📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরত পরবর্তী মদীনার সার্বিক পরিস্থিতি

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরত পরবর্তী মদীনার সার্বিক পরিস্থিতি


বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনার জীবন তিনটি বৈশিষ্ট্যময় পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্যায়ে ছিল ফেতনা, সংকট, অস্থিরতা, চাঞ্চল্য ও প্রতিবন্ধকতা। বাইরে থেকে শত্রুরা মদীনার অস্তিত্ব মিটিয়ে ফেলতে আক্রমণ অভিযান চালিয়েছিল। ষষ্ঠ হিজরীর যিলকদ মাসে সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্য দিয়ে এ পর্যায়ের শেষ হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে মূর্তিপূজারী নেতৃত্বের সাথে সন্ধি হয়েছিল। হিজরী অষ্টম সনের রমযান মাসে মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে এ পর্যায়ের শেষ হয়েছিল। এ পর্যায়ে বিশ্বের রাজা বাদশাহদের দ্বীন ইসলামে দাওয়াত প্রদান করা হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে মানুষরা দলে দলে দ্বীন ইসলামের প্রবেশ করেছে, বিভিন্ন গোত্রগোষ্ঠীর প্রতিনিধি দল মদীনায় আগমন করেছে। এ পর্যায়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ একাদশ হিজরী সনের এগারোই রবিউল আউয়াল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ছিলেন মদীনার তথা ইসলামের নতুন সমাজের রূপায়ণ ও বিনির্মাণের ইমাম, নেতা এবং পথপ্রদর্শক। মদীনায় এমন তিনটি জাতি গোষ্ঠীর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহ অবস্থান ছিল; যাদের একটির অবস্থা অন্যটির থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ এমন কিছু সমস্যা ছিল, যেগুলো অন্য জাতি-গোষ্ঠীর সমস্যার থেকে ভিন্ন। একদিকে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর নির্বাচিত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী দল/গোষ্ঠী। অন্যদিকে ছিল মদীনার প্রাচীন এবং আদি গোত্রসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট মুশরিক। এরা তখন পর্যন্ত ঈমান আনেনি। তৃতীয় দল হচ্ছে ইহুদী সম্প্রদায়। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশকিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাদের জন্যে মদীনার অবস্থা ছিল মক্কার সম্পূর্ণ বিপরীত। মক্কায় যদিও তারা ছিলেন একই কালিমার অনুসারী এবং উদ্দেশ্যও ছিল অভিন্ন, কিন্তু তারা বিভিন্ন পরিবারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। তারা শঙ্কিত, দুর্বল ও অবমাননার সম্মুখীন ছিলেন। তাদের হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না। যেসব উপাদানের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে একটি সমাজ কায়েম হয়, মক্কায় মুসলমানদের হাতে সেসবের কিছুই ছিল না। এ কারণেই মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে শুধু ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। এমন সব আহকাম অবতীর্ণ হয়েছে, যার উপর প্রতিটি মানুষই পৃথকভাবে আমল করতে পারে। এছাড়া পুণ্য কর্ম, কল্যাণ, মঙ্গল এবং সচ্চরিত্রের প্রতি উৎসাহিত আর হীন নীচ কাজসমূহ থেকে বেঁচে থাকার তাগিদ করা হয়েছে।

পাশাপাশি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুহাজিরদের মদীনায় যাওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই সামাজিক ক্ষমতার কলকাঠি ছিল মুসলমানদের হাতে। মুসলমানদের উপর অন্য কারো আধিপত্য ছিল না। তাই এটা ছিল সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, যুদ্ধ ও সন্ধি সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার, হালাল-হারাম মেনে ইবাদত করার এবং স্বভাব চরিত্রের বিকাশ, জীবন জিজ্ঞাসা পুরোপুরি স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন করার সুবর্ণ সুযোগ। সময়টি যথার্থ ছিল মুসলমানদের একটি নতুন ইসলামী সমাজ গঠনের। যে সমাজ জীবনের সকল পর্যায়ে জাহেলী সমাজ থেকে ভিন্ন এবং বিশ্ব মানবের মাঝে বিদ্যমান অন্য যে কোনো সমাজ থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। সমাজটি ইসলামী দাওয়াতের প্রতিনিধি করবে। এমন সমাজের জন্যেই বিগত দশ বছর যাবত মুসলমানরা নানা ধরনের দুঃখ কষ্ট, নির্যাতন ও নিষ্পেষণ সহ্য করেছেন। এ ধরনের কোনো সমাজ হুটহাট করে গঠন করা সম্ভব নয়। বরং এর জন্যে প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ও সঠিক পরিকল্পনার। যাতে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে বিধি বিধান জারি করা যায়। আইন প্রণয়ন, অনুশীলন, প্রশিক্ষণ এবং যথার্থ বাস্তবায়ন করা যায়। বিধি বিধান জারি ও একত্রীকরণের বিষয়টির দায়িত্ব সরাসরি আল্লাহ তা'আলার। আল্লাহর জারী করা বিধিবিধানের এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ ও পথনির্দেশের বিষয়টি সম্পাদনের জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদিষ্ট হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তিনিই উম্মীদের মধ্য থেকে তাদের একজনকে রাসূলরূপে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করেন, তাদের পবিত্র করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, অথচ ইতোপূর্বে তারা ছিলঘোর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। (সূরা জুমুআ-২) সাহাবায়ে কেরাম সব সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মনোযোগী থাকতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আদেশ প্রদান করতেন, তা পালন করে তারা সন্তুষ্টি অনুভব করতেন। আল্লাহ বলেন, যখন তাঁর (আল্লাহর) আয়াত তাদের কাছে পাঠ করা হয়, তখন সেটা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে (সূরা আনফাল-১২১)।

মদীনায় দু'ধরনের মুসলমান ছিল। এরা ছিল প্রথম দল।। কিছু মুসলমানের নিজস্ব জমি, বাড়ি-ঘর ছিল। যারা অর্থ-সম্পদের মধ্যে অবস্থান করত। এদের বলা হত আনসার। এদের মধ্যে বংশানুক্রমিকভাবে অত্যন্ত কঠোর ঘৃণা বিদ্বেষ ও শত্রুতা চলত। পাশাপাশি অপর দলটির নাম হল মুহাজির। এরা ছিল প্রায় সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এরা কষ্ট করে কোনো উপায়ে নিজেদের দেহ ও ভাগ্য নিয়ে মদীনায় এসেছিল। এদের থাকার কোনো ঠিকানা ছিল না। ক্ষুধা নিবারণের জন্যে কোনো কাজও ছিল না। এদের তেমন কোন সম্পদ ছিল না, যার উপর অর্থনৈতিক জীবনের ভিত্তি স্থাপিত হতে পারে। উপরন্তু আশ্রয়হীন মুহাজিরের সংখ্যাও কম ছিল না। বরং দিন দিন এদের সংখ্যা বেড়েই চলছিল। কেননা ঘোষণা করা হয়েছিল, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যারা ঈমান রাখে, তারা যেন হিজরত করে মদীনায় চলে আসে। মদীনায় তেমন কোনো সম্পদ এবং আয়-উপার্জনের উল্লেখযোগ্য কোনো উপায়-উপকরণও ছিল না। ফলে মদীনায় অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এহেন সঙ্কটময় সময়ে ইসলামের শত্রুরা মদীনাকে অর্থনৈতিকভাবে প্রায় বয়কট করে রাখে। এতে আমদানীর পরিমাণ কমে যায় এবং পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠে।

২য় দলটি হল মদীনার মুশরিক অধিবাসীরা। মুসলমানদের উপর তাদের কোনো প্রতিপত্তি ছিল না। তাদের কিছু লোক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহের মধ্যে ছিল। তারা নিজেদের পৈতৃক দ্বীন পরিবর্তনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনুভব করছিল। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের মনে তেমন কোনো প্রকার শত্রুতা বিদ্যমান ছিল না। এ দলটি অতি দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করে সত্যিকার মুসলমানে পরিণত হয়েছিল। অবশ্য মুশরিকদের মাঝে এমন কিছু লোক ছিল, যারা নিজেদের মনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। কিন্তু মুখোমুখি এসে দাঁড়াবার এবং মুকাবিলা করার তাদের সাহস ছিল না। বরং পরিস্থিতির কারণে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা প্রকাশে বাধ্য ছিল। তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই। বুয়াস যুদ্ধের পর আওস ও খাযরাজ গোত্র তাকে নিজেদের নেতা বানাতে একমত হয়েছিল।

এ দুটি গোত্র পূর্বে অন্য কারো নেতৃত্বের ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হতে পারেনি। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জন্যে তারা মুকুট তৈরী করছিল। যাতে এ মুকুট তার মাথায় পড়িয়ে তাকে বাদশাহ ঘোষণা করা যায়। এভাবে সে মদীনার বাদশাহ হয়েই যাচ্ছিল। এমন সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় উপস্থিত হওয়ার কারণে জনগণের দৃষ্টি তার দিক থেকে ফিরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিবদ্ধ হয়। এ কারণে আবদুল্লাহ বিন উবাই মনে করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তার বাদশাহী মুকুট কেড়ে নিয়েছেন। ফলে সে মনের গভীরে তাঁর প্রতি প্রচণ্ড শত্রুতা পোষণ করত। তা সত্ত্বেও বদর যুদ্ধের পর সে দেখল, পরিস্থিতি তার অনুকূলে নয়। আবার এ অবস্থায় শিরকের উপর অটল থাকলে, সে পার্থিব সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবে। এ কারণে সে দৃশ্যত ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করল, বাস্তবে পর্দার অন্তরালে সে কাফেরই ছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুসলমানদের ক্ষতি করার কোনো সুযোগই সে হাতছাড়া করত না। তার সাথী ছিল সে সকল নেতৃস্থানীয় লোক, যারা তার বাদশাহীর অধীনে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু সেসব সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত হতে হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তারা মদীনার কিছুসংখ্যক সরলপ্রাণ যুবক মুসলমানকে নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত।

