📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য


বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্য অসাধারণ কার্যাবলীর উপর কিছু আলোকপাত হওয়া দরকার। এসব বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই তিনি সকল নবী-রাসূলের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর মাথায় সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ নেতৃত্বের অনন্য মর্যাদার মুকুট স্থাপন করেছেন। আল্লাহ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'হে বস্ত্রাবৃত, রাত্রি জাগরণ কর, কিছু অংশ ব্যতীত'। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, 'হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, ওঠ, সতর্ক বাণী প্রচার কর আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের কথা বল।।' এরপর কি হল? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওঠলেন, নিজ কাঁধে বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় আমানতের বোঝা তুলে নিলেন। একাধারে দাঁড়িয়েই রইলেন। সমগ্র মানবতার বোঝা, সকল আকীদা বিশ্বাসের বোঝা এবং বিভিন্ন ময়দানে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার বোঝা, যুদ্ধ জিহাদ ও দৌড় ঝাঁপের বোঝা, সবই ছিল তাঁর কাঁধে। আমৃত্যু তিনি মহান স্রষ্টার বাণী প্রচার করে গেলেন। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে জীবন উৎসর্গ করলেন।

তিনি মানুষের বিবেকের ময়দানে যুদ্ধ জিহাদ এবং দৌড়ঝাঁপ, চেষ্টা প্রচেষ্টার দায়িত্ব এমন এক সময়ে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যখন সকল বিবেক জাহেলিয়াত যুগের নানাবিধ উদ্ভট অমূলক কল্পনা এবং ধারণায় নিমজ্জিত ছিল। তিনি এমন এক সময় দাওয়াতের কাজ এবং শ্রম সাধনার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন, যখন মানুষের বিবেক যুগের নানাবিধ উদ্ভট-অমূলক কল্পনায়, বিলাসিতা এবং ভোগে আকণ্ঠ ডুবে ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মানব বিবেককে তাঁর কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীর আদলে জাহেলিয়াত এবং জাগতিক জীবনের ভার বোঝা থেকে মুক্ত করে নিয়েছিলেন।

পাশাপাশি অন্য এক ময়দানে আলাদা যুদ্ধ তথা একটির পর আরেকটি সংগ্রাম শুরু করে দিয়েছিলেন। আল্লাহর দাওয়াত এবং সে দাওয়াতের উপর ঈমান আনায়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রোশে শয়তানের দোসররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দাওয়াতের পবিত্র চারাগাছকে মাটির নিচে শেকড় বিস্তার এবং শূন্যে শাখা প্রশাখা বিস্তার তথা ফুলে ফলে সুশোভিত হবার আগেই, যারা নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছিল, সে সকল ভয়াবহ শত্রুর সাথে তিনি সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তিনি জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠতে না ওঠতেই রোম সাম্রাজ্য এ নয়া জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশে তার সীমান্তে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেছিল।

এ সকল কর্মতৎপরতার মাঝে তখনো বিবেকের সংগ্রাম সংঘাত শেষ হয়নি, কারণ সেটি হচ্ছে চিরস্থায়ী সংঘাত, এতে শয়তানের সাথে মুকাবিলা করতে হয়। শয়তান মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে তার তৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুহূর্তের জন্যেও তা শিথিল হয় না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত থেকে বিভিন্ন ময়দানে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

দুনিয়া তাঁর চরণে এসে লুটিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখনো তিনি দুঃখকষ্ট এবং দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। অথচ ঈমানদাররা তাঁর চারপাশে শান্তি নিরাপত্তার ছায়া বিস্তার করে রেখেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুঃখ দারিদ্র্যতাপূর্ণ জীবনের পথে সাধনা অব্যাহত রাখেন। যে কোনো অবস্থায় দুঃখকষ্টের মধ্যে তিনি অভিযোগশূন্য ধৈর্যধারণ করেছিলেন। রাত্রিকালে তিনি নামাযে দাঁড়াতেন। তাঁর রবের ইবাদাত এবং ধীরে ধীরে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন। সমগ্র বিশ্ব থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তিনি আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠতেন। অবশ্য আল্লাহর তরফ থেকে তাঁকে এরকম করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। এমনিভাবে সুদীর্ঘ বাইশ বছরের বেশী সময় যাবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগ্রাম চালিয়ে যান। এ সময় তিনি এক কাজে আত্মনিয়োগ করে অন্য কাজ ভুলে থাকেননি। পরিশেষে ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগে এমন ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন, যাতে সবাইকে অবাক হতে হয়। সমগ্র জাযিরাতুল আরব তাঁর অনুগত হয়ে পড়ে। আরবের দিগন্ত থেকে জাহেলিয়াতের মেঘ কেটে যায়। অসুস্থ বিবেকসমূহ সুস্থ হয়ে ওঠে। এমনকি তারা মূর্তিসমূহকে শুধু ছেড়েই দিল না; বরং ভেঙ্গে ফেলল। তাওহীদের বলিষ্ঠ আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠল। ঈমানের তেজে নতুন জীবনীশক্তি লাভ করে মরু বিবেকগুলো আযানের সুমধুর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকল। দিক দিগন্তে আল্লাহু আকবার ধ্বনি, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ক্বারীরা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে এবং আল্লাহর হুকুম আহকাম কায়েম করতে করতে উত্তর দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ল। আরবের আশে পাশে ইসলামের আলো বিকশিত হতে লাগল।

বিচ্ছিন্ন জাতি ও গোত্রসমূহ একত্রিত হয়ে, মানুষ মানুষের দাসত্ব ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করল। এরপর আর কেউ শোষক শাসক নয়, কেউ শোষিত শাসিত নয়, কারো রক্তচক্ষু কাউকে আর ভীতসন্ত্রস্ত করল না। কেউ যালেম নয়, কেউ মযলুম নয়, কেউ মালিক নয়, কেউ গোলাম নয়। বরং সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পরে ভাই ভাই। তারা একে অন্যকে ভালোবাসে। আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর থেকে জাহেলিয়াতের গর্ব, অহংকার এবং পিতা পিতামহের নামে আত্মগরিমার অবসান ঘটান। অনারবদের উপর আরবদের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাংগদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকল না। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারিত হল তাকওয়ার ভিত্তিতে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সকল মানুষ আদমের সন্তান, আর আদম হচ্ছেন মাটির তৈরী। দাওয়াত ও তাবলীগের ফলে সমগ্র আরবে আন্তরিক ও মানবীয় ঐক্য এবং সামাজিক ন্যায়নীতি ও সুবিচার অস্তিত্ব লাভ করল। মানব জাতি দুনিয়ার বিভিন্ন সমস্যা তথা আখিরাতের সত্যিকারের মুক্তির ও সৌভাগ্যের পথের সন্ধান পেল।

অন্য কথায় যুগের ধারাই পাল্টে গেল। দাওয়াত ও তাবলীগের আগে পৃথিবীতে জাহেলিয়াতের জয়-জয়কার রব উঠেছিল। মানুষের বিবেক পঁচে গলে দুর্গন্ধময় হয়ে গিয়েছিল। ভোগবাদীদের আত্মা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছিল। অত্যাচার এবং দাসত্বের প্রবল প্রতাপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাপাচারপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য এবং ধ্বসাত্মক বঞ্চনার ঢেউ বিশ্বকে ওলট পালট করে দিয়েছিল। তদুপরি কুফরী এবং পথভ্রষ্টতার অন্ধকারের মোটা পর্দা পড়ে গিয়েছিল। অথচ সে সময়ও আসমানী মাযহাব (ধর্ম বিশ্বাস) এবং দ্বীনসমূহ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু মানুষ সেসব বিকৃত করে রেখেছিল। ফলে ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। দ্বীন ধর্মের বন্ধন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম ছিল প্রাণহীন দেহের মত কিছু দুর্বল আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয়।

ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কর্ম পদ্ধতি যখন মানব জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন মানবাত্মা, অলীক ধ্যান-ধারণা, প্রবৃত্তির দাসত্ব, নোংরামি, ভণ্ডামি অন্যায় অত্যাচার, নৈরাজ্য স্বেচ্ছাচারিতা এবং অরাজকতা থেকে মুক্তি লাভ করে। মানব সমাজকে যুলুম, অত্যাচার, হঠকারিতা, ঔদ্ধত্য, ধ্বংস, শ্রেণী বৈষম্য, শাসকদের অত্যাচার, জ্যোতিষীদের অবমাননাকর স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্তি দান করে। বিশ্ব তখন দয়া, ক্ষমা, বিনয়, নম্রতা, আবিষ্কার, নির্মাণ, স্বাধীনতা, সংস্কার, মারেফাত, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার, তাকওয়া, ইখলাস, আখলাক এবং আমলের ভিত্তিতে জীবনের উন্নতি অগ্রগতি ও হকদারের ন্যায্য হক লাভের নিশ্চয়তার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়। এসকল পরিবর্তনের সুবাদে সমগ্র আরব এমন এক জগতের আংগিনায় উপনীত হয় এবং প্রত্যক্ষ করে, যার উদাহরণ মানব অস্তিত্বের কোনো যুগে অথবা কোন দেশে দেখা যায়নি। সমগ্র আরব তার ইতিহাসে এমন জৌলুসপূর্ণ এবং ঝলমলে হয়ে ওঠে যে, এর আগে কখনই কোথাও এরকম দেখা যায়নি। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ইসলাম, মুসলমান ও তাদের মহান নেতা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে। বিশ্ব মানব বুঝতে পারে, এটিই মুক্তির নয়া ঠিকানা এবং যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ইহকাল ও পরকালের মুক্তির একমাত্র উপায়; সকলের সামনে দিবালোকের মত স্পষ্ট উন্মুক্ত হয়ে যায়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারিক সৌন্দর্য

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারিক সৌন্দর্য


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অনুপম শারীরিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। যার বিবরণ লেখনিতে সম্ভব নয়। এসব কারণেই তাঁর প্রতি সাহাবীদের মন আপনা থেকে নিবেদিত হয়ে যেত। ফলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মর্যাদা বিধানে মানুষ এমন নিবেদিত চিত্ততার পরিচয় দিত, যার উদাহরণ পৃথিবীর অন্য কোন ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে কখনই ঘটেনি। তাঁর বন্ধু ও সহচররা তাঁকে প্রাণের চেয়ে বেশী ভালোবাসতেন। তারা চাইতেন, যদি প্রয়োজন হয় তবে নিজের মাথাও তরবারীর সামনে পেতে দিবেন, তবু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মোবারকে একটি আঁচড়ও যেন লাগতে না পারে। এ ধরনের ভালোবাসার কারণ ও যোগ্যতার পূর্ণ বিকাশ তার মধ্যে সর্বদা বিরাজমান ছিল। স্বভাবসম্মত যেসব গুণের প্রতি মন প্রাণ উজাড় করে দেয়ার মানুষের ইচ্ছা জাগে, সেসব গুণের সমাবেশ তাঁর মধ্যে এত বেশী ছিল যে, অন্য কারো মধ্যেই সে রকম থাকা অসম্ভব। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যান্য দৈহিক গড়নের ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৈহিক গঠন প্রকৃতি এতই আকর্ষণীয় ছিল যে, তাকে এক পলক দেখলেই মহামানব বলে মনে হত।

হিজরতের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে মাবাদ এর তাঁবুতে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মদীনার পথে রওনা হয়ে যান। তাঁর চলে যাওয়ার পর উম্মে মাবাদ, স্বামীর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ অবয়বের যে চিত্র তুলে ধরেন তা ছিল অপরূপ মাধুর্যমণ্ডিত। চমকানো রং। উজ্জ্বল চেহারা। সুন্দর গঠন। সটান সোজাও নয়, আবার ঝুঁকে পড়ার মতও নয়; এমন দেহ বল্লম। অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিত্তাকর্ষণ দৈহিক গঠন। সুরমারাঙ্গা চোখ। লম্বা পলক। ঋজু কণ্ঠস্বর। লম্বা ঘাড়। সাদা কালো চোখ। সুরমা কালো পলক। সূক্ষ্ম এবং পরস্পর সম্পৃক্ত চোখের ভ্রু। চমকানো কালো চুল। চুপচাপ থাকার সময় গম্ভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কথা বলার সময় আকর্ষণীয়। দূর থেকে দেখে মনে হত সবার চেয়ে উজ্জ্বল ও সৌন্দর্যপূর্ণ। কাছে থেকে সুদর্শন মিষ্টি মধুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট। কথা খুব সংক্ষিপ্তও নয় আবার দীর্ঘায়িতও নয়; স্পষ্ট ও পরিমিত বলতেন। কথা বলার সময় মনে হত যেন মুক্তা ঝরছে। মাঝারি উচ্চতাসম্পন্ন। বেঁটেও নয়, লম্বাও নয়। কিছুটা লম্বার দিকেই; মধ্যম উচ্চতা। সহচররা তাঁকে ঘিরে যদি কিছু বলত, তবে তিনি সেকথা গভীর মনোযোগের সাথে শোনতেন। তিনি কোনো আদেশ করলে তারা ছুটে গিয়ে সে আদেশ পালন করতেন। সহচররা তাঁর অত্যন্ত অনুগত এবং তাঁর প্রতি গভীর সম্মান শ্রদ্ধার মনোভাব পোষণ করতেন। কেউ উদ্ধত দুর্বিনীত ছিল না। কেউ বাহুল্য কথাও বলতেন না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেই, শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসত।

হযরত আলী (রা.), রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৈহিক সৌন্দর্য বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্বনবী অস্বাভাবিক লম্বাও ছিলেন না; আবার বেঁটেও ছিলেন না। ছিলেন মাঝারি গঠন আকৃতিসম্পন্ন। তাঁর চুল খুব বেশী কোঁকড়ানোও ছিল না, আবার একেবারে খাড়াও ছিল না, ছিল উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের। তাঁর কপোল মাংসলও ছিল না, আবার শুকনোও ছিল না; বরং উভয়ের মাঝামাঝি ধরনের ছিল। তাঁর কপাল ছিল প্রশস্ত। গায়ের রং ছিল গোলাপী ও গৌর রংয়ের মিশ্র রূপ। চোখ সুরমারাঙ্গা লালচে, ঘন পল্লববিশিষ্ট। বুকের উপর নাভি থেকে হালকা চুলের রেখা ছিল। দেহের অন্য অংশ লোমশূন্য, হাত পা মাংসল। তিনি চলার সময় স্পন্দিত ভঙ্গিতে পা তুলতেন। তাঁকে হেঁটে যেতে দেখলে মনে হত তিনি যেন উপর থেকে নীচের দিকে যাচ্ছেন। তিনি কোনো দিকে লক্ষ্য করলে পুরোপুরি লক্ষ্য করতেন। উভয় কাঁধের মাঝখানে তাঁর মোহরে নবুওয়াত ছিল। তিনি ছিলেন সকল নবীর শেষনবী। তিনি ছিলেন সর্বাধিক দানশীল, সর্বাধিক সাহসী, সর্বাধিক সত্যবাদী, সর্বাধিক অঙ্গীকার পালনকারী, সর্বাধিক কোমলপ্রাণ এবং সর্বাধিক আভিজাত্যসম্পন্ন। হঠাৎ করে কেউ তাঁকে দেখলে ভীত-বিহবল হয়ে পড়ত। পরিচিত কেউ তাঁর সামনে গেলে ভালোবাসায় ব্যাকুল হত। তাঁর গুণ বৈশিষ্ট্য বলতে গেলে বর্ণনাকারীকে অবশ্যই বলতে হত; আমি এর আগে তাঁর মত অন্য কাউকে দেখিনি।

