📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত সারা এবং বয়সসমূহ
যেসব ছোট ছোট কাফেলাকে হিজরতের পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিযানের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছিলেন এবং যেসব যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে অংশগ্রহণ করেননি, বরং তিনি তার সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিয়ে পাঠাতেন; সেসব ছোট বড় যুদ্ধের বা অভিযানের নাম আরবী পরিভাষায় সারায়া এবং বয়স। সারায়া এমন ছোট বাহিনীকে বলা হয় যাতে কমপক্ষে পাঁচজন অথবা একশ জন সৈন্য থাকে। সর্বাধিক চারশত সৈন্য থাকতে পারে। বুয়াস হচ্ছে কোন বাহিনীর সে অংশের নাম, যারা মূলবাহিনী থেকে অন্যত্র কোন অভিযানে প্রেরিত হয়। এ দু'ধরনের সর্বোচ্চ ৭৪টি অভিযানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের পাঠিয়েছিলেন। অভিযানগুলোর সতন্ত্র নেতৃত্ব ছিল এবং নির্দিষ্ট কর্ম পরিধি ছিল। ২য় হিজরী হতে এসব অভিযান শুরু হয়ে একাদশ হিজরী পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর ১১তম হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবী হতে পরপারে স্থানান্তরিত হন। এতগুলো অভিযানের সর্বমোট হতাহতের সংখ্যা মাত্র শতাধিক। মূলত দ্বীন প্রচার তথা দাওয়াত ও তাবলীগই ছিল এসব অভিযানগুলোর অন্তর্নিহিত ও প্রকাশ্য উদ্দেশ্য। পৃথিবীর কুফরী শক্তির মুকাবিলায় আল্লাহর দ্বীন প্রচারই ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মূল কর্মপদ্ধতি বা উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় হিজরী সন থেকে সে সকল ছোট বড় অভিযানসমূহের সূচনা হয়। কারণ এর আগে জিহাদের অনুমতি ছিল না। (সূরা হজ্জ্ব-৩৯)। অভিযানসমূহ ধারাবাহিকভাবে ও সংখ্যার ক্রমানুসারে বর্ণিত হল:
(১) দ্বিতীয় হিজরীর রবিউল আউয়াল বা রবিউস সানী অথবা রমযান মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা হযরত হামযার (রা.) নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ করা হয়। এ ছিল মহানবীর নির্দেশে সর্বপ্রথম অভিযান। ইসলামের ইতিহাসে হযরত হামযাই (রা.) প্রথম ব্যক্তি, যিনি সেনাপ্রধান হওয়ার গৌরব লাভ করেছিলেন। অভিশপ্ত আবু জাহলের নেতৃত্বে কুরাইশ কাফিরদের একটি দল সিরিয়া থেকে মক্কা যাচ্ছিল। সে দলকে বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্রিশ জন মুহাজির সাহাবীর একটি দল প্রেরণ করেন। এ দলের নেতৃত্ব হযরত হামযার (রা.) হাতে ন্যস্ত করা হয়। আয়েস অঞ্চলের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা দিয়ে কুরাইশ কাফেলা যাচ্ছিল। হযরত হামযা (রা.) সাদা পতাকা হাতে নিয়ে অগ্রসর হন। ইসলামের ইতিহাসে এটি ছিল সর্বপ্রথম পতাকা। এ অভিযানে যুদ্ধ হয়নি। তিনি নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(২) ২য় হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা শাওয়াল মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওবায়দাকে (রা.) ষাট অথবা আশিজন মুহাজিরসহ রাবেগের দিকে প্রেরণ করেন। কুরাইশদের এক কাফেলাকে প্রতিরোধ করাই ছিল এ অভিযানের উদ্দেশ্য। উক্ত কাফেলায় আবু সুফিয়ান নেতৃত্ব দিচ্ছিল এবং ইকরামা ইবনে আবু জাহলও তাঁর সংগে ছিল। মুসলমানদের এ বাহিনী মুকাবিলা ছাড়াই মদীনায় ফিরে আসে। তবে হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) একটি তীর নিক্ষেপ করেছিলেন; যা ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত তীর।
(৩) একই বছর যিলক্বদ মাসে বদর যুদ্ধের পর খাতারার দিকে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। খাতারা হচ্ছে জুহফার নিকট হেজাজের একটি ময়দানের নাম। হযরত সা'দ (রা.) এর সংগে মুহাজিরদের বিশটি অথবা আটটি আরোহী ছিল। কুরাইশের এক বাহিনীকে প্রতিহত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। পরে জানা যায় যে, কাফেলা আগের দিনই চলে গেছে। তাই মুসলিম বাহিনী মদীনায় ফিরে আসে।
(৪) একই বছর রবিউল আউয়াল মাসে মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমার (রা.) নেতৃত্বে সাহাবীদের বাহিনী কা'ব ইবনে আশরাফ ইহুদীর এলাকার দিকে প্রেরণ করা হয়। বনী নযীরের বংশদ্ভূত এ নরাধম ছিল কুচক্রি কবি। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাদের সম্পর্কে অত্যন্ত কটূক্তি করত। সে কাফিরদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানি দিত। মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমা (রা.), তাঁর চার জন বন্ধু নিয়ে তার কাছে চলে যান। সাথীদেরকে বস্তির একদিকে নির্জন স্থানে বসিয়ে রাখেন। তিনি একাই তার দুর্গে প্রবেশ করেন। সে তখন তার শয্যাকক্ষে সুখের বিছানায় বিশ্রামরত ছিল। এ অবস্থাতে তাকে হত্যা করেন। রবিউল আউয়ালের ১৪ তারিখ পূর্ণিমার রাতেই মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমা (রা.) তাকে হত্যা করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনায় অত্যন্ত আনন্দিত হন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এ মাহাত্ম্যপূর্ণ কাজের জন্য সাহাবীকে অনেক প্রশংসা ও তাঁর জন্য দোয়া করেন।
(৫) একই বছর জুমাদাল উখরার প্রথম দিকে যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনী ক্বারদার দিকে প্রেরণ করা হয়। নাজদের এক কূপের নাম হচ্ছে কারদা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদকে একশত আরোহীর বাহিনী সংগে নিয়ে কুরাইশদের এক কাফেলাকে প্রতিরোধ করতে প্রেরণ করেন। কাফেলার উপর বিজয় সূচিত হয়। প্রচুর পরিমাণ গনীমতের মাল হস্তগত হয়। সব মাল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পেশ করা হলে মহানবী যথারীতি তা বিতরণ করে দেন। ইসলামের ইতিহাসে এটিই প্রথম গনীমত।
(৬) দ্বিতীয় হিজরীর জুমাদাল উখরার শেষ দিকে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশের (রা.) বাহিনী প্রেরণ করা হয়। সাহাবী আব্দুল্লাহ ছিলেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ফুফু উম্মাইয়ার ছেলে এবং মুসলিম জননী যয়নাব বিনতে জাহশের ভাই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আট অথবা বারজন মুহাজিরসহ বতনে নাখলায় প্রেরণ করেন। বতনে নাখলা হল মক্কা থেকে একদিনের পথ। মক্কা এবং তায়েফের মধ্যবর্তী এক স্থানের নাম। সেখানে কাফিরদের সংগে মুসলমানগণের মুকাবিলা হয়। যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় সূচিত হয়। গনীমতস্বরূপ কাফিরদের বিপুল মালামাল অর্জিত হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) গনীমতের এক পঞ্চমাংশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য আলাদা করে অবশিষ্টটুকু সাথীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। এভাবেই ইসলামের ইতিহাসে গনীমতের এক পঞ্চমাংশ বের করার এ নিয়ম প্রথম চালু হয়। এর পূর্ব পর্যন্ত এক পঞ্চমাংশ বের করার হুকুম আসেনি। পরবর্তীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশের (রা.) আমল অনুযায়ী আল্লাহর হুকুম নাযিল হয়। অপর বর্ণনা মতে তিনি সমস্ত গণিমতের মাল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নখলা বাসীর মালামাল ভাগ বণ্টন করা স্থগিত রাখেন। পরে বদরের গনীমতের সংগে মিলিয়ে তা যথাযথ ভাগ করেন।
(৭) বদরের যুদ্ধের পরে ২য় হিজরীর ২২শে রমযান হযরত ওমায়র ইবনে আদি (রা.) কে আসমা বিনতে মারওয়ানকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করেন। সে ছিল এজিদ ইবনে যায়েদের স্ত্রী এবং বনু উমাইয়া ইবনে যায়েদের বংশদ্ভূত। এ কুচক্রী নারী সদা সর্বদা অকথ্য ভাষায় গাল মন্দ করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দিত। সে কবিতা লিখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরুদ্ধে কাফিরদের উস্কানি দিত। বিস্ময়করভাবে অন্ধ সাহাবী হয়েও হযরত ওমায়র (রা.) সুযোগ মত তাকে হত্যা করেন। এর বিনিময়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বছীর (চক্ষুবিশিষ্ট) উপাধি দিয়েছিলেন।
(৮) ২য় হিজরীর শাওয়াল মাসে হযরত ছালিম ইবনে ওমায়ের (রা.) কে ১২০ বছর বয়স্ক এক ইহুদী কুচক্রী বৃদ্ধকে হত্যার জন্য পাঠান। তার নাম ছিল আবু আস। সে জঘন্য কবিতা লিখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অমার্জনীয় কটূক্তি করত। ছালিম (রা.) তাকে গোপনে হত্যা করে নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(৯) ৩য় হিজরীর মহররমের শুরুতে আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ আল মাখজুমী (রা.) এর বাহিনীকে 'ক্বাতান' প্রেরণ করা হয়। এটি হচ্ছে বনু আসাদের একটি পাহাড় বা কূপের নাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একশত পঞ্চাশ জন সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। যুদ্ধে প্রচুর গনীমত হস্তগত হয়। হযরত আবু সালামা (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য পছন্দ মত সামগ্রী এবং এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে অবশিষ্ট মাল সাথীদের মধ্যে ভাগ করে দেন। প্রত্যেকের অংশে ৭টি করে উট এবং ততোধিক ছাগল বণ্টন হয়েছিল।
(১০) ৩য় হিজরীর মহররম মাসে পুনরায় আব্দুল্লাহ ইবনে আনিস আসলামী (রা.) কে একাকী কুচক্রী সুফিয়ান ইবনে খালিদ এবং তার সংগীদের মুকাবিলার জন্য 'বতনে উরানায়' প্রেরণ করেন। বতনে উরানা আরাফাতের কাছে একটি ময়দানের নাম। তিনি তৃতীয় হিজরীর ৫ই মহররম অভিযানে বের হন। সুফিয়ান ইবনে খালিদকে হত্যা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমত তার মস্তক এনে হাজির করেন। ২২ মহররম শনিবার তিনি ফিরে আসেন।
(১১) তৃতীয় হিজরীর সফর মাসে 'রাজী' এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আসিম ইবনে ছাবিত ইবনে আবু আফলাহকে দশজন সাহাবীর বাহিনী দিয়ে আজল এবং কারার দিকে প্রেরণ করেন। তারা ছিল ইলিয়াস ইবনে মুজরের আওলাদের দু'টি কাবিলা। সাহাবাগণ যখন 'রাজী' নামক স্থানে পৌঁছেন তখন দুশত তীরান্দাজ বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে। আটজন মুসলিম সেনা ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়ে যান এবং কাফিররা তিনজনকে গ্রেফতার করে মক্কায় নিয়ে যায়। এ তিনজন হলেন, (১) যায়েদ ইবনুদ্দাসিলা (রা.) (২) খুবাইব ইবনে আদী (রা.) (৩) আব্দুল্লাহ ইবনে তারিক (রা.)। গ্রেফতার করে নিয়ে যাবার পথে তারা যখন মররুজ জাহরান স্থানে পৌঁছেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে তারিক (রা.) সামনে এগিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। সুতরাং তাকে শহীদ করা হয়। খুবাইব এবং যায়েদকে (রা.) মক্কায় নিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। তারা অনেক দিন পর্যন্ত মক্কায় বন্দী জীবন কাঁটান। মহররম শেষ হওয়া মাত্র সফর মাসে উভয়কে একই দিনে শহীদ করা হয়।
