📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 নবুয়্যতের ৩য় বছর

📄 নবুয়্যতের ৩য় বছর


নবুওয়াতের ৩য় বছরে, মতান্তরে চতুর্থ বছরে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ আসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে বয়ান করুন। আপনি মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বছর মতান্তরে চতুর্থ বছর নিজ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং এ ব্যাপারে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আপনি নিকট আত্মীয়- স্বজনকে ভয় প্রদর্শন করুন।' উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ের উপর উঠে কুরাইশ গোত্রদের আহ্বান জানালেন। হে বনী ফেহের! হে বনী লোয়াই! হে বনী কাব! হে বনী আব্দুল মুত্তালিব! সবাইকে ডেকে কলেমা তৈয়ব্যের পয়গাম শুনালেন। অতঃপর নিজ চাচা আব্বাসকে এবং কন্যা ফাতেমাকে ডেকে তাওহীদ ও কলেমার কথাই বলেন। এর জবাবে আবু লাহাব বলে, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি এ জন্য আমাদের ডেকেছো?' এর জবাবে পবিত্র কুরআনে তাব্বাত ইয়াদা সূরা (সূরা লাহাব) নাযিল হয়।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবু তালিব যখন জানলেন যে তার সন্তান আলী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি পুত্রকে নিতে আসলেন। বালক পুত্র আলী (রা.) বলেন, আব্বা আমি আল্লাহ ও রাসূলের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি। এখন আর ফিরতে পারব না। আবু তালিব ছেলের কথায় দৃঢ়তার আভাস পেয়ে জবাব দেন, আমি জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে বিপথে পরিচালিত করবেন না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাকে বলেন, চাচা আপনিও এ সত্যধর্ম গ্রহণ করুন। আবু তালিব কোমল কণ্ঠে বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি জানি তুমি মিথ্যাবাদী নও।
তবে আমি যতদিন বেঁচে থাকব, তোমাকে কুরাইশদের অত্যাচার হতে রক্ষা করব। কি বিচিত্র চরিত্র এ লোকটির? ইতিহাসে রয়েছে মৃত্যুর সময় আবু তালিব বলেছেন, লোকে বলবে আবু তালিব মৃত্যুর ভয়ে পিতার ধর্ম ছেড়েছে। তাই আমি ইসলাম গ্রহণ করছি না। আল্লাহ বলেন, হে নবী আপনি যাকে ভালবাসেন, তাকে সঠিক পথে আনতে পারবেন না। তবে আল্লাহ যাকে চান, তাকে সঠিক পথে আনেন। দাওয়াত ও তাবলীগ বান্দার কাজ। হিদায়াত আল্লাহর হাতে। দাওয়াত ও তাবলীগের দ্বিতীয় ধাপে আল্লাহপাক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেন, হে নবী, আপনার আত্মীয়-স্বজনদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন। নবুওয়াতের পথম তিনবছর গোপনেই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চলেছে।
নিকটাত্মীয়-স্বজন ও কাছের লোকেরা ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছে। খাদীজা, তার কন্যারা, আলী, আবু বকর, যায়েদ, ওসমান, ওমরের বোন ফাতিমা ও তার স্বামী (রা.) প্রমুখরা গোপনে মুসলমান হয়েছেন। এরপরই প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ আসে নবুওয়াতের ৪র্থ বছরে।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 নবুয়্যতের ৪র্থ বছর

