📄 নবুয়্যতের ১১তম বছর
নবুওয়াতের ১১তম বছরে আকাবার প্রথম বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই আনসারদের ইসলাম গ্রহণের সূচনা। মদীনা শরীফ থেকে আগত হাজীগণ হজ্বের মৌসুমে জুরায়ে ওকবার কাছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে সাক্ষাৎ করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তারা সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের সংখ্যা ছিল ছয় বা আটজন। আবু উসামা আসওয়াদ ইবনে জাতারাহ আল কাজরাজী (রা.) হলেন আনসারদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। মুয়াজ, মুয়াওয়িজ এবং আওফ (রা.); তারা ছিলেন হযরত হারিস ইবনে রাফায়ার (রা.) সন্তান। এ তিনজনকে বনী আফরাও বলা হয়। তাদের মাতার নাম হচ্ছে আফরা (রা.)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বাইয়াত গ্রহণের ভাষা আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অর্থাৎ “আমি তোমাদের বাইয়াত করছি এ শর্তে যে তোমরা আল্লাহর সংগে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না। জেনে শুনে কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিবে না। কোন কাজে আমার নির্দেশ অমান্য করবে না। অতএব তোমরা যদি আমার এ শর্তসমূহ পালন কর, তবে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর যদি তোমরা এর মধ্যে কোন খেয়ানত কর, তবে তোমাদের ব্যাপার আল্লাহর হাওলা করে দিলাম। তিনি চাইলে তোমাদের শাস্তি দিবেন অথবা ক্ষমা করে দিবেন।" প্রথম বাইয়াত থেকেই মদীনায় ইসলাম প্রচার শুরু হয়। এভাবেই মদীনায় দাওয়াত ও তাবলীগের হাতেখড়ি হয়।
📄 নবুয়্যতের ১২তম বছর
নবুওয়াতের ১২তম বছর হল হিজরতের এক বছর আগের বছর। ইমাম নববী এবং ইবনে সাদ প্রমুখ ইসলামী গবেষকরা এ মত গ্রহণ করেছেন। ২৭ রজব শনিবার কিংবা সোমবার মতান্তরে রমযানে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মি'রাজের অবিস্মরণীয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। মি'রাজে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের চূড়ান্ত শীর্ষস্থানে পৌঁছে ছিলেন। তিনি আল্লাহর বিশাল ও মহান নিদর্শনাবলী দেখেছেন। যার বিবরণ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে।
মি'রাজ রজনীতে হযরত জিব্রাঈল (আ.), মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষ বিদারণ করেন। হৃদয় বা অন্তর মোবারক বের করে জমজমের পানি ভর্তি সোনার থালায় ধৌত করেন। অতঃপর পবিত্র হৃদয়ে হিকমত, ঈমান এবং নবুওয়াতের নূর ভর্তি করে স্বস্থানে রেখে দেন। ওলামাগণ বলেন বক্ষ বিদারণের ঘটনা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে চারবার ঘটেছে। প্রথম ৪ বছর বয়সে, দ্বিতীয় দফা দশ বছর বয়সে, তৃতীয় দফা হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের সময় এবং চতুর্থ বার শবে মি'রাজের সময়। মি'রাজ সফরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী যানবাহনে আরোহণ করেন। এর নাম বুরাক। মক্কা শরীফ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত বুরাকে ভ্রমণ করেছেন। বুরাক, বরক ধাতু থেকে নির্গত। বরক আরবী শব্দ এবং এর অর্থ বিদ্যুৎ। বুরাকের গতি আলোর মতোই দ্রুত ছিল। আইনস্টাইনের সময়ের আপেক্ষিকবাদ সূত্র মতে আলোর গতিতে চলমান বস্তুর জন্য সময় স্থির হয়ে যায়। বায়তুল মুকাদ্দাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'রাকাত নামায আদায় করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইমামতিতে সকল নবীগণ সেদিন নামায আদায় করে ধন্য হয়েছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত নবীগণের ইমাম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে রাতে যখন বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বেরিয়ে আসেন তখন জান্নাত থেকে একটি সিঁড়ি লাগানো হয়। (আলোর গতি সম্পন্ন চলন্ত লিফট)। যে সিঁড়ি দিয়ে তিনি প্রথম আসমানে গিয়ে পৌঁছেন। অতঃপর ঐ সিঁড়িটি প্রথম আসমানে উপস্থাপন করা হয় যা দিয়ে তিনি দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছেন। এমনিভাবে স্তরে স্তরে সপ্তম আসমানেরও উপরে চলে যান বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পুরো ঘটনাই ছিল আলোর গতিতে।
