📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 তাবুকের যুদ্ধ

📄 তাবুকের যুদ্ধ


পরবর্তী বছরই কাইজার মুসলমানদেরকে 'মুতা' নামক স্থানে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য সিরিয়া সীমান্তে সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তুতির তাৎপর্য জানতে পেরে মুকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। সমসাময়িক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের ঘোষণা দেন আল্লাহর নবী। পূর্বের যুদ্ধবিগ্রহে কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে মুকাবিলা হবে তা কাউকে না জানানোই ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি। অনেক সময় তিনি মদীনা হতে বের হয়ে লক্ষ্যস্থলের দিকে সোজা পথে অগ্রসর না হয়ে বাঁকা পথে অগ্রসর হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি কোন গোপনীয়তা না রেখে স্পষ্ট ভাষায় সকলকে জানিয়ে দিলেন যে, রোম শক্তির সাথে যুদ্ধ হবে এবং সিরিয়ার দিকে যেতে হবে।

মুসলমানদের জন্য এটা ছিল খুবই কঠিন পরীক্ষার সময়। হেজায ভূমিতে চলছিল দুর্ভিক্ষ। জমির শস্য শূন্য, অপরদিকে বাগানের খেজুর পরিপক্ক হয়ে টসটস করছিল। খেজুর পাতার ঝুপড়ি নির্মাণের সময় হয়েছিল। একে তো গ্রীষ্মকাল। তার উপর পথ ছিল অতি দীর্ঘ। শত শত মাইলের পথ, ধূলিঝড় এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বালুকার উপর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ইসলামের জন্য উৎসর্গকারী মুসলমানদের মধ্যে কোন দুর্বলতা ছিল না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পাওয়া মাত্র মুসলমানরা যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহাসমারহে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। মক্কা বিজয়ের পর আরবের বহু গোত্র তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল গোত্রকেই সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানালেন। দলে দলে লোক এসে সৈন্য শ্রেণীতে ভর্তি হতে লাগল। প্রায় চলিশ হাজার সৈন্য সংগৃহীত হল। এত বিরাট বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনার জন্য বহু অর্থের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে অর্থের যোগান ছিল না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থের জন্য সাহাবীদের নিকট আহবান জানালেন। এ আহ্বানে বিপুল সাড়া মিলল। আল্লাহর নামে, ইসলামের পথে সবাই অকাতরে অর্থ সাহায্য করতে লাগলেন। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কে কত দান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলতে লাগল। হযরত ওসমান ও হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করলেন। হযরত ওমর নিজের উপার্জিত সামগ্রীর অর্ধেক এনে পেশ করলেন। হযরত আবু বকর নিজের সমস্ত সম্পদ উৎসর্গ করলেন। আর বললেন, আমি আমার গৃহে আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। দরিদ্র সাহাবীরা কষ্টে শিষ্টে মজুরী করে যা কিছু পেয়েছিলেন তা সবই এনে দিলেন। মহিলারা নিজেদের অলংকার খুলে দিলেন। প্রাণ উৎসর্গকারী স্বেচ্ছা সেবীদের বাহিনী চতুর্দিক হতে জমায়েত হতে লাগল। তারা দাবী করল, অস্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা হলে আমরা আমাদের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

যারা যানবাহন পায়নি তারা কান্নাকাটি করতে লাগলেন এবং এমনভাবে নিজেদের প্রাণের কাতরতা প্রকাশ করতে লাগলেন। যা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে ব্যথা অনুভূত হল। বস্তুতঃ ঈমান ও মুনাফিকীর পার্থক্য সূচিত হওয়ার জন্য এ সময়টি, একটি নির্ভুল মানদ হয়ে দাঁড়াল। এ সময় কারো যুদ্ধ ময়দান হতে দূরে সরে থাকার অর্থই ছিল ইসলামের সাথে তার দূরবর্তী সম্পর্ক। এ জন্যে ঐসব মুনাফিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহী জানিয়ে দেয়া হত।

নবম হিজরীর রজব মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৪০ বা ৩০ হাজার মুজাহিদ নিয়ে সিরিয়ার দিকে রওনা হন। এ বাহিনীতে ছিল দশ হাজার উষ্ট্রারোহী যোদ্ধা। উটের সংখ্যা এতই কম ছিল যে, এক একটি উটের পিঠে একাধিক লোক পালাক্রমে সওয়ার হয়েছিল। এর উপর ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও পানির অভাব। কিন্তু এসব সত্ত্বেও প্রকৃত মুসলমানরা অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বের হন। তাবুকে পৌঁছার পরই মুসলমানরা নগদ ফল লাভ করেন। সেখানে পৌঁছে মুসলীম বাহিনী জানতে পারেন যে, কাইজার গুপ্তচরের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা জেনে প্রত্যক্ষ মুকাবিলায় আসতে সাহস করেনি। সীমান্ত পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে। কারণ মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী, কাফিরের লক্ষাধিক সৈন্যের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সে অবলোকন করেছিল। এ অভিযানে স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে আগাত ৩০ বা ৪০ হাজার সৈন্যের মুকাবিলা করার জন্য এক বা দুই লক্ষ্য সৈন্য নিয়ে ময়দানে আসার মত সাহস রোম সম্রাটের ছিল না। মুসলমানদের রণকৌশল, ঈমানি জোর, সাহস এবং আত্মউদ্দীপনার কাছে রোমদের বিনা যুদ্ধে পরাজয় ঘটে।

কাইজারের এভাবে পালিয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামী শক্তির যে নৈতিক বিজয় সূচিত হয়, তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথেষ্ট মনে করলেন। ফলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অতিক্রম করে সিরিয়া সীমান্তে প্রবেশ করার পরিবর্তে, তাবুকে ২০ দিন অপেক্ষা করে রোম সম্রাজ্য ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ছোট ছোট রাজ্যগুলোতে সামরিক প্রভাব খাঁটিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত করদরাজ্যে পরিণত করে নিলেন। ফলে এর খ্রীষ্টান গোত্রপতি-আকিদার বিন মালেক, আযলার খ্রীষ্টান গোত্রপতি-ইউহানা বিন দুবা এবং মাকনা, জাররা, আজরাহসহ প্রভৃতি স্থানের খ্রীষ্টান দলপতিরা জিজিয়া আদায়ে মদিনা সরকারের আনুগত্য গ্রহণ করে। এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা রোম সাম্রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। পাশাপাশি যেসব লোক তখন পর্যন্ত প্রাচীন জাহেলিয়াতের পুনঃ প্রতিষ্ঠার আশায় দিন গুনছিল, তাদের মেরুদ সম্পূর্ণ চূর্ণ হয়ে যায়। সারা বিশ্বে মুসলমানদের জয়গান ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর শৌর্য বীর্য এবং বিজয় গাঁথার ইতিহাসের বুনিয়াদ রচিত হয় সারা বিশ্বে।