হযরত আলীর (রা.) অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, বিশ্বনবীর মাথা ছিল বড়, জোড়ার হাড় ছিল ভারি। বুকের মাঝখানে লোমের হালকা রেখা ছিল। তিনি চলার সময় এমনভাবে চলতেন, মনে হতো কেউ যেন উঁচু থেকে নীচুতে অবতরণ করছেন।

হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেশী ছিল চওড়া, চোখ ছিল লালচে। পায়ের গোড়ালি ছিল সরু ধরনের। হযরত আবু তোফায়েল (রা.) বলেন, তিনি ছিলেন গৌড় রংয়ের, চেহারা ছিল মোলায়েম। তাঁর উচ্চতা ছিল মাঝামাঝি ধরনের। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের তালু ছিল প্রশস্ত, রং ছিল চমকদার। একেবারে সাদাও ছিলেন না, একবারে গমের-রংও ছিল না। ওফাতের সময় পর্যন্ত তাঁর মাথা এবং চেহারার বিশটি চুলও সাদা হয়নি। শুধু কানপট্টির কয়েকটি এবং মাথার কয়েকটি চুল সাদা হয়েছিল। হযরত আবু জোহায়ফা (রা.) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নীচের ঠোঁট সংলগ্ন দাড়ি সাদা দেখেছি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বোসর (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নীচের ঠোঁট সংলগ্ন দাড়ির কয়েকটি সাদা হয়ে গিয়েছিল। হযরত বারা (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মাঝারি উচ্চতাসম্পন্ন। উভয় কাঁধের মাঝখানে দূরত্ব ছিল। মাথার চুল ছিল উভয় কানের লতিকা পর্যন্ত। আমি তাঁকে লাল পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। কখনো কোন জিনিস তাঁর চেয়ে অধিক সৌন্দর্যসম্পন্ন দেখিনি। তিনি প্রথমে আহলে কিতাবদের মত চুল আঁচড়াতে পছন্দ করতেন। এ কারণে চুল আঁচড়ালে সিঁথি করতেন না। কিন্তু পরবর্তীতে সিঁথি করতেন। হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন, তাঁর চেহারা ছিল সবচেয়ে সুন্দর এবং তাঁর চরিত্র বৈশিষ্ট্য ছিল সকলের চেয়ে উৎকৃষ্ট।

হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা কি তলোয়ারের মত চোখা ছিল? তিনি বলেন, না; বরং তাঁর চেহারা ছিল চাঁদের মত। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা ছিল গোলাকার। রবী বিনতে মোয়াওয়েয (রা.) বলেন, তোমারা যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে, তবে মনে হত যে উদীয়মান সূর্য দেখছ। হযরত জাবের ইবনে ছামুরা (রা.) বলেন, এক চাঁদনী রাতে আমি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখছিলাম। সে সময় তাঁর পরিধানে ছিল লাল পোশাক। আমি একবার তাঁর প্রতি এবং একবার চাঁদের প্রতি তাকাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, তিনি চাঁদের চেয়েও অধিক সুন্দর। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে অধিক সুন্দর কোনো মানুষ আমি দেখিনি। মনে হত যেন তাঁর চেহারায় সূর্য জ্বলজ্বল করছে। আমি তাঁর চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন কাউকে দেখিনি। তিনি হাঁটতে শুরু করলে যমীন যেন তাঁর পায়ে সংকুচিত হয়ে আসত। তাঁর সাথে হাঁটার সময় আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, কিন্তু তিনি থাকতেন নির্বিকার।

হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশী হতেন, তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠত। দেখে মনে হত, যেন এক টুকরো উজ্জ্বল চাঁদ। একবার তিনি হযরত আয়িশা (রা.) এর কাছে অবস্থান করছিলেন। ঘর্মাক্ত হয়ে ওঠার পর তাঁর চেহারা আরো উজ্জ্বল সুন্দর দেখাচ্ছিল। তিনি যখন ক্রোধান্বিত হতেন, তখন চেহারা লাল হয়ে যেত, মনে হতো যেন উভয় কপালে আংগুরের দানা নিংড়ে দেয়া হয়েছে। হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হাসতেন মৃদু হাসতেন। তাঁর চোখ দেখে মনে হত যেন, সুরমা লাগান, অথচ তাতে সুরমা লাগানো ছিল না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনের দুটি দাঁত সামান্য পৃথক ছিল। কথা বলার সময় উভয় দাঁতের মধ্য থেকে আলোকআভা বিচ্ছুরিত হত। তাঁর গ্রীবা ছিল রৌপ্যের নির্মিত পাত্রের মত পরিচ্ছন্ন। চোখের পলক ছিল দীর্ঘ। দাড়ি ছিল ঘন। ললাট ছিল প্রশস্ত। ভ্রু পৃথক। নাসিকা উন্নত। নাভি থেকে বক্ষ পর্যন্ত হালকা লোমের রেখা। বাহুতে কিছু লোম ছিল। পেট এবং বুক ছিল সমান্তরাল। বুক প্রশস্ত। হাতের তালু প্রশস্ত। পথ চলার সময় তিনি কিছুটা ঝুঁকে মধ্যম গতিতে চলতেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি এমন কোনো রেশম দেখিনি, যা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতের তালুর চেয়ে বেশী নরম। এমন কোনো মিশকে আম্বর শুকিনি, যা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহের সুগন্ধির চেয়ে অধিক সুবাসিত ছিল।

হযরত আবু জোহায়ফা (রা.) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাত আমার চেহারার ওপর রেখেছিলাম। সে সময় আমি অনুভব করলাম সে হাত বরফের চেয়ে বেশী ঠাণ্ডা এবং মিশকের চেয়ে বেশী খোশবুদার। কিশোর সাহাবী হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কপোলে হাত রেখেছিলেন, এতে আমি এমন শীতলতা ও সুবাস অনুভব করলাম, মনে হল, তিনি তাঁর পবিত্র হাত আতর বিক্রেতার আতরদান থেকে বের করেছেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘাম ছিল মুক্তার মত। হযরত উম্মে সোলায়ম (রা.) বলেন, এ ঘামই ছিল সবচেয়ে উত্তম খোশবু। হযরত জাবের (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো রাস্তা দিয়ে পথ চলার পর; অন্য কেউ সে পথ দিয়ে গেলে বুঝতে পারত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পথে গমন করেছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উভয় কাঁধের মাঝামাঝি জায়গায় ছিল মোহরে নবুওয়াত। কবুতরের ডিমের মত দেখতে এ মোহরে নবুওয়াতের রং ছিল তাঁর দেহ বর্ণের মত। এটি বাম কাঁধের নরম হাড়ের পাশে অবস্থিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাঞ্জল ও অলংকারপূর্ণ ভাষায় কথা বলতেন। তাঁকে মানসিক অসংকোচ, যথার্থ শব্দ চয়ন, সুন্দর বাক্য গঠন, অর্থের বিশুদ্ধতা, সংকোচ থেকে দূরে অবস্থিতির সাথে সাথে অল্প কথায় বেশী অর্থ বুঝানো গুণে ভূষিত করা হত। তাঁকে দুর্লভ প্রজ্ঞা, কর্মকৌশল এবং আরবের সকল ভাষার জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তিনি প্রত্যেক গোত্রের সাথে সে গোত্রের ভাষায় এবং তাদের বাকরীতিতে কথা বলতেন। বেদুঈনদের মত দৃঢ়তাব্যঞ্জক বাকভঙ্গি, সম্বোধন প্রকৃতি এবং পাশাপাশি শহরের নাগরিক জীবনের বিশুদ্ধ ভাষা ছিল তাঁর আয়ত্তাধীন। উপরন্তু তাঁর ছিল ওহীভিত্তিক আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ক্ষমাশীলতা ও আকর্ষণীয় গুণবৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সাধারণত সকল ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণুতার অধিকারী মানুষের মধ্যেই কোন না কোন ত্রুটির কথা জানা যায়। কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এমন উন্নত ও সুন্দর ছিল যে, তাঁকে যত কষ্ট দেয়া হত; এবং তাঁর উপর দুর্বৃত্তদের উত্ত্যক্ত ও বাড়াবাড়ি যত বৃদ্ধি পেত, তাঁর ধৈর্যও তত বেড়ে যেত।

হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু'টি কাজের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হলে তিনি সহজ কাজটিই বেছে নিতেন, যদি না সেটা গুনাহের কাজ হত। তিনি কখনো নিজের জন্যে কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর সম্মান ক্ষুণ্ণ করা হলে আল্লাহর জন্যে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন। তিনি হিংসা ও ক্রোধ থেকে সবচেয়ে বেশী দূরে ছিলেন। সকলের প্রতি সহজেই তিনি রাযি হয়ে যেতেন। তাঁর দান ও দয়াশীলতা পরিমাপ করা ছিল অসম্ভব। দারিদ্র্যের আশংকা থেকে মুক্ত মানসিকতা নিয়ে তিনি দান খয়রাত করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবার চেয়ে বেশী দানশীল। তাঁর দানশীলতা রমযান মাসে [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাক্ষাতের পর] অধিক বেড়ে যেত। রমযান মাসে প্রতি রাতে হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। তিনি কল্যাণ ও দানশীলতায় প্রবাহিত বাতাসের চেয়ে অগ্রণী ছিলেন। গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বদাই দান করতেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, কখনোই এমন হয়নি যে, কেউ তাঁর কাছে কিছু চেয়েছে অথচ তিনি দিতে অসম্মতি জানিয়েছেন। বীরত্ব বাহাদুরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্থান ছিল সবার উপরে। তিনি ছিলেন সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বীর। কঠিন পরিস্থিতিতে বিশিষ্ট বীর পুরুষদেরও যখন পদস্থলন হয়ে যেত, সে সময়ও তিনি অটল অবিচল থাকতেন। তাঁর দৃঢ়চিত্ততায় কোনরূপ বিচলিত ভাব আসত না। অনেক বড় বড় বীর বাহাদুরও কখনো কখনো পলায়ন করেছেন, পিছপা হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মাঝে এটা কখনো পাওয়া যায়নি। হযরত আলী (রা.) বলেন, যে সময় যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হত, সে সময় আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করতাম। কেউ তাঁর চেয়ে বেশী শত্রুর কাছাকাছি হত না। হযরত আনাস (রা.) বলেন, একরাতে মদীনাবাসীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই এক বিকট শব্দের কারণে দিক বেদিক ছুটতে শুরু করে। পথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দেখা হয়। তিনি সবার আগে বিকট শব্দের জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি হযরত আবু তালহার (রা.) একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলেন। তাঁর গলায় তরবারি ঝুলান ছিল। তিনি লোকদের অভয় দিয়ে বলছিলেন, ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক লাজুক প্রকৃতির এবং নিম্ন দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পর্দানশীল কুমারী মেয়ের চেয়ে অধিক লজ্জাশীল।

কোন কিছু তাঁর পছন্দ না হলে তাঁর চেহারা দেখেই বুঝা যেত। কারো চেহারার প্রতি তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন না। দৃষ্টি নিচু রাখতেন এবং আসমানের চেয়ে যমীনের দিকেই তার দৃষ্টি বেশী সময় নিবদ্ধ থাকত। সাধারণত তাকানোর সময় নীচু দৃষ্টিতে তাকাতেন। লজ্জাশীলতা ও আত্মসম্মানবোধ এত প্রবল ছিল যে, কারো মুখের উপর সরাসরি অপ্রিয় কথা বলতেন না। কারো ব্যাপারে কোন অপ্রিয় কথা তাঁর কাছে পৌঁছলে, সে লোকের নাম উল্লেখ করে তাকে বিব্রত করতেন না। বরং এভাবে বলতেন, কিছু লোক এভাবে বলাবলি করছে।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠতম ন্যায়পরায়ণ, পাক পবিত্র, সত্যবাদী এবং একনিষ্ঠ আমানতদার। বন্ধু শত্রু সকলেই এটা স্বীকার করতেন। নবুওয়াত লাভের আগে তাঁকে 'আল আমিন' উপাধি দেয়া হয়েছিল। আইয়ামে জাহেলিয়াতে তাঁর কাছে বিচার-ফয়সালার জন্যে বাদী বিবাদী উভয় পক্ষই হাযির হত। তিরমিযী শরীফে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত; একবার আবু জাহল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, আমরা তো আপনাকে মিথ্যাবাদী বলি না, কিন্তু আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করি। একথার পর আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন; 'তারা তোমাকে তো মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এ সীমালংঘনকারী যালেমরা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে। (সূরা আল আনআম: ৩৩)। সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে (তখনও তিনি বিশ্বনবীর শত্রু ছিলেন) জিজ্ঞেস করেছিল, সে নবী যেসব কথা বলেন, সে সব কথা বলার আগে তোমরা তাঁকে মিথ্যা অভিযুক্ত করতে কি না? আবু সুফিয়ান বলেছিলেন না'। তিনি কখনই মিথ্যা বলেন না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অতি বিনয়ী নিরহংকার। বাদশাদের সম্মানে তাদের সেবক পার্শ্বসহচর যে রকম বিনয়াবনত ভংগিতে দাঁড়িয়ে থাকে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানে সাহাবীদের সেভাবে দাঁড়াতে নিষেধ করতেন। তিনি গরীব মিসকিনদের অসুস্থতার খোঁজ নিতেন। গরীবদের সাথে ওঠা বসা করতেন। ক্রীতদাসদের দাওয়াত গ্রহণ করতেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সাধারণ মানুষের মতই বসতেন।

হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, তিনি নিজের জুতা নিজেই মেরামত করতেন। নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন। তিনি নিজ হাতে তেমনি কাজকর্ম করতেন যেমন তোমাদের কেউ ঘরের সাধারণ কাজকর্ম করে। তিনি ছিলেন অন্য সব সাধারণ মানুষের মতোই একজন মানুষ। নিজের ব্যবহৃত কাপড়ে উকুন, পোকা বা ময়লা থাকলে তিনি নিজে তা বের করতেন। নিজ হাতে বকরীর দুধ দোহন করতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অংগীকার পালনে ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। তিনি আত্মীয়স্বজনের প্রতি খুব বেশী খেয়াল রাখতেন। সবার চেয়ে বেশী সহৃদয়তা ও আন্তরিকতার সাথে নিজেকে উত্থাপন করতেন। বিনীত জীবন যাপনে এবং সৌজন্য শালীনতায় ছিলেন সবচেয়ে অগ্রগামী। তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তিনি সবার চেয়ে উদার স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অসচ্চরিত্রতা তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘৃণার বিষয় ছিল। এ থেকে তিনি দূরে থাকতেন। স্বভাবগতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবেও তিনি কখনো অশালীন কথা বলতেন না। কাউকে কখনই অভিশাপ দিতেন না। বাজারে উচ্চৈঃস্বরে চিল্লাচিল্লি করতেন না।