তৃতীয় দলটি ছিল মদীনার ইহুদীরা। এরা আশুরী এবং রোমানদের অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে হেজাযে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল হিব্রু। হেজাযে আশ্রয় নেয়ার পর তাদের চালচলন, ভাষা, সভ্যতা সংস্কৃতি সব কিছু আরব রঙে রঞ্জিত হয়েছিল। এমনকি তাদের গোত্রসমূহ এবং গোত্র সদস্যদের নামকরণও আরবী হয়ে গিয়েছিল। আরবদের সাথে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু এতোসব সত্ত্বেও তাদের বংশীয় অহমিকা যথারীতি বহাল ছিল। আরবদের তারা মনে করত খুবই নিকৃষ্ট। তাদের উম্মী বলে গালি দিত। উম্মী বলতে তারা বোঝাতে চাইত আরবরা নির্বোধ, মূর্খ, জংলী, নীচু এবং অদ্যুৎ। তাদের আকীদা এমনই ছিল যে, তারা ভাবত আরবদের ধন-সম্পদ তাদের জন্যে পুরোপুরি বৈধ। যেভাবে ইচ্ছা তারা তা ভোগ করতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'তারা বলে, নিরক্ষরদের ব্যাপারে আমাদের কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই (সূরা আলে ইমরান-৭৫)।

এসব ইহুদীদের মধ্যে তাদের দ্বীনের প্রচার প্রসারের কোনো প্রকার তৎপরতা লক্ষ্য করা যেত না। তারা দ্বীন বলতে বুঝত শুভাশুভ নির্ধারণ, যাদু, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি। এসব কিছুর বদৌলতে তারা নিজেদের আলিম, পণ্ডিত এবং আধ্যাত্মিক নেতা মনে করত। ইহুদীরা ধন-সম্পদ উপার্জনে ছিল দক্ষ। খাদ্যশস্য, খেজুর, মদ এবং পোশাকের ব্যবসা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা খাদ্যশস্য, পোশাক ও মদ আমদানি এবং খেজুর রফতানী করত। ব্যবসায় আরবদের কাছ থেকে তারা দ্বিগুণ, তিন গুণ মুনাফা করত। শুধু তাই নয়, তারা সুদও খেত। তারা আববের শেখ ও সর্দারদের সুদে বিরাট অংকের টাকা ধার দিত। আরব শেখ ও সর্দাররা এ সুদী ঋণের অর্থ খ্যাতি লাভ এবং তাদের প্রশংসাকারী কবিদের জন্যে নিরর্থক ব্যয় করত। ইহুদীরা সুদের উপর অর্থ ধার নেয়ার বিনিময়ে যমীন, শস্য ক্ষেত, বাগ বাগিচা ইত্যাদি বন্ধক রাখত। এতে কয়েক বছরেই ইহুদীরা সেসবের মালিক হয়ে যেত।

ইহুদীরা গুজব, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ এবং ফাসাদ বিশৃংখলার আগুন জ্বালাতে ছিল সিদ্ধহস্ত। তারা প্রতিবেশী গোত্রসমূহের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে শত্রুতার বীজ বপন করত। এক গোত্রকে অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে চরমভাবে উত্তেজিত করে তুলত, সূক্ষ্মভাবে পরস্পরকে লেলিয়ে দিয়ে ইহুদীরা চুপচাপ একপাশে বসে থাকত, আর আরবদের ধ্বংসের দৃশ্য দেখত। মারামারির সময়ও তারা মোটা সুদে অর্থ ধার দিত, যাতে মূলধনের অভাবে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে না যায়। এতে ইহুদীরা দু'ভাবে লাভবান হত। একদিকে তারা নিজেদের ঐক্য সংহতি নিরাপদ রাখত, অন্যদিকে সুদের ব্যবসার বাজারও জমজমাট রাখত। এমনকি সুদের উপর সুদ বা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ হিসাব করে তারা মোটা অংকের অর্থ উপার্জন করত। মদীনায় প্রধান তিনটি ইহুদী গোত্র ছিল। বনু কায়নুকা- ছিল খাযরাজ গোত্রের মিত্র এবং এরা মদীনার ভেতরেই বসবাস করত। বনু নযির ও বনু কোরায়যা- এ দুটি গোত্র ছিল আওস গোত্রের মিত্র। তারা মদীনার শহরতলী এলাকায় বসবাস করত।

এ তিনটি ইহুদী গোত্র দীর্ঘকাল যাবত আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। বুয়াস যুদ্ধে তারা নিজ নিজ মিত্র গোত্রের সাথে যুদ্ধে শরীক হত। ইহুদীরা ইসলামের প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা, আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বংশোদ্ভূত ছিলেন না, যাতে তাদের বংশীয় অহমিকাবোধে ছোট লাগে। অপরদিকে ইসলামের দাওয়াত ছিল এক কল্যাণকর দাওয়াত। যা বিভিন্ন হৃদয়সমূহকে জোড়া লাগাতো। হিংসা বিদ্বেষের আগুন নেভাতো। ইসলাম তার অনুসারীদদের আমানতদায়ী, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং হালাল মাল ভোগ ও ব্যবহারে অভ্যস্ত বানাতো অর্থাৎ ইসলামী শিক্ষা গোত্রসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি সৃষ্টি করত। তাদের এ ভয় কাজ করত যে, ইসলাম এলে ইহুদীদের কল থেকে আরবরা মুক্ত হয়ে যাবে। ফলে তাদের বাণিজ্যিক তৎপরতা হ্রাস পাবে। তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি সু fortified সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত হবে। এমনকি এ ধরনের আশঙ্কাতো করত, যে মুসলমানরা একদিন তাদের হারানো অর্থ, বাগান ও জমি ফিরে চাইবে, যেগুলো ইহুদীরা সুদের বিনিময়ে দখল করেছিল। এ কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আসার সময় থেকেই ইহুদীরা, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি প্রবল শত্রুতা পোষণ করতে থাকে। উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.) থেকে একটি চমৎকার হাদীস বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আমি ছিলাম আমার পিতা ও চাচার কাছে তাদের সন্তানদের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয়। তারা তাদের অন্য সন্তানদের চেয়ে আমাকে বেশি ভালোবাসতেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আসার পর কোবা পল্লীতে বনু আমর ইবনে আউফের মহল্লায় অবতরণ করেন। এ খবর পাওয়ার পর আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব এবং চাচা আবু ইয়াসের খুব সকালে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হাজির হন এবং সূর্য ডোবার সময় ফিরে আসেন। তারা আলোচনায় বলেন, যতদিন বেঁচে থাকি মুহাম্মদের (বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) শত্রুতা করব।

হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম উচ্চস্তরের একজন ইহুদী আলেম ছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বনী নাজ্জার গোত্রের আগমনের খবর পাওয়ার পরেই আবদুল্লাহ বিন সালাম (রা.) তাঁর কাছে হাজির হন এবং এমন কিছু প্রশ্ন করেন, যেসব প্রশ্নের উত্তর একজন নবী ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, ইহুদীরা অন্যের নামে অপবাদ দিতে সিদ্ধহস্ত। যদি তাদের কারো কাছে আপনি আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করেন, তাহলে তারা যা বলবে, আমার ইসলাম গ্রহণের খবর শোনার পর তার বিপরীত বলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে কয়েকজন ইহুদীকে ডেকে পাঠালে তারা আসে। তখন আবদুল্লাহ বিন সালাম (রা.) ঘরের ভেতর লুকিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগত ইহুদীদের জিজ্ঞেস করেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যেকার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর পুত্র। আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে ভালো মানুষ এবং সবচেয়ে ভালো মানুষের সন্তান। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তির সন্তান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, আচ্ছা বলো তো, যদি শোনো আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মুসলমান হয়েছে? ইহুদীরা দু'বার অথবা তিন বার বলল, আল্লাহ তা'আলা তাকে এ থেকে হিফাযত করুন। এরপরই হযরত আবদুল্লাহ বেরিয়ে এসে বলেন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল। একথা শোনার সাথে সাথে ইহুদীরা বলল, এ হচ্ছে আমাদের মধ্যেকার সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তি এবং মন্দ ব্যক্তির সন্তান। সে সময় থেকেই ইহুদীরা তার সম্পর্কে আরো নানান রকম খারাপ কথা বলতে শুরু করে। (বুখারী)।

