📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


৮ম হিজরীর রমযানে মক্কা বিজয় হয়। হুদাইবিয়ার সাথে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত। হুদাইবিয়ার একটি শর্ত ছিল এরূপ: মক্কাবাসী অথবা মুসলমানরা যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে। অপরপক্ষ এতে বাদ সাধতে পারবে না। এরই ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের সাথে বনু খোজায়ার এবং অপরদিকে বনু বকরের সাথে মক্কাবাসীদের চুক্তি হয়েছিল। অথচ কিছু দিন যেতে না যেতেই, মক্কার কাফিররা বনু বকরের পক্ষাবলম্বন করে, বনু খোজায়ার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের অনেক লোককে হত্যা করে ফেলে। ফলে খোজায়ার গোত্রের লোকেরা এসে প্রিয় নবীর নিকট ফরিয়াদ জানায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীর নিকট তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবী জানান। নতুবা চুক্তি ভঙ্গ বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু মক্কার কাফিররা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথার কোন মূল্যই দিল না। শেষ পর্যন্ত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ বলেই বিবেচিত হল।

এবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে মক্কা অভিযানের আয়োজন শুরু করে দিলেন। তিনি সবকিছু গোপন রেখে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন। কারণ, এ অভিযানের খবর মক্কাবাসী জানতে পারলে তারাও বিপুল সমরায়োজন করত। ফলে একটা ভীষণ রক্তারক্তি কা ঘটে যেতে পারত। অথচ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ ধ্বংসাত্মক বিজয় চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ভালবাসা দিয়ে ও মানবতা দিয়ে পবিত্র মক্কা জয় করতে। এজন্যই তিনি কুরাইশদেরকে প্রস্তুত হবার অবকাশ দেননি।

হাতিব বিন আবি বোলতা (রা.) নামক জনৈক বদরী সাহাবী এ সময় একটি কা করে বসেন। তখনও তার স্ত্রী-পুত্র মক্কায় অবস্থান করত। তাদের প্রতি মক্কার কুরাইশদের সহানুভূতির আশায় তিনি গোপনে জনৈকা ক্রীতদাসীর মাধ্যমে মক্কায় মুসলমানদের অভিযানের খবর পাঠানোর চেষ্টা করেন। আল্লাহ অহীর মাধ্যমে তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী, মিকদাদ ও হযরত যুবাইরকে (রা.) বলে পাঠান যে, তোমরা দ্রুত যাও, 'রওযা খাক' নামক স্থানে গেলে উটে সওয়ারী এক মহিলা দেখবে, তাকে আটক করবে এবং তার নিকট একটা চিঠি পাবে। তোমরা তা নিয়ে আস। বিশ্বনবীর নির্দেশ পালন করা হলে ঘটনার সত্যতা মিলে। এ কাজের জন্য হাতিবের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হয়। হাতিব অকপটে তার উপরোক্ত উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এটা ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা মু'জেযা।

পরিকল্পনা অনুসারে ধীরে ধীরে مسلمانوں দশ হাজারের বিরাট বাহিনী তৈরী হয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরীর ১০ই রমযান (৬৩০ খ্রীঃ) মক্কা অভিমুখী অভিযানে রওনা হন। মক্কার উপকণ্ঠে 'মারুর জাহরান' নামক স্থানে এসে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং মক্কা বিজয় করার জন্য কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেন। সন্ধ্যর পর খাদ্য প্রস্তুতির জন্য তাবুর বাইরে চুল্লি জ্বালান হয়। রাতে অগণিত চুল্লিতে আগুন জ্বলতে দেখে কুরাইশরা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। আবু সুফিয়ান এ দৃশ্য দেখতে এসে ধরা পড়ে যান এবং তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আনা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আবু সুফিয়ান! এখনও কি তোমার ভুল ভাঙ্গবে না? তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে না? এখনও কি দেবদেবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে? নবীর দাওয়াতের কথায় আবু সুফিয়ানের মনে দাগ কাটে এবং তিনি তখন কালেমা পড়ে ইসলাম কবুল করেন। অপরদিকে আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়াও ইসলামের গুণে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ইসলাম গ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কুরআনের ভাষায় বলেন, আজ তোমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি অতি দয়ালু করুণাময়। (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারা নিরাপদ, যারা মসজিদে হারামে থাকবে তারা নিরাপদ আর যারা নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে তারাও নিরাপদ। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে ৪টি দলে বিভক্ত করে নগরে, প্রবেশের নির্দেশ দেন। আর হযরত আব্বাস (রা.) কে বলেন, আবু সুফিয়ানকে এখন মক্কায় ফিরে যেতে না দিয়ে সম্মুখের পাহাড়ের উপর নিয়ে যান, যেন সে مسلمانوں ক্ষমতা দেখতে পায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مسلمانوں যে চারটি দলে বিভক্ত হবার নির্দেশ দেন; সে দলগুলোর নেতারা ছিলেন: (১) হযরত যুবাইর (রা.) (২) হযরত আবু ওবায়দা (রা.) (৩) হযরত সাদ বিন ওবাদা (রা.) ও (৪) হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। হযরত আলী (রা.) পতাকা হাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। সেনাপতিদের প্রতি নির্দেশ ছিল; বাধা না দিলে কাউকে যেন আঘাত করা না হয়। বস্তুতঃ বিনা বাধায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুসলিম বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে। ক্বাবা ঘরে পৌঁছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসমান বিন তালহার নিকট হতে চাবি নেন এবং পবিত্র কা'বা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করেন। এরপর কা'বার মূর্তিগুলোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আঘাত করতে করতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসারিত হয়েছে, আর মিথ্যা না কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, আর না পুনরাবৃত্তি করতে পারে। (আল কুরআন)