তাবুক হতে বিজয়ী বেশে ফিরে আসার পর চতুর্দিক হতে মহানবীর নিকট শান্তির প্রস্তাব আসতে আরম্ভ করে। বনু তামিম, বনু মুস্তালিক, বনু কিন্দা, বনু আজাদ, বনু তাঈ, প্রভৃতি বহু গোত্র ইসলাম কবুল করে। সুপ্রসিদ্ধ দানবীর হাতেম তাই এর পুত্র আদি বিন হাতেম এ সময় মুসলমান হন। বিখ্যাত কুরাইশ কবি কাব বিন যুহর ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানদের তাবুক হতে বিজয় বেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে মুনাফিকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও (সূরা তওবা: ৯৫)। মুনাফিকদের মধ্যে এমন কিছু লোকছিল, যারা তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ গমনে অপারগতা প্রকাশ করে। উল্লেখ্য তাবুকের জিহাদ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বেশকটি ঘটনা ঘটেছিল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই পথিমধ্যে আল্লাহ তার হাবীবকে মুনাফিকদের বিশদ অবস্থা জানিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা যখন ফিরে এসে তাদের নিকট পৌঁছবে, তখন তারা নানা ওজর পেশ করবে। কিন্তু আপনি বলুন, ওজরের বাহানা করো না। আমরা তোমাদের কোন কথাই বিশ্বাস করি না। আল্লাহ আমাদেরকে, তোমাদের অবস্থা বলে দিয়েছেন (সূরা তওবা : ৯৪)। তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও। তাহলে তোমরা অবশ্যই তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরায়ে নিবে। কেননা, তারা একটা কদর্য জিনিস। আর তাদের আসল স্থান হচ্ছে জাহান্নাম (সূরা তাওবা: ৯৫)। পাশাপাশি আল্লাহ তাবুক যুদ্ধে পিছনে পরে থাকা ঈমানদারদের ব্যাপারে বলেন, অপর তিনজনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটি মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও, তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল। (সূরা তাওবা: ১১৮)

মিথ্যা ঈমানের দাবীদার মুনাফিকদের স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়ার পর, মহান আল্লাহ পিছনে পড়ে থাকা মু'মিনের দু'টি গ্রুপ বা দলের বর্ণনা দেন। একদল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর কিছু লোক রয়েছে, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও একটি মন্দ কাজ। আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন (সূরা আত তওবা: ১০২)। অপর দল প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, কিছু লোক আরো রয়েছে, যাদের ব্যাপারটি আল্লাহর নির্দেশের উপর স্থগিত রয়েছে। তিনি হয়তো তাদের আযাব দিবেন, না হয় তাদের ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আত তাওবা : ১০৬)

এছাড়া বাকী তিনজন প্রসঙ্গে আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে ইঙ্গিত করেন। যারা প্রকাশ্যভাবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেনি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তারা নিজেদের দুর্বলতার কথা সত্য সত্য বলে দেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সমাজচ্যুত করেন। এমনকি তাদের সাথে সালাম কালামের আদান প্রদান পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ ব্যবস্থা নেয়ার পর তাদের অবস্থা যে কিরূপ ভয়াবহ হয়েছিল তা আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলে দিচ্ছেন, অপর তিন জনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটা মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন যখন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল, আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নেই, তখন আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদের দিকে দেখলেন, যাতে তারা ফিরে আসে (সূরা আত তওবা : ১১৮)। এ তিন জন সাহাবী হলেন, হযরত কা'ব বিন মালেক, মুরারা বিন ও হেলান বিন উমাইয়া (রা.)। এ তিনজনই আনসারী সাহাবী ছিলেন এবং বাইয়াতে আকাবা ও বিভিন্ন যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দাওয়াতের কাজ এবং ইসলামের প্রচার তথা দ্বীন রক্ষার প্রয়োজনে সত্যিকারের জিহাদে বা ধর্মীয় যুদ্ধে, কোন মুসলমানই পিছে থাকতে পারবে না।

কেউ যদি তা করে তবে, তা গুরুতর অন্যায়। ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মীয় যুদ্ধে মুজাহিদদের স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়। মুনাফিকরাই বিভিন্ন বাহানা বা কারণ দেখিয়ে জিহাদকে পরিহার করে। এর পরও যদি কোন দুর্বল ঈমানের মুসলমান এমন কাজ করে বসে, তবে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বয়কট করাই যুক্তি যুক্ত। এর পর সেসব দুর্বল ঈমানদারদের জন্য তওবার রাস্তা খোলা থাকবে। আল্লাহ চাইলে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। মহান আল্লাহ যেহেতু ক্ষমার মহাসাগর; তাই সত্যিকারভাবে তওবা করলে এমন গুরুতর পাপও মোচন হওয়া সম্ভব। অতএব দ্বীন প্রচারে, সংগ্রামে, জিহাদে অংশগ্রহণ مسلمانوں জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফরয। এসবই তাবুক অভিযান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্জ

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্জ


এক সময় পরিস্থিতি এমন হল যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে পূর্ণতা এসে গেছে। আল্লাহর রবুবিয়ত প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং অন্য সবকিছুর প্রভুত্বের বিলোপ সাধন হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাতের ভিত্তিতে একটি নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসবের অদৃশ্য ঘোষক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেতনা ও মনোজগতে এ অনুভূতি জাগিয়ে দিচ্ছিল, যে পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মু'য়ায (রা.) কে ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় অন্যান্য প্রয়োজনীয় কথা ও উপদেশের পর বলেন, হে মু'য়ায, সম্ভবত এ বছরের পর আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। হয়তো এরপর তুমি আমার মসজিদ এবং কবরের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। হযরত মু'য়ায (রা.) একথা শুনে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে চিরবিদায়ের কথা ভেবে কাঁদতে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে দাওয়াত ও তাবলীগের সুফল দেখাতে চাচ্ছিলেন। যে পথে তিনি দীর্ঘ বাইশ বছর দুঃখকষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা চাচ্ছিলেন, তাকে দুঃখকষ্ট ভোগের সুফল দেখানোর ব্যবস্থা এভাবে হোক, তিনি যেন হজ্জের মাধ্যমে মক্কার প্রান্তে আরব গোত্রসমূহের সদস্য এবং প্রতিনিধিদের সাথে সমবেত হতে পারেন। এরপর তারা তাঁর কাছ থেকে দ্বীন ও শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। তিনি তাদের কাছ থেকে এ মর্মে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন, যেন তাঁর উপর অর্পিত আমানত তিনি আদায় করেছেন। আল্লাহর এরূপ ইচ্ছা অনুযায়ী বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন সায়াহ্নে ঐতিহাসিক হজ্জে গমনের ইচ্ছা ঘোষণা করেন। তখন আরব মুসলমানরা দলে দলে মক্কায় পৌঁছতে শুরু করেন। সকলেই মনে-প্রাণে চাচ্ছিলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদাংক অনুসরণ করে তাঁর আনুগত্য মেনে নিবেন।

