📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ১ম হিজরী

📄 ১ম হিজরী


প্রথম হিজরী (৬২২ খ্রীষ্টাব্দ): প্রথম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে মদীনায় হিজরত করার পূর্বে হযরত মুসয়াব ইবনে ওমায়র (রা.) কে দ্বিতীয়বার মদীনায় পাঠান। তিনি যাতে লোকদের তাওহীদ, আখিরাত, রিসালাত তথা কুরআন এবং দ্বীনের জরুরী বিষয়াবলী শিক্ষা দেন। তাঁর এই শিক্ষা দানের বরকতে বহু লোক মুসলমান হয়ে যান। বনু আবদে আশহালের গোটা কাবিলা একই দিনে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কাবিলার নারী পুরুষ শিশুসহ কেহই এমন ছিল না যিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। প্রথম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা মুকাকাররামা থেকে মদীনা মুনাওয়ারাহ হিজরত করেন। এ মোবারক সফরে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর গোলাম আমির ইবনে ফুহাইয়া এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকত আদ দাইলী অংশগ্রহণ এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃহস্পতিবার, রবিউল আউয়ালের চন্দ্রিমা রাতে মক্কা মুকাররামাকে বিদায় জানিয়ে ছাওর পর্বতের দিকে রওনা হন। ছাওর পর্বতে তিন রাত অবস্থান করেন অর্থাৎ শুক্র, শনি ও রবিবার রাত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কুবা বস্তিতে হাজির হন। সেখানে কয়েক রাত্রি অবস্থান করেন। সেখানে কুবা মসজিদ নির্মাণ করেন। অতঃপর শুক্রবার কুবা থেকে মদীনা পৌঁছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগার রাত্রি কুবায় অবস্থান করেন। অতঃপর ২৩ রবিউল আউয়াল জু'মার দিনে মদীনায় এসে হাজির হন।

যে রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মক্কা থেকে বের হয়ে ছাওর পর্বতের দিকে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিলেন, সে রাতে একটি ঘটনা ঘটে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকরের ঘরে ছিলেন। ঘরের লোকজন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) এর জন্য সফরের সামান তৈরি করেন। একটি থলিতে কিছু খাবার সামগ্রী এবং একটি মশকে কিছু পানি ছিল। থলি এবং মশকের মুখ বাঁধার জন্য কোন রশি ছিল না। তখন হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) তার কোমরের বেল্ট ছিঁড়ে দু'টুকরা করে একটি দিয়ে থলি এবং অপরটি দিয়ে মশকের মুখ বেঁধে দেন। এর ফলে তার উপাধি হয়ে যায় যাতুন নেতাকাইন অর্থাৎ দু'কমরবন্দওয়ালী।

প্রথম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। ছাওর গুহার মুখে মাকড়শা জাল বুনে রাখে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি মু'জেযা প্রকাশ পায়। এক জোড়া কবুতর গুহার মুখে ডিম পাড়ে। ফলে মাকড়শার জাল এবং কবুতরের ডিম গুহাটিকে একটি অব্যবহৃত ও শক্ত দুর্গে পরিণত করে দেয়। কাফিরগণ এতে বুঝে নেয় যে, এ গুহায় কোন লোক প্রবেশ করেনি। ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে, 'কাফিরগণ বুঝতে পেল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি গুহায় থাকতেন তবে গুহার মুখে মাকড়শা জাল বুনতে পারত না এবং কবুতরও ডিম দিতে পারত না।'

একই রাত্রিতে ছাওর পর্বতে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বিস্ময়কর মু'জেযা প্রকাশ পায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) যখন গুহায় প্রবেশ করতে ইচ্ছা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) তখন বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম এ অন্ধকার রাতে এ গর্তে আপনি আমার আগে প্রবেশ করবেন না। আমি প্রথমে প্রবেশ করি, যদি তাতে কোন সাপ বিচ্ছু অথবা বিষাক্ত জীব-জন্তু থাকে; তবে আমাকে কাটবে, আপনাকে না। সুতরাং হযরত আবু বকর (রা.) প্রথমে ভিতরে গেলেন। চারদিকে খোঁজ নিয়ে দেখলেন। সেখানে গর্তের ভিতরে অনেকগুলো ছিদ্র বিদ্যমান। আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নিজ কাপড় ছিঁড়ে টুকরা দিয়ে সব গর্তের মুখ বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু একটি ছিদ্র বাকী রয়ে গেল এবং তাঁর কাপড় নিঃশেষ হয়ে গেল। হযরত আবু বকর (রা.) সে ছিদ্রে নিজ পায়ের গোঁড়ালী রেখে দিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভিতরে আসার আবেদন জানালেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিতরে তাশরীফ নিয়ে যান। এক পর্যায়ে ঐ ছিদ্র থেকে একটি সর্প হযরত আবু বকর (রা.) কে দংশন করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি এ বিষয়ে অবহিত করলে, মহানবী নিজ মুখের লালা লাগিয়ে দেন। ফলে বেদনা এতটাই কমে গেল যে, যেন কোন বেদনাই ছিল না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেন, 'আয় আল্লাহ আবু বকরকে কিয়ামতের দিন আমার সংগে আমারই স্তরে রাখুন।' আল্লাহ সাথে সাথে ওহী পাঠান। হে নবী! আপনার দোয়া কবুল করা হয়েছে।

হিজরতের সফরের প্রাক্কালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে মা'বাদ (রা.)-এর তাঁবুর পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। উম্মে মা'বাদ এর আরেক নাম আতিকা। তিনি কুদাইদে অবস্থান করতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে গিয়েছিলেন। উম্মে মা'বাদ এবং তার স্বামী আবু মা'বাদ খেজায়ী ইসলাম এবং বাইয়াত গ্রহণ করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে মা'বাদের অনুমতিক্রমে তার বকরীর দুধ দোহন করেন। ছাগলটি অত্যন্ত দুর্বল এবং রুগ্ন ছিল। তাছাড়া ছাগলটি ছিল বাজি বা বন্ধ্যা। তার স্তনের মধ্যে দুধের নাম নিশানা ছিল না। তথাপি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বড় পাত্রে দুধ দোহন করেন। সে দুধ নিজের সাথীদের পান করান এবং উম্মে মা'বাদকেও পান করতে বলেন। পরিশেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও দুধ পান করেন। পুনরায় এ পাত্রে দুধ বের করেন এবং উম্মে মা'বাদকে দুধ দিয়ে তিনি তাশরীফ নিয়ে যান। অতঃপর হযরত ওমর (রা.) এর খেলাফত কাল অর্থাৎ ১৮ হিজরী পর্যন্ত এ ছাগলটি সকাল বিকাল এভাবে দুধ দিতে থাকে। এটি বিশ্বনবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়কর মু'জেযার একটি।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছাওর পর্বতের গুহা থেকে মদীনার পথে রওনা হন। তখন অনেক কাফির সমবেত হয়। কিন্তু কোন কাফির মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ধরতে সক্ষম হয়নি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন উম্মে মা'বাদের তাঁবু থেকে রওনা করেন, তখন সুরাকা ইবনে মালিক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পৌঁছতে সক্ষম হয়। অভিশপ্ত আবু জেহেল এবং অন্যান্য কুরাইশ কাফিররা এ শর্ত রেখেছিল যে, যদি কেউ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা আবু বকর (রা.) কে হত্যা করতে কিংবা জীবন্ত ধরে আনতে সক্ষম হয়, তবে তাকে এক শত উট পুরস্কার দেয়া হবে। সুরাকা পুরস্কারের লোভে ঘোড়ায় চড়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছাকাছি চলে যায়। সে যখন মাত্র তিন গজ দূরত্বে চলে যায়, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! শত্রু আমাদের কাছে চলে এসেছে।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেন।

