📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মূতার যুদ্ধ

📄 মূতার যুদ্ধ


মুসলমানদের সাথে রোমান সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ মক্কা বিজয়ের পূর্বেই শুরু হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হুদাইবিয়ার সন্ধির পর দ্বীন ইসলামকে প্রচারের উদ্দেশ্যে উত্তর দিকে একটি দল সিরিয়া সংলগ্ন বিভিন্ন গোত্রের নিকট পাঠান। দাওয়াত ও তাবলীগের জামাতটি হিজরত করতে থাকে। কিন্তু 'জাতুত তালাহ' নামক স্থানে মুসলিম জামাতের ১৫ জনকে হত্যা করা হয়। এ সময়ে বসরা অধিপতি শুরাহবিলের নিকট ইসলামের দাওয়াতপত্র প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র বাহক হারিস বিন উমাইরকে (রা.) হত্যা করে। এসব কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরী জমাদিউল আউয়াল মাসে ৩ হাজার মুজাহিদের এক বাহিনী সিরিয়া সীমান্তে পাঠান। এ বাহিনী 'ময়ান' নামক স্থানে পৌঁছলে জানা যায় যে, শুরাহবিল এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। অথচ এরূপ ভয়বহ খবর সত্ত্বেও ৩ হাজার প্রাণ উৎসর্গকারী মুসলিম বাহিনী সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে এবং 'মুতা' নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। আশ্চর্যজনক হলেও শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের জয় সাধিত হয়।

মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এ জায়গা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের দূরত্ব মাত্র দুই মনযিল। এখানেই মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় মুসলমানরা যেসব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, এ যুদ্ধ ছিল সেসবের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। এ যুদ্ধই মুসলমানদের খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশসমূহ জয়ের পথ খুলে দিয়েছিল। অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল অর্থাৎ ৬২৯ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ অভিযানের কারণ খুবই স্পষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রা.) কে একখানি চিঠিসহ বোসরার গভর্নরের কাছে প্রেরণ করেন। রোমের কায়সারের গভর্নর শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানী সে সময় বালকা এলাকায় নিযুক্ত ছিল। এ দুর্বৃত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দূতকে গ্রেফতার এবং শক্তভাবে বেঁধে হত্যা করে। যেহেতু রাষ্ট্রদূত বা সাধারণ দূতদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক নিয়মেই গুরুতর অপরাধ। সেহেতু এটা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল। এমনকি এর চেয়েও গুরুতর অপরাধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত হত্যার খবর শোনার পর খুবই মর্মাহত হন। এ কারণে তিনি সে এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্যে সৈন্যদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী তৈরী করা হয়। খন্দকের যুদ্ধ ছাড়া ইতোপূর্বে অন্য কোনো যুদ্ধেই মুসলমানরা তিন হাজার সৈন্য সমাবেশ করেননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) কে এ সেনাদলের সেনাপতি মনোনীত করে বলেন, যায়েদ যদি শহীদ হয়, তবে জাফর (রা.) এবং জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) সিপাহসালার দায়িত্ব পালন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সেনাদলের জন্যে সাদা পতাকা তৈরী করে তা হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার (রা.) হাতে দেন। সৈন্যদলকে তিনি ওসীয়ত করেন, তারা যেন হারেস ইবনে ওমায়রের হত্যাকারে জায়গায় স্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তো ভালো। তা না হলে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে, আল্লাহর সাহায্যে কুফরকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। খেয়ানত করবে না। কোনো নারী, শিশু, অতীব বৃদ্ধ এবং গির্জায় অবস্থানকারী দুনিয়া পরিত্যাগকারীকে হত্যা করবে না। খেজুর এবং অন্য কোনো গাছ কাটবে না। কোন অট্টালিকা ধ্বংস করবে না।

মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সর্বসাধারণ মুসলমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোনীত সেনানায়কদের সালাম এবং বিদায় জানান। সে সময় অন্যতম সেনানায়ক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) কাঁদছিলেন।
তাঁকে এ সময় কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বা তোমাদের সাথে সম্পর্কের কারণে আমি কাঁদছি না।

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনে জাহান্নামের ভয়ে কাঁদছি। সে আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে, এটা তোমাদের প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।' (সূরা মারইয়াম : ৭১)। আমি জানি না, জাহান্নামে প্রবেশের পর ফিরে আসব কিভাবে? মুসলমানরা বলেন, আল্লাহর শান্তি ও নিরাপত্তা আপনাদের সঙ্গী হোক। আপনাদের হিফাযত করুন এবং গনীমতের মালসহ আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনুন। উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মুসলিম সৈন্যরা মাআন নামক এলাকায় পৌঁছেন। এ স্থান ছিল হেজাযের সাথে সংশিষ্ট জর্দানী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম বাহিনী সেখানে পৌঁছে অবস্থান নেয়। সেখানেই মুসলিম গুপ্তচররা খবর দিলেন, রোমের কায়সার বালকা অঞ্চলের মায়াব এলাকায়, এক লাখ রোমান সৈন্য সমাবেশ করে রেখেছে। এছাড়া তাদের পতাকাতলে লাখম, জুযাম, বালকিন, বাহরা এবং বালা গোত্রের আরো এক লাখ সৈন্য সমবেত হয়েছে। শেষোক্ত এক লাখ ছিল আরব গোত্রসমূহের সমন্বিত সেনাদল।

মুসলমানরা ধারণাই করতে পারেননি, তারা এমন এক বিশাল ও দুর্ধর্ষ সেনাদলের সম্মুখীন হবেন। মুসলমানরা দূরবর্তী এলাকায় হঠাৎ করেই ভয়াবহ শত্রু পক্ষের সম্মুখীন হয়েছেন। তখন তাদের সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়, তারা কি তিন হাজার সৈন্যসহ দুই লাখ দুর্ধর্ষ সৈন্যের সাথে মুকাবিলা করবেন? বিস্মিত ও চিন্তিত মুসলমানরা দুই রাত পর্যন্ত পরামর্শ করেন। কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিঠি লিখে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হোক। তিনি হয়তো বা বাড়তি সৈন্য পাঠাবেন অথবা অন্য কোনো নির্দেশ দিবেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) দৃঢ়তার সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'হে লোকসকল, আপনারা যা এড়াতে চাইছেন এটা তো সেই শাহাদাত, যার জন্যে আপনারা বেরিয়েছেন। স্মরণ রাখবেন, শত্রুদের সাথে আমাদের মুকাবিলার মাপকাঠি সৈন্যদল, শক্তি এবং সংখ্যাধিক্যের নিরিখে বিচার্য নয়। আমরা সে দ্বীনের জন্যেই লড়াই করি, যে দ্বীন দ্বারা আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন। কাজেই সামনের দিকে চলুন। আমরা দুটি কল্যাণের মধ্যে একটি অবশ্যই লাভ করব। হয়তো আমরা জয় লাভ করব অথবা শাহাদাত বরণ করে আমাদের জীবন ধন্য হবে। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মতের সমর্থনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

