📄 নবুয়্যতের ৭ম বছর
নবুওয়াতের সপ্তম বর্ষের পহেলা মহররম মতান্তরে অষ্টম বছর কুরাইশরা একটি অন্যায় লিখিত আদেশের মাধ্যমে বনু হাশিমের সংগে সামাজিক বয়কট করে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মহানবীর সংগে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব ইবনে আবদে মানাফকে শুয়াবে আবি তালিবে (দু'পাহাড়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে) বন্দী করে রাখে। কুরাইশরা যখন দেখতে পেল যে ক্রমশঃ তাদের ধর্ম সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীন দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে।
পাশাপাশি হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ফলে ইসলাম নতুন করে অত্যন্ত কার্যকরী উপায় ও নিজের গতি পেয়ে গেছে। এদিকে সাধারণ মুসলমানগণ আবিসিনিয়া হিজরত করে নাজ্জাশীর নিকট আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। নাজ্জাশী তাদের অতিমাত্রায় সহযোগিতা ও সদ্ব্যবহার করছেন। অপরদিকে আবু তালিব এবং তার ভ্রাতৃপ্রতীম বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে আছে। এমনি অবস্থায় কুরাইশ দল পরামর্শক্রমে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, বনু হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের সংগে সম্পর্ক ছেদ করতে হবে এবং তাদেরকে শহরের বাইরে কোন গিরি সংকটে আবদ্ধ করে রাখতে হবে। সে গিরি-গুহার নাম ছিল শুয়াবে আবি তালিব। এ সময় আল্লাহপাক বিশ্বনবীকে জানান, নিশ্চয় তোমাদের ভীতি, ধন, সম্পদ ও শস্যহানী দ্বারা পরীক্ষা করে দেখব। আপনি সেসব ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন, যারা বিপদে পতিত হলে বলে আমরা আল্লাহর জন্য। তার দিকেই আমরা প্রত্যাবর্তন করব। (বাকারা : ১৫৫-১৫৬)। এরপর মুসলমানরা অসীম ধৈর্যধারণ করে। দাওয়াত ও তাবলীগের সফলতা আসবে ধৈর্যের মাধ্যমে। এ কথাটি পুনরায় বাস্তব বলে প্রমাণ হয়। এ সময় মুসলমানরা গাছের পাতা, শুকনো চামড়া, এসব অখাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করেছিল। কিন্তু মুশরিকদের অন্তর সামান্যতম নরম হয়নি।
কুরাইশের এ চুক্তি মৌখিক ছিল না। বরং তা ছিল লিপিবদ্ধ দলিল আকারে। এ চুক্তিটি কা'বা শরীফের দেয়ালে লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ চুক্তির অমানুষিক ও ভয়ংকর দফাগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বনী হাশিম ও বনী আবদে মনাফসহ শহর থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
২. কুরাইশের কোন সদস্য তাদের সংগে কোন ধরনের আত্মীয়তা করতে পারবে না।
৩. তাদের নিকট কোন ধরনের খাদ্য পানীয় সরবরাহ করতে দেয়া হবে না।
৪. কোন ব্যক্তি তাদের কাছে কোন জিনিস বিক্রি করতে পারবে না। তাদের কোন জিনিসও কেউ ক্রয় করতে পারবে না।
৫. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যতক্ষণ পর্যন্ত কুরাইশের হাতে হস্তান্তর করা না হবে; ততক্ষণ কোন সন্ধি বা আপোষ করা হবে না।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের সাথে শুয়াবে আবি তালিবে বন্দী অবস্থায় তিন বছর থাকেন। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে ঐ চুক্তিনামাটি উইপোকা কেটে ফেলে এবং একমাত্র আল্লাহর নাম ছাড়া একটি শব্দও অবশিষ্ট ছিল না। মহানবী (সা.) ওহী মারফত এটা জেনে স্বীয় চাচা আবু তালিবকে এ বিষয়টি অবহিত করেন। আবু তালিব সেটা কুরাইশদেরকে অবগত করেন। কুরাইশরা তা বিশ্বাস করতে রাজী হল না। আবু তালিব বলেন, চুক্তিনামা খুলে দেখ। সুতরাং সেটা খোলা হল এবং দেখা গেল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা মত চুক্তিনামাটি একেবারে পরিষ্কার; তাতে কোন লিখা নেই। এতে কুরাইশরা খুবই লজ্জিত হল। কাফিররা চুক্তিনামাটি ছিঁড়ে ফেলে। তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। এমনিভাবে তিন বছর পর অর্থাৎ নবুওয়াতের দশম বছরে মহানবী (সা.), তাঁর স্বজন, সাহাবী (রা.) এবং ভক্ত প্রেমিকগণ নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
