📘 মহা উপদেশ > 📄 বাড়াবাড়ি ধ্বংসের মূল

📄 বাড়াবাড়ি ধ্বংসের মূল


অনুরূপভাবে ধ্বংস ও পথভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ হচ্ছে, কতিপয় শাইখের বিষয়ে অতিভক্তি, সীমালঙ্ঘন ও অতি বাড়াবাড়ি করা, চাই তা শাইখ 'আদী অথবা ইউনুস কানবি, মানছুর হাল্লাজ অথবা অনুরূপ যে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে হোক। এমনকি মহান খলিফা ও বিশিষ্ট সাহাবী আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-র বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও শীর্ষস্থানীয় নবী ঈসা আলাইহিস সালামের বিষয়ে বাড়াবাড়িও একই পর্যায়ভুক্ত।
যে ব্যক্তি কোনো বিশিষ্ট নবী অথবা পুণ্যবান ব্যক্তির ব্যাপারে যেমন আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু অথবা 'আদী অথবা অন্য কেউ, অথবা অনুরূপ কোনো ব্যক্তি যার যাকে নেককার লোক মনে করা হয়, যেমন, হাল্লাজ, মিসরের শাসক হাকিম লি আমরিল্লাহ (তথাকথিত ফাতেমী শাসক), ইউনুস কানাবি অথবা এ ধরনের অন্য যে কোনো মানুষের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করল এবং তার মধ্যে ইলাহ-এর কোনো ক্ষমতা আছে বলে মনে করল। যথাঃ এ কথা বলল যে, উমুক পীর বা শাইখের ইচ্ছা মোতাবেক প্রত্যেক ব্যক্তিকে খাদ্য দেওয়া হয় অথবা বকরী জবাইয়ের সময় বলে আমার নেতার নামে, আমার বাবা ও পীরের নামে জবাই দিলাম অথবা সাজদাহর মাধ্যমে তার বা তার মতো কোনো মাখলুকের ইবাদাত করল অথবা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যকে ডাকল, যেমন এভাবে বলা- হে আমার উমুক অভিভাবক আমাকে ক্ষমা কর, আমার প্রতি রহম কর, আমাকে সাহায্য কর, আমাকে রিযিক দাও, আমাকে পরিত্রাণ দাও, আমাকে মুক্তি দাও অথবা একথা বলা যে, তোমার ওপরই আমি তাওয়াক্কুল করলাম, তুমিই আমার জন্যে যথেষ্ট অথবা আমি তোমার যথেষ্টতায় অথবা এ ধরনের সব কথা ও কর্ম যেগুলো রবের বৈশিষ্ট্য; আর যেসব কথা ও কর্ম কেবল আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য প্রযোজ্য নয়, এমন কিছু করল তখন তা সবই শির্ক ও ভ্রষ্টতা বলে গণ্য হবে। এর জন্যে ঐ ব্যক্তির ওপর তওবা জারী করতে হবে। যদি তওবার নির্দেশ পাওয়ার পরও তওবা করে ইসলামে ফিরে না আসে তাহলে ইসলামী প্রশাসনের রায় অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে হবে। বস্তুত আল্লাহ তা'আলা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং বহু কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যাতে এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত করা হয়, তার সঙ্গে যেন শরীক করা না হয়, যেন তার সঙ্গে অন্য কিছুকে ইলাহ হিসাবে গ্রহণ না করা হয়।
আর যারা আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে অন্যান্য ইলাহগুলো ডাকে যেমন- সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, উযাইর, ঈসা, ফিরিশতামণ্ডলী, লাত, উয্যা, মানাত, ইয়াগুস, ইয়াউক, নাছর (প্রভৃতিকে ইলাহ হিসাবে ডাকে) তারা ঐ গুলোকে সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকারী, বৃষ্টি বর্ষণ কারী অথবা উদ্ভিদ ও শস্য উৎপাদনকারী স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করে না (তবুও তারা মুশরিকদের মধ্যে গণ্য।)
বস্তুতঃ তারা ফিরিশতামণ্ডলী, নবীগণ, জিন্ন, নক্ষত্ররাজি, নির্মিত মূর্তিসমূহ এবং কবরবাসীর ইবাদাত এ জন্য করে যে, তারা ওদেরকে সুপারিশ করে আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্যে পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হবে। তারা বলে, তারা আমাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশকারী হবে।

