📘 মহা উপদেশ > 📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মধ্যপন্থী দল

📄 আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মধ্যপন্থী দল


খ- আল-ওয়াসাতিয়‍্যাহ: (মধ্যপন্থী হওয়া)
এ নাজাত বা মুক্তি প্রাপ্ত দল, যারা 'আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত' নামে পরিচিত। তারা হলেন সকল দলসমূহের মধ্যে মধ্যপন্থী। যেমন, সমগ্র ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থার মধ্যে ইসলাম হলো মধ্যপন্থী দীন।
• সুতরাং মুসলিমগণ হলেন আল্লাহ তা'আলার নবী, রাসূল ও পুণ্যবান বান্দাদের মধ্যে মধ্যপন্থী। তারা তাদের বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করে না, যেমন খ্রিস্টানগণ সীমালঙ্ঘন করেছিল। খ্রিস্টানরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে, তাদের যারা আলেম ও পাদ্রী তাদের উপাস্য সাব্যস্ত করে এবং মাসীহ ইবন মারইয়ামকে তারা (উপাস্য) সাব্যস্ত করে। অথচ তাদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন এক ইলাহের ইবাদাত করে, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তারা তার সাথে যাদের শরীক করে তা হতে তিনি পবিত্র। ¹⁶ মুসলিম জামা'আত নবীদের প্রতি এ ধরনের কোনো অবিচার ও জুলুম অত্যাচার করেনি যেমনটি করেছে ইয়াহুদীরা। তারা বহু নবীদেরকে বিনা অপরাধে হত্যা করেছে। মানব সমাজে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিতেন তাদেরকেও তারা হত্যা করেছিল। ¹⁷ তাদের প্রবৃত্তি ও মতের বিরুদ্ধে যখনই কোনো রাসূল আসতেন, তখন তাদের একদল তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করত ও অপর দল তাদেরকে হত্যা করত। ¹⁸
পক্ষান্তরে মুমিন মুসলিমরা কখনোই এ ধরনের কাজ করতে পারে না, তারা আল্লাহ তা'আলার নবী ও রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করেন, তাদের সম্মান করেন, ভালোবাসেন ও তাদের আনুগত্য করেন। তারা তাদের ইবাদাত করেন না এবং তাদেরকে রব হিসাবে মেনেও নেন না। যেমন, আল্লাহ তা'আলা কতই সুন্দর বলেছেন,
﴿مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللَّهُ الْكِتَابَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لِي مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُونَ وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَنْ تَتَّخِذُوا الْمَلَائِكَةَ وَالنَّبِيِّينَ أَرْبَابًا أَيَأْمُرُكُمْ بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ﴾ [آل عمران: ۷۹، ۸۰]
"এটা কোনো মানুষের পক্ষে উপযোগী নয় যে, আল্লাহ তা'আলা যাকে কিতাব, জ্ঞান ও নবুওয়ত দান করেন, অতঃপর সে মানবমণ্ডলীর মধ্যে এ কথা বলে যে, তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে পরিত্যাগ করে আমার ইবাদাত কর, বরং বলবে তোমরা হয়ে যাও 'রাব্বানী' (কাণ্ডারী), কারণ তোমরাই কুরআন শিক্ষাদান কর এবং ওটা নিজেরাও পাঠ করে থাক। আর তিনি আদেশ করেন না যে, তোমরা ফিরিশতাগণকে ও নবীগণকে রব হিসাবে গ্রহণ কর। তোমরা মুসলিম হবার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফরি করার আদেশ করবেন"? [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৯-৮০]
• অনুরূপভাবে মুমিনগণ ঈসা আলাইহিস সালাম বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তারা খ্রিস্টানদের মতো বলে না যে, ঈসা-ই আল্লাহ, তার পুত্র অথবা তিন জনের একজন। আর তারা তাকে অস্বীকারও করে না এবং মারইয়াম আলাইহিস সালামের প্রতি গুরুতর অপবাদও আরোপ করে না। যেমন, ইয়াহুদীগণ অপবাদ দিয়ে থাকে। ইয়াহূদীরা ঈসা আলাইহিস সালামকে জারজ সন্তান বলে আখ্যায়িত করে। বরং মুমিনগণ বলেন, ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার অন্যতম বান্দা ও তার শীর্ষস্থানীয় একজন রাসূল, তিনি আল্লাহর কালিমা, যাকে পবিত্রা কুমারী নারী মারিয়ামের পেটে ঢেলে দেওয়া হয় এবং ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত (সৃষ্ট) এক রূহ।