(১২) ৪র্থ হিজরীর সফর মাসে হামরাউল আসাদের যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মুনযির ইবনে আমর এর যুদ্ধা বাহিনীকে দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য বি'রে মাউনায় প্রেরণ করা হয়। এ অভিযানকে ক্বারার এর অভিযান বলা হয়। আসহাবে সুফফার সত্তর জনের এ দলটি ছিল কুরআনের ক্বারী। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে রা'আল কাজওয়ান ওসাইয়া এবং বনু লাহিয়ান এর নিকট ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কাফিরগণ এসব সাহাবাকে শহীদ করে ফেলে। মাত্র একজন সাহাবী পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তার নাম আমর ইবনে উমাইয়া (রা.)। তিনি ফিরে এসে সকল সাথীর শাহাদাতের সংবাদ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) ঐসব সাহাবা যেদিন শহীদ হয়েছিলেন, সেদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সংবাদ দিয়েছিলেন। সংবাদ শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐসব কাফিরদের উপর যারপর নাই রাগান্বিত হন। একটানা এক মাস পর্যন্ত ফজরের নামাযে কুনুতে নাযেলা পাঠ করে তাদের বদদোয়া করেন। পরিশেষে এ ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়। 'এ ব্যাপারে আপনার কোন ইখতিয়ার নেই। (আপনি ধৈর্যধারণ করুন) যাতে আল্লাহ তাদের দিকে মনযোগী হন অথবা শান্তি দেন, কারণ তারা যে যালিম।' (আলে ইমরান-১২৮)। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুনূতে নাযেলা বন্ধ করে দেন। বি'রে মাউনা মক্কা এবং আসফানের মধ্যবর্তী বনু হোজাইলের এক স্থানের নাম।
(১৩) পঞ্চম হিজরীতে দাওমাতুল জুন্দাল, বনীল মুস্তালিক, খন্দক এবং বনী কুরাইযার যুদ্ধ হয়েছিল। ফলে এ বছর কোন সারায়া বা ছোট অভিযান হয়নি। অধিকাংশ সীরাত গ্রন্থে তাই বলা হয়েছে। তবে জুরকানী শরহে মাওয়াহিবে, হাফিয ইবনে হাজার (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এ বছর জুমাদাল উখরায় হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। যা নজদের ইদকে একশত আরোহী নিয়ে করা হয়েছিল। ৬ষ্ঠ হিজরীর মহররম মাসে মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমাকে ত্রিশজন আরোহীসহ ক্বিরতার দিকে প্রেরণ করা হয়। তারা ১৫০টি উট এবং তিন হাজার ছাগল গনীমতস্বরূপ লাভ করেন। মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমা (রা.) বলেন, 'আমি এ অভিযানের উদ্দেশ্যে ১০ই মহররম রওনা হই। ১৯ দিন সফরে থাকি। অতঃপর মহররমের একদিন বাকী থাকতে মদীনায় ফিরে আসি।' এ অভিযানে সাহাবায়ে কেরামরা, ছামামা ইবনে আছাল হাসাদীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন ইয়ামামাবাসীর সর্দার। অবশেষে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
(১৪) একই বছর রবিউল আউয়াল মাসে ওক্বাশা ইবনে মিহসান (রা.) কে চল্লিশ অশ্বারোহী বাহিনীসহ ওমর মারজুকের মুকাবিলায় পাঠান হয়। তারা বিজয়ী হয়ে দু'শত উট নিয়ে ফিরে আসেন। কোন যুদ্ধ করতে হয়নি। কোন সাহাবী শহীদও হননি। সবাই নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(১৫) ৬ষ্ঠ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে কিংবা রবিউস সানীতে, হযরত মুহাম্মদ ইবনে মুসলিমাকে (রা.) দশজন সৈন্যসহ বনু মা'বিয়ার দিকে প্রেরণ করা হয়। তারা যুলকিসসা নামক স্থানে বাস করত। এ যুদ্ধে মক্কার কাফিরদের বিজয় হয় এবং মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সাথী শাহাদাতবরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পেয়ে তাদের সাহায্যের জন্য হযরত আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.) কে প্রেরণ করেন। তিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।
(১৬) একই বছর রবিউস সানীর শেষ দিকে হযরত আবু ওবাইদা ইবনে জারারাহ (রা.) এর বাহিনীকে যাতুল কিসসা পাঠান হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সংবাদ পেলেন যে, কাফিররা মুসলমানদের উপর বিজয়ী হয়ে গেছে এবং অধিকাংশই শাহাদাত বরণ করেছে। তখনই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাহিনীকে পাঠিয়ে ছিলেন। ২৮ শে রবিউস সানী রোজ শনিবার দিন, এ বাহিনীকে পাঠান হয়। তারা শত্রুকে পরাজিত করে বিপুল সংখ্যক জীব-জন্তু গনীমত হিসেবে হস্তগত করেন।
(১৭) একই বছর রবিউস সানীর শেষ তারিখে এবং কারো কারো মতে রবিউল আউয়াল মাসে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনী, বনী সুলাইমের উদ্দেশ্যে জাম্মুম পাঠান হয়। এটা হচ্ছে মদীনা থেকে বার মাইল দূরে নাখলার কাছে একটি স্থানের নাম। এ বাহিনী শত্রু পক্ষের কিছু লোকদের বন্দী করে এবং তাদের জীব-জন্তুর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(১৮) একই বছর জুমাদাল উখরা মাসে মতান্তরে জুমাদল উলা মাসে যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনী বনু সালাবা ইবনে সাদ এর উদ্দেশ্যে 'তারাফ' নামক স্থানে প্রেরণ করা হয়। পনের জন সাথীর এ বাহিনী যথাসময়ে সেখানে পৌঁছে। কোন যুদ্ধ হয়নি। মুসলমান বাহিনী বিশটি উট গনীমতস্বরূপ নিয়ে আসেন।
(১৯) ৬ষ্ঠ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনী বনু জুযামের উদ্দেশ্যে ওয়াদিউল কুরার পথে হিসমার ভূখণ্ডে প্রেরণ করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাঁচশত আরোহীসহ প্রেরণ করেন। তারা গনীমতস্বরূপ এক হাজার উট, পাঁচ হাজার ছাগল নিয়ে আসেন। তাছাড়া একশত মহিলা এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে আসেন। উক্ত কাবিলার সর্দার রেফায়া ইবনে যায়েদ আল জুযামী নিজ বাহিনীর দশজন সদস্য নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হন এবং তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকল বন্দী এবং জীব-জন্তু ফেরৎ দিয়ে দেন।
(২০) একই বছর জুমাদাল উখরা অথবা রজব মাসে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর বাহিনী বনী ফাজরার দিকে ওয়াদিউল কুরা পাঠান হয়। এ অভিযান, হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) অভিযানের আগে অনুষ্ঠিত হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর বাহিনীতে একশত সৈন্য ছিলেন। বেশ ক'জন কাফির অভিযানে নিহত হয় এবং অনেকেই গ্রেফতার হয়।
(২১) এ বছর রজব মাসে জায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনী বনু ফাজারার উদ্দেশ্যে ওয়াদিউল কুরা পাঠান হয়। কোন যুদ্ধ হয়নি।
(২২) একই বছর শা'বান মাসে হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এর বাহিনীকে দাওমাতুল জানদাল এর দিকে অভিযানে পাঠান হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) কে ডেকে নিজের পার্শ্বে বসান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তার মাথায় পাগড়ী পরান। অতঃপর শত শত বাহিনীর কাফেলা সংগে নিয়ে তাকে দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য পাঠান। তারা দাওমাতুর জান্দাল পৌঁছে এলাকার লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়। অধিকাংশ লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেনি। অথচ তারা জিযিয়া ট্যাক্স বা কর দিতে সম্মত হয়।
(২৩) ৬ষ্ঠ হিজরীতে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনীকে মাদায়েন প্রেরণ করা হয়। তার সংগে হযরত আলীর গোলাম জমিরাও (রা.) ছিলেন। এ যুদ্ধে কিছু বন্দী হস্তগত হয়। মাদায়েন হযরত সোয়াইব (আ.) এর গোত্রের শহরের নাম। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে তাবুকের বিপরীত দিকে এটি অবস্থিত।
(২৪) একই বছর শা'বান মাসে হযরত আলী (রা.) এর বাহিনীকে একশত সৈন্য নিয়ে বনু সাদ ইবনে বকর এর উদ্দেশ্যে ফাদাক পাঠান হয়। আলী (রা.) সেখান থেকে গণিমতস্বরূপ পাঁচশত উট এবং দু'হাজার ছাগল নিয়ে আসেন।
(২৫) ৬ষ্ঠ হিজরীতে পুনরায় রমযান মাসে যায়েদ ইবনে হারিসার (রা.) বাহিনীকে দ্বিতীয় বারের মত বনু ফাজারার উদ্দেশ্যে ওয়াদিউল কুরা পাঠান হয়। তিনি সেখানে গিয়ে কিছু কাফিরকে হত্যা করেন এবং কিছু কাফিরকে বন্দী করে নিয়ে আসেন। বন্দীদের মধ্যে উম্মে কিরফা নামক এক মহিলাও ছিল। তার আসল নাম ফাতিমা বিনতে রবিয়া ইবনে বদর। সে তার কাবিলার অত্যধিক বরণীয় হিসেবে বিবেচিত ছিল। তার মর্যাদা, সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল প্রবাদের মত। সে নিজ ঘরে সবসময় পঞ্চাশটি তরবারী লটকে রাখত। এসব তরবারীর পরিচালক ছিল তার এমন আত্মীয়-স্বজন যাদেরকে বিবাহ করা বৈধ নয়। বার জন ছিল তার নিজের ছেলে। হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) এ মহিলাকে হত্যা করে, তার দুনিয়াবী প্রতিপত্তিকে ভূলণ্ঠিত করেন।
(২৬) ৬ষ্ঠ হিজরীর রমযান মাসে আরেকটি অভিযানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক আনসারীর বাহিনীকে আবু রাফে ইহুদীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। পাঁচ অথবা সাতজন সাহাবী এ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আবু রাফে ইহুদী, হেজায ভূমির খাইবার এর কাছে একটি দুর্গে বাস করত। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অমার্জনীয় কটূক্তি করত। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরুদ্ধে আরব গোত্রসমূহকে উস্কানী দিত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক (রা.) রাতের আঁধারে তাকে হত্যা করে, দুনিয়াবী শয়তানী থেকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন।