মদীনার বাইরে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল কুরাইশরা। তারা মক্কায় মুসলমানদের দশ বছর সীমাহীন কষ্ট দিয়েছিল। চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, নির্যাতন ও অত্যাচারে তারা মুসলমানদের জর্জরিত করেছিল। মুসলমানরা মদীনায় হিজরত করার পর কুরাইশের লোকেরা তাদের মক্কার বাড়িঘর, জায়গা জমি, ধন-সম্পদ সব অধিকার করে নিয়েছিল। মুসলমান এবং তাদের পরিবার পরিজনকে যাকেই নাগালে পেয়েছে তাকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী সমূলে উৎপাটিত করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করেছে। এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। মুসলমানরা কোনো প্রকারে কষ্টে শিষ্টে পাঁচশ কিলোমিটার দূরবর্তী মদীনায় গিয়ে পৌঁছার পরও কাফিররা তাদের ঘৃণ্য রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যায়। যেহেতু তারা মক্কার হেরেমের অধিবাসী এবং বায়তুল্লাহর প্রতিবেশী ছিল, এ কারণে তারা আরবদের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং পার্থিব কর্তৃত্বের আসীনে সমাসীন ছিল। তারা সে প্রভাব বিস্তার করে আরব উপদ্বীপের মুশরিকদের উত্তেজিত করে। এমনকি মদীনার সাথে প্রায় পুরোপুরি বয়কট করে। ফলে মদীনায় জিনিসপত্রের আমদানী কমে যায়। ওদিকে মদীনায় আশ্রয় নেয়া মুহাজিরদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। প্রকৃতপক্ষে মক্কার কাফের এবং মুসলমানদের এ নতুন আবাসস্থলের মাঝে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

যেভাবে মুসলমানদের বাড়িঘর ও ধন-সম্পদ মক্কার উদ্ধত বিদ্রোহীরা জবরদখল করে নিয়েছিল; সেভাবে মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছিল; মুসলমানদের জীবনযাত্রায় যেভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল; সঙ্গতভাবে মুসলমানদেরও সেরূপ বাধা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অধিকার ছিল। যে যেমন তাকে তেমন প্রতিদান দাও- এ নীতির ভিত্তিতে মক্কার উদ্ধত বিদ্রোহীদের সাথে তাদের অনুরূপ আচরণ মুসলমানদের জন্যে যথার্থ ছিল, যেন তারা মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করার কোনো সুযোগ না পায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর এসব সমস্যার সম্মুখীন হন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নেতাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। যারা অনুগ্রহ, স্নেহ মমতা ও করুণা পাওয়ার উপযুক্ত ছিল; তিনি তাদের অনুগ্রহ করেন, আর যারা কঠোর আচরণ পাওয়ার যোগ্য ছিল তাদের সাথে সে রকম আচরণ করেন। তবে এটা ঠিক, দয়া ও অনুগ্রহের পরিমাণ কঠোরতার চাইতে বেশি ছিল। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ইসলাম এবং মুসলমানদের হাতে এসে পড়ে।

মসজিদে নববী নির্মাণ: প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম পদক্ষেপেই মদীনায় মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মসজিদ নির্মাণের জন্যে তিনি সে জায়গাকেই নির্ধারণ করেছিলেন, যেখানে তাঁর উট গিয়ে বসেছিল। সে জমির মালিক ছিল দুই এতিম বালক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ থেকে নায্য মূল্যে সে জমি ক্রয় করে মসজিদ নির্মাণে কাজ শুরু করেন। নির্মাণ কাজে তিনি নিজেও ইট পাথর বহন করেছিলেন। সে জমিতে মুশরিকদের কয়েকটি পুরাতন কবর ছিল। খেজুর এবং অন্যান্য কয়েকটি গাছও ছিল। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের কবরগুলো খুঁড়ে ফেলেন এবং দেয়ালগুলো সমতল করে দেন। খেজুর এবং অন্যান্য গাছ কেটে কিবলার দিকে লাগিয়ে দেন। সে সময় কিবলা ছিল বায়তুল মাকাদ্দাস। মসজিদের দরজার দু'টি পালা পাথর দিয়ে বানানো হয়। দেয়ালসমূহ কাঁচা ইট এবং কাদা দিয়ে গাঁথা হয়। ছাদের উপর খেজুর শাখা এবং পাতা বিছিয়ে দেয়া হয়। খেজুর গাছের কাণ্ডের খাম্বা বানানো হয় এবং মেঝেতে বালু আর ছোট ছোট কংকর বিছিয়ে দেয়া হয়। তিনটি দরজা লাগানো হয়। কিবলার দিকের দেয়াল থেকে পেছনের দেয়াল পর্যন্ত একশ হাত লম্বা ছিল। প্রস্থ লম্বার সমান অথবা এর চাইতে কিছু কম ছিল। মেঝে বা বুনিয়াদ ছিল প্রায় তিন হাত গভীর।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের পাশে কয়েকটি ঘরও তৈরী করেন। এসব ঘরের দেয়াল কাঁচা ইট, ছাদ খেজুরের ডাল ও পাতা দিয়ে বানান হয়। এসব ছিল প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণীদের বাসগৃহ। এগুলো তৈরী হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) ঘর থেকে এখানে এসে ওঠে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদ নির্মাণ শুধু নামায আদায়ের জন্যেই ছিল না; বরং এটি ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এতে মুসলমানরা ইসলামের শিক্ষা ও হিদায়াতের পাঠ গ্রহণ করতেন (বুখারী)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক সমাজ গঠন করেছিলেন, যেখানে দীর্ঘকালের জাহেলী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও ঘৃণা-বিদ্বেষে জর্জরিত বিভিন্ন গোত্রের মানুষ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে বসবাস করত। এ মসজিদ ছিল এমন একটি কেন্দ্র, যে কেন্দ্র থেকে নবগঠিত রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত এবং বিভিন্ন অভিযান প্রেরিত হত। এছাড়া এ মসজিদের মর্যাদা ছিল একটি সংসদের মত, যেখানে মজলিসে শূরা (পরামর্শ সভা) এবং মজলিসে এন্তেযামিয়া (ব্যবস্থাপনা পরিষদ) এর অধিবেশন বসত। সাথে সাথে এ মসজিদই ছিল এক বিপুল সংখ্যক নিঃস্ব মুহাজিরের আবাসস্থল। যাদের বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না; তারা এ মসজিদে বসবাস করত।

হিজরতের প্রথম থেকেই আযানের প্রচলন হয়। এ আযান ছিল ঊর্ধ্বজগতের সংগীত। যে সঙ্গীতের সুর দিনে পাঁচ বার দিক দিগন্তে গুঞ্জরিত হত এবং বিশ্বজগৎ কেঁপে ওঠত। এ প্রসংগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়দ ইবনে আবদে রাব্বিহী (রা.)-এর স্বপ্নের ঘটনা প্রসিদ্ধ। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববী নির্মাণের মাধ্যমে যেমন পারস্পরিক জোর ও মিল মহব্বতের একটি কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন, একইভাবে তিনি মানব ইতিহাসের এক সমুজ্জ্বল কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেন, যাতে মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয়। ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের মূল কথা ছিল, তারা একে অন্যের দুঃখে দুখী এবং সুখে সুখী হবেন। ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের উদ্দেশ্য ছিল, জাহেলী যুগের অহমিকার পরিবর্তন ঘটানো। যা কিছু অহমিকা ও মর্যাদাবোধ হবে তা যেন ইসলামের জন্যেই হয়।
বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার পার্থক্য যেন মিটে যায়। উঁচু নীচুর মানদণ্ড যেন মানবতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতেই হয়।

বিশ্বনবীর মহান প্রশিক্ষণঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে শুধু অন্তসারশূন্য শব্দের আবরণে আচ্ছাদিত করেননি; বরং এমন এক অঙ্গীকার সাব্যস্ত করেছিলেন, যা রক্ত এবং সম্পদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এটা শুধু মুখে মুখে উচ্চারিত নিষ্ফল সালাম ও মুবারকবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের সাথে আত্মত্যাগ, পরদুঃখকাতরতা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং প্রেরণার সংমিশ্রিত ছিল।

এ কারণে এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধন মদীনার নতুন সমাজকে দুর্লভ ও সমুজ্জ্বল কৃতিত্বে পরিপূর্ণ করেছিল। বুখারী শরীফে এর একটি উদাহরণ রয়েছে, মুহাজিররা মদীনায় আগমনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) এবং হযরত সা'দ ইবনে রবীর (রা.) মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছিলেন। হযরত সা'দ ইবনে রবী (রা.) হযরত আবদুর রহমানকে (রা.) বলেন, আনসারদের মধ্যে আমি সবচেয়ে ধনী, আপনি আমার ধন-সম্পদের অর্ধেক গ্রহণ করুন। আমার দু'জন স্ত্রী রয়েছে, আপনি ওদের দেখুন, যাকে আপনার বেশি পছন্দ হয় আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর আপনি তাকে বিবাহ করুন। হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আপনার পরিবার পরিজন এবং ধন-সম্পদে বরকত দান করুন। আপনাদের এখানে বাজার কোথায়? তাকে বনু কায়নুকার বাজারের কথা বলা হল। তিনি বাজার থেকে ফিরে আসার পর তাঁর কাছে কিছু পনির এবং ঘি ছিল। এরপর প্রতিদিন তিনি নিয়মিত বাজারে যাওয়া আসা করতেন। একদিন তাঁর গায়ে হলুদের চিহ্ন দেখা গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কারণ জানতে চাইলে হযরত আবদুর রহমান (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি বিবাহ করেছি।

