📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 খায়বারের যুদ্ধ

📄 খায়বারের যুদ্ধ


সিরিয়া প্রান্তরের এক বিশাল শ্যামল ভূখ ের নাম খায়বার। ছোট বড় বহু দুর্গ দ্বারা এ স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। পূর্ব হতেই এখানে ইহুদীরা বসতি স্থাপন করেছিল। মদীনার বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রদ্বয় এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রের ইহুদীরা খায়বরে তাদের জাতি ভাইদের সাথে যোগ দেয়ার পর, তাদের দুষ্ট ও কুচক্রি মনোভাব অরো পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিরাট ও ব্যাপকভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের মনস্থ করল। সমস্ত আয়োজন ঠিক হলে, ইহুদীরা ছোট খাট কয়েকটি আক্রমণ দ্বারা मुसलमानोंকে উত্তেজিত করল। ইহুদীদের এ চক্রান্তের গোপন খবর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেড়ে অনতিবিলম্বে ১৪শ কিংবা ১৬শ মুসলিম সৈন্য বাহিনী নিয়ে খায়বারের দিকে রওয়ানা হন।

মদীনা হতে খায়বার প্রায় একশত মাইল (তিন দিনের পথ) দূরে অবস্থিত। ৭ম হিজরীর মহররম মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত দ্রুত বেগে সৈন্য চালনা করেন যে, ইহুদীরা কোন পূর্বাভাসই পেল না। তিন দিনের এ পথ অতিক্রম করে হঠাৎ একদিন খুব ভোরে ইহুদীদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত দুর্গে এসে পৌঁছেন। কৃষকরা মাঠে এসে দেখতে পেল যে, সম্মুখে তাদের বিরাট মুসলিম সেনাদল। ভয়ে তারা দৌঁড়ে গিয়ে নগরবাসীকে এ সংবাদ দিল। ইহুদীরা হতভম্ব হয়ে গেল। তখন বনু গাতফান ও অন্যান্য গোত্রের সহযোগিতা লাভের আর অবসর রইল না। তখন তাদের নেতা সালাম বিন মিসকামের সাথে পরামর্শ করে তাদের ছয়টি দুর্গের মধ্যে 'ওয়াতি' ও 'সামেল' নামক দুর্গে তাদের ধন সম্পদ ও মেয়েদের সুরক্ষিত করল। তাদের ধনাগার ছিল 'নায়িম' নামক দুর্গে। সৈন্য বাহিনী থাকত নাতীত নামক দুর্গে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নাতীত বা নায়িম দুর্গ আক্রমণ করেন। পঞ্চাশজন مسلمان এতে আহত হন। আর ইহুহীদের নেতা সালাম নিহত হলে তার স্থলাভিসিক্ত হন হারিস বিন যয়নাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ দুর্গ مسلمانوں অধিকারে আসে। আরো কয়েকটি দুর্গ অধিকারে আসার পর, মুসলিম বাহিনী বিখ্যাত দুর্গ 'কানুস' এর সম্মুখীন হয়। মুসলমানরা এ দুর্গ দখল করতে পারছিল না দেখে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিন হযরত আবু বকর (রা.) কে এবং দ্বিতীয় দিন হযরত ওমর (রা.) কে সেনাপতি করে পাঠান। এ দু'দিনের আক্রমণে শত্রুরা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুর্গের পতন হয়নি। তৃতীয় দিন আল্লাহর সিংহ হযরত আলীকে (রা.) ইসলামের পতাকা দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই নাও ইসলামের পতাকা এবং যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের বিজয়ী করেন। মুসলমানরা হযরত আলীর নেতৃত্বে প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ করলে কানুস দুর্গের পতন হয়। অতঃপর অন্যান্য দুর্গও মুসলমানদের করায়ত্তে আসে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায় ইহুদীদের নিহতের সংখ্যা ৯২ জন, আর مسلمانوں শহীদের সংখ্যা ১৯ জন। প্রায় তিন সপ্তাহকাল অবরুদ্ধ থাকার পর খায়বারের সমস্ত দুর্গ মুসলমানদের হস্তগত হয়। এ যুদ্ধে মহাবীর আলী (রা.) ঢাল হিসেবে দুর্গের যে লোহার কপাট বা দরজাটি ব্যবহার করেছিলেন; তা উঠাতে ৭ জন সাহাবা হিমশিম খেয়ে যান। অথচ আলী (রা.) সেটাকে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করেছেন। সবই মহান রবের ইচ্ছা।