মক্কাবাসীরা অপেক্ষা করছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করেন? যেসব মুশরিকরা বহু বছর যাবত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং مسلمانوںকে সর্বপ্রকারের দুঃখ কষ্ট দিয়েছিল আজ তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বন্দীদেরকে উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, হে কুরাইশরা! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব বলে তোমরা ধারণা কর? তারা উত্তর দিল, আমরা আপনার নিকট হতে ভাল ব্যবহার পাওয়ার আশা করি। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও তোমরা সকলে মুক্ত।

এ ঘোষণায় ইকরামা, সাফওয়ান, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা; প্রমুখ অমার্জনীয় অপরাধী ক্ষমা পেয়ে যায়। এখানে এ সত্যটি পুনরায় স্পষ্ট হয়ে উঠে: পৃথিবীর রাজা বাদশাহ ও নবীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল- নবী রাসূলরা মহানুভব ও মানবতাবাদী। নবীরা (আ.) বিশাল হৃদয়ের হন। ক্ষমা করা, পূর্বের দুঃখস্মৃতি ভুলে যাওয়াই নবীদের মূল আদর্শ। আর দুনিয়াবাদীরা প্রতিশোধপরায়ণ ও হঠকারী। পাশাপাশি এ ব্যাপক ও সাধারণ ক্ষমা হতে কিছু লোককে আলাদা রাখা হয়, যারা ইসলামের অতিমাত্রায় ক্ষতি করেছিল। কিন্তু এরূপ লোকের অধিকাংশই তখন আত্ম গোপন করেছিল এবং ক্রমে ক্রমে তারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণপূর্বক ইসলাম কবুল করেছিল। এ ক্ষমা ও দয়ার ফলে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণে সুভাগ্যবান হন। হযরত মুয়াবিয়া, আবু কাহাফা প্রমুখ সে দিনই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ভয়ঙ্কর শত্রুরাও ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

সূরায়ে ফাতাহ, হাদীদ ও নাছর- এ তিনটি সূরাতে আল্লাহ মক্কা বিজয় সম্বন্ধে ইঙ্গিত করেছেন। সূরা ফাতাহে এসেছে, আপনাকে সাহায্য করবেন জবরদস্ত সাহায্য। আর সে শক্তিশালী ও জবরদস্ত সাহায্য হল মক্কা বিজয় (সূরা ফাতাহ)। সূরা হাদীদে এসেছে, তোমাদের মধ্যে তারা- যারা ব্যয় করেছে মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা অধিক উচ্চ, ঐ সমস্ত লোকের চেয়ে; যারা ব্যয় করে মক্কা বিজয়ের পরে এবং জিহাদ করে। আর আল্লাহ তাদের সকলের সাথে উত্তম প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন (সূরা আল হাদীদ)। সূরা নাছরে এসেছে, যখন এসে পড়ে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় এবং আপনি লোকদেরকে দেখেন যে তারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে দলে দলে প্রবেশ করছে। (সূরা আন নাছর)

মক্কা বিজয়ের বিশেষত্ব হল, তা শক্তি বলে বিজিত হওয়া সত্ত্বেও রক্তপাত হতে রক্ষিত ছিল। কা'বার হেরেমের সম্মান ও মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদকে (রা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন; কা'বা শরীফে প্রবেশ কালে কারো প্রতি যেন তরবারি না উঠায়। দুনিয়ার ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন কোন রাজা-বাদশাহ কোন দেশ জয় করে, তখন বিজিত দেশের উপর নানা প্রকার অত্যাচার, উৎপীড়ন সংঘটিত হয়। তারা হত্যা ও লুটতরাজ করে। সে জাতিকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করে কিংবা হত্যা করে। কিন্তু তদস্থলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ঘোষণা ছিল, আজ তোমাদের উপর কোন ক্ষোভ নেই। যাও তোমরা সকলেই মুক্ত? কাফির বা মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে যদি সন্ধি হয়, তবে সে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ কাফির দলের জান, মাল এবং ইজ্জত সব কিছু নিজের জান, মাল এবং ইজ্জতের মত মনে করতে হবে। অবশ্য প্রতিপক্ষের পক্ষ হতে বিরোধিতা বা চুক্তি ভঙ্গ হলে, مسلمانوں চুক্তি ভঙ্গসহ তাদের মূলোৎপাটন করা যাবে। মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের হৃদয় এতটাই সহানুভব ও উদার ছিল। যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। সত্যিই তিনি অতুলনীয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন

📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন


মক্কা বিজয় ছিল মূলত একটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান। এর ফলে আরববাসীদের সামনে মূর্তিপূজার অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে তার অবসান ঘটে। সমগ্র আরবের জন্যে সত্য মিথ্যা চিহ্নিত হয়ে যায়। তাদের মনোজগৎ থেকে সন্দেহ সংশয়ের অবসান ঘটাতে থাকে। এ কারণে মক্কা বিজয়ের পর তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে।

হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমরা একটি কূপের ধারে বাস করতাম, তার পাশ দিয়ে কাফেলা চলাচল করত। আমরা তাদের লোকদের এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। তিনি কেমন তা জানতে চাইতাম। তারা বলত, মনে করেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে ওহী পাঠান হয় এবং সে ওহীতে আল্লাহ তা'আলা এরূপ এরূপ বলেন। হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমি সেসব কথা শুনতাম। কথাগুলো আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের জন্যে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা বলত, তাঁকে এবং তাঁর কওমকে বা জাতিকে ছেড়ে দাও। যদি তিনি নিজের কওমের উপর জয় লাভ করেন তাহলে বুঝা যাবে, তিনি সত্য নবী। অতঃপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে। সকল কওম ইসলাম গ্রহণের জন্যে অগ্রসর হয়। আমার পিতাও আমার কওমের কাছে ইসলামের শিক্ষা নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর সত্য নবীর কাছ থেকে এসেছি। তিনি বলেন, অমুক অমুক নামায আদায় কর। নামাযের সময় হলে তোমাদের মধ্য থেকে একজন যেন আযান দেয়। এরপর তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি বেশী পরিমাণ কুরআন জানেন, তিনি যেন ইমামতি করেন।

এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মক্কা বিজয়ের ঘটনা পরিস্থিতির পরিবর্তনে ইসলামকে শক্তিশালী করেছিল। আরববাসীদের ভূমিকা নির্ধারণে এবং ইসলামের সামনে তাদের অস্ত্র সমর্পণে মক্কা বিজয় এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাবুকের যুদ্ধের পর এ অবস্থা আরো শক্তিশালী রূপ নেয়। এ কারণে দেখা যায় যে, নবম ও দশম হিজরীর দুই বছরে মদীনায় বহু প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। সে সময় মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে মক্কা বিজয়ের সময় যেখানে مسلمانوں সংখ্যা ছিল দশ হাজার, অথচ এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তবুকের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়। বিদায় হজ্জের সময় দেখা যায়, مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার, মতান্তরে ২ লাখ। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারপাশে তাঁরা লাব্বাইক ধ্বনি দিচ্ছিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিলেন। পাহাড়-পর্বতে, মাঠে-প্রান্তরে তাওহীদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এভাবেই মক্কা বিজয়ের পর খুব দ্রুত ইসলামের প্রচার, প্রসার ও দাওয়াত ও তাবলীগের কল্পনাতীত অগ্রগতি সাধিত হয়। মক্কা বিজয়ের মধ্যদিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জিত হতে থাকে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 হুনাইনের যুদ্ধ

📄 হুনাইনের যুদ্ধ


'হুনাইন' মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মক্কা হতে প্রায় দশ মাইল দূরে। পূর্বেই মক্কা বিজয়ের প্রভাব সমগ্র আরব গোত্রের উপর পড়েছিল। অধিকাংশ আরব গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মুসলমানরা মক্কার কুরাইশদের পরাজিত করলেও প্রাচীন জাহেলী শক্তি হুনাইনের প্রান্তরে অবস্থানকারী দুর্ধর্ষ হাওয়াজিন, সাকীফ, নজর, জুশম এবং অন্যান্য জাহেলিয়াতপন্থি গোত্র ও কবিলার লোকেরা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। مسلمانوں এ বিজয় তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ইসলামের দাওয়াত, প্রচার-প্রসার ও বিপবী আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য তারা সংঘবদ্ধ হয় এবং তাদের আশেপাশের অন্যান্য গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানায়। এ সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করে মালিক বিন আউফ। সে সবাইকে তাদের স্ত্রী পুত্র, চতুষ্পদ জন্তু ও মাল সম্পদসহ যুদ্ধের ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল, যেন দলের লোকেরা নিজেদের পরিবার পরিজন ও মাল সম্পদের লোভে হলেও যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে না যায়।

পবিত্র মক্কা অধিকার করার পর মুসলমানরা তাদেরকে আক্রমণ করতে পারে- এ আশংকায় কাফিদের সকল গোত্র মিলে কালবিলম্ব না করে مسلمانوں বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আয়োজন করেছিল। কাফিররা 'আওতান' নামের একটি মাঠের সংকীর্ণ স্থানে সমবেত হয়ে। সংবাদ শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াতাড়ি তাঁর সৈন্য বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। মদীনা হতে আগত দশ হাজারের সাথে নব দীক্ষিত দু'হাজার কুরাইশ বীরও যোগ দেয়।

বিস্ময়ের ব্যাপার ঐ সৈন্যের মধ্যে আবু জেহেলের পুত্রদ্বয়, আবু সুফিয়ান এবং প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবৃন্দও ছিলেন। কী অপূর্ব পরিবর্তন: সারা জীবন যারা কাফিরদের নেতারূপে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তারাই আজ বিশ্বনবীর ভক্তরূপে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। মহান প্রতিপালক যেমনটি চান তাই হয়। বিশ্বনবী মা'আয বিন জাবালকে মক্কার মুয়াল্লিম এবং খাত্তাব বিন আসাদ কে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে ১২ হাজার সৈন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হন। সংখ্যায়, যুদ্ধোপকরণে মাল সম্পদে পূর্বের তুলনায় মুসলমানরা ছিল সমৃদ্ধ। কে তাদের বিজয় ঠেকায়? ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে কিছুটা অহংকারের ভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু আল্লাহ অলক্ষ্যে এ কথা শুনতে পেয়ে তাদের উপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানরা 'হুনাইন' নামক স্থানে পৌঁছে রাত যাপন করে। এ সংবাদ জানতে পেরে শত্রু সৈন্যরা প্রস্তুত হয়ে পথের দু'ধারের পর্বতগুলোতে আত্মগোপন করে থাকে। ফলে মুসলিম বাহিনী যখন হুনাইন প্রান্তর অতিক্রম করতে যায়। হঠাৎ পথের দু'ধার হতে হাওয়াজিনরা বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ করতে থাকে। মহাবিপদ আসন্ন। অপ্রস্তুত ও অসতর্ক অবস্থায় কী করবে তারা? দিশেহারা হয়ে মুসলিম বাহিনী যে যেদিকে পারে পালাতে আরম্ভ করে।