মাআন এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী শত্রুদের প্রতি অগ্রসর হয়ে বালকার মাশারেফ নামক জায়গায় হিরাক্লিয়াসের সৈন্যদের মুখোমুখি হন। শত্রুরা আরো এগিয়ে এলে মুসলমানরা মুতা নামক জায়গায় সমবেত হন।
এরপর যুদ্ধের জন্যে সৈন্যদের বিন্যস্ত করা হয়। ডান দিকে কাতাবা আযরীকে (রা.) এবং বাম দিকে ওবাদা ইবনে মালেক আনসারী (রা.) কে নিযুক্ত করা হয়। মুতার রণাঙ্গনের উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের প্রবল হামলার মুকাবিলা করে। বিস্ময়কর ছিল এ যুদ্ধ। দুনিয়ার মানুষ বিস্ফোরিত নেত্রে এ যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঈমানের বসন্ত বায়ু চলতে থাকলে এ ধরনের বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটতে পারে। কোন হিসাব, নিয়ম বা কৌশলে এমন অসমযুদ্ধ হতে পারে না। একবার কল্পনা করলে সহজেই অনুমেয়; কি করে এমন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল?

সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়পাত্র হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) পতাকা গ্রহণ করেন। অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ধরনের বীরত্বের পরিচয় মুসলমান ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হযরত যায়েদ (রা.) এর শাহাদাতের পর হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) পতাকা হাতে তুলে নেন। তিনিও অতুলহীন বীরত্বের পরিচয় দিয়ে লড়াই করতে থাকেন। তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তিনি নিজের সাদা কালো ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে শত্রুদের ওপর আঘাত করতে থাকেন। শত্রুদের তরবারির আঘাতে তার ডান হাত কেটে গেলে, তিনি বাঁ হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। বাঁ হাত কেটে গেলে দুই বাহু দিয়ে যুদ্ধ পতাকা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখেন। শাহাদত বরণ করা পর্যন্ত এভাবে পতাকা ধরে রাখেন। উল্লেখ রয়েছে, একজন রোমান সৈন্য তরবারি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করেন, যাতে তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাকে বেহেশতে দুটি পাখা দান করেছেন। সে পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়ান। এ কারণে তার উপাধি 'জাফর তাইয়ার' এবং জাফর 'যুলজানাহাইন'। তাইয়ার অর্থ উড্ডয়নকারী আর যুলজানাহাইন অর্থ দুই পাখাওয়ালা। (হাদীস)

ইমাম বুখারী নাফে (র.) এর মাধ্যমে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধের দিন হযরত জাফর (রা.) শহীদ হওয়ার পর আমি তার দেহে আঘাতের চিহ্নগুলো গুনে দেখেছি। তার দেহে তীর ও তলোয়ারের পঞ্চাশটি আঘাত ছিল। এসব আঘাতের একটিও পেছনের দিকে ছিল না। অপর এক বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে ছিলাম। জাফর ইবনে আবু তালিবকে সন্ধান করে নিহতদের মাঝে পেয়ে যাই। তার দেহে বর্শা ও তীরের ৯০ টির বেশি আঘাত দেখেছি। নাফে (রা.) থেকে ইবনে ওমর (রা.) এর বর্ণনায় এতোটুকু অতিরিক্ত রয়েছে, আমি এসকল যখম সবই তার দেহের সম্মুখভাগে দেখতে পেয়েছি। এরকম বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের মাধ্যমে হযরত জাফর (রা.) এর শাহাদাত বরণের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) পতাকা গ্রহণ করে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হন।

উল্লেখ আছে হাজার হাজার শত্রু বেষ্টিত ময়দানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। তিনি ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় তাঁর চাচাতো ভাই গোশত লেগে থাকা একটা হাড় তাঁর হাতে দেন। তিনি এক কামড় খেয়ে সময় ক্ষেপণ না করে দূরে ছুঁড়ে ফেলেন। এরপর লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) এর শাহাদাতের পর বনু আজলান গোত্রের সাবেত ইবনে আরকাম (রা.) নামক এক সাহাবী ছুটে গিয়ে পতাকা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, হে মুসলমানরা, তোমরা কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও। সাহাবীরা তাকেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। এরপর সাহাবীরা হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি পতাকা গ্রহণের পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। বুখারীতে স্বয়ং খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, মুতার যুদ্ধের দিন আমার হাতে ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায়। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল। অপর এক বর্ণনায় তাঁর যবানীতে এভাবে উল্লেখ রয়েছে, আমার হাতে মুতার যুদ্ধের দিন ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায় এবং শেষে একটি ছোট সাইজের ইয়েমেনী যুদ্ধাস্ত্র অবশিষ্ট ছিল।

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতার যুদ্ধের দিন রণক্ষেত্রের হুবহু খবর কোনো মাধ্যম ছাড়াই আগে ভাগেই ওহীর মাধ্যমে পেয়ে যান। তিনি মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, যায়েদ পতাকা গ্রহণ করেছে এবং শহীদ হয়ে গেছে। এরপর জাফর পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ এ সময় অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এরপর আল্লাহর তলোয়ারসমূহের একটি তলোয়ার পতাকা গ্রহণ করেছে, তার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের জয়যুক্ত করেছেন। অসীম বীরত্ব, বাহাদুরী এবং কঠিন জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সামনে টিকে থাকা ছিল এক অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর ঘটনা। হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) এ সময় যে বীরত্বের পরিচয় দেন, ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তার মত এমন সেনানায়ক বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।

এ যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। সকল বর্ণনার উপর দৃষ্টিপাত করলে মনে হয়, প্রথম দিনের যুদ্ধে দিনভর হযরত খালিদ (রা.) রোমান সৈন্যদের মুকাবিলায় অবিচল ছিলেন। তিনি সে সময় এক নুতন যুদ্ধকৌশল আবিষ্কার করেছিলেন, যাতে রোমানদের ধোঁকা ও ভয় দেখিয়ে এতটুকু সফলতার সাথে পিছনে নিয়ে আসবেন, যাতে কোনো অবস্থায়ই রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া করার সাহস না পায়। কেননা, তিনি জানতেন, যদি مسلمانরা পলায়ন, আর রোমানরা তাদের ধাওয়া করে, তাহলে তাদের কবল থেকে مسلمانوں রক্ষা করা খুবই কঠিন হবে। পরদিন সকালে হযরত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সেনা দলের বিন্যাসে রদবদল এনে তাদের নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। ডান দিকের সৈন্যদের বাঁ দিকে এবং বাঁ দিকের সৈন্যদের ডান দিকে মোতায়েন করেন। পিছনের সৈন্যদের সামনে আর সামনের সৈন্যদের পিছনে নিয়ে যান। এরূপ সেনা বিন্যাসের দৃশ্য থেকে শত্রুরা বলাবলি করতে থাকে, মুসলমানদের সহায়ক সৈন্য দল এসে গেছে। সুতরাং তাদের শক্তি পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে সেনা পরিচালনায় আনা হয় নতুন কৌশল। ফলে যুদ্ধের পুরো চেহারাই পাল্টে দেয়া হয়। এছাড়া ক্ষিপ্রতার সাথে আক্রমণ, সামনে যাওয়া, পিছে এসে পুনরায় আক্রমণে পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে যায়। প্রতিপক্ষ পুরোটাই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।

