📄 আহলে বাইতদের হক
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার-বংশধরের প্রতিও মুসলিম জাতির অধিকার আছে। তাদেরকে দেখাশুনা করা মুসলিম কর্ণধারদের ওপর ফরয। কেননা বিনা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও যুদ্ধ লব্ধ সম্পদের এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে ধার্য করে দিয়েছেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠের সময় তার বংশধরকে অন্তর্ভুক্ত করে দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের জন্য বলেন, তোমরা বল,
«اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ تَجِيدُ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ»
"হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার বংশধরের ওপর সালাত বর্ষণ কর। যেমন তুমি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তার বংশধরের ওপর বর্ষণ করেছ, নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার বংশধরের ওপর বরকত নাযিল কর। যেমন তুমি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তার বংশধরের ওপর বরকত নাযিল করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত"। 63
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর তারা যাদের ওপর যাকাত-সদকা খাওয়া হারাম ছিল। ইমাম শাফে'ঈ রহ., আহমাদ ইবন হাম্বল রহ.-সহ অনেকেই এ কথা বলেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الصَّدَقَةَ لَا تَحِلُّ لِمُحَمَّدٍ وَلَا لِآلِ مُحَمَّدٍ
"যাকাত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের জন্যে হালাল নয়"। 64
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا ﴾ [الاحزاب : ৩৩]
"হে নবী পরিবার, আল্লাহ তা'আলা তো শুধু চান তোমাদের হতে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”। [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩৩]
মহান আল্লাহ তা'আলা তাদের ওপর যাকাত হারাম করেছেন। কেননা, তা মানুষের ময়লা। কোনো কোন সালাফ বা পূর্বসূরি আলেম বলেছেন, আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে ভালোবাসা ঈমান এবং তাদের সঙ্গে ঈর্ষা করা মুনাফিকী। আর বনী হাশিমকে ভালোবাসা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত ও তাদের প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা নিফাকী-পাপ।
মুসনাদ ও সুনান গ্রন্থাবলীতে রয়েছে, যখন কতিপয় সম্প্রদায় বনী হাশিমের ওপর অত্যাচার করছিল তখন আব্বাস সে বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অভিযোগ করলে, তিনি আব্বাসকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
والذي نفسي بيده لا يدخلون الجنة حتى يحبوكم من أجلى
“হে জন সমাজ! যে মহান সত্ত্বার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি, আমার কারণে তোমরা বনী হাশিমকে মহব্বত না করলে জান্নাতে যেতে পারবে না”। 65
সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إن الله اصطفى بني إسماعيل، واصطفى بني كنانة من بني إسماعيل، واصطفى قريشا من كنانة، واصطفى بني هاشم من قريش، واصطفاني من بني هاشم
“আল্লাহ তা'আলা বনী ইসমাঈলকে মনোনিত করেছেন, বনী ইসমাইল থেকে বনী কিনানাকে মনোনিত করেছেন। বনী কিনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ গোত্র থেকে বনী হাশিমকে নির্বাচিত করেছেন”। 66
টিকাঃ
63 সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩০৫
64 সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৭২
65 তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৪
66 মুসলিম, হাদীস নং ২২৭৬
📄 ফিতনা ও তার প্রভাব
উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে হত্যার মাধ্যমে ফিতনার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। এক ও অখণ্ডিত মুসলিম মিল্লাত বিবিধ দলে উপদলে বিভক্ত হল। এক দল উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর পক্ষ নিলো এবং তার প্রতি অতি শ্রদ্ধায় সীমালঙ্ঘন করল এবং আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, এরা ছিল অধিকাংশ শামবাসী। তারা নির্দ্বিধায় আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে গালি-গালাজ ও তার সঙ্গে চরম ঈর্ষা শুরু করল।
অপর দিকে অধিকাংশ ইরাকবাসী আলীর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর পক্ষ গ্রহণ করল এবং আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে শ্রদ্ধা করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করল, উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তার সঙ্গে বিরোধের পাহাড় ক্রমান্বয়ে গাঢ় হয়ে উঠল, তাকে গালি-গালাজ দেওয়া শুরু করল। এভাবে এ ফিরকাবন্দী ও বিদ'আত প্রকট আকার ধারণ করল। এরা শেষ পর্যন্ত আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে গালি দেওয়া শুরু করল। ফলে সেদিন এটি বৃহত্তর বিপদ রূপে প্রকাশ পেল।
সুন্নাহ বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আদর্শ হলো উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা উভয়কে মহব্বত করা। আর আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে তাদের দু'জনের উপরে অগ্রাধিকার দেওয়া। তারা দু'জন এ জন্যে প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য যে, তাদের দুইজনকে মহান আল্লাহ তা'আলা বিশেষ বিশেষ গুণে বিশেষিত করেছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে দলাদলি ও বিচ্ছিন্ন হওয়া নিষেধ করেছেন।
এটি এমন স্থান যেখানে ঐক্যের ওপর অটুট থাকা ও আল্লাহ তা'আলার রজ্জুকে সু-দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা মুমিনের ওপর ওয়াজিব করেছেন। কারণ, ইলম, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও সুন্নতের অনুসরণের ওপরই সুন্নতের মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।
📄 যারা সাহাবীগণের গালি দেয় তাদের শাস্তি
অতঃপর যখন রাফিদ্বী সম্প্রদায় সাহাবীগণের গালি গালাজ শুরু করল, তখন আলেমগণ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, যারাই সাহাবীগণকে গালি দিবে তাদেরকেই শাস্তি প্রদান করতে হবে। তারপরও রাফেদ্বী সম্প্রদায় সাহাবীগণকে কাফির বলা ছাড়াও আরও বহু বাড়াবাড়ি করেছে। আমি ইতোপূর্বে বহু স্থানে তার উল্লেখ করেছি এবং ঐ কাজের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শর'ঈ বিধানও বর্ণনা করেছি। সে সময় ইয়াযিদ ইবন মু'আবিয়ার বিষয়ে কেউই কোনো কথা উপস্থাপন করে নি। তার বিষয়টি দীনী কোনো আলোচনার বিষয়ও ছিল না। পরবর্তীতে তার বিষয়ে বহু কাল্পনিক ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। কোনো কোনো দল তাকে প্রকাশ্যে অভিসম্পাত প্রদান করেছে। হয়তো এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ছিল অন্যদের অভিশাপের দরজা খুলে দেওয়া। কিন্তু অধিকাংশ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত কাউকে নির্দিষ্টভাবে অভিসম্পাত করা কখনো পছন্দ করেন নি। সুন্নতের প্রতি আজ্ঞাবহ কতক মুসলিম (আহলে সুন্নাত কর্তৃক) লা'নত না করার বিষয়টি জানতে পেরে মনে করল ইয়াযিদ ছিল অনেক বড় নেককার ও হিদায়েতের বিশেষ ইমাম। (অথচ এটা তাদের ভুল ধারণা)
বস্তুত ইয়াযিদের বিষয়ে দুই দিক থেকে বিপরীত মুখী বাড়াবাড়ি করা হয়েছে অর্থাৎ একদল তার সম্পর্কে বলে, কাফির, দীন-চ্যুত মুরতাদ। কারণ, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতীকে হত্যা করেছে, তার নানা উত্বাহ ইবন রাবী'আহ ও তার মামা ওয়ালিদসহ যাদেরকে কাফির মনে করে হত্যা করা হয়েছিল তাদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তিনি আনসার ও তার বংশধরকে হাররা নামক স্থানে হত্যা করেছে, প্রকাশ্য মদ খাওয়া, দিবালোকে গর্হিত কার্যাবলী সম্পাদন সহ নানা অশ্লীল কাজে জড়িত ছিলেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
