📄 ২য় হিজরী
দ্বিতীয় হিজরী (৬২৩ খ্রীষ্টাব্দ): দ্বিতীয় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা এবং হযরত ওসমান (রা.) এর স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যা (রা.) ইন্তিকাল করেন। তিনি রমযান মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যু বদর যুদ্ধের দু'দিন পরে হয়েছিল। ঘটনাক্রমে যে দিন হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) হযরত ওসমান (রা.), এর নিকট বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে আসেন। সেদিনই হযরত রুকাইয়্যার (রা.) ইন্তিকাল হয়। এ সময় হযরত ওসমান (রা.) তার দাফনে ব্যস্ত ছিলেন। এ ছিল দ্বিতীয় হিজরীর ১৯শে রমযান রোজ রবিবার। বদর যুদ্ধ হয়েছিল ১৭ ই রমযান শুক্রবার। নবীকন্যার বয়স ছিল ২১ বছর। ২য় হিজরীতে ওবায়দা ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব আল কুরশীর বাহিনীকে রাবেগ পাঠান হয়েছিল। সেখানে হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ অভিযানে তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। আর সেটা ছিল মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত সর্বপ্রথম তীর।
একই বছর বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে বায়তুল্লাহ শরীফকে কিবলা নির্ধারণ করা হয়। এটা দ্বিতীয় হিজরীর মধ্যবর্তী রজব মাসে মঙ্গলবার দিনে হয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় শুভাগমনের ঠিক সতের মাস পরের ঘটনা। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ ঠিক এমন সময় এসেছিল, যখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বনু সালামার মসজিদে যুহরের নামাযে ইমামতি করছিলেন। দু'রাকাত নামায হয়ে যাওয়ার পর এ নির্দেশ আসে। সুতরাং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের মধ্যেই কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বাকী দু'রাকাত বায়তুল্লাহর দিকে আদায় করেন। এ জন্য এ মসজিদের নাম মসজিদে কিবলাতাইন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর আশুরার রোযা পালন করেন এবং এ রোযা পালনের নির্দেশ প্রদান করেন। অর্থাৎ রোযাকে ওয়াজিব হিসেবে ঘোষণা করেন। অথচ একই তারিখে মক্কায় থাকাকালীন সময়েও নফল হিসেবে পালন করেছেন। দ্বিতীয় হিজরীতে যখন রমযানের রোযা ফরয হয়, তখন এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। এরপর আশুরার রোযা পুনরায় নফল হয়ে যায়।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজ জীবনের শেষ বছর বলেছিলেন, 'আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে ১০ই মুহাররমের সাথে নয় তারিখের রোযাও পালন করব।' কিন্তু পরবর্তী রমযান আসার আগেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান। অতএব, ১০ই মুহাররমের রোযার সংগে নয় বা এগার তারিখের আর একটি রোযা পালন করা মুস্তাহাব। যাতে ইহুদী নাসারাদের সংগে অসামঞ্জস্য থাকে। মহররম বা আশুরার রোযার এটাই সর্বশেষ সুন্নাত বা মুস্তাহাব নিয়ম।
২য় হিজরীতে ক্বিবলা পরিবর্তনের একমাস পরে শাবানের ১৫ তারিখ রমযানের রোযা ফরয করা হয়। আর এটা হচ্ছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় তাশরীফ নিয়ে যাওয়ার ঠিক আঠারো মাস পরের ঘটনা। এই হিজরীতেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদ পড়ার হুকুম আসে। এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়। 'মহান আল্লাহ এবং তাঁর ফিরিশতাকুল রহমত প্রেরণ করেন নবীর উপরে। হে ঈমানদারগণ তোমরা রহমত পাঠাও তাঁর প্রতি এবং সালাম পাঠাও, বল সালাম।' আল্লামা শামী লিখেছেন, এ হুকুম নাযিল হয় ১৫ই শাবান দ্বিতীয় হিজরীতে। ২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধের প্রস্তুতির পূর্বে নামাযে সালাম-কালাম অর্থাৎ কথা বার্তা বলা নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম নাযিল হয়। এর আগে নামাযে পরস্পরে কথাবার্তা বলা এবং সালাম ও তার জবাব দেয়া বৈধ ছিল। অতঃপর আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহর সামনে আদবের সাথে নীরবে দাঁড়িয়ে থাক। (বাকারা-২৩৮)।
২য় হিজরীতেই ঈদের নামাযের দু'দিন পূর্বে সদকায়ে ফিতরের হুকুম নাযিল হয়। তখনও যাকাত ফরয হয়নি। অধিক বিশুদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য উক্তি হচ্ছে যাকাত হিজরতের আগের বছর ফরয হয়েছিল। একই বছর ঈদের নামাযের হুকুম নাযিল হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে লাঠি মোবারক গেড়ে দেয়া হয় এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে সুতরা করে ঈদের নামায পড়ান। এটা ছিল মুসলমানদের সর্বপ্রথম ঈদ। এ লাঠি মোবারক আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী, জুবায়র ইবনে আওয়ামকে হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ লাঠি উপহার হিসেবে দিয়ে ছিলেন। দুই ঈদে এবং অন্যান্য প্রয়োজনে এলাঠিটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মাটিতে পুঁতে রাখা হত। একই বছর যিলহজ্ব মাসে ঈদগাহে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহার নামায পড়ান। এটা ছিল মুসলমানদের সর্বপ্রথম ঈদুল আযহার নামায। এ বছর কুরবানীর নির্দেশ আসে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামায শেষ করে চাশতের সময় দু'টি ভেড়া কুরবানী করেন। ভেড়া দু'টি ছিল কাল এবং শিং বিশিষ্ট (ভেড়ার) খাসী। দুটি জন্তুই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে যবাই করেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে এবং অপরটি সকল উম্মতের পক্ষ থেকে। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর কুরবানী করেছেন।
