📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ও পরিস্থিতি

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ও পরিস্থিতি


মুসলমানরা হিজরত শুরু করলে কাফিররা তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। মুসলমানরা কাফিরদের কবল থেকে বেরিয়ে গেছে এবং মদীনায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, এটা দেখে কাফিরদের ক্রোধ আরো বেড়ে গিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনও খোলাখুলি মুশরিক ছিল। মদীনায় সে ছিল আনসারদের নেতা। সে সময় মদীনায় আবদুল্লাহর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। কেননা, আনসাররা তার নেতৃত্বের উপর একমত হয়েছিল। এমনকি সে সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি মদীনায় না যেতেন, তবে মদীনাবাসী তাকে তাদের রাজা বা নেতা হিসেবে গ্রহণ করত। মক্কার পৌত্তলিকরা তাদের হুমকিপূর্ণ চিঠিতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে লিখেছিল, আপনারা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়েছেন, তাই আমরা আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, হয়ত আপনারা তার সাথে লড়াই করুন অথবা তাকে মদীনা থেকে বের করে দিন। যদি না করেন তবে আমরা সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনাদের যোদ্ধা পুরুষদের সবাইকে হত্যা করব এবং আপনাদের মহিলাদের সম্মান বিনষ্ট করব (আবু দাউদ)। এ চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মক্কার মুশরিকদের নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হন। তার মনে আগে থেকেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা বিদ্বেষ ছিল। কেননা তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তার কাছ থেকে মদীনার রাজমুকুট কেড়ে নিয়েছেন। মক্কার মুশরিকদের চিঠি পাওয়ার পর পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজার সহযোগীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হন। এ খবর পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহকে বলেন, কুরাইশদের হুমকিতে তোমরা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছ মনে হচ্ছে। শোনো, তোমরা নিজেরা নিজেদের যতো ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছ, মক্কার কুরাইশরা তার চেয়ে তোমাদের বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা কি নিজেদের সন্তান এবং ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করতে চাও? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এ কথা শোনার পর যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত আবদুল্লাহর সহযোগীরা ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায় (আবু দাউদ)।

সমর্থক সহযোগীরা ছত্র ভঙ্গ হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনকার মত যুদ্ধ থেকে বিরত হয়। পর্দার অন্তরালে কুরাইশদের সাথে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এ দুষ্ট ও দুর্বৃত্ত মুসলমান ও মুশরিকদের মাঝে অনিষ্ট, ফাসাদ, বিশৃংখলা, সংঘাত সৃষ্টির কোনো সুযোগই হাতছাড়া করত না। উপরন্তু মুসলমানদের বিরোধিতায় শক্তি অর্জনের জন্যে ইহূদীদের সাথেও ঘোর যোগাযোগ রক্ষা করত। যেন প্রয়োজনের সময় ইহুদীরা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার কৌশলে অশান্তি ও বিশৃংখলার আগুন নির্বাপিত করতেন (বুখারী)। একবার হযরত সা'দ ইবনে মা'য়ায (রা.) ওমরা পালনের জন্যে মক্কায় গিয়ে উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হন। তিনি উমাইয়াকে বলেন, আমি একটু নিরিবিলি সময়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করতে চাই। উমাইয়া ভর দুপুরে হযরত সা'দকে নিয়ে বের হলে আবু জাহলের সাথে দেখা হয়। সে উমাইয়াকে বলল, আবু সাফওয়ান, তোমার সঙ্গে আসা এ লোকটির পরিচয় কি? উমাইয়া জবাব দেয়, ইনি হচ্ছেন সা'দ ইবনে মা'য়ায। আবু জাহেল হযরত সা'দকে সম্বোধন করে বলল, তুমি দেখছি বড়ো নিবিষ্ট মনে তাওয়াফ করছ। অথচ তোমরা বেদ্বীনদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছ। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছাও রাখ। খোদার কসম, তুমি যদি আবু সাফওয়ানের মেহমান না হতে, তবে তোমাকে নিরাপদে মদীনায় ফিরে যেতে দেয়া হত না। একথা শুনে হযরত সা'দ (রা.) উচ্চৈঃস্বরে বলেন, শোন, তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ থেকে বিরত রাখ, তবে আমি তোমাদের বাণিজ্য কাফেলা মদীনার কাছ দিয়ে যেতে দেব না, সেটা কিন্তু তোমার জন্যে আমার চেয়ে গুরুতর ব্যাপার হবে (বুখারী)। এদিকে কুরাইশরা মুসলমানদের খবর পাঠালেন, তোমরা মনে করো না, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে; আমরা ইয়াসরেব পৌঁছে তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়ব। (রাহমাতুললিল আলামীন)।