পক্ষান্তরে প্রশংসাকারীগণ বিশ্বাস করেন যে, তিনি সুপথ প্রাপ্ত পথ প্রদর্শক ন্যায়পরায়ণ নেতা ছিলেন। তিনি সাহাবী বা শীর্ষ স্থানীয় সাহাবীগণের অন্যতম একজন। তিনি আল্লাহ তা'আলার ওলীদের বিশেষ একজন। কখনো কখনো কেউ এও বিশ্বাস করতো যে তিনি নবীদের একজন ছিলেন। তারা আরো বলেছেন যারা ইয়াজিদের সমালোচনা থেকে বিরত থাকবে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বিরত রাখবেন।
তারা শাইখ হাসান ইবন আদী রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইয়াজিদ এ রূপ এ রূপ মহাগুণের অধিকারী মহান অলী ছিলেন। যারা ইয়াজিদের সমালোচনা থেকে বিরত হবে তারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। শাইখ হাসানের সমকালীন ঐসব ভক্তরা মহামান্য শাইখ আদীর মতের বিরুদ্ধে তার ও ইয়াজিদের বিষয়ে তারা বহু ভ্রান্ত কবিতা, বাড়াবাড়িমূলক বহু রচনাবলী তার নামে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা শাইখ 'আদি ও ইয়াযিদ বিষয়ে এমন বাড়াবাড়ি করে যা শাইখ 'আদি যে মতের ওপর ছিলেন তা তার বিরুদ্ধে চলে যায়। তার বিরুদ্ধে যে সব অপবাদ দেওয়া হয়, তা হতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরাপদ। তার মধ্যে এ ধরনের কোন বিদ'আত ছিল না, যার অপবাদ তারা রটিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি রাফেজীদের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং তাদের রোষানলে পড়েন। তারা শাইখ হাসানকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। মুসলিম জাহানে ফিতনার কালো ছায়া নেমে আসে যা আল্লাহ ও তার রাসূল কখনো পছন্দ করেন নি।
এ হলো ইয়াজিদের বিষয়ে দু'দিক থেকে বিপরীতমুখী বাড়াবাড়ির সংক্ষিপ্ত ভাষা চিত্র। ইয়াযিদ সম্পর্কে উভয় পক্ষের পরস্পর বিরোধি এ ধরনের বাড়াবাড়ি মুসলিম সমাজ ও আলিমদের ঐক্যমতের সম্পূর্ণ বিরোধী কার্যকলাপ।
কেননা, ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়াহ উসমান ইবন 'আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফতে জন্ম গ্রহণ করে। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত পান নি। আলিমদের ঐকমত্য অনুযায়ী তিনি সাহাবী ছিলেন না। দীন ও যথাযথ কাজের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি মুসলিম যুবকদের একজন একজন ছিলেন। কাফির দীন-চ্যুৎ মুরতাদ ছিলেন না। তার পিতার মৃত্যুর পর কিছু সংখ্যক মুসলিমদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এবং কিছু সংখ্যক মুসলিমদের সম্মতিতে তিনি মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হন। তার ছিল বহু বীরত্ব ও সুমহান বদান্য, তিনি প্রকাশ্য অশ্লীল কাজে জড়িত ছিলেন না। যেমন কিছু সংখ্যক বিরুদ্ধবাদীরা বর্ণনা করে থাকে।
📄 তাদের শাসন আমলের কতক বড় বড় ঘটনা
এক. হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হত্যা কার্য তার অন্যতম। তিনি হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে হত্যার নির্দেশ দেন নি এবং তার হত্যার সংবাদে আনন্দ প্রকাশ করেন নি। তার সম্মানহানি করে দন্তের উপর লাঠির আঘাত করে ঠাট্টা বিদ্রূপও করেন নি। হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর মস্তক শাম এ নিয়ে যেতেও নির্দেশ দেন নি। তাকে হত্যার কারণে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন নি; বরং তিনি হুসাইনকে বাধা প্রদানের নির্দেশ দেন এবং তার কর্মকে প্রতিহত করতে নির্দেশ দেন তাতে যদি যুদ্ধ করা লাগে তবুও। ইয়াজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী ও প্রতিনিধি তার নির্দেশের ওপর বাড়াবাড়ি করেছে। সামর ইবন জুল জাওশান সৈন্যদলকে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের নেতৃত্বে তাকে হত্যার জন্য উৎসাহিত করেছে। ফলে উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তার প্রতি সীমালঙ্ঘন করেছিল। তখন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে ইয়াজিদ এর নিকট নিয়ে যাওয়া অথবা প্রহরারত