📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন

📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন


মক্কা বিজয় ছিল মূলত একটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান। এর ফলে আরববাসীদের সামনে মূর্তিপূজার অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে তার অবসান ঘটে। সমগ্র আরবের জন্যে সত্য মিথ্যা চিহ্নিত হয়ে যায়। তাদের মনোজগৎ থেকে সন্দেহ সংশয়ের অবসান ঘটাতে থাকে। এ কারণে মক্কা বিজয়ের পর তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে।

হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমরা একটি কূপের ধারে বাস করতাম, তার পাশ দিয়ে কাফেলা চলাচল করত। আমরা তাদের লোকদের এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। তিনি কেমন তা জানতে চাইতাম। তারা বলত, মনে করেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে ওহী পাঠান হয় এবং সে ওহীতে আল্লাহ তা'আলা এরূপ এরূপ বলেন। হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমি সেসব কথা শুনতাম। কথাগুলো আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের জন্যে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা বলত, তাঁকে এবং তাঁর কওমকে বা জাতিকে ছেড়ে দাও। যদি তিনি নিজের কওমের উপর জয় লাভ করেন তাহলে বুঝা যাবে, তিনি সত্য নবী। অতঃপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে। সকল কওম ইসলাম গ্রহণের জন্যে অগ্রসর হয়। আমার পিতাও আমার কওমের কাছে ইসলামের শিক্ষা নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর সত্য নবীর কাছ থেকে এসেছি। তিনি বলেন, অমুক অমুক নামায আদায় কর। নামাযের সময় হলে তোমাদের মধ্য থেকে একজন যেন আযান দেয়। এরপর তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি বেশী পরিমাণ কুরআন জানেন, তিনি যেন ইমামতি করেন।

এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মক্কা বিজয়ের ঘটনা পরিস্থিতির পরিবর্তনে ইসলামকে শক্তিশালী করেছিল। আরববাসীদের ভূমিকা নির্ধারণে এবং ইসলামের সামনে তাদের অস্ত্র সমর্পণে মক্কা বিজয় এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাবুকের যুদ্ধের পর এ অবস্থা আরো শক্তিশালী রূপ নেয়। এ কারণে দেখা যায় যে, নবম ও দশম হিজরীর দুই বছরে মদীনায় বহু প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। সে সময় মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে মক্কা বিজয়ের সময় যেখানে مسلمانوں সংখ্যা ছিল দশ হাজার, অথচ এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তবুকের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়। বিদায় হজ্জের সময় দেখা যায়, مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার, মতান্তরে ২ লাখ। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারপাশে তাঁরা লাব্বাইক ধ্বনি দিচ্ছিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিলেন। পাহাড়-পর্বতে, মাঠে-প্রান্তরে তাওহীদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এভাবেই মক্কা বিজয়ের পর খুব দ্রুত ইসলামের প্রচার, প্রসার ও দাওয়াত ও তাবলীগের কল্পনাতীত অগ্রগতি সাধিত হয়। মক্কা বিজয়ের মধ্যদিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জিত হতে থাকে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 হুনাইনের যুদ্ধ

📄 হুনাইনের যুদ্ধ


'হুনাইন' মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মক্কা হতে প্রায় দশ মাইল দূরে। পূর্বেই মক্কা বিজয়ের প্রভাব সমগ্র আরব গোত্রের উপর পড়েছিল। অধিকাংশ আরব গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মুসলমানরা মক্কার কুরাইশদের পরাজিত করলেও প্রাচীন জাহেলী শক্তি হুনাইনের প্রান্তরে অবস্থানকারী দুর্ধর্ষ হাওয়াজিন, সাকীফ, নজর, জুশম এবং অন্যান্য জাহেলিয়াতপন্থি গোত্র ও কবিলার লোকেরা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। مسلمانوں এ বিজয় তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ইসলামের দাওয়াত, প্রচার-প্রসার ও বিপবী আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য তারা সংঘবদ্ধ হয় এবং তাদের আশেপাশের অন্যান্য গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানায়। এ সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করে মালিক বিন আউফ। সে সবাইকে তাদের স্ত্রী পুত্র, চতুষ্পদ জন্তু ও মাল সম্পদসহ যুদ্ধের ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল, যেন দলের লোকেরা নিজেদের পরিবার পরিজন ও মাল সম্পদের লোভে হলেও যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে না যায়।

পবিত্র মক্কা অধিকার করার পর মুসলমানরা তাদেরকে আক্রমণ করতে পারে- এ আশংকায় কাফিদের সকল গোত্র মিলে কালবিলম্ব না করে مسلمانوں বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আয়োজন করেছিল। কাফিররা 'আওতান' নামের একটি মাঠের সংকীর্ণ স্থানে সমবেত হয়ে। সংবাদ শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াতাড়ি তাঁর সৈন্য বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। মদীনা হতে আগত দশ হাজারের সাথে নব দীক্ষিত দু'হাজার কুরাইশ বীরও যোগ দেয়।

