📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 কর্ম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়

📄 কর্ম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয়


নবুওয়াত পাবার পূর্বে ছেলেবেলা হতেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যবাদিতার জন্য আল-আমীন বা বিশ্বাসী উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমন সৎ ও আমানতদার ছিলেন যে, তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিরোধিরাও তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিকট মূল্যবান সম্পদ জমা রাখত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একান্ত সাদাসিধা ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনই সম্পদ জমাতেন না, বা কামনাও করতেন না। পরিবারের সবার সাথে হাসিখুশীভাবে মিশতেন। নিজের হাতে ঘরের কাজ করতেন। নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবদান দৃষ্টান্তস্বরূপ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেস্ত।” অর্থাৎ পৃথিবীর সকল পুরুষরাই যেহেতু কোন না কোন নারীর সন্তান। অতএব নারীর মর্যাদা কোথায় গেল ভেবে দেখুন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন, "সে ব্যক্তি নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোক, যে নিজের স্ত্রীর নিকট ভাল নয়।" মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনাদর্শ এরূপ বৈচিত্রময় ছিল যে, একদিকে জিহাদের ময়দানে তিনি শ্রমিকের মত মাটি কেটেছেন। প্রয়োজনবোধে আবার সেনাপতি ও সেনানায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। একদিকে বিবাহ- শাদীর মাধ্যমে স্ত্রী-কন্যা-জামাই ও পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি স্বীয় দয়া-মায়া বিজড়িত কর্তব্য পালনে ব্রতী হয়েছেন এবং অপরদিকে স্রষ্টার প্রেমে বিভোর হয়ে নিবিষ্ট চিত্তে হেরা গুহায় কঠোর সাধনায় মগ্ন রয়েছেন। একদিকে মহাসেনাপতির দায়িত্ব পালনে বীরের মত জিহাদ করে শত্রুকে পরাস্ত, নত, পর্যুদস্ত করেছেন, অপরদিকে পরম শত্রুকেও ক্ষমা করে বক্ষে স্থান দিয়েছেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে সত্যদ্রোহীদের গুপ্ত ষড়যন্ত্রের খবর রেখেছেন, অপরদিকে খেজুর পাতার পূর্ণ কুটিরে বসে শত শত মাইল দূরবর্তী শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রেখেছেন। কারো সাথে প্রয়োজনে সন্ধি করেছেন, আবার শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। একদিকে সমাজের ও পরিবারের নিত্য প্রয়োজন মিটানোর উদ্দেশ্যে তাদের খবর রেখেছেন, অপরদিকে অসীম রহস্যালোকে প্রবেশ করে আল্লাহ তা'আলার ঐশী যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। "তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সহকর্মীদের প্রতি ছিলেন পরম অমায়িক" (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)। "তাদের দান করতেন যথার্থ মর্যাদা আর ভালবাসতেন গভীরভাবে" (সূরা আনফালঃ ৬২-৬৪)। তাদের সাথে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনও গর্ব অহংকার করতেন না, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী আদর্শ মানুষ। নবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি (সা.) সাথীদের সাথে পরামর্শ করে কাজ করতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের এমন কল্যাণাকাঙ্ক্ষী ছিলেন যে, তারা প্রত্যেকেই তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাথে একান্ত নৈকট্যের সম্পর্ক অনুভব করতেন। তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মহান নীতি ছিল ধৈর্য, সবর ও সহনশীলতায় গাঁথা। তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আচরণ ছিল রাগ-উত্তেজনা ও বিতর্ক বহির্ভূত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাল দিয়ে মন্দের জবাব দিতেন। বিরোধিতা পরিহার করে শত্রুর উপকার ও কল্যাণ করতেন। পাশাপাশি তাদের জন্য হিদায়াতের দোয়া করতেন। তাদের হীন ও ঘৃণ্য আচরণের মুকাবিলায় তাঁর অস্ত্র ছিল উদারতা ও ক্ষমা।

নেতা হিসেবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসাধারণ গুণাবলী হচ্ছে : মহান স্রষ্টার প্রতি পরম ভালোবাসা ও ভরসা। জীবন, সময় ও সম্পদের সীমাহীন ত্যাগ (কুরবানী), দৃঢ়তা, অটলতা, আস্থাশীলতা, দূরদৃষ্টি, অন্তরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতা। বীরত্ব, সাহসিকতা ও নির্ভীকতা। কথা ও কাজের অসামান্য সামঞ্জস্য। ধৈর্য, সবর ও সহনশীলতা। মহত্ত্ব, উদারতা, বিশালতা, দয়া, অনুগ্রহ, বিনয় ও মহানুভবতা। আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থপরতা। স্পষ্টবাদিতা, সত্যবাদিতা, সত্যপ্রিয়তা, ন্যায়পরায়ণতা ও পবিত্রতা। সর্বোপরি মানুষের হিদায়াত ও কামিয়াবীর জন্য চরম পেরেশানী ছিল তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। ধর্ম প্রচারে ও মানুষের সাথে আচার ব্যবহারে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য ছিল অসাধারণ। বিশ্বনবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথায় ছিল সৌন্দর্য মাধুর্য কোমলতা ও আবেদনশীলতা। বুদ্ধিমত্তা, উত্তম ও মর্মস্পর্শী ভাষায় তিনি উপদেশ দিতেন। বিতর্কে না জড়িয়ে যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে হৃদয়মন ছুয়ে যাওয়া ভাষায় দাওয়াত দিতেন। চাপ প্রয়োগ, জোর-জবরদস্তি না করে সুসংবাদ দান, সতর্ককরণের নীতি অবলম্বন করতেন। ভাল কথা দিয়ে, মন্দ কথার জবাব দিতেন। কঠোরতা বর্জন করে সহজ সরল পথ দেখাতেন। উত্তেজনা বর্জন করে শান্ত ধীর মস্তিষ্কে কর্ম সাধন করতেন। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থভাবে দাওয়াত দিতেন। প্রতিশোধের নীতি বর্জন করে ক্ষমার নীতি গ্রহণ করতেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে যারা সমবেত হয়েছেন তাদেরকে তিনি সূফী ও দরবেশ বানিয়ে দেননি, যোগী-সন্যাসীরূপে গড়ে তোলেন নি। নির্বোধ পর্যায়ের সরলও করেননি বা নিষ্ক্রীয় পর্যায়ের দুনিয়াত্যাগীও বানাননি। তিনি তাদের এমন শিক্ষা দিয়েছেন, তারা (সাহাবীরা) ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী, সচেতন ও প্রাজ্ঞ, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও বিচক্ষণ, কর্মঠ ও নিরলস এবং অগ্রগামী ও দ্রুতগামী। তাঁরা পাদ্রী ও সাধুদের মত কর্ম বিমুখ ছিলেন না বরং সদা কর্মচঞ্চল ছিলেন তথা সব রকমের সদগুণাবলী ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এভাবেই সর্বোত্তম স্বভাবের মানুষগুলো উৎকৃষ্টতম প্রশিক্ষণ পেয়ে শ্রেষ্ঠতম সাংগঠনিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং অন্যতম সুন্দর নেতৃত্বের অধীনে সমবেত হয়ে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। এজন্যেই তাঁরা সংখ্যালঘু হয়েও সমগ্র আরব জাহানসহ বিশ্ব বিজয় করেছিলেন। অধ্যাপক হিট্টি একথাই বলেছেন তার ইতিহাস গ্রন্থে। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা তাঁর অধীনস্থদের প্রতি সহনশীল ছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের অপরাধ শুধু মাফই করেননি, বরং কোন দিন তাদের কৈফিয়ত তলব করেননি। তাদের প্রতি কখনও রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি সদয় নয়, আল্লাহও তার প্রতি সদয় নন" (বুখারী ও মুসলিম)। "যে সৎকর্মের পেছনে আন্তরিকতা বেশি, তার জন্য আল্লাহর কাছে সওয়াবও বেশি" এটা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপদেশ।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 পবিত্র কুরআনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন নাম ও গুণাবলী

📄 পবিত্র কুরআনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন নাম ও গুণাবলী


আল কুরআনের যে সমস্ত আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম ও গুণাবলী বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে তা সূরা এবং আয়াত অনুসারে বর্ণিত হলঃ