এরপর ইহুদীরা অতি বিনীতভাবে বিশ্বনবীনির নিকট লিখিত শর্তে শান্তি প্রস্তাব দেয়। শর্ত ছিল এরূপঃ (১) তাদের জীবন, সম্পত্তি, মহিলা ও শিশুদের স্পর্শ করা হবে না। (২) তারা অর্ধেক ফসল হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেবে। (৩) তারা مسلمانوں অনুগত প্রজা হয়ে বসবাস করবে। (৪) ইহুদীরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শর্ত মেনে নিলেন। প্রতিবছর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) খায়বারে এসে উৎপন্ন ফসল ভাগ করে দিতেন। এ সত্ত্বেও ইহুদীদের স্বভাব বদলায়নি। বিশ্বাসঘাতকতা ও কলা কৌশলে চতুরতা ইহুদী জাতির মজ্জাগত অভ্যাস। এরা পুনরায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র করে। ইহুদী নেতা হারিসের কন্যা ও সালামের স্ত্রী যয়নাব, মহানবীকে দাওয়াত করে বিষ মিশ্রিত খাদ্য খেতে দেয়। মহানবী এক লুকমা মুখে দিয়েই ফেলে দেন। কিন্তু বিশর বিন রানা (রা.) নামক এক সাহাবী সামান্য গিলে ফেলায় সে শহীদ হন। ফলে এ হত্যার দায়ে যয়নাবকে প্রাণদ দেয়া হয়। খায়বার যুদ্ধে যে সব মহিলা বন্দী হয়েছিল তাদের মধ্যে হযরত সফিয়াও (রা.) ছিলেন। তিনি একজন সাহাবীর ভাগে পড়েন। অথচ তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দাসীরূপে থাকার জন্য আবেদন জানান। দয়াল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে আজাদ করে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহ খায়বারের বিজয়ের ইঙ্গিত করেছিলেন। আল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন, মুমিনরা যখন গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল, তখন তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন। তাই তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে অখ বিজয় দান করবেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ দান করবেন, যা তারা অচিরেই লাভ করবে (সূরা আল ফাতাহ : ১৮-১৯)। হুদাইবিয়ায় আল্লাহ দেয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হয়েছিল ফলে مسلمانوں মনোবল আরও বেড়ে গিয়েছিল।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


৮ম হিজরীর রমযানে মক্কা বিজয় হয়। হুদাইবিয়ার সাথে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত। হুদাইবিয়ার একটি শর্ত ছিল এরূপ: মক্কাবাসী অথবা মুসলমানরা যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে। অপরপক্ষ এতে বাদ সাধতে পারবে না। এরই ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের সাথে বনু খোজায়ার এবং অপরদিকে বনু বকরের সাথে মক্কাবাসীদের চুক্তি হয়েছিল। অথচ কিছু দিন যেতে না যেতেই, মক্কার কাফিররা বনু বকরের পক্ষাবলম্বন করে, বনু খোজায়ার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের অনেক লোককে হত্যা করে ফেলে। ফলে খোজায়ার গোত্রের লোকেরা এসে প্রিয় নবীর নিকট ফরিয়াদ জানায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীর নিকট তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবী জানান। নতুবা চুক্তি ভঙ্গ বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু মক্কার কাফিররা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথার কোন মূল্যই দিল না। শেষ পর্যন্ত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ বলেই বিবেচিত হল।

এবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে মক্কা অভিযানের আয়োজন শুরু করে দিলেন। তিনি সবকিছু গোপন রেখে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন। কারণ, এ অভিযানের খবর মক্কাবাসী জানতে পারলে তারাও বিপুল সমরায়োজন করত। ফলে একটা ভীষণ রক্তারক্তি কা ঘটে যেতে পারত। অথচ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ ধ্বংসাত্মক বিজয় চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ভালবাসা দিয়ে ও মানবতা দিয়ে পবিত্র মক্কা জয় করতে। এজন্যই তিনি কুরাইশদেরকে প্রস্তুত হবার অবকাশ দেননি।

হাতিব বিন আবি বোলতা (রা.) নামক জনৈক বদরী সাহাবী এ সময় একটি কা করে বসেন। তখনও তার স্ত্রী-পুত্র মক্কায় অবস্থান করত। তাদের প্রতি মক্কার কুরাইশদের সহানুভূতির আশায় তিনি গোপনে জনৈকা ক্রীতদাসীর মাধ্যমে মক্কায় মুসলমানদের অভিযানের খবর পাঠানোর চেষ্টা করেন। আল্লাহ অহীর মাধ্যমে তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী, মিকদাদ ও হযরত যুবাইরকে (রা.) বলে পাঠান যে, তোমরা দ্রুত যাও, 'রওযা খাক' নামক স্থানে গেলে উটে সওয়ারী এক মহিলা দেখবে, তাকে আটক করবে এবং তার নিকট একটা চিঠি পাবে। তোমরা তা নিয়ে আস। বিশ্বনবীর নির্দেশ পালন করা হলে ঘটনার সত্যতা মিলে। এ কাজের জন্য হাতিবের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হয়। হাতিব অকপটে তার উপরোক্ত উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এটা ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা মু'জেযা।

পরিকল্পনা অনুসারে ধীরে ধীরে مسلمانوں দশ হাজারের বিরাট বাহিনী তৈরী হয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরীর ১০ই রমযান (৬৩০ খ্রীঃ) মক্কা অভিমুখী অভিযানে রওনা হন। মক্কার উপকণ্ঠে 'মারুর জাহরান' নামক স্থানে এসে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং মক্কা বিজয় করার জন্য কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেন। সন্ধ্যর পর খাদ্য প্রস্তুতির জন্য তাবুর বাইরে চুল্লি জ্বালান হয়। রাতে অগণিত চুল্লিতে আগুন জ্বলতে দেখে কুরাইশরা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। আবু সুফিয়ান এ দৃশ্য দেখতে এসে ধরা পড়ে যান এবং তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আনা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আবু সুফিয়ান! এখনও কি তোমার ভুল ভাঙ্গবে না? তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে না? এখনও কি দেবদেবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে? নবীর দাওয়াতের কথায় আবু সুফিয়ানের মনে দাগ কাটে এবং তিনি তখন কালেমা পড়ে ইসলাম কবুল করেন। অপরদিকে আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়াও ইসলামের গুণে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ইসলাম গ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কুরআনের ভাষায় বলেন, আজ তোমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি অতি দয়ালু করুণাময়। (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারা নিরাপদ, যারা মসজিদে হারামে থাকবে তারা নিরাপদ আর যারা নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে তারাও নিরাপদ। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে ৪টি দলে বিভক্ত করে নগরে, প্রবেশের নির্দেশ দেন। আর হযরত আব্বাস (রা.) কে বলেন, আবু সুফিয়ানকে এখন মক্কায় ফিরে যেতে না দিয়ে সম্মুখের পাহাড়ের উপর নিয়ে যান, যেন সে مسلمانوں ক্ষমতা দেখতে পায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مسلمانوں যে চারটি দলে বিভক্ত হবার নির্দেশ দেন; সে দলগুলোর নেতারা ছিলেন: (১) হযরত যুবাইর (রা.) (২) হযরত আবু ওবায়দা (রা.) (৩) হযরত সাদ বিন ওবাদা (রা.) ও (৪) হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। হযরত আলী (রা.) পতাকা হাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। সেনাপতিদের প্রতি নির্দেশ ছিল; বাধা না দিলে কাউকে যেন আঘাত করা না হয়। বস্তুতঃ বিনা বাধায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুসলিম বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে। ক্বাবা ঘরে পৌঁছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসমান বিন তালহার নিকট হতে চাবি নেন এবং পবিত্র কা'বা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করেন। এরপর কা'বার মূর্তিগুলোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আঘাত করতে করতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসারিত হয়েছে, আর মিথ্যা না কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, আর না পুনরাবৃত্তি করতে পারে। (আল কুরআন)

