📄 বাহরাইনের শাসনকর্তা মোনযের এর কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহরাইনের শাসনকর্তা মোনযের ইবনে সাওয়ার এর নামে চিঠি লিখে তাকেও ইসলামের দাওয়াত দেন। এ চিঠি হযরত আলা ইবনে হাযরামীর হাতে প্রেরণ করা হয়েছিল। জবাবে মোনযের লিখেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার চিঠি আমি বাহরাইনের অধিবাসীদের পড়ে শুনিয়েছি। কিছু লোক ইসলাম পছন্দ করেছে, পবিত্রতার দৃষ্টিতে দেখেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে। আবার অনেকে পছন্দ করেনি। এখানে ইহুদী এবং অগ্নি উপাসকও রয়েছে। আপনি ওদের ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ দিন। এর জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিঠি লিখেন: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মোনযের ইবনে সাওয়ার নামে। আপনার প্রতি সালাম। আমি আপনার কাছে আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। অতঃপর আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে, সে তা নিজের জন্যেই করবে। যে ব্যক্তি আমার দূতদের আনুগত্য করবে এবং তাদের আদেশ মান্য করবে, সে ব্যক্তি যেন আমারই আনুগত্য করেছে। যারা আমার দূতদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে, তারা আমার সাথেই ভাল ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হবে। আমার দূতরা আপনার প্রশংসা করেছেন। আপনার জাতি সম্পর্কে আপনার সুপারিশ আমি গ্রহণ করেছি। কাজেই মুসলমানরা যে অবস্থায় ঈমান এনেছে তাদের সে অবস্থায় ছেড়ে দিন। আমি দোষীদের ক্ষমা করে দিয়েছি, আপনিও তাদের ক্ষমা করুন। আপনি যতদিন সঠিক পথ অনুসরণ করবেন, ততদিন আমি আপনাকে পদ থেকে বরখাস্ত করব না। যারা ইহুদীদের ধর্মকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে অথবা অগ্নি উপাসনার উপর কায়েম রয়েছে, তাদের জিযিয়া (কর) দিতে হবে।
📄 ইয়ামামার শাসনকর্তা হাওযা এর কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামামার শাসনকর্তা হাওয়া ইবনে আলীর কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। তাতে লেখা ছিল: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে হাওয়া ইবনে আলীর প্রতি। সে ব্যক্তির উপর সালাম, যিনি হিদায়াতের অনুসরণ করেন। আপনার জানা থাকা উচিত, আমার দ্বীন উট ও ঘোড়ার শেষ গন্তব্যস্থল পর্যন্ত প্রসার লাভ করবে। কাজেই ইসলাম গ্রহণ করুন। শান্তিতে থাকবেন এবং আপনার অধীনে যা কিছু রয়েছে সেসব আপনার জন্যে অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। এ চিঠি পৌছানোর জন্যে সালীত ইবনে আমরকে (রা.) দূত মনোনীত করা হয়। হযরত সালীত, সীলমোহর লাগানো এ চিঠি নিয়ে ইয়ামামার শাসনকর্তা হাওয়া বিন আলীর দরবারে পৌঁছেন। হাওয়া তাকে নিজের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করে মোবারকবাদ জানান। হযরত সালীত চিঠিখানি শাসনকর্তাকে পড়ে শোনান। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে মাঝামাঝি ধরনের কথা বলেন। এরপর বাদশা আল্লাহর রাসূলের কাছে নিম্নরূপ লিখিত জবাব দেন। 'আপনি যে বিষয়ের দাওয়াত দিচ্ছেন, তার কল্যাণ ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত। আরবদের উপর আমার প্রভাব রয়েছে। কাজেই আপনি আমাকে কিছু কাজের দায়িত্ব দিন, আমি আপনার আনুগত্য করব।'
ইয়ামামার শাসনকর্তা হাওয়া আল্লাহর রাসূলের দূতকে কিছু উপঢৌকন প্রদান করেন। সে উপঢৌকনের মাঝে মূল্যবান পোশাকও ছিল। হযরত সালীত (রা.) সেসব নিয়ে আল্লাহর রাসূলের দরবারে আসেন এবং তাঁকে সব কিছু অবহিত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ চিঠি পাঠ শেষে মন্তব্য করেন, সে যদি এক টুকরো জমিও আমার কাছে চায়, তবু আমি তাকে দিব না। সে নিজেও ধ্বংস হবে এবং যা কিছু তার হাতে রয়েছে, সেসবও ধ্বংস হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয় থেকে ফিরে আসার পর হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁকে খবর দেন, বাদশা হাওয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর সাহাবীদের বলেন, শোনো, ইয়ামামায় একজন মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব ঘটবে এবং আমার পরে সে নিহত হবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তাকে কে হত্যা করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এবং তোমার সাথীরা। পরবর্তীকালে আল্লাহর রাসূলের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
