📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৬ষ্ঠ হিজরী

📄 ৬ষ্ঠ হিজরী


৬ষ্ঠ হিজরী (৬২৭ খ্রীষ্টাব্দ) : ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়ার উদ্দেশ্যে যিলকদের ১ম তারিখ সোমবার মদীনা থেকে রওনা করেন এবং যুল হুলাইফায় এসে এহরাম বাঁধেন। মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে প্রায় পরেন শত সাহাবা ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এ সময় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে প্রতিনিধি করেন। সংগে নিয়ে আসেন কুরবানীর ৭০টি উট। উটের দায়িত্বে ছিলেন নাজিয়া ইবনে জুনদুব আসলাম (রা.)। তিনি বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে উটগুলো নিয়ে ছুটে যান। মহানবী যখন হুদাইবিয়ায় পৌঁছেন তখন মক্কার সব কাফির মিলে তাঁকে এগিয়ে যেতে নিষেধ করেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে চুল কাটান, হাদির উটগুলি কুরবানী করেন। মুসলমানরা কেউ এ বছর ওমরাহ পালন করতে পারেননি। পরবর্তী বছর সপ্তম হিজরীতে এর কাজা করেন। হুদাইবিয়ার সংগ্রাম শেষ করে মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তনের সময় আবু জানদাল (রা.) মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেদমতে হাজির হন। তাঁর আসল নাম হচ্ছে আস ইবনে সুহাইল ইবনে ওমর আল কুরশী। তিনি কিছুদিন পূর্বে মক্কার কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এর শাস্তিস্বরূপ তার পিতা তাকে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে মক্কা বিজয়ের দিন তার পিতাও ইসলাম গ্রহণ করেন।

সন্ধির সময় আরেক সাহাবী আবু বসীর হাজির হন। তার আসল নাম ছিল ওকবা ইবনে উসাইদ ইবনে জারিয়া ছাকাফী (রা.)। তিনি ছিলেন বনী জোহরার মিত্র। অনেক পূর্ব থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু বসীর এবং আবু জানদাল (রা.) মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আবার মক্কায় পাঠিয়ে দেন। কারণ হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তের মধ্যে ছিল যারা মুসলমান হয়ে মক্কা থেকে বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে যাবে, তাদেরকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। অতঃপর আবু জানদাল এবং আবু বসীর (রা.) মদীনা এবং সিরিয়ার মধ্যবর্তী এক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার যুদ্ধের পূর্বে হযরত খুফাফ ইবনে ইমা ইবনে রাহাযা আল গেফারী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নিজ কওম বনু গেফারের ইমাম ও খতীব ছিলেন। তিনি হুদাইবিয়া এবং বাইয়াতে রেযওয়ানে অংশগ্রহণ করেন। হযরত খুফাফ তার পিতা ইমা, তার দাদা রাহাযা (রা.) তিনজনই সাহাবী ছিলেন। এ হিজরীর রমযানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লোকজন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন: হজুর! বৃষ্টির জন্য দোয়া করুন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে কান্নাকাটা করার, বিনয় প্রকাশ করার এবং সদাকা করার নির্দেশ দেন। তারপর সবাইকে নিয়ে ঈদগাহে ছুটে যান। দু'রাকাত নামায আদায় করেন। প্রথম রাকাতে সূরা আলা; দ্বিতীয় রাকাতে সূরা গাশিয়া তিলাওয়াত করেন। প্রথম রাকাতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচবার তকবীর পড়েন। তারপরে এক আকর্ষণীয় ও ঈমান বৃদ্ধিকারক ভাষণ দেন। লোকজন স্থান ত্যাগ করার আগেই বৃষ্টি শুরু হয় এবং কয়েকদিন ধরে অনবরত বৃষ্টি হতে থাকে। বৃষ্টি হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আজ লোকজন এভাবে সকাল করেছে যে কিছু সংখ্যক আমার উপর ঈমান রাখে এবং তারাকে অস্বীকার করেছে। আবার কিছু লোক তারার উপর ঈমান এনেছে এবং আমাকে অস্বীকার করেছে। যারা বলেছে যে আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমাকে ও আল্লাহকে স্বীকার করেছে এবং গ্রহের উপর ঈমান আনেনি।'

হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে এবং খাইবার যুদ্ধের পূর্বে হযরত রেফায়া ইবনে যায়েদ ইবনে ওহাব আল জুজামী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নিজ গোত্রের এক দল নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতে একখানা চিঠি লিখে দেন। তাঁর গোত্রের অবশিষ্ট লোক, পত্র পেয়ে সকলেই ইসলামে দীক্ষিত হন। হযরত রেফায়া (রা.) সেই সাহাবী, যিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুদয়াম নামক হাবশী গোলাম হাদিয়াস্বরূপ দান করেছিলেন। তিনি খায়বারে নিহত হন। এ বছর যিলহজ্ব মাসে মতান্তরে চতুর্থ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বের রাজা বাদশাহগণের উদ্দেশ্যে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র পাঠান। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান যে অনারব বাদশাহগণ সিল মোহর ছাড়া কোন চিঠি গ্রহণ করেন না। এ কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপার আংটি তৈরি করেন। তাতে তিন লাইন লেখা ছিল। উপরে আল্লাহ, মধ্যখানে রাসূল এবং নীচে ছিল মুহাম্মদ। বিশ্বের রাজা বাদশাহদের নামে চিঠি লিখে এ সিলমোহর দ্বারা তাতে সিল বা মোহর লাগাতেন। সিল মোহরটি তৈরি হলে যিলহজ্ব মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাজা বাদশাহদের প্রতি দূত মারফত পত্র পাঠান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্ব মাসে একই দিনে নিম্নের সাহ- াবীদেরকে (রা.) বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশা-শাসকদের কাছে প্রেরণ করেনঃ
১। আমর ইবনে উমাইয়া আজ জামিরী (রা.) কে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে।
২। দিহইয়া ইবনে খলীফা কালবীকে (রা.) রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে।
৩। আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.) কে পারস্য সম্রাট পারভেজের কাছে।
৪। হাতিব ইবনে আবু বালতা আল লাখমীকে (রা.) মিসর ও আলেক জান্দ্রিয়ার রাজা মুকাওকিসের কাছে।
৫। সোজা ইবনে ওহাব আল আসাদীকে (রা.), দামেস্কের বাদশা হারিছ ইবনে আবু শামর আল গাছছানীর কাছে।
৬। আমর আল আমিরী (রা.) কে ইয়ামামার বাদশা হাওয়া ইবনে আলী হানাফীর কাছে।
৭। আলা ইবনে হাজারামী (রা.) কে বাহরাইনের বাদশা শাহ মুনযির ইবনে সাওয়া আত তাইমী আদ দারমী আল আবদীর কাছে। ৮। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) কে ওমানের দু'জন বাদশা/সর্দার জায়কর এবং আবদে ফিরানে জুলানদের কাছে।

একই বছর সূরা ফাতাহ নাযিল হয়। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে ৬ষ্ঠ হিজরী হজ্ব ফরয হয়। আবার মতান্তরে দশম হিজরীতে হজ্ব ফরয হয়েছিল। একই বছর হজ্ব ও উমরা পালন এর ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব ও উমরা পালন কর।' (বাক্বারাহ-১৯৬)। কাফিরদের চরম শত্রুতার কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হজ্ব করতে পারেননি। তবে এ বছর যিলকদ মাসে ওমরার জন্য তাশরীফ নিয়ে যান। তবে মুশরিকরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হুদাইবিয়াতে আটকে দেয়। একই বছর জেহার (অর্থাৎ স্ত্রীকে মায়ের সংগে তুলনা করা) বিষয়ে আয়াত নাযিল হয়। জেহার যে তালাকের স্থলাভিষিক্ত নয় এ কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়। এ বছর কতিপয় মহিলা সাহাবী (রা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসেন। তন্মধ্যে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে ওকবা ইবনে আবি মুয়ীতও ছিলেন। মক্কার কাফিররা হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের ফেরৎ পাঠাবার জন্য সংবাদ পাঠায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর অপেক্ষায় থাকেন। পরে তাদের ফেরত পাঠাতে নিষেধ করে আয়াত নাযিল হয়। সূরা মুমতাহিনায় এ ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। 'আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সকল কাফির মহিলাদের তালাক দিয়ে দেন। হযরত ওমর (রা.) এর ঘরে দু'জন কাফির মহিলা ছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদেরকে ছেড়ে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসছিলেন তখন উটের উপর আরোহী অবস্থায় মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সূরা ফাতাহ নাযিল হয়। এ সূরা নাযিল হওয়ার কারণে সাহাবায়ে কেরাম সীমাহীন আনন্দিত হন।

৬ষ্ঠ হিজরীতে সফরকালীন সময়ে যখন সূরা ফাতাহ নাযিল হয়, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সূরা নিয়ে বিশেষ ধ্যানে মশগুল ছিলেন। সময়টা ছিল রাত এবং সফর ছিল উটের। এ অবস্থায় হযরত ওমর (রা.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোন এক বিষয়ে প্রশ্ন করেন। মহানবী নীরব থাকেন। এতে হযরত ওমরের মনে বড়ই কষ্ট হয়। তিনি মনে মনে ভাবেন, নিশ্চয় আমার থেকে কোন মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী থেকে যখন অবসর হন তখন ইরশাদ করেন, 'হে ওমর। ওহীর ব্যস্ততার করণে আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। সূরা ফাতাহ নাযিল হয়েছে। এটা আমার কাছে গোটা পৃথিবী থেকে অধিক প্রিয়।' এ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা করান। এ প্রতিযোগিতায় ইবনে ওমর (রা.) শামিল ছিলেন। একই হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের দৌড় প্রতিযোগিতা করান। একজন গ্রাম্য লোকের সাধারণ একটি উট বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিখ্যাত উটনী ক্বাসওয়াকে পরাজিত করে এগিয়ে যায়। কাসওয়ার সংগে কোন জন্তুর প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার ঘটনা ছিল এই প্রথম। কাজেই মুসলমানগণের নিকট ব্যাপারটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং খুবই কষ্টকর মনে হয়। এ কষ্টের কথা মহানবীকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ এ বিষয়টি নিজ যিম্মাদারিতে নিয়ে গেছেন যে, দুনিয়াতে কোন জিনিস যখন খুব উন্নত হয়, তখন সেটাকে অবনত করে দেখান।' একই বছর আবারও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর ঘোড়া প্রথম স্থান অধিকার করে এবং তিনি পুরস্কৃত হন। এ দু'টি ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম প্রতিযোগিতামূলক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত (উসদুল গাবাহ)। এ বছর উম্মে রুমান বিনতে আমির ইবনে ওয়াইমির আল ফাসিয়ার (রা.) ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর স্ত্রী এবং হযরত আয়িশা সিদ্দীকার আম্মা। তার নাম ছিল যয়নব। তিনি প্রথম যুগের মুসলমান ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার কবরে অবতরণ করেছিলেন এবং তাঁর সম্পর্কে উক্তি করেন, 'কেউ যদি জান্নাতের বড় চক্ষুবিশিষ্ট হুর দেখতে চায়, তবে সে যেন তাকে দেখে নেয়।

৬ষ্ঠ হিজরীতে লবীদ ইবনে আসিম ইহুদী (আল্লাহর অভিশাপ প্রাপ্ত ব্যক্তি) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদু করে। এ নিকৃষ্ট কাজ সে ইহুদীদের উস্কানীতে করেছিল। এ কাজের জন্য ইহুদীরা তাকে তিনশত দিনার দান করেছিল। যেসব বস্তু দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদু করেছিল; সে তা যীইওয়ান নামক কূপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আল্লামা শামী লিখেছেন যে, সপ্তম হিজরীর মহররম মাসে সে যাদু করেছিল। ফলে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল হয়। এরপর কূপ থেকে ঐ যাদু বের করা হয়। এ যাদু একটি সুতার মধ্যে করা হয়েছিল। এতে এগারটি গিরা ছিল। উভয় সূরার এক একটি আয়াত দ্বারা একটি করে গিরা খুলতে থাকে। দুই সূরা পাঠ করার পর এগারটি আয়াতের দ্বারা এগারটি গিরা খুলে যায় এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ সুস্থ ও যাদুমুক্ত হন। এ সূরাদ্বয় এতটাই মর্তবাপূর্ণ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুদাইবিয়াতে অবস্থান করছিলেন তখন হযরত কাব ইবনে উজরা (রা.) সাহাবীকে দেখতে পেলেন যে, তিনি এহরাম অবস্থায় চুলা জ্বালিয়েছেন এবং তার চেহারা থেকে একটি উকুন খসে পড়ছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'ওহে কা'ব, এসব উকুন তোমাকে যন্ত্রণা দিবে। তিনি আরজ করেন, 'জ্বী হ্যাঁ।' এ ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়। তোমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ কিংবা যার মাথায় কষ্ট আছে, সে যেন তার ফিদিয়াস্বরূপ রোযা পালন করে অথবা সদাকা দিয়ে দেয় অথবা কুরবানী করে' (বাকরা-১৯৬)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিয়ে বলেন, 'তোমার মাথার চুল মুণ্ডিয়ে ফেল এবং ঐ তিন বস্তুর কোন একটি আদায় কর।' এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন তিনটি রোযা, সদকার ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন ছয়জন মিসকীন এবং কুরবানীর ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন একটি ছাগল যবাই কর। ৬ষ্ঠ হিজরীতে বনী লাহইয়ান যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আম্মাজান হযরত আমিনার কবর যিয়ারত করেন। সেখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়। এতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট অনুভব করেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তাকে (বিশ্বনবীর মা'কে) জীবিত করেন। তিনি জীবিত হয়ে ঈমান আনেন। অতঃপর পুনরায় তার ইন্তিকাল হয়ে যায়। বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা হযরত আব্দুল্লাহকেও আল্লাহ জীবিত করেছিলেন। তিনিও ঈমানের মত মহাসম্পদে ভূষিত হয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা মাতার জীবিত হওয়ার বর্ণনা প্রসংগে যদিও মুহাদ্দিসগণ অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। তবে অনেক গুণী মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে এর সনদ হাসান। সুতরাং এটা বিশ্বাস করা যেতে পারে। তবে আল্লাহই ভাল জানেন সত্যিকার ঘটনা কি ছিল। এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক না করাই উত্তম।

