রকাশ বটে।

তিনি খিলাফতের গুরু দায়িত্ব পালনে সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন। অপরদিকে প্রায়ই তিনি সারারাত জাগতেন এবং একই রাকাতে সমগ্র কুরআন মাজীদ খতমে তিলাওয়াত করতেন। প্রায়ই রোযা রাখতেন। কখনও কখনও মাসের পর মাস রোযা রাখতেন। তিনি খুব সামান্যই আহার করতেন। অথচ তিনি আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ছিলেন। প্রতিবছরই হজ্জ পালন করতেন এবং হজ্জের জামাতের আমীর হতেন। দাওয়াত ও তাবলীগে গভীর মনোনিবেশ করতেন। তিনি অনেক গোলাম, দাস-দাসীকে মুক্ত করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে এসেছেন। তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের কারণে অনেক নামকরা আরব ইসলামের ছায়াতলে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

তিনি জনহিতকর কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। রাস্তাঘাট, মসজিদ নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা করা, কূপ, খাল-নদী খনন ইত্যাদিতে প্রচুর ব্যয় করতেন। বন্ধু ও গরীব আত্মীয় স্বজন নিয়ে আহার করতেন। পোশাক-আশাকে অতি সাধারণ ছিলেন। কখনই দামি ও মিহি কাপড় পড়েননি। আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তি হয়েও অতি সাধারন জীবন যাপন করে, একজন পূর্ণ ও সফল মুসলমান হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন ওসমান গনি (রা.)।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ইসলামের চতুর্থ খলিফা মহাবীর হযরত আলী (রা.)

📄 ইসলামের চতুর্থ খলিফা মহাবীর হযরত আলী (রা.)


তরুণ/বালকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আলী (রা.) ইসলামের চতুর্থ খলিফা। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবের জৈষ্ঠ পুত্র এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবসময়ের সঙ্গী ও প্রিয় পাত্র ছিলেন। ছোট (বালক) বয়স থেকেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসবাস করা তথা কাছে থেকে দেখার সুবাদে তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গভীরভাবে জেনেছেন।

আলী (রা.) সারাটি জীবন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে ও সহচর্যে থেকে নিজেকে দ্বীনের জন্য উৎসর্গ করেছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যদি জ্ঞানের শহর হই, তবে আলী (রা.) তার দরজা। আলী (রা.) ইসলামের তত্ত্বজ্ঞান তথা আল্লাহপাকের গভীর মারিফাত হাসিল করেছিলেন।

তিনি অত্যন্ত সাহসী ও সমরবিদ ছিলেন। তিনি শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, সাহসী বীর ও শক্তিমান পুরুষ ছিলেন। বদর যুদ্ধের প্রারম্ভে সামনাসামনি সমরযুদ্ধে শত্রুদের বীর সেনাকে তরবারীর এক আঘাতে ভূলুণ্ঠিত করেছিলেন। খায়বারের বিজয় সূচিত হয় তার হাতে। সে যুদ্ধে খায়বার দুর্গের লোহার দরজাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন আলী (রা.)। যুদ্ধের পর তার ব্যবহৃত ঢাল, সাতজন শক্তিমান পুরুষও সম্মিলিতভাবে তুলতে সক্ষম হননি। তবে যুদ্ধে আলী (রা.) এটি কিভাবে ব্যবহার করেছেন, মহান আল্লাহই তা ভাল জানেন।

যুদ্ধের ময়দানে, তার বীরত্বে, হুংকারে, বাহুবলে, সাহসিকতায় ও কৌশলে যেকোন শত্রু সহজেই পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হত। সাহসে, বীরত্বে, শৌর্যে, বীর্যে ও সমরের শক্তিমত্তায় তাকে আল্লাহর সিংহ (শেরে খোদা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

ইসলামের ক্ষতি দেখলেই তিনি বজ্রের হুংকার দিতেন। শত্রুদের উপড় বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়তেন। পাশাপাশি তিনি সরল ও উদারতায় মহৎ প্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। জ্ঞানে-ত্যাগে-মহত্ত্বে-ইবাদতে-বীরত্বে সর্বত্রই তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ।

কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি ছিলেন জ্ঞান ও বিদ্যার মহাসাগর। তিনি বিখ্যাত কবি ছিলেন। রাসূলের জীবদ্দশায় যত যুদ্ধ হয়েছে, সবগুলোতেই আলী (রা.) বীর দর্পে অংশগ্রহণ করেন ও বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি আবির্ভূত হতেন সিংহের মত। মুহূর্তেই শত্রুকে ধরাশয়ী করতেন।