সে রাতেই আসমানসমূহে গুরুত্বপূর্ণ নবীগণের সংগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাক্ষাৎ করেন। ঐসব নবীগণ, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানার্থে এবং সম্বর্ধনা প্রদানের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগে আসমানে পৌছে গিয়েছিলেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আসমানে হযরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.), তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আসামানে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে হযরত মূসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সংগে সাক্ষাৎ হয়। মি'রাজের এ সফরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল মা'মুর পরিদর্শন করেন। বায়তুল মা'মুর হল ফিরিশতাদের কিবলা। এখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফিরিশতা এর তোয়াফ করেন। অথচ কিয়ামত পর্যন্ত কোন ফিরিশতা দ্বিতীয় বার তোয়াফ করার সুযোগ পাবেন না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মে'রাজ সফরে জান্নাত এবং তার বিশাল নিয়ামত রাজি আর জাহান্নام এবং তার ভয়াবহ শাস্তি পরিদর্শন করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে দুধ, মধু এবং মদ ভর্তি পাত্র হাজির করা হয়। তিনি দুধ নির্বাচন করেন এবং পান করেন। এতে জিব্রাঈল (আ.) আরজ করেন, 'আপনি ফিতরাতকে গ্রহণ করেছেন। এটা আপনার এবং আপনার উম্মতের বৈশিষ্ট্য।
এ রাতে মহান আল্লাহ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এবং উম্মতের উপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছিলেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মূসা (আ.) এর পরামর্শে নামাযের এ সংখ্যা হ্রাস করার দরখাস্ত নিয়ে আল্লাহর দরবারে নয়বার গমন করেন। প্রতিবার পাঁচ ওয়াক্ত করে নামায হ্রাস করা হয়। এভাবে প্রতিদিন মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে এসে পৌঁছায়। মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামায যখন বাকী রইল; তখন আল্লাহ বলেন, উম্মতে মুহাম্মদী 'আদায় করবে পাঁচবেলা নামায পাঁচ ওয়াক্ত এবং ছাওয়াব পাবে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের সমান। আমার জ্ঞানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল এবং এর বিনিময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের ছাওয়াব দিব। আমার সিদ্ধান্ত কোন অবস্থাতেই পরিবর্তন হয় না।'
মি'রাজ রজনীতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশের উপর অধিষ্ঠিত হন এবং আল্লাহ তার প্রিয় হাবীবকে নিজ সান্নিধ্য দিয়ে ধন্য করেন। আল্লাহ নিজ শান মোতাবেক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে কথা বলেন। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, 'অতঃপর নিকটবর্তী হলেন এবং অতি নিকটবর্তী হলেন। উভয়ের মধ্যে দু'কামানের দূরত্ব ছিল অথবা তার চেয়েও নিকটবর্তী হলেন।' এ ব্যাপারে দ্বিমত আছে যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছিলেন কি না? ওলামাগণ বলেছেন, হ্যাঁ স্বচক্ষেই দেখেছেন। মি'রাজের রাতে আল্লাহর দরবারে সালাম পেশ করার জন্য নিম্নের বাক্যাবলী দান করা হয়েছিল, যা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আল্লাহর মাঝে কথোপকথন। শেষ বাক্যটি সমবেত ফিরিশতারা বলেছিল।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য, তা কথা দিয়ে হোক অথবা শারীরিক কিংবা আত্মিক।' এর জবাবে আল্লাহ বলেন, 'সালাম আপনার প্রতি হে নবী এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বা প্রাচুর্য।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় বার বলেন, 'সালাম বর্ষিত হোক, আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর সকল নেক বান্দাগণের প্রতি।' এতদশ্রবণে হযরত জিব্রাঈল (আ.) এবং ফিরিশতাগণ বলেন, 'আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আমি আরও স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
মি'রাজ পরবর্তী ভোরবেলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জেযা প্রকাশিত হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একরাতে আকাশ ভ্রমণ ও প্রত্যাবর্তন করেছেন। এসবই খুব অবিশ্বাস্য বলে মনে হল কুরাইশবাসীর কাছে। তাই তারা পুরো ঘটনাটি অস্বীকার করল। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বায়তুল মুকাদ্দাসের বিবরণ স্মরণ করে বর্ণনা করতে বলল।