📄 নবুয়্যতের ৪র্থ বছর


নবুওয়াতের ৪র্থ বছরে মতান্তরে নবুওয়াতের তৃতীয় বছর খাদীজা (রা.)-এর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের ইন্তিকাল হয় এবং মক্কায় তাকে দাফন করা হয়। ওয়ারাকা অন্ধ ও নিঃসন্তান অবস্থায় ইস্তিকাল করেন। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তিনি মুসলমান ছিলেন। নবুওয়াতের ৪র্থ বছর হযরত আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। এ বছর থেকে মক্কার মুশরিকগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে প্রকাশ্যে শত্রুতা ও বিরোধিতা শুরু করে দেয়। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রকার নির্যাতনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত হতে থাকে।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে আবু তালিবের ব্যাপক সমর্থন ছিল। মক্কার কাফিরদের একটি প্রতিনিধি দল আবু তালিবের নিকট গিয়ে উপস্থিত হয়ে বলে, আপনার ভাতিজা আমাদের ধর্মকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি আমাদের ধর্মের সমালোচনা করেন। তিনি লোকজনকে আমাদের দেবতাদের পূজা করতে নিষেধ করেন। আপনি তাকে এ ব্যাপারে বিরত থাকতে বলুন। তাকে বলে দিন, যেন তিনি আমাদের ধর্মের সমর্থনে কথা বলেন। তিনি যদি আপনার কথা না মানেন, তবে আপনি তাকে সহায়তা বন্ধ করে দিন। এ কথা শুনে আবু তালিব বলেন, 'আমি তাকে বাঁধা দিতে পারব না এবং তার সহায়তাও বন্ধ করব না।' এ ধরনের জবাব শুনে মক্কার কাফিরগণ পোড়া মুখ নিয়ে ফিরে যায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি চাচা আবু তালিবের এমন একচ্ছত্র সমর্থন সত্যি বিস্ময়কর। অথচ তার ইসলাম গ্রহণ নসীব হয়নি। হিদায়াত পুরোপুরি আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান, যেভাবে চান, যখন চান- তাই হয়। হিদায়াতের জন্য আমাদের কান্নাকাটি করা চাই। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যাকে ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তার ভাগ্যেই হিদায়াত নসীব হয়।

এ বছর থেকেই (মতান্তরে নবুওয়াতের ৩য় বছর) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ব্যাপকভাবে এবং প্রকাশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। মক্কার হাঁটে, মাঠে, ঘাটে, মহল্লায়, অলি, গলিতে, ঘরে-ঘরে দাওয়াত ও তাবলীগ করেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীরা (রা.)। তাঁদের পুরো দিন রাতের কর্মই ছিল দ্বীনের প্রচার ও প্রসার। মক্কার কাফির, মুশরিকরা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের (রা.) ব্যাপকভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও উত্ত্যক্ত করত। হাসি-তামাশা করে অপমান করত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা কেউ যেন শুনতে না পারে এজন্য শোরগোল, চিৎকার, চেঁচামেচি ও গান বাজনা করত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবিচল থেকে দাওয়াত দিতেন। নবুওয়াতের ৫ম বছর আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেন, আপনি মক্কা ও আশপাশের লোকদের সতর্ক করুন। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজকে মক্কায় সীমাবদ্ধ না রেখে মক্কার আশে পাশে ব্যাপক করে দেন। পরবর্তীতে তায়েফ, হুনাইন, ইয়াসরিব তথা মদীনা পর্যন্ত দাওয়াতের কাজকে বিস্তার করেন। এমনকি আবিসিনিয়ার খ্রীষ্টান বাদশার কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছান।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 নবুয়্যতের ৫ম বছর

📄 নবুয়্যতের ৫ম বছর


নবুওয়াতের ৫ম বছরে হযরত আলী (রা.)-এর বড় ভাই জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পূর্বে এবং একত্রিশ জনের পরে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হন। মুসলমানগণ মক্কার কাফিরদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে হাবশার (আবিসিনিয়ার বা ইথিওপিয়ার) দিকে হিজরত করতে বাধ্য হন। প্রথম হিজরতের বা জামাতের মধ্যে বারজন পুরুষ এবং পাঁচজন মহিলা ছিলেন। সর্বপ্রথম হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) তার স্বীয় স্ত্রী, নবী কন্যা হযরত রুকাইয়্যা বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংগে নিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাই তিনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম আল্লাহর পথে হিজরতকারী। মুহাজিরীনে আউয়ালিন (প্রথম স্তরের মুহাজের) এর এ কাফেলায় ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা.), মুসআব ইবনে আওয়াম (রা.), আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ আল মাখজামী (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রা.) প্রমুখ। হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) মুসলমানদের প্রথম হিজরতকারী জামাতের আমীর ছিলেন।