১। মুহাম্মদ: ইমরান ১৪৪, আহযাব ৪০, মুহাম্মদ-১, ফাতাহ ২৯।
২। আহমদ: সফ-৬,৩।
৩। আবদুল্লাহ: হাদীদ ৯, জীন-১৯, কাহফ-১।
৪। শাহেদ: ফাতাহ-৯, আহযাব-৪৬, মুযযাম্মিল-১৫।
৫। মুবাশশিরঃ আহযাব-৪৬, ফাতাহ-৯, ফুরকান-৫৬।
৬। বাশীর: নিসা-১৯, আ'রাফ-১৮, হ্রদ-২, সাবা-২৮, ফাতির-২৪।
৭। নাযীর: বাকারা-১১৯, আনকাবূত-৫০, নিসা-১৯, আরাফ-১৮৮, হ্রদ-২, হিজর-৮৯, ফাতির-২৩, ২৪, ৩৭, ৪২, ৪৬, ফাতাহ-৯, যারিয়াত-৫০,৫১, মূলক-৮,৯,১৭,২৬, ফুরকান-৫৬, সাবা-২৮,৪৬, ছোয়াদ-৭, আহকাফ-৫।
৮। শহীদ: বাকারা-১৪৩, নিসা-৪১, নাহল-৮৯, হজ্জ-৭৮।
৯। আবদুহুঃ ফুরকান-১, বনী ইসরাঈল-১।
১০। মুযাককির: আলগাশিয়া-২১, ১১।
১১। সিরাজুম মনীর: ফাতির-৪৬।
১২। দা'য়ী ইলাল্লাহ: ফাতির-৪৬।
১৩। হাক্কুন: ইউনুস-১০৮।
১৪। আযীযুন: তাওবাহ-১২৮।
১৫। রাউফুন: তাওবাহ-১২৮।
১৬। রাহীম: তাওবাহ-১২৮।
১৭। আমীন: দুখান-১৯।
১৮। নূর: মায়েদা-১৫।
১৯। নি'মাতুন: বাকারা-২৩১, নামল-৮১।
২০। হাদী: রূম-৫৩।
২১। রাহমাতুন: আম্বিয়া-১১৭।
২২। তোয়াহা: তোয়াহা-১।
২৩। ইয়াসীন: ইয়াসীন-১।
২৪। মুযযাম্মিল: মুযযাম্মিল-১।
২৫। মুদ্দাসসির: মুদ্দাসসির-১।
২৬। মুনযির: নামল-৯২।
২৭। খাতামুন নাবিয়‍্যীন: আহযাব ৪০।
২৮। নবী: ইমরান-১৬১, মায়েদা-৮১, আ'রাফ-১৫৭, ১৫৮, আনফাল-৬৪, ৬৫, ৬৭, ৭০, তাওবা-২,৬১,৭৩, ১১৩, হুজুরাত-২, আহযাব-১,২৮,৩২,৩৮,৪৬, ফাতির-৫০, ৫২, তাহরীম-১, ৩, ৮, ৯, তালাক-১, মুমতাহিনা ১২।
২৯। রাসূল: বাকারা ১৪২, ২৫০, ইমরান-২৩, ৮১, ৮৬, ১০১, ১৩২, ১৫৩, ১৭২, ১৭৯, ১৮৩, নিসা-১৪, ৫২, ৬১, ৬৪, ৬৯, ৮০, ১০০, ১১৫, ১২৬, ১৭০, মায়েদা-১৫, ৩২, ৪১, ৫৫, ৫৬, ৬৭, ৮২, ৯২, ৯৯, ১৪০, আ'রাফ ১৫৭, ১৫৮, আনফাল-১, ১২, ২৪, তওবা-১, ২, ৭, ১৬, ২৪, ২৬, ২৯, ৩৩, ৫৪, ৫৯, ৬৩, ৬৫, ৮০, ৮১, ৮৪, ৮৬, ৮৮, ৯১, ৯৪, ৯৭, ৯৯, ১০৫, ১০৭, ১২৮, নাহল- ১১৩, বনী ইসরাঈল-৯৩, হজ্জ-৭৮, মু'মিন-৭৮, যুখরুফ-২৯, আনকাবূত-১৮, হুজুরাত-১, ৩, ৮, ১৪, ১৫, আলফাতাহ-৯, ১২, ১৩, ১৭, ২৬, ২৭, ২৮, ৯৬, আহযাব-৬, ২১, ২৯, ৩১, ৩৩, ৩৬, ৪০, ফাতির-৫২, ৫৭, ৭১, দুখান-১৪, ১৯, হাদীদ-৭, ৮, ২৯, মুজাদালা-৫, ৮, ৯, ১২, ১৩, ২০, ২২, মুহাম্মদ-৩২, ৩৩, মুনাফিকুন- ১, ৭, ৮, তাগাবুন-৮, ১২, ফুরকান-৭, ২৭, ৩০, ৪১, তুলাক-১১, জুমাহ-২, ছফ-৯, ১১, ৬৬, হাশর-৪, ৬, ৭, ৮, মুমতাহিনা-১, জীন-২২, ২৮, হাক্বক্বাহ-৪২, নূর-৪৮, ৫১, ৫২, ৫৪, ৫৬, ৬২, ৬৩।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা বা মি‘রাজ

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা বা মি‘রাজ


মি'রাজের ঘটনার ইঙ্গিত বা বর্ণনা আল কুরআনে এসেছে। মহিমান্বিত তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত (সূরা বনি ইসরাঈল : ১)। ইসরা অর্থ রাতের ভ্রমণ। আর মি'রাজ অর্থ আরোহণের সিঁড়ি। ইসরা বা মি'রাজ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নজিরবিহীন মর্যাদা, সম্মান ও বিস্ময়কর ঘটনা; যাতে মহান আল্লাহ তাঁর বন্ধুকে মক্কার মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা এবং তথা হতে ঊর্ধ্ব জগৎ পর্যন্ত স্বশরীরে, আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনাদি দেখাবার জন্য ভ্রমণ করিয়ে ছিলেন। এ বিস্ময়কর ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের দু'টি সূরা অর্থাৎ সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা নাজমে উল্লেখ রয়েছে এবং বহু সংখ্যক হাদীস দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে এ ঘটনাটি হিজরতের এক বা দেড় বছর পূর্বে সংঘটিত হয়। সেদিন রজব মাসের ২৭ তারিখ ছিল বলে প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়। বিশ্বনবীর হাদীস ও জীবন চরিত গ্রন্থাবলীতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বিপুল সংখ্যক সাহাবী হতে বর্ণিত হয়েছে। বিখ্যাত মুহাদ্দিস ফরকানী (রহ.) বলেন, মি'রাজের ঘটনাটি ৪৫ জন সাহাবায়ে কেরাম হতে নকল করা হয়েছে।

রাতের বেলা হযরত জিব্রাঈল (আ.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত 'বোরাক' এর উপর আরোহণ করিয়ে নিয়ে যান। সেখানে তিনি পূর্বের নবীদের সাথে নামায আদায় করেন। তবে কোন কোন বর্ণনা মতে ফিরে আসার সময় সেখানে নামায আদায় করেছিলেন। এরপর জিব্রাঈল (আ.), তাঁকে ঊর্ধ্ব জগতে নিয়ে যান এবং ঊধর্ব জগতের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে অবস্থিত মহামান্য নবী রাসূলদের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। শেষ পর্যন্ত তিনি সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বলোকে উপনীত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে উপস্থিত হন এবং এ উপস্থিতির সময় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ হিদায়াত ছাড়াও তাঁকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের হুকুম দেয়া হয়। অতঃপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস প্রত্যাবর্তন করেন এবং সেখান হতে মসজিদুল হারামে ফিরে আসেন। পরের দিন তিনি এ ঘটনার কথা লোকদের নিকট বর্ণনা করলে, মক্কার কাফেররা ঠাট্টা বিদ্রূপ করতে থাকে। এতে কতিপয় মুসলমানের ঈমানও নড়বড়ে হতে দেখা যায়।

সূরা বনী ইসরাঈলে ইসরার ঘটনাটি মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করার সাথে সংশ্লিষ্ট। পবিত্র সে মহান সত্তা, যিনি নিজের বান্দাকে রাতের এক অংশে মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ করান। যার চতুর্পাশকে আমি বরকতময় করেছি এ উদ্দেশ্যে, যেন আমার নিদর্শনাদি তাঁকে দেখিয়ে দেই। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব দেখেন ও শোনেন (সূরা বনী ইসরাঈল: ১)। আর যে দর্শনই আমি আপনাকে দেখিয়েছি তা কেবলমাত্র মানুষের পরীক্ষার জন্য দেখিয়েছি। (বনী ইসরাঈল)। সূরা আল নাজমের মধ্যে ঊর্ধ্ব জগৎ পর্যন্ত আরোহণের উল্লেখ রয়েছে। এ সূরায় বলা হয়েছে, অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন, এরপর ঝুঁকে এলেন, তারপর রয়ে গেল (উভয়ের মধ্যে) দু'ধনুক; পরিমাণ বরং তার চেয়েও কম ব্যবধান। অতঃপর আল্লাহ তার বান্দার উপর ওহী নাযিল করেন- যে অহী প্রেরণ করলেন। সে বান্দা যা কিছু দেখেছেন তার অন্তর মিথ্যা বলেনি। তবে কি তোমরা এ বিষয়ে তাঁর সাথে ঝগড়া করছ? যা সত্যই ঘটেছে। নিশ্চয়ই সে তাকে আর একবার দর্শন করেছেন, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে উপস্থিত ছিলেন। (সূরা আন নাজম ৮-১৮)

