📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বনু কুরাইয়ার যুদ্ধ

📄 বনু কুরাইয়ার যুদ্ধ


আহযাব বা খন্দক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নিজের ঘরে পৌঁছলেন। তখন যুহরের নামাযের সময় হযরত জিব্রাঈল (আ.) এসে আল্লাহর হুকুম শুনালেন। এখনই হাতিয়ার কোষবদ্ধ করা ঠিক নয়। বনু কুরাইযার ব্যাপারটি এখনই চুকিয়ে নেয়া আবশ্যক। এ নির্দেশ পেয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনতিবিলম্বে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। যারাই অনুগত্যশীল আছ, তারা যেন বনু কুরাইযার অঞ্চলে না পৌঁছা পর্যন্ত আসরের নামায আদায় না করে। এ ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলীর (রা.) সাথে অগ্রবর্তী এক বাহিনী সে অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। তারা যখন সেখানে পৌঁছলেন তখন দেখলেন ইহুদী লোকেরা ঘরের ছাদে উঠে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদেরকে নানা রকম গালাগাল করছে। হযরত আলীর (রা.) বাহিনী দেখে তারা মনে করছিল যে, তাদেরকে শুধু ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই এটা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু একটু পরে স্বয়ং রাসূলের নেতৃত্বে যখন সমগ্র মুসলিম বাহিনী সেখানে উপস্থিত হল এবং তাদের পুরো এলাকাকে পরিবেষ্টন করে নিল, তখন তাদের প্রাণ উড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। অবরোধের তীব্রতা ইহুদীরা দু'তিন সপ্তাহের অধিককাল সহ্য করতে পারল না। শেষ পর্যন্ত তারা এ শর্তে নিজেদেরকে রাসূলের হাতে অর্পণ করল যে, আউস গোত্রের সরদার হযরত সা'দ বিন মু'য়ায (রা.) তাদের সম্পর্কে যে ফয়সালা দিবে তারা তা মেনে নিবে।

হযরত সা'দ (রা.) কে তারা শালিস মেনে ছিল এ আশায় যে, জাহেলিয়াত যুগে আওস ও বনু কুরাইযার মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। সেদিকে খেয়াল করে হয়ত তিনি কিছুটা উদারতা দেখাবেন। ইতোপূর্বে বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রদ্বয় যেভাবে মদীনা হতে চলে গিয়েছিল; হয়ত অনুরূপভাবে তাদেরও চলে যেতে, তিনি ফয়সালা দিবেন। আওস গোত্রের লোকেরা হযরত সা'দ এর নিকট মিত্র গোত্রের প্রতি উদার নীতি গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালো। কিন্তু হযরত সা'দ নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছিলেন যে, মদীনা হতে যে দু'টি গোত্র চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল; তারা চতুর্দিকের সমগ্র গোত্র-কবিলাকে উত্তেজিত করে দশ হাজার সৈন্যের বাহিনী তৈরি করে মদীনার উপর চড়াও হয়েছিল। এরা সে অভিশপ্ত ইহুদী, যারা কঠিন মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করে মদীনাকে ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এসব কারণেই তিনি যুক্তিসঙ্গত ফয়সালা দিলেন। বনু কুরাইযার পুরুষদের হত্যা করার ফয়সালা দিলেন। নারী ও শিশুদেরকে দাস দাসী বানিয়ে নেয়ার এবং তাদের যাবতীয় ধন সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করার ফয়সালা দিলেন। আর এ ফয়সালাকে কার্যকর করার জন্য, মুসলমানরা যখন বনু কুরাইযার মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করল। তখন ভয়ঙ্কর কিছু তথ্য উৎঘাটিত হল। বিগত পরিখা যুদ্ধে কাফিরদের পক্ষে অংশগ্রহণের জন্য এ বিশ্বাসঘাতকরা ১৫শ তরবারী, তিনশ বর্ম, দু'হাজার বল্লম এবং ১৫শ ঢাল সংগ্রহ করেছিল। আল্লাহ যদি মুসলমানদের সহায়তা না করতেন, আর মুশরিকরা যদি চূড়ান্তভাবে পরিখা অতিক্রম করত, ঠিক সে মুহূর্তে বনু কুরাইযা পশ্চাৎ দিক হতে আক্রমণ করার জন্য এসব অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহার করত। এজন্যে আল্লাহপাক বলেন, যদি শত্রু পক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত; তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না (সূরা আহযাব-১৪)। বনু কুরাইযার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিচার করেননি। ইহুদীদের মনোনীত ব্যক্তির হাতে তাদের বিচার ভার অর্পণ করেছিলেন। এতখানি অধিকার নিশ্চয়ই কোন অপরাধীকে কোথাও দেয়া হয়নি। সা'দ (রা.) যদি ইহুদীদেরকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিতেন, তবু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নির্বিবাদে ও স্বত্বস্ফূর্তভাবে মেনে নিতেন। ফলে এ সম্বন্ধে তাদের পক্ষ হতে কোন কিছুই আর বলার ছিল না। আল্লাহ বলেন, কিতাবীদের মধ্য হতে যারা কাফিরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি ওদের দুর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং ওদের অন্তরে ভীতি প্রবেশ করালেন। ফলে তোমরা একদলকে হত্যা করেছ এবং একদলকে বন্দী করেছ। তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘরবাড়ির, ধন সম্পত্তির এবং এমন এক ভূখণ্ডের মালিক করে দিলেন যেখানে তোমরা অভিযান করনি। (সূরা আহযাব: ২৬-২৭)