এরপর উভয় দল সামনা সামনি হয়ে গেলে কিছুক্ষণ আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। তখন হযরত খালিদ (রা.) নিজ বাহিনীর বিন্যাস সংরক্ষিত রেখে ধীরে ধীরে তাদের পিছিয়ে নিতে থাকেন, কিন্তু রোম সৈন্যরা ভয়ে مسلمانوں পিছু নেয়নি। কারণ তারা ভাবছিল, মুসলমানরা ধোঁকা দিচ্ছে। তারা কোনো চাল চেলে তাদের বিস্তৃত মরুপ্রান্তরে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। ফলে রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া না করে নিজেদের এলাকায় ফিরে যায়। এদিকে مسلمانরা নিরাপদে সফলতার সাথে পিছনে হটে মদীনায় ফিরে আসে। মুতার যুদ্ধে ১২ জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। রোমানদের কত নিহত হয়েছে তার বিবরণ জানা যায়নি। তবে যুদ্ধের বিবরণ পাঠে বুঝা যায়, তাদের বহু নিহত হয়েছিল। কেননা, শুধুমাত্র হযরত খালিদের (রা.) হাতেই তলোয়ার ভেংগেছে নয়টি। অতএব শত্রু সৈন্যদের নিহতের সংখ্যা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এক ও একাশি এর পার্থক্য (১৪৮১) সমন্বিত এ সংঘর্ষেও কাফিররা مسلمانوں উপর জয়ী হতে পারেনি দেখে সমগ্র আরব ও নিকট প্রাচ্যের লোকেরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঠিক এ ব্যাপারটিই সিরিয়া ও তৎসন্নিহিত অর্ধ স্বাধীন আরব গোত্র ও ইরাক নিকটবর্তী নজদী গোত্রসমূহ যারা ইরান সম্রাটের প্রভাবাধীন ছিল তারা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। মুতার যুদ্ধে এক এক করে যায়েদ বিন হরেসা, জাফর বিন আবু তালিব এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহ (রা.) সেনাপতি হিসাবে শহীদ হন।

এর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সৈনিক হতে সেনানায়ক হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বিজয়ী হন। এ যুদ্ধের পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুলাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি সৈন্য পরিচালনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেন। তিনি তাঁর পুরো জীবনে কোন যুদ্ধে কখনই পরাজিত হননি। এ ঘটনা কোন সেনানায়কের জীবনে বিরল।

যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মুতা অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেটা সম্ভব না হলেও এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের সুনাম সুখ্যাতি বহু দূর বিস্তার লাভ করে। সমগ্র আরব জগৎ, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কেননা, রোমানরা ছিল সে সময়ের শ্রেষ্ঠ শক্তি। আরবরা মনে করত রোমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া আত্মহত্যার সামিল। কাজেই, উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ সৈন্যের মুকাবিলা করে সফলভাবে ফিরে আসা অভূতপূর্ব বিস্ময় ছাড়া আর কিছু ছিল না। এ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়, আরব জনগণ তখন পর্যন্ত যে ধরনের লোকদের সম্পর্কে অবহিত ছিল, সে সকল লোক থেকে মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সাথে রয়েছে। তাদের নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃতই আল্লাহর রসূল। এ কারণেই দেখা যায় যে, জেদী ও অহংকারী গোত্রসমূহ যারা লাগাতার مسلمانوں সাথে যুদ্ধে জড়াত, তারা মুতার যুদ্ধের পর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অতএব, বনু সোলায়মান, আশজা, গাতফান, যুবইয়ান ও ফাযারা প্রভৃতি গোত্র মুতার যুদ্ধের পর ইসলাম গ্রহণ করে। মুতার যুদ্ধে রোমানদের সাথে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা রোমান রাজ্যসমূহে مسلمانوں বিজয় এবং দূরদূরান্তের এলাকাসমূহে مسلمانوں কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুতিকাগার হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এ যুদ্ধের পর, مسلمانوں খ্যাতি ও বিরত্বের কথা সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। مسلمانরা হয়ে যায় অজেয় শক্তির নতুন মেরুকরণ।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 তাবুকের যুদ্ধ

📄 তাবুকের যুদ্ধ


পরবর্তী বছরই কাইজার মুসলমানদেরকে 'মুতা' নামক স্থানে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য সিরিয়া সীমান্তে সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তুতির তাৎপর্য জানতে পেরে মুকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। সমসাময়িক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের ঘোষণা দেন আল্লাহর নবী। পূর্বের যুদ্ধবিগ্রহে কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে মুকাবিলা হবে তা কাউকে না জানানোই ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি। অনেক সময় তিনি মদীনা হতে বের হয়ে লক্ষ্যস্থলের দিকে সোজা পথে অগ্রসর না হয়ে বাঁকা পথে অগ্রসর হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি কোন গোপনীয়তা না রেখে স্পষ্ট ভাষায় সকলকে জানিয়ে দিলেন যে, রোম শক্তির সাথে যুদ্ধ হবে এবং সিরিয়ার দিকে যেতে হবে।

মুসলমানদের জন্য এটা ছিল খুবই কঠিন পরীক্ষার সময়। হেজায ভূমিতে চলছিল দুর্ভিক্ষ। জমির শস্য শূন্য, অপরদিকে বাগানের খেজুর পরিপক্ক হয়ে টসটস করছিল। খেজুর পাতার ঝুপড়ি নির্মাণের সময় হয়েছিল। একে তো গ্রীষ্মকাল। তার উপর পথ ছিল অতি দীর্ঘ। শত শত মাইলের পথ, ধূলিঝড় এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বালুকার উপর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ইসলামের জন্য উৎসর্গকারী মুসলমানদের মধ্যে কোন দুর্বলতা ছিল না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পাওয়া মাত্র মুসলমানরা যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহাসমারহে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। মক্কা বিজয়ের পর আরবের বহু গোত্র তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল গোত্রকেই সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানালেন। দলে দলে লোক এসে সৈন্য শ্রেণীতে ভর্তি হতে লাগল। প্রায় চলিশ হাজার সৈন্য সংগৃহীত হল। এত বিরাট বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনার জন্য বহু অর্থের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে অর্থের যোগান ছিল না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থের জন্য সাহাবীদের নিকট আহবান জানালেন। এ আহ্বানে বিপুল সাড়া মিলল। আল্লাহর নামে, ইসলামের পথে সবাই অকাতরে অর্থ সাহায্য করতে লাগলেন। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কে কত দান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলতে লাগল। হযরত ওসমান ও হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করলেন। হযরত ওমর নিজের উপার্জিত সামগ্রীর অর্ধেক এনে পেশ করলেন। হযরত আবু বকর নিজের সমস্ত সম্পদ উৎসর্গ করলেন। আর বললেন, আমি আমার গৃহে আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। দরিদ্র সাহাবীরা কষ্টে শিষ্টে মজুরী করে যা কিছু পেয়েছিলেন তা সবই এনে দিলেন। মহিলারা নিজেদের অলংকার খুলে দিলেন। প্রাণ উৎসর্গকারী স্বেচ্ছা সেবীদের বাহিনী চতুর্দিক হতে জমায়েত হতে লাগল। তারা দাবী করল, অস্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা হলে আমরা আমাদের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