মক্কাবাসীরা অপেক্ষা করছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করেন? যেসব মুশরিকরা বহু বছর যাবত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং مسلمانوںকে সর্বপ্রকারের দুঃখ কষ্ট দিয়েছিল আজ তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বন্দীদেরকে উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, হে কুরাইশরা! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব বলে তোমরা ধারণা কর? তারা উত্তর দিল, আমরা আপনার নিকট হতে ভাল ব্যবহার পাওয়ার আশা করি। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও তোমরা সকলে মুক্ত।

এ ঘোষণায় ইকরামা, সাফওয়ান, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা; প্রমুখ অমার্জনীয় অপরাধী ক্ষমা পেয়ে যায়। এখানে এ সত্যটি পুনরায় স্পষ্ট হয়ে উঠে: পৃথিবীর রাজা বাদশাহ ও নবীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল- নবী রাসূলরা মহানুভব ও মানবতাবাদী। নবীরা (আ.) বিশাল হৃদয়ের হন। ক্ষমা করা, পূর্বের দুঃখস্মৃতি ভুলে যাওয়াই নবীদের মূল আদর্শ। আর দুনিয়াবাদীরা প্রতিশোধপরায়ণ ও হঠকারী। পাশাপাশি এ ব্যাপক ও সাধারণ ক্ষমা হতে কিছু লোককে আলাদা রাখা হয়, যারা ইসলামের অতিমাত্রায় ক্ষতি করেছিল। কিন্তু এরূপ লোকের অধিকাংশই তখন আত্ম গোপন করেছিল এবং ক্রমে ক্রমে তারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণপূর্বক ইসলাম কবুল করেছিল। এ ক্ষমা ও দয়ার ফলে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণে সুভাগ্যবান হন। হযরত মুয়াবিয়া, আবু কাহাফা প্রমুখ সে দিনই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ভয়ঙ্কর শত্রুরাও ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

সূরায়ে ফাতাহ, হাদীদ ও নাছর- এ তিনটি সূরাতে আল্লাহ মক্কা বিজয় সম্বন্ধে ইঙ্গিত করেছেন। সূরা ফাতাহে এসেছে, আপনাকে সাহায্য করবেন জবরদস্ত সাহায্য। আর সে শক্তিশালী ও জবরদস্ত সাহায্য হল মক্কা বিজয় (সূরা ফাতাহ)। সূরা হাদীদে এসেছে, তোমাদের মধ্যে তারা- যারা ব্যয় করেছে মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা অধিক উচ্চ, ঐ সমস্ত লোকের চেয়ে; যারা ব্যয় করে মক্কা বিজয়ের পরে এবং জিহাদ করে। আর আল্লাহ তাদের সকলের সাথে উত্তম প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন (সূরা আল হাদীদ)। সূরা নাছরে এসেছে, যখন এসে পড়ে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় এবং আপনি লোকদেরকে দেখেন যে তারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে দলে দলে প্রবেশ করছে। (সূরা আন নাছর)