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি


মুশরিকদের সম্মিলিত বাহিনী ও বনু কুরাইযার পরাজয়ের পর মুসলমানরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সমর্থ হন। তাদের মধ্যে তখন পবিত্র কা'বা যিয়ারত ও নিজেদের মাতৃভূমিকে এক নজর দেখার জন্য অদম্য ইচ্ছা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতোমধ্যে একদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযের পর তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন কাবাঘর যিয়ারত করছেন। মক্কায় সাহাবাদেরকে নিয়ে ওমরা আদায় করছেন। নবীর স্বপ্ন এক প্রকার ওহী। ফলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বপ্নের কথা শুনার পর মুসলমানদের অন্তরে আগ্রহ আরো অধিক বৃদ্ধি পায়। অবশেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬ষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসের প্রথম দিকে ১৪শ সাহাবীর কাফেলা নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। সাথে নেন কুরবানীর পশু। সাহাবীদের কাছে ছিল একটি করে তরবারী ও ইহরামের কাপড়। যুল হুলাইফাতে পৌঁছে সবাই ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধেন। কুরবানীর জন্য ৭০টি উট নির্ধারিত ছিল। এসব উটের গলায় মুসলমানরা কুরবানীর চিহ্নস্বরূপ কিলাদা লটকিয়ে দেন।

অথচ মক্কার কাফিররা মুসলমানদের এ নেক নিয়তকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের ধারণা হয়, এ ছলনায় হয়ত মুসলমানরা মক্কা শরীফ দখল করতে চাচ্ছে। তাই তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনক্রমেই মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরামা বিন আবু জাহেলের নেতৃত্বে বিরাট এক সৈন্য দল প্রেরণ করে কাফিররা। তারা মুসলমানদের পথ রোধ করে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পেয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে 'হুদাইবিয়ায়' এসে উপনীত হন। বিশ্বনবী সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করার জন্য হযরত ওসমান (রা.) কে মক্কায় প্রেরণ করেন। ইতোমধ্যে কাফিররা, মুসলিম শিবিরে, আকস্মিকভাবে কয়েকটি হামলা চালিয়ে সাহাবীদেরকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রিয়নবী বার বার ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে তাদের সে অপকৌশল ব্যর্থ করে দেন।