যারা যানবাহন পায়নি তারা কান্নাকাটি করতে লাগলেন এবং এমনভাবে নিজেদের প্রাণের কাতরতা প্রকাশ করতে লাগলেন। যা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে ব্যথা অনুভূত হল। বস্তুতঃ ঈমান ও মুনাফিকীর পার্থক্য সূচিত হওয়ার জন্য এ সময়টি, একটি নির্ভুল মানদ হয়ে দাঁড়াল। এ সময় কারো যুদ্ধ ময়দান হতে দূরে সরে থাকার অর্থই ছিল ইসলামের সাথে তার দূরবর্তী সম্পর্ক। এ জন্যে ঐসব মুনাফিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহী জানিয়ে দেয়া হত।

নবম হিজরীর রজব মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৪০ বা ৩০ হাজার মুজাহিদ নিয়ে সিরিয়ার দিকে রওনা হন। এ বাহিনীতে ছিল দশ হাজার উষ্ট্রারোহী যোদ্ধা। উটের সংখ্যা এতই কম ছিল যে, এক একটি উটের পিঠে একাধিক লোক পালাক্রমে সওয়ার হয়েছিল। এর উপর ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও পানির অভাব। কিন্তু এসব সত্ত্বেও প্রকৃত মুসলমানরা অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বের হন। তাবুকে পৌঁছার পরই মুসলমানরা নগদ ফল লাভ করেন। সেখানে পৌঁছে মুসলীম বাহিনী জানতে পারেন যে, কাইজার গুপ্তচরের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা জেনে প্রত্যক্ষ মুকাবিলায় আসতে সাহস করেনি। সীমান্ত পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে। কারণ মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী, কাফিরের লক্ষাধিক সৈন্যের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সে অবলোকন করেছিল। এ অভিযানে স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে আগাত ৩০ বা ৪০ হাজার সৈন্যের মুকাবিলা করার জন্য এক বা দুই লক্ষ্য সৈন্য নিয়ে ময়দানে আসার মত সাহস রোম সম্রাটের ছিল না। মুসলমানদের রণকৌশল, ঈমানি জোর, সাহস এবং আত্মউদ্দীপনার কাছে রোমদের বিনা যুদ্ধে পরাজয় ঘটে।

কাইজারের এভাবে পালিয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামী শক্তির যে নৈতিক বিজয় সূচিত হয়, তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথেষ্ট মনে করলেন। ফলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অতিক্রম করে সিরিয়া সীমান্তে প্রবেশ করার পরিবর্তে, তাবুকে ২০ দিন অপেক্ষা করে রোম সম্রাজ্য ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ছোট ছোট রাজ্যগুলোতে সামরিক প্রভাব খাঁটিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত করদরাজ্যে পরিণত করে নিলেন। ফলে এর খ্রীষ্টান গোত্রপতি-আকিদার বিন মালেক, আযলার খ্রীষ্টান গোত্রপতি-ইউহানা বিন দুবা এবং মাকনা, জাররা, আজরাহসহ প্রভৃতি স্থানের খ্রীষ্টান দলপতিরা জিজিয়া আদায়ে মদিনা সরকারের আনুগত্য গ্রহণ করে। এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা রোম সাম্রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। পাশাপাশি যেসব লোক তখন পর্যন্ত প্রাচীন জাহেলিয়াতের পুনঃ প্রতিষ্ঠার আশায় দিন গুনছিল, তাদের মেরুদ সম্পূর্ণ চূর্ণ হয়ে যায়। সারা বিশ্বে মুসলমানদের জয়গান ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর শৌর্য বীর্য এবং বিজয় গাঁথার ইতিহাসের বুনিয়াদ রচিত হয় সারা বিশ্বে।

তাবুক হতে বিজয়ী বেশে ফিরে আসার পর চতুর্দিক হতে মহানবীর নিকট শান্তির প্রস্তাব আসতে আরম্ভ করে। বনু তামিম, বনু মুস্তালিক, বনু কিন্দা, বনু আজাদ, বনু তাঈ, প্রভৃতি বহু গোত্র ইসলাম কবুল করে। সুপ্রসিদ্ধ দানবীর হাতেম তাই এর পুত্র আদি বিন হাতেম এ সময় মুসলমান হন। বিখ্যাত কুরাইশ কবি কাব বিন যুহর ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানদের তাবুক হতে বিজয় বেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে মুনাফিকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও (সূরা তওবা: ৯৫)। মুনাফিকদের মধ্যে এমন কিছু লোকছিল, যারা তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ গমনে অপারগতা প্রকাশ করে। উল্লেখ্য তাবুকের জিহাদ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বেশকটি ঘটনা ঘটেছিল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই পথিমধ্যে আল্লাহ তার হাবীবকে মুনাফিকদের বিশদ অবস্থা জানিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা যখন ফিরে এসে তাদের নিকট পৌঁছবে, তখন তারা নানা ওজর পেশ করবে। কিন্তু আপনি বলুন, ওজরের বাহানা করো না। আমরা তোমাদের কোন কথাই বিশ্বাস করি না। আল্লাহ আমাদেরকে, তোমাদের অবস্থা বলে দিয়েছেন (সূরা তওবা : ৯৪)। তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও। তাহলে তোমরা অবশ্যই তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরায়ে নিবে। কেননা, তারা একটা কদর্য জিনিস। আর তাদের আসল স্থান হচ্ছে জাহান্নাম (সূরা তাওবা: ৯৫)। পাশাপাশি আল্লাহ তাবুক যুদ্ধে পিছনে পরে থাকা ঈমানদারদের ব্যাপারে বলেন, অপর তিনজনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটি মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও, তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল। (সূরা তাওবা: ১১৮)

