📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সামরিক অভিযান
সমগ্র আরবে ইসলামের জয় জয়কার রব উঠে। সারা বিশ্ব শংকিত হয়। সুবিস্তৃত রোম সাম্রাজ্যের শাসকবর্গ ইসলাম এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের বেঁচে থাকার অধিকার মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। এ কারণে রোম সম্রাটের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কারো ইসলাম গ্রহণ করা ছিল বিপদজনক। রোমের গভর্নর ফারওয়া ইবনে আমর জুযামীর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা অন্যদের জন্যেও প্রবল ছিল। রোমের শাসকদের এ ধরনের ঔদ্ধত্য এবং অহঙ্কারপূর্ণ আচরণের কারণে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাদশ হিজরীর সফর মাসে এক বিরাট বাহিনী তৈরীর কাজ শুরু করেন। বিশ্বনবী হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.) কে এ বাহিনীর সেনাপতি পদে নিযুক্তি দিতে আদেশ দেন। বলেন, বালকা এলাকা এবং দারুমের ফিলিস্তিনী ভূখ সওয়ারদের মাধ্যমে নাস্তানাবুদ করে এসো। রোমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের মনে সাহস সঞ্চার করাই ছিল সে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, গির্জার বাড়াবাড়ি এবং স্বেচ্ছাচারিতার সামনে কথা বলার কেউ ছিল না। তাছাড়া একথা সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে, ইসলাম গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে নিজের মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানান। সার্বিক বিবেচনায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের বড় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।
হযরত ওসামাকে (রা.) সেনাপতি নিযুক্ত করার কারণে কেউ কেউ সমালোচনা করে এ অভিযানে অংশ গ্রহণে বিলম্ব করেন। এ অবস্থা লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যদি ওসামার সেনাপতিত্বের প্রশ্নে সমালোচনামুখর হও, তবে তো বলতেই হয়, ইতোপূর্বে তার পিতাকে সেনাপতি নিযুক্ত করার সময়েও তোমরা সমালোচনামুখর হয়েছিলে। অথচ আল্লাহর শপথ, যায়েদ ছিল সেনাপতি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন। এছাড়া সে ছিল আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। যায়েদের পর ওসামাও আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। তখন সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হযরত ওসামার (রা.) আশপাশে সমবেত হয়ে তাঁর বাহিনীতে শামিল হন। এ বাহিনী রওনা হয়ে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে মাকাতে যরফ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। অবশ্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা সম্পর্কে উদ্বেগজনক খবর পেয়ে তারা সামনে অগ্রসর হননি। আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় তারা সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের পর ওসামার মিশন সাময়িক স্থগিত রেখে সবাই মদীনায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে আবু বকরের (রা.) খিলাফতের সময় এ অভিযান পুনরায় প্রেরণ করা হয়।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল
একাদশ হিজরীর (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ) ২৯শে সফর রোববার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকিতে এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। ফেরার পথে মাথা ব্যথা শুরু হয় এবং উত্তাপ এত বেড়ে যায় যে, মাথায় বাঁধা পট্টির উপর দিয়েও তাপ অনুভব করা যাচ্ছিল। এটা ছিল তাঁর মরণ রোগের শুরু। তিনি সে অসুস্থ অবস্থায়ই এগার দিন নামায পড়ান। অসুখের মোট মেয়াদ ছিল তের অথবা চৌদ্দ দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মানস প্রকৃতি ক্রমেই ভয়াবহ দুর্বল হয়ে পড়ছিল। এ সময় তিনি বারবার সহধর্মিণীদের জিজ্ঞেস করতেন, আমি আগামীকাল কোথায় থাকব? আমি আগামীকাল কোথায় থাকব? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জিজ্ঞাসার তাৎপর্য তাঁর সহধর্মিণীরা বুঝে ফেলেন। তাই তারা বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি যেখানে থাকতে ইচ্ছা করেন সেখানেই থাকবেন। এরপর তিনি হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে স্থানান্তরিত হন। স্থানান্তরের সময় তিনি হযরত ফযল ইবনে আব্বাস এবং হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এর উপর ভর দিয়ে চলছিলেন। তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। পবিত্র চরণযুগল মাটিতে হেঁচড়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে স্থানান্তরিত হন এবং জীবনের শেষ সপ্তাহ সেখানেই কাটান। হযরত আয়িশা (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শিক্ষা করা দোয়াসমূহ পাঠ করে তাঁর পবিত্র দেহে ফুঁ দিতেন এবং বরকতের আশায় তাঁর পবিত্র হাত দেহে মেলাতেন। এ অবস্থাতেও তিনি আয়িশার (রা.) ঘরে উম্মুল মুমেনিন ও মহিলাদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত দেন। দাওয়াত ও তাবলীগ অব্যাহত রাখেন।
