📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ


বিদায় হজ্জের দিন আরাফাতের পূর্বদিকে নামিরা নামক স্থানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবু খাটানো হয়েছিল। ১০ যিলহজ্জ, দশম হিজরী; ঠিক দুপুরের পরই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটে চেপে উপত্যকার মাঝামাঝি স্থানে এসে বক্তৃতা দিলেন। তাঁর প্রতিটি বাক্যই রাবিয়া বিন উমাইয়া বিন খালফ (রা.) কর্তৃক পুনরাবৃত্ত হয়েছিল। নামায শেষে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ শুরু করেন।

পরকাল সম্পর্কে বলেন:
১। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো মন দিয়ে শ্রবণ কর, কেননা আমি এ বছরের পর এ স্থানে তোমাদের সঙ্গে পুনরায় নাও মিলতে পারি।"
২। "হে মানবমণ্ডলী, (আগত, অনাগতকালের) যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত না হচ্ছো, তোমাদের রক্ত ও তোমাদের ধন-সম্পদ এদিন ও এ মাসের মতই পবিত্র।"
৩। "নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হবে, যখন তোমাদের প্রভু তোমাদের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আমি তোমাদের তাঁর সংবাদ পৌঁছে দিয়েছি।"

সামজিক কর্তব্য সম্পর্কে বলেন:
৪। "যে ব্যক্তি অন্যের ধন-সম্পদের অভিভাবক বা আমানতদার, তার উচিত মালিককে তার মালপত্র ফিরিয়ে দেয়া।"
৫। "সুদের উপর নেয়া-দেয়া হারাম ও বাতিল। তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। কারও প্রতি অত্যাচার করো না ও অত্যাচারিত হয়ো না।"
৬। আল্লাহর সিদ্ধান্ত মতে, সুদ বাতিল এবং আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের জন্য যে সমস্ত সুদ পাওনা আছে সবই বাতিল করা হল।
৭। অজ্ঞাত যুগের খুনের ক্ষতিপূরণ সবই বাতিল হল।
৮। হে মানবমণ্ডলী, শয়তান এদেশে পূজিত হওয়ার আশা ত্যাগ করেছে। সে অন্য দেশে মান্য হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান) সম্পর্কে সতর্ক থাকবে, যেন তোমাদের ভাল কাজ অন্য লোকের দ্বারা নষ্ট হয়ে না যায়।
৯। হে মানবমণ্ডলী, পবিত্র মাসের রহিতকরণ অন্ধকার যুগেরই ধারা। যারা অবিশ্বাস্য পছন্দ করে, তারা বিভ্রান্ত। তারা বলে-এক বছরের পবিত্র মাস, পরের বছর অপবিত্র। তারা আল্লাহ কর্তৃক পবিত্র মাসের সংখ্যা ঠিক রাখার জন্য পবিত্র মাসকে অপবিত্র বলে। সময় ঘুরছে, যে দিন থেকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ কর্তৃক মাসের সংখ্যা ১২, তাদের মধ্যে ৪টা পবিত্র, ৩টা পরপর এবং জামাদি ও শাবানের মধ্যবর্তী বছর।

স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে বলেন:
১০। হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি তোমাদের অধিকার আছে, তাদেরও তোমাদের প্রতি অধিকার আছে। ঐ ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর নিকট শ্রেষ্ঠ।

এটা তাদের অবশ্য কর্তব্য, তাদের সতীত্ব রক্ষা করা এবং অশ্লীলতা ত্যাগ করা। যদি তারা দোষী হয় তবে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস (সঙ্গম) করো না। তোমরা তাদের সংশোধনার্থে প্রহার কর। কিন্তু যেন ক্ষত-বিক্ষত না হয়ে যায়। যদি তারা অনুতপ্ত হয়, তবে তাদের খেতে দাও, পরতে দাও, তাদের সঙ্গে তখন ভাল ব্যবহার কর। তোমরা একে অন্যকে উপদেশ দিও- তোমাদের স্ত্রী-জাতির প্রতি ভাল ব্যবহার করার জন্যে। কেননা তারা তোমাদেরই অংশ বা অন্তর্ভুক্ত। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাক্য দ্বারাই তাদের তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন:
১১। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো অনুধাবন কর, যার জন্য আমি আমার কথাগুলো তোমাদের নিকট রেখে গেলাম। যদি তোমরা এটা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর তাহলে তোমরা কোনদিনই বিপথগামী হবে না। বিশেষ করে আল্লাহর কুরআন ও আমার হাদিস (তাঁর দূতের ধর্মীয় নীতি ও জীবন ধারা)।"
১২। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো অনুধাবন কর, নিশ্চিত করে বুঝে নাও। তোমরা শিক্ষা পেয়েছ প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানদের ভাই। সকল মুসলমানই এক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। এটা কোন মানুষের জন্যই অবৈধ নয় অনুমতি ব্যতীত অন্যের জিনিস গ্রহণ করবে না। সুতরাং কেউ কারও প্রতি অবিচার করো না।