বিস্ময়ের ব্যাপার ঐ সৈন্যের মধ্যে আবু জেহেলের পুত্রদ্বয়, আবু সুফিয়ান এবং প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবৃন্দও ছিলেন। কী অপূর্ব পরিবর্তন: সারা জীবন যারা কাফিরদের নেতারূপে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তারাই আজ বিশ্বনবীর ভক্তরূপে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। মহান প্রতিপালক যেমনটি চান তাই হয়। বিশ্বনবী মা'আয বিন জাবালকে মক্কার মুয়াল্লিম এবং খাত্তাব বিন আসাদ কে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে ১২ হাজার সৈন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হন। সংখ্যায়, যুদ্ধোপকরণে মাল সম্পদে পূর্বের তুলনায় মুসলমানরা ছিল সমৃদ্ধ। কে তাদের বিজয় ঠেকায়? ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে কিছুটা অহংকারের ভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু আল্লাহ অলক্ষ্যে এ কথা শুনতে পেয়ে তাদের উপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানরা 'হুনাইন' নামক স্থানে পৌঁছে রাত যাপন করে। এ সংবাদ জানতে পেরে শত্রু সৈন্যরা প্রস্তুত হয়ে পথের দু'ধারের পর্বতগুলোতে আত্মগোপন করে থাকে। ফলে মুসলিম বাহিনী যখন হুনাইন প্রান্তর অতিক্রম করতে যায়। হঠাৎ পথের দু'ধার হতে হাওয়াজিনরা বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ করতে থাকে। মহাবিপদ আসন্ন। অপ্রস্তুত ও অসতর্ক অবস্থায় কী করবে তারা? দিশেহারা হয়ে মুসলিম বাহিনী যে যেদিকে পারে পালাতে আরম্ভ করে।

মুসলমানদের সকল অহংকার পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। এমন অপ্রত্যাশিতভাবে তাদেরকে যে এ হীন লজ্জাকর পরাজয় বরণ করতে হবে, সেটি তারা ভাবেনি। এতদিন সংখ্যায় অল্প হয়ে বহু সংখ্যক শত্রু সেনাকে জয় করার অভিজ্ঞতা মুসলমানরা অর্জন করেছিল। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের যে শক্তি নেই- এ সত্য তারা কোন দিনই প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেনি। সেদিন পার্থিব শক্তির অহংকারী মুসলমান, নিজে থেকে সে সত্য হৃদয়ঙ্গম করে। মুসলমানরা পরিষ্কার বুঝতে পারে অল্প সংখ্যক হলেই যে কোন দল বা জামাত পরাজিত হয়-তাও যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে জয়লাভ করা যায়- তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়ের পিছে কাজ করে অন্য এক রহস্য। অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রস্থানের সময় হযরত আব্বাস (রা.), মুহাজির ও আনসারদেরকে বিশ্বনবীর চতুর্পাশে সমবেত হওয়ার জন্য উচ্চস্বরে আহ্বান জানান। এ আহবানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী একত্রিত হয়ে বীর বিক্রমে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে।

এভাবে সকলে একত্রিত হয়ে প্রচণ্ড বেগে কাফিরদেরকে আক্রমণ করে। এতে করে হাওয়াজিন ও সাকীফ গোত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। তারা এমনভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে থাকে যে, রসদ পত্র তো দূরের কথা, নিজেদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে সাথে নিয়ে যেতেও ভুলে যায়। ফলে গনীমতের মাল হিসেবে ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী, প্রচুর সোনা-রূপা মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়। ছয় হাজার শত্রু সৈন্য বন্দী হয়।

হুনাইন অভিযানে মক্কার কাফিরদের মাঝে অসংখ্য সাধারণ নর-নারী, যুদ্ধের দৃশ্য উপভোগের জন্য বের হয়ে আসে। তাদের ধারণা ছিল, এ যুদ্ধে মুসলিম সেনারা হেরে গেলে, তাদের পক্ষে প্রতিশোধ নেয়ার একটা ভাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর তারা জয়ী হলেও তাদের তেমন কোন ক্ষতি নেই। এ মনোভাবাপন্ন লোকদের মধ্যে শায়বা বিন ওসমানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যিনি পরে মুসলমান হয়ে নিজের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধে আমার পিতা হযরত হামযার (রা.) হাতে এবং আমার চাচা হযরত আলীর (রা.) হতে নিহত হয়। ফলে অন্তরে প্রতিশোধের যে আগুন জ্বলছিল তা বর্ণনার বাইরে। আমি হুনাইনের এ অভিযানকে অপূর্ব সুযোগ মনে করে مسلمانوں সহযাত্রী হলাম। যেন মওকা পেলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আক্রমণ করতে পারি। তাই আমি তাদের সাথে থেকে সদা সুযোগের সন্ধানে ছিলাম। এক সময় যখন পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং যুদ্ধের সূচনায় দেখা যায় مسلمانরা হতোদ্যম হয়ে পালাতে শুরু করেছে, তখন আমি এ সুযোগে তড়িৎবেগে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছি। কিন্তু দেখি যে, তার ডানদিকে হযরত আব্বাস (রা.) ও বাম দিকে আবু সুফিয়ান, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ রক্ষিরূপে রয়েছেন। এজন্য পিছন দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁর কাছে পৌঁছি এবং সংকল্প করি যে, তরবারির অতর্কিত আঘাত হেনে তাঁকে হত্যা করব (নাউযু বিল্লাহ)। ঠিক এ সময় আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ হয় এবং আমাকে ডাক দিয়ে তিনি বলেন, শায়বা! এদিকে এসো। আমি তাঁর পাশে গেলে তাঁর পবিত্র হাত আমার বুকের উপর রাখেন আর দোয়া করেন। হে আল্লাহ! ওর থেকে শয়তানকে দূর করে দাও। অতঃপর আমি যখন দৃষ্টি উঠাই তখন আমার চোখ, কান ও প্রাণ থেকেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক প্রিয় মনে হয়। তারপর তিনি আদেশ দেন, যাও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। আমার তখন এমন অবস্থা হল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। তাই কাফিরদের সাথে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করি। যুদ্ধ শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলে তার খেদমতে হাজির হই। তিনি আমার মনের গোপন দূরভিসন্ধি প্রকাশ করে বলেন, মক্কা থেকে মন্দ উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছিল। আর আমাকে হত্যার জন্য আশে পাশে ঘুরছিলে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তোমার দ্বারা সৎ কাজ করানো, পরিশেষে তাই হল। একই ধরনের ঘটনা ঘটে নযর বিন হারিসের সাথে। তিনিও অনুরূপ উদ্দেশ্যে হুনাইন গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আল্লাহ তার অন্তরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালবাসা প্রবিষ্ট করান। ফলে একজন মুসলিম যোদ্ধারূপে কাফিরদের মুকাবিলা করেন।

হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারের দরুন প্রথমে তাদের পরাজয় দেখা দেয়। পরবর্তীতে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বিজয় সূচিত হয়। সে অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ইতোপূর্বে অনেক ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন। সে দিন হুনাইনের যুদ্ধের দিন যখন তোমাদের সংখ্যা বিপুলতার অহংকার ও অহমিকা ছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজেই আসেনি। যমীন বিশালতা সত্ত্বেও তোমাদের পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পশ্চাদপসারণ করে পালাতে লাগলে (সূরা তাওবা: ২৫)। অতঃপর আল্লাহ তার শান্তির অমিয় ধারা তার রাসূল ও মু'মিনদের উপর বর্ষণ করলেন। আর সে বাহিনীও পাঠালেন, যা তোমরা দেখতে পেলে না। আর তিনি কাফিরদের শাস্তি দান করলেন। কেননা, এটাই কাফিরদের প্রতিফল। (সূরা আত তাওবা: ২৬)

হুনাইন যুদ্ধের প্রথম আক্রমণে যে সকল সাহাবী আপন স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোবল ফিরে পাবার পর স্ব স্ব অবস্থানে ফিরে আসেন। আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ অবস্থানে সুদৃঢ় হন। সাহাবীদের প্রতি সান্ত্বনা প্রেরণের অর্থ হল, তারা বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন। এতে বুঝা গেল যে, আল্লাহর সান্ত্বনা ছিল দু'প্রকার। এক প্রকার পলায়নরত সাহাবীদের জন্য, আর অন্য প্রকার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যারা সুদৃঢ় ছিলেন তাদের জন্য। ওহুদ ও হুনাইন-দু'টিই مسلمانوں যথার্থ শিক্ষার ক্ষেত্র। ওহুদে তারা জয়ী হয়ে পরবর্তীতে পরাজিত হয়েছিল। হুনাইনে প্রথমে পরাজিত হয়ে, পর মুহূর্তেই জয়ী হয়েছিল। ওহুদে শিখেছে নেতার আদেশ লঙ্ঘন করার শোচনীয় পরিণাম। অপরদিকে হুনাইনে শিখেছে অহংকার করার মারাত্মক কুফল। সাথে সাথে ঈমানের পরীক্ষাও এ দু'স্থানে ভীষণভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর সাহায্য ও করুণা ব্যতীত কোন কিছুই যে সম্ভব নয়- এ সত্যটি উভয় স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুসলমানরা এ সত্যটি হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছে যে, অল্প সংখ্যক হলেই যে দল বা জামাত পরাজিত হয়-তা যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে, দল বা জামাত জয়লাভ করে তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়; সম্মান-লাঞ্ছনা, লাভ-ক্ষতি উন্নতি-অবনতি; সফলতা ধ্বংস; সবকিছুই মহান আল্লাহর হাতে। মহান প্রতিপালক যেভাবে, যখন, যা চান- সেভাবে, তখন তাই হয়। মহান আল্লাহ মহাক্ষমতাবান।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মূতার যুদ্ধ

📄 মূতার যুদ্ধ


মুসলমানদের সাথে রোমান সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ মক্কা বিজয়ের পূর্বেই শুরু হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হুদাইবিয়ার সন্ধির পর দ্বীন ইসলামকে প্রচারের উদ্দেশ্যে উত্তর দিকে একটি দল সিরিয়া সংলগ্ন বিভিন্ন গোত্রের নিকট পাঠান। দাওয়াত ও তাবলীগের জামাতটি হিজরত করতে থাকে। কিন্তু 'জাতুত তালাহ' নামক স্থানে মুসলিম জামাতের ১৫ জনকে হত্যা করা হয়। এ সময়ে বসরা অধিপতি শুরাহবিলের নিকট ইসলামের দাওয়াতপত্র প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র বাহক হারিস বিন উমাইরকে (রা.) হত্যা করে। এসব কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরী জমাদিউল আউয়াল মাসে ৩ হাজার মুজাহিদের এক বাহিনী সিরিয়া সীমান্তে পাঠান। এ বাহিনী 'ময়ান' নামক স্থানে পৌঁছলে জানা যায় যে, শুরাহবিল এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। অথচ এরূপ ভয়বহ খবর সত্ত্বেও ৩ হাজার প্রাণ উৎসর্গকারী মুসলিম বাহিনী সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে এবং 'মুতা' নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। আশ্চর্যজনক হলেও শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের জয় সাধিত হয়।

মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এ জায়গা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের দূরত্ব মাত্র দুই মনযিল। এখানেই মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় মুসলমানরা যেসব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, এ যুদ্ধ ছিল সেসবের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। এ যুদ্ধই মুসলমানদের খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশসমূহ জয়ের পথ খুলে দিয়েছিল। অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল অর্থাৎ ৬২৯ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ অভিযানের কারণ খুবই স্পষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রা.) কে একখানি চিঠিসহ বোসরার গভর্নরের কাছে প্রেরণ করেন। রোমের কায়সারের গভর্নর শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানী সে সময় বালকা এলাকায় নিযুক্ত ছিল। এ দুর্বৃত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দূতকে গ্রেফতার এবং শক্তভাবে বেঁধে হত্যা করে। যেহেতু রাষ্ট্রদূত বা সাধারণ দূতদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক নিয়মেই গুরুতর অপরাধ। সেহেতু এটা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল। এমনকি এর চেয়েও গুরুতর অপরাধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত হত্যার খবর শোনার পর খুবই মর্মাহত হন। এ কারণে তিনি সে এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্যে সৈন্যদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী তৈরী করা হয়। খন্দকের যুদ্ধ ছাড়া ইতোপূর্বে অন্য কোনো যুদ্ধেই মুসলমানরা তিন হাজার সৈন্য সমাবেশ করেননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) কে এ সেনাদলের সেনাপতি মনোনীত করে বলেন, যায়েদ যদি শহীদ হয়, তবে জাফর (রা.) এবং জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) সিপাহসালার দায়িত্ব পালন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সেনাদলের জন্যে সাদা পতাকা তৈরী করে তা হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার (রা.) হাতে দেন। সৈন্যদলকে তিনি ওসীয়ত করেন, তারা যেন হারেস ইবনে ওমায়রের হত্যাকারে জায়গায় স্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তো ভালো। তা না হলে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে, আল্লাহর সাহায্যে কুফরকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। খেয়ানত করবে না। কোনো নারী, শিশু, অতীব বৃদ্ধ এবং গির্জায় অবস্থানকারী দুনিয়া পরিত্যাগকারীকে হত্যা করবে না। খেজুর এবং অন্য কোনো গাছ কাটবে না। কোন অট্টালিকা ধ্বংস করবে না।

মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সর্বসাধারণ মুসলমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোনীত সেনানায়কদের সালাম এবং বিদায় জানান। সে সময় অন্যতম সেনানায়ক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) কাঁদছিলেন।
তাঁকে এ সময় কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বা তোমাদের সাথে সম্পর্কের কারণে আমি কাঁদছি না।

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনে জাহান্নামের ভয়ে কাঁদছি। সে আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে, এটা তোমাদের প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।' (সূরা মারইয়াম : ৭১)। আমি জানি না, জাহান্নামে প্রবেশের পর ফিরে আসব কিভাবে? মুসলমানরা বলেন, আল্লাহর শান্তি ও নিরাপত্তা আপনাদের সঙ্গী হোক। আপনাদের হিফাযত করুন এবং গনীমতের মালসহ আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনুন। উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মুসলিম সৈন্যরা মাআন নামক এলাকায় পৌঁছেন। এ স্থান ছিল হেজাযের সাথে সংশিষ্ট জর্দানী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম বাহিনী সেখানে পৌঁছে অবস্থান নেয়। সেখানেই মুসলিম গুপ্তচররা খবর দিলেন, রোমের কায়সার বালকা অঞ্চলের মায়াব এলাকায়, এক লাখ রোমান সৈন্য সমাবেশ করে রেখেছে। এছাড়া তাদের পতাকাতলে লাখম, জুযাম, বালকিন, বাহরা এবং বালা গোত্রের আরো এক লাখ সৈন্য সমবেত হয়েছে। শেষোক্ত এক লাখ ছিল আরব গোত্রসমূহের সমন্বিত সেনাদল।

মুসলমানরা ধারণাই করতে পারেননি, তারা এমন এক বিশাল ও দুর্ধর্ষ সেনাদলের সম্মুখীন হবেন। মুসলমানরা দূরবর্তী এলাকায় হঠাৎ করেই ভয়াবহ শত্রু পক্ষের সম্মুখীন হয়েছেন। তখন তাদের সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়, তারা কি তিন হাজার সৈন্যসহ দুই লাখ দুর্ধর্ষ সৈন্যের সাথে মুকাবিলা করবেন? বিস্মিত ও চিন্তিত মুসলমানরা দুই রাত পর্যন্ত পরামর্শ করেন। কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিঠি লিখে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হোক। তিনি হয়তো বা বাড়তি সৈন্য পাঠাবেন অথবা অন্য কোনো নির্দেশ দিবেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) দৃঢ়তার সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'হে লোকসকল, আপনারা যা এড়াতে চাইছেন এটা তো সেই শাহাদাত, যার জন্যে আপনারা বেরিয়েছেন। স্মরণ রাখবেন, শত্রুদের সাথে আমাদের মুকাবিলার মাপকাঠি সৈন্যদল, শক্তি এবং সংখ্যাধিক্যের নিরিখে বিচার্য নয়। আমরা সে দ্বীনের জন্যেই লড়াই করি, যে দ্বীন দ্বারা আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন। কাজেই সামনের দিকে চলুন। আমরা দুটি কল্যাণের মধ্যে একটি অবশ্যই লাভ করব। হয়তো আমরা জয় লাভ করব অথবা শাহাদাত বরণ করে আমাদের জীবন ধন্য হবে। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মতের সমর্থনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

মাআন এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী শত্রুদের প্রতি অগ্রসর হয়ে বালকার মাশারেফ নামক জায়গায় হিরাক্লিয়াসের সৈন্যদের মুখোমুখি হন। শত্রুরা আরো এগিয়ে এলে মুসলমানরা মুতা নামক জায়গায় সমবেত হন।
এরপর যুদ্ধের জন্যে সৈন্যদের বিন্যস্ত করা হয়। ডান দিকে কাতাবা আযরীকে (রা.) এবং বাম দিকে ওবাদা ইবনে মালেক আনসারী (রা.) কে নিযুক্ত করা হয়। মুতার রণাঙ্গনের উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের প্রবল হামলার মুকাবিলা করে। বিস্ময়কর ছিল এ যুদ্ধ। দুনিয়ার মানুষ বিস্ফোরিত নেত্রে এ যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঈমানের বসন্ত বায়ু চলতে থাকলে এ ধরনের বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটতে পারে। কোন হিসাব, নিয়ম বা কৌশলে এমন অসমযুদ্ধ হতে পারে না। একবার কল্পনা করলে সহজেই অনুমেয়; কি করে এমন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল?

সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়পাত্র হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) পতাকা গ্রহণ করেন। অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ধরনের বীরত্বের পরিচয় মুসলমান ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হযরত যায়েদ (রা.) এর শাহাদাতের পর হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) পতাকা হাতে তুলে নেন। তিনিও অতুলহীন বীরত্বের পরিচয় দিয়ে লড়াই করতে থাকেন। তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তিনি নিজের সাদা কালো ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে শত্রুদের ওপর আঘাত করতে থাকেন। শত্রুদের তরবারির আঘাতে তার ডান হাত কেটে গেলে, তিনি বাঁ হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। বাঁ হাত কেটে গেলে দুই বাহু দিয়ে যুদ্ধ পতাকা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখেন। শাহাদত বরণ করা পর্যন্ত এভাবে পতাকা ধরে রাখেন। উল্লেখ রয়েছে, একজন রোমান সৈন্য তরবারি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করেন, যাতে তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাকে বেহেশতে দুটি পাখা দান করেছেন। সে পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়ান। এ কারণে তার উপাধি 'জাফর তাইয়ার' এবং জাফর 'যুলজানাহাইন'। তাইয়ার অর্থ উড্ডয়নকারী আর যুলজানাহাইন অর্থ দুই পাখাওয়ালা। (হাদীস)

ইমাম বুখারী নাফে (র.) এর মাধ্যমে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধের দিন হযরত জাফর (রা.) শহীদ হওয়ার পর আমি তার দেহে আঘাতের চিহ্নগুলো গুনে দেখেছি। তার দেহে তীর ও তলোয়ারের পঞ্চাশটি আঘাত ছিল। এসব আঘাতের একটিও পেছনের দিকে ছিল না। অপর এক বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে ছিলাম। জাফর ইবনে আবু তালিবকে সন্ধান করে নিহতদের মাঝে পেয়ে যাই। তার দেহে বর্শা ও তীরের ৯০ টির বেশি আঘাত দেখেছি। নাফে (রা.) থেকে ইবনে ওমর (রা.) এর বর্ণনায় এতোটুকু অতিরিক্ত রয়েছে, আমি এসকল যখম সবই তার দেহের সম্মুখভাগে দেখতে পেয়েছি। এরকম বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের মাধ্যমে হযরত জাফর (রা.) এর শাহাদাত বরণের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) পতাকা গ্রহণ করে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হন।

উল্লেখ আছে হাজার হাজার শত্রু বেষ্টিত ময়দানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। তিনি ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় তাঁর চাচাতো ভাই গোশত লেগে থাকা একটা হাড় তাঁর হাতে দেন। তিনি এক কামড় খেয়ে সময় ক্ষেপণ না করে দূরে ছুঁড়ে ফেলেন। এরপর লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) এর শাহাদাতের পর বনু আজলান গোত্রের সাবেত ইবনে আরকাম (রা.) নামক এক সাহাবী ছুটে গিয়ে পতাকা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, হে মুসলমানরা, তোমরা কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও। সাহাবীরা তাকেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। এরপর সাহাবীরা হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি পতাকা গ্রহণের পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। বুখারীতে স্বয়ং খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, মুতার যুদ্ধের দিন আমার হাতে ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায়। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল। অপর এক বর্ণনায় তাঁর যবানীতে এভাবে উল্লেখ রয়েছে, আমার হাতে মুতার যুদ্ধের দিন ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায় এবং শেষে একটি ছোট সাইজের ইয়েমেনী যুদ্ধাস্ত্র অবশিষ্ট ছিল।

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতার যুদ্ধের দিন রণক্ষেত্রের হুবহু খবর কোনো মাধ্যম ছাড়াই আগে ভাগেই ওহীর মাধ্যমে পেয়ে যান। তিনি মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, যায়েদ পতাকা গ্রহণ করেছে এবং শহীদ হয়ে গেছে। এরপর জাফর পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ এ সময় অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এরপর আল্লাহর তলোয়ারসমূহের একটি তলোয়ার পতাকা গ্রহণ করেছে, তার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের জয়যুক্ত করেছেন। অসীম বীরত্ব, বাহাদুরী এবং কঠিন জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সামনে টিকে থাকা ছিল এক অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর ঘটনা। হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) এ সময় যে বীরত্বের পরিচয় দেন, ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তার মত এমন সেনানায়ক বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।

এ যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। সকল বর্ণনার উপর দৃষ্টিপাত করলে মনে হয়, প্রথম দিনের যুদ্ধে দিনভর হযরত খালিদ (রা.) রোমান সৈন্যদের মুকাবিলায় অবিচল ছিলেন। তিনি সে সময় এক নুতন যুদ্ধকৌশল আবিষ্কার করেছিলেন, যাতে রোমানদের ধোঁকা ও ভয় দেখিয়ে এতটুকু সফলতার সাথে পিছনে নিয়ে আসবেন, যাতে কোনো অবস্থায়ই রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া করার সাহস না পায়। কেননা, তিনি জানতেন, যদি مسلمانরা পলায়ন, আর রোমানরা তাদের ধাওয়া করে, তাহলে তাদের কবল থেকে مسلمانوں রক্ষা করা খুবই কঠিন হবে। পরদিন সকালে হযরত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সেনা দলের বিন্যাসে রদবদল এনে তাদের নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। ডান দিকের সৈন্যদের বাঁ দিকে এবং বাঁ দিকের সৈন্যদের ডান দিকে মোতায়েন করেন। পিছনের সৈন্যদের সামনে আর সামনের সৈন্যদের পিছনে নিয়ে যান। এরূপ সেনা বিন্যাসের দৃশ্য থেকে শত্রুরা বলাবলি করতে থাকে, মুসলমানদের সহায়ক সৈন্য দল এসে গেছে। সুতরাং তাদের শক্তি পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে সেনা পরিচালনায় আনা হয় নতুন কৌশল। ফলে যুদ্ধের পুরো চেহারাই পাল্টে দেয়া হয়। এছাড়া ক্ষিপ্রতার সাথে আক্রমণ, সামনে যাওয়া, পিছে এসে পুনরায় আক্রমণে পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে যায়। প্রতিপক্ষ পুরোটাই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।