এটা শুধু হুমকি ছিল না; বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্তিশালী সূত্রে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র এবং অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনও কখনও সারারাত জেগে কাটাতেন। আবার কখনও কখনও সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত যাপন করতেন। পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্যে নির্দিষ্ট ছিল না; বরং এটা অব্যাহত স্থায়ী ব্যবস্থা ছিল। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাত্রিকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে পাহারার ব্যবস্থা করা হত। অতপর পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাকে মানুষদের থেকে হিফাযত রাখবেন।' এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কামরা বা ঘর থেকে মাথা বের করে বলেন, হে লোকেরা তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিরাপদ করে দিয়েছেন (তিরমিযী)। নিরাপত্তাহীনতার এ শঙ্কা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য ছিল। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীরা মদীনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। মদীনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত যাপন করতেন না এবং অস্ত্র ছাড়া ভোর করতেন না।

এসব শংকাজনক পরিস্থিতি মদীনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে ছিল বিশেষ হুমকি ও বিরাট চ্যালেঞ্জস্বরূপ। যা থেকে সুস্পষ্ট হচ্ছিল, কুরাইশরা হঠকারিতা, দুষ্কৃতি থেকে বিরত হবার নয়। তখন আল্লাহ্‌ মুসলমানদের যুদ্ধ করার অনুমতি দেন। তবে এ যুদ্ধকে ফরয বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। এ সময় আল্লাহ্‌ কুরআনের আয়াত নাযিল করেন, যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরও যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করা যাচ্ছে, কেননা তারা মযলুম, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তা'আলা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম। এ আয়াতের সাথে আরো কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়। সে সকল আয়াতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ করার এ অনুমতি নিছক যুদ্ধের জন্যে নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাতিল বা মিথ্যার মূল উৎপাটন এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রতিষ্ঠা। যেমন আল্লাহ্‌ পাক এরশাদ করেন 'আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে; সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে (সূরা হজ্জ)। এ অনুমতি হিজরতের পর মদীনায় নাযিল হয়েছিল, তবে নাযিলের সঠিক সময় নির্ধারণ করা কঠিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ সীমানা বিস্তৃত করার জন্যে দু'টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। (১) যেসব গোত্র মক্কা থেকে সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের আশেপাশে অথবা সে পথ থেকে মদীনার মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাস করছে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করা। (২) সে পথে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ করা।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামরিক অভিযান শুরুর আগে জুহায়না গোত্রের সাথেও ইহুদীদের অনুরূপ একটি বন্ধুত্ব, সহায়তা দান এবং অনাক্রমণ চুক্তি করেন। এ গোত্র মদীনা থেকে ৪৫ কিঃ মিঃ দূরে বাস করত। এছাড়া বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো কয়েকটি সহগোত্রীতার চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছারিয়‍্যা ও গাযওয়া (যুদ্ধ ও অভিযান) সম্পর্কিত। যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের পর বর্ণিত পরিকল্পনাদ্বয় বাস্তবায়নের জন্যে কার্যত মুসলমানদের সেনা অভিযান শুরু হয়। সেনা দল নৈশ টহল দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিল মদীনার আশেপাশের রাস্তায় সাধারণভাবে এবং মক্কার আশেপাশের রাস্তায় বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, একই সাথে সেসব রাস্তার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রসমূহের সাথে চুক্তি সম্পাদন করা এবং ইয়াসরেবের মুশরিক, ইহুদী ও আশেপাশের বেদুঈনদের মনে করিয়ে দেয়া যে, মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা অতীতের দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা কাটিয়ে ওঠেছে। উপরন্তু এর মাধ্যমে কুরাইশদের অযথা ক্রোধ এবং আচরণের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে ভয় দেখানো যে, নির্বুদ্ধিতার ফলে তারা ধসে যেতে চলেছে। এতে তাদের হুঁশ আসবে এবং তাদের অর্থনীতি ও জীবনোপকরণ হুমকির সম্মুখীন দেখে সন্ধি-সমঝোতার প্রতি ঝুঁকবে। আর মুসলমানদের ঘরে প্রবেশ করে, তাদের নিঃশেষ করার যে সংকল্প পোষণ করছে; আল্লাহর পথে যে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করাচ্ছে; মক্কায় দুর্বল মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন করছে; সেসব থেকে বিরত হবে। ফলে জাযিরাতুল আরবে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ মুসলমানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে। ফলশ্রুতিতে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ প্রশস্ত হবে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 খায়বারের যুদ্ধ

