📄 ১০ম হিজরী
দশম হিজরী (৬৩১ খ্রীষ্টাব্দ) : দশম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্ব আদায় করেন যা বিদায় হজ্ব নামে খ্যাত। এ হজ্বের আরও কয়েকটি নাম রয়েছে। যথা: হিজ্জাতুল ইসলাম, হিজ্জাতুল বালাগ, হিজ্জাতুল তামাম, হিজ্জাতুল কামাল। হিজরতের পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র এ হজ্জই করেছিলেন। এ হজ্জের সংগে ওমরাহও পালন করেছিলেন যা মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিখ্যাত সর্বমোট চারটি ওমরার মধ্যে একটি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৫ যিলকুদ শনিবার যুহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময়ে মদীনা শরীফ থেকে রওনা করেন।
মদীনা শরীফে যুহরের নামায চার রাকাত আদায় করেন। যুল হুলাইফায় পৌঁছে আসর দু'রাকাত (কসর) আদায় করেন। মদীনা শরীফে আবু দুজানা আনসারী আসসায়ীদি (রা.) কে অথবা সেবা ইবনে আরফাতা আল গিফারীকে (রা.) নিজের প্রতিনিধি করে যান। ৪র্থ যিলহজ্ব শনিবার সকালবেলা মক্কায় পৌঁছেন। ওকুফে আরাফাত জুমু'আ বারে (শুক্রবার) হয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার আশে পাশে ঘোষণা করেন যে, তিনি হজ্বে যাচ্ছেন। ঘোষণা শুনে চতুর্দিক থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে লোকজনের ঢল নামে। এমনভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে সাহাবীদের যারা মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজার। মক্কা শরীফে যারা বাস করতেন তাদের সংখ্যা আলাদা। তাছাড়া আরও অনেকেই এসেছিলেন হযরত আলী (রা.) এবং হযরত আবু মূসার (রা.) নেতৃত্বে ইয়ামেন থেকে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীর এক শত উট নিয়ে গিয়েছিলেন। ইহরাম খোলার দিন নিজ হাতে ৬৩ টি উট কুরবানী করান। এ সংখ্যা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়সের সংখ্যার অনুপাত। বাকী উটগুলো কুরবানী করার জন্য হযরত আলী (রা.) কে নির্দেশ দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুল হুলাইফা থেকে ইফরাদ হজ্বের নিয়ত করেন। যুল হুলাইফার কাছে ওয়াদিয়ে আক্বীকে যখন পৌছেন তখন জিব্রাঈল (আ.) হাজির হন এবং বলেন, 'এ বরকতময় মাসে দু'রাকাত নামায আদায় করুন। তাছাড়া আপনি বলুন, হজ্ব এবং ওমরার নিয়ত করলাম।' ফলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্বের সাথে ওমরার ইহরামও বাঁধেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যুল হুলাইফায় অবস্থান করছিলেন তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর স্ত্রী হযরত আসমা বিনতে ওমায়ের গর্ভবতী ছিলেন। সময় আসন্ন ছিল। সেখানেই মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের জন্ম হয়। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে জানতে চাইলেন যে, এখন কি করতে হবে? মহানবী উত্তর দেন, 'গোসল করে কাপড় পাল্টে নিয়ে ইহরাম বেঁধে ফেল।'
বিদায় হজ্জের সফরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবওয়া এবং উদ্দান পৌঁছেন তখন সায়ব ইবনে জুনামা আললাইসী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জীবিত খরগোস হাদিয়া হিসেবে পেশ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কবুল করেননি। একই বছর বিদায় হজ্বের সফরকালে 'ইহাই জামাল' নামক স্থানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় সিংগা লাগান। তখন তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। রোযাও রেখেছিলেন (বুখারী শরীফ)। 'ইহাই জামাল' মদনা ও মক্কার মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। ইহা মদীনার অধিক নিকটবর্তী। এতে বোঝা যায় রোযাদারের জন্য সিংগা লাগানো যা পূর্বে নিষিদ্ধ ছিল, তা পরে রহিত হয়ে গেছে। (সে সময়কার Minor Operation কে সিংগা বলা হত। এতে চিকিৎসার খাতিরে দেহ থেকে দূষিত রক্তক্ষরণ করা হত)।
বিদায় হজ্জের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে হযরত ফাতিমা (রা.) এবং মুসলিম জননীগণও ছিলেন। মক্কা পৌছে ওমরার তোয়াফ এবং সায়ী শেষ করে হযরত আয়িশা (রা.) ছাড়া সকলেই ইহরাম খুলে ফেলেন। হযরত আয়িশার (রা.) মক্কায় প্রবেশ করার আগে সারিফ নামক স্থানে ঋতু বা মাসিক শুরু হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন ওমরাহকে হজ্জে রূপান্তরিত করে ফেলেন। (অর্থাৎ ওমরার ইহরাম ভেংগে হজ্জের এহরাম বেঁধে নেন)। তিনি তাই করেন এবং হজ্জের ইহরামের উপর কায়েম থাকেন। হজ্জ শেষ করে তিনি ইহরাম খুলেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন লোকজন ওমরাহ এবং হজ্জ নিয়ে বাড়িতে ফিরবে অথচ আমি কেবল হজ্জ নিয়ে ফিরব! একথা শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকরকে সংগে নিয়ে তানয়ীম থেকে বদলা ওমরাহ করান।
