📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাংসারিক জীবন
দীর্ঘ পঁচিশ বছর বিবি খাদীজা (রা.) সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সর্বাবস্থায় স্বামীর জীবন সঙ্গিনী হয়েছিলেন। খাদীজা (রা.) পয়ষট্টি বছর বয়সে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীর আদর, সোহাগ ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হননি। তিনি এত ভাগ্যবতী ছিলেন যে, মৃত্যুর সময় স্বামীর কোলে মাথা রেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য হয়নি। তিনিই সে ভাগ্যবতী নারী, যিনি বিশ্বনবীকে নবুওয়াতপ্রাপ্তির পূর্বে ও পরে উভয় অবস্থাতেই দেখেছেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। মহিয়সী খাদীজা (রা.) এর গর্ভে এবং নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসে দু'পুত্র ও চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম ছেলের নাম ছিল 'কাশেম'। এজন্যে লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবুল কাশেম বলে সম্বোধন করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ ডাকাকে পছন্দ করতেন। দ্বিতীয় ছেলের নাম তৈয়ব ওরফে তাহির। এ দু'সন্তানই শিশুকালে ইন্তিকাল করেন (ইবনে হিশাম)। কিন্তু কবি গোলাম মোস্তফা রচিত 'বিশ্বনবী' গ্রন্থে আবুল কাশেম, তৈয়ব ও তাহির এ তিন সন্তানের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের মৃত্যুতে অন্তরে আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু তাতে তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। মহান বিধাতার প্রতি সমর্পিত হয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বিশ্বনবীর কোন ছেলে সন্তানই বেঁচে থাকত না বিধায় মক্কার কাফিররা হিংসা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে আটকুরে বলে গাল দিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন পুত্র সন্তান জীবিত থাক, এটা হয়তবা আলীমুল গাইব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা চাননি। কেননা, এ সন্তানেরা অথবা তার পরবর্তী অধঃস্তন পুরুষেরা খিলাফত নিয়ে নানা মতবাদের জন্ম দিতে পারত। হয়তবা স্বাধীন নির্বাচনের ও গণতন্ত্রকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে আল্লাহ এমন করেছেন। অবশ্য আল্লাহই ভাল জানেন, এর পিছের রহস্যের কারণ। কেননা মানুষের জ্ঞানের সীমানা সসীম-সীমিত- অতিক্ষুদ্র। খাদীজা (রা.) এর গর্ভে যে চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের নাম যথাক্রমে ঐয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা (রা.)। মেয়েদের মধ্যে ফাতেমাই (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত বা পৃথিবী হতে বিদায়ের পরেও জীবিত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবের সন্তান, হযরত আলীর (রা.) সাথে হযরত ফাতিমার (রা.) বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে দু'সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দু'জন দৌহিত্র প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুবই আদরের ছিলেন। তাদের শহীদ হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে পূর্বেই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন।
'ওকাজ' মেলা থেকে বিবি খাদীজা (রা.) 'যায়েদ' নামে একটি বালককে কিনে আনেন। সে সময় সমস্ত পৃথিবী জুড়েই দাস ব্যবসা প্রচলিত ছিল। হাঁটে গরু ছাগলের মত মানুষ বিক্রি হত। ক্রয় করা গোলামের প্রতি আচরণও হত নিষ্ঠুর। তারাও যে মানুষ, তারাও যে একই আল্লাহর বান্দা, তাদেরও যে অন্য আর দশজন মানুষের মত আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্নেহ, মায়া, মমতা অর্থাৎ মনুষ্যত্বের সব কিছুই বিদ্যমান থাকতে পারে, মানুষ নামের মনিবেরা তা কখনই চিন্তা করত না। এ বিষয়টি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মর্মান্তিকভাবে পীড়া দিত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় কেঁদে উঠত। এ কতবড় যুলুম ও অন্যায়। খাদীজা (রা.) বালক যায়েদকে ক্রয় করে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পেশ করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দিয়ে বললেন, 'যায়েদ'! আজ থেকে তুমি মুক্ত। বাকি মানুষদের মতই স্বাধীন সত্তা। বিশ্ব মানবের যিনি মুক্তিদাতা, তিনি কি কখনও কোন মানুষকে দাসত্বের শিকলে বেঁধে রাখতে পারেন? আল্লাহ বলেছেন, সব 'মানুষই ভাই ভাই।' কুরআনের এ অমোঘ বাণীকে তিনি বাস্তবে রূপ দিতে ধরায় এসেছেন। মানুষ হয়ে অন্য মানুষের প্রভু হওয়া গর্হিত কাজ, চরম পাপাচার। তাই প্রভু নয়, পিতা যেমন আপন সন্তানকে লালন করে, তেমনি করে যায়েদকে তিনি লালন করতে লাগলেন। যায়েদ বিন হারেসা (রা.) হয়ে গেলেন বিশ্বনবীর পালক পুত্র। যায়েদ (রা.) ছিলেন কালো বা নিগ্রো। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত সাহাবী (রা.) হয়ে মুতার যুদ্ধে সেনাপতির বেশে শাহাদৎ বরণ করেছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকা অবস্থায় বালক যায়েদের পিতা হারিস এবং চাচা কা'ব যায়েদের খোঁজে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের সন্তানকে ফেরত চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যায়েদকে তো আমি মুক্ত করে দিয়েছি। সে ইচ্ছা করলে এখনই চলে যেতে পারে। কিন্তু যায়েদ জন্ম দাতা পিতার সাথে যেতে রাজি হলেন না। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, 'আপনি আমার বাবা, আমি বাকী জীবন শুধু আপনার খিদমতেই থাকতে চাই। আমাকে এর থেকে বঞ্চিত করবেন না। আপনাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। যায়েদের পিতা হারিস সন্তানের এ আকুলতা লক্ষ্য করে তাকে আর ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। প্রিয় সন্তানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে রেখে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে গেলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহার ও চরিত্র কতটা পবিত্র ও আকর্ষণীয় হলে, একজন গোলাম তথা পালক পুত্র নিজের বাবা-মার কাছে ফিরে যাওয়াকে কষ্টকর মনে করে; তা সহজেই অনুমেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, যায়েদকে এভাবে রাখলে মানুষ তাকে ক্রীতদাসই ভাববে। তাই তিনি তখনই কা'বা শরীফের প্রাঙ্গনে উপস্থিত হয়ে সমবেত কুরাইশ নেতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকলে সাক্ষী থাক, এ যায়েদ আমার পুত্র, সে আমার উত্তরাধিকারী, আমি তার উত্তরাধিকারী। কি উদার আহবান। কি মহত্ত্বপূর্ণ ঘোষণা। এ ঐতিহাসিক ঘোষণাকারীই আমাদের বিশ্বনেতা, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সাধারণ একটি ক্রীতদাসকে আপন সন্তানের মর্যাদা দেয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। পৃথিবীতে কোন মানুষই ছোট বা তুচ্ছ নয়। পরিবেশ, পরিস্থিতি মানুষকে ছোট বড় করে। সুযোগ সুবিধা পেলে ওরাও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ স্থানে আরোহণ করতে পারে। ইতিহাসে যায়েদ (রা.), এর যথার্থ ও যোগ্য প্রমাণ রেখেছেন। যায়েদ বহু যুদ্ধ অভিযানে সেনাপতির দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছেন। মদীনার আমীরের দায়িত্ব দক্ষভাবে পালন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষকে আপন করে নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে মনুষ্যত্বের জয়গানে মুখরিত করতে যে প্রেরণা যুগিয়েছেন, তা অনুসরণ করলে আজও এ মাটির পৃথিবীই জান্নাতের অনাবিল সুখ-শান্তিতে পূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুকরণ ও অনুসরণেই বিশ্ব মানবের মুক্তি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংসার শুরু করেছেন দশ বছর হয়ে গেছে। এরপর তাঁর বয়স পয়ত্রিশ পূর্ণ হতে চলল। বিয়ের পর স্ত্রীর ব্যবসা, তাঁরই তরে তথা মানব সেবায় উৎসর্গ হয়েছে। মহান প্রতিপালকের বরকতে তা আরো বড়, আরও প্রাচুর্যময় হয়েছে। সংসারে সমৃদ্ধি এসেছে। সাথে এসেছে সন্তান-সন্ততি। দু'ছেলে চার মেয়ে। ছেলেরা বড় হওয়ার আগেই আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে। মেয়েরা নরম তুলতুলে পায়ে এক সময় হাঁটতে শিখেছে। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকেন। সারাক্ষণ স্রষ্টার সান্নিধ্য খুঁজেন। এর মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে এসে সবার খোঁজ খবর নেন। কার কি প্রয়োজন, তা জেনে নিয়ে তা পূরণ করেন। প্রতিবেশীর খোঁজ খবর নেন। তাদের প্রয়োজন সাধ্যমত পূরণ করেন। সমাজ, জাতি, সংসার সবই পালন করেন। এর মাঝে প্রায়ই তিনি তিন-চারদিনের খাবার সাথে নিয়ে হেরা গুহার উদ্দেশ্যে রওনা হন। হেরার চারপাশ জনমানবশূন্য বিস্তীর্ণ ধূ ধূ প্রান্তর। বিশাল শান্ত নীলাকাশ। তীব্র প্রখর সূর্যের আলো। শীতল, মায়াবী চাঁদের কোমল জ্যোতি। রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারার অপূর্ব সমারোহ। উত্তাল বাতাসের হিল্লোল। এর মাঝে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকেন। তাঁর অদেখা অজানা প্রিয় ইলাহ বা রবের সঙ্গ লাভের প্রতীক্ষায় থাকেন।