'হে আল্লাহ আপনি আমাদের সহায়তা করুন, যেভাবে আপনি চান।' দোয়া শেষ হতে না হতে সুরাকা ঘোড়াসহ ভূমিতে ধ্বসে যায়। ফলে সুরাকা চিৎকার করে বলে উঠে, 'হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমাকে রক্ষা করুন। আপনার আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, যদি আমি এ বিপদ থেকে রেহাই পাই, তবে আর কোনদিন এমন স্পর্ধা দেখাব না। আমি আপনার খবর কাউকে বলব না।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেন এবং তার ঘোড়া মুক্তি পেয়ে যায়। সেখান থেকেই সে ফিরে যায়। সেদিন সুরাকা ইসলাম গ্রহণ করেনি। মক্কা বিজয়ের পরে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইন যুদ্ধ শেষ করে আসেন, সেদিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে যান, বুরাইদা ইবনে হাসিব তার কওমের সত্তর-আশি জন লোক নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে সাক্ষাৎ করেন। তারা মক্কা মদীনার মধ্যখানে বাস করতেন। আবু জেহেল এবং অন্যান্য কুরাইশ কাফিররা তাদের কাছে পয়গাম পাঠিয়ে ছিল যে যদি তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারেন তবে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। তারা মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর পবিত্র জ্যোতির্ময় চেহারা দেখেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্দর বাণী শুনেন। যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদের দাওয়াত দেন। তখন হযরত বুরাইদা (রা.) তার সকল সংগী-সাথীসহ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনা তৈয়িবাহ পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংগে যান।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে প্রথমে কুবায় দশ কিম্বা বার দিন অবস্থান করেন। সেখানে অবস্থানকালে মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদ নির্মাণ কর্মকা েমহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অংশগ্রহণ করেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মসজিদ। এ মসজিদ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'নিশ্চয় সে মসজিদ যার বুনিয়াদ তাক্বওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, আপনি তাতে অবস্থান করার অধিক উপযুক্ত।' মসজিদ নির্মাণের ব্যস্ত তার দরুন ঐ কয়েকদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুবায় থাকতে হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেখানে জু'মা পড়ান। মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্মিত এ মসজিদটি বনু সালিম ইবনে আওফের বস্তি কুবা এবং মদীনার মধ্যখানে ছিল। এটিকে মসজিদে জু'মা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ হচ্ছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম জু'মা এবং সর্বপ্রথম খুতবা। এ মসজিদ এখনও আছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ দিন কুবায় ছিলেন। অতঃপর কুবা থেকে মদীনা আসার পথে মধ্যখানে বনু সালিম ইবনে আওফের অনুরোধে এবং বরকতের উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করেন। সেখানেই জু'মার আয়াত নাযিল হয়। তাই সেখানে জু'মা পড়েন এবং খুতবা দেন। এরপর উটে আরোহণ করে মদীনায় প্রবেশ করেন। অতএব জু'মার দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় প্রবেশ করেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনা শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশার্থে মদীনার নারী, পুরুষ এবং ছেলেমেয়েরা ঘর হতে বের হয়ে আসে। পর্দানশীল মহিলারা ঘরের ছাদে উঠে পড়ে। বনু নাজ্জার গোত্রের ছোট ছোট মেয়েরা কবিতা পাঠ করে। 'হে মহান ব্যক্তিত্ব! যাঁকে আমাদের মধ্যে নবী বানিয়ে পাঠান হয়েছে। আপনি এমন হুকুম আহকাম নিয়ে এসেছেন; যেগুলো পালন করা আমাদের জন্য জরুরী।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় শুভাগমন করেন তখন তিনি উষ্ট্রীর উপর আরোহী ছিলেন। মদীনার সকল অধিবাসী চাইতেন যেন মহানবী তাঁর গৃহে অবস্থান করেন। উষ্ট্রীর লাগাম ধরে সবাই নিজেদের প্রবল আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাচ্ছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, 'ওকে ছেড়ে দাও, যেখানে আদেশ হবে উস্ত্রী সেখানেই বসবে।' অবশেষে উস্ত্রী হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) বাড়িতে গিয়ে বসে পড়ে। এ স্থানটি খুবই বরকতময়। লোকজন এর যিয়ারত করেন। মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের ফলে এ স্থানটি বর্তমানে মসজিদের অভ্যন্তরেই রয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আইয়ুব আনসারীর ঘরে মেহমান হয়ে তাশরীফ নেন। এখানেই মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) ঘরে অবস্থান করেই উম্মুল মুমেনীনদের জন্য হুজরা (কক্ষ) নির্মাণ করেন। এগুলো যখন নির্মিত হয়ে যায়, তখন তিনি সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে যান। আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) বাড়িতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সাত মাস অবস্থান করেন। আবার কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, সেখানে এক মাসেরও কমসময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান করেন। হযরত আলী (রা.) তিনদিন পর হিজরত করেন। বিশ্বনবী তাকে জনগণের আমানত ফেরৎ দেয়ার জন্য মক্কায় রেখে এসেছিলেন। তিনি হিজরত করে কুবায় এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে সাক্ষাৎ করেন। হযরত আলী (রা.) যখন হিজরত করে কুবা পৌছেন; দ্রুত চলার কারণে তার পায়ে মারাত্মক ব্যথা বেদনা অনুভূত হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীর ব্যথার জায়গায় হাত রাখেন ফলে ব্যাথা তৎক্ষণাৎ বিদূরীত হয়ে যায়। এরপর পরবর্তী জীবনে আর কখনও তার পায়ে ব্যথা হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবায় অবস্থান করে আরবী তারিখ গণনা শুরু করার নির্দেশ দেন অর্থাৎ হিজরত দ্বারা তারিখ সূচনা করেন এবং হিজরী সনের প্রথম মাস মহররম নির্ধারণ করেন। আরবদের কাছে মহররম বছরের শুরু হিসেবে ধরা হয়। এ মাসেই হাজীগণ হজ্ব শেষে বাড়ি ফিরেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের কয়েকদিন পরে কয়েকজন সম্মানিত মহিলা হিজরত করেন। তারা হলেন, হযরত ফাতিমা (রা.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উম্মুল মুমেনীন হযরত সওদা (রা.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ধাত্রী উম্মে আইমান (রা.), মুসলিম জননী হযরত আয়িশা (রা.), তাঁর বোন আসমা বিনতে আবু বকর (রা.), হযরত আয়িশার আম্মা উম্মে রুমান (রা.)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা পৌঁছার পর হযরত যায়েদ ইবনে হারিছা (রা.) এবং হযরত আবু রাফেকে ঐসব মহিলাদের নিয়ে আসার জন্য মক্কা মুকাররমায় প্রেরণ করেন। তারা উভয়েই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের সাত মাস পরে হিজরত করেন। হযরত আসমা (রা.) যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন পরিপূর্ণ গর্ভবতী ছিলেন। কুবাতেই তার সন্তান হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) জন্ম গ্রহণ করেন।