মন্দের বদলা মন্দ দিয়ে দিতেন না। বরং তিনি মন্দের বিনিময়ে ক্ষমার রীতি অবলম্বন করতেন। কেউ তাঁর পিছনে আসতে শুরু করলে তাকে পিছনে ফেলে চলে যেতেন না। পানাহারে দাসীবাঁদীদের চেয়ে উচ্চমান অবলম্বন করতেন না। তিনি তাঁর খাদেমের কাজও করে দিতেন। কোন কাজ করা বা না করা প্রসংগে কখনো খাদেমের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেননি। তিনি গরীব মিসকিনদের ভালোবাসতেন। তাদের সাথে ওঠাবসা করতেন এবং তাদের জানাযায় হাযির হতেন। কোনো গরীবকে তার দারিদ্র্যের কারণে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন না। একবার তিনি সফরে ছিলেন। সেসময় একটি বকরী যবাই করার পরামর্শ হয়। একজন বললেন, যবাই করার দায়িত্ব আমার। অন্যজন বললেন, চামড়া ছাড়ানোর দায়িত্ব আমার। তৃতীয় জন বললেন, রান্নার দায়িত্ব আমি পালন করব। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবাই বলল, আমরা আপনার কাজ করে দিব। তিনি বললেন, আমি জানি, তোমরা আমার কাজ করে দিবে। কিন্তু আমি তোমাদের চাইতে স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করতে চাই না। কেননা বান্দা যখন তার আচরণে বন্ধু বান্ধবের মাঝে নিজেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মনে করবে, আল্লাহ তা'আলা তা পছন্দ করবেন না। এরপর তিনি উঠে সবচেয়ে কঠিন কাজ অর্থাৎ লাকড়ি সংগ্রহ করতে লেগে যান।

হিন্দ ইবনে আবু হালাল (রা.) তার যবানীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু গুণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা গভীর চিন্তায় চিন্তিত থাকতেন। সব সময় চিন্তা-ভাবনা করতেন। আরাম আয়েশের চিন্তা করতেন না। অপ্রয়োজনে কথা বলতেন না। দীর্ঘ সময় যাবত নীরব থাকতেন। কথার শুরুতে ও শেষে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। অস্পষ্ট উচ্চারণে কোনো কথা বলতেন না। অর্থবহ দ্ব্যর্থহীন কথা বলতেন। তাঁর কথায় কোন বাহুল্য থাকত না। তিনি ছিলেন নরম মেজাযের। মামুলি নেয়ামত হলেও তার অমর্যাদা করতেন না। কোন কিছুর নিন্দা সমালোচনা করতেন না। পানাহারে খাদ্য দ্রব্যের সমালোচনা করতেন না। কারো থেকে সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী কোনো আচরণ প্রকাশিত হলে; তার প্রতি তিনি বিরক্ত হতেন। সে লোকের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করা পর্যন্ত নিবৃত্ত হতেন না। তবে তাঁর মন ছিল উদার। নিজের জন্যে কারো উপর ক্রুদ্ধ হতেন না। কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। কারো প্রতি ইশারা করতে অঙ্গুলির পরিবর্তে হাতের তালু ব্যবহার করতেন। বিস্ময়ের সময় হাত ওল্টাতেন। ক্রুদ্ধ হলে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। খুশী হলে দৃষ্টি নীচু করতেন। তিনি অধিকাংশ সময় মৃদু হাসতেন। মৃদু হাসির সময় দাঁতের কিয়দংশ মুক্তার মত ঝকমক করত।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থহীন কথা বলতেন না। সাথীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতেন। তাদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করতেন না। সকল সম্প্রদায়ের সম্মানিত লোকদের সম্মান করতেন। সম্মানিত লোককেই নেতা নিযুক্ত করতেন। মানুষের অনিষ্ট, দুষ্কৃতি থেকে সাবধান থাকতেন এবং তাদের থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এ জন্যে কারো থেকে মুখ গোমরা করে রাখতেন না। সাহাবীদের খবরাখবর নিতেন। তাদের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। ভালো বিষয়ের প্রশংসা এবং খারাপ বিষয়ের সমালোচনা করতেন। সব বিষয়েই মধ্যপন্থা পছন্দ করতেন। কোনো বিষয়ে অমনোযোগী থাকা তাঁর অপছন্দ ছিল। লোকজন যেন গাফেল, অমনোযোগী মানসিকতায় ভারাক্রান্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য করতেন। যে কোনো অবস্থার জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতেন। সত্য ও ন্যায় থেকে দূরে থাকা পছন্দ করতেন না। অসত্য থেকে দূরে থাকতেন। তাঁর কাছে যারা থাকতেন, তারা সকলেই ছিলেন উত্তম মানুষ। তাদের মধ্যেও তারাই ছিলেন তাঁর অতি নিকটের বা কাছের, যারা অধিক উত্তম এবং যারা ছিলেন কল্যাণকামী, পরোপকারী। তাঁর কাছে সে ব্যক্তির মর্যাদাই অধিক ছিল, যে অন্যের দুঃখে সমবেদনা, সহমর্মিতা প্রকাশকারী এবং সাহায্যকারী ছিল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওঠতে বসতে সর্বদাই আল্লাহকে স্মরণ করতেন। তাঁর বসার জন্যে নির্ধারিত কোন জায়গা ছিল না। কোন জনসমাবেশে গেলে যেখানে জায়গা খালি পেতেন সেখানেই বসতেন। অন্যদেরও এ রকম করার নির্দেশ দিতেন। উপস্থিত সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতেন। কারো মনে কখনই একথা জাগত না, অমুককে আমার চেয়ে বেশী মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। কেউ কোন প্রয়োজনে তাঁর কাছে বসলে বা দাঁড়ালে সে লোকের প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতেন; যতোক্ষণ না সে আনন্দ চিত্তে ফিরে যেত। এতে তাঁর ধৈর্যের কোন বিচ্যুতি দেখা যেত না। কেউ তাঁর কাছে কোন কিছু চাইলে তিনি অকাতরে দান করতেন। প্রার্থিত বস্তু প্রদান অথবা ভাল কথা বলে তাকে খুশী না করা পর্যন্ত বিদায় করতেন না। তিনি নিজের উন্নত চরিত্র বৈশিষ্ট্যে এবং হাসিমুখ দ্বারা সবাইকে সন্তুষ্ট করতেন। তিনি ছিলেন সকলের জন্যে পিতৃতুল্য। তাঁর দৃষ্টিতে সবাই ছিল সমান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কারো শ্রেষ্ঠত্ব বা মর্যাদার আধিক্য নির্ণীত হত তাকওয়ার ভিত্তিতে। সকলেই সকলের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করত। বয়োজ্যেষ্ঠকে সবাই সম্মান এবং ছোটকে স্নেহ করত। কারো কোন প্রয়োজন দেখা দিলে তা পূরণ করা হত। অপরিচিত লোককে অবজ্ঞা, উপেক্ষা করা হত না। বরং তার সাথে পরিচিত হয়ে আন্তরিকতা প্রকাশ করা হত।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় সবসময় শান্তি ও স্মিতভাব বিরাজ করত। রুক্ষ্মতা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। তিনি বেশী জোরে কথা বলতেন না। অশালীন কোন কথা তাঁর মুখে উচ্চারিত হত না। কার প্রতি রুষ্ট হলেও তাকে ধমক দিয়ে কথা বলতেন না। কার প্রশংসা করার সময় অতি মাত্রায় প্রশংসা করতেন না। যে জিনিসের প্রতি আগ্রহী না হতেন, সেটা সহজেই ভুলে থাকতেন। কোনো ব্যাপারেই কেউ তাঁর কাছে হতাশ হত না। তিনটি বিষয় থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত রাখতেন। তা হচ্ছে- ১) অহংকার, ২) কোন জিনিসের বাহুল্যতা এবং ৩) অর্থহীন কথা। আর তিনটি বিষয় থেকে লোকদের নিরাপদ রাখতেন। সেগুলো হচ্ছে- ১) পরের নিন্দা, ২) কাউকে লজ্জা দেয়া এবং ৩) অন্যের দোষ প্রকাশ করা। তিনি ছিলেন চরম পরোপকারী এবং পরম বন্ধুবৎসল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কথাই মুখে আনতেন যে কথায় সওয়াব লাভের আশা থাকত। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁর সাহাবীরা এমনভাবে মাথা নিচু করে বসতেন, দেখে মনে হত তাদের মাথার উপর চড়ুই পাখী বসে আছে। তিনি কথা শেষ করে নীরব হলে সাহাবীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতেন। কোন সাহাবী, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন বাহুল্য কথা বলতেন না। কোন সাহাবী তাঁর কাছে কোন কথা বলতে শুরু করলে, উপস্থিত অন্য সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত নীরবতা বজায় থাকত। যে কথায় সাহাবীরা হাসতেন, সে কথায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হাসতেন। যে কথা শুনে সাহাবীরা অবাক হতেন, সে কথা শুনে তিনিও অবাক হতেন। অপরিচিত লোক কথা বলায় অসংযমী হলে তিনি ধৈর্য হারাতেন না। তিনি বলতেন, কাউকে পরমুখাপেক্ষী দেখলে তার প্রয়োজন পূরণ করে দাও। ইহসানের বিনিময় ছাড়া কোন ব্যাপারেই অন্যের প্রশংসা তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। বেহুদা প্রশংসা, চাটুকারিতা ও মুসাহেবী তিনি খুব অপছন্দ করতেন।

