📄 ওলী হওয়া ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়
আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনকারীরাই হলো আল্লাহ তা'আলার অলী। আর তারা হলেন, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনের কারীমে সংবাদ দেন যে, তার অলী হলো, তাকওয়া অবলম্বনকারী মুমিনগণ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴾ [يونس : ٦٢، ٦٣]
“জেনে রেখো! আল্লাহ তা'আলার বন্ধুদের জন্যে কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত ও হবে না। এরা হচ্ছে সে সব লোক, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৬২-৬৩]
তারপর আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াতে মুত্তাকী কারা তার সংজ্ঞা প্রদান করেন,
لَيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَءَاتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَءَاتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُوْلَبِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُوْلَبِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ ﴾ [البقرة: ١٧٧]
“তোমরা তোমাদের মুখ পূর্ব দিকে ফেরাও বা পশ্চিম দিকে ফেরাও এতে কোনো কল্যাণ নেই, বরং কল্যাণ আছে এতে যে, কোনো ব্যক্তি ঈমান আনবে আল্লাহ তা'আলা, শেষ দিবস, ফিরিশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি এবং আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসার্থে ধন-সম্পদ আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম- মিসকিন, মুসাফির ও সাহায্য প্রার্থীদের এবং মানুষদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার জন্য দান করবে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত প্রদান করবে, ওয়াদা করার পর স্বীয় অঙ্গীকার পূর্ণ করবে এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্যের সময় ও দুর্দিনে ধৈর্য ধারণ করবে, মূলতঃ এরাই হচ্ছে সত্যবাদী এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত মুত্তাকী"। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ ঘোষণা করব। আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরয করে দিয়েছি তার দ্বারা কোনো বান্দা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারবে। আমার বান্দাগণ সর্বদা নফল ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকলে অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়, আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে স্পর্শ করে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যার সাহায্যে সে চলাফেরা করে। আর সে যদি আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করে, আমি তাকে তা অবশ্যই প্রদান করি। আর সে যদি আমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় প্রদান করি। আমি যে কাজ করতে চাই, তা করতে কোনো দ্বিধা সংকোচ করি না, যতটা দ্বিধা সংকোচ করি একজন মুমিনের মৃত্যু সম্পর্কে, কেননা সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে অথচ আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি"।
উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের স্তর হলো দু'টি।
এক- ফরয বিষয়াবলী সম্পাদনের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ করা।
দ্বিতীয়ত- ফরয বিষয়াবলী সম্পাদনের পর নফল আদায়ের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করা।
প্রথমটি হলো ডানপন্থী পুণ্যবান সত্যপন্থীদের স্তর। দ্বিতীয়টি হলো অগ্রগামী নৈকট্য অর্জনকারীদের স্তর। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ * يُسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ تَخْتُومٍ خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ ) [المطففين: ٢٢، ٢٧]
"পুণ্যবান লোকেরা থাকবে অফুরন্ত নি'আমতের মাঝে। উচ্চ আসনে বসে তারা (চারদিকের সবকিছু) দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখে প্রশান্তির উজ্জ্বলতা দেখতে পাবে। তাদেরকে পান করানো হবে ছিপি-আঁটা উৎকৃষ্ট পানীয়। তার ছিপি হবে মিশকের, প্রতিযোগিরা যেন এ বিষয়েই প্রতিযোগিতা করুক”। [সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ২২-২৬]
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, ডানপন্থীদের জন্য মিশ্রিত করা হবে আর নৈকট্য লাভকারীরা সেখানে (নেশা মুক্ত) খাঁটি শরাব পান করবে।
📄 তাকওয়ার সংজ্ঞা
তাকওয়া হলো আল্লাহ তা'আলা যা আদেশ করেছেন তা সম্পাদন করা এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার ওলীদের অবস্থা ও ওলী হওয়ার মাধ্যমগুলো বর্ণনা করেছেন, যা ইমাম বুখারী রহ, সহীহ বুখারীতে বর্ণনা করেছেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«يقول الله تبارك وتعالى: من عادى لي وليا فقد بارزني بالمحاربة، وما تقرب إلي عبدي بمثل أداء ما افترضت عليه، ولا يزال عبدي يتقرب إلي بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، فبي يسمع، وبي يبصر، وبي يبطش، وبي يمشي، ولئن سألني لأعطينه، ولئن استعاذ بي لأعيذنه، وما ترددت عن شيء أنا فاعله ترددي عن قبض نفس عبدي المؤمن, يكره الموت وأكره مساءته ولا بد له منه»
একই অর্থবোধক কথা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যারা আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং সার্বিক ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে; তারা অবশ্যই আল্লাহ তা'আলার ওলীদের অন্তর্ভুক্ত। 68
📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার স্বরূপ
আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসতে নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও তাদের বিরোধিতা করা মুমিনের ওপর ওয়াজিব করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَرَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ * فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَرِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ تَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَابِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنفُسِهِمْ نَادِمِينَ * وَيَقُولُ الَّذِينَ ءَامَنُوا أَهَؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَسِرِينَ * يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَابِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ * وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ ﴾ [المائدة: ٥١، ٥٦]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করিও না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। আল্লাহ তা'আলা যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তদেরকে দেখবে সত্বর তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান মুশরিকদের) মাঝে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরা কি তারাই যারা আল্লাহ তা'আলার নামে শক্ত কসম খেয়ে বলত যে, তারা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে আছে। তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে, যার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ তার দীন হতে ফিরে গেলে সত্বর আল্লাহ তা'আলা এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন আর তারাও তাকে ভালবাসবে, তারা মুমিনদের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহ তা'আলার পথে যুদ্ধ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে তারা ভয় করবে না, এটা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ-যাকে ইচ্ছে তিনি দান করেন এবং আল্লাহ তা'আলা প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু আল্লাহ তা'আলা, তার রাসূল ও মুমিনগণ যারা সালাত কায়িম করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে অবনত হয়। যে কেউ আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল এবং ঈমানদারগণকে বন্ধরূপে গ্রহণ করবে সে দেখতে পাবে যে আল্লাহ তা'আলার দলই বিজয়ী হবে। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫১-৫৬]
আল্লাহ তা'আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মুমিনের বন্ধু হলো আল্লাহ তা'আলা, তার রাসুল ও তার প্রতি ঈমানদার বান্দাগণ। এ বিশেষণটি প্রতিটি মুমিন যে এ গুণে গুণান্বিত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। চাই সে তার বংশের, দেশের, মাযহাবের অথবা স্বীয় দলভুক্ত হোক বা না হোক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ [التوبة: ٧١]
"মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু"। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭১]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ ءَاوَوا وَنَصَرُوا أُوْلَئِكَ bَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُم مِّن وَلَيَتِهِم مِّن شَيْءٍ حَتَّى يُهَاجِرُوا وَإِنِ اسْتَنصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَى قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُم مِيثَقٌ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُن فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ ءَاوَوا وَنَصَرُوا أُوْلَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَّهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا مِنْ بَعْدُ وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا مَعَكُمْ فَأُوْلَئِكَ مِنكُمْ وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابٍ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [الانفال: ٧٢، ٧৬]
"যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে, নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য করেছে, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করে নি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব তোমার ওপর নেই, তবে তারা যদি দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য, কিন্তু তোমাদের ও যে জাতির মধ্যে মৈত্রী চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়। তোমরা যা কর আল্লাহ তা'আলা তা দেখেন। আর যারা কুফরি করে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। যদি তোমরা তা [মুমিনদের পরস্পরের বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করা ও কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্ক [ছিন্ন করা] না কর তবে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহা-বিপর্যয় দেখা দিবে। যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে এবং আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য-সহযোগিতা করেছে- তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যারা পরে ঈমান এনেছে ও হিজরত করেছে আর তোমাদের সাথে একত্র হয়ে জিহাদ করেছে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২-৭৫]