প্রথম হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববী এবং তার পবিত্রা স্ত্রীদের হুজরা নির্মাণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাফে ইবনে আমরের ছেলে ছাহল ও সুহাইলের কাছ থেকে জমি খরিদ করে মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদে নববী নির্মাণের ইতিহাস অতি সুস্পষ্ট। মসজিদের পাশেই একটি ছায়াদার জায়গায় ছাপড়ার মত নির্মাণ করা হয়। যাতে মিসকীনগণ আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। এ জায়গাকে 'সুফফা' বলা হয়। প্রথম হিজরীতে আযান এবং ইকামতের সূচনা হয়। প্রথমে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদি রাব্বিহ আল আনসারী আল খাযরাজীকে আল্লাহ কর্তৃক স্বপ্ন যোগে আযান এবং ইকামতের নিয়ম শিক্ষা দেয়া হয়। অতঃপর এর সমর্থনে ওহী নাযিল হয় এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে এর সত্যতার স্বীকৃতি দান করেন।

অপর এক বর্ণনা মতে আযান এবং ইকামতের সূচনা দ্বিতীয় হিজরীতে হয়। হাফিয ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে লিখেছেন, প্রথম হিজরীতে আযান এবং ইকামতের প্রচলনের বর্ণনা অধিক বিশুদ্ধ। হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, সর্বপ্রথম আযান দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) এর। তিনি প্রথমে ফজরের আযান দেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) হযরত জিব্রাঈল (আঃ) কর্তৃক আযানের যে শব্দাবলী শুনতে পেয়েছিলেন সেগুলো বলে যেতেন এবং হযরত বেলাল (রা.) উঁচু আওয়াজে তা আযান আকারে পেশ করেন।

প্রথম হিজরীতে এক রাখালের সংগে বাঘের কথা বার্তা হয়। বাঘ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাতের সাক্ষী দেয়। এ রাখালের নাম ছিল আহ্বান ইবনে আওছ (রা.)। তাঁর উপনাম ছিল আবু আক্কাবাহ। রাখাল যখন বাঘের কথাবার্তা শুনে এবং তার সম্মুখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'জেযা প্রকাশিত হয়, তখন সে বাঘকে বলে, যদি কেউ আমার ছাগলগুলো দেখাশুনা করত তবে আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতাম। বাঘ বলে উঠে, 'তুমি যদি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে তাড়াতাড়ি ফিরে আস, তবে আমি এ সময়টুকু তোমার ছাগলের রাখালী করব।' রাখাল রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাখাল, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ঐ বাঘের ঘটনা ব্যক্ত করেন। ঘটনা শুনে মহানবী অত্যন্ত খুশি হন এবং তাকে ছাগলের কাছে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান যে, বাঘ সত্যি সত্যি ছাগলের রাখালী করছে। এমনকি সকল ছাগল নিরাপদে আছে।

হযরত ওসমান ইবনে মাজউন (রা.) প্রথম হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তিনিই হচ্ছেন সর্বপ্রথম মুহাজির সাহাবী যার দাফন হয় জান্নাতুল বাকীর গোরস্তানে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছেলে হযরত ইব্রাহীমের পার্শ্বে তাকে দাফন করা হয়।

প্রথম হিজরীর জুমাদাল উলায় হযরত নো'মান ইবনে বশীর আল আনসারী আল খাযরাজীর জন্ম হয়। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহার ভাতিজা। তিনি সর্বপ্রথম আনসারী সন্তান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পরে মদীনায় তার জন্ম হয়। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) এর ছয় মাসের বড় ছিলেন। বিশ্বনবীর হিজরতের ছ'মাস পরে শাওয়াল মাসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়র (রা.) কুবায় জন্মগ্রহণ করেন। মুহাজির সাহাবার ঘরে মদীনা শরীফে তিনি ছিলেন প্রথম সন্তান। সীরাত বিষয়ের আলেমগণ বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় শুভাগমনের পরে যায়েদ ইবনে হারিসা এবং আবু রাফে' (রা.) কে মক্কায় পাঠান যাতে করে তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকরের (রা.) পরিবারবর্গকে মদীনায় নিয়ে আসেন। তারা সেখানে গেলেন এবং তাদেরকে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে হযরত আসমা বিনতে আবু বকরও (রা.) ছিলেন। যিনি পূর্ণ গর্ভধারিণী ছিলেন। যখন তিনি কুবা এসে পৌঁছেন, তখন তার কোলে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ফলে মুসলমানগণ অত্যন্ত খুশি হন। কারণ ইহুদীরা পূর্বেই সংবাদ প্রচার করে রেখেছিল যে তারা সাহাবায়ে কেরামকে যাদু করে রেখেছে। ফলে তাদের কোন ছেলে সন্তান হবে না। এরপর যখন আনসারদের মধ্যে প্রথম হযরত নোমান ইবনে বশীর জন্মগ্রহণ করেন। তখন মুসলমানগণ ভীষণ খুশি হোন। এ সময় ইহুদীরা বলল যে, আমরা মুহাজিরদের উপর যাদু চালিয়েছি, আনসারদের উপর নয়। অতঃপর যখন মুহাজিরদের মধ্যে হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) সন্তান প্রসব করেন, তখন তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোলে রাখা হয়। মহানবী নিজ মুখের লালা নবজাতকের মুখে লাগিয়ে দেন। সর্বপ্রথম তার পেটে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখের পবিত্র লালা প্রবেশ করে। অতঃপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর এনে চিবিয়ে তার মাথার তালুতে লাগান। আরবীতে এটাকে তাহনীক বলে। অতঃপর তার জন্য বরকতের দোয়া করেন। তিনি বিখ্যাত ও সম্পদশালী সাহাবী হয়েছিলেন।

হযরত উম্মে সুলাইম (রা.) নিজ সন্তান হযরত আনাস (রা.) কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে নিয়ে আসেন যাতে তিনি মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেদমত করতে পারেন। আনসার সাহাবারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নানা ধরনের হাদিয়া তোহফা দিতেন। পুরুষগণ যেমন, মহিলারাও তেমন। হযরত উম্মে সুলাইম (রা.) তা দেখে খুবই ব্যথিত হলেন। কারণ তার কাছে হাদিয়া দেয়ার মত কিছুই ছিল না। অবশেষে তিনি নিজ সন্তান হযরত আনাসকে (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে নিয়ে আসেন এবং আরজ করেন, 'হুজুর! এ আপনার নগণ্য খাদিম। ওকে কবুল করুন।' তিনি একজন নামকরা সাহাবী হয়েছিলেন এবং বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি নবীর দোয়ার বরকতে শতায়ু পান।