হযরত খারেজা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মজলিসে সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাশীল ছিলেন। পোশাক পরিধানে তিনি ছিলেন শালীন। অধিকাংশ সময় নীরবতা পালন করতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। যে ব্যক্তি অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলত, তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। তিনি যখন হাসতেন, মৃদু হাসতেন। সুস্পষ্টভাবে কথা বলতেন অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। সাহাবীরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উচ্চৈঃস্বরে হাসতেন না। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর উপস্থিতিতে হাসি সংযত রাখতেন এবং মৃদু হাসতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতুলনীয় ও সর্বমহান গুণবৈশিষ্ট্যের অধিকারী একজন পূর্ণাংগ মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে পরম আকর্ষণীয় স্বভাব বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর নবীর প্রশংসায় বলেন, নিসন্দেহে আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। এজন্যই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বকালের সর্বমানুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণের ভেতরেই সত্যিকারের মানবতার বিকাশ ও সফলতা রয়েছে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ


বিদায় হজ্জের দিন আরাফাতের পূর্বদিকে নামিরা নামক স্থানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবু খাটানো হয়েছিল। ১০ যিলহজ্জ, দশম হিজরী; ঠিক দুপুরের পরই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটে চেপে উপত্যকার মাঝামাঝি স্থানে এসে বক্তৃতা দিলেন। তাঁর প্রতিটি বাক্যই রাবিয়া বিন উমাইয়া বিন খালফ (রা.) কর্তৃক পুনরাবৃত্ত হয়েছিল। নামায শেষে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ শুরু করেন।

পরকাল সম্পর্কে বলেন:
১। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো মন দিয়ে শ্রবণ কর, কেননা আমি এ বছরের পর এ স্থানে তোমাদের সঙ্গে পুনরায় নাও মিলতে পারি।"
২। "হে মানবমণ্ডলী, (আগত, অনাগতকালের) যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত না হচ্ছো, তোমাদের রক্ত ও তোমাদের ধন-সম্পদ এদিন ও এ মাসের মতই পবিত্র।"
৩। "নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রভুর সঙ্গে মিলিত হবে, যখন তোমাদের প্রভু তোমাদের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। আমি তোমাদের তাঁর সংবাদ পৌঁছে দিয়েছি।"

সামজিক কর্তব্য সম্পর্কে বলেন:
৪। "যে ব্যক্তি অন্যের ধন-সম্পদের অভিভাবক বা আমানতদার, তার উচিত মালিককে তার মালপত্র ফিরিয়ে দেয়া।"
৫। "সুদের উপর নেয়া-দেয়া হারাম ও বাতিল। তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। কারও প্রতি অত্যাচার করো না ও অত্যাচারিত হয়ো না।"
৬। আল্লাহর সিদ্ধান্ত মতে, সুদ বাতিল এবং আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের জন্য যে সমস্ত সুদ পাওনা আছে সবই বাতিল করা হল।
৭। অজ্ঞাত যুগের খুনের ক্ষতিপূরণ সবই বাতিল হল।
৮। হে মানবমণ্ডলী, শয়তান এদেশে পূজিত হওয়ার আশা ত্যাগ করেছে। সে অন্য দেশে মান্য হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান) সম্পর্কে সতর্ক থাকবে, যেন তোমাদের ভাল কাজ অন্য লোকের দ্বারা নষ্ট হয়ে না যায়।
৯। হে মানবমণ্ডলী, পবিত্র মাসের রহিতকরণ অন্ধকার যুগেরই ধারা। যারা অবিশ্বাস্য পছন্দ করে, তারা বিভ্রান্ত। তারা বলে-এক বছরের পবিত্র মাস, পরের বছর অপবিত্র। তারা আল্লাহ কর্তৃক পবিত্র মাসের সংখ্যা ঠিক রাখার জন্য পবিত্র মাসকে অপবিত্র বলে। সময় ঘুরছে, যে দিন থেকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছে। আল্লাহ কর্তৃক মাসের সংখ্যা ১২, তাদের মধ্যে ৪টা পবিত্র, ৩টা পরপর এবং জামাদি ও শাবানের মধ্যবর্তী বছর।

স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে বলেন:
১০। হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি তোমাদের অধিকার আছে, তাদেরও তোমাদের প্রতি অধিকার আছে। ঐ ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর নিকট শ্রেষ্ঠ।

এটা তাদের অবশ্য কর্তব্য, তাদের সতীত্ব রক্ষা করা এবং অশ্লীলতা ত্যাগ করা। যদি তারা দোষী হয় তবে তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস (সঙ্গম) করো না। তোমরা তাদের সংশোধনার্থে প্রহার কর। কিন্তু যেন ক্ষত-বিক্ষত না হয়ে যায়। যদি তারা অনুতপ্ত হয়, তবে তাদের খেতে দাও, পরতে দাও, তাদের সঙ্গে তখন ভাল ব্যবহার কর। তোমরা একে অন্যকে উপদেশ দিও- তোমাদের স্ত্রী-জাতির প্রতি ভাল ব্যবহার করার জন্যে। কেননা তারা তোমাদেরই অংশ বা অন্তর্ভুক্ত। তোমরা তাদের আল্লাহর আমানতরূপে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর বাক্য দ্বারাই তাদের তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন:
১১। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো অনুধাবন কর, যার জন্য আমি আমার কথাগুলো তোমাদের নিকট রেখে গেলাম। যদি তোমরা এটা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ কর তাহলে তোমরা কোনদিনই বিপথগামী হবে না। বিশেষ করে আল্লাহর কুরআন ও আমার হাদিস (তাঁর দূতের ধর্মীয় নীতি ও জীবন ধারা)।"
১২। "হে মানবমণ্ডলী, তোমরা আমার কথাগুলো অনুধাবন কর, নিশ্চিত করে বুঝে নাও। তোমরা শিক্ষা পেয়েছ প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানদের ভাই। সকল মুসলমানই এক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। এটা কোন মানুষের জন্যই অবৈধ নয় অনুমতি ব্যতীত অন্যের জিনিস গ্রহণ করবে না। সুতরাং কেউ কারও প্রতি অবিচার করো না।

