📄 মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্ব
মুসলিম মিল্লাত অন্যান্য উম্মতের মধ্যে মধ্যপন্থী ও শ্রেষ্ঠ জাতি। কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। যেমন আল্লাহ বলেন, كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْনَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْনَ بِاللَّهِ 'তোমরাই উত্তম জাতি, মানবতার কল্যাণের জন্যই তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ কর, অসৎ কাজ থেকে বাঁধা প্রদান কর এবং আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর' (আলে-ইমরান ১১০)। কেবল এই তিনটি গুণের কারণেই যে এ সম্প্রদায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে তা নয়; বরং আরো অনেক গুণ বা বিশেষণ রয়েছে, যার দ্বারা এ জাতি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। তন্মধ্যে উক্ত তিনটি গুণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা এখানে উম্মতে মুসলিমার শ্রেষ্ঠত্বের কতিপয় দিক উল্লেখ করব।
১. আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন: এ জাতির ঈমান আম বা ব্যাপক। কারণ তারা পৃথিবীতে আল্লাহ প্রেরিত সকল নবী-রাসূল এবং পূর্ববর্তী অন্যান্য জাতির প্রতি অবতীর্ণ সমস্ত গ্রন্থের উপর ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করে। আল্লাহ বলেন, آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُوْনَ كُلُّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ 'রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও। সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহ্ প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি' (বাক্বারাহ ২৮৫)।
২. এ জাতি সৎ কাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করে: এ উম্মতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎ কাজে বাধা দেয়। আল্লাহ এ জাতিকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এজন্য একটি দল গঠন করারও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহ্বান জানাবে সৎ কাজের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম' (আলে ইমরান ১০৪)।
৩. উম্মতে মুহাম্মদী অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা মানুষের জন্য মঙ্গলকামী ও উপকারী: এ উম্মত মানুষকে এমন বিষয়ের দিকে আহ্বান জানায় যাতে তাদের উপকারিতা ও পরিত্রাণ রয়েছে। তারা এ পথে তাদের জান-মাল কুরবানী করে এজন্য যে, আল্লাহ তাদের উপর ওয়াজিব করেছেন সৃষ্টিকে নাজাতের পথ বাতলে দিতে। যেমন রাবী' ইবনু আমির পারস্য সেনাপতি রুস্তমের জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন, আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন যেন আমরা লোকদেরকে মানুষের উপাসনা থেকে আল্লাহ্ ইবাদতের দিকে, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে প্রশস্ততার দিকে এবং অত্যাচারী দ্বীন থেকে ইসলামের ইনছাফের দিকে বের করে আনি।
৪. নবীদের আহ্বানে অধিক সাড়া দানকারী: এ উম্মতের সংখ্যা অধিক হবে এ মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 'আমিই জান্নাতের ব্যাপারে প্রথম সুফারিশকারী হব। এত অধিক সংখ্যক লোক আমাকে বিশ্বাস করেছে যে, অন্য কোন নবীকেই এত অধিক সংখ্যক লোক বিশ্বাস করেনি'। অন্যত্র তিনি বলেন, 'কিয়ামতের দিন নবীদের মধ্যে অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে'।
৫. এ উম্মত গোমরাহী বা ভ্রষ্টতার উপর সমবেত হবে না: রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَجَارَ أُمَّتِي مِنْ أَنْ تَجْتَمِعَ عَلَى ضَلَالَةِ 'আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতকে গোমরাহীর উপর সমবেত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন'। তাদের মধ্যে অন্ততঃ একটি দল সঠিক দ্বীনের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। বিরোধীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না, এমতাবস্থায় কিয়ামত সংগঠিত হবে।
৬. এ উম্মতের কিতাব সমস্ত আসমানী গ্রন্থের চেয়ে শ্রেষ্ঠ: উম্মতে মুহাম্মাদীর নিকটে নাযিলকৃত ইলাহী গ্রন্থ অন্যান্য সকল আসমানী গ্রন্থ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। কুরআন একমাত্র আসমানী কিতাব যার হেফাযত এবং হ্রাস-বৃদ্ধি, পরিবর্তন-পরিবর্ধন থেকে রক্ষার দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْনَ 'আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি এবং নিজেই এর সংরক্ষক' (হিজর ১৫/৯)।
৭. এ উম্মতের নবী ও রাসূল হচ্ছেন অন্যান্য নবী-রাসূলগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ: মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এ মর্মেও কোন মতপার্থক্য নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি মানব জাতির নেতা-সরদার। তাঁর রিসালাত ব্যাপক যা সমগ্র মানব জাতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তিনি বলেন, 'আমাকে পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কাউকে দেওয়া হয়নি... প্রত্যেক নবীকে স্বীয় কওমের প্রতি পাঠানো হয়েছে। আর আমি প্রেরিত হয়েছি সমস্ত মানুষের প্রতি'।
৮. ক্বিয়ামতের দিন হাশরে এবং হিসাবের ক্ষেত্রে এ উম্মত অগ্রগামী হবে: উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি দিক হলো এ জাতি সর্বশেষ হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা সর্বাগ্রে হাশরের ময়দানে সমবেত হবে এবং তাদের হিসাব হবে সবার আগে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'আমরা সর্বশেষ জাতি, কিন্তু আমাদের হিসাব হবে সর্বাগ্রে'।
৯. এ উম্মত অধিক জান্নাতবাসী হবে: এ উম্মত অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা রাসূলের দাওয়াতে সর্বাধিক সাড়া দানকারী, এজন্য তারা জান্নাতেও অধিক সংখ্যায় প্রবেশ করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আমি আশা করছি যে, তোমরাই জান্নাতের অর্ধেক অধিবাসী হবে'।
সুতরাং মধ্যপন্থী জাতি ও উম্মত হিসাবে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর পসন্দনীয় আমল করার তাওফীক দিন-আমীন!