অন্ধকার রাতে কিছুক্ষণের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান করে তার বিশদ বিবরণ স্মরণ রাখার তেমন প্রয়োজনীয়তাই বা কি ছিল? সর্বশক্তিমান আল্লাহ যা ইচ্ছে তা করতে পারেন। আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিব্রাঈল (আ.) তাঁর বাহুতে করে পুরো বায়তুল মোকাদ্দাস তুলে নিয়ে আসেন মক্কায়, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আকিলের বাড়ীর পার্শ্বে। বিশ্বনবী তা দেখে দেখে প্রতিটি বিষয়ের বিবরণ পেশ করতে থাকেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে বায়তুল মোকাদ্দাসের সঠিক বিবরণ শুনে মক্কাবাসী বিস্ময়ে ভিমরী খেয়ে যায়। কেননা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে কখনই ঐ মসজিদে ভ্রমণ করেননি বা দেখেননি। প্রিন্সেস বিলকিসের সিংহাসন তুলে নিয়ে আসা যেমন হযরত সুলাইমান (আ.) এর মু'জেযা ছিল, বায়তুল মুকাদ্দাস উঠিয়ে নিয়ে আসাও ছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জেযা।
এ বছরই মি'রাজ রজনীর পরবর্তী ভোর বেলা যখন কুরাইশ কাফিরগণ মি'রাজকে অস্বীকার করল, তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরীক্ষা করার জন্য বলল, বলুন দেখি আমাদের মক্কার একটি বণিক দল এখান থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা করেছে; তাদের খবর কি? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, 'ঐ দলটি অমুক জায়গার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। দলের মধ্যে এতজন লোক আছে, এতটি উট রয়েছে।' কুরাইশবাসী আবার প্রশ্ন করল, 'তবে তারা মক্কায় কবে এসে পৌঁছবে?' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, 'অমুক মাসের অমুক তারিখ, বুধবার। কাফেলার সম্মুখে ধূসর বর্ণের একটি উট থাকবে। তার পিঠে থাকবে দু'টি চাটাই।' অবশেষে বিশ্বনবী যেভাবে বলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই ঘটেছিল। তথাপি হতভাগাদের ঈমান নসীব হয় নি।
এ বছর হাবশায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জা'ফর ইবনে আবি তালিবের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন হাবশার (আবিসিনিয়াতে) মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সন্তান। উসদুল গাবা কিতাবে আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল দশ বছর। তিনি আপন পিতা জা'ফর (রা.) এর সংগে মদীনায় চলে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি। অত্যধিক বদান্যতার জন্য তার উপাধি ছিল বাহরুল জাউদ অর্থাৎ দানের সাগর। বলা হয়ে থাকে যে, ইসলামে তার চেয়ে বড় দাতা আর কেউ ছিলেন না অর্থাৎ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে, তিনিই ছিলেন বড় দাতা। অথচ তিনি ছিলেন অল্পবয়স্ক সাহাবী।
এ বছর রজব মাসে আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে হজ্ব মৌসুমে তাশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন। এদিকে মদীনাতে হযরত জাবির (রা.) ছাড়াও বারজন আনসার সাহাবী হজ্বের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন আকাবার নিকটবর্তী স্থানে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে তাদের সাক্ষাৎ হয়। তারা ১২ জনই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুসআব ইবনে ওমায়র আল কুরশী আল আবদরী (রা.) কে কুরআনে করীম, নামায এবং শরীয়তের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তাবলীগ ও তা'লীমের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো জ্বলে উঠে। নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছর হযরত মুসয়াব ইবনে ওমায়র (রা.) মদীনায় তিহাত্তর জনকে নিয়ে আকাবার তৃতীয় বাইয়াতে রাত্রিবেলা হাজির হন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের হিজরতের আগে দ্বিতীয় বার মদীনায় প্রেরণ করেন। তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগ এবং তা'লীম ও তাদরিসের (শিক্ষাদানের) ফলে মদীনায় ইসলাম চমকে উঠে।