তাঁর পিতামহ হযরত ইব্রাহীম (আ.) যেভাবে তাঁর প্রিয় ইলাহ বা রবের ইবাদতে মশগুল হতেন, ঠিক তেমনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে উঠেন। স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আশায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধীর আগ্রহে দিন অতিবাহিত করেন। অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সংসারের বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। এক সময় অর্থ ছিল না- বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। উত্তপ্ত বালুরাশির বুক চিরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সুদূর সিরিয়া-মিশরে ছুটতে হয়েছে। অর্থ আহরণ করতে হয়েছে। পিতৃত্ব আবু তালিবের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই সাংসারিক জীবনে আদর্শ অভিভাবক হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত হয়েছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবসা সম্পর্কে অভূতপূর্ব যোগ্যতার কথা শুনে নিজের বিশাল ব্যবসা অবলীলায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয় ধনাঢ্য বিধবা খাদীজা (রা.)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে খাদীজার (রা.) ব্যবসাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবেই একজন বিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
গুণবতী ও পবিত্র নারী খাদীজাতুল কোবরা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করে ধন্য হন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা নিশ্চিত আশ্রয় এবং উপযুক্ত সহধর্মিণী পেয়ে সংসার ও সাংসারিক জীবনকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করেন। কিন্তু স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আশায় হৃদয়ের অতৃপ্তি ধীরে ধীরে মহিরুহে রূপান্তরিত হতে থাকে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একসময় নিজের ঘরকে আর শান্তির নীড় বলে মনে হয় না। সন্তানদের স্নেহ-আদর, স্বজন-প্রতিবেশীর শ্রদ্ধা-ভালবাসা, স্ত্রীর পত্নী সেবার মায়াবী বাঁধন ধীরে ধীরে ধূসর হতে থাকে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুধু সংসার ধর্ম পালন করার জন্য অথবা শুধু স্বজন, সমাজ, জাতি, দেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহান আল্লাহ তাঁকে এ নশ্বর পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি সারা বিশ্বের পথ প্রদর্শক। বিশ্বের সবার জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তাঁর জন্য অনেক বড় দায়িত্ব প্রস্তুত করে রেখেছেন। তাঁকে পিতা ইব্রাহীমের বংশধর- যাঁরা এত যুগ পরে যাযিরাতুল আরবে, এক আল্লাহর উপাসনা বাদ দিয়ে ৩৬০টি পাথরের মূর্তির পূজা করতো; হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি; আর জীবন্ত কন্যা সন্তানকে মাটির গভীরে প্রথিত করে নিজেদেরকে গর্বিত মনে করতো। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে; এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই তাঁর আগমন। জাহান্নাম থেকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। অন্ধকার গহবর থেকে আলোতে টেনে বের করার কর্মযজ্ঞ। এক সময় যাঁকে স্রষ্টার নির্দেশে সকল মাখলুকের আর মাটির মানুষের সার্বিক দায়িত্ব নিতে হবে; তাঁকে সর্বাধিক বিবেচনায় আরো উন্নত হতে হবে। এজন্যই বয়স বাড়ার সাথে সাথে মহান প্রতিপালক তাঁর প্রিয় বন্ধুর অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভারি করেছেন।
এভাবে বিশ্বনবী পঁয়ত্রিশ থেকে শুরু করে চল্লিশের পূর্বেই ভিতরে ভিতরে এক পূর্ণ দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তম স্ত্রী খাদীজা (রা.), স্বামীর এ পরিবর্তন গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেছেন। খাদীজা (রা.) স্থির ও নিশ্চিত, তার পবিত্র স্বামী পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। তার ভাই ওয়ারাকা তো তাঁকে নিশ্চিত করেছেন, এ ব্যক্তি তুচ্ছ কেউ নন। আগত ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ নবী। খাদীজার (রা.) অন্তরও এটা বিশ্বাস করেছে যে, নিশ্চয়ই তিনি শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী। ফলে বিবি খাদীজা মাঝে মাঝে চঞ্চল হলেও বিচলিত হননি। স্বামীর পাশে পাশে মহিরুহের মত বন্ধু হয়ে, তাঁর সাধনাকে পূর্ণতা দিতে সহায়তা করেছেন। খাদ্য, পানীয় ফুরিয়ে গেলে হেরা পর্বতের গুহা থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাড়ীর পথে আসতে দেরী করতেন, মহিয়সী খাদীজা (রা.) তখন খাবার নিয়ে দূর্গম মরুভূমির আগুনঝরা পথ অতিক্রম করে স্বামীর কাছে পৌঁছে যেতেন। ধ্যানমগ্ন স্বামীর ধ্যান ভাঙার অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন। প্রিয় স্বামী ধ্যান ভাঙতেই, চোখ খুলে যখন প্রিয়তমা স্ত্রীকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখতেন; তখন এক অনাবিল প্রশান্তিতে তাঁর হৃদয় মন ভরে যেত। খাদীজা (রা.), স্বামীকে কাছে বসিয়ে তৃপ্তির সাথে আহার করাতেন। এরপর বাড়তি খাদ্য, পানীয় ও বস্ত্র স্বামীর প্রয়োজনে সেখানে রেখে আবার তপ্ত বালুকণা আর তীক্ষ্ণ পাথর কুচির বুক মাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরতেন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিকর পদযাত্রা তাঁর হৃদয়ে কোন প্রভাব বিস্তার করত না। উপরন্তু স্বামীর সান্নিধ্যের সময়টুকুই তার কষ্টকে মুছে দিয়ে অনাবিল প্রশান্তিতে উদ্বেলিত করত। খাদীজা (রা.) সত্যই মহিয়সী নারী। এ পবিত্রা নারীকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে ফিরিশতা জিব্রাইল (আ.) মারফত সালাম পাঠিয়েছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যৌবনের মূল অংশ অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ বছরকাল, মাত্র একজন স্ত্রীর সাথে অতিবাহিত করেন। তাও আবার এমন একজন নারীর সাথে; যাকে বলা যায় প্রায় বৃদ্ধা। তার মৃত্যুর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকজন বৃদ্ধা মহিলাকে বিয়ে করেন। উভয় জনই ছিলেন বৃদ্ধা এবং বিধবা। প্রথমজন হযরত খাদীজা (রা.) এবং দ্বিতীয়জন হযরত সাওদা (রা.)। এরপর জীবনের শেষ ৩-৫ বছরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামাজিক, আদর্শিক, সমতা, শান্তি, রাজনৈতিক, আত্মিক এবং বিশেষ কারণেই বাকী বিয়েগুলো করেন। প্রতিটি বিয়ের পিছনেই ছিল এক মহৎ এবং গৌরবোজ্জ্বল উদ্দেশ্য। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আয়েশা (রা.) এবং হযরত হাফসা (রা.) কে বিয়ে করে যথাক্রমে হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত ওমর ফারুক (রা.) এর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন। একইভাবে হযরত ওসমান (রা.) এর হাতে পরপর দু'কন্যাকে বিয়ে দিয়ে এবং হযরত আলী (রা.) এর সাথে সবচেয়ে আদরের/স্নেহের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) কে বিয়ে দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন বিশিষ্ট সাহাবীর সাথে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ চারজন সাহাবী ইসলামের বিজয়ে, প্রচার-প্রসারে, ত্যাগ-তিতিক্ষায় খলিফা হিসেবে অতুলনীয় মহত্ত্বের পরিচয় দেন। আরবের সামাজিক রীতিতে, তারা শ্বশুর সম্পর্কিত আত্মীয়তার বিশেষ গুরুত্ব দিত। আরব প্রথানুযায়ী, জামাতা সম্পর্ক, বিভিন্ন গোত্রের মাঝে সম্পর্ক দৃঢ়করণে বিশেষ ভূমিকা পালন করত। জামাতার সাথে যুদ্ধ করা, তাদের রীতিতে লজ্জাজনক কাজ ছিল। এ নিয়মকে বা প্রথাকে কাজে লাগাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রতি বিভিন্ন গোত্রের শত্রুতা ও শক্তি খর্ব করতে তাদের মহিলাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হযরত