অপরদিকে হযরত ওসমান (রা.) মক্কায় গিয়ে কাফিরদের ব্যাখ্যা করেন যে, মুসলমানরা রক্ত পাত করার জন্য মক্কায় আসছে না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল, কা'বা শরীফ যিয়ারত করা। কিন্তু কুরাইশরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ওসমানকে (রা.) আটক করে। এদিকে মুসলিম শিবিরে রটে যায় যে, হযরত ওসমানকে শহীদ করা হয়েছে। তাঁর ফিরে না আসায় মুসলমানরাও নিশ্চিত হয়ে যায়, খবরটা সত্য। মুসলমানদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। এসময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নিচে বসে সাহাবীদের থেকে এ মর্মে বাইআত গ্রহণ করেন যে, তারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে প্রস্তুত। তারা এখান থেকে আমৃত্যু পিছু হটবে না। অবস্থার নাজুকতা বিচারে এটা সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, এটা কোন মামলি বাইআত ছিল না। সাহাবীরা সংখ্যায় মাত্র ১৪শ। নিজ নিজ তরবারী (যা বহন করা বৈধ ছিল) ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধ সরঞ্জাম তাদের সাথে ছিল না। তারা সেদিন নিজেদের এলাকা থেকে আড়াইশ মাইল দূরে একেবারে মক্কার সীমান্তে উপনীত ছিল। যেখানে শত্রুপক্ষ পূর্ণশক্তি নিয়ে আক্রমণ করতে সামর্থ্য ছিল। এসব প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও কাফেলার সবাই নবীর হাতে হাত রেখে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত ছিল। তাদের নিষ্ঠাপূর্ণ ঈমান এবং আল্লাহর পথে নিবেদিত প্রাণ হওয়ার; এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? এটাই ইসলামের ইতিহাসে 'বাইআতে রিদওয়ান' নামে খ্যাত। বস্তুত মহান আল্লাহ মুসলমানদের এ দীপ্ত চেতনা ও শহীদী প্রেরণায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ঘোষণা দিলেন, আল্লাহ মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা একটি গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল। (সূরা ফাতাহ-১৮)

মুসলমানদের এ সংবাদ ক্রমে ক্রমে 'মক্কায় পৌঁছে গেল। এতে মক্কার মুশরিকরা ভীত ও আতংকিত হয়ে গেল। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের নিকট খবর পৌঁছাল যে, ওসমানকে হত্যা করার সংবাদ মিথ্যা। এরপরই হযরত ওসমান ফিরে আসেন। কুরাইশদের পক্ষ থেকে সন্ধির আলোচনা করার জন্য কিছু প্রস্তাব নিয়ে সুহাইল বিন আমরের নেতৃত্বে কাফিরদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়। কুরাইশরা তাদের জিদ এবং একগুয়েমি পরিত্যাগ করে। তবে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে এবং বলতে থাকে; বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন এ বছর ফিরে যান। তাহলে আগামী বছর তিনি ওমরার জন্য আসতে পারেন। এরপর দীর্ঘ আলোচনার পর কিছু শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি পত্র লেখা হয়। শর্তগুলো ছিল এরূপঃ (১) দশ বছরের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোন তৎপরতা চালাবে না।
(২) কুরাইশদের থেকে যারা মুসলমানদের দলভুক্ত হতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কুরাইশদের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের কেউ কুরাইশদের দলভুক্ত হলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে না। (৩) এ বছর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দল বল নিয়ে ওমরা না করে ফিরে যাবেন এবং আগামী বছর ওমরার জন্য এসে মাত্র তিনদিন মক্কায় অবস্থান করবেন। সে সময় মক্কাবাসীরা মুসলমানদের জন্য স্থান খালি করে দিবেন। তাদের সঙ্গে তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র থাকতে পারবে না। (৪) যে কোন আরব গোত্র যে কোন পক্ষের মিত্র হয়ে এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তাদের সে অধিকার থাকবে।

এসব শর্তে যখন সন্ধি চুক্তিটি চূড়ান্ত হচ্ছিল, তখন মুসলমানদের পুরো বাহিনী অত্যন্ত বিচলিত ও অপমান বোধ করছিল। যে মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐসব শর্ত মেনে নিচ্ছিলেন, তা কেহই বুঝে উঠতে পারে নি। এ সন্ধির ফলে যে বিরাট কল্যাণ অর্জিত হতে যাচ্ছিল, তা দেখতে পাওয়ার মত দূর দৃষ্টি, সে মুহূর্তে সাহাবীদের ছিল না। এমনকি হযরত ওমরের (রা.) মত গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞানীজনের অবস্থাও ছিল নাজুক। তিনি বিচলিত হয়ে হযরত আবু বকরের নিকট গিয়ে বললেন, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন? আমরা কি মুসলমান নই? এসব লোক কি মুশরিক নয়? এসব সত্ত্বেও আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এ অবমাননা মেনে নেব কেন? এমন কি ওমর (রা.) স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে তাঁকেও অনুরূপ প্রশ্ন করেছিলেন।