এ হিজরীতে ওমরায়ে হুদাইবিয়ার সফরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসফান পৌঁছেন, তখন মুশরিকগণ যুদ্ধের জন্য আসেন। এ সময় আল্লাহ তা'আলা যুহর এবং আসরের সময় মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সালাতুল খাওফ নাযিল করেন। এটা ছিল সর্বপ্রথম সালাতুল খাওফ বা বিপদ কালীন নামায। যে নামাযে প্রথম কাতারে মুসলমানরা অস্ত্রসহ পাহারারত থাকবে এবং পিছনের কাতারে মুসলমানরা নামায আদায় করবে। হুদাইবিয়া সফরের সময় হযরত আবু কাতাদা (রা.) রাতের বেলা একটি জংলী গাধা শিকার করেন। তিনি তখন এহরামের মধ্যে ছিলেন না। এ জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতিতে মুহ-রিম যারা ছিলেন, সকলেই এর গোশত খেয়েছিলেন। হুদাইবিয়ার সফরের প্রাক্কালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবওয়া বা উদ্যানে ছিলেন তখন সায়াব ইবনে জাছামা লাইসী (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি জীবন্ত গাধা উপহার দেন। তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা গ্রহণ করেননি। এতে সাহাবীর চেহারায় দুঃখের ছাপ লক্ষ্য করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এটা এ জন্য গ্রহণ করতে অপারগ যে, আমি এহরামের মধ্যে আছি।' যেহেতু এটা জীবিত ছিল তাই গ্রহণ করেননি। অথচ আবু কাতাদার জন্তুটি যবাইকৃত ছিল সেটা গ্রহণ করেছিলেন। হুদাইবিয়াতে কিকর-বাবুল (বা বাবলা) গাছের নিচে বাইয়াতে রেযওয়ান অনুষ্ঠিত হয়। এর উল্লেখ করে মহান আল্লাহ ইরশাদ ফরমান, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ রাজী হয়েছেন মুমিনদের প্রতি, যখন তারা গাছের নিচে আপনার নিকট বায়াত গ্রহণ করেছিলেন।' (সূরা ফাতাহ-১৮)। এ বাইয়াতে সাহাবাগণ শপথ করেছিলেন যে, প্রয়োজনে জীবন দিব, তথাপি ময়দান থেকে পিছপা হব না। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ওক্কাসা ইবনে মিহসান (রা.) এর ভাই আবু সানান ইবনে মিহসান (রা.) বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ওক্কাসার চেয়ে বিশ বছরের বড়। তার নাম ছিল ওহাব। তিনি এবং তার ছেলে সানান বদর থেকে শুরু করে বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশার সকল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আবু সানানের ওফাত হয়েছিল বনী কুরাইযার যুদ্ধে এবং তার ছেলের মৃত্যু হয় হযরত ওসমান (রা.) এর খিলাফত আমলে।

এ বছর হুদাইবিয়ার কূপের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার মু'জেযা সংঘটিত হয়। হুদাইবিয়ার কূপে অল্প পানি ছিল। সাহাবীগণ সে পানি উঠিয়ে ফেলেছিলেন এবং কূপ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে কূপে পানি না থাকার অভিযোগ করেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তীরদানী থেকে একটি তীর দান করেন। সে তীর কূপের ভেতরে গেঁড়ে দেয়া হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করার পর অবশিষ্ট পানি দান করেন। সে পানি উপরে থেকে কূপে ঢেলে দেয়া হয়। ফলে কূপের পানি ঝর্ণা ধারার মত উথলে উঠে। সাহাবায়ে কেরাম অতি তৃপ্তির সাথে পানি ব্যবহার ও পান করেন। উভয়পক্ষের সর্বসম্মতভারে হুলাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় যে, দশ বছর যাবৎ উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এ সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন বা লিখেন হযরত আলী (রা.)। হুদাইবিয়াতে অপর একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। আরও একবার পানি সংকট মারাত্মকভাবে দেখা দেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি পাত্রে সামান্য পানি ছিল। এছাড়া কাফেলায় আর কোন পানি ছিল না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পানি একটি পাত্রে ঢালেন। অতঃপর তাতে হাত মোবারক রাখেন। এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অংগুলীসমূহ দিয়ে ঝর্ণার ধারার মত পানি বেরিয়ে আসতে শুরু করে। সকল মুসলিম বাহিনী তৃপ্তির সাথে সে পানি ব্যবহার করে। সকলেই সে পানিতে ওযুও করেন। এ ঘটনার বর্ণনাকারী হযরত জাবির (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এ বাহিনীতে আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর দেন, 'আমরা এক লক্ষ হলেও পানি যথেষ্ট হত। তবে আমরা সেদিন পনেরশত সাহাবা ছিলাম।' ইমাম বুখারী এবং অন্যান্য হাদীসের ইমামগণও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা আরও বলেছেন, 'বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অংগুলী মোবারক থেকে নির্গত এ পানি সকল পানি থেকে উত্তম পানি ছিল।' হুদাইবিয়া থেকে মদীনা যাওয়ার পথে সূরা আল ফাতাহ নাযিল হয়। উক্ত সূরায় মহাসুসংবাদসমূহ দেয়া হয়েছিল। যেমন: মক্কা আল মুকররমার বিজয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগের ও পরের সকল গোনাহ মাফ করা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে সর্বপ্রকার পাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। খাইবার বিজয় হবে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে' 'আল্লাহ তোমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন, বিপুল পরিমাণ গনীমত যা তোমরা গ্রহণ করবে এবং শীঘ্রই হবে।' এটা ছিল খাইবার যুদ্ধের গনীমত যা শীঘ্র অর্জিত হয়েছিল।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৭ম হিজরী

📄 ৭ম হিজরী


সপ্তম হিজরী (৬২৮ খ্রীষ্টাব্দ): ৭ম হিজরীতে খাইবারের যুদ্ধের পর এক ইহুদী মহিলা যয়নব বিনতে হারিস (সাল্লামের স্ত্রী) ইবনে শিকম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছাগলের গোশতে বিষ প্রয়োগ করে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দেন। অপর উক্তিমতে সে ইসলাম গ্রহণ করে এজন্য তাকে ক্ষমা করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু এ বিষমাখা গোশত খেয়ে বিশর ইবনে বারা (রা.) ইন্তিকাল করেন। ফলে সাহাবীর হত্যার বদলে তাকে হত্যা করা হয়। এ বছর খাইবার যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সালামা ইবনে আকওয়ার পায়ের গোঁড়ালীতে আঘাত লাগলে তাতে তিনবার ফুঁক দেন। তিনি সাথে সাথে সুস্থ হয়ে উঠেন এবং তার পরে আর কখনো পায়ে ব্যথা অনুভব করেননি।

৭ম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার যুদ্ধ থেকে অবসর হলে হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব আবু মূসা আশয়ারী (রা.) নিজ সাথীদের নিয়ে আবিসিনিয়া থেকে এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সপ্তম হিজরীতে খাইবার আসেন। উক্ত দলে শিশু এবং মহিলা ছাড়াও অনেক সাহাবী ছিলেন। একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ানকে শাদী করেন। ৭ম হিজরীতে সফর মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুফিয়া বিনতে হুইয়াকে শাদী করেন। তিনি খাইবারের যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে ছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাকে নিজের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাকে আজাদ করে বিয়ে করেন। তাঁর ওলীমার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিন পর্যন্ত সাহাবাযে কেরামকে মেহমানদারী করেন।

খাইবার বিজয়ের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত সাদীয়াকে শাদী করেন। তখন মুসলিম জননীর সম্মানার্থে সাহাবায়ে কেরাম সকল বন্দীকে বিনা মূল্যে আজাদ করে দেন, যাদের সংখ্যা ছিল একশত পরিবার। লোকসংখ্যা ছিল সাত শতাধিক। খাইবার যুদ্ধের সময় মহররম ও সফর মাসের মাঝামাঝি ইয়ামান থেকে দু'শ কাবিলার একটি প্রতিনিধি দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসেন। এ দলটি ছিল হযরত আবু হুরাইরার (রা.)। উক্ত দলে ছিলেন তোফায়েল ইবনে আমর আদ দুসী এবং হযরত আবু হুরাইরা (রা.) প্রমুখ। এছাড়াও দু'শ কাবিলার সত্তর আশিটি পরিবারে আনুমানিক চারশত লোক ছিলেন। তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। একমাত্র তোফায়েল ইবনে আমর হিজরতের পূর্বেই মদীনাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

এ বছর যিলক্বাদ মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরাতুল কাযার সফরে, হযরত মাইমুন বিনতে হারিসের সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ওমরাতুল কাযার উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পহেলা যিলকদ রওনা হন এবং চার যিলহজ্ব ভোরে মক্কা আল মুকাররমাহ পৌঁছেন। তোয়াফ এবং সায়ী করে ওমরাহ পালন করেন। তিনদিন মক্কায় অবস্থান করে মদীনার উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। হযরত মাইমুনা বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাহাতুল মুমেনীনদের মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৭ম হিজরীতে কাযা ওমরাহ (ওমরাতুল কাযা) পালন করেন। পহেলা যিলক্বদ তারিখে এ উদ্দেশ্যে রওনা করেন। যুল হুলাইফায় এহরাম বাঁধেন। শিশু ছাড়াও বারশত সাহাবী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ছিলেন।

মদীনা তৈয়িবায় এ সময় আবু রহম কলছুম ইবনে হোসাইন আল গেফারীকে মতান্তরে উয়াইফ ইবনে আজবতকে অথবা আবুজর গেফারী (রা.) কে প্রতিনিধি করে রেখে যান। ওমরাতুল কাযার উদ্দেশ্যে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের উপর আরোহী ছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা উটের লাগাম ধরে রেখেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওমরার তোয়াফের উদ্দেশ্যে যখন সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন তখন মসজিদের এক পাশে কতিপয় কাফির বসা ছিল। তারা মন্তব্য করে 'ওদেরকে ইয়াসরিবের জ্বরে দুর্বল করে দিয়েছে।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দেন کاফিরদের ধারণার প্রতিবাদে তোয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল কর। (রমল মানে বীরের মত ঘাড় হেলিয়ে দুলিয়ে দ্রুত চলা) বাকী চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে কর। ওমারাতুল কা'বার উদ্দেশ্যে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন তখন হযরত বিলাল (রা.) কে নির্দেশ দেন, 'কা'বার ছাদে উঠে আযান দাও।' ওমরার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বা শরীফের ভিতরে প্রবেশ থেকে বিরত থাকেন। কারণ, ভিতরে তখন মূর্তি রাখা ছিল। অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের সময় মূর্তি সরিয়ে নিয়ে সেগুলো ভেংগে ফেলা হয়। অতঃপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিতরে প্রবেশ করেন।

ওমরাহ পালন শেষে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তখন তার চাচা মহাবীর হযরত হামযার (রা.) অল্প বয়স্কা এতীম শিশু কন্যা উমামাহ মতান্তরে আম্মারাহ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চাচা বলে ডাক দিয়ে, পিছনে এসে দাঁড়ায়। ফলে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার উদ্ভব হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে হযরত আলী (রা.) তাকে হযরত ফাতিমার কাছে সোপর্দ করেন। মদীনায় পৌঁছার পর তার লালন-পালন নিয়ে হযরত আলী (রা.), হযরত জাফর (রা.) এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার মধ্যে পাল্লাপাল্লি ও বিতর্ক শুরু হয়। মামলা রাসূলুল্লাহর আদালতে দায়ের করা হয়। হযরত আলী তার অধিকারের কথা বর্ণনা করে বলেন, 'এ হচ্ছে আমার চাচার মেয়ে এবং আমিই তাকে মক্কা থেকে তুলে নিয়ে এসেছি।' হযরত যায়েদ বলেন, 'সে আমার ভাই এর মেয়ে। আপনিই হামযা এবং আমার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দিয়েছেন।' হযরত জাফর (রা.) বলেন, 'সে আমার চাচার মেয়ে এবং ঐ মেয়ের খালা আমার স্ত্রী। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাফরের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করে বলেন খালার মর্যাদা মায়ের তুল্য। হযরত জাফর (রা.) জয়যুক্ত হন।

৭ম হিজরী মতান্তরে অষ্টম হিজরীতে অথবা দশম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাসসানের বাদশাহ জিবিল্লাহ ইবনে আইহামকে ইসলামের দাওয়াত জানিয়ে পত্র লিখে পাঠান। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে পত্রের উত্তর দিয়েছিলেন। অবশ্য পরে সে মুর্তাদ হয়ে যান। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তিনি ইসলামের উপর কায়েম ছিলেন। ৭ম হিজরীতে মিসরের আলেক জান্দ্রিয়ার বাদশাহ মুকাউকিস মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য হাতিব ইবনে আবু বালতার মাধ্যমে, বেশকিছু দামী জিনিসপত্র উপঢৌকনস্বরূপ প্রেরণ করেন। (১) মারিয়া কিবতিয়া যিনি পরবর্তীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন সঙ্গিণী হয়ে ছিলেন, (২) তার বোন সিরীন, (৩) একটি গাধা, (৪) দুলদুল নামক খচ্চর, (৫) বিশ খানা মিসরীয় উন্নতমানের কাতান কাপড়, (৬) শিরিয়ান কাঠের সুরমাদানী, (৯) আয়না, (১০) কারুকাজের চিরুনী। তাছাড়াও বাদশা একশত নগদ দিনার এবং পাঁচটি জামা হযরত হাতিব (রা.) কে দান করেন।

৭ম হিজরীতে খাইবার যুদ্ধের প্রাক্কালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম বারের মত মুতা বিয়ে হারাম ঘোষণা করেন। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে খায়বার যুদ্ধ পর্যন্ত তা জায়েয ছিল। মক্কা বিজয়ের পর আবার তা জায়েয বলে ঘোষণা করা হয়। আওতাসের যুদ্ধ পর্যন্ত তা বৈধ থাকে। আওতাস যুদ্ধের তিনদিন পর থেকে পুনরায় মুতা বিয়ে হারাম ঘোষণা করা হয়, যা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। এতে বুঝা যায় যে, মুতা বিয়ে দু'বার হালাল হয়েছিল এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে গেছে। মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন বলেছেন: আজ থেকে মুতা বিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত হারাম করা হল। লম্বা সফরে বা অভিযানে কোন এলাকায় মুসলমানদের সাময়িক বসবাসের সময় সাময়িক বিয়ের নিয়মকে মুতা বিয়ে বলা হত। এটা চিরতরে হারাম হয়ে গেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারে গাধার গোশত খাওয়া হারাম ঘোষণা করেন। খাইবার যুদ্ধের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁচা পিয়াজ এবং রসুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিংস্র পশু এবং ছোঁ মেরে খায় যেসব পাখী, সেগুলো নিষেধ করেন। গনীমতের মাল বণ্টনের পূর্বে বিক্রি বা ব্যক্তিগতভাবে নেয়া নিষেধ করেন।

এ হিজরীতে কুরমান আজ জাফরী নামক এক লোক বাহ্যিকভাবে নিজেকে মুসলমান দাবী করে। মূলতঃ সে ছিল মুনাফিক। সে আনসার কাবিলার বনু জাফরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে বলেছিলেন যে, সে মুনাফিক এবং জাহান্নামী। খাইবারে যখন যুদ্ধ শুরু হয়। সে খুব বীরত্বের সাথে লড়তে থাকে এবং যুদ্ধে আহত হয়। লোকজন দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ার উপক্রম হয়ে যায় যে, এমন একজন বীর মুজাহিদ কেমন করে জাহান্নামী হতে পারে। হযরত আকসাম ইবনে আবুল জুন আলখেজায়ী নামক সাহাবী বলেন, 'আমি ইচ্ছা করলাম ঐ ব্যক্তির সংগে থাকব। যাতে আমি দেখতে পারি যে তার শেষ পরিণতি কি হয়?' পরে দেখা গেল, ঐ ব্যক্তি মারাত্মক আহত হয়ে ভীষণ কষ্টের মধ্যে আত্মহত্যা করে ফেলেছে। সাহাবী আকসাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার বাণী আল্লাহ বাস্তবায়ন করে দিয়েছেন। ঐ ব্যক্তি আত্মহত্যা করে ফেলেছে।' এ কথা শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বিলাল (রা.) কে বলেন, 'উঠো! ঘোষণা করে দাও যে, একমাত্র মুমিনগণ জান্নাতে যাবে। আর আল্লাহ কখনও কখনও কোন কাফির পাপী বান্দাকে দিয়ে তার দ্বীনের খেদমত করান।' (বুখারী)

