📘 মহা উপদেশ > 📄 বাড়াবাড়ি যারা করে তাদের অবস্থান

📄 বাড়াবাড়ি যারা করে তাদের অবস্থান


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনা অনুযায়ী আখেরাতে আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভকে মিথ্যা মনে করা, চরমপন্থীদের দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাওয়ার দাবীকে সত্য বলে মনে করা, এ দু'টির মাঝামাঝি রয়েছে আল্লাহ তা'আলার দীন। এ দু'টি আক্বীদাই বাতিল। এসব লোকদের কারো কারো দাবী যে, সে পৃথিবীতে স্বচক্ষে আল্লাহ তা'আলাকে দেখেছে। এরাও পূর্ববর্তী লোকদের ন্যায় পথভ্রষ্ট। যদি তারা কোনো সত্যপরায়ণ ব্যক্তি অথবা সীমা অতিক্রমকারী ব্যক্তি বা রাষ্ট্র প্রধান কিংবা অন্য কোনো ধরণের মানুষের আকৃতিতে আল্লাহ তা'আলাকে দেখার দাবি করে, তাহলে তাদের পথভ্রষ্টটা ও কুফুরী আরো মারাত্মক হবে। তখন তারা ঐসব খ্রিস্টানদের থেকেও অধিক পথভ্রষ্ট যারা দাবী করেছিল যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে ঈসা ইবন মারইয়ামের আকৃতিতে দেখেছে।
এরা হলো শেষ জামানার দজ্জালের অনুচর পথভ্রষ্ট-কারীর চেয়েও নিকৃষ্ট ও অধিক গোমরাহ। দাজ্জাল মানুষকে বলবে আমি তোমাদের রব, সে আসমানকে নির্দেশ দিবে, অতঃপর বৃষ্টি প্রবাহিত হবে এবং যমীনকে নির্দেশ দিবে, অতঃপর সুজলা-সুফলা ফসল উৎপাদিত হবে। সে অনাবাদী যমীনকে বলবে তোমার ভিতর প্রোথিত সম্পদ বের করে দাও সঙ্গে সঙ্গে যমীন তা বের করে দিবে। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাতিকে দজ্জাল বিষয়ে সতর্ক করে গেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ما من خلق آدم إلى يوم القيامة فتنة أعظم من الدجال
"আদম সৃষ্টি থেকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত এই সবুজ শস্য শ্যামল পৃথিবীতে যত ফিতনার ঘটনার অবতারণা হবে তার মধ্যে দজ্জালের ঘটনাই হবে সবচেয়ে বড় ফিতনা"। 42
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
إذا جلس أحدكم في الصلاة فليستعذ بالله من أربع، ليقل: اللهم إني أعوذ بك من عذاب جهنم، وأعوذ بك من عذاب القبر، وأعوذ بك من فتنة المحيا والممات، وأعوذ بك من فتنة المسيح الدجال
"তোমাদের মধ্যে কেউ যখন সালাতের সমাপনী বৈঠকে বসে তখন সে যেন চারটি বিষয় থেকে মুক্তির জন্যে আশ্রয় চেয়ে বলে, হে আল্লাহ তা'আলা! আমি জাহান্নামের আযাব থেকে তোমার নিকট আশ্রয় কামনা করছি, কবরের সাজা হতে নিষ্কৃতির জন্যে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, জীবন ও মরণের পরীক্ষার বিষয়ে আশ্রয় চাচ্ছি এবং মাসীহ দাজ্জালের পরীক্ষা থেকে বাঁচার জন্যে তোমার দরবারে আশ্রয় ভিক্ষা করছি"।
এ দাজ্জাল রুবুরিয়্যাহ দাবী করবে এবং কিছু সংশয় বিষয় নিয়ে আসবে যদ্বারা মানুষকে পরীক্ষায় ফেলবে। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা ও আল্লাহ তা'আলার দাবীদার দাজ্জালের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إنه أعور، وإن ربكم ليس بأعور
“জেনে রাখ! দাজ্জাল হবে কানা, আর তোমাদের রব কানা নন”। 43
তিনি আরো বলেছেন, তোমরা ভালোভাবে জেনে রেখ! তোমাদের মধ্যে কেউই কখনই মৃত্যুর পূর্বে তার আল্লাহ তা'আলাকে দেখতে পাবে না"। উম্মতের জন্যে উপরোক্ত দু'টি প্রকাশ্য আলামত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। মানুষ সে দু'টি চিহ্নের মাধ্যমে মিথ্যা আল্লাহ তা'আলা দাবীদার দাজ্জালকে সনাক্ত করতে সক্ষম হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন যে, দাজ্জালের পরীক্ষায় কিছু মানুষ পথভ্রষ্ট হবে তারা দুনিয়াতে মানুষের আকৃতিতে আল্লাহ তা'আলাকে দেখা জায়েয বলবে। যেমন, ঐসব বিভ্রান্তকারী পথভ্রষ্ট যাদের নাম করা হয় সর্বেশ্বর-বাদী ও অদ্বৈতবাদী। (তারা প্রধানত এ দু'টি ভাগে বিভক্ত। এ প্রকৃতির লোকেরা আল্লাহ তা'আলাকে কতিপয় বস্তুর মধ্যে সর্বেশ্বর ও অদ্বৈতবাদ মনে করে।44)