📄 খায়বারের যুদ্ধ


সিরিয়া প্রান্তরের এক বিশাল শ্যামল ভূখ ের নাম খায়বার। ছোট বড় বহু দুর্গ দ্বারা এ স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। পূর্ব হতেই এখানে ইহুদীরা বসতি স্থাপন করেছিল। মদীনার বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রদ্বয় এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রের ইহুদীরা খায়বরে তাদের জাতি ভাইদের সাথে যোগ দেয়ার পর, তাদের দুষ্ট ও কুচক্রি মনোভাব অরো পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিরাট ও ব্যাপকভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের মনস্থ করল। সমস্ত আয়োজন ঠিক হলে, ইহুদীরা ছোট খাট কয়েকটি আক্রমণ দ্বারা मुसलमानोंকে উত্তেজিত করল। ইহুদীদের এ চক্রান্তের গোপন খবর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেড়ে অনতিবিলম্বে ১৪শ কিংবা ১৬শ মুসলিম সৈন্য বাহিনী নিয়ে খায়বারের দিকে রওয়ানা হন।

মদীনা হতে খায়বার প্রায় একশত মাইল (তিন দিনের পথ) দূরে অবস্থিত। ৭ম হিজরীর মহররম মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত দ্রুত বেগে সৈন্য চালনা করেন যে, ইহুদীরা কোন পূর্বাভাসই পেল না। তিন দিনের এ পথ অতিক্রম করে হঠাৎ একদিন খুব ভোরে ইহুদীদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত দুর্গে এসে পৌঁছেন। কৃষকরা মাঠে এসে দেখতে পেল যে, সম্মুখে তাদের বিরাট মুসলিম সেনাদল। ভয়ে তারা দৌঁড়ে গিয়ে নগরবাসীকে এ সংবাদ দিল। ইহুদীরা হতভম্ব হয়ে গেল। তখন বনু গাতফান ও অন্যান্য গোত্রের সহযোগিতা লাভের আর অবসর রইল না। তখন তাদের নেতা সালাম বিন মিসকামের সাথে পরামর্শ করে তাদের ছয়টি দুর্গের মধ্যে 'ওয়াতি' ও 'সামেল' নামক দুর্গে তাদের ধন সম্পদ ও মেয়েদের সুরক্ষিত করল। তাদের ধনাগার ছিল 'নায়িম' নামক দুর্গে। সৈন্য বাহিনী থাকত নাতীত নামক দুর্গে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নাতীত বা নায়িম দুর্গ আক্রমণ করেন। পঞ্চাশজন مسلمان এতে আহত হন। আর ইহুহীদের নেতা সালাম নিহত হলে তার স্থলাভিসিক্ত হন হারিস বিন যয়নাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ দুর্গ مسلمانوں অধিকারে আসে। আরো কয়েকটি দুর্গ অধিকারে আসার পর, মুসলিম বাহিনী বিখ্যাত দুর্গ 'কানুস' এর সম্মুখীন হয়। মুসলমানরা এ দুর্গ দখল করতে পারছিল না দেখে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিন হযরত আবু বকর (রা.) কে এবং দ্বিতীয় দিন হযরত ওমর (রা.) কে সেনাপতি করে পাঠান। এ দু'দিনের আক্রমণে শত্রুরা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুর্গের পতন হয়নি। তৃতীয় দিন আল্লাহর সিংহ হযরত আলীকে (রা.) ইসলামের পতাকা দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই নাও ইসলামের পতাকা এবং যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের বিজয়ী করেন। মুসলমানরা হযরত আলীর নেতৃত্বে প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ করলে কানুস দুর্গের পতন হয়। অতঃপর অন্যান্য দুর্গও মুসলমানদের করায়ত্তে আসে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায় ইহুদীদের নিহতের সংখ্যা ৯২ জন, আর مسلمانوں শহীদের সংখ্যা ১৯ জন। প্রায় তিন সপ্তাহকাল অবরুদ্ধ থাকার পর খায়বারের সমস্ত দুর্গ মুসলমানদের হস্তগত হয়। এ যুদ্ধে মহাবীর আলী (রা.) ঢাল হিসেবে দুর্গের যে লোহার কপাট বা দরজাটি ব্যবহার করেছিলেন; তা উঠাতে ৭ জন সাহাবা হিমশিম খেয়ে যান। অথচ আলী (রা.) সেটাকে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করেছেন। সবই মহান রবের ইচ্ছা।