📄 দামেশকের শাসনকর্তা হারেস এর কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দামেশকের শাসনকর্তা হারেস বিন আবী শেমার গাসসানীর কাছে প্রেরিত চিঠিতে লিখেন: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে হারেশ ইবনে আবু শেমারের নামে। সে ব্যক্তির প্রতি সালাম, যিনি হিদায়াতের অনুসরণ করেন, ঈমান আনেন এবং সত্যতা স্বীকার করেন। আপনাকে আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনার দাওয়াত দিচ্ছি, যিনি এক অদ্বিতীয় এবং যাঁর কোনো শরীক নেই। আপনাদের জন্যে আপনাদের রাজত্ব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এ চিঠি আসাদ ইবনে খোযায়মা গোত্রের সাথে সম্পর্কিত সাহাবী হযরত শুজা ইবনে ওয়াহাবের (রা.) হাতে প্রেরণ করা হয়। হারেসের হাতে এ চিঠি দেয়ার পর তিনি বলেন, আমার বাদশাহী আমার কাছ থেকে কে ছিনিয়ে নিতে পারে? শীঘ্রই আমি তার বিরুদ্ধে হামলা করতে যাচ্ছি। এ বদনসীব ইসলাম গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে সে ও তার রাজত্ব ধ্বংসে পতিত হয়। বাদশা ও তার রাজ্য পরাভূত ও নিঃশেষ হয়ে যায়।
📄 আম্মানের বাদশাহ জেফারের কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মানের বাদশাহ জেফার এবং তার ভাই আবদের নামেও একখানা চিঠি লিখেন। তাদের পিতার নাম ছিল জুলানদি। চিঠির বক্তব্যে লিখেন: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে জুলানদির দুই পুত্র জেফার ও আবদের নামে। সালাম সে ব্যক্তির উপর, যিনি হিদায়াতের অনুসরণ করেন। অতঃপর আমি আপনাদের উভয়কে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। কেননা আমি সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর রাসূল। যারা জীবিত আছে তাদের পরিণামের দায় দেখানো এবং কাফিরদের জন্যে আল্লাহর কথার সত্যতা প্রমাণের জন্যেই আমি কাজ করছি। ইসলাম গ্রহণ করলে আপনাদেরকেই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখা হবে। যদি অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনাদের বাদশাহী শেষ হয়ে যাবে। আপনাদের ভূখণ্ড ঘোড়ার হামলার শিকার হবে। আপনাদের বাদশাহীর উপর আমার নবুওয়াত বিজয়ী হবে।
এ চিঠি পৌঁছানোর জন্যে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) কে মনোনীত করা হয়। তিনি বলেন, আমি রওনা হয়ে আম্মানে পৌছি এবং আবদের সাথে সাক্ষাৎ করি। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবদে ছিলেন নরম মেজাযের। তাকে বলি, আমি আপনার এবং আপনার ভাইয়ের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে দূত হিসেবে এসেছি। জবাবে তিনি বলেন, আমার ভাই বয়স এবং বাদশাহী, উভয় দিক থেকেই আমার চেয়ে বড় এবং অগ্রগণ্য। কাজেই আমি আপনাকে তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। তিনি নিজেই আপনার আনীত চিঠি পড়বেন। এরপর আবদের সাথে আসের দীর্ঘ আলোচনা হয়। পরদিন পুনরায় বাদশার কাছে যেতে চাই, কিন্তু তিনি ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেননি। আমি ফিরে এসে তার ভাইকে বলি, আমি বাদশার কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। আবদে আমাকে বাদশার কাছে পৌঁছে দেয়। বাদশাহ বলেন, আপনার উপস্থাপিত দাওয়াত সম্পর্কে আমি ভেবে দেখেছি। আমি যদি বাদশাহী এমন একজনের কাছে ন্যস্ত করি, যার সেনাদল এখনো পৌছেনি, তবে আমি আরবে সবচেয়ে দুর্বল ভীরু বলে পরিচিত হব। যদি তার সৈন্যরা এখানে এসেই পড়ে, তবে আমরা তাদের যুদ্ধের সাধ মিটিয়ে দেব। জবাবে আমি বলি, ঠিক আছে, আমি আগামীকাল ফিরে যাচ্ছি। আমার যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর বাদশাহ তার ভাইয়ের সাথে নির্জনে মতবিনিময় করেন। বাদশাহ তার ভাইকে বলেন, এ রাসূল যাদের উপর বিজয়ী হয়েছে, তাদের তুলনায় আমরা কিছুই না। তিনি যার কাছেই পয়গাম পাঠিয়েছেন তিনিই দাওয়াত কবুল করেছেন। পরদিন সকালে পুনরায় আমাকে বাদশার দরবারে ডাকা হয়। বাদশাহ এবং তার ভাই উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ঈমান আনেন। সদাকা আদায় এবং বাদী বিবাদীর মধ্যে ফয়সালা করতে আমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। কেউ আমার বিরোধিতা করলে তারা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা করেন।
এ ঘটনার বিবরণ ও প্রকৃতি দেখে মনে হয়, অন্যান্য সকল বাদশার নিকট চিঠি প্রেরণের পরে আল্লাহর রাসূল এ চিঠি আম্মানের বাদশাহকে প্রেরণ করেছিলেন। সম্ভবত মক্কা বিজয়ের পর এ চিঠি প্রেরণ করা হয়। এ সকল চিঠির মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় তাঁর দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। জবাবে কেউ ঈমান এনেছে, কেউ কুফরীর উপরই অটল থেকেছে। তবে এ সকল চিঠির প্রভাব এটুকু হয়েছে যে, যারা কুফরী করেছে তাদের মনোযোগও এদিকে আকৃষ্ট হয়েছে এবং তাদের কাছে আল্লাহর রাসূলের নাম এবং তাঁর প্রচারিত দ্বীন একটি পরিচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরবর্তীতে চিঠি মারফত দাওয়াত ও তাবলীগের বিষয়টি ইসলামের প্রচার, প্রসার ও বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। এভাবেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা বিশ্বে দাওয়াত ও তাবলীগ করেছেন। দ্বীন ইসলামকে সারাবিশ্বে পৌঁছে দিয়েছিলেন।