📄 ৩য় হিজরী
তৃতীয় হিজরী (৬২৪ খ্রীষ্টাব্দ): ৩য় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর (রা.) এর কন্যা মুসলিম জননী হযরত হাফছা (রা.) কে শাদী করেন। সর্বাধিক বিশুদ্ধ উক্তি অনুযায়ী এটি শাবান মাসের ঘটনা। হযরত হাফছার (রা.) প্রথম স্বামী খুলাইস ইবনে হুজাফার ইন্তিকাল উহুদ যুদ্ধের পূর্বে হয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ ছিল আঘাত, যা তিনি বদর যুদ্ধে পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে। এ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম জননী হযরত জয়নাব বিনতে খুজাইমাকে শাদী করেন। তিনি অত্যধিক দাতা ছিলেন বলে তাঁকে উম্মুল মাসাকীন বলা হত। উম্মুল মাসাকীন অর্থ অসহায় দরিদ্রের মা। তার প্রথম স্বামী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর যিলহজ্ব মাসের শেষের দিকে তার সংগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাদী মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে দুই বা তিন মাস কাটানোর পর, ৪র্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস সানী মাসে ইন্তিকাল করেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মধ্যে কেবলমাত্র হযরত খাদীজা (রা.) এবং হযরত যয়নাব (রা.) এর মৃত্যু হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায়। কোন কোন মতে হযরত রায়হানাও (রা.) মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। রবিউল আউয়াল মাসে হযরত ওসমান (রা.) এর শাদী হয় নবী দুলালী হযরত সায়্যিদা উম্মে কুলসুমের (রা.) সংগে। তাযকিরাতুল ক্বারী কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) হযরত জয়নাবের পরে এবং হযরত ফাতিমার আগে জন্মগ্রহণ করেন। এ হিসেবে তাঁর জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৩৪ বছর। এক বর্ণনায় তৃতীয় হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ হয়। এ ব্যাপারে আল কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা.) কে ইহুদীদের লিখিত ভাষা শিক্ষা করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং বলেন, 'আমি ওদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমার চিঠিপত্রের মধ্যে তারা ঝামেলা করতে পারে।' একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাতুর রেকার যুদ্ধে সালাতুল খওফ নামায আদায় করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, খাওফের নামায আসফান বা যিকিরদের যুদ্ধের সময় নাযিল হয়েছিল। আর এ দুটি যুদ্ধ ৬ হিজরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উহুদের যুদ্ধের পর এ হুকুম নাযিল হয় যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্য নাওহা বা বিলাপ করা, চেহারায় আঘাত করা, বক্ষ ছিঁড়ে ফেলা হারাম। এর আগে তা হারাম ছিল না। উল্লেখ্য যে, ওহুদের শহীদানের জন্য মহিলারা নাওহা এবং মাতম করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন এবং দেখেন হামযার জন্য কাঁদার মত কেউ নেই। কাজেই মহিলারা অন্যান্য শহীদানের মত হযরত হামযার জন্যও কাঁদতে থাকেন। কান্নাকাটির এ অনুষ্ঠান যখন সমাপ্ত হয় তখন নাওহা নিষেধ করে দেয়া হয়। এটাই আল কুরআনের নির্দেশনা।
এ বছর উহুদের যুদ্ধের পর মুশরিকরা হযরত হামযার (রা.) লাশ মোবারককে মুছলা অর্থাৎ বিকৃত করে। কান, নাক ইত্যাদি কেটে ফেলে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, 'আমি এর বদলায় তোমাদের সত্তর জনের মুছলা করে ছাড়ব।' এ কথার প্রেক্ষিতে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, 'যদি বদলা নিতে হয় তবে এতটুকুই কর, যতটুকু তোমাদের সংগে আচরণ করা হয়েছে।' উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলী, মুসলমানগণের কার্যক্রম, মুশরিকদের ধমক প্রদান ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে কুরআনে ষাটটি আয়াত নাযিল হয়। (সূরা আলে ইমরান-১২১-১৮১)। উহুদ যুদ্ধের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামযার (রা.) জানাযার নামায পড়ান। অতঃপর অন্যান্য শহীদানের কফিন বা জানাযা এক একজন করে হযরত হামযার (রা.) লাশের পাশে এনে রাখা হয় এবং জানাযা নামায পড়া হয়। এমনিভাবে হযরত হামযার জানাযা ৭০ বার পড়া হয়। তার অর্থ এ নয় যে হযরত হামযার জানাযার নামায সত্তরবার পড়া হয়েছে। বরং প্রত্যেক শহীদের জানাযার নামায আলাদা আলাদা পড়া হয়েছে। প্রত্যেক শহীদের সংগে হযরত হামযার (রা.) লাশ ওছিল। কাজেই হযরত হামযার জানাযা সত্তর বার পড়া হয়েছে ধরা যায়।
বিশুদ্ধ সূত্রমতে ৪র্থ হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ করার সময় এ আয়াত নাযিল হয়েছিল, 'হে ঈমানদারগণ! আসল কথা হল যে, মদ এবং জুয়া এবং মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর এগুলো নিকৃষ্ট ব্যাপার, শয়তানের কাজ। তোমরা এসব থেকে দূরে থেকো; যাতে তোমাদের কল্যাণ হয়। শয়তান তো এটা চায় যে, মদ এবং জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে হিংসা, হানাহানি সৃষ্টি করে দেয় এবং আল্লাহর স্মরণ এবং নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখে। অতএব এখনও কি তোমরা বিরত হবে না?' (সূরা আল মায়েদা ৯০-৯১)। এ বছর যখন মদ হারাম ঘোষণা করা হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন উহুদের শহীদান সম্পর্কে অর্থাৎ কতিপয় সাহাবা উহুদের যুদ্ধের দিন মদ পান করেছিলেন। অতঃপর শহীদ হয়ে যান। তবে তারা কি পাপী হবেন? যেহেতু তখন পর্যন্ত মদ নিষিদ্ধ হয়নি তাই তাদের সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়। 'যারা ঈমান নিয়ে এসেছে এবং নেক আমল করেছে; তারা মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যা পান করেছে তাতে তাদের গোনাহ হবে না।' (সূরা মায়েদা-৯৩)