নবুওয়াতের সপ্তম বর্ষের পহেলা মহররম মতান্তরে অষ্টম বছর কুরাইশরা একটি অন্যায় লিখিত আদেশের মাধ্যমে বনু হাশিমের সংগে সামাজিক বয়কট করে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মহানবীর সংগে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব ইবনে আবদে মানাফকে শুয়াবে আবি তালিবে (দু'পাহাড়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে) বন্দী করে রাখে। কুরাইশরা যখন দেখতে পেল যে ক্রমশঃ তাদের ধর্ম সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দ্বীন দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে।
পাশাপাশি হযরত হামযা (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ফলে ইসলাম নতুন করে অত্যন্ত কার্যকরী উপায় ও নিজের গতি পেয়ে গেছে। এদিকে সাধারণ মুসলমানগণ আবিসিনিয়া হিজরত করে নাজ্জাশীর নিকট আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। নাজ্জাশী তাদের অতিমাত্রায় সহযোগিতা ও সদ্ব্যবহার করছেন। অপরদিকে আবু তালিব এবং তার ভ্রাতৃপ্রতীম বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে আছে। এমনি অবস্থায় কুরাইশ দল পরামর্শক্রমে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, বনু হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের সংগে সম্পর্ক ছেদ করতে হবে এবং তাদেরকে শহরের বাইরে কোন গিরি সংকটে আবদ্ধ করে রাখতে হবে। সে গিরি-গুহার নাম ছিল শুয়াবে আবি তালিব। এ সময় আল্লাহপাক বিশ্বনবীকে জানান, নিশ্চয় তোমাদের ভীতি, ধন, সম্পদ ও শস্যহানী দ্বারা পরীক্ষা করে দেখব। আপনি সেসব ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন, যারা বিপদে পতিত হলে বলে আমরা আল্লাহর জন্য। তার দিকেই আমরা প্রত্যাবর্তন করব। (বাকারা : ১৫৫-১৫৬)। এরপর মুসলমানরা অসীম ধৈর্যধারণ করে। দাওয়াত ও তাবলীগের সফলতা আসবে ধৈর্যের মাধ্যমে। এ কথাটি পুনরায় বাস্তব বলে প্রমাণ হয়। এ সময় মুসলমানরা গাছের পাতা, শুকনো চামড়া, এসব অখাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করেছিল। কিন্তু মুশরিকদের অন্তর সামান্যতম নরম হয়নি।
কুরাইশের এ চুক্তি মৌখিক ছিল না। বরং তা ছিল লিপিবদ্ধ দলিল আকারে। এ চুক্তিটি কা'বা শরীফের দেয়ালে লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ চুক্তির অমানুষিক ও ভয়ংকর দফাগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বনী হাশিম ও বনী আবদে মনাফসহ শহর থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
২. কুরাইশের কোন সদস্য তাদের সংগে কোন ধরনের আত্মীয়তা করতে পারবে না।
৩. তাদের নিকট কোন ধরনের খাদ্য পানীয় সরবরাহ করতে দেয়া হবে না।
৪. কোন ব্যক্তি তাদের কাছে কোন জিনিস বিক্রি করতে পারবে না। তাদের কোন জিনিসও কেউ ক্রয় করতে পারবে না।