অতঃপর দশম হিজরীর শনিবার দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। যিলকদ মাসের তখনো চার দিন বাকি। তিনি মাথায় তেল দেন। চুল আঁচড়ান। তহবন্দ বা লুঙ্গী পরেন। চাদর গায়ে জড়ান। কুরবানীর পশু সজ্জিত করেন এবং যুহরের পর মক্কার দিকে রওনা হন। আসরের আগেই তিনি যুল হুলায়ফা নামক জায়গায় পৌঁছেন। সেখানে আসরের দু'রাকাত নামায আদায় করেন। রাত যাপনের জন্যে তাঁবু স্থাপন করেন। সকালে তিনি সাহাবীদের বলেন, রাতে আমার মহান প্রভুর কাছ থেকে একজন আগন্তুক এসে বলেছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পবিত্র প্রান্তরে নামায আদায় করুন এবং বলুন, হজ্জের মধ্যে ওমরা রয়েছে। এরপর যোহর নামাযের আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের জন্যে গোসল করেন। হযরত আয়িশা (রা.) নিজ হাতে তার পবিত্র দেহে যারিরা ও মেশক মিশ্রিত সুগন্ধি লাগান। সুগন্ধির চমক তাঁর সিঁথি এবং পবিত্র দাড়িতে দেখা যাচ্ছিল। তিনি এ খোশবু ধৌত করেননি। যেমন ছিল তেমনি রেখে দেন। এরপর তিনি তহবন্দ (লুঙ্গী) পরিধান করেন। চাদর গায়ে দেন। যুহরের দু'রাকাত নামায আদায় করেন। পরে মোসাল্লায় বসেই একত্রে হজ্জ এবং ওমরার ইহরাম বেঁধে লাব্বায়েক আওয়ায দিয়ে বাইরে আসেন। পরে উটনীতে আরোহণ করে দু'বার লাব্বায়েক বলেন। উটনীতে চড়ে খোলা ময়দানে গিয়ে সেখানেও লাব্বায়েক ধ্বনি উচ্চারণ করেন।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখেন। এক সপ্তাহ পর তিনি এক বিকেলে মক্কার কাছে পৌছে যী-তুওয়া নামক জায়গায় অবস্থান করেন এবং ফজরের নামায আদায়ের পর গোসল করে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেদিন ছিল দশম হিজরীর যিলহজ্জ মাসের চার তারিখ; রোববার। মদীনা থেকে রওনা হওয়ার পর পথে আট রাত অতিবাহিত হয়। স্বাভাবিক গতিতে পথ চললে এরূপ সময়েরই প্রয়োজন হয়। মসজিদে হারামে পৌঁছে তিনি প্রথমে কাবা ঘর তাওয়াফ করেন। এরপর সাফা মারওয়ার মধ্যবর্তী জায়গায় সাঈ করেন, কিন্তু ইহরাম খোলেননি। কেননা তিনি হজ্জ ও ওমরার ইহরাম একত্রে বেঁধেছিলেন এবং নিজের সাথে কুরবানীর পশুও নিয়ে এসেছিলেন। তাওয়াফ এবং সাঈ শেষে তিনি মক্কার হাজুন নামক স্থানে অবস্থান করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার হজ্জের তাওয়াফ ছাড়া কোনো তাওয়াফ করেননি।

তাঁর যে সকল সাহাবী কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসেননি, তিনি তাদের আদেশ দেন, তারা যেন নিজেদের ইহরাম ওমরায় পরিবর্তিত করে নেয় এবং কাবা ঘর তাওয়াফ, সাফা মারওয়ার সাঈ শেষ করে পুরোপুরি হালাল হয়ে যায় কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে হালাল হচ্ছিলেন না, এ কারণে সাহাবীরা সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যা পরে জেনেছি, সেটা যদি আগে জানতাম, তবে কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসতাম না। যদি আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকত, তবে আমিও হালাল হয়ে যেতাম। একথা শোনার পর সাহাবীরা আনুগত্যে মাথা নত করেন। যাদের কাছে কুরবানীর পশু ছিল না, তারা হালাল হয়ে যান।

যিলহজ্জ মাসের আট তারিখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় গমন করেন। ৯ই যিলহজ্জ তারিখ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। যোহর, আছর, মাগরিব, এশা এবং ফজর এ পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। পরে আরাফাত ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর নামেরা প্রান্তরে পৌঁছে তাঁবু প্রস্তুত পান। তিনি সেখানে অবতরণ করেন। সূর্য ঢলে পড়লে তাঁর আদেশে কাসওয়া উটনীর পিঠে আসন লাগানো হয়। তিনি প্রান্তরের মাঝামাঝি স্থানে গমন করেন। সে সময় তাঁর চারদিকে এক লাখ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লাখ মানুষের জনসমুদ্র বিদ্যমান ছিল। তিনি সমবেত জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যাকে বিদায় হজ্জের ভাষণ বলা হয়। বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'হে লোক সকল, আমার কথা শোনো, আমি জানি না, এবারের পর তোমাদের সাথে এ জায়গায় আর মিলিত হতে পারব কিনা।' তোমাদের রক্ত এবং ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্যে আজকের দিন, বর্তমান মাস এবং বর্তমান শহরের মতোই নিষিদ্ধ। শোনো, জাহেলিয়াত যুগের সবকিছু আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহেলিয়াতের খুনও খতম করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যেকার প্রথম যে রক্ত আমি শেষ করছি তা হচ্ছে, রবিয়া ইবনে হারেসের পুত্রের রক্ত। এ শিশু বনী সা'দ গোত্রে দুধ পান করছিল। সে সময় হোযারল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। জাহেলী যুগের সুদ খতম করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যেকার প্রথম যে সুদ আমি খতম করছি, তা হচ্ছে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ। এখন থেকে সকল প্রকার সুদ শেষ করে দেয়া হল।

হ্যাঁ, নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, কেননা তোমরা তাদের আল্লাহর আমানতের সাথে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের এটা অধিকার, তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে আসতে দেবে না, যাদের তোমরা পছন্দ কর না। যদি তারা এরূপ করে তবে তোমরা তাদের প্রহার করতে পার। কিন্তু বেশী কঠোর প্রহার কর না। তোমাদের উপর তাদের অধিকার হচ্ছে, তোমরা তাদের ভালোভাবে পানাহার করাবে এবং পোশাক দিবে।

তোমাদের কাছে আমি এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাক, তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। হে লোক সকল, মনে রেখ, আমার পরে কোন নবী নেই। তোমাদের পরে কোন উম্মত নেই। কাজেই নিজ প্রতিপালকের ইবাদাত করবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে, রমযান মাসে রোযা রাখবে, সানন্দ চিত্তে নিজের ধন-সম্পদের যাকাত দিবে, নিজ প্রতিপালকের ঘরে হজ্জ করবে, নিজের শাসকদের আনুগত্য করবে। যদি এরূপ কর, তবে তোমাদের মহান প্রভু তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

তোমাদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা তখন কি বলবে? সাহাবী-রা বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি পূর্ণাঙ্গ তাবলীগ করেছেন, হক পয়গাম পৌছে দিয়েছেন, কল্যাণ কামনার হক পুরোপুরি আদায় করেছেন। এ কথা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত আঙ্গুল আকাশের দিকে তুলে, লোকদের দিকে ঝুঁকে তিন বার বলেন, ইয়া রাব্বাল আলামীন, তুমি সাক্ষী থেক। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীসমূহ রবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ উচ্চকণ্ঠে মানুষের কাছে পৌছে দিচ্ছিলেন। তিনি ভাষণ শেষ করার পর আল্লাহ তা'আলা কুরআনের আয়াত নাযিল করেন। 'আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।' (সূরা মায়েদা : ৩)। হযরত ওমর (রা.) এ আয়াত শুনে কাঁদতে শুরু করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, কাঁদছি এ জন্যে যে, পূর্ণতার পর তো অপূর্ণতাই শুধু বাকি থাকে। মহান আল্লাহই জানেন, বিশ্বনবীর সে ভাষণ কিভাবে লক্ষাধিক সাহাবী এক ময়দানে দাঁড়িয়ে শুনতে পেয়েছেন। এটাও বিশ্বনবীর একটা মু'জেযা।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণের পর হযরত বিলাল (রা.) আযান ও ইকামত দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের নামায পড়ান। এরপর হযরত বিলাল একামত দেন এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় আসরের নামায পড়ান। উল্লিখিত উভয় নামাযের মাঝে অন্য কোনো নামায আদায় করেননি। এরপর উটের পিঠে আরোহণ করে তাঁর অবস্থানস্থলে গমন করেন। সেখানে তিনি কাসওয়া উটনীর পেট চাতালের দিকে করে জাবালে মাশাত (পায়ে চলা লোকদের পথে অবস্থিত বালুকা স্তূপ) সামনে রেখে কিবলামুখী হয়ে লাগাতার (এ অবস্থায়ই) অবস্থান করেন। এমনকি সূর্যাস্ত হয়ে যায়। সূর্যের হলুদ অবস্থা কিছুটা মিলিয়ে গিয়ে অতঃপর সূর্যগোলক পুরোপু-রি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত ওসামা (রা.) কে পিছনে বসান এবং সেখান থেকে রওনা হয়ে মুযদালিফায় গমন করেন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামায এক আযানে দুই একামতে আদায় করেন। মাঝখানে কোনো নফল নামায আদায় করেননি। এরপর তিনি শুয়ে পড়েন এবং ফজরের নামাযের সময় পর্যন্ত শায়িত থাকেন। ভোরের আলো উদ্ভাসিত হতেই আযান একামতের সাথে ফজরের নামায আদায় করেন। এরপর উটনীতে সওয়ার হয়ে 'মাশয়ারে হারামে' গমন করে কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর নামে তাকবীর ধ্বনি দেন; লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং তাওহীদের কালেমা উচ্চারণ করেন। সকালে চারদিক ভালোভাবে ফর্সা হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করেন। এরপর সূর্য ওঠার আগে আগেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে হযরত ফযল ইবনে আব্বাস (রা.) কে নিজের সওয়ারীর পিছনে বসান। 'বাতনে মুহাচ্ছারে' (আবরাহার সৈন্যদের উপর গযব অবতীর্ণ হওয়ার জায়গায়) পৌঁছে সওয়ারী জোরে চালান। এরপর মধ্যবর্তী রাস্তা, যা জামরায়ে কোবরার পথে বেরিয়ে গেছে, সে পথে চলে তিনি জামরায়ে কোবরায় পৌছেন। সে সময় সেখানে একটি গাছ ছিল। জামরায়ে কোবরা সে গাছের পরিচয়েও পরিচিত ছিল। জামরায়ে কোবরাকে জামরায়ে আকাবা এবং জামরায়ে উলাও বলা হত। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করেন। প্রতিবার পাথর নিক্ষেপের সময় তিনি তাকবীর ধ্বনি দিয়েছিলেন। সেগুলো ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছিল। বাতনে ওয়াদীতে দাঁড়িয়ে তিনি এসব পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন।

এরপর কুরবানীর জায়গায় গিয়ে নিজের হাতে ৬৩টি উট যবাই করেন। এরপর হযরত আলী (রা.) কে বাকি ৩৭টি উট যবাই করতে দেন। এভাবে একশ উট কুরবানী করা হয়। হযরত আলী (রা.) কেও তিনি নিজের কুরবানীতে শামিল করে নেন। এরপর তাঁর আদেশে প্রত্যেক উট থেকে এক টুকরো করে গোশত নিয়ে একটি হাঁড়িতে রান্না করা হয়। তিনি এবং হযরত আলী (রা.) সে গোশত থেকে কিছু আহার করেন। তিনি গোশতের কিছু ঝোলও পান করেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করে মক্কা মুয়াযযামায় গমন করে বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করেন। এ তাওয়াফকে বলা হয় তাওয়াফে এফাযা। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের নামায মক্কায় আদায় করেন। এরপর যমযম কূপের পাড়ে বনু আবদুল মুত্তালিবের কাছে গমন করেন। এ গোত্র হাজীদের যমযমের পানি পান করাচ্ছিলেন।

সেখানে তিনি বলেন, হে বনু আবদুল মুত্তালিব, তোমরা পানি উত্তোলন কর। পানি উত্তোলনের কাজে অন্য লোকেরা তোমাদের পরাজিত করে দেবে, যদি এ আশংকা পোষণ না করতাম তবে আমিও তোমাদের সাথে পানি উত্তোলন করতাম। সাহ- াবীরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পানি তুলতে দেখলে তারাও পানি তোলার চেষ্টা করতেন। ফলে হাজীদের পানি পান করানোর যে গৌরব এককভাবে বনী আবদুল মুত্তালিবের ছিল, সে ব্যবস্থা আর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকত না। অতঃপর বনু আবদুল মুত্তালিবের লোকেরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক বালতি পানি দেন এবং তিনি প্রয়োজনমত তা থেকে পান করেন।

সেদিন ছিল কুরবানীর দিন অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন চাশতের সময় একটি খোতবা প্রদান করেন। সে সময় তিনি খচ্চরের পিঠে আরোহিত ছিলেন। হযরত আলী (রা.) তার বক্তব্য সমবেত সাহাবীদের শোনাচ্ছিলেন। তাদের কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেদিনের ভাষণেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগের দিনের বক্তব্যের কিছু কিছু পুনরুল্লেখ করেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে হযরত আবু বকর (রা.) এর বর্ণনায় রয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমে নহর অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্জ তারিখে আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি বলেন, 'যুগ ঘুরে ফিরে সে দিনের আকৃতিতে পৌছে গেছে। যে দিন আল্লাহ তা'আলা আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চার মাস হচ্ছে হারাম। যার তিনটি একের পর এক আসে। যথা যিলকদ, যিলহজ্জ এবং মহররম। অন্য একটি মাস হচ্ছে জমাদিউস সানী এবং শাবান মাসের মাঝামাঝি, সে মাসের নাম রজব।' এরপর আবু বকর বর্ণনা করেন; মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করেন, এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূলই ভালো জানেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। আমরা তখন বুঝলাম, তিনি এ মাসের অন্য কোনো নাম রাখবেন। কিন্তু তিনি বললেন, এটি কি যিলহজ্জ মাস নয়? আমরা বললাম, কেন নয়? তিনি বললেন, এটা কোন শহর? আমরা বললাম আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। আমরা ভাবলাম, তিনি এ শহরের অন্য কোনো নাম রাখবেন, কিন্তু তিনি বললেন, এটি কি মক্কা শহর নয়? আমরা তখন বললাম, কেন নয়? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দিনের পরিচয় কি? আমরা বললাম, আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। আমরা ভাবলাম, তিনি এ দিনের অন্য কোনো নাম রাখবেন, কিন্তু তিনি বললেন, এ দিন কি ইয়াওমুন নহর (কুরবানীর দিন) - ১০ই যিলহজ্জ নয়? আমরা বললাম, কেন নয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আচ্ছা তবে শোন; তোমাদের রক্ত, তোমাদের অর্থ-সম্পদ এবং তোমাদের ইযযত, আবরু, পরস্পরের জন্যে এরূপ নিষিদ্ধ ও সম্মানযোগ্য, যেমন তোমাদের এ শহর, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের আজকের এ দিন তোমাদের জন্যে সম্মানযোগ্য। তোমরা তোমাদের প্রভুর সাথে শীঘ্রই মিলিত হবে এবং তোমাদের নিজ নিজ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। কাজেই লক্ষ্য রেখ, আমার পরে তোমরা এমন পথভ্রষ্ট হয়ো না যে, একে অন্যের ঘাড় মটকাতে শুরু করে দাও?। বল, আমি কি তাবলীগ করেছি? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেক। যে ব্যক্তি এখানে উপস্থিত রয়েছে তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিবে। কেননা উপস্থিত অনেকের চেয়ে অনেক অনুপস্থিত ব্যক্তি আমার এ বক্তব্য অধিক হৃদয়ংগম করবে।