এ বছর এবং মতান্তরে অষ্টম হিজরীতে সালাতুল খওফ এর বিধান নাযিল হয়। এ বছর এক ইহুদী যুগলকে পাথর মারা হয়েছে তাদের অপকর্মের (ব্যভিচারের) জন্য। এ বছর জুমাদাল উলায় হযরত আবু সালামা আব্দুল্লাহ আব্দুল আসাদ আল কুরসী আল মাখজামী (রা.) ইন্তিকাল করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাম্পত্যে আসার পূর্বে তার গৃহে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছিলেন এবং ৮ জুমাদাল উখরা চতুর্থ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। আবু সালামার ইন্তিকালের পর হযরত উম্মে সালামা চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করেন। তার পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে তার আব্দ হয়। শাওয়ালের শেষদিকে চতুর্থ হিজরীতে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহে আসেন।
তোয়ায়মা ইবনে উবাইরিক নামক মুনাফিক হযরত কাতাদা ইবনে নোমান আল আনসারীর (রা.) ঘর থেকে ঢাল চুরি করে নিয়ে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। সে পলায়ন করে মক্কায় চলে যায়। সেখানেও চুরি করে। মক্কাবাসী তাকে হত্যা করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবাদ জানিয়ে জানতে চাইলেন যে, হাত কাটার পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হল কেন? তখন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে আয়াত নাযিল করেন, 'আপনি বিতর্কে জড়াবেন না। ওদের পক্ষ হয়ে, যারা নিজেদের জীবনের খেয়ানত করে থাকে।' (নিসা-১০৭)
📄 ৪র্থ হিজরী
৪র্থ হিজরী (৬২৫ খ্রীষ্টাব্দ): ৪র্থ হিজরীতে বিরে মাউনায় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। এ অভিযানে ৭০ জন সাহাবী দাওয়াত ও তাবলীগে অংশ নিয়েছিলেন। একজন ছাড়া সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। বিরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ফজরের নামাযের পরে এক মাসব্যাপী কুনুতে নাযেলার দোয়া পাঠ করা হয়। উক্ত দোয়ার মধ্যে অভিযুক্ত জালিম কাবিলাসমূহের নাম ধরে ধরে বদ দোয়া করা হয়। কাবিলাগুলো হচ্ছে, আসম, যাকওয়ান, ওকবা ও লাইহান। অতঃপর আয়াত নাযিল হয়, '(হে নবী) আপনার এ বিষয়ে কোন এখতিয়ার নেই। আপনাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন, অথবা তাদের শাস্তি প্রদান করেন।' (সূরা আলে ইমরান-১২৮)। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুনুতে নাযেলা পাঠ করা বন্ধ করে দেন (বুখারী শরীফ)। একই বছর সফর মাসে হযরত খুবাইব ইবনে আদী (রা.) এবং যায়েদ ইবনে দাতনা (রা.) মক্কায় শহীদ হন।
এ হিজরীতে হযরত খুবাইব (রা.) কে হত্যার পূর্বে তিনি দু'রাকাত নামায আদায় করেন। অতঃপর এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দু'রাকাত নামায আদায় করা সুন্নত সাব্যস্ত হয়। যাকে অন্যায়ভাবে জোর করে হত্যা করা হয় সে দু'রাকাত সুন্নাত নামায পড়ে নিবে। এটা এজন্য সুন্নত যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় এটা করা হয়েছে এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে পছন্দ করেছেন। এ বছর মক্কার মুশরিকরা হযরত খুবাইব (রা.) কে তানয়ীম নিয়ে জীবন্ত শূলে চড়িয়ে হত্যা করে। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমান যাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। কাফিরগণ যখন তাকে শূলে চড়ায় তখন তার মুখ কিবলার দিক থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ শূলের সে লাকড়ী খ টি অটোমেটিক কিবলার দিকে ফিরে আসে। এ ঘটনাটি তার কারামাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাকে যে নরাধম হত্যা করেছিল তার নাম ছিল, আবু সারুয়া ওকবা ইবনে হারিছ। অথচ পঞ্চম হিজরীতে আবু সারুয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত খুবাইব (রা.) এর বীরত্বপূর্ণ শাহাদাতের ঘটনা জানতে পেরে বলেছিলেন, 'কে আছ! যে খুবাইবকে শূলে থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবে?' হযরত যুবায়র ইবনে আওয়াম এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) দাঁড়িয়ে আরজ করেন, 'আমরা নিয়ে আসব।' সুতরাং উভয়েই সফরের প্রস্তুতি নিলেন এবং হযরত খুবাইবকে (রা.) শূলে চড়ানোর চল্লিশ দিন পরে রাতের বেলা তানয়ীম পৌছেন। দেখতে পেলেন, তাঁর লাশ সম্পূর্ণ তাজা টাটকা রয়েছে, যেন আজই ইন্তিকাল করেছেন। তার হাতে জখম রয়েছে। সেখান থেকে তাজা রক্ত ঝরছে। রং ছিল রক্তের এবং সুগন্ধি ছিল মিশকের। মক্কার সত্তরজন কাফির শুয়ে শুয়ে লাশ প্রহরা দিচ্ছিল। তারা দু'জন মিলে শূল থেকে লাশটি নামিয়ে নিয়ে আসেন। অতপর লাশ হযরত আলী (রা.) এর ঘোড়ার উপর রেখে মদীনায় নিয়ে আসেন।
সফরকালীন সময়ে কুসর নামাযের বিধান সম্বলিত আয়াত এ হিজরীতে নাযিল হয়। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে 'আর তোমরা যখন সফরে যাও, তখন নামায কসর করতে কোন বাঁধা নেই' (সূরা নিসা-১০১)। ৪র্থ হিজরীর পহেলা যিলক্বাদ তারিখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) কে বিয়ে করেন। কোন কান সূত্র মতে সেটা পঞ্চম হিজরীতে হয়েছিল। হযরত যয়নবের তখন বয়স ছিল পয়ত্রিশ বছর। মুসলিম জননীগণের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম মদীনায় ইন্তিকাল করেন। এ হিজরীতে হযরত যয়নব বিনতে জাহশের রুখসতীর দিনে পর্দার হুকুম নাযিল হয়। কারো কারো মতে এটা ছিল পঞ্চম হিজরীর ঘটনা। তবে প্রথম উক্তি অধিকতর বিশুদ্ধ।
📄 ৫ম হিজরী
পঞ্চম হিজরী (৬২৬ খ্রীষ্টাব্দ): ৫ম হিজরীর মহররম মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রায়হানা বিনতে মায়মুনাকে শাদী করেন। তার সম্পর্ক ছিল বনু নযীরের সংগে। তিনি ছিলেন বনু কুরাইযার যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্য নির্বাচন করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে নিজ দাম্পত্যে নিয়ে আসেন। একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু মুস্তালিক যুদ্ধের পরে মুসলিম জননী হযরত জুয়াইরিয়াহ (রা.) কে শাদী করেন। তিনি বনু মুস্তালিকের নেতা হযরত হারিস ইবনে জেরারের কন্যা ছিলেন। এক উক্তি মতে, এই বিয়ে ৬ষ্ঠ হিজরীতে হয়েছিল। এ বছর উম্মুল মুমেনীন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা হারিস ইবনে জেরার মুস্তালিকের যুদ্ধে বন্দী হয়ে আসেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন。
