📄 নবুয়্যতের ১ম বছর
নবুওয়াতের প্রথম বছরটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের একচল্লিশতম বর্ষ। তিনি নবুওয়াত ও রিসালাত প্রাপ্ত হন ঠিক চল্লিশ বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটিতে (বুখারী, মুসলিম)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে অথবা রমযান মাসে নবুওয়াত লাভ করেছেন। রবিউল আউয়াল থেকে স্বপ্ন যোগে নবুওয়াতের সূচনা হয়েছিল এবং এ অবস্থা ছয় মাস পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অতঃপর রমযান শরীফে লাইলাতুল কদরে প্রিয়নবী যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন তখন জিব্রাঈল (আ.) এর শুভাগমন হয় এবং কুরআন নাযিল হওয়া আরম্ভ হয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, 'রমযান সেই মহিমান্বিত মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।' অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, 'আমি কদরের রাত্রিতে কুরআন নাযিল করেছি।' (১ ফেব্রুয়ারী ৬১০ খ্রীঃ) বিশ্বনবী হেরা গুহায় গভীর ইবাদতে মগ্ন। অকস্মাৎ তাঁর কাছে ফিরিশতা জিব্রাঈল (আ.) উপস্থিত হলেন। ফিরিশতা জিব্রাঈল (আ.) আত্মপ্রকাশ করেই বলেন, ইকরা, (পড়ুন)। উম্মি নবী বলেন, আমি পড়তে জানি না। এরপর জিব্রাঈল (আ.), প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জড়িয়ে ধরে ছেড়ে দিয়ে, একই প্রশ্ন করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই উত্তর দেন। এরপর পুনরায় ফিরিশতা, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জড়িয়ে চেপে ধরে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় একই প্রশ্ন করেন। এভাবে তিনবার তাদের মধ্যে কথোপকথন হয়। ৪র্থ বার জিব্রাঈল (আ.) আল কুরআনের সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত পাঠ করেন। ইকরা বিস্মি রব্বিকাল্লাযী খলাক্বা, খলাকুল ইনসানা মিন আলাক্বা, ইকুরা ওয়া রব্বুকাল আকরমুল্লাযী আল্লামা বিলকুলাম; আল্লামাল ইনসানা মা-লাম ইয়ালাম। অর্থাৎ, পড়ুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন আপনার প্রতিপালক সম্মানিত। যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে সে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না। (সূরা আলাক্ব: ১-৫)।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে আয়াতগুেেলাকে পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তা তাঁর অন্তরে বসে গেল। অতঃপর যখন তিনি হেরা পাহাড়ের গুহা হতে বের হয়ে এলেন, তখন তাঁর অবস্থা এরূপ ছিল যে, অন্তর (অহীর ভারে) কাঁপছিল। তিনি ঘরে প্রবেশ করেই বললেন, আমাকে চাদর জড়িয়ে দাও! নবী পত্নি খাদীজা (রা.) তখনই তাঁর গায়ের উপর চাদর জড়িয়ে দিলেন। এরপর যখন তিনি একটু শান্ত হলেন; তখন খাদীজাকে (রা.) সমুদয় ঘটনা বর্ণনা করে শুনালেন। অতঃপর বললেন, আমার প্রাণের ভয় হচ্ছে। হযরত খাদীজা (রা.) একথা শুনে আরয করলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না। কেননা, আপনি আত্মীয়তার হক পালন করেন, মেহমানদের মেহমানদারী করেন, অসহায়দের সহায়তা করেন, অভাবগ্রস্তদের জীবিকা নির্বাহের উপায় করে দেন, ইত্যাদি। আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে মর্যাদাবান ও সম্মানিত করবেন।
হৃদয়ের পবিত্রতা এবং জ্ঞানের গভীরতা আছে বলেই হযরত খাদীজা (রা.) আরব সমাজে 'তাহেরা' নামে পরিচিত ছিলেন। এমনকি সৃষ্টির সেরা মহামানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণী হওয়ার এবং এভাবে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিণী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবি খাদীজার এরূপ আলাপ আলোচনার পর তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার চাচাতো ভাই 'ওয়ারাকা বিন নওফেলে'র নিকট নিয়ে গেলেন। ওয়ারাকা জাহেলী যুগের ঐ সকল লোকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যারা সত্যিকার খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন এবং ইঞ্জীল কিতাব লিখতেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সী অতিশয় দুর্বল ও অন্ধ ছিলেন। হযরত খাদীজা (রা.) ওয়ারাকাকে বললেন: ভাই! আপনি আপনার ভগ্নিপতির ঘটনাটি শ্রবণ করুন। ওয়ারাকা জিজ্ঞাসা করলেন, অবস্থা কি? তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংঘটিত পুরো ঘটনা পুরোপুরি বর্ণনা করে শুনালেন। ওয়ারাকা শুনে বললেন, ইনি সেই ফিরিশতা (জিব্রাঈল) যিনি হযরত মূসা আলাইহিস সালাম-এর নিকট অহী নিয়ে আসতেন। তিনি আরো বলেন: কতইনা ভাল হত, যদি আমি সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম যখন আপনার কওম আপনাকে জন্মভূমি (মক্কা) হতে বের করে দিবে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, আমার কওম কি আমাকে জন্মভূমি হতে গৃহহীন করবে? ওয়ারাকা বললেন, নিঃসন্দেহে এরূপ হবে এবং যে পয়গাম পৌঁছাবার জন্য আল্লাহ আপনাকে পয়গাম্বর বানিয়ে পাঠিয়েছেন আর এ খেদমতের জন্য যিনিই আদিষ্ট হয়েছেন তাঁরই এ অবস্থা হয়েছে। অতএব, যদি সে সময়টুকু আমার জীবিত কালেই আসে, তবে আমি পূর্ণ শক্তি দিয়ে আপনার সাহায্য করব। কিন্তু ওয়ারাকা সে সময়টি আর পাননি। এর পূর্বেই তিনি পরলোক গমন করেন (বুখারী)। নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রথম দিকে গাছপালা এবং পাথর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম জানাতো। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'নবুওয়াতের শুরুর লগ্নে আমি যে গাছ কিংবা পাথরের নিকট দিয়ে চলতাম তারা আমাকে এভাবে সালাম দিত, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।' অপর এক হাদীসে আছে যে, মক্কায় এমন দু'টি পাথর আছে যেগুলো আমাকে নবুওয়াতের প্রথম দিকে সালাম জানাত। কোন কোন আলেম বলেন, এর অর্থ হাজরে আসওয়াদ, আবার কেউ কেউ বলেন, সেটা ছিল অপর একটি পাথর, যা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর বাড়ির কাছে ছিল।