মুসলমানদের সকল অহংকার পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। এমন অপ্রত্যাশিতভাবে তাদেরকে যে এ হীন লজ্জাকর পরাজয় বরণ করতে হবে, সেটি তারা ভাবেনি। এতদিন সংখ্যায় অল্প হয়ে বহু সংখ্যক শত্রু সেনাকে জয় করার অভিজ্ঞতা মুসলমানরা অর্জন করেছিল। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের যে শক্তি নেই- এ সত্য তারা কোন দিনই প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেনি। সেদিন পার্থিব শক্তির অহংকারী মুসলমান, নিজে থেকে সে সত্য হৃদয়ঙ্গম করে। মুসলমানরা পরিষ্কার বুঝতে পারে অল্প সংখ্যক হলেই যে কোন দল বা জামাত পরাজিত হয়-তাও যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে জয়লাভ করা যায়- তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়ের পিছে কাজ করে অন্য এক রহস্য। অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রস্থানের সময় হযরত আব্বাস (রা.), মুহাজির ও আনসারদেরকে বিশ্বনবীর চতুর্পাশে সমবেত হওয়ার জন্য উচ্চস্বরে আহ্বান জানান। এ আহবানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী একত্রিত হয়ে বীর বিক্রমে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে।

এভাবে সকলে একত্রিত হয়ে প্রচণ্ড বেগে কাফিরদেরকে আক্রমণ করে। এতে করে হাওয়াজিন ও সাকীফ গোত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। তারা এমনভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে থাকে যে, রসদ পত্র তো দূরের কথা, নিজেদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে সাথে নিয়ে যেতেও ভুলে যায়। ফলে গনীমতের মাল হিসেবে ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী, প্রচুর সোনা-রূপা মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়। ছয় হাজার শত্রু সৈন্য বন্দী হয়।

হুনাইন অভিযানে মক্কার কাফিরদের মাঝে অসংখ্য সাধারণ নর-নারী, যুদ্ধের দৃশ্য উপভোগের জন্য বের হয়ে আসে। তাদের ধারণা ছিল, এ যুদ্ধে মুসলিম সেনারা হেরে গেলে, তাদের পক্ষে প্রতিশোধ নেয়ার একটা ভাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর তারা জয়ী হলেও তাদের তেমন কোন ক্ষতি নেই। এ মনোভাবাপন্ন লোকদের মধ্যে শায়বা বিন ওসমানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যিনি পরে মুসলমান হয়ে নিজের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধে আমার পিতা হযরত হামযার (রা.) হাতে এবং আমার চাচা হযরত আলীর (রা.) হতে নিহত হয়। ফলে অন্তরে প্রতিশোধের যে আগুন জ্বলছিল তা বর্ণনার বাইরে। আমি হুনাইনের এ অভিযানকে অপূর্ব সুযোগ মনে করে مسلمانوں সহযাত্রী হলাম। যেন মওকা পেলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আক্রমণ করতে পারি। তাই আমি তাদের সাথে থেকে সদা সুযোগের সন্ধানে ছিলাম। এক সময় যখন পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং যুদ্ধের সূচনায় দেখা যায় مسلمانরা হতোদ্যম হয়ে পালাতে শুরু করেছে, তখন আমি এ সুযোগে তড়িৎবেগে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছি। কিন্তু দেখি যে, তার ডানদিকে হযরত আব্বাস (রা.) ও বাম দিকে আবু সুফিয়ান, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ রক্ষিরূপে রয়েছেন। এজন্য পিছন দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁর কাছে পৌঁছি এবং সংকল্প করি যে, তরবারির অতর্কিত আঘাত হেনে তাঁকে হত্যা করব (নাউযু বিল্লাহ)। ঠিক এ সময় আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ হয় এবং আমাকে ডাক দিয়ে তিনি বলেন, শায়বা! এদিকে এসো। আমি তাঁর পাশে গেলে তাঁর পবিত্র হাত আমার বুকের উপর রাখেন আর দোয়া করেন। হে আল্লাহ! ওর থেকে শয়তানকে দূর করে দাও। অতঃপর আমি যখন দৃষ্টি উঠাই তখন আমার চোখ, কান ও প্রাণ থেকেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক প্রিয় মনে হয়। তারপর তিনি আদেশ দেন, যাও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। আমার তখন এমন অবস্থা হল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। তাই কাফিরদের সাথে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করি। যুদ্ধ শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলে তার খেদমতে হাজির হই। তিনি আমার মনের গোপন দূরভিসন্ধি প্রকাশ করে বলেন, মক্কা থেকে মন্দ উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছিল। আর আমাকে হত্যার জন্য আশে পাশে ঘুরছিলে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তোমার দ্বারা সৎ কাজ করানো, পরিশেষে তাই হল। একই ধরনের ঘটনা ঘটে নযর বিন হারিসের সাথে। তিনিও অনুরূপ উদ্দেশ্যে হুনাইন গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আল্লাহ তার অন্তরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালবাসা প্রবিষ্ট করান। ফলে একজন মুসলিম যোদ্ধারূপে কাফিরদের মুকাবিলা করেন।

হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারের দরুন প্রথমে তাদের পরাজয় দেখা দেয়। পরবর্তীতে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বিজয় সূচিত হয়। সে অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ইতোপূর্বে অনেক ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন। সে দিন হুনাইনের যুদ্ধের দিন যখন তোমাদের সংখ্যা বিপুলতার অহংকার ও অহমিকা ছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজেই আসেনি। যমীন বিশালতা সত্ত্বেও তোমাদের পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পশ্চাদপসারণ করে পালাতে লাগলে (সূরা তাওবা: ২৫)। অতঃপর আল্লাহ তার শান্তির অমিয় ধারা তার রাসূল ও মু'মিনদের উপর বর্ষণ করলেন। আর সে বাহিনীও পাঠালেন, যা তোমরা দেখতে পেলে না। আর তিনি কাফিরদের শাস্তি দান করলেন। কেননা, এটাই কাফিরদের প্রতিফল। (সূরা আত তাওবা: ২৬)

হুনাইন যুদ্ধের প্রথম আক্রমণে যে সকল সাহাবী আপন স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোবল ফিরে পাবার পর স্ব স্ব অবস্থানে ফিরে আসেন। আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ অবস্থানে সুদৃঢ় হন। সাহাবীদের প্রতি সান্ত্বনা প্রেরণের অর্থ হল, তারা বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন। এতে বুঝা গেল যে, আল্লাহর সান্ত্বনা ছিল দু'প্রকার। এক প্রকার পলায়নরত সাহাবীদের জন্য, আর অন্য প্রকার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যারা সুদৃঢ় ছিলেন তাদের জন্য। ওহুদ ও হুনাইন-দু'টিই مسلمانوں যথার্থ শিক্ষার ক্ষেত্র। ওহুদে তারা জয়ী হয়ে পরবর্তীতে পরাজিত হয়েছিল। হুনাইনে প্রথমে পরাজিত হয়ে, পর মুহূর্তেই জয়ী হয়েছিল। ওহুদে শিখেছে নেতার আদেশ লঙ্ঘন করার শোচনীয় পরিণাম। অপরদিকে হুনাইনে শিখেছে অহংকার করার মারাত্মক কুফল। সাথে সাথে ঈমানের পরীক্ষাও এ দু'স্থানে ভীষণভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর সাহায্য ও করুণা ব্যতীত কোন কিছুই যে সম্ভব নয়- এ সত্যটি উভয় স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুসলমানরা এ সত্যটি হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছে যে, অল্প সংখ্যক হলেই যে দল বা জামাত পরাজিত হয়-তা যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে, দল বা জামাত জয়লাভ করে তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়; সম্মান-লাঞ্ছনা, লাভ-ক্ষতি উন্নতি-অবনতি; সফলতা ধ্বংস; সবকিছুই মহান আল্লাহর হাতে। মহান প্রতিপালক যেভাবে, যখন, যা চান- সেভাবে, তখন তাই হয়। মহান আল্লাহ মহাক্ষমতাবান।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মূতার যুদ্ধ

📄 মূতার যুদ্ধ


মুসলমানদের সাথে রোমান সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ মক্কা বিজয়ের পূর্বেই শুরু হয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হুদাইবিয়ার সন্ধির পর দ্বীন ইসলামকে প্রচারের উদ্দেশ্যে উত্তর দিকে একটি দল সিরিয়া সংলগ্ন বিভিন্ন গোত্রের নিকট পাঠান। দাওয়াত ও তাবলীগের জামাতটি হিজরত করতে থাকে। কিন্তু 'জাতুত তালাহ' নামক স্থানে মুসলিম জামাতের ১৫ জনকে হত্যা করা হয়। এ সময়ে বসরা অধিপতি শুরাহবিলের নিকট ইসলামের দাওয়াতপত্র প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র বাহক হারিস বিন উমাইরকে (রা.) হত্যা করে। এসব কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরী জমাদিউল আউয়াল মাসে ৩ হাজার মুজাহিদের এক বাহিনী সিরিয়া সীমান্তে পাঠান। এ বাহিনী 'ময়ান' নামক স্থানে পৌঁছলে জানা যায় যে, শুরাহবিল এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছে। অথচ এরূপ ভয়বহ খবর সত্ত্বেও ৩ হাজার প্রাণ উৎসর্গকারী মুসলিম বাহিনী সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে এবং 'মুতা' নামক স্থানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। আশ্চর্যজনক হলেও শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের জয় সাধিত হয়।

মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এ জায়গা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের দূরত্ব মাত্র দুই মনযিল। এখানেই মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় মুসলমানরা যেসব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, এ যুদ্ধ ছিল সেসবের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। এ যুদ্ধই মুসলমানদের খৃষ্টান অধ্যুষিত দেশসমূহ জয়ের পথ খুলে দিয়েছিল। অষ্টম হিজরীর জমাদিউল আউয়াল অর্থাৎ ৬২৯ খৃষ্টাব্দের আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ অভিযানের কারণ খুবই স্পষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রা.) কে একখানি চিঠিসহ বোসরার গভর্নরের কাছে প্রেরণ করেন। রোমের কায়সারের গভর্নর শুরাহবিল ইবনে আমর গাসসানী সে সময় বালকা এলাকায় নিযুক্ত ছিল। এ দুর্বৃত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দূতকে গ্রেফতার এবং শক্তভাবে বেঁধে হত্যা করে। যেহেতু রাষ্ট্রদূত বা সাধারণ দূতদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক নিয়মেই গুরুতর অপরাধ। সেহেতু এটা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল। এমনকি এর চেয়েও গুরুতর অপরাধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত হত্যার খবর শোনার পর খুবই মর্মাহত হন। এ কারণে তিনি সে এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্যে সৈন্যদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী তিন হাজার সৈন্যের বাহিনী তৈরী করা হয়। খন্দকের যুদ্ধ ছাড়া ইতোপূর্বে অন্য কোনো যুদ্ধেই মুসলমানরা তিন হাজার সৈন্য সমাবেশ করেননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) কে এ সেনাদলের সেনাপতি মনোনীত করে বলেন, যায়েদ যদি শহীদ হয়, তবে জাফর (রা.) এবং জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) সিপাহসালার দায়িত্ব পালন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সেনাদলের জন্যে সাদা পতাকা তৈরী করে তা হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার (রা.) হাতে দেন। সৈন্যদলকে তিনি ওসীয়ত করেন, তারা যেন হারেস ইবনে ওমায়রের হত্যাকারে জায়গায় স্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তো ভালো। তা না হলে আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর পথে, আল্লাহর সাহায্যে কুফরকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। খেয়ানত করবে না। কোনো নারী, শিশু, অতীব বৃদ্ধ এবং গির্জায় অবস্থানকারী দুনিয়া পরিত্যাগকারীকে হত্যা করবে না। খেজুর এবং অন্য কোনো গাছ কাটবে না। কোন অট্টালিকা ধ্বংস করবে না।

মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সর্বসাধারণ মুসলমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোনীত সেনানায়কদের সালাম এবং বিদায় জানান। সে সময় অন্যতম সেনানায়ক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) কাঁদছিলেন।
তাঁকে এ সময় কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বা তোমাদের সাথে সম্পর্কের কারণে আমি কাঁদছি না।

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনে জাহান্নামের ভয়ে কাঁদছি। সে আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে, এটা তোমাদের প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।' (সূরা মারইয়াম : ৭১)। আমি জানি না, জাহান্নামে প্রবেশের পর ফিরে আসব কিভাবে? মুসলমানরা বলেন, আল্লাহর শান্তি ও নিরাপত্তা আপনাদের সঙ্গী হোক। আপনাদের হিফাযত করুন এবং গনীমতের মালসহ আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনুন। উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মুসলিম সৈন্যরা মাআন নামক এলাকায় পৌঁছেন। এ স্থান ছিল হেজাযের সাথে সংশিষ্ট জর্দানী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। মুসলিম বাহিনী সেখানে পৌঁছে অবস্থান নেয়। সেখানেই মুসলিম গুপ্তচররা খবর দিলেন, রোমের কায়সার বালকা অঞ্চলের মায়াব এলাকায়, এক লাখ রোমান সৈন্য সমাবেশ করে রেখেছে। এছাড়া তাদের পতাকাতলে লাখম, জুযাম, বালকিন, বাহরা এবং বালা গোত্রের আরো এক লাখ সৈন্য সমবেত হয়েছে। শেষোক্ত এক লাখ ছিল আরব গোত্রসমূহের সমন্বিত সেনাদল।

মুসলমানরা ধারণাই করতে পারেননি, তারা এমন এক বিশাল ও দুর্ধর্ষ সেনাদলের সম্মুখীন হবেন। মুসলমানরা দূরবর্তী এলাকায় হঠাৎ করেই ভয়াবহ শত্রু পক্ষের সম্মুখীন হয়েছেন। তখন তাদের সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়, তারা কি তিন হাজার সৈন্যসহ দুই লাখ দুর্ধর্ষ সৈন্যের সাথে মুকাবিলা করবেন? বিস্মিত ও চিন্তিত মুসলমানরা দুই রাত পর্যন্ত পরামর্শ করেন। কেউ কেউ অভিমত প্রকাশ করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিঠি লিখে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হোক। তিনি হয়তো বা বাড়তি সৈন্য পাঠাবেন অথবা অন্য কোনো নির্দেশ দিবেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) দৃঢ়তার সাথে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'হে লোকসকল, আপনারা যা এড়াতে চাইছেন এটা তো সেই শাহাদাত, যার জন্যে আপনারা বেরিয়েছেন। স্মরণ রাখবেন, শত্রুদের সাথে আমাদের মুকাবিলার মাপকাঠি সৈন্যদল, শক্তি এবং সংখ্যাধিক্যের নিরিখে বিচার্য নয়। আমরা সে দ্বীনের জন্যেই লড়াই করি, যে দ্বীন দ্বারা আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন। কাজেই সামনের দিকে চলুন। আমরা দুটি কল্যাণের মধ্যে একটি অবশ্যই লাভ করব। হয়তো আমরা জয় লাভ করব অথবা শাহাদাত বরণ করে আমাদের জীবন ধন্য হবে। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মতের সমর্থনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

মাআন এলাকায় দুই রাত অতিবাহিত করার পর মুসলিম বাহিনী শত্রুদের প্রতি অগ্রসর হয়ে বালকার মাশারেফ নামক জায়গায় হিরাক্লিয়াসের সৈন্যদের মুখোমুখি হন। শত্রুরা আরো এগিয়ে এলে মুসলমানরা মুতা নামক জায়গায় সমবেত হন।
এরপর যুদ্ধের জন্যে সৈন্যদের বিন্যস্ত করা হয়। ডান দিকে কাতাবা আযরীকে (রা.) এবং বাম দিকে ওবাদা ইবনে মালেক আনসারী (রা.) কে নিযুক্ত করা হয়। মুতার রণাঙ্গনের উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্য দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের প্রবল হামলার মুকাবিলা করে। বিস্ময়কর ছিল এ যুদ্ধ। দুনিয়ার মানুষ বিস্ফোরিত নেত্রে এ যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঈমানের বসন্ত বায়ু চলতে থাকলে এ ধরনের বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটতে পারে। কোন হিসাব, নিয়ম বা কৌশলে এমন অসমযুদ্ধ হতে পারে না। একবার কল্পনা করলে সহজেই অনুমেয়; কি করে এমন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল?

সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়পাত্র হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) পতাকা গ্রহণ করেন। অসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দিয়ে তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ধরনের বীরত্বের পরিচয় মুসলমান ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। হযরত যায়েদ (রা.) এর শাহাদাতের পর হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) পতাকা হাতে তুলে নেন। তিনিও অতুলহীন বীরত্বের পরিচয় দিয়ে লড়াই করতে থাকেন। তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তিনি নিজের সাদা কালো ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে শত্রুদের ওপর আঘাত করতে থাকেন। শত্রুদের তরবারির আঘাতে তার ডান হাত কেটে গেলে, তিনি বাঁ হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। বাঁ হাত কেটে গেলে দুই বাহু দিয়ে যুদ্ধ পতাকা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখেন। শাহাদত বরণ করা পর্যন্ত এভাবে পতাকা ধরে রাখেন। উল্লেখ রয়েছে, একজন রোমান সৈন্য তরবারি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করেন, যাতে তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাকে বেহেশতে দুটি পাখা দান করেছেন। সে পাখার সাহায্যে তিনি জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা উড়ে বেড়ান। এ কারণে তার উপাধি 'জাফর তাইয়ার' এবং জাফর 'যুলজানাহাইন'। তাইয়ার অর্থ উড্ডয়নকারী আর যুলজানাহাইন অর্থ দুই পাখাওয়ালা। (হাদীস)

ইমাম বুখারী নাফে (র.) এর মাধ্যমে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুতার যুদ্ধের দিন হযরত জাফর (রা.) শহীদ হওয়ার পর আমি তার দেহে আঘাতের চিহ্নগুলো গুনে দেখেছি। তার দেহে তীর ও তলোয়ারের পঞ্চাশটি আঘাত ছিল। এসব আঘাতের একটিও পেছনের দিকে ছিল না। অপর এক বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি মুতার যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে ছিলাম। জাফর ইবনে আবু তালিবকে সন্ধান করে নিহতদের মাঝে পেয়ে যাই। তার দেহে বর্শা ও তীরের ৯০ টির বেশি আঘাত দেখেছি। নাফে (রা.) থেকে ইবনে ওমর (রা.) এর বর্ণনায় এতোটুকু অতিরিক্ত রয়েছে, আমি এসকল যখম সবই তার দেহের সম্মুখভাগে দেখতে পেয়েছি। এরকম বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের মাধ্যমে হযরত জাফর (রা.) এর শাহাদাত বরণের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) পতাকা গ্রহণ করে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হন।

উল্লেখ আছে হাজার হাজার শত্রু বেষ্টিত ময়দানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। তিনি ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় তাঁর চাচাতো ভাই গোশত লেগে থাকা একটা হাড় তাঁর হাতে দেন। তিনি এক কামড় খেয়ে সময় ক্ষেপণ না করে দূরে ছুঁড়ে ফেলেন। এরপর লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) এর শাহাদাতের পর বনু আজলান গোত্রের সাবেত ইবনে আরকাম (রা.) নামক এক সাহাবী ছুটে গিয়ে পতাকা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, হে মুসলমানরা, তোমরা কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দাও। সাহাবীরা তাকেই সেনাপতির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বলেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই। এরপর সাহাবীরা হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি পতাকা গ্রহণের পর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। বুখারীতে স্বয়ং খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, মুতার যুদ্ধের দিন আমার হাতে ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায়। এরপর আমার হাতে একটি ইয়েমেনী ছোট তলোয়ার অবশিষ্ট ছিল। অপর এক বর্ণনায় তাঁর যবানীতে এভাবে উল্লেখ রয়েছে, আমার হাতে মুতার যুদ্ধের দিন ৯টি তলোয়ার ভেংগে যায় এবং শেষে একটি ছোট সাইজের ইয়েমেনী যুদ্ধাস্ত্র অবশিষ্ট ছিল।

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুতার যুদ্ধের দিন রণক্ষেত্রের হুবহু খবর কোনো মাধ্যম ছাড়াই আগে ভাগেই ওহীর মাধ্যমে পেয়ে যান। তিনি মসজিদে নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেন, যায়েদ পতাকা গ্রহণ করেছে এবং শহীদ হয়ে গেছে। এরপর জাফর পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা গ্রহণ করেছে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চোখ এ সময় অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এরপর আল্লাহর তলোয়ারসমূহের একটি তলোয়ার পতাকা গ্রহণ করেছে, তার মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের জয়যুক্ত করেছেন। অসীম বীরত্ব, বাহাদুরী এবং কঠিন জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ অমুসলিম সৈন্যের সামনে টিকে থাকা ছিল এক অভূতপূর্ব ও বিস্ময়কর ঘটনা। হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) এ সময় যে বীরত্বের পরিচয় দেন, ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তার মত এমন সেনানায়ক বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতে সম্ভব নয়।