মক্কা বিজয়ের বিশেষত্ব হল, তা শক্তি বলে বিজিত হওয়া সত্ত্বেও রক্তপাত হতে রক্ষিত ছিল। কা'বার হেরেমের সম্মান ও মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদকে (রা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন; কা'বা শরীফে প্রবেশ কালে কারো প্রতি যেন তরবারি না উঠায়। দুনিয়ার ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন কোন রাজা-বাদশাহ কোন দেশ জয় করে, তখন বিজিত দেশের উপর নানা প্রকার অত্যাচার, উৎপীড়ন সংঘটিত হয়। তারা হত্যা ও লুটতরাজ করে। সে জাতিকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করে কিংবা হত্যা করে। কিন্তু তদস্থলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ঘোষণা ছিল, আজ তোমাদের উপর কোন ক্ষোভ নেই। যাও তোমরা সকলেই মুক্ত? কাফির বা মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে যদি সন্ধি হয়, তবে সে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ কাফির দলের জান, মাল এবং ইজ্জত সব কিছু নিজের জান, মাল এবং ইজ্জতের মত মনে করতে হবে। অবশ্য প্রতিপক্ষের পক্ষ হতে বিরোধিতা বা চুক্তি ভঙ্গ হলে, مسلمانوں চুক্তি ভঙ্গসহ তাদের মূলোৎপাটন করা যাবে। মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের হৃদয় এতটাই সহানুভব ও উদার ছিল। যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। সত্যিই তিনি অতুলনীয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন

📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন


মক্কা বিজয় ছিল মূলত একটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান। এর ফলে আরববাসীদের সামনে মূর্তিপূজার অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে তার অবসান ঘটে। সমগ্র আরবের জন্যে সত্য মিথ্যা চিহ্নিত হয়ে যায়। তাদের মনোজগৎ থেকে সন্দেহ সংশয়ের অবসান ঘটাতে থাকে। এ কারণে মক্কা বিজয়ের পর তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে।

হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমরা একটি কূপের ধারে বাস করতাম, তার পাশ দিয়ে কাফেলা চলাচল করত। আমরা তাদের লোকদের এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। তিনি কেমন তা জানতে চাইতাম। তারা বলত, মনে করেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে ওহী পাঠান হয় এবং সে ওহীতে আল্লাহ তা'আলা এরূপ এরূপ বলেন। হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমি সেসব কথা শুনতাম। কথাগুলো আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের জন্যে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা বলত, তাঁকে এবং তাঁর কওমকে বা জাতিকে ছেড়ে দাও। যদি তিনি নিজের কওমের উপর জয় লাভ করেন তাহলে বুঝা যাবে, তিনি সত্য নবী। অতঃপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে। সকল কওম ইসলাম গ্রহণের জন্যে অগ্রসর হয়। আমার পিতাও আমার কওমের কাছে ইসলামের শিক্ষা নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর সত্য নবীর কাছ থেকে এসেছি। তিনি বলেন, অমুক অমুক নামায আদায় কর। নামাযের সময় হলে তোমাদের মধ্য থেকে একজন যেন আযান দেয়। এরপর তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি বেশী পরিমাণ কুরআন জানেন, তিনি যেন ইমামতি করেন।

এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মক্কা বিজয়ের ঘটনা পরিস্থিতির পরিবর্তনে ইসলামকে শক্তিশালী করেছিল। আরববাসীদের ভূমিকা নির্ধারণে এবং ইসলামের সামনে তাদের অস্ত্র সমর্পণে মক্কা বিজয় এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাবুকের যুদ্ধের পর এ অবস্থা আরো শক্তিশালী রূপ নেয়। এ কারণে দেখা যায় যে, নবম ও দশম হিজরীর দুই বছরে মদীনায় বহু প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। সে সময় মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে মক্কা বিজয়ের সময় যেখানে مسلمانوں সংখ্যা ছিল দশ হাজার, অথচ এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তবুকের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়। বিদায় হজ্জের সময় দেখা যায়, مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার, মতান্তরে ২ লাখ। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারপাশে তাঁরা লাব্বাইক ধ্বনি দিচ্ছিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিলেন। পাহাড়-পর্বতে, মাঠে-প্রান্তরে তাওহীদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এভাবেই মক্কা বিজয়ের পর খুব দ্রুত ইসলামের প্রচার, প্রসার ও দাওয়াত ও তাবলীগের কল্পনাতীত অগ্রগতি সাধিত হয়। মক্কা বিজয়ের মধ্যদিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জিত হতে থাকে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 হুনাইনের যুদ্ধ