এ বছর রমযানুল মুবারকে আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) প্রথম হিজরতের পরে এবং দ্বিতীয় হিজরতের আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদুল হারামে সিজদার সূরাটি তিলাওয়াত করেন। কুরাইশদের বৈঠকে মুসলমান, কাফির, মানুষ এবং জীন সবাই উপস্থিত ছিলেন। তিলাওয়াত করে যখন সিজদার আয়াতে পৌছেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে এক সাথে মুসলমান, কাফির, মানব, দানব, জীন সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তবে কুরাইশের এক বৃদ্ধ, উমাইয়া ইবনে খালফ অহংকারবশতঃ সিজদা করেনি। সে বরং এক মুষ্টি কঙ্কর পাথর হাতে নিয়ে ললাটে লাগিয়েছিল এবং বলেছিল, 'আমার জন্য এটাই যথেষ্ট।' বিস্ময়করভাবে একমাত্র উমাইয়া ইবনে খালফ ছাড়া যত মুশরিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং সিজদা করেছিলেন, আল্লাহ তাদের সবাইকে ইসলামের নিয়ামতে ধন্য করেন। ফলে উমাইয়া ইবনে খালফের ইসলাম গ্রহণের তাওফীক হয়নি। বাকী সবাই পর্যায়ক্রমে মুসলমান হয়েছিলেন।

এ বছরের গোঁড়ার দিকে অথবা নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরের শুরুতে হাবশায় দ্বিতীয় হিজরতের ঘটনা ঘটে। এ জামাতে মুহাজিরদের কাফেলায় তিরাশিজন পুরুষ এবং এগারজন কুরাইশ মহিলা এবং সাতজন বিদেশী মহিলা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কেউ কেউ এ সংখ্যা আরো অধিক বলেছেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম হলেন: জাফর ইবনে আবুতালিব (রা.), তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে ওমাইস (রা.), বুনাইস ইবনে হুজাদা আস সাহমী (রা.), মাসয়াব ইবনে ওমায়র (রা.), মোয়াইকিব ইবনে আবু ফাতিমা আদদুসী (রা.), মেকদাদ ইবনুল আসওয়াদ আল কুন্দী (রা.), আবু ওবায়াদা ইবনুল জাতারাহ (রা.), খালিদ ইবনে হেজাম ইবনে খুওয়াইলীদ (রা.), (তিনি হেকম ইবনে হেজামের ভাই এবং হযরত খাদীজার ভাতিজা), উম্মুল মুমেনীন সওদা বিনতে জাময়া' (রা.) প্রমুখ। আল্লামা শামী তাঁর গ্রন্থে প্রথম হিজরত এবং দ্বিতীয় হিজরতের বিশদব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ বছর হযরত বিলাল, খাব্বাব ও আম্মারের (রা.) উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়। বিলাল (রা.)-কে মরুর তপ্ত বালুতে টানা হেঁচড়া করত তার মালিক। খাব্বাব (রা.) কে জ্বলন্ত উনুনের উপর উত্তপ্ত কয়লার মাঝে শুইয়ে রাখা হত। তার পিঠের মাংসের গলিত চর্বিতে আগুন নিভে যেত। এভাবেই গরীব ও গোলাম মুসলমানদের উপর তাদের মুশরিক ও কাফির মালিকরা নির্যাতন করত। আবু বকর (রা.) এদেরকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করে স্বাধীন করে দেন। এ বছর খালিদ ইবনে হেজাম ইবনে খুওয়াইলিদ (রা.) ইন্তিকাল করেন। হাবশা হিজরতের পথে তার ইন্তিকাল হয়। তার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আয়াত নাযিল হয়। 'আর যে কেউ বের হবে হিজরতের উদ্দেশ্যে, নিজ ঘর থেকে আল্লাহ ও রাসূলের তরে, তবে তার ছাওয়াব নির্ধারিত হয়ে আছে আল্লাহর নিকট।' (সূরা নিসা-১০০)।