পুরুষদের মধ্যে তিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। অথচ তখন তিনি বালক। তিনি বালক অবস্থায় বিশ্বনবী ও মা খাদীজা (রা.) কে নামায পড়তে দেখতেন এবং এক সময় তিনিও তাদের পাশে এসে নামায পড়া শুরু করেন। অথচ মনে মনে এর পূর্বেই ইসলামের কলেমা পড়ে নেন। পিতা আবু তালিব তাকে ধর্ম বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি অকপটে ইসলাম ধর্মে দীক্ষার কথা স্বীকার করেন এবং বাকী জীবন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে কাটিয়ে দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। অথচ সে সময় তার শিশু মনে কতটুকুই বা বুঝ ছিল? আবু তালিব পুত্রের দৃঢ়তায় মুগ্ধ হন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাকে রেখে যান।

যেদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফিররা হত্যা করার জন্য মনস্থির করে তাঁর ঘরের চারদিকে ঘিরে রেখেছিল; সেদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আলী (রা.) তাঁর বিছানায় নির্ভয়ে রাত্রি যাপন করেন। পরদিন কাফিরদের প্রশ্নের কাট কাট জবাব দেন। এতে তার সাহস এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর বিশ্বাসের যথার্থ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তিনি এতটাই অকুতোভয় ও সাহসী ছিলেন।

আলী (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় কন্যা এবং বেহেশতের নারীদের নেত্রী ফাতিমার (রা.) স্বামী ছিলেন। তার দু'পুত্র ইমাম হাসান ও হোসাইন (রা.) যুগ শ্রেষ্ঠ ইমাম, নেতা এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হোসাইন (রা.) কে তাঁর কলিজার টুকরা বলেছেন। তার এ পুত্রদ্বয় (রা.) ইসলামের তথা দাওয়াত ও তাবলীগের তরে শহীদ হয়েছেন।

বদরের প্রান্তরে সামনাসামনি মল্লযুদ্ধে তাঁর হাতে বীর কাফির সেনা ওলীদ ও সায়বা নিহত হন। এছাড়া মুসলিমদের ক্ষুদ্র বাহিনীর বিজয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওহুদ প্রান্তরে মল্লযুদ্ধে আলীর হাতে তালহা নিহত হন। খন্দকের যুদ্ধে বীর কাফির সর্দার আমর তার হাতে নিহত হন। এভাবে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের শুরুতে, প্রতিবারই বিজয় দিয়ে আলী (রা.) মুসলিম বাহিনীকে উজ্জীবিত করেছেন। হুনাইনের যুদ্ধেও মুসলমানরা প্রথম দিকে হারতে বসেছিল। এখানেও আলী (রা.) অবিচল থেকে মুসলিম বাহিনীর পতাকা হাতে যুদ্ধ করে যান এবং শেষে মুসলমানরা জয়ী হয়।

হযরত ওসমানের (রা.) শাহাদাতের পর মুসলমানদের মাঝে চরম বিশৃংখলা দেখা দেয়। এ সময় আলীর (রা.) উপর খিলাফতের গুরু দায়িত্ব আসে। সূচনা থেকেই খিলাফত তার জন্য ছিল কন্টক শয্যার মত। ঘরে ও বাহিরে (মদীনা ও অন্যান্য রাজ্যে) ছিল অসন্তোষ ও হাঙ্গামা। নানারকম দল, উপদলে এবং দাবি ও বিদ্রোহে মদীনা প্রকম্পিত। আয়িশা, যুবায়ের ও তালহার (রা.) মত জ্ঞানী সাহাবীরাও আলীকে (রা.) ভুল বুঝেছিল। জঙ্গে জামালে হাজার হাজার সাহাবা শহীদ হন। আলী (রা.) পুরো ব্যাপারটিই খুবই বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর খারিজীদের বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। এটাও বুদ্ধিমত্তার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেন আলী (রা.)।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আলী (রা.) শহীদ হবে এবং নিরপরাধে তাকে হত্যা করা হবে। আর হয়েছেও তাই। এক খারেজী গোলাম (আব্দুর রহমান) তাকে ১৭ই রমযানে, ফজরের নামাযে ইমামতি করার সময় পিছন থেকে ছুরিকাঘাত করে। তিনি জায়নামাযে লুটিয়ে পড়েন। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর তিনি খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। ইন্তিকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৬ বছর।