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক রেওয়াতে রয়েছে, আনসাররা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবেদন জানালেন, আপনি আমাদের এবং মুহাজির ভাইদের মধ্যে আমাদের মালিকানাধীন খেজুর বাগানগুলো বণ্টন করে দিন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, না। তখন আনসাররা বলেন, তাহলে মুহাজির ভাইয়েরা আমাদের বাগানে কাজ করুক আমরা উৎপাদিত ফল থেকে তাদের অংশ দেব। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঠিক আছে। আমি তোমাদের কথা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি (বুখারী)। এ থেকে বুঝা যায়, আনসাররা কিভাবে মুহাজিরদের আপন করে নিয়েছিলেন। এতে মুহাজিরদের প্রতি আনসারদের ভালোবাসা, সরল-সহজ আন্তরিকতা এবং আত্মত্যাগের পরিচয় পাওয়া যায়। মুহাজিররা আনসারদের এ দয়া ও মমত্ববোধের যথেষ্ট কদর করতেন। তারা আনসারদের দয়া ও অনুগ্রহ থেকে অবৈধ কোনো সুবিধা ভোগ করেননি। বরং নিজেদের ভেংগে পড়া অর্থনীতির কোমর সোজা করতে যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই গ্রহণ করেছিলেন। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যেকার এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এক অভিনব কর্মকৌশল, অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বিচক্ষণতার প্রমাণ।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের উল্লিখিত ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কের মত আরেকটি অঙ্গীকার করান। যার মাধ্যমে জাহেলী যুগের সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও গোত্রীয় বিরোধের বুনিয়াদ ধসিয়ে দেয়া যায় এবং যেখানে জাহেলী যুগের রসম-রেওয়াজের জন্যে কোনো অবকাশই রাখা হয়নি। বর্ণিত অঙ্গীকারের দফাসমূহ ছিল সর্বকালীন সময়ের জন্য যথার্থ। এ অঙ্গীকার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরাইশ, ইয়াসরেবী (আনসার), তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে যুক্ত হয়ে জিহাদে অংশ গ্রহণকারী মুমিন মুসলমানদের মধ্যে সম্পাদিত হচ্ছে-
১। এরা সবাই অন্য সকল মানুষ থেকে একটি ভিন্ন উম্মত।
২। কুরাইশ মুহাজিররা তাদের পূর্বতন অবস্থা অনুযায়ী পরস্পরে রক্তপণ আদায় করবে। মুমিনদের মধ্যে প্রচলিত পন্থায় সুবিচারমূলকভাবে কয়েদীদের ফিদিয়া (মুক্তিপণ) দেবে। আনসারদের সকল গোত্র নিজেদের পূর্বতন রীতি অনুযায়ী পরস্পরে রক্তপণ আদায় করবে। তাদের সকল দল প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এবং ঈমানদাররা নিজ কয়েদীদের ফিদিয়া আদায় করবে।
৩। ঈমানদাররা নিজেদের নিঃসম্বল কাউকে ফিদিয়া বা রক্তপণের ব্যাপারে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দান ও উপঢৌকন থেকে বঞ্চিত করবে না।
৪। যারা তাদের উপর বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যনিষ্ঠ মুসলমান তাদের বিরোধিতা করবে। অথবা ঈমানদারদের মধ্যে যারা যুলুম-অত্যাচার, পাপ দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল সত্যনিষ্ঠ মুমিন মুসলমান তাদের বিরোধিতা করবে।
৫। মুমিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী তাদের যে কারো সন্তান হোক, এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না।
৬। কোনো মুমিন আরেক মুমিনকে কোনো কাফিরের হত্যার বদলে হত্যা করবে না।
৭। কোনো মুমিন অন্য মুমিনের বিরুদ্ধে কাফিরকে সাহায্য সহায়তা করবে না।
৮। আল্লাহর যিম্মা (অংগীকার) হবে এক। একজন সাধারণ মানুষের দেয়া অঙ্গীকারও সকল মুসলমানের উপর প্রযোজ্য হবে।
৯। যে সকল ইহুদী আমাদের অনুগত হবে, তাদের সাহায্য করা হবে। তারা অন্যান্য মুসলমানের মতোই ব্যবহার পাবে। তাদের উপর কোনো প্রকার যুলুম-অত্যাচার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করা হবে না।
১০। মুসলমানদের সন্ধি সমঝোতা হবে অভিন্ন। কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে বাদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদে অন্যের সাথে আপস করবে না। বরং সকলেই সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তিতে চুক্তি বা অংগীকারে আবদ্ধ হবে।
১১। আল্লাহর পথে জিহাদে প্রবাহিত রক্তের ক্ষেত্রে সকল মুসলমানই অভিন্ন বিবেচিত হবে।
১২। কোনো মুসলমানই কুরাইশ মুশরিকদের কাউকে জান মালের নিরাপত্তা বা আশ্রয় দিতে পারবে না। আর তার নিরাপত্তার জন্যে কোনো মুমিনের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।
১৩। কেউ যদি কোনো মুমিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে হত্যাকারী যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস নেয়া যাবে না।
১৪। এক্ষেত্রে সকল মুমিন, যালিমের বা হত্যাকারীর বিরোধিতা করবে। অন্যদের তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ব্যতীত অন্য কিছু হালাল হবে না।
১৫। কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বেদয়াতীকে সাহায্য করা এবং তাকে আশ্রয় দেয়া মুমিনের জন্যে বৈধ হবে না। যদি কেউ তাকে আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার উপর আল্লাহর গযব ও লা'নত বর্ষিত হবে। তার ফরয নফল কোনো ইবাদাতই কবুল হবে না।
১৬। তোমাদের মধ্যে যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অনুযায়ী মীমাংসা করবে। (ইবনে হিশাম)

এভাবেই দূরদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নতুন সমাজের ভিত শক্তিশালী করে তোলেন। তবে সমাজের বাহ্যিক দিক প্রকৃতপক্ষে তার অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের প্রতিবিম্ব ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যের বদৌলতে সে সমাজ থেকে সাহাবায়ে কেরামের মতো সম্মানিত ব্যক্তিত্ব আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান, আত্মশুদ্ধি, উন্নত স্বভাব চরিত্র গঠনে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাতেন। তাদের ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, সম্মান মর্যাদা এবং ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম কানুন শেখাতেন। একজন সাহাবী, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন ইসলাম উৎকৃষ্ট অর্থাৎ ইসলামের কোন আমল উত্তম? বিশ্বনবী বলেছিলেন, তুমি অন্যদের খাবার দাও এবং চেনা অচেনা সবাইকে সালাম করো (বুখারী)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার পর আমি তাঁর কাছে হাযির হই। তাঁর পবিত্র চেহারা দেখেই আমি ভালোভাবে বুঝে ফেলি, এ চেহারা কোন মিথ্যাবাদী মানুষের নয়। এরপর তিনি প্রথম কথা এটাই বলেছিলেন, হে লোকসকল, সালামের প্রসার ঘটাতে থাক, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ, রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নামায পড়, জান্নাতে নিরাপদে প্রবেশ করবে (তিরমিযী; ইবনে মাজা)। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার দুর্বৃত্তপনা এবং ধ্বংসকারিতা থেকে নিরাপদ নয় (বুখারী)। সে ব্যক্তিই মুসলমান, যার মুখ এবং হাত থেকে অন্য মুসলমানরা নিরাপদ থাকে (বুখারী)। তোমাদের মধ্যেকার কোন ব্যক্তি ততোক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্যে পছন্দ করা জিনিস নিজের ভাইয়ের জন্যে পছন্দ না করবে (বুখারী)। সকল মুমিন একজন মানুষের মত। যদি তার চোখে ব্যথা হয়, তবে সারা দেহে সে কষ্ট অনুভূত হয়। যদি মাথায় ব্যথা হয়, তবে সারা দেহে সে ব্যথার কষ্ট অনুভূত হয় (মুসলিম)।

বিশ্বনবী ঘোষণা করেন, মুমিন, মুমিনের জন্যে ইমারতস্বরূপ। যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তি যোগায় (বুখারী, মুসলিম)। নিজেদের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, শত্রুতা করো না, একে অন্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখো না। প্রত্যেকে আল্লাহর বান্দা এবং ভাই ভাই হয়ে থাক। কোনো মুসলমানের জন্যে নিজের ভাইকে তিন দিনের বেশি ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয় (বুখারী)।