খন্দক যুদ্ধের শেষ দিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মু'জেযা (অলৌকিক ঘটনা) প্রকাশিত হয় অর্থাৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়া কবুল হয়। মহান আল্লাহ প্রচ ঘূর্ণিঝড় এবং হিমেল বাতাস চালিয়ে দেন। ফলে কাফিরদের তাঁবু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তাদের সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। তদুপরি মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের বাহিনী পাঠিয়ে দেন। যারা অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে নারায়ে তকবীর ধ্বনি দেয়। এ দৃশ্য দেখে কাফিরদের চেতনা-বুদ্ধি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাদের জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে গেলে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে লেজ গুটিয়ে পলায়ন করাকেই নিরাপদ মনে করে। আর এটা ছিল রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার ফসল। পবিত্র কুরআন সেদিকেই ইংগিত করেছে, 'অতঃপর আমি তাদের প্রতি এক ঘূর্ণিঝড় প্রবাহিত করলাম এবং এমন এক বাহিনী পাঠালাম যা তোমাদের দৃষ্টির অগোচরে ছিল' (সূরা আল আহযাব-৯)। 'আর আল্লাহ কাফিরদের বিচলিত করে সরিয়ে দেন ফলে, তাদের কোন প্রত্যাশা পূরণ হল না। আর যুদ্ধে মুসলমানের পক্ষে আল্লাহ নিজেই যথেষ্ট ছিলেন।' (সূরা আল আহযাব-২৫)
৫ম হিজরীতে বনু কুরাইযার যুদ্ধে হযরত খাল্লাদ ইবনে সুয়াইদ ইবনে ছালাবা আল আনসারী আল খাযরাজী (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। বনু কুরাইযার বান- ানানাহ নামক এক মহিলা তাঁর প্রতি লোহার দরজার পাট নিক্ষেপ করে। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে ঘোষণা করেন যে, 'তিনি দুই শহীদের ছাওয়াব পাবেন।' খুনের বদলায় সে মহিলাকে হত্যা করা হয়। হতভাগা এ মহিলাটি ছাড়া, অন্য কোন যুদ্ধে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। কুরাইযার এ যুদ্ধে হুয়াই ইবনে আখতার নামের ইহুদী কাফির নিহত হয়। সেছিল ইহুদীদের প্রধান এবং মুসলিম জননী হযরত সুফিয়ার (রা.) পিতা। সে রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মারাত্মক হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করত। আল্লাহ তাকে কুফরীর অবস্থায় মৃত্যু দেন。
কুরাইযার যুদ্ধের সময় হযরত আবু লুবাবা ইবনে আব্দুল মুনজির আল আনসারী আল আওসী (রা.) এর তওবা কবুল হয়। যুদ্ধে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ী হলেন এবং তিনি বুঝতে পেলেন যে তার রেহাই পাওয়ার আর কোন সুযোগ নেই। তখন তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট দরখাস্ত করেন; আবু লুবাবাকে যেন বনু কুরাইযার নিকট যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। তাদের সংগে তার কিছু জরুরী পরামর্শ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ আবেদন মনজুর করেন এবং হযরত আবু লুবাবাকে বনু কুরাইযার কাছে পাঠিয়ে দেন। বনু কুরাইযার সংগে আবু লুবাবার জানাশুনা ছিল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন যে, যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিদ্ধান্ত কবুল করে কেল্লা থেকে বেরিয়ে আসা মনজুর করেন, তবে তাদের সংগে মহানবী কি আচরণ করবেন?' হযরত আবু লুবাবা তাদের জবাবে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে হাত দ্বারা গলার দিকে ইংগিত করেন। এর অর্থ ছিল তাদেরকে হত্যা করা হবে। এ সময় আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা খেয়ানত করবে না। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সম্পর্কে। আর নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না' (সূরা আনফাল-২৭)। কুরআনের এ আয়াতে আবু লুবাবাকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন তার এ আচরণে আল্লাহ ও রাসূলের খেয়ানত হয়েছে। সুতরাং তিনি মদীনায় আসেন এবং নিজেকে মসজিদের একটি খুঁটির সংগে বেঁধে রাখেন। তিনি শপথ করেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার তওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন তাঁকে খুলে না দেয়। পনের দিন পরে তার ক্ষমার ঘোষণা আসে এবং কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর কিছু লোক রয়েছে যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। যারা মিলে ঝিলে আমল করেছে কিছু ভাল এবং কিছু মন্দ (সূরা তওবা)। সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে গিয়ে তার বাঁধন খুলে দেন। মদীনা শরীফে আজও সে খুঁটি উত্তয়ানায়ে আবু লুবাবা নামে পরিচিত হয়ে আছে।
এ বছর বনু কুরাইযা সম্পর্কে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর যে আহলে কিতাবগণ তাদের সহায়তা করেছিল তাদেরকে তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে এনেছে। তাদের অন্তরে তোমাদের ভয়ভীতি সঞ্চার করে দেয়া হয়। কিছু সংখ্যককে তোমরা হত্যা করতে শুরু কর এবং কিছু সংখ্যককে বন্দী কর। তাদের জমি, তাদের ঘর বাড়ি এবং সহায়-সম্পদের মালিক, তোমাদের করে দিলেন (সূরা আহযাব- ২৬-২৭)। এ বছর রজব মাসে হযরত বিলাল ইবনে হারিছ মুজনী (রা.) তার কাবিলা বনু মুজনিয়ার চারশত লোক নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হন। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং বলেন, 'তোমরা সেখানেই অবস্থান কর। তোমাদের মুহাজিরদের মর্যাদা দেয়া হবে। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতিক্রমে নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরে আসেন। হযরত বিলাল ইবনে হারিছ (রা.) সুজনিয়া কাবিলার সর্বপ্রথম মুসলমান ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিনে বনু মুজনিয়ার ঝা। তারই হাতে ছিল। ৪র্থ হিজরীতে হযরত জেমাম ইবনে ছা'লাবা (রা.) তার কওম বনু সা'দ ইবনে বকরের প্রতিনিধি হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে হাজির হন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামায, রোযা, যাকাত এবং হজ্ব সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করে ফিরে গিয়ে তার কওমকে সেসব বিষয়ে অবগত করেন। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর রজব মাসে মুজনিয়া কাবিলার প্রতিনিধি দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হন। তাদের সংগে ছিলেন বহু সংখ্যক লোক। তন্মধ্যে নোমান ইবনে মুকরিন ইবনে আয়িজ মাজানী, বেলাল ইবনে হারিছ মাজানী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের মূর্তির নাম ছিল "হাজিব”। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এটা ছিল সর্বপ্রথম প্রতিনিধি দল যারা মদিনায় এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে সাক্ষাৎ করেন।