একদিন মক্কার মুশরিক আবু জাহল, শাইবাহ, ওতবাহ, ওলীদ ইবনে ওতবাহ, আম্মারা ইবনে ওলীদ, ওতবাহ ইবনে আবি মুয়িত, উমাইয়া ইবনে খালফসহ মুশরিকদের দল মসজিদুল হারামে বৈঠক করছিলেন। মহানবী (সা.) কা'বার ছায়ার নীচে নামায আদায় করছিলেন। মসজিদে হারামের কাছেই এক লোক উট যবাই করেছিল। ঐসব কাফিরগণ পরস্পর পরামর্শ করল। তাদের থেকে কোন এক ব্যক্তি ঐ উটের ভুঁড়ি তুলে নিয়ে সিজদারত অবস্থায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথার উপর ফেলে দিবে। যেমন কথা তেমন কাজ। কাফিররা ঠিক সিজদারত অবস্থায় উটের পচা নাড়ি-ভুঁড়ি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথার উপর ফেলে দিল। হযরত ফাতেমা (রা.) তখন ছিলেন খুব ছোট। খবর শুনে দৌড়ে এসে হাজির হলেন ঘটনাস্থলে। মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ্যে শিশু ফাতিমার ঐ কথাই বলেছিলেন, যে কথাটি ফিরাউনের বংশের জনৈক মুমিন ব্যক্তি বলেছিলেন। 'তোমরা কি একজন মানুষকে কেবল এ কারণেই হত্যা করতে চাও যে, সে বলেছে আমার রব আল্লাহ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব হতভাগাদের নাম ধরে ধরে বদ দোয়া করেন। সে দোয়া অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয় বদরের যুদ্ধে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, 'আমি ওদের দেখেছি বদরের যুদ্ধের দিন। তারা সবাই বদরের কূপে লাশ হয়ে পড়েছিল।'

এ বছর হযরত সুমাইয়া ইবনে খুব্বাত (রা.) ইন্তিকাল করেন। দ্বীনের জন্য প্রথম শহীদ হয়েছিলেন হযরত আম্মার ইবনে ইয়াছিরের আম্মা সুমাইয়া (রা.)। তিনি শীর্ষস্তরের সাহাবী ছিলেন। তাঁকে দ্বীন থেকে ফিরানোর জন্য স্তরে স্তরে শাস্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর পদস্খলন ঘটেনি। একদিন অভিশপ্ত আবু জেহেল এসে, এ অবলা মহিলার লজ্জাস্থানে বর্ষার আঘাত হানে। তিনি তৎক্ষণাত শাহাদত বরণ করেন। ফলশ্রুতিতে এ সম্মানিত মহিলা ইসলামের প্রথম শহীদ হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেন। মুসলমানদের উপর যে কত বড় অত্যাচার ও যুলুম করা হত, তা এ শাহাদতের ঘটনা হতেই অনুমেয়। তবুও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসীম ধৈর্যধারণ করে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চালিয়ে যান। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পোশাক ধরে টানা হেঁচড়া করা হয়েছে; তার পবিত্র মুখে বালি ও থুথু মারা হয়েছে; পাথরের আঘাতে কপাল থেকে রক্ত ঝরেছে; শত-সহস্রবার জঘন্যতম অপমান করা হয়েছে। তবুও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতে তাবলীগের পথ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। চরম ধৈর্য নিয়ে, যুলুম অত্যাচার সহ্য করে দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে অবিচল থেকেছেন।

📘 মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব > 📄 নবুয়্যতের ৬ষ্ঠ বছর