মিথ্যা ঈমানের দাবীদার মুনাফিকদের স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়ার পর, মহান আল্লাহ পিছনে পড়ে থাকা মু'মিনের দু'টি গ্রুপ বা দলের বর্ণনা দেন। একদল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর কিছু লোক রয়েছে, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও একটি মন্দ কাজ। আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন (সূরা আত তওবা: ১০২)। অপর দল প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, কিছু লোক আরো রয়েছে, যাদের ব্যাপারটি আল্লাহর নির্দেশের উপর স্থগিত রয়েছে। তিনি হয়তো তাদের আযাব দিবেন, না হয় তাদের ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আত তাওবা : ১০৬)

এছাড়া বাকী তিনজন প্রসঙ্গে আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে ইঙ্গিত করেন। যারা প্রকাশ্যভাবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেনি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তারা নিজেদের দুর্বলতার কথা সত্য সত্য বলে দেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সমাজচ্যুত করেন। এমনকি তাদের সাথে সালাম কালামের আদান প্রদান পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ ব্যবস্থা নেয়ার পর তাদের অবস্থা যে কিরূপ ভয়াবহ হয়েছিল তা আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলে দিচ্ছেন, অপর তিন জনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটা মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন যখন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল, আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নেই, তখন আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদের দিকে দেখলেন, যাতে তারা ফিরে আসে (সূরা আত তওবা : ১১৮)। এ তিন জন সাহাবী হলেন, হযরত কা'ব বিন মালেক, মুরারা বিন ও হেলান বিন উমাইয়া (রা.)। এ তিনজনই আনসারী সাহাবী ছিলেন এবং বাইয়াতে আকাবা ও বিভিন্ন যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দাওয়াতের কাজ এবং ইসলামের প্রচার তথা দ্বীন রক্ষার প্রয়োজনে সত্যিকারের জিহাদে বা ধর্মীয় যুদ্ধে, কোন মুসলমানই পিছে থাকতে পারবে না।

কেউ যদি তা করে তবে, তা গুরুতর অন্যায়। ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মীয় যুদ্ধে মুজাহিদদের স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়। মুনাফিকরাই বিভিন্ন বাহানা বা কারণ দেখিয়ে জিহাদকে পরিহার করে। এর পরও যদি কোন দুর্বল ঈমানের মুসলমান এমন কাজ করে বসে, তবে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বয়কট করাই যুক্তি যুক্ত। এর পর সেসব দুর্বল ঈমানদারদের জন্য তওবার রাস্তা খোলা থাকবে। আল্লাহ চাইলে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। মহান আল্লাহ যেহেতু ক্ষমার মহাসাগর; তাই সত্যিকারভাবে তওবা করলে এমন গুরুতর পাপও মোচন হওয়া সম্ভব। অতএব দ্বীন প্রচারে, সংগ্রামে, জিহাদে অংশগ্রহণ مسلمانوں জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফরয। এসবই তাবুক অভিযান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্জ

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজ্জ


এক সময় পরিস্থিতি এমন হল যে, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে পূর্ণতা এসে গেছে। আল্লাহর রবুবিয়ত প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং অন্য সবকিছুর প্রভুত্বের বিলোপ সাধন হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রিসালাতের ভিত্তিতে একটি নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসবের অদৃশ্য ঘোষক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেতনা ও মনোজগতে এ অনুভূতি জাগিয়ে দিচ্ছিল, যে পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মু'য়ায (রা.) কে ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় অন্যান্য প্রয়োজনীয় কথা ও উপদেশের পর বলেন, হে মু'য়ায, সম্ভবত এ বছরের পর আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। হয়তো এরপর তুমি আমার মসজিদ এবং কবরের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। হযরত মু'য়ায (রা.) একথা শুনে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে চিরবিদায়ের কথা ভেবে কাঁদতে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলকে দাওয়াত ও তাবলীগের সুফল দেখাতে চাচ্ছিলেন। যে পথে তিনি দীর্ঘ বাইশ বছর দুঃখকষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা চাচ্ছিলেন, তাকে দুঃখকষ্ট ভোগের সুফল দেখানোর ব্যবস্থা এভাবে হোক, তিনি যেন হজ্জের মাধ্যমে মক্কার প্রান্তে আরব গোত্রসমূহের সদস্য এবং প্রতিনিধিদের সাথে সমবেত হতে পারেন। এরপর তারা তাঁর কাছ থেকে দ্বীন ও শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। তিনি তাদের কাছ থেকে এ মর্মে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন, যেন তাঁর উপর অর্পিত আমানত তিনি আদায় করেছেন। আল্লাহর এরূপ ইচ্ছা অনুযায়ী বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন সায়াহ্নে ঐতিহাসিক হজ্জে গমনের ইচ্ছা ঘোষণা করেন। তখন আরব মুসলমানরা দলে দলে মক্কায় পৌঁছতে শুরু করেন। সকলেই মনে-প্রাণে চাচ্ছিলেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদাংক অনুসরণ করে তাঁর আনুগত্য মেনে নিবেন।

অতঃপর দশম হিজরীর শনিবার দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। যিলকদ মাসের তখনো চার দিন বাকি। তিনি মাথায় তেল দেন। চুল আঁচড়ান। তহবন্দ বা লুঙ্গী পরেন। চাদর গায়ে জড়ান। কুরবানীর পশু সজ্জিত করেন এবং যুহরের পর মক্কার দিকে রওনা হন। আসরের আগেই তিনি যুল হুলায়ফা নামক জায়গায় পৌঁছেন। সেখানে আসরের দু'রাকাত নামায আদায় করেন। রাত যাপনের জন্যে তাঁবু স্থাপন করেন। সকালে তিনি সাহাবীদের বলেন, রাতে আমার মহান প্রভুর কাছ থেকে একজন আগন্তুক এসে বলেছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পবিত্র প্রান্তরে নামায আদায় করুন এবং বলুন, হজ্জের মধ্যে ওমরা রয়েছে। এরপর যোহর নামাযের আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরামের জন্যে গোসল করেন। হযরত আয়িশা (রা.) নিজ হাতে তার পবিত্র দেহে যারিরা ও মেশক মিশ্রিত সুগন্ধি লাগান। সুগন্ধির চমক তাঁর সিঁথি এবং পবিত্র দাড়িতে দেখা যাচ্ছিল। তিনি এ খোশবু ধৌত করেননি। যেমন ছিল তেমনি রেখে দেন। এরপর তিনি তহবন্দ (লুঙ্গী) পরিধান করেন। চাদর গায়ে দেন। যুহরের দু'রাকাত নামায আদায় করেন। পরে মোসাল্লায় বসেই একত্রে হজ্জ এবং ওমরার ইহরাম বেঁধে লাব্বায়েক আওয়ায দিয়ে বাইরে আসেন। পরে উটনীতে আরোহণ করে দু'বার লাব্বায়েক বলেন। উটনীতে চড়ে খোলা ময়দানে গিয়ে সেখানেও লাব্বায়েক ধ্বনি উচ্চারণ করেন।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সফর অব্যাহত রাখেন। এক সপ্তাহ পর তিনি এক বিকেলে মক্কার কাছে পৌছে যী-তুওয়া নামক জায়গায় অবস্থান করেন এবং ফজরের নামায আদায়ের পর গোসল করে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেদিন ছিল দশম হিজরীর যিলহজ্জ মাসের চার তারিখ; রোববার। মদীনা থেকে রওনা হওয়ার পর পথে আট রাত অতিবাহিত হয়। স্বাভাবিক গতিতে পথ চললে এরূপ সময়েরই প্রয়োজন হয়। মসজিদে হারামে পৌঁছে তিনি প্রথমে কাবা ঘর তাওয়াফ করেন। এরপর সাফা মারওয়ার মধ্যবর্তী জায়গায় সাঈ করেন, কিন্তু ইহরাম খোলেননি। কেননা তিনি হজ্জ ও ওমরার ইহরাম একত্রে বেঁধেছিলেন এবং নিজের সাথে কুরবানীর পশুও নিয়ে এসেছিলেন। তাওয়াফ এবং সাঈ শেষে তিনি মক্কার হাজুন নামক স্থানে অবস্থান করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার হজ্জের তাওয়াফ ছাড়া কোনো তাওয়াফ করেননি।