• অনুরূপভাবে মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলার দীনের বিধি-বিধানের ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। তারা মনে করেন আইন প্রণয়ন করা, রহিত করা ও বহাল রাখার একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ তা'আলা। আল্লাহ তা'আলা তার ইচ্ছা অনুযায়ী কোন কিছু রহিত করতে চাইলে এবং কোন বিধান বহাল রাখতে চাইলে তারা তার ওপর এসব বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন না। (আল্লাহ যা ইচ্ছা রহিত করেন, আবার যা ইচ্ছা তিনি বহাল রাখেন।) যেমনটি ইয়াহুদীরা বলে থাকেন। (তারা আল্লাহর দ্বারা কোনো বিধান রহিত করার অধিকার নেই বলে থাকে) আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বর্ণনা দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
سَيَقُولُ السُّفَهَاءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلَهُمْ عَن قِبْلَتِهِمُ الَّتِي كَانُوا عَلَيْهَا ﴾ [البقرة: ١٤٢]
"মানুষের মধ্যে নির্বোধগণ বলে যে, তারা যে কিবলার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা হতে কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল"। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
﴿ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ ءَامِنُوا بِمَا أَنزَلَ ٱللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُۥ وَهُوَ ٱلْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَهُمْ ﴾ [البقرة: ٩١]
"আর যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ তা'আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি ঈমান আন। তখন তারা বলে, আমরা তো শুধু সেসব কিছুর ওপর ঈমান আনি যা আমাদের বনী ইসরাঈল জাতির ওপর নাযিল করা হয়েছে। এর বাহিরে যা আছে তা তারা অস্বীকার করে [অথচ] তা একান্ত সত্য এবং তাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়ণকারী”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৯১]
আর মুসলিমগণ তাদের বিজ্ঞ আলিমদের ও বুজর্গানে দীনদের জন্যে এটা জায়েয মনে করেন না যে, তারা চাইলে আল্লাহ তা'আলার দীনকে পরিবর্তন করবে। যা ইচ্ছে তা শরী'আত বলে নির্দেশ দিবেন এবং যা ইচ্ছে তা হারাম বলে নিষেধ করবেন যেমনটি করে থাকে খ্রিস্টানগণ। যেমন, আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রসঙ্গে বলেন,
﴿ ٱتَّخَذُوٓاْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلْمَسِيحَ ٱبْنَ مَرْيَمَ ﴾ [التوبة: ٣١]
"এসব লোকেরা আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম ও ধর্ম যাজকদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩১] এ আয়াতটির ওপর আদী ইবন হাতীম রাদিয়াল্লাহু 'আনহু জিজ্ঞাসা করে বলেছিলেন, হে আল্লাহ তা'আলার রাসূল! তারা তো তাদের ইবাদাত করে না। আল্লাহ তা'আলার রাসূল প্রত্যুত্তরে তাকে বলেছিলেন,
«مَا عَبَدُوهُمْ وَلَٰكِنْ أَحَلُّوا لَهُمُ ٱلْحَرَامَ فَأَطَاعُوهُمْ وَحَرَّمُوا عَلَيْهِمُ ٱلْحَلَٰلَ فَأَطَاعُوهُمْ»
"তারা ইবাদাত করে না ঠিকই, তাদের আলেমরা হারামকে হালাল বলেন। আর তারা তাদের অনুকরণ করে ও মেনে নেয়। আর হারামকে হালাল বলেন আর তারা তাদের অনুকরণ করে ও মেনে নেয়।” সে বলল হাঁ। আল্লাহ তা'আলার রাসূল তাকে বললেন, তাহলে এটাই تو তাদের ইবাদাত করা হলো। কেননা হালাল ও হারাম করার ক্ষমতা তো তার, যিনি রব। ¹⁹
পক্ষান্তরে, মুমিনদের বক্তব্য হল, সৃষ্টি ও নির্দেশ কেবল আল্লাহর জন্য। যেমন করে কেউ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না তেমনি অপরকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে না। আর মুমিনগণ বলেন, আমাদের কথা হবে আমরা শুনলাম ও মানলাম। ফলে তারা আল্লাহ তা'আলা যা আদেশ করেছেন, তা তারা মেনে নিয়েছেন। আর তারা বলে,