📄 নবুয়্যতের ৬ষ্ঠ বছর


নবুওয়াতের ৫ম বা ৬ষ্ঠ বছর আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘোষণা দেন, আমি আপনাকে সমস্ত বিশ্বের মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছি। এ নির্দেশ পাওয়া মাত্র বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা বিশ্বের মানুষের জন্য দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করেন। সূরা ফুরকানের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, পবিত্র ও মহান সে সত্তা, যিনি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী কিতাব নাযিল করেছেন নিজের বান্দা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যেন তিনি সারা বিশ্ববাসীকে ভয় প্রদর্শন করেন (ফুরকান-১)। এ জন্যেই বিশ্বনবী বিদায় হজ্জে বলেছেন, উপস্থিত জনতার প্রত্যেকেই অনুপস্থিত জনতাকে আমার আনীত দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিবে। নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে কুরাইশ কাফিরদের নির্যাতনের কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরকাম ইবনে আবুল আরকামের গৃহে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি গোপনে নামায আদায় করতেন। এমন অবস্থায় একদিন বিস্ময়করভাবে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর ঘর থেকে বের হয়ে প্রকাশ্যে মসজিদুল হারামে গিয়ে জামায়াতে নামায আদায় করেন। দার এ আরকাম হচ্ছে মক্কা আল মুকাররমার মসজিদুল হারামের পার্শ্বে সাফা পাহাড়ের সংলগ্ন একটি স্থান।

হযরত ওমরের (রা.) ইসলাম গ্রহণ ছিল নবুওয়াতের দ্বিতীয় কিংবা পঞ্চম বছরের ঘটনা। হযরত ওমর (রা.) তখন ছিলেন ছাব্বিশ বছরের যুবক। তার আগে ঊনচল্লিশ জন নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ বছর হযরত ওমর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন আয়াত নাযিল হয়, 'হে নবী! আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর যারা ঈমানদার আপনার অনুসরণ করেছেন।' এ বছর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মোজেযা প্রকাশিত হয়। একটি গরুর বাচ্চা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ঘোষণা দেয়। ঘটনাটি হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের অন্যতম একটি কারণ হয়েছিল।

অভিশপ্ত আবু জাহল কুরাইশদের এক সমাবেশে বক্তব্য দানকালে বলে বসে, 'হে কুরাইশবাসী! মুহাম্মদ (সা.) আমাদের ধর্মকে বাতিল বলে থাকেন। আমাদের দেবতাদেরকে কটাক্ষ করেন। যে ব্যক্তি তার মাথা কেটে নিয়ে আসবে, তাকে একশত উট এবং একশত উকিয়া রৌপ্য পুরস্কার দিব।' এক উকিয়া চল্লিশ দিরহাম। ঘোষণা শুনে হযরত ওমর (রা.) কোষ থেকে তরবারী উন্মুক্ত করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন নাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আবতাহ নামক স্থানে পৌঁছার পর দেখতে পেলেন কতিপয় কাফির একটি গরুর ছানাকে হাত পা বেঁধে যবাই করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর গরুর বাচ্চার ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে, হে যুরাইহের বংশ! এক ব্যক্তি অত্যন্ত সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় সজোরে ঘোষণা দিচ্ছেন এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর দাওয়াত দিচ্ছেন।