এরপর উভয় দল সামনা সামনি হয়ে গেলে কিছুক্ষণ আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। তখন হযরত খালিদ (রা.) নিজ বাহিনীর বিন্যাস সংরক্ষিত রেখে ধীরে ধীরে তাদের পিছিয়ে নিতে থাকেন, কিন্তু রোম সৈন্যরা ভয়ে مسلمانوں পিছু নেয়নি। কারণ তারা ভাবছিল, মুসলমানরা ধোঁকা দিচ্ছে। তারা কোনো চাল চেলে তাদের বিস্তৃত মরুপ্রান্তরে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। ফলে রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া না করে নিজেদের এলাকায় ফিরে যায়। এদিকে مسلمانরা নিরাপদে সফলতার সাথে পিছনে হটে মদীনায় ফিরে আসে। মুতার যুদ্ধে ১২ জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। রোমানদের কত নিহত হয়েছে তার বিবরণ জানা যায়নি। তবে যুদ্ধের বিবরণ পাঠে বুঝা যায়, তাদের বহু নিহত হয়েছিল। কেননা, শুধুমাত্র হযরত খালিদের (রা.) হাতেই তলোয়ার ভেংগেছে নয়টি। অতএব শত্রু সৈন্যদের নিহতের সংখ্যা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এক ও একাশি এর পার্থক্য (১৪৮১) সমন্বিত এ সংঘর্ষেও কাফিররা مسلمانوں উপর জয়ী হতে পারেনি দেখে সমগ্র আরব ও নিকট প্রাচ্যের লোকেরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঠিক এ ব্যাপারটিই সিরিয়া ও তৎসন্নিহিত অর্ধ স্বাধীন আরব গোত্র ও ইরাক নিকটবর্তী নজদী গোত্রসমূহ যারা ইরান সম্রাটের প্রভাবাধীন ছিল তারা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। মুতার যুদ্ধে এক এক করে যায়েদ বিন হরেসা, জাফর বিন আবু তালিব এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহ (রা.) সেনাপতি হিসাবে শহীদ হন।

এর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সৈনিক হতে সেনানায়ক হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বিজয়ী হন। এ যুদ্ধের পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুলাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি সৈন্য পরিচালনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেন। তিনি তাঁর পুরো জীবনে কোন যুদ্ধে কখনই পরাজিত হননি। এ ঘটনা কোন সেনানায়কের জীবনে বিরল।

যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মুতা অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেটা সম্ভব না হলেও এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের সুনাম সুখ্যাতি বহু দূর বিস্তার লাভ করে। সমগ্র আরব জগৎ, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কেননা, রোমানরা ছিল সে সময়ের শ্রেষ্ঠ শক্তি। আরবরা মনে করত রোমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া আত্মহত্যার সামিল। কাজেই, উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ সৈন্যের মুকাবিলা করে সফলভাবে ফিরে আসা অভূতপূর্ব বিস্ময় ছাড়া আর কিছু ছিল না। এ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়, আরব জনগণ তখন পর্যন্ত যে ধরনের লোকদের সম্পর্কে অবহিত ছিল, সে সকল লোক থেকে মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সাথে রয়েছে। তাদের নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃতই আল্লাহর রসূল। এ কারণেই দেখা যায় যে, জেদী ও অহংকারী গোত্রসমূহ যারা লাগাতার مسلمانوں সাথে যুদ্ধে জড়াত, তারা মুতার যুদ্ধের পর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অতএব, বনু সোলায়মান, আশজা, গাতফান, যুবইয়ান ও ফাযারা প্রভৃতি গোত্র মুতার যুদ্ধের পর ইসলাম গ্রহণ করে। মুতার যুদ্ধে রোমানদের সাথে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা রোমান রাজ্যসমূহে مسلمانوں বিজয় এবং দূরদূরান্তের এলাকাসমূহে مسلمانوں কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুতিকাগার হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এ যুদ্ধের পর, مسلمانوں খ্যাতি ও বিরত্বের কথা সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। مسلمانরা হয়ে যায় অজেয় শক্তির নতুন মেরুকরণ।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 তাবুকের যুদ্ধ

📄 তাবুকের যুদ্ধ


পরবর্তী বছরই কাইজার মুসলমানদেরকে 'মুতা' নামক স্থানে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য সিরিয়া সীমান্তে সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রস্তুতির তাৎপর্য জানতে পেরে মুকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। সমসাময়িক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের ঘোষণা দেন আল্লাহর নবী। পূর্বের যুদ্ধবিগ্রহে কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে মুকাবিলা হবে তা কাউকে না জানানোই ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতি। অনেক সময় তিনি মদীনা হতে বের হয়ে লক্ষ্যস্থলের দিকে সোজা পথে অগ্রসর না হয়ে বাঁকা পথে অগ্রসর হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি কোন গোপনীয়তা না রেখে স্পষ্ট ভাষায় সকলকে জানিয়ে দিলেন যে, রোম শক্তির সাথে যুদ্ধ হবে এবং সিরিয়ার দিকে যেতে হবে।

