📄 মিসরের বাদশাহ মোকাওকিসের কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনকর্তা জোরায়য ইবনে মাত্তা'র কাছে একখানা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। জোরায়যের উপাধি ছিল মোকাওকিস। চিঠির বিবরণে এসেছে: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মোকাওকিস আযম কিবতের নামে। তার প্রতি সালাম যিনি হিদায়াতের আনুগত্য করেন। আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দু'টি পুরস্কার দিবেন। আর যদি ইসলাম গ্রহণ না করেন, তবে কিবতের অধিবাসীদের পাপও আপনার উপর বর্তাবে। হে কিবতীরা, 'এমন একটি বিষয়ের প্রতি এস, যা আমাদের এবং তোমাদের জন্যে সমান। আমরা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত করব না এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করব না। আমাদের মধ্যে কেউ যেন আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কাউকে প্রভু হিসেবে না মানে। যদি কেউ এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, সাক্ষী থাক, আমরা মুসলমান।
এ চিঠি পৌঁছানোর জন্যে হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রা.) কে মনোনীত করা হয়। তিনি মোকাওকিসের দরবারে পৌঁছার পর বলেন, 'এ যমীনে আপনার আগেও একজন শাসনকর্তা ছিলেন, যে নিজেকে রব্বে আ'লা মনে করত। আল্লাহ তা'আলা তাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদের জন্যে দৃষ্টান্ত করেছেন। প্রথমে তার দ্বারা অন্য লোকদের উপর প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে। এরপর তাকে প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কাজেই অন্যের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। এমন যেন না হয়, অন্যরা আপনারা ঘটনা থেকে শিক্ষা লাভ করবে।
মোকাওকিস জবাবে বলেন, আমাদের একটা দ্বীন রয়েছে, যা আমরা পরিত্যাগ করতে পারি না, যতোক্ষণ পর্যন্ত তার চেয়ে উত্তম কোনো দ্বীন পাওয়া না যায়। জবাবে হযরত হাতেব (রা.) বলেন, আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। এ দ্বীনকে আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী সকল দ্বীনের পরিবর্তে যথেষ্ট মনে করেছেন।
এ চিঠির প্রেরক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর কুরাইশরা তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর প্রমাণিত হয়। ইহুদীরা সবচেয়ে বেশী শত্রুতা করে। আর নাসারারা ছিল অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহর শপথ, হযরত মূসা (আ.) যেমন হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন, তেমনি হযরত ঈসা (আ.) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন। আমরা আপনাকে কুরআনের দাওয়াত দিচ্ছি। যেমন আপনারা তাওরাতের অনুসারীদের ইঞ্জীলের দাওয়াত দিয়ে থাকেন। যে নবী যে কওমকে পেয়ে যান, সে কওম সে নবীর উম্মত হয়ে যায়। এরপর সে নবীর আনুগত্য করা উক্ত কওমের জন্যে অত্যাবশ্যক। আপনারা নবাগত নবীর জামানা পেয়েছেন, কাজেই তাঁর আনুগত্য করুন। আপনাকে আমরা দ্বীনে মসীহ থেকে ফিরে আসতে বলছি না। বরং আমরা মূলত সে দ্বীনের দাওয়াতই দিচ্ছি।
মোকাওকিস বলেন, সে নবী সম্পর্কে আমি খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছি, তিনি কোনো অপছন্দীয় কাজের আদেশ দেন না এবং পছন্দনীয় কোনো কাজ করতে নিষেধ করেন না। তিনি পথভ্রষ্ট যাদুকর নন, মিথ্যাবাদী জ্যোতিষীও নন। বরং আমি দেখেছি, তাঁর সাথে নবুয়তের এ নিশানা রয়েছে, তিনি গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করেন এবং অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে খবর দেন। আমি তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে আরো চিন্তা-ভাবনা করব। মোকাওকিস আল্লাহর রসূলের চিঠি নিয়ে হাতীর দাঁতের একটি কৌটায় রাখেন। এরপর মুখ বন্ধ করে সীল লাগিয়ে তার এক দাসীর হাতে দেন। এরপর আরবী ভাষায় এক লিপিকারকে ডেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর কাছে নিম্নোক্ত চিঠি লেখান। পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর নামে মোকাওকিস আযিম কিবত এর পক্ষ থেকে। আপনার প্রতি সালাম। আমি আপনার চিঠি পাঠ করেছি এবং চিঠির বক্তব্য ও দাওয়াত আমি বুঝেছি। জানি, এখনো একজন নবী আসার বাকি রয়েছে। আমি ধারণা করেছিলাম, তিনি সিরিয়া থেকে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতের সম্মান করেছি। আপনার খেদমতে দুই জন দাসী পাঠাচ্ছি। কিবতীদের মধ্যে তাদের যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। আপনার জন্যে কিছু পোশাক এবং সওয়ারীর জন্যে একটি খচ্চরও হাদিয়া পাঠাচ্ছি। আপনার প্রতি সালাম।
মোকাওকিস আর কোন কথা লিখেননি। তিনি ইসলামও গ্রহণ করেননি। তার প্রেরিত দাসীদের নাম ছিল মারিয়া কিবতিয়া এবং সিরীন। খচ্চরটির নাম ছিল দুলদুল। এটি হযরত মোয়াবিয়া (রা.) এর সময় পর্যন্ত জীবিত ছিল। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মারিয়াকে নিজের কাছে রেখেছিলেন ও বিয়ে করেছিলেন। মারিয়ার গর্ভ থেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন এবং শিশুকালেই মৃত্যুবরণ করেন। সিরীনকে কবি হাসসান ইবনে সাবেত আনসারীর কাছে সমর্পণ করা হয়।
📄 পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্য সম্রাট কেসরার কাছেও একখানি চিঠি প্রেরণ করেন। সেখানে লিখেন: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কেসরার নামে। সালাম সে ব্যক্তির প্রতি, যিনি হিদায়াতের আনুগত্য করেন এবং আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস, স্থাপন করেন; এবং সাক্ষ্য দেন, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই। তিনি এক অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই, মুহাম্মদ' তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আপনাকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ আমি সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। যারা বেঁচে আছে তাদের পরিণাম সম্পর্কে ভয় দেখানো এবং কাফিরদের উপর সত্য কথা প্রমাণিত করাই আমার কাজ। কাজেই আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। যদি এতে অস্বীকৃতি জানান, তবে সকল অগ্নি উপাসকের পাপও আপনার উপর বর্তাবে। এ চিঠি নিয়ে যাওয়ার জন্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফা (রা.) কে মনোনীত করা হয়। তিনি চিঠিখানি বাহরাইনের শাসনকর্তার হাতে দেন। বাহরাইনের শাসনকর্তা দূতের মাধ্যমে নাকি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফার মাধ্যমে এ চিঠি সম্রাটের কাছে পৌঁছান। জানা যায় চিঠিখানি কেসরার সম্রাট পারভেজকে পড়ে শোনানোর পর' সে তা ছিঁড়ে ফেলে অহংকারের সাথে বলে, আমার প্রজাদের মধ্যে একজন সাধারণ প্রজা নিজের নাম আমার নামের আগে লিখেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পাওয়ার পর বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা তার বাদশাহী ছিন্নভিন্ন করে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিঃসৃত কথাই হুবহু বাস্তবে পরিণত হয়।
পারস্য সম্রাট ইয়েমেনের গভর্নর বাযানকে লিখে পাঠিয়েছিল; তোমার কাছ থেকে তাগড়া দু'জন লোককে পাঠাও, তারা যেন হেজাযে গিয়ে সে লোককে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসে। বাযান, পারস্য সম্রাটের নির্দেশ পালনের জন্যে দু'জন লোককে তার চিঠিসহ আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রেরণ করে। সে চিঠিতে প্রেরিত লোকদ্বয়ের সাথে কেসরার কাছে হাযির হওয়ার জন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেয়া হয়। বিশ্বনবীর কাছে উভয় আগন্তুক গিয়ে হুমকিপূর্ণ কিছু কথা বলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তভাবে তাদের বলেন, তোমরা আগামীকাল দেখা করো।