বিদায় হজ্জের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী ক্বাসওয়ার উপর আরোহণ করে ওকুফে আরাফা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতের মাঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তাতে গুরুত্বপূর্ণ আহকাম এবং শরীয়তের অনেক জরুরী বিষয়াবলীর উল্লেখ করেন। এ বক্তব্যে ঘোষণা করেন যে, জাহেলিয়াতের সকল খুন মুওকুফ করা হল। সুতরাং জাহেলিয়াতের যুগে যদি কোন ব্যক্তি নিহত হয়ে থাকে তবে ভবিষ্যতে সে খুনের দাবী করতে পারবে না। জাহেলিয়াতের সকল সুদ মওকুফ করা হল। অতএব, সর্বপ্রথম আমি আমার চাচাত ভাই রবীয়া ইবনে হারিসের খুনের দাবী মওকুফ করছি এবং সর্বপ্রথম আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদও মওকুফ করে দিলাম। আরাফাতের ময়দানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহর এবং আসরের নামায এক আযান এবং দু'ইকামতসহকারে (যুহরের সময় কসর) আদায় করেন। এ দিন সন্ধ্যায় মুযদালিফাতে মাগরিব এবং এশা এক আযান এবং এক ইকামতের সাথে (এশার সময়) আদায় করেন।
৯ই যিলহজ্ব আরাফাতে খুৎবা দানকালে আলকুরআনের বিশেষ আয়াত নাযিল হয়। 'আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম। আর আমি তোমাদের প্রতি আমার দান পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের দ্বীন হিসেবে ইসলামকেই পছন্দ করলাম' (সূরা মায়েদা-৩)। সূর্যাস্ত পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতে অবস্থান করেন। সূর্যাস্তের পরে মুযদালিফা রওনা হন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরাফাতে ছিলেন, তখন জনৈক ব্যক্তি এসে আরজ করেন, 'ইহরাম অবস্থায় কোন কোন কাপড় পরিধান করা যায়?' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'জামা সেলওয়ার, পাগড়ী, টুপী, মোজা পরিধান করা যাবে না। তাছাড়া এমন কাপড়ও পরা যাবে না, যা জাফরান দিয়ে রঙ্গীন করা হয়েছে এবং তাতে জাফরান লেগে আছে।' ওকুফে আরাফাতের সময় এক ব্যক্তি উটের উপর থেকে পড়ে যায়। এতে সে ঘাড় ভেংগে মারা যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'এ ব্যক্তির মুখ এবং মাথা কাফন দিয়ে ঢেকে দিও না। খুশবুও লাগাবে না। সে তালবিয়্যাহ পাঠ করতে করতে কিয়ামতের দিন উঠবে।' আরাফাত থেকে মুযদালিফা যাওয়ার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) কে পিছনে আরোহণ করিয়েছিলেন।
কুরবানীর দিন সকাল বেলা ওকুফে মুযদালিফা করেছিলেন এবং এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। খুতবা শেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফা থেকে মিনা রওনা করেন। সেখানে গিয়ে জুমরায়ে উকবার রমী করেন। মুযদালিফা থেকে মিনা আসার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযল ইবনে আব্বাস (রা.) কে নিজের পিছনে আরোহণ করান।
ফযল ইবনে আব্বাস যখন মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনে সাওয়ার ছিলেন তখন কাবিলায়ে খাসয়ামের এক মহিলা মহানবীর খেদমতে হাজির হলেন এবং আরজ করেন, 'আমার পিতার উপর এ অবস্থায় হজ্ব ফরয হয়েছে যে, তিনি এতই বৃদ্ধ যে, যানবাহনে আরোহণ করতে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ (বদলা) এবং ওমরাহ পালন করতে পারি?' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, তোমার বাবার পক্ষ থেকে তুমি হজ্জ এবং ওমরাহ পালন কর।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমরায়ে উকবায় পাথর নিক্ষেপ শেষে এক গুরুত্বপূর্ণ খুতবা দেন। উক্ত খুতবায় ইরশাদ করেন, 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত, আবরু পরস্পরের জন্য এমনই সম্মানিত, যেভাবে আজকের এদিন, সম্মানিত এ মাস, এ শহর হারাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, 'যামানা ঘুরে সে অবস্থায় ফিরে এসেছে, যেভাবে সেদিন মহান আল্লাহ আসমান যমীন সৃষ্টি করেছিলেন। যামানা ঘুরে এসেছে এ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বলেছিলেন অর্থাৎ জাহেলিয়াতের যুগে এমন নিয়ম ছিল যে; তারা নিজেদের স্বার্থের কারণে মাসগুলোকে আগে পিছে করে দিত। কাজেই যেসব ইবাদত বিশেষ মাসে করা হত যেমন হজ্জ বা যিলহজ্ব মাসের বিশেষ তারিখের সাথে সংশ্লিষ্ট, তারা এটাকে কখনো যিলকুদ কখনো বা মুহাররম মাসে নিয়ে যেত। কখনো আবার নির্দিষ্ট তারিখ মত রেখে দিত। যেমন বিদায় হজ্জটি ঠিক সময় মতই হয়েছিল। স্বার্থের কারণে মাসসমূহকে আগে পিছে করার জাহেলী প্রথা চিরদিনের তরে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে অর্থাৎ যামানা ঘুরে ফিরে তার আসল স্থানে অবস্থান নিল। কিয়ামত পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম হবে না।
কুরবানী শেষে, চুল কেঁটে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। যুহরের সময় ফরয তোয়াফ (তোয়াফে যিয়ারত) আদায় করেন। অতঃপর জমজম কূপের কাছে যান এবং পানি পান করেন। অতঃপর মিনা ফিরে যান। সেখানে তিন দিন অবস্থান করেন। প্রতিটি জুমারাতে কংকর নিক্ষেপ করেন। এ ছিল রবি, সোম এবং মঙ্গলবার। মঙ্গলবারে মিনা থেকে গিয়ে বিদায়ী তোয়াফ করেন। অতঃপর মক্কা থেকে বিদায় নিয়ে মদীনার পথে রওনা করেন।