তাঁর যে সকল সাহাবী কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসেননি, তিনি তাদের আদেশ দেন, তারা যেন নিজেদের ইহরাম ওমরায় পরিবর্তিত করে নেয় এবং কাবা ঘর তাওয়াফ, সাফা মারওয়ার সাঈ শেষ করে পুরোপুরি হালাল হয়ে যায় কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে হালাল হচ্ছিলেন না, এ কারণে সাহাবীরা সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যা পরে জেনেছি, সেটা যদি আগে জানতাম, তবে কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়ে আসতাম না। যদি আমার সাথে কুরবানীর পশু না থাকত, তবে আমিও হালাল হয়ে যেতাম। একথা শোনার পর সাহাবীরা আনুগত্যে মাথা নত করেন। যাদের কাছে কুরবানীর পশু ছিল না, তারা হালাল হয়ে যান।

যিলহজ্জ মাসের আট তারিখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় গমন করেন। ৯ই যিলহজ্জ তারিখ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। যোহর, আছর, মাগরিব, এশা এবং ফজর এ পাঁচ ওয়াক্ত নামায সেখানে আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। পরে আরাফাত ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর নামেরা প্রান্তরে পৌঁছে তাঁবু প্রস্তুত পান। তিনি সেখানে অবতরণ করেন। সূর্য ঢলে পড়লে তাঁর আদেশে কাসওয়া উটনীর পিঠে আসন লাগানো হয়। তিনি প্রান্তরের মাঝামাঝি স্থানে গমন করেন। সে সময় তাঁর চারদিকে এক লাখ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লাখ মানুষের জনসমুদ্র বিদ্যমান ছিল। তিনি সমবেত জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যাকে বিদায় হজ্জের ভাষণ বলা হয়। বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'হে লোক সকল, আমার কথা শোনো, আমি জানি না, এবারের পর তোমাদের সাথে এ জায়গায় আর মিলিত হতে পারব কিনা।' তোমাদের রক্ত এবং ধন-সম্পদ পরস্পরের জন্যে আজকের দিন, বর্তমান মাস এবং বর্তমান শহরের মতোই নিষিদ্ধ। শোনো, জাহেলিয়াত যুগের সবকিছু আমার পদতলে পিষ্ট করা হয়েছে। জাহেলিয়াতের খুনও খতম করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যেকার প্রথম যে রক্ত আমি শেষ করছি তা হচ্ছে, রবিয়া ইবনে হারেসের পুত্রের রক্ত। এ শিশু বনী সা'দ গোত্রে দুধ পান করছিল। সে সময় হোযারল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। জাহেলী যুগের সুদ খতম করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যেকার প্রথম যে সুদ আমি খতম করছি, তা হচ্ছে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ। এখন থেকে সকল প্রকার সুদ শেষ করে দেয়া হল।

হ্যাঁ, নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর, কেননা তোমরা তাদের আল্লাহর আমানতের সাথে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের এটা অধিকার, তারা তোমাদের বিছানায় এমন কাউকে আসতে দেবে না, যাদের তোমরা পছন্দ কর না। যদি তারা এরূপ করে তবে তোমরা তাদের প্রহার করতে পার। কিন্তু বেশী কঠোর প্রহার কর না। তোমাদের উপর তাদের অধিকার হচ্ছে, তোমরা তাদের ভালোভাবে পানাহার করাবে এবং পোশাক দিবে।

তোমাদের কাছে আমি এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাক, তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। হে লোক সকল, মনে রেখ, আমার পরে কোন নবী নেই। তোমাদের পরে কোন উম্মত নেই। কাজেই নিজ প্রতিপালকের ইবাদাত করবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে, রমযান মাসে রোযা রাখবে, সানন্দ চিত্তে নিজের ধন-সম্পদের যাকাত দিবে, নিজ প্রতিপালকের ঘরে হজ্জ করবে, নিজের শাসকদের আনুগত্য করবে। যদি এরূপ কর, তবে তোমাদের মহান প্রভু তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

তোমাদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা তখন কি বলবে? সাহাবী-রা বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি পূর্ণাঙ্গ তাবলীগ করেছেন, হক পয়গাম পৌছে দিয়েছেন, কল্যাণ কামনার হক পুরোপুরি আদায় করেছেন। এ কথা শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত আঙ্গুল আকাশের দিকে তুলে, লোকদের দিকে ঝুঁকে তিন বার বলেন, ইয়া রাব্বাল আলামীন, তুমি সাক্ষী থেক। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীসমূহ রবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ উচ্চকণ্ঠে মানুষের কাছে পৌছে দিচ্ছিলেন। তিনি ভাষণ শেষ করার পর আল্লাহ তা'আলা কুরআনের আয়াত নাযিল করেন। 'আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।' (সূরা মায়েদা : ৩)। হযরত ওমর (রা.) এ আয়াত শুনে কাঁদতে শুরু করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, কাঁদছি এ জন্যে যে, পূর্ণতার পর তো অপূর্ণতাই শুধু বাকি থাকে। মহান আল্লাহই জানেন, বিশ্বনবীর সে ভাষণ কিভাবে লক্ষাধিক সাহাবী এক ময়দানে দাঁড়িয়ে শুনতে পেয়েছেন। এটাও বিশ্বনবীর একটা মু'জেযা।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাষণের পর হযরত বিলাল (রা.) আযান ও ইকামত দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের নামায পড়ান। এরপর হযরত বিলাল একামত দেন এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় আসরের নামায পড়ান। উল্লিখিত উভয় নামাযের মাঝে অন্য কোনো নামায আদায় করেননি। এরপর উটের পিঠে আরোহণ করে তাঁর অবস্থানস্থলে গমন করেন। সেখানে তিনি কাসওয়া উটনীর পেট চাতালের দিকে করে জাবালে মাশাত (পায়ে চলা লোকদের পথে অবস্থিত বালুকা স্তূপ) সামনে রেখে কিবলামুখী হয়ে লাগাতার (এ অবস্থায়ই) অবস্থান করেন। এমনকি সূর্যাস্ত হয়ে যায়। সূর্যের হলুদ অবস্থা কিছুটা মিলিয়ে গিয়ে অতঃপর সূর্যগোলক পুরোপু-রি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত ওসামা (রা.) কে পিছনে বসান এবং সেখান থেকে রওনা হয়ে মুযদালিফায় গমন করেন। সেখানে মাগরিব ও এশার নামায এক আযানে দুই একামতে আদায় করেন। মাঝখানে কোনো নফল নামায আদায় করেননি। এরপর তিনি শুয়ে পড়েন এবং ফজরের নামাযের সময় পর্যন্ত শায়িত থাকেন। ভোরের আলো উদ্ভাসিত হতেই আযান একামতের সাথে ফজরের নামায আদায় করেন। এরপর উটনীতে সওয়ার হয়ে 'মাশয়ারে হারামে' গমন করে কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহর নামে তাকবীর ধ্বনি দেন; লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং তাওহীদের কালেমা উচ্চারণ করেন। সকালে চারদিক ভালোভাবে ফর্সা হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করেন। এরপর সূর্য ওঠার আগে আগেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে হযরত ফযল ইবনে আব্বাস (রা.) কে নিজের সওয়ারীর পিছনে বসান। 'বাতনে মুহাচ্ছারে' (আবরাহার সৈন্যদের উপর গযব অবতীর্ণ হওয়ার জায়গায়) পৌঁছে সওয়ারী জোরে চালান। এরপর মধ্যবর্তী রাস্তা, যা জামরায়ে কোবরার পথে বেরিয়ে গেছে, সে পথে চলে তিনি জামরায়ে কোবরায় পৌছেন। সে সময় সেখানে একটি গাছ ছিল। জামরায়ে কোবরা সে গাছের পরিচয়েও পরিচিত ছিল। জামরায়ে কোবরাকে জামরায়ে আকাবা এবং জামরায়ে উলাও বলা হত। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করেন। প্রতিবার পাথর নিক্ষেপের সময় তিনি তাকবীর ধ্বনি দিয়েছিলেন। সেগুলো ছোট ছোট পাথরের টুকরো ছিল। বাতনে ওয়াদীতে দাঁড়িয়ে তিনি এসব পাথর নিক্ষেপ করেছিলেন।

এরপর কুরবানীর জায়গায় গিয়ে নিজের হাতে ৬৩টি উট যবাই করেন। এরপর হযরত আলী (রা.) কে বাকি ৩৭টি উট যবাই করতে দেন। এভাবে একশ উট কুরবানী করা হয়। হযরত আলী (রা.) কেও তিনি নিজের কুরবানীতে শামিল করে নেন। এরপর তাঁর আদেশে প্রত্যেক উট থেকে এক টুকরো করে গোশত নিয়ে একটি হাঁড়িতে রান্না করা হয়। তিনি এবং হযরত আলী (রা.) সে গোশত থেকে কিছু আহার করেন। তিনি গোশতের কিছু ঝোলও পান করেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীতে আরোহণ করে মক্কা মুয়াযযামায় গমন করে বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করেন। এ তাওয়াফকে বলা হয় তাওয়াফে এফাযা। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহরের নামায মক্কায় আদায় করেন। এরপর যমযম কূপের পাড়ে বনু আবদুল মুত্তালিবের কাছে গমন করেন। এ গোত্র হাজীদের যমযমের পানি পান করাচ্ছিলেন।

সেখানে তিনি বলেন, হে বনু আবদুল মুত্তালিব, তোমরা পানি উত্তোলন কর। পানি উত্তোলনের কাজে অন্য লোকেরা তোমাদের পরাজিত করে দেবে, যদি এ আশংকা পোষণ না করতাম তবে আমিও তোমাদের সাথে পানি উত্তোলন করতাম। সাহ- াবীরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পানি তুলতে দেখলে তারাও পানি তোলার চেষ্টা করতেন। ফলে হাজীদের পানি পান করানোর যে গৌরব এককভাবে বনী আবদুল মুত্তালিবের ছিল, সে ব্যবস্থা আর তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকত না। অতঃপর বনু আবদুল মুত্তালিবের লোকেরা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক বালতি পানি দেন এবং তিনি প্রয়োজনমত তা থেকে পান করেন।

সেদিন ছিল কুরবানীর দিন অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন চাশতের সময় একটি খোতবা প্রদান করেন। সে সময় তিনি খচ্চরের পিঠে আরোহিত ছিলেন। হযরত আলী (রা.) তার বক্তব্য সমবেত সাহাবীদের শোনাচ্ছিলেন। তাদের কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেদিনের ভাষণেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগের দিনের বক্তব্যের কিছু কিছু পুনরুল্লেখ করেন। বুখারী এবং মুসলিম শরীফে হযরত আবু বকর (রা.) এর বর্ণনায় রয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমে নহর অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্জ তারিখে আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি বলেন, 'যুগ ঘুরে ফিরে সে দিনের আকৃতিতে পৌছে গেছে। যে দিন আল্লাহ তা'আলা আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন। বারো মাসে এক বছর। এর মধ্যে চার মাস হচ্ছে হারাম। যার তিনটি একের পর এক আসে। যথা যিলকদ, যিলহজ্জ এবং মহররম। অন্য একটি মাস হচ্ছে জমাদিউস সানী এবং শাবান মাসের মাঝামাঝি, সে মাসের নাম রজব।' এরপর আবু বকর বর্ণনা করেন; মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করেন, এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রসূলই ভালো জানেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। আমরা তখন বুঝলাম, তিনি এ মাসের অন্য কোনো নাম রাখবেন। কিন্তু তিনি বললেন, এটি কি যিলহজ্জ মাস নয়? আমরা বললাম, কেন নয়? তিনি বললেন, এটা কোন শহর? আমরা বললাম আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। আমরা ভাবলাম, তিনি এ শহরের অন্য কোনো নাম রাখবেন, কিন্তু তিনি বললেন, এটি কি মক্কা শহর নয়? আমরা তখন বললাম, কেন নয়? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দিনের পরিচয় কি? আমরা বললাম, আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। আমরা ভাবলাম, তিনি এ দিনের অন্য কোনো নাম রাখবেন, কিন্তু তিনি বললেন, এ দিন কি ইয়াওমুন নহর (কুরবানীর দিন) - ১০ই যিলহজ্জ নয়? আমরা বললাম, কেন নয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আচ্ছা তবে শোন; তোমাদের রক্ত, তোমাদের অর্থ-সম্পদ এবং তোমাদের ইযযত, আবরু, পরস্পরের জন্যে এরূপ নিষিদ্ধ ও সম্মানযোগ্য, যেমন তোমাদের এ শহর, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের আজকের এ দিন তোমাদের জন্যে সম্মানযোগ্য। তোমরা তোমাদের প্রভুর সাথে শীঘ্রই মিলিত হবে এবং তোমাদের নিজ নিজ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। কাজেই লক্ষ্য রেখ, আমার পরে তোমরা এমন পথভ্রষ্ট হয়ো না যে, একে অন্যের ঘাড় মটকাতে শুরু করে দাও?। বল, আমি কি তাবলীগ করেছি? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেক। যে ব্যক্তি এখানে উপস্থিত রয়েছে তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিবে। কেননা উপস্থিত অনেকের চেয়ে অনেক অনুপস্থিত ব্যক্তি আমার এ বক্তব্য অধিক হৃদয়ংগম করবে।