এ বছর ১২ই সফর কাফিরদের সংগে যুদ্ধের অনুমতি আসে (হজ্জ-৩৯)। ইতোপূর্বে বাহাত্তরটি আয়াতে যুদ্ধ অবৈধ বলা হয়েছিল। কিন্তু উপরোক্ত আয়াত আগের নিষেধাজ্ঞাকে রহিত বা বাতিল করে দেয়। অতঃপর সূরা তওবার 'আয়াতে সাইফ' নাযিল হলে জিহাদ ফরয হয়ে যায়। এ আয়াতে বলা হয়েছে 'মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর, ওদের ধর, বেঁধে ফেল, ঘাঁটিতে ওৎ পেতে বসে থাক' (সূরা তওবা-৫)। উক্ত আয়াতটি এর আগের নাযিলকৃত একশত বিশ আয়াতের রহিতকারী। কারণ এর দ্বারা জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়েছে। এর আগের আয়াতসমূহে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। কিংবা কাফির যদি যুদ্ধ শুরু করে তবে তার প্রতিরোধ হিসেবে যুদ্ধ করা জায়েয ছিল অর্থাৎ যুদ্ধের মোটামুটি অনুমতি থাকলেও তা ফরয ছিল না। ২য় হিজরীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর নখলায় প্রেরিত অভিযানে গনীমত অর্জিত হয়। এ ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গনীমত। ২য় হিজরীতে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর অভিযানে আমর ইবনে আলা হাযরামী নামক একজন কাফির নিহত হয়। সেছিল মুসলমানদের হাতে নিহত সর্বপ্রথম কাফির। একই অভিযানে দু'জন কাফির বন্দী হয়। তারা ছিল সর্বপ্রথম বন্দী কাফির সৈন্য। (১) হেকম ইবনে কাইসান (২) ওসমান ইবনে আব্দুল্লাহ। হেকাম ইবনে কাইসান ইসলাম গ্রহণ করে, পরবর্তীতে অত্যন্ত পাকা ঈমানদার মুসলমান হিসেবে সাব্যস্ত হোন। কিন্তু ওসমান মুক্তি পেয়ে মক্কায় চলে যায় এবং কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
যদিও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) কে ইসলামী বাহিনীর সর্বপ্রথম আমীর মনোনীত করা হয়েছিল। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, ইসলামের অভিযানের সর্বপ্রথম আমির ছিলেন হযরত হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)। মুশরিকগণ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এবং তাঁর বাহিনীর উপর এ অভিযোগ দিয়েছিল যে, মুসলমানগণ সম্মানিত মাসের মর্যাদা রক্ষা করেননি। পবিত্র মাসেও তারা রক্তপাত করেছেন। অতএব এ পাপের ভাগী হবে তারা। এ কথা শুনে সাহ-াবায়ে কেরাম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের ঈমান, আমাদের হিজরত, আমাদের জিহাদের উপর আমরা কি আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারি না?' তখন আল কুরআনে আয়াত নাযিল হয় 'যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে- নিঃসন্দেহে তারা আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে পারে এবং আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং খুবই দয়াময়।' (সূরা বাকারা-২৮)
২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধ শেষে মুসলমানদের বিজয়ের সংবাদ শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করেন। দু'রাকাত শোকরানার নামায আদায় করেন। বদর যুদ্ধের পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে বন্দী কাফির সৈন্যদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করে তাদের মুক্ত করার পরার্মশ দেন। হযরত আবু বকর (রা.) ফিদিয়া বা মুক্তিপণের পক্ষে রায় দেন। হযরত ওমর (রা.) এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মত দেন। 'ওদের নিকট থেকে ফিদিয়া নেয়া নয় বরং ওদের হত্যা করাই যুক্তিযুক্ত। যাতে পৃথিবী আল্লাহর শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হয়।' সবশেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিদিয়া নিয়ে তাদের মুক্তি দানের ফায়সালা দেন। এতে করে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতা আসে এবং হযরত ওমরের (রা) পরামর্শের পক্ষে আয়াত নাযিল হয় 'যদি আল্লাহর এটি লিখিত সিদ্ধান্ত না হত, তবে তোমরা যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর, তাতে তোমাদের উপর কোন বড় শাস্তি এসে পড়ত।'
বদর যুদ্ধে তিনজন মুসলমান অর্থাৎ হযরত হামযা (রা.) ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং ওবায়দা ইবনে হারিছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) তিন মুশরিক সৈন্যের সামনাসামনি মোকাবেলায় ময়দানে আসেন। মুশরিক তিনজন হল ওতবা, শাইবা এবং ওলীদ ইবনে ওতবা। মল্লযুদ্ধে হযরত আলী (রা.) ওলীদকে হত্যা করেন। হযরত হামযা (রা.) শাইবাকেও হত্যা করেন। অতঃপর উভয়েই হযরত ওবায়দার সাহায্যে এগিয়ে যান এবং উতবাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। এ ছয়জন সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। 'এ দু'পক্ষে যারা দু'বার তাদের প্রভুর মতবিরোধ করেছে, অতএব যারা ছিল কাফির এবং তাদের জন্য আগুনের কাপড় কাঁটা হবে।'
বদর যুদ্ধে আবু জেহেল ইবনে হেশাম নিহত হন। তাকে মায়ায এবং মুয়াওয়ায (যারা ছিলেন আফরার দু'সন্তান) হযরত মায়ায ইবনে আমর ইবনে জামুহের সহায়তায় হত্যা করেন। যুদ্ধ শেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'দেখে এসো আবু জাহলের কি ঘটেছে? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার খোঁজে বের হন। তিনি কাফিরদের মৃত লাশের পাশে দেখতে পেলেন তখনও তার শরীরে জীবনের সামান্য স্পন্দন বাকী রয়েছে। তিনি আবু জেহেলের বক্ষে চড়ে বসেন এবং তরবারী দিয়ে তার মাথা কেঁটে নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে রেখে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে খুশি হন এবং আল্লাহ পাকের শুকরিয়াস্বরূপ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।