মুসলমান মুসলমানের ভাই। একজন মুসলমান যেন অন্য মুসলমানের উপর যুলুম না করে এবং তাকে শত্রুর হাতে তুলে না দেয়। যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দুঃখ দুশ্চিন্তা দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির দুঃখসমূহকে দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন (বুখারী, মুসলিম)। তোমরা যমীনের অধিবাসীদের উপর দয়া কর, আকাশের মালিক তোমাদের উপর দয়া করবেন (তিরমিযী, আবু দাউদ)। সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায়, অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে (মিশকাত)। মুসলমানকে গালাগাল দেয়া ফাসেকের কাজ। মুসলমানের সাথে মারামারি কাটাকাটি করা কুফরী (বুখারী)। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে ফেলা সদকা এবং এ কাজ ঈমানের শাখাসমূহের একটি বলে গণ্য হবে (বুখারী, মুসলিম)।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকা ও দান খয়রাতের উপদেশ দিতেন। তিনি সদাকা ও দান খয়রাতের এমন উত্তম ফযীলত বর্ণনা করতেন, যাতে আপনা থেকেই সেদিকে মন আকৃষ্ট হত। 'তিনি বলতেন, সদাকা গুনাহসমূহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয় (তিরমিযী; ইবনে মাজা)। যে মুসলমান কোনো নগ্ন মুসলমানকে পোশাক পরিধান করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ পোশাক পরিধান করাবেন। যে মুসলমান কোন ক্ষুধার্ত মুসলমানকে আহার করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে ফল খাওয়াবেন। যে মুসলমান কোন পিপাসিত মুসলমানকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে ছিপি আঁটা শরাবান তহুরা পান করাবেন (তিরমিযী; আবু দাউদ)। খেজুরের এক টুকরো দান করে হলেও আগুন থেকে আত্মরক্ষা কর। যদি সেটুকুর সামর্থ্যও না থাকে, তবে ভালো কথার মাধ্যমে নিজেকে আগুন থেকে আত্মরক্ষা কর (বুখারী)।

একই সাথে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিক্ষাবৃত্তি থেকে দূরে থাকার জন্যে উপদেশ দিতেন। তিনি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং অল্পে তুষ্টির ফযীলত শোনাতেন। ভিক্ষাবৃত্তিকে ভিক্ষুকের চেহারায় আঁচড় এবং খুজলি পাঁচড়ার যখম বলে আখ্যায়িত করতেন (আবু দাউদ, তিরমিযী)। তবে এ থেকে তাদেরকে ব্যতিক্রম বলেছেন, যারা একান্ত নিরুপায় হয়েই ভিক্ষা করে। তিনি কোন প্রকার ইবাদতের কি ফযীলত এবং আল্লাহর কাছে সেসব ইবাদতের কি রকম সওয়াব রয়েছে তাও বলতেন। আকাশ থেকে তাঁর কাছে যে ওহী আসত, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মুসলমানদের সে ওহীর সাথে যুক্ত করে রাখতেন, মুসলমানদের তা পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে শোনার পর মুসলমানরা তাঁকে পড়ে শোনাত। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে যেন বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, চিন্তা, গবেষণা, দাওয়াত ও তাবলীগের নবীসুলভ দায়িত্বানুভূতি ও সচেতনতাবোধ জাগ্রত হয়।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের অন্তর্নিহিত শক্তি সমুন্নত করেছেন। তাদের আল্লাহর দেয়া সামর্থ্য ও যোগ্যতাকে উন্নত করেছেন। তাদের উন্নত আচার আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মালিক বানিয়েছেন, যেন মানব ইতিহাসে আম্বিয়ায়ে কেরামের পর তারা মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যে উচ্চতর নমুনা হতে পারেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি আদর্শ অনুসরণ করতে চায়, সে যেন মৃত ব্যক্তির (সাহাবাদের) আদর্শ অনুসরণ করে। কেননা জীবিত লোকদের ব্যাপারে ফেতনার আশঙ্কা রয়েছে। সাহাবারা ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথী, উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, পুণ্যপ্রাণ, গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং সর্বাধিক নিঃসংকোচ। আল্লাহ এ সকল মানুষকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বন্ধু ও সাথী এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে মনোনীত করেছিলেন। কাজেই তাদের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানা, তাদের পদাংক অনুসরণ করা জরুরী। যতোটা সম্ভব তাদের চরিত্র মাধুর্য এবং জীবনচরিত আত্মস্থ করা উচিত। কেননা তারা হিদায়াতের সহজ, সোজা ও সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন (মিশকাত)।

বিশ্বনবীর মদীনায় শান্তির মহাদ্যোগ:
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীণভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও উন্নত বৈশিষ্ট্যের ছিলেন। আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা, সম্মান, মর্যাদা, উত্তম স্বভাব চরিত্র ও সুন্দর আমলের বৈশিষ্ট্যের উন্নত মহামানব ছিলেন। যাতে মন আপনা আপনি তাঁর দিকে আকৃষ্ট হয়, জীবন উৎসর্গ করার ইচ্ছা জাগে। ফলে তাঁর পবিত্র মুখনিসৃত কথা পালন করতে সাহাবারা ছুটে যেতেন। হিদায়াত ও পথনির্দেশের যেসব কথা তিনি বলতেন, সেকথা যথাযথভাবে পালন করতে সাহাবাদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। এ ধরনের প্রচেষ্টার কল্যাণেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এমন একটি সমাজ গঠনে সক্ষম হন, যা ইতিহাসের সর্বাধিক বৈশিষ্ট্যময় এবং মর্যাদাপূর্ণ সমাজ ছিল। তিনি সে সমাজের সমস্যাসমূহের এমন চিত্তকর্ষক সমাধান বের করেন, মানবতা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত কালের চাকায় পিষ্ট হয়ে এবং ঘোর অন্ধকারে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে এরপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে নতুন সমাজের উপাদানসমূহে এমন উন্নত শিক্ষা ও আদর্শের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে, যা পুরো ইতিহাসের ধারাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। যা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। হিজরতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের মধ্যে আকীদা-বিশ্বাস, রাজনীতি, একতা, শৃংখলা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে অমুসলিমদের সাথে নিজের সম্পর্ক সুবিন্যস্তকরণের উদ্যোগ নেন। তিনি চাচ্ছিলেন, সকল মানুষ সুখ শান্তি ও নিরাপত্তার সৌভাগ্য ও বরকতে পূর্ণ হোক। সাথে সাথে মদীনা এবং আশপাশের এলাকায় শৃংখলা এবং সুব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত হোক। তিনি উদারতা ও মানসিক প্রশস্ততার এমন নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করলেন, যা গোঁড়ামি, বাড়াবাড়ি এবং চরম পন্থায় ভরা তখনকার বিশ্বে কোনো সমাজ চিন্তাও করে নি।

মদীনার সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী ছিল ইহুদীরা। তারা পর্দার আড়ালে মুসলমানদের সাথে শত্রুতা করত। অথচ তারা বিরোধিতা ও ঝগড়াঝাটির প্রকাশ ঘটাত না। এ কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে একটি চুক্তিতে উপনীত হন। সে চুক্তিতে তাদের দ্বীন, ধর্ম পালন এবং জান মাল রক্ষার নিরংকুশ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। ইহুদীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির দফাসমূহ ছিল শান্তিপূর্ণ ও সহ-অবস্থানের মাইলফলকস্বরূপ।
১। বনু আওফের ইহুদীরা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়ে এ উম্মত হিসেবে বিবেচিত হবে। ইহুদী ও মুসলমান নিজ নিজ দ্বীনের উপর আমল করবে। স্বয়ং তাদের গোলাম এবং সংশ্লিষ্টদেরও এ অধিকার থাকবে। বনু আওফ ছাড়া অন্য ইহুদীরাও এ রকমের অধিকার ভোগ করবে।
২। ইহূদী এবং মুসলমানরা নিজ নিজ ব্যয়ের জন্যে দায়ী হবে। তাদের নির্বাসিত করা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা অথবা ঝগড়ার রাজনীতির পন্থা অবলম্বন করা যাবে না।
৩। যে কোনো শক্তি এ চুক্তির আওতাভুক্ত কোনো দলের সাথে যুদ্ধ করলে সবাই সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ আক্রান্ত দলকে সাহায্য সহযোগিতা করবে।
৪। এ চুক্তি অংশীদারদের পরস্পরের সম্পর্ক, কল্যাণ কামনা, কল্যাণ চিন্তা ও পরস্পরের উপকার সাধনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; অন্যায়ের উপর নয়।
৫। কোনো ব্যক্তি তার মিত্রের কারণে অপরাধী বিবেচিত হবে না।
৬। মযলুমকে সাহায্য করা হবে।
৭। যতোদিন যাবত যুদ্ধ চলতে থাকবে, ততোদিন ইহুদীরাও মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।
৮। এ চুক্তি অংশীদারদের সকলের জন্যে মদীনায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হত্যা ও রক্তপাত নিষিদ্ধ থাকবে।
৯। এ চুক্তি অন্তর্ভুক্তদের মধ্যে কোনো নতুন সমস্যা দেখা দিলে বা ঝগড়া-বিবাদ হলে, আল্লাহর আইন অনুযায়ী রাসূল তা সমাধান করবেন এবং ইহুদীদের তার মীমাংসা করবেন।
১০। কুরাইশ এবং তাদের সাহায্যকারীদের আশ্রয় প্রদান করা হবে না।
১১। ইয়াসরেবের (মদীনার) উপর কেউ হামলা করলে সে হামলা মুকাবিলায় সবাই পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। সকল পক্ষ নিজ নিজ অঞ্চলে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করবে।
১২। এ চুক্তি কোনো অত্যাচারী বা অপরাধীর জন্যে আড়াল হবে না (ইবনে হিশাম)।