বিদায় হজ্জের সময় একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে একটি শিশুকে তার জন্মের দিনেই নিয়ে আসা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবজাত শিশুকে জিজ্ঞেস করেন, 'বল তো আমি কে?' এক দিনের শিশু উত্তর দেয়, 'আপনি আল্লাহর রাসূল।' মহানবী বলেন, 'তুমি সত্যি বলেছ। আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন।' এরপর থেকে শিশুটি পূর্ণবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত আর কথা বলেনি। তার নাম ছিল ইয়ামামাহ। বিদায় হজ্জে যখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতের রাত্রিতে মিনায় অবস্থান করছিলেন, তখন মিনার মসজিদে খাইফের পাশে একটি গুহায় ওয়াল মুরসালাত সূরা নাযিল হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সম্মুখে সদ্য নাযিলকৃত সূরাটি তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন। তখন বিশ্বনবীর তিলাওয়াত শুনার জন্য একটি সাপ এসে উপস্থিত হয়। সাহাবাগণ তাকে মারার জন্য দৌড়ে যান কিন্তু সে অদৃশ্য হয়ে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, 'সে তোমাদের অনিষ্ট থেকে বেঁচে গেছে, যেভাবে তোমরা তার অনিষ্ট থেকে বেঁচে গেছ।'
বিদায় হজ্জ থেকে ফিরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুহফার গদীরেখম নামক স্থানে পৌছেন। সেখানে যুহরের নামায আদায় করেন। নামাযের পরে খুতবা দেন। তাতে বলেন, 'আল্লাহ আমার মাওলা, আমার সহায়। আর আমি সকল মুমিনের মাওলা অর্থাৎ প্রিয়পাত্র।' অতঃপর হযরত আলীর (রা.) হাত ধরে বলেন, 'আমি যার বন্ধু, আলীও তার বন্ধু। আয় আল্লাহ! তার সংগে যে বন্ধুত্ব করে, তুমিও তার সংগে বন্ধুত্ব কর। আর যে ব্যক্তি তার সংগে শত্রুতা পোষণ করে, তুমিও তার সংগে শত্রুতা পোষণ কর। যে তাকে সাহায্য করবে না, তুমিও তাকে অসহায় করে দিও। আলী যেখানেই থাকবে, সত্য তার সাথী করে দিও।'
বিদায় হজ্জ শেষে মদীনা ফিরে আসার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সেনান আনসারী (রা.) নামের এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তুমি এবার কেন আমাদের সংগে হজ্জ করতে গেলে না?' তিনি বলেন, 'হজ্জে যাওয়ার মত আরোহী আমার ছিল না।' মহানবী বলেন, 'তাহলে রমযানে ওমরাহ পালন করে নিও। কারণ রমযানের ওমরাহ হজ্জের সমান।' বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাসী রাইহানা (রা.) ইন্তিকাল করেন। সে বিদায় হজ্জে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ছিলেন। তিনি মদীনায় এসে ইন্তিকাল করেন। জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়।
এ বছর মুসাইলামাতুল কাযযাব তার গোত্র বনু খলীফার চৌদ্দজনের একটি দল নিয়ে ইয়ামামাহ থেকে মদীনায় আসে। তার দলের লোকেরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু মুসাইলামা ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। সে বলতে থাকে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তার পরবর্তীতে আমাকে খিলাফত দিয়ে যান, তবে আমি মুসলমান হব। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে যান। সে সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে খেজুরের একটি ডাল ছিল। উক্ত ডালের প্রতি ইংগিত করে বিশ্বনবী বলেন, 'তুই যদি আমার কাছে এ ধরনের একটি খেজুরের ডালও দাবী করিস, তবে আমি তাও দেব না। আর তুই তোর সীমানা থেকে এগিয়েও যেতে পারবি না।' এক বর্ণনা মতে, সে ইসলাম গ্রহণ করার পর মুর্তাদ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর খেলাফতকালে ১১ হিজরীতে সে নিহত হয়। জানা যায় যে, সে বেশকিছু অমঙ্গল ও খারাপ ধরনের অলৌকিক কা রপ্ত করেছিল। সে কারও জন্য দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করলে ঐ ব্যক্তি অন্ধ হয়ে যেত। একবার পানির মধ্যে বরকতের জন্য কূপের ভিতর থুথু নিক্ষেপ করলে সংগে সংগে কূপের সব পানি শুকিয়ে যায়। একবার জনৈক চক্ষুষ্মান ব্যক্তির ভাল চোখে তার মুখের লালা লাগালে, সে ব্যক্তি তখনই অন্ধ হয়ে যায়। কোন ছাগলের স্তনে সে হাত লাগালে ঐ ছাগলের দুধ শুকিয়ে যেত। সে এক ছেলের মাথায় হাত বুলালে ছেলেটির মাথায় টাক পড়ে যায়। জনৈক ব্যক্তির দুই সন্তানের জন্য সে দীর্ঘায়ু কামনা করলে তার একটি ছেলে বাড়িতে গিয়ে কূপে পড়ে মারা যায়। অপর ছেলেকে বাঘে খেয়ে ফেলে। মুসাইলামা এমনই অভিশাপপ্রাপ্ত ছিল। ফলে লোকেরা তাকে ভয় করত।
এ হিজরীতে ইয়েমান দেশে আসওয়াদ ইবনে কাব ইবনে আলয়ানী নামের এক মিথ্যাবাদী নবী আত্মপ্রকাশ করে। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে নবুওয়াতের দাবী করেছিল। বিদায় হজ্জের পর সে আত্মপ্রকাশ করে। আসওয়াদের নাম ছিল আবহালা ইবনে কাব। তার উপাধি ছিল যুরখেমারীল আসওয়াদ। কারণ সে সর্বদা কালো ওড়না দিয়ে তার চেহারা ঢেকে রাখত। কেউ কেউ বলেছেন যে, তার উপাধি ছিল যুলহেমার। তার কাছে একটি কালো গাধা ছিল। সে ঐ গাধাকে এমন প্রশিক্ষণ দিয়ে ছিল যে, গাধাটি তাকে সিজদা করত।
এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজরানের বাদশাহর নামে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র লিখেন। নাজরান হল মক্কা থেকে সাতদিনের পথ ইয়ামানের একটি বড় শহরের নাম। এর অধীনে কয়েকটি বস্তি এবং খামার ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্র পেয়ে চব্বিশ জন, লোকের একটি প্রতিনিধি দল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হয়। এ দলের মাঝে ছিল আকীব। যার আসল নাম আব্দু মাসীহ। আকিব তার উপাধি ছিল। সূরা আল ইমরানের প্রারম্ভিক কয়েকটি আয়াত তার সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে আলাপ আলোচনা এবং বাহাস বা বিতর্ক করেন। এ সময় মুবাহালার আয়াত নাযিল হয়।
'মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে মুবাহালার দাওয়াত দেন। ফলে তারা নীরব হয়ে যায়। পরে এ শর্তে সন্ধিতে আবদ্ধ হয় যে, তারা দু'হাজার সেট কাপড় (প্রতি জোড়া চল্লিশ দিরহাম মূল্যমানের), এক উকিয়া করে গম, ত্রিশটি ঘোড়া, ত্রিশটি উট, ত্রিশ খানা লৌহবর্ম, ত্রিশটি বল্লম, প্রতি বছর ট্যাক্সস্বরূপ আদায় করবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করতঃ সন্ধি পত্র লিখে দেন। মোটকথা, তারা ইসলাম থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।
এ বছর বাজান ইবনে সাসান ইন্তিকাল করেন। সে ছিল বাহরামের বংশধর। বাহরাম ছিল সাসানের বাদশাহ। বাজান ছিল কেসরার পক্ষ থেকে ইয়ামানের গভর্নর। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে কেসরার পারভেজের মৃত্যু হয়, তিনি ইয়ামানে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দেয়া হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামানের গভর্নর পদে বহাল রাখেন। তিনি ছিলেন ইয়ামানের মুসলমানের প্রথম গভর্নর। আজমী বাদশাহগণের মধ্যে তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ১০ম হিজরীর রবিউল আউয়ালে, মতান্তরে নবম হিজরীর শেষ ভাগে তাবুক থেকে ফেরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়াজ ইবনে জাবাল (রা.) এবং আবু মূসা আশয়ারী (রা.) কে ইয়ামান পাঠান। এ সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, 'সহজ পন্থা অবলম্বন করবে, কঠিন করবে না। সুসংবাদ দিবে, ঘৃণা জন্মাবে না।' উভয়কে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। মায়াজ ইবনে জাবাল (রা.) কে যখন ইয়ামানে পাঠান; তখন তাকে বিদায় জানাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে যান। তাকে তখন দ্বীন এবং শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অনেক উপদেশ প্রদান করেন। এ সময় হযরত মায়াজ আরোহী ছিলেন। আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সংগে হেঁটে হেঁটে চলছিলেন। তিনি আরজ করেন, 'হে নবী' সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি পায়ে হেঁটে চলছেন, অথচ আমি সওয়ার অবস্থায়! অনুমতি প্রদান করুন, আমিও নেমে পড়ি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, 'এ পায়ে হেঁটে চলাকে আমি আল্লাহর রাস্তায় চলা হিসেবে গণ্য করি।' এ জন্যেই পায়ে হেঁটে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সর্বোত্তম। আজও পায়দাল জামাতের মর্তবা অনেক।
রমযান মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী ইবনে আবু তালিবকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে ইয়ামান পাঠান। তারা হযরত আলী (রা.) এর দাওয়াত কবুল করে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে তিনি সেখানে অবস্থান করে তাদেরকে কুরআন এবং দ্বীনের জরুরী বিষয়ে শিক্ষা দিতে থাকেন।
অবশেষে বিদায় হজ্বের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তলব করে মদীনায় নিয়ে আসেন। তিনি মদীনায় এসে বিদায় হজ্বের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সফর সংগী হন। এমনিভাবে হযরত আবু মূসা (রা.) ও মায়াজ (রা.) ইয়ামানে থেকে যান। এ বছর সা'দ ইবনে খাওলা আমেরীর (রা.) ইন্তিকাল হয়। তিনি ছিলেন বনু আমির ইবনে লুয়াই এর অন্তর্ভুক্ত। কেউ কেউ বলছেন যে, তিনি এ কাবিলার মিত্র ছিলেন। তাছাড়া তিনি সুরাইয়া বিনতে হারিছ আল আস লামিয়ার স্বামী। তিনি মক্কায় ইন্তিকাল করায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। কারণ তিনি মদীনায় হিজরতকারীদের মধ্যে একজন মুহাজির ছিলেন। মুহাজির ব্যক্তির জন্য পুনরায় মদীনায় যাওয়ার অনুমতি ছিল না। এতে করে হিজরত বাতিল হয়ে যেত। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর ইন্তিকালের পনের বিশ দিন পরে সন্তান প্রসব করেন। তখন তার ইদ্দত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন যে, সন্তান প্রসব হওয়ার কারণে তার ইদ্দত খতম হয়ে গিয়েছিল। আবার কেউ কেউ বলেছিল, ইদ্দত খতম হয়নি। তাকে চার মাস দশ দিন অতিবাহিত করতে হবে। সুরাইয়া বিষয়টি মহানবীর খেদমতে পেশ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সন্তান প্রসব করায় তোমার ইদ্দত খতম হয়ে গেছে। যেখানে ইচ্ছে বিয়ে করতে পার।'
এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল বাজালী (রা.) কে জুলকিলা এর নিকট পাঠান। সে ছিল ইয়ামান এবং তায়েফের নেতৃবৃন্দের অন্যতম। তার উচ্চাভিলাস এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, সে নিজেকে খোদা বলে দাবী করে ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্র পাওয়ার পর সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ মেনে নেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হওয়ার জন্য রওনা করেন। পথিমধ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের খবর পৌঁছে। হযরত জারীর (রা.) মদীনায় চলে আসেন এবং যুলকিলা তার বাড়িতে ফিরে যায়। সে বাড়িতে অবস্থান করতে থাকে। অবশেষে হযরত ওমর (রা.) এর খিলাফতকালে তার কাছে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। সে সময় বার হাজার গোলাম সাথে করে নিয়ে খলিফার দরবারে হাজির হয়েছিলেন। তন্মধ্যে চার হাজার আজাদ করে দেন। হযরত ওমর (রা.) বলেন, 'অবশিষ্ট সকল গোলাম আমার কাছে বিক্রি করে দাও।' সে বলেছিল, 'বিক্রি করব না। বরং আল্লাহর ওয়াস্তে আজাদ করে দিলাম।'
এ বছর বিদায় হজ্বের পূর্বে হযরত আলী (রা.) যখন দ্বিতীয় বার ইয়ামান গিয়েছিলেন তখন সেখানে একটি আশ্চর্য দুর্ঘটনা ঘটে যায়। কিছুলোক আসওয়াদে আনাসীকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একটি কূপ খনন করে। অথচ কূপটি গোপন রাখার উদ্দেশ্যে উপর থেকে ঢেকে রাখে। সে কূপে একটি বাঘ পড়ে যায়। বাঘ দেখার জন্য লোকজন জড় হলে এক ব্যক্তি তাতে পড়ে যায়। পড়ার সময় সে অপর এক ব্যক্তিকে ধরে তাকেও কূপের ভিতর ফেলে দেয়। দ্বিতীয় ব্যক্তি তৃতীয় এক ব্যক্তিকে ধরলে সেও কূপে পড়ে যায়। তৃতীয় ব্যক্তি চতুর্থ ব্যক্তিকে ধরে। ফলে সেও কূপে পড়ে যায়। বাঘ চারজনকেই মেরে ফেলে। আর এক ব্যক্তি বল্লম নিক্ষেপ করে বাঘটিকে মেরে ফেলে। অবশেষে নিহত চার ব্যক্তির ওয়রিসগণ হযরত আলী (রা.) এর আদালতে মোকাদ্দমা দায়ের করেন। হযরত আলী (রা.) বলেন, 'তোমাদের জন্য কূপ খননকারীদের যিম্মায় এক চতুর্থাংশ খেসারত, এক তৃতীয়াংশ খেসারত পাবে দ্বিতীয় ব্যক্তি কারণ তার উপর তিন ব্যক্তি মরেছে। অর্ধেক খেসারত পাবে তৃতীয় ব্যক্তি, কারণ তার উপর দু'ব্যক্তি পড়ে মারা গেছে এবং চতুর্থ ব্যক্তি পাবে পূর্ণ খেসারত। অন্যথায় মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যেতে পার। তারা ফায়সালা মেনে নিলেন না, বরং মামলাটি নিয়ে মদীনা তৈয়িবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গেলেন। সেখানে গিয়ে দুর্ঘটনার বিবরণ দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এর ফায়সালা করে দিব ইনশাআল্লাহ।' তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! হযরত আলী (রা.) উক্ত ঘটনার বিচার ফায়সালা করে দিয়েছেন।' মহানবী জিজ্ঞেস করেন, 'কিভাবে?' ফায়সালার কথা বলা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে বলেন, 'হযরত আলী যে ফায়সালা করেছে, ব্যাস, এই তো ফায়সালা।' এতে আলীর (রা.) প্রতি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠে। আলীর (রা.) বিচারের প্রতি বিশ্বনবীর সমর্থন মিলল।
ফারওযা ইবনে ওমর আল জোজামী এ বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি রোম সম্রাটের পক্ষ থেকে সিরিয়াতে বাক্কার কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের ইসলাম গ্রহণ করার খবর লিখে পত্র পাঠান। পত্রের সংগে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রেরণ করেন। দশম হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। যখন সালমান প্রতিনিধি দলের লোকজন তাঁর কাছে হাজির হন। তারা অনাবৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেন, 'আয় আল্লাহ! তাদের এলাকায় বৃষ্টি বর্ষণ করুন।' তারা বাড়ী ফিরে এসে জানতে পান যে, বৃষ্টি হয়েছে। আরও জানতে পান যে, রাতে যে সময়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্য দোয়া করেছিলেন, ঠিক সে সময়েই বৃষ্টি হয়েছিল। এ বছর হামদানের প্রতিনিধি দল আসে। তাবুক থেকে ফিরে আসার পর তাদের আগমন হয়। তারা ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মালিককে (রা.) তাদের আমীর নিযুক্ত করেন। এ বছর যুবায়েদ গোত্রের প্রতিনিধিবৃন্দ বিশ্বনবীর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে আমর ইবনে মা'দিকারও (রা.) ছিলেন। কারো কারো মতে, এ বছর আব্দুল কয়েসের (রা.) প্রতিনিধিবৃন্দ হাজির হয়েছিলেন। এ বছর কাবিলায়ে কুন্দার ষাট অথবা আশিজন অশ্বারোহী প্রতিনিধি দল মহানবীর দরবারে হাজির হন। তাদের মধ্যে আশয়াম ইবনে কয়েস আল কুন্দী এবং প্রখ্যাত কবি ইমরাউল কয়েস ইবনে আবিস আল কুন্দীও (রা.) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সকলেই ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন। অতঃপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকালের পর আশয়াম ইবনে কয়েস মুর্তাদ হয়ে যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে বন্দী করেন। তিনি দ্বিতীয়বার ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের উপর অটল থাকেন। এ বছর ইয়ামামা থেকে বনু হানফিয়ার প্রতিনিধি দল হাজির হন। তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর। তাদের মধ্যে মিথ্যাবাদী মুসাইলামাও ছিল। সে ছাড়া অন্যান্য সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। সেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল বলে কেউ কেউ উক্তি করেন। তবে পরে সে নবুওয়াতের দাবী করে মুর্তাদ হয়ে যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর খেলাফতকালে মুসাইলামা কুফরীর অবস্থায় নিহত হয়।
এ বছর কিংবা ১১ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) কে যুল খালাছা নামক মূর্তি ধ্বংসের অভিযানে প্রেরণ করেন। এ বছর বনু আরস প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। তারা ছিলেন সাত জন। আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তারা কোন কোন লোকের মুখে শুনতে পেলেন যে, যে ব্যক্তি হিজরত করবে না, তার ইসলাম গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হিজরত না করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অনুমতি দিয়ে বলেন, 'তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহকে ভয় করে চলবে। তোমাদের আমলে কোন কমতি (কম) হবে না। এ বছর শা'বান মাসে খাওলান প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। এটি ছিল ইয়ামানের এক কাবিলা। ১০ সদস্যের এ দলটি ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে শিক্ষা দান করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিজ এলাকায় মূর্তি ভেংগে ফেলার নির্দেশ দেন। তারা ফিরে গিয়ে সেটা ভেংগে ফেলেন। এর আগে তারা নিজেদের সম্পদের এক অংশ আল্লাহর জন্য এবং এক অংশ মূর্তির জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিল। তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে, 'আল্লাহ যে ফসল এবং জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন তার কিছু অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করেছে এবং তাদের ধারণামতে বলে থাকে এটা আল্লাহর জন্য। আর এটা আমাদের প্রভুদের জন্য।' (সূরা আনআম-১৩৬)। এমন বলা বা করা হারাম ও গৃহিত কাজ। এ বছর ছা'ছা' গোত্রের প্রতিনিধি দল হাজির হয়। উক্ত দলে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও আমীর ইবনে তোফায়েল এবং আবেদ ইবনে রবিয়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ দু'ব্যক্তি গোপনে আকস্মিকভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শহীদ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে পৌঁছে; মহান আল্লাহ তাদের দুরভিসন্ধি এবং অনিষ্ট থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হিফাযত করেন এবং আল্লাহ তার নিজ কুদরতের দ্বারা তাদেরকে ধ্বংস করে দেন। আবেদকে আসমানী বজ্রপাতে ধ্বংস করে দেন। এবং আমীরের শরীরে মারাত্মক খোঁস-পাঁচড়া বের হয়। সে এ অবস্থায় ঘোড়ার উপর আরোহণ করে তার বাড়ির পথে পলায়ন করে। মহান আল্লাহ পথিমধ্যেই ঘোড়ার পিঠে তাকেও ধ্বংস করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন।
যুদাইল ইবনে আবি মারিয়া (রা.) যিনি ছিলেন আস ইবনে ওয়ায়িলের মুক্ত কৃত গোলাম। তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়াতে গিয়েছিলেন। তামীমে দারী এবং আদী আবদে বদদা তাদের সফর সংগী ছিলেন। তারা উভয়ই ছিলেন খ্রীষ্টান। এ সফরকালে যুদাইলের ইন্তিকাল হয়। তারা একটি গোপন ওসিয়ত নামা লিখে তাদের মালামাল নিয়ে আসেন। তাতে একখানা তরবারী কমতি ছিল। অর্থাৎ যা গোপন তালিকায় ছিল। এটা তামীম এবং আদী খেয়ানতের বশীভূত হয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের সম্পর্কে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে যখন কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন ওসিয়ত করার সময় তোমাদের মধ্য থেকে ধর্মপরায়ণ দু'জনকে সাক্ষী রেখো' (সূরা আল মায়েদা-১০৬)। অতএব, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের পরে এ দু'ব্যক্তির হলফ গ্রহণ করেন। অতঃপর যখন সে তরবারী মদীনা তৈয়িবায় বিক্রি হতে দেখা গেল, তখন এ দু'ব্যক্তির অসত্য বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া গেল। তখন মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসগণ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আদী এবং মুত্তালিব ইবনে আবি ওয়াদায়া হলফ উঠালেন। ফলে তাদেরকে তরবারীর হকদার ঘোষণা করা হয়। এ বছর হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ আল বাজানী (রা.) তার একশত পঞ্চাশ জন সাথী নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ভ্রাতাদের অনুমতি নিয়ে আসা উচিত।' এ বছর ১০ই রবিউল আউয়াল শনিবার মতান্তরে বিদায় হজ্ব থেকে ফিরে আসার পর যিলহজ্ব মাসের শেষ দিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহীম (রা.) ইন্তিকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ১৮ মাস, মতান্তরে ২৪ মাস। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহীমের ওফাতের দিনে সূর্য গ্রহণ হয়েছিল। লোকজন বলতে শুরু করে, ছেলে ইব্রাহীমের ইন্তিকালের কারণে সূর্য গ্রহণ হয়েছে।' এ ধরনের মন্তব্য শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভাষণ দান করেন। তাতে ইরশাদ করেন, 'সূর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্য থেকে দু'টি নিদর্শন। এগুলো কারও জন্ম বা মৃত্যুর কারণে আলোবিহীন হয় না।'
📄 ১১তম হিজরী
একাদশ হিজরীর মুহাররম মাসে অথবা রজব মাসের মাঝামাঝি ইয়ামানের 'নাখা'র প্রতিনিধি দল বিশ্বনবীর খেদমতে হাজির হন। এটি ছিল সর্বশেষ প্রতিনিধি দল যারা দরবারে নববীতে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। উক্ত দলে একশত সদস্য ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদের জানাযার নামায আদায় করেন। তাদের জন্য দোয়া এবং ইস্তেগফার করেন। অথচ তাদের শাহাদাতের আট বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন অর্ধরাতে (আযাদকৃত গোলাম) আবু মুয়াইহিবকে সাথে নিয়ে জান্নাতুল বাকীর দিকে গমন করেন। মুক্ত গোলামকে বলেন, 'আমার সংগে চল। আমাকে বাকীবাসীর জন্য মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।' জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে, দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতে থাকেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমাকে দুনিয়ার খাজানা (ধন ভাণ্ডার) পেশ করা হয়েছে এবং নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আমি কি পৃথিবীতে থাকতে চাই অথবা চির সুখময় জান্নাতে গিয়ে আমার আল্লাহর সংগে সাক্ষাৎ করতে চাই? আমি জান্নাতে যাওয়াকে গ্রহণ করে নিয়েছি।'
এ বছর সফর মাসের ৩০ তারিখ বুধবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। রোগের সূচনা হয় হযরত মায়মুনার ঘর থেকে। অসুস্থ থাকার সময়সীমা তেরো দিন পর্যন্ত ছিল। রোগাক্রান্ত হওয়ার এ সময়ে একদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহ ইহুদীদের প্রতি অভিশাপ করেছেন, তারা তাদের নবীগণের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়ে নিয়েছে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ অবস্থায় আরও বলেছিলেন, 'সাবধান নামাযের পাবন্দী এবং অধীনস্থদের সংগে সদ্ব্যবহার করবে।' অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) জন্য খিলাফতের (নিয়োগ) পত্র লিখার ইচ্ছা করেন। যাতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে লোকজন মতবিরোধ না করেন। এ হচ্ছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের মাত্র পাঁচদিন আগের ঘটনা। এ দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোগের মাত্রা ছিল অত্যধিক। অত্যধিক অসুস্থতা দেখে হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, 'মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লিখে দেয়ার কষ্ট দিবেন না। আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।' এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লিখার ইচ্ছা ত্যাগ করেন এবং বলেন, 'আল্লাহ এবং মুমিনরা আবু বকর ছাড়া অন্য কাউকেই গ্রহণ করবে না' (বুখারী এবং মুসলিম)। শিয়া সম্প্রদায় দাবী করেন যে, খিলাফতের পত্র হযরত আলী (রা.) জন্য লেখা হচ্ছিল, অথচ শিয়া সম্প্রদায়ের এ দাবী মনগড়া বাতিল কল্পনা মাত্র। হাদীসের কোন কিতাবে এর কোন প্রামাণ নেই। এ সংগে বিশুদ্ধ বা হাসান হাদীস দূরের কথা কোন যায়ীফ বর্ণনাও পাওয়া যায় না। যায় না। এটা তাদের মনগড়া আবিষ্কার মাত্র। অতএব, এটা অগ্রহণযোগ্য বা অবিশ্বাসযোগ্য।