(২৭) ৬ষ্ঠ হিজরীর শাওয়াল মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) কে উসায়ের ইবনে রেযام ইহুদীর প্রতি খায়বারে প্রেরণ করেন। এ বাহিনীকে ত্রিশজন সৈন্য ছিল। বাহিনীতে আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক আনসারী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.)ও ছিলেন। তারা উক্ত ইহুদীর কাছে গিয়ে পৌঁছেন এবং বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তোমার নিকট পাঠিয়েছেন যাতে তুমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গিয়ে হাজির হও। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে পুরস্কারে ভূষিত করবেন এবং তোমাকে খাইবারের শাসক নিযুক্ত করবেন। লোভী উসাইর সেই লালসায় ত্রিশজন ইহুদীকে নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা করেন। রাস্তায় উসায়ের ও তার দল মুসলিম বাহিনীর সাথে বিরোধিতা এবং বিদ্রোহ করে। তখন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.) তাকে হত্যা করেন। তার সাথীগণ যুদ্ধের জন্য তৈরী হয়ে যায়। ফলে মুসলমান বাহিনী শত্রুদের সবাইকে হত্যা করেন। মাত্র একজন পলায়ন করতে সক্ষম হয়। মুসলমানদের কোন প্রকার ক্ষতি হয়নি।
(২৮) ৬ষ্ঠ হিজরীর শাওয়াল মাসে হযরত কিরজ ইবনে জাবির আলকুরশীর (রা.) বাহিনী 'আকল এবং উরাইনার' দিকে পাঠান হয়। তারা ছিলেন সে আট ব্যক্তি, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে ইসলাম গ্রহণ করে মদীনাতে বসবাস শুরু করেছিলেন। সেখানকার আবহাওয়া অনুকূল মনে না হওয়ায়, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতি নিয়ে জংগলে চলে যান। সেখানে যাকাতের উট ময়দানে চরতে ছিল। তারা সেখানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাখাল ইয়াসারকে হত্যা করে এবং উট নিয়ে চলে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত কিরজ ইবনে জাবির (রা.) এর নেতৃত্বে বিশজন আরোহী সৈন্যকে এ বিশ্বাসঘাতকদের ধাওয়া করার জন্য পাঠান। অতঃপর তাদেরকে গ্রেপ্তার করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির করা হয়। এদের সম্পর্কে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়। 'যারা আল্লাহর সংগে এবং তার রাসূলের সংগে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে (অর্থাৎ যারা ছিনতাই এবং দস্যুবৃত্তি করে) তাদের শাস্তি হচ্ছে, হত্যা করা হবে কিংবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত এবং পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে। অথবা ভূমি থেকে বের করে দেয়া হবে।' সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের হাত-পা কেটে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। সেভাবেই তাদেরকে হত্যা করা হয়।
(২৯) ৬ষ্ঠ হিজরীতে হযরত আমর ইবনে উমাইয়া জমিরী (রা.) কে কুচক্রী আবু সুফিয়ানকে আকস্মিক হত্যা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় পাঠান হয়। কারণ কেননা আবু সুফিয়ান এক নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র করেছিল। সে একজন লোককে মদীনায় পাঠিয়েছিল। যেন সে, কোন সুযোগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করে। এরপর হযরত আমর মক্কায় আসেন। কিন্তু তিনি আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার কোন সুযোগ করতে পারেননি। তবে তিনি মক্কার বাইরে দু'জন কাফিরকে হত্যা করতে সক্ষম হন। এরা হল, আমর ইবনে ওবায়দুল্লাহ ইবনে মালিক এবং বনু বুদাইলের এক ব্যক্তি। অতঃপর অপর দু'ব্যক্তির সংগে তার সাক্ষাৎ হয়, যাদেরকে কুরাইশবাসী গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে মদীনায় পাঠিয়ে ছিল। হযরত আমর (রা.) উক্ত দু'জনের একজনকে হত্যা করেন এবং অপরজনকে বন্দী করে নিয়ে আসেন মদীনায়।
(৩০) ৭ম হিজরীতে মহররম মাসে হযরত আবান ইবনে সাঈদ (রা.) এর যোদ্ধা বাহিনীকে নজদের দিকে প্রেরণ করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কয়েকজন সাহাবীসহ নিজে খায়বারের যুদ্ধের জন্য তাশরীফ নেবার পূর্বেই মদীনা থেকে পাঠিয়ে দেন। ঐ বাহিনীটি অনেক বিলম্বে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেদমতে খাইবার গিয়ে পৌঁছেন। এসময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার যুদ্ধ শেষ করেছেন। সুতরাং তারা খাইবারের গনীমতের অংশ থেকে বঞ্চিত থাকেন। তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দানস্বরূপ সামান্য দিয়েছিলেন। তাদের ফিরে আসার সময় হযরত আবু হুরাইরা (রা.) দুস কাবিলার সাথে ইয়ামান থেকে এসেছিলেন। বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ঐ সময় গিয়ে পৌঁছি, যখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারে অবস্থান করছিলেন। আমি আরজ করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাকে দিবেন না।' আমি বললাম 'এ হচ্ছে নো'মান ইবনে কাওকাল (রা.) আনসারীর হত্যাকারী। তাকে উহুদের যুদ্ধে আবান শহীদ করেছিলেন। তিনি তখন মক্কার কাফির সৈন্যদের পক্ষে ছিলেন। পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।' এটা শুনে আবান বলেন, 'কেমন আশ্চর্য কথা! এক বিড়াল 'জান' নামক পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আমাদের কাছে এসেছে। সে আমার উপর এমন একজন মুসলমান হত্যার দোষারোপ করছে যাকে মহান আল্লাহ আমার হাতে শাহাদাতের মহান মর্যাদা দান করেছেন এবং আমাকে তাঁর হাতে লাঞ্ছিত করেননি।' ব্যাপারটি যদি উল্টা ঘটে যেত অর্থাৎ আমি যদি কুফরী অবস্থায় তার হাতে নিহত হতাম, তবে লজ্জিত হয়ে জাহান্নামে যেতে হত। আল্লাহ আমাকে এই লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করেছেন। কি জ্ঞানগর্ভ কথা।
(৩১) ৭ম হিজরীর শা'বান মাসে আমিরুল মু'মেনীন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর বাহিনীকে তুরবা নামক স্থানে পাঠান হয়। তুরবা মক্কা থেকে দু'দিনের পথ, এক ময়দানের নাম। বনু হাওয়াজিনের অবশিষ্ট কাফিরগণ এখানে বাস করত। হযরত ওমর (রা.) ত্রিশটি সওয়ারী নিয়ে রওনা হন। কাফিরগণ এ সংবাদ পেয়ে পলায়ন করে। যুদ্ধ হয়নি। হযরত ওমর (রা.) নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(৩২) শাবান মাসে আমিরুল মুমেনীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর বাহিনী, বনু কেলাব গোত্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারা নজদে, ওয়াদিউল কুরার কাছে বসবাস করত। যুদ্ধে শত্রু পক্ষের কতিপয় নিহত এবং কিছু সংখ্যক বন্দী হয়। তিনি নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(৩৩) শাবান মাসে হযরত বশীর ইবনে সা'দ (রা.) এর বাহিনীকে বনু মাতারার উদ্দেশ্যে ফাদাক পাঠান হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ত্রিশজন আরোহী সৈন্যের আমীর বানিয়ে পাঠান। তাঁদের মধ্যে উসামা ইবনে যায়েদ, আবু মাসউদ আবদরী এবং কাব ইবনে ওজরাও (রা.) শরিক ছিলেন। সেখানে ভয়ানক যুদ্ধ হয়; তথাপি তারা কয়েকটি উট এবং ছাগল গনীমতস্বরূপ নিয়ে মদীনায় ফিরে আসতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে হযরত বশীরের (রা.) অনেক সাথী শাহাদাত বরণ করেন এবং তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট মদীনায় আসেন। একই হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার তাদের সাহায্যের জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাত প্রেরণ করেন। তাঁরা গিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন এবং গনীমত ছিনিয়ে আনেন।
(৩৪) ৭ম হিজরীর রমযানুল মোবারকে হযরত গালিব ইবনে আব্দুল্লাহ আল লাইছি (রা.) এর বাহিনী বনু উয়াল এবং বনু আব্দ ইবনে ছালাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নজদ এলাকা মদীনা থেকে ৯৬ মাইল দূরে অবস্থিত। মীফা নামক এলাকার দিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একত্রিশ জনের বাহিনীসহ প্রেরণ করেন। হযরত উসামা ইবনে যায়েদও (রা.) তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা শত্রুর সম্মুখীন হয়েছিলেন। বিজয় হয় মুসলমানদের। তারা বহুসংখ্যক উট এবং ছাগল গনীমতস্বরূপ নিয়ে আসেন। কাউকে বন্দী করেননি।
(৩৫) ৭ম হিজরীতে হযরত বশীর ইবনে সা'দ (রা.) এর বাহিনী ইয়ামান এবং জাবার দিকে প্রেরণ করা হয়। ইয়ামান এবং জাবার দু'টি স্থানের নাম; যা খাইবার এবং ওয়াদিউল কুরার কাছেই অবস্থিত। সেখানে বনু গাতফান গোত্র বসবাস করত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তিনশত সৈন্যের বাহিনীসহ প্রেরণ করেছিলেন। তাঁরা প্রচুর পরিমাণে গনীমতের মাল নিয়ে আসেন। এ ছাড়া দু'ব্যক্তিকে বন্দী করে মদীনায় নিয়ে আসেন। পরে এ দু'জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
(৩৬) একই বছর যিলহজ্ব মাসে হযরত আখরাম ইবনে আব্দুল আওজা আস সালমী (রা.) এর বাহিনীকে বনু সুলাইম এর উদ্দেশ্যে পাঠান হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পঞ্চাশ সদস্যসহ প্রেরণ করেন। সেখানে কাফিরদের সংগে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। হযরত আখরাম (রা.) ছাড়া তার সকল সাথী শাহাদাত বরণ করেন। তিনি ১লা সফর ৭ম হিজরী তারিখে মদীনায় নিসঙ্গ ফিরে আসেন।
(৩৭) ৮ম হিজরীর সফর মাসে হযরত গালিব ইবনে আব্দুল্লাহ আল লাইছী (রা.) এর বাহিনী বনু মুলাওয়ীহ এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ কর হয়। তারা কাদীদে বসবাস করত। এটি মক্কা থেকে ৪২ মাইল দূরে অবস্থিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চৌদ্দ বা তার চেয়ে বেশী সংখ্যক সৈন্য দিয়ে প্রেরণ করেন। হযরত গালিব (রা.) এবং তার বাহিনী যুদ্ধে জয় লাভ করেন। মুসলমান সৈন্যগণ কাফিরদের বড় বড় নেতাদের হত্যা করেন। কাফিরদের মহিলা এবং শিশুদের বন্দী করেন। তাদের সকল জীব-জন্তু মদীনায় নিয়ে আসেন।
(৩৮) একই বছর সফর মাসে অপর একটি বাহিনী মো'সাব এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তারা ফাদাকে বসবাস করত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দু'শত সৈন্য দিয়ে প্রেরণ করেন। মুশরিকদের সংগে মুকাবিলা হয়। তাদের উট এবং ছাগলসমূহকে গনীমত হিসেবে নিয়ে আসা হয়। মহিলা এবং শিশুদের বন্দী করা হয়। মাথাপিছু গনীমত হয় দশ উট অথবা এর সমান ছাগল। দশটি ছাগল এক উটের সমান ধরা হয়েছিল।
(৩৯) ৮ম হিজরীর রবিউল আউয়ালে হযরত শুজা ইবনে ওহাব (রা.) এর অভিযান বনু হাওয়াজিন এর এক শাখা বুন আমিরের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তারা ছায়ী নামক স্থানে বাস করত। এটি ইরাকের কাছাকাছি অবস্থিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চব্বিশজন সাথীসহ প্রেরণ করেন। বিপুল সংখ্যক উট এবং ছাগল তাদের হস্তগত হয়। বাহিনী এগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে আসেন মদীনায়। গনীমত হিসেবে মাথাপিছু পনেরটি করে উট তাদের অংশে আসে। এক উট সমান বিশটি ছাগল ধরা হয়েছিল।
