📄 ওহুদের যুদ্ধ
বদরের যুদ্ধ ছিল মুসলমান এবং মুশরিকদের মধ্যে প্রথম সশস্ত্র ও মর্যাদা নির্ধারণী সংঘর্ষ। এতে মুসলমানরা 'ফাতহে মুবিন' অর্থাৎ সুস্পষ্ট বিজয় লাভ করেন। সমগ্র আরব জাহান এ বিজয় প্রত্যক্ষ করেছে। এ যুদ্ধের ফলাফলে মানসিক কষ্টে তারাই বেশি জর্জরিত ছিল, যারা এ যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরা ছিল মুশরিক। এছাড়া অন্য একটি দল ছিল, যারা মুসলমানদের বিজয় এবং উচ্চ মর্যাদা অর্জনকে তাদের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বের জন্যে আশঙ্কার বিষয় বলে মনে করত, তারা হল ইহুদী। মুসলমানরা বদরের যুদ্ধে জয় লাভ করায় এ দু’দল অর্থাৎ মুশরিক ও ইহুদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রোধ ও আক্রোশে জ্বলে পুড়ে মরছিল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'অবশ্য মু'মিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইহুদী ও মুশরিকদেরই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখবে। (সূরা মায়েদা-৮২)
মদীনার কিছু লোক এ উভয় দলের হিতাকাঙ্ক্ষী ছিল। তারা যখন লক্ষ্য করল, নিজেদের সম্মান বজায় রাখার অন্য কোনো পথ খোলা নেই, তখন প্রকাশ্যে তারা ইসলামে প্রবেশ করে। অথচ অন্তরে এবং বাস্তবে তারা ছিল মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার বন্ধু-বান্ধব। তারাও মুসলমানদের প্রতি ইহুদী ও মুশরিকদের চেয়ে কম ক্রোধান্বিত ছিল না। বরং এ তিন দলই, মুসলমানদের উপর চরমভাবে ক্ষেপে ছিল। এরা ছাড়া চতুর্থ একটি দলও ছিল। তারা হল, আরব বেদুঈন। যারা মদীনার আশেপাশে বসবাস করত। ইসলাম বা কুফর কোনো কিছুর প্রতিই তাদের মনের কোনো টান ছিল না। তারা ছিল লুটেরা, ডাকাত। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাফল্যে তারাও মনে কষ্ট পেয়েছিল। তারা আশঙ্কা করছিল, মদীনায় একটি শক্তিশালী সরকার কায়েম হলে, তাদের লুটতরাজের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে তাদের মনেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জেগে ওঠে ছিল এবং তারা মুসলমানদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল।
এভাবে মদীনায় মুসলমানরা চতুর্মুখী সমস্যার মুখোমুখি হয়ে পড়ে। তবে মুসলমানদের ব্যাপারে এ চারটি দলের প্রত্যেকেরই কর্মপদ্ধতি ছিল পৃথক। প্রত্যেকে নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণে ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করছিল। তারা ভাবছিল, এতেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। মদীনায় একদল লোক, মুখে প্রকাশ্যে ইসলামের কথা বললেও আড়ালে অন্তরালে তারা ষড়যন্ত্র, কুটিলতা এবং পারস্পরিক ঝগড়া ফাসাদ সৃষ্টির পথ অবলম্বন করে। এদিকে মক্কাবাসীরা বদরের কোমরভাঙ্গা মারের প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দিতে থাকে। তারা খোলাখুলি প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকির পাশাপাশি যুদ্ধ প্রস্তুতিও শুরু করে। এক বছর পরে মক্কার কুরাইশরা যুদ্ধাভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওনা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ অভিযান ওহদের যুদ্ধ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধ মুসলমানদের খ্যাতি ও গৌরবের উপর কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলেছিল।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং উদ্ভুত শঙ্কার মোকাবেলায় মুসলমানরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেগুলো থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতাসুলভ যোগ্যতার পরিচয় ফুটে উঠে। এছাড়া একথাও বোঝা যায় যে, মদীনার নেতৃত্ব চারদিকের বিপদ সম্পর্কে কতোটুকু জাগ্রত ও সতর্ক ছিল। এমনকি শত্রুদের মোকাবেলায় তারা কতটা সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে রেখেছিল। বদরের পর মুসলমানদের যেসব অভিযান, শত্রুতা ও সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছিল, তা আলোচনা করা যাক।
১. বনু সোলায়মের সাথে যুদ্ধ : বদরের যুদ্ধের পর মদীনার তথ্য বিভাগ সর্বপ্রথম খবর পায়, গাতফান গোত্রের শাখা বনু সোলায়মের লোকেরা মদীনায় হামলা করতে সৈন্য সংগ্রহ করছে। এ খবর পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'শ সওয়ার মুজাহিদসহ আকস্মিকভাবে তাদের এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে কুদর নামাক জায়গায় গিয়ে পৌঁছান। বনু সোলায়ম গোত্র এ ধরনের আকস্মিক হামলার জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তারা হতবুদ্ধি হয়ে পলায়ন করে। যাওয়ার সময় পাঁচশ উট রেখে যায়। মুসলমানরা সেসব উট অধিকার করে নেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে উটের চার পঞ্চমাংশ মুহাজিরদের মাঝে ভাগ করে দেন। প্রত্যেকে দু'টি করে উট পায়। এ অভিযানে ইয়াসার নামে একজন ক্রীতদাসও মুসলমানদের হাতে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দেন। এরপর তিনি বনু সোলায়মের এলাকায় তিন দিন অবস্থানের পর মদীনায় ফিরে আসেন। দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে বদর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার মাত্র ৭ দিন পর এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানের সময় সেবা ইবনে আরফাতা, মতান্তরে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে মদীনায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
২. রাসূল (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র: বদর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুশরিকরা রোষ ও ক্রোধে ছিল দিশেহারা এবং পুরো মক্কা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত হাঁড়ির মত টগবগ করে ফুটছিল। অবশেষে মক্কার দুই বীর যুবক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, সকল বিরোধ অনৈক্যের উৎস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই শেষ করে দিবে (নাউযু বিল্লাহ)। বদর যুদ্ধের কয়েকদিন পরের কথা। ওমায়র ইবনে ওয়াহাব জুমাহী ছিল কুরাইশ শয়তানদের একজন। এ দুর্বৃত্ত মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামকে নানাভাবে কষ্ট দিত। তার পুত্র ওয়াহাব ইবনে ওমায়র বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। সে একদিন কা'বার হাতীমে বসে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সাথে বদর যুদ্ধে নিহতদের লাশ একটি নোংরা কুয়ায় নিক্ষেপ করার দুঃখজনক ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করছিল। সাফওয়ান বলল, খোদার কসম, বদরের নিহতদের পরে বেঁচে থাকায় কোনো স্বাদ নেই। জবাবে ওমায়র বলল, খোদার কসম, তুমি সত্য কথাই বলেছ। দেখ, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম এবং আমার পরিবার পরিজনের চিন্তা না থাকত, তাহলে আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করে ফেলতাম। কিন্তু আমার ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নেই, পরিবার পরিজনও আমার অবর্তমানে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। যেহেতু আমার সন্তান ওদের হাতে বন্দী, তাই আমার মদীনায় যাওয়ার একটা অজুহাতও রয়েছে। সাফওয়ান সব কথা শুনে ভাবল, চমৎকার সুযোগ। সে ওমায়রকে বলল, শোন, তোমার ঋণ পরিশোদের দায়িত্ব আমার। তোমার পক্ষ থেকে আমি তা পরিশোধ করব। আর আজীবন তোমার পরিবারকে আমি নিজের পরিবারের মতো দেখব। আমার কাছে কোনো জিনিস রয়েছে অথচ তারা পাবে না, এমন কখনো হবে না।
ওমায়র বলল, ঠিক আছে। তবে আমাদের একথা যেন গোপন থাকে। সাফওয়ান বলল, হ্যাঁ, গোপনই থাকবে। এরপর ওমায়ের তার তরবারি ধারালো করে তাতে বিষ মিশায়। সে মদীনার দিকে রওনা হয়ে এক সময় সেখানে পৌঁছায়। মসজিদে নববীর সামনে সে তার উট বসাচ্ছিল। এ সময় তার উপর হযরত ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) দৃষ্টি পড়ে। তিনি মুসলমানদের এক সমাবেশে বদর যুদ্ধে আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। ওমায়রকে দেখামাত্র তিনি বলেন, এ নরাধম কুত্তা, আল্লাহর দুশমন ওমায়র। নিশ্চয়ই কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর দুশমন ওমায়র তরবারি ঝুলিয়ে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ওকে আমার কাছে নিয়ে আস। ওমায়র এলে, হযরত ওমর (রা.) তার তলোয়ার ওমায়েরের গলার কাছে চেপে ধরেন। কয়েকজন আনসারকে বলেন, তোমরা ভিতরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে সেখানে বসে থাক। তাঁর বিরুদ্ধে এ খবিসের শংকাজনক তৎপরতা সম্পর্কে সজাগ থাকবে। কেননা একে বিশ্বাস করা যায় না। এরপর হযরত ওমর (রা.), ওমায়রকে মসজিদের ভিতরে নিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখলেন, হযরত ওমর (রা.) ওমায়েরের তরবারি তার ঘাড়েই লেপ্টে ধরে আছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ওমর ওকে ছেড়ে দাও। আর ওমায়েরকে বলেন, তুমি কাছে এসো। ওমায়র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, আপনাদের সকাল শুভ হোক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাদের এমন এক সম্বোধন শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমাদের সম্বোধন থেকে উত্তম। তা হচ্ছে আস্সালামু আলাইকুম, যা জান্নাতীদের সম্বোধন।
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে ওমায়র, তুমি কেন এসেছ? সে বলল, আপনাদের কাছে যে বন্দী রয়েছে তার ব্যাপারেই এসেছি। আপনারা আমার বন্দীর ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে তোমার ঘাড়ে তরবারি কেন? সে বলল, আল্লাহ এ তরবারির নিপাত করুন। এটি কি আর আমাদের কোনো কাজে আসবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সত্যি করে বল, কেন এসেছ? সে বলল, বললাম তো, যুদ্ধবন্দী সম্পর্কে আলোচনার জন্যে এসেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না তা নয়। তুমি এবং সাফওয়ান কা'বার হাতীমে বসে নিহত কুরাইশদের লাশ কুয়ায় ফেলা প্রসঙ্গে আলোচনা করেছ। এরপর তুমি বলেছিলে, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম এবং আমার পরিবার পরিজন না থাকত, তবে আমি এখান থেকে গিয়ে মুহাম্মদকে হত্যা করতাম। একথা শোনার পর সাফওয়ান এ শর্তে তোমার ঋণ এবং পরিবার পরিজনের দায়িত্ব নিয়েছে যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে। আল্লাহ তা'আলা আমার এবং তোমাদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে আছেন।
ওমায়র বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের কাছে আকাশের যে খবর নিয়ে আসতেন এবং আপনার উপর যে ওহী নাযিল হত, সেসব আমরা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতাম, কিন্তু এটা তো এমন ব্যাপার, যাতে আমি এবং সাফওয়ান ছাড়া সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল না। কাজেই আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এ খবর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ আপনাকে বলেননি। সে আল্লাহর জন্যে সকল প্রশংসা যিনি আমাকে ইসলামের পথ দেখিয়েছেন এবং এ জায়গা পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। একথা বলে ওমায়র কালেমা তাইয়েবার সাক্ষ্য দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমাদের ভাইকে দ্বীন শেখাও, কুরআন পড়াও এবং তার বন্দীকে মুক্ত করে দাও। এদিকে সাফওয়ান মক্কায় বলে বেড়াচ্ছিল, সুখবর শোন, কয়েকদিনের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটবে, যা আমাদের বদরের দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। সাফওয়ান মদীনা থেকে আসা লোকের কাছে ওমায়েরের খবর জানতে চাচ্ছিল। অবশেষে একজনের কাছে খবর পেল, ওমায়র মুসলমান হয়ে গেছে। এ খবর শুনে সাফওয়ান কসম খেয়ে বলল, ওমায়রের সাথে কখনো কথা বলব না এবং তার কোনো উপকারও করব না। এদিকে ইসলাম গ্রহণের পর ওমায়র (রা.) মক্কায় এসে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তার আহ্বানে বহু লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়। (ইবনে হিশাম)
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, ইহুদীরা মুসলমানদের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে ঝগড়া বিবাদের উস্কানি দিত। উদাহরণস্বরূপ মদীনায় শাশ ইবনে কায়স নামে এক ইহুদী ছিল। লোকটি এত বৃদ্ধ ছিল যে, দেখে মনে হতো, তার এক পা কবরে চলে গেছে। মুসলমানদের প্রতি তার শত্রুতা ও ঘৃণা ছিল সীমাহীন। একবার সে সাহাবায়ে কেরামের এক মজলিসের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। সে মজলিসে আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকজন বসে কথাবার্তা বলছিল। উভয়ের মধ্যে জাহেলিয়াত যুগের মত পারস্পরিক শত্রুতা ছিল না। ইসলামের স্নেহ, কোমলতা, ঐক্য, জাহেলিয়াত যুগের পারস্পরিক শত্রুতার জায়গা দখল করেছিল এবং তাদের দীর্ঘ কালের বিরোধ বিবাদের সমাপ্তি ঘটেছিল। এ অবস্থা দেখে বৃদ্ধ ইহুদীর মনে খুবই কষ্ট হয়। সে বলতে থাকে, বাহরে বাহ, এখানে তো দেখছি বনু কায়লা পরিবারের অভিজাত ব্যক্তিবর্গ সমবেত হয়েছে। এ অভিজাতদের একত্রিত হওয়ার পর আমরা তো অপাংক্তেয় হয়ে গেছি। আমাদের তো আর এখানে বসবাসের সুযোগ নেই। বৃদ্ধ ইহুদী তার সঙ্গে থাকা যুবকটিকে বলল, ওদের কাছে গিয়ে বুয়াস যুদ্ধ এবং তারও আগের কিছু ঘটনা আলোচনা কর। এ প্রসংগে উভয়পক্ষে যেসব পরস্পর বিদ্বেষী কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছিল, সেসব কবিতার কিছু কিছু ওদের শোনাও; যেন ওরা ঝগড়ায় জড়িয়ে যায়। ইহুদী যুবকটি তা-ই করে। ফলে আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকদের মধ্যে আস্তে আস্তে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। উপস্থিত লোকেরা ঝগড়া শুরু করে এবং একে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে থাকে। উভয় গোত্রের একজন করে প্রতিনিধি হাঁটু গেড়ে বসে। একজন বলল, যদি চাও, তবে আমরা সে যুদ্ধ এখন তাজা করে দিতে পারি। একথা শুনে উভয়পক্ষ ক্ষেপে ওঠে। উভয় দলই বলল, আমরাও প্রস্তুত। হাররায় উভয় পক্ষের মুকাবিলা হবে। অস্ত্রের ঝনঝনানী ও যুদ্ধের আওয়ায ওঠে। উভয় পক্ষের লোকজন অস্ত্র নিয়ে হাররা অভিমুখে রওনা হয়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হতে যাবে, এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খরব পৌছে। তিনি দ্রুত মুহাজির সাহাবাদের সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বলেন, হে- মুসলমানরা, হায় আল্লাহ! আমার জীবদ্দশায় তোমরা জাহেলিয়াতে ফিরে যাচ্ছ? ইসলাম গ্রহণের পরও তোমাদের একি কাজ? ইসলামের মাধ্যমে তোমরা জাহেলিয়াতের রসম-রেওয়াজ থেকে মুক্ত হয়েছ। কুফরী থেকে মুক্তি লাভ করেছ। তোমাদের অন্তর পরস্পরের জন্যে সম্প্রীতিতে পূর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপদেশপূর্ণ কথা শুনে আনসার সাহাবীরা বুঝতে পারল, তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়েছে, দুশমনের প্ররোচনার শিকার হয়েছে। এসব ভেবে তারা কাঁদতে শুরু করে। আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা একে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে। এরপর আল্লাহর রাসূলের অনুগত হয়ে তারা এমনভাবে ঘরে ফিরে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের দুশমন ইহুদী শাশ ইবনে কায়সের ষড়যন্ত্রের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন। (ইবনে হিশাম)।
মুসলমানরদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য সৃষ্টির জন্যে ইহুদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টার এটি একটি মাত্র উদাহরণ। ইসলামী দাওয়াতের পথে ইহুদীদের বাধা সৃষ্টির উদাহরণ এ ঘটনা থেকেই পাওয়া যায়। এ উদ্দেশ্যে ইহুদীরা নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করত। তারা মিথ্যা প্রোপাগা চালাত। সকালে মুসলমান হয়ে বিকেলে পুনরায় কাফের হয়ে যেত। তারা এটা এজন্যেই করত, যাতে দুর্বল চিত্তের মানুষদের মনে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বীজ বপন করা যায়। কারো সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলে সে যদি মুসলমান হত, তাহলে ইহুদীরা তার জীবিকার পথ সংকীর্ণ করে দিত। আর টাকা পাওনা থাকলে সকাল-বিকাল তাগাদা দিয়ে তাকে অতিষ্ঠ করে তুলত। আবার কোনো মুসলমান পাওনাদার হলে তার পাওনা আদায় করত না; বরং অন্যায়ভাবে তা আত্মসাৎ করত। এরপরও যদি সে মুসলমান টাকা চাইতো, তখন কুচক্রী ইহুদী বলত, তোমার পাওনা তো আমার উপর ততোদিন পরিশোধের দায়িত্ব ছিল, যতোদিন তুমি পূর্বপুরুষের দ্বীনে বিশ্বাসী ছিলে। এখন তুমি তোমার দ্বীন পরিবর্তন করেছ, কাজেই এখন তোমার এবং আমার মধ্যে সম্পর্ক থাকার কোন পথ নেই। (তাফসীরে সূরা আলে ইমরান)
ইহুদীরা যখন দেখল, বদর প্রান্তরে আল্লাহ মুসলমানদের সরাসরি সাহায্য করেছেন এবং তাদের মর্যাদা ও প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষের উত্তপ্ত হাঁড়ি টগবগ করে ফুটে উঠল। তারা প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে এবং মুসলমানদের কষ্ট দেয়ার জন্যে উঠে পড়ে লাগে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে হিংসুটে এবং দুর্বৃত্ত ছিল কা'ব ইবনে আশরাফ। মদীনার তিনটি ইহুদী গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্ট ও শয়তান প্রকৃতির ছিল বনু কায়নুকা। তারা মদীনার ভিতরে থাকত এবং তাদের মহল্লা তাদের নামেই পরিচিত ছিল। তারা পেশায় ছিল কর্মকার, স্বর্ণকার এবং থালাবাটি নির্মাতা। এ কারণে তাদের কাছে সব সময় প্রচুর সমরাস্ত্র বিদ্যমান থাকত। তাদের যুদ্ধ করার মত বলিষ্ঠ লোকের সংখ্যা ছিল সাত'শ। তারা ছিল মদীনায় সবচেয়ে শক্তিধর ও বীর ইহুদী গোত্র। তারাই সর্বপ্রথম মুসলমানদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে।
আল্লাহ যখন বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সফলতা দান করেন, তখন ইহুদীদের শত্রুতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তারা দুর্বৃত্তপনা, ঘৃণ্য কার্যকলাপ এবং উস্কানিমূলক কর্মতৎপরতা অবলম্বন করে। মুসলমানরা বাজারে গেলে তারা তাদের সাথে উপহাসমূলক আচরণ করত। ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে কষ্ট দিত। তাদের ঔদ্ধত্য এতই সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে, তারা মুসলিম মহিলাদেরও উত্ত্যক্ত করত। ক্রমে অবস্থা নাজুক হয়ে ওঠে। ইহুদীদের ঔদ্ধত্য হঠকারিতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। এ সময় একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের সমবেত করে ওয়ায নসীহত করে হিদায়াতের সরল সোজা পথের প্রতি আহ্বান জানান। তাদের নিপীড়নমূলক কাজের মন্দ পরিণাম সম্পর্কেও সতর্ক করে দেন। কিন্তু এতে তাদের হীন ও ঘৃণ্য কার্যকলাপ আরো বেড়ে যায়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের দিন কুরাইশদের পরাজিত করেন। এরপর মদীনায় ফিরে এসে বনু কায়নুকার বাজারে ইহুদীদের এক সমাবেশ আহ্বান করেন। এ সমাবেশে তিনি বলেন, হে ইহুদী সম্প্রদায়, কুরাইশদের উপর যে রকম আঘাত পড়েছে, সে রকম আঘাত তোমাদের উপর আসার আগেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তারা বলল, হে মুহাম্মদ, তুমি আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করছ। কুরাইশ গোত্রের আনাড়ি অনভিজ্ঞ লোকদের সাথে তোমাদের মোকাবেলা হয়েছে। এতেই তোমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে বসে আছ। আমাদের সাথে যদি তোমাদের যুদ্ধ হয় তবে বুঝতে পারবে, পুরুষ কাকে বলে। আমরা হচ্ছি সাহসী বীর বাহাদুর। আমাদের মত লোকের সাথে তোমাদের মুকাবিলা হয়নি। তাই আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করে বসে আছ। তাদের উক্তির জবাবে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন, 'যারা কুফরী করে; তাদের বল, তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হবে এবং তোমাদের জাহান্নামে একত্র করা হবে। আর সেটা কতই না নিকৃষ্ট আবাসস্থল। দু'টি দলের পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। একদল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছিল আর অন্য দল ছিল কাফের। ওরা তাদের চোখের দেখায় দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নিজ সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্যে শিক্ষা রয়েছে। (সূরা আলে ইমরান, ১২-১৩)
বনু কায়নুকা যে জবাব দিয়েছিল, তার অর্থ সুস্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রোধ সম্বরণ এবং ধৈর্যধারণ করেন। মুসলমানরাও ধৈর্যধারণ করে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান এবং তাদের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করার পর তাদের ঔদ্ধত্য আরো বেড়ে যায়। কয়েকদিন পরেই মদীনায় তারা হাংগামাপূর্ণ সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে। ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের কবর খনন করে নেয়। নিজেদের জীবনের সকল পথ বন্ধ করে ফেলে।
ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, একবার এক আরব মহিলা বনু কায়নুকার বাজারে দুধ বিক্রি করতে যায়। দুধ বিক্রির পর সে মহিলা কোন এক প্রয়োজনে এক ইহুদী স্বর্ণকারের দোকানে বসে। ইহুদী তার চেহারা অনাবৃত করতে বলে, কিন্তু মহিলা রাজি হননি। এতে স্বর্ণকার চুপিসারে সে মহিলার কাপড়ের একাংশ তার পিঠের সাথে গিট বেঁধে দেয়। মহিলা কিছুই বুঝতে পারেনি। মহিলা উঠে দাঁড়ালে, সাথে সাথে তার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে পড়ে। এতে ইহুদীরা খিল খিল করে হেসে ওঠে। মহিলা এভাবে অপমানিত হয়ে চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করেন। তার কান্না শুনে একজন মুসলমান কারণ জানতে চান। সব শুনে ক্রোধে অস্থির হয়ে তিনি সে ইহুদীর উপর হামলা করে তাকে মেরে ফেলেন। ইহুদীরা যখন দেখল, তাদের একজন লোককে মেরে ফেলা হয়েছে এবং মেরেছে তাদের শত্রু মুসলমান, তখন তারা সম্মিলিত হামলা চালিয়ে সে মুসলমানকেও মেরে ফেলে। নিহত মুসলমানের পরিবারবর্গ চিৎকার কান্নাকাটি করে ইহুদীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের কাছে অভিযোগ করেন। ফলে মুসলমান এবং বনু কায়নুকা গোত্রের ইহুদীদের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। (ইবনে হিশাম)
এ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। তিনি মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযেরকে অর্পণ করেন এবং হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের হাতে মুসলমানদের পতাকা তুলে দিয়ে আল্লাহর বাহিনী সঙ্গে নিয়ে বনু কায়নুকার বসতি অভিমুখে রওনা হন। ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে মুহূর্তে দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। তিনি কঠোরভাবে তাদের অবরোধ করে রাখেন। সেদিন ছিল জুমার দিন, দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ। এরপর পনের দিন, অর্থাৎ যিলক্বদ মাসের প্রথম দিন পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত রাখা হয়। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তা'আলা ইহুদীদের মনে মুসলমানদের প্রভাব বসিয়ে দেন।
আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে, তিনি কোনো কওমকে পরাজিত করতে চাইলে তাদের মনে প্রতিপক্ষের প্রভাব বসিয়ে দেন। বনু কায়নুকা গোত্র আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার শর্তে আত্মসমর্পণ করে। তাদের জান-মাল, মহিলা ও শিশুদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের দেয়া ফয়সালাই চূড়ান্ত হয়। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে ইহুদীদের সবাইকে বেঁধে ফেলা হয়।