মুসলমানদের জন্য এটা ছিল খুবই কঠিন পরীক্ষার সময়। হেজায ভূমিতে চলছিল দুর্ভিক্ষ। জমির শস্য শূন্য, অপরদিকে বাগানের খেজুর পরিপক্ক হয়ে টসটস করছিল। খেজুর পাতার ঝুপড়ি নির্মাণের সময় হয়েছিল। একে তো গ্রীষ্মকাল। তার উপর পথ ছিল অতি দীর্ঘ। শত শত মাইলের পথ, ধূলিঝড় এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বালুকার উপর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ইসলামের জন্য উৎসর্গকারী মুসলমানদের মধ্যে কোন দুর্বলতা ছিল না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পাওয়া মাত্র মুসলমানরা যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহাসমারহে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। মক্কা বিজয়ের পর আরবের বহু গোত্র তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল গোত্রকেই সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানালেন। দলে দলে লোক এসে সৈন্য শ্রেণীতে ভর্তি হতে লাগল। প্রায় চলিশ হাজার সৈন্য সংগৃহীত হল। এত বিরাট বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনার জন্য বহু অর্থের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে অর্থের যোগান ছিল না।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থের জন্য সাহাবীদের নিকট আহবান জানালেন। এ আহ্বানে বিপুল সাড়া মিলল। আল্লাহর নামে, ইসলামের পথে সবাই অকাতরে অর্থ সাহায্য করতে লাগলেন। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কে কত দান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলতে লাগল। হযরত ওসমান ও হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করলেন। হযরত ওমর নিজের উপার্জিত সামগ্রীর অর্ধেক এনে পেশ করলেন। হযরত আবু বকর নিজের সমস্ত সম্পদ উৎসর্গ করলেন। আর বললেন, আমি আমার গৃহে আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। দরিদ্র সাহাবীরা কষ্টে শিষ্টে মজুরী করে যা কিছু পেয়েছিলেন তা সবই এনে দিলেন। মহিলারা নিজেদের অলংকার খুলে দিলেন। প্রাণ উৎসর্গকারী স্বেচ্ছা সেবীদের বাহিনী চতুর্দিক হতে জমায়েত হতে লাগল। তারা দাবী করল, অস্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা হলে আমরা আমাদের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

যারা যানবাহন পায়নি তারা কান্নাকাটি করতে লাগলেন এবং এমনভাবে নিজেদের প্রাণের কাতরতা প্রকাশ করতে লাগলেন। যা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে ব্যথা অনুভূত হল। বস্তুতঃ ঈমান ও মুনাফিকীর পার্থক্য সূচিত হওয়ার জন্য এ সময়টি, একটি নির্ভুল মানদ হয়ে দাঁড়াল। এ সময় কারো যুদ্ধ ময়দান হতে দূরে সরে থাকার অর্থই ছিল ইসলামের সাথে তার দূরবর্তী সম্পর্ক। এ জন্যে ঐসব মুনাফিক ব্যক্তিদের সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহী জানিয়ে দেয়া হত।

নবম হিজরীর রজব মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৪০ বা ৩০ হাজার মুজাহিদ নিয়ে সিরিয়ার দিকে রওনা হন। এ বাহিনীতে ছিল দশ হাজার উষ্ট্রারোহী যোদ্ধা। উটের সংখ্যা এতই কম ছিল যে, এক একটি উটের পিঠে একাধিক লোক পালাক্রমে সওয়ার হয়েছিল। এর উপর ছিল গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম ও পানির অভাব। কিন্তু এসব সত্ত্বেও প্রকৃত মুসলমানরা অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বের হন। তাবুকে পৌঁছার পরই মুসলমানরা নগদ ফল লাভ করেন। সেখানে পৌঁছে মুসলীম বাহিনী জানতে পারেন যে, কাইজার গুপ্তচরের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা জেনে প্রত্যক্ষ মুকাবিলায় আসতে সাহস করেনি। সীমান্ত পর্যন্ত এসে ফিরে গেছে। কারণ মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী, কাফিরের লক্ষাধিক সৈন্যের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সে অবলোকন করেছিল। এ অভিযানে স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে আগাত ৩০ বা ৪০ হাজার সৈন্যের মুকাবিলা করার জন্য এক বা দুই লক্ষ্য সৈন্য নিয়ে ময়দানে আসার মত সাহস রোম সম্রাটের ছিল না। মুসলমানদের রণকৌশল, ঈমানি জোর, সাহস এবং আত্মউদ্দীপনার কাছে রোমদের বিনা যুদ্ধে পরাজয় ঘটে।

কাইজারের এভাবে পালিয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামী শক্তির যে নৈতিক বিজয় সূচিত হয়, তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথেষ্ট মনে করলেন। ফলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক অতিক্রম করে সিরিয়া সীমান্তে প্রবেশ করার পরিবর্তে, তাবুকে ২০ দিন অপেক্ষা করে রোম সম্রাজ্য ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ছোট ছোট রাজ্যগুলোতে সামরিক প্রভাব খাঁটিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুগত করদরাজ্যে পরিণত করে নিলেন। ফলে এর খ্রীষ্টান গোত্রপতি-আকিদার বিন মালেক, আযলার খ্রীষ্টান গোত্রপতি-ইউহানা বিন দুবা এবং মাকনা, জাররা, আজরাহসহ প্রভৃতি স্থানের খ্রীষ্টান দলপতিরা জিজিয়া আদায়ে মদিনা সরকারের আনুগত্য গ্রহণ করে। এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা রোম সাম্রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। পাশাপাশি যেসব লোক তখন পর্যন্ত প্রাচীন জাহেলিয়াতের পুনঃ প্রতিষ্ঠার আশায় দিন গুনছিল, তাদের মেরুদ সম্পূর্ণ চূর্ণ হয়ে যায়। সারা বিশ্বে মুসলমানদের জয়গান ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর শৌর্য বীর্য এবং বিজয় গাঁথার ইতিহাসের বুনিয়াদ রচিত হয় সারা বিশ্বে।