এরপর ২য় পর্যায়ে অহী নাযিল হয় সূরা মুদ্দাছছিরের প্রথম ৪ আয়াত নিয়ে। তাতে বলা হয়, হে কম্বল আবৃত (নবী) উঠো এবং মানুষকে ভয় প্রদর্শন কর, আর তোমার রবের বড়ত্ব/শ্রেষ্ঠত্ব/মহত্ত্ব প্রকাশ কর, তোমার পোশাকসমূহ পবিত্র কর। (সূরা মুদ্দাছছির: ১-৪)। এ আয়াতগুলো মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যকে পূর্ণতা দিতেই নাযিল হয়েছে। কেননা, সূরা আলাকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চ মানবতাবোধ তথা জ্ঞান অর্জনের জন্য সঠিক ইলমের কথা বলা হয়েছে। যেখানে আমল নেই, সেখানে ইলমের উপকারিতা নিষ্ফল হয়ে যায়। আর উল্টো যেখানে আমল আছে কিন্তু ইলম নেই, সেখানে এ আমল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই হিদায়েত ও সিরাতুল মুস্তাকিমের জন্য ইলম, আমল উভয়টির প্রয়োজন রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে নাযিলকৃত আয়াতগুলোতে পড়া, জ্ঞানার্জন করা বা ইলমের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে নাযিলকৃত আয়াতগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের ব্যাপারে জোর তাগিদ এসেছে।
পবিত্র কুরআনে অহী নাযিলের প্রথম স্তরে সূরা আলাকে হিতকর ইলমের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় স্তরে সূরা মুদ্দাছছিরে হিতকর আমলের মৌলিক বিষয়গুলো তথা দাওয়াত ও তাবলীগের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সূরা আলাকের আয়াতগুলোতে হেরা গুহায় নাযিলকৃত যে অহীর কথা বলা হয়েছে তা ছিল ইলম নামক গুণের প্রকাশক্ষেত্র। যা ছিল অহীর প্রথম স্তর। প্রাথমিক পর্যায়ে অহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ ও মনে খুব বেশি চাপ পড়ত। তখনও তিনি অহী গ্রহণে ভালভাবে অভ্যস্ত হননি। তাই প্রথম দিকে ঘন ঘন অহী নাযিল হত না। প্রতি বার অহী আসার পর কিছুদিন বন্ধ থাকত। এভাবে কয়েকবার বিরতি দিয়ে যখন তিনি অহী গ্রহণের অভ্যস্ত হন, তখন তা ঘন ঘন নাযিল হতে থাকে। দ্বিতীয় স্তরে হিতকর আমলের মৌলিক বিবরণ তথা দাওয়াত ও তাবলীগের প্রকাশ করে সূরা মুদ্দাছছিরের উপরোক্ত আয়াত ক'টি নাযিল হয়। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাছের মানুষদের মাঝে ব্যাপক দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। নিজের স্ত্রী, কন্যা, পালকপুত্র, বন্ধু আবুবকর, বালক আলী (রা.) কে দ্বীনের দাওয়াত দেন।
এরপর ছয়মাস পর তৃতীয় পর্যায়ে পুনরায় অহী নাযিল হয় সূরা দ্বোহার পাঁচ আয়াত নিয়ে। এখানে বলা হয়েছে, শপথ উজ্জ্বল দিনের এবং রাতের যখন তা প্রশান্তির সাথে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। (হে নবী) আপনার রব আপনাকে ত্যাগ করেননি, না তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নিঃসন্দেহে আপনার জন্য পরবর্তী অবস্থা প্রথম অবস্থার চেয়ে উত্তম। আর শীঘ্রই আপনার রব আপনাকে এত দিবেন যে, আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। (সূরা আদ্ব দ্বোহাঃ ১-৫)। প্রথম অহী নাযিলের পর কিছু কালের জন্য অহী নাযিল হওয়ার ধারা বন্ধ ছিল। অহী প্রেরণ বন্ধ থাকার এ সময়সীমা অধিকাংশের মতে ছয় মাসের মত ছিল। তখন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে চিন্তা ঢুকলো যে, না জানি আমার এমন কোন ভুল ত্রুটি হয়ে গেছে, যার কারণে রব আমার উপর নারাজ হয়ে আমাকে ত্যাগ করেছেন। তখন উল্লিখিত সূরা দ্বো-হা ও সূরা ইনশিরাহ নাযিল করে আল্লাহ তাঁর হাবীবকে সান্ত্বনা প্রদান করেন। মূলতঃ এটা ছিল অহী নাযিলের তৃতীয় স্তর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে যে, আপনার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে অহী বন্ধ করা হয়নি। এখানে দিনের ও রাতের কসম খেয়ে আল্লাহ একথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, দিনের আলোতে পরিশ্রম করার পর বিশ্রামের জন্য রাতের অন্ধকার যেমন দরকার; তেমনি অহী আসার কারণে আপনার উপর যে কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে, যার ফলে আপনি শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে ক্লান্ত হয়ে যান। মাঝে মাঝে আপনার একটু বিশ্রামের দরকার। অহী, দিনের আলোর মতই আপনাকে কাজে ব্যস্ত রাখে। আর রাতের মত বিশ্রাম নেয়ার উদ্দেশ্যে অহী বন্ধ রাখা হয়। কাজেই অহী বন্ধ রাখাটাও একটি প্রয়োজনীয় কাজ। এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। এরপর তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে (পরিবার এবং অতি