মাত্র একমাস আগে ইসলামের ছদ্মবেশ ধারণকারী মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ সময় ইহুদীপ্রীতির নযীর স্থাপন করে। সে কপট বিনয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ইহুদীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সে বলে, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ করুন। উল্লেখ্য, বনু কায়নুকা ছিল খাযরাজ গোত্রের মিত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। মুনাফিক নেতা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার বুকের দিকের ফাড়া অংশে হাত ঢুকিয়ে দেয়। তিনি এতে বিরক্ত হয়ে বলেন, আমাকে ছাড়। তিনি এত ক্রুদ্ধ হন যে, তাঁর চেহারায় ক্রোধের ঝলক ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, তোমার জন্যে আমার আফসোস হচ্ছে, তুমি আমাকে ছাড়। কিন্তু এ মুনাফিক তার অনুরোধ অব্যাহত রাখে। সে বলল, আমার মিত্রদের ব্যাপারে অনুগ্রহ না করা পর্যন্ত আপনাকে ছাড়ব না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর কথা রাখেন। তার খাতিরে ইহুদীদের জীবন ভিক্ষা দেন। তবে নির্দেশ দেন, তাদের মদীনা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। তারা মদীনার আশেপাশে কোথাও থাকতে পারবে না। ইহুদীরা তখন যতোটা জিনিস সঙ্গে নেয়া সম্ভব ততোটা নিয়ে সিরিয়ার দিকে চলে যায়। এখানে বহু ইহুদীদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। এর মধ্যে তিনটি কামান, দু'টি বর্ম, তিনটি তলোয়ার এবং তিনটি বর্শা নিজের জন্যে রাখেন। অবশিষ্ট ধন-সম্পদ থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করে নেন। একদিকে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, ইহুদী এবং মুনাফিকরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। অন্যদিকে আবু সুফিয়ানও তার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান এ মর্মে কসম করেছিল যে, মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সে ফরয গোসল করবে না। এ কসম পূরণের জন্যে আবু সুফিয়ান দু'শ সওয়ারী নিয়ে রওনা হয় এবং কানাত প্রান্তরে অবস্থিত নাইব পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু স্থাপন করে। মদীনা থেকে এ জায়গার দূরত্ব বার মাইল। কিন্তু আবু সুফিয়ান মদীনায় সরাসরি হামলার সাহস পায়নি। সে এমন একটা কাজ করে বসে, যাকে ডাকাতি বা রাহাজানি বলা যায়।
রাতের অন্ধকারে আবু সুফিয়ান মদীনার উপকণ্ঠে এসে হুয়াই ইবনে আখতারের ঘরে গিয়ে তাকে দরজা খোলার অনুরোধ জানায়। হুয়াই পরিণাম আশঙ্কায় দরজা খুলতে অস্বীকার করে। তখন আবু সুফিয়ান সেখান থেকে বনু নযীরের অন্য এক সর্দার সালাম ইবনে মিশকামের কাছে গমন করে। এ লোকটি বনু নযীর গোত্রের কোষাধ্যক্ষ ছিল। আবু সুফিয়ান ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চায়। সালাম ইবনে মিশকাম, আবু সুফিয়ানকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করে এবং আতিথেয়তাও করে। খাবার খাওয়ায়, মদ পরিবেশন করে এবং মদীনার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশদ অবহিত করে। এরপর আবু সুফিয়ান এখান থেকে বেরিয়ে দ্রুত তার সঙ্গীদের কাছে পৌছে এবং একদল লোক পাঠিয়ে মদীনার উপকণ্ঠে আরিষ নামক জায়গায় হামলা করায়। এ দুর্বৃত্তরা সেখানে কয়েকটি খেজুর গাছ কেটে ফেলে এবং কয়েকটি গাছে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর একজন আনসার এবং তার এক মিত্রকে ফসলের ক্ষেতে পেয়ে হত্যা করে ঊর্ধ্বশ্বাসে মক্কাভিমুখে পালিয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত ধাওয়া করেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা এর চেয়ে দ্রুত মক্কার পথে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালিয়ে যায়। তারা বোঝা হালকা করার জন্যে ছাতু, খাদ্ৰসামগ্রী এবং সাজসরঞ্জাম পথে ফেলে রেখে যায়। এসব জিনিস মুসলমানদের হস্তগত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সঙ্গীরা আবু সুফিয়ানকে কারকারাতুল কুদর পর্যন্ত ধাওয়া করে ফিরে আসেন। ফেরার পথে মুসলমানরা আবু সুফিয়ানের লোকদের ফেলে যাওয়া ছাতুসহ বিভিন্ন জিনিস তুলে নেন। এ অভিযানের নামকরণ করা হয় গাযওয়াতুস সাবিক বা সাবিক অভিযান। আরবী ভাষায় সাবিক মানে হাতু। বদর যুদ্ধের মাত্র দুই মাস পরে দ্বিতীয় হিজরীর যিলহজ্জ মাসে এ ঘটনা ঘটে। এ অভিযানের সময় মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনযের এর উপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। (ইবনে হিশাম)
বদর যুদ্ধের পর এ অভিযান ছিল সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তৃতীয় হিজরীর মহররম মাসে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এরপর, মদীনার তথ্য বিভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানায়, বনু সালাবা এবং মোহারেব গোত্রের এক বিরাট দল মদীনায় হামলা করতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এ খবর পাওয়ার পর পরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন। সওয়ারী ও পদাতিক মিলিয়ে সাড়ে চারশ মুজাহিদ রওনা হন। এ অভিযানে গমনকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওসমান (রা.)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। পথে মুহাজিররা বনু সালাবা গোত্রের জাব্বার নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আল্লাহর রসূলের সামনে হাযির করেন। লোকটিকে তিনি ইসলামে দাওয়াত দেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হযরত বেলাল (রা.)-এর সংগে দেন। সে পথপ্রদর্শকরূপে মুসলমানদের শত্রু এলাকা পর্যন্ত পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। এদিকে শত্রুরা মুসলিম বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে আশেপাশের পাহ- াড়ী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখেন এবং মুজাহিদদের নিয়ে শত্রুদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেন। সে জায়গায় ছিল একটা কূপ, যা 'যি-আমর' নামে পরিচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেদুঈনদের উপর প্রভাব বিস্তার এবং মুসলমানদের শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা দেয়ার জন্যে তৃতীয় হিজরীর পুরো সফর মাস সেখানে অতিবাহিত করে পরে মদীনায় ফিরে আসেন। (ইবনে হিশাম)
ইহুদীদের মধ্যে কাব ইবনে আশরাফ এক লোক মুসলমানদের প্রচ ঘৃণা করত। ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতায় সে ছিল অত্যন্ত কঠোর। সে আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দিত এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধের দাওয়াত দিয়ে বেড়াত। তার মায়ের গোত্র ছিল বনু নযির। এ লোকটি ছিল ধনী এবং প্রভাবশালী। আরবে তার দৈহিক সৌন্দর্যের সুনাম এবং বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিতি ছিল। এ লোকটির দুর্গ ছিল মদীনার দক্ষিণাংশে বনু নযির গোত্রের বসতি এলাকার পিছনে। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এবং কুরাইশ নেতাদের হত্যাকারে খবর শোনার সাথে সাথে সে বলে ছিল, আসলেই কি এরকম ঘটেছে? তারা ছিল আরবদের মধ্যে অভিজাত লোকদের বাদশাহ। মুহাম্মদ যদি তাদের মেরেই থাকে, তাহলে পৃথিবীর অভ্যন্ত রভাগ এর উপরিভাগ থেকে উত্তম। সুতরাং বেঁচে থাকার চেয়ে আমাদের মরে যাওয়াই ভাল।
নিশ্চিতভাবে মুসলমানদের বিজয়ের খবর পাওয়ার পর আল্লাহর শত্রু কাব ইবনে আশরাফ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের কুৎসা রটনা এবং ইসলামের শত্রুদের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়। এতেও তৃপ্ত হতে না পেরে সে মক্কায় কুরাইশদের কাছে গমন করে এবং মুত্তালিব ইবনে আবু ওয়াদা সাহমীর মেহমান হয়। এরপর সে মুশরিকদের মনে উত্তেজনার আগুন প্রজ্বলিত করে। তাদের প্রতিশোধের আগুন তীব্র করে এবং আল্লাহর রসূলের বিরুদ্ধে কুরাইশদের যুদ্ধের প্ররোচিত করার জন্যে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে নিহত কুরাইশ সরদারদের জন্যে বিলাপ মাতম শুরু করে। কাব মক্কায় অবস্থানকালে আবু সুফিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কাছে আমাদের না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদের দ্বীন অধিক পছন্দীয়? উভয় দলের মধ্যে কারা হিদায়াতপ্রাপ্ত? কা'ব ইবনে আশরাফ বলল, তোমরা মুসলমানদের চেয়ে অধিক হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং উত্তম। এ প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন। তুমি কি তাদের দেখোনি, যাদের কিতাবের এক অংশ দেয়া হয়েছিল, তারা 'জেব্ত' এবং 'তাগুতে'র ওর ঈমান রাখে, তারা কাফেরদের সম্পর্কে বলে, তাদের পথই মুমিনদের চেয়ে উৎকৃষ্টতর। (সূরা নিসা-৫১)।
কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কায় এসব জঘন্য কাজ করার পর মদীনায় ফিরে আসে। মদীনায় এসে সে সাহাবায়ে কেরামের স্ত্রীদের সম্পর্কে ঘৃণ্য কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করে। এছাড়া যা মুখে আসছিল তাই বলছিল। অবিরামভাগে সে মুসলমানদের কষ্ট দিতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা বলেন, কা'ব ইবনে আশরাফের সাথে বোঝাপড়ার মতো কে আছো? এ লোকটি আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহর রসূলের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা, ওব্বাদ ইবনে বিশর, আবু নায়েলা ওরফে সালকান ইবনে সালামা, হারেস ইবনে আওস, আবু আব্বাস ইবনে জারার (রা.) উঠে দাঁড়ান। আবু নায়েলা ওরফে সালকান ইবনে সালামা (রা.) ছিলেন কা'ব ইবনে আশরাফের দুধভাই। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এ দলের নেতা মনোনীত হন।
এর নির্দিষ্ট দিনে কা'ব ইবনে আশরাফের উপর হামলার সময় হযরত হারেস ইবনে আওস (রা.)-এর দেহে একজন সঙ্গীর তরবারির সামান্য আঘাত লাগে। এতে তিনি আহত হন। তাঁর দেহ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। ফেরার পথে হাররায়ে আরিয় নামক জায়গায় পৌঁছার পর তারা দেখেন, হারেস (রা.) সঙ্গে নেই। তাই সবাই সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর হারেস এসে পৌঁছান। হারেসকে তুলে নিয়ে তারা বাকিয়ে গার্কাদে পৌঁছে জোরেশোরে তাকবীর ধ্বনি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত কিলোমিটার দূর হতে সে তাকবীর ধ্বনি শুনতে পান। এতে তিনি বুঝতে পারেন, অভিযান সফল হয়েছে। তিনিও আল্লাহ আকবর ধ্বনি দেন। এ দলের লোকেরা উপস্থিত হলে তিনি বলেন, এ চেহারাগুলো কামিয়াব হোক। তারা বলেন, আপনার চেহারাও, হে আল্লাহর রাসূল। একথা বলার পর পরই অভিযানে অংশ গ্রহণকারীরা কা'ব ইবনে আশরাফের কর্তিত মস্তক আল্লাহর রাসূলের সামনে রেখে দেন। কা'বের হত্যায় তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং হারেসের ক্ষতস্থানে থুথু লাগিয়ে দেন। এতে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর সে ক্ষতস্থানে আর কখনো ব্যথা হয়নি। (ইবনে হিশাম)
কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে ইহুদী হঠকারীদের মনে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তারা স্পষ্টত বুঝতে পারে, যারা শান্তি ভঙ্গের জন্যে দায়ী হবে, সম্পাদিত চুক্তি লংঘন করবে, সদুপদেশ দানে কাজ না হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের দ্বিধা করবেন না। এ কারণে তারা কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যার খবর শুনে টুশব্দ করেনি। বরং তারা একেবারে দম বন্ধ করে পড়ে থাকে। অংগীকার রক্ষা করছে বলে প্রকাশ্যে দেখাতে থাকে। এরপরের গুরুত্বপূর্ণ এক সামরিক অভিযানে তিনশ মুজাহিদ অংশ গ্রহণ করেন। এ বাহিনী নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে বাহরান এলাকা অভিমুখে রওনা হন। এটি হেজাযের অভ্যন্তরে ফারা অঞ্চলের এক জায়গা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গী মুজাহিদরা রবিউস সানী এবং জমাদিউল আউয়াল মাস সেখানেই অবস্থান করেন। এরপর মদীনায় ফিরে আসেন। কোনো লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়নি। (ইবনে হিশাম)
ওহুদ যুদ্ধের ঠিক আগে সংঘটিত হয় মুসলমানদের শেষ সফল অভিযান। তৃতীয় হিজরীর জমাদিউস সানি মাসে এ অভিযান পরিচালিত হয়। বদর যুদ্ধের পর থেকে কুরাইশরা মানসিক কষ্টে ও অস্থিরতায় কাতর ছিল। এর মাঝে গ্রীষ্মকাল এসে পড়ে। এ সময়ই সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠানোর কথা। বাণিজ্য কাফেলার নিরাপত্তার চিন্তা তাদের পেয়ে বসে। সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার নেতা সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কথায় কুরাইশদের এ দুঃচিন্তার বিষয়টা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। সে কুরাইশদের বলে, মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্যপথ কঠিন বিপজ্জনক করে তুলেছে। বুঝতে পারছি না, তাদের সাথে কিভাবে মুকাবিলা করব। তারা সমুদ্র উপকূল থেকে সরছে না, এদিকে উপকূলবাসীরাও তাদের সাথে সমঝোতা করে নিয়েছে। সাধারণ লোকেরাও তাদের পক্ষে চলে গেছে। বুঝতে পারছি না, আমরা কোন্ পথ অবলম্বন করব। অথচ আমরা যদি ঘরে বসে থাকি, তবে তো আমাদের পুঁজিই শেষ হয়ে যাবে। কেননা মক্কায় আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা দু'মৌসুমের ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। গ্রীষ্মকালে সিরিয়া আর শীতকালে আবিসিনিয়ার সাথে।
ফলে কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলা সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নেতৃত্বে ইরাকগামী পথ ধরে অগ্রসর হয়। কিন্তু এ সফর পরিকল্পনার বিস্তারিত খবর মদীনায় পৌঁছে যায়। সালিত ইবনে নোমান, যিনি মুসলমান হয়েছিলেন, তিনি নঈম ইবনে মাসউদের সাথে এক মদের আড্ডায় মিলিত হন। নঈম তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। উল্লেখ্য যে, তখনো পর্যন্ত মদপান নিষিদ্ধ হয়নি। মদের আড্ডায় নঈম, সালিতের কাছে নেশার ঘোরে কুরাইশদের বাণিজ্য যাত্রার সব কথা প্রকাশ করে দেয়। সালিত সাথে সাথে বিদ্যুদ্বেগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে কুরাইশ কাফেলার এ সফরের সব কথা প্রকাশ করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পেয়ে অবিলম্বেই কুরাইশ কাফেলার উপর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং একশ সওয়ারের একটি বাহিনী হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা কালবী (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। হযরত যায়েদ (রা.) তার বাহিনীসহ দ্রুত পথ অতিক্রম করেন। ওদিকে কুরাইশ কাফেলা একবারে অজ্ঞাত অবস্থায় কারদা নামক কূপের পাড়ে গিয়ে তাঁবু ফেলার জন্যে অবতরণ করছিল। এ অবস্থায় হযরত যায়েদ (রা.) সেখানে উপস্থিত হয়ে হঠাৎ হামলা চালিয়ে পুরো কাফেলাই দখল করে নেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এবং কাফেলার অন্য তত্ত্বাবধায়কদের পলায়ন ছাড়া উপায় ছিল না। মুসলিম বাহিনী কুরাইশ কাফেলার পথপ্রদর্শক ফোরাত ইবনে হাইয়ানকে মতান্তরে আরো দু'জন লোককে গ্রেফতার করে। কাফেলার বিভিন্ন মালামাল গনীমত হিসেবে মুসলমানদের হস্তগত হয়। যেগুলোর মূল্য ছিল আনুমানিক এক লাখ দেরহাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পঞ্চমাংশ আলাদা করে, বাকি সব মুজাহিদদের মধ্যে ভাগ করে দেন। ফোরাত ইবনে হাইয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইবনে হিশাম)
বদর যুদ্ধের পর এটি ছিল কুরাইশদের জন্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা। এর ফলে তাদের মানসিক যন্ত্রণা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাদের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা থাকে। হয়ত নিজেদের দম্ভ অহংকার ছেড়ে মুসলমানদের সাথে আপস মীমাংসা করা। অন্যথায় তাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে নিজেদের হারান শক্তি সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনা এবং মুসলমানদের শক্তি এমনভাবে ভেংগে দেয়া যেন ভবিষ্যতে তারা পুনরায় মাথা তুলতে না পারে। মক্কার কুরাইশরা দ্বিতীয় পথই গ্রহণ করে। এ ঘটনার পর তাদের প্রতিশোধস্পৃহা বহুগুণ বেড়ে যায়। তারা মুসলমানদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার এবং তাদের দেশে প্রবেশ করে তাদের উপর হামলা করার জন্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অতীতের ঘটনাবলীর পাশাপাশি বাণিজ্য আক্রান্ত হওয়ার ক্ষোভও ওহুদ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ।
বদর যুদ্ধে মক্কার কাফিরদের পরাজয় ও অবমাননা এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল। এ কারণে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রোধে অস্থির ছিল। এমনকি তারা নিহতদের জন্যে শোক প্রকাশ, কান্নাকাটি এবং বিলাপ নিষেধ করে দিয়েছিল। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ ও পরিশোধের তাড়াহুড়া করা থেকে বিরত ছিল, যেন মুসলমানরা তাদের দুঃখ দুশ্চিন্তা আন্দাজ করতে না পারে। তাদের শোকের গভীরতা এবং মানসযন্ত্রণা তারা মুসলমানদের জানতে দেয়নি। বদর যুদ্ধের পর তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ করে নিজেদের মনের জ্বালা জুড়ানোর এবং ক্রোধ প্রশমনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপরই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। কুরাইশ নেতাদের মধ্যে এ যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এবং আবদুল্লাহ ইবনে রবিয়া ছিল সবচেয়ে অগ্রগামী।
আবু সুফিয়ানের যে কাফেলা বদর যুদ্ধের কারণ হয়েছিল এবং সে মালামালসহ ঐ কাফেলা নিরাপদে বাঁচিয়ে নিতে সফল হয়েছিল। উক্ত কাফেলার সমুদয় মালামাল সে পরবর্তী যুদ্ধের ব্যয় বহনের জন্যে সংরক্ষণ করে রাখে। সে মালামালের মালিকদের বলে, শোনো কুরাইশ বংশের লোকেরা, মুহাম্মদ তোমাদের কঠিন আঘাত হেনেছে, তোমাদের নেতাদের হত্যা করেছে। সুতরাং তার সাথে যুদ্ধ করতে তোমরা তোমাদের এ মালামাল দিয়ে সহায়তা কর। হয়তো আমরা প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হব। কুরাইশদের একথায় সাড়া দিয়ে আবু সুফিয়ানের কাফেলায় যা কিছু সম্পদ ছিল তা সবই যুদ্ধের জন্যে দান করতে রাযি হয়। সে মালামালের পরিমাণ ছিল এক হাজার উট এবং পঞ্চাশ হাজার দীনার। যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্যে উটগুলো বিক্রি করে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন, 'আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত করার জন্যে কাফিররা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তারা তো ধন-সম্পদ ব্যয় করবেই; অতপর সেটা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে এবং তাদের পরাভূত করা হবে। (সূরা আনফাল-৩৬)
সবশেষে যায়েদ বিন হারেসা কালবীর (রা.) অভিযানে কুরাইশদের যে গুরুতর কোমর ভাংগা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তথা যে পরিমাণ দুঃখ পেতে হয়, তা আগুনে তেলের কাজ করে। এরপর থেকেই মুসলমানদের সাথে একটি ভয়ংকর যুদ্ধ লড়ার জন্যে কুরাইশদের প্রস্তুতিতে জেদী ভাব সঞ্চারিত হয়। বছর পূর্ণ হতেই কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। নিজেদের লোক ছাড়াও সহযোগী এবং মিত্রদের মিলে সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় তিন হাজার। কুরাইশ নেতারা কিছুসংখ্যক সুন্দরী মহিলাকেও যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করে। সে অনুযায়ী পনের জন মহিলাকেও নেয়া হয়। মহিলাদের যুদ্ধক্ষেত্রে নেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান হয়, তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার প্রেরণায় যুদ্ধে বীরত্ব এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা বেশি কাজ করবে। যুদ্ধের জন্যে তিন হাজার উট এবং দু'শ ঘোড়া প্রস্তুত করা হয়। ঘোড়াগুলোকে অধিকতর সক্রিয় রাখতে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত পুরো পথ সেগুলোর উপর কাউকে আরোহণ করতে বিরত রাখা হয়। এছাড়া নিরাপত্তামূলক অস্ত্রের মধ্যে তিন হাজার বর্মও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আবু সুফিয়ানকে পুরো বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। খালিদ ইবনে ওলীদকে সাহায্যকারী ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হয়। ইকরামা ইবনে আবু জাহেলকে তার সহকারী নিযুক্ত করা হয়। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধ পতাকা বনী আবদুদ দার গোত্রের হাতে দেয়া হয়। হযরত আব্বাস (রা.) কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির প্রতি গভীর নযর রাখছিলেন। অতএব মক্কী বাহিনী মদীনার দিকে রওয়ানা করতেই তিনি সমুদয় বিবরণ সম্বলিত একখানা পত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করে দূত মারফত মদীনায় পাঠান। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হযরত আব্বাস (রা.)-এর চিঠি পড়ে শোনান। তিনি হযরত উবাই (রা.) কে চিঠির বক্তব্য গোপন রাখার নির্দেশ দিয়ে আনসার ও মুহাজির নেতাদের সাথে জরুরী পরামর্শ করেন।
কুরাইশ বাহিনীর মদীনাভিমুখে রওনার খবর পেতেই যে কোনো অবাঞ্চিত পরিস্থিতি মুকাবিলার জন্যে মুসলমানরা সর্বক্ষণ অস্ত্র সঙ্গে রাখতে শুরু করেন। এমনকি নামাযের সময়ও অস্ত্র কাছে রাখা হত। কয়েকজন আনসারকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তা রক্ষায় নিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন হযরত সা'দ ইবনে মা'য়ায (রা.), ওসায়দ ইবনে হোযায়র (রা.) এবং সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.)। তারা সশস্ত্র অবস্থায় সারা রাত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে পাহারায় থাকতেন। মদীনার বিভিন্ন প্রবেশপথেও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দল নিয়োগ করা হয়। যে কোনো ধরনের আকস্মিক হামলা মোকাবেলায় তাদের প্রস্তুত রাখা হয়। শত্রুদের গতিবিধির উপর নযর রাখতে মদীনার বাইরের রাস্তায়ও ছোট ছোট কয়েকটি টহল দল নিযুক্ত করা হয়।
এদিকে কুরাইশ বাহিনী পরিচিত পথে মদীনা অভিমুখে এগিয়ে চলে। আবওয়া নামক জায়গায় পৌঁছার পর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে ওতবা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মা বিবি আমেনার কবর খুঁড়ে ফেলার প্রস্তাব করে। কিন্তু এমন একটি ঘৃণ্য কাজের দরজা উন্মুক্ত করতে কুরাইশ নেতারা রাযি হয়নি। কুরাইশ বাহিনী আবওয়া থেকে যথারীতি তাদের সফর অব্যাহত রাখে।
তারা মদীনার কাছে পৌঁছে প্রথমে আকিক প্রান্তর অতিক্রম করে। এরপর কিছুটা ডানে গিয়ে ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আইনাইন নামক জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করে। আইনাইন মদীনার উত্তরে কানাত প্রান্তরের কাছে একটি উর্বর ভূমি। এটা তৃতীয় হিজরীর ৬ শাওয়াল শুক্রবার দিনের ঘটনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার নামায পড়ান এবং নামায শেষে ওয়াজ নসীহত করেন, জিহাদে উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, ধৈর্য এবং দৃঢ়পদ থাকার মাধ্যমেই জয় লাভ করা যেতে পারে। সাথে সাথে মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন যেন তারা শত্রুর মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত থাকে। একথা শোনার পর মুসলমানদের মাঝে আনন্দের স্রোত বয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আসরের নামায আদায় করেন তখন লোকজন সমবেত হয়। মদীনার উপরিভাগের বাসিন্দারাও আসে। নামাযের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমর (রা.) সঙ্গে ছিলেন। তারা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথায় পাগড়ি বেঁধে দেন এবং পোশাক পরিধান করান। তিনি উপরে নিচে দু'টি বর্ম পরিধান করেন। এরপর তলোয়ারসহ অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সকলের সামনে হাযির হন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদের তিন ভাগে ভাগ করেন-