বদর যুদ্ধে কাফির পক্ষের ৭০ জন নিহত হয়। তাদের বড় বড় প্রায় সকল নেতৃবৃন্দ প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে ছিল-উমাইয়া ইবনে খালফ, ওতবা ইবনে রবীয়া, শাইবা, ওলীদ ইবনে ওতবা, তোয়াইমা ইবনে আদী, জুমায়া ইবনে আসওয়াদ, হারিস এবং আকিল (আসওয়াদের পুত্রদ্বয়), আব্দুল খাইরী নাবিজ এবং মুনাব্বিহ (আপন সহোদর), আসওয়াদ ইবনে আব্দুল আসওয়াদ মাখজুমি এবং আরো অনেকে। এ যুদ্ধে ৭০ জন কাফির বন্দী হয়। যেমন-সুহাইল ইবনে আমর আলকুরশী আবুদায়াহ ইবনে সুবরাহ। মুত্তালিব ইবনে আবূ দুদায়াহ, হানজালা, আমর, সম্বুর ইবনে হাব্বাব, আবুল আস ইবনে রবীয়া, আব্দুল উজ্জা ইবনে আবেদ শামছ, ইবনে আবদে মানাফ আলকুরশী, ওতবা ইবনে আবি মুয়ীট, নজর ইবনে হারিস।
বদর যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসসাফরা পৌঁছান তখন হযরত আলীকে (রা.) নির্দেশ দেন, ‘নজর ইবনে হারিছকে হত্যা কর।’ তিনি তখনই এ পাপিষ্ঠকে হত্যা করেন। আবার যখন আজজাজাবিয়ায় পৌঁছেন তখন আমীর ইবনে হাবিব (রা.)-কে নির্দেশ দেন, ওকবা ইবনে আবূ মুয়ীটকে হত্যা কর। সুতরাং তাকেও হত্যা করা হয়। এ সেই নজর ইবনে হারিছ, যে বিভিন্ন দেশ থেকে মিথ্যা কাহিনি ক্রয় করে সংগ্রহ করত এবং মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোকাবেলায়া কেচ্ছা কাহিনী বলে বেড়াত অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের আয়াত সম্পর্কে উপহাস করত। বিদ্রূপ করে বলত, লাও আমি তার চাইতে ভাল গল্প তোমাদের উপহার দিলাম। আল-কুরআনে তার সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়েছিল, ‘আর কোন কোন লোক এমনও আছে যে, ঐসব জিনিসের ক্রেতা হয়ে থাকে, যা আল্লাহ থেকে মানুষকে গাফিল করে রাখে। যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে না বুঝে শুনে পথভ্রষ্ট করে এবং এসব নিয়ে উপহাস করে। এমন সব লোকের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট শাস্তি।’ (সূরা লুকমান-৬)
২য় হিজরীর বদর যুদ্ধের সাতদিন পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবূ লাহাব কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর হয় ‘মদছা’ নামক এক জটিল এবং নিকৃষ্ট চর্মরোগে। তার সমস্ত শরীরে মসুরীর ডালের মত দানা দানা দেখা দেয়। আরবাবাসী এ রোগকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট মনে করত। তাদের মতে এ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট সংক্রামক রোগ। তার লাশকে লাঠি দিয়ে সরিয়ে পাথরচাপা দেয়া হয়। বদর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আরও তিনদিন অবস্থান করেন। তিনি তৃতীয় দিন ঐ গর্তের কাছে আসেন; যেখানে কাফিরদের মৃতদেহসমূহ ফেলা হয়েছিল। গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমাদের সংগে আমাদের মহান রব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা বাস্তবে তা পেয়েছি। সুতরাং তোমাদের প্রভু তোমাদের সংগে যে ওয়াদা করেছিলেন, তোমরাও কি বাস্তবে সেটা সঠিক পেয়েছ?’ অতঃপর মহানবী উপস্তিত সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বলেন, 'আমি যা কিছু বললাম, তোমাদের চেয়ে তারা (নিহত কাফির) আরো ভালভাবে শুনতে পেয়েছে, কিন্তু জবাব দিতে তারা অক্ষম।' (বুখারী, মুসলিম)
হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে বদর যুদ্ধে বন্দী করা হয়। তখন তিনি তখন ছিলেন কুরাইশ কাফিরদের দলভুক্ত। যখন মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়; তখন আব্বাস আপত্তি করে বলেন, তার কাছে ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দেয়ার মত কোন সম্পদ নেই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "ঐ স্বর্ণ থেকে আদায় করে দিন, যে স্বর্ণ বদরের যুদ্ধে আসার সময় আপনার স্ত্রীর উপস্থিতিতে নিজের ঘরের মেঝেতে পুতে রেখেছেন এবং তাকে অসিয়্যত করেছেন। এ যুদ্ধে যদি আমার কিছু ঘটে যায় তবে এ স্বর্ণ আমার তিন ছেলে ফযল, আব্দুল্লাহ এবং ক্বাসিমকে ভাগ করে দিও।" এ বক্তব্য শুনে হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আপনি সঠিক বলেছেন। এবার আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। কারণ, আমি এবং আমার স্ত্রী উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কেউ এ ঘটনা জানে না। আমি নিশ্চিত যে আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে, আপনি এ ঘটনা জানতে পেরেছেন। এ ঘটনাটি তাঁর ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হয়েছিল।
বদর যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরে আসার পর, হযরত ওমায়র ইবনে ওহহাব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি কুরাইশের শয়তানদের মধ্যে গণ্য হতেন। তিনি মক্কা থেকে মদীনায় আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবার মক্কায় ফিরে যান এবং মক্কার কাফিরদের এমনি যাতনা দিতে থাকেন, যেভাবে ইতোপূর্বে সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিতেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের উপলক্ষ্য হল যে; তিনি সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সংগে হাতিমে কা'বায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার গোপন পরামর্শ করেছিলেন। যা এতই গোপন ছিল যে তৃতীয় ব্যক্তি তা জানতো না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাকে এ পরামর্শের বিষয় অবগত করেন। এতে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত এবং রিসালতের উপর তাঁর বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
২য় হিজরীর সফর মাসের শেষের দিকে হযরত ফাতিমার (রা.) শাদীর আক্দ অনুষ্ঠিত হয়। এ হচ্ছে হযরত আয়িশার (রা.) রুখছতীর সাড়ে চার মাস পরের ঘটনা। হযরত ফাতিমার বয়স ছিল উনিশ বছর দেড় মাস। প্রসিদ্ধ উক্তি মতে কাবা শরীফ মেরামতের সময় হযরত ফাতিমার (রা.) জন্ম হয়েছিল। আর তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ৩৫ বছর। বিয়ের সময় তখন হযরত আলীর (রা.) বয়স ছিল ২৪ বছর দেড় মাস। কারণ তাঁর জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ত্রিশ বছর।
📄 ৩য় হিজরী