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের (মুমিনদের মাতাদের) নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন যে, অসুস্থতার অবশিষ্ট দিনগুলো হযরত আয়িশা (রা.) এর ঘরে অবস্থান করার জন্য। সকল স্ত্রীরা খুশি হয়ে অনুমতি প্রদান করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়ালের ৫ তারিখ শনিবার হযরত আয়িশা (রা.) এর গৃহে চলে আসেন। এটা তাঁর নিধারিত (পালার) দিনও ছিল। অতঃপর ৮ দিন পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে অবস্থান করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এখান থেকে অন্যত্র যাননি এবং আজ পর্যন্ত এখানেই আছেন। ৮ই রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে তাশরীফ নিলেন। অপারগতার কারণে বসে বসে খুতবা দেন, তাতে উম্মাহর প্রয়োজনীয় বিষয়ে নসীহত উপদেশ ছিল। দাওয়াত ও তাবলীগের উপর জোর দেন। খুতবার মধ্যে ইরশাদ ফরমান, 'আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে এখতিয়ার দিয়েছেন যে, তিনি পৃথিবীতে থাকতে চান অথবা আখেরাতের স্থায়ী জগতে চলে যেতে চান। তিনি আল্লাহর কাছে যাওয়ার বিষয় গ্রহণ করে নিয়েছেন।' হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা.) বলেন, 'বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাটির মর্ম একমাত্র আবু বকর (রা.) ব্যতিত আমরা কেহই উপলব্ধি করতে পারিনি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনে হযরত আবু বাকর (রা.) কেঁদে উঠেন। প্রকৃতপক্ষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথাই বলছিলেন এবং হযরত আবু বকর (রা.) আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলিম ও তত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন। এ খুতবায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, 'আবু বকর ব্যতিত অন্য সকলের জানালা যেগুলো মসজিদের দিকে খোলা হয়, সব বন্ধ করে দাও।' ফলে আবু বকরের জানালা ছাড়া অন্যান্য সকল জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। এখনও মসজিদে নববীর পশ্চিম দিকে তা খোলা রয়েছে এবং সোনালী অক্ষরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে নির্দেশ লেখা রয়েছে। এ ভাষণে আনসারদের সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন, 'আমি তোমাদের, আনসার সাহাবার সংগে সদ্ব্যবহার এবং শিষ্টাচার প্রদর্শনের জন্য ওসিয়ত করছি। তাদের পুণ্যবানদের খেদমত করবে এবং অন্যান্যদের ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবে।'
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৭ ওয়াক্ত নামায জামাতে পড়তে পারেননি। একাকী ঘরে নামায পড়েছেন। এ তিন দিনের মধ্যে একদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য সুস্থতা বোধ করেন। তখন দু'জনের সহায়তায় মসজিদে এসে নামায আদায় করেন। পা মোবারক টেনে টেনে মসজিদে আসার কারণে মসজিদে নববীতে কদম মোবারকের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল।
আবু বকর নামায পড়াচ্ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতারে গিয়ে পৌঁছেন এবং আবু বকরের পাশে বসে যান এবং জামায়াতে নামায আদায় করেন। সে তিন দিনের শেষদিন সোমবার ছিল। এটাই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনের শেষ দিন। ফজরের নামাযের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরা শরীফের পর্দা সরালেন। সে সময় হযরত আবু বকর (রা.) নামাযের ইমামতি করছিলেন। মুসলমান জনতা তার পিছনে নামায আদায় করছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন এবং মুচকি হাঁসলেন। অতঃপর পর্দা ফেলে দেন। এদিনেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবী ত্যাগ করেন। ইন্তিকালের তিন দিন আগে মালাকুল মউত [আজরাঈল (আ.)] বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হন এবং রূহ মোবারক কবয করার অনুমতি চান। আজরাঈল (আ.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'আপনার অনুমতি হলে জান কবয করতে পারি।' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দেন। এর তিন দিন পর এসে আজরাইল (আ.) রূহ মোবারক কবয করে নিয়ে যান।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ই রবিউল আউয়াল ইন্তিকাল করেন। দিনটি ছিল সোমবার। ইন্তিকালের সময় ছিল দ্বিপ্রহরের পরে। এ বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ৬৩ বছর। এ বছর মুসলমানরা হযরত আবু বকরের (রা.) হাতে খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করে। ১১ হিজরীর ১২ ই রবিউল আউয়াল এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) রমযানের তিন তারিখে ইন্তিকাল করেন। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ২৯ বছর। এ বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচারিকা এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আজাদকৃত দাসী হযরত উম্মে আইমন হাবশিয়া (রা.) ইন্তিকাল করেন। তার ওফাত হয় বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের পাঁচ অথবা ছ'মাস পরে। তিনি ইসলামের প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রথমে হাবশার দিকে অতঃপর মদীনায় হিজরত করেন। এ বছর উমামার যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে হযরত আবু বকর (রা.) এর পক্ষ থেকে মুসলিম সৈন্যদের সেনাপতি ছিলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা.)। মহান আল্লাহ নিজ দয়া এবং সাহায্যে তাঁকে বিজয়ী করেন।