ইন্তিকালের পাঁচ দিন আগে চাহার শোম্বায় (বুধবার) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহের উত্তাপ অতিরিক্ত আকার ধারণ করে। এতে তাঁর কষ্ট বেড়ে যায় এবং তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় তিনি বলেন, বিভিন্ন কূপের সাত মশক পানি আমার উপর ঢাল। আমি যেন লোকদের কাছে গিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগ করতে পারি। তাঁর এ আদেশ পুরো করতে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হয় এবং দেহে এত বেশী পরিমাণ পানি ঢালা হয়, যাতে তিনি বলেন, ব্যস, ব্যস, আর প্রয়োজন নেই। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা সুস্থ বোধ করে মসজিদে যান। এ সময়ও তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। তিনি মিম্বারে আরোহণ করে ভাষণ দেন। সাহাবায়ে কেরাম আশেপাশে সমবেত ছিলেন। তিনি বলেন, ইহুদী নাসারাদের উপর আল্লাহর লানত, কেননা তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। তিনি আরো বলেন, তোমরা আমার কবরকে পূজার বেদীতে বা মাজারে পরিণত করো না।
এরপর তিনি নিজেকে অন্যদের বদলা নেয়ার জন্যে পেশ করে বলেন, আমি যদি কারো পিঠে চাবুকের আঘাত করে থাকি, তবে এ আমার পিঠ হাযির, সে যেন বদলা নিয়ে নেয়। যদি কাউকে অসম্মান করে থাকি, তবে সে যেন আমার কাছ থেকে বদলা গ্রহণ করে। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর থেকে নীচে নেমে আসেন এবং যুহরের নামায পড়ান। এরপর তিনি পুনরায় মিম্বারে উপবেশন করে শত্রুতা, হিংসা, বক্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে ইতোপূর্বে বলা কথা পুনরায় বলেন। এক লোক বলেন, আপনার কাছে আমি তিন দিরহাম পাওনা রয়েছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযল ইবনে আব্বাস (রা.) কে সে ঋণ পরিশোধের আদেশ দেন। এরপর তিনি আনসারদের সম্পর্কে ওসিয়ত করেন। তিনি বলেন, আমি তোমাদের আনসারদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি। কেননা তারা আমার অন্তর ও কলিজা। তারা নিজেদের যিম্মাদারী পূর্ণ করেছে, কিন্তু তাদের অধিকারসমূহ বাকি রয়ে গেছে। কাজেই তাদের মধ্যেকার নেককারদের গ্রহণ করবে এবং বদকারদের ক্ষমা করবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ বাড়তে থাকবে, কিন্তু আনসারদের সংখ্যা কমতে থাকবে, এমনকি তারা খাবারে লবণের পরিমাণের মত হয়ে পড়বে। কাজেই তোমাদের যারা কোনো উপকার বা ক্ষতি করার মত কাজের দায়িত্ব পাবে, তারা আনসারদের মধ্যেকার নেককারদের গ্রহণ করবে এবং বদকারদের ক্ষমা করবে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর বা ওফাতের চার দিন আগে বৃহস্পতিবার তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন। সে সময় তিনি বলেন, আমি তোমাদের ক'টি কথা লিখে দিচ্ছি, এরপর তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না। সে সময় ঘরে কয়েকজন লোক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত ওমরও (রা.) ছিলেন। তিনি বলেন, আপনি অসুখে খুবই কষ্ট পাচেছন। আমাদের কাছে পবিত্র কুরআন রয়েছে, সেটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। একথা শুনে ঘরে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা লিখে দিতে চাচ্ছিলেন, তা লিখিয়ে নেয়া হোক। কেউ কেউ বলছিলেন, না দরকার নেই। হযরত ওমর (রা.) বলেন, সেটাই ঠিক। মতভেদ এক সময়ে কথা কাটাকাটিতে পরিণত হয়। শোরগোল বেড়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। সেদিনই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যাপারে ওসিয়ত করেন। প্রথমত উহুদী, নাসারা এবং মুশরিকদের জাযিরাতুল আরব থেকে বের করে দেবে। দ্বিতীয়ত আগন্তুক প্রতিনিধি দলের সাথে আমি যে রকম ব্যবহার করতাম, সে রকম ব্যবহার করবে। তৃতীয় কথা বর্ণনাকারী ভুলে গেছেন। সম্ভবত বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা অথবা ওসামার (রা.) বাহিনীকে প্রেরণ করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসীদের প্রতি খেয়াল রাখবে।