﴿إِنَّ ٱللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ ﴾ [المائدة: ١] "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা যা চান তার আদেশ দেন"। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১]
পক্ষান্তরে মাখলুক স্রষ্টার কোনো নির্দেশের পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না, সে যদিও মহা ক্ষমতাশালী হয়।
• অনুরূপ মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী বিষয়ে মধ্যপন্থী। কেননা, ইয়াহুদীরা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীকে অপূর্ণাঙ্গ মাখলুকের গুণাবলীর সাথে বিশেষিত করেছে। তারা বলে, আল্লাহ তা'আলা গরীব আর আমরা ধনী। ²⁰ আল্লাহ তা'আলার হাত বন্ধ। ²¹ তারা আরো বলে, তিনি সৃষ্টি করতে করতে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়েছেন। সুতরাং তিনি শনিবারের বিশ্রাম ও প্রশান্তি গ্রহণ করেছেন। এরূপ বহু ভ্রান্ত আকীদা ইয়াহুদীরা পোষণ করে থাকে।
আর খ্রিস্টানগণ মাখলুক তথা সৃষ্ট জীবকে স্বয়ং স্রষ্টার সাথে খাস এ ধরনের গুণাবলীর সাথে বিশেষিত করেছে। তারা বলে, মাখলুক সৃষ্টি করে, রিযিক দেয়, সৃষ্ট জীবের প্রতি দয়া করে, ক্ষমা করে, অনুগ্রহ প্রদর্শন করে, প্রতিদান দিয়ে থাকে, শান্তি প্রদান করে। (অথচ এগুলো কেবল স্রষ্টার গুণ)
মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনে যার কোনো শরীক নেই, সমকক্ষ নেই, তার কোনো উদাহরণও নেই; তিনিই সমগ্র পৃথিবীর রব, সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি ছাড়া বাকী সবাই তার বান্দা এবং তার মুখাপেক্ষী। মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا لَقَدْ أَحْصَهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدَّاً * وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا ﴾ [مريم: ٩٣، ٩٥]
“আকাশ আর জমিনে এমন কেউ নেই যে, দয়াময়ের নিকট বান্দা হয়ে হাযির হবে না। তিনি (তার সৃষ্টির] সব কিছুকেই (কড়ায় গণ্ডায়] গুনে তার পূর্ণাঙ্গ হিসেব রেখে দিয়েছেন। কিয়ামতের দিন এদের সবাই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার সামনে আসবে”। [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৯০-৯৫]
• অনুরূপভাবে হালাল ও হারামের ব্যাপারে মুমিনগণ মধ্যপন্থী। কিন্তু ইয়াহুদীরা তার বিপরীত, তারা নিজেরাই তাদের নিজেদের কতক বস্তুকে হারাম করেছিল। আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন, ﴿ فَإِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا [النساء : ١٦٠] “ইয়াহূদীদের বাড়াবাড়ি আর বহু লোককে আল্লাহ তা'আলার পথে বাধা দেওয়ার কারণে আমরা তাদের ওপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬০] ²²
ইয়াহূদীরা নখ বিশিষ্ট প্রাণীর গোশত খেত না। যেমন, উট, হাঁস ইত্যাদি।
পাকস্থলীর ঝিল্লির চর্বি, দুই কিডনির গোশত ও বকরীর দুধ প্রভৃতি তারা খেত না, যা তারা তাদের নিজেদের ওপর বিভিন্ন খাদ্য ও পোশাক ইত্যাদি হারাম করেছিল। এমনকি বলা হয়ে থাকে (খাদ্য, পোশাক ছাড়াও) তাদের ওপর তিনশত ষাট ধরণের বস্তু হারাম ছিল। দুইশত আটচল্লিশটি বিষয় তাদের ওপর ছিল কঠোর বিধান। অনুরূপভাবে নাপাকীর বিষয়ে তাদের প্রতি কঠোরতা আরোপ করা হয়। এমনকি ঋতুবর্তী মহিলার সঙ্গে তারা খানা-পিনা খেত না এবং একসঙ্গে এক ঘরে বসবাস করতো না।
প্রক্ষান্তরে খ্রিস্টানগণ যাবতীয় অপবিত্র জিনিস ও সমস্ত হারাম দ্রব্য হালাল করে নিয়েছিল। সকল প্রকার নোংরা অপবিত্র জিনিসের অনুশীলন করেছিল। ঈসা আলাইহিস সালাম তাদের শুধু এ কথা বলেছিলেন, যার বর্ণনায় আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿ وَلِأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ ٱلَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ ﴾ [آل عمران: ٥٠]
"আর যাতে আমি হালাল করি, কতক এমন বস্তু যা তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছিল"। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৫০]