টিকাঃ
এগুলো সবই ইবাদত যা কেবল এক আল্লাহর জন্য নিবেদন করা হবে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে এবং তাঁর নবী বর্ণনা করেছেন। জবেহ করা ইবাদত হওয়ার প্রমাণ, আল্লাহর তা'আলা বলেন, قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَتَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ [আল-আন'আম: ১৬২, ১৬৩] বল, 'নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব। 'তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম। [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৬২-১৬৩]
অনুরূপভাবে দো'আও ইবাদাত। যে সব বিষয়ের সমাধান করার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ রাখে না তা কোন মাখলুকের কাছে চাওয়া, চাই তা সুপারিশকারী হিসেবে চাওয়া হোক বা অন্য যে কোন উদ্দেশ্যেই চাওয়া হোক তা অবশ্যই শির্ক। সুতরাং দো'আ যেন একমাত্র আল্লাহর জন্য হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ [ইউনুস : ১০৬] আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব, তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬]

📘 মহা উপদেশ > 📄 নবী ও রাসূলদের তাওহীদ

📄 নবী ও রাসূলদের তাওহীদ


আল্লাহ তা'আলা তার নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। তিনি আল্লাহকে বাদ দিয়ে কাউকে ডাকতে নিষেধ করেছেন, ইবাদতের ডাকও নয় এবং সাহায্যেরও নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ، فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا ﴿ أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَةٌ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا ﴾ [الاسراء: ٥٦، ٥٧]
"বল, 'তোমরা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে কর তাদেরকে ডাক, (তাদেরকে আহ্বান করলেও দেখবে) তারা তোমাদের দুঃখ-বেদনা দূর করতে বা পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। তারা যাদেরকে আহবান করে তারা নিজেরাই তো তাদের 'রব'-এর নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটবর্তী হতে পারে, তার দয়া প্রত্যাশা করে ও তার শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় তোমার রবের শাস্তি ভয়াবহ”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৬-৫৭]
পূর্বসূরি এক দল জ্ঞানী বলেন, প্রাচীনকালে কিছু লোক ছিল যারা মাসীহ, উযাইর ও ফিরিশতামণ্ডলীকে ডাকত, আল্লাহ তা'আলা তাদের বলেন, তোমরা যেমন আমার নিকট নৈকট্য চাও, তোমরা যাদেরকে ডাকছ তারাও তেমনি আমার নৈকট্য চাইত, তোমরা যেমন আমার রহমত চাও তারাও আমার নিকট রহমত চাইত। তোমরা যেমন আমার আযাবকে ভয় কর তারাও আমার আযাবকে ভয় করত। আল্লাহ তা'আলা এদের প্রসঙ্গে বলেন,
﴿ قُلِ ادْعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٖ وَمَا لَهُۥ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٖ وَلَا تَنفَعُ ٱلشَّفَٰعَةُ عِندَهُۥٓ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَّهُۥ ۚ ﴾ [سبا: ٢٢، ٢٣]
"বল, তোমরা আল্লাহ তা'আলার পরিবর্তে যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে আহবান কর। তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অনুপরিমাণও কোনো কিছুর মালিক নয় এবং এ দু'য়ে তাদের কোনোও অংশ নেই, আর তাদের কেউ আল্লাহর সাহায্যকারীও নয়। যাকে অনুমতি দেওয়া হয় সে ছাড়া আল্লাহ তা'আলার নিকট কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না”। [সূরা সাবা, আয়াত: ২২-২৩]
মহান পবিত্র আল্লাহ অবহিত করছেন যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া এমন শক্তিকে ডাকা হচ্ছে যাদের আল্লাহ তা'আলার রাজত্বে অনুপরিমাণ ক্ষমতা ও অংশীদারীত্ব নেই, সৃষ্টি বিষয়ে তাদের কোনো ক্ষমতাও নেই যার দ্বারা সাহায্য করবে। আর আল্লাহ তা'আলার অনুমতি ছাড়া তারা নিকট কারো সুপারিশ উপকারে আসবে না।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿ وَكَم مِّن مَّلَكٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغْنِي شَفَٰعَتُهُمْ شَيْـًٔا إِلَّا مِنۢ بَعْدِ أَن يَأْذَنَ ٱللَّهُ لِمَن يَشَآءُ وَيَرْضَىٰ ﴾ [النجم: ٢٦]
“আকাশসমূহে কত ফিরিশতা রয়েছে। তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেবেন”। [সুরা আন-নাজম, আয়াত: ২৬]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ شُفَعَاءٌ قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُونَ شَيْئًا وَلَا يَعْقِلُونَ قُل لِّلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَّهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ﴾ [الزمر: ٤২ , ٤٣]
"তারা কি আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে (অন্যদেরকে নিজেদের মুক্তির জন্য) সুপারিশকারী বানিয়ে নিয়েছে? বল, তারা কোনো কিছুর মালিক না হওয়া সত্ত্বেও এবং তারা না বুঝলেও? বল, যাবতীয় সুপারিশ আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহ তা'আলারই। অতঃপর তারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে"। [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৩-৪৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ﴾ [يونس: ১৮]
"আর তারা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া এমন বস্তুসমূহের ইবাদাত করে যারা তাদের কোনো অপকারও করতে পারে না এবং উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে এরা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নিকট আমাদের সুপারিশকারী। তুমি বলে দাও, তোমরা কি আল্লাহ তা'আলাকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশ সমূহে, আর না জমিনে? তিনি পবিত্র এবং তাদের মুশরিকী কার্যকলাপ হতে অনেক ঊর্ধ্বে”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