এক বর্ণনায় রয়েছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ভাষণে একথাও বলেছেন, 'স্মরণ রেখ', অপরাধী নিজের উপরই অপরাধ করে। সে নিজেই অপরাধের জন্যে দায়ী হবে। স্মরণ রেখ, কোনো অপরাধী পুত্র, নিজের পিতার উপর, কোনো অপরাধী পিতা, নিজের পুত্রের উপর অপরাধ করতে পারে না। পিতার অপরাধের জন্যে পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্যে পিতাকে পাকড়াও করা হবে না। স্মরণ রেখ শয়তান এ মর্মে হতাশ হয়ে গেছে, এ শহরে আর কখনো তার উপাসনা করা হবে না। তবে নিজেদের যেসব কাজ তোমরা তুচ্ছ মনে করবে, সেসব শয়তানের আনুগত্যে সম্পন্ন হবে এবং তা দ্বারাই শয়তান সন্তুষ্টি লাভ করবে।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে তাশরীকে (১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ) মিনায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি হজ্জের রীতিসমূহ পালন করেন। সে সাথে জনসাধারণকে শরীয়তের হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেন। আল্লাহর যিকির করেন। মিল্লাতে ইব্রাহীমের সুন্নতসমূহ কায়েম করেন। শিরকের নিদর্শনসমূহ নির্মূল করেন। আইয়ামে তাশরীকের একদিন তিনি এ ভাষণ দেন। আবু দাউদে এ বর্ণনা রয়েছে। হযরত ছারা বিনতে বিনহান (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রউসের দিন আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং বলেন, এ দিন কি আইয়ামে তাশরীকের মাঝখানের দিন নয়? তাঁর সেদিনের ভাষণও ছিল পূর্বের (কুরবানীর দিনের) ভাষণের অনুরূপ। এ ভাষণ সূরা নাসর নাযিল হওয়ার পর দেয়া হয়েছিল।

তাশরীকের শেষদিনে ১৩ যিলহজ্জ ইয়াওমুন নফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনা থেকে রওনা করেন এবং আতবাহ উপত্যকার খায়ফে বনী কেনানায় অবতরণ করেন। দিনের বাকি অংশ এবং রাত সেখানেই কাটান। যুহর, আসর, মাগরিব ও এশার নাময সেখানেই পড়েন। অবশ্য এশার পরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেন এবং উঠে সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে গমন করে বিদায়ী তাওয়াফ করেন। হজ্জের যাবতীয় কাজ শেষে তিনি সওয়ারী মদীনাভিমুখে চালনা করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি বিশ্রাম নিবেন; উদ্দেশ্যে এমন ছিল না। বরং সেখানে গিয়ে আল্লাহর পথে ব্যাপক দাওয়াত ও তাবলীগ এবং নতুন সংগ্রাম সাধনার সূচনা করবেন- এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সামরিক অভিযান

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সামরিক অভিযান


সমগ্র আরবে ইসলামের জয় জয়কার রব উঠে। সারা বিশ্ব শংকিত হয়। সুবিস্তৃত রোম সাম্রাজ্যের শাসকবর্গ ইসলাম এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের বেঁচে থাকার অধিকার মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। এ কারণে রোম সম্রাটের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কারো ইসলাম গ্রহণ করা ছিল বিপদজনক। রোমের গভর্নর ফারওয়া ইবনে আমর জুযামীর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা অন্যদের জন্যেও প্রবল ছিল। রোমের শাসকদের এ ধরনের ঔদ্ধত্য এবং অহঙ্কারপূর্ণ আচরণের কারণে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাদশ হিজরীর সফর মাসে এক বিরাট বাহিনী তৈরীর কাজ শুরু করেন। বিশ্বনবী হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.) কে এ বাহিনীর সেনাপতি পদে নিযুক্তি দিতে আদেশ দেন। বলেন, বালকা এলাকা এবং দারুমের ফিলিস্তিনী ভূখ সওয়ারদের মাধ্যমে নাস্তানাবুদ করে এসো। রোমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের মনে সাহস সঞ্চার করাই ছিল সে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, গির্জার বাড়াবাড়ি এবং স্বেচ্ছাচারিতার সামনে কথা বলার কেউ ছিল না। তাছাড়া একথা সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে, ইসলাম গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে নিজের মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানান। সার্বিক বিবেচনায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের বড় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।

হযরত ওসামাকে (রা.) সেনাপতি নিযুক্ত করার কারণে কেউ কেউ সমালোচনা করে এ অভিযানে অংশ গ্রহণে বিলম্ব করেন। এ অবস্থা লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যদি ওসামার সেনাপতিত্বের প্রশ্নে সমালোচনামুখর হও, তবে তো বলতেই হয়, ইতোপূর্বে তার পিতাকে সেনাপতি নিযুক্ত করার সময়েও তোমরা সমালোচনামুখর হয়েছিলে। অথচ আল্লাহর শপথ, যায়েদ ছিল সেনাপতি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন। এছাড়া সে ছিল আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। যায়েদের পর ওসামাও আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। তখন সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হযরত ওসামার (রা.) আশপাশে সমবেত হয়ে তাঁর বাহিনীতে শামিল হন। এ বাহিনী রওনা হয়ে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে মাকাতে যরফ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। অবশ্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা সম্পর্কে উদ্বেগজনক খবর পেয়ে তারা সামনে অগ্রসর হননি। আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় তারা সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের পর ওসামার মিশন সাময়িক স্থগিত রেখে সবাই মদীনায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে আবু বকরের (রা.) খিলাফতের সময় এ অভিযান পুনরায় প্রেরণ করা হয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল


একাদশ হিজরীর (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ) ২৯শে সফর রোববার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকিতে এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। ফেরার পথে মাথা ব্যথা শুরু হয় এবং উত্তাপ এত বেড়ে যায় যে, মাথায় বাঁধা পট্টির উপর দিয়েও তাপ অনুভব করা যাচ্ছিল। এটা ছিল তাঁর মরণ রোগের শুরু। তিনি সে অসুস্থ অবস্থায়ই এগার দিন নামায পড়ান। অসুখের মোট মেয়াদ ছিল তের অথবা চৌদ্দ দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মানস প্রকৃতি ক্রমেই ভয়াবহ দুর্বল হয়ে পড়ছিল। এ সময় তিনি বারবার সহধর্মিণীদের জিজ্ঞেস করতেন, আমি আগামীকাল কোথায় থাকব? আমি আগামীকাল কোথায় থাকব? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জিজ্ঞাসার তাৎপর্য তাঁর সহধর্মিণীরা বুঝে ফেলেন। তাই তারা বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি যেখানে থাকতে ইচ্ছা করেন সেখানেই থাকবেন। এরপর তিনি হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে স্থানান্তরিত হন। স্থানান্তরের সময় তিনি হযরত ফযল ইবনে আব্বাস এবং হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) এর উপর ভর দিয়ে চলছিলেন। তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। পবিত্র চরণযুগল মাটিতে হেঁচড়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে স্থানান্তরিত হন এবং জীবনের শেষ সপ্তাহ সেখানেই কাটান। হযরত আয়িশা (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শিক্ষা করা দোয়াসমূহ পাঠ করে তাঁর পবিত্র দেহে ফুঁ দিতেন এবং বরকতের আশায় তাঁর পবিত্র হাত দেহে মেলাতেন। এ অবস্থাতেও তিনি আয়িশার (রা.) ঘরে উম্মুল মুমেনিন ও মহিলাদের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত দেন। দাওয়াত ও তাবলীগ অব্যাহত রাখেন।