প্রথম হিজরীতে যাকাতের "নিসাব" পরিমাণ নির্ধারণ এবং যাকাত ফরযের বিধান নাযিল হয়। প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে, হিজরতের ছয় মাস পরে উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা.) এর রুখসতী হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল নয় বছর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার বরকতে মহামারী এবং জ্বর রোগ মদীনা থেকে দূর হয়ে যায়। এর পূর্বে মদীনা ছিল বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক মহামারী অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে মহামারীর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ছিল। দুর্বল মুহাজিরগণ এখানে আসার পর মারাত্মকভাবে জ্বরে আক্রান্ত হতে থাকেন। তাদের চেহারা ফ্যাকাশে এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং মক্কার কথা তাদের বার বার মনে পড়তে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেন, 'হে আল্লাহ! আমাদের জন্য মদীনাকে এমন প্রিয় শহর করে দাও, যেমন মক্কা আমাদের কাছে প্রিয়। বরং তার চেয়েও অধিক প্রিয় এবং একে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর করে দাও, এর পরিমাপে বরকত দান কর। এখানকার জ্বর, জুহফার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও।' মহান আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ দোয়া কবুল করেন এবং মহামারী জুহফায় ফিরিয়ে দেন। জুহফায় ইহুদীরা বসবাস করত এবং মক্কা থেকে মদীনা আসার পথে মুহাজিরদের কষ্ট দিত। আল্লাহ এদের ধ্বংস করে দেন। এরপর তাদের বস্তি উজাড় হয়ে যায়। যা আজ পর্যন্তও আবাদ হয়নি। বলা হয় যে, আজ পর্যন্ত যে কেউ জুহফা প্রবেশ করলে তার তৎক্ষণাত জ্বর হয়ে যায়; যদিও সে মুসলমান হোক না কেন। এ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দোয়ার প্রভাব।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনা শুভাগমনের এক অথবা দু'মাস পরে নামাযের রাকাত বৃদ্ধি পায়। যুহর, আসর এবং এশার নামাযকে দু'রাকাতের স্থলে চার রাকাত করা হয়। এর আগে শবে মি'রাজে মাগরিবের নামায ছাড়া বাকী সকল নামায দু'রাকাত করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। অবশ্য প্রথম থেকেই মাগরিব ছিল তিন রাকাত। পরবর্তীতে চতুর্থ হিজরীতে সফরকালীন সময়ের জন্য নামাযের রাকাত হ্রাস করে দেয়া হয় অর্থাৎ চার রাকাতের স্থলে দু'রাকাত করা হয়। সফরকালীন সংক্ষিপ্ত নামাযকে কসর বলে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ২য় হিজরী

📄 ২য় হিজরী


দ্বিতীয় হিজরী (৬২৩ খ্রীষ্টাব্দ): দ্বিতীয় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা এবং হযরত ওসমান (রা.) এর স্ত্রী হযরত রুকাইয়্যা (রা.) ইন্তিকাল করেন। তিনি রমযান মাসে ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যু বদর যুদ্ধের দু'দিন পরে হয়েছিল। ঘটনাক্রমে যে দিন হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) হযরত ওসমান (রা.), এর নিকট বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে আসেন। সেদিনই হযরত রুকাইয়‍্যার (রা.) ইন্তিকাল হয়। এ সময় হযরত ওসমান (রা.) তার দাফনে ব্যস্ত ছিলেন। এ ছিল দ্বিতীয় হিজরীর ১৯শে রমযান রোজ রবিবার। বদর যুদ্ধ হয়েছিল ১৭ ই রমযান শুক্রবার। নবীকন্যার বয়স ছিল ২১ বছর। ২য় হিজরীতে ওবায়দা ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব আল কুরশীর বাহিনীকে রাবেগ পাঠান হয়েছিল। সেখানে হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ অভিযানে তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। আর সেটা ছিল মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত সর্বপ্রথম তীর।

একই বছর বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে বায়তুল্লাহ শরীফকে কিবলা নির্ধারণ করা হয়। এটা দ্বিতীয় হিজরীর মধ্যবর্তী রজব মাসে মঙ্গলবার দিনে হয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় শুভাগমনের ঠিক সতের মাস পরের ঘটনা। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ ঠিক এমন সময় এসেছিল, যখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বনু সালামার মসজিদে যুহরের নামাযে ইমামতি করছিলেন। দু'রাকাত নামায হয়ে যাওয়ার পর এ নির্দেশ আসে। সুতরাং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের মধ্যেই কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বাকী দু'রাকাত বায়তুল্লাহর দিকে আদায় করেন। এ জন্য এ মসজিদের নাম মসজিদে কিবলাতাইন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর আশুরার রোযা পালন করেন এবং এ রোযা পালনের নির্দেশ প্রদান করেন। অর্থাৎ রোযাকে ওয়াজিব হিসেবে ঘোষণা করেন। অথচ একই তারিখে মক্কায় থাকাকালীন সময়েও নফল হিসেবে পালন করেছেন। দ্বিতীয় হিজরীতে যখন রমযানের রোযা ফরয হয়, তখন এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। এরপর আশুরার রোযা পুনরায় নফল হয়ে যায়।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজ জীবনের শেষ বছর বলেছিলেন, 'আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে ১০ই মুহাররমের সাথে নয় তারিখের রোযাও পালন করব।' কিন্তু পরবর্তী রমযান আসার আগেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান। অতএব, ১০ই মুহাররমের রোযার সংগে নয় বা এগার তারিখের আর একটি রোযা পালন করা মুস্তাহাব। যাতে ইহুদী নাসারাদের সংগে অসামঞ্জস্য থাকে। মহররম বা আশুরার রোযার এটাই সর্বশেষ সুন্নাত বা মুস্তাহাব নিয়ম।

২য় হিজরীতে ক্বিবলা পরিবর্তনের একমাস পরে শাবানের ১৫ তারিখ রমযানের রোযা ফরয করা হয়। আর এটা হচ্ছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় তাশরীফ নিয়ে যাওয়ার ঠিক আঠারো মাস পরের ঘটনা। এই হিজরীতেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরূদ পড়ার হুকুম আসে। এ সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়। 'মহান আল্লাহ এবং তাঁর ফিরিশতাকুল রহমত প্রেরণ করেন নবীর উপরে। হে ঈমানদারগণ তোমরা রহমত পাঠাও তাঁর প্রতি এবং সালাম পাঠাও, বল সালাম।' আল্লামা শামী লিখেছেন, এ হুকুম নাযিল হয় ১৫ই শাবান দ্বিতীয় হিজরীতে। ২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধের প্রস্তুতির পূর্বে নামাযে সালাম-কালাম অর্থাৎ কথা বার্তা বলা নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম নাযিল হয়। এর আগে নামাযে পরস্পরে কথাবার্তা বলা এবং সালাম ও তার জবাব দেয়া বৈধ ছিল। অতঃপর আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহর সামনে আদবের সাথে নীরবে দাঁড়িয়ে থাক। (বাকারা-২৩৮)।