এ বছর যিলহজ্ব মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘোড়ার উপর আরোহণ করে 'আল গাবা' তাশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ঘোড়া থেকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পড়ে যান এবং ডান পায়ে আঘাত পান। এ সময় কয়েকদিন ঘরে অবস্থান করেন। আঘাতের কারণে বসে বসে নামায আদায় করেন। সে সময় মসজিদে হাজির হতে পারেননি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধে ছিলেন। তখন হযরত সাদ ইবনে ওবাদার (রা.) আম্মা আমরা বিনতে সা'দ ইবনে আমর আনসারী ইন্তিকাল করেন। যেহেতু হযরত সাদও (রা.) এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ছিলেন এজন্য তার জানাযা এবং দাফন কাজে শরীক হতে পারেননি। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আম্মা আকস্মিক ইন্তিকাল করেন। তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে সদাকা করার কথা বলতেন। এখন যদি আমি সদাকা করি তবে তার পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে কিনা?' ইরশাদ করেন, 'হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, 'কোন সদাকা সবচেয়ে উত্তম?' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দেন, 'পানি পান করাও। (অর্থাৎ যেখানে প্রয়োজন সেখানে কূপ খনন করে দাও)। সুতরাং হযরত সাদ (রা.) পানির কূপ তৈরি করে তার মাতার পক্ষ থেকে আল্লাহর পথে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। এ বছর হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ এবং হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর বর্ণনা মতে তারা অষ্টম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ। এ বছর সাবান মাসে বনু মুস্তালিক যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধকে মুরাইসী যুদ্ধও বলা হয়। উক্ত যুদ্ধে হযরত আয়িশা (রা.) এর হার হারিয়ে গিয়েছিল এবং এর সাথেই ঘটনাক্রমে তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হয়। এ যুদ্ধে হযরত আয়িশার (রা.) উপরে অপবাদ রটনার ঘটনা ঘটেছিল। (নাউযু বিল্লাহ)।
এ বছর আয়িশার বিরুদ্ধে অপবাদের প্রতিবাদে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। সূরা নূরের ১৮নং আয়াত তার সম্পর্কে নাযিল হয়। এতে হযরত আয়িশার পবিত্রতা প্রমাণিত হয়। মুনাফিক এবং অপবাদ রটনাকারীরা লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হয়। উল্লেখ্য ইফকের ঘটনার শুরুতে তায়াম্মুমের বিধান নাযিল হয়েছিল। তায়াম্মুম অন্য কোন উম্মতের জন্য জায়েয ছিল না। এটা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের খাস উপহার ও দয়া。
৫ম হিজরীতে হযরত আয়িশার নিদোর্ষিতা ও পবিত্রতার আয়াত নাযিলের পরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কুসম খেয়ে ছিলেন যে, তিনি তার চাচাত ভাই মিসতাহ ইবনে আসাসাহ (রা.) এর আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দিবেন। কারণ, ইফকের ঘটনায় তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। তার ব্যয় ভার হযরত আবু বকর (রা.) গ্রহণ করেছিলেন। এতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'আর তোমাদের যারা দ্বীনি লাইনে বুজুর্গ এবং আর্থিক সচ্ছলতার অধিকারী; তারা যেন নিজ আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের অনুদান বন্ধ করার কুসম না খায়। তাদের ক্ষমা করে দেয়া উচিৎ। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দিন এবং তোমাদের মার্জনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান (সূরা নূর-২২)। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি চাই যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেন।' অতঃপর মিসতাহ (রা.) এর আর্থিক অনুদান চালু করে দেন এবং বলেন, 'আল্লাহর কুসম ভবিষ্যতে তার অনুদান আর বন্ধ হবে না।' কুরআনে করীমে হযরত আয়িশা (রা.) এর সাফাই ঘোষণা হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ চার ব্যক্তিকে অপবাদ লাগানোর শাস্তিস্বরূপ আশিটি করে বেত্রাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেন। যারা হযরত আয়িশা (রা.) কে অপবাদ দিয়েছিল তারা হলেন : আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুল (মুনাফিক), হাসসান ইবনে সাবিত, মিসতাহ ইবনে আসাসাহ, হামনা বিনতে জাহশ (এ তিনজন মুসলমান)। এ চার ব্যক্তির মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হল মুনাফিকদের নেতা। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অত্যন্ত হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করত। সে মা আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদের ঝড় বইয়ে দেয়। অপর তিনজন ছিলেন সত্যিকার মুমিন সাহাবী। তারা সরল বিশ্বাসে প্রোপাগাণ্ডাকে বিশ্বাস করে এ অপবাদ রটনায় অংশগ্রহণ করেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কঠোর ধমক দেয়া হয়। এক বর্ণনায় এসেছে বা কেউ কেউ বলেছেন যে, উক্ত ঘটনায় কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয়নি।
