📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উচ্চবংশ কুরাইশ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামহের নাম আবদুল মুত্তালিব এবং পিতার নাম আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ'র জন্ম নিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনা রয়েছে।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতামহ মানত করেছিলেন যে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে যদি তিনি দশটি পুত্র সন্তানের মুখ দেখতে পান তাহলে ১টি পুত্র আল্লাহর নামে কুরবানী করবেন। আল্লাহ তার আশা পূরণ করেন। সর্ব কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ ছিল পিতার সর্বাধিক প্রিয়। আবদুল মুত্তালিব পুত্র কুরবানীর ব্যাপারে আল্লাহর নামে কোরায বা লটারী করলেন। লটারীতে বার বার আব্দুল্লাহর নাম উঠল। এভাবে দশবার লটারীতে একই ফল পেলেন। তখন তিনি প্রতিবারের জন্য ১০টি করে উট হিসাব করে ১০০টি উট; আব্দুল্লাহর বদলা হিসেবে কুরবানী করলেন। এভাবে বিশ্বনবীর পিতা আব্দুল্লাহ রক্ষা পান। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন 'আমি দুই যবহের সন্তান অর্থাৎ তার বংশে পিতৃ পুরুষের মধ্যে দু'টি যবহের উপক্রম ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমটি তাঁর পিতা আবদুল্লাহর ঘটনা এবং দ্বিতীয়টি তাঁর পিতামহের বংশের আদি পুরুষ হযরত ইসমাইল (আ.) এর কুরবানীর ঘটনা। যিনি যবেহ হচ্ছিলেন তাঁর পিতা হযরত ইব্রাহীমের (আ.) হাতে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর মেহেরবানীতে তিনিও রক্ষা পেয়েছিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা আব্দুল্লাহ ছিলেন সুন্দর ও চরিত্রবান সুপুরুষ। তাঁর চেহারায় এক অভাবনীয় আলোকছটা সবসময় ঝলমল করত। তাঁর আচার ব্যবহার, কথাবার্তা, চলাফেরা এবং মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ গুণ ছিল। তিনি তার বংশের প্রত্যেকটি লোকের কাছে অত্যধিক প্রিয় ছিলেন। কথিত রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর বংশ পরম্পরায় এসেছে। ফলে বংশের উপরস্থ প্রত্যেকেই সর্বদা এক অলৌকিক উজ্জ্বল্যের অধিকারী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি পবিত্র বংশে জন্মেছি এবং আদম হতে আরম্ভ করে আমার পিতা মাতা পর্যন্ত অন্ধ যুগীয় কোন অত্যাচার-ব্যভিচার-কদাচার আমার বংশকে স্পর্শ করেনি। বিয়ের সময় আব্দুল্লাহর বয়স ছিল আনুমানিক সতের।
বিয়ের পর বেশ কিছুদিন তিনি ব্যবসা উপলক্ষ্যে শাম দেশে (পারস্য) যাতায়াত করেন। শামদেশ থেকে ফিরে আসার পথে তিনি একদিন মদীনায় ইয়াসরেবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অসুস্থতার খবর পেয়ে আবদুল মুত্তালিব তার বড় ছেলে হারিসকে পাঠালেন। কিন্তু হারিসের সেখানে পৌঁছার পূর্বেই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ ইহজগত ত্যাগ করে কবরবাসী হয়ে গেলেন। হারিস এ শোকসংবাদ নিয়ে বাড়ি ফিরলে বংশের আদরের দুলালের মৃত্যুতে পুরো বংশ ও নগরীতে শোকের ছায়া নেমে আসে (৫৭০ খ্রীঃ)।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মায়ের গর্ভে। অথচ পিতা দুনিয়ার বুক হতে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেছেন। এভাবেই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠমানব বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের গর্ভেই এতীম হয়ে রইলেন। বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা'র গর্ভে থাকা অবস্থায় মা আমিনার অনুভূতি ছিল বিস্ময়কর। তিনি বলেন, যে দিন আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গর্ভে ধারণ করি, সেদিন থেকে সন্তান প্রসবের দিন পর্যন্ত আমি সামান্যতম যন্ত্রণা অনুভব করিনি। এমনকি আমি তার কোন ওজনও অনুভব করিনি। কোন অবস্থায় আছি, তাও বুঝতে পারতাম না। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, গর্ভ ধারণের পরে একদিন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে ফিরিশতারা আমার সামনে হাজির হয়ে বলল, তুমি কি বুঝতে পারছ না যে, তুমি গর্ভবতী, তোমার গর্ভে বিশ্বমানবের পথ প্রদর্শক আসছে। যা বললাম তা খুব ভালভাবে জেনে রাখ। আর সে মুহূর্তে আলোর একটি রশ্মি আমার দেহ হতে বের হয়ে তীব্রবেগে উত্তর দিকে চলে যায় এবং তা সিরিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অতঃপর আমার প্রসবের দিন যখন সমাগত হলো, তখন ঐ ফিরিশতারা আবার আমার নিকট এলো এবং এ বলে আমাকে সতর্ক করে দিল যে, আমি যেন বলি হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানকে তার শত্রুর হাত হতে রক্ষা কর এবং আমি যেন আমার সন্তানের নাম রাখি 'মুহাম্মদ' অর্থাৎ প্রশংসিত। যার কথা তৌরাত ও ইঞ্জীল গ্রন্থে উল্লেখ আছে। কারণ তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে সকলের প্রশংসিত হবেন।
৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে ১২ই রবিউল আওয়াল, রোজ সোমবার রাতের অন্ধকারের বুক চিরে পূর্বাকাশে দেখা দিল আশার আলো। দিকে দিকে অন্ধকার, অধর্ম, অত্যাচার, অনাচার ও পাপ-পংকিলতা-কলুষিত পৃথিবীর বহু আকাঙ্ক্ষিত এবং দিশেহারা মানুষের একান্ত প্রতীক্ষিত নূরের রবি, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মপ্রকাশ করলেন পৃথিবীর বুকে। রুক্ষ আরবের মরু দিগন্তে মক্কা নগরীর এক জীর্ণ কুটিরের এক নিভৃত কক্ষে মা আমিনা সুখ স্বপ্নে দেখতে পেলেন-এক অপূর্ব আলোতে আকাশ বাতাস-জমীন আলোকিত। তার কুটিরে আজ কি অপরূপ দৃশ্য, কারা এ শুভ্রবাসন পুণ্যময়ী রমণীগণ? মা হাওয়া, হাজেরা, আসিয়া, রহিমা, মারইয়াম সবাই আজ আমিনার শিয়রে দণ্ডায়মান।
বেহেশতী আলোর ছটায় সারা ঘর অসম্ভর রকমের উদ্ভাসিত এবং বেহেশতী সৌরভে বাতাস আজ সুরভিত। মা আমিনা বলেন, আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সদ্যজাত শিশুর দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন হাতে ভর দিয়ে সিজদা করছে এবং এক হাতে মাটি আঁকড়ে ধরে শাহাদত আঙ্গুলটি ঊর্ধ্বদিকে তুলে রেখেছে। আর আকাশের দিকে মাথা তুলে কি যেন দেখছে। প্রকৃতির এ হাসি আনন্দ ও স্ফূর্তির ঢেউ অনেকেরই চোখ এড়াতে পারেনি। অনেকে উদগ্রীব হয়ে খুঁজে বেড়াতে থাকে কোথায় যেন কি ঘটে গেছে? মনে প্রশ্ন জাগে, আজ দুনিয়ার সবকিছু হাসছে কেন? কি সে মহাঘটনা।