(১) মুহাজির বাহিনী। এ বাহিনীর পতাকা হযরত মোসয়াব ইবনে ওমায়র আবদারী (রা.)-কে প্রদান করেন।
(২) আনসারদের আওস গোত্রের বাহিনী। এ বাহিনীর পতাকা হযরত ওসায়দ ইবনে হোযায়র (রা.)-কে দেন।
(৩) খাযরাজ গোত্রের বাহিনী। হযরত হুবাব ইবনে মোনযের (রা.)-কে এ বাহিনীর পতাকা প্রদান করেন।
মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল সর্বসাকুল্যে এক হাজার। তাদের মধ্যে একশ জন বর্ম পরিহিত এবং পঞ্চাশ জন ঘোড়সওয়ার ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ চলাকালে মদীনায় অবস্থানরতদের নামাযে ইমামতির দায়িত্ব হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর উপর দিয়ে মুসলিম সৈন্যদের রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে রওয়ানা হয়। হযরত সা'দ ইবনে মা'য়ায (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা (রা.) বর্ম পরিহিত হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এগিয়ে যান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শায়খান নামক জায়গায় পৌছে মুসলিম সৈন্যদের পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং যুদ্ধের অনুপযোগীদের ফেরত পাঠান। যাদের ফেরত পাঠান হয়; তারা হলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), হযরত ওসামা ইবনে যায়দ (রা.), হযরত ওসায়দ ইবনে যহির (রা.), যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে আকরাম (রা.), হযরত ওসামা ইবনে আওস (রা.), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারী (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে হেব্বা (রা.)। এ তালিকায় হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)-এর নামও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সহীহ বুখারীর রেওয়ায়াত অনুযায়ী তিনি ওহুদ যুদ্ধে যোগ দান করেন।
কম বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও হযরত রাফে ইবনে খাদীজা (রা.) এবং হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.)-কে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেয়া হয়। এর কারণ ছিল, হযরত রাফে ইবনে খাদীজা (রা.) তীরন্দাজ হিসেবে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাকে অনুমতি দেয়ার পর হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, আমি তো রাফের চেয়ে অধিক শক্তিশালী। কুস্তিতে তাকে আমি আছড়ে দিতে পারি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একথা জানান হলে তিনি উভয়কে কুস্তি লড়ার আদেশ দেন। সে কুস্তিতে হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) সত্যিই হযরত রাফেকে আছড়ে ফেলেন। তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সামুরা (রা.)-কেও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেন। জিহাদে অংশ গ্রহণের জন্য এসব তরুণ সাহাবীদের ঈমানী শক্তি ও মনোবলের এমন ইতিহাস সত্যিই বিরল।
শায়খানে সন্ধ্যা হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মাগরিব এবং এশার নামায আদায় করে রাত যাপনের সিদ্ধান্ত দেন। পঞ্চাশ জন সাহাবীকে নির্বাচন করা হয়, যারা মুসলমানদের তাঁবুর চারদিকে অবিরত টহল দেন। এ দলের নেতা ছিলেন হযরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারী (রা.)। তিনিই ইহুদী কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর সাফওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কায়স (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং শত্রু বাহিনী একেবারে কাছাকাছি অবস্থানে থেকে এক অপরকে দেখছিলেন। ওহুদে পৌছার পূর্বেই মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার পথ অবলম্বন করে এবং তিনশ লোক সাথে নিয়ে সেখান থেকে ফিরে যায়। এ সময় সে বলছিল, আমরা বুঝতে পাচ্ছি না খামাখাই কেন জীবন দিতে যাব? সে এ বিতর্ক প্রকাশ করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যদের কথা মেনেছেন, তার কথা মানেননি।
এ মুনাফিক তার দলবল নিয়ে মুসলিম বাহিনী থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার যে কারণ প্রকাশ করছে, নিশ্চিত বলা চলে, কারণ আসলে তা নয়। সে বলছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা মানেননি, তাই সে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তাহলে এ অবস্থায় তার মুসলিম বাহিনীর সাথে এত দূর পর্যন্ত আসার প্রশ্নই আসে না। বরং সেনাদল রওনা হওয়ার আগেই তার আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এ নাজুক মুহূর্তে এসে সে ইসলামী বাহিনীতে চাঞ্চল্য, অস্থিরতা ও দুর্বলতা ছড়াতে চাচ্ছিল। যখন সে শত্রুবাহিনীর প্রতিটি তৎপরতা দেখছিল। তার প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল, দলবলসহ তার মুসলিম বাহিনী ত্যাগ করার ফলে সাধারণ সৈন্যরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগ ত্যাগ করবে। আর যারা থাকবে তাদের সাহস হিম্মত ভেংগে পড়বে। অন্যদিকে এ দৃশ্য দেখে শত্রুর সাহস অটুট থাকবে। সুতরাং মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবায়ের এরূপ কর্মকা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর একনিষ্ঠ আন্তরিক সংগী সাথীদের নির্মূল নিশ্চিহ্ন করার এক কার্যকর প্রচেষ্টা ছিল। এ মুনাফিকের আশা ছিল, এরপর সে এবং তার সাথী অনুসারীদের নেতৃত্ব কর্তৃত্বের জন্যে ময়দান পরিষ্কার নিষ্কণ্টক হয়ে যাবে। এ মুনাফিকের কিছু দুরভিসন্ধি সফল হওয়ার কাছাকাছি ছিল। কেননা সে এবং তার সঙ্গীদের পিছুটান দেখে আওস গোত্রের শাখা বনু হারেসা এবং খাযরাজ গোত্রের শাখা বনু সালামার লোকেরাও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। তারাও ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন এবং তারা ফিরে যাওয়ার সংকল্প গ্রহণের পরও অবিচল হয়ে থাকে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 'যখন তোমাদের মধ্যকার দু'টি দল ভীরুতার পরিচয় দেয়ার ইচ্ছা করেছিল এবং আল্লাহ তাদের বন্ধু। মুমিনদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত।
হযরত জাবের (রা.)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) এ নাজুক পরিস্থিতিতে মুনাফিকদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করতে চেষ্টা করেন। তিনি প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশী মুনাফিকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে তাদের পিছনে কিছু দূর গিয়ে বলেন, এখন ফিরে চল, আল্লাহর পথে লড়াই কর। কিন্তু তারা জবাব দেয়, যদি আমরা জানতাম, তোমরা যুদ্ধ করবে তাহলে আমরা ফিরে আসতাম না। একথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা.) বলেন, ওহে আল্লাহর শত্রুরা, তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নাযিল হবে। স্মরণ রেখো, আল্লাহ তাঁর নবীকে তোমাদের মুখাপেক্ষী রাখবেন না। এ মুনাফিকদের সম্পর্কেই আল্লাহ আয়াত নাযিল করেছেন, 'এবং মুনাফিকদের আনবার জন্যে তাদের বলা হয়েছিল,' এসো, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর। তারা বলল, যদি যুদ্ধ জানতাম তবে নিশ্চিত তোমাদের অনুসরণ করতাম না। সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যা তারা মুখে বলে তা, তাদের অন্তরে নেই। যা তারা গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা তা বিশেষভাবে অবহিত। (সূরা আলে ইমরান, ১৬৭)
মুনাফিকদের ফিরে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশিষ্ট সাতশ মুসলমানকে সঙ্গে নিযে শত্রুদের দিকে অগ্রসর হয়ে প্রান্তরের শেষ সীমায় অবস্থিত ওহুদ পাহাড়ের ঘাঁটিতে পৌঁছে সেখানেই শিবির স্থাপন করেন। সামনে ছিল মদীনা আর পিছনে ওহুদের উঁচু পাহাড়। শত্রু বাহিনী তখন মুসলমান এবং মদীনার মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছিল। এখানে পৌঁছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৈন্যদের বিন্যস্ত ও সংগঠিত করেন। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সৈন্যদের কয়েকটি সারিতে বিভক্ত করেন। তীরন্দাজদের একটি ছোট বাহিনী নির্বাচন করেন। তাদের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ইবনে নোমান আনসারী বদরী (রা.)-কে এ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে কানাত উপত্যকার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মুসলিম বাহিনীর শিবির থেকে প্রায় দেড়শ মিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট পাহাড়ের গিরিপথে নিযুক্ত করেন। এ গিরিপথ বর্তমানে বাজালে রুমাত নামে পরিচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরিপথে মোতায়েনকৃত তীরন্দাজদের নেতার উদ্দেশ্যে বলেন, 'তোমরা ঘোড়সওয়ার শত্রুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাদের আমাদের কাছ থেকে দূরে রাখবে। লক্ষ্য রাখবে তারা যেন পিছনের দিক থেকে আমাদের উপর হামলা করতে না পারে। আমরা জয় লাভ করি অথবা পরাজিত হই, উভয় অবস্থায়ই তোমরা নিজেদের অবস্থানে অবিচল থাকবে। তোমাদের দিক থেকে যেন আমাদের উপর হামলা হতে না পারে। এরপর সকল তীরন্দাজকে লক্ষ্য করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আমাদের পেছনের দিক হিফাযত করবে। যদি দেখ আমরা মারা পড়ছি, তবুও আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসো না। যদি দেখ আমরা গনীমতের মাল আহরণ করছি, তবুও তোমরা আমাদের সাথে অংশ নেবে না (ইবনে হিশাম)। এমনি কঠোর সামরিক নির্দেশসহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীরন্দাজ সৈন্যদের নিযুক্ত করে একমাত্র গিরিপথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কারণ শত্রুরা সেদিক থেকে মুসলমানদের একেবারে পিছনে উপনীত হয়ে তাদের ঘেরাও করে নিতে সক্ষম হত।
হযরত মোনযের ইবনে আমর (রা.)-কে ডান দিকের এবং হযরত যোবায়র ইবনে আওয়াম (রা.) কে বাম দিকের বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.)-কে হযরত যোবায়র ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর সহকারী নিযুক্ত করেন। হযরত যোবায়র (রা.)-কে এক বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি যেন খালেদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বাধীন ঘোড়সওয়ারদের গতিরোধ করে রাখেন (খালিদ তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি)। এ বিন্যাস ছাড়াও সম্মুখভাগে এমন বিশিষ্ট ও বাছাই করা বীর বাহাদুর মুসলমানদের মোতায়েন করা হয়, যাদের বীরত্ব সাহসিকতা এবং জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করার খ্যাতি এত বেশি ছিল যে, তাদের এক একজনকে এক হাজার শত্রুর মোকাবেলায় যথেষ্ট মনে করা হত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেনাবিন্যাসের এ পরিকল্পনা ছিল সূক্ষ্ম যুদ্ধ কৌশল ও সামরিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। এতে তাঁর সামরিক নেতৃত্ব এবং সমর কৌশলে নৈপুণ্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে আরো প্রমাণিত হয়, সুযোগ্য ও দূরদর্শী কোনো সেনানায়কই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ সমর পরিকল্পনা প্রণয়নে সক্ষম হবেন না। কেননা, শত্রু সৈন্যদের উপস্থিতিতে যুদ্ধের ময়দানে এসেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের অবস্থানের জন্যে উৎকৃষ্ট স্থান নির্বাচন করেছিলেন। পাহাড়ের সম্মুখভাগে অবস্থান গ্রহণ করে তিনি শত্রুদের হামলা থেকে পিছন দিক এবং ডান দিক নিরাপদ করেন। বাম দিক থেকে শত্রুরা এসে যে জায়গায় পৌছে হামলা করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, সে জায়গায় তিনি সুদক্ষ তীরন্দাজ বাহিনী মোতায়েন করেন। পিছনে উঁচু জায়গা বাছাই করে তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, খোদা না করুন, পরাজিত হলেও যেন পলায়ন করতে না হয় এবং শত্রুদের ধাওয়ার মুখে পড়ে নাজেহালও হতে না হয়। বরং শিবিরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এমতাবস্থায় শত্রুরা শিবিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্যে হামলা চালালে তাদের শোচনীয় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। পক্ষান্তরে শত্রুদের এমন জায়গায় থাকতে বাধ্য করেছিলেন, যাতে তারা জয়ী হলেও তেমন সুফল লাভ করতে না পারে। আর মুসলমানরা জয় লাভ করলে, তারা মুসলমানদের ধাওয়া থেকে আত্মরক্ষা করতে না পারে। পাশাপাশি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশিষ্ট বীরদের একটি দলকে সম্মুখভাগে রেখে সৈন্য সংখ্যার কমতি পূরণ করেছিলেন। তিনি তৃতীয় হিজরী সালের ৭ই শাওয়াল শনিবার সকালে সেনাবিন্যাসের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেন।
যথাযথভাবে সেনাবিন্যাসের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা যুদ্ধ শুরু করবে না। তিনি সেদিন উপরে নীচে দুটি বর্ম পরিধান করেছিলেন। সাহাবীদের যুদ্ধের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেন, শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময় বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিবে। সাহাবাদের মধ্যে উদ্দীপনা ও জিহাদী জোশ, জযবা সৃষ্টির প্রাক্কালে তিনি একটি ধারাল তলোয়ার খাপমুক্ত করে বলেন, এর হক আদায় করতে পারবে এমন কে আছ? একথা শুনে কয়েকজন সাহাবী তলোয়ার নেয়ার জন্যে ছুটে যান। তাদের মধ্যে হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, হযরত যোবায়র ইবনে আওয়াম এবং ওমর ইবনে খাত্তাব (রা)-ও ছিলেন। হযরত আবু দোজানা সেমাক ইবনে খারশা (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল এর হক কী? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, এ তরবারি দিয়ে শত্রুর চেহারায় এমনভাবে আঘাত করবে যেন সে চেহারা বাঁকা হয়ে যায়। হযরত আবু দোজানা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এ তলোয়ার গ্রহণ করে এর হক আদায় করতে চাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তলোয়ার হযরত আবু দোজানা (রা.)-এর হাতে তুলে দেন।
হযরত আবু দোজানা (রা.) ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক। লড়াইয়ের সময় তিনি বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতেন। তার কাছে একটি লাল পট্টি ছিল। সেটি মাথায় বেঁধে নিলে লোকে বুঝত, এবার তিনি আমৃত্যু লড়াই করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেয়া তলোয়ার গ্রহণ করে তিনি মাথায় লাল পট্টি বেঁধে মুসলমান ও কাফের সৈন্যদের মাঝখান দিয়ে বুক টান করে হাঁটতে লাগলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ ধরনের চলাচল আল্লাহ রব্বুল আলামীন পছন্দ করেন না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়।
মুশরিকরা কাতারবন্দী করার মূলনীতিতেই সৈন্য সমাবেশ করে। তাদের প্রধান সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান। সে সৈন্যদের মাঝামাঝি জায়গায় নিজের কেন্দ্র তৈরী করে। ডান দিকে ছিলেন খালিদ ইবনে ওলীদ, বাঁ দিকে ইকরামা ইবনে আবু জাহেল। পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আর তীরন্দাজ সৈন্যদের নেতৃত্বে আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়াকে নিযুক্ত করা হয়। মুশরিক বহিনীর যুদ্ধ পতাকা বহন করছিল বনু আবদুদ দারের একটি ছোট দল।
যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে কুরাইশরা মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ভাঙ্গন এবং পারস্পরিক কলহ সৃষ্টির চেষ্টা করে। আবু সুফিয়ান আনসারদের কাছে পয়গাম পাঠায়, আপনারা যদি আমাদের এবং আমাদের চাচাতো ভাই (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাঝখান থেকে সরে যান, তবে আমরা আপনাদের উপর হামলা করব না। কিন্তু আনসাররা আবু সুফিয়ানকে কঠোর ভাষায় জবাব পাঠিয়ে কিছু রূঢ় কথাও শুনিয়ে দেন। এ যুদ্ধে কুরাইশ মহিলারাও অংশগ্রহণ করে। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে ওতবা। এসব মহিলা যুদ্ধরত সৈন্যদের মাঝে ঘুরে ঘুরে দফ বাজিয়ে বাজিয়ে তাদের উদ্দীপ্ত করে তুলছিল। যুদ্ধের জন্যে অনুপ্রেরণা দেয়ার পাশাপাশি বর্শা নিক্ষেপ, তলোয়ার এবং তীর ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এরপর উভয় দল মুখোমুখি এসে দাঁড়ালে যুদ্ধ শুরু হয়। কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রথম যুদ্ধ উদ্যোক্তা, মুশরিকদের নিশানাদার তালহা ইবনে আবু তালহা আবদারী সামনে এগিয়ে আসে। এ লোকটি কুরাইশদের মাঝে শ্রেষ্ঠ ঘোড়সওয়ার ছিল। মুসলমানরা তাকে সেনাদলের কোলাব্যাঙ বলতেন। উটের পিঠে সওয়ার হয়ে সে মল্ল বা মুখোমুখি যুদ্ধের আহ্বান জানায়। তার অসাধারণ বীরত্বের কথা ভেবে মুসলমানরা ইতস্তত করছিলেন। হঠাৎ হযরত যোবায়র (রা.) সামনে অগ্রসর হয়ে চোখের পলকে বাঘের মত তালহার উটের উপর লাফিয়ে ওঠেন। পরক্ষণে তালহাকে নিজের কবজায় এনে তাকেসহ নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে তলোয়ার দ্বারা যবাই করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যোবায়র (রা.)-এর অসীম সাহসিকতা দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তোলেন। মুসলমানরাও উচ্চ স্বরে নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার বলে ওঠেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর হযরত যোবায়র (রা.)-এর প্রশংসা করে বলেন, 'সকল নবীরই একজন 'হাওয়ারী' থাকে। আমার 'হাওয়ারী' হচ্ছে যোবায়র। (সীরাতে হালাবিয়া)।
এরপর চারদিকে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র ময়দানে এলোপাতাড়ি হামলা, জবাবী হামলা চলতে থাকে। কুরাইশদের পতাকা রণক্ষেত্রের মাঝামাঝি জায়গায় ছিল। বনু আবদুদ দার তাদের কমান্ডার তালহা ইবনে আবু তালহার মৃত্যুর পর বনু আবদুদ দার গোত্রের দশ ব্যক্তি, যারা মুশরিকদের পতাকা ধারণ করছিল, একে একে সবাই মারা পড়ে। এরপর পতাকা তোলার মতো তাদের কেউ জীবিত ছিল না, কিন্তু সে সময় সওয়াব নামে তাদের এক হাবশী ক্রীতদাস পতাকা তুলে নিয়ে তার পূর্ববর্তী পতাকাবাহী মনিবদের চেয়ে অধিক বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাস সওয়াব নিহত হওয়ার পর পতাকা মাটিতে পড়ে যায় এবং এটা ওঠাতে পারে এমন কেউ বেঁচে ছিল না। এ কারণে তা মাটিতেই পড়ে থাকে।
এদিকে হযরত আবু দোজানা (রা.) মাথায় লাল পট্টি বেঁধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেয়া তলোয়ার হাতে নিয়ে তার হক আদায়ে দৃঢ় সংকল্পে লড়াই করতে করতে অনেক দূর চলে যান। তিনি যে মুশরিকেরই মুখোমুখি হতেন, তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতেন। মুশরিকদের কাতারের পর কাতার তিনি ওলট পালট করে দেন। এক সময় তিনি কুরাইশ নারীদের নেত্রীর কাছে গিয়ে পৌঁছেন। তিনি জানতেন না, ওরা নারী। তিনি বলেন, আমি দেখলাম এক লোক যোদ্ধাদের জোরেশোরে উদ্বুদ্ধ উদ্দীপিত করছে। তাই আমি তাকে নিশানা করলাম, কিন্তু তলোয়ার দিয়ে হামলা করতে চাইলে সে মরণ চিৎকার দিয়ে ওঠে। এ চিৎকার শুনে আমি বুঝে ফেলি সে মহিলা। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তলোয়ার দিয়ে কোনো মহিলাকে হত্যা করে তা কলঙ্কিত করতে চাইনি। এ মহিলা ছিল হিন্দা বিনতে ওতবা অর্থাৎ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী।
এদিকে হযরত হামযা (রা.) ক্রুদ্ধ বাঘের মত লড়াই করছিলেন। অতুলনীয় বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে তিনি শত্রু ব্যূহ ভেদ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সামনে মুশরিক বীর বাহাদুর চতুর্মুখী ঝড়ে উড়ে যাওয়া পাতার মতো ঝরে যাচ্ছিল। তিনি মুশরিক বাহিনীর নিশানাদারদের নিশ্চিহ্নকরণে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন ছাড়াও তাদের বড় বড় জাঁ-বাজ বীর বাহাদুরদের অবস্থা শোচনীয় করে রেখেছিলেন। শত আফসোস, এসময়ই তিনি শহীদ হন, তাকে কিন্তু বীর বাহাদুরের মত সামনা সামনি যুদ্ধে হত্যা করা হয়নি; বরং ভীরু কাপুরুষের মত চুপিসারে হত্যা করা হয়েছে। হযরত হামযা (রা.)-এর হত্যাকারীর নাম ওয়াহশী ইবনে হারব। হত্যাকারী বলেন, আমি ছিলাম জোবায়র ইবনে মোতয়েমের ক্রীতদাস। তার চাচা মুয়ায়মা ইবনে আদী, বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। কুরাইশরা ওহুদ যুদ্ধে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে জোবায়র ইবনে মোতয়েম আমাকে বলল, যদি তুমি মুহাম্মদের চাচা হামযাকে আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধস্বরূপ হত্যা করতে পার, তবে তুমি মুক্তি পাবে। এ প্রস্তাব পাওয়ার পর আমিও কুরাইশদের সাথে ওহদ যুদ্ধে রওনা হই। আমি ছিলাম আবিসিনিয়ার অধিবাসী এবং বর্শা নিক্ষেপে সুদক্ষ। আমার নিক্ষিপ্ত বর্শা কমই লক্ষ্যভ্রষ্ট হত। যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর আমি হযরত হামযা (রা.)-কে খুঁজতে শুরু করি।
এক সময় তাকে পেয়েও যাই। তাকে ধূলি ধূসরিত উটের মত মনে হচ্ছিল। তিনি লোকেদের ছিন্নভিন্ন করতে করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সামনে কোনো বাঁধাই টিকতে পারছিল না।
আল্লাহর শপথ, আমি হযরত হামযা (রা.)-এর উপর হামলার সংকল্প নিয়ে প্রস্তুত হয়ে একটি পাথর অথবা বৃক্ষের আড়ালে লুকিয়ে থেকে তাকে সামনে আসার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলাম। এ সময় সেবা' ইবনে আবদুল ওযযা আমাকে ডিঙ্গিয়ে তার কাছে পৌঁছে যায়। হযরত হামযা (রা.) হুঙ্কার দিয়ে সেবা'কে বলেন, ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর পুত্র, এই নে। একথা বলে তিনি সেবা'র উপর এমন জোরে তরবারির আঘাত করেন, যেন তার ঘাড়ে মাথা ছিলই না। আমি তখন বর্শা তুলে হযরত হামযার (রা.) প্রতি নিক্ষেপ করি। বর্শা তার নাভির নীচে বিদ্ধ হয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পিছনে বেরিয়ে যায়। তিনি পড়ে গিয়ে উঠতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু সক্ষম হননি। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আমি তাকে এ অবস্থায়ই রেখে দেই। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে আমি তার কাছে গিয়ে নিজের বর্শা বের করে নিয়ে কুরাইশ সেনা দলের মাঝে গিয়ে বসে থাকি। হযরত হামযা (রা.) ছাড়া অন্য কাউকে আঘাত করার কোনো ইচ্ছা বা প্রয়োজনই আমার ছিল না। আমি মুক্তি পাওয়ার জন্যেই হযরত হামযা (রা.)-কে হত্যা করেছি। এরপর মক্কায় ফিরে এসেই আমি মুক্তি লাভ করি। (ইবনে হিশাম)
শেরে খোদা, শেরে রাসূল হযরত হামযার (রা.) শাহাদাতে মুসলমানদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও যুদ্ধে মুসলমানদের সাফল্যের লক্ষণ সুস্পষ্ট ছিল। হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত আলী, হযরত যোবায়র, হযরত মোসয়াব ইবনে ওমায়র, হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ, হযরত সা'দ ইবনে মা'য়ায, হযরত সা'দ ইবনে ওবাদা, হযরত সা'দ ইবনে রবী, হযরত নযর ইবনে আনাস (রা.) এমন বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন, যাতে কাফেরদের পিলে চমকে যায়, মনোবল ভেঙ্গে পড়ে, তাদের শক্তি সাহস অকার্যকর হয়ে পড়ে।
নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদদের একজন ছিলেন হযরত হানযালা (রা.)। তিনি সেদিন এক অনন্য গৌরবের সাথে জিহাদের ময়দানে হাযির হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আবু আমির রাহেবের পুত্র, যে ফাসেক উপাধি পায়। হযরত হানযালা (রা.) নতুন বিয়ে করেছিলেন। জিহাদের জন্যে যখন আহ্বান জানানো হচ্ছিল, তখন তিনি ছিলেন বাসর শয্যায়। জিহাদের আহ্বান শোনার সাথে সাথেই তিনি রওনা হয়ে যান। যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর হযরত হানযালা (রা.) মুশরিকদের ব্যূহ ভেদ করে তীব্র বেগে তাদের সেনাপতি আবু সুফিয়ানের কাছ পর্যন্ত পৌছে তার কাজ প্রায় শেষ করে দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তার শাহাদাত নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে তলোয়ার তোলার সাথে সাথে শাদ্দাদ ইবনে আওস দেখে ফেলে এবং হযরত হানযালার (রা.) উপর আকস্মিক হামলা চালায়। এতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
যে সকল তীরন্দাজকে মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবালে রুমাতে নির্দিষ্ট দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন তারা যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মক্কার ঘোড়সওয়াররা খালিদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে এবং ফাসেক আবু আমিরের সহায়তায় ইসলামী ফৌজের বাম বাহু ভেঙ্গে দিয়ে একেবারে পিঠের উপর পৌছে, তাদের সারিতে চাঞ্চল্য ফেলে দিয়ে, পুরোপুরি পরাজিত করতে, পর্যায়ক্রমে তিন বার হামলা চালায়। কিন্তু মুসলমান তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপ করে তাদের এমনভাবে ঝাঁঝরা করে দেয় যে, তাদের তিন বারের হামলাই ব্যর্থ হয় (ফাতহুল বারী)। বেশ কিছুক্ষণ তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে। স্বল্পসংখ্যক মুসলমানের এ বাহিনী যুদ্ধের গতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। অবশেষে মুশরিকদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তাদের কাতারগুলো ডানে বামে, সামনে পেছনে বিক্ষিপ্ত বিশৃংখল হয়ে পড়তে শুরু করে। মনে হচ্ছিল যেন তিন হাজার মুশরিক সাতশ নয়; বরং ত্রিশ হাজার মুসলমানের মুখোমুখি হয়েছে। মুসলমানরা ঈমান, একিন, জীবনবাজি, বীরত্ব ও সাহসিকতার অত্যন্ত সমুচ্চ প্রতিকৃতি হয়ে তীর এবং তলোয়ার চালনায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করছিলেন।
মুসলমানদের অপ্রতিরোধ্য হামলার মুখে মুশরিক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। নিজেদের অসীম শক্তি ব্যয় সত্ত্বেও তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অক্ষমতা ও অপারগতা অনুভব করে। তাদের সাহস মনোবল এতোটাই ভেংগে পড়ে যে, যুদ্ধ পতাকাবাহী সওয়ারের পরিণতি দেখে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে পতাকার কাছে গিয়ে তা তুলে ধরতেও তারা সাহস পাচ্ছিল না। তখন তারা পিছপা হতে শুরু করে এবং পলায়নের পথ অবলম্বন করে। মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ, নিজেদের সম্মান মর্যাদা ও প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধার ইত্যাদি যত বড় বড় কথা তারা বলেছিল, সেসব একেবারে ভুলে বসে। আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের উপর তাঁর সাহায্য নাযিল করেন এবং তাদের সংগে যে অঙ্গীকার করেছিলেন তা পূর্ণ করেন। মুসলমানরা তলোয়ারের মাধ্যমে মুশরিকদের এমনভাবে জবাব দেয়া, যাতে ওরা নিজেদের শিবির ছেড়ে দূরে পালিয়ে যায়। মোটকথা, তারা শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়র (রা.) বলেন, তার পিতা বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমি লক্ষ্য করেছি, হিন্দা বিনতে ওতবা এবং তার সঙ্গিণী মহিলাদের হাঁটু দেখা যাচ্ছিল। তারা কাপড় তুলে ছুটে পালাচ্ছিল। (ইবনে হিশাম)
স্বল্প সংখ্যক মুসলমান মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যখন ইতিহাসের পাতায় এক মর্যাদাপূর্ণ বিজয় প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছিলেন; যা স্বীয় ঔজ্জ্বল্যে জৌলুসে বদর যুদ্ধের বিজয় থেকে কোনোভাবেই কম ছিল না। ঠিক তখনই তীরন্দাজ বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য এক ভয়াবহ ভুল করে ফেলেন। তাদের এ ভয়াবহ ভুলে যুদ্ধের চিত্রই পরিবর্তিত হয়ে যায়। মুসলমানরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন। স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদাত বরণ থেকে অল্পের জন্যে রক্ষা পান। এ ভুলের কারণে মুসলমানদের বদর যুদ্ধে অর্জিত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়ে যায়।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জয় পরাজয় উভয় অবস্থায়ই তীরন্দাজদের স্বস্থানে অটল অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কঠোর নির্দেশ সত্ত্বেও, মুসলমানদের গনীমতের মালামাল সংগ্রহ করতে দেখে এ বাহিনীর দুনিয়াপ্রীতি প্রবল হয়ে পড়ে। তারা একে অন্যকে বলে, গনীমত, গনীমত। তোমাদের সঙ্গীরা জয়ী হয়েছে, এখন আর কিসের প্রতীক্ষা। তীরন্দাজদের মধ্যে থেকে এ আওয়ায উঠতেই তাদের কমাণ্ডার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়র (রা.) তাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তোমরা কি ভুলে গেছো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের কি আদেশ দিয়েছেন? কিন্তু তাদের অধিকাংশই হযরত আবদুল্লাহর (রা.) কথা কানে তোলেননি। তারা বলেন, আল্লাহর শপথ আমরাও ওদের কাছে যাব এবং কিছু গনীমতের মাল অবশ্যই সংগ্রহ করব (সহীহ বুখারী)। এরপর তীরন্দাজদের চল্লিশ জন নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে গণীমত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সাধারণ সৈন্যদের শামিল হন। এভাবে মুসলিম বাহিনীর পিছনের দিক পাহারাশূন্য হয়ে পড়ে। তখন সেস্থানে শুধু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়র (রা.) এবং তাঁর নয় জন সঙ্গী পাহারায় নিযুক্ত রইলেন। তাঁরা দৃঢ় সংকল্পের সাথে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, যদি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দেন তবেই আমরা এখান থেকে যাব অথবা নিজেদের প্রাণ তার মালিকের কাছে সমর্পণ করব।
খালিদ ইবনে ওলীদ তিন বার এ গিরিপথ অতিক্রমের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। এবার তিনি মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর অনুপস্থিতির সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে অত্যন্ত দ্রুতবেগে মুসলিম বাহিনীর একেবারে পিছনে পৌঁছে যান এবং অল্পক্ষণের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়র (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করে পিছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর হামলা করেন। তাঁর সঙ্গীরা উচ্চৈঃস্বরে জয়ধ্বনি তোলে। এতে পরাজিত মুশরিকরা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়ে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদিকে বনু হারেস গোত্রের আমরাহ বিনতে আলকামা নামের এক মহিলা দৌড়ে গিয়ে মুশরিকদের ভূলণ্ঠিত পতাকা উচ্চে তুলে ধরে। দেখতে দেখতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাফেররা তার চারিদিকে জড়ো হতে শুরু করে এবং একে অন্যকে ডাকতে থাকে। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা একত্রিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। মুসলমানরা তখন সামনে পিছনে উভয় দিক থেকেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠিক যেন যাঁতাকলের মাঝখানে পড়ে নিষ্পেষিত হওয়ার উপক্রম পূর্ব মুহূর্ত।
সে সংকট সন্ধিক্ষণে মাত্র নয় জন (সহীহ মুসলিম) সাহাবীকে সাথে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছন দিকে যাচ্ছিলেন এবং মুসলিমদের আক্রমণ আর মুশরিকদের পলায়নের দৃশ্য দেখছিলেন। হঠাৎ তিনি খালিদ ইবনে ওলীদের ঘোড়সওয়ার সংগীদের দেখতে পেলেন। সে সময় তাঁর সামনে মাত্র দু'টি পথ খোলা ছিল। হয় তো নয় জন সঙ্গীসহ নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া এবং শত্রুদের কবলে পড়ে থাকা সাহাবীদের তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়া। অথবা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাহাবীদের ডেকে একত্রিত করে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী করে মুশরিকদের অবরোধ ভেংগে নিজের সৈন্যদের ওহুদের চূড়ায় যাওয়ার পথ করে দেয়া। এ নাজুক পরীক্ষার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে অতুলনীয় সমর নৈপুণ্য ও সাহসিকতার প্রকাশ ঘটে। কেননা, নিজের জীবন রক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে সাহাবীদের প্রাণ রক্ষার সিদ্ধান্ত নেন।
অতএব খালিদ ইবনে ওলীদের ঘোড়সওয়ারদের দেখতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উচ্চৈঃস্বরে ডেকে বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা, এদিকে, এদিকে। অথচ তিনি জানতেন, তাঁর এ ডাকার শব্দ মুসলমানদের আগে কাফেরদের কানে গিয়ে পৌঁছবে। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওয়ায শুনে মুশরিকরা বুঝতে পারে তিনি এখানেই রয়েছেন। এটা বুঝার পর মুশরিকদের ছোট একটি দল মুসলমানদের আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছে যায়। অবশিষ্টরা দ্রুত মুসলমানদের ঘেরাও করতে থাকে।
মুশরিকদের অবরোধে শিকার হওয়ায় একদল মুসলমান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। নিজেদের জীবন রক্ষার চিন্তাই তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে তারা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের পথ ধরে। পিছনে কি হচ্ছে সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানতো না। তাদের কয়েকজন মদীনায় গিয়ে ওঠেন, কয়েকজন পাহাড়ের উপরে আশ্রয় নেন। অন্য একদল পিছনের দিকে গিয়ে মুশরিকদের সাথে মিশে যান। মুশরিক আর মুসলমান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে মুসলমানদের হাতেই কিছু মুসলমান নিহত হয়। সহীহ বুখারীতে হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ওহুদের দিন (প্রথমে) মুশরিকদের পরাজয় হয়েছিল। এরপর ইবলিস আওয়ায দেয়, ওহে আল্লাহর বান্দারা, পিছনে যাও। এতে সামনের কাতারের লোকেরা পিছনের কাতারে ঢুকে পড়ে। হযরত হোযায়ফা (রা.) বলেন, তার পিতা ইয়ামানের উপর হামলা করছে। তিনি বলেন ওহে আল্লাহর বান্দারা, ইনি আমার পিতা, কিন্তু আল্লাহর শপথ, লোকেরা তার থেকে হাত ফেরায়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে মেরেই ফেলল। হযরত হোযায়ফা (রা.) তখন বলেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন আপনাদের মাগফিরাত করুন। হযরত ওরওয়া (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, হযরত হোযায়ফার (রা.) পিতার মাঝে সব সময় কল্যাণ অবশিষ্ট ছিল। এ অবস্থায়ই তিনি আল্লাহর সাথে গিয়ে মিলিত হন। (সহীহ বুখারী)
মুসলিম সেনাদলে চরম বিশৃংখলা ও অব্যবস্থা দেখা দেয়। তাদের অনেকে ছিলেন অস্থির। তারা বুঝতে পারছিলেন না, কোনদিকে যাবেন। সে সময় এক ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে বলেছিল, মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়েছে। এতে মুসলমানদের অবশিষ্ট হুঁশও শেষ হতে থাকে। অধিকাংশের সাহস ভেংগে পড়ে। কোনো কোনো মুসলমান এ ঘোষণা শোনার পর যুদ্ধ বন্ধ করে হাতোদ্যম হয়ে হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলেন। কিছুসংখ্যক মুসলমান এতটুকু পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে: মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বলবে, সে যেন আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে তাদের জন্যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। কিছুক্ষণ পর এ লোকদের কাছ দিয়ে হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, তারা চুপচাপ হাতের উপর হাত ধরে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কিসের প্রতীক্ষায় রয়েছ? তারা জবাব দিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করা হয়েছে। হযরত আনাস ইবনে নযর (রা.) বলেন তাহলে তোমরা বেঁচে থেকে কি করবে? ওঠো, যে জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন দিয়েছেন, সে জন্যে তোমরা জীবন দাও।
এরপর বলেন, হে আল্লাহ, এ মুসলমানরা যা কিছু করেছে তা থেকে আমি তোমার দরবারে পানাহ চাই। আর মুশরিকরা যা কিছু করেছে তা থেকে স্বচ্ছতা পবিত্রতা অবলম্বন করছি। একথা বলে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হলে হযরত সা'দ ইবনে মু'য়ায (রা.)-এর সাথে দেখা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, হে আবু ওমর, কোথায় যাচ্ছেন? হযরত আনাস (রা.) বলেন, জান্নাতের সুবাসের কথা কি আর বলব। হে সা'দ, ওহুদ পাহাড়ের ওপার থেকে জান্নাতের সুবাস অনুভব করছি। একথা বলে তিনি আরো সামনে এগিয়ে মুশরিকদের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে যান। যুদ্ধ শেষে তাকে শনাক্ত করাই সম্ভব হচ্ছিল না। তার বোন আঙ্গুলের কর দেখে তাকে শনাক্ত করেছিলেন। তার দেহে বর্শা, তীর ও তলোয়ারের আশির অধিক আঘাত লেগেছিল। (যাদুল-মায়াদ)
হযরত সাবিত ইবনে দারদাহ (রা.) তার গোত্রের লোকদের ডেকে বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যদি হত্যা করা হয়েই থাকে, আল্লাহ তো জীবিত রয়েছেন। তিনি তো চিরঞ্জীব। তোমরা নিজেদের দ্বীনের জন্যে লড়। সাবিত (রা.) কিছু সাহাবীর সহায়তায় খালিদ ইবনে ওলীদের বাহিনীর উপর হামলা করেন এবং লড়াই করতে করতে খালিদের হাতেই বর্ষার আঘাতে নিহত হন। তার সঙ্গী আনসাররাও তার মতোই লড়াই করতে করতে শাতাদাত বরণ করেন (আস সীরাতুল হালাবিয়া)। একজন মুহাজির সাহাবী এক রক্তাক্ত আনসার সাহবীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মুহাজির সাহাবী বলেন, ও ভাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিহত হয়েছেন? আনসার বলেন, মুহাম্মদ যদি নিহত হয়েই থাকেন, তবে তিনি তো আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন। এখন সে দ্বীনের হিফাযতের জন্যে লড়াই কর (যাদুল মায়াদ)। এ ধরনের সাহস প্রদান এবং উদ্দীপনাময় কথায় মুসলিম বাহিনীর সাহস, শক্তি, সামর্থ্য পুনর্বহাল হয়। তাদের হুঁশ জ্ঞান পুনরায় ফিরে আসে। এরপর মুসলমানরা অস্ত্র ফেলে দেয়া অথবা মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথে মিলে আবু সুফিয়ানের কাছ থেকে নিরাপত্তা লাভের কথা ভাবার পরিবর্তে, অস্ত্র তুলে নেয়। এরপর মুশরিকদের দুর্ভেদ্য ঘেরাও ভেদ করে নিজেদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পথ তৈরীর চেষ্টা করতে থাকে। এ সময় জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যার খবর নিছক মিথ্যা গুজব। এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল বহুগুণে বেড়ে যায়। তারা দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে কাফিরদের বেষ্টনী ভেদ করে নিজেদের শক্তিশালী কেন্দ্রের আশেপাশে একত্র হতে সক্ষম হয়।
মুসলিম বাহিনীর তৃতীয় একটি দল একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তার কথা ভাবছিলেন। তারা অবরোধের খবর পাওয়ার পরই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ছুটে যান। তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত আলী (রা.) প্রমুখ। যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা প্রথম সারিতে সকলের আগে আগে ছিলেন, কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তি সত্তার জন্যে ভয় শংকা দেখা দেয়ায় তারা তাঁর হিফাযত এবং নিরাপত্তা বিধানেও সবার চেয়ে অগ্রগামী থাকেন।
মুসলিম বাহিনী যখন মুশরিকদের অবরোধের যাঁতাকলের দু'পাটের মাঝে পড়ে পিষ্ট হবার উপক্রম; ঠিক সেই সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশেপাশেও চলছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, মুশরিকদের ঘেরাও তৎপরতার শুরুতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে নয় জন সাহাবী ছিলেন। তিনি তখন মুসলমানদের আগেই মুশরিকদের কাছে পৌছে যান। এতে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনে ফেলে। কেননা, সে সময় তারা মুসলমানদের চেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক কাছে ছিল। ফলে মুশরিক সৈন্যরা তাঁর উপর হামলা করে বসে এবং মুসলমানদের সমবেত হওয়ার আগেই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এ ত্বরিত হামলার ফলে সেখানে বিদ্যমান নয় জন সাহাবী ও মুশরিকদের মাঝে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবীদের অসামান্য ভালোবাসা, বীরত্ব ও সাহসিকতার দুর্লভ পরিচয় ফুটে ওঠে।
ওহুদের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতজন আনসার ও দু'জন কুরাইশ সাহাবীর সাথে মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। হামলাকারীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর তিনি বলেন, কে আছো, যে ওদের আমার থেকে প্রতিরোধ করতে পারে? তার জন্যে জান্নাত রয়েছে অথবা তিনি বলেছেন, সে ব্যক্তি জান্নাতে আমার সাথী হবে। এরপর একজন আনসার সাহাবী সামনে অগ্রসর হয়ে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে যান। এরপর মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরো কাছে পৌছে যায়। এবারও পূর্বাবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এভাবে পুনঃপুনঃ প্রতিরোধ যুদ্ধে সাত জন আনসার সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে অবশিষ্ট দু'জন কুরাইশ সাহাবীকে বলেন, আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে সুবিচার করিনি (মুসলিম)। এ সাত জন আনসার সাহাবীর সর্বশেষজন ছিলেন হযরত ওমারা ইবনে ইয়াযিদ ইবনে সাকান (রা.)। লড়াই করতে করতে তিনিও ক্ষতবিক্ষত হয়ে এক সময় ঢলে পড়েন। (ইবনে হিশাম)
হযরত ওমারা ইবনে ইয়াযিদ (রা.)-এর ঢলে পড়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মাত্র দু'জন কুরাইশ সাহাবী ছিলেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু ওসমান (রা.)-এর সূত্র মতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সময় লড়াই করছিলেন, সে সময় লড়াইয়ে তাঁর সঙ্গে হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) এবং হযরত সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা.) ব্যতীত অন্য কেউ ছিলেন না (বুখারী)। সে সময়টা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের চরম সংকটময় মুহূর্ত আর মুশরিকদের জন্যে একটা সুবর্ণ সুযোগ।
প্রকৃতপক্ষে মুশরিকরা সে সুযোগ কাজে লাগাতে কোনো ত্রুটিও করেনি। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে তাঁকে শেষ করেই দিতে চেয়েছিল। এ হামলায় ওতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাস, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাথর নিক্ষেপ করে। সে আঘাতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাটিতে পড়ে যান। তাঁর নীচের মাঢ়ির ডান দিকের 'দাঁত' ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং নীচের ঠোঁট কেটে গিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মেহাব যুরী সামনে অগ্রসর হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কপালে আঘাত করে। আবদুল্লাহ ইবনে কোমায়া নামের এক দুর্বৃত্ত দুরাচার সামনে এসে তাঁর কাঁধে এমন জোরে তলোয়ারের আঘাত করে যে, এক মাস পর্যন্ত তিনি সে আঘাতের যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। তবে আঘাত তাঁর দেহের লৌহবর্ম কাটতে পারেনি। দুর্বৃত্ত ইবনে কোমায়া তরবারি তুলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দ্বিতীয় বার আঘাত করে। এ আঘাত, ডান চোখের নীচের হাড়ে লেগে বর্মের দু'টি কড়া চেহারায় বিঁধে যায়। সাথে সাথে সে দুর্বৃত্ত বলে উঠে, এ নাও, আমি ইবনে কোমায়া (ভঙ্গকারীর পুত্র)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র মুখম লের রক্ত মুছতে মুছতে বলেন, আল্লাহ তা'আলা তোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলুন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের রক্তাক্ত মুখম ল মুছছিলেন আর বলছিলেন, সে জাতি কি করে সফল হতে পারে, যারা নিজেদের নবীর চেহারা যখম করেছে, তার দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদের আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একথা বলার পর আল্লাহ রব্বুল আলামীন এ আয়াত নাযিল করেন, 'তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদের শাস্তি দেবেন, এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছু নেই, কারণ তারা যালিম (বুখারী)। কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, হে আল্লাহ, আমার কওমকে ক্ষমা কর, কেননা ওরা জানে না (বুখারী)। মুসলিম শরীফেও বর্ণিত হয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার বলছিলেন, হে পরওয়ারদেগার, আমার কওমকে ক্ষমা করে দাও, ওরা জানে না।
নিঃসন্দেহে মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু হযরত তালহা (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) অতুলনীয় আত্মত্যাগ, অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার মাধ্যমে মুশরেকদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন (বুখারী)। তারা দু'জনই ছিলেন আরবের সুদক্ষ তীরন্দাজ। তারা তীর নিক্ষেপ করে করে হামলাকারী মুশরিকদের, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তুনীরের সব তীর হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)-কে ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, তীর চালাও, আমার মা বাবা তোমার জন্যে কুরবান হোন। তীর নিক্ষেপে হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)-এর দক্ষতা নৈপুণ্য এ থেকেই প্রমাণিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনই অন্য কোন সাহাবীর জন্যে তাঁর পিতা মাতা নিবেদিত হওয়ার কথা বলেননি। (বুখারী)
হযরত তালহার (রা.) বীরত্বের বিবরণ নাসাঈ শরীফের এক রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়। যাতে হযরত জাবের (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মুশরিকদের সে সময়ের হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। তখন তিনি মুষ্টিমেয় কয়েকজন আনসার সাহাবীর সাথে ছিলেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘেরাও করে ফেললে তিনি বলেছিলেন, এদের সাথে লড়াই করার মতো কে আছো? হযরত তালহা (রা.) বলেন, আমি আছি। এরপর হযরত জাবের (রা.) আনসারদের সামনে অগ্রসর হওয়ার এবং একে একে শহীদ হওয়ার বিবরণ উল্লেখ করেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, আনসাররা শহীদ হওয়ার পর হযরত তালহা (রা.) সামনে এগিয়ে একাই এগার জনের সমান বীরত্বের পরিচয় দেন। এক কাফির সেনা, তাঁর হাতে তরবারির আঘাত হানে, এতে তাঁর আঙ্গুল কেটে যায়। সাথে সাথে তিনি 'ইস সি' শব্দ উচ্চারণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি যদি বিসমিল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করতে, তাহলে ফেরেশতারা সকলের সামনে তোমাকে উপরে তুলে নিয়ে যেতেন। হযরত জাবের (রা.) বলেন, এরপর আল্লাহ কাফিরদের অন্যদিকে ফিরিয়ে দেন। (ফাতহুল বারী)