২য় হিজরীতেই ঈদের নামাযের দু'দিন পূর্বে সদকায়ে ফিতরের হুকুম নাযিল হয়। তখনও যাকাত ফরয হয়নি। অধিক বিশুদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য উক্তি হচ্ছে যাকাত হিজরতের আগের বছর ফরয হয়েছিল। একই বছর ঈদের নামাযের হুকুম নাযিল হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে লাঠি মোবারক গেড়ে দেয়া হয় এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে সুতরা করে ঈদের নামায পড়ান। এটা ছিল মুসলমানদের সর্বপ্রথম ঈদ। এ লাঠি মোবারক আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী, জুবায়র ইবনে আওয়ামকে হাদিয়াস্বরূপ দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ লাঠি উপহার হিসেবে দিয়ে ছিলেন। দুই ঈদে এবং অন্যান্য প্রয়োজনে এলাঠিটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মাটিতে পুঁতে রাখা হত। একই বছর যিলহজ্ব মাসে ঈদগাহে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল আযহার নামায পড়ান। এটা ছিল মুসলমানদের সর্বপ্রথম ঈদুল আযহার নামায। এ বছর কুরবানীর নির্দেশ আসে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামায শেষ করে চাশতের সময় দু'টি ভেড়া কুরবানী করেন। ভেড়া দু'টি ছিল কাল এবং শিং বিশিষ্ট (ভেড়ার) খাসী। দুটি জন্তুই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে যবাই করেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে এবং অপরটি সকল উম্মতের পক্ষ থেকে। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর কুরবানী করেছেন।

এ বছর ১২ই সফর কাফিরদের সংগে যুদ্ধের অনুমতি আসে (হজ্জ-৩৯)। ইতোপূর্বে বাহাত্তরটি আয়াতে যুদ্ধ অবৈধ বলা হয়েছিল। কিন্তু উপরোক্ত আয়াত আগের নিষেধাজ্ঞাকে রহিত বা বাতিল করে দেয়। অতঃপর সূরা তওবার 'আয়াতে সাইফ' নাযিল হলে জিহাদ ফরয হয়ে যায়। এ আয়াতে বলা হয়েছে 'মুশরিকদের যেখানে পাও হত্যা কর, ওদের ধর, বেঁধে ফেল, ঘাঁটিতে ওৎ পেতে বসে থাক' (সূরা তওবা-৫)। উক্ত আয়াতটি এর আগের নাযিলকৃত একশত বিশ আয়াতের রহিতকারী। কারণ এর দ্বারা জিহাদ ফরয করে দেয়া হয়েছে। এর আগের আয়াতসমূহে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। কিংবা কাফির যদি যুদ্ধ শুরু করে তবে তার প্রতিরোধ হিসেবে যুদ্ধ করা জায়েয ছিল অর্থাৎ যুদ্ধের মোটামুটি অনুমতি থাকলেও তা ফরয ছিল না। ২য় হিজরীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর নখলায় প্রেরিত অভিযানে গনীমত অর্জিত হয়। এ ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গনীমত। ২য় হিজরীতে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এর অভিযানে আমর ইবনে আলা হাযরামী নামক একজন কাফির নিহত হয়। সেছিল মুসলমানদের হাতে নিহত সর্বপ্রথম কাফির। একই অভিযানে দু'জন কাফির বন্দী হয়। তারা ছিল সর্বপ্রথম বন্দী কাফির সৈন্য। (১) হেকম ইবনে কাইসান (২) ওসমান ইবনে আব্দুল্লাহ। হেকাম ইবনে কাইসান ইসলাম গ্রহণ করে, পরবর্তীতে অত্যন্ত পাকা ঈমানদার মুসলমান হিসেবে সাব্যস্ত হোন। কিন্তু ওসমান মুক্তি পেয়ে মক্কায় চলে যায় এবং কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।

যদিও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) কে ইসলামী বাহিনীর সর্বপ্রথম আমীর মনোনীত করা হয়েছিল। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে, ইসলামের অভিযানের সর্বপ্রথম আমির ছিলেন হযরত হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)। মুশরিকগণ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) এবং তাঁর বাহিনীর উপর এ অভিযোগ দিয়েছিল যে, মুসলমানগণ সম্মানিত মাসের মর্যাদা রক্ষা করেননি। পবিত্র মাসেও তারা রক্তপাত করেছেন। অতএব এ পাপের ভাগী হবে তারা। এ কথা শুনে সাহ-াবায়ে কেরাম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আরজ করেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের ঈমান, আমাদের হিজরত, আমাদের জিহাদের উপর আমরা কি আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারি না?' তখন আল কুরআনে আয়াত নাযিল হয় 'যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে- নিঃসন্দেহে তারা আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে পারে এবং আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং খুবই দয়াময়।' (সূরা বাকারা-২৮)

২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধ শেষে মুসলমানদের বিজয়ের সংবাদ শুনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করেন। দু'রাকাত শোকরানার নামায আদায় করেন। বদর যুদ্ধের পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে বন্দী কাফির সৈন্যদের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করে তাদের মুক্ত করার পরার্মশ দেন। হযরত আবু বকর (রা.) ফিদিয়া বা মুক্তিপণের পক্ষে রায় দেন। হযরত ওমর (রা.) এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মত দেন। 'ওদের নিকট থেকে ফিদিয়া নেয়া নয় বরং ওদের হত্যা করাই যুক্তিযুক্ত। যাতে পৃথিবী আল্লাহর শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হয়।' সবশেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিদিয়া নিয়ে তাদের মুক্তি দানের ফায়সালা দেন। এতে করে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কতা আসে এবং হযরত ওমরের (রা) পরামর্শের পক্ষে আয়াত নাযিল হয় 'যদি আল্লাহর এটি লিখিত সিদ্ধান্ত না হত, তবে তোমরা যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর, তাতে তোমাদের উপর কোন বড় শাস্তি এসে পড়ত।'

বদর যুদ্ধে তিনজন মুসলমান অর্থাৎ হযরত হামযা (রা.) ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং ওবায়দা ইবনে হারিছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) তিন মুশরিক সৈন্যের সামনাসামনি মোকাবেলায় ময়দানে আসেন। মুশরিক তিনজন হল ওতবা, শাইবা এবং ওলীদ ইবনে ওতবা। মল্লযুদ্ধে হযরত আলী (রা.) ওলীদকে হত্যা করেন। হযরত হামযা (রা.) শাইবাকেও হত্যা করেন। অতঃপর উভয়েই হযরত ওবায়দার সাহায্যে এগিয়ে যান এবং উতবাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। এ ছয়জন সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। 'এ দু'পক্ষে যারা দু'বার তাদের প্রভুর মতবিরোধ করেছে, অতএব যারা ছিল কাফির এবং তাদের জন্য আগুনের কাপড় কাঁটা হবে।'