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর নবীকে প্রসব কালে একটি আলোর রেখা মা আমিনার দেহ থেকে বের হয়ে অতি দ্রুত সিরিয়া অতিক্রম করে বসরা শহরের রাজপ্রাসাদকে আলোকিত করে। একই সাথে ঘটে যায় বহু বিস্ময়কর ঘটনা। এসব ঘটনা বিশ্বের মানুষকে চমকে দেয়। প্রবল ভূমিকম্পে পারস্য সম্রাট খসরুর রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠে এবং চৌদ্দটি গম্বুজ ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। যে অগ্নিশিখা পারস্যে হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত ছিল তা নিভে যায়। কা'বাঘরে স্থাপিত ৩৬০টি মূর্তি উপুড় হয়ে পড়ে যায়। বিশ্বের সকল মূর্তিপূজকরা দারুণ লজ্জায় মাথা অবনত রাখতে বাধ্য হয়। মদীনার প্রসিদ্ধ কবি হাসান বিন সাবেত (পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন) বলেন, আমার বয়স তখন সাত বছর। কথাবার্তা সবই বুঝি। হঠাৎ একদিন দেখি জনৈক ইহুদী মদীনার একটি লাল পাহাড়ের চূড়ায় উঠে অপর ইহুদীদেরকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকছে। সকলে একত্রিত হলে, সে বলল, আজ রাতে অকাশের গায়ে নজমে আহমদ (আহমদের তারকা) উদিত হয়েছে। কাজেই প্রতিশ্রুত নবী আহমদ জন্ম গ্রহণ করেছেন। দাদা আবদুল মুত্তালিব তখন কাবা ঘরে তার বন্ধুদের সাথে আলাপ করছিলেন, আমিনা তাঁকেই সর্বপ্রথম সংবাদ পাঠালেন। আপনার নাতি হয়েছে দেখে যান। আবদুল মুত্তালিব সংবাদ শুনে বাড়ি আসেন। সদ্য ভূমিষ্ঠ নাতিকে দাদার কোলে তুলে দিয়ে, মা আমিনা সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। আবদুল মুত্তালিব আনন্দে আত্মহারা হয়ে দু'হাত বাড়িয়ে নাতিকে কোলে নিয়ে চুমু দিতে দিতে কা'বা ঘরে আসেন। আবদুল মুত্তালিব, নাতিকে পবিত্র কাবার চাদরে আবৃত করে, তার দীর্ঘায়ু ও মঙ্গলের জন্য বহুক্ষণ আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে দোয়া করেন। আবদুল মুত্তালিবের বন্ধুরা অবাক বিস্ময়ে তার এ প্রার্থনা দেখতে থাকে। কেউ কোন রা শব্দ করে না। সাত দিন পর, আরবের নিয়মানুযায়ী আবদুল মুত্তালিব খুব উৎসবমুখর পরিবেশে নাতির আকিকা পালন করেন। মক্কার বিশিষ্ট কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ও আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয়া হয়। উৎসব শেষে কুরাইশ দলপতিরা শিশুকে দেখে খুশিতে কৌতূহলবশতঃ জিজ্ঞাসা করেন, শিশুর নাম কি রাখলেন? মুহাম্মদ। কোন এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে আবদুল মুত্তালিবের মুখ থেকে এ পবিত্র নাম বের হয়ে আসে। মুহাম্মদ! নাম শুনে অবাক হয়ে যায় কুরাইশ দলপতিরা। তারা পুনরায় প্রশ্ন তোলে, এমন অদ্ভুত নাম তো আমরা কখনো শুনিনি? দেবতার নামের সাথে নাম মিলিয়ে রাখলেন না কেন? সেকালের নিয়মানুসারে দেবদেবিদের নামের সাথে মিলিয়ে শিশুদের নাম রাখা হত।
আবদুল মুত্তালিব আবেগাপ্লুত হয়ে জবাব দেন, আমার স্নেহের নাতিটি বিশ্ব বরেণ্য হবে। বিশ্ব জগতে তার মহিমা ও প্রশংসা হবে। এজন্যই ওর নাম রাখলাম 'মুহাম্মদ' অর্থাৎ প্রশংসিত। আমন্ত্রিত দলপতিরা আবদুল মুত্তালিবের কথা বুঝতে না পারলেও আর কোন প্রশ্ন না করে শিশুকে দোয়া করে চলে যায়। মা আমিনাও গর্ভাবস্থায় স্বপ্ন দেখতেন, তার প্রাণের দুলালের নাম যেন 'আহমদ' রাখা হয়েছে। এজন্য 'মুহাম্মদ' নামের সাথে তিনি 'আহমদ' নামও যুক্ত করে দেন।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই দু'নামে অভিহিত হলেন। মুহাম্মদ ও আহমদ। মুহাম্মদ অর্থ চরম প্রশংসিত আর আহমদ অর্থ চরম প্রশংসাকারী। বাস্তবেও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দ্বারা চরমভাবে প্রশংসিত হয়েছেন। আবার তিনি আল্লাহর চরম প্রশংসা করেছেন। আল্লাহর হাবীব যে চরম প্রশংসা ও সম্মান লাভ করেছেন, পৃথিবীর অন্য কারো ভাগ্যে তা ঘটেনি। ভবিষ্যতে ঘটবেও না। আবার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে আল্লাহর প্রশংসা করেছেন, অন্য কারো দ্বারা তা করা সম্ভব হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। এজন্যই প্রিয় নবীর উভয় নামই অতিমাত্রায় সার্থক ও সফল হয়েছে। আল্লাহর হাবীব, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মাত্র এক সপ্তাহ মা আমিনার বুকের দুধ পান করেন। পরে বিবি হালিমা সাদিয়ার নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত আরেক সপ্তাহ আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবার বুকের দুধ পান করেন।
আবদুল্লাহর পুত্র সন্তান জন্ম লাভের পর, আনন্দ সংবাদ আবু লাহাবের কাছে দাসী সুমাইয়া পৌঁছালে, বিশ্বনবীর চাচা আবু লাহাব খুশিতে সংবাদদাত্রী দাসী সুয়াইবাকে সাথে সাথেই মুক্ত করে দেন। পরবর্তীকালে আবু লাহাব ইসলামের সবচাইতে বড় শত্রু হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তার নামে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন। আবু লাহাবের ব্যাপারে বুখারী শরীফে একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, আবু লাহাবকে তার মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি অবস্থা চাচা? উত্তরে আবু লাহাব বলল, আর বল না বাবা; ভীষণ আযাবে ভুগছি। তবে প্রতি সোমবার দিন শুধু শাহাদত ও মধ্যমা আঙ্গুলের ফাঁকে একটু পানি পাই পান করার জন্য। ঐদিন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সংবাদ নিয়ে আসায়, আঙ্গুলদ্বয়ের দ্বারা ইশারা করে সুয়াইবা দাসীকে বলেছিলাম, যা তুই মুক্ত। এ কাজটুকু করার বিনিময়ে পরকাল এ সামান্য রহমত এদিনে আমার ভাগ্যে জুটেছে (বুখারী)। সত্যিই বিস্ময়কর। স্রষ্টার কাছে এতটাই বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিশুকাল
কুরাইশ ও মক্কা নগরীর অন্যান্য সম্ভ্রান্ত আরব পরিবারের শিশু সন্তানদেরকে গ্রাম্য বেদুইন ধাত্রীদের কাছে পঠানো ছিল তখনকার দিনের চিরাচরিত রীতি। গ্রামের মুক্ত আলো বাতাসে শিশুরা সুস্থ ও সবল হয়ে গড়ে উঠবে, শুদ্ধ ভাষা শিখবে। এ উদ্দেশ্যে নগরীর শিশুদেরকে গ্রাম্য ধাত্রীর কাছে পাঠানো হত। কেননা শহরের নানা জাতির নানা সম্প্রদায়ের মানুষ থাকায় শুদ্ধ আরবি ভাষায় অনেক বিকৃতি দেখা দিত। তাই গ্রাম্য পরিবেশে থাকলে অতি শৈশবে তারা খাঁটি ও অবিকৃত আরবি ভাষা আয়ত্ত করতে পারবে বলে শিশুদের বেদুইন ধাত্রীদের কাছে দেয়া হত। গ্রামের আর্থিক অভাবে দুর্বল, অথচ সম্ভ্রান্ত বংশের গৃহবধূরা এ কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা পয়সার আশায় বছরে একাধিকবার স্তন্যপায়ী সন্তানের সন্ধানে দূর দূরান্ত হতে উপস্থিত হত। প্রিয়নবীর জন্ম লাভের দু'সপ্তাহ পরে তায়েফের পার্শ্বস্থিত গ্রামের, বনী সাদ গোত্রের একটা ধাত্রী দল মক্কায় এসে উপস্থিত হয়। তাদের সাথে আর্থিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল বিবি হালিমাও ছিলেন। হালিমা বিনতে যুইব বলেন, বছরটা ছিল ঘোর অন্ধকার। আমি এবং আমার স্বামী হারিস দু'জনেই মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। আমরা ঠিক করলাম, মক্কায় গিয়ে একটি দুগ্ধ পোষ্য শিশু খুঁজে বের করব। আমরা আরো মনে করলাম, হয়তো এমন একটি শিশু