এরপর ইহুদীরা অতি বিনীতভাবে বিশ্বনবীনির নিকট লিখিত শর্তে শান্তি প্রস্তাব দেয়। শর্ত ছিল এরূপঃ (১) তাদের জীবন, সম্পত্তি, মহিলা ও শিশুদের স্পর্শ করা হবে না। (২) তারা অর্ধেক ফসল হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেবে। (৩) তারা مسلمانوں অনুগত প্রজা হয়ে বসবাস করবে। (৪) ইহুদীরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শর্ত মেনে নিলেন। প্রতিবছর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) খায়বারে এসে উৎপন্ন ফসল ভাগ করে দিতেন। এ সত্ত্বেও ইহুদীদের স্বভাব বদলায়নি। বিশ্বাসঘাতকতা ও কলা কৌশলে চতুরতা ইহুদী জাতির মজ্জাগত অভ্যাস। এরা পুনরায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র করে। ইহুদী নেতা হারিসের কন্যা ও সালামের স্ত্রী যয়নাব, মহানবীকে দাওয়াত করে বিষ মিশ্রিত খাদ্য খেতে দেয়। মহানবী এক লুকমা মুখে দিয়েই ফেলে দেন। কিন্তু বিশর বিন রানা (রা.) নামক এক সাহাবী সামান্য গিলে ফেলায় সে শহীদ হন। ফলে এ হত্যার দায়ে যয়নাবকে প্রাণদ দেয়া হয়। খায়বার যুদ্ধে যে সব মহিলা বন্দী হয়েছিল তাদের মধ্যে হযরত সফিয়াও (রা.) ছিলেন। তিনি একজন সাহাবীর ভাগে পড়েন। অথচ তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দাসীরূপে থাকার জন্য আবেদন জানান। দয়াল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে আজাদ করে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহ খায়বারের বিজয়ের ইঙ্গিত করেছিলেন। আল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন, মুমিনরা যখন গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল, তখন তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন। তাই তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে অখ বিজয় দান করবেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ দান করবেন, যা তারা অচিরেই লাভ করবে (সূরা আল ফাতাহ : ১৮-১৯)। হুদাইবিয়ায় আল্লাহ দেয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হয়েছিল ফলে مسلمانوں মনোবল আরও বেড়ে গিয়েছিল।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


৮ম হিজরীর রমযানে মক্কা বিজয় হয়। হুদাইবিয়ার সাথে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত। হুদাইবিয়ার একটি শর্ত ছিল এরূপ: মক্কাবাসী অথবা মুসলমানরা যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে। অপরপক্ষ এতে বাদ সাধতে পারবে না। এরই ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের সাথে বনু খোজায়ার এবং অপরদিকে বনু বকরের সাথে মক্কাবাসীদের চুক্তি হয়েছিল। অথচ কিছু দিন যেতে না যেতেই, মক্কার কাফিররা বনু বকরের পক্ষাবলম্বন করে, বনু খোজায়ার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের অনেক লোককে হত্যা করে ফেলে। ফলে খোজায়ার গোত্রের লোকেরা এসে প্রিয় নবীর নিকট ফরিয়াদ জানায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীর নিকট তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবী জানান। নতুবা চুক্তি ভঙ্গ বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু মক্কার কাফিররা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথার কোন মূল্যই দিল না। শেষ পর্যন্ত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ বলেই বিবেচিত হল।

এবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে মক্কা অভিযানের আয়োজন শুরু করে দিলেন। তিনি সবকিছু গোপন রেখে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন। কারণ, এ অভিযানের খবর মক্কাবাসী জানতে পারলে তারাও বিপুল সমরায়োজন করত। ফলে একটা ভীষণ রক্তারক্তি কা ঘটে যেতে পারত। অথচ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ ধ্বংসাত্মক বিজয় চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ভালবাসা দিয়ে ও মানবতা দিয়ে পবিত্র মক্কা জয় করতে। এজন্যই তিনি কুরাইশদেরকে প্রস্তুত হবার অবকাশ দেননি।

হাতিব বিন আবি বোলতা (রা.) নামক জনৈক বদরী সাহাবী এ সময় একটি কা করে বসেন। তখনও তার স্ত্রী-পুত্র মক্কায় অবস্থান করত। তাদের প্রতি মক্কার কুরাইশদের সহানুভূতির আশায় তিনি গোপনে জনৈকা ক্রীতদাসীর মাধ্যমে মক্কায় মুসলমানদের অভিযানের খবর পাঠানোর চেষ্টা করেন। আল্লাহ অহীর মাধ্যমে তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী, মিকদাদ ও হযরত যুবাইরকে (রা.) বলে পাঠান যে, তোমরা দ্রুত যাও, 'রওযা খাক' নামক স্থানে গেলে উটে সওয়ারী এক মহিলা দেখবে, তাকে আটক করবে এবং তার নিকট একটা চিঠি পাবে। তোমরা তা নিয়ে আস। বিশ্বনবীর নির্দেশ পালন করা হলে ঘটনার সত্যতা মিলে। এ কাজের জন্য হাতিবের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হয়। হাতিব অকপটে তার উপরোক্ত উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এটা ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা মু'জেযা।

পরিকল্পনা অনুসারে ধীরে ধীরে مسلمانوں দশ হাজারের বিরাট বাহিনী তৈরী হয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরীর ১০ই রমযান (৬৩০ খ্রীঃ) মক্কা অভিমুখী অভিযানে রওনা হন। মক্কার উপকণ্ঠে 'মারুর জাহরান' নামক স্থানে এসে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং মক্কা বিজয় করার জন্য কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেন। সন্ধ্যর পর খাদ্য প্রস্তুতির জন্য তাবুর বাইরে চুল্লি জ্বালান হয়। রাতে অগণিত চুল্লিতে আগুন জ্বলতে দেখে কুরাইশরা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। আবু সুফিয়ান এ দৃশ্য দেখতে এসে ধরা পড়ে যান এবং তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আনা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আবু সুফিয়ান! এখনও কি তোমার ভুল ভাঙ্গবে না? তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে না? এখনও কি দেবদেবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে? নবীর দাওয়াতের কথায় আবু সুফিয়ানের মনে দাগ কাটে এবং তিনি তখন কালেমা পড়ে ইসলাম কবুল করেন। অপরদিকে আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়াও ইসলামের গুণে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ইসলাম গ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কুরআনের ভাষায় বলেন, আজ তোমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি অতি দয়ালু করুণাময়। (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারা নিরাপদ, যারা মসজিদে হারামে থাকবে তারা নিরাপদ আর যারা নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে তারাও নিরাপদ। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে ৪টি দলে বিভক্ত করে নগরে, প্রবেশের নির্দেশ দেন। আর হযরত আব্বাস (রা.) কে বলেন, আবু সুফিয়ানকে এখন মক্কায় ফিরে যেতে না দিয়ে সম্মুখের পাহাড়ের উপর নিয়ে যান, যেন সে مسلمانوں ক্ষমতা দেখতে পায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مسلمانوں যে চারটি দলে বিভক্ত হবার নির্দেশ দেন; সে দলগুলোর নেতারা ছিলেন: (১) হযরত যুবাইর (রা.) (২) হযরত আবু ওবায়দা (রা.) (৩) হযরত সাদ বিন ওবাদা (রা.) ও (৪) হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। হযরত আলী (রা.) পতাকা হাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। সেনাপতিদের প্রতি নির্দেশ ছিল; বাধা না দিলে কাউকে যেন আঘাত করা না হয়। বস্তুতঃ বিনা বাধায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুসলিম বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে। ক্বাবা ঘরে পৌঁছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসমান বিন তালহার নিকট হতে চাবি নেন এবং পবিত্র কা'বা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করেন। এরপর কা'বার মূর্তিগুলোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আঘাত করতে করতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসারিত হয়েছে, আর মিথ্যা না কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, আর না পুনরাবৃত্তি করতে পারে। (আল কুরআন)