এদিকে মদীনায় যখন এ ঘটনা চলছে, ঠিক তখন পারস্যে খসরু পারভেজের পারিবারিক বিদ্রোহ কলহ তীব্র রূপ ধারণ করে। কায়সারের সৈন্যদের হাতে পারস্যের সৈন্যরা একের পর এক পরাজয় স্বীকার করছিল। এমতাবস্থায় পারস্য সম্রাট কেসরার পুত্র শেরওয়াহ পিতাকে হত্যা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। ঘটনা ছিল মঙ্গলবার রাত, সপ্তম হিজরীর ১০ই জমাদিউল আউয়াল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহীর মাধ্যমে এ খবর পেয়ে যান। পরদিন সকালে পারস্য সম্রাটের আগন্তক প্রতিনিধিদ্বয় আল্লাহর রাসূলের দরবারে এলে তিনি তাদের এ খবর জানান। তারা বলেন, আপনি এসব আবোল-তাবোল কি বলছেন? এর চেয়ে মামুলী কথাও আমরা আপনার অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছি। আমরা কি আপনার এ কথা বাদশার কাছে লিখে পাঠাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, লিখে দাও। সাথে সাথে একথাও লিখে দাও, আমার দ্বীন এবং আমার হুকুমত সেখানেও পৌঁছবে, যেখানে তোমাদের বাদশাহ পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়; বরং এমন জায়গায় গিয়ে থামবে, যার আগে উট বা ঘোড়া যেতে পারে না। তোমরা তাকে একথাও জানিয়ে দিয়ো, যদি তোমরা মুসলমান হয়ে যাও, তবে যা কিছু তোমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেসব আমি তোমাদের দিয়ে দেবো এবং তোমাদের কওমের পছন্দের কাউকে বাদশাহ করে দেব। উভয় দূত এরপর মদীনা থেকে ইয়েমেনে বাযানের কাছে গিয়ে তাকে সব কথা জানায়। এরপরই ইয়েমেনে এক চিঠি এসে পৌঁছায়, শেরওয়াহ তার পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেছেন। নতুন সম্রাট তার চিঠিতে ইয়েমেনের গভর্নর বাযানকে এ নির্দেশও দিয়ে ছিলেন, আমার পিতা যার সম্পর্কে অহংকারপূর্ণ কথা লিখেছেন, পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে বিরক্ত করবেন না। এ ঘটনায় বাযান এবং তার পারস্যের বন্ধু-বান্ধব, যারা সে সময় ইয়েমেনে উপস্থিত ছিল, সকলেই মুসলমান হয়ে যায়।
📄 রোম সম্রাট কায়সারের কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
বুখারীর এক দীর্ঘ হাদীসে এ চিঠির বিবরণ উল্লেখ রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে যে চিঠি লিখেছিলেন, সে চিঠিতে লেখা ছিল: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। সালাম সে ব্যক্তির প্রতি, যিনি হিদায়াতের আনুগত্য করেন। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে শান্তিতে থাকবেন এবং দ্বিগুণ পুরস্কার পাবেন। যদি অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনার প্রজাদের পাপও আপনার উপর বর্তাবে। হে আহলে কিতাব, এমন একটি বিষয়ের প্রতি আস, যা আমাদের ও তোমাদের জন্যে একই সমান। সেটি হচ্ছে, আমরা আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা ও আনুগত্য করব না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করব না। আল্লাহ ব্যতীত আমাদের কেউ পরস্পরকে এবং অন্য কিছুকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করব না, যদি লোকেরা অমান্য করে তবে তাদের বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি।
এ চিঠি পৌছানোর জন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত দেহইয়া ইবনে খলীফা কালবী (রা.) কে মনোনীত করেন। তাকে বলা হয়, তিনি যেন এ চিঠি বসরার শাসনকর্তার হাতে দেন। বসরার শাসনকর্তা এটা সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে পৌঁছে দিবেন। এরপর যা কিছু হয়েছে, তার বিবরণ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব তাকে বলেছেন, সম্রাট হিরাক্লিয়াস তাকে কুরাইশদের একদল লোকের সাথে তার দরবারে আমন্ত্রণ জানান। হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তানুযায়ী এ কাফেলা ব্যবসার মালামাল নিয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিল। সম্রাট (হিরাক্লিয়াস) এর আহ্বানে কাফেলার লোকজন ইলিয়ায় (বায়তুল মোকাদ্দাসে) তার দরবারে হাযির হয়। সম্রাট তাদের কাছে বসান। সে সময় তার আশেপাশে দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