এ কারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُواْ الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُوْنَ) [التوبة:]
"যে সব আহলে কিতাব আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনে না, আর কিয়ামতের দিবসের প্রতিও না, আর ঐ বস্তুগুলোকে হারাম মনে করে না যেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল হারাম করেছেন, আর সত্য দীনকে নিজেদের দীন (ইসলাম) হিসেবে গ্রহণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাক যে পর্যন্ত না তারা অধীনতা স্বীকার করে প্রজারূপে জিযিয়া (কর) দেয়”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৯]
পক্ষান্তরে মুমিনগণ- যেমন, আল্লাহ তা'আলা তাদের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন তারা স্বীয় বাণীতে, তিনি বলেন,
وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِايَتِنَا يُؤْمِنُونَ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَنْهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَيثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ ءَامَنُوا بِهِ، وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ وَ أُوْلَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ﴾ [الاعراف: ١٥৬, ١৫৭]
"আর আমার দয়া (রহমত) তো (আসমান-জমিনের) সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, আমি অবশ্যই তা লিখে দেবো এমন লোকদের জন্যে, যারা আল্লাহ তা'আলা তা'আলাকে ভয় (তাকওয়া অবলম্বন করে) করে, যারা যাকাত আদায় করে, যারা আমার আয়াত সমূহের ওপর ঈমান আনে। যারা এ বার্তাবাহক উম্মী (নিরক্ষর) রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার উল্লেখ তাদের তাওরাত ও ইঞ্জিলেও তারা দেখতে পায়। যে নবী তাদের ভালো কাজের আদেশ দেন, মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন, যিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করে ও অপবিত্র বস্তুগুলো তাদের ওপর হারাম ঘোষণা করেন, তাদের ঘাড়ে যে বোঝা ছিল তা তিনি নামিয়ে দেন এবং যে সব বন্ধন তাদের গলার ওপর ছিল তা তিনি খুলে ফেলেন। অতএব, যারা তার ওপর ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য সহযোগিতা করে আর তার ওপর অবতীর্ণ আলোর (কুরআন) অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম"। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬-১৫৭]
এ প্রসঙ্গে তাদের আরো বহু গুণাবলী রয়েছে, যা বর্ণনা করতে গেলে অধ্যায়টি অনেক দীর্ঘ হবে।
অনুরূপভাবে দলসমূহের মধ্যেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যপন্থী দল:
দলসমূহের মধ্যেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্য পন্থী দল:
• মুমিনগণ আল্লাহর নাম সিফাত ও আয়াতসমূহের বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা আহলে তা'তিল তথা নির্গুণবাদী, যারা যারা আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহকে অর্থহীন করে, আর স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নিজের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তারা তাকে অকার্যকর বলে আখ্যায়িত করে। ²³ এমনকি তারা একগুলোকে অস্তিত্বহীন ও মৃতের সাথে তুলনা করে। মুমিনগণ তাদের (এই আহলে তা'তীল) ও আহলে তামসীল²⁴ তথা স্বাদৃশ্যবাদীদের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে। এ আহলে তামসীল অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা'আলা জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ও তাকে মাখলুকের সাথে তুলনা করে। (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার উদাহরণ বর্ণনা করে এবং আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আল্লাহ তা'আলাকে সাদৃশ্য স্থাপন করে। ²⁵) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলী তেমনি যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তার গুণাগুণ করেছেন; কোনো প্রকার তাহরীফ (বিকৃতি), অস্বীকার, তাকয়ীফ²⁶ (ধরণ) বর্ণনা করা ও উদাহরণ উপস্থাপন করা ছাড়া।
