📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ১১তম হিজরী

📄 ১১তম হিজরী


একাদশ হিজরীর মুহাররম মাসে অথবা রজব মাসের মাঝামাঝি ইয়ামানের 'নাখা'র প্রতিনিধি দল বিশ্বনবীর খেদমতে হাজির হন। এটি ছিল সর্বশেষ প্রতিনিধি দল যারা দরবারে নববীতে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। উক্ত দলে একশত সদস্য ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদের জানাযার নামায আদায় করেন। তাদের জন্য দোয়া এবং ইস্তেগফার করেন। অথচ তাদের শাহাদাতের আট বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন অর্ধরাতে (আযাদকৃত গোলাম) আবু মুয়াইহিবকে সাথে নিয়ে জান্নাতুল বাকীর দিকে গমন করেন। মুক্ত গোলামকে বলেন, 'আমার সংগে চল। আমাকে বাকীবাসীর জন্য মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।' জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে, দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতে থাকেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমাকে দুনিয়ার খাজানা (ধন ভাণ্ডার) পেশ করা হয়েছে এবং নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আমি কি পৃথিবীতে থাকতে চাই অথবা চির সুখময় জান্নাতে গিয়ে আমার আল্লাহর সংগে সাক্ষাৎ করতে চাই? আমি জান্নাতে যাওয়াকে গ্রহণ করে নিয়েছি।'

এ বছর সফর মাসের ৩০ তারিখ বুধবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। রোগের সূচনা হয় হযরত মায়মুনার ঘর থেকে। অসুস্থ থাকার সময়সীমা তেরো দিন পর্যন্ত ছিল। রোগাক্রান্ত হওয়ার এ সময়ে একদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহ ইহুদীদের প্রতি অভিশাপ করেছেন, তারা তাদের নবীগণের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ে নিয়েছে।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ অবস্থায় আরও বলেছিলেন, 'সাবধান নামাযের পাবন্দী এবং অধীনস্থদের সংগে সদ্ব্যবহার করবে।' অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) জন্য খিলাফতের (নিয়োগ) পত্র লিখার ইচ্ছা করেন। যাতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে লোকজন মতবিরোধ না করেন। এ হচ্ছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের মাত্র পাঁচদিন আগের ঘটনা। এ দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগের মাত্রা ছিল অত্যধিক। অত্যধিক অসুস্থতা দেখে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, 'মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লিখে দেয়ার কষ্ট দিবেন না। আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।' এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিখার ইচ্ছা ত্যাগ করেন এবং বলেন, 'আল্লাহ এবং মুমিনরা আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকেই গ্রহণ করবে না' (বুখারী এবং মুসলিম)। শিয়া সম্প্রদায় দাবী করেন যে, খিলাফতের পত্র হযরত আলী (রা.) জন্য লেখা হচ্ছিল, অথচ শিয়া সম্প্রদায়ের এ দাবী মনগড়া বাতিল কল্পনা মাত্র। হাদীসের কোন কিতাবে এর কোন প্রামাণ নেই। এ সংগে বিশুদ্ধ বা হাসান হাদীস দূরের কথা কোন যায়ীফ বর্ণনাও পাওয়া যায় না। যায় না। এটা তাদের মনগড়া আবিষ্কার মাত্র। অতএব, এটা অগ্রহণযোগ্য বা অবিশ্বাসযোগ্য।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের (মুমিনদের মাতাদের) নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন যে, অসুস্থতার অবশিষ্ট দিনগুলো হযরত আয়িশা (রা.) এর ঘরে অবস্থান করার জন্য। সকল স্ত্রীরা খুশি হয়ে অনুমতি প্রদান করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়ালের ৫ তারিখ শনিবার হযরত আয়িশা (রা.) এর গৃহে চলে আসেন। এটা তাঁর নিধারিত (পালার) দিনও ছিল। অতঃপর ৮ দিন পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে অবস্থান করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এখান থেকে অন্যত্র যাননি এবং আজ পর্যন্ত এখানেই আছেন। ৮ই রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে তাশরীফ নিলেন। অপারগতার কারণে বসে বসে খুতবা দেন, তাতে উম্মাহর প্রয়োজনীয় বিষয়ে নসীহত উপদেশ ছিল। দাওয়াত ও তাবলীগের উপর জোর দেন। খুতবার মধ্যে ইরশাদ ফরমান, 'আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে এখতিয়ার দিয়েছেন যে, তিনি পৃথিবীতে থাকতে চান অথবা আখেরাতের স্থায়ী জগতে চলে যেতে চান। তিনি আল্লাহর কাছে যাওয়ার বিষয় গ্রহণ করে নিয়েছেন।' হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা.) বলেন, 'বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটির মর্ম একমাত্র আবু বকর (রা.) ব্যতিত আমরা কেহই উপলব্ধি করতে পারিনি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনে হযরত আবু বাকর (রা.) কেঁদে উঠেন। প্রকৃতপক্ষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথাই বলছিলেন এবং হযরত আবু বকর (রা.) আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম ও তত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন। এ খুতবায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, 'আবু বকর ব্যতিত অন্য সকলের জানালা যেগুলো মসজিদের দিকে খোলা হয়, সব বন্ধ করে দাও।' ফলে আবু বকরের জানালা ছাড়া অন্যান্য সকল জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। এখনও মসজিদে নববীর পশ্চিম দিকে তা খোলা রয়েছে এবং সোনালী অক্ষরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে নির্দেশ লেখা রয়েছে। এ ভাষণে আনসারদের সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন, 'আমি তোমাদের, আনসার সাহাবার সংগে সদ্ব্যবহার এবং শিষ্টাচার প্রদর্শনের জন্য ওসিয়ত করছি। তাদের পুণ্যবানদের খেদমত করবে এবং অন্যান্যদের ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবে।'