৫. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যতক্ষণ পর্যন্ত কুরাইশের হাতে হস্তান্তর করা না হবে; ততক্ষণ কোন সন্ধি বা আপোষ করা হবে না।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু হাশিম এবং বনু মুত্তালিবের সাথে শুয়াবে আবি তালিবে বন্দী অবস্থায় তিন বছর থাকেন। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে ঐ চুক্তিনামাটি উইপোকা কেটে ফেলে এবং একমাত্র আল্লাহর নাম ছাড়া একটি শব্দও অবশিষ্ট ছিল না। মহানবী (সা.) ওহী মারফত এটা জেনে স্বীয় চাচা আবু তালিবকে এ বিষয়টি অবহিত করেন। আবু তালিব সেটা কুরাইশদেরকে অবগত করেন। কুরাইশরা তা বিশ্বাস করতে রাজী হল না। আবু তালিব বলেন, চুক্তিনামা খুলে দেখ। সুতরাং সেটা খোলা হল এবং দেখা গেল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা মত চুক্তিনামাটি একেবারে পরিষ্কার; তাতে কোন লিখা নেই। এতে কুরাইশরা খুবই লজ্জিত হল। কাফিররা চুক্তিনামাটি ছিঁড়ে ফেলে। তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। এমনিভাবে তিন বছর পর অর্থাৎ নবুওয়াতের দশম বছরে মহানবী (সা.), তাঁর স্বজন, সাহাবী (রা.) এবং ভক্ত প্রেমিকগণ নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
📄 নবুয়্যতের ৮ম বছর
কুরাইশ কর্তৃক বিশ্বনবী ও তার অনুসারীদের এ বয়কট ছিল হৃদয় বিদারক ও ভয়াবহ। বয়কটের তিন বছর শিশু-কিশোর-মহিলা ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা খাদ্য ও পানির অভাবে রাতে চিৎকার করে কাঁদতো। পিপাসা এবং ক্ষুধার তাড়নায় বেহুশ হয়ে যেত। গাছের ছাল, পাতা, পশুর চামড়া খেয়ে দিন অতিবাহিত করত। তাদের করুণ অবস্থায় আকাশ বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে যেত। দ্বীনের জন্য এত যুলুম অত্যাচার, সকল ইতিহাসকে হার মানিয়ে যায়। অথচ কাফির মুশরিকরা এসব দেখে হাসি, তামাশা এবং ব্যঙ্গ- বিদ্রূপ করত। তাদের কর্ম পশুত্বকেও হার মানিয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীরা এর মাঝেও দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন। তা'লীম, গাশত, দাওয়াত, ইবাদত চলতে থাকে যথারীতি। সময়টা ছিল ইসলামের জন্য সংকটাপন্ন ও দুর্বিসহ।
মক্কার কাফিরদের নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, পারস্যের কাফিরগণ অর্থাৎ নওশের এর সন্তান বা রোমানদের উপর বিজয়ী হয়ে গেছে। সংবাদ শুনে মক্কার কাফিররা খুবই আনন্দিত হয়ে উঠে। তারা মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, রোমনরাও তোমাদের মত আহলে কিতাব। অপর পারস্যবাসী আমাদের মত কিতাব ছাড়া। আমাদের ভাইয়েরা সে দেশে যেভাবে রোমান ভাইদের উপর বিজয়ী হয়েছে, তেমনিভাবে আমরাও তোমাদের উপর বিজয়ী হব। এতে মুসলমানগণ মর্মাহত ও ব্যথিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা রূমের প্রাথমিক আয়াতসমূহ নাযিল হয়। এ সূরার মর্মকথা হল, আগামী দশ বছরের মধ্যে রোমানরা পুনরায় পারস্যের উপর আক্রমণ করবে এবং তারা পারস্যের উপর বিজয়ী হবে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মক্কার কাফিরদের ঐ আয়াতটি পড়ে শুনান। তখন কাফিরগণ সেটা বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। উবাই ইবনে খালফ, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) উপর এ শর্ত আরোপ করে যে, তোমাদের দাবী অনুযায়ী যদি নয় বছরের মধ্যে রোম পারস্যের উপর বিজয়ী হতে পারে, তবে আমি তোমাকে একশত উট পুরস্কার দিব। অন্যথায় তোমার নিকট থেকে একশত উট আদায় করে ছাড়ব। উভয়পক্ষ থেকে এ চুক্তির জামিন নির্ধারিত হয়। অতঃপর মুসলমানগণ যেদিন বদর যুদ্ধে জয়লাভ করেন; ঠিক সেদিন সংবাদ এসে পৌঁছে যে, রোম পারস্যের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। এ কথা শুনে মুসলমানদের অন্তরে আনন্দের জোয়ার দেখা দেয়। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, 'আর সেদিন খুশি হবে মুসলমানগণ।' হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), উবাই ইবনে খালফের জামিনের নিকট থেকে একশত উট আদায় করে নেন।