📄 হুনাইনের যুদ্ধ


'হুনাইন' মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নাম। মক্কা হতে প্রায় দশ মাইল দূরে। পূর্বেই মক্কা বিজয়ের প্রভাব সমগ্র আরব গোত্রের উপর পড়েছিল। অধিকাংশ আরব গোত্র ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মুসলমানরা মক্কার কুরাইশদের পরাজিত করলেও প্রাচীন জাহেলী শক্তি হুনাইনের প্রান্তরে অবস্থানকারী দুর্ধর্ষ হাওয়াজিন, সাকীফ, নজর, জুশম এবং অন্যান্য জাহেলিয়াতপন্থি গোত্র ও কবিলার লোকেরা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। مسلمانوں এ বিজয় তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। ইসলামের দাওয়াত, প্রচার-প্রসার ও বিপবী আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য তারা সংঘবদ্ধ হয় এবং তাদের আশেপাশের অন্যান্য গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার জন্য আহ্বান জানায়। এ সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করে মালিক বিন আউফ। সে সবাইকে তাদের স্ত্রী পুত্র, চতুষ্পদ জন্তু ও মাল সম্পদসহ যুদ্ধের ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল, যেন দলের লোকেরা নিজেদের পরিবার পরিজন ও মাল সম্পদের লোভে হলেও যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে না যায়।

পবিত্র মক্কা অধিকার করার পর মুসলমানরা তাদেরকে আক্রমণ করতে পারে- এ আশংকায় কাফিদের সকল গোত্র মিলে কালবিলম্ব না করে مسلمانوں বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আয়োজন করেছিল। কাফিররা 'আওতান' নামের একটি মাঠের সংকীর্ণ স্থানে সমবেত হয়ে। সংবাদ শুনে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াতাড়ি তাঁর সৈন্য বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। মদীনা হতে আগত দশ হাজারের সাথে নব দীক্ষিত দু'হাজার কুরাইশ বীরও যোগ দেয়।

বিস্ময়ের ব্যাপার ঐ সৈন্যের মধ্যে আবু জেহেলের পুত্রদ্বয়, আবু সুফিয়ান এবং প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবৃন্দও ছিলেন। কী অপূর্ব পরিবর্তন: সারা জীবন যারা কাফিরদের নেতারূপে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তারাই আজ বিশ্বনবীর ভক্তরূপে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। মহান প্রতিপালক যেমনটি চান তাই হয়। বিশ্বনবী মা'আয বিন জাবালকে মক্কার মুয়াল্লিম এবং খাত্তাব বিন আসাদ কে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে ১২ হাজার সৈন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হন। সংখ্যায়, যুদ্ধোপকরণে মাল সম্পদে পূর্বের তুলনায় মুসলমানরা ছিল সমৃদ্ধ। কে তাদের বিজয় ঠেকায়? ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে কিছুটা অহংকারের ভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু আল্লাহ অলক্ষ্যে এ কথা শুনতে পেয়ে তাদের উপর অসন্তুষ্ট হন এবং তাদের শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানরা 'হুনাইন' নামক স্থানে পৌঁছে রাত যাপন করে। এ সংবাদ জানতে পেরে শত্রু সৈন্যরা প্রস্তুত হয়ে পথের দু'ধারের পর্বতগুলোতে আত্মগোপন করে থাকে। ফলে মুসলিম বাহিনী যখন হুনাইন প্রান্তর অতিক্রম করতে যায়। হঠাৎ পথের দু'ধার হতে হাওয়াজিনরা বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষণ করতে থাকে। মহাবিপদ আসন্ন। অপ্রস্তুত ও অসতর্ক অবস্থায় কী করবে তারা? দিশেহারা হয়ে মুসলিম বাহিনী যে যেদিকে পারে পালাতে আরম্ভ করে।