নিস্তব্ধ নিঝুম রাত। গভীর শান্ত প্রকৃতি। ঘন অন্ধকারের কোলে মাথা রেখে আকাশও ঘুমিয়ে পড়েছে। নিথর, নির্জন চারিধার। মধ্য রাতের প্রকৃতি স্থির, নিশ্চুপ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কা'বা চত্তরে (কারো কারো মতে উম্মে হানীর ঘরে) ঘুমে বিভোর। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন কে যেন প্রাণ উন্মাদ করা স্বরে ডাকছে, মুহাম্মদ! ডাক কানে যেতেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখের ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে দেখেন জিব্রাঈল (আ.) মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত জিব্রাইল (আ.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্ষ বিদীর্ণ করেলেন এবং তার পবিত্র কলব জমজমের পানিতে ধুয়ে তাতে হিকমত ও ঈমান পুরে দিয়ে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এটা চতুর্থবার বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা। এটা করার কারণ, যেন তিনি পূর্ণ পবিত্রতা লাভ করে আলমে মালাকুতে পৌঁছাতে পারেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) সাদা বর্ণের একটি বাহন সামনে নিয়ে এলেন। এর নাম বোরাক। বোরাক খচ্চরের চেয়ে নীচু এবং গাধার চেয়ে কিছুটা উঁচু। সে পদনিক্ষেপ করতে পারে দৃষ্টির শেষ সীমানায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে সওয়ার করানো হয়েছিল এবং জিব্রাঈল (আ.) আমাকে আকাশের উপর নিয়ে গিয়েছিলেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বোরাকের পাদানীতে কদম মুবারক রাখতে উদ্যত হলেন তখন বোরাক ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল। এ অবস্থা লক্ষ্য করে হযরত জিব্রাঈল (আ.) বোরাককে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে বোরাক তোমার কি হয়েছে? তুমি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করছো কেন? সারকারে দু'আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ তো এর পূর্বে তোমার পৃষ্ঠে আরোহণ করেনি। একথা শুনে বোরাক শান্ত হয়ে গেল এবং যমীনের উপর নতজানু হল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের পিঠে তুলে নেয়ার জন্য বোরাক প্রস্তুত হল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিঠে চড়ে বসলেন। বোরাক বিদ্যুৎ গতিতে গন্তব্য পথে ছুটে চলল। পথে খেজুর বাগান সমৃদ্ধ এলাকায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপনীত হলেন; তখন হযরত জিব্রাঈল (আ.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, এখানে দু'রাকাত নামায আদায় করে নিন। জায়গাটির নাম ইয়াসরীব। পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় মদীনা মুনাওয়ারা।

ভ্রমণ পথে মাদায়েন এবং হযরত ঈসা (আ.) এর জন্ম স্থানে পৌঁছলে, সেখানেও হযরত জিব্রাঈল (আ.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু'রাকাত নামায আদায় করতে বললেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন একপাশে এক বৃদ্ধা রমণী দাঁড়িয়ে আছে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'এটা, কে?' উত্তরে জিব্রাঈল (আ.) বললেন, সামনে এগিয়ে চলুন। কিছু দূরে আসার পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন একজন লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডাকছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিব্রাঈলকে (আ.) পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন। 'ওনি কে?' জিব্রাঈল (আ.) বললেন, সামনে চলুন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে একটি জামাত দেখতে পেলেন। যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম প্রদান করছিলেন। তাদের সালামের বাক্যগুলো ছিল অতি সুন্দর। আস্সালামু আলাইকা ইয়া আওয়্যাল, আস্সালামু আলাইকা ইয়া আখের, আস্সালামু আলাইকা ইয়া হাশর। জিব্রাঈল (আ.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে রাসূল আপনি এদের সালামের জবাব দিয়ে ধন্য করুন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের সালামের জবাব দিলেন।

এবারে জিব্রাঈল (আ.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতৃক পূর্বে করা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, ওই বৃদ্ধা রমণী হচ্ছে দুনিয়া। তার আয়ু বেশী দিন নেই। কেননা বৃদ্ধা রমণীর আয়ু যৎসামান্যই বাকী থাকে। আর আপনাকে যে লোকটি ডাক দিল, সে হচ্ছে ইবলীস শয়তান। আপনি যদি তার ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত দুনিয়াকে আখিরাতের উপরে প্রাধান্য দিত এবং শয়তান তাদেরকে গুনাহগার করে ফেলত। আর ঐ জামাতে যারা আপনাকে সালাম দিয়েছে তারা হচ্ছেন- হযরত জিব্রাঈল (আ.), হযরত মূসা (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.)। এরপর বোরাক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে বায়তুল মোকদ্দাসে পৌঁছল এবং তিনি মসজিদের দরজার বেষ্টনিতে বোরাককে বাধলেন। বর্তমানে উক্ত দরজার নাম 'বাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'। এরপর তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং দু'রাকাত নামায আদায় করলেন। দু'রাকাত নামায ছিল তাহিয়াতুল মসজিদ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনে এখানে ফিরিশতাকুল একত্রিত হয়েছিলেন। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সমস্ত নবীদের রূহসমূহ স্বআকৃতি সম্পন্ন হয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা এখানে আল্লাহ তা'আলার হামদ ও ছানা পেশ করলেন এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম পেশ করলেন। সবাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিলেন। এরপর আযান হল। একামতও হল। সকলেই ইমামতির জন্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সামনে এগিয়ে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমামতি করলেন আর আম্বিয়া কেরাম সকলেই তাঁর পিছে জামাতে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদের বাহিরে এলেন, তখন হযরত জিব্রাঈল (আ.) তাঁর সামনে এক পেয়ালা দুধ এবং এক পেয়ালা শরাব পেশ করলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ গ্রহণ করলেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন, 'আপনি ফিতরত বা স্বাভাবিকতাকেই পছন্দ করলেন'।

বর্ণিত আছে এ সময় আম্বিয়া কেরাম আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত মূসা (আ.), হযরত দাউদ (আ.), হযরত সুলায়মান (আ.), এবং হযরত ঈসা (আ.) ছিলেন। তাদের প্রশংসা এবং খোতবা ঐ সমস্ত ফযীলত, কারামত ও মু'জেযাসমূহের বর্ণনা সম্বলিত ছিল; যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদেরকে ধন্য করেছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলার শুকুর গুজারীর জন্য তাঁদের যবান মুবারক খুলে দিয়েছিলেন। এরপর খাতেমুন্নাবিয়‍্যীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আপনারা সকলেই আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের শানে হামদ, ছানা পেশ করেছেন। এখন আমিও তার উদ্দেশ্যে হামদ, ছানা পেশ করছি। সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহ্ তা'আলার জন্য যিনি আমাকে সমগ্র আলমের রহমতস্বরূপ, সমস্ত মানুষের জন্য সুসংবাদ দানকারী এবং ভয় প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমার উপর কুরআন নাযিল করেছেন। যার মধ্যে সবকিছুই সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত হয়েছে। আমার উম্মতকে মধ্যম উম্মত বানানো হয়েছে। মর্যাদার দিক দিয়ে তারাই প্রথম উম্মত আর আগমনের দিক দিয়ে সর্বশেষ। যিনি আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিয়েছেন এবং আমার দায়িত্বের বোঝাকে সহনীয় করে দিয়েছেন। আমার নামের আলোচনা উন্নত করে দিয়েছেন। তিনি আমাকে নবুওয়াতের সিলসিলার উদ্বোধনকারী এবং সমাপ্তকারী বানিয়েছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উক্ত প্রশংসা বাণী শোনার পর হযরত ইব্রাহীম (আ.) অন্যান্য আম্বিয়া কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হল যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাদের সকলের চেয়ে উত্তম। (মাদারেজুন নবুওয়াত, ২য় খ)। এরপর জিব্রাঈল (আ.) হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সাথে নিয়ে ঊর্ধ্ব আকাশ পানে ছুটে চলেন। মুহূর্তের মধ্যে তারা প্রথম আসমানের প্রবেশ দ্বারে এসে উপনীত হন। বন্ধ দরজায় আঘাত করতেই ভেতর থেকে সাড়া মিলে! প্রশ্ন ভেসে আসে' 'কে?' জিব্রাঈল (আ.) উত্তর 'করেন, 'আমি জিব্রাঈল'। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, তোমার সাথে কে? তিনি কি আল্লাহর বাণীপ্রাপ্ত হয়েছেন। জিব্রাঈল (আ.) উত্তর দেন, ইনি আল্লাহর রাসূল, মুহাম্মদ। জিব্রাঈল (আ.) এর উত্তর শোনার সাথে সাথে দরজা খুলে যায়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সাথে জিব্রাঈল (আ.)। দরজার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাঁকে দেখিয়ে জিব্রাঈল (আ.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'ইনি আপনার আদি পিতা হযরত আদম (আ.)। এঁকে সালাম করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মানের সাথে তার পূর্ব পুরুষকে সালাম জানান। হযরত আদম (আ.), রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্নেহভরে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, 'মুবারক হো, হে আমার বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব।'

