📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


এক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মতাদর্শ নিয়ে দেশ, জাতি ও ইসলামের মধ্যে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে থাকে। তাদের মতাদর্শ হচ্ছে-

১. হুকুমদাতা একমাত্র আল্লাহ, মানুষের হুকুম দানের অধিকার নেই। দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ 'আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম নেই' (ইউসুফ ১২/৪০, ৬৭)। এ আয়াতের অর্থ না বোঝার কারণে ছিফফীনের যুদ্ধে শালিস নিযুক্ত করার কারণে খারেজীরা আলী, মু'আবিয়া সহ সকল ছাহাবীকে কাফের আখ্যায়িত করে এবং আলী (রাঃ) তাদের হাতে নিহত হন। অথচ এ আয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো, বিধানদাতা আল্লাহ তা'আলা এবং চূড়ান্ত ফায়ছালাকারীও তিনি। তাঁর সৃষ্টি হিসাবে মানুষ তাঁরই বিধান মেনে চলবে। এক্ষেত্রে কেউ প্রজাদের উপর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করতে পারবে শরী'আতের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে। রাসূলের বাণী অনুযায়ী এই প্রতিনিধি ভাল বা খারাপ হ'তে পারে।

২. আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের। প্রমাণ হচ্ছে আল্লাহর বাণী, وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ‘আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফের' (মায়েদাহ ৫/৪৪)। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শাসক কোন অন্যায় করলে বা তা প্রতিরোধ না করলে এবং আল্লাহ্র বিধান প্রতিষ্ঠা না করলে উক্ত আয়াতের আলোকে তারা ঐ শাসকগোষ্ঠীকে কাফের বলে গণ্য করে এবং তাদের হত্যা করা বৈধ মনে করে। অথচ পরবর্তী দু'টি আয়াতে একই ব্যাপারে দু'ধরনের বক্তব্য এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُوْনَ 'আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা যালেম' (মায়েদাহ ৫/৪৫)। তিনি আরো বলেন, وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُوْনَ. 'বিধান অনুযায়ী যারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারা ফাসেক' (মায়েদাহ ৫/৪৭)। এসব ক্ষেত্রে তারা লক্ষ্য রাখে না যে, আয়াতে বর্ণিত একই হুকুমের জন্য কাফের, যালেম ও ফাসেক কখন হবে কিংবা কার জন্য কোন হুকুম প্রযোজ্য?

প্রথম আয়াতটি (মায়েদাহ ৫/৪৪) ইউসুফ (আঃ) তাঁর কারাগারে বন্দী বন্ধুদেরকে যে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার বর্ণনা। তিনি পরে জেল হ'তে মুক্তি পেয়ে তৎকালীন মিসরের কুফরী হুকুমতের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা 'আযীযে মিছরে'র অধীনে খাদ্যবিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সূরা মায়েদাহ্র পরবর্তী আয়াতগুলি আহলে কিতাবগণকে তাওরাত ও ইঞ্জীলের বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করার জন্য বলা হয়েছে। এ আয়াতগুলি যদি সাধারণ অর্থে নেওয়া হয়, তাহ'লে প্রথম আয়াতটি 'হুকুমে তাকভীনী' বা প্রাকৃতিক বিধান অর্থে নিতে হবে, যার একচ্ছত্র মালিকানা আল্লাহ্ হাতে। এর অর্থ কখনোই রাষ্ট্রীয় বিধান নয়, যা পরিষ্কারভাবে 'হুকুমে আকুলীর' অন্তর্ভুক্ত। এটির অর্থ 'হুকমে শারঈ'ও নয়। তা যদি হ'ত তাহ'লে ইউসুফ (আঃ) নিজে নবী হয়ে এবং নিজে এই আয়াতের প্রবক্তা হয়ে তার বিরোধিতা করে কুফরী হুকুমতের অধীনে কোন দায়িত্ব পালন করতেন না। বরং হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতেন। অতঃপর সূরা মায়েদাহ্র আয়াতগুলি ইসলামী রাষ্ট্রের আদালতের বিধান হিসাবে গণ্য হবে। যেন বিচারকগণ আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়ছালা করেন। অবশ্য যদি কোন বিষয়ে কুরআন ও হাদীছের স্পষ্ট দলীল না পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারক ইজতেহাদের ভিত্তিতে রায় দিতে পারবেন।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূরা মায়েদাহ ৪৪ আয়াতের فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُوْনَ এর ব্যাখ্যায় বলেন, ليس بالكفر الذى يذهبون اليه 'এর অর্থ কুফরী নয়, যেদিকে লোকেরা গিয়েছে'। ত্বাউস বলেন, ليس بكفر ينقل عن الملة 'এর অর্থ ঐ কুফরী নয় যা তাকে ইসলামী মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়'। আত্বা বলেন, এটি কুফরীর পরেই সবচেয়ে বড় পাপ' (তাফসীর ইবনু কাছীর)। এক্ষণে আয়াতগুলির মর্ম হ'ল এই যে, যদি কোন মুসলিম বিচারক আল্লাহকৃত কোন হারামকে হারাম বলে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বাস্তবে উক্ত হারাম কর্ম সম্পাদন করেন, তাহ'লে তিনি ফাসেক ও পাপিষ্ঠ মুসলিম হিসাবে গণ্য হবেন। তার বিষয়টি আল্লাহ্র উপরে ছেড়ে দেওয়া হবে। চাইলে তিনি তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন। কেননা কবীরা গুনাহগার মুসলিম 'কাফের' হয় না। তবে খারেজীদের মতে ঐ ব্যক্তি কাফের (কুরতুবী)। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং তার রক্ত হালাল।