দণ্ডবিধি সম্পর্কে বলেন:
১৩। একজনের অপরাধে অন্যকে দণ্ড দেয়া যাবে না। অতঃপর পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে দায়ী করা চলবে না।
১৪। যদি কোন নাক কাটা হাবসী ক্রীতদাসকেও তার যোগ্যতার জন্য তোমাদের আমীর বা নেতা করে দেয়া হয়, তোমরা সর্বতোভাবে তার অনুগত হয়ে থাকবে। তার আদেশ মান্য করবে।

ধর্ম সম্পর্কে বলেনঃ
১৫। সাবধান! ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না। এর অতিরিক্ততার ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী বহুজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
১৬। তোমরা ধর্মভ্রষ্ট হয়ে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়াতে ও রক্তপাতে লিপ্ত হয়ো না। তোমরা পরস্পর পরস্পরের ভাই ভাই।

• মানুষ ও জাতি সম্পর্কে বলেন:
১৭। এক দেশের মানুষের উপর অন্য দেশের মানুষের প্রাধান্যের কোন কারণ নেই। সমস্ত মানুষ আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে উৎপন্ন। মানুষের প্রাধান্য মানুষের যোগ্যতার জন্য এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয়।
১৮। জেনে রেখো। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তাই সমগ্র বিশ্বে মুসলমানরা এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ।

শেষনবী বিষয়ে বলেন:
১৯। হে লোক সকল। শ্রবণ কর, আমার পর কোন নবী নেই। তোমাদের পর আর কোন উম্মত (জাতি) নেই। এ বছরের পর তোমরা হয়তো আর আমার সাক্ষাৎ পাবে না। ইলমে ওহী (ঐশী জ্ঞান) উঠে যাওয়ার পূর্বে আমার নিকট থেকে শিখে নাও।
২০। চারটি কথা স্মরণ রেখো; শিরক (আল্লাহর অংশী) করো না। অন্যায়ভাবে নরহত্যা করো না। চুরি করো না। ব্যভিচার করো না।

দাস-দাসী সম্পর্কে বলেন:
২১। হে মানববৃন্দ! কোন দুর্বল মানুষের উপর অত্যাচার করো না। গরিবের উপর অত্যাচার করো না। সাবধান, কারও অসম্মতিতে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। সাবধান, মজুরের শরীরের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার মজুরী মিটিয়ে দিও। তোমরা যা খাবে ও পরবে, তা তোমাদের দাস-দাসীদের খেতে ও পরতে দিও। যে মানুষ দাস-দাসীদের ক্ষমা করে ও ভালবাসে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন ও ভালবাসেন।
২২। যে ব্যক্তি নিজ বংশের পরিবর্তে নিজেকে অন্য বংশের বলে প্রচার করে। তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাগণের ও মানব জাতির অভিসম্পাত।

প্রকৃত মুসলমান সম্পর্কে বলেন:
২৩। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত থেকে অন্যান্যরা নিরাপদ থাকে। ঈমানদার বিশ্বাসী ওই ব্যক্তি, যার হাতে সকল মানুষের ধন ও প্রাণ নিরাপদ থাকে। ওই ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন হতে পারে না- যে দু'বেলা উদর পূর্ণ করে আহার করে, আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। ওই ব্যক্তি মুসলমান হতে পারে না-যখন সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা অন্যের জন্যও পছন্দ করে না।

একতা সম্পর্কে বলেন:
২৪। আমার উম্মতের মধ্যে যে ঝগড়া ও বিবাদ করতে বের হয়, তার বুকে আঘাত কর। একত্রে খাওয়া-দাওয়া কর। আলাদা আলাদাভাবে আহার করো না। কেননা একত্রে খাওয়াতে বরকত আছে। যে বিভেদ সৃষ্টি করে, তার স্থান জাহান্নামে। আমি তোমাদের পাঁচটি আদেশ করছি: একতা রক্ষা কর, জনতার অনুগত থাক, প্রয়োজনে হিজরত কর, উপদেশ শ্রবণ কর এবং আল্লাহর পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ কর।

ঘুষ সম্পর্কে বলেন:
২৫। যাকে আমরা শাসনকার্যে নিযুক্ত করি। আমরা তার ভরণ-পোষণ করি। এরপরও যদি সে কিছু গ্রহণ করে, তা বিশ্বাসভঙ্গ বা ঘুষ বলে গণ্য হবে এবং ঘুষ গ্রহণ মহাপাপ।

হিংসা সম্পর্কে বলেন:
২৬। তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ কর। কেননা আগুন যেমন জ্বালানি কাঠকে ভস্মীভূত করে, হিংসা তেমনি মানুষের সৎগুণকে ধ্বংস করে।