খাইবার যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম যখন অত্যধিক ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে দু'টি ছাগল যবাই করার নির্দেশ দেন। এ দু'টি ছাগলের রান্না করা গোশত সকল সাহাবার মধ্যে ভাগ বণ্টন করে দেন। সাহাবার সংখ্যা ছিল এক হাজার ছয়শত। সমস্ত বাহিনী খুব তৃপ্তির সাথে পেটপুরে এ গোশত খান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারের সকল বাগান এবং জমিতে ফসল ফলাবার জন্য ইহুদীদের নির্দেশ দেন এবং উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক তারা পাবে বলে নির্ধারণ করেন। এরপরে বলেন, 'যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা আমি তোমাদের সংগে এ চুক্তি বহাল রাখব।' এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহানুভতা প্রকাশ পায়। কেননা, পরাজিত ইহুদীদের তিনি হত্যা বা বিতাড়িত করতে পারতেন। খাইবারের যুদ্ধে একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। ইহুদীদের একটি হাবশী গোলাম ছিল। তার নাম ছিল আসলাম। সে ইহুদীদের ছাগল চরাত। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমান হয়ে তিনি আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে কিছু ছাগল আছে; এগুলো আমার মালিকের আমানতস্বরূপ। সুতরাং এ ছাগলগুলো মালিকের নিকট ফেরত দেয়া কি আমার জন্য জরুরী?' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ছাগলগুলো দল থেকে বের করে আল্লাহর নাম নিয়ে তাদের মালিকের কাছে হাকিয়ে দাও। আল্লাহ নিজেই তোমার আমানত নিজ নিজ মালিকের কাছে পৌছে দিবেন।' তিনি তাই করলেন এবং প্রত্যেকটি ছাগল কোন তত্ত্বাবধান ছাড়াই নিজ নিজ মালিকের কাছে ফিরে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বরকতে মহান আল্লাহ এমনিভাবে তাঁর আমানত সম্পন্ন করে দেন। অতঃপর ঐ ভৃত্য যুদ্ধের পোশাক পরে অস্ত্র হাতে নিয়ে লড়তে লড়তে শাহাদাতবরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ "আমি দেখেছি দু'জন ফুর তার মাথার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আছে। হাফিয ইবনে কাছীর (রহ.) আলবেদা গ্রন্থে লিখেছেন এ কাল গোলাম শহীদ হয়েছিলেন। অথচ আল্লাহর সামনে একটি সিজদা করার সুযোগও তার হয়নি। কোন প্রকার নামায, রোযা হজ্ব বা অন্য কোন আমল ছাড়াই সে সাহাবী এবং শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন।

খাইবার যুদ্ধের প্রাক্কালে হযরত আলী (রা.) এর চোখে মারাত্মক ব্যথা হয়। ফলে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হতে পারেননি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডেকে পাঠান। তার চোখে হাত রাখেন, সামান্য লালা মোবারক লাগান এবং দোয়া করে দেন। এতে করে তিনি এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠেন; যেন তার কোন রোগই ছিল না। খাইবার যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ একদিন ফরমান, 'আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ইসলামের ঝা। দিব, যিনি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসেন। আল্লাহ এবং রাসূলও তাকে ভালবাসেন।' সকলেই এ কথা শুনে গভীর আগ্রহের সাথে রাত কাটালেন। সকলেই মনে মনে ঝা। পাওয়ার আশাবাদী রইলেন। সকাল বেলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের ঝা। হযরত আলীর (রা.) হাতে দিয়ে বলেন, দেখ! ওদের সংগে যুদ্ধ করতে তাড়াহুড়া করবে না। প্রথমে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিবে। আল্লাহর হক্ক সম্পর্কে তাদের বুঝাবে। আল্লাহর কসম! একজন লোককেও যদি আল্লাহ তোমার মাধ্যমে হিদায়ত করেন, তবে তা লাল উটের চেয়েও উত্তম।' অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তা এমন সবকিছু থেকে উত্তম যাতে সূর্য উদয় হয়। আর এক বর্ণনায় আছে, একজন লোকের ইসলাম গ্রহণ, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সকল কাফিরকে হত্যার চেয়ে উত্তম। দাওয়াত এবং তাবলীগের শান- মর্যাদা এত উপরে।

৭ম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমেনীন হযরত ছাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.) কে শাদী করেন। তিনি ছিলেন খাইবারের নেতার কন্যা এবং হযরত হারুন আলাইহিস্ সালাম [হযরত মূসা (আ.) এর ভাই] এর বংশদ্ভূত। তার পৈতৃক বংশে একশত নবী এবং একশত রাজা জন্ম নিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্নী হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছিলেন। যে সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার শুভাগমন করছিলেন, তখন হযরত ছাফিয়া স্বপ্নে দেখেন; সূর্য অথবা চন্দ্র যেন আসমান থেকে অবতরণ করে তার কোলে চলে এসেছে। তিনি এ স্বপ্নের কথা স্বামী কেনানের কাছে প্রকাশ করেন। স্বপ্নের কথা শুনে কেনান ক্রোধে ফেটে পড়ে এবং মুখে সজোরে আঘাত করে। উত্তেজিত হয়ে বলে, 'সম্ভবতঃ তুমি সে রাজার অপেক্ষায় আছো; যিনি হেজায ভূমি থেকে আমাদের এখানে আসছেন।' সৌভাগ্য তাকে ইসলামে টেনে নিয়ে আসে। স্বামী কেনান নিহত হবার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। খাইবার যুদ্ধে ইহুদীদের দু'জন বীর যোদ্ধা মারহাব এবং তার ভাই হারিছ এবং দু'জন নেতা আমির এবং ইয়াছির মারা যায়। প্রথম তিন ব্যক্তিকে হযরত আলী (রা.) এবং চতুর্থ ইহুদীকে হযরত যুবায়র ইবনে আওয়ام হত্যা করেন। এ বছর খাইবার যুদ্ধে মুসলমানদের আক্রমণ ছিল ভয়াবহ ও ক্ষীপ্র। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময় বলেছিলেন, 'এবার তান্দুর গরম হয়েছে।' এ বাক্যটি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিরাট অর্থবোধক বাক্যসমূহের মধ্যে গণ্য হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবার থেকে ফিরে এসে 'সাহাবা' নামক স্থানে যখন পৌঁছেন, তখন হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের সৌভাগ্য সূর্য ফিরে আসে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের নামায আদায় করে হযরত আলীর উরুতে মাথা মোবারক রেখে শুয়ে পড়েন। এমন অবস্থায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ওহী নাযিল হতে শুরু করে। কোন ওজরের কারণে হযরত আলীর (রা.) আসরের নামায বাকী রয়ে গিয়েছিল। তিনি ওহী নাযিলের কারণে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানার্থে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা বলেননি। এরই মধ্যে সূর্য অস্ত হয়ে যায়। সূর্যাস্তের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে অবগত হলেন এবং দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ! আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ছিল। তার খাতিরে সূর্যকে ফিরিয়ে দিন।' সুতরাং অস্তমিত হওয়ার পরও; সূর্য আবার উদয় হয়। এটি হযরত আলীর (রা.) কারামত হিসেবে গণ্য হয়। সূর্য উদয়ের এ হাদীস কোন কোন মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় সহীহ এবং হাসান।

খাইবার থেকে ফেরার পথে লাইলাতুল তারীসের ঘটনা ঘটে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম সফর শেষ করে রাতে এসে অবস্থান গ্রহণ করেন। এমনভাবে ঘুম লেগেছিল যে সূর্য উঠে যায়। ফজরের নামায কাযা হয়ে যায়। সূর্যের হলুদ বর্ণ কেটে যাবার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযান ও ইকামতের সাথে জামাতে নামায আদায় করেন। তখন ক্বেরাত জোরে পাঠ করেন। লাইলাতুল তারীসের সময়কাল সম্পর্কে আরো দু'টি উক্তি রয়েছে। প্রথম কথা হল, এটা হুদাইবিয়া থেকে ফেরার পথে ঘটেছিল।

দ্বিতীয় কথা হল, তাবুক থেকে ফেরার পথে। তবে প্রথম উক্তিই অধিক বিশুদ্ধ। খাইবার থেকে ফেরার সময় কাফেলা যখন মদীনা তৈয়িবার নিকটে পৌঁছে; তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টি উহুদ পাহাড়ের উপর পড়লে মহানবী বলে উঠেন, 'এটা সে পাহাড় যে আমাদের ভালবাসে এবং আমরাও তাকে ভালবাসি। হে আল্লাহ! আমি মদীনার দু'পার্শ্বে হারাম আখ্যা দিলাম যেভাবে ইব্রাহীম (আ.) মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন।' যাতুর রেকার যুদ্ধের সফরে এক বাচ্চাকে আনা হয়; যার উন্মাদ রোগ ছিল। তার আম্মা তাকে নিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হন এবং তার রোগের কথা জানান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালা মোবারক লাগিয়ে দেন এবং দোয়া করেন, ছেলেটি তখনই সুস্থ হয়ে উঠে। যাতুর রেকার যুদ্ধে আরেকটি মু'জেযা প্রকাশিত হয়। আলবা ইবনে যায়েদ আল হারেসী (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উট পাখির কয়েকটি ডিম হাদিয়া দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে সে ডিমগুলো একটি বড় প্লেটে রাখা হয় এবং সাহাবায়ে কেরামকে খাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সকলেই তা থেকে তৃপ্তির সাথে আহার করেন। কিন্তু ডিমগুলো যেমন ছিল তেমনি রয়ে যায়। এ সময় সৈন্যদের সংখ্যা ছিল সাত বা আটশত। যাতুর রেকার যুদ্ধে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। সৈন্যদলের পানি ফুরিয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরামের ওযুর পানির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এক সাহাবীর নিকট সামান্য পানি ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পানিটুকু একটি পাত্রে ঢালতে বলেন। অতঃপর সে পাত্রে নিজের পবিত্র হাত রাখেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অংগুলি মোবারকের মধ্যদিয়ে পানি নির্গত হতে শুরু করে। সকলেই তা থেকে পানি পান করেন। ওযু করেন এবং জীব জন্তুকেও পানি পান করান। এ যুদ্ধে সাহ- াবায়ে কেরাম পেটের ক্ষুধার অভিযোগ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, 'অচিরেই আল্লাহ তোমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন।' সাহাবায়ে কেরাম সমুদ্র বন্দরের দিকে যান। আল্লাহ সাগর থেকে একটি মাছ তীরে নিক্ষেপ করে দেন। সাহাবায়ে কেরাম খুব তৃপ্তির সাথে মাছ খান। এ মাছটি এত বড় ছিল যে, পাঁচজন লোক এর চোখের উপর বসতে পেরেছিল। খায়বার যুদ্ধে এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। এ যুদ্ধে সাহাবাগণ একটি পাখীর বাসা থেকে পাখীর বাচ্চা ধরে নিয়ে আসেন। সে পাখীটি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এর অভিযোগ নিয়ে আসে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাখির বাচ্চাগুলো ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ইরশাদ ফরমান, 'এ পাখীটি যেভাবে তার বাচ্চাদের প্রতি স্নেহশীল, মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়াবান।'

যাতুর রেকার এ যুদ্ধে হযরত উবাদা ইবনে বিশর (রা.) এবং আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রহরার জন্য নির্ধারিত ছিলেন। উভয়ে পরস্পর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এক সাথী অর্ধরাত পর্যন্ত পাহারা দিবেন এবং দ্বিতীয় সাথী শেষ অর্ধেক রাত জেগে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথমার্ধের দায়িত্ব ছিল হযরত উবাদার (রা.) উপর। তিনি নামাযের নিয়ত বেঁধে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সূরা কাহাফ তিলাওয়াত শুরু করেন। হযরত আম্মার (রা.) শুয়ে পড়েন। ইতোমধ্যে জনৈক কাফির হযরত উবাদাকে (রা.) লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে। তাতে সাহাবীর দেহ রক্তের ফোয়ারায় ভেসে যায়। তবুও তিনি নামায ত্যাগ করেননি। যখন রক্ত খুব বেশী বের হতে শুরু করে তিনি রুকু সিজদা করে নামায শেষ করেন এবং তার বন্ধু হযরত আম্মার (রা.) কে জাগালেন। হযরত উবাদা (রা.) এ অবস্থা দেখে বলেন, 'হে আল্লাহর বান্দা! তীর বর্ষণের সাথে সাথে তুমি কেন আমাকে জাগালে না। হযরত আম্মার বলেন, 'আমি সূরা কাহাফ শুরু করেছিলাম, বন্ধ করতে মন মানেনি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রহরার দায়িত্বে ত্রুটি হচ্ছে এ আশংকা না হলে আমি নামাযও ত্যাগ করতাম না এবং তোমাকেও জাগাতাম না। সুবহানাল্লাহ। একে একে তিনটি বিষাক্ত তীর বিদ্ধ হয়েছে। অথচ সাহাবী (রা.) নামায ত্যাগ করতে প্রস্তুত নন। সাহাবায়ে কেরামের ঈমান কেমন মজবুত ছিল এতেই বুঝা যায় এবং তারা কেমন নামায পড়তেন, বুঝা উচিত।

এ বছর যাতুর রেকার যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে একদিন দুপুর বেলার ঘটনা। গরম ছিল অত্যধিক, যে ময়দানে মহানবী অবস্থান করছিলেন সেখানে বন-জংগল ছিল প্রচুর। সাহাবায়ে কেরাম গাছের ছায়া খুঁজতে এদিকে সেদিকে ছুটে যান। তাঁরা একেক জন একেক গাছের নীচে শুয়ে পড়েন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঘন ছায়া ঘেরা গাছের নীচে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ গারছ ইবনে হারিছ নামের এক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার জন্য ছুটে আসে। তরবারী উত্তোলন করে কাফির বলল, এবার কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ধীর এবং শান্তকণ্ঠে জবাব দেন, 'আল্লাহ।' এদিকে হযরত জিব্রাঈল (আ.) এসে গারছকে সজোরে ধাক্কা দেন। এতে সে মাটিতে লুটয়ে পড়ে। তার হাত থেকে তরবারী পড়ে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরবারী হাতে নিয়ে বলেন, 'এবার তোকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে?' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথা শুনে গারছ হতভম্ভ হয়ে যায়। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে এবং শপথ করে যে, বাকী জীবনে কখনও শত্রুতা করবে না। যারা মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে লড়াই করে সে তাদের সংগে কোন প্রকার সহযোগিতাও করবে না। এ প্রতিশ্রুতির পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করে দেন। মহান আল্লাহ এমনিভাবে তাঁর নবীর হিফাযত করেছেন। সৈয়দ জামাল উদ্দিন 'রওজাতুল আহবাব' কিতাবে লিখেছেন, পরবর্তীতে গারছ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কলিমা পাঠ করেন, ফলে মহানবী তাঁকে ক্ষমা করে দেন। তিনি আপন কওমে ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তার দাওয়াতে বহু লোক মুসলমান হয়।