তৃতীয় হিজরী (৬২৪ খ্রীষ্টাব্দ): ৩য় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর (রা.) এর কন্যা মুসলিম জননী হযরত হাফছা (রা.) কে শাদী করেন। সর্বাধিক বিশুদ্ধ উক্তি অনুযায়ী এটি শাবান মাসের ঘটনা। হযরত হাফছার (রা.) প্রথম স্বামী খুলাইস ইবনে হুজাফার ইন্তিকাল উহুদ যুদ্ধের পূর্বে হয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ ছিল আঘাত, যা তিনি বদর যুদ্ধে পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে। এ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম জননী হযরত জয়নাব বিনতে খুজাইমাকে শাদী করেন। তিনি অত্যধিক দাতা ছিলেন বলে তাঁকে উম্মুল মাসাকীন বলা হত। উম্মুল মাসাকীন অর্থ অসহায় দরিদ্রের মা। তার প্রথম স্বামী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর যিলহজ্ব মাসের শেষের দিকে তার সংগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাদী মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে দুই বা তিন মাস কাটানোর পর, ৪র্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস সানী মাসে ইন্তিকাল করেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মধ্যে কেবলমাত্র হযরত খাদীজা (রা.) এবং হযরত যয়নাব (রা.) এর মৃত্যু হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায়। কোন কোন মতে হযরত রায়হানাও (রা.) মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। রবিউল আউয়াল মাসে হযরত ওসমান (রা.) এর শাদী হয় নবী দুলালী হযরত সায়্যিদা উম্মে কুলসুমের (রা.) সংগে। তাযকিরাতুল ক্বারী কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) হযরত জয়নাবের পরে এবং হযরত ফাতিমার আগে জন্মগ্রহণ করেন। এ হিসেবে তাঁর জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৩৪ বছর। এক বর্ণনায় তৃতীয় হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ হয়। এ ব্যাপারে আল কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা.) কে ইহুদীদের লিখিত ভাষা শিক্ষা করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং বলেন, 'আমি ওদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমার চিঠিপত্রের মধ্যে তারা ঝামেলা করতে পারে।' একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাতুর রেকার যুদ্ধে সালাতুল খওফ নামায আদায় করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, খাওফের নামায আসফান বা যিকিরদের যুদ্ধের সময় নাযিল হয়েছিল। আর এ দুটি যুদ্ধ ৬ হিজরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উহুদের যুদ্ধের পর এ হুকুম নাযিল হয় যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্য নাওহা বা বিলাপ করা, চেহারায় আঘাত করা, বক্ষ ছিঁড়ে ফেলা হারাম। এর আগে তা হারাম ছিল না। উল্লেখ্য যে, ওহুদের শহীদানের জন্য মহিলারা নাওহা এবং মাতম করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন এবং দেখেন হামযার জন্য কাঁদার মত কেউ নেই। কাজেই মহিলারা অন্যান্য শহীদানের মত হযরত হামযার জন্যও কাঁদতে থাকেন। কান্নাকাটির এ অনুষ্ঠান যখন সমাপ্ত হয় তখন নাওহা নিষেধ করে দেয়া হয়। এটাই আল কুরআনের নির্দেশনা।
এ বছর উহুদের যুদ্ধের পর মুশরিকরা হযরত হামযার (রা.) লাশ মোবারককে মুছলা অর্থাৎ বিকৃত করে। কান, নাক ইত্যাদি কেটে ফেলে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, 'আমি এর বদলায় তোমাদের সত্তর জনের মুছলা করে ছাড়ব।' এ কথার প্রেক্ষিতে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, 'যদি বদলা নিতে হয় তবে এতটুকুই কর, যতটুকু তোমাদের সংগে আচরণ করা হয়েছে।' উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলী, মুসলমানগণের কার্যক্রম, মুশরিকদের ধমক প্রদান ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে কুরআনে ষাটটি আয়াত নাযিল হয়। (সূরা আলে ইমরান-১২১-১৮১)। উহুদ যুদ্ধের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামযার (রা.) জানাযার নামায পড়ান। অতঃপর অন্যান্য শহীদানের কফিন বা জানাযা এক একজন করে হযরত হামযার (রা.) লাশের পাশে এনে রাখা হয় এবং জানাযা নামায পড়া হয়। এমনিভাবে হযরত হামযার জানাযা ৭০ বার পড়া হয়। তার অর্থ এ নয় যে হযরত হামযার জানাযার নামায সত্তরবার পড়া হয়েছে। বরং প্রত্যেক শহীদের জানাযার নামায আলাদা আলাদা পড়া হয়েছে। প্রত্যেক শহীদের সংগে হযরত হামযার (রা.) লাশ ওছিল। কাজেই হযরত হামযার জানাযা সত্তর বার পড়া হয়েছে ধরা যায়।
বিশুদ্ধ সূত্রমতে ৪র্থ হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ করার সময় এ আয়াত নাযিল হয়েছিল, 'হে ঈমানদারগণ! আসল কথা হল যে, মদ এবং জুয়া এবং মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর এগুলো নিকৃষ্ট ব্যাপার, শয়তানের কাজ। তোমরা এসব থেকে দূরে থেকো; যাতে তোমাদের কল্যাণ হয়। শয়তান তো এটা চায় যে, মদ এবং জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে হিংসা, হানাহানি সৃষ্টি করে দেয় এবং আল্লাহর স্মরণ এবং নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখে। অতএব এখনও কি তোমরা বিরত হবে না?' (সূরা আল মায়েদা ৯০-৯১)। এ বছর যখন মদ হারাম ঘোষণা করা হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন উহুদের শহীদান সম্পর্কে অর্থাৎ কতিপয় সাহাবা উহুদের যুদ্ধের দিন মদ পান করেছিলেন। অতঃপর শহীদ হয়ে যান। তবে তারা কি পাপী হবেন? যেহেতু তখন পর্যন্ত মদ নিষিদ্ধ হয়নি তাই তাদের সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়। 'যারা ঈমান নিয়ে এসেছে এবং নেক আমল করেছে; তারা মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যা পান করেছে তাতে তাদের গোনাহ হবে না।' (সূরা মায়েদা-৯৩)