টিকাঃ
১০২. মুসলিম, 'ঈমান' অধ্যায়, 'ঈমান ও ইসলামের বর্ণনা' অনুচ্ছেদ; মিশকাত, মুকাদ্দামা, হা/১।
১০৩. বুখারী, 'জুম'আ' অধ্যায়, 'জুম'আর ফরয' অনুচ্ছেদ, হা/৮৭৬।
১০৪. ইবনু মাজাহ, 'যুহদ' অধ্যায়, 'উম্মতে মুহাম্মাদীর গুণাবলী' অনুচ্ছেদ, হা/৪২৮৭, হাদীছ ছহীহ।
১০৫. ইবনু মাজাহ, ঐ, হা/৪২৮৭, হাদীছ ছহীহ।
১০৬. মুসলিম, 'ঈমান' অধ্যায়, 'অন্যায় কাজে বাধাদান' অনুচ্ছেদ, হা/৪৯।
১০৭. মুসলিম শরহে নববী সহ, 'ঈমান' অধ্যায়, 'সৎকাজের নির্দেশ ওয়াজিব' অনুচ্ছেদ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২২-২৩।
১০৮. তাফসীরে তাবারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১০২।
১০৯. তাফসীরে তাবারী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১০৫।
১১০. তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক ৩/৫২০; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৪০।
১১১. তাফসীর তাবারী ৭/১০৩।
১১২. মুসলিম, 'ঈমান' অধ্যায় হা/১৯৬।
১১৩. মুসলিম, 'ঈমান' অধ্যায় হা/১৯৬।
১১৪. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৫৫০০।
১১৫. বুখারী, 'চিকিৎসা' অধ্যায় হা/৫৭০৫।
১১৬. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৩৩১, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩১৯-২০, হাদীছ হাসান।
১১৭. বুখারী, 'সুন্নাত আঁকড়ে ধরা' অধ্যায়, হা/৭৩১১; ইবনু মাজাহ মুকাদ্দামাহ, হা/১০।
১১৮. তদেব।
১১৯. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৭/৮৪ পৃঃ।
১২০. আবুল হাসান নদভী, কিতাবুন নবুওয়াত ওয়াল আম্বিয়া, পৃঃ ২১৩।
১২১. তাফসীর তাবারী ১০/৩৭৭-৭৮।
১২২. তাফসীর ইবনু কাছীর ৫/৮৫।
১২৩. মুসলিম, ‘ঈমান’ অধ্যায়, হা/১৯৪।
১২৪. মুসলিম, ‘মর্যাদা’ অধ্যায়, হা/২২৭৮।
১২৫. ইবনু মাজাহ, ‘যুহদ’ অধ্যায়, ‘শাফা‘আত’ অনুচ্ছেদ, হা/৪৩0৮, হাদীছ ছহীহ।
১২৬. ফাতহুল বারী, ৬/৪৪৪।
১২৭. বুখারী, ‘তাফসীর’ অধ্যায় وأن يونس لمن المرسلين অনুচ্ছেদ হা/৩৩৯৫।
১২৮. ফাতহুল বারী, ৬/৪৪৬।
১২৯. বুখারী 'তায়াম্মুম' অধ্যায় হা/৩৩৫; মিশকাত হা/৫৭৪৭ 'ফাযায়েল' অধ্যায়।
১৩০. মুসলিম হা/৫২৩, মিশকাত হা/৫৭৪৮।
১৩১. তাফসীর ইবনে কাছীর ২/২৮৬।
১৩২. বুখারী, 'মানাসিক' অধ্যায়, 'শেষ নবীর বর্ণনা' অনুচ্ছেদ, হা/৩৫৩৫।
১৩৩. তাফসীর ইবনে কাছীর ২/৭৮।
১৩৪. বুখারী, 'জুম'আহ' অধ্যায়, 'জুম'আ করা' অনুচ্ছেদ, হা/৮৭৬।
১৩৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৫৪।
১৩৬. ফতহুল বারী ২/৩৫৪।
১৩৭. মুসলিম, 'জুম'আ' অধ্যায়, হা/৮৫৫।
১৩৮. মুসলিম হা/১৯৭, মিশকাত হা/৫৭৪৩।
১৩৯. বুখারী, 'রিক্বাক্ব' অধ্যায়, 'হাশর কিভাবে হবে' অনুচ্ছেদ, হা/৬৫২৮।