সম্রাট হিরাক্লিয়াস মক্কার বাণিজ্য প্রতিনিধি দলকে সমনে রেখে তার দোভাষীকে তলব করেন। এরপর দোভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞেস করেন, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন তার সাথে বংশগত সম্পর্কের দিক থেকে তোমাদের মধ্যে কে অধিক নিকটবর্তী? আবু সুফিয়ান বলেন, আমি তখন বাদশাহকে বলি, আমিই বংশগত দিক থেকে তার অধিক নিকটবর্তী। হিরাক্লিয়াস তখন বলেন, তুমি আমার কাছাকাছি এসো। তিনি বলেন, এর সঙ্গীদের পিছনে বসাও। এরপর হিরাক্লিয়াস তার দোভাষীকে বলেন, এ লোকটিকে আমি সে নবীর দাবীদার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। যদি সে কোন কথার জবাবে মিথ্যা বলে, তবে তার সঙ্গীদের বলে দাও, তারা যেন সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করে। আবু সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর শপথ, যদি মিথ্যা বলার দুর্নাম হওয়ার ভয় না থাকত, তবে আমি তাঁর সম্পর্কে অবশ্যই মিথ্যা বলতাম। হিরাক্লিয়াসের সাথে আবু সুফিয়ানের দোভাষীর উপস্থিতিতে বিশদ আলোচনা হয়। এরপর হিরাক্লিয়াস তার দোভাষীকে বলেন, এ লোকটিকে বল, আমি যখন নবুওয়াতের দাবীদারের বংশ মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তখন সে বলেছে, তিনি উচ্চ বংশ ও মর্যাদাসম্পন্ন। নিয়ম হচ্ছে, নবী রাসূলগণ উচ্চ বংশ ও মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের মধ্য থেকেই প্রেরিত হয়ে থাকেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর আগে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ এ ধরনের কথা বলেছিল কিনা। সে বলেছে, বলেনি। যদি সে অন্য কারো বলা কথারই পুনরাবৃত্তি করত, তবে আমি বলতাম, এ লোকটি অন্যের বলা কথারই প্রতিধ্বনি করছে। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তার বাপ-দাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিল কিনা? সে বলেছে না, ছিল না। যদি তার বাপ-দাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ থাকত, তবে আমি বলতাম, এ লোক বাপ-দাদার বাদশাহী লাভের আকাঙ্ক্ষা করছে। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তিনি যা বলেছেন এর আগে তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করেছিলে কিনা? সে বলেছে, না। কাজেই মানুষের ব্যাপারে যিনি মিথ্যা কথা বলেন না। তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে মিথ্যা বলবেন, এটা হতেই পারে না। আমি একথাও জিজ্ঞেস করেছি, বড়লোকেরা তার আনুগত্য করছে, নাকি দুর্বল লোকেরা? সে বলেছে দুর্বল লোকেরা। প্রকৃতপক্ষে দুর্বল লোকেরাই নবী রাসূলের আনুগত্য করে। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তার দ্বীন গ্রহণের পর কেউ মোরতাদ (বেদ্বীন) হয়েছে কিনা? সে বলেছে, না। প্রকৃতপক্ষে ঈমানের সজীবতা অন্তরে প্রবেশের পর এরকমই হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তিনি চুক্তি অংগীকার ভংগ করেন কিনা? সে বলেছে, না। প্রকৃতপক্ষে নবী রাসূল এরকমই হয়ে থাকেন। তারা চুক্তি অংগীকার ভংগ করেন না। আমি জিজ্ঞেস করেছি, তিনি কি কি কাজের আদেশ দিয়ে থাকেন? সে বলেছে, তিনি আমাদের আল্লাহর ইবাদাতের, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার আদেশ করেন, মূর্তিপূজা নিষেধ করেন এবং নামায, সত্যবাদিতা, পরহেযগারী, পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতার আদেশ দেন। সে যা কিছু বলেছে, যদি এসব সত্য হয়ে থাকে, তবে তিনি খুব শীঘ্রই আমার দুই পায়ের নীচের জায়গারও মালিক হয়ে যাবেন। আমি জানতাম, এ নবী আসবেন, কিন্তু আমার ধারণা ছিল না, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই আসবেন। আমি যদি নিশ্চিত জানতাম তাঁর কাছে পৌছতে পারব, তবে তাঁর সাথে সাক্ষাতের কষ্ট স্বীকার করতাম এবং তাঁর কাছে থাকলে তাঁর দুই চরণ ধুয়ে দিতাম।
এরপর হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি চেয়ে নিয়ে পাঠ করেন। তিনি চিঠি পড়া শেষ করতেই সেখানে শোরগোল এবং উচ্চৈঃস্বরে কথাবার্তা শুরু হয়। এরপর হিরাক্লিয়াসের আদেশে আমাদেরকে (অর্থাৎ আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে) সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। বাইরে এসে সঙ্গীদের আমি বললাম, আবু কাবশার পুত্রের ঘটনা তো দেখছি বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাকে তো দেখছি বনু আসফারের (রোমানদের) বাদশাও ভয় পায়।
এরপর আমি সব সময় এ বিশ্বাস পোষণ করতাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীন বিজয়ী হবেই। আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরপর আমার মাঝে ইসলামের আলো জ্বেলে দিয়েছেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি আল্লাহর রাসূলের প্রেরিত চিঠির প্রভাবই ছিল আবু সুফিয়ানের এ বিবরণী যা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এ চিঠির আরেকটি প্রভাব এও ছিল যে, সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র বাহক হযরত দেহইয়া কালবী (রা.) কে বেশ কিছু মালামাল ও কাপড় চোপড় প্রদান করেন। হযরত দেহইয়া (রা.) সেসব নিয়ে মদীনায় ফেরার পথে, হুসমা নামক জায়গায় জুযام গোত্রের কিছু লোক ডাকাতি করে সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মদীনায় পৌঁছে হযরত দেহইয়া (রা.) নিজের বাড়ীতে না গিয়ে প্রথমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে গিয়ে সব কথা ব্যক্ত করেন। সব শুনে বিশ্বনবী হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) এর নেতৃত্বে পাঁচশ সাহাবীকে হুসমা অভিযানে প্রেরণ করেন। হযরত যায়েদ (রা.) জুযাম গোত্রের লোকদের উপর নৈশ আক্রমণ চালিয়ে তাদের বেশ কিছু লোককে হত্যা করেন। এরপর তাদের পশুপাল ও মহিলাদের হাঁকিয়ে নিয়ে আসে। পশুপালের মধ্যে এক হাজার উট ও পাঁচ হাজার বকরী এবং বন্দীদের মধ্যে একশ নারী ও শিশু ছিল।
📄 বাহরাইনের শাসনকর্তা মোনযের এর কাছে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহরাইনের শাসনকর্তা মোনযের ইবনে সাওয়ার এর নামে চিঠি লিখে তাকেও ইসলামের দাওয়াত দেন। এ চিঠি হযরত আলা ইবনে হাযরামীর হাতে প্রেরণ করা হয়েছিল। জবাবে মোনযের লিখেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার চিঠি আমি বাহরাইনের অধিবাসীদের পড়ে শুনিয়েছি। কিছু লোক ইসলাম পছন্দ করেছে, পবিত্রতার দৃষ্টিতে দেখেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে। আবার অনেকে পছন্দ করেনি। এখানে ইহুদী এবং অগ্নি উপাসকও রয়েছে। আপনি ওদের ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ দিন। এর জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিঠি লিখেন: পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মোনযের ইবনে সাওয়ার নামে। আপনার প্রতি সালাম। আমি আপনার কাছে আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। অতঃপর আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি ভালো কাজ করবে, সে তা নিজের জন্যেই করবে। যে ব্যক্তি আমার দূতদের আনুগত্য করবে এবং তাদের আদেশ মান্য করবে, সে ব্যক্তি যেন আমারই আনুগত্য করেছে। যারা আমার দূতদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে, তারা আমার সাথেই ভাল ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হবে। আমার দূতরা আপনার প্রশংসা করেছেন। আপনার জাতি সম্পর্কে আপনার সুপারিশ আমি গ্রহণ করেছি। কাজেই মুসলমানরা যে অবস্থায় ঈমান এনেছে তাদের সে অবস্থায় ছেড়ে দিন। আমি দোষীদের ক্ষমা করে দিয়েছি, আপনিও তাদের ক্ষমা করুন। আপনি যতদিন সঠিক পথ অনুসরণ করবেন, ততদিন আমি আপনাকে পদ থেকে বরখাস্ত করব না। যারা ইহুদীদের ধর্মকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে অথবা অগ্নি উপাসনার উপর কায়েম রয়েছে, তাদের জিযিয়া (কর) দিতে হবে।