চুক্তির দু'টি শর্ত (২নং ও ৩নং) মুসলমানদের জন্য বাহ্যিকভাবে নেহাত অবমাননাকর ছিল বৈকি। সন্ধির ঘটনাটি জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মত হয়েছিল। যখন সন্ধি চুক্তিটি লিপিবদ্ধ হচ্ছিল, ঠিক তখন সুহাইল বিন আমরের পুত্র আবু জানদাল কোন প্রকারে পালিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিবিরে গিয়ে হাজির হন। তখন তিনি পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় ছিলেন। আর দেহে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সরাসরি আবেদন জানান। আমাকে এ বন্দীদশা থেকে মুক্ত করুন। এ করুণ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে ধৈর্যধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মুশরিক প্রতিনিধি সুহাইল বিন আমর বলে, চুক্তি পত্র লেখা শেষ না হলেও চুক্তির শর্তাবলী স্থির হয়ে গেছে। তাই এ ছেলেকে আমার হাতে অর্পণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যুক্তি মেনে নিলেন এবং আবু জানদালকে যালিমের হাতে তুলে দিলেন।

সন্ধি চুক্তি শেষ করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেন, তোমরা এখানে কুরবানী করে মাথা মুড়িয়ে এহরাম ভেঙ্গে ফেল। কিন্তু কেউই জায়গা থেকে একটুও নড়লেন না। এভাবে তিনি তিনবার আদেশ দিলেন। কিন্তু সাহাবারা বিমূঢ় রইলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিচ্ছেন, আর তা পালনের জন্য সাহাবারা তৎপর হচ্ছেন না; এমন ঘটনা এ একটি ক্ষেত্র ছাড়া বিশ্বনবীর পুরো নবুওয়াতী জীবনে আর কখনো ঘটেনি। এতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দুঃখ পান। তাঁবুতে গিয়ে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালামার কাছে তা প্রকাশ করলেন। উম্মুল মু'মিনীন বলেন, আপনি চুপ চাপ গিয়ে নিজের উট কুরবানী করুন এবং ক্ষৌরকার ডেকে মাথা মুড়ান। তাহলে সবাই আপনাকে দেখে অনুসরণ করবে।

আশ্চর্যজনকভাবে হলও তাই। সাধ্যানুযায়ী সবাই কুরবানী করে এবং মাথা মুড়িয়ে এহরাম থেকে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু দুঃখ ও মর্ম যাতনায় তাদের হৃদয় চৌচির হয়ে রইল। সাহাবীরা কোনভাবেই নিজেদেরকে বুঝ দিতে পারলেন না। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই চুপ করে রইল। এই ছিল ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি।

এরপর কাফেলা যখন হুদাইবিয়া ত্যাগ করে মদীনার দিকে ফিরে যাচ্ছিল তখন 'দাজনান' বা 'কুরাউল গাসীম' নামক স্থানে এ চুক্তিকে প্রকাশ্য বিজয় বলে সূরা ফাতাহের আয়াত নাযিল হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে একত্রিত করে বলেন, আজ আমার উপর এমন জিনিস নাযিল হয়েছে, যা আমার জন্য দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও বেশি মূল্যবান। তারপর তিনি সূরা ফাতাহ পাঠ করেন। বিশেষ করে হযরত ওমরকে ডেকে তা শুনান। এখানে আল্লাহপাকের সরাসরি ঘোষণা ছিল, হে নবী! আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যাতে আল্লাহ আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি বিচ্যুতি মাফ করে দেন (সূরা ফাতাহ : ১-২)। এ আয়াত শুনে হযরত ওমর জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি বিজয়? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ সে মহান সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, এটা অবশ্যই বিজয়। তিনি আরো বলেন তোমরা একেবারে মুশরিকদের বাড়ির দরজায় গিয়ে হাজির হয়েছিলে। তারা আগামী বছর ওমরা করতে দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে তোমাদেরকে ফিরে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সন্ধি করার জন্য তারা নিজেরাই ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। অথচ তাদের মনে তোমাদের প্রতি যে শত্রুতা রয়েছে তা অজানা নয়। সে দিনের কথা ভুলে গেলে, যে দিন আহযাব যুদ্ধে শত্রুরা সব দিক থেকে চড়াও হয়েছিল এবং তোমাদের শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল? (বায়হাকী)