নবুওয়াতের ৮ম বছর আওস এবং খাজরায কাবিলার মধ্যে 'বুয়াস' নামক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একই বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মোজেযা ঘটে। মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দাবী জানায় যে, 'আপনি এমন কোন ঘটনা দেখান; যা আকাশের মধ্যে ঘটবে।' তাই মহানবী (সা.) পূর্ণিমার রাতে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার অবিস্মরণীয় অলৌকিক ঘটনা দেখান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদত আংগুল দ্বারা চাঁদের প্রতি ইংগিত করেন এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এক টুকরা হেরা পর্বতের ডান দিকে এবং অপর টুকরা বাম দিকে পৃথিবীর নিকটে ঝুঁকে পড়ে। হেরা পর্বত উভয়ের মধ্যখানে সুস্পষ্টভাবে চমকে উঠে। তা দর্শনে কাফিরগণ বলে উঠে, এটা (এক শক্ত) প্রকাশ্য যাদু। তারা তা অবিশ্বাস করে এবং ইসলাম গ্রহণ না করে নিজেদের মনের খায়েশ অনুসারে চলতে থাকে। (সূরা কুমার)। বর্ণিত আছে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা ভারতবর্ষের এক হিন্দু রাজা দর্শন করেছিলেন এবং তিনি রাজ্য ছেড়ে দেশান্তরি হয়ে মক্কায় গিয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। অথচ যাদের জন্য এ মোজেযা প্রকাশিত হয়েছিল, তাদের ভাগ্যে হিদায়াত নসীব হয়নি। অথচ হিদায়াত নসীব হয়েছিল দূর দেশের এক মুশরিক রাজার। হিদায়াত আল্লাহর কাছে।
কুরাইশ কর্তৃক বিশ্বনবী ও তার অনুসারীদের এ বয়কট ছিল হৃদয় বিদারক ও ভয়াবহ। বয়কটের তিন বছর শিশু-কিশোর-মহিলা ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা খাদ্য ও পানির অভাবে রাতে চিৎকার করে কাঁদতো। পিপাসা এবং ক্ষুধার তাড়নায় বেহুশ হয়ে যেত। গাছের ছাল, পাতা, পশুর চামড়া খেয়ে দিন অতিবাহিত করত। তাদের করুণ অবস্থায় আকাশ বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে যেত। দ্বীনের জন্য এত যুলুম অত্যাচার, সকল ইতিহাসকে হার মানিয়ে যায়। অথচ কাফির মুশরিকরা এসব দেখে হাসি, তামাশা এবং ব্যঙ্গ- বিদ্রূপ করত। তাদের কর্ম পশুত্বকেও হার মানিয়েছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীরা এর মাঝেও দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন। তা'লীম, গাশত, দাওয়াত, ইবাদত চলতে থাকে যথারীতি। সময়টা ছিল ইসলামের জন্য সংকটাপন্ন ও দুর্বিসহ।
মক্কার কাফিরদের নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, পারস্যের কাফিরগণ অর্থাৎ নওশের এর সন্তান বা রোমানদের উপর বিজয়ী হয়ে গেছে। সংবাদ শুনে মক্কার কাফিররা খুবই আনন্দিত হয়ে উঠে। তারা মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, রোমনরাও তোমাদের মত আহলে কিতাব। অপর পারস্যবাসী আমাদের মত কিতাব ছাড়া। আমাদের ভাইয়েরা সে দেশে যেভাবে রোমান ভাইদের উপর বিজয়ী হয়েছে, তেমনিভাবে আমরাও তোমাদের উপর বিজয়ী হব। এতে মুসলমানগণ মর্মাহত ও ব্যথিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা রূমের প্রাথমিক আয়াতসমূহ নাযিল হয়। এ সূরার মর্মকথা হল, আগামী দশ বছরের মধ্যে রোমানরা পুনরায় পারস্যের উপর আক্রমণ করবে এবং তারা পারস্যের উপর বিজয়ী হবে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মক্কার কাফিরদের ঐ আয়াতটি পড়ে শুনান। তখন কাফিরগণ সেটা বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। উবাই ইবনে খালফ, হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) উপর এ শর্ত আরোপ করে যে, তোমাদের দাবী অনুযায়ী যদি নয় বছরের মধ্যে রোম পারস্যের উপর বিজয়ী হতে পারে, তবে আমি তোমাকে একশত উট পুরস্কার দিব। অন্যথায় তোমার নিকট থেকে একশত উট আদায় করে ছাড়ব। উভয়পক্ষ থেকে এ চুক্তির জামিন নির্ধারিত হয়। অতঃপর মুসলমানগণ যেদিন বদর যুদ্ধে জয়লাভ করেন; ঠিক সেদিন সংবাদ এসে পৌঁছে যে, রোম পারস্যের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। এ কথা শুনে মুসলমানদের অন্তরে আনন্দের জোয়ার দেখা দেয়। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছে, 'আর সেদিন খুশি হবে মুসলমানগণ।' হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), উবাই ইবনে খালফের জামিনের নিকট থেকে একশত উট আদায় করে নেন।
নবুওয়াতের ৮ম বছর আওস এবং খাজরায কাবিলার মধ্যে 'বুয়াস' নামক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একই বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মোজেযা ঘটে। মুশরিকরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট দাবী জানায় যে, 'আপনি এমন কোন ঘটনা দেখান; যা আকাশের মধ্যে ঘটবে।' তাই মহানবী (সা.) পূর্ণিমার রাতে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার অবিস্মরণীয় অলৌকিক ঘটনা দেখান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাহাদত আংগুল দ্বারা চাঁদের প্রতি ইংগিত করেন এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। এক টুকরা হেরা পর্বতের ডান দিকে এবং অপর টুকরা বাম দিকে পৃথিবীর নিকটে ঝুঁকে পড়ে। হেরা পর্বত উভয়ের মধ্যখানে সুস্পষ্টভাবে চমকে উঠে। তা দর্শনে কাফিরগণ বলে উঠে, এটা (এক শক্ত) প্রকাশ্য যাদু। তারা তা অবিশ্বাস করে এবং ইসলাম গ্রহণ না করে নিজেদের মনের খায়েশ অনুসারে চলতে থাকে। (সূরা কুমার)। বর্ণিত আছে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা ভারতবর্ষের এক হিন্দু রাজা দর্শন করেছিলেন এবং তিনি রাজ্য ছেড়ে দেশান্তরি হয়ে মক্কায় গিয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। অথচ যাদের জন্য এ মোজেযা প্রকাশিত হয়েছিল, তাদের ভাগ্যে হিদায়াত নসীব হয়নি। অথচ হিদায়াত নসীব হয়েছিল দূর দেশের এক মুশরিক রাজার। হিদায়াত আল্লাহর কাছে।
📄 নবুয়্যতের ৯ম বছর
নবুওয়াতের নবম বছরে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ জোরদার হয়। মুসলমানদের উপর অত্যাচারও বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার আশেপাশে বেশী বেশী দাওয়াতের কাজ করেন। বিশ্বনবীর সাহাবীরাও শত বাঁধা ও অত্যাচারের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন। দরিদ্র দাস-দাসীদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। তবে ধনী, বংশীয় ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরা ইসলাম থেকে দূরে থেকে যান। তাদের অহংকার এবং লোকে কি বলবে, এ মনোভাবের কারণে হিদায়াত নসীব হয়নি। অনেক মুশরিক ও কাফির স্পষ্টই অনুধাবন করেছিল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য রাসূল এবং ইসলাম সর্বশেষ ও খাঁটি ধর্ম। কিন্তু নিজেদের মিথ্যা অহংকারে তারা হিদায়াত থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়।
নবুওয়াতের নবম বছরে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ জোরদার হয়। মুসলমানদের উপর অত্যাচারও বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার আশেপাশে বেশী বেশী দাওয়াতের কাজ করেন। বিশ্বনবীর সাহাবীরাও শত বাঁধা ও অত্যাচারের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখেন। দরিদ্র দাস-দাসীদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে। তবে ধনী, বংশীয় ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরা ইসলাম থেকে দূরে থেকে যান। তাদের অহংকার এবং লোকে কি বলবে, এ মনোভাবের কারণে হিদায়াত নসীব হয়নি। অনেক মুশরিক ও কাফির স্পষ্টই অনুধাবন করেছিল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য রাসূল এবং ইসলাম সর্বশেষ ও খাঁটি ধর্ম। কিন্তু নিজেদের মিথ্যা অহংকারে তারা হিদায়াত থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়।