এ বছর এবং মতান্তরে অষ্টম হিজরীতে সালাতুল খওফ এর বিধান নাযিল হয়। এ বছর এক ইহুদী যুগলকে পাথর মারা হয়েছে তাদের অপকর্মের (ব্যভিচারের) জন্য। এ বছর জুমাদাল উলায় হযরত আবু সালামা আব্দুল্লাহ আব্দুল আসাদ আল কুরসী আল মাখজামী (রা.) ইন্তিকাল করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাম্পত্যে আসার পূর্বে তার গৃহে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছিলেন এবং ৮ জুমাদাল উখরা চতুর্থ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। আবু সালামার ইন্তিকালের পর হযরত উম্মে সালামা চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করেন। তার পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে তার আব্দ হয়। শাওয়ালের শেষদিকে চতুর্থ হিজরীতে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহে আসেন।
তোয়ায়মা ইবনে উবাইরিক নামক মুনাফিক হযরত কাতাদা ইবনে নোমান আল আনসারীর (রা.) ঘর থেকে ঢাল চুরি করে নিয়ে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। সে পলায়ন করে মক্কায় চলে যায়। সেখানেও চুরি করে। মক্কাবাসী তাকে হত্যা করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবাদ জানিয়ে জানতে চাইলেন যে, হাত কাটার পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হল কেন? তখন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে আয়াত নাযিল করেন, 'আপনি বিতর্কে জড়াবেন না। ওদের পক্ষ হয়ে, যারা নিজেদের জীবনের খেয়ানত করে থাকে।' (নিসা-১০৭)
📄 ৪র্থ হিজরী
৪র্থ হিজরী (৬২৫ খ্রীষ্টাব্দ): ৪র্থ হিজরীতে বিরে মাউনায় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। এ অভিযানে ৭০ জন সাহাবী দাওয়াত ও তাবলীগে অংশ নিয়েছিলেন। একজন ছাড়া সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। বিরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ফজরের নামাযের পরে এক মাসব্যাপী কুনুতে নাযেলার দোয়া পাঠ করা হয়। উক্ত দোয়ার মধ্যে অভিযুক্ত জালিম কাবিলাসমূহের নাম ধরে ধরে বদ দোয়া করা হয়। কাবিলাগুলো হচ্ছে, আসম, যাকওয়ান, ওকবা ও লাইহান। অতঃপর আয়াত নাযিল হয়, '(হে নবী) আপনার এ বিষয়ে কোন এখতিয়ার নেই। আপনাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন, অথবা তাদের শাস্তি প্রদান করেন।' (সূরা আলে ইমরান-১২৮)। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুনুতে নাযেলা পাঠ করা বন্ধ করে দেন (বুখারী শরীফ)। একই বছর সফর মাসে হযরত খুবাইব ইবনে আদী (রা.) এবং যায়েদ ইবনে দাতনা (রা.) মক্কায় শহীদ হন।
এ হিজরীতে হযরত খুবাইব (রা.) কে হত্যার পূর্বে তিনি দু'রাকাত নামায আদায় করেন। অতঃপর এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দু'রাকাত নামায আদায় করা সুন্নত সাব্যস্ত হয়। যাকে অন্যায়ভাবে জোর করে হত্যা করা হয় সে দু'রাকাত সুন্নাত নামায পড়ে নিবে। এটা এজন্য সুন্নত যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় এটা করা হয়েছে এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে পছন্দ করেছেন। এ বছর মক্কার মুশরিকরা হযরত খুবাইব (রা.) কে তানয়ীম নিয়ে জীবন্ত শূলে চড়িয়ে হত্যা করে। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমান যাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। কাফিরগণ যখন তাকে শূলে চড়ায় তখন তার মুখ কিবলার দিক থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ শূলের সে লাকড়ী খ টি অটোমেটিক কিবলার দিকে ফিরে আসে। এ ঘটনাটি তার কারামাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাকে যে নরাধম হত্যা করেছিল তার নাম ছিল, আবু সারুয়া ওকবা ইবনে হারিছ। অথচ পঞ্চম হিজরীতে আবু সারুয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত খুবাইব (রা.) এর বীরত্বপূর্ণ শাহাদাতের ঘটনা জানতে পেরে বলেছিলেন, 'কে আছ! যে খুবাইবকে শূলে থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবে?' হযরত যুবায়র ইবনে আওয়াম এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) দাঁড়িয়ে আরজ করেন, 'আমরা নিয়ে আসব।' সুতরাং উভয়েই সফরের প্রস্তুতি নিলেন এবং হযরত খুবাইবকে (রা.) শূলে চড়ানোর চল্লিশ দিন পরে রাতের বেলা তানয়ীম পৌছেন। দেখতে পেলেন, তাঁর লাশ সম্পূর্ণ তাজা টাটকা রয়েছে, যেন আজই ইন্তিকাল করেছেন। তার হাতে জখম রয়েছে। সেখান থেকে তাজা রক্ত ঝরছে। রং ছিল রক্তের এবং সুগন্ধি ছিল মিশকের। মক্কার সত্তরজন কাফির শুয়ে শুয়ে লাশ প্রহরা দিচ্ছিল। তারা দু'জন মিলে শূল থেকে লাশটি নামিয়ে নিয়ে আসেন। অতপর লাশ হযরত আলী (রা.) এর ঘোড়ার উপর রেখে মদীনায় নিয়ে আসেন।
সফরকালীন সময়ে কুসর নামাযের বিধান সম্বলিত আয়াত এ হিজরীতে নাযিল হয়। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে 'আর তোমরা যখন সফরে যাও, তখন নামায কসর করতে কোন বাঁধা নেই' (সূরা নিসা-১০১)। ৪র্থ হিজরীর পহেলা যিলক্বাদ তারিখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) কে বিয়ে করেন। কোন কান সূত্র মতে সেটা পঞ্চম হিজরীতে হয়েছিল। হযরত যয়নবের তখন বয়স ছিল পয়ত্রিশ বছর। মুসলিম জননীগণের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম মদীনায় ইন্তিকাল করেন। এ হিজরীতে হযরত যয়নব বিনতে জাহশের রুখসতীর দিনে পর্দার হুকুম নাযিল হয়। কারো কারো মতে এটা ছিল পঞ্চম হিজরীর ঘটনা। তবে প্রথম উক্তি অধিকতর বিশুদ্ধ।
📄 ৫ম হিজরী
পঞ্চম হিজরী (৬২৬ খ্রীষ্টাব্দ): ৫ম হিজরীর মহররম মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রায়হানা বিনতে মায়মুনাকে শাদী করেন। তার সম্পর্ক ছিল বনু নযীরের সংগে। তিনি ছিলেন বনু কুরাইযার যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্য নির্বাচন করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আজাদ করে নিজ দাম্পত্যে নিয়ে আসেন। একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু মুস্তালিক যুদ্ধের পরে মুসলিম জননী হযরত জুয়াইরিয়াহ (রা.) কে শাদী করেন। তিনি বনু মুস্তালিকের নেতা হযরত হারিস ইবনে জেরারের কন্যা ছিলেন। এক উক্তি মতে, এই বিয়ে ৬ষ্ঠ হিজরীতে হয়েছিল। এ বছর উম্মুল মুমেনীন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা হারিস ইবনে জেরার মুস্তালিকের যুদ্ধে বন্দী হয়ে আসেন। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন。