অবস্থায় সুরক্ষিত সীমান্ত শহরে পাঠানো বা মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার জন্যে তাদের নিকট আবেদন করেছিলেন। তারা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেয়। সে উমার ইবন সা'আদকে নির্দেশ দেন সে যেন হুসাইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ফলে তারা তাকে ও তার পরিবারের কিছু সংখ্যক ব্যক্তিবর্গকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তার হত্যাকাণ্ড ছিল ভয়াবহ বিপদসমূহের অন্যতম। কেননা, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ও তার পূর্বে উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কে হত্যা করা এ উম্মতের ভয়াবহ ফিতনাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাদের দুজনকে তারাই হত্যা করেছে যারা আল্লাহ তা'আলার নিকট সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীব।
তারপর হুসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর পরিবারবর্গ যখন তার দরবারে এসেছিলেন, তিনি তাদেরকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন এবং তাদেরকে সসম্মানে মদিনায় পাঠিয়ে ছিলেন। ইয়াজিদ কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি হুসাইন এর হত্যার জন্য উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদকে অভিসম্পাত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি ইরাকের অনুসারীদের বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম শুধুমাত্র হুসাইনের হত্যা ছাড়া। তা সত্ত্বেও তিনি তার হত্যার কোন প্রতিবাদ করেছেন এমন কোন কর্ম তার থেকে প্রকাশ পায়নি। তার হত্যার প্রতিশোধ ও বদলাও নেননি অথচ এটা তার ওপর ওয়াজিব ছিল। তাই হক পন্থীরা তার অন্যান্য কার্যকলাপের সাথে এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব পরিত্যাগ করার সমালোচনা করেছেন। পক্ষান্তরে যারা তার সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করে, তারা তার ওপর বহু মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দেয়।
আর দ্বিতীয় ঘটনা হলো, মদীনাবাসীগণ তার সঙ্গে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের পর তা ভঙ্গ করেছিল, তার প্রেরিত প্রতিনিধিকে পরিবারসহ সেখান থেকে বের করে দিয়েছিল। অতঃপর তিনি একটি সৈন্যদলকে এ মর্মে প্রেরণ করেন যে, মদীনাবাসীর নিকট তারা আনুগত্য কামনা করবে, এতে যদি তারা সম্মত না হয় তাহলে তারা তিন দিন পর্যন্ত তাদের বুঝার সুযোগ দিবে। তারপর বাধা দিলে তারা অস্ত্রের সাহায্যে মদিনায় প্রবেশ করবে। তিন দিন পর তাদের রক্তকে তারা হালাল হিসাবে গ্রহণ করবে। নির্দেশ মোতাবেক সৈন্যদল তিনদিন পর্যন্ত মদিনায় অপেক্ষায় ছিল। তারপর তারা গণহত্যা শুরু করে, লুটতরাজ আরম্ভ করে, হারাম-কৃত মহিলাদেরকে জোর পূর্বক যৌন-ক্রিয়ার পাত্রে পরিণত করে। তারপর সে অপর একটি সৈন্য বাহিনীকে মক্কায় প্রেরণ করে, তারা মক্কা অবরোধ করে। ইয়াজিদের মৃত্যু পর্যন্ত তারা মক্কা অবরোধ করে রেখেছিল। এ ছিল ইয়াজিদের অত্যাচার ও সীমালঙ্ঘনের সংক্ষিপ্ত চিত্র যা তার নির্দেশে সংঘটিত হয়েছিল। এ জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা হলো তাকে গালিও দিবে না ভালোবাসবেও না।
ছালিহ ইবন আহমদ ইবন হাম্বল বলেন, আমি আমার বাবাকে বললাম, জনগণ বলে, তারা ইয়াজিদকে ভালোবাসে। তিনি বললেন, হে আমার বৎস, যে আল্লাহ তা'আলা ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে কি ইয়াজিদকে ভালবাসতে পারে! আমি বললাম, হে আমার বাবা! তাহলে আপনি তাকে অভিসম্পাত করেন না কেন? তিনি বললেন, হে আমার বৎস্য! তুমি কি কখনও তোমার বাবাকে কারো প্রতি অভিশাপ দিতে দেখেছ?
তার কর্তৃক বর্ণিত আছে- তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়া কর্তৃক হাদীস বর্ণনা করুন। তিনি জবাবে বললেন, না। ইসলামে তার কোনো সম্মানিত স্থান নেই। সে কি ঐ ব্যক্তি নয় যে মদিনাবাসীর ওপর এই এই অপকর্ম ও অত্যাচার করেছিল?