এ চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর মদীনা এবং তার আশেপাশের এলাকা একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সে রাষ্ট্রের রাজধানী মনোনীত হয় মদীনা। রাসূল ছিলেন সে রাষ্ট্রের মহানায়ক। এর মূল কর্তৃত্ব ছিল মুসলমানদের হাতে। এভাবেই বাস্তবে মদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানীতে পরিণত হয়। শান্তি ও নিরাপত্তার বৃত্ত আরো সম্প্রসারিত করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তী সময়ে অন্যান্য গোত্রের সাথেও এ রকম চুক্তি করেন।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ও পরিস্থিতি

📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র ও পরিস্থিতি


মুসলমানরা হিজরত শুরু করলে কাফিররা তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। মুসলমানরা কাফিরদের কবল থেকে বেরিয়ে গেছে এবং মদীনায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, এটা দেখে কাফিরদের ক্রোধ আরো বেড়ে গিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনও খোলাখুলি মুশরিক ছিল। মদীনায় সে ছিল আনসারদের নেতা। সে সময় মদীনায় আবদুল্লাহর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। কেননা, আনসাররা তার নেতৃত্বের উপর একমত হয়েছিল। এমনকি সে সময় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি মদীনায় না যেতেন, তবে মদীনাবাসী তাকে তাদের রাজা বা নেতা হিসেবে গ্রহণ করত। মক্কার পৌত্তলিকরা তাদের হুমকিপূর্ণ চিঠিতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে লিখেছিল, আপনারা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়েছেন, তাই আমরা আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, হয়ত আপনারা তার সাথে লড়াই করুন অথবা তাকে মদীনা থেকে বের করে দিন। যদি না করেন তবে আমরা সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনাদের যোদ্ধা পুরুষদের সবাইকে হত্যা করব এবং আপনাদের মহিলাদের সম্মান বিনষ্ট করব (আবু দাউদ)। এ চিঠি পাওয়ার পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মক্কার মুশরিকদের নির্দেশ পালনের জন্যে প্রস্তুত হন। তার মনে আগে থেকেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা বিদ্বেষ ছিল। কেননা তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তার কাছ থেকে মদীনার রাজমুকুট কেড়ে নিয়েছেন। মক্কার মুশরিকদের চিঠি পাওয়ার পর পরই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার মূর্তিপূজার সহযোগীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হন। এ খবর পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহকে বলেন, কুরাইশদের হুমকিতে তোমরা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছ মনে হচ্ছে। শোনো, তোমরা নিজেরা নিজেদের যতো ক্ষতি করতে উদ্যত হয়েছ, মক্কার কুরাইশরা তার চেয়ে তোমাদের বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা কি নিজেদের সন্তান এবং ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করতে চাও? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এ কথা শোনার পর যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত আবদুল্লাহর সহযোগীরা ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায় (আবু দাউদ)।

সমর্থক সহযোগীরা ছত্র ভঙ্গ হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তখনকার মত যুদ্ধ থেকে বিরত হয়। পর্দার অন্তরালে কুরাইশদের সাথে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এ দুষ্ট ও দুর্বৃত্ত মুসলমান ও মুশরিকদের মাঝে অনিষ্ট, ফাসাদ, বিশৃংখলা, সংঘাত সৃষ্টির কোনো সুযোগই হাতছাড়া করত না। উপরন্তু মুসলমানদের বিরোধিতায় শক্তি অর্জনের জন্যে ইহূদীদের সাথেও ঘোর যোগাযোগ রক্ষা করত। যেন প্রয়োজনের সময় ইহুদীরা তাকে সাহায্য করে। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার কৌশলে অশান্তি ও বিশৃংখলার আগুন নির্বাপিত করতেন (বুখারী)। একবার হযরত সা'দ ইবনে মা'য়ায (রা.) ওমরা পালনের জন্যে মক্কায় গিয়ে উমাইয়া ইবনে খালফের মেহমান হন। তিনি উমাইয়াকে বলেন, আমি একটু নিরিবিলি সময়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করতে চাই। উমাইয়া ভর দুপুরে হযরত সা'দকে নিয়ে বের হলে আবু জাহলের সাথে দেখা হয়। সে উমাইয়াকে বলল, আবু সাফওয়ান, তোমার সঙ্গে আসা এ লোকটির পরিচয় কি? উমাইয়া জবাব দেয়, ইনি হচ্ছেন সা'দ ইবনে মা'য়ায। আবু জাহেল হযরত সা'দকে সম্বোধন করে বলল, তুমি দেখছি বড়ো নিবিষ্ট মনে তাওয়াফ করছ। অথচ তোমরা বেদ্বীনদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছ। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছাও রাখ। খোদার কসম, তুমি যদি আবু সাফওয়ানের মেহমান না হতে, তবে তোমাকে নিরাপদে মদীনায় ফিরে যেতে দেয়া হত না। একথা শুনে হযরত সা'দ (রা.) উচ্চৈঃস্বরে বলেন, শোন, তুমি যদি আমাকে তাওয়াফ থেকে বিরত রাখ, তবে আমি তোমাদের বাণিজ্য কাফেলা মদীনার কাছ দিয়ে যেতে দেব না, সেটা কিন্তু তোমার জন্যে আমার চেয়ে গুরুতর ব্যাপার হবে (বুখারী)। এদিকে কুরাইশরা মুসলমানদের খবর পাঠালেন, তোমরা মনে করো না, মক্কা থেকে গিয়ে নিরাপদে থাকবে; আমরা ইয়াসরেব পৌঁছে তোমাদের সর্বনাশ করে ছাড়ব। (রাহমাতুললিল আলামীন)।

এটা শুধু হুমকি ছিল না; বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্তিশালী সূত্রে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র এবং অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত হন। ফলে তিনি কখনও কখনও সারারাত জেগে কাটাতেন। আবার কখনও কখনও সাহাবায়ে কেরামের প্রহরাধীনে রাত যাপন করতেন। পাহারার ব্যবস্থা বিশেষ কয়েকটি রাতের জন্যে নির্দিষ্ট ছিল না; বরং এটা অব্যাহত স্থায়ী ব্যবস্থা ছিল। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাত্রিকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে পাহারার ব্যবস্থা করা হত। অতপর পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়, 'আল্লাহ তা'আলা তোমাকে মানুষদের থেকে হিফাযত রাখবেন।' এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কামরা বা ঘর থেকে মাথা বের করে বলেন, হে লোকেরা তোমরা ফিরে যাও, আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিরাপদ করে দিয়েছেন (তিরমিযী)। নিরাপত্তাহীনতার এ শঙ্কা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সকল মুসলমানের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য ছিল। হযরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীরা মদীনায় আসার পর আনসাররা তাদের আশ্রয় প্রদান করেন। মদীনার আনসাররা অস্ত্র ছাড়া রাত যাপন করতেন না এবং অস্ত্র ছাড়া ভোর করতেন না।

এসব শংকাজনক পরিস্থিতি মদীনার মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্যে ছিল বিশেষ হুমকি ও বিরাট চ্যালেঞ্জস্বরূপ। যা থেকে সুস্পষ্ট হচ্ছিল, কুরাইশরা হঠকারিতা, দুষ্কৃতি থেকে বিরত হবার নয়। তখন আল্লাহ্‌ মুসলমানদের যুদ্ধ করার অনুমতি দেন। তবে এ যুদ্ধকে ফরয বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। এ সময় আল্লাহ্‌ কুরআনের আয়াত নাযিল করেন, যাদের সাথে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদেরও যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করা যাচ্ছে, কেননা তারা মযলুম, নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তা'আলা তাদের সাহায্য করতে সক্ষম। এ আয়াতের সাথে আরো কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়। সে সকল আয়াতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ করার এ অনুমতি নিছক যুদ্ধের জন্যে নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাতিল বা মিথ্যার মূল উৎপাটন এবং আল্লাহর নিদর্শনসমূহ প্রতিষ্ঠা। যেমন আল্লাহ্‌ পাক এরশাদ করেন 'আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে; সকল কাজের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারে (সূরা হজ্জ)। এ অনুমতি হিজরতের পর মদীনায় নাযিল হয়েছিল, তবে নাযিলের সঠিক সময় নির্ধারণ করা কঠিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ সীমানা বিস্তৃত করার জন্যে দু'টি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। (১) যেসব গোত্র মক্কা থেকে সিরিয়াগামী বাণিজ্য পথের আশেপাশে অথবা সে পথ থেকে মদীনার মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাস করছে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করা। (২) সে পথে টহলদানকারী কাফেলা প্রেরণ করা।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামরিক অভিযান শুরুর আগে জুহায়না গোত্রের সাথেও ইহুদীদের অনুরূপ একটি বন্ধুত্ব, সহায়তা দান এবং অনাক্রমণ চুক্তি করেন। এ গোত্র মদীনা থেকে ৪৫ কিঃ মিঃ দূরে বাস করত। এছাড়া বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো কয়েকটি সহগোত্রীতার চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছারিয়‍্যা ও গাযওয়া (যুদ্ধ ও অভিযান) সম্পর্কিত। যুদ্ধের অনুমতি প্রদানের পর বর্ণিত পরিকল্পনাদ্বয় বাস্তবায়নের জন্যে কার্যত মুসলমানদের সেনা অভিযান শুরু হয়। সেনা দল নৈশ টহল দিতে থাকে। এর উদ্দেশ্য ছিল মদীনার আশেপাশের রাস্তায় সাধারণভাবে এবং মক্কার আশেপাশের রাস্তায় বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, একই সাথে সেসব রাস্তার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রসমূহের সাথে চুক্তি সম্পাদন করা এবং ইয়াসরেবের মুশরিক, ইহুদী ও আশেপাশের বেদুঈনদের মনে করিয়ে দেয়া যে, মুসলমানরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা অতীতের দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা কাটিয়ে ওঠেছে। উপরন্তু এর মাধ্যমে কুরাইশদের অযথা ক্রোধ এবং আচরণের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে ভয় দেখানো যে, নির্বুদ্ধিতার ফলে তারা ধসে যেতে চলেছে। এতে তাদের হুঁশ আসবে এবং তাদের অর্থনীতি ও জীবনোপকরণ হুমকির সম্মুখীন দেখে সন্ধি-সমঝোতার প্রতি ঝুঁকবে। আর মুসলমানদের ঘরে প্রবেশ করে, তাদের নিঃশেষ করার যে সংকল্প পোষণ করছে; আল্লাহর পথে যে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করাচ্ছে; মক্কায় দুর্বল মুসলমানদের উপর যে নির্যাতন করছে; সেসব থেকে বিরত হবে। ফলে জাযিরাতুল আরবে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ মুসলমানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে করতে পারবে। ফলশ্রুতিতে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ প্রশস্ত হবে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 খায়বারের যুদ্ধ