হযরত আলী (রা.) পৃথিবীতে থেকে জান্নাতের ঘোষণা শুনেছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শহীদ হওয়া এবং জান্নাত লাভের কথা পূর্বেই শুনিয়েছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রা.) সম্পর্কে এরূপ মন্তব্য করেন যে, হে আলী তোমার অবস্থা ঈসার (রা.) মত হবে। ইহুদীরা তার শত্রুতা করে তাঁর মাতা সম্পর্কে কুৎসা রটায়। অপরদিকে নাসারারা (খ্রীষ্টানরা) তাকে এমন মর্যাদায় উঠায় যে, তাকে আল্লাহর পুত্র বলে। অথচ সেটার অধিকারী তিনি ছিলেন না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বাস্তবেও রূপ নিয়েছিল। খারেজী ও নাছেবীয়রা আলীর (রা.) নামে দুর্নাম রটিয়েছে। অপরদিকে রাওয়াফের ও শিয়ারা তাকে এতটা উপরে তুলেছে যে, একেবারে আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দিয়েছে (নাউযু বিল্লাহ)। অর্থাৎ একপক্ষ তাঁর শত্রুতা করে ধ্বংস হয়েছে এবং অপর পক্ষ মিত্রতার সীমালঙ্ঘন করে কুফরী করেছে। উভয় দলই ধ্বংস এবং মহাপাপ করেছে।

নামাযে আলীর (রা.) একাগ্রচিত্ততার বিস্ময়কর নজির রয়েছে। যুদ্ধে আলীর (রা.) পায়ে তীর বিদ্ধ হলে, কোনভাবেই তা বের করা যাচ্ছিল না। এমন সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আলী (রা.) নামাযে দাঁড়ান। আর তিনি মহান আল্লাহর সাথে গভীর মিরাজে হারিয়ে যান। এসময়, আলীর (রা.) পায়ে অস্ত্রপচার করে বিদ্ধ তীর বের করা হয়। তিনি (রা.) টু শব্দটি পর্যন্ত করেননি। ইবাদতে এমন একাগ্রচিত্তের উদাহরণ বিরল।

মহাবীর আলী (রা.) শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই যুদ্ধ করেছেন। একবার যুদ্ধক্ষেত্রে এক বীর কাফিরকে ধরাশয়ী করে হত্যা করতে অস্ত্র উত্তোলন করেন। এমন সময় কাফির কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আলীর (রা.) মুখে থুথু মারে। আলী (রা.) ধরাশয়ী কাফিরকে হত্যা না করে উঠে পড়লেন। পরাজিত কাফির সেনা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আলীকে (রা.) জিজ্ঞেস করে, ভাই তুমি আমাকে হাতের নাগালে পেয়েও, হত্যা না করে ছেড়ে দিলে কেন? আলী (রা.) বলেন, হে পরাজিত সৈনিক! আমি যুদ্ধ করি মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য। নিজের বীরত্ব জাহিরের জন্য নয়। নিজের খায়েশাতের জন্য নয়। তুমি যখন আমাকে থুথু মারলে তখন আমার তোমার প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে অবস্থায় যদি, আমি তোমাকে হত্যা করতাম, তবে তা হত ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থের শামিল। আমি তো নিজের জন্য তোমাকে হত্যা করব না। তাই আমি তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছি। কাফির সেনা ইসলামের মহত্ত্বে এবং আলীর (রা.) ঈমানী শক্তির কাছে লুটিয়ে পড়ে। সাথে সাথে চিৎকার করে ঘোষণা করে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। ভাই আলী আমাকে ক্ষমা কর! আমাকে পবিত্র কর! আর আমাকে মহান ইসলামের শান্তির কাছে আশ্রয় দাও। এ হচ্ছে মহাবীর আলীর (রা.) মহানুভবতা ঈমানী জোর আর তাকওয়ার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, খিলাফতের শাসন আমল হবে ৩০ বছর। এরপর নিছক রাজ্য শাসন শুরু হবে। বাস্তবেও তাই হয়েছিল। আবু বকর (রা.) দু'বছর; ওমর (রা.) সাড়ে দশ বছর, ওসমান (রা.) বার বছর এবং আলী (রা.) মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন। বাস্তবেও সর্বমোট ৩০ বছর খোলাফায়ে রাশেদীনের ন্যায়নীতির ও ইসলামের শাসন কায়েম ছিল। এরপর শুরু হয়েছিল সাধারণ রাজ্য শাসন। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামল ছিল ইসলামী আদর্শের বাস্তব রূপ এবং অনুসরণীয় কর্মপন্থা। ওটাই আমাদের জন্য মডেল এবং অনুকরণীয় যোগ্য আদর্শ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00