মুসলিম নেতৃবর্গ আলিমদের নিকট ইয়াজিদ হলো রাজতান্ত্রিক বাদশাহদের অন্যতম। আল্লাহ তা'আলার অলী ও সৎ মানুষদের মতো তারা তাকে ভালোবাসেন না। তাকে তারা গালিও দেন না। কেননা, কোনো নির্দিষ্ট মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া তারা পছন্দ করেন না। কেননা, ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, জনৈক ব্যক্তি যাকে হিমার (গাধা) বলা হতো। সে খুব বেশি মদ পান করত। আর যখন মদ খেত তখন আল্লাহ তা'আলার রাসূলের নিকট আনা হতো এবং মদ পানের শাস্তি স্বরূপ তাকে প্রহার করা হতো। একবার এক ব্যক্তি বলল, আল্লাহ তা'আলা তোমার প্রতি অভিশাপ করুন! কারণ, তুমি বারবার আল্লাহ তা'আলার নবীর নিকট এ অপরাধ নিয়ে আস। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বললেন,
لا تلعنه فإنه يحب الله ورسوله
“তাকে অভিশাপ করো না। কারণ, সে আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালোবাসে”। 67
তা সত্ত্বেও আহলে সুন্নাহর একদল লোক তাকে অভিশাপ করা বৈধ মনে করেন। কেননা, তারা বিশ্বাস করেন তিনি এমন নির্মম অত্যাচার করেছিলেন, যে অত্যাচার করার কারণে সে অত্যাচারীকে অভিশাপ করা যেতে পারে।
অপর দল তাকে মহব্বত করা পছন্দ করেন। কারণ, সে একজন মুসলিম। সাহাবীগণের যুগে সে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সাহাবীগণ তার আনুগত্যের বায়'আত নিয়েছিলেন। তারা বলেন, তার বহু কল্যাণময়ী কাজও ছিল। অথবা তিনি যা করেছিলেন তাতে তিনি একজন মুজতাহেদ ছিলেন।
সঠিক কথা হল, যার প্রতি মুসলিম ইমামগণের মতামত প্রতিষ্ঠিত, তা হলো তাকে বিশেষভাবে ভালোবাসারও দরকার নেই এবং তাকে অভিসম্পাত করাও যাবে না। তারপরও যদি সে যালিম ও ফাসিক হয়ে থাকে, আল্লাহ তা'আলা যালিম ও ফাসিককে ক্ষমা করে দেন। বিশেষ করে যখন সে কোন মহান কাজ করে থাকে। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু হতে ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রথম যে দল কুসতুন্তনিয়্যা (কনস্টান্টিনোপল) যুদ্ধ করবে তারা ক্ষমা প্রাপ্ত হবে। আর ঐ স্থানে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়ার নেতৃত্বে। আবু আইয়ুব আনসারীও রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তার সঙ্গী ছিলেন।
অবশ্য ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়া ও তার চাচা ইয়াজিদ ইবন 'আবী সুফিয়ান দুইজনের নাম এক হওয়ার কারণে সংশয় দেখা দেয়। ইয়াজিদ ইবন আবু সুফিয়ান হলেন সাহাবী। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণের অন্যতম। তিনি হারব কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট ব্যক্তি। শাম এর আমীরদের মধ্যে তিনি অন্যতম যাদের আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু শাম বিজয়ের জন্যে প্রেরণ করেছিলেন।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে বিদায় কালীন তার উষ্ট্রবাহন ধরে হেঁটে হেঁটে অসীয়ত করছিলেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, হে আল্লাহ তা'আলার রাসূলের প্রতিনিধি! তুমি আরোহণ করবে নাকি আমি অবতরণ করবো? তিনি তার জবাবে বলেছিলেন, আমি আরোহী হবো না আর তুমি অবতরণকারী হবে না। আমি আশা করি আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় আমার জীবনের পাপরাশি শেষ হয়ে যাক।
উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর খিলাফত আমলে শাম বিজয়ের পর যখন তিনি মারা যান, তখন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু- তার ভাই মু'আবিয়াকে রাদিয়াল্লাহু 'আনহু- তার স্থলাভিষিক্ত করেন। তারপর উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু- এর খিলাফত আমলে ইয়াজিদের জন্ম হয়। মু'আবিয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু- শামে প্রতিষ্ঠিত হলেন এবং তারপর যা ঘটার তা ঘটে গেল।
ওয়াজিব হলো এ বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়ার সমালোচনার দ্বারা মুসলিমদেরকে পরীক্ষায় ফেলা থেকে বিরত থাকা। কারণ, এরূপ করা সম্পূর্ণ বিদ'আত, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের পরিপন্থী। এ সব বিভ্রান্তির ফলে কতিপয় জাহিল মনে করে ইয়াজিদ ইবন মু'আবিয়া শীর্ষ স্থানীয় সাহাবীগণের অন্যতম এবং ন্যায়পরায়ণ মুসলিম ইমাম। অথচ এটি সুস্পষ্ট ভুল।
টিকাঃ
67 আবু দাউদ, হাদীস নং ১২৪