আপনজনের মাঝে) ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অতঃপর ধারাবাহিকভাবে তাওহীদ, আখিরাত ও রিসালতের বিষয়ে অহী নাযিল হতে থাকে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধীরে ধীরে অহী নাযিলের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন। পুরো ব্যাপারটিই ছিল রহস্যময়, বিস্ময়কর, মহাসত্য এবং অতিমানবীয়। সকল নবীদের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে। তবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে অহী নাযিলের ঘটনা ঘটেছে অহরহ, ব্যাপকভাবে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে। সবকিছুই মহান প্রতিপালকের ইচ্ছা। তিনিই জানেন এর প্রকৃত অবস্থা, প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যাপকতা। তবে প্রথম পর্যায়ে যে সকল ভাগ্যবান এবং হিদায়াত প্রাপ্ত নর-নারী ইসলাম গ্রহণ করেছেন; তাদের মর্যাদা বর্ণনা করার মত কোন ভাষা সৃষ্টি হয়নি। তদুপরি সেসব বুদ্ধিমান ও আলোকিত নর-নারীরা প্রথম পর্যায় থেকে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেছেন অর্থাৎ ইসলাম প্রচার করেছেন। তাদের মর্যাদা এবং আমলে সলিহাত কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। কেননা যার তাবলীগের কারণে অন্য কেউ মুসলমান হয়েছে, সে তার সমপরিমাণ আমলের বদলা নিজের আমলনামায় পেতে থাকবে। এ কারণেই আবু বকর (রা.) এর আমলনামার ওজন, সমগ্র উম্মতে মুহাম্মদীর আমলনামার চেয়েও অধিক। একজন সাহাবীর আমলনামার ওজন, আলেম, আবেদ, গাজী, শহীদ তথা যেকোন পীর বা অলীর চেয়েও ওজনদার। আল্লাহপাক সকল উম্মতে মুহাম্মদীকে দাওয়াত ও তাবলীগের মহত্ত্ব বুঝার তৌফিক দিন।
উম্মুল মুমেনীন হযরত খাদীজা (রা.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। পুরুষ এবং মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণের কৃতিত্বের অধিকারী তিনি। আল্লামা ছালাবী, আল্লামা ইবনে আব্দুল বারী, আল্লামা সুহাইলী প্রমুখ আলেমগণ এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা বর্ণনা করেছেন। ইবনে কাছির লিখেছেন যে, উম্মতের সর্বসম্মত ঐক্যমতে নারী পুরুষের মধ্যে হযরত খাদীজা (রা.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে অনেক আগেই খাদীজার (রা.) বিয়ে হয়েছিল। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স সর্বাধিক বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে ২৫ বছর ছিল এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বর্ণনা মোতাবেক সেসময় হযরত খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চার কন্যা হযরত জয়নাব (রা.), ফাতেমা (রা.), রুকাইয়্যা (রা.) এবং উম্মে কুলসুম (রা.); মা খাদীজার (রা.) সংগে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।
আবু বকর সিদ্দীক (রা.) প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী ইসলাম গ্রহণে প্রথম স্থান দখলকারী পুরুষ। পুরুষের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ছিলেন সর্বপ্রথম মুসলমান, তাতে কারো কোন দ্বিমত নেই। বয়সে তিনি (রা.) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে দু'বছরের ছোট ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বহু আগেও মহানবীর (সা.) নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ১২ বছর বয়সে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় চাচা আবু তালিবের সংগে সিরিয়া সফরে গিয়েছিলেন (বুহাইরা নামক পাদ্রীর যুগে), তখন আবু বকর সিদ্দীকও (রা.) সে সফরে সংগী ছিলেন। পাদ্রী বুহাইরা, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করেছিলেন। তখন থেকে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভক্ত ছিলেন। তবে সেটাকে ইসলাম বলা যাবে না। ভক্তি বা বিশ্বাস বলা যাবে। কারণ সেটা ছিল নবুওয়াতের পূর্বের ঘটনা। অথচ নবুওয়াতের উপর বা নবীর স্বীকৃতির উপর বিশ্বাস স্থাপনকে ইসলাম বলে। বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ভোরে নবুওয়াত লাভ করেন এবং সে দিন বিকালেই হযরত আবু বকর (রা.) এর গৃহে ইসলাম পৌঁছে যায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপকভাবে অথচ গোপনে নিকটজন, পরিবার ও অন্তরঙ্গ আপনজন বা সঙ্গীদের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। খুব দরদ দিয়ে দাওয়াতের প্রচার করতেন। দিনরাত দাওয়াতের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, আমার কাজ কি? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বলেন, আমার যে কাজ, তোমারও সে কাজের অনুসরণ করা অর্থাৎ দাওয়াত ও তাবলীগ করা। আবু বকর (রা.) মক্কার সম্মানী লোক ছিলেন। তিনি দাওয়াতের সময় রাহবারীর দায়িত্ব পালন করতেন। আর প্রিয়নবী ছিলেন ক্ষুদ্র জামাতের মুতাকাল্লিম। প্রথম অবস্থায় এভাবেই দু'জনের জামাত মক্কার বাড়ি বাড়ি, ঘরে ঘরে, দাওয়াতের কাজ করত।