তাবুক হতে বিজয়ী বেশে ফিরে আসার পর চতুর্দিক হতে মহানবীর নিকট শান্তির প্রস্তাব আসতে আরম্ভ করে। বনু তামিম, বনু মুস্তালিক, বনু কিন্দা, বনু আজাদ, বনু তাঈ, প্রভৃতি বহু গোত্র ইসলাম কবুল করে। সুপ্রসিদ্ধ দানবীর হাতেম তাই এর পুত্র আদি বিন হাতেম এ সময় মুসলমান হন। বিখ্যাত কুরাইশ কবি কাব বিন যুহর ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানদের তাবুক হতে বিজয় বেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে মুনাফিকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও (সূরা তওবা: ৯৫)। মুনাফিকদের মধ্যে এমন কিছু লোকছিল, যারা তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ গমনে অপারগতা প্রকাশ করে। উল্লেখ্য তাবুকের জিহাদ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বেশকটি ঘটনা ঘটেছিল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় ফিরে আসার পূর্বেই পথিমধ্যে আল্লাহ তার হাবীবকে মুনাফিকদের বিশদ অবস্থা জানিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা যখন ফিরে এসে তাদের নিকট পৌঁছবে, তখন তারা নানা ওজর পেশ করবে। কিন্তু আপনি বলুন, ওজরের বাহানা করো না। আমরা তোমাদের কোন কথাই বিশ্বাস করি না। আল্লাহ আমাদেরকে, তোমাদের অবস্থা বলে দিয়েছেন (সূরা তওবা : ৯৪)। তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের নিকট এসে কসম করবে, যেন তোমরা তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে লও। তাহলে তোমরা অবশ্যই তাদের দিক হতে দৃষ্টি ফিরায়ে নিবে। কেননা, তারা একটা কদর্য জিনিস। আর তাদের আসল স্থান হচ্ছে জাহান্নাম (সূরা তাওবা: ৯৫)। পাশাপাশি আল্লাহ তাবুক যুদ্ধে পিছনে পরে থাকা ঈমানদারদের ব্যাপারে বলেন, অপর তিনজনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটি মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও, তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল। (সূরা তাওবা: ১১৮)

মিথ্যা ঈমানের দাবীদার মুনাফিকদের স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়ার পর, মহান আল্লাহ পিছনে পড়ে থাকা মু'মিনের দু'টি গ্রুপ বা দলের বর্ণনা দেন। একদল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর কিছু লোক রয়েছে, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও একটি মন্দ কাজ। আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন (সূরা আত তওবা: ১০২)। অপর দল প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, কিছু লোক আরো রয়েছে, যাদের ব্যাপারটি আল্লাহর নির্দেশের উপর স্থগিত রয়েছে। তিনি হয়তো তাদের আযাব দিবেন, না হয় তাদের ক্ষমা করে দিবেন। (সূরা আত তাওবা : ১০৬)

এছাড়া বাকী তিনজন প্রসঙ্গে আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে ইঙ্গিত করেন। যারা প্রকাশ্যভাবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেনি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তারা নিজেদের দুর্বলতার কথা সত্য সত্য বলে দেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সমাজচ্যুত করেন। এমনকি তাদের সাথে সালাম কালামের আদান প্রদান পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ ব্যবস্থা নেয়ার পর তাদের অবস্থা যে কিরূপ ভয়াবহ হয়েছিল তা আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলে দিচ্ছেন, অপর তিন জনকেও তিনি মাফ করে দিলেন, যাদের ব্যাপারটা মূলতবী করে রাখা হয়েছিল। যমীন যখন বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল, আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নেই, তখন আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদের দিকে দেখলেন, যাতে তারা ফিরে আসে (সূরা আত তওবা : ১১৮)। এ তিন জন সাহাবী হলেন, হযরত কা'ব বিন মালেক, মুরারা বিন ও হেলান বিন উমাইয়া (রা.)। এ তিনজনই আনসারী সাহাবী ছিলেন এবং বাইয়াতে আকাবা ও বিভিন্ন যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দাওয়াতের কাজ এবং ইসলামের প্রচার তথা দ্বীন রক্ষার প্রয়োজনে সত্যিকারের জিহাদে বা ধর্মীয় যুদ্ধে, কোন মুসলমানই পিছে থাকতে পারবে না।

কেউ যদি তা করে তবে, তা গুরুতর অন্যায়। ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্মীয় যুদ্ধে মুজাহিদদের স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়। মুনাফিকরাই বিভিন্ন বাহানা বা কারণ দেখিয়ে জিহাদকে পরিহার করে। এর পরও যদি কোন দুর্বল ঈমানের মুসলমান এমন কাজ করে বসে, তবে তাকে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বয়কট করাই যুক্তি যুক্ত। এর পর সেসব দুর্বল ঈমানদারদের জন্য তওবার রাস্তা খোলা থাকবে। আল্লাহ চাইলে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। মহান আল্লাহ যেহেতু ক্ষমার মহাসাগর; তাই সত্যিকারভাবে তওবা করলে এমন গুরুতর পাপও মোচন হওয়া সম্ভব। অতএব দ্বীন প্রচারে, সংগ্রামে, জিহাদে অংশগ্রহণ مسلمانوں জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফরয। এসবই তাবুক অভিযান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00