📘 মহা উপদেশ > 📄 তাওহীদই হলো নবী রাসূলদের দাওয়াতের চাবি

📄 তাওহীদই হলো নবী রাসূলদের দাওয়াতের চাবি


দীনের মূল বিষয় হলো এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক না করা। আর এটাই হলো তাওহীদ যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন এবং কিতাবসমূহ অবতীর্ণ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَسْــَٔلْ مَنْ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رُّسُلِنَا أَجَعَلْنَا مِنْ دُونِ الرَّحْمٰنِ آلِهَةً يُّعْبَدُونَ﴾ [الزخرف: ٤٥]
"তোমার পূর্বে আমরা যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে তুমি জিজ্ঞেস কর, আমি (আল্লাহ তা'আলা) কি দয়াময় আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কোনো মা'বুদ স্থির করেছিলাম যাদের ইবাদাত করা যায়"? [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪৫]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ﴾ [النحل: ٣٦]
"আমরা প্রত্যেক জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, তারা আল্লাহ তা'আলার ইবাদাত ও তাগুতকে (সীমা লঙ্ঘনকারী) বর্জনের দাওয়াত দিবে"। [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوْحِيْ إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ﴾ [الانبياء: ٢٥]
"আপনার পূর্বে আমি কোনো রাসূলকে এ ওহী ব্যতীত প্রেরণ করিনি যে, আমি ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমার ইবাদাত কর"। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]