৭ম হিজরীর ১০ জুমাদাল উলা মঙ্গলবার রাতের ছয় ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর পারস্যের বাদশাহ কিসরা পারভেজ ইবনে হরমুজ নওশের নিহত হয়। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পত্রের অবমাননা করেছিল। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্রখানা ছিঁড়ে ফেলেছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি বদদোয়া করেছিলেন। বিশ্বনবী বলেছিলেন, "আল্লাহ যেন ওকেও ছিঁড়ে ফেলেন।" ফলে আল্লাহ তার পুত্র শেরভিয়াকে লেলিয়ে দেন। সে পিতাকে তরবারী দিয়ে পেট চিরে হত্যা করে। যে রাতে সে নিহত হয়েছিল, পরদিন ভোরে মহানবী সাহাবায়ে কেরামকে সংবাদ দেন যে, আজ রাতে আল্লাহ পারস্যের সম্রাট কিসরা পারভেজকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সংবাদ পরিবেশন ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জেযা। এ বছর মসজিদে নববীর মিম্বার মোবারক তৈরী হয়। এর আগে খেজুর গাছের যে টুকরার উপর ভর করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিতেন, সেটার কান্নার ঘটনা ঘটেছিল। ইসলামে এটিই সর্বপ্রথম মিম্বার।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৮ম হিজরী

📄 ৮ম হিজরী


অষ্টম হিজরী (৬২৯ খ্রীষ্টাব্দ): ৮ম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বনবী তাঁর নাম আপন ঊর্ধ্বতন দাদা হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ (আ.) এর নামে রাখেন। জন্মের সপ্তম দিন আকীকায় দু'টি ভেড়ী যবাই করেন। ছেলের মাথার চুল কাটার নির্দেশ দেন। আবু হিন্দ আল বাইয়াজী মাথার চুল কাটেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথার চুলের সমওজন পরিমাণ রৌপ্য সদাকাস্বরূপ গরীব মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। কোন কোন বর্ণনা মতে সপ্তম দিন নাম রাখেন। আবার কোন কোন বর্ণনা মতে জন্মের রাতেই নাম রাখেন। এ বছর শুরুতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বড় কন্যা হযরত যয়নব (রা.) ইন্তিকাল করেন। তার জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ত্রিশ অর্থাৎ নবুওয়াতের দশ বছর পূর্বে, তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।

জুমাদাল উলায় হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.), জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) মুতার যুদ্ধে সিরিয়াতে শাহাদাত বরণ করেন। তাদের শাহাদাতের সংবাদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে খুৎবার মাঝে একে একে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এটা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'জেযা। কারণ, মদীনা থেকে মুতা ছিল ১৮ দিনের রাস্তা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেন, 'আমি জাফরকে জান্নাতে ইয়াকুত পাথরের দু'টি বাহুসহ ফেরেশতাদের সংগে উড়ে বেড়াতে দেখেছি।' হযরত জাফরের শাহাদাতের পর যখন মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করেন তখন জনৈক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এর অভিযোগ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, তাদেরকে থামিয়ে দাও। তথাপি মহিলারা থামল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, 'ওদের মুখে মাটি ঢেলে দাও।' মুতার যুদ্ধে মহান আল্লাহ হযরত খালিদের (রা.) হাতে বিজয় দান করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় তাঁকে সাইফুল্লাহ উপাধি দেন। মহানবী এ বছর হযরত জাফর (রা.) কে তাইয়ার উপাধি দিয়ে ছিলেন।

এ বছর মক্কা বিজয়ের সময় হযরত এতাব ইবনে উসাইদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে নামায এবং হজ্বের জন্য মক্কার আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি এ বছর লোকজনকে হজ্ব করানোর দায়িত্ব পালন করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হুজার দেশের অগ্নিপূজকদের থেকে জিযিয়া ট্যাক্স আদায় করেন। মক্কা বিজয়ের পূর্বে হযরত আবু কাতাদা আনসারী (রা.) এর যে বাহিনী বতনে আজম পাঠান হয়েছিল সেখানে একটি ঘটনা ঘটে। হযরত মিহলাম ইবনে জুছামা লাইছী (রা.) এ যুদ্ধে শরীক ছিলেন। বনু সাজার আমীর ইবনে আজজা নামক ব্যক্তির সংগে তার সাক্ষাৎ হয়। ঐ গোত্রের আমীর, হযরত মিহলাম এবং তার সাথীদের সালাম দেন। কিন্তু সাবাহী (রা.) মনে করলেন যে, বর্ণিত সেনাপতি মুসলমান নয়। তাই তাকে হত্যা করে ফেলেন। যুদ্ধ শেষে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ফিরে এলেন, তখন এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে সফর কর তখন অনুসন্ধান করে নিবে। আর যে ব্যক্তি তোমাদের সম্মুখে আনুগত্য স্বীকার করে, তাকে বলো না যে, সে মুসলমান নয়।' হযরত আমর ইবনে আসসুহমী, খালিদ ইবনে মুগিরা আল মাখজুমী এবং ওসমান ইবনে আবু তালহা আল আবদারী (তিনি কা'বা শরীফের চাবি সংরক্ষক ছিলেন) ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা ৮ই সফর মদীনা তৈয়িবায় হাজির হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ ইসলাম গ্রহণের দু'মাস পরে মদীনায় পৌঁছে মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এর আগে ইসলামের পক্ষে কোন যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। এ বছর পারস্যবাসী, তাদের সম্রাটের মৃত্যুর পর বুরান নামক এক মহিলাকে রাষ্ট্রপ্রধান করে নেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, 'সে জাতি কখনও সফল হবে না, যারা তাদের ব্যাপার মহিলার হাতে তুলে দিয়েছে।'

মক্কা বিজয়ের দিনটি ছিল শুক্রবার। রমযানুল মোবারকের ১৯ তারিখ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বা শরীফ তোয়াফ করেন। অত্যধিক ভীড়ের কারণে প্রতিটি চক্করের সময় তিনি নিজ হাতের ছড়ি দিয়ে হজরে আসওয়াদে চুমু খান। এ তোয়াফ ওমরার জন্য নয় বরং তা ছিল নফল তোয়াফ। যা বায়তুল্লাহ শরীফের বরকত হাসিল করার জন্য করেছিলেন। কারণ এ সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এহরাম ছিল না। তাওয়াফ শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাকামে ইব্রাহীমে তাশরীফ নিয়ে আসেন। এখানে জমজমের পানি পান করেন এবং ওযু করেন। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বা শরীফের ভিতরে প্রবেশ করেন। কাবা শরীফের চাবি সংরক্ষক ওসমান ইবনে আবু তালহার (রা.) নিকট চাবি চান। তিনি জবাব দেন, চাবি আমার আম্মার নিকট। তার নাম ছিল সুলাকা বিনতে সায়ীদ আল আনসারিয়াহ। হযরত ওসমান ঘরে গিয়ে তার কাছে চাবি চান। তিনি চাবি দিতে অস্বীকার করেন। হযরত ওসমান জোর করে তার নিকট থেকে চাবি নিয়ে আসেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়ে দেন। মহানবী (রা.) নিজ হাতে বায়তুল্লাহর তালা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন এবং দু'রাকাত নামায আদায় করেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা পোষণ করেন যে, খানায়ে কা'বার চাবি হযরত ওসমান এবং তার মায়ের নিকট ফেরৎ দিবেন না। কারণ তার মাতা চাবি দিতে কড়াকড়ি করেছিলেন। তখন এ আয়াত নাযিল হয়, 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানতসমূহ তার মালিকের কাছে ফেরৎ দাও' (সূরা নিসা-৫৮)। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট আবার চাবি ফেরত দিয়ে দেন এবং বলেন, 'হে বন্ধু তালহা! লও এখন থেকে চিরদিন এ চাবি তোমাদের নিকটই থাকবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চাবি ফিরিয়ে দেন তখন ওসমান এবং তাঁর মাতা সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর এক বর্ণনা মতে জানা যায় যে, হযরত ওসমান ইবনে আবু তালহা মক্কা বিজয়ের সাত মাস পূর্বে অষ্টম হিজরীর সফর মাসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় ওসমান ইবনে আবু তালহার চাচাত ভাই শাইবা ইবনে আবু তালহা ইবনে আব্দুল উজ্জা ইসলাম গ্রহণ করেন। মতান্তরে তিনি হুনাইন যুদ্ধের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত ওসমান ইবনে আবি তালহার নিকট যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাবি ফেরৎ দেন, তখন মৃত্যু পর্যন্ত এটা তাঁর নিকট ছিল। ইস্তিকালের পূর্বে তিনি চাবি আপন চাচাত ভাই শাইবা ইবনে ওসমানের নিকট হস্তান্তর করে যান। আজ পর্যন্ত পবিত্র খানায়ে কাবার চাবি শাইবার বংশে রয়েছে।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে খাতালকে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করেন। সে ইসলাম গ্রহণ করার পর মুর্তাদ হয়ে গিয়েছিল। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে নিজেও কটূক্তি করত এবং তার দু'জন দাসী দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কুৎসা রটনা ও বাজে গান রচনা করাত। লোকজন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান যে, ইবনে খাতাল কা'বার পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যার নির্দেশ দেন এবং এ অবস্থাতেই তাকে হত্যা করা হয়। আবু বারজা আসলামী (রা.) তাকে হত্যা করেন। মক্কা বিজয়ের সময় আবু লাহাবের দু'ছেলে মুয়াত্তাব এবং ওতবা ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা সাহাবীর মর্যাদা লাভে ধন্য হন। হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আবু লাহাবের মেয়ে দুতারাও ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে তাদের ভাই, ওতাইবা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুবই কষ্ট দিত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আপনি ওর উপর আপনার কোন কুকুর লেলিয়ে দিন।' এ অভিশাপের ফলে একটি হিংস্র বাঘ তাকে চিরে খেয়ে ছিল। সিরিয়াতে তার পিতার সংগে জারকা নামক স্থানে সে কুফরীর অবস্থায় নিকৃষ্টভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল।

মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ, শুকর, মৃত জন্তু এবং এ ধরনের জন্তুর চর্বি বেচাকেনা হারাম ঘোষণা করেছিলেন। তেমনিভাবে গণকের শিরনীও হারাম ঘোষণা করেন। মক্কা বিজয়ের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৭/১৮ অথবা ১৯ দিন মক্কায় অবস্থান করেছিলেন। এ অবস্থায় নামায কুসর আদায় করেন। কারণ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কায় ১৫ দিনের বেশী থাকার ইচ্ছা ছিল না। যখন মক্কা বিজয় হয় তখন শয়তান চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। শয়তানের সন্তানাদী যখন তার পাশে এসে সমবেত হল, তখন সে বলল, 'আজ থেকে আরব দেশে শিরক চলবে না, এ ব্যাপারে তোমরা নিরাশ হয়ে যাও। তবে তাদের মধ্যে 'নওহা' বিস্তার কর। কোন লোক মারা গেলে মৃত ব্যক্তির জন্য সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কান্নাকাটির নাম নওহা। সুতরাং মৃত্যু দিবস পালন করা এবং জন্ম দিবস পালন করা উভয় শয়তানী চক্রান্ত। মক্কা বিজয়ের পরে ফাতিমা বিনতে আসওয়াদ আলমাখজুমিয়া অলংকার চুরি করে। অপর এক বর্ণনা মতে সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘর থেকে তা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য হাত কাটার নির্দেশ জারী করেন।

মক্কা বিজয়ের পরে মদীনার আনসার সাহাবা পরস্পরে কানাঘুষা শুরু করেন যে, মহান আল্লাহ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য মক্কা বিজয় করে দিয়েছেন। মক্কা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৈতৃক বাড়ি-ঘর। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়-স্বজন সবাই এখানে আছেন। সম্ভবতঃ মহানবী আমাদেরকে ছেড়ে এখানে (মক্কায়) থেকে যাবেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তা জানতে পেলেন, তখন আনসার সাহ- াবাদের বলেন, 'তোমাদের এবং আমার জীবন মরণ এক সাথে। অন্য সকল লোকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, বাইরের পোশাকের মত এবং আনসারদের দৃষ্টান্ত হল শরীরের সংগে লেগে থাকা ভিতরের পোশাকের মত। তারা আমার গোপনীয়তা রক্ষাকারী।' মহানবী আরও বলেন, 'যদি হিজরত না হত; তবে আমিও আনসারদের একজন হতাম। লোকজন যদি কোন এক মাঠ দিয়ে চলে এবং আনসাররা (রা.) অপর মাঠ দিয়ে তবে আমি আনসারদের সংগে চলব।' অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয় শেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুনাইন যুদ্ধের জন্য বের হন, তখন এতাব ইবনে উসাইদকে (রা.) মক্কার আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি মক্কায় অবস্থান করেন। এসময় তার বয়স হয়েছিল বিশ বছর। হুনাইনের যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে বার হাজার অপর বর্ণনা মতে চৌদ্দ হাজার সৈন্য ছিল। হুনাইনের রাস্তায় অত্যন্ত ঘন সবুজ একটি বরই গাছ দেখে কোন কোন নওমুসলিম বলে উঠেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের জন্যও একটি 'আনুয়াত' নির্ধারণ করে দিন, যেভাবে কাফিরদের জন্য এটা নির্ধারিত আছে।' উল্লেখ্য যে এ গাছটিকে আনুয়াত বলা হতো। এটা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহু আকবার! তোমরা এমন কথা বললে; যা মূসা (আ.) এর কওম বলেছিল।' তারা বলেছিল, 'হে মূসা! আমাদের জন্য একটি দেবতা নির্ধারণ করে দিন, যেভাবে কাফিরদের দেবদেবী আছে।' মূসা (আ.) বলেছিলেন, 'তোমরা এমন জাতি, যারা অজ্ঞতাপূর্ণ কথা বলে থাকো।' আনুয়াত বলতে হাতিয়ার লটকানোর উদ্দেশ্যে কাফিরগণ এ গাছের সম্মানার্থে এর উপর গিলাফ চড়াত।