একই বছর বনু মুস্তালিকের যুদ্ধের সময় সূরায়ে মুনাফিকুনের শানে নুযুলের এ ঘটনা ঘটে। একজন মুহাজির সাহাবী অর্থাৎ জাহজাহ ইবনে কয়েস আল গেফারী (রা.) যিনি সেনান ইবনে ফারওয়াহ আলজাহনী (রা.) অথবা সেনান ইবনে নায়ীম ইবনে আওস (রা.) নামক এক আনসারীকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। এতে বিষয়টি গড়াতে গড়াতে বড় হয়ে যায়। এক পর্যায়ে কোথায় আনসারগণ! অন্যদিকে মুহাজিরগণ কোথায়? এ ধরনের ডাকাডাকি শুরু হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে বলেন, 'জাহেলিয়াতের যুগের এ ডাক কিসের? এ হচ্ছে পঁচা বাসি কথাবার্তা। এগুলো পরিত্যাগ কর।' মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তা শুনে বলে উঠে, 'আরে এসব আশ্রিত লোকেরা (মুহাজির) তোমাদের রুটি খেয়ে খেয়ে এবার তোমাদের সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ওদের খরচ বন্ধ করে দাও, এমনি তারা ভেসে যাবে।' সে আরও বলে, 'ঠিক আছে একটু মদীনা ফিরে যেতে দাও, যে ব্যক্তি অধিক সম্মানিত সে নিকৃষ্টতমকে বের করে দিবে।' অধিক সম্মানিত বলতে সে নিজেকে বুঝাতে চেয়েছে আর নিকৃষ্টতম বলতে (নাউযু বিল্লাহ) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝাতে চেয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) তার এ নিকৃষ্ট কথাবার্তা শুনতে পান। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বিষয়ে অবগত করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তা জানতে পেরে কুসম খেয়ে তা অস্বীকার করতে থাকে। সে উল্টা হযরত যায়েদকে দোষারোপ করে। সে যায়েদের নামে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদকে ডেকে বলেন, 'সম্ভবত তুমি শুনতে ভুল করেছ।' এতে হযরত যায়েদের মনে খুবই ব্যথা লাগে। মহান আল্লাহ হযরত যায়েদের সমর্থনে এবং মুনাফিকের মিথ্যা উক্তির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইরশাদ ফরমান, 'আর আসমান ও যমীনের সকল ভাার আল্লাহরই হাতে। কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না"। (সূরা মুনাফিকুন-৭)। 'আর সম্মান তো আল্লাহর জন্য এবং তার রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকেরা তা জানে না।' এ বছর জুমাদাল উলা মতান্তরে জমাদাল উখরাতে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) এবং তাঁর সাথীগণ যাঁরা আয়স যুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা কুরাইশের একটি দলকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। তন্মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা হযরত যয়নব (রা.) এর স্বামী আবুল আসও ছিলেন। তিনি তখন পর্যন্ত অমুসলিম ছিলেন। আবুল আস হযরত যয়নবের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। তিনি তাকে নিরাপত্তা দিয়ে দেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ আমাদের পক্ষ থেকেও তাকে আশ্রয় দেয়া হল।' এ বলে আবুল আসের সম্পদ তাকে ফেরত দেয়া হয়। যুদ্ধের পরে আবুল আস ইবনে রবী ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন সাবেক বিয়ে বহাল রেখে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব (রা.) কে আবুল আসের (রা.) সংগে দিয়ে দেন। অন্য এক উক্তি মতে নতুন করে আবার আক্বদ করা হয়েছিল। পরের উক্তিই অধিক গ্রহণযোগ্য। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত যয়নবের এ দ্বিতীয় রুখসতী ৭ম হিজরীতে হয়েছিল। রমযান মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক আনসারীর (রা.) বাহিনী আবু রাফে সালাম ইবনে আবুল হাকীক ইহুদীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। এ প্রসংগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'জেযা প্রকাশিত হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক যখন ঐ ইহুদীকে হত্যা করে ফিরেছিলেন। তখন অট্টালিকার সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে তার পায়ের গোঁড়ালী ভেংগে যায়। এমনকি গোঁড়ালীর টেনডন রগ ছিঁড়ে পা খসে যায়। সাহাবী শক্তভাবে তাতে পট্টি বাঁধেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পা লম্বা কর।' তিনি (রা.) পা বিছিয়ে দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীর পায়ে মোবারক হাত বুলিয়ে দেন। ফলে সাহাবীর পা এমনভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে, যেন কখনও তাঁর পায়ে কোন ব্যথাই ছিল না। শাওয়াল মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার (রা.) বাহিনী উসাইর ইবনে রেজাম ইহুদীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটি মু'জেযা প্রকাশিত হয়। উসাই ইহুদী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইসের মাথার উপর এমন ভয়াবহ আঘাত হানে যে তার মাথা ঘাড় পর্যন্ত ফেটে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আঘাতের স্থানে মুখের লালা মোবারক লাগিয়ে দেন এবং সুস্থতার দোয়া করেন। এরপর বর্ণিত সাহাবীর মাথায় আর কোনদিন ব্যথা হয়নি। এমনকি কখনও রক্ত বা পুঁজ কিছুই বের হয়নি।
📄 ৬ষ্ঠ হিজরী
৬ষ্ঠ হিজরী (৬২৭ খ্রীষ্টাব্দ) : ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদাইবিয়ার উদ্দেশ্যে যিলকদের ১ম তারিখ সোমবার মদীনা থেকে রওনা করেন এবং যুল হুলাইফায় এসে এহরাম বাঁধেন। মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে প্রায় পরেন শত সাহাবা ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এ সময় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে প্রতিনিধি করেন। সংগে নিয়ে আসেন কুরবানীর ৭০টি উট। উটের দায়িত্বে ছিলেন নাজিয়া ইবনে জুনদুব আসলাম (রা.)। তিনি বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে উটগুলো নিয়ে ছুটে যান। মহানবী যখন হুদাইবিয়ায় পৌঁছেন তখন মক্কার সব কাফির মিলে তাঁকে এগিয়ে যেতে নিষেধ করেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে চুল কাটান, হাদির উটগুলি কুরবানী করেন। মুসলমানরা কেউ এ বছর ওমরাহ পালন করতে পারেননি। পরবর্তী বছর সপ্তম হিজরীতে এর কাজা করেন। হুদাইবিয়ার সংগ্রাম শেষ করে মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তনের সময় আবু জানদাল (রা.) মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেদমতে হাজির হন। তাঁর আসল নাম হচ্ছে আস ইবনে সুহাইল ইবনে ওমর আল কুরশী। তিনি কিছুদিন পূর্বে মক্কার কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এর শাস্তিস্বরূপ তার পিতা তাকে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে মক্কা বিজয়ের দিন তার পিতাও ইসলাম গ্রহণ করেন।