অসুখের তীব্রতা সত্ত্বেও ওফাতের চার দিন আগে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নামাযে নিজেই ইমামতি করেন। সেদিনের মাগরিবের নামাযে তিনিই ইমামতি করেছিলেন। সে নামাযে তিনি সূরা মুরসালাত পাঠ করেন। এশার সময় রোগ এত বেড়ে যায়, যাতে মাসজিদে যাওয়ার শক্তি থাকেনি। হযরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, সেদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি নামায আদায় করে ফেলেছে? আমি বললাম, জ্বি না, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আমার জন্যে পাত্রে পানি লও। আমি তাই করলাম। তিনি গোসল করলেন, এরপর ওঠতে চাইলেন কিন্তু বেহুশ হয়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি নামায আদায় করে ফেলেছে? তাঁকে জানানো হল, জ্বি না, ইয়া রাসূলাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারও একই অবস্থা হয়। তিনি গোসল করলেন এরপর ওঠতে চাইলেন, কিন্তু বেহুশ হয়ে গেলেন। এরপর তিনি হযরত আবু বকর (রা.) কে খবর পাঠান, তিনি যেন নামায পড়িয়ে দেন অর্থাৎ নামাযে ইমামতি করেন।
এরপর তাঁর অসুস্থতার জন্য বাকী দিনগুলোতেও, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নামায পড়ান। তাঁর জীবদ্দশায় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সতের ওয়াক্ত নামাযে ইমামতি করেন। হযরত আয়িশা (রা.) তিন অথবা চারবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ মর্মে আরয করেন, ইমামতির দায়িত্ব হযরত আবু বকর (রা.) ব্যতীত অন্য কাউকে দেয়া হোক। তিনি চাচ্ছিলেন, লোকেরা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ না করুক। কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবারই সহধর্মিণীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তোমরা সবাই ইউসুফ (আঃ) এর সাথীদের মত হয়ে গেছ। আবু বকরকে আদেশ দাও, তিনি যেন লোকদের নামায পড়ান।
শনি অথবা রোববার; বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। অতএব দু'জন লোকের কাঁধে ভর দিয়ে যুহরের নামাযের জন্যে মসজিদে যান। সে সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সাহাবীদের নামায পড়াচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখে তিনি পিছনে সরে আসতে থাকেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করেন, পিছনে সরে আসার দরকার নেই। যাদের কাঁধে ভর দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়েছিলেন তাদের বলেন, আমাকে আবু বকরের পাশে বসিয়ে দাও। এরপর তাঁকে হযরত আবু বকরের (রা.) ডান পাশে বসিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তখন নামাযে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একতেদা করছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তাকবীর শোনাচ্ছিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের একদিন আগে (রোববার দিন) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সব দাস দাসীকে মুক্ত করে দেন। তাঁর কাছে সে সময় সাত দিনার ছিল, সেগুলো সদাকা করে দেন। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র মুসলমানদের হেবা করে দেন। রাতের বেলা চেরাগ বা বাতি জ্বালানোর জন্যে হযরত আয়িশা (রা.) এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে জয়তুনের তেল ধারে আনেন। তাঁর বর্ম এক ইহুদীর কাছে তিরিশ সা' (৭৫ কিলোগ্রাম) যবের বিনিময়ে বন্ধক ছিল। হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষদিনটি ছিল সোমবার। মুসলমানরা ফজরের নামায আদায় করছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন। হঠাৎ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়িশা সিদ্দিকার হুজরার পর্দা সরিয়ে সাহাবীদের কাতার বাঁধা অবস্থায় নামায আদায় করতে দেখে মৃদু হাসেন। এদিকে হযরত আবু বকর (রা.) কিছুটা পিছনে সরে গেলেন, যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের কাতারে শামিল হতে পারেন। তিনি ভেবেছিলেন, তিনি হয়ত নামাযে আসতে চান। হযরত আনাস (রা.) বলেন, হঠাৎ করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে সাহাবীরা এত আনন্দিত হলেন, যাতে নামাযের মধ্যেই তাদের ফেতনায় পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হল। তারা নামায ছেড়ে দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক অবস্থার খবর নিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীদের হাতে ইশারা করলেন, তারা যেন নামায পুরো করেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরার ভেতর চলে গিয়ে পর্দা ফেলে দেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অন্য কোনো নামাযের সময় আসেনি। দিনের শুরুতে 'চাশত' নামাযের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) কে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বলেন। এতে নবী কন্যা ফাতিমা (রা.) কাঁদতে থাকেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় ফাতিমার কানে কিছু কথা বলেন এবার হযরত ফাতিমা (রা.) হাসতে থাকেন।
হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, পরবর্তী সময়ে আমি হযরত ফাতিমাকে তাঁর কান্না ও হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রথমবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, এ অসুখেই আমার মৃত্যু হবে। একথা শুনে আমি কাঁদলাম। এরপর তিনি আমাকে কানে কানে বলেন, আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে সর্বপ্রথম তুমিই আমার অনুসারী হবে। একথা শুনে আমি হাসলাম। এ সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতিমা (রা.) কে বিশ্বের সকল মহিলার নেত্রী হওয়ার সুসংবাদও প্রদান করেন। শেষদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যন্ত্রণার তীব্রতা দেখে হযরত ফাতিমা (রা.) হঠাৎ বলে ফেলেন, হায় আমার আব্বার কষ্ট। একথা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আজকের পরে তোমার আব্বার আর কোনো কষ্ট নেই। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হোসাইন (রা.) কে ডেকে চুম্বন করেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্যাণের ওসিয়ত করেন। সহধর্মিণীদের ডেকে তাদেরও ওয়ায-নসহীত করেন। মৃত্যুর শেষ দিনেও দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন।
বিশ্বনবী কষ্ট ক্রমেই বাড়ছিল। খাইবারে ইহুদী মহিলার দেয়া বিষের প্রভাবও প্রকাশ পাচ্ছিল। খাইবারে দাওয়াত করে তাঁকে খাদ্যে বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়িশা (রা.) কে বলেন, হে আয়িশা, খাইবারে আমি যে বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়েছিলাম তার প্রতিক্রিয়াজনিত কষ্ট সব সময় অনুভব করছি। এখন মনে হচ্ছে, সে বিষের প্রভাবে যেন আমার প্রাণের শিরা কাটা যাচ্ছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগ, নসিয়ত ও নির্দেশ প্রদান করেন। তাদের তিনি বলেন, 'আস সালাত, আস সালাত ওয়ামা মালাকাত আইমানুকুম অর্থাৎ নামায, নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসী।' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একথা কয়েকবার উচ্চারণ করেন।
এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতকালীন অবস্থা শুরু হয়। হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেহে ঠেস দিয়ে ধরে রাখেন। তিনি বলেন, আমার উপর আল্লাহর একটি নেয়ামত হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে, আমার পালার দিনে, আমার কোলের উপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁর এবং আমার থুথু একত্রিত করে দেন। মৃত্যুর পূর্বে আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এসেছিলেন। সে সময় তার হাতে ছিল মিসওয়াক। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ের উপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি মিসওয়াকের প্রতি তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝলাম তিনি মিসওয়াক চান। বললাম, আপনার জন্যে নেবো কি? তিনি মাথা নেড়ে ইশারা করেন। আমি মিসওয়াক এনে তাঁকে দেই। কিন্তু তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্ত অনুভব করেন। আমি বললাম, আপনার জন্যে কি নরম করে দেব? তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। আমি দাঁত দিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি বেশ ভালোভাবে মিসওয়াক করেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে পানি ছিল। তিনি হাত ভিজিয়ে চেহারা মুছছিলেন আর বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, মৃত্যু বড় কঠিন।