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَلَهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ﴾ [الحجرات: ٩]
"মুমিনদের দু'দল লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে আর সুবিচার করবে। আল্লাহ তা'আলা ন্যায়-বিচারকারীদের ভালোবাসেন”। [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ৯]
সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم كمثل الجسد الواحد إذا اشتكى منه عضو تداعى له سائر الجسد بالحمى والسهر»
“পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়া অনুগ্রহের ক্ষেত্রে মুমিনের উদাহরণ হলো এক ও অখণ্ডিত দেহ। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন সমস্ত শরীর তার জন্যে বিনিদ্র ও ব্যথায় আক্রান্ত হয়”। ⁶⁹
সহীহ হাদীসে অনুরূপ আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا»
“একজন মুমিন আর একজন মুমিনের জন্য প্রাচীরের ন্যায়। যার একাংশ অপর অংশকে সু-দৃঢ় করে। অতঃপর তিনি একহাতের অঙ্গুলিগুলো অপর হাতের অঙ্গুলির মধ্যে প্রবেশ করালেন”। ⁷⁰
অনুরূপ সহীহ হাদীসে আরো বর্ণিত আছে,
«والذي نفسي بيده لا يؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه»
“যার হাতে আমার জীবন তার শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্য যা ভালোবাসে অপরের জন্য তা-ই ভালো না বাসে”। ⁷¹
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المسلم أخو المسلم لا يسلمه ولا يظلمه»
“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তাকে (বিপদের সময়) অন্যের নিকট সোপর্দ করতে পারে না ও তার প্রতি অত্যাচারও করতে পারে না”। ⁷²
কুরআন ও হাদীসে এরূপ বহু দলীল বিদ্যমান, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বলা হয়েছে।
এরই ভিত্তিতে আল্লাহ তা'আলা এক মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। পরস্পর পরস্পরকে ভাই ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। একে অপরকে সাহায্যকারী, অনুগ্রহকারী ও দয়াশীল হিসেবে পরিণত করেছেন। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ঐক্য স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলাদলি ও মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ﴾ [ال عمران: ١٠٣]
"তোমরা সমবেতভাবে আল্লাহ তা'আলার রজ্জুকে সু-দৃঢ়ভাবে ধারণ কর ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়ো না”। [আল আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ﴾ [الانعام: ١٥٩]
"নিশ্চয় যারা নিজেদের দীনকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে নিয়েছে আর দলে দলে ভাগ হয়ে গেছে, তাদের কোনো কাজের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহ তা'আলার ওপর ন্যস্ত”। [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৫৯]
বড়ই পরিতাপের বিষয়! কীভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের লোকেরা বিভিন্ন দল ও বিবিধ মতভেদে বিভক্ত হয়েছে। দলের স্বার্থেই কেবল ধারণা প্রসূত জ্ঞান ও প্রবৃত্তির চরিতার্থে কোনো লোক এক দলকে ভালোবাসে ও অপর দলকে শত্রু মনে করে অথচ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ মর্মে কোনো প্রমাণ তাদের নিকট নেই।
টিকাঃ
68 আল্লাহ তা'আলা বলেন, أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ) [يونس: ٦٢، ٦٤]
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ]إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ﴾ [الانفال: ٣٤
69 সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৮
70 সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৮২
71 সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭২
72 সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭৮
📄 জামা‘আত রহমত আর বিভক্তি আযাব
এ ধরনের দলাদলি ও বিভক্তি যা মুসলিম উম্মাহ ও তাদের আলেম, পণ্ডিত, আমীর ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, এর ফলশ্রুতিতেই শত্রুদের তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর অন্যতম কারণ হল, তারা আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূলের আনুগত্য করা ছেড়ে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصَرَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَقًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ، فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ﴾ [المائدة: ١٤]
"আর যারা বলে 'আমরা খ্রিস্টান' আমরা তাদের নিকট থেকেও ওয়াদা নিয়েছিলাম। অনন্তর তাদেরকে যা কিছু উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে তারা নিজেদের এক বড় অংশ হারাতে বসেছে। সুতরাং আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা সঞ্চার করে দিলাম"। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১৪]
যখনই মানুষ আল্লাহ তা'আলার কতক বিধান পরিত্যাগ করেছে, তখনই তাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা এবং কাটাকাটি দেখা দিয়েছে। আর যখন জাতি বিভিন্ন দল, সংগঠন ও পার্টিতে বিভক্ত হয়েছে, তখনই তারা বিপর্যয় ও ধ্বংসলীলায় পতিত হয়েছে। আর যখনই তারা একটি দলে সমবেত হয়েছে, তখনই তারা সংশোধন হয়েছে ও অহীর বিধানে রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। কেননা এক দলে থাকে রহমত। বিভক্ত হওয়া, দলাদলি করা ও মুসলিম সমাজে ফাটল সৃষ্টি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।