ইন্তিকালের পাঁচ দিন আগে চাহার শোম্বায় (বুধবার) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহের উত্তাপ অতিরিক্ত আকার ধারণ করে। এতে তাঁর কষ্ট বেড়ে যায় এবং তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় তিনি বলেন, বিভিন্ন কূপের সাত মশক পানি আমার উপর ঢাল। আমি যেন লোকদের কাছে গিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগ করতে পারি। তাঁর এ আদেশ পুরো করতে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হয় এবং দেহে এত বেশী পরিমাণ পানি ঢালা হয়, যাতে তিনি বলেন, ব্যস, ব্যস, আর প্রয়োজন নেই। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা সুস্থ বোধ করে মসজিদে যান। এ সময়ও তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিল। তিনি মিম্বারে আরোহণ করে ভাষণ দেন। সাহাবায়ে কেরাম আশেপাশে সমবেত ছিলেন। তিনি বলেন, ইহুদী নাসারাদের উপর আল্লাহর লানত, কেননা তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। তিনি আরো বলেন, তোমরা আমার কবরকে পূজার বেদীতে বা মাজারে পরিণত করো না।

এরপর তিনি নিজেকে অন্যদের বদলা নেয়ার জন্যে পেশ করে বলেন, আমি যদি কারো পিঠে চাবুকের আঘাত করে থাকি, তবে এ আমার পিঠ হাযির, সে যেন বদলা নিয়ে নেয়। যদি কাউকে অসম্মান করে থাকি, তবে সে যেন আমার কাছ থেকে বদলা গ্রহণ করে। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর থেকে নীচে নেমে আসেন এবং যুহরের নামায পড়ান। এরপর তিনি পুনরায় মিম্বারে উপবেশন করে শত্রুতা, হিংসা, বক্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে ইতোপূর্বে বলা কথা পুনরায় বলেন। এক লোক বলেন, আপনার কাছে আমি তিন দিরহাম পাওনা রয়েছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযল ইবনে আব্বাস (রা.) কে সে ঋণ পরিশোধের আদেশ দেন। এরপর তিনি আনসারদের সম্পর্কে ওসিয়ত করেন। তিনি বলেন, আমি তোমাদের আনসারদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি। কেননা তারা আমার অন্তর ও কলিজা। তারা নিজেদের যিম্মাদারী পূর্ণ করেছে, কিন্তু তাদের অধিকারসমূহ বাকি রয়ে গেছে। কাজেই তাদের মধ্যেকার নেককারদের গ্রহণ করবে এবং বদকারদের ক্ষমা করবে। তিনি আরও বলেন, মানুষ বাড়তে থাকবে, কিন্তু আনসারদের সংখ্যা কমতে থাকবে, এমনকি তারা খাবারে লবণের পরিমাণের মত হয়ে পড়বে। কাজেই তোমাদের যারা কোনো উপকার বা ক্ষতি করার মত কাজের দায়িত্ব পাবে, তারা আনসারদের মধ্যেকার নেককারদের গ্রহণ করবে এবং বদকারদের ক্ষমা করবে।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর বা ওফাতের চার দিন আগে বৃহস্পতিবার তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন। সে সময় তিনি বলেন, আমি তোমাদের ক'টি কথা লিখে দিচ্ছি, এরপর তোমরা কখনো গোমরাহ হবে না। সে সময় ঘরে কয়েকজন লোক উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হযরত ওমরও (রা.) ছিলেন। তিনি বলেন, আপনি অসুখে খুবই কষ্ট পাচেছন। আমাদের কাছে পবিত্র কুরআন রয়েছে, সেটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। একথা শুনে ঘরে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা লিখে দিতে চাচ্ছিলেন, তা লিখিয়ে নেয়া হোক। কেউ কেউ বলছিলেন, না দরকার নেই। হযরত ওমর (রা.) বলেন, সেটাই ঠিক। মতভেদ এক সময়ে কথা কাটাকাটিতে পরিণত হয়। শোরগোল বেড়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। সেদিনই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন ব্যাপারে ওসিয়ত করেন। প্রথমত উহুদী, নাসারা এবং মুশরিকদের জাযিরাতুল আরব থেকে বের করে দেবে। দ্বিতীয়ত আগন্তুক প্রতিনিধি দলের সাথে আমি যে রকম ব্যবহার করতাম, সে রকম ব্যবহার করবে। তৃতীয় কথা বর্ণনাকারী ভুলে গেছেন। সম্ভবত বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা অথবা ওসামার (রা.) বাহিনীকে প্রেরণ করার কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসীদের প্রতি খেয়াল রাখবে।

অসুখের তীব্রতা সত্ত্বেও ওফাতের চার দিন আগে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল নামাযে নিজেই ইমামতি করেন। সেদিনের মাগরিবের নামাযে তিনিই ইমামতি করেছিলেন। সে নামাযে তিনি সূরা মুরসালাত পাঠ করেন। এশার সময় রোগ এত বেড়ে যায়, যাতে মাসজিদে যাওয়ার শক্তি থাকেনি। হযরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, সেদিন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি নামায আদায় করে ফেলেছে? আমি বললাম, জ্বি না, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আমার জন্যে পাত্রে পানি লও। আমি তাই করলাম। তিনি গোসল করলেন, এরপর ওঠতে চাইলেন কিন্তু বেহুশ হয়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কি নামায আদায় করে ফেলেছে? তাঁকে জানানো হল, জ্বি না, ইয়া রাসূলাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারও একই অবস্থা হয়। তিনি গোসল করলেন এরপর ওঠতে চাইলেন, কিন্তু বেহুশ হয়ে গেলেন। এরপর তিনি হযরত আবু বকর (রা.) কে খবর পাঠান, তিনি যেন নামায পড়িয়ে দেন অর্থাৎ নামাযে ইমামতি করেন।

এরপর তাঁর অসুস্থতার জন্য বাকী দিনগুলোতেও, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নামায পড়ান। তাঁর জীবদ্দশায় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সতের ওয়াক্ত নামাযে ইমামতি করেন। হযরত আয়িশা (রা.) তিন অথবা চারবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ মর্মে আরয করেন, ইমামতির দায়িত্ব হযরত আবু বকর (রা.) ব্যতীত অন্য কাউকে দেয়া হোক। তিনি চাচ্ছিলেন, লোকেরা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ না করুক। কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবারই সহধর্মিণীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তোমরা সবাই ইউসুফ (আঃ) এর সাথীদের মত হয়ে গেছ। আবু বকরকে আদেশ দাও, তিনি যেন লোকদের নামায পড়ান।