📄 নবুয়্যতের ১০ম বছর
নবুওয়াতের দশম বছরে কুরাইশদের নির্যাতনমূলক চুক্তিনামা বাতিল হয়। বনু হাশিম শোয়াবে আবু তালিবের (রা.) বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসেন। তখনও আবু তালিব জীবিত ছিলেন। এ বছর ৭ই রমযান অথবা ১৫ই শাওয়াল, মতান্তরে প্রথম যিলক্বদ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবু তালিব ইন্তিকাল করেন। আল্লামা শামী লিখেছেন, আবু তালিব হিজরতের তিন বছর পূর্বে অর্থাৎ শোয়াবের বন্দীশালা থেকে মুক্ত হয়ে আসার বিশ দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন।
তখন আবু তালিবের বয়স ছিল আশি বছরের ঊর্ধ্বে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চাচা আবু তালিবের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে প্রস্তুত হন, তখন কুরআনের আয়াত নাযিল হয় অর্থাৎ 'নবীর জন্য এবং অন্যান্য মুসলমানের জন্য জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে। তারা যদিও আত্মীয় হন না কেন; এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবার পর যে তারা জাহান্নামী।' (সূরা তাওবা-১১৩)। তাছাড়া বুখারী শরীফে আছে, এ আয়াতটিও আবু তালিব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে: 'আপনি যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করতে পারবেন না। বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত করেন এবং যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে তাদের কথাও তিনি জানেন।' (সূরা আল কসাস-৫৬)
এ বছরই মুসলিম জননী হযরত খাদীজা (রা.) ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে পঁচিশ বছর অতিবাহিত করেন। হজুন নামক স্থানে জান্নাতুল মোয়াল্লার শেষ প্রান্তে তাকে দাফন করা হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাকে কবরে রাখেন। কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নামাযের জানাযা পড়েননি; কারণ তখনও জানাযার নামাযের বিধান আসেনি। তাঁর মৃত্যুর তারিখ ছিল নবুওয়াতের দশম বর্ষের ১০ই রমযান। আবু তালিব এবং হযরত খাদীজার (রা.) ইন্তিকালে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীরভাবে শোকাহত হয়ে পড়েন। বিরহ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফের দিকে চলে যান। হযরত খাদীজার (রা.) ইন্তিকালের পরে শাওয়াল মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদা বিনতে জাময়া (রা.) কে শাদী করেন। হযরত খাদীজার (রা.) ইন্তিকালের পর তিনিই প্রথম স্ত্রী।
হিজরতের সময় তিনিই কেবল স্ত্রী হিসেবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে বসবাস করছিলেন। হযরত আয়িশার (রা.) সংগে যদিও বিয়ে হয়েছিল; কিন্তু রুখসতী তখনও হয়নি। নবুওয়াতের দশম বছর শাওয়াল মাসে হযরত আয়িশা (রা.) এর সংগে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিয়ে সম্পাদন হয়। তখন আয়িশার (রা.) বয়স ছিল ছয় বছর। বিয়ের তিন বছর পরে শাওয়াল মাসে নয় বছর বয়সে তার রুখসতী হয় (হিজরতের পরে)।