মিসওয়াক শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত অথবা আঙ্গুল তোলেন। এ সময় তাঁর দৃষ্টি ছিল ছাদের দিকে। উভয় ঠোঁট তখনো নড়ছিল। তিনি বিড়বিড় করে কি যেন বলছিলেন। হযরত আয়িশা (রা.) মুখের কাছে কান পাতেন। বিশ্বনবী তখন বলছিলেন, হে আল্লাহ, নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎব্যক্তি, যাদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের দলভুক্ত কর। আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ, আমাকে মার্জনা কর, আমার উপর রহম কর এবং আমাকে 'রফিকে 'আলায় পৌছে দাও। হে আল্লাহ আমাকে রফিকে আলায় পৌছে দাও! বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ কথাটি তিন বার উচ্চারণ করেন।
এরপর তাঁর হাত ঝুলে পড়ে এবং তিনি পরম বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।' অর্থাৎ আমরা সবাই আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। এ ঘটনা ঘটেছিল একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার, চাশতের নামাযের শেষ সময়ে (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ)। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল তেষট্টি বছর চার দিন।
হৃদয়বিদারক এ শোক সংবাদ অল্পক্ষণের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মদীনার জনগণের উপর শোকের পাহাড় ভেংগে পড়ে। চারদিকে শোকের কালো ছায়া। হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন আমাদের মাঝে মদীনায় আগমন করেছিলেন সেদিনের চেয়ে সমুজ্জ্বল দিন আমি আর কখনো দেখিনি। আর যেদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনও আমি আর কখনো দেখিনি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর হযরত ফাতিমা (রা.) শোকে কাতর হয়ে বলেন, 'হায় পিতা, যিনি পরওয়ারদেগারের ডাকে লাব্বায়েক বলেছেন। হায় আব্বা, যাঁর ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। হায় আব্বা, আমি জিব্রাঈল (আঃ) কে আপনার ওফাতের খবর জানাচ্ছি।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর শুনে হযরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে পড়েন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, কিছু কিছু মুনাফিক মনে করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয়েছে; কিন্তু আসলে তাঁর ওফাত হয়নি। তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে ঠিক সেভাবে গেছেন, যেভাবে হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ) গিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমের কাছ থেকে চল্লিশ দিন অনুপস্থিত থাকার পর পুনরায় ফিরে এসেছিলেন। অথচ তাঁর ফিরে আসার আগে তাঁর জাতির লোকেরা বলাবলি করছিল, মূসা (আঃ) এর ওফাত হয়েছে। আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ফিরে আসবেন এবং যারা মনে করছে তিনি মারা গেছেন, তিনি তাদের হাত পা কেটে ফেলবেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সুনহে নামক জায়গায় নিজের বাড়িতে ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর শুনে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত ছুটে এসে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন। এরপর কাউকে কোনো কথা না বলে, সোজা হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহ মোবারক তখন ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে ঢাকা ছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চেহারা থেকে চাদর সরিয়ে চুম্বন করে কেঁদে ওঠেন। এরপর বলেন, আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান হোন। আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্যে দু'টি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্যে লেখা ছিল তা হয়ে গেছে। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বাইরে আসেন। হযরত ওমর (রা.) সমবেত লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে বলেন, ওমর বসে পড়। হযরত ওমর (রা.) বসতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে সাহাবীরা হযরত ওমরকে ছেড়ে হযরত আবু বকরের (রা.) প্রতি মনোযোগী হন। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূজা করতে, সে জেনে রাখুক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়েছে। আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করতে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ তা'আলা চিরঞ্জীব, তিনি কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন, 'মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়ে গেছে। সুতরাং যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন, তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখন আল্লাহর ক্ষতি করবে না। বরং আল্লাহ তা'আলা শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।' (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)