এক বর্ণনায় রয়েছে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ভাষণে একথাও বলেছেন, 'স্মরণ রেখ', অপরাধী নিজের উপরই অপরাধ করে। সে নিজেই অপরাধের জন্যে দায়ী হবে। স্মরণ রেখ, কোনো অপরাধী পুত্র, নিজের পিতার উপর, কোনো অপরাধী পিতা, নিজের পুত্রের উপর অপরাধ করতে পারে না। পিতার অপরাধের জন্যে পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধের জন্যে পিতাকে পাকড়াও করা হবে না। স্মরণ রেখ শয়তান এ মর্মে হতাশ হয়ে গেছে, এ শহরে আর কখনো তার উপাসনা করা হবে না। তবে নিজেদের যেসব কাজ তোমরা তুচ্ছ মনে করবে, সেসব শয়তানের আনুগত্যে সম্পন্ন হবে এবং তা দ্বারাই শয়তান সন্তুষ্টি লাভ করবে।

এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে তাশরীকে (১১, ১২ ও ১৩ই যিলহজ্জ) মিনায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি হজ্জের রীতিসমূহ পালন করেন। সে সাথে জনসাধারণকে শরীয়তের হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেন। আল্লাহর যিকির করেন। মিল্লাতে ইব্রাহীমের সুন্নতসমূহ কায়েম করেন। শিরকের নিদর্শনসমূহ নির্মূল করেন। আইয়ামে তাশরীকের একদিন তিনি এ ভাষণ দেন। আবু দাউদে এ বর্ণনা রয়েছে। হযরত ছারা বিনতে বিনহান (রা.) বলেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রউসের দিন আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং বলেন, এ দিন কি আইয়ামে তাশরীকের মাঝখানের দিন নয়? তাঁর সেদিনের ভাষণও ছিল পূর্বের (কুরবানীর দিনের) ভাষণের অনুরূপ। এ ভাষণ সূরা নাসর নাযিল হওয়ার পর দেয়া হয়েছিল।

তাশরীকের শেষদিনে ১৩ যিলহজ্জ ইয়াওমুন নফরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনা থেকে রওনা করেন এবং আতবাহ উপত্যকার খায়ফে বনী কেনানায় অবতরণ করেন। দিনের বাকি অংশ এবং রাত সেখানেই কাটান। যুহর, আসর, মাগরিব ও এশার নাময সেখানেই পড়েন। অবশ্য এশার পরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেন এবং উঠে সওয়ার হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে গমন করে বিদায়ী তাওয়াফ করেন। হজ্জের যাবতীয় কাজ শেষে তিনি সওয়ারী মদীনাভিমুখে চালনা করেন। মদীনায় পৌঁছে তিনি বিশ্রাম নিবেন; উদ্দেশ্যে এমন ছিল না। বরং সেখানে গিয়ে আল্লাহর পথে ব্যাপক দাওয়াত ও তাবলীগ এবং নতুন সংগ্রাম সাধনার সূচনা করবেন- এটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সামরিক অভিযান

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সামরিক অভিযান


সমগ্র আরবে ইসলামের জয় জয়কার রব উঠে। সারা বিশ্ব শংকিত হয়। সুবিস্তৃত রোম সাম্রাজ্যের শাসকবর্গ ইসলাম এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের বেঁচে থাকার অধিকার মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। এ কারণে রোম সম্রাটের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কারো ইসলাম গ্রহণ করা ছিল বিপদজনক। রোমের গভর্নর ফারওয়া ইবনে আমর জুযামীর ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা অন্যদের জন্যেও প্রবল ছিল। রোমের শাসকদের এ ধরনের ঔদ্ধত্য এবং অহঙ্কারপূর্ণ আচরণের কারণে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাদশ হিজরীর সফর মাসে এক বিরাট বাহিনী তৈরীর কাজ শুরু করেন। বিশ্বনবী হযরত ওসামা ইবনে যায়েদ (রা.) কে এ বাহিনীর সেনাপতি পদে নিযুক্তি দিতে আদেশ দেন। বলেন, বালকা এলাকা এবং দারুমের ফিলিস্তিনী ভূখ সওয়ারদের মাধ্যমে নাস্তানাবুদ করে এসো। রোমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের মনে সাহস সঞ্চার করাই ছিল সে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, গির্জার বাড়াবাড়ি এবং স্বেচ্ছাচারিতার সামনে কথা বলার কেউ ছিল না। তাছাড়া একথা সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে, ইসলাম গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে নিজের মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানান। সার্বিক বিবেচনায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের বড় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।

হযরত ওসামাকে (রা.) সেনাপতি নিযুক্ত করার কারণে কেউ কেউ সমালোচনা করে এ অভিযানে অংশ গ্রহণে বিলম্ব করেন। এ অবস্থা লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা যদি ওসামার সেনাপতিত্বের প্রশ্নে সমালোচনামুখর হও, তবে তো বলতেই হয়, ইতোপূর্বে তার পিতাকে সেনাপতি নিযুক্ত করার সময়েও তোমরা সমালোচনামুখর হয়েছিলে। অথচ আল্লাহর শপথ, যায়েদ ছিল সেনাপতি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন। এছাড়া সে ছিল আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। যায়েদের পর ওসামাও আমার প্রিয়ভাজনদের অন্যতম। তখন সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হযরত ওসামার (রা.) আশপাশে সমবেত হয়ে তাঁর বাহিনীতে শামিল হন। এ বাহিনী রওনা হয়ে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে মাকাতে যরফ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। অবশ্য বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা সম্পর্কে উদ্বেগজনক খবর পেয়ে তারা সামনে অগ্রসর হননি। আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় তারা সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকালের পর ওসামার মিশন সাময়িক স্থগিত রেখে সবাই মদীনায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে আবু বকরের (রা.) খিলাফতের সময় এ অভিযান পুনরায় প্রেরণ করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00