📄 খায়বারের যুদ্ধ


সিরিয়া প্রান্তরের এক বিশাল শ্যামল ভূখ ের নাম খায়বার। ছোট বড় বহু দুর্গ দ্বারা এ স্থানটি সুরক্ষিত ছিল। পূর্ব হতেই এখানে ইহুদীরা বসতি স্থাপন করেছিল। মদীনার বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রদ্বয় এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। বনু কাইনুকা ও বনু নযীর গোত্রের ইহুদীরা খায়বরে তাদের জাতি ভাইদের সাথে যোগ দেয়ার পর, তাদের দুষ্ট ও কুচক্রি মনোভাব অরো পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিরাট ও ব্যাপকভাবে مسلمانوں বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের মনস্থ করল। সমস্ত আয়োজন ঠিক হলে, ইহুদীরা ছোট খাট কয়েকটি আক্রমণ দ্বারা मुसलमानोंকে উত্তেজিত করল। ইহুদীদের এ চক্রান্তের গোপন খবর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেড়ে অনতিবিলম্বে ১৪শ কিংবা ১৬শ মুসলিম সৈন্য বাহিনী নিয়ে খায়বারের দিকে রওয়ানা হন।

মদীনা হতে খায়বার প্রায় একশত মাইল (তিন দিনের পথ) দূরে অবস্থিত। ৭ম হিজরীর মহররম মাসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত দ্রুত বেগে সৈন্য চালনা করেন যে, ইহুদীরা কোন পূর্বাভাসই পেল না। তিন দিনের এ পথ অতিক্রম করে হঠাৎ একদিন খুব ভোরে ইহুদীদের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত দুর্গে এসে পৌঁছেন। কৃষকরা মাঠে এসে দেখতে পেল যে, সম্মুখে তাদের বিরাট মুসলিম সেনাদল। ভয়ে তারা দৌঁড়ে গিয়ে নগরবাসীকে এ সংবাদ দিল। ইহুদীরা হতভম্ব হয়ে গেল। তখন বনু গাতফান ও অন্যান্য গোত্রের সহযোগিতা লাভের আর অবসর রইল না। তখন তাদের নেতা সালাম বিন মিসকামের সাথে পরামর্শ করে তাদের ছয়টি দুর্গের মধ্যে 'ওয়াতি' ও 'সামেল' নামক দুর্গে তাদের ধন সম্পদ ও মেয়েদের সুরক্ষিত করল। তাদের ধনাগার ছিল 'নায়িম' নামক দুর্গে। সৈন্য বাহিনী থাকত নাতীত নামক দুর্গে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নাতীত বা নায়িম দুর্গ আক্রমণ করেন। পঞ্চাশজন مسلمان এতে আহত হন। আর ইহুহীদের নেতা সালাম নিহত হলে তার স্থলাভিসিক্ত হন হারিস বিন যয়নাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ দুর্গ مسلمانوں অধিকারে আসে। আরো কয়েকটি দুর্গ অধিকারে আসার পর, মুসলিম বাহিনী বিখ্যাত দুর্গ 'কানুস' এর সম্মুখীন হয়। মুসলমানরা এ দুর্গ দখল করতে পারছিল না দেখে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিন হযরত আবু বকর (রা.) কে এবং দ্বিতীয় দিন হযরত ওমর (রা.) কে সেনাপতি করে পাঠান। এ দু'দিনের আক্রমণে শত্রুরা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুর্গের পতন হয়নি। তৃতীয় দিন আল্লাহর সিংহ হযরত আলীকে (রা.) ইসলামের পতাকা দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই নাও ইসলামের পতাকা এবং যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের বিজয়ী করেন। মুসলমানরা হযরত আলীর নেতৃত্বে প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ করলে কানুস দুর্গের পতন হয়। অতঃপর অন্যান্য দুর্গও মুসলমানদের করায়ত্তে আসে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায় ইহুদীদের নিহতের সংখ্যা ৯২ জন, আর مسلمانوں শহীদের সংখ্যা ১৯ জন। প্রায় তিন সপ্তাহকাল অবরুদ্ধ থাকার পর খায়বারের সমস্ত দুর্গ মুসলমানদের হস্তগত হয়। এ যুদ্ধে মহাবীর আলী (রা.) ঢাল হিসেবে দুর্গের যে লোহার কপাট বা দরজাটি ব্যবহার করেছিলেন; তা উঠাতে ৭ জন সাহাবা হিমশিম খেয়ে যান। অথচ আলী (রা.) সেটাকে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করেছেন। সবই মহান রবের ইচ্ছা।

এরপর ইহুদীরা অতি বিনীতভাবে বিশ্বনবীনির নিকট লিখিত শর্তে শান্তি প্রস্তাব দেয়। শর্ত ছিল এরূপঃ (১) তাদের জীবন, সম্পত্তি, মহিলা ও শিশুদের স্পর্শ করা হবে না। (২) তারা অর্ধেক ফসল হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেবে। (৩) তারা مسلمانوں অনুগত প্রজা হয়ে বসবাস করবে। (৪) ইহুদীরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের শর্ত মেনে নিলেন। প্রতিবছর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) খায়বারে এসে উৎপন্ন ফসল ভাগ করে দিতেন। এ সত্ত্বেও ইহুদীদের স্বভাব বদলায়নি। বিশ্বাসঘাতকতা ও কলা কৌশলে চতুরতা ইহুদী জাতির মজ্জাগত অভ্যাস। এরা পুনরায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র করে। ইহুদী নেতা হারিসের কন্যা ও সালামের স্ত্রী যয়নাব, মহানবীকে দাওয়াত করে বিষ মিশ্রিত খাদ্য খেতে দেয়। মহানবী এক লুকমা মুখে দিয়েই ফেলে দেন। কিন্তু বিশর বিন রানা (রা.) নামক এক সাহাবী সামান্য গিলে ফেলায় সে শহীদ হন। ফলে এ হত্যার দায়ে যয়নাবকে প্রাণদ দেয়া হয়। খায়বার যুদ্ধে যে সব মহিলা বন্দী হয়েছিল তাদের মধ্যে হযরত সফিয়াও (রা.) ছিলেন। তিনি একজন সাহাবীর ভাগে পড়েন। অথচ তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দাসীরূপে থাকার জন্য আবেদন জানান। দয়াল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে আজাদ করে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহ খায়বারের বিজয়ের ইঙ্গিত করেছিলেন। আল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন, মুমিনরা যখন গাছের নীচে আপনার হাতে বাইয়াত করছিল, তখন তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন। তাই তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন। পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে অখ বিজয় দান করবেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ দান করবেন, যা তারা অচিরেই লাভ করবে (সূরা আল ফাতাহ : ১৮-১৯)। হুদাইবিয়ায় আল্লাহ দেয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হয়েছিল ফলে مسلمانوں মনোবল আরও বেড়ে গিয়েছিল।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


৮ম হিজরীর রমযানে মক্কা বিজয় হয়। হুদাইবিয়ার সাথে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত। হুদাইবিয়ার একটি শর্ত ছিল এরূপ: মক্কাবাসী অথবা মুসলমানরা যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তি বদ্ধ হতে পারবে। অপরপক্ষ এতে বাদ সাধতে পারবে না। এরই ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের সাথে বনু খোজায়ার এবং অপরদিকে বনু বকরের সাথে মক্কাবাসীদের চুক্তি হয়েছিল। অথচ কিছু দিন যেতে না যেতেই, মক্কার কাফিররা বনু বকরের পক্ষাবলম্বন করে, বনু খোজায়ার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের অনেক লোককে হত্যা করে ফেলে। ফলে খোজায়ার গোত্রের লোকেরা এসে প্রিয় নবীর নিকট ফরিয়াদ জানায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীর নিকট তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবী জানান। নতুবা চুক্তি ভঙ্গ বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু মক্কার কাফিররা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথার কোন মূল্যই দিল না। শেষ পর্যন্ত সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ বলেই বিবেচিত হল।