মক্কাবাসীরা অপেক্ষা করছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করেন? যেসব মুশরিকরা বহু বছর যাবত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং مسلمانوںকে সর্বপ্রকারের দুঃখ কষ্ট দিয়েছিল আজ তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বন্দীদেরকে উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, হে কুরাইশরা! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব বলে তোমরা ধারণা কর? তারা উত্তর দিল, আমরা আপনার নিকট হতে ভাল ব্যবহার পাওয়ার আশা করি। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও তোমরা সকলে মুক্ত।

এ ঘোষণায় ইকরামা, সাফওয়ান, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা; প্রমুখ অমার্জনীয় অপরাধী ক্ষমা পেয়ে যায়। এখানে এ সত্যটি পুনরায় স্পষ্ট হয়ে উঠে: পৃথিবীর রাজা বাদশাহ ও নবীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল- নবী রাসূলরা মহানুভব ও মানবতাবাদী। নবীরা (আ.) বিশাল হৃদয়ের হন। ক্ষমা করা, পূর্বের দুঃখস্মৃতি ভুলে যাওয়াই নবীদের মূল আদর্শ। আর দুনিয়াবাদীরা প্রতিশোধপরায়ণ ও হঠকারী। পাশাপাশি এ ব্যাপক ও সাধারণ ক্ষমা হতে কিছু লোককে আলাদা রাখা হয়, যারা ইসলামের অতিমাত্রায় ক্ষতি করেছিল। কিন্তু এরূপ লোকের অধিকাংশই তখন আত্ম গোপন করেছিল এবং ক্রমে ক্রমে তারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণপূর্বক ইসলাম কবুল করেছিল। এ ক্ষমা ও দয়ার ফলে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণে সুভাগ্যবান হন। হযরত মুয়াবিয়া, আবু কাহাফা প্রমুখ সে দিনই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ভয়ঙ্কর শত্রুরাও ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

সূরায়ে ফাতাহ, হাদীদ ও নাছর- এ তিনটি সূরাতে আল্লাহ মক্কা বিজয় সম্বন্ধে ইঙ্গিত করেছেন। সূরা ফাতাহে এসেছে, আপনাকে সাহায্য করবেন জবরদস্ত সাহায্য। আর সে শক্তিশালী ও জবরদস্ত সাহায্য হল মক্কা বিজয় (সূরা ফাতাহ)। সূরা হাদীদে এসেছে, তোমাদের মধ্যে তারা- যারা ব্যয় করেছে মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা অধিক উচ্চ, ঐ সমস্ত লোকের চেয়ে; যারা ব্যয় করে মক্কা বিজয়ের পরে এবং জিহাদ করে। আর আল্লাহ তাদের সকলের সাথে উত্তম প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন (সূরা আল হাদীদ)। সূরা নাছরে এসেছে, যখন এসে পড়ে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় এবং আপনি লোকদেরকে দেখেন যে তারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে দলে দলে প্রবেশ করছে। (সূরা আন নাছর)