উম্মে সালামা (রা.) ছিলেন বনু মাখযুম গোত্রের মহিলা। আবু জাহল এবং খালীদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন এ গোত্রের লোক। এ গোত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর খালীদ বিন ওয়ালিদের মাঝে ইসলামের প্রতি তেমন শত্রুতা লক্ষ্য করা যায়নি। এমনকি ক'দিন পরই, তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধে অপরাজেয় সেনাপতি হিসেবে বীরদর্পে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ইতিহাস এর সাক্ষী। এমনকি ইসলামের চরম শত্রু আবু সুফিয়ানের কন্যা হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)-কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বিয়ে করার পর, আবু সুফিয়ান কিছুকাল শত্রুতা করলেও, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আসেননি এবং সর্বশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) এবং হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) উভয়ই বিধবা ছিলেন। অপরদিকে হযরত জুওয়াইরিয়া (রা.) এবং হযরত সফিয়া (রা.) এর বিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সংঘটিত হওয়ার পর, যথাক্রমে বনু মুস্তালিক এবং বনু নযির গোত্র, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি এ দু'গোত্রের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক অনেক উন্নত ও নিবিড় হয়েছিল। এ উভয় উম্মুল মুমেনিন (রা.) বিধবা ছিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উম্মুল মুমেনিনদের (রা.) বিয়ের কারণেই, ইসলাম এবং দ্বীনি ইলম সর্বোপরি বিশ্ব মুসলিম সমাজ উপকৃত হয়েছে। আসলে ব্যাপারটি ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার খাস রহমত, কুদরত এবং রহস্যময় উদ্দেশ্য। দাম্পত্য জীবনে তথা পারিবারিক জীবনের রীতিনীতি শিক্ষাদানে উম্মুল মুমেনিনরা (রা.) বিশাল এবং ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষভাবে তাদের মাঝে যারা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন; তাঁরা ইসলামকে বিশেষভাবে উপকার করে গেছেন। এদের মাঝে মুসলমানদের শিরধার্য হলেন উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়িশা (রা.)। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহস্রাধিক হাদীস, ঘটনা, বাণী বর্ণনা করে গেছেন। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর ঐ সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দেস, মুফতি এবং ফিকাহবিদ ছিলেন। ইসলামের বড় বড় সাহাবী, খলিফারাও, যে কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হলে হযরত আয়িশার (রা.) শরণাপন্ন হতেন এবং উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়িশা (রা.) সেসব জটিল সমস্যার ইসলাম ভিত্তিক সমাধান করে দিতেন। হযরত আয়িশা (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত সন্নিধ্যে থাকার কারণে, তিনি কয়েক হাজার গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণনা করে গেছেন। তাঁর (রা.) বর্ণনাকৃত হাদীসের মধ্যে বিশুদ্ধ হাদীসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ইসলামের পারিবারিক, সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক অনেক হাদীস, মাসলা-মাসায়েল রচিত হয়েছে উম্মুল মুমেনদের অবদানে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে, তার পালক পুত্র হযরত যায়েদের (রা.) তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী হযরত যয়নবের (রা.) বিবাহ ছিল জাহেলী যুগের রীতিনীতির নস্যাৎ করার এক শ্রেষ্ঠ দলিল। এ বিয়ের মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, পালক পুত্র কখনই আসল পুত্রের সমতুল্য হতে পারে না। জাহেলী যুগের পালক পুত্রের কুসংস্কার-তথা নিলর্জ কার্যকলাপ ও বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজ ও ইসলামী ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করেছিল এ বিয়ে। জাহেলী যুগের এ কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হযরত যয়নবের (রা.) বিয়ে দেন। এ ব্যাপারে আল কুরআনে নির্দেশ জারী হয়েছে। অতএব বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের কোন ঘটনা নিয়ে বক্রভাবে চিন্তা করা জঘন্যতম নির্বুদ্ধিতা ও মহাপাপ।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ময়দার নরম রুটি খেয়েছেন কিনা জানি না। তিনি কখনো ভূনা করা বকরী খেয়ে দেখেননি। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমাদের দুই দুই মাস কেটে যেত; তৃতীয় মাসের চাঁদ দেখা যেত; অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলায় আগুন জ্বলতো না। দু'টো সামান্য খেজুর ও পানি খেয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণীরা জীবন ধারণ করতেন; অথচ কেউ কোন আপত্তিকর আচরণ করতো না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীরা রাসূলকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁরা কেউ দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়েননি।
সাধারণত সতীনের মাঝে যে ধরনের (সচরাচর) খুনসুটি বা মনোমালিন্য হয়; তাও তাঁদের মাঝে লক্ষ্য করা যায়নি। বরং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক বন্ধন, মহত্ত্ব, মমত্ব, আদর্শিক সম্পর্ক সত্যিই কল্পনাতীত এবং অবিস্মরণীয় হয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবন বিশ্ব মানবতা, শান্তি, মানুষের মর্যাদা ও ভালোবাসার অকল্পনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে চিত্রিত হয়ে আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মাত্র সন্তান (ছেলে) ইব্রাহীম, মারিয়া (মরিয়ম) কিবতিয়ার গর্ভে এবং অন্যান্য সকল সন্তান খাদীজার (রা.) গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন। আবদুল্লাহর দু'টি ডাক নাম ছিল। তায়্যিব ও তাহির। অনেকেই ভুল করে তায়্যিব ও তাহিরকে, দু'জন বলে মনে করে থাকেন। কাসিম ২ বছর বয়সে ও আবদুল্লাহ শৈশবে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেই ওফাত প্রাপ্ত হন। ইব্রাহীম ৮ম হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০ম হিজরীতে মাত্র ১৬ মাস বয়সে ইন্তিকাল করেন। বিশ্বনবীর সকল পুত্র সন্তান শিশুকালে মৃত্যুবরণ করেন। সর্বশেষ পুত্র সন্তান ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করলে কাফিররা খুশী হয়। পুত্র সন্তানরা একে একে সবাই মৃত্যুবরণ করায় তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে বিশ্বনবীকে আটখুড়া, নিঃবংশ, ইত্যাদি নামে ডাকত। এ ব্যাপারে সূরা আল কাউসার নাযিল হয়। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, বিশ্বনবীকে তিনি কাউসার দান করে সম্মানিত করেছেন।
রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্যেষ্ঠা কন্যা জয়নবের, খাদীজার (রা.) ছোট বোন হালার পুত্র, আবুল আস বিন রাবিবিনের সঙ্গে বিবাহ হয়। আবুল আস বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ায় আবুল আস মুক্তি পেয়ে মক্কায় ফিরে যান এবং মুক্তির শর্তানুযায়ী ঐয়নবকে মদীনা পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে আবুল আস ষষ্ঠ হিজরীতে মদীনায় এসে মুসলমান হয়ে জয়নবের সঙ্গে মিলিত হন। ঐয়নব (রা.) অষ্টম হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। উমামা নামের জয়নবের একটি মেয়ে ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমামাকে খুব আদর করতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একন্যা খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২য় ও ৩য় কন্যা যথাক্রমে রুকাইয়া ও কুলসুমের প্রথমে বিবাহ হয়-উৎবা ও উতাইবার সঙ্গে। তারা উভয়েই ছিল আবু লাহাবের পুত্র। যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন, তখন আবু লাহাব পুত্রদ্বয়কে বাধ্য করল মহানবীর কন্যাদ্বয়কে পরিত্যাগ করতে। ফলে এ দু'মেয়েরই পর্যায়ক্রমে হযরত ওসমানের (রা.) সঙ্গে বিবাহ হয়। ওসমান (রা.) রুকাইয়ার (রা.) মৃত্যুর পর, কুলসুমকে (রা.) বিবাহ করেন। রুকাইয়া (রা.) দ্বিতীয় হিজরীর রমযানে বদরের যুদ্ধের দিন ইন্তিকাল করেন। জান্নাতুল বাকিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁকে নিজ হাতে দাফন করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমের সঙ্গে ওসমানের (রা.) বিবাহ সম্পাদিত হয় ৩য় হিজরীতে। উম্মে কুলসুম ৯ম হিজরীতে ইস্তিকাল