সন্ধির সময় আরেক সাহাবী আবু বসীর হাজির হন। তার আসল নাম ছিল ওকবা ইবনে উসাইদ ইবনে জারিয়া ছাকাফী (রা.)। তিনি ছিলেন বনী জোহরার মিত্র। অনেক পূর্ব থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু বসীর এবং আবু জানদাল (রা.) মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে আবার মক্কায় পাঠিয়ে দেন। কারণ হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তের মধ্যে ছিল যারা মুসলমান হয়ে মক্কা থেকে বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে যাবে, তাদেরকে মক্কায় ফিরিয়ে দিতে হবে। অতঃপর আবু জানদাল এবং আবু বসীর (রা.) মদীনা এবং সিরিয়ার মধ্যবর্তী এক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার যুদ্ধের পূর্বে হযরত খুফাফ ইবনে ইমা ইবনে রাহাযা আল গেফারী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নিজ কওম বনু গেফারের ইমাম ও খতীব ছিলেন। তিনি হুদাইবিয়া এবং বাইয়াতে রেযওয়ানে অংশগ্রহণ করেন। হযরত খুফাফ তার পিতা ইমা, তার দাদা রাহাযা (রা.) তিনজনই সাহাবী ছিলেন। এ হিজরীর রমযানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লোকজন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন: হজুর! বৃষ্টির জন্য দোয়া করুন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে কান্নাকাটা করার, বিনয় প্রকাশ করার এবং সদাকা করার নির্দেশ দেন। তারপর সবাইকে নিয়ে ঈদগাহে ছুটে যান। দু'রাকাত নামায আদায় করেন। প্রথম রাকাতে সূরা আলা; দ্বিতীয় রাকাতে সূরা গাশিয়া তিলাওয়াত করেন। প্রথম রাকাতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচবার তকবীর পড়েন। তারপরে এক আকর্ষণীয় ও ঈমান বৃদ্ধিকারক ভাষণ দেন। লোকজন স্থান ত্যাগ করার আগেই বৃষ্টি শুরু হয় এবং কয়েকদিন ধরে অনবরত বৃষ্টি হতে থাকে। বৃষ্টি হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আজ লোকজন এভাবে সকাল করেছে যে কিছু সংখ্যক আমার উপর ঈমান রাখে এবং তারাকে অস্বীকার করেছে। আবার কিছু লোক তারার উপর ঈমান এনেছে এবং আমাকে অস্বীকার করেছে। যারা বলেছে যে আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমাকে ও আল্লাহকে স্বীকার করেছে এবং গ্রহের উপর ঈমান আনেনি।'
হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে এবং খাইবার যুদ্ধের পূর্বে হযরত রেফায়া ইবনে যায়েদ ইবনে ওহাব আল জুজামী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নিজ গোত্রের এক দল নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাতে একখানা চিঠি লিখে দেন। তাঁর গোত্রের অবশিষ্ট লোক, পত্র পেয়ে সকলেই ইসলামে দীক্ষিত হন। হযরত রেফায়া (রা.) সেই সাহাবী, যিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুদয়াম নামক হাবশী গোলাম হাদিয়াস্বরূপ দান করেছিলেন। তিনি খায়বারে নিহত হন। এ বছর যিলহজ্ব মাসে মতান্তরে চতুর্থ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বের রাজা বাদশাহগণের উদ্দেশ্যে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র পাঠান। এ সময় সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান যে অনারব বাদশাহগণ সিল মোহর ছাড়া কোন চিঠি গ্রহণ করেন না। এ কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপার আংটি তৈরি করেন। তাতে তিন লাইন লেখা ছিল। উপরে আল্লাহ, মধ্যখানে রাসূল এবং নীচে ছিল মুহাম্মদ। বিশ্বের রাজা বাদশাহদের নামে চিঠি লিখে এ সিলমোহর দ্বারা তাতে সিল বা মোহর লাগাতেন। সিল মোহরটি তৈরি হলে যিলহজ্ব মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাজা বাদশাহদের প্রতি দূত মারফত পত্র পাঠান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্ব মাসে একই দিনে নিম্নের সাহ- াবীদেরকে (রা.) বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশা-শাসকদের কাছে প্রেরণ করেনঃ
১। আমর ইবনে উমাইয়া আজ জামিরী (রা.) কে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে।
২। দিহইয়া ইবনে খলীফা কালবীকে (রা.) রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে।
৩। আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.) কে পারস্য সম্রাট পারভেজের কাছে।
৪। হাতিব ইবনে আবু বালতা আল লাখমীকে (রা.) মিসর ও আলেক জান্দ্রিয়ার রাজা মুকাওকিসের কাছে।
৫। সোজা ইবনে ওহাব আল আসাদীকে (রা.), দামেস্কের বাদশা হারিছ ইবনে আবু শামর আল গাছছানীর কাছে।
৬। আমর আল আমিরী (রা.) কে ইয়ামামার বাদশা হাওয়া ইবনে আলী হানাফীর কাছে।
৭। আলা ইবনে হাজারামী (রা.) কে বাহরাইনের বাদশা শাহ মুনযির ইবনে সাওয়া আত তাইমী আদ দারমী আল আবদীর কাছে। ৮। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) কে ওমানের দু'জন বাদশা/সর্দার জায়কর এবং আবদে ফিরানে জুলানদের কাছে।