ওহুদের দিন তালহার (রা.) দেহে উনচল্লিশ অথবা পঁয়ত্রিশ আঘাত লেগেছিল। তার শাহাদাত আঙ্গুলসহ দুটি আঙ্গুল নিষ্ক্রীয় হয়ে যায় (ফাতহুল বারী)। ইমাম বুখারী কায়স ইবনে আবু হাযেম (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি লক্ষ্য করলাম, তালহার (রা.) হাত নিষ্ক্রীয়। এ হাত দ্বারা ওহুদের দিন তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করেছিলেন (বুখারী)। তিরিমিযী শরীফের বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন বলেছিলেন, যে ব্যক্তি কোন শহীদকে ভূপৃষ্ঠে চলাফেরা করা অবস্থায় দেখতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে ওবায়দুলাহ (রা.)-কে দেখে (মিশকাত)। আবু দাউদ তায়ালেসী হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ওহুদ যুদ্ধের আলোচনার সময় বলতেন, সেদিনের যুদ্ধের একক কৃতিত্ব ছিল তালহার (ফাতহুল বারী)। সেদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনিই সর্বাধিক পালন করেন। হযরত আবু বকর (রা.) হযরত তালহা (রা.) সম্পর্কে একথাও বলেন, 'হে তালহা, তোমার জন্যে জান্নাতসমূহ ওয়াজিব হয়ে গেছে। তুমি হুরেঈনের মাঝে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছ'। (বুখারী)
সে সংকট সন্ধিক্ষণে আল্লাহ গায়েব থেকে সাহায্য প্রেরণ করেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত সাদ (রা.) বর্ণনা করেন, ওহুদের দিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাদা পোশাক পরিহিত দু'জন লোককে দেখেছি। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষে বীরত্বের সাথে লড়াই করছিলেন। এর আগে বা পরে সে দু'জন লোককে আমি কখনো দেখিনি। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তারা দু'জন ছিলেন হযরত জিবারাঈল (আ.) ও হযরত মিকাঈল (আ.) (বুখারী)। উল্লিখিত দুর্ঘটনা আকস্মিকভাবে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটে গিয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্বাচিত সাহাবীরা, যারা যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রথম কাতারে ছিলেন, তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বান শোনার অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর কাছে ছুটে এসেছিলেন। তারা চেষ্টা করছিলেন যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তি সত্তার ব্যাপারে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, কিন্তু এসব সাহাবী তাঁর কাছে পৌঁছার আগেই তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। ততক্ষণে ছয় জন আনসার সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন, সপ্তম আনসার সাহাবী আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ঢলে পড়েছেন। হযরত সা'দ (রা.) এবং হযরত তালহা (রা.) প্রাণপণ প্রচেষ্টা করে মুশরিকদের হামলা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষার জন্যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাহাবীরা এসেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছে নিজেদের শরীর ও হাতিয়ার দিয়ে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন এবং শত্রুর হামলা প্রতিরোধে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সর্বপ্রথম ছুটে এসেছিলেন তাঁর গুহার সাথী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, ওহুদের দিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহরক্ষীরা ছাড়া অন্য সবাই তাঁকে অবস্থান স্থলে রেখে যুদ্ধ করতে সামনের কাতারে চলে গিয়েছিলেন। অবরোধের দুর্ঘটনার পর সর্বপ্রথম আমিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি একজন লোক তাঁকে রক্ষার জন্যে লড়াই করছেন আমি মনে মনে বললাম, আপনার নাম তো তালহা (রা.)। আপনার উপর আমার মা বাবা কুরবান হোন। এ সময় হযরত আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) চড়ুই পাখির উড়ার মতো দ্রুত ছুটে আমার কাছে আসেন। আমরা উভয়ে দৌঁড়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দেখি এক ব্যক্তি আড়াল হয়ে পড়ে আছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের ভাইকে তোলো। সে নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।
হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আমরা পৌছে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক যখম হয়ে গেছে। শিরস্ত্রাণের দুটি কড়া চোখের নীচে চেহারায় গেঁথে গেছে। আমি সেগুলো বের করতে চাইলে আবু ওবায়দা (রা.) বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে ওগুলো আমাকে বের করতে দিন। এরপর তিনি দাঁত দিয়ে একটি কড়া কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে বের করতে লাগলেন, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথা কম পান। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি কড়া বের করেন। এতে হযরত আবু ওবায়দার নীচের মাড়ির একটি দাঁত পড়ে যায়। দ্বিতীয় কড়াটি আমি বের করতে চাইলাম, কিন্তু আবু ওবায়দা (রা.) বলেন, আবু বকর (রা.), আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বের করতে দিন। এরপর তিনি দ্বিতীয় কড়াটিও ধীরে ধীরে টেনে বের করেন। এতে তাঁর নীচের মাড়ির আরেকটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের ভাই তালহাকে সামলাও। সে নিজের জন্যে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, এরপর আমরা হযরত তালহার (রা.) প্রতি মনোনিবেশ করি। তার দেহে দশটির বেশি আঘাত লেগেছিল (যাদুল মায়াদ)। হযরত তালহা (রা.) সেদিন কি রূপ বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিলেন তা এতেই বুঝা যায়।
সে সংকটময় মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিবেদিত প্রাণ সাহাবীদের একটি দল এসে পৌঁছেন। তারা হলেন, হযরত আবু দুজানা, হযরত মুসয়াব ইবনে ওমায়র, হযরত আলী ইবনে আবু তালিব, হযরত সাহল ইবনে হোনায়ফ, হযরত মালেক ইবনে সেনান (হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর পিতা), হযরত উম্মে ওমারা নোসায়বা বিনতে কা'ব মাযেনিয়া, হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব, হযরত হাতেব ইবনে আবু বালতায়া এবং হযরত আবু তালহা (রা.)। এদিকে প্রতি মুহূর্তে শত্রুদের সংখ্যাও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলে তাদের হামলাও কঠিন হচ্ছিল। এক পর্যায়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গর্তের ভেতর পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পান। ফাসেক আবু আমির মুসলমানদের ক্ষতি করতে এ ধরনের কয়েকটি গর্ত খনন করে রেখেছিলেন। গর্তে পড়ে যাওয়ার পর হযরত আলী (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ধরলেন এবং হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) তাঁকে কোলে তুলে নিলে তবেই তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হন।
নাফে ইবনে জোবায়র (র.) বলেন, আমি এক মুহাজির সাহাবীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, ওহুদের যুদ্ধে আমি হাযির ছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, চারদিক থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর তীর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তিনি তীরের মাঝখানে রয়েছেন, সেসব তীর তাঁকে ঘিরে থাকা সাহাবীরা প্রতিরোধ করছিলেন। আমি আরো লক্ষ্য করলাম, আবদুল্লাহ ইবনে শেহাব যুহরী জানতে চাচ্ছিলেন, বলো, মুহাম্মদ কোথায়? এবার আমি থাকব অথবা সে থাকবে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশেই ছিলেন। তাঁর কাছে সে সময় অন্য কেউ ছিল না। জবাবে ইবনে শেহাব বলল, আল্লাহর শপথ, আমি তাকে দেখতেই পাইনি। আমাদের দৃষ্টি থেকে তাকে হিফাযত করা হয়েছে। এরপর আমরা চার জন প্রতিজ্ঞা করে বেরুলাম তাদের হত্যা করব, কিন্তু আমরা তাদের পর্যন্ত পৌছতে পারিনি। (যাদুল মায়াদ)
এ সময় মুসলমানরা এমন অসাধারণ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, যার উদাহরণ ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। হযরত আবু তালহা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বুক টান করে দাঁড়ান। তিনি বুক উপরে তুলে ধরতেন যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রক্ষা করতে পারেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, ওহুদের দিন সর্বসাধারণ মুসলমান পরাজিত হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে না এসে এদিক ওদিক ছুটে পালাচ্ছিল। হযরত আবু তালহা (রা.) একটি ঢাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। নিপুণ হাতে তীর নিক্ষেপ করতেন। সেদিন তিনি দু'টি অথবা তিনটি ধনুক ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। পাশ দিয়ে কেউ তুনীর নিয়ে অতিক্রম করতে থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, এগুলো আবু তালহা (রা.)-কে দাও। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের প্রতি মাথা উঁচু করে তাকালে হযরত আবু তালহা (রা.) বলতেন, আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান হোন, আপনি মাথা উঁচু করে তাকাবেন না, এতে আপনার পবিত্র দেহে তীর বিদ্ধ হতে পারে। আমার বুক আপনার বুকের সামনে রয়েছে। (বুখারী)
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত আবু তালহা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ একই ঢাল দিয়ে আত্মরক্ষা করছিলেন। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। তিনি তীর নিক্ষেপের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা উঁচু করে দেখতেন তা কোথায় গিয়ে পড়েছে (বুখারী)। হযরত আবু দুজানা (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এসে তাঁর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নিজের পিঠকে ঢাল বানিয়ে দেন, শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর তার পিঠে এসে বিধছিল, কিন্তু তিনি একটুও নড়াচড়া করছিলেন না। হযরত হাতেব ইনবে আবু বালতায়া (রা.) ওতবা ইবনে আবী ওয়াক্কাসের পিছু নেন, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁত মোবারক শহীদ করেছিল। হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (রা.) তরবারি দিয়ে প্রচ শক্তিতে ওতবাকে আঘাত করেন, যাতে তার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। হযরত হাতেব (রা.) ওতবার তরবারি এবং ঘোড়া কবজা করেন। হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) নিজের ভাই ওতবাকে হত্যা করতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু এ আগ্রহ পূরণে তিনি সফল হতে পারেননি। বরং এ সৌভাগ্য হযরত হাতেব (রা.) অর্জন করেন।
হযরত সাহল বিন হোনায়ফ (রা.) ও নামকরা তীরন্দাজ ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মরণের বায়াত করে অত্যন্ত বীরবিক্রমে মুশরিকদের প্রতিরোধ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তীর নিক্ষেপ করছিলেন। হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ধনুক থেকে এতো তীর নিক্ষেপ করেছিলেন, যাতে ধনুকের এক কিনারা ভেঙ্গে গিয়েছিল। সে ধনুক পরে হযরত কাতাদা ইবনে নো'মান (রা.) নিয়েছিলেন এবং সেটা তাঁর কাছেই ছিল। সেদিন হযরত কাতাদা (রা.)-এর চোখে এমন আঘাত লেগেছিল যাতে চোখ চেহারার উপর ঢলে পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র হাতে সে চোখ কোটরে প্রবেশ করিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে দুটি চোখের মধ্যে সে চোখটিই বেশী সুন্দর দেখাত এবং সেটির দৃষ্টি ছিল অধিক প্রখর। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) লড়াই করতে করতে মুখে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁর সামনের মাড়ির দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি বিশ বাইশটি আঘাত পেয়েছিলেন। এসব আঘাতের কিছু তাঁর পায়েও লেগেছিল, যাতে তিনি খোঁড়া হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরীর (রা.) পিতা হযরত মালেক ইবনে সেনান (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার রক্ত চুষে পরিষ্কার করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, থুথু ফেলে দাও। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি থুথু ফেলব না। এরপর ফিরে গিয়ে তিনি লড়াই করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেউ যদি কোন জান্নাতী মানুষকে দেখতে চায় তবে সে যেন মালেক ইবনে সেনান (রা.)-কে দেখে। এরপর তিনি লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
ওহুদ যুদ্ধে মুসলমান মহিলাদের ভূমিকাও ছিল অনন্য। মহিলা সাহাবী হযরত উম্মে ওমারা নোসায়বা বিনতে কা'ব (রা.) অভূতপূর্ব কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি কয়েকজন মুসলমানের মাঝে থেকে লড়াই করতে করতে ইবনে কোমায়রের সামনে গিয়ে পৌছেন। ইবনে কোমায়ার তলোয়ার দিয়ে সজোরে আঘাত করলে তাঁর কাঁধে যখম হয়। তিনিও তলোয়ার দিয়ে ইবনে কোমায়ারকে কয়েকবার আঘাত করেন। কিন্তু সে পাপিষ্ঠ বর্ম পরিহিত থাকায় বেঁচে যায়। হযরত উম্মে ওমারা লড়াই করতে করতে বারোটি আঘাত পান।
হযরত মোসআব ইবনে ওমায়ের (রা.) অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ইবনে কোমায়ার ও তাঁর সাথীদের উপর্যুপরি হামলা প্রতিরোধ করেন। তাঁর হাতে ছিল ইসলামী বাহিনীর পতাকা। শত্রু সৈন্যরা তার ডান হাতে এমন জোরে তলোয়ার চালায় যাতে তাঁর হাত কেটে যায়। এরপর তিনি বাম হাতে পতাকা তুলে ধরেন এবং কাফের বাহিনীর সামনে স্থির অবিচল থাকেন। অবশেষে তার বাম হাতও কেটে যায়। তিনি তখন হাঁটুতে ঠেস দিয়ে বুক ও ঘাড়ের সাহায্যে পতাকা উর্ধ্বে তুলে ধরেন। এ অবস্থায়ই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর হত্যাকারী ছিল ইবনে কোমায়ার। এ দুর্বৃত্ত হযরত মোসআব (রা.)-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করেছিল। হযরত মোসআবের (রা.) চেহারার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার মিল ছিল। হযরত মোসআব (রা.)-কে হত্যা করে ইবনে কোমায়ার মুশরিকদের কাছে গিয়ে চিৎকার করে ঘোষণা করে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করা হয়েছে (ইবনে হিশাম)। ইবনে কোমায়ার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে দিলে মুহূর্তে তা মুসলমান ও মুশরিকদের কাছে পৌঁছে যায়। এটা ছিল সে নাযুক মূহূর্ত, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে দূরে মুশরিকদের অবরোধের মাঝে যুদ্ধরত সাহাবীদের মনোবল ভেঙ্গে যুদ্ধের সংকল্প শিথিল হয়ে পড়ে। তাদের সারিগুলো উতাল পাতাল এবং অনৈক্য বিশৃংখলার শিকার হয়। হামলা কিছুটা কমে আসে। কেননা মুশরিকরা ভেবেছিল, তাদের আসল উদ্দেশ্য পুরো হয়ে গেছে। অতএব বহুসংখ্যক মুশরিক হামলা বন্ধ করে দিয়ে মুসলিম শহীদদের লাশ বিকৃত করতে শুরু করে।
হযরত মোসআব ইবনে ওমায়রের (রা.) শাহাদাতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ পতাকা হযরত আলী (রা.)-কে দেন। তিনি অবিচলতার সাথে দৃঢ়পদে লড়াই করেন। সেখানে উপস্থিত অন্য কয়েকজন সাহাবীও অতুলনীয়, বীরত্ব এবং সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাল্টা আক্রমণ করেন। অবশেষে এ ধরনের সম্ভাবনা দেখা দেয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের কাতার চিরে সাহাবীদের কাছে যাওয়ার জন্যে পথ তৈরী করে নিতে পারেন। অতএব তিনি সাহাবীদের নিরাপত্তা বলয়ে প্রবেশের উদ্দেশ্যে পা বাড়ান। এ সময় প্রথমে হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) তাঁকে চিনে ফেলেন। আনন্দে চিৎকার করে তিনি বলেন ওহে মুসলমানরা, তোমাদের জন্যে সুসংবাদ, এতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসছেন। তিনি তাকে চুপ করার ইঙ্গিত দেন, যাতে মুশরিকরা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে না পারে। কিন্তু মুসলমানরা তাঁর ডাক শুনে ফেলেছিলেন, ফলে তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে প্রায় ত্রিশ জন সাহাবী হাযির হন।
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের ঘাঁটিতে মুসলমানদের শিবিরের দিকে যেতে শুরু করেন। তিনি শিবিরে গিয়ে পৌঁছলে মুশরিকরা মুসলমানদের অবরোধের মাঝে নেয়ার যে কাজ শুরু করেছিল সেটা ব্যর্থ হয়ে যাবে, এ কারণে তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যাবর্তন ব্যর্থ করে দিতে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালায়, কিন্তু তিনি হামলাকারীদের ভিড় ঠেলে শিবিরে ফেরার রাস্তা করে নেন। এ সময় ওসমান ইবনে উবদুল্লাহ ইবনে মুগীরা নামের এক দুর্বৃত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অগ্রসর হতে হতে বলে, হয়তো আমি থাকব অথবা সে থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে থেমে যান, কিন্তু সে সুযোগ হয়নি। কেননা তার ঘোড়া একটি গর্তে পড়ে যায়। ইত্যবসরে হযরত হারেস বিন সেম্মা (রা.) হুঙ্কার দিয়ে সামনে এগিয়ে তার পায়ে তলোয়ারের প্রচ আঘাত করে তাকে বসিয়ে দেন। এরপর তাকে হত্যা শেষে তার অস্ত্র খুলে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌছেন। এরই মধ্যে এক মক্কী ঘোড়সওয়ার আবদুল্লাহ ইবনে জাবের ঘুরে এসে হযরত হারেস ইবনে সেম্মা (রা.)-এর কাঁধে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে, কিন্তু মুসলমানরা দৌড়ে এসে তাকে তুলে নেন। পরক্ষণে মাথায় লাল পট্টি পরিহিত হযরত আবু দুজানা (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে জাবেরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তলোয়ারের আঘাত হানেন, যাতে তার মাথা উড়ে যায়।
কুদরতের আরেক রহস্যময় ব্যাপার হল, এ ধরনের জীবন-মরণ যুদ্ধের মধ্যেও مسلمانوں চোখে ঘুম পাচ্ছিল। পবিত্র কুরআনের বাণী অনুযায়ী এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রশান্তির নিদর্শন। হযরত আবু তালহা (রা.) বলেন, ওহুদের বিভীষিকাময় যুদ্ধের সময় যাদের ঘুম পাচ্ছিল, আমিও তাদের একজন। ঘুমের চাপে কয়েকবার আমার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তরবারি পড়ে যাচ্ছিল আর আমি তা তুলে নিচ্ছিলাম। একাধিকবার এরকম হয়েছিল (বুখারী)। মোটকথা, এরকম প্রাণপণ প্রচেষ্টায় مسلمانوں এ ছোট দল সুশৃংখলভাবে পাহাড়ের ঘাঁটিতে অবস্থিত শিবিরে গিয়ে পৌঁছেন এবং অবশিষ্ট সৈন্যদের জন্যেও সুরক্ষিত শিবির পর্যন্ত পৌছার পথ করে দেন। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রণকৌশলের সামনে খালিদ ইবনে ওলীদের রণকৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়।
ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘাঁটিতে পৌঁছার পর উবাই ইবনে খালফ একথা বলতে বলতে সামনে অগ্রসর হয়: মুহাম্মদ কোথায়? হয়তো আমি থাকব অথবা সে থাকবে? সাহাবীরা বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাদের কেউ কি তার উপর হামলা করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ওকে আসতে দাও। এ দুর্বৃত্ত কাছে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হারেস ইবনে সেম্মা (রা.)-এর কাছ থেকে ছোট একটা বর্শা নিয়ে তাতে ঝটকা মারেন। তখন লোকজন এমনভাবে এদিকে ওদিকে সটকে যায়, যেমন গায়ে মাছি বসলে উট একটুখানি ঝাঁকুনি দিলে মাছি উড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর উবাইয়ের মুখোমুখি গমন করেন। তার শিরস্ত্রাণ এবং বর্মের মাঝামাঝি কণ্ঠনালীর কাছে একটুখানি জায়গা খালি ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে স্থান লক্ষ্য করে বর্শা নিক্ষেপ করেন। এতে উবাই ইবনে খালফ ঘোড়া থেকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে কুরাইশদের কাছে ফিরে যায়।
বর্শার আঘাতে তার গলার কাছে সামান্য ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেটা কোন বড় আঘাত ছিল না। রক্তও বের হয়নি। তবুও সে চিৎকার করে বলতে থাকে, আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাকে হত্যা করেছে। লোকেরা তাকে বলল, কি বাজে বকছ, তোমার আঘাত তো তেমন গুরুতর নয়। সামান্য আঁচড় লাগার মত দেখা যাচ্ছে। উবাই বলল, মুহাম্মদ মক্কায় আমাকে বলেছিল আমি তোমাকে হত্যা করব। কাজেই আল্লাহর শপথ, সে আমার উপর থুথু নিক্ষেপ করলেও আমার প্রাণ চলে যেত। পরিশেষে আল্লাহর এ দুশমন মক্কায় ফেরার পথে সারেফ নামক জায়গায় মারা যায়। (ইবনে হিশাম)। আবুল আসওয়াদ হযরত ওরওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, মৃত্যুর পূর্বে উবাই ষাঁড়ের মতো চিৎকার করে বলতে ছিল, সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ। আমার যে কষ্ট হচ্ছে, সে কষ্ট যদি যিল মাজাযের অধিবাসীদের হত, তাহলে তারা সবাই মরে যেত (মুখতাসার সীরাতুর রাসূল)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার পথে একটি উঁচু জায়গা দিয়ে উঠতে পারছিলেন না, একে তো তাঁর দেহ ছিল মজবুত ও শক্তিশালী, দ্বিতীয়ত তিনি দু'টো বর্ম পরিধান করেছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন মারাত্মকভাবে আহত। হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) নীচে বসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাঁধে তুলে দাঁড়িয়ে যান। এভাবে তিনি চাতালের উপর ওঠেন। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তালহা নিজের জন্যে জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছে (ইবনে হিশাম)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘাঁটির ভিতরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার পর মুশরিকরা مسلمانوں পরাস্ত করতে সর্বশেষ চেষ্টা চালায়। ইবনে ইসহাক বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘাঁটির ভেতরে চলে যাবার পর আবু সুফিয়ান এবং খালিদ ইবনে ওলীদের নেতৃত্বে মুশরিকদের একটি ছোট দল উপরে ওঠার চেষ্টা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন। হে আল্লাহ, ওরা যেন উপরে উঠতে না পারে। এরপর হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এবং একদল মুহাজির সাহাবী যুদ্ধ করে ওদের পাহাড়ের নীচে নামিয়ে দেয় (ইবনে হিশাম)।
মুশরিকরা পাহাড়ের উপরে সামান্য উঠে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সা'দ (রা.)-কে বলেন, ওদের পিছনে ঠেলে দাও। সা'দ (রা.) বলেন, আমি একাকী কিভাবে তা পারব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন বার কথাটা উচ্চারণ করেন। পরে হযরত সা'দ (রা.) তার তুন থেকে একটা তীর বের করে এক শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করলে সে ওখানেই নিহত হয়। হযরত সা'দ (রা.) বলেন, এরপর আমি সে তীরে আরেকজনকেও হত্যা করলাম। এরপর মুশরিকরা নীচে নেমে যায়। আমি ভাবলাম, এটি বরকতসম্পন্ন তীর। পরে আমি সে তীর আমার তুনের মধ্যে রেখে দেই। এ তীর জীবনভর হযরত সা'দ (রা.)-এর কাছে ছিল। পরে তার সন্তানরাও সেটি সংরক্ষণ করেন। (যাদুল মায়াদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এটা ছিল মুশরিকদের সর্বশেষ হামলা। সে সময় কাফিররা রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছুই জানত না। বরং তারা এক রকম ধরেই নিয়েছিল যে, তিনি নিহত হয়েছেন। এ কারণে তারা নিজেদের শিবিরে ফিরে গিয়ে মক্কা অভিমুখে গমনের প্রস্তুতি শুরু করে। এ সময় কিছু মুশরিক নারী-পুরুষ مسلمان শহীদদের অংগ প্রতংগ ছেদনে লিপ্ত হয়। তারা শহীদদের লজ্জাস্থান, কান, নাক প্রভৃতি অঙ্গ কেটে নেয় এবং পেট চিরে ফেলে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে ওতবা হযরত হামযার (রা.) বুক চিরে কলিজা বের করে মুখে পুরে চিবিয়ে গিলে ফেলার চেষ্টা করে এবং গিলতে না পারায় ফেলে দেয়। তারা মুসলিম শহীদদের কর্তিত নাক ও কান দিয়ে মালা গেঁথে নুপুর বানিয়ে গলায় এবং পায়ে পরিধান করে (ইবনে হিশাম)। শেষ দিকে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা থেকে সহজেই বোঝা যায়, নিবেদিত প্রাণ মুসলমানরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কিরূপ দৃঢ় সংকল্প ছিলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনে জীবন বিসর্জন দিতে তাদের আগ্রহের কোন কমতি ছিল না?