পেয়ে যাব, যার কৃতজ্ঞ পিতা-মাতা আমাদের কঠিন অভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবেন। আমরা একটি কাফেলায় শরীক হলাম। যেখানে আমাদের গোত্রের অনেকেই ছিল। যারা একই উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। আমি যে গাধার পিঠে সওয়ার হয়েছিলাম সেটা ছিল শীর্ণকায় এবং ক্লান্তিতে এতো দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, তার রাস্তায় পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হল। আমার বাচ্চা সারারাত ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছিল। আমরা সে রাতে একদম ঘুমোতে পারিনি। আমার বাচ্চার ক্ষুধা নিবৃত্ত করার মত এক ফোঁটা দুধও আমার বুকে ছিল না। আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। আমি ভাবলাম, আমাদের এ কষ্টের অবস্থায় আমি কি কোন দুগ্ধপোষ্য শিশু পাব? কাফেলার অনেক পরে, আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। ইতোমধ্যে অন্যান্য দুগ্ধবতী সব মহিলারা নবজাতকের লালন-পালনের দায়িত্ব পেয়ে গেছে। কেবল একটি শিশু ছাড়া এবং সে দুগ্ধ শিশুটি ছিল বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
বিবি হালিমা বলেন, শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা বেঁচে ছিলেন না। তার পরিবার উচ্চ বংশীয় হলেও, ধনী ছিলেন না। সে জন্যে কোন ধাত্রী শিশুটিকে নিতে আগ্রহী ছিল না। আমরা প্রথমে ঠিক করেছিলাম খালি হাতেই ফিরে যাব। কিন্তু আমি এ ভেবে চিন্তিত ছিলাম যে, খালি হাতে ফিরে গেলে এলাকায় আমার চেয়ে ভাগ্যবতীরা আমাকে বিদ্রূপ করবে। তাছাড়া সুন্দর শিশুটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল মক্কা নগরীর অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় সে শুকিয়ে ঝরে যাবে। আমার মনে শিশুটির প্রতি এক গভীর মমতা জেগে উঠল। আমি অনুভব করলাম, অলৌকিকভাবে আমার স্তন স্ফীত হয়ে দুধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে! আমি আমার স্বামীকে বললাম, 'আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমার এ শিশুটিকে নিতে বড়ই ইচ্ছে করছে। যদিও এর থেকে আমাদের আর্থিকভাবে তেমন কিছু পাবার নেই। আমার স্বামী বললেন, আমার মনে হয় না যে, তুমি ভুল বলছ। হয়তো এ শিশুটির কারণে আমাদের সংসারে আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হতে পারে। নিজেকে সংযত করতে না পেরে আমি সুদর্শন ও মায়াবী ঘুমন্ত শিশুটির দিকে দৌঁড়ে গেলাম। যখন আমি শিশুটির সুন্দর ছোট বুকে হাত রাখলাম, তখন সে চোখ খুলে হাসল। তার চোখ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল মিষ্টি আলো। আমি তার ভ্রুর মাঝে চুমু খেলাম। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আমি আমাদের কাফেলায় তাঁবুর কাছে ফিরে এলাম। আমি আমার ডান স্তন তার মুখে তুলে দিলাম। অবাক হয়ে আমি দেখলাম, সে তার ক্ষুধা নিবারণের মতো যথেষ্ট দুধ পান করতে পারলো। আমি আবার আমার বাম স্তন তার মুখে তুলে দিলাম। কিন্তু সেটা সে মুখে নিল না (তার দুধ ভাইয়ের জন্য রেখে দিল)। সে পরবর্তীতেও সব সময়ই এরকম করতো। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতাম।
বিবি হালিমা সাদিয়া বলেন, আরো একটা বড় ধরনের বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সকাল থেকে যে উটের বাঁটে দুধ ছিল না, সে বাঁটগুলো দুধে ভর্তি হয়ে গেল। সেগুলো থেকে আমার স্বামী দুগ্ধ দোহন করল এবং আমরা তা পরম তৃপ্তিসহকারে পান করলাম। কয়েক মাস পর রাতের ছায়ায়, এ প্রথম আমাদের ভালো ঘুম হল। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে আমার স্বামী বললেন, 'হালিমা! তুমি এক অসাধারণ আশীর্বাদপ্রাপ্ত শিশুকে পোষ্যরূপে গ্রহণ করেছ। শিশুটিকে নিয়ে আমি আমার গাধার পিঠে সওয়ার হলাম। গাধাটি দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করল এবং সবাইকে অবাক করে, কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা কাফেলাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চললো। আমার সহযাত্রীরা বলতে লাগলো, হালিমা! একটু দাঁড়াও, যাতে আমরা এক সাথে বাড়ি ফিরতে পারি। এটা কি সে গাধা নয়, যেটার পিঠে চড়ে তুমি এসেছিলে? আমি তাদেরকে বললাম, হ্যা সেটাই তো। তখন তারা অবাক হল, আর বলাবলি করতে লাগলো, গাধাটির ওপর এমন কিছুর আছর হয়েছে, যার ব্যাপারে তারা কোন ধারণা করতে অক্ষম। অবশেষে বনী সাদ গোত্রে আমরা নিজ নিজ ঘরে পৌঁছলাম। আমাদের মত খরা-পীড়িত এলাকা পৃথিবীর আর কোথাও ছিল বলে আমার জানা ছিল না। আমাদের পশুর পাল দুর্ভিক্ষে কাঁবু হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা বাড়ি ফিরে দেখি, অন্যান্য ভালো মৌসুমের চেয়ে আমাদের ভেড়াগুলো রহস্যময়ভাবে সতেজ হয়ে উঠেছে।
অথচ আমাদের আশেপাশের পশুগুলোর অবস্থা ছিল শোচনীয়। সেজন্য মালিকরা তাদের রাখালদের দোষারোপ করতে লাগল। তারা রাখালদের গালি দিয়ে বলল, হালিমার ভেড়াগুলো যেখানে চরে সেখানে আমাদের ভেড়াগুলো চরাতে পারিস না? রাখালরা নির্দেশ মোতাবেক কাজ করল কিন্তু তাতে কোন ফল হল না। এভাবে আমাদের বাড়িঘর কল্যাণ ও প্রাচুর্যে ভরে উঠতে লাগল। শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন দু'বছর হল, তখন আমি তাকে দুধ ছাড়িয়ে দিলাম। তার হাবভাব এমন ছিল যে, মাত্র নয় মাস বয়সে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত সুন্দর স্বরে কথা বলতে পারত যে, তা হৃদয় স্পর্শ করে যেত। সে কখনও নোংরা থাকতো না এবং ফুঁপিয়ে বা চিৎকার করে কাঁদতো না। যদি কখনও রাতে সে অস্থির হয়ে উঠত এবং ঘুমাতে চাইতো না, তখন আমি তাকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে আসতাম। শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলই আকাশের তারকারাজির দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকত এবং ভীষণ আনন্দিত হয়ে উঠত। আর যখন দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন সে চোখ বুজে ঘুমিয়ে যেত।