এরপর সে স্থান ছেড়ে জিব্রাঈল (আ.) কে নিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছেন। সেখানে হযরত ঈসা (আ.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে লক্ষ্য করে বলেন, 'হে ন্যায়দর্শী ভাই আমার। খোশ আমদেদ। স্বাগতম। এমনিভাবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে একে সবগুলো আসমান অতিক্রম করেন। তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ হলে আন্তরিকতার সাথে সালাম বিনিময় হয়। মিশকাত শরীফে আছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইউসুফ (আ.) এর রূপ লাবণ্যের উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হযরত ইউসুফ (আ.) কে দেখে মনে হল যেন সৌন্দর্যের একটা বিরাট অংশ আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত তাঁকে দান করেছেন। তিবরানী এবং বায়হাকীতেও বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ইউসুফ সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে বেশী সুন্দর'। অন্যান্য মানুষের সাথে তাঁকে তুলনা করলে বলতে হবে রাতের আকাশের অগণিত নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্রের যে সৌন্দর্য, তিনিও তেমনি সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন। চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রীস (আ.) এর সাথে রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ হয়। পঞ্চম আসমানে দেখা হয় হযরত হারুন (আ.) এর সাথে। তিনি সালাম বিনিময়ের পর ফিরিশতারা মারহাবা, শুভাগমন বলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তিনি ৬ষ্ঠ আসমানে উপনীত হন। জিব্রাঈল (আ.) এখানেই হযরত মূসা (আ.) এর সাথে বিশ্বনবীকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচয় করিয়ে দেন। উভয়ের মধ্যে সালাম ও প্রীতি সম্ভাষণ বিনিময়ের পর জিব্রাঈল (আ.), রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে আরও ঊর্ধ্ব আকাশে রওনা হন।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সিদরাতুল মুনতাহার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি হচ্ছে সৃষ্টজীবের কর্ম তৎপরতা এবং ইলমের সমাপ্তিস্থল। আল্লাহ তায়ালার হুকুম এখানেই নাযিল হয়। এখান থেকে যাবতীয় আহকাম গ্রহণ করার জন্য ফিরিশতারা অপেক্ষমান থাকেন। এ স্থান অতিক্রম করার অধিকার ও ক্ষমতা কারো নেই। সবকিছু এখানে এসে শেষ হয়ে যায়। ফেরেশতারা নিম্নজগৎ থেকে ঊর্ধ্ব জগতে যা কিছু নিয়ে যান এবং ঊর্ধ্ব জগৎ থেকে হুকুম ও বিধান সংক্রান্ত যা কিছু নিয়ে নিম্ন জগতে আবতরণ করেন, এ সবের সংযোগস্থল হচ্ছে সিদরাতুল মুনতাহা। মাখলুকের দিক থেকে কেউই এ স্থান অতিক্রম করতে পারেনি। কেবল বিশ্বনবীই (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ব্যতিক্রম। এ স্থানে আসার পর হযরত জিব্রাঈল (আ.) থেমে যান এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত জিব্রাঈল (আ.) কে জিজ্ঞাসা করেন, এটা কোন জায়গা এবং আপনার পৃথক হওয়ার কারণ কি? তিনি আরও বলেন, এমন স্থানে তো কোন বন্ধু, অন্য বন্ধুকে একা ফেলে যেতে পারে না। হযরত জিব্রাঈল (আ.) বলেন, আমি যদি আর এক কদম সামনে অগ্রসর হই, তাহলে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাব।

সিদ্রাতুল মুনতাহা থেকে প্রবাহিত হয়েছে চারটি নহর বা নদী। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর হাদীস থেকে বুঝা যায়, উক্ত চারটি নহরই জান্নাতের। উক্ত নহরসমূহ জান্নাতের-একথার অর্থ জান্নাতের কল্যাণ ও পরিণাম, যা চিরস্থায়ী হবে। জান্নাতের নহর মানেই জান্নাতের অস্তিত্ব থেকে নির্গত নহর। নহরসমূহের অবস্থা বেহেস্তি বস্তুর অবস্থার মতই রহস্যময় ও সূক্ষ্ম, যা বুঝা দুঃসাধ্য। এছাড়াও জান্নাতে পানি, দুধ, মধু ও শরাবের নহর প্রবহমান। কুরআন মজীদে এ রকমই উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন সপ্তম আকাশ পেরিয়ে একটি নহর দেখতে পেলাম। ইয়াকুত ও যমরুদ পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে নহরটি। তারপাশে পড়ে থাকা পেয়ালাগুলো সোনা, রূপা, ইয়াকুত, মোতি এবং যবরযদের। তাঁর পানি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। এটা লক্ষ্য করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল (আ.) কে বলেন, হে জিব্রাঈল! এটা কি? তিনি উত্তর দিলেন, এটা হাউযে কাউছার, আল্লাহ তা'আলা এটা আপনাকে দান করেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, জান্নাতে প্রবাহিত একটি নহর রয়েছে। যার নাম সালসাবিল। এ সালসাবিল নহর দু'টি ধারা থেকে নেমে এসেছে। একটির নাম কাউসার আর অপরটির নাম রহমত। গুনাহগার বান্দা জাহান্নামে জ্বলে পুড়ে যখন কালো হয়ে যাবে এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াতে তারা যখন জাহান্নাম থেকে বের হবে, তখন এ নহরের পানি দিয়ে তাদেরকে গোসল করানো হবে। তারপর তারা পুনরায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

সিদ্রাতুল মুনতাহা এমন এক স্থান, যার সংজ্ঞা নির্ণয় ও বর্ণনা প্রদান মনুষ্য জ্ঞান ও অনুমানের অতীত। এখানে আসার পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে শরাব, দুধ ও মধুর পেয়ালা পুনরায় হাজির করা হয়। এবারও তিনি দুধই পছন্দ করেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বায়তুল মামুর দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁর উপর থেকে পর্দা সরিয়ে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তারপর আমার সামনে বায়তুল মামুর উপস্থিত করা হয়। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং বায়তুল মামুরের মধ্যে হয়তো বা আরও অনেক আলম বা জগৎ বিদ্যমান ছিল এবং সে সমস্ত আলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার মত সময় ও শক্তি তাঁর ছিল না। তাই এ সকল থেকে পর্দা সরিয়ে দেয়া হয় এবং সবকিছু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টির অধীনে নিয়ে আসা হয়। তিনি সবকিছুই ভালভাবে দেখে নেন।

বাইতুল মামুর ঐ মসজিদ যা কা'বার ঠিক বরাবর উপরে আকাশে অবস্থিত। বাইতুল মামুর যদি পৃথিবীতে পতিত হত, তবে কাবা গৃহের উপরেই পড়ত। পৃথিবীতে কা'বার যে মর্যাদা আকাশে বাইতুল মামুরের মর্যাদা ঠিক তেমনই। ফিরিশতরা ঊর্ধ্বাকাশে এ ঘরকে তওয়াফ করে এবং তার দিকে ফিরে নামায আদায় করে। যেমনভাবে দুনিয়ায় কা'বা গৃহের তওয়াফ করা হয় এবং তার দিকে ফিরে নামায আদায় করা হয়। দৈনিক সত্তর হাজার ফিরিশতা বাইতুল মামুর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসে। যিয়ারত শেষে তারা ফিরে গেলে, আর কোন দিনই তাদের যিয়ারতের সৌভাগ্য হয় না। এমনিভাবে দৈনিক নতুন ফিরিশতাদের আসা যাওয়া চলছে। বাইতুল মামুর এর সৃষ্টির সময় থেকেই এ নিয়ম জারী আছে। এটা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কুদরতের দলিল। আল্লাহ তা'আলা এত অধিক সংখ্যক ফিরিশতা সৃষ্টি করেছেন যা কল্পনা করা অসম্ভব। হাদীস শরীফে এসেছে, আসমান যমীনের এমন কোন জায়গাও বাকি নেই, যেখানে ফিরিশতারা সিজদা করেননি। আর সাগর বক্ষের এমন কোন বিন্দু ও পানি নেই, যার উপর আল্লাহ তা'আলার কোন না কোনো ফিরিশতা নিয়োজিত রাখেননি। হাদীস শরীফে এসেছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি যখন সপ্তম আকাশে আরোহণ করলাম, তখন হযরত ইব্রাহীম খলিল (আ.) কে বাইতুল মামুরে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখতে পেলাম। তাঁর সাথে এক বিরাট জামাত উপবিষ্ট ছিল। আমি তাঁকে সালাম প্রদান করলাম। তিনিও তাঁর উত্তর দিলেন। সেখানে আমি দেখলাম, আমার উম্মত দু'ধরনের। একদল সাদা পোশাক পরিহিত। তাঁদের এ সাদা পোশাক কাগজের মত মিহি। অপর জামাতটি ময়লা পোশাক পরিহিত। সাদা পোশাক পরিহিত লোকগুলো বাইতুল মামুরের নিকটে আমার সঙ্গে মিলিত হল। আর ময়লা কাপড় পরিহিত লোকগুলো রইল পিছনে। আমি সাদা পোশাক পরিহিত লোকদেরকে সঙ্গে নিয়ে বাইতুল মামুরে নামায আদায় করলাম। পোশাকের পরিচ্ছন্নতা ও শুভ্রতা সুন্দর আমলের ইঙ্গিতবহ।