হযরত কা'ব ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আমি সেসব মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যারা ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে আসে। আমি লক্ষ্য করলাম, মুশরিকরা মুসলিম শহীদদের অংগ প্রতংগ কাটছে। আমি খানিকটা থেমে সামনে এগিয়ে গেলাম। লক্ষ্য করলাম, বর্ম পরিহিত বিশালদেহী এক মুশরিক শহীদদের মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করছে। সে যেতে যেতে বলছিল যবাই করা বকরীর মতো স্তূপ পড়ে গেছে। আর একজন মুসলমান এ লোকটির পথপানে চেয়ে আছে। সেও বর্ম পরিহিত। আমি আরো কয়েক কদম অগ্রসর হয়ে তার পিছু নেই। আমি দাঁড়িয়ে উভয়ের শক্তি পরিমাপ করলাম। আমার মনে হল, কাফের লোকটি অস্ত্রশস্ত্র এবং সাজ সরঞ্জাম উভয় দিক থেকেই উত্তম। এবার আমি উভয়ের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে উভয়ের সংঘর্ষ বেধে যায়। মুসলমান লোকটি ওই কাফিরকে তরবারি দিয়ে এমন আঘাত করলেন যাতে সে দ্বিখতি হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর সে মুসলমান নিজের মুখোশ খুলে বলেন, ও কা'ব, কাজটা কেমন হল? আমি হচ্ছি আবু দুজানা (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া)।
যুদ্ধ শেষে কিছুসংখ্যক মুসলিম মহিলা জিহাদের ময়দানে পৌঁছেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন, আমি হযরত আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.) এবং উম্মে সোলায়ম (রা.)-কে দেখলাম, তারা পায়ের গোঁড়ালির উপর কাপড় তুলে পিঠে পানির মশক বয়ে নিয়ে আসছেন এবং مسلمانوں পান করাচ্ছেন (বুখারী)। হযরত ওমর (রা.) বলেন, ওহুদের দিন হযরত উম্মে সালীত (রা.) আমাদের জন্যে মশক ভর্তি করে পানি নিয়ে আসছিলেন (বুখারী)। পানি বহনকারিণী মহিলাদের মধ্যে হযরত উম্মে আয়মানও ছিলেন। তিনি মদীনায় ফিরে যাওয়া পরাজিত مسلمانوں দেখে তাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করে বলছিলেন, এ নাও সুতা কাটার চাক্কি, আর তোমাদের তলোয়ার আমাদের হাতে দাও। এরপর তিনি দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে আহতদের পানি পান করাতে লাগলেন। হিব্বান ইবনে আরকা নামক এক ব্যক্তি তার প্রতি তীর নিক্ষেপ করে। এতে তিনি পড়ে গেলে তার পর্দা খুলে যায়। আল্লাহর দুশমন তা দেখে খিলখিল করে হেসে ওঠে। ব্যাপারটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব খারাপ লাগল। তিনি হযরত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)-কে একটি পালকশূন্য তীর দিয়ে বলেন, এটি নিক্ষেপ কর। সা'দ তীর নিক্ষেপ করলেন এবং তা হিব্বানের গলায় বিদ্ধ হয়ে সে চিৎ হয়ে পড়ে যায় এবং তারও পর্দা খুলে যায়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে হাসেন, যাতে তাঁর মাড়ির মূলের দাঁত দেখা যেতে থাকে। এরপর বলেন, সা'দ উম্মে আয়মানের বদলা গ্রহণ করেছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার দোয়া কবুল করুন। (আস সীরাতুল হালবিয়া)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের ঘাঁটিতে আশ্রয় নেয়ার পর হযরত আলী (রা.) তাঁর ঢালে করে মেহরাস থেকে পানি নিয়ে আসেন। বলা হয়ে থাকে, মেহরাস পাথরে তৈরী এক ধরনের কূপ, যাতে পানি বেশী আসে। এও বলা হয়, হেরাস ওহুদের একটি ঝর্ণা। হযরত আলী (রা.) পানি এনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পান করতে দেন। কিন্তু কিছুটা গন্ধ অনুভব হওয়ায় তিনি সে পানি পান না করে চেহারার রক্ত ধুয়ে নেন এবং কিছু পানি মাথায় ঢালেন। সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন, সে ব্যক্তির উপর আল্লাহর কঠিন গযব, যে আল্লাহর রাসূলের চেহারা রক্তাক্ত করেছে। (ইবনে হিশাম)
হযরত সাহল (রা.) বলেন, আমি জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারার রক্ত কে ধুয়েছেন, পানি কে ঢেলেছেন এবং চিকিৎসা কি বস্তু দ্বারা হয়েছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) তাঁর ক্ষত ধুয়ে দিচ্ছিলেন, আর হযরত আলী (রা.) ঢালে করে আনা পানি ক্ষতের উপর বইয়ে দিচ্ছিলেন। হযরত ফাতিমা (রা.) লক্ষ্য করলেন, পানি ঢেলে দেয়ায় রক্ত আরো বেশী বের হচ্ছে। তখন তিনি চাটাইয়ের একটি টুকরো নিয়ে আগুনে পুড়ে ছাই ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেন, যাতে রক্ত বন্ধ হয়ে যায় (বুখারী)। এ দিকে হযরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) সুপেয় মিষ্টি পানি নিয়ে আসেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পানি পান করে তাঁর কল্যাণের জন্যে দোয়া করেন (আস সীরাতুল হালবিয়া)। যখমের যন্ত্রণার কারণে এ দিন তিনি যুহরের নামায বসে আদায় করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামও তাঁর পেছনে বসেই নামায আদায় করেন। (ইবনে হিশাম)
এদিকে মুশরিকরা ফিরে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে নেয়। ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে আবু সুফিয়ান ওহুদ পাহাড়ের উপর উঠে উচ্চৈঃস্বরে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ আছে কি? কেউ কোন জবাব দিলেন না। সে আবার বলল, তোমাদের মধ্যে আবু জোহাফার পুত্র (আবু বকর) আছে কি? এবারও কেউ কোনো জবাব দিলেন না। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মধ্যে কি ওমর ইবনে খাত্তাব আছে? এবারও কেউ কোনো জবাব দিলেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে জবাব দিতে নিষেধ করেছিলেন। আবু সুফিয়ান এ তিন জন ছাড়া অন্য কারো কথা জিজ্ঞেস করেনি। কারণ, তার সম্প্রদায় ভাল করেই জানত, এ তিন জনের মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। কোনো জবাব না পেয়ে আবু সুফিয়ান স্বগতোক্তি করে বলল, চল এ তিন জন থেকেই রেহাই পাওয়া গেছে। একথা শুনে হযরত ওমর (রা.) আত্মসম্বরণ করতে না পেরে বলেন, ওরে আল্লাহর দুশমন, তুমি যাদের নাম উচ্চারণ করেছ, তারা সবাই জীবিত আছেন। আল্লাহ তা'আলা এখনও তোমার অবমাননার উপকরণ অবশিষ্ট রেখেছেন। একথা শুনে আবু সফিয়ান বলল, তোমাদের নিহত লোকদের অংগপ্রতংগ কাটা হয়েছে। আমি এসব করতে বলিনি, তবে এতে আমি নাখোশও নই। এরপর সে ধ্বনি দিল, হোবলের জয় হোক! মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, তোমরা জবাব দিচ্ছ না কেন? সাহাবায়ে কেরাম বলেন, কি জবাব দেব? তিনি বলেন, বল, আল্লাহু আকবর আল্লাহ মহান এবং সর্বশক্তিমান। আবু সুফিয়ান আবার ধ্বনি তুলল, আমাদের জন্যে ওযযা আছে, তোমাদের ওযযা নেই।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা জবাব দিচ্ছ না কেন? সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, কি জবাব দেব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, বল 'আল্লাহু মাওলানা ওয়া-লা মাওলানা কুম'- আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রভু, তোমাদের কোন প্রভু নেই। এরপর আবু সুফিয়ান বলল, কি চমৎকার কৃতিত্ব। আজ বদরের যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণের দিন। যুদ্ধ হচ্ছে একটা বালতি। হযরত ওমর (রা) জবাবে বলেন, তোমরা আর আমরা সমান নই। আমাদের যারা নিহত হয়েছেন তারা জান্নাতে, আর তোমাদের যারা নিহত হয়েছে তারা জাহান্নামে রয়েছে।
এরপর আবু সুফিয়ান বলল, ওহে ওমর, একটু কাছে আস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও, দেখ কি বলে? হযরত ওমর (রা.) এগিয়ে গেলে আবু সুফিয়ান বলল ওহে ওমর, তোমাকে আল্লাহর নামে শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আমরা কি মুহাম্মদকে হত্যা করতে পেরেছি? হযরত ওমর (রা.) বলেন, আল্লাহর শপথ, পারোনি; বরং এখন তিনি তোমার কথা শুনছেন। আবু সুফিয়ান বলল, ওমর, তুমি আমার কাছে ইবনে কোমায়রের চাইতেও অধিক সত্যবাদী ব্যক্তি (ইবনে হিশাম)। সাঙ্গপাঙ্গসহ ফিরে যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান বলল, আগামী বছর বদর প্রান্তরে পুনরায় লড়াই করার ওয়াদা রইল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাহাবীকে বলেন, বলে দাও, আচ্ছা ঠিক আছে, তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে একথাই সিদ্ধান্ত হয়ে থাকল (ইবনে হিশাম)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে কাফিরদের পিছনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ওদের পিছনে পিছনে যাও, দেখ, ওরা কি করছে এবং ওদের পরবর্তী ইচ্ছা কি? যদি ওরা ঘোড়া পাশে রেখে উটের পিঠে সওয়ার হয়, তবে বুঝতে হবে, ওরা মক্কার দিকে যাচ্ছে। আর যদি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে উট হাঁকিয়ে নিয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে ওরা মদীনার পথে রওনা হয়েছে। সেক্ষেত্রে মদীনায় গিয়ে ওদের সাথে মোকাবেলা করব। হযরত আলী (রা.) বলেন, এরপর আমি কাফিরদের অনুসরণ করে লক্ষ্য করলাম, ওরা ঘোড়া পাশে রেখে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে মক্কায় ফিরে যাচ্ছে। (ইবনে হিশাম)
কুরাইশদের চলে যাওয়ার পর মুসলমানরা শহীদান এবং আহতদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন, ওহুদের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সা'দ ইবনে রবীর (রা.) খোঁজ নিতে পাঠান। আমাকে বলে দিলেন, যদি সা'দকে পাওয়া যায় তবে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং জিজ্ঞেস করবে, সে এখন কেমন বোধ করছে। হযরত যায়েদ (রা.) বলেন, আমি তাকে শহীদদের লাশের মধ্যে বের করলাম। কাছে গিয়ে দেখি তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। তার দেহে বর্শা, তীর ও তলোয়ারের সত্তরটি আঘাত লেগেছিল। আমি বললাম, হে সা'দ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনি কেমন অনুভব করছেন, সে কথা জানতে চেয়েছেন? হযরত সা'দ ইবনে রবী (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূলকে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, আমি জান্নাতের খোশবু পাচ্ছি। আমার আনসার ভাইদের বলবে, যদি তোমাদের একটি চোখের স্পন্দন বাকি থাকতেও শত্রুরা আল্লাহর রাসূলের কাছে পৌঁছতে পারে, তবে আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোন ওযর আপত্তি কাজে আসবে না। একথা বলার পর পরই তিনি ইন্তিকাল করেন। (যাদুল মায়াদ)
আহতদের মধ্যে আমি উসাইরেমকেও পেলাম। তার নাম আমর ইবনে সাবেত (রা.)। তখন তার সামান্য প্রাণ-স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। ইতোপূর্বে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি সে দাওয়াত গ্রহণ করেননি। মুসলমানদের অনেকে অবাক হয়ে বলেন, উসাইরেম এখানে এলো কিভাবে? আমরা তো তাকে দ্বীন ইসলামের অস্বীকারকারী অবস্থায় রেখে এসেছি। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কিভাবে এখানে এলেন? ইসলামের প্রতি ভালোবাসা নাকি নিজ গোত্রের সাহায্যের প্রেরণা আপনাকে এখানে এনেছে? তিনি বলেন, ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় এসেছি। আমি আল্লাহ রব্বুল আলামীন এবং তাঁর প্রিয় রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, অথচ তিনি আল্লাহ তা'আলার জন্যে এক ওয়াক্ত নামাযও আদায় করেননি (যাদুল মায়াদ)। ইসলাম গ্রহণের পর কোন নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
আহতদের মধ্যে কোযমান নামের এক ব্যক্তিকেও পাওয়া গেল। তিনি এ যুদ্ধে যথেষ্ট বীরত্ব দেখিয়েছেন এবং সাত বা আট জন মুশরিককে হত্যা করেছেন। তার দেহে ছিল বহুসংখ্যক আঘাতের চিহ্ন। তাকে বনু যফর গোত্রের মহল্লায় নিয়ে যাওয়া হল এবং মুসলমানরা তাকে সুসংবাদ শোনাল। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি তো আমার গোত্রের সম্মান রক্ষার্থে লড়াই করেছি। তা না হলে আমি তো লড়াই করতাম না। যখমের যন্ত্রণা তীব্র হয়ে গেলে কোযমান নিজেকে যবাই করে আত্মহত্যা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পূর্বে কোযমানের কথা আলোচনা করা হলে তিনি বলেছিলেন, সে তো জাহান্নামী (যাদুল মায়াদ)। এ ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীটির সত্যতা প্রমাণিত হয়। আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছাড়া দেশের বা দশের জন্যে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যারা যুদ্ধ করে, তাদের সকলের পরিণাম কোযমানের মতই হবে। যদিও তারা ইসলামের পতাকা তলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করে, তবুও তাদের এ পরিণামেরই সম্মুখীন হতে হবে।
অপরদিকে নিহতদের মধ্যে বনু ছা'লাবা গোত্রের এক ইহুদীও ছিল। যখন যুদ্ধের দামামা বেজেছে তখন সে স্বগোত্রীয়দের বলল, আল্লাহর শপথ, তোমরা তো জান, মুহাম্মদকে সাহায্য করা তোমাদের ফরয কর্তব্য। ইহুদীরা বলল, আজ শনিবার। সে বলল, তোমাদের জন্যে কোনো শনিবার নেই। এরপর সে তলোয়ার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হয়। রওনা হওয়ার সময় বলল, যদি আমি যুদ্ধে নিহত হই তবে আমার অর্থ-সম্পদের মালিকানা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, তিনি যা চান তাই করবেন। এরপর সে যুদ্ধক্ষেত্রে مسلمانوں পক্ষে যুদ্ধ করতে করতে মারা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব কথা শুনে বলেন, মোখায়রিক (ঐ ইহুদী) একজন ভালো ইহুদী ছিল (ইবনে হিশাম)। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের শহীদদের লাশ পরিদর্শন করে বলেন, আমি এদের জন্য সাক্ষী থাকব। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিহত হয়, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় ওঠাবেন, তখন তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকবে। সে রক্তের রং রক্তের মতই হবে। কিন্তু তা থেকে কস্তুরীর সুবাস নির্গত হবে। (ইবনে হিশাম)
কয়েকজন সাহাবী নিজেদের শহীদদের লাশ মদীনায় স্থানান্তর করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একথা জানার পর তাদের লাশ ফিরিয়ে এনে শাহাদাত বরণের জায়গাতেই দাফন করার নির্দেশ দেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শহীদদের অস্ত্র এবং চামড়ার পোশাক খুলে নিয়ে বিনা গোসলে যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই দাফন কর। তিনি দু'তিন জন সাহ- াবীর লাশ একই কবরে এবং দু'জনকে একই কাফনে জড়িয়ে দাফন করার নির্দেশ দেন। দু'জন সাহাবীকে একই কাফনে জড়ানোর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন, এ দু'জনের মধ্যে কুরআন করীম কার বেশী মুখস্থ ছিল? সাহাবীরা যার প্রতি ইশারা করেন তাকে কবরে ওপরের দিকে রাখার জন্যে বলেন। এ সময় তিনি বলেন, আমি কিয়ামতের দিন এদের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিব। আবদুল্লাহ ইবনে আমর, ইবনে হারাম (রা.) এবং আমর ইবনে জামুহ (রা.)-কে একই কবরে দাফন করা হয়। কেননা তাদের দু'জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল (যাদুল মায়াদ)। হযরত হানযালার (রা.) লাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধান করার পর এক জায়গায় এমন অবস্থায় পাওয়া গেল যখন তার লাশ থেকে পানি ঝরছিল এবং মাটি থেকে উপরে ছিল (শূন্যে ভাসছিল)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেন, ফিরিশতারা তাকে গোসল করাচ্ছেন। এরপর বলেন, তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস কর, ব্যাপার কি? জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বাসর রাতের ঘটনা বলেন অর্থাৎ সাহাবী ফরয গোসলের সময় পাননি অথচ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে থেকে হযরত হানযালার (রা.) নাম হল গাসিলুল মালায়িকা অর্থাৎ এমন ব্যক্তি, যাকে ফিরিশতারা গোসল দিয়েছেন। (যাদুল মায়াদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা হামযার অবস্থা দেখে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাঁর ফুফু হযরত সফিয়া (রা.) এলেন। তিনিও হযরত হামযা (রা.)- কে দেখতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সফিয়ার পুত্র হযরত যোবায়র (রা.)-কে বলেন, তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। তিনি যেন তার ভাইয়ের অবস্থা দেখতে না পান। কিন্তু হযরত সফিয়া (রা.) বলেন, তা কেন? আমি জানি, আমার ভাইয়ের অংগপ্রতংগ কেটে ফেলা হয়েছে। হযরত হামযা (রা.) আল্লাহর পথে ছিলেন। কাজেই যা কিছু হয়েছে আমি তা মেনে নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ, আমি সওয়াবের আশায় সবর করব। এরপর তিনি হযরত হামযা (রা.)-এর কাছে এলেন, দেখলেন, ইন্না লিল্লাহ পড়লেন, তার জন্যে দোয়া করলেন। হামযা (রা.)-কে আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের (রা.) সাথে দাফন হল। তিনি হযরত হামযার (রা.) ভাগিনা এবং দুধভাই ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামযার (রা.) জন্যে যেভাবে কেঁদেছিলেন, তাকে অন্য কোন সময় ওই রকম কাঁদতে দেখা যায়নি। তিনি হযরত হামযা (রা.)-কে কেবলার দিকে রাখেন, এরপর তার জানাযার পাশে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কাঁদলেন যাতে আমরা তাঁর কান্নার হু হু শব্দ শুনতে পেলাম। (মুখতাসারুস সীরাহ)
প্রকৃতপক্ষে ওহুদের শহীদদের অবস্থা ছিল বড়ই হৃদয়বিদারক। হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত (রা.) বলেন, হযরত হামযার (রা.) জন্যে কালো পাড়বিশিষ্ট একখানা চাদর ছাড়া অন্য কোনো কাফন পাওয়া যায়নি। এ চাদর মাথার দিকে টেনে দেয়া হলে পায়ের দিক, আর পায়ের দিকে টেনে দেয়া হলে মাথার দিক বেরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার পা খোলা রেখে ঘাস দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় (মুসনাদে আহমদ)। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বলেন, ওহুদের যুদ্ধে হযরত মোসআব ইবনে ওমায়র (রা.) শহীদ হন। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে ভাল। একখানা মাত্র চাদর দিয়ে তাকে কাফন দেয়া হয়। সে চাদর দিয়ে তার মাথা ঢেকে দেয়া হলে পা; আর পা ঢেকে দেয়া হলে মাথা খুলে যায়। হযরত খাব্বাব (রা.) ও তার কাফনের এরূপ অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন। তবে এটুকু বেশী বলেছেন, তার এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বলেন, চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে পায়ের উপর ঘাস চাপিয়ে দাও। (বুখারী)
ইমাম আহমদের বর্ণনায় রয়েছে, ওহুদের দিন মুশরিকরা ফিরে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেন, তোমরা কাতারবন্দী হও, আমি আমার প্রতিপালকের কিছু প্রশংসা করব। এরপর তিনি বলেন, 'হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা তোমারই জন্যে। তুমি যা প্রশস্ত করে দাও তা কেউ সংকীর্ণ করতে পারে না। আর তুমি যা সংকীর্ণ করে দাও, কেউ তা প্রশস্ত করতে পারে না। তুমি যাকে পথভ্রষ্ট করে দাও কেউ তাকে হিদায়েত করতে পারে না। পক্ষান্তরে তুমি যাকে হিদায়েত দাও, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। যে জিনিস তুমি আটক করে দাও, সে জিনিস কেউ দিতে পারে না। পক্ষান্তরে যে জিনিস তুমি দাও, কেউ তা আটক করতে পারে না। যে জিনিস তুমি দূরে সরিয়ে দাও, সে জিনিস কেউ কাছে আনতে পারে না। পক্ষান্তরে যে জিনিস তুমি কাছে এনে দাও, সে জিনিস কেউ দূরে সরিয়ে দিতে পারে না। হে আল্লাহ রব্বুল আলামীন, আমাদের উপর তোমার বরকত, রহমত, ফযল ও রিযিক বিস্তৃত কর। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে স্থায়ী নিয়ামতের আবেদন করছি, যে নিয়ামত কখনো শেষ হবে না। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে দারিদ্র্যের দিনে সাহায্য এবং ভয়ের দিনে নিরাপত্তার আবেদন জানাচ্ছি। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের যা কিছু দিয়েছ আর যা কিছু দাওনি, উভয়ের মন্দ থেকে আমি 'তোমার কাছে পানাহ চাই। হে আল্লাহ, আমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় এবং আমাদের অন্তরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দাও। কুফরী, ফাসিকী এবং নাফরমানী আমরা যেন পছন্দ না করি, সে ব্যবস্থা কর এবং আমাদের হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও। হে আল্লাহ, আমাদের মুসলমান অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং পরকালে মুসলমান অবস্থায় জীবিত কর। অবমাননা ও ফিতনা ফাসাদ থেকে আমাদের দূরে রাখ। তোমার সালেহীন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও। হে আল্লাহ, তুমি সে সকল কাফিরকে মেরে ফেল, তাদের সাথে কঠোর ব্যবহার কর, আযাবে নিক্ষেপ কর। যারা তোমার রাসূলদের মিথ্যাবাদী বলে এবং তোমার পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে; হে আল্লাহ, সেসব কাফিরকেও মার, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে।'
শহীদদের দাফন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পথে রওনা হন। যুদ্ধক্ষেত্রে সাহাবীরা যে ধরনের মহব্বত ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, মদীনায় ফেরার পথে ঈমানদার মহিলারা অনুরূপ আত্মত্যাগ এবং ধৈর্যের পরিচয় দেন। মদীনায় যাওয়ার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হযরত হামনা বিনতে জাহশ (রা.)-এর সাক্ষাৎ হয়। তার ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা.) যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
হযরত হামনা ভাইয়ের শাহাদাতের খবর শুনে ইন্না লিল্লাহ পড়েন এবং মাগফিরাতের দোয়া করেন। এরপর তাকে তার মামা হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)-এর শাহাদাতের খবর দেয়া হলে তিনি পুনরায় ইন্না লিল্লাহ পড়েন এবং মাগফিরাতের দোয়া করেন। এরপর তার স্বামী হযরত মোসআব ইবনে ওমায়র (রা.)-এর শাহাদাতের খবর দেয়া হলে তিনি চিৎকার দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নারীর স্বামী তার কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। (ইবনে হিশাম)
অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু দীনার গোত্রের এক মহিলা সাহাবীর কাছ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করেন। তার স্বামী, ভাই এবং পিতা শহীদ হয়েছিলেন। এ মহিলাকে তাদের শাহাদাতের খবর জানানো হলে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কি খবর? তাকে বলা হল, তিনি ভালো আছেন। মহিলা সাহাবী বলেন, তাঁকে আমি একটু দেখতে চাই। সাহাবীরা ইশারায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখিয়ে দেন। মহিলা সাহাবী সাথে সাথে বলেন, আপনি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সকল বিপদই তুচ্ছ (ইবনে হিশাম)। এ সময় হযরত সা'দ ইবনে মো'য়ায (রা.)-এর মা ছুটে এলেন। হযরত সা'দ (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোড়ার লাগাম ধরে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এ হচ্ছেন আমার মা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাকে মারহাবা। এরপর তিনি হযরত সা'দ (রা.)-এর মায়ের সম্মানে ঘোড়া থামান। তিনি কাছে এলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক পুত্র হযরত আমর ইবনে মো'য়ায (রা.)-এর শাহাদাতের খবর জানান এবং সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্যধারণ করতে বলেন। তিনি জবাবে বলেন, আপনাকে ভাল অবস্থায় দেখার পর সকল বিপদই আমার কাছে তুচ্ছ। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদের শহীদদের জন্যে দোয়া করেন এবং বলেন হে উম্মে সা'দ, তুমি খুশী হও। শহীদদের পরিবারে গিয়ে সুসংবাদ দাও, তাদের সকল শহীদ একই জান্নাতে রয়েছে এবং নিজের পরিবার পরিজনের ব্যাপারে তাদের শাফায়াত কবুল করা হয়েছে। এ কথায় হযরত সা'দ (রা.)-এর মা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, শহীদদের পরিবার পরিজনের জন্যেও দোয়া করুন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আল্লাহ, তাদের মনের শোক যাতনা দূর করে দাও, মসিবতের বিনিময় দাও এবং তাদের অবশিষ্টদের হিফাযত কর।