পরিশ্রমী ও ভিক্ষুক সম্পর্কে বলেন:
২৭। যে ব্যক্তি নিজ হাতের কাজ দ্বারা খাদ্য সংগ্রহ করে, তা অপেক্ষা উত্তম খাদ্য আর নেই। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ভিক্ষা করে, সে যদি এক গাছি দড়ি নিয়ে, পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে বিক্রি করে, আল্লাহ তার মুখ রক্ষা করেন। এটাই তার জন্য উত্তম।

আমলনামা সম্পর্কে বলেন:
২৮। তোমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহর সম্মুখে হাজির হতে হবে এবং আপন আপন ভাল-মন্দের হিসাব-নিকাশ (আমলনামা) পাঠ করতে হবে। তোমরা সাবধান। তখন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না।

জ্ঞান সম্পর্কে বলেনঃ
২৯। তোমরা জেনে রেখো-বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্ত অপেক্ষা মূল্যবান। যে জ্ঞানের পথে পরিভ্রমণ করে, আল্লাহ তাকে স্বর্গের পথে পথ দেখান। জ্ঞান অনুসন্ধান কর, জ্ঞানার্জন (বিদ্যাশিক্ষা) প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয অর্থাৎ অবশ্যই কর্তব্য।

ব্যবহার সম্পর্কে বলেন:
৩০। সমাজে তোমার আচরণ ঐরূপ হবে, যেমন আচরণ তুমি অন্য থেকে কামনা কর। সমাজে তোমার ব্যবহার ঐরূপ হবে, যেরূপ ব্যবহার তুমি নিজে পেলে খুশি হও।

পিতামাতা সম্পর্কে বলেন: ৩১। হে মানববৃন্দ! তোমরা জেনে রেখো। তোমাদের মাতা-পিতার সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি। মাতা-পিতার অসন্তুষ্টিই আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তোমাদের স্বর্গ তোমাদের মায়ের পায়ের তলে অবস্থিত।

শ্রেষ্ঠ মানুষ সম্পর্কে বলেন: ৩২। হে মানব সন্তান! তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ, যে মানুষের উপকার করে।

দাওয়াত ও তাবলীগ সম্পর্কে বলেন: ৩৩। যারা উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিতদের নিকটে আমার এ পয়গাম পৌছিঁয়ে দেবে। হয়তো উপস্থিতদের কিছু লোক অপেক্ষা অনুপস্থিতদের কিছু লোক বেশি উপকৃত হবে।

জগতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম মানবের সর্বশ্রেষ্ঠতম সাধকের, শ্রেষ্ঠতম রাসূলের ভাষণ যথাযথভাবে অনুবাদ করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই এখানে শুধু তাঁর অমূল্য সংবাদটি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ময়দানে উপস্থিত বিশাল জনতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি জানেন এটা কোন দিন? তারা উত্তর দিলেন, এটা পবিত্র হজ্বের দিন। তারপর তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি জানেন আল্লাহ আপনাদের জীবন-মাল সকল কিছু পবিত্র করেছেন, যতক্ষণ আপনারা তাঁর সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন? তারা উত্তর দিলেন-হ্যাঁ। এইভাবে তিনি বাক্যের পর বাক্যগুলো বলতে থাকলেন।

অতঃপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন স্বর্গের সপ্তদ্বার খোলা আকাশের দিকে মুখমণ্ডল উত্তোলন করে বলে উঠলেন- "হে আল্লাহ, আমি কি তোমার রিসালতের গুরুভার ও নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব বহন করতে পেরেছি? হে আল্লাহ, আমি কি আমার কর্তব্য পালন করেছি?” সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জনতা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন-হ্যাঁ। নিশ্চয় নিশ্চয়। তখন বিশ্বনবী বলে উঠলেন- "হে আল্লাহ, তুমি আমার সাক্ষী থাক।"

এরপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ভাষণ শেষ করলেন। তারপর উট থেকে নেমে 'যুহর' ও 'আসর' নামায পড়লেন। তিনি যে সমাপ্তি ভাষণ দিলেন-আল্লাহ তা সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন করলেন। এরপর আল কুরআনের সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ আয়াত নাযিল হল। "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, তোমাদের জন্য ইসলাম (শান্তি) ধর্ম মনোনীত করে দিলাম।" (সূরা মায়েদা-৩)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াত পড়ে শুনিয়ে দিলেন। সন্ধ্যার দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাত ত্যাগ করলেন। মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন করলেন। সকলের সঙ্গে জামাতে মাগরেব (সন্ধ্যা) ও এশার (রাত্রির) নামায সমাপন করলেন।

সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশারিল হারামে অবতরণ করলেন এবং মিনার দিকে যাত্রা করলেন। পথে জামারাত (পাথর নিক্ষিপ্তের স্থান) অতিক্রম করলেন। এরপর হযরত তাঁর ৬৩ বছর বয়সের সাথে মিলিয়ে ৬৩টি উট কুরবানী করলেন। আলী (রা.) বাকি ৩৭টি উট কুরবানী করলেন। এরপর মহানবী তাঁর মস্তক মুণ্ডন করলেন। এভাবেই পবিত্র হজ্ব সমাপন হয়। এ হজ্জকে বিদায় হজ্জ বলা হয়। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এটাই ছিল শেষ হজ্জ। এ হজ্জকে ভাষণ হজ্জও বলা হয়। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হজ্জে মানবম লীর প্রতি সাধারণ ও ব্যাপক ভাষণ দান করেছিলেন।

সকলকে নির্দেশও দিয়েছিলেন-যাতে তাঁরা তাঁর কথাগুলোকে যারা উপস্থিত থাকতে পারেনি, যারা আসার চেষ্টা করেও আসতে পারেনি, এমনকি যারা তখন পর্যন্ত জন্মায়নি তাদের নিকট যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়। যাতে করে তাঁর বাণী কালস্রোতে সর্বদাই বয়ে চলে। একে ইসলামের হজ্জ বলা হয়, কেননা এ হজ্জের দিনে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে চিরদিনের জন্য। আল্লাহপাক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরআন সম্পর্কে বলেন, "তিনি নিরক্ষরদের একজনকে রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট তাঁর আয়াত আবৃত্তি করে তাদের পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। ইতোপূর্বে এরাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল। যারা এখনও তাদের দলভুক্ত হয়নি। তাদের জন্যও সে প্রেরিত হয়েছে, আল্লাহ বিজ্ঞানময়." (৬২: ২-৩)। "বল-আল্লাহ, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী, এ কুরআন আমার নিকট পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের ও যার নিকট পৌঁছাবে তাদের সতর্ক করি." (৬ : ১৯)

ধীর-স্থির ও বিচক্ষণ হযরত আবু বকর যখন এ আয়াত (মায়েদা: ৩) শুনলেন যে, ইসলাম পূর্ণতা লাভ করল, তখন তিনি আনন্দের পরিবর্তে কেঁদে ফেললেন। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যে মহান গৌরবজনক গুরুদায়িত্ব এসেছিল আজ তার সম্মানজনক সমাধানের স্বীকৃতিও এসে গেল। সুতরাং মহামানব আর হয়তো বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন না। তিনি অচিরেই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবেন। সে কথার ইঙ্গিত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভাষণের প্রথমেই দিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই সকল মানুষ তাঁর এ কথার মর্ম অনুধাবন করলেন, তখন তাদের মর্মবেদনার কোন সীমা-পরিসীমা রইল না। অসহ্য মানসিক যন্ত্রণার কোন সান্ত্বনা ছিল না। অবশ্য পূর্বেই আল কুরআনে এসেছে সে মহাসত্য। "আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল, বিধান তাঁরই। তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে.” (২৮: ৮৮)। যমীনের উপর যা কিছু আছে, তা সবই একদিন বিলীন হয়ে যাবে, বাকী থাকবে শুধু তোমার প্রভুর সত্তা - যিনি পরাক্রমশালী ও মহানুভব। (৫৫: ২৬-২৭)

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবনের দুঃখ কষ্ট

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবনের দুঃখ কষ্ট


১। জন্মের পূবেই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন।
২। মাত্র ৬ বছর বয়সে বিনা নোটিসে মাতা ইনতিকাল করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুকালে মাতার নিকট মাত্র কয়েক মাস ছিলেন।
৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন, তখন তাঁর অভিভাবক ও দাদা আবদুল মুত্তালিব ইনতিকাল করেন।
৪। নবুওয়াতের ১০তম বছরে রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবু তালিব ইনতিকাল করেন।
৫। একই বছর (নবুওয়াতের ১০তম বছর) প্রিয়তম স্ত্রী খাদীজা (রা.) মৃত্যুবরণ করেন।
৬। তিন কন্যার মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রুকাইয়া (রা.) ২য় হিজরীতে, যয়নব (রা.) ৮ম হিজরীতে ও উম্মে কুলসুম (রা.) ৯ম হিজরীতে ইনতিকাল করেন। ৪র্থ কন্যা ফাতিমা (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন।
৭। তাঁর প্রথম শিশু পুত্র কাসেম ২ বছর বয়সে এবং ২য় পুত্র আবদুল্লাহ অতি শৈশবে মৃত্যুবরণ করে। সর্বশেষ এবং ৩য় শিশু পুত্র ইব্রাহীম মাত্র ১৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৬১ বছর। বিশ্বনবীর সকল পুত্রসন্তানই অতি শৈশবে মৃত্যুবরণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00