(৪০) একই বছর রবিউল আউয়ালে হযরত কাব ইবনে ওমায়র আনসারীকে (রা.) যাতে আতলা নামক স্থানে পাঠান হয়। এ যুদ্ধে কাফির সৈন্য বিজয়ী হয়। সকল মুসলমান সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। মাত্র একজন জীবিত ছিলেন। তিনি এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ দেন। যাতে আতাল' সিরিয়ার এক জায়গার নাম।
(৪১) ৮ম হিজরীর জুমাদাল উলায় মুতার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদিও স্বয়ং অংশগ্রহণ করেননি তথাপি বিপুল সংখ্যক মুসলমান তাতে অংশ নিয়েছিলেন। এজন্য এ যুদ্ধকে গাযওয়ায়ে মুতাও বলা হয়। মুতা সিরিয়ার একটি বিখ্যাত শহরের নাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) কে আমীর মনোনীত করেন এবং বলেছিলেন যদি যায়েদ (রা.) শহীদ হয়ে যায় তবে জাফর বিন আবু তালিব (রা.) আমীর হবে। জাফর (রা.) শহীদ হলে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহ (রা.) আমীর হবে। তিনি শহীদ হলে মুসলমানদের মধ্যে পরামর্শক্রমে একজন আমীর নিযুক্ত করে নিবে। রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস আড়াই লক্ষ সৈন্য নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুকাবিলার জন্য বালকা নামক স্থানে অবস্থান করছিল। এ তিন জন জেনারেলের শাহাদাত বরণের পর মুসলমানগণ পরামর্শক্রমে আল্লাহর তরবারী (সাইফুল্লাহ) হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে আমীর নির্বাচন করেন। তিনি ঝা হাতে নিয়ে মুসলমানদের নতুন করে সাজান এবং কাফির সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আল্লাহর সাহায্যে যুদ্ধের অবস্থা পাল্টে যায়। কাফিরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এবং পরাজয় ঘটে। এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদকে আল্লাহর তরবারী উপাধি দেন। এ যুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (রা.) হতে নয়টি তরবারী ভেঙ্গে যায়।
তিনি বিশ্ব ইতিহাসের একমাত্র জেনারেল যিনি যুদ্ধের ময়দানে সৈনিক হতে জেনারেল নির্বাচিত হন এবং জীবনে কখনই কোন যুদ্ধে পরাজিত হননি। তিনি কাফির ও মুসলিম উভয় অবস্থায় জয়ী হয়েছেন। খালিদের (রা.) সৈন্য পরিচালনা, কৌশল, ক্ষিপ্রতা সবই অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, 'খালিদ আল্লাহর তরবারীর মধ্যে একটি তরবারী।' এ যুদ্ধে মুসলমানদের মাত্র বার জন সৈন্য শহীদ হন। পক্ষান্তরে কাফির সৈন্যদের লাশের স্তূপ জমা হয়েছিল। নিহতদের সঠিক সংখ্যা আল্লাহই ভাল জানেন। কাফিরদের অনেক জেনারেল নিহত হয়। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং সরঞ্জামাদী গনীমতস্বরূপ হস্তগত হয়। এ বিজয় ছিল মহান আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানীর কারণে। আর সাহায্য তো কেবল আল্লাহরই! নিশ্চয় তিনি মহাপরাক্রমশালী ও সুকৌশলী। এ যুদ্ধে কাফিরদের সৈন্যের সংখ্যা ছিল মুসলমানদের তিরাশিগুণ। বিশ্বের ইতিহাসে এমন অসম কোন যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়নি। তদুপরি সে যুদ্ধে মুসলমানরাই জয়ী হয়েছিলেন। সবই আল্লাহর ইচ্ছা।
(৪২) ৮ম হিজরীর জুমাদাল উলায় হযরত আমর বিন আস (রা.) এর বাহিনীকে যাতুস সালাসিল পাঠান হয়। তিন শত বীর মুহাজির এবং আনসার সাহাবীর মুসলিম বাহিনীর আমীর করে তাকে মুশরিকদের কাজয়া, আমেলা, লখম এবং জুযام গোত্রের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। মুসলিম দলে তিনটি ঘোড়া ছিল। সালাসিল নামক স্থানে যুদ্ধ হয়। পরিশেষে যুদ্ধে মুসলমানগণ বিজয়ী এবং গনীমতের অধিকারী হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। আসসালাসিল মদীনার দশ মাইল দূরে একটি কূপের নাম। এ যুদ্ধ যেহেতু ঐ কূপের কাছে সংঘটিত হয়েছিল, তাই একে যাতুস সালাসিল যুদ্ধও বলা হয়। হযরত আমর ইবনুল আসকে (রা.) তার ইসলাম গ্রহণের চার মাস পরে এ অভিযানে পাঠান হয়েছিল।
(৪৩) ৮ম হিজরীর রজব মাসে হযরত আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) এর বাহিনী কুরাইশের এক কাফেলার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তার সংগে ছিলেন তিন শত সৈন্যের একটি দল। কুরাইশদের দলের অবস্থান ছিল মদীনা থেকে পাঁচ দিনের দূরত্বে বনু জানাইনাহ এলাকায়। এ যুদ্ধকে সাইফুল বাহার অথবা খাবত এর যুদ্ধ বলা হয়ে থাকে। যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যদের রসদ ফুরিয়ে গেলে তারা গাছের পাতা চিবিয়ে খেয়েছিলেন। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের খাদ্যের জন্য পাহাড়ের মত একটি মাছ (আম্বর বা তিমি মাছ) সাগরের তীরে উঠে আসে। সাহাবীরা এক মাস পর্যন্ত এ মাছ ভক্ষণ করেন এবং এর তেল শরীরে মালিশ করেন। ফলে তাদের স্বাস্থ্য মোটা তাজা হয়ে যায়। সাহাবাগণ উক্ত মাছের অংশ মদীনাতে নিয়ে আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ মাছ খেয়েছিলেন। এখানে মুখোমুখি কোন যুদ্ধ করতে হয়নি। হযরত আবু ওবায়দা (রা.) নীলতিমি বা আম্বর মাছের কাটা দাড়া করেন এবং সবচেয়ে উঁচু সাহাবী হযরত কায়েস ইবনে সাদ ইবনে ওবাদাকে (রা.) এর নীচ দিয়ে উটে চড়ে অতিক্রম করার নির্দেশ দেন। তিনি অতি সহজেই নিজ উট নিয়ে মাছের কাটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করেন। অতঃপর হযরত আবু ওবায়দা (রা.) ঐ মাছের চোখের গর্তের ভেতর বসার নির্দেশ দিলে, তাতে তেরজন সাহাবী অনায়াসে বসে পড়েন। মহান আল্লাহর সৃষ্টি এবং সাহায্য সত্যই বিস্ময়কর।
(৪৪) মক্কা বিজয়ের পূর্বে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আমর ইবনে মুতারাহ আলজাহনী (রা.) কে আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। যিনি তখনও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরম শত্রু ছিলেন। হযরত আমর (রা.) জুহাইনা এবং মুজিনা গোত্রের কতিপয় সাথী নিয়ে তার মুকাবিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আল্লাহ তায়ালা আবু সুফিয়ান এবং তার দল বলকে পরাজিত করেন। তার অনেক সাথী ময়দানে নিহত হয়। অতঃপর মক্কা বিজয়ের দিন আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।
(৪৫) ৮ম হিজরীর শাবান মাসে হযরত আবু কাতাদা, ইবনুল হারিস আল রবয়ী আল আনসারী আসসালামী (রা.) এর বাহিনী বনু মুহারিবের উদ্দেশ্যে গাতফান এলাকায় প্রেরণ করা হয়। তারা 'খাজরা' নামক স্থানে বাস করত। এটি ছিল নজদ অঞ্চলে বনু মুহারিবের ভূমির নাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ষোল জন সংগীসহ প্রেরণ করেন। তারা যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। কাফিরদের বহু সৈন্য গ্রেফতার হয়। দু'শত উট এবং দু'হাজার ছাগল গনীমতস্বরূপ মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়।
(৪৬) ৮ম হিজরীর রমযানের শুরুতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এর আগে আবু কাতাদার (রা.) একটি বাহিনী বতনে ইজম প্রেরণ করা হয়। এটি মদীনার একটি ময়দান বা পাহাড়ের নাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আট জন সংগীসহ প্রেরণ করেন। কোন যুদ্ধ হয়নি। তারা সকলেই নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন।
(৪৭) ৮ম হিজরীর রমযান মাসে হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ করা হয় যুদ্ধে ওসামা (রা.) এর এক প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটেছিল। সামনাসামনি সমর যুদ্ধের সময় একজন কাফির সৈন্য তার সামনে আসে। তিনি তাকে হত্যা করার জন্য তরবারী উঠান। সে তখন কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে। তথাপি হযরত উসামা তাকে হত্যা করে ফেলেন। মদীনায় ফিরে আসার পরে, যখন মহানবী ঘটনা জানতে পান, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে ওসামা, 'তুমি কিয়ামতের দিনে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ব্যাপারে কি করবে? অর্থাৎ তোমার উপর যখন একজন মুসলমান হত্যার মামলা হবে তখন তুমি কি জবাব দিবে? হযরত উসামা আরজ করেন, 'আমি যখন তাকে হত্যা করতে উদ্যত হই, সে তখন ভীত হয়ে কালিমা পাঠ করেছে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তুমি তার বুক চিরে দেখলে না কেন?' অর্থাৎ সে কি অন্তর দিয়ে পাঠ করেছে না মৃত্যুর ভয়ে! এ কলেমা এতটাই দামী।
(৪৮) ৮ম হিজরীতে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয় শেষ করেন, তখন রমযান মাসের ছয় রাত্রি অবশিষ্ট থাকতে অর্থাৎ ২৪ রমযান 'মানাত' নামক প্রতিমা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে সাদ ইবনে যায়েদ আল আশ হালীর (রা.) বাহিনী প্রেরণ করেন। এটা ছিল আওছ এবং খাজরাজের দেবতা। তিনি বিশজন সৈন্য নিয়ে সেখানে যান এবং প্রতীমা ধ্বংস করে সফলভাবে মক্কায় ফিরে আসেন।
(৪৯) মক্কা বিজয় শেষে ওজ্জা নামক মূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবনে ওলীদের (রা.) বাহিনী প্রেরণ করেন। মক্কার পূর্ব দিকে নাখলা নামক স্থানে এটি স্থাপিত ছিল। হযরত খালেদ (রা.) ত্রিশজন সাহাবী নিয়ে মূর্তিটি ভেংগে ফেলেন।
(৫০) মক্কা বিজয়ের পরে রমযান মাসেই সোয়া নামক মূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আমর ইবনে আসের (রা.) বাহিনী প্রেরণ করেন। এ মূর্তি রুহাত নামক স্থানে সাগরের পাড়ে মক্কা থেকে কিছু দূরে একটি গ্রামে অবস্থিত ছিল। হযরত আমর ইবনে আস (রা.) সেখানে গিয়ে মূর্তি ধ্বংস করে সফলভাবে ফিরে আসেন।
(৫১) মক্কা বিজয়ের পরে এবং হুনাইন যুদ্ধের পূর্বে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) এর বাহিনীকে বনী জুমাইমার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। এটি হচ্ছে বনু কানানার একটি শাখা। ইয়ালামলামের কাছে মক্কা থেকে একদিনের পথে তাদের আবাস ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনশত পঞ্চাশ জন আনসার ও মুহাজিরকে এ অভিযানে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে কিছু কাফির নিহত এবং বন্দী হয়। এ যুদ্ধে এক প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটেছিল। হযরত খালিদ (রা.) যখন কাফিরদের বিরুদ্ধে তরবারী পরিচালনা শুরু করেন, তখন কতিপয় মুশরিক (নিজেদের মুসলমান বলে প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে) আমরা আমাদের ধর্ম ছেড়ে দিয়েছি (অর্থাৎ মুসলমান হয়ে গেছি) বলে উঠে। অথচ লোকেরা "আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি" এমন সুস্পষ্ট ভাষায় তা বলতে পারেনি। সুতরাং হযরত খালিদ (রা.) তাদের ভুলবশতঃ হত্যা করে ফেলেন। এ সংবাদ পেয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ (রা.)-কে দোষারোপ করেন এবং হাত তুলে তিন বার বলেন, 'হে আল্লাহ! খালিদ যা কিছু করেছে আমি সে সম্পর্কে জড়িত না থাকার কথা ঘোষণা করছি।' অবশেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেকের জান ও মালের ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন।