বদর যুদ্ধে আবু জেহেল ইবনে হেশাম নিহত হন। তাকে মায়ায এবং মুয়াওয়ায (যারা ছিলেন আফরার দু'সন্তান) হযরত মায়ায ইবনে আমর ইবনে জামুহের সহায়তায় হত্যা করেন। যুদ্ধ শেষে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'দেখে এসো আবু জাহলের কি ঘটেছে? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার খোঁজে বের হন। তিনি কাফিরদের মৃত লাশের পাশে দেখতে পেলেন তখনও তার শরীরে জীবনের সামান্য স্পন্দন বাকী রয়েছে। তিনি আবু জেহেলের বক্ষে চড়ে বসেন এবং তরবারী দিয়ে তার মাথা কেঁটে নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে রেখে দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে খুশি হন এবং আল্লাহ পাকের শুকরিয়াস্বরূপ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।

বদর যুদ্ধে কাফির পক্ষের ৭০ জন নিহত হয়। তাদের বড় বড় প্রায় সকল নেতৃবৃন্দ প্রাণ হারায়। এদের মধ্যে ছিল-উমাইয়া ইবনে খালফ, ওতবা ইবনে রবীয়া, শাইবা, ওলীদ ইবনে ওতবা, তোয়াইমা ইবনে আদী, জুমায়া ইবনে আসওয়াদ, হারিস এবং আকিল (আসওয়াদের পুত্রদ্বয়), আব্দুল খাইরী নাবিজ এবং মুনাব্বিহ (আপন সহোদর), আসওয়াদ ইবনে আব্দুল আসওয়াদ মাখজুমি এবং আরো অনেকে। এ যুদ্ধে ৭০ জন কাফির বন্দী হয়। যেমন-সুহাইল ইবনে আমর আলকুরশী আবুদায়াহ ইবনে সুবরাহ। মুত্তালিব ইবনে আবূ দুদায়াহ, হানজালা, আমর, সম্বুর ইবনে হাব্বাব, আবুল আস ইবনে রবীয়া, আব্দুল উজ্জা ইবনে আবেদ শামছ, ইবনে আবদে মানাফ আলকুরশী, ওতবা ইবনে আবি মুয়ীট, নজর ইবনে হারিস।

বদর যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসসাফরা পৌঁছান তখন হযরত আলীকে (রা.) নির্দেশ দেন, ‘নজর ইবনে হারিছকে হত্যা কর।’ তিনি তখনই এ পাপিষ্ঠকে হত্যা করেন। আবার যখন আজজাজাবিয়ায় পৌঁছেন তখন আমীর ইবনে হাবিব (রা.)-কে নির্দেশ দেন, ওকবা ইবনে আবূ মুয়ীটকে হত্যা কর। সুতরাং তাকেও হত্যা করা হয়। এ সেই নজর ইবনে হারিছ, যে বিভিন্ন দেশ থেকে মিথ্যা কাহিনি ক্রয় করে সংগ্রহ করত এবং মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোকাবেলায়া কেচ্ছা কাহিনী বলে বেড়াত অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের আয়াত সম্পর্কে উপহাস করত। বিদ্রূপ করে বলত, লাও আমি তার চাইতে ভাল গল্প তোমাদের উপহার দিলাম। আল-কুরআনে তার সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়েছিল, ‘আর কোন কোন লোক এমনও আছে যে, ঐসব জিনিসের ক্রেতা হয়ে থাকে, যা আল্লাহ থেকে মানুষকে গাফিল করে রাখে। যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে না বুঝে শুনে পথভ্রষ্ট করে এবং এসব নিয়ে উপহাস করে। এমন সব লোকের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট শাস্তি।’ (সূরা লুকমান-৬)

২য় হিজরীর বদর যুদ্ধের সাতদিন পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচা আবূ লাহাব কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর হয় ‘মদছা’ নামক এক জটিল এবং নিকৃষ্ট চর্মরোগে। তার সমস্ত শরীরে মসুরীর ডালের মত দানা দানা দেখা দেয়। আরবাবাসী এ রোগকে অত্যন্ত নিকৃষ্ট মনে করত। তাদের মতে এ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট সংক্রামক রোগ। তার লাশকে লাঠি দিয়ে সরিয়ে পাথরচাপা দেয়া হয়। বদর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে আরও তিনদিন অবস্থান করেন। তিনি তৃতীয় দিন ঐ গর্তের কাছে আসেন; যেখানে কাফিরদের মৃতদেহসমূহ ফেলা হয়েছিল। গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমাদের সংগে আমাদের মহান রব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা বাস্তবে তা পেয়েছি। সুতরাং তোমাদের প্রভু তোমাদের সংগে যে ওয়াদা করেছিলেন, তোমরাও কি বাস্তবে সেটা সঠিক পেয়েছ?’ অতঃপর মহানবী উপস্তিত সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বলেন, 'আমি যা কিছু বললাম, তোমাদের চেয়ে তারা (নিহত কাফির) আরো ভালভাবে শুনতে পেয়েছে, কিন্তু জবাব দিতে তারা অক্ষম।' (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে বদর যুদ্ধে বন্দী করা হয়। তখন তিনি তখন ছিলেন কুরাইশ কাফিরদের দলভুক্ত। যখন মুক্তিপণ আদায় করে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়; তখন আব্বাস আপত্তি করে বলেন, তার কাছে ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দেয়ার মত কোন সম্পদ নেই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "ঐ স্বর্ণ থেকে আদায় করে দিন, যে স্বর্ণ বদরের যুদ্ধে আসার সময় আপনার স্ত্রীর উপস্থিতিতে নিজের ঘরের মেঝেতে পুতে রেখেছেন এবং তাকে অসিয়্যত করেছেন। এ যুদ্ধে যদি আমার কিছু ঘটে যায় তবে এ স্বর্ণ আমার তিন ছেলে ফযল, আব্দুল্লাহ এবং ক্বাসিমকে ভাগ করে দিও।" এ বক্তব্য শুনে হযরত আব্বাস (রা.) বলেন, আপনি সঠিক বলেছেন। এবার আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। কারণ, আমি এবং আমার স্ত্রী উম্মুল ফযল ছাড়া অন্য কেউ এ ঘটনা জানে না। আমি নিশ্চিত যে আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে, আপনি এ ঘটনা জানতে পেরেছেন। এ ঘটনাটি তাঁর ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হয়েছিল।

বদর যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফিরে আসার পর, হযরত ওমায়র ইবনে ওহহাব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি কুরাইশের শয়তানদের মধ্যে গণ্য হতেন। তিনি মক্কা থেকে মদীনায় আসেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবার মক্কায় ফিরে যান এবং মক্কার কাফিরদের এমনি যাতনা দিতে থাকেন, যেভাবে ইতোপূর্বে সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিতেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের উপলক্ষ্য হল যে; তিনি সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সংগে হাতিমে কা'বায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার গোপন পরামর্শ করেছিলেন। যা এতই গোপন ছিল যে তৃতীয় ব্যক্তি তা জানতো না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাকে এ পরামর্শের বিষয় অবগত করেন। এতে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত এবং রিসালতের উপর তাঁর বিশ্বাস অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