খন্দক যুদ্ধের শেষ দিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মু'জেযা (অলৌকিক ঘটনা) প্রকাশিত হয় অর্থাৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়া কবুল হয়। মহান আল্লাহ প্রচ ঘূর্ণিঝড় এবং হিমেল বাতাস চালিয়ে দেন। ফলে কাফিরদের তাঁবু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তাদের সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। তদুপরি মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের বাহিনী পাঠিয়ে দেন। যারা অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠে নারায়ে তকবীর ধ্বনি দেয়। এ দৃশ্য দেখে কাফিরদের চেতনা-বুদ্ধি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাদের জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে গেলে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে লেজ গুটিয়ে পলায়ন করাকেই নিরাপদ মনে করে। আর এটা ছিল রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার ফসল। পবিত্র কুরআন সেদিকেই ইংগিত করেছে, 'অতঃপর আমি তাদের প্রতি এক ঘূর্ণিঝড় প্রবাহিত করলাম এবং এমন এক বাহিনী পাঠালাম যা তোমাদের দৃষ্টির অগোচরে ছিল' (সূরা আল আহযাব-৯)। 'আর আল্লাহ কাফিরদের বিচলিত করে সরিয়ে দেন ফলে, তাদের কোন প্রত্যাশা পূরণ হল না। আর যুদ্ধে মুসলমানের পক্ষে আল্লাহ নিজেই যথেষ্ট ছিলেন।' (সূরা আল আহযাব-২৫)
৫ম হিজরীতে বনু কুরাইযার যুদ্ধে হযরত খাল্লাদ ইবনে সুয়াইদ ইবনে ছালাবা আল আনসারী আল খাযরাজী (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। বনু কুরাইযার বান- ানানাহ নামক এক মহিলা তাঁর প্রতি লোহার দরজার পাট নিক্ষেপ করে। ফলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে ঘোষণা করেন যে, 'তিনি দুই শহীদের ছাওয়াব পাবেন।' খুনের বদলায় সে মহিলাকে হত্যা করা হয়। হতভাগা এ মহিলাটি ছাড়া, অন্য কোন যুদ্ধে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। কুরাইযার এ যুদ্ধে হুয়াই ইবনে আখতার নামের ইহুদী কাফির নিহত হয়। সেছিল ইহুদীদের প্রধান এবং মুসলিম জননী হযরত সুফিয়ার (রা.) পিতা। সে রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মারাত্মক হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করত। আল্লাহ তাকে কুফরীর অবস্থায় মৃত্যু দেন。
কুরাইযার যুদ্ধের সময় হযরত আবু লুবাবা ইবনে আব্দুল মুনজির আল আনসারী আল আওসী (রা.) এর তওবা কবুল হয়। যুদ্ধে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ী হলেন এবং তিনি বুঝতে পেলেন যে তার রেহাই পাওয়ার আর কোন সুযোগ নেই। তখন তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট দরখাস্ত করেন; আবু লুবাবাকে যেন বনু কুরাইযার নিকট যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। তাদের সংগে তার কিছু জরুরী পরামর্শ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ আবেদন মনজুর করেন এবং হযরত আবু লুবাবাকে বনু কুরাইযার কাছে পাঠিয়ে দেন। বনু কুরাইযার সংগে আবু লুবাবার জানাশুনা ছিল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন যে, যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিদ্ধান্ত কবুল করে কেল্লা থেকে বেরিয়ে আসা মনজুর করেন, তবে তাদের সংগে মহানবী কি আচরণ করবেন?' হযরত আবু লুবাবা তাদের জবাবে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে হাত দ্বারা গলার দিকে ইংগিত করেন। এর অর্থ ছিল তাদেরকে হত্যা করা হবে। এ সময় আয়াত নাযিল হয়, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা খেয়ানত করবে না। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সম্পর্কে। আর নিজেদের আমানতের খেয়ানত করো না' (সূরা আনফাল-২৭)। কুরআনের এ আয়াতে আবু লুবাবাকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন তার এ আচরণে আল্লাহ ও রাসূলের খেয়ানত হয়েছে। সুতরাং তিনি মদীনায় আসেন এবং নিজেকে মসজিদের একটি খুঁটির সংগে বেঁধে রাখেন। তিনি শপথ করেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার তওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত কেউ যেন তাঁকে খুলে না দেয়। পনের দিন পরে তার ক্ষমার ঘোষণা আসে এবং কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর কিছু লোক রয়েছে যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। যারা মিলে ঝিলে আমল করেছে কিছু ভাল এবং কিছু মন্দ (সূরা তওবা)। সুতরাং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে গিয়ে তার বাঁধন খুলে দেন। মদীনা শরীফে আজও সে খুঁটি উত্তয়ানায়ে আবু লুবাবা নামে পরিচিত হয়ে আছে।