মুসলিম জননী হযরত আয়িশা (রা.) নয় বছর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে অতিবাহিত করেন। বিশ্বনবীর ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল আঠার বছর। নবুওয়াতের চতুর্থ বছর তার জন্ম হয়। এ বিয়ে আল্লাহপাকের ইশারা। কেননা, আয়িশা (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর দীর্ঘ সময় জীবিত থেকে উম্মতের খেদমত করে গেছেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফতী ও আলেম ছিলেন। বড় বড় সাহাবী ও খলীফারা তাঁর কাছ থেকে ইলম ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন।
নবুওয়াতের দশম বছরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফে তাশরীফ নিয়ে যান। সেখানে বনু শক্বীক কাবিলার বস্তী ছিল। সেখানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৬ দিন অবস্থান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য তাদের আহ্বান জানান এবং তাদেরকে কুরাইশ কাফিরদের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করার কথা বলেন। তারা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করে। অবশেষে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৩শে যিলক্বদ মক্কায় ফিরে আসেন। তার সাথে ছিলেন যায়েদ বিন হারেসা (রা.)। এটাই ইসলামের প্রথম দাওয়াত ও তাবলীগের জামাত। যে জামাতের আমীর ছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জামাতের একমাত্র সাথী যায়েদ বিন হারেসা (রা.): জামাত ২৬ দিন মক্কা থেকে ১০০ মাইল দূরে তায়েফে অবস্থান করেন। জামাতের রাহাবার ছিলেন যায়েদ (রা.) এবং মুতাকাল্লিম বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জামাত ভয়াবহ নির্যাতনের স্বীকার হয় এবং কোন লোক দ্বীন গ্রহণ করেনি। উল্টো তায়েফের বালক-বালিকাদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল। তারা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছয় মাইল পর্যন্ত পাথর মারতে মারতে তাড়া করে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সারা শরীর রক্তে জর্জরিত হয়। অত্যাচারে পথিমধ্যে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফে দাওয়াতরত ছিলেন তখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তায়েফের তিনজন সর্দার এসে উপস্থিত হন। আবদে ইয়ালীল, হাবিব এবং মাসউদ। তারা ছিলেন ওমর ইবনে ওবায়েদের সন্তান। কথা প্রসংগে তারা যে কথা বলেছিলেন মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তা উল্লেখ করেছেন। এ কুরআন কেন দুই বস্তির বড় ও নামীদামী লোকের উপর নাযিল হল না? অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছিল যে, মক্কার ওলীদ ইবনে মুগিরাহ মাখজুমী এবং তায়েফের ওরতারাহ ইবনে মাসউদ ছাকাফী এ দুজনের কোন একজন নেতৃস্থানীয় লোককে আল্লাহ কেন নবুওয়াত দান করলেন না? কত বড় বেয়াদবি! এর জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাহলে কি তারা নিজেরা আপনার রবের রহমত বিতরণ করে? তায়েফবাসীর নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহারে জর্জরিত হয়ে অত্যন্ত ব্যথিত মনে যখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে আসছিলেন। পথিমধ্যে জিব্রাইল (আ.) এবং পাহাড় পর্বতের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতারা (আ.) এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে হাজির হন এবং আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি অনুমতি দেন তবে মক্কার দুই দিকের পাহাড় তুলে এনে ওদের এমনভাবে পিষে ফেলব, যাতে একজনও জীবিত না থাকে। রহমতের সাগর, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেন, না। আমি আশা করি তারা যদি আমাকে বিশ্বাস নাও করে; তবুও তাদের বংশের মধ্যে এমন লোক জন্ম নিবে, যারা আল্লাহর তাওহীদে ঈমান আনবে এবং শিরক করবে না, মূর্তিপূজা করবে না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়া পরবর্তীতে সফল হয়েছে। বর্তমানে আরবের মাঝে তায়েফের মুসলমানরাই বেশী নরম ও সরল অন্তরের।