📘 মহা উপদেশ > 📄 তাওহীদের বাস্তবায়ন ও সব ধরনের শির্কের অণু-কণা থেকে সতর্ক করণ

📄 তাওহীদের বাস্তবায়ন ও সব ধরনের শির্কের অণু-কণা থেকে সতর্ক করণ


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওহীদকে বাস্তবায়ন করেন এবং উম্মতকে তা শিক্ষা দেন। তাই জনৈক ব্যক্তি যখন তার সামনে বলেছিল আল্লাহ তা'আলা যা চান ও আপনি যা চান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জবাবে বলেছিলেন,
«أجعلتني الله ندا؟ بل ما شاء الله وحده»
"তুমি কি আমাকে আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে শরীক করছ; বরং আল্লাহ তা'আলা এককভাবে যা চান তাই হয়"।
তারপর বললেন,
«لا تقولوا: ما شاء الله وشاء محمد ولكن قولوا: ما شاء الله ثم شاء محمد»
"তুমি এভাবে বলবে না যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা চান; বরং বলবে, আল্লাহ তা'আলা যা চান অতঃপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা চায়”। ⁴⁶
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যের নামে শপথ করতে নিষেধ করছেন। তিনি বলেন -
«من كان حالفا فليحلف بالله أو ليصمت»
"যে শপথ করতে চায় সে আল্লাহ তা'আলার নামে শপথ করবে অথবা নীরব থাকবে"। ⁴⁷
তিনি আরো বলেন,
«من حلف بغير الله فقد أشرك»
“যে আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্যের নামে শপথ করল সে শির্ক করল”। ⁴⁸
তিনি আরো বলেন,
«لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم إنما أنا عبد فقولوا عبد الله ورسوله»
"তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন করে খ্রিস্টানগণ ইবন মারইয়ামের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। নিশ্চয় আমি একজন বান্দা। অতএব, তোমরা বল, আপনি আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও তার রাসূল"। ⁴⁹
এ কারণে আলেমগণ একমত হয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি কোনো সৃষ্ট বস্তুর নামে শপথ করতে পারবে না। যথা- কা'বা ও অন্যান্য বস্তুর নামে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাজদাহ করতেও নিষেধ করেছেন। কোনো কোনো সাহাবী তাকে সাজদাহ করতে চাইলে তিনি তাদের নিষেধ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لا يصلح السجود إلا الله»
“আল্লাহ তা'আলা ছাড়া সাজদাহ পাওয়ার উপযোগী কেউই নেই”। ⁵⁰
তিনি আরো বলেন,
«لو كنت آمراً أحدا أن يسجد لأحد لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها»
"আমি যদি এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে সাজদাহ দেওয়ার নির্দেশ দিতাম তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম সে যেন তার স্বামীকে সাজদাহ করে"। ⁵¹
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু'আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে বলেন,
«أرأيت لو مررت بقبري أكنت ساجدا له؟»
"তুমি যদি আমার কবরের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম কর তাহলে কি কবরকে সাজদাহ দিবে? তিনি বললেন, না”। ⁵²
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, فلا تسجد لى "আমাকে সাজদাহ করবে না"।
এজন্য কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যুকালীন অসুস্থতার সময় বলেন,
«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد»
"আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি লা'নত বর্ষণ করুন। কারণ, তারা নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।"
তারা যে কাজ করছে তা থেকে তিনি উম্মতকে সর্তক করে দিয়েছেন। 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'যদি আশঙ্কা না হতো তাহলে ঘরের বাহিরে প্রকাশ্য স্থানে তার কবর দেওয়া হত কিন্তু মানুষ মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে এ সম্ভাবনায় তিনি তা অপছন্দ করেছেন'। ⁵³
সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে বলেছেন:
«إن من قبلكم كانوا يتخذون القبور مساجد، ألا فلا تتخذوا القبور مساجد، فإني أنهاكم عن ذلك»
"তোমাদের পূর্বের লোকেরা কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করত। সাবধান! তোমরা কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করবে না। আমি তোমাদের এ বিষয়ে নিষেধ করলাম"।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, «اللهم لا تجعل قبري وثنا يعبد، اشتد غضب الله على قوم اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد»
"হে আল্লাহ তা'আলা! তুমি আমার কবরকে উপাসনার মূর্তি বানিয়ে দিও না। আল্লাহ তা'আলার গযব ঐ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রকট হয়, যারা নবীদের কবরসমূহকে মসজিদরূপে (ইবাদতের স্থান) গ্রহণ করেছে"।
তিনি আরো বলেন, «لا تتخذوا بيتي عيدا ولا بيوتكم قبورا، وصلوا علي حيث كنتم فإن صلاتكم تبلغن»
"তোমরা আমার ঘরকে উৎসবস্থলে পরিণত করো না। আর তোমাদের গৃহগুলোকে কবরে পরিণত করো না। তোমরা যেখানেই থাক না কেন আমার ওপর দরুদ পাঠ কর। কেননা তোমাদের দরুদ আমার নিকট পৌঁছবে"। ⁵⁴