হযরত আলী (রা.), হযরত আবু বকরের (রা.) পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। অপর এক বর্ণনা মতে হযরত আবু বকরের আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথম বক্তব্য প্রসিদ্ধ এবং বিশুদ্ধও বটে। এর সমর্থনে জানা যায় যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবারে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন এবং হযরত আলী (রা.) এর পরদিন মঙ্গলবার ইসলাম গ্রহণ করেন। এদিকে খাইসামা প্রমুখ হযরত আলীর (রা.) উক্তি বর্ণনা করেছেন। আলী (রা.) বলেন, আবু বকর ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে আমার চেয়ে এগিয়ে গেছেন। তাছাড়া হযরত আলী (রা.) তখন নাবালক বাচ্চা ছিলেন। ৮ বা ১০ বছর ছিল তার বয়স। ১০ বছরের কথা বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। কেননা সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনায় রয়েছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের ত্রিশ বছর পরে তার জন্ম হয়েছে। এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ও পালক পুত্র যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। আলী ইবনে আবু তালিবের (রা.) পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
অতঃপর ইসলামের দিকে অগ্রবর্তী অনেক সাহাবীগণ ইসলাম গ্রহণ করেন যেমন হযরত ওসমান (রা.), যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা.), হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.), হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) ইসলামী ভ্রাতৃত্বে প্রবেশ করেন। উপরোক্ত পাঁচজন মহান ব্যক্তিবর্গ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর দাওয়াত ও তাবলীগের ফলে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই তাঁদেরকে দরবারে নববীতে নিয়ে আসেন। আবু বকরের (রা.) দাওয়াত ও তাবলীগের ফলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুয়াযিযন হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) ইসলামে দীক্ষিত হন। তিনি ইসলামের সর্বপ্রথম মুয়াযিযন হওয়ার গৌরবের অধিকারী। তাঁর মাতা হামামাহও মুসলমান হয়েছিলেন। সে হিসেবে তাকে বিলাল ইবনে হামামাহও বলা হয়। হযরত বিলাল (রা.) এক মুশরিকের গোলাম ছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে নয় উকিয়া খাদ্যের বিনিময়ে খরিদ করে আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এ জন্য তাঁকে (রা.) মাওলায়ে আবু বকর বলা হত। এরপর আমির ইবনে ফুহাইর ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর আযাদকৃত গোলাম।
ইসলামের শুরুতেই হযরত আবু যর গিফারী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম জুনদুব ইবনে জানাদাহ। ইসলামে প্রবেশে তাঁর স্থান হচ্ছে চতুর্থ বা পঞ্চম। তাঁর পূর্বেই (কয়েকদিন আগে) তাঁর বড় ভাই উনাইস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর উভয় ভাই নিজ গোত্র বনী গিফারে ফিরে যান। সে গোত্রের লোকেরা হারামাইন শরীফাইনের মধ্যবর্তী স্থলে বসবাস করতেন।
এরপর বিশ্বনবীর (সা.) সান্নিধ্যে মদীনায় আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালের সময় পর্যন্ত মদীনায় অবস্থান করেন। উমাইয়্যাহ ইবনে খালফ এর এক গোলাম আবু ফকীহা প্রথমদিকেই মুসলমান হন। হযরত বিলাল (রা.) সহ এ দু'জন একই দিনে মুসলমান হন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রা.) ইসলামের প্রারম্ভে শান্তির ধর্মে দীক্ষিত হন। তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াসির (রা.), পিতা ইয়াসির বিন আমির (রা.), মাতা সুমাইয়া বিনতে সালাম (রা.) প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আম্মার এবং হযরত সোহাইব (রা.) একইদিনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতামাতা এবং তাঁর ভাই কিছুদিন পরে মুসলমান হন। হযরত সোহাইব ইবনে সিনান রুমী (রা.) প্রথমদিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এক বর্ণনা মতে হযরত সোহাইব (রা.) ত্রিশ পয়ত্রিশ ব্যক্তির পরে এমন সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারে আরকামে অবস্থান করছিলেন। তবে এ উক্তিটি দুর্বল।
হযরত খাব্বাব ইবনে আরত তামিমী (রা.) শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের দিক থেকে ৬ষ্ঠ। হযরত মুসআব ইবনে ওমাইর (রা.) আলকুরশী, যা কুরাইশ বংশের একটি শাখা বনী আব্দুদ দার এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আদয়ামা ইবনে রবিআ (রা.), আরকাম ইবনে আবু আরকাম (রা.) এ দু'জন ছিলেন কুরাইশের একটি শাখা, বনু মাখজুমের অন্তর্ভুক্ত। ওসমান ইবনে মাজউন (রা.) এবং তার দু'ভাই ক্বাদামা ইবনে মাজউন (রা.) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাজউন (রা.) প্রারম্ভেই ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথমে উল্লিখিত চারজনই আবু বকরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবুওয়াতের প্রথম বছরেই আবু ওবায়দা ইবনে আমির (রা.), ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে জাতারাহ আলকুরশী ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র কণ্ঠে আমীনুল উম্মত খেতাবে ভূষিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফাত ভাই আবু সালামা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ আলকুরশী আলমাখজামী (রা.) নবুওয়াতের প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম বাতারা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব। ইসলাম