• অনুরূপভাবে মুমিনগণ 'আল্লাহর সৃষ্টি ও আদেশ' অধ্যায়েও মধ্যপন্থী। তারা আল্লাহ তা'আলার কুদরতকে অস্বীকারকারী ক্বাদারিয়‍্যা; যারা আল্লাহ তা'আলার পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা, তার সার্বজনীন ইচ্ছা এবং তিনি যে সব কিছুর স্রষ্টা তার ওপর ঈমান রাখে না, অথচ তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা। মুমিনগণ সে কাদারিয়‍্যা সম্প্রদায় ও জাবরিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে, কারণ এ জাবরিয়‍্যা সম্প্রদায় বলে, বান্দার কোনো কিছু করার ইচ্ছাশক্তি নেই, ক্ষমতা নেই, কোনো কর্ম নেই। তাই তারা, আল্লাহ তা'আলার আদেশ, নিষেধ, সওয়াব ও শাস্তির সকল বিধান বাতিল ও অকার্যকর মনে করে। ফলে তারা ঐসব মুশরিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা'আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ لَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشْرَكْنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَىْءٍۢ ۚ ﴾ [الانعام: ١٤٨]
"যারা শির্ক করে তারা বলে, আল্লাহ তা'আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না"। [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৪৮]
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি বান্দাদের হিদায়াত দেওয়ার করার ক্ষমতা রাখেন এবং তাদের হৃদয় পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি আল্লাহ যা চান তা হয়, আর যা তিনি চান না, তা হয় না। তার রাজত্বে এমন কিছু সংঘটিত হয় না যার ইচ্ছা তিনি করেন নি। তার ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি অপারগ বা অক্ষম নন। তিনি বস্তুনিচয়, গুণাগুণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা।
আর তারা এ কথাও বিশ্বাস করে যে, বান্দার ক্ষমতা, ইচ্ছা ও কর্ম রয়েছে। সে ইচ্ছে মাফিক কাজ করতে পারে। তারা তাদেরকে বাধ্য বলে বিশ্বাস করে না। কারণ, বাধ্য বলা হয়, যাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে তার কর্মে স্বাধীন বানিয়েছেন। সুতরাং সে স্বাধীন, ইচ্ছাকারী। আল্লাহ তা'আলা যেমনি তার স্রষ্টা, তেমনি তার এখতিয়ার-স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিরও স্রষ্টা। এ ক্ষমতায় আল্লাহর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং মহান আল্লাহ তা'আলা এমন এক মহান সত্ত্বা, যার সত্ত্বা, গুণাবলী ও কার্যাবলীতে তার কোনো তুলনা নেই।
• অনুরূপভাবে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত নাম-ধাম প্রদান করা (মুমিন-কাফির বলা), বিধি-বিধান, ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) ও ধমকী (হুমকি)র বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা চরমপন্থী তথা খারেজী, যারা মুসলিমদের মধ্যে কবীরাগুনাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকে আজীবন জাহান্নামী মনে করে, তাদের ঈমান থেকে সম্পূর্ণ খারিজ-বহিস্কার মনে করে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশকে অস্বীকার করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তথা মুমিনগণ সে খারেজী সম্প্রদায় ও মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও মাঝামাঝি অবস্থানে। এ মুরজিয়া সম্প্রদায় বলে থাকে, পাপীদের ঈমান আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের ঈমানের সমতুল্য। নেক আমল দীন ও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা আল্লাহ তা'আলার শাস্তিমূলক সতর্কবাণী ও শাস্তি প্রদানকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বিশ্বাস করে যে, পাপিষ্ঠ মুসলিমের মূল ঈমান সহ আংশিক ঈমান বিদ্যমান থাকে। তারা পূর্ণাঙ্গ মুমিন নন। তাদের সাথে এমন পরিপূর্ণ ঈমান নেই যদ্বারা তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত হবে। তবে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং যার হৃদয়ে শস্যদানা ও সরিষার দানা সমতুল্য ঈমান আছে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্যে সাফা'আত সংরক্ষণ করেছেন।