টিকাঃ
42 তাবরানী, আওসাতে কবীর, হাদীস নং ৩৩৬
43 সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৩৭
44 অনুবাদক

📘 মহা উপদেশ > 📄 হুলুলের আকীদা পোষণকারী সর্বশেষবাদীদের প্রকার

📄 হুলুলের আকীদা পোষণকারী সর্বশেষবাদীদের প্রকার


তারা দুই প্রকার:
ক- এক সম্প্রদায়ের লোক এমন আছে আল্লাহ তা'আলাকে কতিপয় বস্তুর মধ্যে সর্বেশ্বর ও অদ্বৈতবাদে বিশেষিত করে। যেমন, খ্রিস্টানগণ ঈসা আলাইহিস সালামের মধ্যে ও চরমপন্থীরা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ও তার সমমানের লোকদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব আছে বলে বিশ্বাস করে।
অপর কিছু লোক পীর, মাশাইখদের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা আছে বলে বিশ্বাস করে। আর কিছু লোক রাজা-বাদশাহের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা আছে বলে বিশ্বাস করে থাকেন। আর কিছু লোক সুন্দর সুন্দর ছবির মধ্যে আল্লাহ তা'আলা আছে বিশ্বাস করে। ইত্যাদি ভ্রান্ত কথা-বার্তা রয়েছে যেগুলো খৃস্টানদের কথার চেয়েও নিকৃষ্ট।
খ- দ্বিতীয় শ্রেণী: এ শ্রেণীর লোকেরা আল্লাহ তা'আলাকে সব বস্তুর মধ্যে সর্বেশ্বর ও অদ্বৈতবাদ বলে। এমনকি তারা সকল অস্তিত্বের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বিরাজমান বলে মনে করে। এমনকি তারা বিশ্বাস করে কুকুর, শূকর, অপবিত্র বস্তুসহ অন্যান্য সবকিছুতে আল্লাহ তা'আলা বিরাজমান। এটি জাহমিয়া সম্প্রদায় ও তাদের মতাবলম্বী এবং অদ্বৈতবাদী মত। যেমন, ইবন 'আরাবী, ইবন ফারিদ্ব, ইবন সাব'ঈন, তিলমসানীও বালয়ানী প্রমুখের অনুসারীদের বিশ্বাস।
অথচ সকল রাসূল, তাদের অনুসারী মুমিন ও আহলে কিতাবের মাযহাব হলো, আল্লাহ তা'আলা সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা। আসমান ও যমীন এবং তার মধ্যকার সব কিছুর রব, মহান আরশের রব, সকল সৃষ্টি তারই বান্দা। তারা তার প্রতি মুখাপেক্ষী। মহা মহিম পবিত্র আল্লাহ তা'আলা আসমানের আরশের উপর রয়েছেন। সৃষ্ট জীব থেকে তিনি অনেক দূরে। এতদসত্বেও তারা যেখানেই থাকুক না কেন তিনি তাদের সাথেই রয়েছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴾ [الحديد: ٤]
"তিনিই ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তারপর আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উঠে। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা'আলা তা দেখেন”। [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৪]