এবার বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে মক্কা অভিযানের আয়োজন শুরু করে দিলেন। তিনি সবকিছু গোপন রেখে সৈন্য সংগ্রহ করেছিলেন। কারণ, এ অভিযানের খবর মক্কাবাসী জানতে পারলে তারাও বিপুল সমরায়োজন করত। ফলে একটা ভীষণ রক্তারক্তি কা ঘটে যেতে পারত। অথচ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ ধ্বংসাত্মক বিজয় চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ভালবাসা দিয়ে ও মানবতা দিয়ে পবিত্র মক্কা জয় করতে। এজন্যই তিনি কুরাইশদেরকে প্রস্তুত হবার অবকাশ দেননি।

হাতিব বিন আবি বোলতা (রা.) নামক জনৈক বদরী সাহাবী এ সময় একটি কা করে বসেন। তখনও তার স্ত্রী-পুত্র মক্কায় অবস্থান করত। তাদের প্রতি মক্কার কুরাইশদের সহানুভূতির আশায় তিনি গোপনে জনৈকা ক্রীতদাসীর মাধ্যমে মক্কায় মুসলমানদের অভিযানের খবর পাঠানোর চেষ্টা করেন। আল্লাহ অহীর মাধ্যমে তার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী, মিকদাদ ও হযরত যুবাইরকে (রা.) বলে পাঠান যে, তোমরা দ্রুত যাও, 'রওযা খাক' নামক স্থানে গেলে উটে সওয়ারী এক মহিলা দেখবে, তাকে আটক করবে এবং তার নিকট একটা চিঠি পাবে। তোমরা তা নিয়ে আস। বিশ্বনবীর নির্দেশ পালন করা হলে ঘটনার সত্যতা মিলে। এ কাজের জন্য হাতিবের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হয়। হাতিব অকপটে তার উপরোক্ত উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বিশ্বাস করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এটা ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা মু'জেযা।

পরিকল্পনা অনুসারে ধীরে ধীরে مسلمانوں দশ হাজারের বিরাট বাহিনী তৈরী হয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ম হিজরীর ১০ই রমযান (৬৩০ খ্রীঃ) মক্কা অভিমুখী অভিযানে রওনা হন। মক্কার উপকণ্ঠে 'মারুর জাহরান' নামক স্থানে এসে তিনি শিবির স্থাপন করেন এবং মক্কা বিজয় করার জন্য কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করেন। সন্ধ্যর পর খাদ্য প্রস্তুতির জন্য তাবুর বাইরে চুল্লি জ্বালান হয়। রাতে অগণিত চুল্লিতে আগুন জ্বলতে দেখে কুরাইশরা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। আবু সুফিয়ান এ দৃশ্য দেখতে এসে ধরা পড়ে যান এবং তাকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আনা হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আবু সুফিয়ান! এখনও কি তোমার ভুল ভাঙ্গবে না? তুমি কি আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করবে না? এখনও কি দেবদেবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে? নবীর দাওয়াতের কথায় আবু সুফিয়ানের মনে দাগ কাটে এবং তিনি তখন কালেমা পড়ে ইসলাম কবুল করেন। অপরদিকে আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়াও ইসলামের গুণে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ইসলাম গ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কুরআনের ভাষায় বলেন, আজ তোমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আর তিনি অতি দয়ালু করুণাময়। (সূরা ইউসুফ : ৯২)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে তারা নিরাপদ, যারা মসজিদে হারামে থাকবে তারা নিরাপদ আর যারা নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকবে তারাও নিরাপদ। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম বাহিনীকে ৪টি দলে বিভক্ত করে নগরে, প্রবেশের নির্দেশ দেন। আর হযরত আব্বাস (রা.) কে বলেন, আবু সুফিয়ানকে এখন মক্কায় ফিরে যেতে না দিয়ে সম্মুখের পাহাড়ের উপর নিয়ে যান, যেন সে مسلمانوں ক্ষমতা দেখতে পায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম مسلمانوں যে চারটি দলে বিভক্ত হবার নির্দেশ দেন; সে দলগুলোর নেতারা ছিলেন: (১) হযরত যুবাইর (রা.) (২) হযরত আবু ওবায়দা (রা.) (৩) হযরত সাদ বিন ওবাদা (রা.) ও (৪) হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। হযরত আলী (রা.) পতাকা হাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। সেনাপতিদের প্রতি নির্দেশ ছিল; বাধা না দিলে কাউকে যেন আঘাত করা না হয়। বস্তুতঃ বিনা বাধায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুসলিম বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে। ক্বাবা ঘরে পৌঁছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসমান বিন তালহার নিকট হতে চাবি নেন এবং পবিত্র কা'বা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করেন। এরপর কা'বার মূর্তিগুলোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আঘাত করতে করতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করেন, সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসারিত হয়েছে, আর মিথ্যা না কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারে, আর না পুনরাবৃত্তি করতে পারে। (আল কুরআন)

মক্কাবাসীরা অপেক্ষা করছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি করেন? যেসব মুশরিকরা বহু বছর যাবত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং مسلمانوںকে সর্বপ্রকারের দুঃখ কষ্ট দিয়েছিল আজ তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ বন্দীদেরকে উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, হে কুরাইশরা! আমি তোমাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব বলে তোমরা ধারণা কর? তারা উত্তর দিল, আমরা আপনার নিকট হতে ভাল ব্যবহার পাওয়ার আশা করি। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যাও তোমরা সকলে মুক্ত।

এ ঘোষণায় ইকরামা, সাফওয়ান, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা; প্রমুখ অমার্জনীয় অপরাধী ক্ষমা পেয়ে যায়। এখানে এ সত্যটি পুনরায় স্পষ্ট হয়ে উঠে: পৃথিবীর রাজা বাদশাহ ও নবীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল- নবী রাসূলরা মহানুভব ও মানবতাবাদী। নবীরা (আ.) বিশাল হৃদয়ের হন। ক্ষমা করা, পূর্বের দুঃখস্মৃতি ভুলে যাওয়াই নবীদের মূল আদর্শ। আর দুনিয়াবাদীরা প্রতিশোধপরায়ণ ও হঠকারী। পাশাপাশি এ ব্যাপক ও সাধারণ ক্ষমা হতে কিছু লোককে আলাদা রাখা হয়, যারা ইসলামের অতিমাত্রায় ক্ষতি করেছিল। কিন্তু এরূপ লোকের অধিকাংশই তখন আত্ম গোপন করেছিল এবং ক্রমে ক্রমে তারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণপূর্বক ইসলাম কবুল করেছিল। এ ক্ষমা ও দয়ার ফলে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণে সুভাগ্যবান হন। হযরত মুয়াবিয়া, আবু কাহাফা প্রমুখ সে দিনই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ভয়ঙ্কর শত্রুরাও ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

সূরায়ে ফাতাহ, হাদীদ ও নাছর- এ তিনটি সূরাতে আল্লাহ মক্কা বিজয় সম্বন্ধে ইঙ্গিত করেছেন। সূরা ফাতাহে এসেছে, আপনাকে সাহায্য করবেন জবরদস্ত সাহায্য। আর সে শক্তিশালী ও জবরদস্ত সাহায্য হল মক্কা বিজয় (সূরা ফাতাহ)। সূরা হাদীদে এসেছে, তোমাদের মধ্যে তারা- যারা ব্যয় করেছে মক্কা বিজয়ের পূর্বে এবং জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা অধিক উচ্চ, ঐ সমস্ত লোকের চেয়ে; যারা ব্যয় করে মক্কা বিজয়ের পরে এবং জিহাদ করে। আর আল্লাহ তাদের সকলের সাথে উত্তম প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন (সূরা আল হাদীদ)। সূরা নাছরে এসেছে, যখন এসে পড়ে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় এবং আপনি লোকদেরকে দেখেন যে তারা আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে দলে দলে প্রবেশ করছে। (সূরা আন নাছর)

মক্কা বিজয়ের বিশেষত্ব হল, তা শক্তি বলে বিজিত হওয়া সত্ত্বেও রক্তপাত হতে রক্ষিত ছিল। কা'বার হেরেমের সম্মান ও মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদকে (রা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন; কা'বা শরীফে প্রবেশ কালে কারো প্রতি যেন তরবারি না উঠায়। দুনিয়ার ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন কোন রাজা-বাদশাহ কোন দেশ জয় করে, তখন বিজিত দেশের উপর নানা প্রকার অত্যাচার, উৎপীড়ন সংঘটিত হয়। তারা হত্যা ও লুটতরাজ করে। সে জাতিকে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ করে কিংবা হত্যা করে। কিন্তু তদস্থলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ঘোষণা ছিল, আজ তোমাদের উপর কোন ক্ষোভ নেই। যাও তোমরা সকলেই মুক্ত? কাফির বা মুশরিক সম্প্রদায়ের সাথে যদি সন্ধি হয়, তবে সে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ কাফির দলের জান, মাল এবং ইজ্জত সব কিছু নিজের জান, মাল এবং ইজ্জতের মত মনে করতে হবে। অবশ্য প্রতিপক্ষের পক্ষ হতে বিরোধিতা বা চুক্তি ভঙ্গ হলে, مسلمانوں চুক্তি ভঙ্গসহ তাদের মূলোৎপাটন করা যাবে। মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের হৃদয় এতটাই সহানুভব ও উদার ছিল। যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। সত্যিই তিনি অতুলনীয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00