এ বছর বনু কুরাইযা সম্পর্কে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আর যে আহলে কিতাবগণ তাদের সহায়তা করেছিল তাদেরকে তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে এনেছে। তাদের অন্তরে তোমাদের ভয়ভীতি সঞ্চার করে দেয়া হয়। কিছু সংখ্যককে তোমরা হত্যা করতে শুরু কর এবং কিছু সংখ্যককে বন্দী কর। তাদের জমি, তাদের ঘর বাড়ি এবং সহায়-সম্পদের মালিক, তোমাদের করে দিলেন (সূরা আহযাব- ২৬-২৭)। এ বছর রজব মাসে হযরত বিলাল ইবনে হারিছ মুজনী (রা.) তার কাবিলা বনু মুজনিয়ার চারশত লোক নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হন। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং বলেন, 'তোমরা সেখানেই অবস্থান কর। তোমাদের মুহাজিরদের মর্যাদা দেয়া হবে। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুমতিক্রমে নিজেদের ঘরবাড়িতে ফিরে আসেন। হযরত বিলাল ইবনে হারিছ (রা.) সুজনিয়া কাবিলার সর্বপ্রথম মুসলমান ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিনে বনু মুজনিয়ার ঝা। তারই হাতে ছিল। ৪র্থ হিজরীতে হযরত জেমাম ইবনে ছা'লাবা (রা.) তার কওম বনু সা'দ ইবনে বকরের প্রতিনিধি হিসেবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে এসে হাজির হন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামায, রোযা, যাকাত এবং হজ্ব সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করে ফিরে গিয়ে তার কওমকে সেসব বিষয়ে অবগত করেন। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর রজব মাসে মুজনিয়া কাবিলার প্রতিনিধি দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হন। তাদের সংগে ছিলেন বহু সংখ্যক লোক। তন্মধ্যে নোমান ইবনে মুকরিন ইবনে আয়িজ মাজানী, বেলাল ইবনে হারিছ মাজানী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের মূর্তির নাম ছিল "হাজিব”। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এটা ছিল সর্বপ্রথম প্রতিনিধি দল যারা মদিনায় এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে সাক্ষাৎ করেন।
এ বছর যিলহজ্ব মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ ঘোড়ার উপর আরোহণ করে 'আল গাবা' তাশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ঘোড়া থেকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পড়ে যান এবং ডান পায়ে আঘাত পান। এ সময় কয়েকদিন ঘরে অবস্থান করেন। আঘাতের কারণে বসে বসে নামায আদায় করেন। সে সময় মসজিদে হাজির হতে পারেননি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওমাতুল জানদাল যুদ্ধে ছিলেন। তখন হযরত সাদ ইবনে ওবাদার (রা.) আম্মা আমরা বিনতে সা'দ ইবনে আমর আনসারী ইন্তিকাল করেন। যেহেতু হযরত সাদও (রা.) এ যুদ্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে ছিলেন এজন্য তার জানাযা এবং দাফন কাজে শরীক হতে পারেননি। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আম্মা আকস্মিক ইন্তিকাল করেন। তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে সদাকা করার কথা বলতেন। এখন যদি আমি সদাকা করি তবে তার পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে কিনা?' ইরশাদ করেন, 'হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, 'কোন সদাকা সবচেয়ে উত্তম?' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দেন, 'পানি পান করাও। (অর্থাৎ যেখানে প্রয়োজন সেখানে কূপ খনন করে দাও)। সুতরাং হযরত সাদ (রা.) পানির কূপ তৈরি করে তার মাতার পক্ষ থেকে আল্লাহর পথে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। এ বছর হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ এবং হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর বর্ণনা মতে তারা অষ্টম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ। এ বছর সাবান মাসে বনু মুস্তালিক যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধকে মুরাইসী যুদ্ধও বলা হয়। উক্ত যুদ্ধে হযরত আয়িশা (রা.) এর হার হারিয়ে গিয়েছিল এবং এর সাথেই ঘটনাক্রমে তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হয়। এ যুদ্ধে হযরত আয়িশার (রা.) উপরে অপবাদ রটনার ঘটনা ঘটেছিল। (নাউযু বিল্লাহ)।
এ বছর আয়িশার বিরুদ্ধে অপবাদের প্রতিবাদে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। সূরা নূরের ১৮নং আয়াত তার সম্পর্কে নাযিল হয়। এতে হযরত আয়িশার পবিত্রতা প্রমাণিত হয়। মুনাফিক এবং অপবাদ রটনাকারীরা লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হয়। উল্লেখ্য ইফকের ঘটনার শুরুতে তায়াম্মুমের বিধান নাযিল হয়েছিল। তায়াম্মুম অন্য কোন উম্মতের জন্য জায়েয ছিল না। এটা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের খাস উপহার ও দয়া。
৫ম হিজরীতে হযরত আয়িশার নিদোর্ষিতা ও পবিত্রতার আয়াত নাযিলের পরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কুসম খেয়ে ছিলেন যে, তিনি তার চাচাত ভাই মিসতাহ ইবনে আসাসাহ (রা.) এর আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দিবেন। কারণ, ইফকের ঘটনায় তিনিও অংশ নিয়েছিলেন। তার ব্যয় ভার হযরত আবু বকর (রা.) গ্রহণ করেছিলেন। এতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'আর তোমাদের যারা দ্বীনি লাইনে বুজুর্গ এবং আর্থিক সচ্ছলতার অধিকারী; তারা যেন নিজ আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের অনুদান বন্ধ করার কুসম না খায়। তাদের ক্ষমা করে দেয়া উচিৎ। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ত্রুটি ক্ষমা করে দিন এবং তোমাদের মার্জনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান (সূরা নূর-২২)। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি চাই যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেন।' অতঃপর মিসতাহ (রা.) এর আর্থিক অনুদান চালু করে দেন এবং বলেন, 'আল্লাহর কুসম ভবিষ্যতে তার অনুদান আর বন্ধ হবে না।' কুরআনে করীমে হযরত আয়িশা (রা.) এর সাফাই ঘোষণা হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ চার ব্যক্তিকে অপবাদ লাগানোর শাস্তিস্বরূপ আশিটি করে বেত্রাঘাতের নির্দেশ প্রদান করেন। যারা হযরত আয়িশা (রা.) কে অপবাদ দিয়েছিল তারা হলেন : আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলুল (মুনাফিক), হাসসান ইবনে সাবিত, মিসতাহ ইবনে আসাসাহ, হামনা বিনতে জাহশ (এ তিনজন মুসলমান)। এ চার ব্যক্তির মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হল মুনাফিকদের নেতা। সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অত্যন্ত হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করত। সে মা আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদের ঝড় বইয়ে দেয়। অপর তিনজন ছিলেন সত্যিকার মুমিন সাহাবী। তারা সরল বিশ্বাসে প্রোপাগাণ্ডাকে বিশ্বাস করে এ অপবাদ রটনায় অংশগ্রহণ করেন। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কঠোর ধমক দেয়া হয়। এক বর্ণনায় এসেছে বা কেউ কেউ বলেছেন যে, উক্ত ঘটনায় কাউকে শাস্তি প্রদান করা হয়নি।