(৫২) ৮ম হিজরীর শাওয়াল মাসে হুনাইন এবং তায়েফ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আবু আমির ওবায়দ ইবনে ছালিম বিন হেজার আল আশয়ারী (রা.) (হযরত আবু মূসা আশয়ারীর চাচা) এর বাহিনীকে আওতাসে পাঠান হয়। হুনাইন যুদ্ধের পরে ঐসব কাফিরদের মুকাবিলার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাঠিয়েছিলেন; যারা হুনাইন থেকে পলায়ন করেছিল। আবু দুরাইদ ইবনে আম্মারের সংগে তাঁর যুদ্ধ হয়। আবু দুরাইদ নিহত হয়, তার সাথীরা পরাজিত হয়। বিপুল পরিমাণ মালামাল এবং বন্দী গনীমতস্বরূপ হস্তগত হয়। এ যুদ্ধে হযরত আবু আমির (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আমিরের জন্য দোয়া করেন, 'আয় আল্লাহ! আবু আমির ওবায়দের মাগফিরাত করুন। তাকে আপনার সৃষ্টির বহু লোকের উপর মর্যাদা দান করুন।' এ যুদ্ধে হযরত আবু মূসা আশয়ারী, আবু আমিরের (রা.) হত্যাকারীকে হত্যা করেন।
(৫৩) শাওয়াল মাসে হুনাইন এবং তায়েফ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে হযরত তুফায়েল ইবনে দোয়াইলী (রা.) এর বাহিনী যুলকাফফাইনকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। যুল কাফফাইন বনু দুস কাবিলার মূর্তির নাম। এটা ছিল কাঠের তৈরী। মুসলিম বাহিনী মূর্তি ভেংগে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ পৌঁছার চারদিন পরে তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হন।
(৫৪) ৮ম হিজরীর যিলকদ মাসে জিয়িয়ারানা থেকে ফিরে আসার পথে কয়েস ইবনে আসাদ ইবনে ওবাদা (রা.) এর বাহিনী চার শত সৈন্যসহ মদার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। এ হচ্ছে আরবের একটি গোত্র যারা ইয়ামানের দিকে বাস করত। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৫৫) ৮ম হিজরীর যিলকদ মাসে তায়েফ থেকে ফেরার পথে এবং জিয়িয়ারানার গনীমতের মাল বণ্টনের পরে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদের (রা.) বাহিনী ইয়ামানের হামাদন কাবিলার দিকে প্রেরণ করেন। হযরত খালিদ (রা.) সেখানে পৌঁছে তাদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। ছ'মাস পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করে দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু তারা ইসলাম কবুল করেনি। হযরত খালিদ তাদের কিছু লোকদের বন্দী করেন। অতঃপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে সেখানে পাঠান। তিনি সেখানে পৌঁছার পর তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আনুগত্য স্বীকার করেন। এ যুদ্ধে একটি ঘটনা প্রকাশিত হয়। হযরত আলী (রা.) সেখানে একটি দাসী, নিজের জন্য বেছে দেন, সে ছিল সবচেয়ে ভাল। তিনি তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মদীনায় নিয়ে আসেন। হযরত বুরাইদা ইবনে হাসির আসলামীর (রা.) খেয়াল হল যে, হযরত আলী (রা.) গনীমতের মালে খেয়ানত করেছেন। কাজেই তিনি তার সংগে হিংসা পোষণ করতে থাকেন। মদীনায় ফিরে আসার পরে এ বিষয়টি আলোচনা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বুরাইদা (রা.) কে জিজ্ঞেস করেন, 'বুরাইদা! তুমি আলীর সংগে বিদ্বেষ পোষণ করবে না। কারণ আলী আমার এবং আমি আলীর।' আলীর (রা.) সংগে যদি তোমার ভালবাসা থাকে তবে সে ভালবাসা আরও বৃদ্ধি কর। হযরত বুরাইদা (রা.) বলেন, 'এ কথার পরে আমার নিকট আলীর (রা.) চেয়ে অধিক প্রিয়পাত্র আর কেউ ছিল না।'
(৫৬) ৯ম হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উইহায়না ইবনে হিসন আল ফেজারীর বাহিনীকে বনু তামীম গোত্রের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাঁদের মধ্যে কোন মুহাজির বা আনসার ছিলেন না। যুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কাফির পক্ষের এগারজন পুরুষ, একশ জন মহিলা এবং ত্রিশজন শিশু বন্দী হয়।
(৫৭) ৯ম হিজরীর সফরে আব্দুল্লাহ ইবনে আওসাজা (রা.) এর বাহিনী ইসলামের দাওয়াতের জন্য বনু হারিছা ইবনে আমর এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য বদ দোয়া করেন। তাদের বিবেক বিলুপ্ত হয়। কাজেই তাদের শরীরে কম্পন সৃষ্টি হয় এবং নির্বোধ হওয়ার সে রোগ এখনও অব্যাহত আছে। তাদের কথা বার্তা পাগলের প্রলাপের মত হয়ে থাকে।
(৫৮) একই বছর সফর মাসে হযরত কুতবা ইবনে আমির আল আনসারী আল খাযরাজী আল বদরী (রা.) এর বহিনী বনু খাছয়াম এর প্রতি প্রেরিত হয়। এটি ইয়ামান দেশের একটি দুর্গ ঘেরা শহর। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিশজন সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলমানগণ জয়ী হয়ে কাফিরদের উট, ছাগল এবং মহিলাদের গনীমতস্বরূপ অধিকারী হন।
(৫৯) ৯ম হিজরীর সফর মাসে মতান্তরে রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস সানী মাসে হযরত জেহাক ইবনে সুফিয়ান কেলাবীর (রা.) বাহিনীকে 'ক্বারাতা' নামক এলাকায় প্রেরণ করা হয়। এটি বনু ওকায়েদ ইবনে কোরের একটি শাখা। হযরত জেহাক (রা.) তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। যুদ্ধ সংঘটিত হলে কাফির বাহিনী পরাজিত হয়। হযরত জেহাক (রা.) নিরাপদে গনীমতসহ ফিরে আসেন। আলকামা ইবনে মুজাজাজ মুদলাজী (রা.) এর বাহিনীকে জিদ্দার সাগরের তীর ঘেঁষে মূলত দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য প্রেরণ করা হয়। সেখানে আবিসিনিয়া থেকে কিছু লোক এসে একত্রিত হয়ে বাস করছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তিনশত সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। মুসলিম সৈন্য সেখানে পৌঁছা মাত্র তারা যুদ্ধ না করে পলায়নের পথ বেছে নেয়।
(৬০) এ বছর রবিউল আখের মাসে হযরত আলী (রা.) এর বাহিনীকে ফুলমনাক মূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বনু তাই কাবিলার দিকে প্রেরণ করা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দলে দু'শত অশ্বারোহী বাহিনীসহ পাঠিয়েছিলেন। হযরত আলী (রা.) এর বাহিনী ঐ মূর্তিকে ধ্বংস করে। মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। বিপুল পরিমাণ উট, ছাগল এবং যুদ্ধবন্দী হস্তগত হয়। এ যুদ্ধে দু'টি তরবারী হস্তগত হয়। একটির নাম মিখজাস, অপরটির নাম আতারাসুব। আলী (রা.) তরবারীদ্বয় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেশ করেন। পরবর্তী অধিকাংশ যুদ্ধেই এ তরবারী দু'টি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে থাকত। এ যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে বিখ্যাত দানবীর হাতীম তাইয়ের কন্যা এবং আদী ইবনে হাতিমের বোন সাফফানা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার অনুরোধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বন্দীদের বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দিয়ে দেন। বন্দীদের সংখ্যা ছিল নয় শত। তিনি দেশে ফিরে গিয়ে ভাই আদি ইবনে হাতিমকে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন। দশ হিজরীতে আদি ইবনে হাতিম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৬১) একই বছর রবিউস সানী মাসে হযরত ওক্কাসা ইবনে মিহসান (রা.) এর বাহিনী হেবাবে পাঠান হয়। যুদ্ধবিহীন মুসলিম বাহিনী নিরাপদে ফিরে আসে।
(৬২) একই বছর রজব মাসে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে অবস্থান করছিলেন, তখন হযরত খালিদ ইবনে ওলীদের (রা.) বাহিনীকে উকাইদার ইবনে আকদ ইবনে আব্দুল মালিক নাসরানীর (খ্রীস্টান নেতা) উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। উকাইদার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। অধিকাংশের মতে সে কুফরী অবস্থায় নিহত হয়। সে ছিল রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের পক্ষ থেকে দাওমাতুল জুনদালের গভর্নর। উকাইদার মুসলিম সেনাবাহিনীর সংগে দু'হাজার উট, আটশত ঘোড়া, চারশ বল্লম এবং চারশ নেজার বিনিময়ে চুক্তির প্রস্তাব দেয়। মুসলিম বাহিনী তা গ্রহণ করেন। উকাউদার দাওমাতুল জানদালের গভর্নর তথা বিরাট সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.)-কে চারশ বিশজন আরোহীসহ তার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে ছিলেন। হযরত খালিদ (রা.) উকাইদার এবং তার ভাই মুসাদিকে বন্দী করে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরবারে নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা প্রদান করেন। সসম্মানে তাদেরকে ফেরত দেন। লিখিত চুক্তিনামাও প্রদান করেন।
(৬৩) ৯ম হিজরীর শেষের দিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এবং হযরত মুগিরা ইবনে শো'বা (রা.) কে 'লাত' নামক মূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে তায়েফের দিকে প্রেরণ করেন। তারা সেখানে গিয়ে মূর্তিটি ভেংগে চুরমার করে দেয়। সেখানে মজুদ যাবতীয় মালামাল অর্থাৎ স্বর্ণ, রৌপ্য, অলংকার, বস্ত্র, সুগন্ধি ইত্যাদি নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে পেশ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত মালামাল বিতরণ করে দেন।
(৬৪) নবম হিজরীর মতান্তরে দশম হিজরীর রবিউস সানীর শেষদিকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু মূসা আশয়ারী এবং হযরত মায়ায ইবনে জাবাল (রা.) কে ইয়ামানে গভর্নর করে পাঠান। ইয়ামানের দু'টি অঞ্চল ছিল। উঁচু এলাকায় হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা.)কে গভর্নর করে পাঠান। মহানবী তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, 'নম্র ব্যবহার করবে কঠোর হবে না। সুসংবাদ দিবে, ঘৃণা জন্মাবে না।' (৬৫) দশম হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস ছানী মাসে মতান্তরে জুমাদাল উলা মাসে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) এর বাহিনী বনু আবদে মাদান এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। এটি হচ্ছে বনু হারিছ ইবনে কাব এর একটি শাখা। তারা ইয়ামানে বসবাস করত। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয় এবং ইরশাদ ফরমান তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে, তবে তাদের ইসলাম গ্রহণ কবুল করে নিবে এবং তাদের নিরাপত্তা বিধান করবে। আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে, তবে যুদ্ধ করবে। হযরত খালিদ (রা.) তাঁদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। হযরত খালিদ (রা.) তাতে সম্মত হয়ে তাদের নিরাপত্তা বিধান করেন।