• অনুরূপভাবে মুমিনগণ, রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণের বিষয়ে সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারী দলেরও মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছেন। কারণ সীমা লঙ্ঘনকারীরা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমার ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা এ আক্বীদা পোষণ করে যে, উক্ত দু'জন ব্যতীত আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-ই একমাত্র নিষ্পাপ ইমাম। তারা বলে থাকে যে, সাহাবীগণ যুলুম-অত্যাচার ও পাপ কর্ম করেছেন। তারা পরবর্তী মুসলিম উম্মাহকে কাফির বলে থাকে। কখনো কখনো তারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে নবী ও ইলাহ বানিয়েছেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতগণ সেই গালিয়া তথা শিয়া-রাফেযী সম্প্রদায় ও জাফিয়া তথা অসম্মানকারী সম্প্রদায়ের মাঝামাঝি অবস্থানে। জাফিয়া-অত্যাচারী দল, তারাই যারা এ আক্বীদা রাখে যে আলী ও উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা উভয়-ই কাফির। তারা তাদেরকে ও তাদেরকে যারা ক্ষমতাসীন করেছেন তাদের রক্ত হালাল মনে করে। তাদেরকে গালি দেওয়া বৈধ মনে করে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর খেলাফত ও ইমামত বিষয়ে অপবাদ দেয়, দুর্নাম ও গালি-গালাজ করে।
• অনুরূপভাবে মুমিনগণ 'সুন্নত অধ্যায়' এর সকল বিষয়ে মধ্যপন্থী। কারণ, তারা আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসকে যথাযথ আঁকড়ে ধারণকারী। আর তারা পূর্ববর্তী-অগ্রগামী মুহাজির, আনসার ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাদের অনুসরণকারীগণ যে আদর্শের ওপর ছিলেন তারই ধারণকারী।

টিকাঃ
¹⁶ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُوْنِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَها وَاحِدًا لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [التوبة: ৩১] “তারা আল্লাহ তা'আলাকে ছেড়ে নিজেদের আলিম ও ধর্ম যাজকদেরকে এবং মরিয়মের পুত্র মাসীহকে রব বানিয়ে নিয়েছে অথচ তাদের প্রতি এ আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করবে যিনি ব্যতীত ইলাহ হওয়ার যোগ্য কেউ নেই। তিনি তাদের অংশীদার স্থির করা হতে পবিত্র"। ¹⁶
¹⁷ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا إِلَّا بِحَبْلٍ مِّنَ اللَّهِ وَحَبْلٍ مِّنَ النَّاسِ وَبَاءُو بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الْمَسْكَنَةُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ۚ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَوا وَّكَانُوا يَعْتَدُونَ ﴾ [آل عمران: ১১২] “তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের ওপর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে লাঞ্ছনা, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রতিশ্রুতি এবং মানুষের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি থাকলে আলাদা কথা। আর তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে গযব নিয়ে ফিরে এসেছে। আর তাদের উপর দারিদ্র্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা এ কারণে যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত এবং নবীদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তা এ জন্য যে, তারা নাফরমানী করেছে, আর তারা সীমালঙ্ঘন করত"। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১২]