এ বছর হুনাইন যুদ্ধে, প্রথমদিকে মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছিল। কাফির বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। এ অবস্থায় মুসলমানগণ গনীমতের মাল সঞ্চয় করতে শুরু করেন। আবার কেউ কেউ সংখ্যাধিক্যের কারণে অহংকার করতে থাকেন। ইতোমধ্যে কাফির বাহিনী পাল্টা প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে দেয়। তীর নিক্ষেপ করে মুসলমানদের ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং সবাই মক্কার দিকে পালাতে থাকেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকী শত্রু সৈন্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাদা রং এর খচ্চরের উপর মহানবী আরোহী ছিলেন। এটা বিশ্বনবীকে ফাওয়া ইবনে নেফাছা আল জুজামী হাদিয়াস্বরূপ দান করেছিলেন। এর নামছিল "কিছছ"। অপর বর্ণনা মতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দুলদুলের উপর আরোহী ছিলেন। সেটা মিশর বা আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ বিশ্বনবীকে দান করেছিলেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারিছ এর লাগাম ধরে রেখেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার যখন সাহাবায়ে কেরামকে আহ্বান জানালেন, তখন সকলেই ফিরে আসেন। মুসলমানগণ যখন ফিরে আসেন তখন একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। মহানবী খচ্চরের পিষ্ঠ থেকে নীচে নেমে আসেন। এক মুষ্টি কংকর হাতে নিয়ে কাফির সৈন্যদের লক্ষ করে নিক্ষেপ করেন এবং বলেন, 'কা'বার ররেব কুসম! কাফির বাহিনী পরাজিত হয়েছে।' আবার তিনবার বলেন, 'কাফিরদের চেহারা বিগড়ে যাক।' 'তাদের সাহায্য হবে না।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কংকর নিক্ষেপ করার সাথে সাথে সেগুলো সকল কাফিরের চোখে গিয়ে বিদ্ধ হয়। এ সময় সকল কাফিরের এমন মনে হচ্ছিল যে, প্রতিটি গাছ পালা পাথর এবং সকল বস্তু যেন এক একটি অশ্বারোহী সৈনিক হয়ে তাদেরকে ধাওয়া করছে। মোটকথা মহান আল্লাহ পাক একমাত্র তার নিজ সাহায্যে কাফিরদের পরাজিত করে দেন। مسلمانوں আর কোন যুদ্ধই করতে হয়নি। মুসলমানগণ সে যুদ্ধে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ময়দানে একা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ সওয়ারীকে কাফির বাহিনীর দিকে হাকাচ্ছিলেন এবং নিম্নের কবিতা পাঠ করছিলেন, 'আমি সত্যিকার নবী। মিথ্যাবাদী নই। আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।' হুনাইনের যুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে ফিরিশতা পাঠিয়ে ছিলেন। তারা ছিলেন সাদা রং বিশিষ্ট মানুষের আকৃতিতে। তাদের মাথায় ছিল লাল পাগড়ী। সকলেই অশ্বারোহী। পাঁচ হাজার ফিরিশতা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহায্যের জন্য অবতরণ করেছিলেন। যেমন কুরআন পাকে বলা হয়েছে, 'আল্লাহ সৈন্য পাঠিয়ে ছিলেন যা তোমাদের দৃষ্টিতে আসেনি' (সূরা তওবা-২৬)। হুনাইন যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছিলেন, যে ব্যক্তি কোন কাফিরকে হত্যা করবে, সে ঐ কাফিরের মালামাল পাবে, তবে এ বিষয়ে সাক্ষী থাকতে হবে। এ যুদ্ধে হযরত আবু তালহা যায়েদ ইবনে ছাহল আনসারী একা বিশজন কফিরকে হত্যা করেন এবং তাদের ছামানা খুলে ফেলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছামানার সব কিছু তাঁকে দিয়ে দেন।

হুনাইনের যুদ্ধে অনেক কাফির এবং তাদের মালামাল জীবজন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হস্তগত হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গনীমতের মালামাল সাহাবায়ে কেরামকে হস্তান্তর করে সেগুলো জিয়িয়ারানায় পাঠিয়ে দেন। অতঃপর তায়েফ অভিযান থেকে জিয়িয়ারানায় ফিরে এসে সেগুলো বণ্টন করে দেন। হুনাইন যুদ্ধ সম্পর্কে তখন এ আয়াত নাযিল হয়, 'মহান আল্লাহ বহু জায়গাতে তোমাদের সাহায্য করেছেন এবং হুনাইনের দিনেও যখন তোমরা সংখ্যাধিক্যের কারনে গর্বিত ছিলে' (সূরা-তওবা)। হুনাইন যুদ্ধে একজন মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, 'কে তাকে হত্যা করেছে?' হযরত খালিদ ইবনে ওলীদের কথা বলা হলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদকে নির্দেশ দেন: কোন মহিলা, কোন শিশু এবং কোন দুর্বল বৃদ্ধ লোককে যেন হত্যা করা না হয়। হুনাইন যুদ্ধে চারজন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন, আইমন ইবনে উম্মে আইমন (রা.)। উম্মে আইমন ছিলেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাসী, যিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লালন পালন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, এ আইমন ভিন্ন একজন; আনসারী কাবিলার ছিলেন। তার বংশ ধরা হচ্ছে আইমন ইবনে উবায়েদ ইবনে যায়েদ আল খাযরাজী আল আনসারী। এ উভয় কথার মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য করা হয়েছে যে, উম্মে আইমনের শাদী হয়েছিল উবায়েদ আনসারীর (রা.) সংগে। তার ঔরসে উম্মে আইমন (রা.) জন্ম নিয়েছিলেন। উবায়দের (রা.) ইন্তিকালের পরে উম্মে আইমনের বিয়ে যায়েদ ইবনে হারিসের (রা.) সংগে হয়েছিল। তার ঘরে হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। কাজেই আইমন হচ্ছেন উসামার মা (জুরকানী শরহে মাওয়াহিব)। হুনাইন যুদ্ধে বাকী তিনজন শহীদ সাহাবী হলেন, এজীদ ইবনে জুময়া ইবনে আসওয়াদ (রা.), সুরাকা ইবনে হারিছ আনসারী (রা.) এবং আবু আমির আশয়ারী (রা.)। এ যুদ্ধে আবু লাহাব গেফারীও (রা.) শহীদ হয়েছিলেন। হুনাইন যুদ্ধে তিনশত কাফির নিহত হয়েছিল। কোন কোন উক্তি মতে সত্তর জন নিহত হয়েছিল। অর্থাৎ পরাজয়ের পূর্বে ৭০ জন এবং পরে তিনশত নিহত হতে পারে। হুনাইনের যুদ্ধে কাফিরদের অনেক মহিলা বন্দী হয়েছিল। তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলমান সৈন্যদের মধ্যে তাদেরকে বিয়ে দেয়া হয়। যেহেতু তাদের কাফির স্বামী জীবিত ছিল তাই মুসলমানগণ দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর বিবাহিত মহিলা, সেসব মহিলা ব্যতীত যাদের মালিকানা তোমাদের রয়েছে। যদিও তাদের কাফের স্বামী থাকে তথাপি তারা তোমাদের জন্য হালাল।' এ বছর সাহাবায়ে কেরাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আজল (বীর্য প্রত্যাহার করা) সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। মহানবী উত্তর দেন, 'না তোমাদের উচিৎ তোমরা এভাবে করবে না। যে প্রাণ কিয়ামত পর্যন্ত জন্ম নিবে, সে জন্ম নিয়েই থাকবে।' তায়েফ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এটা আবু রেগালের কবর। সে ছিল ছামুদ বংশীয়। তার সংগে স্বর্ণের সিলও দাফন করা হয়েছে।' সাহাবাগণ এ স্থানটির মাটি খুঁড়েছিলেন এবং এতে স্বর্ণের সিল বের হয়ে আসে। এটা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'জেযা। অষ্টম হিজরীতে তায়েফের যুদ্ধের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, যে গোলাম তায়েফবাসী থেকে বের হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে, সে আজাদ হবে। এ ঘোষণা শুনে তিনজন গোলাম এগিয়ে এলে, তিনজনকেই আল্লাহর ওয়াস্তে আজাদ করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবু বাকরাহ লুফাই ইবনে মাসরোহ। তিনি ছিলেন হারিছ ইবনে কেলদার গোলাম। তিনি এবং তাঁর সকল সাথী ইসলাম গ্রহণ করেন। তায়েফের যুদ্ধে ছাবিত ইবনে জিয়া আল আনসারী (রা.) শহীদ হন। তিনি বাইয়াতে আকাবা এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তায়েফের যুদ্ধে হযরত সালমান ফার্সীর (রা.) পরামর্শে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রেন বা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করেছিলেন। এ ছিল মুসলমানদের ব্যবহৃত সর্বপ্রথম মিনজানিক বা ক্রেন বা ক্ষেপণাস্ত্র। সেখান থেকে গোলা বর্ষণ করা হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর ছেলে আব্দুল্লাহ (রা.) তায়েফে শহীদ হন।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৯ম হিজরী

📄 ৯ম হিজরী


নবম হিজরী (৬৩০ খ্রীষ্টাব্দ): নবম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের যাকাত আদায় করে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য কিছু ব্যক্তিবর্গকে নিযুক্ত করেন। নবম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে যখন বনু তামীমের একটি প্রতিনিধি দল আসে এবং তারা হুজরার বাইরে থেকে চীৎকার করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডাক দেয়, তখন আয়াত নাযিল হয়, 'নিশ্চয় যে সকল লোক আপনাকে হুজরার বাইর থেকে আহবান করছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই বুদ্ধি রাখে না' (সূরা হুজরাত-৪১)।

একই বছর বনু তামীমের প্রতিনিধি দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে প্রশ্ন করে যে, তাদের নেতা কে হবেন? হযরত আবু বকর (রা.) এবং ওমর (রা.) এ দু'জনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। হযরত আবু বকরের অনুরোধ ছিল কাইনুক ইবনে মা'বাদকে আমীর করা হোক এবং হযরত ওমরের আবেদন ছিল আফরা ইবনে জালিসকে আমীর করা হোক। হযরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.) কে বলেন, 'তুমি শুধু আমার বিরোধিতা করতে চাও।' এ বিতর্কে উভয়ের শব্দ উঁচু হয়ে গেলে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগে বাড়া-বাড়ির চেষ্টা কর না' (আল হুজুরাত-১)। এরপর থেকে তাঁরা অত্যন্ত ধীর শব্দে কথা বলতেন এবং এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়, 'নিশ্চয় যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে নিজেদের আওয়াজ নীচু রাখেন, আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহকে তাক্বওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন।' (সূরা হুজরাত-৩)

নবম হিজরী (৬৩০ খ্রীষ্টাব্দ): নবম হিজরীতে রজব মাসে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর ইন্তিকাল হয়। তার নাম ছিল আসহিমা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নামাযে জানাযা পড়েছিলেন। তাতে চার তকবীর পাঠ করেছিলেন এবং বলেছিলেন তোমাদের ভাইয়ের জন্য মাগফিরাত কামনা কর। একই বছর আব্দুল কয়েসের (রা.) প্রতিনিধি দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা দীন ইসলাম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন এবং জানতে চান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ করছি এবং চারটি বিষয়ে নিষেধ করছি। তোমাদের ঈমান, নামায, যাকাত এবং রোযা পালনের নির্দেশ করছি এবং কদুর পাত্র, মাটির তৈলাক্ত রংগীন পাত্র, খেজুরের গুড়ির পাত্র এবং তার কূলের রঙ্গিন বাসন ব্যবহার নিষেধ করছি।' শরহে মাওয়াহিবে আছে যে, আব্দুল কয়েসের (রা.) দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে দু'বার হাজির হয়েছিলেন। প্রথমতঃ পঞ্চম হিজরীতে, দ্বিতীয়ত নবম হিজরীতে। প্রথম দফায় তের বা চৌদ্দজন এবং দ্বিতীয় বার চল্লিশ জন এসেছিলেন। নবম হিজরীতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দূর-দুরান্ত হতে প্রতিনিধিসমূহ আসতে থাকেন। তাই এর নাম 'প্রতিনিধি আগমনের সন' রাখা হয়। প্রতিনিধিগণের আগমন তখন থেকে শুরু হয়েছিল, যখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ যুদ্ধ থেকে ফিরে জিয়িয়ারানা অবস্থান করেন। অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসের শেষদিকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। ৫ই যিলক্বদ তারিখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিয়িয়ারানা তাশরীফ নিয়ে আসেন। হাফিয মুগলতায়ী তার সীরাত গ্রন্থে যেসব প্রতিনিধি দলের কথা উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ যারা জিয়িয়ারানা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে ইন্তিকালের সময় পর্যন্ত দরবারে নবুওয়াতে হাজির হয়েছিলেন। তাদের সংখ্যা ষাটেরও অধিক। আল্লামা শামী একশতের অধিক দলের কথা লিখেছেন। অতি সংক্ষেপে ক'টি দলের আলোচনা করা যেতে পারে।

বনু ফাজারা অনাবৃষ্টি এবং দুর্ভিক্ষের অভিযোগ নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ মু'জেযা এভাবে প্রকাশ পায়। মহানবী দোয়ার জন্য হাত উঠালেন সংগে সংগে বৃষ্টি হতে শুরু করে। এক সপ্তাহ পর্যন্ত অনাবরত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে। অভিযোগ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন খারিজা ইবনে মিহসান। বুখারী শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে যে বেদুঈনের কথা বলা হয়েছে ইনি ছিলেন সেই ব্যক্তি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুতবা দানরত অবস্থায় এ অভিযোগ করা হয়েছিল। বনু আসাদ ইবনে খুজাইমার প্রতিনিধি দল হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ওয়াবিসা ইবনে মুয়ীদ এবং তোলাইহা ইবনে খুয়াইলিদ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দয়ার ভংগিতে বলেন, 'আমরা দুর্দিনে আঁধার রাতের পোশাক পরিধান করে আপনার কাছে এসেছি, অথচ আপনার কোন বাহিনী আমদের নিকট প্রেরণ করতে হয়নি।' এ কথা প্রসংগে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'তারা আপনার প্রতি দয়া প্রদর্শন করছে যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছে। আপনি বলে দিন, আমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করবে না। বরং তোমাদের প্রতি আল্লাহ দয়া করেছেন যে, তোমাদের ঈমানের পথে পরিচালিত করেছেন' (সূরা হুজুরাত-১৭)। অতঃপর তাঁরা ইসলামের উপর কায়েম থাকে একমাত্র তোলাইহা ইবনে খুয়ালিদ ব্যতীত। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরে মুর্তাদ (ধর্মান্তরিত) হয়ে যায় এবং নবুওয়াতী দাবী করে বসে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নিজ খেলাফতকালে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে সৈন্যসহ তাকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করেন। তুমুল সংঘর্ষ হয়। সে পলায়ন করে সিরিয়াতে চলে যায়। পরবর্তীতে সে যথাযথভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। অতঃপর হযরত ওমর (রা.) এর শাসন আমলে মদীনায় এসে হাজির হয়।

বনু কেলাবের প্রতিনিধি দল বিশ্বনবীর কাছে হাজির হয়। তাদের মধ্যে লবীদ ইবনে রবিয়া এবং আবু আকিল আল আমেরীও শরীক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি। তার সম্পর্কেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, কোন কবির সবচেয়ে সত্যকথা হচ্ছে লবীদের এ কবিতাংশ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই বাতিল এবং পার্থিব সকল ভোগ বিলাস একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে।' তিনি এবং তাঁর সাথীগণ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন সহধর্মিণীগণের সংগে 'ঈলা' করেছিলেন এবং বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম! একমাস পর্যন্ত তোমাদের সংস্পর্শে আসব না।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। ফলে ডান বাহুতে এবং পায়ের গোঁড়ালীতে জখম হয়েছিল। এ জন্য ঘরে অবস্থান করেন। এ সময় মসজিদে নামাযের জন্য হাজির হতে পারতেন না। ঘরে বসে বসে নামায আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরাম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে আসলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন 'ইমাম এ জন্য নিয়োগ করা হয় যাতে তার অনুসরণ করা যায়। অতএব, তিনি যখন তাকবীর বলবেন, তোমরা তাকবীর বলবে, যখন রুকু করবেন, তোমরাও রুকু করবে। যখন রুকু থেকে মাথা উঠাবেন, তোমরাও মাথা উঠাবে। তিনি যখন বসে নামায পড়েন, তোমরাও বসে নামায পড়বে।'