(৬৬) একই হিজরীতে হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদের (রা.) অভিযান আরবের কতিপয় লোকের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। হযরত মিকদাদ (রা.) যখন তাদের কাছে পৌঁছেন তারা পালিয়ে চলে যায়। মাত্র একজন লোক থেকে যায়। তার কাছে বিপুল পরিমাণ মালামাল ছিল। সে কালিমা পাঠ করে এবং মুসলমানদের সালাম করে। হযরত মিকদাদ (রা.) মনে করেন বিপদ দেখে কালিমা পড়া এবং ইসলাম গ্রহণ সঠিক নয়। তাই তিনি তাকে হত্যা করেন। সংবাদ পেয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত মিকদাদ (রা.) কে ডেকে পাঠান এবং খুবই দোষারোপ করেন এবং ইরশাদ ফরমান, 'মিকদাদ! তুমি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছো, যে বলেছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। কিয়ামতের দিন তুমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সম্পর্কে কি করে দায় মুক্ত হবে।' উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে বের হও (সফর কর), তখন যাচাই করে নিও। আর যে কেউ তোমাদেরকে সালাম করে তাকে তোমরা মুসলমান নয় এরূপ বলবে না।'
(৬৭) দশম হিজরীর রমযান মাসে হযরত আলী (রা.) এর বাহিনীকে দ্বিতীয়বার ইয়ামান প্রেরণ করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তিনশত আরোহী যোদ্ধাসহ প্রেরণ করেন। কিন্তু কাফিররা ইসলাম গ্রহণ করেনি। ফলে তাদের সংগে যুদ্ধ হয় এবং বিশজন কাফির নিহত হয়। তিনি ঐসব লোকদের আবার ইসলামের দাওয়াত দেন। এবার তারা সংগে সংগে ইসলাম গ্রহণ করে। হযরত আলী (রা.) সেখানে অবস্থান করে তাদের কুরআন শরীফ এবং শরীয়তের আহকাম শিক্ষা দেন। অতঃপর আলী (রা.) বিদায় হজ্বের সময় এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে সাক্ষাৎ করেন।
(৬৮) দশম হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু আবদের নয় সদস্য বিশিষ্ট এক বাহিনীকে কুরাইশদের একটি কাফেলাকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কোন সংঘর্ষ হয়নি।
(৬৯) একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বাহিনী রি'য়াই সুহাইমীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। রি'য়াই এর কাছে মুসলিম বাহিনী পৌঁছে, তাদের পরিবারবর্গ, মালামালসহ গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। কোন একটি জিনিসও অবশিষ্ট রাখেননি। এরপর রি'য়াইবাসীরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে হাজির হন অথচ তাদের যাবতীয় মালামাল পূর্বেই ভাগ বণ্টন হয়ে গেছে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পরিবারবর্গ এবং সকল মালামাল ফিরত দিয়ে দেন।
(৭০) এ বছর হযরত আবু উমামা বাহিনীকে প্রেরণ করা হয় 'মুদাইয়াবিন নাজলীন্' এর উদ্দেশ্যে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজ গোত্র বনু বাহেলার নিকট ইসলামের দাওয়াতের জন্য প্রেরণ করেন। তিনি নিজ গোত্রের দিকে যান। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তারা দাওয়াত গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়।
(৭১) দশম হিজরীতে হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আলবজলীর (রা.) অভিযান যুল খালাসাকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পাঠান হয়। যুল খালাসা একটি জায়গার নাম, যেখানে খাসয়াম কাবিলা এবং হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল বাজালীর গোত্রের 'বনু বুহাইলাহ' নামক মূর্তি স্থাপিত ছিল। কা'বা শরীফের সংগে শত্রুতার বশীভূত হয়ে ঐ জায়গাটি নির্মাণ করা ছিল। যাতে জনগণের দৃষ্টি কা'বা শরীফ থেকে ফিরে যুল লামার দিকে নিবদ্ধ হয়। তারা এটাকে 'কা'বায়ে শামিয়া' নামে অভিহিত করত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আহমান গোত্রের একশত পঞ্চাশ আরোহী বাহিনীসহ প্রেরণ করেন। তাদের মধ্যে হযরত আবু আরতাতও শামিল ছিলেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে তথাকথিত শামিয়া কা'বা ধ্বংস করে। তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেন। সেখানে উপস্থিত কাফিরদের হত্যা করে। অতঃপর হযরত আবু আরতাদ (রা.) কে সুসংবাদ দিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পাঠান। তিনি এসে আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তাকে রোগাক্রান্ত উটের মত করে দিয়েছি।' এ সংবাদ শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহমানের আরোহী এবং পদাতিক বাহিনীর জন্য পাঁচবার বরকতের দোয়া করেন। এরপর হযরত জারীর (রা.) আপন সাথীদের নিয়ে ফিরে আসেন। তারা রাস্তায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের সংবাদ শুনতে পান।
(৭২) দশম হিজরীতে হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং হযরত খালিদ ইবনে সায়ীদের (রা.) বাহিনী ইয়ামানের দিকে প্রেরণ করেন এবং ইরশাদ করেন, 'তোমরা যদি একত্রে থাকো তবে তোমাদের আমীর হবে আলী (রা.)। আর যদি বিছিন্ন হওয়ার প্রয়োজন হয় তবে উভয়েই নিজ নিজ দলের আমীর হবে।' তাঁরা ইয়ামান গিয়ে কতিপয় কাফিরকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন।
(৭৩) এ বছর খালিদ ইবনে ওলীদের (রা.) বাহিনী ইয়ামানের দিকে প্রেরণ করেন। হযরত খালিদ (রা.) সেখানে পৌঁছার পর তারা ভয়ে এবং আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। হযরত খালিদ তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে তাদেরকে হত্যা করে ফেলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পেয়ে নাখোশ হন এবং তাদের অর্ধেক ক্ষতিপূরণ দান করেন।
(৭৪) দশম হিজরীর সফর মাসের শেষ দিকে হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) এর অভিযান 'উবনার' দিকে প্রেরণ করেন। এটা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রেরিত সর্বশেষ অভিযান। উবনা সিরিয়ার একটি স্থানের নাম। ২৬ শে সফর শনিবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমানদের বাহিনীর সংগে যুদ্ধের নির্দেশ দেন। রোমানরা সিরিয়ার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিল। পরের দিন ২৭ সফর রবিবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসামা ইবনে যায়েদকে (রা.) এ জামায়াতের আমীর মনোনীত করেন। সফরের ত্রিশ তারিখে জ্বর আর মাথা ব্যথার মধ্য দিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ রোগের উদ্রেক হয়। ১লা রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র হাতে হযরত উসামা ইবনে যায়েদের (রা.) জন্য ঝা তৈরী করেন এবং তাঁকে হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, হযরত আবু ওবাদা ইবনে জাররাহ, হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, হযরত সায়িদ ইবনে যায়েদ, হযরত কাতাদা ইবনে নোমান, হযরত সালামা ইবনে আসলাম প্রমুখ শীর্ষ আনসার এবং মুহাজির সাহাবায়ে কেরামকে সংগে করে পাঠান। হযরত উসামা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিদায় নিয়ে জুরুফ নামক স্থানে তাঁবু পরিবেশন করেন। যাতে সকল সৈন্য সেখানে সমবেত হতে পারে। এ জায়গাটি উহুদ পাহাড়ের পিছনে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। কিন্তু সাহাবীরা যখন জানতে পেলেন যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগ মারাত্মক হয়ে পড়েছে, তখন হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান এবং হযরত আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) এবং কতিপয় সাহাবা মদীনায় ফিরে আসেন। ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার হযরত উসামা (রা.) জিহাদের সফর শুরু করতে যাচ্ছিলেন। আকস্মিক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের সংবাদ এসে পৌঁছে। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' সুতরাং তিনি সকল সাথী নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। অতঃপর যখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলিফা হলেন তখন সর্বপ্রথম হযরত উসামার বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেন। হযরত উসামা (রা.) তিন হাজার সৈন্য নিয়ে জুরুফ নামক স্থান থেকে ১লা রবিউস সানী ১১ হিজরী রওনা করেন। সৈন্যদের মধ্যে সাতশত কুরাইশ সৈন্য ছিলেন। এক হাজার ঘোড়া ছিল। এ বাহিনী ধীরে ধীরে উবনা পৌঁছে। সেখানে মুশরিকদের সংগে যুদ্ধ হয়। যারা মোকাবেলা করতে আসে তাদেরকে হত্যা করা হয়। তাদের স্ত্রী সন্তানদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের ঘরবাড়ি, শস্য ক্ষেত এবং বাগান ধ্বংস করে দেয়া হয়। এ যুদ্ধে কোন মুসলমানের ক্ষতি হয়নি। হযরত উসামা (রা.) নিরাপদে এবং বিজয়ী হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। ১১তম হিজরীর এটাই শেষ অভিযান। যা বিশ্বনবীর জীবন দশায় শুরু হয়ে আবু বকর (রা.) এর খিলাফতের সময় পূর্ণতা পায় ও শেষ হয়।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সকল যুদ্ধ ও অভিযানে মুসলমানদের সর্বমোট শহীদের সংখ্যা ২৫৯ জন, আহত ১২৭ জন এবং বন্দী মাত্র একজন। অপরদিকে কাফির এবং বিধর্মীদের নিহতের সংখ্যা ৭৫৯ জন বা এক হাজার আহত সহস্রাধিক এবং বন্দী ৬৫৬৪ জন (সীরাত ইবনে হিশাম)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬৩ বছর বয়সে ১২ই রবিউল আওয়াল ১১ হিজরী বা ৭ই জুন ৬৩২ খ্রীঃ রোজ সোমবার ইন্তিকাল করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মোট জীবনকাল ছিল ২২,৩৩০ দিন ৬ ঘণ্টার মত। মুসলমানদের এতোগুলো যুদ্ধ বা অভিযানে হতাহতের সংখ্যা অকল্পনীয়ভাবে নগণ্য। এর বিপরীতে দু'টি বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তিন কোটি এবং আহতের সংখ্যা তিন কোটি এবং এ দুটো যুদ্ধের নায়ক বা কারণ অমুসলিমরা। অতএব যারা মুসলমানদের যুদ্ধবাজ জাতি বলে; তারাই এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই জবাব পেয়ে যাবেন। বরং এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং বিশ্বনবী শান্তির দূত।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমরনীতি
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সামরিক নীতি রেখে গেছেন তা পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। সংক্ষেপে তাঁর সমর নীতিগুলো নিম্নরূপ:
১। সৈন্যদের প্রতি ধর্ম ও নৈতিকতা রক্ষার কঠোর নির্দেশ ছিল। মদ্যপান, ব্যভিচার ও লুটতরাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
২। যুদ্ধক্ষেত্রে নামায ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাদ দেয়া যাবে না।
৩। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনীমত) এক পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রের জন্য। এগুলো জাতীয় সম্পদরূপে গরীবদের জন্য রক্ষিত থাকবে।
৪। যুদ্ধে প্রথম আক্রমণ করা মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল অর্থাৎ অন্যায়কে প্রতিহত করার এবং আত্মরক্ষা ব্যতীত ইসলামে কোন যুদ্ধ ছিল না।
৫। মুসলমানদের যুদ্ধ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মাত্র। তাই তাকবীর ছাড়া যেকোন রণহুংকার নিষেধ ছিল। এ সংগ্রামকেই জিহাদ বলা হয়েছে।
৬। যুদ্ধে স্ত্রী, বৃদ্ধ, বালক, রুগ্ন, সকল অসহায় এবং অসামরিক ব্যক্তিকে আঘাত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। জীব জন্তু, পশু পাখি, শস্যক্ষেত্র, বাড়ি ঘর ইত্যাদির উপর হস্তক্ষেপ বা ক্ষয়ক্ষতি করাকে পাপ বলে ঘোষিত হয়েছিল।
৭। রাজদূতকে হত্যা বিশ্ব শান্তির পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
৮। শত্রু হোক, সৈন্য হোক, আশ্রয় প্রার্থনা করলে সংগে সংগে আশ্রয় দেয়ার বিধান করা হয়েছিল।
৯। যুদ্ধাবস্থায় অথবা যুদ্ধের পূর্বে বা পরে শত্রুরা শান্তির প্রস্তাব দিলে, সংগে সংগে তা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
১০। যুদ্ধ বন্দিদের প্রতি সদ্ব্যবহার করাই শুধুমাত্র ঘোষণা ছিল না, তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছিল।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমর দক্ষতা ও কৌশল
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের প্রতি লক্ষ্য করলে যে কেউ একথা স্বীকার করতে নৈতিকভাবে বাধ্য হবে যে, তিনি ছিলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সফল সামরিক কমাণ্ডার। পরিবেশ, পরিস্থিতি, পটভূমি, প্রাসঙ্গিক লক্ষণসমূহ এবং পরিণতি ইত্যাদি বিবেচনায় তিনি ছিলেন অতুলনীয় মেধার অধিকারী। তাঁর বুদ্ধি বিবেচনা ছিল নির্ভুল এবং বিবেকের সচেতনতা ছিল গভীর ও তাৎপর্যমণ্ডিত। নবুওয়াত ও রিসালাতের গুণে তিনি ছিলেন সাইয়েদুল মুরসালীন বা প্রেরিত সকল নবী রাসূলের নেতা। অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্বের গুণবৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন অসাধারণ। যে সকল যুদ্ধে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সব ক্ষেত্রেই তিনি কার্যকারণ ও পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সঠিক কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর দক্ষতা, সমর কৌশলতা, সাহসিকতা, কৌশল ও নেতৃত্ব ছিল অনন্য। সৈন্য সমাবেশ, যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রণয়ন, অবস্থান নির্ণয়; ইত্যাদিতে তাঁকে কেউ ডিঙ্গিয়ে যেতে পারেনি। তাঁর সমর কৌশলতায় প্রমাণিত হয়েছে, বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিশারদের চেয়েও তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ। তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনায় পরাজয়ের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, ওহুদ এবং হুনাইনের যুদ্ধে যা কিছু ঘটেছে তার কারণ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিকল্পনার ত্রুটি নয়। বরং কিছু সংখ্যক মুসলিম সৈন্যের ব্যক্তিগত দুর্বলতাই এর জন্যে দায়ী ছিল। আর ওহুদের যুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট নির্দেশ এবং সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার পরিণতি তো সবারই জানা।
উভয় যুদ্ধেই মুসলমানরা পরাজয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় তিনি যে সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার উদাহরণ ইতিহাসের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি শত্রু বেষ্টনীতেও ছিলেন অটল অবিচল। এরকম কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি তুলনাহীন সমর কৌশলতায় ও বীরত্বে শত্রুদের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। ওহুদের যুদ্ধে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। এ ছাড়া হুনাইনের যুদ্ধে তাঁর সমর কৌশলতায় মুসলমানদের পরাজয় অবশেষে চূড়ান্ত বিজয়ে পরিণত হয়। অথচ ওহুদের মত বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং হুনাইনের মত ভয়কাতরতা ও অস্থিরতা যে কোনো সেনানায়কের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তিকে লোপ করে দেয়ার কথা। এসব ক্ষেত্রে সেনা কমাণ্ডারদের স্নায়ুর উপর এত বেশী চাপ সৃষ্টি হয়, যাতে আত্মরক্ষার চেষ্টা করাই স্বাভাবিক। অথচ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে ইসলামের বিজয় কেতন উড়িয়েছেন।
এসব হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের সামরিক দিক। আরেকটি দিক আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এ সকল যুদ্ধের মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। ফেতনা ফাসাদের আগুন নিভিয়ে দেন। ইসলাম ও পৌত্তলিকতার সংঘর্ষে শত্রুর শক্তি-সামর্থ্য এবং অহংকার নস্যাৎ করে দেন। ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের পথকে স্বাধীন নির্বিঘ্ন করে দিতে পৌত্তলিকদের সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেন। এছাড়া এসব যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রু মিত্র, প্রকৃত মুসলমান এবং মুনাফিকদের পার্থক্য নির্ণীত হয়।
সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সেনানায়কদের এক অপরাজেয় দল গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্ট সেনাদল ইরাক, সিরিয়া, পারস্য ও রোমের যুদ্ধে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কৌশল গ্রহণে বড় বড় যুদ্ধবাজদের হার মানিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, শত্রুদের তাদের ভূখণ্ড, ধন-সম্পদ, খেত-খামার, বাগান, পানির আধার, সম্মানজনক অবস্থান এবং বিলাসী জীবনোপকরণ থেকেও বহিষ্কার করেন। এসব যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের জন্যে বাসস্থান, ক্ষেত-খামার এবং কর্মসংস্থানের মত প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করেন। বাস্তুভিটাহীন উদ্বাস্তুদের সমস্যার সমাধান করেন। অস্ত্র, গোলা, সামরিক সরঞ্জামের বহুবিধ উপকরণের ব্যবস্থা করেন। অথচ প্রতিপক্ষের উপর কোন প্রকার অত্যাচার উৎপীড়ন এবং বাড়াবাড়ি না করেই তিনি এসব করেছিলেন।
জাহেলিয়াতের যুগে যেসব কারণে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব কারণও পরিবর্তন করেন। জাহেলিয়াতের যুগে যুদ্ধ মানে লুটতরাজ, হত্যা, ধ্বংস, যুলুম-অত্যাচার, অবিশ্বাস্য রকমের বাড়াবাড়ি, প্রতিশোধ গ্রহণ, দুর্বলের উপর অত্যাচার, জনপদ বিরাণ করা, বাড়িঘর অট্টালিকা ভেঙ্গে ফেলা, নারীদের সম্মান নষ্ট করা, শিশু ও বৃদ্ধদের সাথে নিষ্ঠুর নৃশংস ব্যবহার করা, ক্ষেত-খামারের ফসল নষ্ট করা এবং পশুপাল হত্যা করা। মোটকথা, সর্বাত্মক ক্ষতি ও ধ্বংসই ছিল সেসব যুদ্ধের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য। ইসলাম যুক্তিসঙ্গত কারণে যুদ্ধ শুরু করে এবং তার ফলাফল ছিল সর্বকালের মানুষের জন্যে কল্যাণকর। পরবর্তী সকল সময়েই এর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। এসব সংগ্রাম বা জিহাদের পরে মানুষ বুঝতে পেরেছে, জিহাদ হচ্ছে মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়া, যুলুম-অত্যাচার নির্যাতন থেকে বের করে; ন্যায় ও সুবিচারমূলক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসার সশস্ত্র প্রচেষ্টা অর্থাৎ এমন একটা ব্যবস্থা করা যাতে শক্তিশালীরা দুর্বলদের উপর অত্যাচার করতে না পারে। বরং স্বৈরাচারী অত্যাচারীদের দুর্বল করে উৎপীড়িত ও দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে ইসলামী জিহাদের মূল উদ্দেশ্য। ইসলামী যুদ্ধ ও জিহাদের অর্থ হচ্ছে, সেসব দুর্বল নারী-পুরুষ ও শিশুকে রক্ষা করা, যারা এ বলে দোয়া করে, হে প্রতিপালক, তুমি আমাদের এ জনপদ থেকে বের কর, যার অধিবাসীরা অত্যাচারী। তুমি তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্যে অভিভাবক ও সাহায্যকারী প্রেরণ কর, তার মাধ্যমে আমাদের সাহায্য কর অর্থাৎ ইসলামী যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর যমীনকে খেয়ানত, যুলুম-অত্যাচার, পাপাচার থেকে মুক্ত করে তার স্থলে শান্তি, নিরাপত্তা, দয়াশীলতা ও মানবতা প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের জন্যে উন্নত নীতিমালা প্রণয়ন করেন। মুসলিম সৈন্য এবং সেনাপতিদের সে নীতিমালার বাইরে যেতে দেননি। হযরত সোলায়মান ইবনে বোরায়দা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ব্যক্তিকে সেনাপতির দায়িত্ব দিতেন তখন তাকে তাকওয়া, পরহেযগারী এবং মুসলমান সঙ্গীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ দিতেন। এরপর বলতেন, আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর। খেয়ানত কর না। অঙ্গীকার লংঘন বা বিশ্বাসঘাতকতা কর না। কারো নাক, কান ইত্যাদি কেটে দিও না। কোন শিশুকে হত্যা কর না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাপতিদেরকে এভাবে উপদেশ দিতেন: সহজ সরল ব্যবহার করবে, কঠোরতার আশ্রয় নেবে না। মানুষকে শান্তি দেবে, কাউকে ঘৃণা করবে না। রাত্রিকালে কোন শক্ত এলাকায় পৌঁছলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল হওয়ার আগে হামলা করতেন না। তাছাড়া তিনি অগ্নিসংযোগ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কাউকে বেঁধে হত্যা করতে, শিশু মহিলাদের প্রহার এবং হত্যা করতে, লুটতরাজ করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, লুটের মাল মৃত জন্তুর চেয়ে বেশী হালাল নয়। অনুরূপ তিনি ক্ষেত-খামার ধ্বংস ও চতুষ্পদ জন্তু হত্যা করতে এবং গাছপালা কেটে ফেলতে নিষেধ করেন। তবে বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে সেটা ভিন্ন কথা।
মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, কোন আহত ব্যক্তির উপর হামলা করবে না। কোন পলায়নকারী ব্যক্তিকে ধাওয়া করবে না। কোন বন্দীকে হত্যা করবে না। তিনি এ রীতিও প্রবর্তন করেন যে, কোন দূতকে হত্যা করা যাবে না। তিনি একথা বলেছেন যে, কোন অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করা যাবে না। এমনকি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এও বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককে বিনা কারণে হত্যা করবে, সে বেহেশতের সুগন্ধও পাবে না। অথচ বেহেশতের সুগন্ধ তা চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। এসব কারণে এবং উন্নততর রীতিনীতির ফলে ইসলামের যুদ্ধ, জাহেলিয়াত যুগের নোংরামি থেকে পূত পবিত্র হয়ে জিহাদে রূপান্তরিত হয়েছে।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্য অসাধারণ কার্যাবলীর উপর কিছু আলোকপাত হওয়া দরকার। এসব বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই তিনি সকল নবী-রাসূলের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর মাথায় সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ নেতৃত্বের অনন্য মর্যাদার মুকুট স্থাপন করেছেন। আল্লাহ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'হে বস্ত্রাবৃত, রাত্রি জাগরণ কর, কিছু অংশ ব্যতীত'। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, 'হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, ওঠ, সতর্ক বাণী প্রচার কর আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্ত্ব-শ্রেষ্ঠত্বের কথা বল।।' এরপর কি হল? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওঠলেন, নিজ কাঁধে বিশ্বজগতের সবচেয়ে বড় আমানতের বোঝা তুলে নিলেন। একাধারে দাঁড়িয়েই রইলেন। সমগ্র মানবতার বোঝা, সকল আকীদা বিশ্বাসের বোঝা এবং বিভিন্ন ময়দানে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার বোঝা, যুদ্ধ জিহাদ ও দৌড় ঝাঁপের বোঝা, সবই ছিল তাঁর কাঁধে। আমৃত্যু তিনি মহান স্রষ্টার বাণী প্রচার করে গেলেন। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে জীবন উৎসর্গ করলেন।
তিনি মানুষের বিবেকের ময়দানে যুদ্ধ জিহাদ এবং দৌড়ঝাঁপ, চেষ্টা প্রচেষ্টার দায়িত্ব এমন এক সময়ে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, যখন সকল বিবেক জাহেলিয়াত যুগের নানাবিধ উদ্ভট অমূলক কল্পনা এবং ধারণায় নিমজ্জিত ছিল। তিনি এমন এক সময় দাওয়াতের কাজ এবং শ্রম সাধনার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন, যখন মানুষের বিবেক যুগের নানাবিধ উদ্ভট-অমূলক কল্পনায়, বিলাসিতা এবং ভোগে আকণ্ঠ ডুবে ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মানব বিবেককে তাঁর কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীর আদলে জাহেলিয়াত এবং জাগতিক জীবনের ভার বোঝা থেকে মুক্ত করে নিয়েছিলেন।
পাশাপাশি অন্য এক ময়দানে আলাদা যুদ্ধ তথা একটির পর আরেকটি সংগ্রাম শুরু করে দিয়েছিলেন। আল্লাহর দাওয়াত এবং সে দাওয়াতের উপর ঈমান আনায়নকারীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রোশে শয়তানের দোসররা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দাওয়াতের পবিত্র চারাগাছকে মাটির নিচে শেকড় বিস্তার এবং শূন্যে শাখা প্রশাখা বিস্তার তথা ফুলে ফলে সুশোভিত হবার আগেই, যারা নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছিল, সে সকল ভয়াবহ শত্রুর সাথে তিনি সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তিনি জাযিরাতুল আরবের বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠতে না ওঠতেই রোম সাম্রাজ্য এ নয়া জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশে তার সীমান্তে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করেছিল।
এ সকল কর্মতৎপরতার মাঝে তখনো বিবেকের সংগ্রাম সংঘাত শেষ হয়নি, কারণ সেটি হচ্ছে চিরস্থায়ী সংঘাত, এতে শয়তানের সাথে মুকাবিলা করতে হয়। শয়তান মানব মনের গভীরে প্রবেশ করে তার তৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুহূর্তের জন্যেও তা শিথিল হয় না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত থেকে বিভিন্ন ময়দানে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
দুনিয়া তাঁর চরণে এসে লুটিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখনো তিনি দুঃখকষ্ট এবং দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন। অথচ ঈমানদাররা তাঁর চারপাশে শান্তি নিরাপত্তার ছায়া বিস্তার করে রেখেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুঃখ দারিদ্র্যতাপূর্ণ জীবনের পথে সাধনা অব্যাহত রাখেন। যে কোনো অবস্থায় দুঃখকষ্টের মধ্যে তিনি অভিযোগশূন্য ধৈর্যধারণ করেছিলেন। রাত্রিকালে তিনি নামাযে দাঁড়াতেন। তাঁর রবের ইবাদাত এবং ধীরে ধীরে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন। সমগ্র বিশ্ব থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তিনি আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠতেন। অবশ্য আল্লাহর তরফ থেকে তাঁকে এরকম করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। এমনিভাবে সুদীর্ঘ বাইশ বছরের বেশী সময় যাবত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগ্রাম চালিয়ে যান। এ সময় তিনি এক কাজে আত্মনিয়োগ করে অন্য কাজ ভুলে থাকেননি। পরিশেষে ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগে এমন ব্যাপক সাফল্য লাভ করেন, যাতে সবাইকে অবাক হতে হয়। সমগ্র জাযিরাতুল আরব তাঁর অনুগত হয়ে পড়ে। আরবের দিগন্ত থেকে জাহেলিয়াতের মেঘ কেটে যায়। অসুস্থ বিবেকসমূহ সুস্থ হয়ে ওঠে। এমনকি তারা মূর্তিসমূহকে শুধু ছেড়েই দিল না; বরং ভেঙ্গে ফেলল। তাওহীদের বলিষ্ঠ আওয়াজে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠল। ঈমানের তেজে নতুন জীবনীশক্তি লাভ করে মরু বিবেকগুলো আযানের সুমধুর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকল। দিক দিগন্তে আল্লাহু আকবার ধ্বনি, প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ক্বারীরা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে এবং আল্লাহর হুকুম আহকাম কায়েম করতে করতে উত্তর দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ল। আরবের আশে পাশে ইসলামের আলো বিকশিত হতে লাগল।
বিচ্ছিন্ন জাতি ও গোত্রসমূহ একত্রিত হয়ে, মানুষ মানুষের দাসত্ব ছেড়ে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করল। এরপর আর কেউ শোষক শাসক নয়, কেউ শোষিত শাসিত নয়, কারো রক্তচক্ষু কাউকে আর ভীতসন্ত্রস্ত করল না। কেউ যালেম নয়, কেউ মযলুম নয়, কেউ মালিক নয়, কেউ গোলাম নয়। বরং সকল মানুষ আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পরে ভাই ভাই। তারা একে অন্যকে ভালোবাসে। আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর থেকে জাহেলিয়াতের গর্ব, অহংকার এবং পিতা পিতামহের নামে আত্মগরিমার অবসান ঘটান। অনারবদের উপর আরবদের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাংগদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকল না। শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারিত হল তাকওয়ার ভিত্তিতে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সকল মানুষ আদমের সন্তান, আর আদম হচ্ছেন মাটির তৈরী। দাওয়াত ও তাবলীগের ফলে সমগ্র আরবে আন্তরিক ও মানবীয় ঐক্য এবং সামাজিক ন্যায়নীতি ও সুবিচার অস্তিত্ব লাভ করল। মানব জাতি দুনিয়ার বিভিন্ন সমস্যা তথা আখিরাতের সত্যিকারের মুক্তির ও সৌভাগ্যের পথের সন্ধান পেল।
অন্য কথায় যুগের ধারাই পাল্টে গেল। দাওয়াত ও তাবলীগের আগে পৃথিবীতে জাহেলিয়াতের জয়-জয়কার রব উঠেছিল। মানুষের বিবেক পঁচে গলে দুর্গন্ধময় হয়ে গিয়েছিল। ভোগবাদীদের আত্মা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছিল। অত্যাচার এবং দাসত্বের প্রবল প্রতাপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাপাচারপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য এবং ধ্বসাত্মক বঞ্চনার ঢেউ বিশ্বকে ওলট পালট করে দিয়েছিল। তদুপরি কুফরী এবং পথভ্রষ্টতার অন্ধকারের মোটা পর্দা পড়ে গিয়েছিল। অথচ সে সময়ও আসমানী মাযহাব (ধর্ম বিশ্বাস) এবং দ্বীনসমূহ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু মানুষ সেসব বিকৃত করে রেখেছিল। ফলে ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। দ্বীন ধর্মের বন্ধন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ধর্ম ছিল প্রাণহীন দেহের মত কিছু দুর্বল আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয়।
ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কর্ম পদ্ধতি যখন মানব জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন মানবাত্মা, অলীক ধ্যান-ধারণা, প্রবৃত্তির দাসত্ব, নোংরামি, ভণ্ডামি অন্যায় অত্যাচার, নৈরাজ্য স্বেচ্ছাচারিতা এবং অরাজকতা থেকে মুক্তি লাভ করে। মানব সমাজকে যুলুম, অত্যাচার, হঠকারিতা, ঔদ্ধত্য, ধ্বংস, শ্রেণী বৈষম্য, শাসকদের অত্যাচার, জ্যোতিষীদের অবমাননাকর স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্তি দান করে। বিশ্ব তখন দয়া, ক্ষমা, বিনয়, নম্রতা, আবিষ্কার, নির্মাণ, স্বাধীনতা, সংস্কার, মারেফাত, ঈমান, ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার, তাকওয়া, ইখলাস, আখলাক এবং আমলের ভিত্তিতে জীবনের উন্নতি অগ্রগতি ও হকদারের ন্যায্য হক লাভের নিশ্চয়তার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়। এসকল পরিবর্তনের সুবাদে সমগ্র আরব এমন এক জগতের আংগিনায় উপনীত হয় এবং প্রত্যক্ষ করে, যার উদাহরণ মানব অস্তিত্বের কোনো যুগে অথবা কোন দেশে দেখা যায়নি। সমগ্র আরব তার ইতিহাসে এমন জৌলুসপূর্ণ এবং ঝলমলে হয়ে ওঠে যে, এর আগে কখনই কোথাও এরকম দেখা যায়নি। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ইসলাম, মুসলমান ও তাদের মহান নেতা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে। বিশ্ব মানব বুঝতে পারে, এটিই মুক্তির নয়া ঠিকানা এবং যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ইহকাল ও পরকালের মুক্তির একমাত্র উপায়; সকলের সামনে দিবালোকের মত স্পষ্ট উন্মুক্ত হয়ে যায়।