শনি অথবা রোববার; বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। অতএব দু'জন লোকের কাঁধে ভর দিয়ে যুহরের নামাযের জন্যে মসজিদে যান। সে সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সাহাবীদের নামায পড়াচ্ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখে তিনি পিছনে সরে আসতে থাকেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশারা করেন, পিছনে সরে আসার দরকার নেই। যাদের কাঁধে ভর দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়েছিলেন তাদের বলেন, আমাকে আবু বকরের পাশে বসিয়ে দাও। এরপর তাঁকে হযরত আবু বকরের (রা.) ডান পাশে বসিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তখন নামাযে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একতেদা করছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তাকবীর শোনাচ্ছিলেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের একদিন আগে (রোববার দিন) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সব দাস দাসীকে মুক্ত করে দেন। তাঁর কাছে সে সময় সাত দিনার ছিল, সেগুলো সদাকা করে দেন। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র মুসলমানদের হেবা করে দেন। রাতের বেলা চেরাগ বা বাতি জ্বালানোর জন্যে হযরত আয়িশা (রা.) এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে জয়তুনের তেল ধারে আনেন। তাঁর বর্ম এক ইহুদীর কাছে তিরিশ সা' (৭৫ কিলোগ্রাম) যবের বিনিময়ে বন্ধক ছিল। হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষদিনটি ছিল সোমবার। মুসলমানরা ফজরের নামায আদায় করছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইমামতির দায়িত্বে ছিলেন। হঠাৎ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়িশা সিদ্দিকার হুজরার পর্দা সরিয়ে সাহাবীদের কাতার বাঁধা অবস্থায় নামায আদায় করতে দেখে মৃদু হাসেন। এদিকে হযরত আবু বকর (রা.) কিছুটা পিছনে সরে গেলেন, যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের কাতারে শামিল হতে পারেন। তিনি ভেবেছিলেন, তিনি হয়ত নামাযে আসতে চান। হযরত আনাস (রা.) বলেন, হঠাৎ করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে সাহাবীরা এত আনন্দিত হলেন, যাতে নামাযের মধ্যেই তাদের ফেতনায় পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হল। তারা নামায ছেড়ে দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক অবস্থার খবর নিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীদের হাতে ইশারা করলেন, তারা যেন নামায পুরো করেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুজরার ভেতর চলে গিয়ে পর্দা ফেলে দেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অন্য কোনো নামাযের সময় আসেনি। দিনের শুরুতে 'চাশত' নামাযের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) কে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু কথা বলেন। এতে নবী কন্যা ফাতিমা (রা.) কাঁদতে থাকেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় ফাতিমার কানে কিছু কথা বলেন এবার হযরত ফাতিমা (রা.) হাসতে থাকেন।

হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, পরবর্তী সময়ে আমি হযরত ফাতিমাকে তাঁর কান্না ও হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, প্রথমবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন, এ অসুখেই আমার মৃত্যু হবে। একথা শুনে আমি কাঁদলাম। এরপর তিনি আমাকে কানে কানে বলেন, আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে সর্বপ্রথম তুমিই আমার অনুসারী হবে। একথা শুনে আমি হাসলাম। এ সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতিমা (রা.) কে বিশ্বের সকল মহিলার নেত্রী হওয়ার সুসংবাদও প্রদান করেন। শেষদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যন্ত্রণার তীব্রতা দেখে হযরত ফাতিমা (রা.) হঠাৎ বলে ফেলেন, হায় আমার আব্বার কষ্ট। একথা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আজকের পরে তোমার আব্বার আর কোনো কষ্ট নেই। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান ও হোসাইন (রা.) কে ডেকে চুম্বন করেন এবং তাদের ব্যাপারে কল্যাণের ওসিয়ত করেন। সহধর্মিণীদের ডেকে তাদেরও ওয়ায-নসহীত করেন। মৃত্যুর শেষ দিনেও দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন।

বিশ্বনবী কষ্ট ক্রমেই বাড়ছিল। খাইবারে ইহুদী মহিলার দেয়া বিষের প্রভাবও প্রকাশ পাচ্ছিল। খাইবারে দাওয়াত করে তাঁকে খাদ্যে বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়িশা (রা.) কে বলেন, হে আয়িশা, খাইবারে আমি যে বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়েছিলাম তার প্রতিক্রিয়াজনিত কষ্ট সব সময় অনুভব করছি। এখন মনে হচ্ছে, সে বিষের প্রভাবে যেন আমার প্রাণের শিরা কাটা যাচ্ছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগ, নসিয়ত ও নির্দেশ প্রদান করেন। তাদের তিনি বলেন, 'আস সালাত, আস সালাত ওয়ামা মালাকাত আইমানুকুম অর্থাৎ নামায, নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ দাসদাসী।' বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একথা কয়েকবার উচ্চারণ করেন।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতকালীন অবস্থা শুরু হয়। হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেহে ঠেস দিয়ে ধরে রাখেন। তিনি বলেন, আমার উপর আল্লাহর একটি নেয়ামত হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে, আমার পালার দিনে, আমার কোলের উপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁর এবং আমার থুথু একত্রিত করে দেন। মৃত্যুর পূর্বে আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) এসেছিলেন। সে সময় তার হাতে ছিল মিসওয়াক। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ের উপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি মিসওয়াকের প্রতি তাকিয়ে আছেন। আমি বুঝলাম তিনি মিসওয়াক চান। বললাম, আপনার জন্যে নেবো কি? তিনি মাথা নেড়ে ইশারা করেন। আমি মিসওয়াক এনে তাঁকে দেই। কিন্তু তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্ত অনুভব করেন। আমি বললাম, আপনার জন্যে কি নরম করে দেব? তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। আমি দাঁত দিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি বেশ ভালোভাবে মিসওয়াক করেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে পানি ছিল। তিনি হাত ভিজিয়ে চেহারা মুছছিলেন আর বলছিলেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, মৃত্যু বড় কঠিন।

মিসওয়াক শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত অথবা আঙ্গুল তোলেন। এ সময় তাঁর দৃষ্টি ছিল ছাদের দিকে। উভয় ঠোঁট তখনো নড়ছিল। তিনি বিড়বিড় করে কি যেন বলছিলেন। হযরত আয়িশা (রা.) মুখের কাছে কান পাতেন। বিশ্বনবী তখন বলছিলেন, হে আল্লাহ, নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎব্যক্তি, যাদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের দলভুক্ত কর। আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ, আমাকে মার্জনা কর, আমার উপর রহম কর এবং আমাকে 'রফিকে 'আলায় পৌছে দাও। হে আল্লাহ আমাকে রফিকে আলায় পৌছে দাও! বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ কথাটি তিন বার উচ্চারণ করেন।

এরপর তাঁর হাত ঝুলে পড়ে এবং তিনি পরম বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।' অর্থাৎ আমরা সবাই আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। এ ঘটনা ঘটেছিল একাদশ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার, চাশতের নামাযের শেষ সময়ে (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দ)। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল তেষট্টি বছর চার দিন।