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে, হালিমা প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুধ ছাড়ানোর পর, তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন এবং মক্কা পৌঁছা মাত্র হালিমা, মা আমিনার পায়ে পড়ে কাকুতি মিনতি করে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবার ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। ফলে তার মিনতি এবং ছেলের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে, মা আমিনা শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হালিমার সঙ্গে পুনরায় তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। বিবি হালিমার একমাত্র পুত্রের নাম ছিল আবদুল্লাহ। তিন মেয়ে শায়মা, আতিয়া ও হুযাফা। বড় মেয়ে শায়মা, তার দুধ ভাই শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুব আদর করত। তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। এতে একটুও ক্লান্তি অনুভব করত না। মা হালিমা সদা সর্বদা কড়া নজর রাখতেন। কখন তারা কি করে? কোথায় যায়? কোনো ব্যাপারে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্ট হয় কিনা? একবার শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোলে করে শায়মা বেশ দূরে এক মাঠে ছেলেদের খেলা দেখতে গিয়েছিল। এদিকে মা হালিমা শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশে পাশে না দেখে বিচলিত হয়ে উঠলেন। দুপুর বেলার প্রখর রৌদ্রের মধ্যে ছেলেকে নিয়ে শায়মা কোথায় গেল? তিনি সে চিন্তায় অস্থির। এমন সময়ে শায়মা তার দুধ ভাইকে নিয়ে ফিরে এল। হালিমা, শায়মাকে খুব বকাঝকা করলেন। রৌদ্রে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাগ করলেন। শায়মা বলল মা! ভাইয়ের মোটেই কষ্ট হয়নি। আমি যখন যেখানে গিয়েছি, সেখানেই এক খণ্ড মেঘ আমাদের এ কুরাইশ ভাইয়ের মাথার উপর ছায়া দান করেছে। আমি দাঁড়ালে মেঘটিও থেমে দাঁড়াত। ভাইয়ের শরীরে একটুও রোদ লাগেনি। বিবি হালিমা মেয়ের কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার পর অসীম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এতো মহান স্রষ্টার সরাসরি কৃপায় পালিত মানব শিশু। নিশ্চয়ই এ শিশু বিশ্ব বরেণ্য কেউ হবে।
শিশুনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চার বছর বয়সে বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে কুরআনে এসেছে, আমি কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত করে দেইনি; আর আপনার যে বোঝা আপনার পিঠ বাঁকা করে দিয়েছিল; তা আপনার থেকে সরিয়ে দিয়েছি (সূরা আলাম নাশরাহ-১)। একদিন শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুধ ভাইয়ের সাথে মেষ চরাতে চারণ ভূমিতে গেলেন। তখন এক কল্পনাতীত ঘটনা ঘটল। দিনের মধ্যভাগে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুধভাই, হঠাৎ দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে আসে। সে তার পিতা মাতাকে চিৎকার করে, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বলতে থাকে, তোমরা তাড়াতাড়ি এসো। আমার কুরাইশ ভাইকে সাদা কাপড় পরা দু'জন লোক মাটিতে শুইয়ে বুক চিরে দু'ফালা করে ফেলেছে। ভয়ে পাগোলীনির মত হালিমা এবং বিস্ময়ে তার স্বামী দৌড়াতে দৌঁড়াতে ছেলেকে অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সেখানে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটা পাহাড়ের উপর বসে থাকতে দেখে। তাকে সম্পূর্ণ শান্ত, অথচ তার মুখমণ্ডল বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। অতপর তাঁর পালক পিতা (হারিস) তাঁকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, প্রিয় বৎস, ব্যাপার কি? তোমার কি হয়েছে? তখন শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বলেন, আমি যখন মেষপালের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছিলাম। সে সময় শুভ্রমূর্তির মত দু'জন লোক দেখতে পেলাম। আমি প্রথমে ঐ দু'জনকে বিরাটকায় শুভ্রপাখি মনে করেছিলাম। কাছে আসায় ভুল ভাঙ্গল। তারা আমাকে চিৎ করে মাটিতে শুইয়ে দিল। তারপর আমার বুক চিরে বুকের ভেতর থেকে কী একটা বস্তু ফেলে দিল। তারপর আবার আমার বুক যেমন ছিল তেমনই করে দিল (মুসলিম)।
বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব এ ঘটনার পর, বিবি হালিমার মনে শত প্রশ্ন জাগতে লাগল। স্বামী হারিস চুপে চুপে বলল, হালিমা! আমার মনে হয় ছেলেকে ভূত প্রেতে আছর করেছে। এ সমস্ত ঘটনা জানা জানি হবার আগেই, চল আমরা তাকে ফেরত দিয়ে আসি। বিবি হালিমা ও তার স্বামী, মায়ের ছেলেকে মায়ের কাছে দিয়ে আসাই ভাল মনে করে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হল। নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মা আমিনার কাছে নিয়ে গেলেন। হালিমা, মা আমিনার নিকট ঘটনাটি খুলে বললেন। আমিনা বললেন, জেনে রাখুন শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই ওর ক্ষতি করার। কারণ এক গৌরবময় ভবিষ্যৎ ওর জন্য অপেক্ষা করছে। বিবি আমিনা তখন শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গর্ভে থাকাকালীন সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাগুলো হালিমাকে জানালেন। এরপর তিনি হালিমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং তাকে পুরস্কৃত করে নিজের শিশু সন্তান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গভীর মাতৃস্নেহে কাছে টেনে নিলেন। মার কাছে, মুক্ত বাতাসে, পরম স্নেহে, পিতৃহারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় হতে লাগলেন।
বিশ্বনবী ছিলেন এতিম এবং এ ব্যাপারে কুরআনে এসেছে 'অতএব, আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না এবং নবীর প্রার্থনাকারীকে ধমক দিবেন না' (সূরা আদ দোহা: ৯-১০)। আরবের রীতি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মায়ের স্নেহের বাঁধন খুলে চলে যেতে হয়েছিল দুধ মাতা হালিমার ঘরে। শিশুনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ দু'বছর তার বুকের দুধ পান করেন। বড় হলেন। দুধ মা হালিমার আদর সোহাগ এবং দুধ ভাই আবদুল্লাহ ও বোন শায়মার স্নেহে লালিত পালিত হয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করেন।
শিশুনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর ছয় বছরে পা দিতেই মা আমিনার ক্রোড়ে এসে নবজীবন লাভ করেছিলেন। একদিন মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদীনায় বেড়াতে যেতে মনস্থ করেন। আমিনার বংশের অনেকেই আত্মীয়তা সূত্রে মদীনার সাথে জড়িত। আবার স্বামী আবদুল্লাহও সেখানে সমাহিত হয়েছেন। আত্মীয়দের সাথে দেখাশুনা করা তথা স্বামীর কবর যিয়ারত করার আকুলতা বুকে নিয়ে মা আমিনা পুত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে মদীনা যান। সেখানে গিয়ে মাতুল গোষ্ঠী বনী নাজারে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন।