হুদাইবিয়ার সন্ধি যে প্রকৃতই বিজয় ছিল, তা কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রকাশ পেয়ে যায়। সব শ্রেণীর মানুষ পুরাপুরি বুঝতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকেই ইসলামের বিজয় সূচিত হয়েছে। মূলতঃ সন্ধির শর্ত মোতাবেক দশ বছরের শান্তি প্রতিষ্ঠার কারণে ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে। ব্যাপকভাবে দাওয়াতের কাজ চলে। সপ্তম ও অষ্টম হিজরীতে মুসলমানদের সংখ্যা দশগুণ বেড়ে যায়। আর মক্কা বিজয়ের সূচনাও হুদাইবিয়ার সন্ধি থেকেই হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ আরো বলেন, হে নবী! যারা আপনার হাতে বাইয়াত করেছিল, প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর কাছেই বাইয়াত করেছিল। তাদের হাতের উপর ছিল আল্লাহর হাত। যে এ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে, অশুভ পরিণাম তার নিজের উপরেই বর্তাবে। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত এ প্রতিশ্রুতি পালন করবে, আল্লাহ অচিরেই তাকে বড় পুরস্কার দান করবেন (সূরা ফাতাহ-১০)। অর্থাৎ সে সময় লোকেরা যে হাতে বাইয়াত করছিল, তা ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ছিল না। আল্লাহর প্রতিনিধির হাত ছিল এবং রাসূলের মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর সাথে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আল্লাহপাক বলেন, আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল। তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন। তাই তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করবেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ দান করবেন- যা তারা অচিরেই লাভ করবে (সূরা ফাতাহ-১৮ ও ১৯)। যে গাছটির নিচে বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল, পরবর্তীতে লোকজন এসে সে গাছের নিচে নামায পড়তে শুরু করেছিল, বিষয়টি জানতে পেরে হযরত ওমর (রা.) লোকদের তিরস্কার করেন এবং গাছটি কেটে ফেলেন।