এ কারণে পৃথিবীর সকল আলেম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ শরী'আতসম্মত নয় এবং এর নিকট সালাত পড়াও ইসলামী বিধি সম্মত নয়; বরং ইসলামের শীর্ষ স্থানীয় আলেম ও নেতৃবর্গের অভিন্ন সিদ্ধান্ত যে, কবরের পার্শ্বের সালাত ইবাদাত হিসেবে গৃহীত হবে না, বরং তা অবশ্যই বাতিল বলে গণ্য হবে।
মুসলিমদের কবর যিয়ারত করা, দাফনের পূর্বে মৃত ব্যক্তির সমমর্যাদা সম্পন্ন লোকের নেতৃত্বে তাদের জানাযার সালাত সম্পাদন করা সুন্নত। আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের প্রসঙ্গে বলেন,
﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ﴾ [التوبة: ٨٤]
"তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে কখনই তুমি তার জানাযার সালাতে দাঁড়াবে না ও তার কবরের কাছে দাঁড়াবে না”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৮৪]
এ আয়াতের 'দলীলুল খিতাব' বা ভাষ্যের দাবী থেকে প্রমাণিত হলো যে, সাধারণ মুমিনগণের কবরের উপরে তাদের জন্য (জানাযার) সালাত আদায় করা যাবে এবং তাদের কবরের পার্শ্বে দাঁড়ানা যাবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণেরকে কবর যিয়ারত-কালীন নিম্নোক্ত দো'আ শিক্ষা দিয়েছেন-
السَّلامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ دَارِ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءُ اللهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ، يَرْحَمُ اللهُ المُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَمِنْكُمْ وَالمُسْتَأْخِرِينَ، نَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمْ العَافِيَةَ، اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُمْ، وَلَا تَفْتِنَا بَعْدَهُمْ، وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُمْ»
"হে মুমিন সম্প্রদায়ের গৃহকর্মী আপনাদের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ হোক। আমরা ও ইনশা-আল্লাহ তা'আলা আপনাদের সঙ্গে মিলিত হবো। আমাদের ও আপনাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ করুক। আমাদের ও আপনাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতিদান থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করিও না, তাদের পরে আমাদেরকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ করিও না। আমাদেরকে ও তাদেরকে ক্ষমা করে দাও"। ⁵⁵
আর এটা এজন্যই যে, মূর্তিপূজার কারণসমূহের অন্যতম কারণ হলো, কবরকে সম্মান প্রদর্শন করা, সেখানে ইবাদাত ও অনুরূপ কর্ম সম্পাদন করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ وَالِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴾ [نوح: ২৩]
"তারা বলল, তোমরা তোমাদের ইলাহদেরকে ছেড়ে দিও না। ছেড়ে দিও না ওদ্দা, সুয়া'আ, ইয়াগুসা, ইয়া'উকা ও নাছরা (নামক মূর্তিদেরকে)"। [সূরা নূহ, আয়াত: ২৩]
সালাফদের একটি দল বলেন, এসব নামে বর্ণিত লোকেরা সমকালীন জাতির ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। যখন তারা মারা গেলেন তখন তারা তাদের কবরের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়ল। তারপর তাদের ভাস্কর্য, প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করে তাদের 'ইবাদত করা শুরু করল।
তাই আলেমদের ঐকমত্য সংঘটিত হয়েছে, যে লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম করতে চায় সে তার কবরের পাথর স্পর্শ ও চুমু দিতে পারবে না। কারণ চুমা দেওয়া ও স্পর্শ করা বায়তুল্লাহ তথা আল্লাহ তা'আলার ঘর কা'বার রুকন বা কোণসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার ঘরকে মানুষের ঘরের সঙ্গে সাদৃশ্য করা যাবে না।
অনুরূপভাবে কবরে তওয়াফ, সালাত ও ইবাদতের জন্য সমবেতও হওয়া যাবে না। বস্তুত তওয়াফ, সালাত ও ইবাদাত করা আল্লাহ তা'আলার ঘরসমূহের অধিকার। আর সেগুলো ঐ মসজিদসমূহ; যাতে উচ্চস্বরে আযানের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নাম প্রচারের জন্যে, আল্লাহর যিকিরের জন্য আল্লাহ তা'আলা অনুমতি দিয়েছেন। মানুষের ঘর (কবর) সমূহে উপরোক্ত ইবাদাত বৈধ হবে না। কারণ তা করলে ঈদ হিসাবে বিবেচিত হবে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لا تتخذوا بيتي عيدا "তোমরা আমার ঘরকে উৎসবস্থলে পরিণত করো না”। ⁵⁶

টিকাঃ
⁴⁶ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৩৪, সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২১১৭
⁴⁷ সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৬৮৫
⁴⁸ সুনান তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৫
⁴⁹ সহীহ বুখারী ৪৭৮/৬
⁵⁰ সুনান তিরমিযী ৩২৪/৪
⁵¹ সুনান আবু দাউদ ৬৭/৩
⁵² সুনান আবু দাউদ ৬৭/৩
⁵³ সহীহ বুখারী, সালাত অধ্যায়: ৫৩২/১
⁵⁴ সুনান আবু দাউদ: ৪৪৭/২
⁵⁵ মুসনাদ, হাদীস নং ২৪৮০১
⁵⁶ সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৪২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00