এরপর বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও দাসী উম্মে আইমানকে নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হন। কিন্তু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছা কি মানুষ বুঝতে পারে? না কখনই পারে না। আর পারে না বলেই মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী আবওয়া নামক স্থানে হঠাৎ মা আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আকস্মিকভাবে সেখানেই ইন্তিকাল করেন (৫৭৬ খ্রিঃ)। শিশুনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের কয়েক মাস পূর্বেই মাতৃগর্ভে থাকাকালীন স্নেহময়ী পিতা দুনিয়া ছেড়ে গেছেন। জন্মের ছয় বছর পর স্নেহময়ী জননীও হারিয়ে গেলেন চিরতরে। মায়ের আদর সোহাগ যখন তিল তিল করে ভোগ করার সময়, তখনই মা এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। এতীম শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদূর বিদেশে মাকে কবর দিয়ে দাসী উম্মে আইমানের হাত ধরে দেশে ফিরেন সর্বশান্ত হয়ে।
ওদিকে আবদুল মুত্তালিব ছেলের বউ' এর মৃত্যু সংবাদ শুনে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। ছেলে আবদুল্লাহ মারা যাবার পর, পিতা আবদুল মুত্তালিব প্রচণ্ড আঘাতে পাথরের মত হয়ে গিয়েছিলেন। সে শোকের পাথর ভাঙতে শুরু করেছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের মধ্যদিয়ে। হঠাৎ ছেলের বউ' এর ইন্তিকালে পুনরায় সবকিছু উলট পালট হয়ে যায়। মায়ের মৃত্যুর পর, দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর অবুঝ নাতির লালন পালনের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। মমতা ও অকৃত্রিম ভালবাসার সঙ্গে তার দেখাশুনা করতে লাগলেন। এভাবেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাল্যজীবন দাদার আদর সোহাগ ও স্নেহ-মমতা এবং চাচা ও বংশের অন্যান্য মানুষের ভালবাসায় অতিবাহিত হতে লাগল। নাতির প্রতি আবদুল মুত্তালিবের স্নেহ কত গভীর ছিল, তা উপলব্ধি করার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়।
পবিত্র কাবার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল মুত্তালিবকে মক্কার লোকেরা এত বেশি সম্মান করতো যে, কা'বা ঘরে কার্পেট বিছানো অবস্থায় তিনিই প্রধান আসন গ্রহণ করতেন। একদিন উপস্থিত জনতা তাদের প্রিয়নেতা আবদুল মুত্তালিবের অপেক্ষায় বসে আছেন। এমন সময় বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথা হতে হঠাৎ এসে বিছানো কার্পেটের ঠিক মাঝখানে, দাদার বিছানার উপরে বসে পড়লেন। এ ঘটনার ফলে জনগণ ক্রুদ্ধ ও বিচলিত হয়ে পড়লে, উপস্থিত চাচাদের একজন তাকে কোলে করে বিছানা থেকে উঠিয়ে নিলেন। ঠিক এসময় আবদুল মুত্তালিব এসে উপস্থিত হলেন। তিনি ব্যাপারটি দেখে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন, আমার নাতি যেখানে বসে ছিল, তাকে ঠিক সে জায়গাতেই বসিয়ে দেয়া হোক। তিনি আরও বললেন, সেই তো আমার বৃদ্ধ কালের আনন্দ। তার এ বিশাল স্পর্ধা জেগে উঠেছে তাঁর নিয়তির পূর্ব লক্ষণ থেকে। কারণ সে নিশ্চয়ই একদিন উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী হবে। যে পদমর্যাদা কোন আরবের কপালে এ যাবত জোটেনি। এ কথা বলে বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের কোলে নিয়ে নিজের পাশে বসালেন। পরম স্নেহে তার মাথা ও পিঠে হাত বুলিয়ে সোহাগ করতে লাগলেন। সোহাগের অতিশয্যে বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাক্যহারা হয়ে গেলেন। কিন্তু এ আদর-সোহাগ, এ অনাবিল সুখ-শান্তি, বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেশি দিন স্থায়ী হল না। যখন তার বয়স ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন (৫৭৮ খ্রীঃ), তখন দাদা আবদুল মুত্তালিব পৃথিবীর এ অস্থায়ী আবাস ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে। দুনিয়ার বুকে তখন বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একেবারে নিঃস্ব। পুরোপুরি একা হয়ে গেলেন।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিশোরকাল
বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে বাবা, মা, দাদা সব হারালেন। এ অনাথ, এতীম, সহায়হীন বালক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসঙ্গতাকে সাথী করে বেড়ে চললেন। চাচা আবু তালিব ছাড়া তার পাশে দাঁড়াবার মত আর কেউ ছিলেন না। দাদা আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুর সময়, নাতিকে তুলে দিয়েছিলেন আবু তালিবের হাতে। পিতা আবদুল মুত্তালিবের অন্তিম আদেশ মাথা পেতে নিলেন, আবু তালিব। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ এতীম অসহায় অবস্থার কথা, তথা পার্থিব সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে আল্লাহর রহমতের ক্রোড়ে প্রতিপালিত হওয়ার কথা, আল্লাহ অলৌকিকভাবে বর্ণনা করেছেন আল কুরআনে। 'হে নবী! আল্লাহ কি আপনাকে এতীম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আপনাকে (স্বীয় রহমতের ক্রোড়ে) আশ্রয় প্রদান করেছেন, আর আপনাকে কি পথহারা পাননি? অতঃপর (বিশ্ব জগতের হিদায়াতের জন্য) হেদায়াত প্রাপ্ত করেছেন। আর আপনাকে কি সহায় সম্বলহীন (পরমুখাপেক্ষী) অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি (নেতৃত্ব প্রদানকরতঃ) অভাবমুক্ত করেছেন।' (সূরা আদদোহা: ৬-৮)
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৈত্রিক সূত্রে উত্তরাধিকারী হিসেবে শুধুমাত্র একটি উটনী ও একজন দাসী লাভ করেন। দারিদ্র্যতার মধ্যদিয়ে তাঁর জীবনের সূচনা হয়। এরপর হযরত খাদীজার (রা.) ব্যবসায় শরীক হয়ে, তথা তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পারিবারিক সচ্ছলতা ও সফলতা লাভ করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, 'আর যদিও আপনি ইতোপূর্বে এসব বিষয়ে গাফিল বা অনবহিত ছিলেন' (সূরা ইউসুফ: ৩)।
বাল্যকালেই মহান প্রতিপালক তাঁর প্রতিপালনের সমস্ত উপলক্ষ ও পার্থিব যাবতীয় উপকরণ হতে বঞ্চিত করে, স্রষ্টা কর্তৃক পূর্ণ প্রতিপালনের ব্যবস্থা করেছেন। তার চিত্র ও হাকিকত অতুলনীয় ভঙ্গীতে আল কুরআনে উঠে এসেছে। 'হে নবী! আমি কি আপনার বক্ষদেশ আপনার জন্য উন্মুক্ত করে দেইনি? আমি আপনার উপর থেকে ভারি বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, যা আপনার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিল' (সূরা আলাম নাশরাহ: ১)। অর্থাৎ আল্লাহ তার প্রিয় হাবিবের বক্ষকে জ্ঞান, বিজ্ঞতা, মাধুর্যতা ও উন্নত চরিত্রের জন্য এমন বিস্তৃত করে দিয়েছিলেন যে, বিশ্ব বিখ্যাত কোন পণ্ডিত ও দার্শনিক তার গরিমার কাছে পৌঁছানোর কল্পনা পর্যন্ত করতে পারবে না।
পিতৃহারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মের দু'সপ্তাহ পরেই আরবের প্রথানুসারে বেদুইন ধাত্রী বিবি হালিমা সাদিয়ার কুটিরে প্রতিপালিত হন। হালিমা ছিলেন বনি সাদ গোত্রের চরিত্রবান মহিলা। সে যুগে সা'দ বংশের মেয়েরা বিশুদ্ধ ও শ্রুতিমধুর আরবি ভাষায় কথাবার্তা বলার জন্য বিখ্যাত ছিল। অপরদিকে শহরের ভাষা নানা ধারায় সংমিশ্রণে বিকৃত হয়ে পড়েছিল। স্রষ্টার অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিপালনের দায়িত্বভার, মার্জিত, রুচিসম্মত ও উন্নতমনা সা'দ গোত্রের দরদী নারী বিবি হালিমার উপর গিয়ে পড়ে। ফলে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরবর্তীতে কথাবর্তায় মিষ্টি ও কারুকার্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতে সক্ষম হন।
শৈশবকাল শিক্ষার সময়। এ সময় শিশুর মনে যে আদর্শের রেখাপাত করে তাই স্থায়ী হয়ে থাকে। শৈশবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেরূপ শিক্ষার কোন ব্যবস্থা হয়নি। পিতা নয়, মাতা নয়, শিক্ষক নয়, সমাজ নয়, স্বয়ং মহান আল্লাহ তাঁর শিক্ষার ভার গ্রহণ করেছিলেন। মানুষের শিক্ষা এবং কৃত্রিম জ্ঞান সীমিত। তা নবী-রাসূলদের জন্য নয়। তাঁদের শিক্ষার পদ্ধতি ও উপাদান সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি এসেছেন স্রষ্টার অলৌকিক শিক্ষায় বিশ্বকে আলোকিত করতে। পৃথিবীর নিয়মে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিরক্ষর উম্মি ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পাক উল্লেখ করেন, তিনি ছিলেন উম্মি। উম্মি অর্থ নিরক্ষর; অর্থাৎ কোন বক্তব্য কাগজে কলমে উদ্ধৃত করতে হলে যে অক্ষর জ্ঞান থাকা দরকার, তা থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত। আল্লাহ বলেন, "আপনি এ কিতাবের (কুরআনের) পূর্বে কোন কিতাব পড়েননি। আর কোন কিতাব নিজ হাতে লিখতেও পারতেন না। (যদি এমন হতো) তবে এ সমস্ত মিথ্যাবাদী লোকেরা সন্দেহ করতে পারত (হয় তো আপনি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ দেখে তা লিখেছেন অথবা মুখস্থ করে লোকদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছেন।" (সূরা আনকাবৃত: ৪৮)।
আবু তালেব একাধারে সমাজের নেতা, কা'বা ঘরের খাদেম এবং সনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রথম জীবনে চাচা আবু তালিবের সাথেই সিরিয়া গমন করেন। আল্লাহ পাক কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরিয়া গমনকেও হাজারও ঘটনার মধ্যে একটি অলৌকিক ঘটনায় পরিণত করেছেন। কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একদিন নিখিল বিশ্বের পথপ্রদর্শক হতে হবে। বিশ্বনবীকে মর্যাদাবান আসনে বসে সারা জাহানের নেতৃত্ব দিতে হবে। এজন্যেই মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণকর্তা আল্লাহ, তাঁকে নানা অসাধারণ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবের সামনে তার বড়ত্বের ও শ্রেষ্ঠত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন। বাণিজ্যের জন্য বছরে একবার সিরিয়া গমন করা কুরাইশদের সাধারণ নিয়ম ছিল। যার ইঙ্গিত সূরা কুরাইশের মধ্যে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন বার বছর দু'মাস দশ দিন। তখন চাচা আবু তালিব অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে পণ্যদ্রব্য নিয়ে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কাফেলা প্রস্তুত। উটগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচার কাপড় জড়িয়ে ধরলেন। আবু তালিব স্নেহের ভাতিজাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি বাবা? কি চাও? কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চাচা! আমাকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? আমার আব্বাও নেই, আম্মাও নেই। এমন মন উতাল করা কথায় চাচা আবু তালিব স্থির থাকতে পারলেন না। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সঙ্গীদেরকে বললেন, ছেলেটি আমাকে ছাড়া থাকে না। তাকে না দেখলে আমিও শান্তি পাই না। এবার না হয় তাকে নিয়ে যাই। বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে কাফেলার সাথে রওনা হলেন। আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বন্ধু কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দলের একজন যাত্রী। ভবিষ্যতের বিশ্বনবী আজ বণিক। তিনি যে একদিন বিশ্ব মানবের পথের দিশারী হবেন-এ বিদেশ যাত্রাও ছিল তারই পূর্বাভাস। এর পাশাপাশি তিনি দেখবেন নানা স্থানের অধিবাসী, বিভিন্ন ধর্ম, সমাজ ও তাদের রীতি-নীতি। কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচিত হবেন, ভিন্ন এলাকা, ভাষাভাষি ও নানা মানুষের সাথে।
এরপর কাফেলা এগিয়ে চলল। মাথার উপরে সূর্য আগুন ঢালছে। কিন্তু তপ্ত রবির উত্তাপ কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্পর্শ করছে না। পায়ের নীচে গরম হয়ে উঠছে বালুকণা। কিন্তু তার উত্তাপ কাফেলাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না।
দিনের পর দিন কাফেলা চলছে। এভাবেই কাফেলা একসময় সবুজ শ্যামলে ঘেরা সিরিয়ার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেল। কাফেলা এগিয়ে চলল। উষর মরুভূমি পার হয়ে শাম বা সিরিয়া ছেড়ে আরও সামনে বসরার অন্তর্গত 'তায়মা' নামক স্থানে। 'তায়মা' খ্রিষ্টান প্রধান একটি ব্যবসা কেন্দ্র। বিশেষ করে বাৎসরিক একটা মেলার জন্য এ এলাকা বিখ্যাত ছিল। তখন মেলা চলছিল পূর্ণদ্যোমে। তাই কিছুদিন সেখানে অবস্থান করে ব্যবসা করার জন্য তাঁবু স্থাপন করল মক্কার কাফেলা।
নিকটেই ছিল একটি খ্রিষ্টান গির্জা। 'বুহাইরা' নামক জনৈক পাদ্রী, সে গির্জার ধর্মগুরু। তিনি তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবের পারদর্শী সুপণ্ডিত ছিলেন।
কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হঠাৎ একদিন পাদ্রী বুহাইরার নজরে পড়ে গেলেন। কিশোর নবীর দীপ্তিময় উজ্জ্বল চেহারা দেখে তিনি থমকে গেলেন। গির্জাটি ছিল একটি পাহাড়ের উপর। খ্রিষ্টান পাদ্রী বুহাইরা সমতল ভূমির দিকে দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎ সাদা এক খণ্ড আয়তাকার মেঘমালার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ল। তা একটি বিশাল পাখির আকারে উত্তর দিকে আগত একটি কাফেলার উপর ছায়া দান করে আসছিল। পাদ্রী বুহাইরা গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন বাতাসে ভাসমান মেঘ খণ্ডটি মক্কার কাফেলার যাত্রীদের উপর ছায়া বিস্তার করে তাদের সঙ্গী হয়ে ভেসে চলছে। অতঃপর আরো লক্ষ্য করে দেখলেন। মৃদু বাতাসের দোলায় বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা এবং পত্র-পল্লব যেন ঝুঁকে পড়ে, ঠিক তেমনিভাবে মেঘ খণ্ডটি ঝুঁকে পড়ে কাফেলার এক বালকের উপর ছায়া বিস্তার করছে এবং সে ঘনছায়া প্রখর সূর্যকিরণ থেকে তাঁকে রক্ষা করছে।