তৃতীয় হিজরীর ৭ই শাওয়াল রোববার বিকেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় পৌঁছেন। ঘরে গিয়ে তাঁর তলোয়ার হযরত ফাতিমা (রা.)-কে দিয়ে বলেন, এ তলোয়ারে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে দাও। আল্লাহর শপথ, এ তরবারি আজ আমার জন্যে অত্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। হযরত আলীও (রা.) তার তরবারি ঝাড়া দিয়ে হযরত ফাতিমা (রা.)-কে দিয়ে রক্ত ধুয়ে দিতে বলেন। আরো বলেন, আল্লাহর শপথ, এ তরবারি আমার জন্যে আজ অত্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদিও তুমি যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়েছ তবে মনে রেখ, সাহায়ল ইবনে হোনায়ফ এবং আবু দুজানা (রা.) বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে। (ইবনে হিশাম)
ওহুদের যুদ্ধে ৭০ জন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন। বর্ণনাকারীদের অধিকাংশই এ সংখ্যার ব্যাপারে একমত। শহীদদের মধ্যে ৬৫ জন ছিলেন আনসার। তাদের ৪১ জন খাযরাজ এবং ২৪ জন আওস গোত্রের। একজন ইহুদীও নিহত হয়েছিলেন। আর মুহাজির শহীদ হয়েছিলেন মাত্র ৪ জন। বাকি রইল মুশরিকদের নিহতদের কথা। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাকের মতে, তাদের ২২ জন নিহত হয়েছিল। কিন্তু ইসলামের যুদ্ধ ইতিহাসবিদ এবং সীরাতবিদরা ওহুদ যুদ্ধের যে বিবরণ উল্লেখ করেছেন এবং প্রসংগক্রমে বিভিন্ন পর্যায়ে নিহত মুশরিকদের যে বিবরণ দিয়েছেন, তার উপর গভীর দৃষ্টিপাত করলে মুশরিকদের নিহতদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭ জন। আল্লাহ তা'আলাই এ সম্পর্কে ভাল জানেন। (ইবনে হিশাম)
ওহুদ থেকে ফিরে আসার পর তৃতীয় হিজরীর ৮ই শাওয়াল শনি ও রোববার রাত মুসলমানরা জরুরী পরিস্থিতিতে অতিবাহিত করেন। তারা সকলেই রণক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও সারারাত মদীনার পথে এবং মদীনার প্রবেশ পথসমূহে কাটিয়ে দেন এবং তাদের প্রধান সিপাহসালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ হিফাযতে নিয়োজিত থাকেন। কেননা নানাদিক থেকে তাঁরা আশঙ্কা বোধ করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা রাত যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনায় অতিবাহিত করেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, যদি মুশরিকরা এরূপ ভেবে থাকে যে, যুদ্ধের ময়দানে সংখ্যায় বেশী হয়েও আমরা কোন ফায়দা অর্জন করতে পারিনি, তবে নিশ্চয়ই তারা লজ্জিত হবে। ফলে তারা মক্কার পথ থেকে ফিরে এসে মদীনায় হামলা করবে। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত নিলেন, মক্কার সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করতে হবে।
সীরাত বিশেষজ্ঞদের বর্ণনা মতে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদ যুদ্ধের পরদিন, তৃতীয় হিজরীর ৮ই শাওয়াল রোববার সকালে ঘোষণা করেন, শত্রুদের মুকাবিলার জন্যে রওনা হতে হবে। ওহুদের যুদ্ধে যারা শরীক হয়েছিল তারাই শুধু আমাদের সাথে যেতে পারবে। মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এ অভিযানে মুসলিম বাহিনীর সাথে গমনের অনুমতি চাইলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দেননি। শারীরিকভাবে আহত, স্বজন হারানোর শোকে কাতর, ভয় শঙ্কায় উদ্বিগ্ন মুসলমানরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের সামনে মাথা নত করে দেন। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) ওহুদের যুদ্ধে হাযির হতে পারেননি। তিনি অনুমতি চেয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি সকল যুদ্ধে আপনার সঙ্গে থাকতে আগ্রহী। ওহুদের যুদ্ধে আমার পিতা আমাকে আমার বোনদের দেখাশোনার জন্যে রেখে গিয়েছিলেন, এ কারণে আমি যুদ্ধে যেতে পারিনি। তাই এবার আমাকে আপনার সাথে গমনের অনুমতি দিন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দেন।
কর্মসূচী অনুযায়ী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন এবং মদীনা থেকে আট মাইল দূরে 'হামরাউল আসাদ' নামক স্থানে পৌছে শিবির স্থাপন করেন।
মুসলিম বাহিনী হামরাউল আসাদে অবস্থানকালে মা'বাদ ইবনে আবু মা'বাদ খোযায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। মতান্তরে তিনি শিরকের উপরই ছিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কল্যাণ কামনা করতেন। খোযায়া এবং বনু হাশেম গোত্রের মধ্যে মৈত্রী ও সহায়তা চুক্তি বিদ্যমান ছিল। এ চুক্তির কারণেই তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিতকামী ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, আপনি এবং আপনার সঙ্গীরা যুদ্ধের ময়দানে কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন, আল্লাহর কসম এতে আমরা খুবই মর্মাহত হয়েছি। আমরা মনে প্রাণে কামনা করছিলাম, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সুস্থ নিরাপদ রাখুন। সে এ ধরনের সমবেদনা প্রকাশ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা'বাদ-কে বলেন, আবু সফিয়ানের কাছে গিয়ে তার উদ্যম নষ্ট করে তাকে নিরুৎসাহিত কর।
মুশরিকরা পুনরায় মদীনা অভিমুখে রওনা হতে পারে বলে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আশঙ্কা করেছিলেন, সেটা যথার্থ ছিল। মাশরিকরা মদীনা থেকে ছত্রিশ মাইল দূরবর্তী রাওহা নামক জায়গায় পৌঁছে যখন শিবির স্থাপন করে, তখন তারা একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে। তারা একদল অন্য দলকে বলছিল, তোমরা কিছুই করোনি। শক্তি, প্রভাব প্রতিপত্তি চুরমার করার পর তাদের এমনিতেই ছেড়ে দিয়ে এসেছো। অথচ এখনো তাদের এত বেশী মাথা বিদ্যমান রয়েছে, যা কিনা পুনরায় তোমাদের মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে। সুতরাং ফিরে চল, ওদের সমূলে উৎপাটন করে দিয়ে আসি।
যারা এ প্রস্তাব দিয়েছিল, মনে হয় তারা উভয় পক্ষের শক্তি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত ছিল না। এ কারণে তাদের দায়িত্বশীল একজন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া এ অভিমতের বিরোধিতা করে বলল, তোমরা অমন কর না। আমি আশঙ্কা করছি, যে সকল মুসলমান ওহুদ যুদ্ধে অংশ নেয়নি, এবার তারাও আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কাজেই আমরাই জয়লাভ করেছি এরুপ আত্মপ্রসাদ নিয়ে মক্কায় ফিরে চল। অন্যথায় পুনরায় মদীনার উপর হামলা করলে তোমরা বিপদে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু অধিকাংশই এ মত গ্রহণ না করে মদীনার উপর হামলার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তারা মদীনা অভিমুখে রওনা হওয়ার আগেই মা'বাদ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। মুনাফিকরা জিজ্ঞেস করল, মা'বাদ, পিছনের খবর কি? মা'বাদ কৌশলের মাধ্যমে বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে তোমাদের পিছু ধাওয়া করতে বেরিয়ে পড়েছেন। তারা সংখ্যায় এত বেশী, এতো বড় সৈন্যদল এর আগে আমি কখনো দেখিনি। সবাই তোমাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে জ্বলছে। ওহুদের যুদ্ধে যারা যোগ দান করেনি, এবার তারাও বেরিয়ে এসেছে। তারা যুদ্ধে যা কিছু হারিয়েছে, সে জন্যে লজ্জিত। বর্তমানে তোমাদের বিরুদ্ধে তারা ভয়াবহ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে। সে ক্রোধের উদাহরণ আমি ইতোপূর্বে আর দেখিনি।
আবু সুফিয়ান বলেন, আরে ভাই, তুমি এসব কি বলছ? মা'বাদ বলেন, হ্যাঁ আল্লাহর কসম, আমি সত্যি বলছি। আমার ধারণা, তোমরা এখান থেকে চলে যাওয়ার আগেই ঘোড়সওয়ার দল দেখতে পাবে অথবা মুসলিম সৈন্যদের অগ্রবর্তী দল এ টিলার পেছন থেকে বেরিয়ে আসবে। আবু সুফিয়ান বলল, আল্লাহর শপথ, আমরা শপথ নিয়েছি, ওদের উপর পাল্টা হামলা করে নির্মূল করে দেব। মা'বাদ বলেন, অমন কর না। আমি তোমাদের ভালোর জন্যে বলছি। এসব কথা শুনে কাফিরদের মনোবল ভেঙ্গে গিয়ে তাদের উপর ভীতি ও ত্রাস ছেয়ে যায়। তারা মক্কায় ফিরে যাওয়াই কল্যাণকর মনে করে। তবে আবু সুফিয়ান মুসলিম বাহিনীকে তাদের পিছু ধাওয়া থেকে বিরত রাখতে এবং পুনরায় সশস্ত্র সংঘর্ষ এড়ানোর জন্যে একটা কৌশল অবলম্বন করে। মদীনার পথে চলমান বনু আবদে কায়সের এক কাফেলার লোকদের আবু সুফিয়ান বলে, তোমরা কি মুহাম্মদের কাছে আমার একটি পয়গাম পৌঁছে দিতে পারবে? যদি পৌঁছে দাও, তবে আমি কথা দিচ্ছি, তোমরা মক্কায় এলে ওকাযের বাজারে তোমাদের এত বেশী কিশমিশ দেব, যতটা এ উটনী বহন করতে পারে। বনু আবদে কায়সের লোকেরা আবু সুফিয়ানের অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হয়। আবু সুফিয়ান বলল, তোমরা মুহাম্মদকে বলবে, আমরা তাকে এবং তার সঙ্গীদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পাল্টা হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এরপর এ কাফেলা 'হামরাউল আসাদ' নামক জায়গা অতিক্রম করার সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানদের কাছে আবু সুফিয়ানের এ বার্তা পৌঁছে দেয়। সাথে সাথে এও বলল, তারা আপনাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে, কাজেই তাদের ভয় করুন। কাফেলার লোকদের কাছে এ খবর পেয়ে مسلمانوں ঈমান আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তারা বলল, আল্লাহ তা'আলাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্ম সম্পাদনকারী।
এ ঈমানী শক্তির কারণে মুসলমানরা আল্লাহর নিয়ামত এবং অনুগ্রহের সাথে মদীনার পথে রওয়ানা হয়। কোনো প্রকার অকল্যাণ তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। তারা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রেযামন্দির অনুসরণ করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা অপরিসীম অনুগ্রহ ও করুণার অধিকারী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোববার দিন হামরাউল আসাদে গমন করেন এবং তৃতীয় হিজরীর ৯, ১০ ও ১১ই শাওয়াল সোম, মঙ্গল ও বুধবার পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। মদীনায় ফিরে আসার আগেই আবু ইযযা জুমহী তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। এ লোকটি বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছিল, কিন্তু দারিদ্র্য এবং কন্যা সন্তানের সংখ্যাধিক্য থাকায় তাকে মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেয়া হয়। সে অঙ্গীকার করেছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করবে না। কিন্তু সে কথা রাখেনি। কবিতার মাধ্যমে সে আল্লাহ, রাসূল এবং সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে সাধারণ লোকদের উদ্দীপিত করতে ব্যস্ত ছিল। এরপর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ওহুদের যুদ্ধে অংশও নিয়েছিল। এ লোকটিকে গ্রেফতার করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাযির করা হলে সে বলল, মুহাম্মদ, আমার ভুল ক্ষমা করে দাও, আমার উপর দয়া কর, আমার কন্যা সন্তানদের কথা ভেবে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ আর করবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এখন আর এটা হতে পারে না যে, তুমি মক্কায় গিয়ে মুখম লে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে, মুহাম্মদকে আমি দ্বিতীয় বার ধোকা দিয়েছি। মুমিন এক গর্ত থেকে দু'বার দংশিত হয় না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যোবায়র (রা.), মতান্তরে হযরত আসেম ইবনে সাবেতকে (রা.) নির্দেশ দিলে এ বেঈমানের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাও।
এভাবেই মক্কার অন্য একজন গুপ্তচরও নিহত হয়। তার নাম মোয়াবিয়া ইবনে মুগীরা ইবনে আবুল আস। সে আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের নানা। ওহুদের দিন মুশরিকরা ফিরে যাওয়ার পর এ লোকটি মদীনায় তার চাচাতো ভাই হযরত ওসমান (রা.)-এর সাথে দেখা করতে আসে। হযরত ওসমান (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার নিরাপত্তার আবেদন জানান। তিনি এ শর্তে তাকে নিরাপত্তা দেন, সে সর্বোচ্চ তিন দিন মদীনায় থাকতে পারবে। এরপরও যদি তাকে মদীনায় দেখা যায়, তবে তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু হামরাউল আসাদ অভিযানে গমনের কারণে মদীনা মুসলিম বাহিনী শূন্য হয়ে গেলে সে কুরাইশদের গুপ্তচর বৃত্তির জন্যে তিনদিনের পরও মদীনায় থেকে যায়। মুসলিম সৈন্যরা ফিরে আসার পর সে পলায়নের চেষ্টা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা এবং হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসেরকে নির্দেশ দেন। উভয় সাহাবী তাকে তাড়া করে হত্যা করেন। (ইবনে হিশাম, যাদুল মায়াদ, ফাতহুল বারী)
এ যুদ্ধের জয় পরাজয় কিভাবে নির্ধারিত হবে? বাস্তবতা অস্বীকার না করলে বলতেই হয়, এ যুদ্ধে দ্বিতীয় পালায় কাফিররা প্রাধান্য লাভ করেছিল এবং যুদ্ধের ময়দান, একরকম তাদের হাতেই ছিল। প্রাণহানিও مسلمانوں পক্ষেই বেশী হয়েছে। মুসলমানদের একটি অংশ নিশ্চিত পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছে। সে সময় যুদ্ধের গতি কাফেরদের পক্ষেই ছিল, কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে, যার কারণে ওহুদ যুদ্ধে কাফিরদের জয় হয়েছে এমন কথা কিছুতেই বলা যায় না। মক্কার সৈন্যরা مسلمانوں শিবির দখল করে নিতে পারেনি, এটা স্পষ্টতই জানা যায়। মদীনার সৈন্যদের এক বিরাট অংশ ভয়াবহ উত্তাল-পাতাল অবস্থা এবং বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও পলায়ন করেনি। তারা অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করে, তাদের প্রধান সেনাপতির কাছে অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সমবেত হয়েছিলেন। مسلمانوں সংখ্যা এত কমেনি যে, মক্কার সৈন্যরা তাদের ধাওয়া করতে সক্ষম হবে। তাছাড়া একজন মুসলমানও কাফিরদের হাতে বন্দী হননি। কাফেররা কোন গনীমতের মালও হস্তগত করতে পারেনি। উপরন্তু তারা মুসলমানদের সাথে তৃতীয় দফা লড়াই করতে প্রস্তুত হয়নি। অথচ মুসলিম বাহিনী তখনো তাদের শিবিরেই অবস্থান করছিল। কাফিররা যুদ্ধক্ষেত্রে দু'এক দিন অথবা তিন দিন অবস্থান করেনি। অথচ সেকালে বিজয়ীরা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের শিবিরে কমপক্ষে তিন দিন অবস্থান করত এবং এটা যুদ্ধ জয়ের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নিদর্শন মনে করা হত।
বিজয় সুসংহত করার প্রমাণ দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য, কিন্তু কাফিররা मुसलमानों আগেই চটপট যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছিল। مسلمانوں সন্তানাদি এবং অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে মদীনায় প্রবেশের সাহসও তাদের হয়নি। অথচ ওহুদ প্রান্তর থেকে সামান্য দূরেই মদীনা নগরী পুরোপুরি সেনা শূন্য এবং খোলামেলা পড়েছিল। তার প্রবেশপথেও কোনো বাধা প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
এ সকল কথার সারমর্ম হল, কুরাইশ সৈন্যরা এতোটুকুই করতে পেরেছে যে, সাময়িক সুযোগে মুসলমানদের কষ্টে ও অসুবিধায় ফেলতে পেরেছে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীকে নিজেদের আয়ত্তে নেয়ার পর তাদের হত্যা বা বন্দী করে লাভবান হওয়া, যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে যা লাভ করা অত্যাবশ্যক ছিল, তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলিম বাহিনী বড় রকমের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা কুরাইশ বাহিনীর বেষ্টনী ভেংগে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। এ ধরনের ক্ষতি তো অনেক সময় বিজয়ীদেরও হতে পারে। কাজেই ব্যাপারটা মুশরিকদের বিজয় বলে অভিহিত করা যায় না।
অপরদিকে আবু সুফিয়ানের মক্কার পথে দ্রুত পলায়ন দ্বারা প্রমাণিত হয়, সে আশঙ্কা করেছিল, তৃতীয় দফা যুদ্ধ শুরু হলে তার সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অবধারিত। হামরাউল আসাদ অভিযানে আবু সুফিয়ানের ভূমিকায় এ অভিমত আরো অধিক প্রমাণিত হয়। এমতাবস্থায় ওহুদ যুদ্ধে কোন পক্ষের সুনিশ্চিত জয় পরাজয় হয়েছে না বলে একে অমীমাংসিত যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করতে পারি। বলতে পারি, এ যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন না করে এবং নিজেদের শিবির শত্রু পক্ষের কবলে ফেলে না রেখে যুদ্ধ স্থগিত করা হয়েছে। ইতিহাসের আলোকে এ ধরনের যুদ্ধকেই বলা হয় অমীমাংসিত যুদ্ধ। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, 'শত্রু সম্প্রদায়ের সন্ধানে তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। যদি তোমরা যন্ত্রণা পাও, তবে তারাও তোমাদের মত যন্ত্রণা পেয়েছে এবং আল্লাহর কাছে তোমরা যা আশা কর, তারা তা করে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।' এ আয়াতে আল্লাহ কষ্ট দেয়া এবং তা অনুভব করার ক্ষেত্রে এক বাহিনীকে অন্য বাহিনীর সাথে তুলনা করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, উভয় দলই সমান অবস্থানে ছিল এবং এমন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেছে, যাতে কেউই কারো উপর জয় লাভ করেনি।
পরবর্তী সময়ে কুরআনে এ যুদ্ধে প্রতিটি পর্যায়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। পর্যালোচনা করে এমন সব কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেসব কারণে مسلمانوں এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এমন একটা সিদ্ধান্ত কর মুহূর্তে ঈমানদাররা এবং এ উম্মত, যাদের অন্যদের বিপরীতে শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার স্বতন্ত্র মর্যাদা রয়েছে। যাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যে অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। সে বিচারে ঈমানদারদের বিভিন্ন দলের মাঝে কি কি দুর্বলতা রয়েছে, কুরআনের পর্যালোচনায় সেসব তুলে ধরা হয়েছে। অনুরূপ পবিত্র কুরআন মুনাফিকদের ভূমিকা উল্লেখ করে তাদের প্রকৃত অবস্থা উন্মোচন করেছে। তাদের অন্তকরণে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লুকিয়ে থাকা শত্রুতার মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সহজ সরল مسلمانوں মধ্যে মুনাফিক এবং তাদের সাথী ইহুদীরা যেসব কুমন্ত্রণা প্ররোচনা ছড়িয়ে রেখেছিল, সেসব অপসারণ করা হয়েছে। আর এ যুদ্ধের প্রশংসাযোগ্য প্রজ্ঞা, কৌশল এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্যসমূহের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে, যা ছিল এ যুদ্ধের সারকথা।
এ যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরানের ষাটটি আয়াত নাযিল হয়েছে এবং আয়াতগুলোতে সর্বাগ্রে যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'স্মরণ কর, যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের কাছ থেকে প্রত্যূষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্যে মুমিনদের স্থানে স্থানে নিয়োগ করছিলে এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ (সূরা আলে ইমরান, ১২১)। পরিশেষে এ যুদ্ধের ফল ও অন্তর্নিহিত রহস্যসমূহ সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন, 'অসৎ কে সৎ থেকে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছ, আল্লাহ মুমিনদের সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের অবহিত করার নন, তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান আন। তোমরা ঈমান আনলে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চললে তোমাদের জন্যে মহাপুরস্কার রয়েছে। (সূরা আলে ইমরান, ১৭৯)।
ওলামায়ে কেরাম বলেন, ওহুদ যুদ্ধে مسلمانوں যে সংকট সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তাতে আল্লাহর অনেক বড় হিকমত লুকায়িত ছিল। যেমন, মুসলমানদের অপরাধ অবাধ্যতার মন্দ পরিণাম এবং নিষিদ্ধ বিষয়ের অশুভ দিক সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তীরন্দাজদের নিজেদের অবস্থানস্থলে অবিচল থাকার যে নির্দেশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন, তারা তা লংঘন করেছে, এ কারণেই তাদের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এছাড়া নবী রাসূলদের সে সুন্নতের কথা প্রকাশ করার উদ্দেশ্য ছিল যে, প্রথমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হন, এরপর সফলতা লাভ করেন। এতে এ রহস্য কৌশলও নিহিত রয়েছে যে, যদি ঈমানদার মুসলমানরা সব সময় জয় লাভ করতে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে এমন সব লোকও প্রবেশ করবে, যারা ঈমানদার নয়। ফলে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। অপরদিকে তারা যদি সব সময় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়, তাহলে নবীর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এ কারণে আল্লাহর হিকমতের দাবী ছিল উভয় রকম অবস্থা সংঘটিত হওয়া। যাতে সত্যবাদী মিথ্যাবাদীর মাঝে পার্থক্য করা যেতে পারে। মুসলমানরা এ যুদ্ধে স্পষ্ট বুঝেছে, তাদের ঘরে মুনাফিক নামক এক শত্রু রয়েছে। এতে মুসলমানরা তাদের সাথে মুকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক হন। একটা হিকমত এও ছিল যে, অনেক সময় সাহায্য আসতে দেরী হলে বিনয় নম্রতা সৃষ্টি হয় এবং প্রবৃত্তির দম্ভ অহংকার ভেঙ্গে যায়। অতএব ঈমানদাররা পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর ধৈর্যধারণ করেন। অথচ মুনাফিকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে যায়, তারা আহাজারি শুরু করে।
আরেকটা হিকমত এও ছিল যে, আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের জন্যে মর্যাদার বাসস্থান জান্নাতে এমন কিছু শ্রেণী রেখেছেন, আমলের মাধ্যমে তাদের সেখানে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষা, দুঃখ কষ্ট এবং বিপদ-মসিবতের কিছু উপায় উপকরণ নির্ধারণ করে রেখেছেন যাতে ঈমানদাররা জান্নাতের সে মর্যাদাকর শ্রেণীতে উপনীত হতে পারেন। এছাড়া একটা হিকমত এও ছিল যে, শহীদ হওয়া আল্লাহর বন্ধুদের জন্যে উচ্চতর মর্যাদার। অতএব আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের জন্যে এ মর্যাদা প্রস্তুত করে রেখেছেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন, তাঁর দুশমনের ধ্বংস করতে চাচ্ছিলেন। তাই তাদের ধ্বংসের উপায় উপকরণও প্রস্তুত করে দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে, কুফরী, যুলুম অত্যাচার এবং আল্লাহর ওলীদের কষ্ট দানে সীমাহীন ঔদ্ধত্য এবং বাড়াবাড়ি। এসব আমলের পরিণামে আল্লাহ গোনাহ থেকে ঈমানদারদের পাকসাফ এবং কাফিরদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। (ফাতহুল বারী)