মানসিক যন্ত্রণায় অস্থির দিশেহারা সাহাবীরা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর বক্তব্য শুনে নিশ্চিত হন, প্রকৃতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, কেউ যেন জানতই না আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে আবু বকরের উচ্চারিত এ আয়াত নাযিল করে রেখেছেন। আবু বকর (রা.) এর তিলাওয়াতের পর সবাই এ আয়াত মুখস্থ করে নেয়। মুখে মুখে তখন এ আয়াত ফিরছিল। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রা.) বলেন, হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ, হযরত আবু বকর (রা.) কে পবিত্র কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনে, আমি যেন মাটি হয়ে গেলাম। আমি দাঁড়াতে পারলাম না, মাটিতে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। কেননা তখন স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যি সত্যিই ইন্তিকাল করেছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাফন দাফনের আগেই তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনায়ন প্রশ্নে সাহাবীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। সাকিফা বনী সায়েদায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়। অবশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খেলাফতের ব্যাপারে সবাই একমত হন। এ কাজে সোমবারের বাকি দিন কেটে গিয়ে রাত এসে যায়। সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরদিন সকাল হয়। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। তখনও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র দেহ একখানা ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে আবৃত ছিল। ঘরের লোকেরা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীরের কাপড় না খুলেই তাঁকে গোসল দেয়া হয়। গোসলদানকারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আব্বাস, হযরত আলী, হযরত আব্বাসের দুই পুত্র ফযল এবং কাসেম। আরও ছিলেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্ত করা দাস শোকরান, হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ এবং আওস ইবনে খাওলা (রা.)। হযরত আব্বাস ও তাঁর দুই পুত্র বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাশ ফেরাচ্ছিলেন। হযরত ওসামা ও হযরত শোকরান পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন এবং হযরত আলী (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের বুকের সাথে ঠেস দিয়ে রেখেছিলেন।
গোসল শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনখানা ইয়েমেনী সাদা চাদর দিয়ে কাফন দেয়া হয়। এতে কোর্তা এবং পাগড়ি ছিল না। তাকে শুধু চাদর দিয়েই জড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোথায় দাফন করা হবে, সে সম্পর্কেও সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, সকল নবীকে যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, সেখানেই দাফন করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত হওয়ার পর, হযরত আবু তালহা (রা.) সে বিছানা ওঠান। যে বিছানায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন। সে বিছানার নীচে কবর খনন করা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ শয্যায় থাকাকালীন চল্লিশজন গোলাম আযাদ করেন। হযরত আয়িশা (রা.) এর কামরায় থাকাকালীন সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসিয়ত করেছিলেন, 'ইন্তিকালের পরে আমাকে গোসল দিবে, কাফন পরাবে, আমার কফিন কিছুক্ষণের জন্য আমার এ হুজরায় রেখে তোমরা বেরিয়ে যাবে। সর্বপ্রথম জিব্রাঈল এসে আমার জানাযা পড়াবে। অতঃপর মিকাইল, তারপর ইস্রাফীল, তারপর আজরাঈল। তাদের প্রত্যেকের সংগে ফিরিশতাদের বিরাট দল থাকবে। অবশেষে ইমাম ছাড়া আমার পরিবারের পুরুষ, তারপরে মহিলাগণ আলাদা আলাদাভাবে আমার জানাযা বা দোয়া পড়বে। অতঃপর তোমরা (সাহাবারা) দলে দলে এসে আমার জানাযা পড়বে।