একই বছর সূরা ফাতাহ নাযিল হয়। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে ৬ষ্ঠ হিজরী হজ্ব ফরয হয়। আবার মতান্তরে দশম হিজরীতে হজ্ব ফরয হয়েছিল। একই বছর হজ্ব ও উমরা পালন এর ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব ও উমরা পালন কর।' (বাক্বারাহ-১৯৬)। কাফিরদের চরম শত্রুতার কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হজ্ব করতে পারেননি। তবে এ বছর যিলকদ মাসে ওমরার জন্য তাশরীফ নিয়ে যান। তবে মুশরিকরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হুদাইবিয়াতে আটকে দেয়। একই বছর জেহার (অর্থাৎ স্ত্রীকে মায়ের সংগে তুলনা করা) বিষয়ে আয়াত নাযিল হয়। জেহার যে তালাকের স্থলাভিষিক্ত নয় এ কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়। এ বছর কতিপয় মহিলা সাহাবী (রা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আসেন। তন্মধ্যে হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে ওকবা ইবনে আবি মুয়ীতও ছিলেন। মক্কার কাফিররা হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের ফেরৎ পাঠাবার জন্য সংবাদ পাঠায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর অপেক্ষায় থাকেন। পরে তাদের ফেরত পাঠাতে নিষেধ করে আয়াত নাযিল হয়। সূরা মুমতাহিনায় এ ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে। 'আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সকল কাফির মহিলাদের তালাক দিয়ে দেন। হযরত ওমর (রা.) এর ঘরে দু'জন কাফির মহিলা ছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদেরকে ছেড়ে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসছিলেন তখন উটের উপর আরোহী অবস্থায় মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সূরা ফাতাহ নাযিল হয়। এ সূরা নাযিল হওয়ার কারণে সাহাবায়ে কেরাম সীমাহীন আনন্দিত হন।
৬ষ্ঠ হিজরীতে সফরকালীন সময়ে যখন সূরা ফাতাহ নাযিল হয়, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সূরা নিয়ে বিশেষ ধ্যানে মশগুল ছিলেন। সময়টা ছিল রাত এবং সফর ছিল উটের। এ অবস্থায় হযরত ওমর (রা.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোন এক বিষয়ে প্রশ্ন করেন। মহানবী নীরব থাকেন। এতে হযরত ওমরের মনে বড়ই কষ্ট হয়। তিনি মনে মনে ভাবেন, নিশ্চয় আমার থেকে কোন মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী থেকে যখন অবসর হন তখন ইরশাদ করেন, 'হে ওমর। ওহীর ব্যস্ততার করণে আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। সূরা ফাতাহ নাযিল হয়েছে। এটা আমার কাছে গোটা পৃথিবী থেকে অধিক প্রিয়।' এ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা করান। এ প্রতিযোগিতায় ইবনে ওমর (রা.) শামিল ছিলেন। একই হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের দৌড় প্রতিযোগিতা করান। একজন গ্রাম্য লোকের সাধারণ একটি উট বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিখ্যাত উটনী ক্বাসওয়াকে পরাজিত করে এগিয়ে যায়। কাসওয়ার সংগে কোন জন্তুর প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার ঘটনা ছিল এই প্রথম। কাজেই মুসলমানগণের নিকট ব্যাপারটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং খুবই কষ্টকর মনে হয়। এ কষ্টের কথা মহানবীকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ এ বিষয়টি নিজ যিম্মাদারিতে নিয়ে গেছেন যে, দুনিয়াতে কোন জিনিস যখন খুব উন্নত হয়, তখন সেটাকে অবনত করে দেখান।' একই বছর আবারও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর ঘোড়া প্রথম স্থান অধিকার করে এবং তিনি পুরস্কৃত হন। এ দু'টি ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম প্রতিযোগিতামূলক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত (উসদুল গাবাহ)। এ বছর উম্মে রুমান বিনতে আমির ইবনে ওয়াইমির আল ফাসিয়ার (রা.) ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর স্ত্রী এবং হযরত আয়িশা সিদ্দীকার আম্মা। তার নাম ছিল যয়নব। তিনি প্রথম যুগের মুসলমান ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার কবরে অবতরণ করেছিলেন এবং তাঁর সম্পর্কে উক্তি করেন, 'কেউ যদি জান্নাতের বড় চক্ষুবিশিষ্ট হুর দেখতে চায়, তবে সে যেন তাকে দেখে নেয়।
৬ষ্ঠ হিজরীতে লবীদ ইবনে আসিম ইহুদী (আল্লাহর অভিশাপ প্রাপ্ত ব্যক্তি) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদু করে। এ নিকৃষ্ট কাজ সে ইহুদীদের উস্কানীতে করেছিল। এ কাজের জন্য ইহুদীরা তাকে তিনশত দিনার দান করেছিল। যেসব বস্তু দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদু করেছিল; সে তা যীইওয়ান নামক কূপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আল্লামা শামী লিখেছেন যে, সপ্তম হিজরীর মহররম মাসে সে যাদু করেছিল। ফলে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল হয়। এরপর কূপ থেকে ঐ যাদু বের করা হয়। এ যাদু একটি সুতার মধ্যে করা হয়েছিল। এতে এগারটি গিরা ছিল। উভয় সূরার এক একটি আয়াত দ্বারা একটি করে গিরা খুলতে থাকে। দুই সূরা পাঠ করার পর এগারটি আয়াতের দ্বারা এগারটি গিরা খুলে যায় এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ সুস্থ ও যাদুমুক্ত হন। এ সূরাদ্বয় এতটাই মর্তবাপূর্ণ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুদাইবিয়াতে অবস্থান করছিলেন তখন হযরত কাব ইবনে উজরা (রা.) সাহাবীকে দেখতে পেলেন যে, তিনি এহরাম অবস্থায় চুলা জ্বালিয়েছেন এবং তার চেহারা থেকে একটি উকুন খসে পড়ছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, 'ওহে কা'ব, এসব উকুন তোমাকে যন্ত্রণা দিবে। তিনি আরজ করেন, 'জ্বী হ্যাঁ।' এ ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়। তোমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ কিংবা যার মাথায় কষ্ট আছে, সে যেন তার ফিদিয়াস্বরূপ রোযা পালন করে অথবা সদাকা দিয়ে দেয় অথবা কুরবানী করে' (বাকরা-১৯৬)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিয়ে বলেন, 'তোমার মাথার চুল মুণ্ডিয়ে ফেল এবং ঐ তিন বস্তুর কোন একটি আদায় কর।' এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন তিনটি রোযা, সদকার ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন ছয়জন মিসকীন এবং কুরবানীর ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন একটি ছাগল যবাই কর। ৬ষ্ঠ হিজরীতে বনী লাহইয়ান যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আম্মাজান হযরত আমিনার কবর যিয়ারত করেন। সেখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়। এতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট অনুভব করেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তাকে (বিশ্বনবীর মা'কে) জীবিত করেন। তিনি জীবিত হয়ে ঈমান আনেন। অতঃপর পুনরায় তার ইন্তিকাল হয়ে যায়। বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা হযরত আব্দুল্লাহকেও আল্লাহ জীবিত করেছিলেন। তিনিও ঈমানের মত মহাসম্পদে ভূষিত হয়েছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিতা মাতার জীবিত হওয়ার বর্ণনা প্রসংগে যদিও মুহাদ্দিসগণ অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। তবে অনেক গুণী মুহাদ্দিসগণ বলেছেন যে এর সনদ হাসান। সুতরাং এটা বিশ্বাস করা যেতে পারে। তবে আল্লাহই ভাল জানেন সত্যিকার ঘটনা কি ছিল। এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক না করাই উত্তম।