হাদীস শরীফে এসেছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর কাছে এমন একদল লোক দেখতে পেলাম, যাদের দেহের বর্ণ কাগজের মত সুন্দর এবং শুভ্র। সেখানে আরেকদল লোক ছিল। যাদের দেহের বর্ণ অন্ধকার ও কৃষ্ণবর্ণ। অতঃপর তারা একটি নহরের কাছে এল এবং সেখানে গোসল করল। তাতে তাদের কালিমা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এরপর তারা আরেকটি নহরের কাছে এল এবং পুনরায় সেখানে গোসল করল। তাতে তাদের দেহমন পরিপূর্ণভাবে শুভ্র সুন্দর লোকদের ন্যায় হয়ে গেল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদা বর্ণের লোকদের সম্পর্কে, জিব্রাইলকে (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, 'এরা কারা? আর কালো বর্ণের লোকগুলোই বা কারা? আর হেলান দিয়ে বসে আছেন যিনি, তিনি কে? নহর দু'টিই বা কিসের, যার পানিতে লোকগুলো গোসল করল? হযরত জিব্রাঈল (আ.) বললেন, সাদা বর্ণের পোশাক পরিহিত লোকগুলো আপন ঈমানকে অন্যায়ের কালিমা দ্বারা কলংকিত করেননি। কৃষ্ণবর্ণের লোকগুলো তাদের সৎ কর্মকে, অসৎ কর্মের সঙ্গে মিশ্রিত করে ফেলেছিল। কিন্তু পরে তারা তওবা করলে আল্লাহ তাদের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। আর নহরগুলো হচ্ছে- প্রথমটি নহরে রহমত, দ্বিতীয়টি নহরে নিয়ামত। আরেকটি নহর হচ্ছে, শরাবান তহুরার নহর। কুরআন পাকে এর কথা বলা হয়েছে।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সওয়ারী আরও উপরে উঠল। এত উপরে উঠল যে, সেখানে কলমের আওয়ায শোনা যাচ্ছিল। কলমের মাধ্যমে ফিরিশতারা আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত তকদীর লিপিবদ্ধ করছিলেন। তকদীরে এলাহী চিরন্তন, কিন্তু তার লিখন ক্রিয়াটি অশাশ্বত। লওহে মাহফুযে সৃষ্ট জগত সম্পর্কে সকল কথা লেখা হয়েছে; আসমান এবং যমীন সৃষ্টিরও বহু আগে।

হাদীস শরীফে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে যা হবে, কলম তা লিপিবদ্ধ করে শুকিয়ে গেছে। এ হাদীসখানা লওহে মাহফুযের লিখা সম্পর্কিত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনতে পেয়েছিলেন, সে লেখার আওয়ায। ফিরিশতারা মূল লিপি থেকে অনুলিপি করছিলেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিতে জান্নাত ও জাহান্নام উপস্থাপন করা হয়। তিনি জান্নাতকে দেখতে পেলেন আল্লাহ তা'আলার রহমতের প্রকাশস্থলরূপে, আর জাহান্নামকে দেখলেন আযাব ও গযবের জায়গা হিসেবে। জান্নাত উন্মুক্ত ছিল। জাহান্নাম ছিল বন্ধ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালসাবিল নামক নহরে গোসল করলেন, তাতে তিনি যাহের ও বাতেন হুদুদ বা সীমানার মলিনতা থেকে পাক সাফ হয়ে গেলেন এবং এভাবে তাঁকে পূর্বাপর সমস্ত ত্রুটি ও ক্ষমার তাজ দান করা হয়।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আল্লাহ তা'আলার কুদরতের বড় বড় নিদর্শন দেখা শেষ করেন, তখন তাঁর জন্য নৈকট্য, বিশেষত্ব ও বজুর্গীর মুহূর্ত উপস্থিত হয়। শেষ সীমা পর্যন্ত উপনীত হতে হতে যাবতীয় বিচ্ছিন্নতার পরিসমাপ্তি ঘটে। এখানে এসে তিনি হন সম্পূর্ণ একা। ফিরিশতা বা মানুষ কেউ তার সাথে ছিল না। কিন্তু তখনও আল্লাহ ও নবীর মাঝে বিদ্যমান ছিল সত্তর হাজার নূরের পর্দা। পর্দাগুলো ছিল এক একটি এক এক রকমের। একেকটি পর্দার দূরত্ব ছিল পাঁচশ বছরের রাস্তার সমান। আর সে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করা ছিল কঠিন। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতের সাহায্যে তিনি সে পর্দাগুলোও অতিক্রম করেন। এ মাকামে উপনীত হওয়ার পর এক বিশেষ ধরনের হয়রানী ও স্থবিরতা তাঁকে গ্রাস করে। তিনি আল্লাহ্ তা'আলার জালালাত ও আযমতই শুধু অনুভব করেন।

আওয়ায আসে, 'হে মুহাম্মদ থামুন, আপনার প্রভু প্রতিপালক এখন সলাত প্রেরণ করছেন। শব্দ শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমান করেন, এটা তো আবু বকরের কণ্ঠ স্বরের মত মনে হচ্ছে। চিন্তা করেন, আবু বকরের কণ্ঠ কোত্থেকে এল। পরিচিত কণ্ঠধ্বনি শুনে তিনি এক রকম স্বস্তি অনুভব করেন। এতে ভীতিপ্রদ অবস্থাটা দূর হয়ে যায়।

এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়, হে সৃষ্টিকুল শ্রেষ্ঠ, হে আহমদ, হে মুহাম্মদ, আপনি নিকটবর্তী হোন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আমার প্রভু আমাকে এত কাছে নিয়ে নিলেন এবং আমি আমার প্রভুর এমন নিকটবর্তী হয়ে গেলাম, যেমন আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে ইরশাদ করেন, অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং এত কাছে চলে এলেন যে, তাহল ধনুকের দু'মাথা বরাবর দূরত্ব অথবা এর চেয়েও কম দূরত্ব। তারপর আল্লাহ তা'আলা আমাকে কিছু প্রশ্ন করেন। কিন্তু আমার সে রকম চেতনা ছিল না যে, জবাব দেই। এরপর আমাকে পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সবকিছুর জ্ঞান দেয়া হল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে বিভিন্ন ধরনের ইলেম শিক্ষা দেন। এক ধরনের ইলেম এমন যে, যা কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। এ ব্যাপারে আমার প্রতিশ্রুতিও নেয়া হয়েছে। কেননা এটি এমন একটি বিষয়, যা কোন সৃষ্টিই সহ্য করতে পারবে না। আরেক প্রকারের এলেম এমন ছিল; যা মানুষের কাছে প্রকাশ করার বা না করার ব্যাপারে আমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আর এক প্রকারের এলেম, যা উম্মতের প্রত্যেকটি খাস ও আম ব্যক্তির কাছে পৌছিয়ে দেয়ার জন্য আমাকে হুকুম করা হয়েছে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিবেদন করেন; হে আমার প্রভু, আপনার সকাশে উপস্থিত হওয়ার মুহূর্তে আমার মধ্যে অস্থিরতা এসে গিয়েছিল। এ সময় হঠাৎ শুনতে পেলাম, আমার প্রভু এবং প্রতিপালক সলাত প্রেরণ করছেন। যা আবু বকরের কণ্ঠ স্বরের মত মনে হয়েছে। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, এখানে আবু বকর কেমন করে এল? আর আমার প্রভু এবং প্রতিপালক সলাত আদায় করবেন কেন? তিনি তো কারো মুখাপেক্ষী নন।

আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে ঘোষণা এল, অন্যের জন্য সলাত আদায় করা থেকে আমি অমুখাপেক্ষী। আমি আরও ঘোষণা দিচ্ছি যে, 'আমার পবিত্রতা এবং আমার রহমত, আমার গযবের উপর অগ্রগামী। হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতখানা তিলাওয়াত করুন, আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন ঐ সত্তা যিনি আপনার উপর দুরূদ পাঠ করেন এবং তাঁর ফিরিশতাবৃন্দও; বিশ্বাসীদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য। আর তিনি মু'মিনদের ব্যাপারে বড়ই দয়ালু। এখানে সলাত বা দরূদ, যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর প্রেরণ করেন। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রহমত তাঁর উপর নিরন্তর বর্ষিত হতে থাকে। মহান আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এতটাই ভালবাসেন।