📄 বনু কুরাইয়ার যুদ্ধ
আহযাব বা খন্দক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নিজের ঘরে পৌঁছলেন। তখন যুহরের নামাযের সময় হযরত জিব্রাঈল (আ.) এসে আল্লাহর হুকুম শুনালেন। এখনই হাতিয়ার কোষবদ্ধ করা ঠিক নয়। বনু কুরাইযার ব্যাপারটি এখনই চুকিয়ে নেয়া আবশ্যক। এ নির্দেশ পেয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনতিবিলম্বে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। যারাই অনুগত্যশীল আছ, তারা যেন বনু কুরাইযার অঞ্চলে না পৌঁছা পর্যন্ত আসরের নামায আদায় না করে। এ ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আলীর (রা.) সাথে অগ্রবর্তী এক বাহিনী সে অঞ্চলে পাঠিয়ে দিলেন। তারা যখন সেখানে পৌঁছলেন তখন দেখলেন ইহুদী লোকেরা ঘরের ছাদে উঠে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদেরকে নানা রকম গালাগাল করছে। হযরত আলীর (রা.) বাহিনী দেখে তারা মনে করছিল যে, তাদেরকে শুধু ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই এটা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু একটু পরে স্বয়ং রাসূলের নেতৃত্বে যখন সমগ্র মুসলিম বাহিনী সেখানে উপস্থিত হল এবং তাদের পুরো এলাকাকে পরিবেষ্টন করে নিল, তখন তাদের প্রাণ উড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। অবরোধের তীব্রতা ইহুদীরা দু'তিন সপ্তাহের অধিককাল সহ্য করতে পারল না। শেষ পর্যন্ত তারা এ শর্তে নিজেদেরকে রাসূলের হাতে অর্পণ করল যে, আউস গোত্রের সরদার হযরত সা'দ বিন মু'য়ায (রা.) তাদের সম্পর্কে যে ফয়সালা দিবে তারা তা মেনে নিবে।
হযরত সা'দ (রা.) কে তারা শালিস মেনে ছিল এ আশায় যে, জাহেলিয়াত যুগে আওস ও বনু কুরাইযার মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। সেদিকে খেয়াল করে হয়ত তিনি কিছুটা উদারতা দেখাবেন। ইতোপূর্বে বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রদ্বয় যেভাবে মদীনা হতে চলে গিয়েছিল; হয়ত অনুরূপভাবে তাদেরও চলে যেতে, তিনি ফয়সালা দিবেন। আওস গোত্রের লোকেরা হযরত সা'দ এর নিকট মিত্র গোত্রের প্রতি উদার নীতি গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালো। কিন্তু হযরত সা'দ নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছিলেন যে, মদীনা হতে যে দু'টি গোত্র চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল; তারা চতুর্দিকের সমগ্র গোত্র-কবিলাকে উত্তেজিত করে দশ হাজার সৈন্যের বাহিনী তৈরি করে মদীনার উপর চড়াও হয়েছিল। এরা সে অভিশপ্ত ইহুদী, যারা কঠিন মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করে মদীনাকে ধ্বংস করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এসব কারণেই তিনি যুক্তিসঙ্গত ফয়সালা দিলেন। বনু কুরাইযার পুরুষদের হত্যা করার ফয়সালা দিলেন। নারী ও শিশুদেরকে দাস দাসী বানিয়ে নেয়ার এবং তাদের যাবতীয় ধন সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করার ফয়সালা দিলেন। আর এ ফয়সালাকে কার্যকর করার জন্য, মুসলমানরা যখন বনু কুরাইযার মূল ভূখন্ডে প্রবেশ করল। তখন ভয়ঙ্কর কিছু তথ্য উৎঘাটিত হল। বিগত পরিখা যুদ্ধে কাফিরদের পক্ষে অংশগ্রহণের জন্য এ বিশ্বাসঘাতকরা ১৫শ তরবারী, তিনশ বর্ম, দু'হাজার বল্লম এবং ১৫শ ঢাল সংগ্রহ করেছিল। আল্লাহ যদি মুসলমানদের সহায়তা না করতেন, আর মুশরিকরা যদি চূড়ান্তভাবে পরিখা অতিক্রম করত, ঠিক সে মুহূর্তে বনু কুরাইযা পশ্চাৎ দিক হতে আক্রমণ করার জন্য এসব অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহার করত। এজন্যে আল্লাহপাক বলেন, যদি শত্রু পক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত; তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না (সূরা আহযাব-১৪)। বনু কুরাইযার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিচার করেননি। ইহুদীদের মনোনীত ব্যক্তির হাতে তাদের বিচার ভার অর্পণ করেছিলেন। এতখানি অধিকার নিশ্চয়ই কোন অপরাধীকে কোথাও দেয়া হয়নি। সা'দ (রা.) যদি ইহুদীদেরকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দিতেন, তবু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা নির্বিবাদে ও স্বত্বস্ফূর্তভাবে মেনে নিতেন। ফলে এ সম্বন্ধে তাদের পক্ষ হতে কোন কিছুই আর বলার ছিল না। আল্লাহ বলেন, কিতাবীদের মধ্য হতে যারা কাফিরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি ওদের দুর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং ওদের অন্তরে ভীতি প্রবেশ করালেন। ফলে তোমরা একদলকে হত্যা করেছ এবং একদলকে বন্দী করেছ। তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ঘরবাড়ির, ধন সম্পত্তির এবং এমন এক ভূখণ্ডের মালিক করে দিলেন যেখানে তোমরা অভিযান করনি। (সূরা আহযাব: ২৬-২৭)
📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি
মুশরিকদের সম্মিলিত বাহিনী ও বনু কুরাইযার পরাজয়ের পর মুসলমানরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সমর্থ হন। তাদের মধ্যে তখন পবিত্র কা'বা যিয়ারত ও নিজেদের মাতৃভূমিকে এক নজর দেখার জন্য অদম্য ইচ্ছা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতোমধ্যে একদিন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযের পর তাঁর স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখলেন কাবাঘর যিয়ারত করছেন। মক্কায় সাহাবাদেরকে নিয়ে ওমরা আদায় করছেন। নবীর স্বপ্ন এক প্রকার ওহী। ফলে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বপ্নের কথা শুনার পর মুসলমানদের অন্তরে আগ্রহ আরো অধিক বৃদ্ধি পায়। অবশেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬ষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসের প্রথম দিকে ১৪শ সাহাবীর কাফেলা নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। সাথে নেন কুরবানীর পশু। সাহাবীদের কাছে ছিল একটি করে তরবারী ও ইহরামের কাপড়। যুল হুলাইফাতে পৌঁছে সবাই ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধেন। কুরবানীর জন্য ৭০টি উট নির্ধারিত ছিল। এসব উটের গলায় মুসলমানরা কুরবানীর চিহ্নস্বরূপ কিলাদা লটকিয়ে দেন।
অথচ মক্কার কাফিররা মুসলমানদের এ নেক নিয়তকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের ধারণা হয়, এ ছলনায় হয়ত মুসলমানরা মক্কা শরীফ দখল করতে চাচ্ছে। তাই তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনক্রমেই মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালিদ ও ইকরামা বিন আবু জাহেলের নেতৃত্বে বিরাট এক সৈন্য দল প্রেরণ করে কাফিররা। তারা মুসলমানদের পথ রোধ করে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ খবর পেয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে 'হুদাইবিয়ায়' এসে উপনীত হন। বিশ্বনবী সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করার জন্য হযরত ওসমান (রা.) কে মক্কায় প্রেরণ করেন। ইতোমধ্যে কাফিররা, মুসলিম শিবিরে, আকস্মিকভাবে কয়েকটি হামলা চালিয়ে সাহাবীদেরকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রিয়নবী বার বার ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে তাদের সে অপকৌশল ব্যর্থ করে দেন।
অপরদিকে হযরত ওসমান (রা.) মক্কায় গিয়ে কাফিরদের ব্যাখ্যা করেন যে, মুসলমানরা রক্ত পাত করার জন্য মক্কায় আসছে না। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল, কা'বা শরীফ যিয়ারত করা। কিন্তু কুরাইশরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ওসমানকে (রা.) আটক করে। এদিকে মুসলিম শিবিরে রটে যায় যে, হযরত ওসমানকে শহীদ করা হয়েছে। তাঁর ফিরে না আসায় মুসলমানরাও নিশ্চিত হয়ে যায়, খবরটা সত্য। মুসলমানদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। এসময় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাছের নিচে বসে সাহাবীদের থেকে এ মর্মে বাইআত গ্রহণ করেন যে, তারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে প্রস্তুত। তারা এখান থেকে আমৃত্যু পিছু হটবে না। অবস্থার নাজুকতা বিচারে এটা সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, এটা কোন মামলি বাইআত ছিল না। সাহাবীরা সংখ্যায় মাত্র ১৪শ। নিজ নিজ তরবারী (যা বহন করা বৈধ ছিল) ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধ সরঞ্জাম তাদের সাথে ছিল না। তারা সেদিন নিজেদের এলাকা থেকে আড়াইশ মাইল দূরে একেবারে মক্কার সীমান্তে উপনীত ছিল। যেখানে শত্রুপক্ষ পূর্ণশক্তি নিয়ে আক্রমণ করতে সামর্থ্য ছিল। এসব প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও কাফেলার সবাই নবীর হাতে হাত রেখে জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত ছিল। তাদের নিষ্ঠাপূর্ণ ঈমান এবং আল্লাহর পথে নিবেদিত প্রাণ হওয়ার; এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? এটাই ইসলামের ইতিহাসে 'বাইআতে রিদওয়ান' নামে খ্যাত। বস্তুত মহান আল্লাহ মুসলমানদের এ দীপ্ত চেতনা ও শহীদী প্রেরণায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ঘোষণা দিলেন, আল্লাহ মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা একটি গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল। (সূরা ফাতাহ-১৮)
মুসলমানদের এ সংবাদ ক্রমে ক্রমে 'মক্কায় পৌঁছে গেল। এতে মক্কার মুশরিকরা ভীত ও আতংকিত হয়ে গেল। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের নিকট খবর পৌঁছাল যে, ওসমানকে হত্যা করার সংবাদ মিথ্যা। এরপরই হযরত ওসমান ফিরে আসেন। কুরাইশদের পক্ষ থেকে সন্ধির আলোচনা করার জন্য কিছু প্রস্তাব নিয়ে সুহাইল বিন আমরের নেতৃত্বে কাফিরদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়। কুরাইশরা তাদের জিদ এবং একগুয়েমি পরিত্যাগ করে। তবে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে এবং বলতে থাকে; বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন এ বছর ফিরে যান। তাহলে আগামী বছর তিনি ওমরার জন্য আসতে পারেন। এরপর দীর্ঘ আলোচনার পর কিছু শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি পত্র লেখা হয়। শর্তগুলো ছিল এরূপঃ (১) দশ বছরের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোন তৎপরতা চালাবে না।
(২) কুরাইশদের থেকে যারা মুসলমানদের দলভুক্ত হতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কুরাইশদের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের কেউ কুরাইশদের দলভুক্ত হলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে না। (৩) এ বছর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দল বল নিয়ে ওমরা না করে ফিরে যাবেন এবং আগামী বছর ওমরার জন্য এসে মাত্র তিনদিন মক্কায় অবস্থান করবেন। সে সময় মক্কাবাসীরা মুসলমানদের জন্য স্থান খালি করে দিবেন। তাদের সঙ্গে তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র থাকতে পারবে না। (৪) যে কোন আরব গোত্র যে কোন পক্ষের মিত্র হয়ে এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তাদের সে অধিকার থাকবে।
এসব শর্তে যখন সন্ধি চুক্তিটি চূড়ান্ত হচ্ছিল, তখন মুসলমানদের পুরো বাহিনী অত্যন্ত বিচলিত ও অপমান বোধ করছিল। যে মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐসব শর্ত মেনে নিচ্ছিলেন, তা কেহই বুঝে উঠতে পারে নি। এ সন্ধির ফলে যে বিরাট কল্যাণ অর্জিত হতে যাচ্ছিল, তা দেখতে পাওয়ার মত দূর দৃষ্টি, সে মুহূর্তে সাহাবীদের ছিল না। এমনকি হযরত ওমরের (রা.) মত গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন জ্ঞানীজনের অবস্থাও ছিল নাজুক। তিনি বিচলিত হয়ে হযরত আবু বকরের নিকট গিয়ে বললেন, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন? আমরা কি মুসলমান নই? এসব লোক কি মুশরিক নয়? এসব সত্ত্বেও আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এ অবমাননা মেনে নেব কেন? এমন কি ওমর (রা.) স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে তাঁকেও অনুরূপ প্রশ্ন করেছিলেন।
চুক্তির দু'টি শর্ত (২নং ও ৩নং) মুসলমানদের জন্য বাহ্যিকভাবে নেহাত অবমাননাকর ছিল বৈকি। সন্ধির ঘটনাটি জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মত হয়েছিল। যখন সন্ধি চুক্তিটি লিপিবদ্ধ হচ্ছিল, ঠিক তখন সুহাইল বিন আমরের পুত্র আবু জানদাল কোন প্রকারে পালিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিবিরে গিয়ে হাজির হন। তখন তিনি পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় ছিলেন। আর দেহে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সরাসরি আবেদন জানান। আমাকে এ বন্দীদশা থেকে মুক্ত করুন। এ করুণ অবস্থা দেখে সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে ধৈর্যধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মুশরিক প্রতিনিধি সুহাইল বিন আমর বলে, চুক্তি পত্র লেখা শেষ না হলেও চুক্তির শর্তাবলী স্থির হয়ে গেছে। তাই এ ছেলেকে আমার হাতে অর্পণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যুক্তি মেনে নিলেন এবং আবু জানদালকে যালিমের হাতে তুলে দিলেন।
সন্ধি চুক্তি শেষ করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেন, তোমরা এখানে কুরবানী করে মাথা মুড়িয়ে এহরাম ভেঙ্গে ফেল। কিন্তু কেউই জায়গা থেকে একটুও নড়লেন না। এভাবে তিনি তিনবার আদেশ দিলেন। কিন্তু সাহাবারা বিমূঢ় রইলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ দিচ্ছেন, আর তা পালনের জন্য সাহাবারা তৎপর হচ্ছেন না; এমন ঘটনা এ একটি ক্ষেত্র ছাড়া বিশ্বনবীর পুরো নবুওয়াতী জীবনে আর কখনো ঘটেনি। এতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দুঃখ পান। তাঁবুতে গিয়ে উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালামার কাছে তা প্রকাশ করলেন। উম্মুল মু'মিনীন বলেন, আপনি চুপ চাপ গিয়ে নিজের উট কুরবানী করুন এবং ক্ষৌরকার ডেকে মাথা মুড়ান। তাহলে সবাই আপনাকে দেখে অনুসরণ করবে।
আশ্চর্যজনকভাবে হলও তাই। সাধ্যানুযায়ী সবাই কুরবানী করে এবং মাথা মুড়িয়ে এহরাম থেকে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু দুঃখ ও মর্ম যাতনায় তাদের হৃদয় চৌচির হয়ে রইল। সাহাবীরা কোনভাবেই নিজেদেরকে বুঝ দিতে পারলেন না। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই চুপ করে রইল। এই ছিল ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি।
এরপর কাফেলা যখন হুদাইবিয়া ত্যাগ করে মদীনার দিকে ফিরে যাচ্ছিল তখন 'দাজনান' বা 'কুরাউল গাসীম' নামক স্থানে এ চুক্তিকে প্রকাশ্য বিজয় বলে সূরা ফাতাহের আয়াত নাযিল হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে একত্রিত করে বলেন, আজ আমার উপর এমন জিনিস নাযিল হয়েছে, যা আমার জন্য দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও বেশি মূল্যবান। তারপর তিনি সূরা ফাতাহ পাঠ করেন। বিশেষ করে হযরত ওমরকে ডেকে তা শুনান। এখানে আল্লাহপাকের সরাসরি ঘোষণা ছিল, হে নবী! আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যাতে আল্লাহ আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি বিচ্যুতি মাফ করে দেন (সূরা ফাতাহ : ১-২)। এ আয়াত শুনে হযরত ওমর জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি বিজয়? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ সে মহান সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, এটা অবশ্যই বিজয়। তিনি আরো বলেন তোমরা একেবারে মুশরিকদের বাড়ির দরজায় গিয়ে হাজির হয়েছিলে। তারা আগামী বছর ওমরা করতে দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে তোমাদেরকে ফিরে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সন্ধি করার জন্য তারা নিজেরাই ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। অথচ তাদের মনে তোমাদের প্রতি যে শত্রুতা রয়েছে তা অজানা নয়। সে দিনের কথা ভুলে গেলে, যে দিন আহযাব যুদ্ধে শত্রুরা সব দিক থেকে চড়াও হয়েছিল এবং তোমাদের শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল? (বায়হাকী)
হুদাইবিয়ার সন্ধি যে প্রকৃতই বিজয় ছিল, তা কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রকাশ পেয়ে যায়। সব শ্রেণীর মানুষ পুরাপুরি বুঝতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকেই ইসলামের বিজয় সূচিত হয়েছে। মূলতঃ সন্ধির শর্ত মোতাবেক দশ বছরের শান্তি প্রতিষ্ঠার কারণে ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে। ব্যাপকভাবে দাওয়াতের কাজ চলে। সপ্তম ও অষ্টম হিজরীতে মুসলমানদের সংখ্যা দশগুণ বেড়ে যায়। আর মক্কা বিজয়ের সূচনাও হুদাইবিয়ার সন্ধি থেকেই হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ আরো বলেন, হে নবী! যারা আপনার হাতে বাইয়াত করেছিল, প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর কাছেই বাইয়াত করেছিল। তাদের হাতের উপর ছিল আল্লাহর হাত। যে এ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে, অশুভ পরিণাম তার নিজের উপরেই বর্তাবে। আর যে আল্লাহর সাথে কৃত এ প্রতিশ্রুতি পালন করবে, আল্লাহ অচিরেই তাকে বড় পুরস্কার দান করবেন (সূরা ফাতাহ-১০)। অর্থাৎ সে সময় লোকেরা যে হাতে বাইয়াত করছিল, তা ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ছিল না। আল্লাহর প্রতিনিধির হাত ছিল এবং রাসূলের মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর সাথে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আল্লাহপাক বলেন, আল্লাহ মু'মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল। তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন। তাই তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করবেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ দান করবেন- যা তারা অচিরেই লাভ করবে (সূরা ফাতাহ-১৮ ও ১৯)। যে গাছটির নিচে বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল, পরবর্তীতে লোকজন এসে সে গাছের নিচে নামায পড়তে শুরু করেছিল, বিষয়টি জানতে পেরে হযরত ওমর (রা.) লোকদের তিরস্কার করেন এবং গাছটি কেটে ফেলেন।
আল্লাহর এ পুরস্কারটি কেবল বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ কারণে ৭ম হিজরীতে মুসলমানরা যখন খায়বার আক্রমণের জন্য যাত্রা করেন, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল তাদেরকেই সাথে নিলেন যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীক ছিলেন। হুদাইবিয়ার ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে (হুদাইবিয়ার) এ বিজয় দিয়েছেন যে, তোমাদের বিরুদ্ধে মানুষের হাত উত্তোলনকে থামিয়ে দিয়েছেন, যাতে মু'মিনদের জন্য তা একটি নিদর্শন হয়ে থাকে এবং আল্লাহ তাদেরকে সোজা পথের হিদায়াত দান করেন (সূরা ফাতাহ-২০)। আল্লাহপাক সেদিন কাফির কুরাইশদের এতটা সাহস দেননি যে, হুদাইবিয়াতে তারা মুসলমানদের সাথে লড়াই বাঁধিয়ে বসতে পারে। অথচ সব কিছুই তাদের অনুকূলে ছিল। আর মুসলমানরা ছিল প্রতিকূল অবস্থায় এবং তাদের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল। এ অবস্থায় আল্লাহ মুসলমানদেরকে সহজভাবে বিজয় দান করেছেন। তাই আল্লাহ বলেন, এ মুহূর্তে যদি কাফিররা তোমাদের সাথে লড়াই বাঁধিয়ে বসতো, তবে অবশ্যই তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করত এবং কোন সহযোগী ও সাহায্যকারী পেত না (সূরা ফাতাহ-২২)। এছাড়া আল্লাহ তোমাদেরকে আরও গনীমতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যা তোমরা এখনো লাভ করতে পারনি। কিন্তু আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান (সূরা ফাতাহ: ২১)। এখানে আল্লাহপাক মক্কা বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত দান করেছেন। অর্থাৎ মক্কা এখনো তোমাদের করায়ত্ব হয়নি। তবে মক্কাকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং হুদাইবিয়ার বিজয়ের ফলশ্রুতিতে তাও তোমাদের করায়ত্ত হবে। এরই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মক্কা বিজয়ের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, তিনি সে সত্তা যিনি মক্কা ভূমিতে তাদের হাত তোমাদের থেকে; আর তোমাদের হাত তাদের থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাদের উপর তোমাদের আধিপত্য দান করার পর (সূরা ফাতাহ : ২৪)। অতঃপর রাসূলের ওমরা করার স্বপ্ন যে সত্য ছিল; সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মহান প্রতিপালক বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন যা ছিল সরাসরি হক। ইনশাআল্লাহ তোমরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে। নিজের মাথা মু ন করবে, চুল কাটবে এবং তোমাদের কোন ভয় থাকবে না। তোমরা যা জানতে না, তিনি তা জানতেন। তাই স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করার পূর্বে তিনি তোমাদেরকে এ আসন্ন বিজয় দান করেছেন (সূরা ফাতাহঃ ২৭)। অর্থাৎ পরের বছর ৭ম হিজরীর যিলকাদ মাসে এ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়। ইতিহাসে এ ওমরাকে ওমরাতুল কাযা বলা হয়। ইসলামের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে, কাফির ও মুশরিকদের সাথে এমন সন্ধি স্থাপনে বাহ্যিক দৃষ্টিতে পরাজয় বরণ মনে হলেও; সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বুঝা যায় যে, পরিণামে তা مسلمانوں জন্য স্পষ্ট বিজয়ের কারণ হয়েছে। যেমন হুদাইবিয়ার সন্ধির পর তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
অনেক সময় আমাদের বাহ্যিকভাবে কোন কিছুকে, হীনতা ও অপমানকর বলে মনে হলেও, পরবর্তীতে তা আল্লাহ তা'আলার নিকট ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য উত্তম ও সম্মানের হয়ে থাকে। আবার অনেক সময় তার বিপরীতও হয়ে থাকে। তাই مسلمانوں কর্তব্য হল, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশকে উত্তম আদর্শরূপে মেনে নেয়া এবং সেভাবেই অনুকরণ ও অনুসরণ করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, অনেক সময় কোন কিছুকে তোমরা অপছন্দ কর, অথচ তোমাদের জন্য তা কল্যাণকর। আবার অনেক সময় কোনকিছুকে ভাল মনে কর, অথচ তোমাদের জন্য তা খারাপ (আল কুরআন)। ইসলাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করে এবং তা দুনিয়াতে সম্মান দিতে পারে না। আর পরকালেও মঙ্গল বয়ে আনে না। কুরআনের নির্দেশ হল, অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয় অঙ্গীকারের জন্য প্রশ্ন করা হবে (সূরা বনী ইসরাঈল)। যারা সংখ্যায় স্বল্পতা সত্ত্বেও, ইসলামের জন্য প্রাণ উৎসর্গ ও সত্যের বিশ্বাসী হয়ে বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন; তারা ইহ ও পরকাল-উভয় জগতে সফলকাম হয়েছিলেন।
আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সুফল নষ্ট করেন না। ইসলাম শান্তি র ধর্ম। তার প্রমাণ হুদাইবিয়ার সন্ধির মধ্যে পাওয়া যায়। মুসলিম জাতি নিজেদের আখলাক, আমল, কার্যকলাপ এবং কথা বার্তায় সমকালীন সমস্ত জাতি ও ধর্মালম্বীদের চেয়ে অধিক উন্নত। এ ব্যাপারটি হুদায়বিহার সন্ধির মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হয়েছ।