এ হিজরীতে ওমরায়ে হুদাইবিয়ার সফরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসফান পৌঁছেন, তখন মুশরিকগণ যুদ্ধের জন্য আসেন। এ সময় আল্লাহ তা'আলা যুহর এবং আসরের সময় মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সালাতুল খাওফ নাযিল করেন। এটা ছিল সর্বপ্রথম সালাতুল খাওফ বা বিপদ কালীন নামায। যে নামাযে প্রথম কাতারে মুসলমানরা অস্ত্রসহ পাহারারত থাকবে এবং পিছনের কাতারে মুসলমানরা নামায আদায় করবে। হুদাইবিয়া সফরের সময় হযরত আবু কাতাদা (রা.) রাতের বেলা একটি জংলী গাধা শিকার করেন। তিনি তখন এহরামের মধ্যে ছিলেন না। এ জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতিতে মুহ-রিম যারা ছিলেন, সকলেই এর গোশত খেয়েছিলেন। হুদাইবিয়ার সফরের প্রাক্কালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবওয়া বা উদ্যানে ছিলেন তখন সায়াব ইবনে জাছামা লাইসী (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি জীবন্ত গাধা উপহার দেন। তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা গ্রহণ করেননি। এতে সাহাবীর চেহারায় দুঃখের ছাপ লক্ষ্য করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমি এটা এ জন্য গ্রহণ করতে অপারগ যে, আমি এহরামের মধ্যে আছি।' যেহেতু এটা জীবিত ছিল তাই গ্রহণ করেননি। অথচ আবু কাতাদার জন্তুটি যবাইকৃত ছিল সেটা গ্রহণ করেছিলেন। হুদাইবিয়াতে কিকর-বাবুল (বা বাবলা) গাছের নিচে বাইয়াতে রেযওয়ান অনুষ্ঠিত হয়। এর উল্লেখ করে মহান আল্লাহ ইরশাদ ফরমান, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ রাজী হয়েছেন মুমিনদের প্রতি, যখন তারা গাছের নিচে আপনার নিকট বায়াত গ্রহণ করেছিলেন।' (সূরা ফাতাহ-১৮)। এ বাইয়াতে সাহাবাগণ শপথ করেছিলেন যে, প্রয়োজনে জীবন দিব, তথাপি ময়দান থেকে পিছপা হব না। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ওক্কাসা ইবনে মিহসান (রা.) এর ভাই আবু সানান ইবনে মিহসান (রা.) বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ওক্কাসার চেয়ে বিশ বছরের বড়। তার নাম ছিল ওহাব। তিনি এবং তার ছেলে সানান বদর থেকে শুরু করে বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশার সকল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আবু সানানের ওফাত হয়েছিল বনী কুরাইযার যুদ্ধে এবং তার ছেলের মৃত্যু হয় হযরত ওসমান (রা.) এর খিলাফত আমলে।
এ বছর হুদাইবিয়ার কূপের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার মু'জেযা সংঘটিত হয়। হুদাইবিয়ার কূপে অল্প পানি ছিল। সাহাবীগণ সে পানি উঠিয়ে ফেলেছিলেন এবং কূপ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে কূপে পানি না থাকার অভিযোগ করেন। তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তীরদানী থেকে একটি তীর দান করেন। সে তীর কূপের ভেতরে গেঁড়ে দেয়া হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করার পর অবশিষ্ট পানি দান করেন। সে পানি উপরে থেকে কূপে ঢেলে দেয়া হয়। ফলে কূপের পানি ঝর্ণা ধারার মত উথলে উঠে। সাহাবায়ে কেরাম অতি তৃপ্তির সাথে পানি ব্যবহার ও পান করেন। উভয়পক্ষের সর্বসম্মতভারে হুলাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় যে, দশ বছর যাবৎ উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এ সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন বা লিখেন হযরত আলী (রা.)। হুদাইবিয়াতে অপর একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। আরও একবার পানি সংকট মারাত্মকভাবে দেখা দেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট একটি পাত্রে সামান্য পানি ছিল। এছাড়া কাফেলায় আর কোন পানি ছিল না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ পানি একটি পাত্রে ঢালেন। অতঃপর তাতে হাত মোবারক রাখেন। এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অংগুলীসমূহ দিয়ে ঝর্ণার ধারার মত পানি বেরিয়ে আসতে শুরু করে। সকল মুসলিম বাহিনী তৃপ্তির সাথে সে পানি ব্যবহার করে। সকলেই সে পানিতে ওযুও করেন। এ ঘটনার বর্ণনাকারী হযরত জাবির (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, এ বাহিনীতে আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর দেন, 'আমরা এক লক্ষ হলেও পানি যথেষ্ট হত। তবে আমরা সেদিন পনেরশত সাহাবা ছিলাম।' ইমাম বুখারী এবং অন্যান্য হাদীসের ইমামগণও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা আরও বলেছেন, 'বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অংগুলী মোবারক থেকে নির্গত এ পানি সকল পানি থেকে উত্তম পানি ছিল।' হুদাইবিয়া থেকে মদীনা যাওয়ার পথে সূরা আল ফাতাহ নাযিল হয়। উক্ত সূরায় মহাসুসংবাদসমূহ দেয়া হয়েছিল। যেমন: মক্কা আল মুকররমার বিজয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগের ও পরের সকল গোনাহ মাফ করা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে সর্বপ্রকার পাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। খাইবার বিজয় হবে। যেমন ইরশাদ হচ্ছে' 'আল্লাহ তোমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন, বিপুল পরিমাণ গনীমত যা তোমরা গ্রহণ করবে এবং শীঘ্রই হবে।' এটা ছিল খাইবার যুদ্ধের গনীমত যা শীঘ্র অর্জিত হয়েছিল।