একই বছর বনু মুস্তালিকের যুদ্ধের সময় সূরায়ে মুনাফিকুনের শানে নুযুলের এ ঘটনা ঘটে। একজন মুহাজির সাহাবী অর্থাৎ জাহজাহ ইবনে কয়েস আল গেফারী (রা.) যিনি সেনান ইবনে ফারওয়াহ আলজাহনী (রা.) অথবা সেনান ইবনে নায়ীম ইবনে আওস (রা.) নামক এক আনসারীকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। এতে বিষয়টি গড়াতে গড়াতে বড় হয়ে যায়। এক পর্যায়ে কোথায় আনসারগণ! অন্যদিকে মুহাজিরগণ কোথায়? এ ধরনের ডাকাডাকি শুরু হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনে বলেন, 'জাহেলিয়াতের যুগের এ ডাক কিসের? এ হচ্ছে পঁচা বাসি কথাবার্তা। এগুলো পরিত্যাগ কর।' মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তা শুনে বলে উঠে, 'আরে এসব আশ্রিত লোকেরা (মুহাজির) তোমাদের রুটি খেয়ে খেয়ে এবার তোমাদের সংগে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ওদের খরচ বন্ধ করে দাও, এমনি তারা ভেসে যাবে।' সে আরও বলে, 'ঠিক আছে একটু মদীনা ফিরে যেতে দাও, যে ব্যক্তি অধিক সম্মানিত সে নিকৃষ্টতমকে বের করে দিবে।' অধিক সম্মানিত বলতে সে নিজেকে বুঝাতে চেয়েছে আর নিকৃষ্টতম বলতে (নাউযু বিল্লাহ) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুঝাতে চেয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) তার এ নিকৃষ্ট কথাবার্তা শুনতে পান। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বিষয়ে অবগত করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তা জানতে পেরে কুসম খেয়ে তা অস্বীকার করতে থাকে। সে উল্টা হযরত যায়েদকে দোষারোপ করে। সে যায়েদের নামে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করতে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদকে ডেকে বলেন, 'সম্ভবত তুমি শুনতে ভুল করেছ।' এতে হযরত যায়েদের মনে খুবই ব্যথা লাগে। মহান আল্লাহ হযরত যায়েদের সমর্থনে এবং মুনাফিকের মিথ্যা উক্তির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইরশাদ ফরমান, 'আর আসমান ও যমীনের সকল ভাার আল্লাহরই হাতে। কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না"। (সূরা মুনাফিকুন-৭)। 'আর সম্মান তো আল্লাহর জন্য এবং তার রাসূলের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফিকেরা তা জানে না।' এ বছর জুমাদাল উলা মতান্তরে জমাদাল উখরাতে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) এবং তাঁর সাথীগণ যাঁরা আয়স যুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা কুরাইশের একটি দলকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন। তন্মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা হযরত যয়নব (রা.) এর স্বামী আবুল আসও ছিলেন। তিনি তখন পর্যন্ত অমুসলিম ছিলেন। আবুল আস হযরত যয়নবের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। তিনি তাকে নিরাপত্তা দিয়ে দেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, 'তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ আমাদের পক্ষ থেকেও তাকে আশ্রয় দেয়া হল।' এ বলে আবুল আসের সম্পদ তাকে ফেরত দেয়া হয়। যুদ্ধের পরে আবুল আস ইবনে রবী ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন সাবেক বিয়ে বহাল রেখে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব (রা.) কে আবুল আসের (রা.) সংগে দিয়ে দেন। অন্য এক উক্তি মতে নতুন করে আবার আক্বদ করা হয়েছিল। পরের উক্তিই অধিক গ্রহণযোগ্য। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত যয়নবের এ দ্বিতীয় রুখসতী ৭ম হিজরীতে হয়েছিল। রমযান মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক আনসারীর (রা.) বাহিনী আবু রাফে সালাম ইবনে আবুল হাকীক ইহুদীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। এ প্রসংগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'জেযা প্রকাশিত হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতিক যখন ঐ ইহুদীকে হত্যা করে ফিরেছিলেন। তখন অট্টালিকার সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে তার পায়ের গোঁড়ালী ভেংগে যায়। এমনকি গোঁড়ালীর টেনডন রগ ছিঁড়ে পা খসে যায়। সাহাবী শক্তভাবে তাতে পট্টি বাঁধেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ফিরে আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পা লম্বা কর।' তিনি (রা.) পা বিছিয়ে দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীর পায়ে মোবারক হাত বুলিয়ে দেন। ফলে সাহাবীর পা এমনভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে, যেন কখনও তাঁর পায়ে কোন ব্যথাই ছিল না। শাওয়াল মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার (রা.) বাহিনী উসাইর ইবনে রেজাম ইহুদীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। এ সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরেকটি মু'জেযা প্রকাশিত হয়। উসাই ইহুদী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইসের মাথার উপর এমন ভয়াবহ আঘাত হানে যে তার মাথা ঘাড় পর্যন্ত ফেটে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আঘাতের স্থানে মুখের লালা মোবারক লাগিয়ে দেন এবং সুস্থতার দোয়া করেন। এরপর বর্ণিত সাহাবীর মাথায় আর কোনদিন ব্যথা হয়নি। এমনকি কখনও রক্ত বা পুঁজ কিছুই বের হয়নি।