২য় হিজরীর সফর মাসের শেষের দিকে হযরত ফাতিমার (রা.) শাদীর আক্দ অনুষ্ঠিত হয়। এ হচ্ছে হযরত আয়িশার (রা.) রুখছতীর সাড়ে চার মাস পরের ঘটনা। হযরত ফাতিমার বয়স ছিল উনিশ বছর দেড় মাস। প্রসিদ্ধ উক্তি মতে কাবা শরীফ মেরামতের সময় হযরত ফাতিমার (রা.) জন্ম হয়েছিল। আর তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ৩৫ বছর। বিয়ের সময় তখন হযরত আলীর (রা.) বয়স ছিল ২৪ বছর দেড় মাস। কারণ তাঁর জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল ত্রিশ বছর।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৩য় হিজরী

📄 ৩য় হিজরী


তৃতীয় হিজরী (৬২৪ খ্রীষ্টাব্দ): ৩য় হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর (রা.) এর কন্যা মুসলিম জননী হযরত হাফছা (রা.) কে শাদী করেন। সর্বাধিক বিশুদ্ধ উক্তি অনুযায়ী এটি শাবান মাসের ঘটনা। হযরত হাফছার (রা.) প্রথম স্বামী খুলাইস ইবনে হুজাফার ইন্তিকাল উহুদ যুদ্ধের পূর্বে হয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ ছিল আঘাত, যা তিনি বদর যুদ্ধে পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় বদর এবং উহুদের মধ্যবর্তী সময়ে। এ হিজরীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম জননী হযরত জয়নাব বিনতে খুজাইমাকে শাদী করেন। তিনি অত্যধিক দাতা ছিলেন বলে তাঁকে উম্মুল মাসাকীন বলা হত। উম্মুল মাসাকীন অর্থ অসহায় দরিদ্রের মা। তার প্রথম স্বামী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর যিলহজ্ব মাসের শেষের দিকে তার সংগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাদী মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে দুই বা তিন মাস কাটানোর পর, ৪র্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল অথবা রবিউস সানী মাসে ইন্তিকাল করেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের মধ্যে কেবলমাত্র হযরত খাদীজা (রা.) এবং হযরত যয়নাব (রা.) এর মৃত্যু হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায়। কোন কোন মতে হযরত রায়হানাও (রা.) মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। রবিউল আউয়াল মাসে হযরত ওসমান (রা.) এর শাদী হয় নবী দুলালী হযরত সায়্যিদা উম্মে কুলসুমের (রা.) সংগে। তাযকিরাতুল ক্বারী কিতাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) হযরত জয়নাবের পরে এবং হযরত ফাতিমার আগে জন্মগ্রহণ করেন। এ হিসেবে তাঁর জন্মের সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স ছিল ৩৪ বছর। এক বর্ণনায় তৃতীয় হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ হয়। এ ব্যাপারে আল কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা.) কে ইহুদীদের লিখিত ভাষা শিক্ষা করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং বলেন, 'আমি ওদের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমার চিঠিপত্রের মধ্যে তারা ঝামেলা করতে পারে।' একই বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাতুর রেকার যুদ্ধে সালাতুল খওফ নামায আদায় করেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, খাওফের নামায আসফান বা যিকিরদের যুদ্ধের সময় নাযিল হয়েছিল। আর এ দুটি যুদ্ধ ৬ হিজরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উহুদের যুদ্ধের পর এ হুকুম নাযিল হয় যে, কোন মৃত ব্যক্তির জন্য নাওহা বা বিলাপ করা, চেহারায় আঘাত করা, বক্ষ ছিঁড়ে ফেলা হারাম। এর আগে তা হারাম ছিল না। উল্লেখ্য যে, ওহুদের শহীদানের জন্য মহিলারা নাওহা এবং মাতম করেছিলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন এবং দেখেন হামযার জন্য কাঁদার মত কেউ নেই। কাজেই মহিলারা অন্যান্য শহীদানের মত হযরত হামযার জন্যও কাঁদতে থাকেন। কান্নাকাটির এ অনুষ্ঠান যখন সমাপ্ত হয় তখন নাওহা নিষেধ করে দেয়া হয়। এটাই আল কুরআনের নির্দেশনা।

এ বছর উহুদের যুদ্ধের পর মুশরিকরা হযরত হামযার (রা.) লাশ মোবারককে মুছলা অর্থাৎ বিকৃত করে। কান, নাক ইত্যাদি কেটে ফেলে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দৃশ্য দেখে বলেছিলেন, 'আমি এর বদলায় তোমাদের সত্তর জনের মুছলা করে ছাড়ব।' এ কথার প্রেক্ষিতে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, 'যদি বদলা নিতে হয় তবে এতটুকুই কর, যতটুকু তোমাদের সংগে আচরণ করা হয়েছে।' উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলী, মুসলমানগণের কার্যক্রম, মুশরিকদের ধমক প্রদান ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে কুরআনে ষাটটি আয়াত নাযিল হয়। (সূরা আলে ইমরান-১২১-১৮১)। উহুদ যুদ্ধের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামযার (রা.) জানাযার নামায পড়ান। অতঃপর অন্যান্য শহীদানের কফিন বা জানাযা এক একজন করে হযরত হামযার (রা.) লাশের পাশে এনে রাখা হয় এবং জানাযা নামায পড়া হয়। এমনিভাবে হযরত হামযার জানাযা ৭০ বার পড়া হয়। তার অর্থ এ নয় যে হযরত হামযার জানাযার নামায সত্তরবার পড়া হয়েছে। বরং প্রত্যেক শহীদের জানাযার নামায আলাদা আলাদা পড়া হয়েছে। প্রত্যেক শহীদের সংগে হযরত হামযার (রা.) লাশ ওছিল। কাজেই হযরত হামযার জানাযা সত্তর বার পড়া হয়েছে ধরা যায়।

বিশুদ্ধ সূত্রমতে ৪র্থ হিজরীতে মদ নিষিদ্ধ করার সময় এ আয়াত নাযিল হয়েছিল, 'হে ঈমানদারগণ! আসল কথা হল যে, মদ এবং জুয়া এবং মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারীর তীর এগুলো নিকৃষ্ট ব্যাপার, শয়তানের কাজ। তোমরা এসব থেকে দূরে থেকো; যাতে তোমাদের কল্যাণ হয়। শয়তান তো এটা চায় যে, মদ এবং জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরে হিংসা, হানাহানি সৃষ্টি করে দেয় এবং আল্লাহর স্মরণ এবং নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখে। অতএব এখনও কি তোমরা বিরত হবে না?' (সূরা আল মায়েদা ৯০-৯১)। এ বছর যখন মদ হারাম ঘোষণা করা হয়, তখন সাহাবায়ে কেরাম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন উহুদের শহীদান সম্পর্কে অর্থাৎ কতিপয় সাহাবা উহুদের যুদ্ধের দিন মদ পান করেছিলেন। অতঃপর শহীদ হয়ে যান। তবে তারা কি পাপী হবেন? যেহেতু তখন পর্যন্ত মদ নিষিদ্ধ হয়নি তাই তাদের সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়। 'যারা ঈমান নিয়ে এসেছে এবং নেক আমল করেছে; তারা মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে যা পান করেছে তাতে তাদের গোনাহ হবে না।' (সূরা মায়েদা-৯৩)