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِنَايَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٌّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِينَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ ﴾ [آل عمران: ২১] আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করে এবং অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে, আর মানুষের মধ্য থেকে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয় তাদেরকে হত্যা করে, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও"। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২১]
¹⁸ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ﴾ [البقرة: ٨٧] "আর আমরা নিশ্চয় মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে একের পর এক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং মারইয়াম পুত্র ঈসাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ। আর তাকে শক্তিশালী করেছি 'পবিত্র আত্মা'র মাধ্যমে। তবে কি তোমাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এমন কিছু নিয়ে এসেছে, যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখন তোমরা অহঙ্কার করেছ, অতঃপর (নবীদের) একদলকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ আর একদলকে হত্যা করেছ। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮৭]
¹⁹ 'আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস একাংশ। ইমাম তিরমিযী তাফসীর অধ্যায়ে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ ، وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ، وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ উপাস্য সাব্যস্ত করেননি, তারা যখন কোন কিছুকে হালাল বলত, তারাও তাকে হালাল মনে করত। আর যখন কোন কিছুকে হারাম বলত, তারা তাকেও হারাম মনে করত"। ইমাম তিরমিযী বলেন হাদীসটি গারীব। আলবানী হাদীসটি হাসান বলেছেন। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেন।
²⁰ আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءٌ سَنَكْتُبُ مَا قَالُواً وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ ﴾ [ال عمران: ۱۸۱] কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, 'নিশ্চয় আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী'। অচিরেই আমি লিখে রাখব তারা যা বলেছে এবং নবীদেরকে তাদের অন্যায়ভাবে হত্যার বিষয়টিও এবং আমি বলব, 'তোমরা উত্তপ্ত আযাব আস্বাদন কর”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮১]
²¹ আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ ]مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقْ كَيْفَ يَشَاءُ﴾ [المائدة: ٦٤ "আর ইয়াহুদীরা বলে, 'আল্লাহর হাত বাঁধা'। তাদের হাতই বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং তারা যা বলেছে, তার জন্য তারা লা'নতগ্রস্ত হয়েছে। বরং তার দু'হাত প্রসারিত। যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন"। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত নং ৬৪]
²² ইবন কাসীর রহ. বলেন, ইয়াহুদীদের বড় বড় গুনাহের কারণে তাদের জন্য যেসব পবিত্র বস্তু ইতিঃপূর্বে হালাল ছিল তা হারাম করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তাওরাতে যেসব বস্তু ইতিঃপূর্বে তাদের জন্য হালাল ছিল, তা হারাম করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لَبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ مِن قَبْلِ أَن تُنَزَّلَ التَّوْرَةُ [ال عمران: ۹৩] "সকল খাবার বনী ইসরাঈলের জন্য হালাল ছিল। তবে ইসরাঈল তার নিজের উপর যা হারাম করেছিল তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৩] তারপর আল্লাহ তাওরাতে অনেক কিছুকে তাদের ওপর হারাম করে দেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿وَعَلَى الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْ مَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ذَلِكَ جَزَيْنَهُم بِبَغْيِهِمْ ۖ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ [الانعام: ١٤٦] “আর ইয়াহুদীদের ওপর আমরা নখবিশিষ্ট সব জন্তু হারাম করেছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাদের উপরে হারাম করেছিলাম, তবে যা এগুলোর পিঠে ও ভুঁড়িতে থাকে, কিংবা যা কোনো হাড়ের সাথে লেগে থাকে, তা ছাড়া। এটি তাদেরকে প্রতিফল দিয়েছিলাম তাদের অবাধ্যতার কারণে। আর নিশ্চয় আমরা সত্যবাদী।
[সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৪৬] অর্থাৎ, আমি এসব বস্তু তাদের ওপর হারাম করেছি, কারণ, তারা তাদের অপকর্ম, হৎকারীতা, বাড়াবাড়ি ও রাসূলের বিরোধিতা করার কারণে এ ধরনের শাস্তি প্রাপ্য ছিল। এ কারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ فَبِظُلْمٍ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَٰتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ كَثِيرًا ﴾ [النساء : ١٦٠] বাড়াবাড়ি আর বহু লোককে আল্লাহ তা'আলার পথে বাধা দেওয়ার কারণে আমরা তাদের ওপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬] তাফসীরে ইবন কাসীর: ৫৮৫/১
²³ মু'আত্তিলাহ: ঐ সব লোক যারা আল্লাহর সিফাতসমূহকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর সিফাতগুলো তার সত্বার সাথে থাকার কথাকে মানে না। আল্লাহর যে সব গুণ তার স্বয়ং সম্পন্নতা ও কামালিয়াতের ওপর প্রমাণ, তারা তা আল্লাহ থেকে অস্বীকার করে। সর্বপ্রথম ইসলামে এ ভ্রান্ত আকীদা যিনি চালু করেন, তার নাম জা'আদ ইবন দিরহাম। আর তার থেকে এ বিষয়গুলো গ্রহণ করে তার ছাত্র জাহাম ইবন সাফওয়ান।
²⁴ এর অর্থ সাদৃস্য স্থাপন করা। যেমন, একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তুর সাথে তুলনা করা। উভয় বস্তুকে সমান মনে করা, কোন বস্তুকে অপর বস্তুর মতো করে তৈরি করা। সুতরাং আল্লাহর সিফাত ও গুণাবলী কখনো মাখলুকের সিফাত বা গুণাবলীর সাদৃশ্য হতে পারে না। কারণ, আল্লাহর সত্বা, সিফাত, নামসমূহ এবং কর্মে তার কোন দৃষ্টান্ত নেই, তার কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তার কোনো তুলনা নেই। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ١١] তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
সাদৃশ্য স্থাপন করা দুই প্রকার: এক- সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা করা। যেমন, খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামকে এবং উযাইর আলাইহিস সালামকে এবং মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করে। দুই- স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। যেমন, সাদৃশবাদীরা বলে, আল্লাহর আমাদের হাতের মতো হাত রয়েছে আর আমাদের কানের মতো কান রয়েছে। আর বস্তুত সব সাদৃশবাদীরাই মু'আত্তিলা বা নির্গুণবাদী।
²⁵ অনুবাদক
²⁶ তাকয়ীফ: কোনো বস্তুর নির্দিষ্ট ধরণ বর্ণনা করা বা ধরণ সাব্যস্ত করাকে তাকয়ীফ বলা হয়। কোনো বস্তুর ধরণ হলো, তার অবস্থা বা তার গুণাগুণ নির্ধারণ। আর আল্লাহর অবস্থা বা ধরণ একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই তার স্বীয় ইলমে সংরক্ষণ করেছেন। এ বিষয়গুলো তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। কোনো মাখলুকের জন্য সে সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, গুণ সব সময় সত্ত্বার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। সত্বার ধরণকেই যদি জানার সুযোগ না থাকে তাহলে তার সিফাতের ধরণ কীভাবে জানা সম্ভব হবে?। ইমাম মালেক রহ.কে ইস্তেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইস্তেওয়া ধরণ কি? উত্তরে তিনি বললেন, ইস্তেওয়া অবশ্যই প্রমাণিত ও তার অর্থ বিদিত, কিন্তু তার ধরণ অজ্ঞাত, এর ওপর বিশ্বাস ওয়াজিব এবং এর ধরণ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা বিদ'আত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00