করেন। ইসলামের প্রথম যুগে বিশ্বনবীর এ দু'কন্যা অমানুষিক নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করেছেন। তবুও তাঁরা পিতার আনীত দ্বীন ইসলামের উপর জীবন অতিবাহিত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৪র্থ কন্যা ফাতিমা (রা.) ৬০৯ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আলীর (রা.) সঙ্গে ২য় হিজরীর যিলহজ্জ মাসে ফাতিমার (রা.) আনুমানিক ১৬ বছর বয়সে বিবাহ হয়। ১১ হিজরীতে (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে) মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের সময় তাঁর পুত্র-কন্যাদের মধ্যে কেবল ফাতিমাই (রা.) জীবিত ছিলেন। অন্য সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন দশাতেই ইন্তিকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র কন্যাদের সকলকেই জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছে। শুধু বিবি খাদীজা (রা.) জান্নাতুল মোয়াল্লাতে (মক্কার পাশে) শুয়ে আছেন। এসব পবিত্র মানুষগুলোর কবরসমূহ সাদামাঠা, চিহ্নবিহীন। কোন ধরনের জৌলুস, বাঁধানো, সাজানো বা জাঁকজমক নেই এসব কবরে। এমনকি সামান্য পাথর দিয়েও চিহ্ন করে রাখা হয়নি। এটাই ইসলামের আদর্শ। এর বিপরীত কোন কিছু ইসলাম সম্মত নয়। যারা কবরকে মাজার বানায়; তারা স্পষ্টতই ইসলামের বাইরে মনগড়া বিদআত বা কঠিন গোনাহে লিপ্ত। এসব থেকে আল্লাহ আমাদের হিফাযত/রক্ষা করুন। আমীন।
দীর্ঘ পঁচিশ বছর বিবি খাদীজা (রা.) সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সর্বাবস্থায় স্বামীর জীবন সঙ্গিনী হয়েছিলেন। খাদীজা (রা.) পয়ষট্টি বছর বয়সে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীর আদর, সোহাগ ও ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হননি। তিনি এত ভাগ্যবতী ছিলেন যে, মৃত্যুর সময় স্বামীর কোলে মাথা রেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোন স্ত্রীর এ সৌভাগ্য হয়নি। তিনিই সে ভাগ্যবতী নারী, যিনি বিশ্বনবীকে নবুওয়াতপ্রাপ্তির পূর্বে ও পরে উভয় অবস্থাতেই দেখেছেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। মহিয়সী খাদীজা (রা.) এর গর্ভে এবং নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসে দু'পুত্র ও চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম ছেলের নাম ছিল 'কাশেম'। এজন্যে লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবুল কাশেম বলে সম্বোধন করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ ডাকাকে পছন্দ করতেন। দ্বিতীয় ছেলের নাম তৈয়ব ওরফে তাহির। এ দু'সন্তানই শিশুকালে ইন্তিকাল করেন (ইবনে হিশাম)। কিন্তু কবি গোলাম মোস্তফা রচিত 'বিশ্বনবী' গ্রন্থে আবুল কাশেম, তৈয়ব ও তাহির এ তিন সন্তানের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানের মৃত্যুতে অন্তরে আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু তাতে তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। মহান বিধাতার প্রতি সমর্পিত হয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। বিশ্বনবীর কোন ছেলে সন্তানই বেঁচে থাকত না বিধায় মক্কার কাফিররা হিংসা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে আটকুরে বলে গাল দিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন পুত্র সন্তান জীবিত থাক, এটা হয়তবা আলীমুল গাইব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা চাননি। কেননা, এ সন্তানেরা অথবা তার পরবর্তী অধঃস্তন পুরুষেরা খিলাফত নিয়ে নানা মতবাদের জন্ম দিতে পারত। হয়তবা স্বাধীন নির্বাচনের ও গণতন্ত্রকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে আল্লাহ এমন করেছেন। অবশ্য আল্লাহই ভাল জানেন, এর পিছের রহস্যের কারণ। কেননা মানুষের জ্ঞানের সীমানা সসীম-সীমিত- অতিক্ষুদ্র। খাদীজা (রা.) এর গর্ভে যে চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের নাম যথাক্রমে ঐয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা (রা.)। মেয়েদের মধ্যে ফাতেমাই (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত বা পৃথিবী হতে বিদায়ের পরেও জীবিত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবের সন্তান, হযরত আলীর (রা.) সাথে হযরত ফাতিমার (রা.) বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে দু'সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দু'জন দৌহিত্র প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুবই আদরের ছিলেন। তাদের শহীদ হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর নির্দেশে পূর্বেই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন।
'ওকাজ' মেলা থেকে বিবি খাদীজা (রা.) 'যায়েদ' নামে একটি বালককে কিনে আনেন। সে সময় সমস্ত পৃথিবী জুড়েই দাস ব্যবসা প্রচলিত ছিল। হাঁটে গরু ছাগলের মত মানুষ বিক্রি হত। ক্রয় করা গোলামের প্রতি আচরণও হত নিষ্ঠুর। তারাও যে মানুষ, তারাও যে একই আল্লাহর বান্দা, তাদেরও যে অন্য আর দশজন মানুষের মত আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্নেহ, মায়া, মমতা অর্থাৎ মনুষ্যত্বের সব কিছুই বিদ্যমান থাকতে পারে, মানুষ নামের মনিবেরা তা কখনই চিন্তা করত না। এ বিষয়টি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মর্মান্তিকভাবে পীড়া দিত। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় কেঁদে উঠত। এ কতবড় যুলুম ও অন্যায়। খাদীজা (রা.) বালক যায়েদকে ক্রয় করে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পেশ করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুক্ত করে দিয়ে বললেন, 'যায়েদ'! আজ থেকে তুমি মুক্ত। বাকি মানুষদের মতই স্বাধীন সত্তা। বিশ্ব মানবের যিনি মুক্তিদাতা, তিনি কি কখনও কোন মানুষকে দাসত্বের শিকলে বেঁধে রাখতে পারেন? আল্লাহ বলেছেন, সব 'মানুষই ভাই ভাই।' কুরআনের এ অমোঘ বাণীকে তিনি বাস্তবে রূপ দিতে ধরায় এসেছেন। মানুষ হয়ে অন্য মানুষের প্রভু হওয়া গর্হিত কাজ, চরম পাপাচার। তাই প্রভু নয়, পিতা যেমন আপন সন্তানকে লালন করে, তেমনি করে যায়েদকে তিনি লালন করতে লাগলেন। যায়েদ বিন হারেসা (রা.) হয়ে গেলেন বিশ্বনবীর পালক পুত্র। যায়েদ (রা.) ছিলেন কালো বা নিগ্রো। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত সাহাবী (রা.) হয়ে মুতার যুদ্ধে সেনাপতির বেশে শাহাদৎ বরণ করেছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকা অবস্থায় বালক যায়েদের পিতা হারিস এবং চাচা কা'ব যায়েদের খোঁজে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের সন্তানকে ফেরত চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যায়েদকে তো আমি মুক্ত করে দিয়েছি। সে ইচ্ছা করলে এখনই চলে যেতে পারে। কিন্তু যায়েদ জন্ম দাতা পিতার সাথে যেতে রাজি হলেন না। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, 'আপনি আমার বাবা, আমি বাকী জীবন শুধু আপনার খিদমতেই থাকতে চাই। আমাকে এর থেকে বঞ্চিত করবেন না। আপনাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না। যায়েদের পিতা হারিস সন্তানের এ আকুলতা লক্ষ্য করে তাকে আর ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। প্রিয় সন্তানকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে রেখে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে গেলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহার ও চরিত্র কতটা পবিত্র ও আকর্ষণীয় হলে, একজন গোলাম তথা পালক পুত্র নিজের বাবা-মার কাছে ফিরে যাওয়াকে কষ্টকর মনে করে; তা সহজেই অনুমেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, যায়েদকে এভাবে রাখলে মানুষ তাকে ক্রীতদাসই ভাববে। তাই তিনি তখনই কা'বা শরীফের প্রাঙ্গনে উপস্থিত হয়ে সমবেত কুরাইশ নেতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকলে সাক্ষী থাক, এ যায়েদ আমার পুত্র, সে আমার উত্তরাধিকারী, আমি তার উত্তরাধিকারী। কি উদার আহবান। কি মহত্ত্বপূর্ণ ঘোষণা। এ ঐতিহাসিক ঘোষণাকারীই আমাদের বিশ্বনেতা, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সাধারণ একটি ক্রীতদাসকে আপন সন্তানের মর্যাদা দেয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। পৃথিবীতে কোন মানুষই ছোট বা তুচ্ছ নয়। পরিবেশ, পরিস্থিতি মানুষকে ছোট বড় করে। সুযোগ সুবিধা পেলে ওরাও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ স্থানে আরোহণ করতে পারে। ইতিহাসে যায়েদ (রা.), এর যথার্থ ও যোগ্য প্রমাণ রেখেছেন। যায়েদ বহু যুদ্ধ অভিযানে সেনাপতির দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছেন। মদীনার আমীরের দায়িত্ব দক্ষভাবে পালন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষকে আপন করে নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে মনুষ্যত্বের জয়গানে মুখরিত করতে যে প্রেরণা যুগিয়েছেন, তা অনুসরণ করলে আজও এ মাটির পৃথিবীই জান্নাতের অনাবিল সুখ-শান্তিতে পূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুকরণ ও অনুসরণেই বিশ্ব মানবের মুক্তি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংসার শুরু করেছেন দশ বছর হয়ে গেছে। এরপর তাঁর বয়স পয়ত্রিশ পূর্ণ হতে চলল। বিয়ের পর স্ত্রীর ব্যবসা, তাঁরই তরে তথা মানব সেবায় উৎসর্গ হয়েছে। মহান প্রতিপালকের বরকতে তা আরো বড়, আরও প্রাচুর্যময় হয়েছে। সংসারে সমৃদ্ধি এসেছে। সাথে এসেছে সন্তান-সন্ততি। দু'ছেলে চার মেয়ে। ছেলেরা বড় হওয়ার আগেই আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে। মেয়েরা নরম তুলতুলে পায়ে এক সময় হাঁটতে শিখেছে। এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকেন। সারাক্ষণ স্রষ্টার সান্নিধ্য খুঁজেন। এর মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে এসে সবার খোঁজ খবর নেন। কার কি প্রয়োজন, তা জেনে নিয়ে তা পূরণ করেন। প্রতিবেশীর খোঁজ খবর নেন। তাদের প্রয়োজন সাধ্যমত পূরণ করেন। সমাজ, জাতি, সংসার সবই পালন করেন। এর মাঝে প্রায়ই তিনি তিন-চারদিনের খাবার সাথে নিয়ে হেরা গুহার উদ্দেশ্যে রওনা হন। হেরার চারপাশ জনমানবশূন্য বিস্তীর্ণ ধূ ধূ প্রান্তর। বিশাল শান্ত নীলাকাশ। তীব্র প্রখর সূর্যের আলো। শীতল, মায়াবী চাঁদের কোমল জ্যোতি। রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারার অপূর্ব সমারোহ। উত্তাল বাতাসের হিল্লোল। এর মাঝে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকেন। তাঁর অদেখা অজানা প্রিয় ইলাহ বা রবের সঙ্গ লাভের প্রতীক্ষায় থাকেন।
তাঁর পিতামহ হযরত ইব্রাহীম (আ.) যেভাবে তাঁর প্রিয় ইলাহ বা রবের ইবাদতে মশগুল হতেন, ঠিক তেমনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে উঠেন। স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আশায় বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধীর আগ্রহে দিন অতিবাহিত করেন। অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সংসারের বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে। এক সময় অর্থ ছিল না- বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। উত্তপ্ত বালুরাশির বুক চিরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সুদূর সিরিয়া-মিশরে ছুটতে হয়েছে। অর্থ আহরণ করতে হয়েছে। পিতৃত্ব আবু তালিবের সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই সাংসারিক জীবনে আদর্শ অভিভাবক হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত হয়েছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবসা সম্পর্কে অভূতপূর্ব যোগ্যতার কথা শুনে নিজের বিশাল ব্যবসা অবলীলায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশীয় ধনাঢ্য বিধবা খাদীজা (রা.)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে খাদীজার (রা.) ব্যবসাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবেই একজন বিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
গুণবতী ও পবিত্র নারী খাদীজাতুল কোবরা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করে ধন্য হন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা নিশ্চিত আশ্রয় এবং উপযুক্ত সহধর্মিণী পেয়ে সংসার ও সাংসারিক জীবনকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করেন। কিন্তু স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আশায় হৃদয়ের অতৃপ্তি ধীরে ধীরে মহিরুহে রূপান্তরিত হতে থাকে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একসময় নিজের ঘরকে আর শান্তির নীড় বলে মনে হয় না। সন্তানদের স্নেহ-আদর, স্বজন-প্রতিবেশীর শ্রদ্ধা-ভালবাসা, স্ত্রীর পত্নী সেবার মায়াবী বাঁধন ধীরে ধীরে ধূসর হতে থাকে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুধু সংসার ধর্ম পালন করার জন্য অথবা শুধু স্বজন, সমাজ, জাতি, দেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহান আল্লাহ তাঁকে এ নশ্বর পৃথিবীতে পাঠাননি। তিনি সারা বিশ্বের পথ প্রদর্শক। বিশ্বের সবার জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তাঁর জন্য অনেক বড় দায়িত্ব প্রস্তুত করে রেখেছেন। তাঁকে পিতা ইব্রাহীমের বংশধর- যাঁরা এত যুগ পরে যাযিরাতুল আরবে, এক আল্লাহর উপাসনা বাদ দিয়ে ৩৬০টি পাথরের মূর্তির পূজা করতো; হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি; আর জীবন্ত কন্যা সন্তানকে মাটির গভীরে প্রথিত করে নিজেদেরকে গর্বিত মনে করতো। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে; এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই তাঁর আগমন। জাহান্নাম থেকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। অন্ধকার গহবর থেকে আলোতে টেনে বের করার কর্মযজ্ঞ। এক সময় যাঁকে স্রষ্টার নির্দেশে সকল মাখলুকের আর মাটির মানুষের সার্বিক দায়িত্ব নিতে হবে; তাঁকে সর্বাধিক বিবেচনায় আরো উন্নত হতে হবে। এজন্যই বয়স বাড়ার সাথে সাথে মহান প্রতিপালক তাঁর প্রিয় বন্ধুর অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভারি করেছেন।
এভাবে বিশ্বনবী পঁয়ত্রিশ থেকে শুরু করে চল্লিশের পূর্বেই ভিতরে ভিতরে এক পূর্ণ দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তম স্ত্রী খাদীজা (রা.), স্বামীর এ পরিবর্তন গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেছেন। খাদীজা (রা.) স্থির ও নিশ্চিত, তার পবিত্র স্বামী পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। তার ভাই ওয়ারাকা তো তাঁকে নিশ্চিত করেছেন, এ ব্যক্তি তুচ্ছ কেউ নন। আগত ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ নবী। খাদীজার (রা.) অন্তরও এটা বিশ্বাস করেছে যে, নিশ্চয়ই তিনি শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ নবী। ফলে বিবি খাদীজা মাঝে মাঝে চঞ্চল হলেও বিচলিত হননি। স্বামীর পাশে পাশে মহিরুহের মত বন্ধু হয়ে, তাঁর সাধনাকে পূর্ণতা দিতে সহায়তা করেছেন। খাদ্য, পানীয় ফুরিয়ে গেলে হেরা পর্বতের গুহা থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাড়ীর পথে আসতে দেরী করতেন, মহিয়সী খাদীজা (রা.) তখন খাবার নিয়ে দূর্গম মরুভূমির আগুনঝরা পথ অতিক্রম করে স্বামীর কাছে পৌঁছে যেতেন। ধ্যানমগ্ন স্বামীর ধ্যান ভাঙার অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন। প্রিয় স্বামী ধ্যান ভাঙতেই, চোখ খুলে যখন প্রিয়তমা স্ত্রীকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখতেন; তখন এক অনাবিল প্রশান্তিতে তাঁর হৃদয় মন ভরে যেত। খাদীজা (রা.), স্বামীকে কাছে বসিয়ে তৃপ্তির সাথে আহার করাতেন। এরপর বাড়তি খাদ্য, পানীয় ও বস্ত্র স্বামীর প্রয়োজনে সেখানে রেখে আবার তপ্ত বালুকণা আর তীক্ষ্ণ পাথর কুচির বুক মাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরতেন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিকর পদযাত্রা তাঁর হৃদয়ে কোন প্রভাব বিস্তার করত না। উপরন্তু স্বামীর সান্নিধ্যের সময়টুকুই তার কষ্টকে মুছে দিয়ে অনাবিল প্রশান্তিতে উদ্বেলিত করত। খাদীজা (রা.) সত্যই মহিয়সী নারী। এ পবিত্রা নারীকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে ফিরিশতা জিব্রাইল (আ.) মারফত সালাম পাঠিয়েছেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যৌবনের মূল অংশ অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ বছরকাল, মাত্র একজন স্ত্রীর সাথে অতিবাহিত করেন। তাও আবার এমন একজন নারীর সাথে; যাকে বলা যায় প্রায় বৃদ্ধা। তার মৃত্যুর পর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকজন বৃদ্ধা মহিলাকে বিয়ে করেন। উভয় জনই ছিলেন বৃদ্ধা এবং বিধবা। প্রথমজন হযরত খাদীজা (রা.) এবং দ্বিতীয়জন হযরত সাওদা (রা.)। এরপর জীবনের শেষ ৩-৫ বছরে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামাজিক, আদর্শিক, সমতা, শান্তি, রাজনৈতিক, আত্মিক এবং বিশেষ কারণেই বাকী বিয়েগুলো করেন। প্রতিটি বিয়ের পিছনেই ছিল এক মহৎ এবং গৌরবোজ্জ্বল উদ্দেশ্য। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আয়েশা (রা.) এবং হযরত হাফসা (রা.) কে বিয়ে করে যথাক্রমে হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত ওমর ফারুক (রা.) এর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন। একইভাবে হযরত ওসমান (রা.) এর হাতে পরপর দু'কন্যাকে বিয়ে দিয়ে এবং হযরত আলী (রা.) এর সাথে সবচেয়ে আদরের/স্নেহের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) কে বিয়ে দিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারজন বিশিষ্ট সাহাবীর সাথে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ চারজন সাহাবী ইসলামের বিজয়ে, প্রচার-প্রসারে, ত্যাগ-তিতিক্ষায় খলিফা হিসেবে অতুলনীয় মহত্ত্বের পরিচয় দেন। আরবের সামাজিক রীতিতে, তারা শ্বশুর সম্পর্কিত আত্মীয়তার বিশেষ গুরুত্ব দিত। আরব প্রথানুযায়ী, জামাতা সম্পর্ক, বিভিন্ন গোত্রের মাঝে সম্পর্ক দৃঢ়করণে বিশেষ ভূমিকা পালন করত। জামাতার সাথে যুদ্ধ করা, তাদের রীতিতে লজ্জাজনক কাজ ছিল। এ নিয়মকে বা প্রথাকে কাজে লাগাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রতি বিভিন্ন গোত্রের শত্রুতা ও শক্তি খর্ব করতে তাদের মহিলাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হযরত উম্মে সালামা (রা.) ছিলেন বনু মাখযুম গোত্রের মহিলা। আবু জাহল এবং খালীদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন এ গোত্রের লোক। এ গোত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর খালীদ বিন ওয়ালিদের মাঝে ইসলামের প্রতি তেমন শত্রুতা লক্ষ্য করা যায়নি। এমনকি ক'দিন পরই, তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধে অপরাজেয় সেনাপতি হিসেবে বীরদর্পে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। ইতিহাস এর সাক্ষী। এমনকি ইসলামের চরম শত্রু আবু সুফিয়ানের কন্যা হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)-কে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বিয়ে করার পর, আবু সুফিয়ান কিছুকাল শত্রুতা করলেও, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আসেননি এবং সর্বশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) এবং হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) উভয়ই বিধবা ছিলেন। অপরদিকে হযরত জুওয়াইরিয়া (রা.) এবং হযরত সফিয়া (রা.) এর বিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সংঘটিত হওয়ার পর, যথাক্রমে বনু মুস্তালিক এবং বনু নযির গোত্র, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি এ দু'গোত্রের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক অনেক উন্নত ও নিবিড় হয়েছিল। এ উভয় উম্মুল মুমেনিন (রা.) বিধবা ছিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উম্মুল মুমেনিনদের (রা.) বিয়ের কারণেই, ইসলাম এবং দ্বীনি ইলম সর্বোপরি বিশ্ব মুসলিম সমাজ উপকৃত হয়েছে। আসলে ব্যাপারটি ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার খাস রহমত, কুদরত এবং রহস্যময় উদ্দেশ্য। দাম্পত্য জীবনে তথা পারিবারিক জীবনের রীতিনীতি শিক্ষাদানে উম্মুল মুমেনিনরা (রা.) বিশাল এবং ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষভাবে তাদের মাঝে যারা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন; তাঁরা ইসলামকে বিশেষভাবে উপকার করে গেছেন। এদের মাঝে মুসলমানদের শিরধার্য হলেন উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়িশা (রা.)। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহস্রাধিক হাদীস, ঘটনা, বাণী বর্ণনা করে গেছেন। তিনি বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর ঐ সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দেস, মুফতি এবং ফিকাহবিদ ছিলেন। ইসলামের বড় বড় সাহাবী, খলিফারাও, যে কোন জটিল সমস্যার সম্মুখীন হলে হযরত আয়িশার (রা.) শরণাপন্ন হতেন এবং উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়িশা (রা.) সেসব জটিল সমস্যার ইসলাম ভিত্তিক সমাধান করে দিতেন। হযরত আয়িশা (রা.), বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত সন্নিধ্যে থাকার কারণে, তিনি কয়েক হাজার গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণনা করে গেছেন। তাঁর (রা.) বর্ণনাকৃত হাদীসের মধ্যে বিশুদ্ধ হাদীসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ইসলামের পারিবারিক, সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক অনেক হাদীস, মাসলা-মাসায়েল রচিত হয়েছে উম্মুল মুমেনদের অবদানে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে, তার পালক পুত্র হযরত যায়েদের (রা.) তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী হযরত যয়নবের (রা.) বিবাহ ছিল জাহেলী যুগের রীতিনীতির নস্যাৎ করার এক শ্রেষ্ঠ দলিল। এ বিয়ের মাধ্যমে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, পালক পুত্র কখনই আসল পুত্রের সমতুল্য হতে পারে না। জাহেলী যুগের পালক পুত্রের কুসংস্কার-তথা নিলর্জ কার্যকলাপ ও বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজ ও ইসলামী ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করেছিল এ বিয়ে। জাহেলী যুগের এ কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হযরত যয়নবের (রা.) বিয়ে দেন। এ ব্যাপারে আল কুরআনে নির্দেশ জারী হয়েছে। অতএব বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের কোন ঘটনা নিয়ে বক্রভাবে চিন্তা করা জঘন্যতম নির্বুদ্ধিতা ও মহাপাপ।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ময়দার নরম রুটি খেয়েছেন কিনা জানি না। তিনি কখনো ভূনা করা বকরী খেয়ে দেখেননি। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমাদের দুই দুই মাস কেটে যেত; তৃতীয় মাসের চাঁদ দেখা যেত; অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চুলায় আগুন জ্বলতো না। দু'টো সামান্য খেজুর ও পানি খেয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মিণীরা জীবন ধারণ করতেন; অথচ কেউ কোন আপত্তিকর আচরণ করতো না। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র স্ত্রীরা রাসূলকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁরা কেউ দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়েননি।
সাধারণত সতীনের মাঝে যে ধরনের (সচরাচর) খুনসুটি বা মনোমালিন্য হয়; তাও তাঁদের মাঝে লক্ষ্য করা যায়নি। বরং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক বন্ধন, মহত্ত্ব, মমত্ব, আদর্শিক সম্পর্ক সত্যিই কল্পনাতীত এবং অবিস্মরণীয় হয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবন বিশ্ব মানবতা, শান্তি, মানুষের মর্যাদা ও ভালোবাসার অকল্পনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে বিশ্ব ইতিহাসে চিত্রিত হয়ে আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মাত্র সন্তান (ছেলে) ইব্রাহীম, মারিয়া (মরিয়ম) কিবতিয়ার গর্ভে এবং অন্যান্য সকল সন্তান খাদীজার (রা.) গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন। আবদুল্লাহর দু'টি ডাক নাম ছিল। তায়্যিব ও তাহির। অনেকেই ভুল করে তায়্যিব ও তাহিরকে, দু'জন বলে মনে করে থাকেন। কাসিম ২ বছর বয়সে ও আবদুল্লাহ শৈশবে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেই ওফাত প্রাপ্ত হন। ইব্রাহীম ৮ম হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০ম হিজরীতে মাত্র ১৬ মাস বয়সে ইন্তিকাল করেন। বিশ্বনবীর সকল পুত্র সন্তান শিশুকালে মৃত্যুবরণ করেন। সর্বশেষ পুত্র সন্তান ইব্রাহীম মৃত্যুবরণ করলে কাফিররা খুশী হয়। পুত্র সন্তানরা একে একে সবাই মৃত্যুবরণ করায় তারা ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে বিশ্বনবীকে আটখুড়া, নিঃবংশ, ইত্যাদি নামে ডাকত। এ ব্যাপারে সূরা আল কাউসার নাযিল হয়। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, বিশ্বনবীকে তিনি কাউসার দান করে সম্মানিত করেছেন।
রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্যেষ্ঠা কন্যা জয়নবের, খাদীজার (রা.) ছোট বোন হালার পুত্র, আবুল আস বিন রাবিবিনের সঙ্গে বিবাহ হয়। আবুল আস বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়ায় আবুল আস মুক্তি পেয়ে মক্কায় ফিরে যান এবং মুক্তির শর্তানুযায়ী ঐয়নবকে মদীনা পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে আবুল আস ষষ্ঠ হিজরীতে মদীনায় এসে মুসলমান হয়ে জয়নবের সঙ্গে মিলিত হন। ঐয়নব (রা.) অষ্টম হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। উমামা নামের জয়নবের একটি মেয়ে ছিল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমামাকে খুব আদর করতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একন্যা খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২য় ও ৩য় কন্যা যথাক্রমে রুকাইয়া ও কুলসুমের প্রথমে বিবাহ হয়-উৎবা ও উতাইবার সঙ্গে। তারা উভয়েই ছিল আবু লাহাবের পুত্র। যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন, তখন আবু লাহাব পুত্রদ্বয়কে বাধ্য করল মহানবীর কন্যাদ্বয়কে পরিত্যাগ করতে। ফলে এ দু'মেয়েরই পর্যায়ক্রমে হযরত ওসমানের (রা.) সঙ্গে বিবাহ হয়। ওসমান (রা.) রুকাইয়ার (রা.) মৃত্যুর পর, কুলসুমকে (রা.) বিবাহ করেন। রুকাইয়া (রা.) দ্বিতীয় হিজরীর রমযানে বদরের যুদ্ধের দিন ইন্তিকাল করেন। জান্নাতুল বাকিতে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁকে নিজ হাতে দাফন করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমের সঙ্গে ওসমানের (রা.) বিবাহ সম্পাদিত হয় ৩য় হিজরীতে। উম্মে কুলসুম ৯ম হিজরীতে ইস্তিকাল করেন। ইসলামের প্রথম যুগে বিশ্বনবীর এ দু'কন্যা অমানুষিক নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করেছেন। তবুও তাঁরা পিতার আনীত দ্বীন ইসলামের উপর জীবন অতিবাহিত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ৪র্থ কন্যা ফাতিমা (রা.) ৬০৯ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আলীর (রা.) সঙ্গে ২য় হিজরীর যিলহজ্জ মাসে ফাতিমার (রা.) আনুমানিক ১৬ বছর বয়সে বিবাহ হয়। ১১ হিজরীতে (৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে) মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের সময় তাঁর পুত্র-কন্যাদের মধ্যে কেবল ফাতিমাই (রা.) জীবিত ছিলেন। অন্য সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন দশাতেই ইন্তিকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র কন্যাদের সকলকেই জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছে। শুধু বিবি খাদীজা (রা.) জান্নাতুল মোয়াল্লাতে (মক্কার পাশে) শুয়ে আছেন। এসব পবিত্র মানুষগুলোর কবরসমূহ সাদামাঠা, চিহ্নবিহীন। কোন ধরনের জৌলুস, বাঁধানো, সাজানো বা জাঁকজমক নেই এসব কবরে। এমনকি সামান্য পাথর দিয়েও চিহ্ন করে রাখা হয়নি। এটাই ইসলামের আদর্শ। এর বিপরীত কোন কিছু ইসলাম সম্মত নয়। যারা কবরকে মাজার বানায়; তারা স্পষ্টতই ইসলামের বাইরে মনগড়া বিদআত বা কঠিন গোনাহে লিপ্ত। এসব থেকে আল্লাহ আমাদের হিফাযত/রক্ষা করুন। আমীন।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামাজিক জীবন
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন আরববাসীদের ঠিক সম্মুখে রয়েছে। নবুওয়াত লাভের পূর্বে পুরো চল্লিশটি বছর তিনি আরবদের মাঝেই, তাদের একজন হয়ে অতিবাহিত করেছেন। তাদের শহর মক্কাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের চোখের সামনে তিনি শৈশব কাটিয়েছেন। সম্মানের সাথে উন্নত চরিত্র নিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জীবনের প্রায় পুরো সময় তাদের সাথে থাকা-খাওয়া, চলা-ফেরা, মেলামেশা করেছেন। বিয়ে-শাদীও তাদের সাথে করেছেন। লেন-দেন করেছেন। সকল প্রকার সামাজিক কাজে যোগ দিয়েছেন তথা সম্পর্ক স্থাপন তাদের সাথেই করেছেন। মেয়েদের বিয়ে শাদীও তাদের কাছে দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি দিকই তাদের নিকট প্রকাশ্য, উজ্জ্বল ও খোলা খাতার মত ছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তিনি কোন শিক্ষালয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেননি। এতীম অনাথ হওয়ার কারণে সে সুযোগও পাননি। তবে কি করে তিনি আল কুরআন হতে এমন তথ্য, তত্ত্ব জ্ঞান, বিজ্ঞতা লাভ করে, সহসাই নবুওতের দাবী করলেন? এর সাথে সাথেই তার মুখ হতে জ্ঞানের ঝর্ণধারা প্রবাহিত হতে লাগল? কেউ গবেষণা করল না? আসলে এর পিছে কি মহারহস্য লুকিয়ে আছে? কেউ তা ভেবে দেখল না? মহান রবের সরাসরি সাহায্য ব্যতীত কেউ কি এমনটি করতে পারে? অবশ্যই না। ইতিহাসই এর সাক্ষী।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় আরববাসীদের কাছে স্পষ্ট ছিল তা হলঃ মিথ্যাবাদ, ধোঁকা, প্রতারণা, জালিয়াতি, ঠকবাজী প্রভৃতি নৈতিক কদর্যতাপূর্ণ কাজ; তাঁর জীবনে কখনই দেখা যায়নি। দীর্ঘ চল্লিশ বছরে, কোন মানুষ এমন দাবী করতে পারেনি যে, তাঁর চরিত্রে ওসব কিছুর বিন্দু মাত্র লক্ষণ ছিল। পক্ষান্তরে যে লোকই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, সে তাঁকে একজন সত্যবাদী, সত্যদর্শী, নিষ্কলুষ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছে। অতএব এ কিতাব (আল কুরআন) তাঁর বানিয়ে বলাটা সম্পূর্ণ নিরর্থক ও বোকামি। অথচ প্রিয়নবী যখন পবিত্র কুরআনের বাণী আরববাসীদের শোনাতে লাগলেন, তখন তারা বলতে লাগল, এটা আল্লাহর বাণী নয় বরং এটা তোমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত বানান কথা। এটাকে আল্লাহর নামে পেশ করার উদ্দেশ্য হল, তার সে বাণীর মূল্য ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করা। মানুষ অজ্ঞতাবশত এভাবেই ভুল করে থাকে। প্রত্যেক নবী রাসূলের ক্ষেত্রেই এমনটি হয়েছে।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর। নবুওয়াত লাভের মাত্র পাঁচ বছর বাকী। তখন কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের ও হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর পুনঃ স্থাপনের মত ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। সে সময় কা'বা গৃহের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে যায়। কারণ এ পবিত্র ঘরটি নিম্নভূমিতে স্থাপিত হয়েছিল। ফলে বর্ষাকালে সারা শহরের পানি হারাম শরীফেই জমা হত। এ পানি যাতে করে কাবা গৃহের ক্ষতি সাধন করতে না পারে, সে জন্য বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাঁধটি প্রায়ই ভেঙ্গে যেত।
ফলে হারাম শরীফের অবস্থা আরও করুণ হয়ে পড়ে। কা'বা ঘরকে ভালভাবে মেরামত করা জরুরী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সব কিছুকে ভেঙ্গে ফেলা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিল যে, আল্লাহর ঘর কিভাবে ভেঙ্গে ধূলিস্মাৎ করা যাবে? এটাতো ভয়ংকর পাপের কাজ। তখন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা মতামত দিল, না! পাপ হবে কেন? এতো কা'বা ঘরকেই পুনঃনির্মাণের জন্য এবং মজবুত করে তৈরি করার জন্য করা হচ্ছে।
এভাবেই কা'বা ঘরের পুনঃনির্মাণে সকলেই ঐক্যমতে পৌঁছে। এদিকে সে সময় জিদ্দা বন্দরের উপকূলে ঝড়ের আঘাতে একটি জাহাজ অকেজো হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। এ সংবাদে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ, ওলীদকে পাঠিয়ে খুব অল্পদামে জাহাজের পরিত্যক্ত কাঠগুলো কা'বার ছাদের জন্য কিনে আনার ব্যবস্থা করে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কা'বা গৃহের সংস্কার কাজে অংশগ্রহণ করে। এতে দেয়ালগুলো খুব দ্রুত নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছে। কিন্তু পবিত্র কালো পাথরটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ এ পবিত্র পাথরটি দেয়ালে স্থাপন করার সম্মান ও গৌরব কোন গোত্রই হাতছাড়া করতে রাজী ছিল না। ফলে দাঙ্গা বাঁধার উপক্রম হল। সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। এ সংবাদে শহরের বাসিন্দারা আতংকিত হয়ে উঠল। আরব রীতিতে সংঘাত যদি শুরু হয়, তাহলে বংশানুক্রমে চলতে থাকে। কোন কোন গোত্র তাদের প্রথানুসারে রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে সংঘাতের জন্য প্রতিজ্ঞা করে বসল। এ পরিস্থিতিতে তাদের সম্মানী ব্যক্তিত্ব জ্ঞানবৃদ্ধ আবু উমাইয়া (মতান্তরে ওলীদ) সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, শোন তোমরা থাম! শুধু শুধু রক্তপাত কেন ঘটাবে? আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হেরেম শরীফের মধ্যে প্রবেশ করবে, তাকেই তোমরা সকলে পঞ্চায়েত মেনে নিবে। তার কথামতেই স্থাপিত হবে পবিত্র পাথর। সকলেই প্রস্তাবে রাজি হল। এরপর সবাই যার যার অবস্থানে চলে গেল।