ঈলা এবং আহত হওয়ার উভয় ঘটনা একই সময় ঘটেছিল। তবে ঘটনার সন সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নবম হিজরীতে। ইয়ামারী 'হাদীস' গ্রন্থে এবং ক্বাসতালানী 'মাওয়াহিব' গ্রন্থে এবং অন্যান্য অনেক আলিম অকাট্যভাবে তাই বলেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এটা পঞ্চম হিজরীর ঘটনা। হাফিয ইবনে হাজার এবং ক্বাসতালানী বুখারীর ব্যাখ্যাকার এর উপর জোর দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, এ ঘটনাদ্বয় ৬ষ্ঠ হিজরীতে ঘটেছিল। তবে এ দু'টি ঘটনা যে, যিলহজ্ব মাসে এবং পর পর একসাথে ঘটেছিল তাতে যেন মতবিরোধ নেই। যখন ঈলার সময়সীমার মেয়াদ অর্থাৎ একমাস শেষ হল, তখন সূরা আহযাবের দুটি আয়াত নাযিল হয়। এতে বিশ্বনবীর সম্মানিত স্ত্রীদেরকে অনুমতি দেয়া হয়েছিল যে, তারা যদি পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এবং ভোগ- বিলাসিতা কামনা করেন তবে তাদেরকে বিদায় দেয়া হবে। আর যদি আল্লাহ ও রাসূলের সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের বাড়ি চান, তাহলে তাঁদেরকে সকল দাবী দাওয়া পরিত্যাগ করতে হবে।' এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদেরকে শুনান। তখন সকলেই একবাক্যে বলে উঠেন, 'আমরা আল্লাহ, রাসূল এবং আখিরাতের সুখ-শান্তিই চাই।' সর্বপ্রথম এ জবাব দিয়েছিলেন হযরত আয়িশা (রা.)। তাকে অনুসরণ করে অন্যান্য সকল স্ত্রীগণ একই কথা বলেছিলেন।

৯ম হিজরীতে মহিলা সাহাবী গামিদিয়াকে (রা.) প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়। সে ব্যভিচারের কারণে অন্তঃসত্তা ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে তিনি চারবার ব্যভিচারের কথা স্বীকার করেন এবং নিজেই নিজেকে শাস্তি প্রদানের আবেদন করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সন্তান প্রসব এবং সন্তানের দুধ ছাড়ানোর সময়সীমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। সাহ-াবী (রা.) যখন সন্তান প্রসব এবং দুধ ছাড়ানো মেয়াদ পূরণ করেন তখন তাকে প্রস্তর নিক্ষেপ করা হয়। অতঃপর বিশ্বনবী জানাযা পড়ান। পরে তাকে দাফন করা হয়। এই সাহাবী (রা.) সম্পর্কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, 'এ মহিলা এমন তওবা করেছে যে, যদি ট্যাক্স উসুলকারীও এমন তওবা করে তবে তারও ক্ষমা হয়ে যাবে। কত গভীর ও মজবুত ঈমান থাকলে মুমিন আল্লাহর নির্দেশকে মেনে নিতে পারে এটি তারই উদাহরণ। ৯ম হিজরীতে কোন কোন সাহাবা (রা.) অস্ত্র বিক্রি করে ফেলেন। তাঁরা বলেন জিহাদ শেষ হয়ে গেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'জিহাদ শেষ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত হযরত ঈসা ইবনে মরিয়াম অবতরণ করবেন।' অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণের পূর্ব পর্যন্ত জিহাদ বন্ধ হবে না; তা চলবে। একই বছর হযরত জিব্রাঈল (আ.) লোকজনকে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে শুভাগমন করেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান, ইহসান এবং কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফে এ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। উক্ত হাদীসকে উম্মুল হাদীস অর্থাৎ হাদীসসমূহের মা বলা হয়ে থাকে।

এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটি মু'জেযা প্রকাশিত হয়। জনগণ অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষে পতিত হয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার মসজিদে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে জনৈক বেদুঈন মসজিদে এসে হাজির হন। তিনি আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনাবৃষ্টির কারণে জীবজন্তু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সন্তানাদি অনাহারে মারা যাচ্ছে। আমদানী রফতানী বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন, যাতে আল্লাহ বৃষ্টি দান করেন।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার অবস্থাতেই হাত উঠালেন এবং দোয়া করলেন। 'হে আল্লাহ! আপনি আমাদের পর্যাপ্ত বৃষ্টি দান করুন।' হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, 'আল্লাহর কসম! মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও মিম্বার থেকে অবতরণ করেননি, বৃষ্টিপাত শুরু হল। আমি দেখতে পেলাম বৃষ্টির ফোঁটা তাঁর দাড়ি মোবারক থেকে পড়তে শুরু করেছে।' পরবর্তী জুমু'আ পর্যন্ত একাধারে বিরামহীন বৃষ্টি হতে থাকে। সপ্তাহব্যাপী সূর্যের মুখ কেউ দেখেনি। পরবর্তী জুমু'আর দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে খুতবা দান করছিলেন। সে বেদুঈন অথবা অন্য কেউ এসে আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ অতি বৃষ্টির কারণে মালামাল জীবজন্তু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রাস্তা ঘাট বন্ধ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি যথেষ্ট হয়েছে। এবার তা বন্ধ হওয়ার জন্য দোয়া করুন।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার মধ্যেই হাত উঠালেন এবং দোয়া করলেন। 'হে আল্লাহ! আমাদের আশেপাশে হোক, আমাদের উপরে নয়। আয় আল্লাহ! পাহাড়ে বা টিলায় মাঠে গাছ-পালায় এবং জংগলে বৃষ্টি হোক।' দোয়ার সাথে সাথে মেঘের কাল ছায়া দূর হয়ে গেল। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্য দু'বার দোয়া করেছিলেন। বুখারী শরীফে দ্বিতীয়বারের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমবারের ঘটনা ৬ষ্ঠ হিজরীতে হয়েছিল।

যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে ফিরে আসেন তখন আব রুক্বিয়া তামীম ইবনে আওস ইবনে খারিজা আদদারী (রা.) ছয় সদস্য বিশিষ্ট দল নিয়ে হাজির হন। তিনি ছিলেন খ্রীষ্টান। দলের সকলেই ইসলাম কবুল করেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাসাসা এবং দাজ্জালের কাহিনী বর্ণনা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বর্ণনা মিম্বরে বয়ান করেছেন। সে কথাটি তামীম দারীর মান মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত। তামীমদারী (রা.) হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে তার অনুমতি নিয়ে ওয়াজ করা শুরু করেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মসজিদে বাতি জ্বালানোর প্রথা চালু করেন। তিনি পরিপূর্ণ কুরআন মজীদ এক রাকাতে সমাপ্ত করতে পারতেন। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওলীদ ইবনে ওকবা ইবনে আবু মুয়ীতকে বনু মুস্তালিকের যাকাত আদায়ের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। জাহেলিয়াতের যুগে ওলীদ এবং বনু মুস্তালিকের মধ্যে শত্রুতা ছিল। ওলীদকে সম্ভবত কেউ ভুল তথ্য দিয়েছিল যে তারা তোমাকে হত্যা করতে চায়। তাই তিনি ভীত হলেন এবং রাস্তা থেকে ফিরে এলেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এসে বলেন, 'তারা ইসলাম ছেড়ে দিয়েছে। তারা যাকাত দেয়নি।' এ সংবাদ শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। ইতোমধ্যে বনু মুস্তালিকের লোকজন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন, 'আমরা মুর্তাদ হইনি কিংবা যাকাত আদায়ের অস্বীকৃতি প্রকাশ করিনি। ওলীদকে কেউ ভুল সংবাদ দিয়েছে, যা তিনি যাচাই না করে, বিশ্বাস করে নিয়েছেন।' এ প্রসংগে আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে খবর নিয়ে আসে, তবে তোমরা তার সত্যতা যাচাই করবে' (আল হুজুরাত-৬)। এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুঃখ দূর হয়ে যায় এবং তিনি এ আয়াত পাঠ করে তাকে শুনান এবং বলেন, 'চিন্তা ভাবনা করে কাজ করা রহমানের পক্ষ থেকে এবং তাড়াহুড়া করা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।' অতঃপর তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আব্বাস ইবনে বিশর (রা.) কে বনু মুস্তালিকবাসীর নিকট পাঠান। তিনি যাকাত উসুল করে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে দ্বীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে অবিহিত করেন।

আলকামা ইবনে মুহাতারাজ আল মাদলাজীর (রা.) বাহিনী আবিসিনিয়ার কিছু লোকের সংগে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। আলকামা তার বাহিনীর কিছু লোকের আমীর হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস সামীকে (রা.) নিযুক্ত করেন। আব্দুল্লাহ কোন কারণবশতঃ তার সাথীদের উপর খুব নারাজ হয়ে গেলেন। তিনি তাদেরকে কাঠ জমা করে আগুন জ্বালাতে নির্দেশ করেন। তারা নির্দেশ পালন করেন। তিনি তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'আমীরের নির্দেশ পালন করার কথা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের বলেননি।' তারা উত্তর দেন, 'নিশ্চয়।' তিনি তখন বলেন, 'আমি আমীর হিসেবে নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়।' কেউ কেউ বলেন যে, আমীরের নির্দেশ হলে আমাদের তা মেনে নেয়া উচিৎ। আবার কেউ কেউ বলেন যে, আমরা আগুন থেকে বাঁচার জন্যই তো ইসলামে এসেছি। কাজেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ব না। ফলে একজনও আগুনে ঝাঁপ দেয়নি। ইতোমধ্যে আব্দুল্লাহর ক্রোধও প্রশমিত হয়। মদীনায় ফিরে আসার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে বিষয়টির আলোচনা চলে আসে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা যদি আগুনে প্রবেশ করতে, তাহলে আর কোনদিনই তা হতে বের হতে পারতে না। শিক্ষণীয় বিষয় হল, নেতা বা আমীরের আনুগত্য ভাল কাজেই করতে হয়। শরীয়ত বিরোধী কাজে নয়।' তাবুক থেকে ফিরে এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে যেরার ধ্বংস করার নির্দেশ প্রদান করেন। এ মসজিদটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে যাওয়ার কিছুদিন পূর্বে মুনাফিকেরা নির্মাণ করেছিল। এ মসজিদ সম্পর্কে কুরআন পাকে বলা হয়েছে, 'কিছুলোক রয়েছে, যারা এসব হীন উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করেছে। যাতে ইসলামের ক্ষতিসাধন করতে পারে এবং কুফরী কথাবার্তা বলে আর ঈমানদারগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।' (সূরা তওবা-১০৭)

৯ম হিজরীতে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল বিশ দিন অসুস্থ থাকার পর মৃত্যুবরণ করে। ওমর (রা.) এর চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও, দয়ার কা ারী বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়ান। তার সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়, 'এসব মুনাফিকদের কেউ মারা গেলে আপনি (বিশ্বনবী সা.) কখনও তাদের জানাযা পড়াবেন না। তাদের কবরের পাশে দাঁড়াবেন না।' হযরত ওমর (রা.) এর অভিমতও ছিল তাই। এভাবে পনেরটি বিষয়ে হযরত ওমর (রা.) এর অভিমত অনুযায়ী আয়াত নাযিল হয়েছিল। দয়ার সাগর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত মুনাফিক সর্দারের প্রতি এতই সদ্ব্যবহার এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করেছিলেন যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার কবরে অবতরণ করেন। নিজের জামা মোবারক তাকে কাফনে পরিধান করান। কোন কোন সাহাবা (রা.) তাতে আপত্তি করেন। তারা এ ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে কথা বলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, 'এর মধ্যে কৌশল রয়েছে। আশা করি আমার এ সদাচরণের ফলে তার কওমের কিছু লোক ঈমান নিয়ে আসবে।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আশাবাদ বাস্তবে রূপ নিল। এ কৌশল অবলম্বনের সুফল এভাবে প্রকাশ পেল যে, মুনাফিকরা দেখল তাদের সর্দার কিভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বারবার কষ্ট দিয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সদ্ব্যবহার ও সুন্দর আচরণও প্রত্যক্ষ করল। মুনাফিক সর্দার তার মৃত্যুর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জামা মোবারকও প্রত্যাশা করছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাও দান করেন। এ আচরণ দেখে এক হাজার মুনাফিক সত্যিকার অন্তরে তওবা করে এবং মুসলমান হয়ে যায়।

নবম হিজরীতে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর সংগে হজ্ব পালন করেন। কুরবানী বা হাদীর জন্তু সংগে নিয়ে যান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পেছনে হযরত আলী (রা.) কে পাঠালেন যাতে সূরা বারাতের প্রথম পাঁচটি আয়াতের ঘোষণা শুনিয়ে দেয়া হয়। হযরত আলী (রা.) আরজ নামক স্থানে গিয়ে হযরত আবু বকরের সংগে মিলিত হন। মক্কা মুকাররামা পৌছার পর হযরত আবু বকর (রা.) হযরত আলী (রা.) কে বলেন, তিনি যেন সূরা বারাতের আয়াত সম্বলিত ঘোষণা পত্র পাঠ করে শুনিয়ে দেন। তা ছিল : আজ থেকে ভবিষ্যতে কোন মুশরিকের সংগে কোন ধরনের সন্ধি চুক্তি নেই। এ বৎসরের পরে আর কোন মুশরিক হজ্ব করতে আসতে পারবে না। কোন ব্যক্তি বায়তুল্লার তোয়াফ উলংগ হয়ে করতে পারবে না। এ ছিল সর্বশেষ হজ্ব যে হজ্বে, মুশরিকরাও অংশ নিয়েছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল, 'হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মুশরিকরা (তাদের বাতিল আকীদা বিশ্বাসের কারণে) নিরেট নাপাক। সুতরাং তারা এ বছরের পরে মসজিদুল হারামের পাশেও যেন না আসে' (সূরা তওবা- ২৮)। এ বিধান নাযিলের পর মুসলমানগণ ভাবতে লাগলেন মুশরিকরা যদি না আসে তবে আমাদের জন্য খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কে নিয়ে আসবে? এ প্রেক্ষিতে আয়াতের পরবর্তী অংশ নাযিল হয়, 'তোমরা যদি দারিদ্র্যতার আশংকা করো তবে (আল্লাহর উপর ভরসা কর)। আল্লাহ তোমাদের তার ফযলে কারো মুখাপেক্ষী রাখবেন না যদি তিনি চান।' (সূরা তওবা-২৮)