এরপর ওসিয়ত মত দশ জন, দশ জন করে সাহাবী হুজরায় প্রবেশ করে পালাক্রমে জানাযার নামায দোয়ার আকারে আদায় করেন। এ নামাযে কেউ ইমাম হননি। সর্বপ্রথম বনু হাশেম গোত্রের লোকেরা নামায আদায় করেন। এরপর মুহাজির, এরপর আনসাররা, এরপর অন্যান্য পুরুষ, এরপর মহিলা, সবশেষে শিশুরা জানাযার নামায আদায় করেন। জানাযার নামায আদায়ে মঙ্গলবার পুরো দিন অতিবাহিত হয় এবং মঙ্গলবার দিবাগত অর্থাৎ বুধবার রাত এসে যায়। এ রাতেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ আহমদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দাফন করা হয় অর্থাৎ কবরে শুইয়ে দেয়া হয়। হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঠিক কোথায় দাফন করা হয় আমরা জানতে পারিনি। তবে বুধবার রাতের মাঝামাঝি সময়ে কোদালের শব্দ পেয়েছিলাম। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মোবারক হযরত আয়িশার (রা.) গৃহে ঠিক ঐ জায়গাতে তৈরি করা হয়, যেখানে হযরত আয়িশার (রা.) বিছানা ছিল। যাঁরা গোসল দিয়েছিলেন একমাত্র হযরত উসামা ছাড়া সকলেই কবরে নেমেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর কাঁচা ইট দিয়ে বন্ধ করা হয়। মোট নয়খানা ইট বিছানো হয়েছিল। কোন ধরনের দেয়াল দেয়া হয়নি। আমাদেরকেও মনে রাখতে হবে যে, মৃত্যু সত্য এবং সবাইকে কবরে যেতে হবেই। কবরের নির্জন প্রকোষ্ঠে সবাইকে একাকী যেতে হয়েছে। আমার ও আপনার ব্যাপারেও একই অবস্থা অপেক্ষা করছে। মৃত্যুর পূর্বেই পরকালের সঞ্চয়, ঈমান ও আমলকে সঠিক এবং সম্পূর্ণ করে করে নিয়ে যেতে হবে। মৃত্যুর পরের জীবন অনন্ত এবং যা কখনই শেষ হবে না।
📄 শেষ কথা
"রাসূল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর." (সূরা আল হাশর: ৭)। আল্লাহ পাক বলেন, "মুহাম্মদ আপনি বলে দিন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। সমস্ত আসমান যমীন যার অধীন, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনিই জীবন দান করেন। তিনিই শক্তি দান করেন। অতএব, আল্লাহর উপর, তার উম্মী নবীর উপর ঈমান আন, যিনি ঈমান এনেছেন আল্লাহর উপর; আল্লাহর আহকামের উপর। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ কর। তাহলে তোমরা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে." (সূরা আল আরাফ: ১৫৮) আর ঈমান না আনাদের জন্য আল্লাহর স্পষ্ট ঘোষণা "যে সকল ব্যক্তি আল্লাহর উপর এবং তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনবে না, আমি সেই কাফিরদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছি." (সূরা আল ফাতাহ: ১৩) আল্লাহ তাঁর রাসূলের (সা.) আনুগত্য করতে বলেছেন, "(হে নবী) আপনি বলেদিন, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর." (সূরা আলে ইমরান: ৩২) আর এই আনুগত্যের বিনিময়ও আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, " আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে তারা ঐ সকল লোকের সঙ্গে থাকবে, যাদেরকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেছেন অর্থাৎ নবী, সিদ্দিকীন, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে, তারা খুবই ভাল সঙ্গী." (সূরা আন্ নিসা: ৬৯) আর আনুগত্যের নগদ পুরস্কার হচ্ছে হিদায়ত। "যদি তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর, তাহলে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে" (সূরা আন নূর: ৫৪) আল্লাহপাক নবীর ইত্তেবা করতে বলেছেন। "হে রাসূল! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি মহব্বত রাখ, তবে আমার ইত্তেবা (অনুকরণ) কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে মহব্বত করবেন." (সূরা আলে-ইমরান: ৩১) আল্লাহপাক পূর্ণ মুমিনের সংজ্ঞা দেন এভাবে, “পূর্ণ মুমিন তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর এতে কোন সন্দেহ পোষণ করে না। অধিকন্তু স্বীয় ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে। বস্তুত তারাই সত্যবাদী." (সূরা আল হুজুরাত : ১৫) বিশ্বনবী (সা.) বলেন, "ফিৎনা-ফাসাদের যামানায় আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য একশত শহীদের সওয়াব রয়েছে." (মিশকাত) মহানবী (সা.) নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন "তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ তার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা আমার আনীত শরীয়তের ও আহকামের তরে অনুগত না হবে." (মিশকাত) "তোমাদের কেউ পূর্ণ মু'মিন হতে পারবে না, যে পর্যন্ত না আমি তার নিকট পিতা, সন্তান এবং অপরাপর সকল মানুষের চেয়ে অধিকতর প্রিয় হই। (বুখারী) আল্লাহপাক আমাদেরকে তাঁর প্রিয়নবীর (সা.) উপর ঈমান আনার ও পূর্ণ আনুগত্য এবং বিশ্বনবীকে পরিপূর্ণভাবে চেনা, জানা তথা তাঁর (সা.) সুন্নাতের উপর চলার তৌফিক দিন। আমীন।