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৭ ওয়াক্ত নামায জামাতে পড়তে পারেননি। একাকী ঘরে নামায পড়েছেন। এ তিন দিনের মধ্যে একদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য সুস্থতা বোধ করেন। তখন দু'জনের সহায়তায় মসজিদে এসে নামায আদায় করেন। পা মোবারক টেনে টেনে মসজিদে আসার কারণে মসজিদে নববীতে কদম মোবারকের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল।

আবু বকর নামায পড়াচ্ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতারে গিয়ে পৌঁছেন এবং আবু বকরের পাশে বসে যান এবং জামায়াতে নামায আদায় করেন। সে তিন দিনের শেষদিন সোমবার ছিল। এটাই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের শেষ দিন। ফজরের নামাযের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরা শরীফের পর্দা সরালেন। সে সময় হযরত আবু বকর (রা.) নামাযের ইমামতি করছিলেন। মুসলমান জনতা তার পিছনে নামায আদায় করছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন এবং মুচকি হাঁসলেন। অতঃপর পর্দা ফেলে দেন। এদিনেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবী ত্যাগ করেন। ইন্তিকালের তিন দিন আগে মালাকুল মউত [আজরাঈল (আ.)] বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হন এবং রূহ মোবারক কবয করার অনুমতি চান। আজরাঈল (আ.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'আপনার অনুমতি হলে জান কবয করতে পারি।' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দেন। এর তিন দিন পর এসে আজরাইল (আ.) রূহ মোবারক কবয করে নিয়ে যান।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ই রবিউল আউয়াল ইন্তিকাল করেন। দিনটি ছিল সোমবার। ইন্তিকালের সময় ছিল দ্বিপ্রহরের পরে। এ বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ৬৩ বছর। এ বছর মুসলমানরা হযরত আবু বকরের (রা.) হাতে খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করে। ১১ হিজরীর ১২ ই রবিউল আউয়াল এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) রমযানের তিন তারিখে ইন্তিকাল করেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ২৯ বছর। এ বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচারিকা এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত দাসী হযরত উম্মে আইমন হাবশিয়া (রা.) ইন্তিকাল করেন। তার ওফাত হয় বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের পাঁচ অথবা ছ'মাস পরে। তিনি ইসলামের প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রথমে হাবশার দিকে অতঃপর মদীনায় হিজরত করেন। এ বছর উমামার যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে হযরত আবু বকর (রা.) এর পক্ষ থেকে মুসলিম সৈন্যদের সেনাপতি ছিলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা.)। মহান আল্লাহ নিজ দয়া এবং সাহায্যে তাঁকে বিজয়ী করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00