এসব অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখে পাদ্রী বুহাইরা অনুমান করলেন যে, মক্কা থেকে আগত কাফেলার মধ্যে রয়েছেন হয়ত সে মানুষটি, যার জন্য তিনি এতকাল অপেক্ষা করে আছেন। যার আগমন বার্তা পবিত্র ধর্ম গ্রন্থগুলোতে আগেই ঘোষিত হয়েছে। তিনি গভীর মনোযোগের সাথে তাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন। তার জানা যত নিদর্শন ছিল, বাহ্যিক আকার অবয়বে সবই এ বালকের সাথে মিলে যাচ্ছে। এভাবে তার পূর্ণ বিশ্বাস জন্মে যে, এ কিশোরই হল প্রতিশ্রুত নবী।
সবকিছু ভালভাবে জানার জন্য, খ্রিষ্টান জ্ঞানী পাদ্রী বুহাইরা একজন দূত পাঠিয়ে কাফেলার বালক, বৃদ্ধ, যুবক, গোলাম সবাইকে দাওয়াত দিলেন। এদিকে তিনি ভাল খাবারের ব্যবস্থা করে মক্কার অতিথিদের আগমনের জন্য আগ্রহ ভরে গির্জার প্রবেশ পথে অপেক্ষা করছিলেন। একটু পরেই দূত মক্কার কাফেলার অতিথিদের নিয়ে সেখানে আসল। বুহাইরা একজন একজন করে সকলকে দেখলেন। কিন্তু কাক্ষিতজনকে দেখতে না পেয়ে বললেন, আমি সকলকে আসতে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু মনে হয় সকলে আসেনি। কুরাইশ সর্দাররা উত্তর দিল, আসার মত কেউ বাদ পড়েনি। শুধু একটা ছোট বালককে আমরা জিনিসপত্র পাহারার জন্য রেখে এসেছি। বুহাইরা বিনীত কণ্ঠে বললেন, তাকেও নিয়ে আসুন। তখন কাফেলার একজনকে পাঠিয়ে কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে আসা হল।
বুহাইরা, বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গভীরভাবে দেখলেন। মেহমানদের খাদ্য গ্রহণের পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক কোণে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আমি লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি সঠিক জবাব দিবে? লাত ও উজ্জার দোহাই দিয়ে বুহাইরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। বালক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন, লাত ও উজ্জার কসম দিবেন না। আমি তাদেরকে ঘৃণা করি। ঠিক আছে, তবে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিবে? কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, বলুন, আমি যতদূর জানি ঠিক ঠিক উত্তর দিব। তখন বুহাইরা তার বর্তমান অবস্থা, কাজ-কর্ম, কখন ঘুম যান, স্বপ্নে কি দেখেন, ইত্যাদি অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন এবং দেখলেন যে, প্রত্যেকটি উত্তর হুবহু পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অবস্থার সাথে মিলে যাচ্ছে। নানা কথার ফাঁকে কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৃষ্ঠদেশে নবুওয়াতের মোহরও দেখে নিলেন পাদ্রী বুহাইরা। আরও ভালভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বুহাইরা পুনরায় আবু তালিবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, এ বালক আপনার কি হয়? আবু তালিব ইচ্ছে করেই কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত অবস্থা গোপন করে বললেন, সে আমার ছেলে। বুহাইরা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন আপনার ছেলে? না, তার পিতা অন্য কেউ হবেন। আবু তালিব এবার স্বীকার করলেন, আসলে কিশোর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ছেলে নয়। তবে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র। বুহাইরা আবু তালিবের কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন এবং পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ভাই কোথায়? মুহূর্তে আবু তালিবের মুখ মলিন হয়ে গেল। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, তিনি মারা গেছেন এবং এ ছেলের মা তখন তিন মাসের গর্ভবতী ছিলেন।
এ কথা শুনেই বুহাইরা গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে পরামর্শের সুরে বললেন, আমি শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আপনাকে বলছি, আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যান। সব সময় তার উপর নজর রাখবেন। বিশেষ করে ইহুদীদের কাছ থেকে সাবধান থাকবেন। যদি তারা এ বালককে দেখে চিনতে পারে, যেমন আমি তার পিঠের নিদর্শন দেখে চিনেছি; তবে তারা তাকে হত্যা করে ফেলবে। এরপর আবু তালেব আর শাম দেশে না গিয়ে সেখানেই নিজের পণ্যদ্রব্য বিক্রি করেন এবং অন্যান্য পণ্য, উটে বোঝাই করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। অবাক ঘটনা হচ্ছে যে, এ ব্যবসায় আবু তালিবের আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভ হয়। পরে জানা যায় যে, একদল খ্রিষ্টান প্রতিশ্রুত নবীকে হত্যা করার সংকল্পে কাফেলার পর কাফেলা খুঁজে বুহাইরার কাছে এসে পৌঁছলে; বুহাইরা তাদেরকে কৌশলে নিরাশ করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই বাল্য বয়সেই বহু স্থানের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেন। পাশাপাশি মহান প্রতিপালকের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন।
📄 বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যৌবনকাল
এরপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সময় যৌবনে পা রাখলেন। অথচ যৌবনসুলভ কোন উচ্ছৃংখলতা, উচ্ছলতা, বেহিসাবী, চঞ্চলতা; তাঁকে কখনই প্রভাবিত করেনি। এমনকি কোন অন্যায়, অশ্লীলতা এবং অভদ্রতাজনিত কাজ তিনি কখনই করেননি। আল্লাহ তার প্রিয় হাবীবকে প্রতি পদে পদে নৈতিক ও চারিত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করেছেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলতেন, আমি কোন দিন জাহেলিয়াতের কোন আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিনি। অন্ধ যুগীয় কোন পাপ কর্ম করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি তখন খুব ছোট, যখন কা'বা ঘর মেরামত করা হচ্ছিল। সে সময় ছোট ছোট বালকরাও ইট-পাথর এগিয়ে দিয়ে একাজে সাহায্য করছিল। কাজের সুবিধার্থে ছোট ছেলেরা সবাই কাপড় কাঁধে বেঁধে রেখে কাজ করছিল। কিন্তু আমি লজ্জাবশত কাপড় পরে কাজ করছিলাম। এতে কাজের কিছুটা ব্যাঘাত হচ্ছিল। তখন আমার চাচা, আমাকে ডেকে বললেন, আরে বেটা! কাপড় খুলে কাঁধে বেঁধে নাও। তখন অগত্যা তাই করলাম। কিন্তু তৎক্ষণাৎ বেহুশ হয়ে পড়ে গেলাম। পরক্ষণে হুঁশ হতেই আমার কাপড়! আমার কাপড়! বলে ডাকতে লাগলাম। চাচা আব্বাস (রা.) আমাকে কোলে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা কি হয়েছে? আমি বললাম, আমি বিবস্ত্র হতেই শুনতে পাই, আকাশ হতে কে যেন ডেকে বলছে, কাপড় পরে নাও হে মুহাম্মদ! কাপড় পরে নাও। জীবনে এ প্রথম আসমানী ডাক শুনে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ফটিকের মত স্বচ্ছ চরিত্রের ব্যাপারে হযরত আলী (রা.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একদা রাতের বেলা আমি মক্কার এক টিলার চূড়ায় এক কুরাইশ বালকের সাথে ছাগল চরাচ্ছিলাম। হঠাৎ ইচ্ছে হল আরবীয়দের "ছমর" গল্পের আসরে গিয়ে আজ রাতে একটু আনন্দ করি। সঙ্গীকে বললাম, আমার ছাগলটা দেখাশুনা করিস, আমি একটু 'ছমর' শুনে আসি। কিছুদূর আগানোর পর, এক বস্তির কাছাকাছি যেতেই, বাজনা ও ঢোল তবলার আওয়াজ কানে ভেসে এল। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, কোন এক লোকের বিয়ে হচ্ছে। কৌতূহলবশত, যখন আমি সে পথে পা বাড়াতে ইচ্ছে করলাম, অমনি আমার ভীষণ ঘুম পেল। এমন ঘুম যে, একটুও চলতে পারলাম না। সেখানেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে সূর্য কিরণের উত্তাপে আমার ঘুম ভাঙ্গে। এভাবেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বিশ্বনবীকে অসুন্দর থেকে নিরাপদ রেখেছেন সেই শিশুকাল হতেই।