পর দিন খুব ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম সেখানে প্রবেশ করল, তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁকে দেখতে পেয়েই সমবেত লোকেরা বলে উঠল, এ ব্যক্তি আল আমিন; বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। আমরা তাকেই মীমাংসাকারী মেনে নিতে রাজি আছি। তিনি তো মুহাম্মদ। সত্যবাদী, বিজ্ঞ, সর্বজন স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব। গোত্র প্রধানরা তাঁকে ঘিরে, তাদের সমস্যার কথা বললেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি বড় চাদর এনে জমিনে বিছানো হোক। অতঃপর প্রত্যেক গোত্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা এসে চাদরের চারিদিকে ধরল। এরপর তিনি কালো পাথরটি নিজ হাতে নিয়ে সে বিছানো চাদরের মাঝখানে রাখলেন। অতঃপর দলপতিরা চাদরের কোণা ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গেল। তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটিকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে দিলেন। এভাবে নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মহান আল্লাহ, সমগ্র কুরাইশদের দ্বারা তাঁকে একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরূপে স্বীকার করিয়ে নিলেন। সমাজে তাঁকে স্বীকৃত ব্যক্তিত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করলেন। এসবই মহান প্রতিপালকের নিখুঁত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন আরববাসীদের ঠিক সম্মুখে রয়েছে। নবুওয়াত লাভের পূর্বে পুরো চল্লিশটি বছর তিনি আরবদের মাঝেই, তাদের একজন হয়ে অতিবাহিত করেছেন। তাদের শহর মক্কাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের চোখের সামনে তিনি শৈশব কাটিয়েছেন। সম্মানের সাথে উন্নত চরিত্র নিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জীবনের প্রায় পুরো সময় তাদের সাথে থাকা-খাওয়া, চলা-ফেরা, মেলামেশা করেছেন। বিয়ে-শাদীও তাদের সাথে করেছেন। লেন-দেন করেছেন। সকল প্রকার সামাজিক কাজে যোগ দিয়েছেন তথা সম্পর্ক স্থাপন তাদের সাথেই করেছেন। মেয়েদের বিয়ে শাদীও তাদের কাছে দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি দিকই তাদের নিকট প্রকাশ্য, উজ্জ্বল ও খোলা খাতার মত ছিল। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তিনি কোন শিক্ষালয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেননি। এতীম অনাথ হওয়ার কারণে সে সুযোগও পাননি। তবে কি করে তিনি আল কুরআন হতে এমন তথ্য, তত্ত্ব জ্ঞান, বিজ্ঞতা লাভ করে, সহসাই নবুওতের দাবী করলেন? এর সাথে সাথেই তার মুখ হতে জ্ঞানের ঝর্ণধারা প্রবাহিত হতে লাগল? কেউ গবেষণা করল না? আসলে এর পিছে কি মহারহস্য লুকিয়ে আছে? কেউ তা ভেবে দেখল না? মহান রবের সরাসরি সাহায্য ব্যতীত কেউ কি এমনটি করতে পারে? অবশ্যই না। ইতিহাসই এর সাক্ষী।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় আরববাসীদের কাছে স্পষ্ট ছিল তা হলঃ মিথ্যাবাদ, ধোঁকা, প্রতারণা, জালিয়াতি, ঠকবাজী প্রভৃতি নৈতিক কদর্যতাপূর্ণ কাজ; তাঁর জীবনে কখনই দেখা যায়নি। দীর্ঘ চল্লিশ বছরে, কোন মানুষ এমন দাবী করতে পারেনি যে, তাঁর চরিত্রে ওসব কিছুর বিন্দু মাত্র লক্ষণ ছিল। পক্ষান্তরে যে লোকই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে, সে তাঁকে একজন সত্যবাদী, সত্যদর্শী, নিষ্কলুষ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছে। অতএব এ কিতাব (আল কুরআন) তাঁর বানিয়ে বলাটা সম্পূর্ণ নিরর্থক ও বোকামি। অথচ প্রিয়নবী যখন পবিত্র কুরআনের বাণী আরববাসীদের শোনাতে লাগলেন, তখন তারা বলতে লাগল, এটা আল্লাহর বাণী নয় বরং এটা তোমার নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত বানান কথা। এটাকে আল্লাহর নামে পেশ করার উদ্দেশ্য হল, তার সে বাণীর মূল্য ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করা। মানুষ অজ্ঞতাবশত এভাবেই ভুল করে থাকে। প্রত্যেক নবী রাসূলের ক্ষেত্রেই এমনটি হয়েছে।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর। নবুওয়াত লাভের মাত্র পাঁচ বছর বাকী। তখন কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের ও হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর পুনঃ স্থাপনের মত ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। সে সময় কা'বা গৃহের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে যায়। কারণ এ পবিত্র ঘরটি নিম্নভূমিতে স্থাপিত হয়েছিল। ফলে বর্ষাকালে সারা শহরের পানি হারাম শরীফেই জমা হত। এ পানি যাতে করে কাবা গৃহের ক্ষতি সাধন করতে না পারে, সে জন্য বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বাঁধটি প্রায়ই ভেঙ্গে যেত।
ফলে হারাম শরীফের অবস্থা আরও করুণ হয়ে পড়ে। কা'বা ঘরকে ভালভাবে মেরামত করা জরুরী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সব কিছুকে ভেঙ্গে ফেলা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিল যে, আল্লাহর ঘর কিভাবে ভেঙ্গে ধূলিস্মাৎ করা যাবে? এটাতো ভয়ংকর পাপের কাজ। তখন বিজ্ঞ ব্যক্তিরা মতামত দিল, না! পাপ হবে কেন? এতো কা'বা ঘরকেই পুনঃনির্মাণের জন্য এবং মজবুত করে তৈরি করার জন্য করা হচ্ছে।
এভাবেই কা'বা ঘরের পুনঃনির্মাণে সকলেই ঐক্যমতে পৌঁছে। এদিকে সে সময় জিদ্দা বন্দরের উপকূলে ঝড়ের আঘাতে একটি জাহাজ অকেজো হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। এ সংবাদে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ, ওলীদকে পাঠিয়ে খুব অল্পদামে জাহাজের পরিত্যক্ত কাঠগুলো কা'বার ছাদের জন্য কিনে আনার ব্যবস্থা করে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কা'বা গৃহের সংস্কার কাজে অংশগ্রহণ করে। এতে দেয়ালগুলো খুব দ্রুত নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছে। কিন্তু পবিত্র কালো পাথরটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কারণ এ পবিত্র পাথরটি দেয়ালে স্থাপন করার সম্মান ও গৌরব কোন গোত্রই হাতছাড়া করতে রাজী ছিল না। ফলে দাঙ্গা বাঁধার উপক্রম হল। সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। এ সংবাদে শহরের বাসিন্দারা আতংকিত হয়ে উঠল। আরব রীতিতে সংঘাত যদি শুরু হয়, তাহলে বংশানুক্রমে চলতে থাকে। কোন কোন গোত্র তাদের প্রথানুসারে রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবিয়ে সংঘাতের জন্য প্রতিজ্ঞা করে বসল। এ পরিস্থিতিতে তাদের সম্মানী ব্যক্তিত্ব জ্ঞানবৃদ্ধ আবু উমাইয়া (মতান্তরে ওলীদ) সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, শোন তোমরা থাম! শুধু শুধু রক্তপাত কেন ঘটাবে? আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হেরেম শরীফের মধ্যে প্রবেশ করবে, তাকেই তোমরা সকলে পঞ্চায়েত মেনে নিবে। তার কথামতেই স্থাপিত হবে পবিত্র পাথর। সকলেই প্রস্তাবে রাজি হল। এরপর সবাই যার যার অবস্থানে চলে গেল।
পর দিন খুব ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম সেখানে প্রবেশ করল, তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁকে দেখতে পেয়েই সমবেত লোকেরা বলে উঠল, এ ব্যক্তি আল আমিন; বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। আমরা তাকেই মীমাংসাকারী মেনে নিতে রাজি আছি। তিনি তো মুহাম্মদ। সত্যবাদী, বিজ্ঞ, সর্বজন স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব। গোত্র প্রধানরা তাঁকে ঘিরে, তাদের সমস্যার কথা বললেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটি বড় চাদর এনে জমিনে বিছানো হোক। অতঃপর প্রত্যেক গোত্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা এসে চাদরের চারিদিকে ধরল। এরপর তিনি কালো পাথরটি নিজ হাতে নিয়ে সে বিছানো চাদরের মাঝখানে রাখলেন। অতঃপর দলপতিরা চাদরের কোণা ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গেল। তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটিকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে দিলেন। এভাবে নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মহান আল্লাহ, সমগ্র কুরাইশদের দ্বারা তাঁকে একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরূপে স্বীকার করিয়ে নিলেন। সমাজে তাঁকে স্বীকৃত ব্যক্তিত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করলেন। এসবই মহান প্রতিপালকের নিখুঁত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।