৯ম হিজরীর শাবান মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন হযরত ওসমান (রা.) এর সহধর্মিণী। তবে তার গর্ভে কোন সন্তান হয়নি। তাবুকের যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ত্রিশ হাজার সৈন্য ছিল। কেউ কেউ বলেছেন তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর হাজার। এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে দশ হাজার মতান্তরে বার হাজার ঘোড়া ছিল। তাবুক যুদ্ধের জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সদাকার জন্য উৎসাহিত করেন এবং মুক্তহস্তে চাঁদার জন্য নির্দেশ দেন। এতে সর্বপ্রথম হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাঁর ঘরের যাবতীয় মালামাল নিয়ে হাজির হন। এসবের মূল্য ছিল চার হাজার দিরহাম। হযরত ওমর (রা.) তার সকল সম্পদের অর্ধেক নিয়ে আসেন। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) দু'শত ওকিয়া, কারও মতে চার হাজার দিরহাম চাঁদা দেন। এটা ছিল তার গোটা সম্পদের অর্ধেক। হযরত আসিম ইবনে আদী (রা.) ষাট ওসক খুরমা পেশ করেন। আবু আকিল এক সা কিংবা অর্ধেক সা খেজুর চাঁদা দেন। মোটকথা সকলেই সাধ্যানুযায়ী দান করেন। এমনিভাবে মহিলারা তাদের হাতের চুড়ি, বাজুবন্দ, গলার হার, পায়ের মল, আংটি, নাকের ফুল ইত্যাদি পেশ করেন।

মুনাফিকরা উভয়পক্ষকে দোষারোপ করে। যারা বেশী দান করে তাদেরকে রিয়াকার অর্থাৎ লোক দেখানোর অপবাদ দেয়। যারা কম দিয়েছিলেন তাদের সম্পর্কে বিদ্রূপ করে বলে, 'এটা না দিলে আর জিহাদ করাই সম্ভব হত না।' মুনাফিকদের এ ধরনের অন্তর বিদীর্ণকারী কটুকথার জবাবে আয়াত নাযিল হয়, 'এ মুনাফিকরা হচ্ছে এমন যে, নফল সদাকা দাতা, চাঁদা দানকারীদেরকে অপবাদ দিয়ে থাকে এবং সেসব দাতাদের নিয়েও কথা বলে যাদের মেহনত মজদুরী ব্যতীত তাদের অন্য কোন অবলম্বন নেই।' (সূরা তওবা) তাবুক যুদ্ধে হযরত ওসমান (রা.) মুক্তহস্তে দান করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি খাদ্য সামগ্রী এবং যুদ্ধের রসদপত্র ভর্তি নয়শত উট, একশত ঘোড়া, এক সহস্র দীনার আল্লাহর পথে ব্যয় করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে অত্যধিক খুশি হলেন এবং ইরশাদ করেন, 'হে ওসমান! আল্লাহ তোমার প্রকাশ্য এবং গোপনীয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত সকল গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আজকের পরে তুমি যে আমলই কর না কেন, তাতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না।' বিরাশি জন মুনাফিক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে তাবুকের যুদ্ধে যায়নি। তারা ঘরে বসে থাকে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে মিথ্যা টালবাহানা করে। তাদের সম্পর্কে দুটি আয়াত নাযিল হয়। 'কিছু বাহানাকারী লোক বেদুঈনদের মধ্য থেকে এসেছিল, যাতে তাদের ঘরে বসে থাকার অনুমতি হয়ে যায়' (সূরা তওবা-৯)। 'পশ্চাৎ অবলম্বনকারীরা খুশি হয়ে গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে বসে থাকার কারণে' (সূরা তওবা-৮১)। সে বছর তাবুক যুদ্ধ থেকে বিরতকারী মুনাফিকদের মধ্যে দু'ভাই ছিল। তারা হলেন, (১) জালাস ইবনে সুয়াইদ, (২) হারিছ ইবনে সুয়াইদ। তারা দু'জন ছিল আওস গোত্রের সদস্য। জালাস বলেছিল, 'এ ব্যক্তি যদি সত্যবাদী হয় তাহলে আমরা গাধার চেয়েও অধম।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ পেয়ে তাকে জিজ্ঞাস করলে সে স্পষ্ট ভাষায় তা অস্বীকার করে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন। 'তারা কুসম খেয়েছে যে, আমরা এমন কথা বলিনি। অথচ তারা কুফরীর কথা বলেছিল। আর তারা এ কুফরীর কথা বলায় নিজেদের বাহ্যিক মুসলমান দাবী করার পর স্পষ্ট কাফির হয়ে গেছে' (সূরা তওবা-৭৪)। এতে তার কুফর এবং নিফাক প্রকাশিত হয়ে পড়ে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে করে ভাবনায় পড়েন। তখন আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহ এমন সব লোকদের কেমন করে হিদায়াত করবেন যারা ঈমান নিয়ে আসার পরে কাফির হয়ে গেল।' (সূরা আলে ইমরান-৮৬)

তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'রোম সাম্রাজ্যের সংগে জিহাদ কর।' রোমানদের মেয়েরা তোমাদের দাসী হবে। একথা শুনে সাদ ইবনে কয়েস ইবনে সাখরা আল আনসারী আস সালমী (বনু সলীমের সর্দার) বলে উঠলো আমি যদি ঐ মহিলাদের দেখতে পাই তখন নিজেকে সামাল দিতে পারি কি না ফিতনায় পড়ে যাই। তার মধ্যে মুনাফিকীর খাসলত বা নমুনা ছিল। সে আরও বলল, সে কারণে আমাকে যুদ্ধে না যাওয়ার অনুমতি দিন। আমি আর্থিক সহযোগিতা করব। এ প্রসংগে আয়াত নাযিল হয়, 'ঐসব মুনাফিকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছে, যে বলে থাকে আমাকে অনুমতি দিন। আমাকে ফিতনায় ফেলবেন না' (সূরা তাওবা-৪৯)। তার আর একটি ঘটনা হল, হুদাইবিয়ার সময় যখন সকল সাহাবী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বাইয়াত করেন, তখন সে নেকাবের কারণে তা থেকে বিরত থাকে। সে তার উটের নীচে আত্মগোপন করে। ৯ম হিজরীতে সকল সাহাবায়ে কেরাম যারা সক্ষম ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তবে তিনজন সাহাবী অংশগ্রহণ করেননি। তারা হলেন, কাব ইবনে মালিক, হেলাল ইবনে উমাইয়া এবং মুরার ইবনে রবী (রা.)। তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সাহাবাকে, এ তিনজনকে বয়কট করার নির্দেশ দেন। এভাবে পঞ্চাশ দিন চলে যায়। তাদের উপর চিন্তা এবং অশান্তির পাহাড় নেমে আসে। তখন আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করেন। কারণ তারা মুনাফিকদের মত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে মিথ্যা ওজুহাত খাড়া না করে সত্য কথা বলেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। তখন হযরত আলী (রা.) এর কাছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগী হওয়া থেকে মদীনায় বিছিন্নভাবে অবস্থান করা কষ্ট ও বিরক্তিকর মনে হয়। তিনি আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাকে মহিলা এবং শিশুদের মধ্যে ফেলে যাচ্ছেন?' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আলী! তুমি কি তাতে রাজী নও। যেন আমার সংগে তোমার সম্পর্ক এমন হোক যেভাবে মূসা (আ.) এর সংগে সম্পর্ক ছিল হারুন (আ.) এর। তবে মনে রেখো আমার পরে আর কোন নবী নেই।' জুরকানী শরহে মাওয়াহিবে লিখেছেন যে' এটাই গ্রহণযোগ্য যা বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ শরীফে সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, তাবুকের সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে মদীনায় তার প্রতিনিধির দায়িত্বে নিয়োজিত করে গিয়েছিলেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার সাথী সংগীসহ বিরত থাকে। তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। তা হচ্ছে ওদীয়া ইবনে ছাবিত মুনাফিকদের এক গ্রুপের সংগে গোপনে বৈঠক করে। তারা পারস্পরিক কথাবার্তার মাঝে বিদ্রূপের স্বরে বলেছিল, 'মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থা দেখো! তিনি রোম এবং সিরিয়ার দুর্গ এবং মহলগুরো জয় করতে চলেছেন, এটা কখনও হবে না। কোন দিনই সম্ভবপর নয়।' মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সে বিষয়ে অবগত করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রা.) কে তাদের কাছে পাঠান এবং বলেন ওদেরকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর যে, তোমরা কোন বিষয়ে আলোচনা করছিলে? এতে যদি তারা অস্বীকার করে তবে বলে দিও যে তোমরা এসব কথা বলছিলে। হযরত আম্মার (রা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তখন তারা পরিষ্কার ভাষায় তা অস্বীকার করে বসে। তাদেরকে যখন বলা হল যে, তোমরা এভাবে ঐসব কথা বলেছ। তখন তারা বাধ্য হয়ে ওজর পেশ করে বলল, হ্যাঁ, আমরা তামাশাস্থলে এসব কথা বলেছিলাম।' এ সময় কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। 'আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলে দিবে আমরা তো কেবল হাসি ঠাট্টা করছিলাম। আপনি ওদের বলে দিন! তোমরা কি তাহলে আল্লাহর সংগে এবং আল্লাহর আয়াতের সংগে এবং তার রাসূলের সংগে হাসি তামাশা করছিলে? অতএব, এভাবে কোন বাহানা তৈরি করবে না। অথচ তোমরা নিজেদের মুমিন বলে কুফরী করছ। (সূরা তওবা-৬৫-৬৬)

তাবুক যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওনা হবার সময় মুনাফিকরা পরস্পরে বলাবলি করছিল এবং মুসলমানদেরকেও ইন্ধন যুগিয়ে ছিল যে, বর্তমানে গ্রীষ্ম মওসুম চলছে। এ কথার প্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হয়, 'তারা বলছিল যে, এমন গরমে বের হবে না। আপনি বলে দিন যে, জাহান্নামের আগুন এর চেয়ে অধিক গরম' (সূরা তওবা-৮১)। একই বছর কিছু গ্রাম্য লোক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে ওজর পেশ করে বলল, তাদেরকে যেন জিহাদে যাওয়া থেকে বাদ দেয়া হয়। এমনকি আলোচিত ৮২ জন মুনাফিক বিনা অনুমতিতেই ঘরে বসে থাকার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। এ প্রসংগে আয়াত নাযিল হয়। অথচ কিছু সংখ্যক বাহানাবাজ লোক গ্রাম্যদের মধ্য থেকে আসে যাতে তাদেরকে ঘরে থেকে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়। আর যারা আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানের দাবী করেছিল; তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলেছিল। তারা একেবারেই বসে রইল।' (সূরা তওবা-৯)। তাবুকের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। হিজরের পানি দিয়ে আটার খামির তৈরি কিংবা সে পানি পান করা নিষেধ করে দেয়া হয়। ভোরে দেখা গেল কারো কাছে পানি নেই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পানির সমস্যার কথা বলা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'রাকাত নামায আদায় করে দোয়া করেন। সংগে সংগে আল্লাহ তা'আলা একখ মেঘমালা পাঠান। যা সাহাবায়ে কেরামের অবস্থানস্থলে বর্ষিত হয়। মুসলিম সৈন্য যেখানে ছিলেন কেবলমাত্র সে সীমানায় বৃষ্টি হয়। একটু এদিক সেদিকেও বৃষ্টিপাতের নাম নিশানা ছিল না। সাহাবাগণ নিজেরা পানি পান করেন এবং তাদের জীবজন্তুকেও পান করান। পানির পাত্রগুলোও ভর্তি করে নেন। অতঃপর মেঘমালা চলে যায়। জনৈক মুনাফিক বলে উঠে, 'এ হচ্ছে একখ মেঘমালা যা অমুক নক্ষত্রের আকর্ষণে আমাদের উপর বর্ষিত হয়েছে।' এর প্রেক্ষিতে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর তোমরা নিজেদের অংশ এভাবে করে নিয়েছ যে তোমরা অস্বীকার করছ।' এ বছর তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথিমধ্যে ওয়াদিউল কুরা পৌছেন। সেখানে জনৈক মহিলার বাগান ছিল। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার বাগানের উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ করার জন্য নিবেদন করে। সকলেই নিজেদের মত অনুমান পেশ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আপন অনুমান পেশ করেন। মহিলা কোন পরিমাণের কথা বলা থেকে বিরত থাকে। পুনরায় তাবুক থেকে ফিরে আসার সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, 'বাগানের উৎপাদন কত হল?' সে বলল, 'আপনি যা বলেছিলেন তাই হয়েছে। তাতে সামান্যতম কর্মী বেশী হয়নি। ঘটনায় সকলের ঈমান বর্ধিত হয়।

তাবুক যাওয়ার সময় ওয়াদিউল কুরায় বনু আরীজ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপ্যায়নের জন্য হারিছা পেশ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খান। এর বিনিময়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদিউল কুরার উৎপাদিত খেজুরের চল্লিশ ওসক প্রতি বছর তাদেরকে দান করতেন। এখানে অপর একটি মু'জেযাও প্রকাশ পায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরে সামুদের কাছে সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দেন 'আজ রাতে সকলেই নিজ নিজ উটগুলোকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখবে এবং কোন ব্যক্তি সাথী সংগী ছাড়া একাকী বাইরে যাবে না। বনু সায়েদার দু'ব্যক্তি ছাড়া সকলেই এ নির্দেশ পালন করেন। এ দু'জনের একজন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাহিরে একাকী যায়। সেখানে বসা অবস্থাতেই তার খেনাক রোগ দেখা দেয়। অপর ব্যক্তির উট হারিয়ে যাওয়ায়, সে তার উটের সন্ধানে বাইরে যায়। এ সময় ঝড় এসে তাকে উঠিয়ে নিয়ে তার কাবিলার পাহাড়ে নিক্ষেপ করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বিষয়ে সংবাদ দেয়া হয়। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, 'আমি কি তোমাদের এভাবে বাইরে যেতে নিষেধ করিনি?' খেনাকগ্রস্ত (গলার ফাঁস লাগা রোগী) লোকটিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে নিয়ে আসা হয়। মহানবী দোয়া করেন এবং গলায় হাত বুলিয়ে দেন। সে পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। আর যে সাহাবা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন; মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে আসার পর ঐ কাবিলার লোকজন তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে পৌঁছে দেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন 'হিজর' থেকে তাবুক রওনা হন তখন তার উটনী 'কাসওয়া' হারিয়ে যায়। সাহাবাগণ তালাশ করেন। কিন্তু উটকে কোথাও পাওয়া যায়নি। এতে যায়েদ ইবনুল নামের মুনাফিক ঠাট্টা করে বলে ছিল, 'মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর নিকট আসমানের খবর আসে। অথচ নিজের উটনী কোথায় সে খবর নেই।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ আমাকে যা জানান এর বাইরে আমি অন্য কিছুই জানি না।' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দেন যে, উটনী ওমুক স্থানে রয়েছে এবং এর লাগাম একটি গাছের সংগে আটকে আছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবা কেরামকে সেখানে পাঠান এবং ঠিক সেভাবেই উটকে পাওয়া যায়। তারা উটনী নিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়। এটি একটি শিক্ষণীয় বিষয়।