এ ঘটনা দেখে হযরত ওমর (রা.) অভিভূত হয়ে পড়েন এবং তার অন্তরে ইসলামের সত্যতা অনুপ্রবেশ করে। পথিমধ্যে ওমর তার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব এর ঘরে যান। তার স্বামী সায়ীদ ইবনে যায়েদ (রা.) সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন সাহাবীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা উভয়েই সদ্য নাযিলকৃত সূরা 'তোহা' এর পাঁচটি আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন। ওমর যখন এ আয়াতটি শুনলেন, 'তোমরা যদি প্রকাশ্যে কথা বল; তবে তিনি চুপে চুপে বলা কথা এবং তার চেয়েও গোপনে বলা কথা জানতে পারেন। তিনি (আল্লাহ) এমন যে, তিনি ছাড়া আর কোন মা'বুদ নেই। তার সুন্দর নামসমূহ রয়েছে।' (সূরা তোহা-৭)। এ আয়াত শুনে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। যেন তার প্রাণ ওষ্ঠাগত হতে যাচ্ছিল। সংগে সংগে দরবারে রিসালাতে এসে হাজির হন। দ্বীন ইসলামের কাছে মস্তক অবনত করে দেন। ফলে মুসলমানদের মাঝে নারায়ে তকবীরের আওয়াজে আকাশ ভারী হয়ে উঠে।

হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ! আবু জাহল ইবনে হিশাম অথবা ওমর ইবনে খাত্তাবের মধ্যে যাকে তুমি পছন্দ কর তার দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী কর।' দোয়া কবুল হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পরদিন হযরত ওমর (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কদমে লুটিয়ে পড়েন। বিশ্বনবী বুধবারে দোয়া করেছেন আর বৃহস্পতিবারে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ করার ফলে মুসলমান জনতার মধ্যে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। ইসলামের মান মর্যাদা ব্যাপক হয়ে উঠে।

ইসলাম গ্রহণ করেই সাহসী বীর হযরত ওমর (রা.) মক্কার বাজারে বেরিয়ে পড়েন। হাতে ছিল খোলা তরবারী। কালিমার শব্দে মক্কার মাটি থরথর করে কাঁপছিল। তিনি যালেম কাফিরদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেন, তোমাদের যে কেউ আপন স্থান ত্যাগ করবে, আমার তরবারী তাকে এমন আঘাত হানবে যে, সে মাটির সংগে মিশে যাবে। ইসলাম গ্রহণের পর ওমর (রা.) প্রকাশ্যে কাবা ঘরে নামায পড়েন। এরপর হযরত ওমর (রা.)-এর সন্তান আব্দুল্লাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। আল্লামা আমির আল রিয়াজুল মুস্তাবাহ কিতাবে লিখেছেন, ইবনে ওমর তাঁর পিতার সংগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

এ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দারে আরকামে অবস্থান করছিলেন তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর মাতা উম্মুল খায়র সালমা বিনতে ছখর মুসলমান হয়েছিলেন। এ বছর দারে আরকামে অবস্থানকালীন সময়ে আয়াস ইবনে বুকাইর ইবনে আবদে ইয়ালিল ইবনে নাশিব আল কেনানী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বদর, উহুদ, খন্দকসহ সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তেমনিভাবে তার তিনজন সহোদর ভাই আমির, আকিল এবং খালিদ ইবনে গাজওয়াহ (রা.) বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাছাড়া তার তিনজন বৈপিত্রয় ভাই মুয়াওয়াজ, মায়াজ এবং আওফর (রা.) বদর যুদ্ধে কৃতিত্বের ও বীরত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার মাতা হলেন প্রখ্যাত মহিলা সাহাবী আফরা বিনতে ওবায়েদ ইবনে ছা'লাবা আল আনসারী। এ বছর মক্কায় কাফির ও মুনাফিকদের অত্যাচার এত বেড়ে গিয়েছিল যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দারে আকরামে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। এ সময় কাফিররা আবু বকর (রা.)-কে এমনভাবে প্রহার করেছিল যে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। আবু বকর (রা.) এর যখন জ্ঞান ফিরে আসে, তিনি নিজের কথা না ভেবে বারবার শুধু বলছিলেন, আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন? তাকে রাসূলের ব্যাপারে নিশ্চিত করা হলে, তিনি শান্ত হন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আবু বকরের (রা.) এটা ছিল অকৃত্রিম ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। এজন্যেই মুমিনদের মাঝে আবু বকরের মর্যাদা এতবেশী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00