দণ্ডবিধি সম্পর্কে বলেন:
১৩। একজনের অপরাধে অন্যকে দণ্ড দেয়া যাবে না। অতঃপর পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে দায়ী করা চলবে না।
১৪। যদি কোন নাক কাটা হাবসী ক্রীতদাসকেও তার যোগ্যতার জন্য তোমাদের আমীর বা নেতা করে দেয়া হয়, তোমরা সর্বতোভাবে তার অনুগত হয়ে থাকবে। তার আদেশ মান্য করবে।

ধর্ম সম্পর্কে বলেনঃ
১৫। সাবধান! ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করো না। এর অতিরিক্ততার ফলে তোমাদের পূর্ববর্তী বহুজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
১৬। তোমরা ধর্মভ্রষ্ট হয়ে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়াতে ও রক্তপাতে লিপ্ত হয়ো না। তোমরা পরস্পর পরস্পরের ভাই ভাই।

• মানুষ ও জাতি সম্পর্কে বলেন:
১৭। এক দেশের মানুষের উপর অন্য দেশের মানুষের প্রাধান্যের কোন কারণ নেই। সমস্ত মানুষ আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে উৎপন্ন। মানুষের প্রাধান্য মানুষের যোগ্যতার জন্য এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয়।
১৮। জেনে রেখো। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তাই সমগ্র বিশ্বে মুসলমানরা এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ।

শেষনবী বিষয়ে বলেন:
১৯। হে লোক সকল। শ্রবণ কর, আমার পর কোন নবী নেই। তোমাদের পর আর কোন উম্মত (জাতি) নেই। এ বছরের পর তোমরা হয়তো আর আমার সাক্ষাৎ পাবে না। ইলমে ওহী (ঐশী জ্ঞান) উঠে যাওয়ার পূর্বে আমার নিকট থেকে শিখে নাও।
২০। চারটি কথা স্মরণ রেখো; শিরক (আল্লাহর অংশী) করো না। অন্যায়ভাবে নরহত্যা করো না। চুরি করো না। ব্যভিচার করো না।

দাস-দাসী সম্পর্কে বলেন:
২১। হে মানববৃন্দ! কোন দুর্বল মানুষের উপর অত্যাচার করো না। গরিবের উপর অত্যাচার করো না। সাবধান, কারও অসম্মতিতে কোন জিনিস গ্রহণ করো না। সাবধান, মজুরের শরীরের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার মজুরী মিটিয়ে দিও। তোমরা যা খাবে ও পরবে, তা তোমাদের দাস-দাসীদের খেতে ও পরতে দিও। যে মানুষ দাস-দাসীদের ক্ষমা করে ও ভালবাসে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন ও ভালবাসেন।
২২। যে ব্যক্তি নিজ বংশের পরিবর্তে নিজেকে অন্য বংশের বলে প্রচার করে। তার উপর আল্লাহর, ফেরেশতাগণের ও মানব জাতির অভিসম্পাত।

প্রকৃত মুসলমান সম্পর্কে বলেন:
২৩। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-মুসলমান ওই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত থেকে অন্যান্যরা নিরাপদ থাকে। ঈমানদার বিশ্বাসী ওই ব্যক্তি, যার হাতে সকল মানুষের ধন ও প্রাণ নিরাপদ থাকে। ওই ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন হতে পারে না- যে দু'বেলা উদর পূর্ণ করে আহার করে, আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। ওই ব্যক্তি মুসলমান হতে পারে না-যখন সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তা অন্যের জন্যও পছন্দ করে না।

একতা সম্পর্কে বলেন:
২৪। আমার উম্মতের মধ্যে যে ঝগড়া ও বিবাদ করতে বের হয়, তার বুকে আঘাত কর। একত্রে খাওয়া-দাওয়া কর। আলাদা আলাদাভাবে আহার করো না। কেননা একত্রে খাওয়াতে বরকত আছে। যে বিভেদ সৃষ্টি করে, তার স্থান জাহান্নামে। আমি তোমাদের পাঁচটি আদেশ করছি: একতা রক্ষা কর, জনতার অনুগত থাক, প্রয়োজনে হিজরত কর, উপদেশ শ্রবণ কর এবং আল্লাহর পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ কর।

ঘুষ সম্পর্কে বলেন:
২৫। যাকে আমরা শাসনকার্যে নিযুক্ত করি। আমরা তার ভরণ-পোষণ করি। এরপরও যদি সে কিছু গ্রহণ করে, তা বিশ্বাসভঙ্গ বা ঘুষ বলে গণ্য হবে এবং ঘুষ গ্রহণ মহাপাপ।

হিংসা সম্পর্কে বলেন:
২৬। তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ কর। কেননা আগুন যেমন জ্বালানি কাঠকে ভস্মীভূত করে, হিংসা তেমনি মানুষের সৎগুণকে ধ্বংস করে।

পরিশ্রমী ও ভিক্ষুক সম্পর্কে বলেন:
২৭। যে ব্যক্তি নিজ হাতের কাজ দ্বারা খাদ্য সংগ্রহ করে, তা অপেক্ষা উত্তম খাদ্য আর নেই। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ভিক্ষা করে, সে যদি এক গাছি দড়ি নিয়ে, পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে বিক্রি করে, আল্লাহ তার মুখ রক্ষা করেন। এটাই তার জন্য উত্তম।

আমলনামা সম্পর্কে বলেন:
২৮। তোমাদের প্রত্যেককেই আল্লাহর সম্মুখে হাজির হতে হবে এবং আপন আপন ভাল-মন্দের হিসাব-নিকাশ (আমলনামা) পাঠ করতে হবে। তোমরা সাবধান। তখন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না।

জ্ঞান সম্পর্কে বলেনঃ
২৯। তোমরা জেনে রেখো-বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্ত অপেক্ষা মূল্যবান। যে জ্ঞানের পথে পরিভ্রমণ করে, আল্লাহ তাকে স্বর্গের পথে পথ দেখান। জ্ঞান অনুসন্ধান কর, জ্ঞানার্জন (বিদ্যাশিক্ষা) প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয অর্থাৎ অবশ্যই কর্তব্য।

ব্যবহার সম্পর্কে বলেন:
৩০। সমাজে তোমার আচরণ ঐরূপ হবে, যেমন আচরণ তুমি অন্য থেকে কামনা কর। সমাজে তোমার ব্যবহার ঐরূপ হবে, যেরূপ ব্যবহার তুমি নিজে পেলে খুশি হও।

পিতামাতা সম্পর্কে বলেন: ৩১। হে মানববৃন্দ! তোমরা জেনে রেখো। তোমাদের মাতা-পিতার সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি। মাতা-পিতার অসন্তুষ্টিই আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তোমাদের স্বর্গ তোমাদের মায়ের পায়ের তলে অবস্থিত।