এ বছর যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নখলা নামক স্থানে অবস্থান করেছিলেন; তখন জী নদের সাত সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল এসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে সাক্ষাৎ করেন। নখলা হচ্ছে মক্কা মুকাররামা থেকে একদিনের রাস্তা। তায়েফ এবং মক্কার মধ্যবর্তী স্থান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফজরের নামাযের ইমামতি করার সময় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন; তখন জীনেরা গভীর মনযোগসহকারে ধ্যানমগ্ন হয়ে শুনতে থাকেন। বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম রাকাতে সূরা আর রহমান এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা জীন অথবা সূরা ইকুরা পাঠ করছিলেন। নামায শেষে তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে সাক্ষাৎ করেন এবং দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তারা নিজেদের কওমের কাছে ফিরে যান। পবিত্র কুরআনে সূরা আত্কাফে এসেছে, আর একদল জীনকে আমি আপনার প্রতি আকৃষ্ট করে দিয়েছি; তারা কুরআন পড়া শ্রবণ করত (আহফাক-২৯) এবং সূরা জী নে তাদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
আহকামুল মারজান ফী আহকামিল জান কিতাবে এসেছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে ছয়বার জীন হাজির হয়েছিল। কেউ কেউ মক্কায় এবং কেউ কেউ মদীনায়। আল্লামা শামী (রহ.) তার সীরাত গ্রন্থে লিখেছেন, জীন জাতির প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রথমবার সাত জন বা নয় জন। দ্বিতীয়বার ষাট জন। তৃতীয়বার তিনশত এবং সর্বশেষবার ষাট হাজার। আল্লামা যুরকানী শরহে মাওয়াহিবে লিখেছেন, জীনের প্রথম দল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে রিসালতের কিছুদিন পরে হাজির হয়েছিল, যখন তাদের উপর জ্বলন্ত অগ্নিশিখা বর্ষিত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। তায়েফ থেকে ফেরার পথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দোয়া করেছিলেন তা তায়েফের দোয়া নামে খ্যাত। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'রাকাত নামায আদায়ের পর এভাবে দোয়া করেছিলেন: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছেই আমার দুর্বলতার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ পেশ করছি। আমি জনগণের মধ্যে আমার অবমাননার দূরবস্থার ফরিয়াদ জানাচ্ছি। হে পরম করুণাময়! আপনি দুর্বলদের রব, আপনি আমাকে কার হাওলা করে দেন? সে দুশমনের প্রতি; যে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না, কোন নিকটস্থ বন্ধুর প্রতি; যার হাতে আমার ফায়সালা হবে। আপনি যদি আমার প্রতি নারাজ না হন, তবে আমি অন্য কারো ভ্রূক্ষেপ করি না। এতদসত্ত্বেও আপনার পক্ষ থেকে প্রদত্ত দয়াই আমার নিকট অধিকতর, কাম্য। আমি চাই আপনার সে নূরের সাহায্যে আসমান ও জমিন আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠুক। যা দ্বারা গোটা অন্ধকার বিদূরিত হয় আর যার বরকতে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কাজ সম্পন্ন হয়। যা দ্বারা আমার উপর আপনার গজব বর্ষিত হতে পারে; তা থেকে পানাহ চাই। আপনাকে রাজী করার চেষ্টা করব ততক্ষণ, যতক্ষণ আপনি রাজী হয়ে যান। আপনার সাহায্য ব্যতীত কোন সাহায্য কিংবা সামর্থ্য কারোরই নেই।