আরব জাতি যোদ্ধা হিসেবে দুর্ধর্ষ। সাম্প্রদায়িকতাই ছিল এসব যুদ্ধের মূল কারণ। একেবারে সাধারণ ঘটনা থেকে গোত্রে গোত্রে, বংশে বংশে, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতো। আর এ যুদ্ধ চলতো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। অবশ্য নিষিদ্ধ চার মাস তারা যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে নিবৃত থাকত। তাদের কাজ ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। আর অবসর সময়ে তারা আমোদ প্রমোদে মেতে উঠত। বছরে কয়েকটি মেলা বসত। সেসব মেলায় বিভিন্ন গোত্রের কবিরা কবিতার আসর বসাতো। এছাড়া ঘোড় দৌড়, জুয়া খেলা, মদ পান করা ইত্যাদি নোংরা কাজ, সেসব মেলাতে হরদম চলত। আর এ থেকে অনেক সময় বিভিন্ন গোত্রের মাঝে ঝগড়া, মারামারি ও যুদ্ধবিগ্রহের বীজ অঙ্কুরিত হত। আরবের বিভিন্ন মেলার মধ্যে একটি মেলা ছিল সর্বপ্রধান। এ মেলা হতেই ফিজ্জার যুদ্ধের উৎপত্তি। হারবে ফিজ্জার অর্থ অন্যায় যুদ্ধ, অধর্মের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসে সূত্রপাত হয়েছিল অথবা এর মাধ্যমে মক্কার পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এজন্যেই এর নামকরণ এমনটি করা হয়েছিল। এ যুদ্ধ বিভিন্ন কারণে চার বার অনুষ্ঠিত হয় এবং তা দীর্ঘ পাঁচ বছর স্থায়ী ছিল। প্রথম যুদ্ধের সময় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল দশ বছর আর শেষ যুদ্ধের সময় ছিল চৌদ্দ বছর। তিনি চতুর্থ ফিজ্জারের সময় চাচা আবু তালিবের সাথে রণাঙ্গনে উপস্থিত হন।
আবু তালিব ও তার আত্মীয় স্বজনের সকলকেই যুদ্ধে যোগদান করতে হয়েছিল। এ যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল কুরাইশ, কিনানা ও তাদের মিত্র গোত্রসমূহ; আর অপরপক্ষে ছিল হাওয়াযিন বংশের কায়স ও তাদের মিত্র গোত্রসমূহ। বনু হাশেম বাহিনীর পতাকাবাহী ছিল যাবের বিন আবদুল মুত্তালিব। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তবে তিনি কেবল বড়দের সাথে থেকে শত্রুদের তীর হতে নিজেকে রক্ষা করে, স্বজনদের তীর সংগ্রহ করে দিতেন। এ যুদ্ধের মাধ্যমে অকারণে বা সাধারণ কারণে মানুষ যে মানুষের রক্ত এমন করে ঝরাতে পারে, তা করুণার আঁধার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ চোখে দেখার সুযোগ পেলেন। এ নির্মম দৃশ্য দেখে বিশ্ব ত্রাণকর্তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্মল ও পবিত্র অন্তরের মধ্যে দুর্গত ও অসহায়দের আর্তনাদের যে করুণ বেদনা জেগে উঠেছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। এ যুদ্ধে যুবায়েরের হাতে ছিল বনী হাশিমের জাতীয় পতাকা। তার অন্তরেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরের চাওয়ার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছিল। যুদ্ধ অবসানের পর যুবায়েরই সর্বপ্রথম এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন যে, মানুষকে যেকোন ধ্বংস থেকে রক্ষা করার জন্য এবং শান্তি স্থাপনের জন্য কাজ করে যেতে হবে। তখন কুরাইশ যুবকরা অতি আনন্দের সাথে, সে প্রস্তাবে সাড়া দিল। আর তাদের সাড়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারপর নেই আনন্দিত হলেন। স্বগোত্রের কোন লোক অন্যায় করলেও, দলগতভাবে তাকে সমর্থন করা এবং তার মর্যাদা রক্ষার্থে সারা গোত্রের ধন-মাল-প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দেয়া ছিল আরবের চিরাচরিত প্রথা। এ কুৎসিৎ মনোবৃত্তির মূলোৎপাটন করে স্বগোত্র, পরগোত্র, স্বদেশী, পরদেশী নির্বিশেষে যে কেউ অন্যায় করলে তার দমন এবং অত্যাচারিতের সমর্থন করাই হল তাদের উদ্দেশ্য।
উল্লিখিত ফিজ্জার যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় (প্রিয়নবীসহ) তাঁর চাচা যুবায়ের বিন আবদুল মুত্তালিব, আবদুল্লাহ বিন জুমআনের ঘরে একটি সভা আহ্বান করেন। সভায় হাশিম, যুহরা প্রভৃতি গোত্রের বিশিষ্ট কুরাইশ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হন। সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর একটি সেবা সংঘ গঠিত হয়। এ সেবা সংঘের সদস্যরা যে সকল কাজ করার জন্য শপথ ও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা হচ্ছে, (১) আমরা দেশের অশান্তি দূর করব; (২) আমরা বিদেশী পর্যটকদেরকে রক্ষা করব; (৩) আমরা গরীব দুখীদেরকে সাহায্য করব; (৪) আমরা শক্তিশালীদিগকে, দুর্বলের উপর অত্যাচার করতে দেব না; (৫) আমরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের চেষ্টা করব। আর এ পবিত্র প্রতিজ্ঞা বাণীর নাম হল 'হিলফুল ফুযুল'। দয়াল নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সমিতির সদস্য ছিলেন। তিনিও আবদুল্লাহ বিন জুমআনের ঘরে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং অন্যান্য সদস্যদের সাথে শপথ ও প্রতিজ্ঞায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পর বলেন, একদা আবদুল্লাহ বিন জুমআনের গৃহে শপথ করে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তার বিনিময়ে আমাকে রক্তবর্ণ উট দান করলেও আমি সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে রাজী নই। আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি আহ্বান করে, হে ফুযুল প্রতিজ্ঞার সদস্যগণ! তবে আমি তার সে ডাকে সাড়া দেব। কারণ ইসলাম ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মযলুমের সাহায্য করার জন্যই এসেছে (আল হাদীস)। উপরোক্ত পাঁচটি আদর্শ যুগে যুগে, দেশে দেশে সকল তরুণেরই অনুকরণীয় হওয়া উচিত। আর্তকে সেবা করা, অত্যাচারীকে বাঁধা দেয়া, উৎপীড়িতকে সাহায্য করা, দেশের শান্তি শৃংখলা রক্ষা করা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন ও মৈত্রী স্থাপন করার মত আদর্শ কর্মই তারুণ্যের উৎকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ। যেমনটি হয়েছিল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিশোর জীবনে।