এরপর হযরত আবু বকর (রা.) এর আওয়ায শ্রবণ প্রসংগে জবাব হচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলা মেহেরবানী করে তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাঁর প্রিয় সঙ্গী হযরত আবু বকর (রা.) এর কণ্ঠ স্বরের অনুরূপ কণ্ঠ স্বর শুনিয়ে দিলেন। যাতে প্রিয় পরিচিত জনের গলার আওয়ায শুনে অপরিচিত স্থানের বিস্ময় ও বিহ্বলতা কাটিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বস্তি লাভ করতে পারেন এবং নিজ সত্তায় উজ্জীবিত হতে পারেন। ঐ সময় আল্লাহ্ তা'আলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে এরশাদ করেন, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি যখন আপনার ভাই মূসা (আ.) এর সঙ্গে কালাম বা আলাপ করতে চাইলাম, তখন তার মধ্যে সাংঘাতিক ভীতি বিরাজ করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে মূসা, তোমার ডান হাতে ওটা কি? তখন মূসা (আ.) তার নিজস্ব পরিচিত জিনিসটির কথা শুনে স্তম্বিত হন। আপনার ব্যাপারেও আমি চাইলাম যে, পরিচিত জনের কণ্ঠস্বর শুনে আপনি আপনার নিজের মধ্যে ফিরে আসুন। তাই আবু বকরের (রা.) আওয়ায আপনাকে শুনিয়ে দিলাম।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর এমন এক বিশাল ব্যাপার আমার দৃষ্টিগোচর হল, যার বর্ণনা দিতে আমি অক্ষম। তারপর আরশ থেকে এক ফোঁটা পানি আমার নিকটবর্তী হল এবং তা আমার মুখে পতিত হল। আমি তার স্বাদ নিলাম। মনে হল, এর চেয়ে মিষ্টি কিছু কেউ কোন দিন আস্বাদন করেনি। এতে করে পূর্বাপর যাবতীয় খবর আমার জানা হয়ে গেল এবং আমার কলব উজ্জ্বলতর হল। আরশের নূর আমার চোখকে আচ্ছাদিত করল। ঐ সময় সমস্ত কিছুই অন্তরের চোখ দিয়ে দেখলাম। আর আমার পেছন দিকেও ঐ রকম দেখতে লাগলাম, যেমন সামনে দেখি। প্রত্যেক মাখলুকের জন্যই নূর ও যুলমাতের মাকাম রয়েছে। অনুভূতির এবং মারেফাতের এক নির্দিষ্ট আকার রয়েছে। প্রত্যেক মুকারবীন ফিরিশতা, যারা আল্লাহ তা'আলার আরশের আশপাশে অবস্থান করেন, তারা সকলেই আল্লাহ তা'আলার কিবরিয়া, জালালত, আযমত ও হায়বতের নূর দ্বারা আচ্ছাদিত। আল্লাহ্ তা'আলার গুণাবলীই হেজাব বা পর্দা। আর ফিরিশতারা মাহজুব বা আচ্ছাদিত। এ সকল ফিরিশতাদের মর্যাদাও ভিন্ন ভিন্ন। তাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট মাকাম ও পদমর্যাদা রয়েছে। প্রত্যেক সৃষ্টি নেয়ামত দানকারীর নেয়ামত দর্শন দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রত্যেক হালপ্রাপ্ত লোক বিভিন্ন হালের দর্শন দ্বারা আচ্ছাদিত। সরঞ্জাম গ্রহণকারী সরঞ্জাম দর্শনের দ্বারা আচ্ছাদিত। কেউ আচ্ছাদিত বৈধ কামনা দ্বারা। কেউবা অবৈধ কামনা দ্বারা। কেউ আচ্ছাদিত গুনাহ ও অসুন্দরের পর্দা দ্বারা। কেউ আচ্ছাদিত সম্পদ, সন্তান অথবা অন্যান্য পার্থিব সরঞ্জাম দ্বারা। কেউ আচ্ছাদিত পৃথিবীর ভোগ বিলাস দ্বারা। আবার কেউ আচ্ছাদিত স্রষ্টার কুদরত দ্বারা।

মানুষের স্বভাব হচ্ছে যে, উঁচু মর্যাদায় অবস্থান করলে সে মর্যাদা সম্পর্কে যেমন সচেতন থাকে তেমনি আরও অধিক মর্যাদার অভিলাষী হয়। তাই দেখা যায়, হযরত মূসা (আ.) যখন আল্লাহ পাকের দরবারে কথোপকথনের মর্যাদা লাভ করলেন, তখন দীদারে এলাহীর বাসনা প্রকাশ করলেন। এটা এক প্রকারের আনন্দ, যাতে মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। কেননা, নৈকট্যের মাকামে আদবের প্রতি লক্ষ্য কমই থাকে। কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নৈকট্যের মাকামে পূর্ণ কৃতকার্য হলেন, তখন তাঁর যাবতীয় হক পূর্ণভাবে আদায় করলেন। যে মাকামে তিনি উন্নীত হয়েছেন, সেখানেই শান্ত এবং স্থির থেকেছেন। অতিরিক্ত কোন আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তাই তিনি স্বাভাবিকভাবে একে একে মর্যাদার সকল মনযিল অতিক্রম করেছেন। এ অভিযাত্রার সবচেয়ে উঁচু মর্তবা হচ্ছে দীদারে বারী বা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা। এ মাকামে আল্লাহ তা'আলা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁকে সুস্থির রেখেছেন। এটা সর্বোচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ ফরমান, 'তিনি যা দর্শন করলেন, তাঁর অন্তর সেগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেনি। দেখা এবং উপলব্ধি করা একটি অপরটির সহায়ক হয়েছে। দর্শন যা পেয়েছে, চোখের দৃষ্টি তাকে ধারণ করেছে, আর চোখ যা দর্শন করেছে অন্তর তাকে অনুভব করেছে, বিশ্বাস করেছে। সবকিছুই সঠিকরূপে গৃহীত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের উপর অগ্রাধিকার লাভ করেছেন। সে জন্যে সমস্ত আম্বিয়া কেরাম (আ.) তাঁর উপর গৌরব (সৌন্দর্যমণ্ডিত ঈর্ষা) করতে লাগলেন। তিনি দুনিয়া এবং আখিরাতে সীরাতুল মুস্তাকিমের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ে গেলেন নবী রাসূলদের শিরোমণি শ্রেষ্ঠ নবী।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন প্রতিষ্ঠা লাভের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআন মজিদে কসম করে বলেন, 'হে সাইয়্যেদে আলম! প্রজ্ঞাপূর্ণ কুরআনের শপথ, নিশ্চয় আপনি পয়গাম্বরগণের মধ্যে একজন-যিনি সীরাতুল মুস্তাকিমের উপর রয়েছেন। এটা আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ্ তা'আলা শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহশীল'। এর পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেছেন, অতঃপর তিনি তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ওহী প্রেরণ করেন। ওহী শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। ' যত প্রকারের ইলম, মারেফাত, হাকীকত, সুসংবাদ, ইশারা, তথ্য, তত্ত্ব, নিদর্শন, কারামাত এবং কামালত আছে সব এ ওহী শব্দটির গণ্ডিতে আবদ্ধ। উপরোল্লিখিত সকল বিষয়ের আধিক্য এবং বিশালতা সবই এর ভেতরে রয়েছে। কেননা, এখানে ওহী বলে সেগুলোকে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। পূর্ণ বিবরণ দেয়া হয়নি। কারণ, এর অন্তর্নিহিত ভাব আল্লাহ্ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ ধারণ করতে পারবে না। সুতরাং অন্যরা ততটুকুই জানতে পারে, যতটুকু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। কেউ আবার তার পবিত্র রূহের দিকে মুতাওয়াজ্জাহ হয়ে বাতেনী ইলম হাসিল করতে সমর্থ হয়েছেন। আউলিয়া কেরام (রহ.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগ্যতাকে ও আভিজাত্যকে অধিকার করে নিয়েছেন। কেবল তারাই এ ধরনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের যৎকিঞ্চিৎ নিগূঢ় তত্ত্ব অর্জনে সফল হয়েছেন। পূর্ণ শরিয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে, আল্লাহর হুকুম ও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের শতভাগ পালনের মাধ্যমে; মহামানবরা সে নূরের ও কুদরতের ছিটে ফোঁটা অর্জন করতে পেরেছেন এবং এখনো পারছেন। পরকালের মুক্তির জন্য এটা অত্যাবশ্যকীয় নয়। শরিয়তের পূর্ণ বাস্তবায়নই মুসলমানদের মূল্য উদ্দেশ্য।

অতঃপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরশে আযীমে পৌঁছেন, আরশ তখন তার জালালী বিস্তারকে সংকুচিত করে আরজ করল, আপনিই তো সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর আহাদিয়াতের জালাল দর্শন করিয়েছেন এবং তার সামাদিয়াতের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা আমাকে (আকারের দিক থেকে) সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক বানানোর পরও আমি চিন্তাক্লিষ্ট ছিলাম যে, কোন পথে কিভাবে আমি আপনার কাজে লাগতে পারি। হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি আমার সকাশে এলে, আমি আপনার সাথে কি আচরণ করব? তা ভেবে সদা-সর্বদা হয়রান পেরেশান ছিলাম। পরওয়ারদিগার আমাকে যখন সৃষ্টি করেন, তখন আমি তাঁর হায়বত ও জালালিয়াতের প্রভাবে কম্পমান ছিলাম। এরপর যখন আমার জন্য বা উপরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু লিখে দেয়া হয় তখন তাঁর ভয়ে আমি আরও কাঁপতে থাকি। পরে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ লিখা হলে আমার কম্পন থেমে যায়। অস্থিরতা দূর হয়। আপনার পবিত্র নামের বরকত আমার মধ্যে উদ্ভাসিত হয়। এখন আমার উপর পতিত হয়েছে আপনার শুভ দৃষ্টি। আজ কত মর্যাদার অধিকারীই না হলাম আমি।

এক পর্যায়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উম্মতের অবস্থা আল্লাহ তা'আলার কাছে পেশ করা হয়। তখন তিনি আরজ করেন, হে আমার প্রভু আপনি তো অনেক উম্মতকে আযাব দিয়েছেন। কাউকে পাথর বর্ষণ করেছেন, কাউকে মাটিতে প্রোথিত করেছেন, কারো চেহারা বিকৃত করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, আমি তাদেরকে রহমত করব, তাদের গুনাহকে আমি নেকীতে রূপান্তরিত করে দিব, যে আমাকে ডাক দিবে, আমি তার ডাকে 'লাব্বাইক, বলব। যে প্রার্থনা করবে, তাঁকে দান করব। আমার উপর যে নির্ভর করবে, আমি তাকে অভাবহীন করে দিব। দুনিয়ায় আমি তাদের গুনাহসমূহ গোপন রাখব। আর আখিরাতে আপনাকে তাদের শাফায়াতকারী নিযুক্ত করব'।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে আল্লাহ তা'আলা তার একনিষ্ঠ ইবাদত ও আনুগত্য হিসেবে মু'মিনদের মি'রাজস্বরূপ পাঁচ ওয়াক্ত নামায প্রদান করেন। আর পরবর্তী সময়ে তথা মদিনায় হিজরতের পর ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে তা পরিচালনার জন্য যে নীতিমালা প্রয়োজন হবে তার প্রতি নির্দেশকরতঃ আল্লাহ নীতিমালা পেশ করেন। তা এমন যে, ঐ মৌলিক নীতিগুলোর উপর সমষ্টিগতভাবে মানবজীবনের মূল ভিত্তি গড়ে তোলাই ইসলামের আসল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩-৩৭)। কুরআনের সে নীতিমালাসমূহ নিম্নরূপ:
(১) এক আল্লাহরই ইবাদত ও আনুগত্য করা: আল্লাহ বলেন আপনার রবের নির্দেশ, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশকেই একমাত্র আদেশ এবং তার আইনকেই একমাত্র আইন বলে স্বীকার করে নেয়া প্রতিটি মানুষের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য ও ফরয। আল্লাহই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং মানুষের ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত সত্তা ও মালিক। এ ব্যাপারে সামান্যতম শিথিলতা করলে মানুষ জান্নাতের অনুপোযুক্ত হয়ে যাবে এবং তার আমল ধ্বংস হয়ে যাবে।

(২) পিতা মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করা: পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তোমাদের নিকট যদি তাদের কোন একজন কিংবা উভয়জন বৃদ্ধাবস্থায় থাকে, তবে তুমি তাদেরকে 'উহ্' পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে ধমক দেবে না। বরং তাদের সাথে বিশেষ মর্যাদাসহকারে কথা বলবে এবং বিনয়ভাবে তাদের সম্মুখে নত হয়ে থাকবে। আর এ দোয়া করবে- হে প্রভু! তাদের প্রতি রহমত কর, যেমনি তারা স্নেহভরে বাল্যকালে আমাদের লালন পালন করছে (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩, ২৪)। অর্থাৎ আল্লাহর পরে সকল মানুষের উপর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পিতামাতার অধিকার। সন্তানকে যে কোন অবস্থায় পিতামাতার অবশ্য অনুগত, সেবা শুশ্রূষাকারী এবং আদব রক্ষাকারী হতে হবে। পিতামাতার সেবায় প্রত্যেক মানুষকে সর্বাধিক যত্নবান হতে হবে। কোন অবস্থায় এ ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন ইসলামে পুরোপুরি নিষেধ বা হারাম।

(৩) নিকট আত্মীয় ও অভাবীদের অধিকার দেয়া: আর নিকট আত্মীয়কে তাদের অধিকার দাও, মিসকীন ও সম্বলহীন পথিককে তার অধিকার দাও (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৬)। অর্থাৎ তোমার উপার্জিত ধন সম্পদকে কেবল নিজের জন্যই সংরক্ষিত করে রাখবে না। বরং এর দ্বারা নিজের আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশী ও অন্যান্য অভাবী লোকদের অধিকারও যথাযথভাবে আদায় করবে। প্রত্যেকের উপার্জিত সম্পদে অন্যান্য সকলেরই বিধি মোতাবেক হক বা অধিকার রয়েছে। নিজের সম্পদকে কুক্ষিগত করা যাবে না। এটা নিষেধ। এর শাস্তি ভয়াবহ।

(৪) অপব্যয় থেকে বিরত থাকা: তোমরা অপব্যয় অপচয় করবে না। অপব্যয়কারী লোক শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের অকৃতজ্ঞ (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৭)। অর্থাৎ প্রয়োজনে তোমরা উপার্জিত সম্পদ নিজের কাজে ব্যয় কর। এরপর আত্মীয়স্বজন ও অভাবীদের মধ্যে তাদের অভাব মোচনের জন্য দান কর। কিন্তু বিলাসিতা ও বেহুদা কাজে অপব্যয় করবে না। কারণ, এতে তোমার নিজের কোন লাভ হবে না। আর সমাজ এবং জাতিরও কোন লাভ হবে না। বরং এ অপব্যয়ে শেষ পর্যন্ত তোমাকে অভাবগ্রস্ত করে তুলবে এবং তা শয়তানরাই একান্তভাবে কামনা করে। অতিরিক্ত ভোগ বিলাস ও মোজমাস্তিতে খরচ করা হারাম। সম্পদকে নিজের মনে করে, যা ইচ্ছে সেভাবে অপব্যয় করা ইসলামে অমার্জনীয় অপরাধ।

(৫) দুস্থ-অভাবীদের সাথে সুন্দর আচরণ করা: তোমরা যদি অভাবীদের হতে পাশ কাটিয়ে থাকতে চাও, এ কারণে যে তোমরা তোমাদের রবের রহমত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষী। তবে তাদেরকে বিনয়সূচক জবাব দাও (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৮)। অর্থাৎ কোন আত্মীয় স্বজন, মিসকীন ও সম্বলহীনদের কিছু দিতে না পারলে, তাদের সুন্দর কথা দিয়ে বিদায় দিবে। এটাও এক প্রকারের দান বিশেষ। দরিদ্র, পীড়িত ও অভাবীদের দান করার সামর্থ্য না থাকলে অথবা দান করতে না চাইলেও, কোন অবস্থাতেই ব্যবহার খারাপ করা যাবে না। দরিদ্র জনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল করা বা অপমান করা গুরুতর পাপ।

(৬) অর্থ ব্যয়ে ভারসাম্যতা রক্ষা করা: নিজের হাত গলায় বেধে রাখবে না আর একেবারে খোলাও ছেড়ে দিবে না। তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও অক্ষম হয়ে যাবে (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৯)। অর্থাৎ এটি একটি রূপক কথা। গলায় হাত বাধা বলতে কার্পণ্য আর খোলা ছেড়ে দেয়া বলতে অপচয় ও বেহুদা খরচ করা বুঝানো হয়েছে। এক কথায়, তোমরা না কৃপণ হয়ে ধন সম্পদ গচ্ছিত করে রাখবে। আর না অপচয়কারী হয়ে নিজের অর্থ নৈতিক শক্তিকে বিনষ্ট করবে। বরং এ ব্যাপারে মধ্যম নীতি গ্রহণ করবে। ইসলাম সর্বাবস্থায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও যথাযথভাবে মধ্যমপন্থা অবলম্বনই আল্লাহর নির্দেশ। পরিমিতভাবে দানও করতে হবে এবং পাশাপাশি নিজ পরিবারের জন্যও সম্পদ রাখতে হবে।

(৭) দারিদ্র্যতার আশংকায় সন্তান হত্যা করা যাবে না: নিজের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যতার আশংকায় হত্যা করবে না। আমি তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। আর তোমাদেরকেও। বস্তুতঃ তাদের হত্যা করা একটি অতি বড় ভুল কাজ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩১)। যুগে যুগে দেখা গেছে, আর এখনও দেখা যাচ্ছে যে, দারিদ্র্যতার ভয়ে মানুষ নিজের শিশু সন্তানকে নানাভাবে হত্যা করছে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হল যে, খাদ্য সংকটের ভয়ে লোক সংখ্যা কমানো স্রষ্টার সাথে মোকাবিলা করার নামান্তর। বরং এজন্য এমন গঠনমূলক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; যার দ্বারা আল্লাহ প্রদত্ত রিযিকের প্রাচুর্য লাভ করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় লোকসংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই তার অপেক্ষা অনেক বেশী অর্থনৈতিক উপায় উপাদান লোকদের হস্তগত হচ্ছে। রিযিক আল্লাহর হাতে এবং আল্লাহ সকল সৃষ্টি জগতের জন্য রিযিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। অতএব রিযিক এবং দারিদ্র্যতার কথা ভেবে সন্তান বা মানবকে হত্যা করা হারাম। জ্ঞানীরা বলেন, মানুষ বাড়াও জনসংখ্যা কমাও।

(৮) যেনা ব্যভিচারের নিকটেও যাওয়া যাবে না: যেনার নিকটেও যেও না, তা অত্যন্ত খারাপ কাজ, আর অতিব নিকৃষ্ট পথ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩২)। অর্থাৎ মানুষ যে কেবল যেনা হতে বিরত থাকবে শুধু তা নয়। বরং যেনার কাজে উৎসাহক ও প্রেরণাদায়ক সংশ্লিষ্ট সকল কাজ হতেও দূরে থাকবে। আর তাহল; বেপর্দা, নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা, মদ্যপান, গান, বাজনা, নাচ, ছবি, মুভি, ভিডিও ইত্যাদি। এছাড়া ইন্টারনেটে, টিভিতে, টুইটারে, ফেইস বুকে, মোবাইলে এবং সকল প্রকার ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে যেকোন যৌন উদ্দীপক কিছু দেখা, শোনা বা অনুধাৱন করা হারাম।

(৯) প্রাণ হত্যা না করা: আর প্রাণ হত্যার অপরাধ করবে না। যাকে আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, সত্য বিধান ব্যতীত। আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে তার অলীকে আমি কিসাস দাবীর অধিকার দিয়েছি। অতএব, সে যেন এ ব্যাপারে সীমালংঘন না করে। এ ব্যাপারে অবশ্যই তাকে সাহায্য করা হবে (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৩)। অর্থাৎ মানুষের প্রাণের মালিক মানুষ নয়, আল্লাহ তা'আলা। তাই প্রাণকে ধ্বংস করার অধিকারও মানুষের নেই। তবে হ্যাঁ ইসলামী আইনে, সত্যতা যাচাই করে পাঁচটি ক্ষেত্রে হত্যা করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। (এক) ইচ্ছাপূর্বক নর হত্যাকারীকে কিসাসের মাধ্যমে। (দুই) দ্বীনের ব্যাপারে বাধা সৃষ্টিকারীকে লড়াইয়ের মাধ্যমে। (তিন) ইসলামী রাষ্ট্রের উৎপাটনের চেষ্টাকারীকে বিচারের মাধ্যমে। (চার) বিবাহিত নারী ও পুরুষকে যেনার অপরাধ করলে শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে। (পাঁচ) ইসলাম ত্যাগকারীকে মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে। এসব কারণ ছাড়া কোন ধরনের দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে বা মনের খেয়াল খুশিমত কাউকে হত্যা করা সবচেয়ে ভয়াবহ এবং অমার্জনীয় অপরাধ। এমনকি আত্মহত্যা ইসলামে অমার্জনীয় পাপ। এর কোন ক্ষমা নেই। এর পরিণام জাহান্নামের অনন্ত মহাশাস্তি।

(১০) এতীমের ধনমাল ভক্ষণ না করা : তোমরা এতীমের মালের নিকটেও যেও না, তবে হ্যাঁ তারা বুদ্ধি বিবেকে পৌঁছা পর্যন্ত উত্তম পন্থায় প্রয়োজনীয় অর্থ গ্রহণ করতে পারবে (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৪)। এতীম বা সহায়হীন দুর্বল মানুষের অর্থ, সম্পদ, মালামাল উপভোগ করা অমার্জনীয় পাপ। পরকালে এর বদলা দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই এ পাপ করা যাবে না।

(১১) অঙ্গীকার বা আমানত পূর্ণ করা : অঙ্গীকার পূর্ণ করা নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৪)। অর্থাৎ যেকোন ব্যাপারে কারো সাথে অঙ্গীকার বা ওয়াদা করা হলে, তা পূরণ করতে হবে। কারো আমানত খেয়ানত করা অমার্জনীয় পাপ। কথা দিলে, তা রক্ষা করা অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। মত বা সাক্ষী দিয়ে তা ভঙ্গ করা যাবে না। এ ধরনের খেয়ানত হারাম।

(১২) মাপে-ওজনে সঠিক দেয়া : মাপের পাত্র দিয়ে দিলে পুরাপুরি ভর্তি করে দিবে। আর ওজনে দিলে ত্রুটিহীন পাল্লা দ্বারা মেপে দিবে। এটা খুব ভালনীতি আর পরিণামও অতি উত্তম (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৫)। অর্থাৎ সঠিক পরিমাপ এবং ওজন দ্বারা পারস্পরিক আস্থা স্থাপিত হবে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা-উভয়ই নির্ভরতা লাভ করতে পারবে। এটাই ইসলামের নীতি এবং এর পরিণাম উত্তম। সকল ধরনের লেনদেন, ক্রয় বিক্রয় ও বিনিময়ে সঠিক পরিমাপ (বা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার সময়) এবং ওজন (কেজি, লিটার, টন, ইত্যাদি) বজায় রাখা। বস্তুগত ও অর্থনৈতিক বিনিময়েও যথাযথ ও সঠিকতা বজায় রাখতে হবে। এর ব্যতিক্রম করা হারাম ও জঘন্যতম পাপ।

(১৩) ভিত্তিহীন ধারণার পেছনে না পড়া : এমন কোন জিনিসের পিছনে লেগে যাবে না, যার জ্ঞান তোমার নেই। নিশ্চয় জানবে যে, চক্ষু, কান ও অন্তর সব কিছুর জন্যই জবাব দিহি করতে হবে (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৬)। অর্থাৎ জ্ঞানের পরিবর্তে অমূলক ধারণা-অনুমানের অনুসরণ করবে না। কারণ, এর ফলে মানব জীবনের অনেক মারাত্মক ব্যাধি দেখা দিতে পারে। কোন ব্যক্তি বা দলের উপর প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত দোষারোপ করা উচিত নয়। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না। সন্দেহ করে, লোকমুখে কথা শুনে বা অনুমান করে কারো সম্পর্কে মন্তব্য করা গুরুতর পাপ। মানুষ এ ধরনের অমার্জনীয় পাপ অহরহ করছে। অথচ সে জানে না, পরকালে এর শাস্তি কত ভয়াবহ হবে।

(১৪) যমীনে বাহাদুরী করে চলা যাবে না : যমীনে বাহাদুরী করে চলবে না, তুমি না যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে, আর না পর্বতের ন্যায় উচ্চতা লাভ করতে পারবে (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৭)। এটা ব্যক্তিগত ও জাতীয় আদর্শ; উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। এ নির্দেশ এবং হিদায়াতের বদৌলতেই মদীনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক, পরিচালক, গভর্নর ও সেনাপতিদের জীবনে অহংকার ও গর্বের নামগন্ধও খুঁজে পাওয়া যেত না। কোন অবস্থাতেই অর্থ, সম্পদ, জনবল, পদ, পদবী, ক্ষমতা, স্বাস্থ্য, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, ডিগ্রী, জ্ঞান, কোন বিষয়েই অহংকার প্রদর্শন করা যাবে না। এটা অমার্জনীয় অপরাধ ও পাপ।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ইসলামের প্রারম্ভিক রাষ্ট্রের নীতি বা মদীনা সনদ

📄 ইসলামের প্রারম্ভিক রাষ্ট্রের নীতি বা মদীনা সনদ


বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র মদীনায় গমনের পর নতুন একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। যে নীতিমালা ও শাসন তন্ত্রের উপর ভিত্তি করে তা পরিচালনা করেন ইতিহাসে তা মদীনা সনদ নামে বিশ্ব খ্যাতি লাভ করে। নিম্নে তাঁর কয়েকটি ধারা উদ্ধৃত হল :

১। মদীনার মুশরিক, ইহুদী ও মুসলমান সবাই এক দলভুক্ত হয়ে ঐক্যমতে থাকবে।
২। গোষ্ঠী ও জাতিসমূহ সকলেই ধর্মের ব্যাপারে স্বাধীন থাকবে। কেউ কারোর ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩। এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত কোন সম্প্রদায় শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে সকলে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করবে।
৪। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মিত্র জাতিসমূহের স্বত্বাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
৫। মদীনা আক্রান্ত হলে সকলে মিলে যুদ্ধ করবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজেদের যুদ্ধ ব্যয় বহন করবে।
৬। উৎপীড়িতকে রক্ষা করতে হবে।
৭। মদীনায় রক্তপাত করা আজ হতে হারাম বলে গণ্য হবে।
৮। দিয়ত বা খুনের বিনিময়স্বরূপ অর্থ দ আগের মতই বহাল থাকবে।
৯। কোন সম্প্রদায় বাহিরের কোন শত্রুর সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারবে না।
১০। নিজেদের মধ্যে কেউ বিদ্রোহী হলে অথবা শত্রুর সাথে কোন প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে, তাঁর সমুচিত শান্তি বিধান করা হবে। সে যদি তাঁর সন্তানও হয় তবু তাকে ক্ষমা করা হবে না।
১১। কোন সম্প্রদায় মক্কার কুরাইশদের সাথে কোন প্রকার গোপন সন্ধি সূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে না।
১২। অমুসলমানদের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে।
১৩। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ গোষ্ঠীর প্রধান নির্বাহী হবেন। যেসকল বিষয়ের মীমাংসা সাধারণভাবে না হয় সেগুলোর মীমাংসা তাঁর উপর ন্যস্ত থাকবে। তিনি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মীমাংসা করবেন।
১৪। এ চুক্তি ভংগ কারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। এ চুক্তিপত্রে সকল সম্প্রদায়ের লোকেরাই দস্তখত করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে পৌত্তলিক বা মুশরিক, মুনাফিক এবং ইহুদীরা এ চুক্তি ভংগ করে আল্লাহর অভিশাপে অভিশপ্ত হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00