হৃদয়বিদারক এ শোক সংবাদ অল্পক্ষণের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মদীনার জনগণের উপর শোকের পাহাড় ভেংগে পড়ে। চারদিকে শোকের কালো ছায়া। হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন আমাদের মাঝে মদীনায় আগমন করেছিলেন সেদিনের চেয়ে সমুজ্জ্বল দিন আমি আর কখনো দেখিনি। আর যেদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনও আমি আর কখনো দেখিনি। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর হযরত ফাতিমা (রা.) শোকে কাতর হয়ে বলেন, 'হায় পিতা, যিনি পরওয়ারদেগারের ডাকে লাব্বায়েক বলেছেন। হায় আব্বা, যাঁর ঠিকানা হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। হায় আব্বা, আমি জিব্রাঈল (আঃ) কে আপনার ওফাতের খবর জানাচ্ছি।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর শুনে হযরত ওমর (রা.) জ্ঞানহারা হয়ে পড়েন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, কিছু কিছু মুনাফিক মনে করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাত হয়েছে; কিন্তু আসলে তাঁর ওফাত হয়নি। তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে ঠিক সেভাবে গেছেন, যেভাবে হযরত মূসা ইবনে ইমরান (আঃ) গিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) তাঁর কওমের কাছ থেকে চল্লিশ দিন অনুপস্থিত থাকার পর পুনরায় ফিরে এসেছিলেন। অথচ তাঁর ফিরে আসার আগে তাঁর জাতির লোকেরা বলাবলি করছিল, মূসা (আঃ) এর ওফাত হয়েছে। আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ফিরে আসবেন এবং যারা মনে করছে তিনি মারা গেছেন, তিনি তাদের হাত পা কেটে ফেলবেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সুনহে নামক জায়গায় নিজের বাড়িতে ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের খবর শুনে ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত ছুটে এসে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন। এরপর কাউকে কোনো কথা না বলে, সোজা হযরত আয়িশার (রা.) ঘরে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহ মোবারক তখন ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে ঢাকা ছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চেহারা থেকে চাদর সরিয়ে চুম্বন করে কেঁদে ওঠেন। এরপর বলেন, আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান হোন। আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্যে দু'টি মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্যে লেখা ছিল তা হয়ে গেছে। এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বাইরে আসেন। হযরত ওমর (রা.) সমবেত লোকদের সাথে কথা বলছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে বলেন, ওমর বসে পড়। হযরত ওমর (রা.) বসতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে সাহাবীরা হযরত ওমরকে ছেড়ে হযরত আবু বকরের (রা.) প্রতি মনোযোগী হন। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, তোমাদের মধ্যেকার যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূজা করতে, সে জেনে রাখুক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়েছে। আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করতে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ তা'আলা চিরঞ্জীব, তিনি কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন, 'মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল, তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়ে গেছে। সুতরাং যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন, তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখন আল্লাহর ক্ষতি করবে না। বরং আল্লাহ তা'আলা শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।' (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

মানসিক যন্ত্রণায় অস্থির দিশেহারা সাহাবীরা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর বক্তব্য শুনে নিশ্চিত হন, প্রকৃতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, কেউ যেন জানতই না আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে আবু বকরের উচ্চারিত এ আয়াত নাযিল করে রেখেছেন। আবু বকর (রা.) এর তিলাওয়াতের পর সবাই এ আয়াত মুখস্থ করে নেয়। মুখে মুখে তখন এ আয়াত ফিরছিল। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রা.) বলেন, হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, আল্লাহর শপথ, হযরত আবু বকর (রা.) কে পবিত্র কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনে, আমি যেন মাটি হয়ে গেলাম। আমি দাঁড়াতে পারলাম না, মাটিতে ঢলে পড়ে যাচ্ছিলাম। কেননা তখন স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যি সত্যিই ইন্তিকাল করেছেন।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাফন দাফনের আগেই তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনায়ন প্রশ্নে সাহাবীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। সাকিফা বনী সায়েদায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়। অবশেষে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খেলাফতের ব্যাপারে সবাই একমত হন। এ কাজে সোমবারের বাকি দিন কেটে গিয়ে রাত এসে যায়। সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরদিন সকাল হয়। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। তখনও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র দেহ একখানা ডোরাকাটা ইয়েমেনী চাদরে আবৃত ছিল। ঘরের লোকেরা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীরের কাপড় না খুলেই তাঁকে গোসল দেয়া হয়। গোসলদানকারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত আব্বাস, হযরত আলী, হযরত আব্বাসের দুই পুত্র ফযল এবং কাসেম। আরও ছিলেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্ত করা দাস শোকরান, হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ এবং আওস ইবনে খাওলা (রা.)। হযরত আব্বাস ও তাঁর দুই পুত্র বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাশ ফেরাচ্ছিলেন। হযরত ওসামা ও হযরত শোকরান পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন এবং হযরত আলী (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের বুকের সাথে ঠেস দিয়ে রেখেছিলেন।

গোসল শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনখানা ইয়েমেনী সাদা চাদর দিয়ে কাফন দেয়া হয়। এতে কোর্তা এবং পাগড়ি ছিল না। তাকে শুধু চাদর দিয়েই জড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোথায় দাফন করা হবে, সে সম্পর্কেও সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, সকল নবীকে যেখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে, সেখানেই দাফন করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত হওয়ার পর, হযরত আবু তালহা (রা.) সে বিছানা ওঠান। যে বিছানায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন। সে বিছানার নীচে কবর খনন করা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ শয্যায় থাকাকালীন চল্লিশজন গোলাম আযাদ করেন। হযরত আয়িশা (রা.) এর কামরায় থাকাকালীন সময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসিয়ত করেছিলেন, 'ইন্তিকালের পরে আমাকে গোসল দিবে, কাফন পরাবে, আমার কফিন কিছুক্ষণের জন্য আমার এ হুজরায় রেখে তোমরা বেরিয়ে যাবে। সর্বপ্রথম জিব্রাঈল এসে আমার জানাযা পড়াবে। অতঃপর মিকাইল, তারপর ইস্রাফীল, তারপর আজরাঈল। তাদের প্রত্যেকের সংগে ফিরিশতাদের বিরাট দল থাকবে। অবশেষে ইমাম ছাড়া আমার পরিবারের পুরুষ, তারপরে মহিলাগণ আলাদা আলাদাভাবে আমার জানাযা বা দোয়া পড়বে। অতঃপর তোমরা (সাহাবারা) দলে দলে এসে আমার জানাযা পড়বে।

এরপর ওসিয়ত মত দশ জন, দশ জন করে সাহাবী হুজরায় প্রবেশ করে পালাক্রমে জানাযার নামায দোয়ার আকারে আদায় করেন। এ নামাযে কেউ ইমাম হননি। সর্বপ্রথম বনু হাশেম গোত্রের লোকেরা নামায আদায় করেন। এরপর মুহাজির, এরপর আনসাররা, এরপর অন্যান্য পুরুষ, এরপর মহিলা, সবশেষে শিশুরা জানাযার নামায আদায় করেন। জানাযার নামায আদায়ে মঙ্গলবার পুরো দিন অতিবাহিত হয় এবং মঙ্গলবার দিবাগত অর্থাৎ বুধবার রাত এসে যায়। এ রাতেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ আহমদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দাফন করা হয় অর্থাৎ কবরে শুইয়ে দেয়া হয়। হযরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঠিক কোথায় দাফন করা হয় আমরা জানতে পারিনি। তবে বুধবার রাতের মাঝামাঝি সময়ে কোদালের শব্দ পেয়েছিলাম। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মোবারক হযরত আয়িশার (রা.) গৃহে ঠিক ঐ জায়গাতে তৈরি করা হয়, যেখানে হযরত আয়িশার (রা.) বিছানা ছিল। যাঁরা গোসল দিয়েছিলেন একমাত্র হযরত উসামা ছাড়া সকলেই কবরে নেমেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর কাঁচা ইট দিয়ে বন্ধ করা হয়। মোট নয়খানা ইট বিছানো হয়েছিল। কোন ধরনের দেয়াল দেয়া হয়নি। আমাদেরকেও মনে রাখতে হবে যে, মৃত্যু সত্য এবং সবাইকে কবরে যেতে হবেই। কবরের নির্জন প্রকোষ্ঠে সবাইকে একাকী যেতে হয়েছে। আমার ও আপনার ব্যাপারেও একই অবস্থা অপেক্ষা করছে। মৃত্যুর পূর্বেই পরকালের সঞ্চয়, ঈমান ও আমলকে সঠিক এবং সম্পূর্ণ করে করে নিয়ে যেতে হবে। মৃত্যুর পরের জীবন অনন্ত এবং যা কখনই শেষ হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00