মুসলমানদের সকল অহংকার পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। এমন অপ্রত্যাশিতভাবে তাদেরকে যে এ হীন লজ্জাকর পরাজয় বরণ করতে হবে, সেটি তারা ভাবেনি। এতদিন সংখ্যায় অল্প হয়ে বহু সংখ্যক শত্রু সেনাকে জয় করার অভিজ্ঞতা মুসলমানরা অর্জন করেছিল। কিন্তু সংখ্যাধিক্যের যে শক্তি নেই- এ সত্য তারা কোন দিনই প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেনি। সেদিন পার্থিব শক্তির অহংকারী মুসলমান, নিজে থেকে সে সত্য হৃদয়ঙ্গম করে। মুসলমানরা পরিষ্কার বুঝতে পারে অল্প সংখ্যক হলেই যে কোন দল বা জামাত পরাজিত হয়-তাও যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে জয়লাভ করা যায়- তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়ের পিছে কাজ করে অন্য এক রহস্য। অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রস্থানের সময় হযরত আব্বাস (রা.), মুহাজির ও আনসারদেরকে বিশ্বনবীর চতুর্পাশে সমবেত হওয়ার জন্য উচ্চস্বরে আহ্বান জানান। এ আহবানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনী একত্রিত হয়ে বীর বিক্রমে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে।

এভাবে সকলে একত্রিত হয়ে প্রচণ্ড বেগে কাফিরদেরকে আক্রমণ করে। এতে করে হাওয়াজিন ও সাকীফ গোত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়। তারা এমনভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে থাকে যে, রসদ পত্র তো দূরের কথা, নিজেদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদেরকে সাথে নিয়ে যেতেও ভুলে যায়। ফলে গনীমতের মাল হিসেবে ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার বকরী, প্রচুর সোনা-রূপা মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়। ছয় হাজার শত্রু সৈন্য বন্দী হয়।

হুনাইন অভিযানে মক্কার কাফিরদের মাঝে অসংখ্য সাধারণ নর-নারী, যুদ্ধের দৃশ্য উপভোগের জন্য বের হয়ে আসে। তাদের ধারণা ছিল, এ যুদ্ধে মুসলিম সেনারা হেরে গেলে, তাদের পক্ষে প্রতিশোধ নেয়ার একটা ভাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর তারা জয়ী হলেও তাদের তেমন কোন ক্ষতি নেই। এ মনোভাবাপন্ন লোকদের মধ্যে শায়বা বিন ওসমানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যিনি পরে মুসলমান হয়ে নিজের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধে আমার পিতা হযরত হামযার (রা.) হাতে এবং আমার চাচা হযরত আলীর (রা.) হতে নিহত হয়। ফলে অন্তরে প্রতিশোধের যে আগুন জ্বলছিল তা বর্ণনার বাইরে। আমি হুনাইনের এ অভিযানকে অপূর্ব সুযোগ মনে করে مسلمانوں সহযাত্রী হলাম। যেন মওকা পেলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আক্রমণ করতে পারি। তাই আমি তাদের সাথে থেকে সদা সুযোগের সন্ধানে ছিলাম। এক সময় যখন পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং যুদ্ধের সূচনায় দেখা যায় مسلمانরা হতোদ্যম হয়ে পালাতে শুরু করেছে, তখন আমি এ সুযোগে তড়িৎবেগে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছি। কিন্তু দেখি যে, তার ডানদিকে হযরত আব্বাস (রা.) ও বাম দিকে আবু সুফিয়ান, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ রক্ষিরূপে রয়েছেন। এজন্য পিছন দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁর কাছে পৌঁছি এবং সংকল্প করি যে, তরবারির অতর্কিত আঘাত হেনে তাঁকে হত্যা করব (নাউযু বিল্লাহ)। ঠিক এ সময় আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ হয় এবং আমাকে ডাক দিয়ে তিনি বলেন, শায়বা! এদিকে এসো। আমি তাঁর পাশে গেলে তাঁর পবিত্র হাত আমার বুকের উপর রাখেন আর দোয়া করেন। হে আল্লাহ! ওর থেকে শয়তানকে দূর করে দাও। অতঃপর আমি যখন দৃষ্টি উঠাই তখন আমার চোখ, কান ও প্রাণ থেকেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিক প্রিয় মনে হয়। তারপর তিনি আদেশ দেন, যাও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। আমার তখন এমন অবস্থা হল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। তাই কাফিরদের সাথে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করি। যুদ্ধ শেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলে তার খেদমতে হাজির হই। তিনি আমার মনের গোপন দূরভিসন্ধি প্রকাশ করে বলেন, মক্কা থেকে মন্দ উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছিল। আর আমাকে হত্যার জন্য আশে পাশে ঘুরছিলে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তোমার দ্বারা সৎ কাজ করানো, পরিশেষে তাই হল। একই ধরনের ঘটনা ঘটে নযর বিন হারিসের সাথে। তিনিও অনুরূপ উদ্দেশ্যে হুনাইন গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আল্লাহ তার অন্তরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালবাসা প্রবিষ্ট করান। ফলে একজন মুসলিম যোদ্ধারূপে কাফিরদের মুকাবিলা করেন।

হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নিজেদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারের দরুন প্রথমে তাদের পরাজয় দেখা দেয়। পরবর্তীতে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে বিজয় সূচিত হয়। সে অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, আল্লাহ ইতোপূর্বে অনেক ক্ষেত্রে তোমাদের সাহায্য করেছেন। সে দিন হুনাইনের যুদ্ধের দিন যখন তোমাদের সংখ্যা বিপুলতার অহংকার ও অহমিকা ছিল। কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজেই আসেনি। যমীন বিশালতা সত্ত্বেও তোমাদের পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, আর তোমরা পশ্চাদপসারণ করে পালাতে লাগলে (সূরা তাওবা: ২৫)। অতঃপর আল্লাহ তার শান্তির অমিয় ধারা তার রাসূল ও মু'মিনদের উপর বর্ষণ করলেন। আর সে বাহিনীও পাঠালেন, যা তোমরা দেখতে পেলে না। আর তিনি কাফিরদের শাস্তি দান করলেন। কেননা, এটাই কাফিরদের প্রতিফল। (সূরা আত তাওবা: ২৬)

হুনাইন যুদ্ধের প্রথম আক্রমণে যে সকল সাহাবী আপন স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোবল ফিরে পাবার পর স্ব স্ব অবস্থানে ফিরে আসেন। আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ অবস্থানে সুদৃঢ় হন। সাহাবীদের প্রতি সান্ত্বনা প্রেরণের অর্থ হল, তারা বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন। এতে বুঝা গেল যে, আল্লাহর সান্ত্বনা ছিল দু'প্রকার। এক প্রকার পলায়নরত সাহাবীদের জন্য, আর অন্য প্রকার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যারা সুদৃঢ় ছিলেন তাদের জন্য। ওহুদ ও হুনাইন-দু'টিই مسلمانوں যথার্থ শিক্ষার ক্ষেত্র। ওহুদে তারা জয়ী হয়ে পরবর্তীতে পরাজিত হয়েছিল। হুনাইনে প্রথমে পরাজিত হয়ে, পর মুহূর্তেই জয়ী হয়েছিল। ওহুদে শিখেছে নেতার আদেশ লঙ্ঘন করার শোচনীয় পরিণাম। অপরদিকে হুনাইনে শিখেছে অহংকার করার মারাত্মক কুফল। সাথে সাথে ঈমানের পরীক্ষাও এ দু'স্থানে ভীষণভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর সাহায্য ও করুণা ব্যতীত কোন কিছুই যে সম্ভব নয়- এ সত্যটি উভয় স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুসলমানরা এ সত্যটি হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছে যে, অল্প সংখ্যক হলেই যে দল বা জামাত পরাজিত হয়-তা যেমনি সত্য নয়। আবার অধিক সংখ্যক হলেই যে, দল বা জামাত জয়লাভ করে তাও তেমনি সত্য নয়। জয় পরাজয়; সম্মান-লাঞ্ছনা, লাভ-ক্ষতি উন্নতি-অবনতি; সফলতা ধ্বংস; সবকিছুই মহান আল্লাহর হাতে। মহান প্রতিপালক যেভাবে, যখন, যা চান- সেভাবে, তখন তাই হয়। মহান আল্লাহ মহাক্ষমতাবান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00