গ্রহণের হিসেবে তার স্থান একাদশ। হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এর ভাই প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আল্লামা ইবনুল আছির উসদুল গাবা গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি দশজন পুরুষের পরে ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং ওবায়দা ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে মানাফ আলকুরশী আল মুত্তালিবী (রা.) নবুওয়াতের প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাত ভাই হযরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং সায়ীদ ইবনে যায়েদ (রা.) নবুওয়াতের প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা দশজন সুসংবাদ প্রাপ্ত সাহাবার অন্তর্ভুক্ত। খুনাইস ইবনে হুজাফা আসসাহমী (রা.) প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ কেউ বলেছেন নবুওয়াতের পঞ্চম সনে হযরত জাফরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে। সায়ীদ ইবনে আবুল আস এর আযাদকৃত গোলাম মুয়াইনকীব ইবনে আবু ফাতেমা (রা.) প্রথম বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। এবছর ইবনে নাওফল ইবনে আসাদ ইবনে আব্দুল উজ্জা ইবনে কুসাই ইবনে কেলাব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। ওয়ারাকা তখনই ঈমান আনেন যখন মা খাদীজা (রা.) মহানবীকে ওহী নাযিলের পর তার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তখন হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার নিকট কিভাবে ওহী আসে? বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ওহী নাযিলের অবস্থা বর্ণনা করেন এবং ওয়ারাকা তা সমর্থন করেন। শরহে মাওয়াহিবে জুরকানী লিখেছেন যে, ওয়ারাকা (রা.) নিশ্চিতভাবেই মুসলমান ছিলেন। প্রখ্যাত সাহাবী আরকাম ইবনে আরকাম আল কুরশী আল মাখজুমী (রা.) প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। জুরকানী লিখেছেন তার ইসলাম গ্রহণ সাত বা দশ জনের পরেই ছিল।
এ বছর খালিদ ইবনে সায়দ ইবনুল আস ইবনে উমাইয়া আল কুরশী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবনে আছির উসদুল গাবায় এবং জুরকানী শরহে মাওয়াহিবে লিখেন ইসলাম গ্রহণের ধারাবাহিকতায় তার স্থান চতুর্থ অথবা পঞ্চম ছিল। ইসলাম গ্রহণ করায় তার পিতা তাকে কঠোর শাস্তি দিতেন। এমনকি তার খানা-পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কাজেই আবিসিনিয়ার দ্বিতীয় হিজরতের সময় অপরাপর অন্যান্য হিজরতকারী সংগীদের সংগে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। খায়বার বিজয়ের পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও খায়বারে অবস্থান করছিলেন; এমনি সময় তিনি সাথী সংগীদের নিয়ে নৌকা যোগে আবিসিনিয়া থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। পরবর্তীতে তিনি ওমরাতুল কাযা, মক্কা বিজয়, হুনাইন, তায়েফ এবং তাবুক ইত্যাদি অভিযানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগী ছিলেন। তাঁর কন্যা উম্মে খালিদ বিনতে খালত ইবনে সায়ীদ ইবনুল আস (রা.) এর জন্ম হয় আবিসিনিয়াতে। তার নাম ছিল উম্মা। তিনিই সেই কন্যা; যার বিবরণ বুখারীতে রয়েছে যে, তিনি যখন নিজ পিতার সংগে হাবশা (আবিসিনিয়া) থেকে ফিরে আসেন, তখন মহামনী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কুসুম রং এর জামা পরিয়ে ছিলেন। এ মেয়ে ঐ রং এর কাপড় পরে আনন্দিত হয়ে উঠে। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবিসিনিয়ার ভাষায় ইরশাদ করেন, "উম্মে খালিদ পোশাকটি খুবই সুন্দর না? খুবই সুন্দর"। উতবা ইবনে গাজওয়ান মাজনী (রা.) এ বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। হযরত মিকুদাদ ইবনে আমর আল কান্দী (রা.) প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
প্রথম দিকেই হযরত ওমর (রা.) এর বোন হযরত ফাতিমা বিনতে খাত্তাব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে হযরত খাদীজা (রা.) এবং তাঁর কন্যাদের পর তিনি হলেন সর্বপ্রথম মহিলা, যিনি ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছিলেন। অর্থাৎ সাবালগ মহিলাদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় মহিলা, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ভাই হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বর্ষে বোনের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসিরের (রা.) আম্মা ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধাত্রী হযরত উম্মে আয়মন (রা.) নবুওয়াতের প্রথম বছর ইসলাম গ্রহণ করেন। তার নাম ছিল বারাকাহ। তিনি হচ্ছেন হযরত উসামা ইবনে যায়েদের (রা.) মাতা। হযরত আব্বাস (রা.) ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের (রা.) স্ত্রী উম্মুল ফযল (রা.) প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার নাম ছিল লুবাবা। কেউ কেউ বলেন, তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর দীর্ঘদিন পরে নবুওয়াতের দ্বিতীয় কিংবা সপ্তম বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন। কারো কারো মতে হযরত খাদীজার (রা.) পরে দ্বিতীয় মহিলা হলেন উম্মুল ফযল (রা.), যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এ গৌরবের অধিকারী হযরত ফাতেমা বিনতে খাত্তাবই (রা.) ছিলেন। বরং উম্মে ফযলের (রা.) আগে ফাতেমা (রা.) ছাড়াও হযরতের আম্মারের (রা.) মাতা সুমাইয়া (রা.) এবং উম্মে আইমনও (রা.) ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছিলেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর কন্যা হযরত আসমা (রা.) প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তিনি ছিলেন সাত বৎসরের মেয়ে। তিনি ছিলেন উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়িশার (রা.) চেয়ে দশ বছরের বড়। এর আগে আঠার জন পুরুষ ও মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা.) মাতা উম্মে আবদ বিনতে আবদ (রা.) প্রথম বছরেই ইসলাম গ্রহণ করেন।
নবুওয়াতের শুরুতেই আসমানের সংবাদ অবগত হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য শয়তানদের উপর সর্বদিক থেকে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা বর্ষিত হতে থাকে। এর আগে তারা আসমানী বার্তা শুনে শুনে গণকের কাছে পৌঁছে দিত। আল্লামা কাজরুনী তাঁর সীরাত গ্রন্থে লিখেছেন যে, শয়তানদের উপর তারকা নিক্ষেপের ঘটনা নবুওয়াতের বিশ দিন পর থেকে শুরু হয়।
সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত যা জিব্রাঈল (আ.) ওহীর সূচনায় হেরা গুহায় নিয়ে এসেছিলেন, অবতরণের পর জিব্রাঈল (আ.) হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে আসেন। একস্থানে পায়ের গুড়ালী দিয়ে আঘাত করেন। ফলে সেখান থেকে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হতে থাকে। ওযু এবং নামাযের নিয়ম পদ্ধতি শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে হযরত জিব্রাঈল (আ.) সেখানে ওযু করেন এবং দু'রাকাত নামায আদায় করেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মনযোগসহকারে তা প্রত্যক্ষ করেন। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মাত্র দু'বেলা নামাযের নির্দেশ প্রদান করা হয়। দু'রাকাত ফজর এবং দু'রাকাত আসরের নামায মি'রাজের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। নামাযের এ বিধানই চলে আসছিল। নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষে মি'রাজের সময় পাঁচ বেলা নামাযের যথারীতি বিধান দেয়া হয়।
ওহী নাযিলের প্রথম দিনে জিব্রাঈল (আ.) মানুষের রূপ ধরে হাজির হয়েছিলেন। এতে হয়ত ধারণা করা যেত যে, সম্ভবতঃ তিনি কোন মানব অথবা জীন হতে পারেন। এ সংশয়টি দূর করার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আকাঙ্ক্ষা ছিল যেন জিব্রাঈল (আ.) তাঁর আসল ফিরিশতার রূপ ধারণ করে হাজির হন। একদা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হেরা পর্বত এবং মক্কা শরীফের মধ্যবর্তী কোন একস্থানে উপস্থিত ছিলেন তখন জিব্রাঈল (আ.) তার প্রকৃত রূপ ধারণ করে হাজির হলেন। এ সময় তিনি মহাশূন্যে চেয়ারের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন যে, তাঁর সমস্ত শরীর মোবারক থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত ঘরে ফিরে আসেন এবং হযরত খাদীজা (রা.) কে বলেন, 'আমাকে কম্বলে জড়িয়ে দাও। আমাকে কম্বল দিয়ে আবৃত কর।' আর এক বর্ণনায় আছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমাকে চাদরে জড়িয়ে দাও, চাদর দিয়ে জড়িয়ে দাও।' কাপড় জড়িয়ে তিনি শুয়ে পড়েন। এরপর ভীতি দূর হয়ে গেলে প্রশান্তি লাভ করেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি হযরত খাদীজার জীবন উৎসর্গের সুফল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার পক্ষ থেকে এভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল যে, হেরা গুহায় খাদীজার প্রতি মহান আল্লাহর সালাম নিয়ে হযরত জিব্রাঈল (আ.) আগমন করেন। হযরত জিব্রাঈল (আ.) এসে বলেন, 'হে রাসূল! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার পক্ষ থেকে সালামের সাথে সাথে আমার সালামও খাদীজাকে পৌঁছে দিবেন।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহ এবং ফিরিশতাকুলের সর্দার হযরত জিব্রাঈলের (আ.) সালাম খাদীজা (রা.) এর দরবারে পেশ করেন। খাদীজা (রা.) সালামের জবাব দেন। উক্ত জবাবের মাধ্যমে তার তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং প্রাঞ্জল ভাষার সৌন্দর্য ফুটে উঠে। 'আল্লাহ নিজেই সালামের অধিকারী। শান্তি, নিরাপত্তা ও সালাম তাঁরই পক্ষে থেকে আসে। হে নবী! আপনার প্রতি সালাম। জিব্রাঈলের প্রতি সালাম এবং প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির উপরেও সালাম, যে তা শুনবে। কিন্তু শয়তানের উপর না।
📄 নবুয়্যতের ২য় বছর