📘 মহা উপদেশ > 📄 পদভ্রষ্ট- গোমরাহ লোকদের শাস্তি

📄 পদভ্রষ্ট- গোমরাহ লোকদের শাস্তি


ঐসব কাফির পথভ্রষ্টরা, যাদের কোনো একজন দাবী করে যে, সে তার রববে তার দুই চোখে দেখেছে। কখনো কখনো এ দাবী করে যে, সে তার সাথে বসেছে, তার সাথে কথা বলেছে, তার সঙ্গে সময় অতিবাহিত করেছে অথবা তিনি সবার সঙ্গে আছেন। আবার কখনো কখনো বলে, মানুষ ছোট বালক বা বড় মানুষ ইত্যাদি ধারণা করে। আবার কখনো সময় এ দাবী করে যে, তিনি তাদের সাথে কথা বলেছেন। এ সব দাবি যারাই করবে তাদেরকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি তাওবা করে, ভালো না হয় তাদের হত্যা করা হবে।
এ ধরনের লোকেরা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের চেয়েও বড় কাফির। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ কাফির এ জন্যে যে, তারা বলে মাসীহ ইবন মরইয়াম-ই আল্লাহ তা'আলা। প্রকৃতপক্ষে মাসীহ হলেন সম্মানিত রাসূল। দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার নিকট মর্যাদাবান এবং আল্লাহ তা'আলার ঘনিষ্ঠদেরও অন্যতম। সুতরাং তারা যখন এ আক্বীদা পোষণ করে 'ঈসা আলাইহিস সালাম- ই আল্লাহ এবং আল্লাহ ও ঈসা আলাইহিস সালাম একাকার হয়েছেন অথবা আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালাম এর মধ্যে প্রবেশ করেছেন', তখন তাদের কুফুরী নিশ্চিত হয়েছে এবং তাদের কাফির হওয়া আরো সম্প্রসারিত হয়েছে।
যখন তাদেরকে কাফের বলা হয়েছে যারা বলেছে আল্লাহ তা'আলা সন্তান গ্রহণ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াতে বলেন,
﴿وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا لَّقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضَ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا * إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا ﴾ [مريم: ۸۸، ۹۳]
"তারা বলে, 'দয়াময় আল্লাহ তা'আলা সন্তান গ্রহণ করেছে।' তোমরা তো এক ভয়ানক বিষয়ের অবতারণা করেছ। এতে যেন আকাশসমূহ ফেটে যাবে, পৃথিবী খণ্ড বিখণ্ড হবে ও পর্বতসমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। কারণ, তারা রহমানের ওপর সন্তান আরোপ করে অথচ সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহ তা'আলার জন্যে শোভা পায় না। আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে বান্দা রূপে আল্লাহ তা'আলার নিকট উপস্থিত হবে না”। [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৮৮-৯৩]
অতএব, সে লোকের কী হবে, যে সাধারণ মানুষের মধ্যে কাউকে আল্লাহ তা'আলা বলে দাবী করে? বরং সে তো চরমপন্থী মতবাদের লোকদের চেয়ে বড় কুফুরী করেছে; যারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু অথবা বিশ্ব নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারভুক্ত কাউকে আল্লাহ বলে দাবী করত।
বস্তুত এরাই সেসব যিন্দিক বা প্রচ্ছন্ন কাফের-মুনাফিক, যাদেরকে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিলেন। তিনি গর্ত করার নির্দেশ দিলেন, কিন্দা দরজার কাছে তা খনন করা হলো। তিন দিন পর্যন্ত তাদেরকে সময় দিয়েছে তওবা করার জন্যে। যারা তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে এসেছে তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন। যারা তওবা না করে স্বীয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের ওপর অটল ছিল তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তাদের হত্যার বিষয়ে সকল সাহাবী একমত ছিলেন। কিন্তু হত্যার ধরণ নিয়ে পরস্পর দ্বিমত ছিল। বিশিষ্ট সাহাবী ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর অভিমত ছিল আগুনে না পুড়িয়ে তলোয়ার দ্বারা হত্যা করা হোক। আর এটাই সকল আলিমের অভিমত। আর এটি আলিমদের নিকট একটি পরিচিত ঘটনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00