মক্কা বিজয়ের বিশেষত্ব হল, তা শক্তি বলে বিজিত হওয়া সত্ত্বেও রক্তপাত হতে রক্ষিত ছিল। কা'বার হেরেমের সম্মান ও মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদকে (রা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন; কা'বা শরীফে প্রবেশ কালে কারো প্রতি যেন তরবারি না উঠায়। দুনিয়ার ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন কোন রাজা-বাদশাহ কোন দেশ জয় করে, তখন বিজিত দেশের উপর নানা প্রকার অত্যাচার, উৎপীড়ন সংঘটিত হয়। তারা হত্যা ও লুটতরাজ করে। সে জাতিকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করে কিংবা হত্যা করে। কিন্তু তদস্থলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ঘোষণা ছিল, আজ তোমাদের উপর কোন ক্ষোভ নেই। যাও তোমরা সকলেই মুক্ত? কাফির বা মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে যদি সন্ধি হয়, তবে সে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ কাফির দলের জান, মাল এবং ইজ্জত সব কিছু নিজের জান, মাল এবং ইজ্জতের মত মনে করতে হবে। অবশ্য প্রতিপক্ষের পক্ষ হতে বিরোধিতা বা চুক্তি ভঙ্গ হলে, مسلمانوں চুক্তি ভঙ্গসহ তাদের মূলোৎপাটন করা যাবে। মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের হৃদয় এতটাই সহানুভব ও উদার ছিল। যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। সত্যিই তিনি অতুলনীয়।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন

📄 মক্কা বিজয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জন


মক্কা বিজয় ছিল মূলত একটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান। এর ফলে আরববাসীদের সামনে মূর্তিপূজার অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে তার অবসান ঘটে। সমগ্র আরবের জন্যে সত্য মিথ্যা চিহ্নিত হয়ে যায়। তাদের মনোজগৎ থেকে সন্দেহ সংশয়ের অবসান ঘটাতে থাকে। এ কারণে মক্কা বিজয়ের পর তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে।

হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমরা একটি কূপের ধারে বাস করতাম, তার পাশ দিয়ে কাফেলা চলাচল করত। আমরা তাদের লোকদের এবং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। তিনি কেমন তা জানতে চাইতাম। তারা বলত, মনে করেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে ওহী পাঠান হয় এবং সে ওহীতে আল্লাহ তা'আলা এরূপ এরূপ বলেন। হযরত আমর ইবনে সালামা (রা.) বলেন, আমি সেসব কথা শুনতাম। কথাগুলো আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের জন্যে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। তারা বলত, তাঁকে এবং তাঁর কওমকে বা জাতিকে ছেড়ে দাও। যদি তিনি নিজের কওমের উপর জয় লাভ করেন তাহলে বুঝা যাবে, তিনি সত্য নবী। অতঃপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটে। সকল কওম ইসলাম গ্রহণের জন্যে অগ্রসর হয়। আমার পিতাও আমার কওমের কাছে ইসলামের শিক্ষা নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর সত্য নবীর কাছ থেকে এসেছি। তিনি বলেন, অমুক অমুক নামায আদায় কর। নামাযের সময় হলে তোমাদের মধ্য থেকে একজন যেন আযান দেয়। এরপর তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি বেশী পরিমাণ কুরআন জানেন, তিনি যেন ইমামতি করেন।

এ হাদীস থেকে বুঝা যায়, মক্কা বিজয়ের ঘটনা পরিস্থিতির পরিবর্তনে ইসলামকে শক্তিশালী করেছিল। আরববাসীদের ভূমিকা নির্ধারণে এবং ইসলামের সামনে তাদের অস্ত্র সমর্পণে মক্কা বিজয় এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাবুকের যুদ্ধের পর এ অবস্থা আরো শক্তিশালী রূপ নেয়। এ কারণে দেখা যায় যে, নবম ও দশম হিজরীর দুই বছরে মদীনায় বহু প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। সে সময় মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে মক্কা বিজয়ের সময় যেখানে مسلمانوں সংখ্যা ছিল দশ হাজার, অথচ এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তবুকের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়। বিদায় হজ্জের সময় দেখা যায়, مسلمانوں সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ২৪ হাজার, মতান্তরে ২ লাখ। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারপাশে তাঁরা লাব্বাইক ধ্বনি দিচ্ছিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিলেন। পাহাড়-পর্বতে, মাঠে-প্রান্তরে তাওহীদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এভাবেই মক্কা বিজয়ের পর খুব দ্রুত ইসলামের প্রচার, প্রসার ও দাওয়াত ও তাবলীগের কল্পনাতীত অগ্রগতি সাধিত হয়। মক্কা বিজয়ের মধ্যদিয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের পূর্ণতা অর্জিত হতে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00