এ বছর মদীনায় মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম বিন খালিদ আলা মাদানী আল আনসারী (রা.) হযরত মুসয়াবের (রা.) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বনু হারিসার বংশভুক্ত ছিলেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনা শুভাগমনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। একই বছর আবুল বিশর উব্বাদ ইবনে বিশর (রা.) হযরত মুসয়াব বিন ওমাযয়েরের (রা.) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে বদর, উহুদ এবং অন্যান্য জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি হচ্ছেন সে দু'জন সাহাবীদের একজন যাদের কারামত প্রকাশিত হয়েছিল। একবার, তারা দু'জনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইমামতিতে এশার নামায আদায় করে দীর্ঘক্ষণ পরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করেন। রাত্রী ছিল ঘোর অন্ধকার। উভয়ের হাতে ছিল লাঠি। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বের হয়ে যান, তখন একজনের লাঠি আলোকিত হয়ে উঠে এবং সে আলোর সাহায্যে তারা পথ চলতে থাকেন। অতঃপর যখন দু'জনের রাস্তা ভিন্ন হয়ে পড়ে, তখন উভয়ের লাঠি আলোকিত হয়ে উঠে। এ অবস্থায় তারা বাড়ি পর্যন্ত পৌছে যান। এটা ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জেযা এবং ঐ সাহাবাদের কারামত। দ্বিতীয় সাহাবীর নাম ছিল উসাইদ ইবনে হোজাইর (রা.)। এ বছর আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনুল আসাদ আল মাখজুমী (রা.) মক্কা থেকে মদীনা হিজরত করেন। তিনি হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতিক্রমে মদীনায় হিজরত করেন। তিনি এর আগে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। অতঃপর মক্কায় ফিরে আসেন। মুশরিকদের অত্যধিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে এবং মদীনাতে ইসলামের প্রসারের খবর পেয়ে, মদীনা শরীফে হিজরত করেন।
📄 নবুয়্যতের ১৩তম বছর
এ বছর যিলহজ মাসে আকাবার তৃতীয় বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। নবুওয়াতের ১২তম বর্ষে (আকাবার বাইয়াতকালে) মদীনার আনসারগণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আগামী বছর একই স্থানে এসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে সাক্ষাৎ করবেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বছর হজ্বের মৌসুমে মিনা চলে যান। অতঃপর আনসার সাহাবাদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ৭৩ জন পুরুষ এবং দু'জন মহিলা আইয়ামে তাশরীফের মধ্যবর্তী রাতে একই স্থানে এসে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে সাক্ষাৎ করে বাইয়াত ও ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন। এছাড়াও মদীনায় আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে। এ বছর মতান্তরে পরের বছর হযরত সায়ীদ ইবনুল আস (রা.) এর জন্ম হয়। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাহাবী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। তিনি সে ভাগ্যবান দলের অন্যতম সদস্য, যারা হযরত ওসমান (রা.) এর নির্দেশে কুরআন মাজীদ সংকলন করেছিলেন। তাঁর পিতা আস ইবনে সায়ীদ বদরের যুদ্ধে হযরত আলীর (রা.) হাতে নিহত হন।
ওলামাগণ লিখেছেন যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার আনসারদের নিকট থেকে তিনবার বাইয়াত অনুষ্ঠান করেছিলেন। প্রথমবার নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে রজব মাসে, তখন ছয়জন বা আটজন মুসলমান হয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার দ্বাদশ বর্ষের রজব মাসে, তখন বারজন মুসলমান হয়েছিলেন। তৃতীয়বার ত্রয়োদশ বর্ষের যিলহজ্ব মাসে, তখন ৭৩ জন পুরুষ এবং দু'জন মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এসকল আকাবা এবং হজ্ব রজব মাসে এ কারণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে, কাফিররা কোন মাসকে আগে নিয়ে আসা কিংবা পিছিয়ে দেয়ার জাহেলি নিয়ম পালনে অভ্যস্ত ছিল। নবুওয়াত প্রাপ্তির যখন তের বছর পূর্ণ হয় তখন চৌদ্দতম বছর মক্কাতেই শুরু হয় এবং এটাই ছিল হিজরতের প্রথম বছর। কেননা নবুওয়াতের চৌদ্দতম বছরে তৃতীয় আকাবার তিন মাস পরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা মুকাররমা থেকে মদীনা তৈয়বায় হিজরত করেন। এরপর থেকেই হিজরী সাল গণনা শুরু হয়।