এ বছর এবং মতান্তরে অষ্টম হিজরীতে সালাতুল খওফ এর বিধান নাযিল হয়। এ বছর এক ইহুদী যুগলকে পাথর মারা হয়েছে তাদের অপকর্মের (ব্যভিচারের) জন্য। এ বছর জুমাদাল উলায় হযরত আবু সালামা আব্দুল্লাহ আব্দুল আসাদ আল কুরসী আল মাখজামী (রা.) ইন্তিকাল করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাম্পত্যে আসার পূর্বে তার গৃহে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছিলেন এবং ৮ জুমাদাল উখরা চতুর্থ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। আবু সালামার ইন্তিকালের পর হযরত উম্মে সালামা চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করেন। তার পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সংগে তার আব্দ হয়। শাওয়ালের শেষদিকে চতুর্থ হিজরীতে তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গৃহে আসেন।

তোয়ায়মা ইবনে উবাইরিক নামক মুনাফিক হযরত কাতাদা ইবনে নোমান আল আনসারীর (রা.) ঘর থেকে ঢাল চুরি করে নিয়ে যায়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। সে পলায়ন করে মক্কায় চলে যায়। সেখানেও চুরি করে। মক্কাবাসী তাকে হত্যা করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবাদ জানিয়ে জানতে চাইলেন যে, হাত কাটার পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হল কেন? তখন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে আয়াত নাযিল করেন, 'আপনি বিতর্কে জড়াবেন না। ওদের পক্ষ হয়ে, যারা নিজেদের জীবনের খেয়ানত করে থাকে।' (নিসা-১০৭)

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 ৪র্থ হিজরী

📄 ৪র্থ হিজরী


৪র্থ হিজরী (৬২৫ খ্রীষ্টাব্দ): ৪র্থ হিজরীতে বিরে মাউনায় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। এ অভিযানে ৭০ জন সাহাবী দাওয়াত ও তাবলীগে অংশ নিয়েছিলেন। একজন ছাড়া সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। বিরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর ফজরের নামাযের পরে এক মাসব্যাপী কুনুতে নাযেলার দোয়া পাঠ করা হয়। উক্ত দোয়ার মধ্যে অভিযুক্ত জালিম কাবিলাসমূহের নাম ধরে ধরে বদ দোয়া করা হয়। কাবিলাগুলো হচ্ছে, আসম, যাকওয়ান, ওকবা ও লাইহান। অতঃপর আয়াত নাযিল হয়, '(হে নবী) আপনার এ বিষয়ে কোন এখতিয়ার নেই। আপনাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন, অথবা তাদের শাস্তি প্রদান করেন।' (সূরা আলে ইমরান-১২৮)। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুনুতে নাযেলা পাঠ করা বন্ধ করে দেন (বুখারী শরীফ)। একই বছর সফর মাসে হযরত খুবাইব ইবনে আদী (রা.) এবং যায়েদ ইবনে দাতনা (রা.) মক্কায় শহীদ হন।

এ হিজরীতে হযরত খুবাইব (রা.) কে হত্যার পূর্বে তিনি দু'রাকাত নামায আদায় করেন। অতঃপর এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দু'রাকাত নামায আদায় করা সুন্নত সাব্যস্ত হয়। যাকে অন্যায়ভাবে জোর করে হত্যা করা হয় সে দু'রাকাত সুন্নাত নামায পড়ে নিবে। এটা এজন্য সুন্নত যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় এটা করা হয়েছে এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজকে পছন্দ করেছেন। এ বছর মক্কার মুশরিকরা হযরত খুবাইব (রা.) কে তানয়ীম নিয়ে জীবন্ত শূলে চড়িয়ে হত্যা করে। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমান যাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হয়। কাফিরগণ যখন তাকে শূলে চড়ায় তখন তার মুখ কিবলার দিক থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ শূলের সে লাকড়ী খ টি অটোমেটিক কিবলার দিকে ফিরে আসে। এ ঘটনাটি তার কারামাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাকে যে নরাধম হত্যা করেছিল তার নাম ছিল, আবু সারুয়া ওকবা ইবনে হারিছ। অথচ পঞ্চম হিজরীতে আবু সারুয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত খুবাইব (রা.) এর বীরত্বপূর্ণ শাহাদাতের ঘটনা জানতে পেরে বলেছিলেন, 'কে আছ! যে খুবাইবকে শূলে থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবে?' হযরত যুবায়র ইবনে আওয়াম এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) দাঁড়িয়ে আরজ করেন, 'আমরা নিয়ে আসব।' সুতরাং উভয়েই সফরের প্রস্তুতি নিলেন এবং হযরত খুবাইবকে (রা.) শূলে চড়ানোর চল্লিশ দিন পরে রাতের বেলা তানয়ীম পৌছেন। দেখতে পেলেন, তাঁর লাশ সম্পূর্ণ তাজা টাটকা রয়েছে, যেন আজই ইন্তিকাল করেছেন। তার হাতে জখম রয়েছে। সেখান থেকে তাজা রক্ত ঝরছে। রং ছিল রক্তের এবং সুগন্ধি ছিল মিশকের। মক্কার সত্তরজন কাফির শুয়ে শুয়ে লাশ প্রহরা দিচ্ছিল। তারা দু'জন মিলে শূল থেকে লাশটি নামিয়ে নিয়ে আসেন। অতপর লাশ হযরত আলী (রা.) এর ঘোড়ার উপর রেখে মদীনায় নিয়ে আসেন।

সফরকালীন সময়ে কুসর নামাযের বিধান সম্বলিত আয়াত এ হিজরীতে নাযিল হয়। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে 'আর তোমরা যখন সফরে যাও, তখন নামায কসর করতে কোন বাঁধা নেই' (সূরা নিসা-১০১)। ৪র্থ হিজরীর পহেলা যিলক্বাদ তারিখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) কে বিয়ে করেন। কোন কান সূত্র মতে সেটা পঞ্চম হিজরীতে হয়েছিল। হযরত যয়নবের তখন বয়স ছিল পয়ত্রিশ বছর। মুসলিম জননীগণের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম মদীনায় ইন্তিকাল করেন। এ হিজরীতে হযরত যয়নব বিনতে জাহশের রুখসতীর দিনে পর্দার হুকুম নাযিল হয়। কারো কারো মতে এটা ছিল পঞ্চম হিজরীর ঘটনা। তবে প্রথম উক্তি অধিকতর বিশুদ্ধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00