নবুওয়াতের ২য় বছরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর জন্ম হয়। উহুদের যুদ্ধের বছর তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ। বয়স কম হওয়ার কারণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেননি। নবুওয়াতের ২য় বছরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা হযরত হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। আল ইসাবা গ্রন্থে হাফিয এ উক্তিকে খুবই সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। আল মাওয়াহেবে লাদুনিয়ার রচয়িতা একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে সীরাত গ্রন্থের অধিকাংশ লেখকদের মতে তিনি নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ বছরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। একদিন মুহাম্মদ (সা.) সাফা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। আবু জেহেল সেখানে গিয়ে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালিগালাজ করে এবং একখণ্ড পাথর ছুঁড়ে মারে। এতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ফেঁটে দরদর করে রক্ত প্রবাহিত হয়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন প্রতিবাদ না করে রক্তমাখা মুখ নিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। এক ক্রীতদাসী ঘটনাটি রাসূলের চাচা হামযার কাছে বলে দেন। হামযা শিকার থেকে বাড়িতে ফিরেছিলেন মাত্র। তিনি সিংহের মত গর্জে উঠেন। কা'বার কাছে গিয়ে ধনুক দিয়ে আবু জেহেলের মাথায় আঘাত করেন। আবু জেহেল বলে, আমি ধর্মের জন্য এ কাজ করেছি। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথায় আঘাত করেছি। হামযা তখন চিৎকার করে কলেমা তৈয়বা পাঠ করে মুসলমান হয়ে যান এবং বলেন, তবে শুনে রাখ আমিও মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করলাম। হযরত হামযার (রা.) মত বীর সাহসী কুরাইশ নেতার ইসলাম গ্রহণে মুসলমানরা অন্তরে প্রশান্তি লাভ করে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। নবুওয়াতের ২য়, মতান্তরে ৩য় সনে হযরত রুকাইয়্যা (রা.) এর বিয়ে হযরত ওসমান (রা.) এর সংগে অনুষ্ঠিত হয়। তবে মাওয়াহিবে লাদুনিয়া এবং সীরাতে শামীরায় এসেছে, যখন 'তাব্বাত ইয়াদা' সূরা নাযিল হয়, তার পূর্বে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বংশের লোকদের ডেকেছিলেন। তাদের মধ্যে আবু লাহাবও ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। এতে আবু লাহাব প্রচণ্ড ক্ষেপে যায়। আবু লাহাবের দু'ছেলে উতবা এবং উতাইবার সংগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু'কন্যার বিয়ে সাব্যস্ত হয়েছিল। হযরত রুকাইয়্যার সংগে উতবার এবং হযরত উম্মে কুলসুমের সংগে উতাইবার বিয়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত ঘর সংসার শুরু হয়নি। উক্ত ঘটনার পর আবু লাহাব তার দু'সন্তানকে নির্দেশ দেয়, তারা যেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যাদ্বয়কে তালাক দিয়ে দেয়। তালাক ঘটে যাওয়ার অল্প কিছুদিন পরে হযরত রুকাইয়্যার বিয়ে হযরত ওসমানের (সা.) সংগে অনুষ্ঠিত হয়।
এ বছর ওহীর মহান সংকলক (কাতিবে ওহী) হযরত যায়েদ ইবনে ছাবিত (রা.) এর জন্ম হয়েছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা তাইয়্যিবায় যখন শুভাগমন করেন তখন তিনি ছিলেন এগার বছরের বালক। তার পিতা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। বদরের যুদ্ধের সময় বয়স কম থাকার কারণে মহানবী (সা.) তাকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেননি। তবে তিনি উহুদের যুদ্ধে এবং পরবর্তী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি বর্ণিত হয়েছে আল কুরআনে। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামীদল এবং যারা নিষ্ঠাবান, তাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট (সূরা তওবা-১০০)। নবুওয়াতের প্রথম দিকেই সূরা ফাতিহা পুরোটাই নাযিল হয়েছিল এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় এ সূরাটি পড়তেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খাদীজা (রা.) এর সাথে জামাতে রাতের অন্ধকারে নামাযে এ সূরাটি তিলাওয়াত করতেন। বালক আলী (রা.) (বয়স ১০ কিংবা ১১ বছর) আড়াল থেকে এ দৃশ্য দেখতেন- আর ভাবতেন এরা কার ইবাদত করে? এরপর হযরত আলীও (রা.) তাদের সাথে জামাতে যোগ দিতে লাগলেন।
📄 নবুয়্যতের ৩য় বছর
নবুওয়াতের ৩য় বছরে, মতান্তরে চতুর্থ বছরে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ আসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে বয়ান করুন। আপনি মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।' মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বছর মতান্তরে চতুর্থ বছর নিজ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং এ ব্যাপারে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়, 'আপনি নিকট আত্মীয়- স্বজনকে ভয় প্রদর্শন করুন।' উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ের উপর উঠে কুরাইশ গোত্রদের আহ্বান জানালেন। হে বনী ফেহের! হে বনী লোয়াই! হে বনী কাব! হে বনী আব্দুল মুত্তালিব! সবাইকে ডেকে কলেমা তৈয়ব্যের পয়গাম শুনালেন। অতঃপর নিজ চাচা আব্বাসকে এবং কন্যা ফাতেমাকে ডেকে তাওহীদ ও কলেমার কথাই বলেন। এর জবাবে আবু লাহাব বলে, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি এ জন্য আমাদের ডেকেছো?' এর জবাবে পবিত্র কুরআনে তাব্বাত ইয়াদা সূরা (সূরা লাহাব) নাযিল হয়।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবু তালিব যখন জানলেন যে তার সন্তান আলী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি পুত্রকে নিতে আসলেন। বালক পুত্র আলী (রা.) বলেন, আব্বা আমি আল্লাহ ও রাসূলের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছি। এখন আর ফিরতে পারব না। আবু তালিব ছেলের কথায় দৃঢ়তার আভাস পেয়ে জবাব দেন, আমি জানি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে বিপথে পরিচালিত করবেন না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাকে বলেন, চাচা আপনিও এ সত্যধর্ম গ্রহণ করুন। আবু তালিব কোমল কণ্ঠে বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি জানি তুমি মিথ্যাবাদী নও।