আল্লাহর এ পুরস্কারটি কেবল বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ কারণে ৭ম হিজরীতে মুসলমানরা যখন খায়বার আক্রমণের জন্য যাত্রা করেন, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল তাদেরকেই সাথে নিলেন যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীক ছিলেন। হুদাইবিয়ার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে (হুদাইবিয়ার) এ বিজয় দিয়েছেন যে, তোমাদের বিরুদ্ধে মানুষের হাত উত্তোলনকে থামিয়ে দিয়েছেন, যাতে মু'মিনদের জন্য তা একটি নিদর্শন হয়ে থাকে এবং আল্লাহ তাদেরকে সোজা পথের হিদায়াত দান করেন (সূরা ফাতাহ-২০)। আল্লাহপাক সেদিন কাফির কুরাইশদের এতটা সাহস দেননি যে, হুদাইবিয়াতে তারা মুসলমানদের সাথে লড়াই বাঁধিয়ে বসতে পারে। অথচ সব কিছুই তাদের অনুকূলে ছিল। আর মুসলমানরা ছিল প্রতিকূল অবস্থায় এবং তাদের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল। এ অবস্থায় আল্লাহ মুসলমানদেরকে সহজভাবে বিজয় দান করেছেন। তাই আল্লাহ বলেন, এ মুহূর্তে যদি কাফিররা তোমাদের সাথে লড়াই বাঁধিয়ে বসতো, তবে অবশ্যই তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করত এবং কোন সহযোগী ও সাহায্যকারী পেত না (সূরা ফাতাহ-২২)। এছাড়া আল্লাহ তোমাদেরকে আরও গনীমতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা তোমরা এখনো লাভ করতে পারনি। কিন্তু আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান (সূরা ফাতাহ: ২১)। এখানে আল্লাহপাক মক্কা বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত দান করেছেন। অর্থাৎ মক্কা এখনো তোমাদের করায়ত্ব হয়নি। তবে মক্কাকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং হুদাইবিয়ার বিজয়ের ফলশ্রুতিতে তাও তোমাদের করায়ত্ত হবে। এরই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মক্কা বিজয়ের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, তিনি সে সত্তা যিনি মক্কা ভূমিতে তাদের হাত তোমাদের থেকে; আর তোমাদের হাত তাদের থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাদের উপর তোমাদের আধিপত্য দান করার পর (সূরা ফাতাহ : ২৪)। অতঃপর রাসূলের ওমরা করার স্বপ্ন যে সত্য ছিল; সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মহান প্রতিপালক বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন যা ছিল সরাসরি হক। ইনশাআল্লাহ তোমরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে। নিজের মাথা মু ন করবে, চুল কাটবে এবং তোমাদের কোন ভয় থাকবে না। তোমরা যা জানতে না, তিনি তা জানতেন। তাই স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করার পূর্বে তিনি তোমাদেরকে এ আসন্ন বিজয় দান করেছেন (সূরা ফাতাহঃ ২৭)। অর্থাৎ পরের বছর ৭ম হিজরীর যিলকাদ মাসে এ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়। ইতিহাসে এ ওমরাকে ওমরাতুল কাযা বলা হয়। ইসলামের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে, কাফির ও মুশরিকদের সাথে এমন সন্ধি স্থাপনে বাহ্যিক দৃষ্টিতে পরাজয় বরণ মনে হলেও; সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বুঝা যায় যে, পরিণামে তা مسلمانوں জন্য স্পষ্ট বিজয়ের কারণ হয়েছে। যেমন হুদাইবিয়ার সন্ধির পর তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

অনেক সময় আমাদের বাহ্যিকভাবে কোন কিছুকে, হীনতা ও অপমানকর বলে মনে হলেও, পরবর্তীতে তা আল্লাহ তা'আলার নিকট ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য উত্তম ও সম্মানের হয়ে থাকে। আবার অনেক সময় তার বিপরীতও হয়ে থাকে। তাই مسلمانوں কর্তব্য হল, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশকে উত্তম আদর্শরূপে মেনে নেয়া এবং সেভাবেই অনুকরণ ও অনুসরণ করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, অনেক সময় কোন কিছুকে তোমরা অপছন্দ কর, অথচ তোমাদের জন্য তা কল্যাণকর। আবার অনেক সময় কোনকিছুকে ভাল মনে কর, অথচ তোমাদের জন্য তা খারাপ (আল কুরআন)। ইসলাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করে এবং তা দুনিয়াতে সম্মান দিতে পারে না। আর পরকালেও মঙ্গল বয়ে আনে না। কুরআনের নির্দেশ হল, অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয় অঙ্গীকারের জন্য প্রশ্ন করা হবে (সূরা বনী ইসরাঈল)। যারা সংখ্যায় স্বল্পতা সত্ত্বেও, ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গ ও সত্যের বিশ্বাসী হয়ে বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন; তারা ইহ ও পরকাল-উভয় জগতে সফলকাম হয়েছিলেন।

আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সুফল নষ্ট করেন না। ইসলাম শান্তি র ধর্ম। তার প্রমাণ হুদাইবিয়ার সন্ধির মধ্যে পাওয়া যায়। মুসলিম জাতি নিজেদের আখলাক, আমল, কার্যকলাপ এবং কথা বার্তায় সমকালীন সমস্ত জাতি ও ধর্মালম্বীদের চেয়ে অধিক উন্নত। এ ব্যাপারটি হুদায়বিহার সন্ধির মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হয়েছ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00