এ যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। সকল বর্ণনার উপর দৃষ্টিপাত করলে মনে হয়, প্রথম দিনের যুদ্ধে দিনভর হযরত খালিদ (রা.) রোমান সৈন্যদের মুকাবিলায় অবিচল ছিলেন। তিনি সে সময় এক নুতন যুদ্ধকৌশল আবিষ্কার করেছিলেন, যাতে রোমানদের ধোঁকা ও ভয় দেখিয়ে এতটুকু সফলতার সাথে পিছনে নিয়ে আসবেন, যাতে কোনো অবস্থায়ই রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া করার সাহস না পায়। কেননা, তিনি জানতেন, যদি مسلمانরা পলায়ন, আর রোমানরা তাদের ধাওয়া করে, তাহলে তাদের কবল থেকে مسلمانوں রক্ষা করা খুবই কঠিন হবে। পরদিন সকালে হযরত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সেনা দলের বিন্যাসে রদবদল এনে তাদের নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। ডান দিকের সৈন্যদের বাঁ দিকে এবং বাঁ দিকের সৈন্যদের ডান দিকে মোতায়েন করেন। পিছনের সৈন্যদের সামনে আর সামনের সৈন্যদের পিছনে নিয়ে যান। এরূপ সেনা বিন্যাসের দৃশ্য থেকে শত্রুরা বলাবলি করতে থাকে, মুসলমানদের সহায়ক সৈন্য দল এসে গেছে। সুতরাং তাদের শক্তি পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে সেনা পরিচালনায় আনা হয় নতুন কৌশল। ফলে যুদ্ধের পুরো চেহারাই পাল্টে দেয়া হয়। এছাড়া ক্ষিপ্রতার সাথে আক্রমণ, সামনে যাওয়া, পিছে এসে পুনরায় আক্রমণে পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে যায়। প্রতিপক্ষ পুরোটাই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।

এরপর উভয় দল সামনা সামনি হয়ে গেলে কিছুক্ষণ আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। তখন হযরত খালিদ (রা.) নিজ বাহিনীর বিন্যাস সংরক্ষিত রেখে ধীরে ধীরে তাদের পিছিয়ে নিতে থাকেন, কিন্তু রোম সৈন্যরা ভয়ে مسلمانوں পিছু নেয়নি। কারণ তারা ভাবছিল, মুসলমানরা ধোঁকা দিচ্ছে। তারা কোনো চাল চেলে তাদের বিস্তৃত মরুপ্রান্তরে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। ফলে রোমান সৈন্যরা مسلمانوں ধাওয়া না করে নিজেদের এলাকায় ফিরে যায়। এদিকে مسلمانরা নিরাপদে সফলতার সাথে পিছনে হটে মদীনায় ফিরে আসে। মুতার যুদ্ধে ১২ জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। রোমানদের কত নিহত হয়েছে তার বিবরণ জানা যায়নি। তবে যুদ্ধের বিবরণ পাঠে বুঝা যায়, তাদের বহু নিহত হয়েছিল। কেননা, শুধুমাত্র হযরত খালিদের (রা.) হাতেই তলোয়ার ভেংগেছে নয়টি। অতএব শত্রু সৈন্যদের নিহতের সংখ্যা সহজেই আন্দাজ করা যায়। এক ও একাশি এর পার্থক্য (১৪৮১) সমন্বিত এ সংঘর্ষেও কাফিররা مسلمانوں উপর জয়ী হতে পারেনি দেখে সমগ্র আরব ও নিকট প্রাচ্যের লোকেরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঠিক এ ব্যাপারটিই সিরিয়া ও তৎসন্নিহিত অর্ধ স্বাধীন আরব গোত্র ও ইরাক নিকটবর্তী নজদী গোত্রসমূহ যারা ইরান সম্রাটের প্রভাবাধীন ছিল তারা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। মুতার যুদ্ধে এক এক করে যায়েদ বিন হরেসা, জাফর বিন আবু তালিব এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহ (রা.) সেনাপতি হিসাবে শহীদ হন।

এর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমত খালিদ বিন ওলীদ (রা.) সৈনিক হতে সেনানায়ক হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং বিজয়ী হন। এ যুদ্ধের পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাইফুলাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি সৈন্য পরিচালনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেন। তিনি তাঁর পুরো জীবনে কোন যুদ্ধে কখনই পরাজিত হননি। এ ঘটনা কোন সেনানায়কের জীবনে বিরল।

যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে মুতা অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, সেটা সম্ভব না হলেও এ যুদ্ধের ফলে মুসলমানদের সুনাম সুখ্যাতি বহু দূর বিস্তার লাভ করে। সমগ্র আরব জগৎ, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। কেননা, রোমানরা ছিল সে সময়ের শ্রেষ্ঠ শক্তি। আরবরা মনে করত রোমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া আত্মহত্যার সামিল। কাজেই, উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তিন হাজার সৈন্য, দুই লাখ সৈন্যের মুকাবিলা করে সফলভাবে ফিরে আসা অভূতপূর্ব বিস্ময় ছাড়া আর কিছু ছিল না। এ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়, আরব জনগণ তখন পর্যন্ত যে ধরনের লোকদের সম্পর্কে অবহিত ছিল, সে সকল লোক থেকে মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর সাহায্য মুসলমানদের সাথে রয়েছে। তাদের নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকৃতই আল্লাহর রসূল। এ কারণেই দেখা যায় যে, জেদী ও অহংকারী গোত্রসমূহ যারা লাগাতার مسلمانوں সাথে যুদ্ধে জড়াত, তারা মুতার যুদ্ধের পর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অতএব, বনু সোলায়মান, আশজা, গাতফান, যুবইয়ান ও ফাযারা প্রভৃতি গোত্র মুতার যুদ্ধের পর ইসলাম গ্রহণ করে। মুতার যুদ্ধে রোমানদের সাথে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালে তা রোমান রাজ্যসমূহে مسلمانوں বিজয় এবং দূরদূরান্তের এলাকাসমূহে مسلمانوں কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুতিকাগার হিসেবে সাব্যস্ত হয়। এ যুদ্ধের পর, مسلمانوں খ্যাতি ও বিরত্বের কথা সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। مسلمانরা হয়ে যায় অজেয় শক্তির নতুন মেরুকরণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00