তবে আমি যতদিন বেঁচে থাকব, তোমাকে কুরাইশদের অত্যাচার হতে রক্ষা করব। কি বিচিত্র চরিত্র এ লোকটির? ইতিহাসে রয়েছে মৃত্যুর সময় আবু তালিব বলেছেন, লোকে বলবে আবু তালিব মৃত্যুর ভয়ে পিতার ধর্ম ছেড়েছে। তাই আমি ইসলাম গ্রহণ করছি না। আল্লাহ বলেন, হে নবী আপনি যাকে ভালবাসেন, তাকে সঠিক পথে আনতে পারবেন না। তবে আল্লাহ যাকে চান, তাকে সঠিক পথে আনেন। দাওয়াত ও তাবলীগ বান্দার কাজ। হিদায়াত আল্লাহর হাতে। দাওয়াত ও তাবলীগের দ্বিতীয় ধাপে আল্লাহপাক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেন, হে নবী, আপনার আত্মীয়-স্বজনদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন। নবুওয়াতের পথম তিনবছর গোপনেই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ চলেছে।
নিকটাত্মীয়-স্বজন ও কাছের লোকেরা ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছে। খাদীজা, তার কন্যারা, আলী, আবু বকর, যায়েদ, ওসমান, ওমরের বোন ফাতিমা ও তার স্বামী (রা.) প্রমুখরা গোপনে মুসলমান হয়েছেন। এরপরই প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ আসে নবুওয়াতের ৪র্থ বছরে।
📄 নবুয়্যতের ৪র্থ বছর
নবুওয়াতের ৪র্থ বছরে মতান্তরে নবুওয়াতের তৃতীয় বছর খাদীজা (রা.)-এর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের ইন্তিকাল হয় এবং মক্কায় তাকে দাফন করা হয়। ওয়ারাকা অন্ধ ও নিঃসন্তান অবস্থায় ইস্তিকাল করেন। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তিনি মুসলমান ছিলেন। নবুওয়াতের ৪র্থ বছর হযরত আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। এ বছর থেকে মক্কার মুশরিকগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংগে প্রকাশ্যে শত্রুতা ও বিরোধিতা শুরু করে দেয়। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রকার নির্যাতনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত হতে থাকে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে আবু তালিবের ব্যাপক সমর্থন ছিল। মক্কার কাফিরদের একটি প্রতিনিধি দল আবু তালিবের নিকট গিয়ে উপস্থিত হয়ে বলে, আপনার ভাতিজা আমাদের ধর্মকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি আমাদের ধর্মের সমালোচনা করেন। তিনি লোকজনকে আমাদের দেবতাদের পূজা করতে নিষেধ করেন। আপনি তাকে এ ব্যাপারে বিরত থাকতে বলুন। তাকে বলে দিন, যেন তিনি আমাদের ধর্মের সমর্থনে কথা বলেন। তিনি যদি আপনার কথা না মানেন, তবে আপনি তাকে সহায়তা বন্ধ করে দিন। এ কথা শুনে আবু তালিব বলেন, 'আমি তাকে বাঁধা দিতে পারব না এবং তার সহায়তাও বন্ধ করব না।' এ ধরনের জবাব শুনে মক্কার কাফিরগণ পোড়া মুখ নিয়ে ফিরে যায়। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি চাচা আবু তালিবের এমন একচ্ছত্র সমর্থন সত্যি বিস্ময়কর। অথচ তার ইসলাম গ্রহণ নসীব হয়নি। হিদায়াত পুরোপুরি আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান, যেভাবে চান, যখন চান- তাই হয়। হিদায়াতের জন্য আমাদের কান্নাকাটি করা চাই। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যাকে ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তার ভাগ্যেই হিদায়াত নসীব হয়।
এ বছর থেকেই (মতান্তরে নবুওয়াতের ৩য় বছর) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ব্যাপকভাবে এবং প্রকাশ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন। মক্কার হাঁটে, মাঠে, ঘাটে, মহল্লায়, অলি, গলিতে, ঘরে-ঘরে দাওয়াত ও তাবলীগ করেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীরা (রা.)। তাঁদের পুরো দিন রাতের কর্মই ছিল দ্বীনের প্রচার ও প্রসার। মক্কার কাফির, মুশরিকরা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের (রা.) ব্যাপকভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও উত্ত্যক্ত করত। হাসি-তামাশা করে অপমান করত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা কেউ যেন শুনতে না পারে এজন্য শোরগোল, চিৎকার, চেঁচামেচি ও গান বাজনা করত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবিচল থেকে দাওয়াত দিতেন। নবুওয়াতের ৫ম বছর আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেন, আপনি মক্কা ও আশপাশের লোকদের সতর্ক করুন। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজকে মক্কায় সীমাবদ্ধ না রেখে মক্কার আশে পাশে ব্যাপক করে দেন। পরবর্তীতে তায়েফ, হুনাইন, ইয়াসরিব তথা মদীনা পর্যন্ত দাওয়াতের কাজকে বিস্তার করেন। এমনকি আবিসিনিয়ার খ্রীষ্টান বাদশার কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছান।