📄 সকল ধর্মগ্রন্থে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন বার্তা
প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীরাই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাবের কথা জানতেন। তাঁর আবির্ভাবের সময় পৃথিবীতে হিন্দু, ফার্সী (অগ্নি উপাসক), বৌদ্ধ, ইহুদী এবং খৃষ্টান ধর্ম প্রচলিত ছিল। হিন্দুদের ধর্ম গ্রন্থ বেদ-পুরাণে, ফার্সীদের ধর্মগ্রন্থ যিন্দাবেস্তায় এবং বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক ও দিঘানিকায়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাবের ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে। ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তৌরাত এবং খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ ইঞ্জীল যে আল্লাহর তরফ হতে অবতীর্ণ হয়েছে, তা পবিত্র কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ কিতাব দু'টির মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুণাবলী এবং তাঁর শুভাগমনের ভবিষ্যৎ বাণী স্পষ্টাক্ষরে বর্ণিত হয়েছে। ইহুদী ও খৃষ্টানরা নিজ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে বহু পূর্বেই তারা বিশ্বনবীর আগমনবার্তা জানতে পেরেছিল।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যখন তাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের ধর্মগ্রন্থের (তাওরাত) সমর্থনকারী কিতাব (কুরআন) পৌঁছল, অথচ ইতোপূর্বে তারা কাফিরদের (আরব পৌত্তলিকদের) কাছেও এর বর্ণনা করত। কিন্তু যখন তাদের জানা-শোনা বস্তু অর্থাৎ কুরআন তাদের কাছে পৌছল; তখন তারা তা অমান্য করে বসল। সুতরাং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ। (সূরা বাকারা-৮৯)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) ইহুদী ধর্মের বিজ্ঞ আলেম ছিলেন (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে)। পবিত্র তাওরাত সম্পর্কে তার অসাধারণ জ্ঞান ছিল। তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ করার পর সালামা এবং মুহাজির নামক তাঁর দুই ভাতিজাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তিনি তাঁদেরকে বলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্রদ্বয়, তোমরা উভয়ে নিঃসন্দেহভাবে অবগত আছ যে, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র তাওরাতে বলেছেন, নিশ্চয় আমি হযরত ইসমাঈল (আ.) এর আওলাদদের মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করব, তাঁর নাম আহমদ। যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, সে হিদায়াত ও যথার্থ পথ প্রাপ্ত হবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না, সে অভিশপ্ত। অনন্তর সালামা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলেন। অথচ মুহাজির ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করল (বায়ানুল কুরআন)। এ সম্পর্কে আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, মিল্লাতে ইব্রাহীম (ইসলাম) হতে শুধু সে ব্যক্তি বিমুখ থাকতে পারে, যে স্বভাবগতভাবেই নির্বোধ (সূরা বাকারা : ১৩০)। ইহুদী ধর্মের অভিজ্ঞ ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেছেন, তাওরাতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুণাবলী লিখিত আছে এবং একথাও লিখিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ.) কে তাঁর কবরের পাশে দাফন করা হবে।
📄 বাইবেলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বাভাস
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে যোহনের বাইবেলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এ সম্পর্কিত কয়েকটি বিবরণ নিম্নে বর্ণিত হল:
১। আর আমি আমার পিতার (আল্লাহর) কাছে নিবেদন করব এবং তিনি আর এক সহায় বা সমর্থনকারী ফারাক্লীতস (বা নবী)। তোমাদের দান করবেন, যেন তিনি চিরকাল তোমাদের সাথে থাকেন। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়-১৪)
২। আর সে সহায়, যিনি পবিত্র আত্মা, যাকে পিতা (আল্লাহ) আমার নামে পাঠিয়ে দিবেন, তিনি সকল বিষয়ে তোমাদেরকে শিক্ষা দিবেন এবং আমি, তোমাদেরকে যা যা বলেছি সে সকল পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিবেন। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়- ১৪, পদ-২৬)
৩। যাকে আমি পিতার (আল্লাহর) নিকট হতে তোমাদের নিকট পাঠিয়ে দিব। সত্যের সে আত্মা, যিনি পিতার নিকট হতে বের হয়ে আসবেন, তিনি আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিবেন। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়-১৪)
৪। তথাপি আমি তোমাদেরকে সত্য বলছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল। কারণ, আমি না গেলে সে সহায় তোমাদের কাছে আসবেন না। কিন্তু আমি যদি যাই, তবে আমি তোমাদের নিকট তাকে পাঠিয়ে দিব। আর তিনি এসে পাপ সম্বন্ধে, ধার্মিকতা সম্বন্ধে এবং বিচার সম্বন্ধে জগৎকে জ্ঞানী করবেন। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়-১৪)
৫। তোমাদেরকে বলবার আমার আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু তোমরা এখন সে সকল সহ্য করতে পারবে না। পরন্তু সে সত্যের আত্মা যখন আসবেন, তখন তিনি তোমাদেরকে সত্যের সন্ধান দিবেন। কারণ তিনি নিজ হতে কিছু বলবেন না, যা যা শুনবেন (ওহী মারফত) তাই বলবেন এবং ভবিষ্যতের ঘটনাও তোমাদেরকে জানাবেন। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়-১৪)
বাইবেলে বর্ণিত বাক্যগুলোতে হযরত ঈসা (আ.) বার বার বিশ্বনবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাকে তিনি ফারাক্লিতস বলে অভিহিত করেন। এ শব্দটি ইবরানী বা সুরইয়ানী। এ শব্দটির হুবহু আরবী অনুবাদ মুহাম্মদ এবং আহমদ। অর্থাৎ প্রশংসিত এবং পরম প্রশংসাকারী। প্রাচীন ইউনানী (গ্রীক) ভাষায় এ শব্দটির অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে পাইরিকিলইউটাস। যার অর্থ অতি প্রশংসাকারী বা প্রশংসিত। কিন্তু পরবর্তীতে খ্রীষ্টানরা যখন দেখতে পেল যে, এর দ্বারা ইসলামের সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে, তখন তারা শব্দটি পরিবর্তন করে 'পাইরিকিলিটাস' অর্থাৎ শান্তিদাতা বানিয়ে দিল। খ্রীষ্টান পাদ্রী এবং মুসলমান আলিম সমাজের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত এ শব্দটি নিয়ে তর্ক যুদ্ধ চলে আসছে। আলিমরা প্রাচীন খ্রীষ্টানদের লিখিত প্রমাণ দ্বারা বহুবার প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, এ শব্দটি পাইরিকিলইউটাস অর্থাৎ আহমদ বা মুহাম্মদ। যারা এ সংবাদ বাহক উম্মী নবীর অনুসরণ করে, যাকে তারা নিজেদের নিকট তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত কথা অনুযায়ী পায়। (সূরা আ'রাফ-১৫৭)
বাইবেলে মুহাম্মদ বা আহমদ নামের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বাইবেলে বলা হয়েছে, হযরত ঈসা মসীহ আকাশে উত্থিত হওয়ার অল্পক্ষণ পূর্বে বলেছেন, আর দেখ আমার পিতা যা প্রতিজ্ঞা করেছেন, তা আমি তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি। কিন্তু যে পর্যন্ত ঊর্ধ্ব হতে শক্তি প্রকাশ/আবির্ভূত না হয়, সে পর্যন্ত তোমরা এ নগরে অবস্থান কর (বাইবেল, লুক, অধ্যায় ২৪)। বর্ণিত উক্তির কয়েকটি পংতির পরেই লুকের বাইবেল শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুত নবীর আবির্ভাবের কোন কথা, কোথাও উল্লেখ নেই। তবে একথা সুস্পষ্ট যে, হযরত ঈসা (আ.) এর পরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কোন নবীর আবির্ভাব হয়নি। সুতরাং তিনিই সে প্রতিশ্রুত নবী। ঊর্ধ্ব হতে শক্তি (প্রতিশ্রুত নবীর) প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা এ নগরে অবস্থান কর। এ কথার অর্থ এ নয় যে, তোমরা সেখানে ঘর বসতি বানাও। বরং এর প্রকৃত মর্ম হচ্ছে প্রতিশ্রুত নবীর আগমন পর্যন্ত জেরুযালেমের 'বায়তুল মুকাদ্দাস' তোমাদের কিবলা থাকবে। যখন তিনি আসবেন তখন মক্কা মুকাররমার পবিত্র কা'বা গৃহকে কিবলা নির্ধারণ করে ইবাদত করতে হবে। অবশ্য যখন আল্লাহ এ ব্যাপারে আদেশ দান করবেন। এ বিষয়ে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন, এখন আপনি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক এদিকে মুখ কর। যারা আহলে কিতাব, তারা অবশ্যই জানে, এটাই পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। (সূরা বাকারা-১৪৪)
ইঞ্জীলে হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এর আবির্ভাবের বর্ণনা করতে গিয়ে প্রতিশ্রুত নবীর আরও একটি ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছে। হযরত ঈসা এবং হযরত ইয়াহইয়া (আ.) একই সময়ে ছিলেন। অবশ্য হযরত ইয়াহইয়া (আ.) হযরত ঈসা (আ.) অপেক্ষা বয়সে বড় ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আ.) কে ইহুদীদের পাঠানো লোকেরা তিনজন নবী সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। যা বাইবেলের ভাষায় এভাবে বলা হয়েছে: ইহুদীরা কয়েকজন ধর্মযাজক ও লিবীয়কে দিয়ে জেরুযালেম থেকে যোহন বা ইয়াহইয়ার (আ.) কাছে প্রশ্ন করে পাঠাল, আপনি কে? তখন তিনি উত্তর দিলেন যে, আমি সে খ্রীষ্ট ঈসা (আ.) নই। তারা তাকে পুনঃ জিজ্ঞাসা করল, তবে কি আপনি হযরত ইয়াহইয়া (আ.)? তিনি বলেন আমি নই। আপনি কি সে নবী? তিনি উত্তর করেন না। তখন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি যদি সে খ্রীষ্ট (আ.) না হন, হযরত ইয়াহইয়া (আ.) না হন, সে নবীও না হন, তবে বাপ্তাইজ করছেন কেন? যোহন (ইয়াহইয়া) উত্তরে তাদেরকে বলেন, তবে আমি জলে বাপ্তাইজ করছি; তোমাদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে তোমরা জান না, যিনি আমার পরে আসছেন, আমি তাঁর পাদুকার বন্ধন খুলবারও যোগ্য নই। (বাইবেল, যোহন অধ্যায়-১)
এ থেকেই প্রমাণ হচ্ছে যে, তাওরাতের ভবিষ্যৎ বাণী অনুযায়ী ইহুদীরা তিনজন নবীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় ছিল। দু'জন হলেন হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.) আর তৃতীয় জনকে সে নবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে, ইহুদী এবং খ্রীষ্টান উভয় সম্প্রদায় এ কথার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত যে, হযরত ঈসা (আ.) এর পর এমন একজন নবী আসবেন, যাকে শুধু নবী শব্দ প্রয়োগ করলেই বুঝা যাবে। এ তৃতীয় নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত আর কেউ নন? হযরত ঈসার (আ.) পর একমাত্র তিনিই নবীরূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং শুধু নবী নামে সমগ্র জগতে প্রসিদ্ধ লাভ করেছেন। মুসলমানরা তাঁকে নবী বা রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন এবং খ্রীষ্টানদের মধ্যে তিনি The Prophet বা সেই প্রত্যাশিত নবী নামে পরিচিত। আর হযরত ইয়াহ্ইয়ার পরে যে একজন নবী আসছেন, তাঁর সম্বন্ধে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ.) বলেন, 'তিনি তোমাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, তোমরা তাঁকে জান না, আমি তাঁর পাদুকার বন্ধন খুলবারও যোগ্য নই। এ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া আর কেউ নন।
সাহাবীদের (রা.) মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর, তাওরাত অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি বলেন, তাওরাতেও অবিকল তাঁর এ গুণগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে (বুখারী-২য় খণ্ড)। কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, “হে নবী, আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা এবং ভয় প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা ফাতাহ-৮)
সাহাবীদের সময়ে কা'আব নামক জনৈক ইহুদী অভিজ্ঞ আলেম, ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আতা নামক জনৈক তাবিঈ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে কোন ভবিষ্যদ্বাণী আছে কি? তিনি উত্তর করলেন, হ্যাঁ আছে। তারপর তিনি তাওরাত হতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঐ গুণাবলীই পড়ে শুনালেন, যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেছিলেন। বর্তমানে তাওরাতের যে সকল কপি পাওয়া যায় তার মধ্যে আশয়ীয়া নবীর কিতাবে সামান্য শাব্দিক পরিবর্তনসহ আজও সে ভবিষ্যৎ বাণীগুলো দেখতে পাওয়া যায়। হযরত আশয়ীয়া (আ.) এর সে ভবিষ্যৎ বাণীতে প্রতীক্ষিত নবীর যে গুণাবলীর বর্ণনা পাওয়া যায় তা এরূপ: তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি আল্লাহর মনোনীত। তাঁর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট। তিনি চিৎকার করবেন না। উচ্চৈঃস্বরে কথা বলবেন না এবং বাজারে কোলাহল করবেন না। তিনি গরীব, দুখী এবং দুর্বলদের উপর অত্যাচার করবেন না, তিনি সদাশয় এবং চরিত্রবান হবেন। তিনি চিরস্থায়ী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অন্তর্ধান (মৃত্যু) হবে না। তাঁর সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন: আমিই আপনার সহায় হয়ে আপনাকে রক্ষা করব। তিনি পূর্ণ তাওহীদ প্রচার করবেন এবং পৌত্তলিক ও মুশরিকদেরকে পরাজিত করে পৌত্তলিকতা ধ্বংস করবেন। মরুভূমিতে, লোকালয়ে এবং কীদারের আবাদকৃত গ্রামসমূহে স্বীয় গুরুগম্ভীর আহ্বানে সমুউচ্চ করবেন। এ ভবিষ্যৎ বাণীর প্রত্যেকটি শব্দ এবং বাক্য, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারও উপর প্রযোজ্য হতে পারে না। তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ দু'টি বিশিষ্ট গুণ রয়েছে। তিনি নিজেকে এ দু'নামেই জগতে প্রচার করেছেন। এমনকি এ দু'টি শব্দ উচ্চারণ না করা পর্যন্ত মুসলমানের কোন নামাযই পূর্ণ হয় না। প্রত্যেকেরই নামায পড়তে হয়: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল। আর ইসলামের তাওহীদের কলেমায় এমনটিই বলা হয়েছে।
📄 বেদ ও পুরাণে (হিন্দু ধর্মে) আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বেদ-পুরাণ এবং উপনিষদ হিন্দুদের বিশিষ্ট ধর্মগ্রন্থ। এসব প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে আল্লাহ, রাসূল, মুহাম্মদ ইত্যাদি শব্দগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাপারটি একটু লক্ষ্য করলেই অবাক হয়ে যেতে হয়।
(১) অথর্ববেদীয় উপনিষদ-এ আছে: অস্য ইল্ললে মিত্রাবরুণো রাজা তস্মাৎ তানি দিব্যানি পুনস্তং দুধ্যু হবয়ামি মিলং কবর ইল্ললাং আল্লা, রাসূল, মহামদ, কং বরস্য আল্লা আল্লম ইল্লাল্লতি ইল্লাল্লাহ ॥৯॥
(২) ভবিষৎ পুরাণ-এ আছে: এতল্লিন্নন্তরে স্লেচ্ছ আচার্যেন সমন্বিত মহামদ ইতি খ্যাত মিষ্যশাকাসমন্বিত ॥৫॥ নমস্তে গিরিজানাথ মরুস্থল, নিবাসিনে ত্রিপুরা, সুরনাশায় বহুমায়া প্রবর্তিনে ॥৭॥ অর্থাৎ ঠিক সে সময়ে মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি - যার বাস মরুস্থলে অর্থাৎ (আরব দেশে)- আপন দলবলসহ আবির্ভূত হবেন। হে আরবের প্রভু, হে জগৎ গুরু, তোমার প্রতি আমার স্তুতিবাদ। তুমি জগতের সমুদয় কলুষ দূর করার বহু উপায় জান, তোমাকে নমস্কার। হে পবিত্র পুরুষ! আমি তোমার দাস। আমাকে তোমার চরণ তলে স্থান দাও।
(৩) অল্পোপনিষদ-এ দেখতে পাওয়া যায়: আল্লা, রাসূল, মহামদ, কং বরস্য আল্লা আল্লাম আব্দল্লাহ, বুকমে ককম আল্লাবুক নিখাতকম অর্থাৎ হে মানুষেরা মনোযোগ দিয়ে শোন প্রশংসিত জন, লোকদের মাঝ থেকেই আবির্ভূত হবেন। আমরা তাকে ৬০,০০০ জন শত্রুর মধ্যে পরিবেষ্টিত পাব। বলাবাহুল্য, এখানে যে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাই বলা হয়েছে, তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কারণ মুহাম্মদ অর্থই প্রশংসিত জন আর মক্কার অধিবাসীদের তৎকালীন সংখ্যাও ছিল প্রায় ৬০,০০০। উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমূহ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, আর্য ঋষিগণ ধ্যানবলে হাজার হাজার বছর আগেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্বরূপ ও আবির্ভাব সম্বন্ধে অনেক তথ্যই অবগত ছিলেন।
📄 বৌদ্ধ ধর্ম শাস্ত্রে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বৌদ্ধদের ধর্ম গ্রন্থ দিঘা-নিয়ায় বর্ণিত রয়েছে, মানুষ যখন গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ভুলে যাবে, তখন আর একজন বৌদ্ধ আসবেন, তাঁর নাম ‘মৈত্রেয়’ (সংস্কৃত শব্দ মৈত্রেয়) অর্থাৎ শান্তি ও করুণার বুদ্ধ। সিংহল থেকে পাওয়া (from Ceylonese sources) একটি প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানেও উপরোক্ত কথার সমর্থন পাওয়া যায়। একবার আনন্দ বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার মৃত্যুর পর কে আমাদেরকে উপদেশ দান করবে? বুদ্ধ বললেন আমিই একমাত্র বুদ্ধ বা শেষ বুদ্ধ নই। যথাসময়ে আর একজন বুদ্ধ আসবেন। আমার চেয়েও তিনি পবিত্র ও অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মমত প্রচার করবেন। আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, তাকে আমরা চিনব কি করে? বুদ্ধ বললেন, তার নাম হবে মৈত্রেয়। এ মৈত্রেয় বা ‘শান্তি ও করুণার বুদ্ধ’ যে মুহাম্মদ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশেষণ, অবিকল এমনই বর্ণিত হয়েছে। তাঁর সম্বন্ধে বলা হয়েছে, তিনি ‘রাহমাতুল লিলআলামিন’ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্য করুণা ও রহমতস্বরূপ।