তাবুক সফরের পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চলার রাস্তায় বিরাট একটি সাপ পাওয়া যায়। সে কিছুক্ষণ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। অতঃপর রাস্তা ছেড়ে সরে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা কি জান এ সাপটি কে ছিল?' সাহাবারা আরজ করেন, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই উত্তম জানেন।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, 'এটা জীনদের মধ্য থেকে ছিল, যারা মক্কায় এসে আমার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন। তাদের বসবাস এখানে। সে আমাকে সালাম দেয়ার জন্য এখানে এসেছিল এবং তোমাদেরকেও সালাম দিয়েছে।' সাহাবাগণ উত্তর দিয়ে বলেন, 'ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।' তাবুক যুদ্ধের সময় একদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সাহাবায়ে কেরাম জমায়েত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত বিলাল (রা.) কে বলেন, 'বিলাল আমার থলির মধ্যে যে খেজুর আছে তা নিয়ে এসো।' হযরত বিলাল (রা.) খেজুর নিয়ে এলেন এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমানে খেজুরগুলো ছড়িয়ে দিলেন। সকল সাহাবারা খুব তৃপ্তিসহকারে তা থেকে খেলেন। খাওয়ার পরেও খেজুর আগে যতগুলো ছিল ততই রয়ে গেল। এটা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটা মু'জেযা। তাবুক যুদ্ধের সময় পানির তীব্র সংকট দেখা দিলে; মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার বরকতে তাবুকের ঝর্ণায় প্রচুর পানি প্রবাহিত হতে শুরু করে। অতঃপর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত এ পানি অত্যধিক পরিমাণে প্রবাহিত হতে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মায়াজ (রা.) কে বলেছিলেন, 'হে মায়াজ। তুমি যদি দীর্ঘায়ু লাভ কর তবে দেখতে পাবে এ পানি দ্বারা বাগানগুলো সতেজ হচ্ছে।' বাস্তবেও তাই হয়েছিল।

অপর একটি মু'জেযা তাবুক যুদ্ধের সময়কালে ঘটেছিল। যুদ্ধে যখন সাহাবায়ে কেরামের খাদ্য নিঃশেষ হয়ে গেল এবং খাওয়ার জন্য তারা উট যবাই করতে প্রস্তুত হল, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খাদ্য সংকটের বিষয় অবহিত করা হল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দস্তরখানা বিছানোর নির্দেশ দেন। এরপর ঘোষণা করেন, যদি কারো নিকট কিছু খাদ্য অবশিষ্ট থাকে তবে সে যেন তা দস্তরখানে নিয়ে আসে। তখন কেউ এক মুষ্টি যব, কেউ এক মুষ্টি খেজুর, কেউ রুটির একখানা টুকরা নিয়ে আসে। এতে দস্তরখানে তিন প্রকার খাদ্য জমা হয়। সব মিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে তিন সের। অতঃপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করেন। দু'রাকাত নামায আদায় করেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করেন। ফলে তাতে এমন বরকত হয় যে, ময়দানের হাজার হাজার মুসলমানের সকলেই তৃপ্তির সাথে আহার করেন। তারপরও খাদ্য অবশিষ্ট রয়ে যায়। এরপর সকলেই পাত্র ভরে খাদ্য সংগ্রহ করে। যার কাছে যত বাসন-কোসন ছিল সব ভরে যায়। অথচ এরপরও কিছু খাদ্য অবশিষ্ট রয়ে যায়। তাবুকের ময়দানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যুদ্ধ শেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকে ভাষণ দেন। এমন প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী বয়ান; যা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য কারো ছিল না। বয়ান শুনে সকলেই হতভম্ব হয়ে যায়। সাহাবীরা আবেগে আপ্লুত হয়ে ঈমানী শক্তিতে বলিয়ান হয়। তাবুক থেকে ফেরার পথে একটি মু'জেযা প্রকাশিত হয়।

অত্যধিক গরমের মধ্যে সাহাবাগণ সারাদিন ঘামতে থাকেন। এমন কোন স্থান খুঁজে পেলেন না, যেখানে একটু পানি পাওয়া যেতে পারে বা যেখানে বিশ্রাম নেয়া যায়। পুরো সৈন্যবাহিনীর কাছেও পানি ছিল না। অত্যধিক পিপাসার কারণে মানুষ এবং জীবজন্তুর মরণাপন্ন দশা হয়ে পড়ে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পানির পাত্রে খুব সামান্য পানি ছিল। তিনি সে পানি একটি জগের মধ্যে ঢালেন। তাতে হাত মোবারক রাখেন। ফলে অংগুলিসমূহ থেকে ঝর্ণার ধারার মত পানি নির্গত হতে শুরু করে। গোটা বাহিনী পানি পান করে পরিতৃপ্ত হয়। তাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার অথবা সত্তর হাজার। সাথে ছিল পনের হাজার উট এবং বার হাজার ঘোড়া। এসব জীবজন্তুকেও পানি পান করানো হয়। তাবুক থেকে ফেরার পথে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক এবং ওয়াদিয়ে মুনতাফানের মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার বরকতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার আরও একটি মু'জেযা দেখা যায়। তাদের কাছে যে অল্প পানি ছিল সে পানি একটি পাত্রে জমা করা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে হাত মুখ ধুয়ে কুলি করেন এবং অবশিষ্ট পানি ঐ পাত্রেই ফেলেন। তার পরে দোয়া করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার বরকতে পানি প্রবাহিত হতে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম নিজেরা পানি পান করেন এবং উট ও ঘোড়াগুরোও পান করে। কাব ইবনে জুহাইর ইবনে আবু সালামা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে তিনি তওবা করেন। তিনি যখন তওবা করে মদীনায় আসেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বিখ্যাত কবিতা "লামিয়া" পাঠ করেন। 'নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল এমন একটি নূরের মত যা থেকে হিদায়াতের আলো অর্জন করা যায় এবং আল্লাহর তলোয়ারের মধ্য থেকে এক উন্মুক্ত হিন্দী তলোয়ারের মত।' তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজ চাদর মোবারক দান করেন, যা ছিল তার জন্য বিরাট বরকতের ব্যাপার। এ চাদর দীর্ঘকাল তার নিকট ছিল। হযরত মুয়াবিয়া (রা.) তার উত্তরাধিকারীদের নিকট থেকে বিশ হাজার দিরহাম দিয়ে এ চাদর খরিদ করে নেন। এভাবে পরপর খলীফাগণের নিকট এ চাদর পৌছতে থাকে এবং একসময় তা হারিয়ে যায়। আল্লামা শামী লিখেছেন, বর্তমানে এ চাদর নেই। তাতারীদের ফিতনার সময় চাদরখানি হারিয়ে গিয়েছে।

এ বছর তাবুক যুদ্ধের সময় ইয়ায়লা ইবনে উমাইয়া (রা.) নামক সাহাবীর চাকর জনৈক ব্যক্তির সংগে ঝগড়া-ঝাটি করে। ঐ ব্যক্তি চাকরকে দাঁত দিয়ে কাঁমড়ে দেয় এবং আহত করে ফেলে। সে সজোরে হাত কামড়াতে গেলে, তার সামনের দুটি দাঁত ভেংগে যায়। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ বিষয়ে বিচারপ্রার্থী হন এবং এর বিনিময় দাবী করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তুমি কিছুই পাবে না। কেননা, সে কি তাহলে তার হাত তোমার মুখের ভিতরে প্রবেশ করে রেখে দিত। যাতে তুমি উটের মত চিবোতে থাকতে?' এভাবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। তাবুক থেকে ফিরে আসার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন স্থানে বিশটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ইবনে ইছহাক এবং কাস্তালানী এভাবেই বর্ণনা করেছেন। সৈয়দ সামহুদী বলেছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিশটি স্থানে নামায আদায় করেছিলেন; সেসব স্থান চিহ্নিত করে রাখা হয় এবং পরে সব জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পরে আল্লাহ পাক ঐ তিন সাহাবীর তওবা কবুল করেন, যারা তাবুকে অংশগ্রহণ করেননি। তারা হলেন কাব ইবনে মালিক (রা.), হেলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) এবং মুরারাহ ইবনে রাবী' (রা.)। এ প্রসংগে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে, 'মহান আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করেন এবং মুহাজির ও আনসারদের অবস্থার প্রতিও যারা এমন সংকটকালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগী হয়েছিলেন। অতঃপর বলেন, ঐ তিন ব্যক্তির অবস্থার প্রতিও লক্ষ্য করেন যাদের বিষয়টি মুলতবী রাখা হয়েছিল। অতঃপর যখন তাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, জমি প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।' (সূরা তাওবা-১১৭)

মহানবী যখন তাবুক থেকে মদীনায় ফিরে এলেন, সে সময় বিভিন্ন রাজা বাদশাহর পক্ষ থেকে তাদের দূত বা পত্র নিয়ে আসে। তাতে তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা লেখা ছিল। এসব বাদশারা হলেন, হারিছ ইবনে আবদে কেলাল, নায়ীম ইবনে আবদে কেলাল এবং নো'মান। এরা ছিলেন বাহয়াইন, হামদান এবং মায়াফিরের অধিপতি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাবুকে অবস্থানের সময়, মদীনা তৈয়িবায়, মায়াবিয়া ইবনে মায়াবিয়া আল লাইছী আল মুজানী (রা.) ইন্তিকাল করেন। জিব্রাঈল (আ.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সাহাবীর ইন্তিকালের খবর দেন। অথচ মদীনা থেকে তাবুকের দূরত্ব ছিল চৌদ্দ দিনের পথ। জিব্রাঈল (আ.) আরও জানান যে, মায়াবিয়ার জানাযায় আল্লাহ তা'আলা সত্তর হাজার ফিরিশতা পাঠিয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, 'কেন'? উত্তর দিলেন, 'এ জন্য যে তিনি দাঁড়িয়ে বসে, চলতে ফিরতে সূরা ইখলাস পাঠ করতেন।' অতঃপর আরেক রহস্যময় ঘটনায় জিব্রাঈল (আ.) যমীনকে সংকুচিত করে দেন। তাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জরুরত (টয়লেট) সারার জন্য বাইরে যান। এতে করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাকাত নামায আব্দুর রহমান ইবনে আওফের পিছনে আদায় করেন। বাকী এক রাকাত সালাম ফেরানোর পরে উঠে দাঁড়িয়ে আদায় করেন। সাহাবায়ে কেরাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাসবুক দেখতে পেয়ে খুব ঘাবড়ে যান। মহানবী নামায শেষ করে তাদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, 'তোমরা সঠিক করেছ, ভাল করেছ।' এ ঘটনা হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফের বিরাট মর্যাদার কারণ স্বরূপ গণ্য হয়। তাবুক থেকে ফেরার পথে মতান্তরে বনু মুস্তালিক থেকে ফেরার সময় এক রাতে ভয়াবহ ঝড় ওঠে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এ ঝড় জনৈক মুনাফিকের মৃত্যুর কারণে এসেছে। পরে জানা যায় যে, এ রাতে একজন বড় মুনাফিক মারা গেছে। তার নাম ছিল তেফায়া ইবনে যায়েদ ইবনে তাবুত। সে ছিল বনু কাইনুকার ইহুদী সন্তান। বাহ্যিকভাবে সে ছিল মুসলমান। অথচ বাস্তবে সে ছিল মুনাফিকদের বড় সর্দার।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে ফিরে আসার পর ওয়ায়মের আজলানী এবং তার স্ত্রীর মধ্যে 'লেয়ান' হয়েছিল। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের সাক্ষীবিহীন অপবাদ। উভয়ে আল্লাহর নামে কসম করে একে অপরের উপর লানত দিয়ে নিজেকে সত্যবাদী দাবী করাকে লেয়ান বলে। যেনাকারী একজন মহিলা গামেদিয়া (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে নিজের পাপের কথা স্বীকার করে, শাস্তির আবেদন জানিয়েছিলেন। তাকে সন্তান প্রসবের পর আসতে বলা হয়েছিল। সন্তানের দুধ ছাড়ানোর পর তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা (রজম) করা হয়। এভাবে নিজের পাপ স্বীকার করে, ইসলামের শাস্তি মাথা পেতে নেয়াটা একটা বিস্ময়কর, বিরল ও উচ্চ ঈমানের কথা? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ মহিলা সাহাবীর উন্নত মর্যাদা, তওবা কবুল ও আখিরাতের উচ্চ আসনের কথা বলেছেন। হাবশার সম্রাট আসহামা নাজ্জাশী ইন্তিকাল করেন এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার গায়েবানা জানাযা আদায় করেন। নবীনন্দিনী উম্মে কুলসুম (রা.) ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোকে কাতর হন। তিনি হযরত ওসমান (রা.) কে বলেছিলেন, যদি আমার তৃতীয় কোনো মেয়ে থাকত, তবে তাকেও আমি তোমার সাথে বিয়ে দিতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তাবুক থেকে ফিরে আসার পর মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তিনি তার জন্যে মাগফিরাতের দোয়া করেন এবং হযরত ওমর (রা.) এর নিষেধ সত্ত্বেও তার জানাযার নামায আদায় করেন। এরপর কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। ফলে হযরত ওমর (রা.) এর বক্তব্যের সমর্থনে মুনাফিকদের জানাযার নামায পড়া নিষেধ করা হয়। হযরত আবু বকর (রা.) এর নেতৃত্বে হজ্জ পালন হয়। নবম হিজরীর যিলকদ বা যিলহজ্জ মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর (রা.) কে আমিরুল হজ্জ (হাজীদের নেতা) বানিয়ে মক্কায় প্রেরণ করেন। সূরা তাওবার প্রথমাংশ নাযিল হয়। এতে মুশরিকদের সাথে কৃত চুক্তি অঙ্গীকার সমতার ভিত্তিতে শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশ আসার পর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলী (রা.) কে এ ঘোষণা প্রকাশের জন্যে প্রেরণ করেন। রক্ত এবং ধন সম্পদ সম্পর্কিত অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে এটাই আরবদের রীতি ছিল। চুক্তির কোনো পক্ষ তা রহিত করতে চাইলে, হয় তো সে নিজে এ রহিত করার ঘোষণা দিবে অথবা নিজের গোত্রের কাউকে দিয়ে ঘোষণা করাবে। বংশের বাইরের কোনো লোককে দিয়ে ঘোষণা করানো হলে, তা মানা হত না। হযরত আবু বকর (রা.) এর সাথে হযরত আলীর (রা.) দাজনান মতান্তরে আরজ প্রান্তরে সাক্ষাৎ হয়। হযরত আবু বকর (রা.), আলী (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আমীর নাকি আমীরের অধীন? হযরত আলী (রা.) বলেন, আমীরের অধীন। এরপর উভয়ে সামনে অগ্রসর হন। হযরত আবু বকর (রা.) লোকদের হজ্জ করান। ১০ই যিলহজ্জ কুরবানীর দিন হযরত আলী (রা.) জামরায় দাঁড়িয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ অনুযায়ী সকল প্রকার চুক্তি অঙ্গীকার সমাপ্তির কথা ঘোষণা করেন। চার মাসের সময় দেয়া হয়। যাদের সাথে কোনো অঙ্গীকার ছিল না, তাদেরও চার মাস সময় দেয়া হয়। তবে মুসলমানদের সাথে যেসব মুশরিক অঙ্গীকার পালনে ত্রুটি করেনি এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যদের সাহায্য করেনি, তাদের চুক্তিপত্র নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়। হযরত আবু বকর (রা.) এক দল সাহাবীকে পাঠিয়ে এ সাধারণ ঘোষণা প্রচার করেন। ভবিষ্যতে কোনো মুশরিক হজ্জ করতে এবং কেউ নগ্নাবস্থায় কা'বা ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না; বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণা ছিল প্রকৃতপক্ষে জাযিরাতুল আরব থেকে মূর্তিপূজা অবসানের চূড়ান্ত পদক্ষেপ। এ বছরের পর মূর্তিপূজার উদ্দেশ্যে মক্কা বা কা'বায় আসার সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00