শ্রেষ্ঠ মানুষ সম্পর্কে বলেন: ৩২। হে মানব সন্তান! তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ, যে মানুষের উপকার করে।

দাওয়াত ও তাবলীগ সম্পর্কে বলেন: ৩৩। যারা উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিতদের নিকটে আমার এ পয়গাম পৌছিঁয়ে দেবে। হয়তো উপস্থিতদের কিছু লোক অপেক্ষা অনুপস্থিতদের কিছু লোক বেশি উপকৃত হবে।

জগতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম মানবের সর্বশ্রেষ্ঠতম সাধকের, শ্রেষ্ঠতম রাসূলের ভাষণ যথাযথভাবে অনুবাদ করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই এখানে শুধু তাঁর অমূল্য সংবাদটি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ময়দানে উপস্থিত বিশাল জনতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি জানেন এটা কোন দিন? তারা উত্তর দিলেন, এটা পবিত্র হজ্বের দিন। তারপর তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি জানেন আল্লাহ আপনাদের জীবন-মাল সকল কিছু পবিত্র করেছেন, যতক্ষণ আপনারা তাঁর সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন? তারা উত্তর দিলেন-হ্যাঁ। এইভাবে তিনি বাক্যের পর বাক্যগুলো বলতে থাকলেন।

অতঃপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন স্বর্গের সপ্তদ্বার খোলা আকাশের দিকে মুখমণ্ডল উত্তোলন করে বলে উঠলেন- "হে আল্লাহ, আমি কি তোমার রিসালতের গুরুভার ও নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব বহন করতে পেরেছি? হে আল্লাহ, আমি কি আমার কর্তব্য পালন করেছি?” সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জনতা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন-হ্যাঁ। নিশ্চয় নিশ্চয়। তখন বিশ্বনবী বলে উঠলেন- "হে আল্লাহ, তুমি আমার সাক্ষী থাক।"

এরপর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ভাষণ শেষ করলেন। তারপর উট থেকে নেমে 'যুহর' ও 'আসর' নামায পড়লেন। তিনি যে সমাপ্তি ভাষণ দিলেন-আল্লাহ তা সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন করলেন। এরপর আল কুরআনের সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ আয়াত নাযিল হল। "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, তোমাদের জন্য ইসলাম (শান্তি) ধর্ম মনোনীত করে দিলাম।" (সূরা মায়েদা-৩)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াত পড়ে শুনিয়ে দিলেন। সন্ধ্যার দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাত ত্যাগ করলেন। মুযদালিফাতে রাত্রি যাপন করলেন। সকলের সঙ্গে জামাতে মাগরেব (সন্ধ্যা) ও এশার (রাত্রির) নামায সমাপন করলেন।

সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাশারিল হারামে অবতরণ করলেন এবং মিনার দিকে যাত্রা করলেন। পথে জামারাত (পাথর নিক্ষিপ্তের স্থান) অতিক্রম করলেন। এরপর হযরত তাঁর ৬৩ বছর বয়সের সাথে মিলিয়ে ৬৩টি উট কুরবানী করলেন। আলী (রা.) বাকি ৩৭টি উট কুরবানী করলেন। এরপর মহানবী তাঁর মস্তক মুণ্ডন করলেন। এভাবেই পবিত্র হজ্ব সমাপন হয়। এ হজ্জকে বিদায় হজ্জ বলা হয়। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এটাই ছিল শেষ হজ্জ। এ হজ্জকে ভাষণ হজ্জও বলা হয়। কেননা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হজ্জে মানবম লীর প্রতি সাধারণ ও ব্যাপক ভাষণ দান করেছিলেন।

সকলকে নির্দেশও দিয়েছিলেন-যাতে তাঁরা তাঁর কথাগুলোকে যারা উপস্থিত থাকতে পারেনি, যারা আসার চেষ্টা করেও আসতে পারেনি, এমনকি যারা তখন পর্যন্ত জন্মায়নি তাদের নিকট যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়। যাতে করে তাঁর বাণী কালস্রোতে সর্বদাই বয়ে চলে। একে ইসলামের হজ্জ বলা হয়, কেননা এ হজ্জের দিনে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে চিরদিনের জন্য। আল্লাহপাক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরআন সম্পর্কে বলেন, "তিনি নিরক্ষরদের একজনকে রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন, যে তাদের নিকট তাঁর আয়াত আবৃত্তি করে তাদের পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। ইতোপূর্বে এরাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে ছিল। যারা এখনও তাদের দলভুক্ত হয়নি। তাদের জন্যও সে প্রেরিত হয়েছে, আল্লাহ বিজ্ঞানময়." (৬২: ২-৩)। "বল-আল্লাহ, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী, এ কুরআন আমার নিকট পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের ও যার নিকট পৌঁছাবে তাদের সতর্ক করি." (৬ : ১৯)

ধীর-স্থির ও বিচক্ষণ হযরত আবু বকর যখন এ আয়াত (মায়েদা: ৩) শুনলেন যে, ইসলাম পূর্ণতা লাভ করল, তখন তিনি আনন্দের পরিবর্তে কেঁদে ফেললেন। কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যে মহান গৌরবজনক গুরুদায়িত্ব এসেছিল আজ তার সম্মানজনক সমাধানের স্বীকৃতিও এসে গেল। সুতরাং মহামানব আর হয়তো বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন না। তিনি অচিরেই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবেন। সে কথার ইঙ্গিত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভাষণের প্রথমেই দিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই সকল মানুষ তাঁর এ কথার মর্ম অনুধাবন করলেন, তখন তাদের মর্মবেদনার কোন সীমা-পরিসীমা রইল না। অসহ্য মানসিক যন্ত্রণার কোন সান্ত্বনা ছিল না। অবশ্য পূর্বেই আল কুরআনে এসেছে সে মহাসত্য। "আল্লাহর সত্তা ব্যতীত সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল, বিধান তাঁরই। তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে.” (২৮: ৮৮)। যমীনের উপর যা কিছু আছে, তা সবই একদিন বিলীন হয়ে যাবে, বাকী থাকবে শুধু তোমার প্রভুর সত্তা - যিনি পরাক্রমশালী ও মহানুভব। (৫৫: ২৬-২৭)

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবনের দুঃখ কষ্ট

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবনের দুঃখ কষ্ট


১। জন্মের পূবেই তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন।
২। মাত্র ৬ বছর বয়সে বিনা নোটিসে মাতা ইনতিকাল করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুকালে মাতার নিকট মাত্র কয়েক মাস ছিলেন।
৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন, তখন তাঁর অভিভাবক ও দাদা আবদুল মুত্তালিব ইনতিকাল করেন।
৪। নবুওয়াতের ১০তম বছরে রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবু তালিব ইনতিকাল করেন।
৫। একই বছর (নবুওয়াতের ১০তম বছর) প্রিয়তম স্ত্রী খাদীজা (রা.) মৃত্যুবরণ করেন।
৬। তিন কন্যার মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রুকাইয়া (রা.) ২য় হিজরীতে, যয়নব (রা.) ৮ম হিজরীতে ও উম্মে কুলসুম (রা.) ৯ম হিজরীতে ইনতিকাল করেন। ৪র্থ কন্যা ফাতিমা (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন।
৭। তাঁর প্রথম শিশু পুত্র কাসেম ২ বছর বয়সে এবং ২য় পুত্র আবদুল্লাহ অতি শৈশবে মৃত্যুবরণ করে। সর্বশেষ এবং ৩য় শিশু পুত্র ইব্রাহীম মাত্র ১৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৬১ বছর। বিশ্বনবীর সকল পুত্রসন্তানই অতি শৈশবে মৃত্যুবরণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00