উপরোক্ত আয়াতগুলির বাহ্যিক অর্থের ভিত্তিতে একশ্রেণীর লোক দেশে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, মনে করে যে তারা জিহাদ করছে। তাদের ধারণা অনুযায়ী তারা মরলে গাযী ও বাঁচলে শহীদ। তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যে ছালাত আদায় করে সে যেমন কাফের নয়, তেমনি তাকে হত্যা করাও বৈধ নয়। এমর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ صَلَّي صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا وَأَكَلَ ذَيْحَتَنَا فَذَلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِي لَهُ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ রَسُولِهِ، فَلَا تَحْقِرُوا اللَّهَ فِي ذِمَّتِهِ - 'যে ব্যক্তি আমাদের মত ছালাত আদায় করে, আমাদের ক্বিবলার দিকে মুখ করে, আমাদের যবহকৃত প্রাণী ভক্ষণ করে সে মুমিন। তার ব্যাপারে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের যিম্মা রয়েছে। সুতরাং যিম্মা পালনের ক্ষেত্রে তোমরা আল্লাহকে তুচ্ছ জ্ঞান কর না'। তেমনি ছালাত আদায়কারী কোন মুসলমানকে হত্যা করা ইসলাম বহির্ভূত। এ সম্পর্কে মহানবী (ছাঃ) আরো বলেন, أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللَّهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوْا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ 'আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহ্র রাসূল। আর যদি না তারা ছালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়। কিন্তু যদি তারা এসব পালন করে তাহলে আমাদের নিকট থেকে তার জান-মাল নিরাপদে থাকবে। তবে ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব হবে আল্লাহ্র নিকটে'।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হচ্ছে প্রত্যেকে নিজের সমর্থিত দলকে সঠিক মনে করে থাকে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْনَ 'প্রত্যেকে নিজেদের নিকট যা আছে তা নিয়েই গর্বিত' (মুমিনূন ২৩/৫৩)। এমনকি সমর্থিত দলের প্রতি মানুষ অনেক ক্ষেত্রে এতই গোঁড়া সমর্থক হয়ে পড়ে যে, দলের কোন ভুলও তার কাছে সঠিক মনে হয়। দলের যে কোন সিদ্ধান্তই তার কাছে চূড়ান্ত বলে গৃহীত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা কুরআন-হাদীছের নির্দেশকেও উপেক্ষা করে। এসবই বাড়াবাড়ি। এগুলি পরিহার করে এক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে।

টিকাঃ
৬০. প্রফেসর ড. ইউসুফ আল-কারযাভী, আধুনিক যুগ: ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচি (ঢাকা: ২০০৩), পৃ. ১২৩।
৬১. মিশকাত, হা/৩৬৬১-৬৪ ও হা/৩৬৯৪, 'ইমারত' অধ্যায়।
৬২. বুখারী, হা/৭০৫২; মুসলিম, হা/৪৭৫২; মিশকাত, হা/৩৬৭১, 'নেতৃত্ব ও পদমর্যাদা' অধ্যায়।
৬৩. বুখারী হা/৭৩৫২।
৬৪. হাকেম ২/৩১৩ পৃঃ হাদীছ ছহীহ।
৬৫. বুখারী, মিশকাত, হা/১৩ 'ঈমান' অধ্যায়।
৬৬. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ; মিশকাত, হা/১২, 'ঈমান' অধ্যায়।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 সামাজিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা

📄 সামাজিক ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা


সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সেখানে পেশী শক্তির প্রাবল্য বিদ্যমান। পূর্ববর্তী সম্প্রদায়গুলো একদিকে মানবাধিকারের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করেনি; ন্যায়-অন্যায়ের তো বালাই ছিল না। নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাউকে যেতে দেখলে তাকে নিপীড়ন ও হত্যা করে তার সর্বস্ব লুটে নেয়াকেই বড় কৃতিত্ব মনে করা হ'ত। জনৈক ব্যক্তির চারণভূমিতে অন্যের উট প্রবেশ করে কিছু ক্ষতি সাধন করায় গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ বেধে যায়, যা চলে শতাব্দীকালব্যাপী। এতে নিহত হয় অসংখ্য বনু আদম। নারীদের মৌলিক অধিকার প্রদান তো দূরের কথা, তাদের জীবিত থাকার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হতো না। কোথাও প্রচলিত ছিল শৈশবেই তাদের জীবন্ত সমাহিত করার প্রথা। অপরদিকে এরূপ নির্বোধ দয়ার্দ্রতারও প্রচলন ছিল যে, পোকা-মাকড় হত্যা করাকেও অবৈধ জ্ঞান করা হতো। জীব হত্যাকে তো দস্তুর মত মহাপাপ বলে সাব্যস্ত করা হতো। আল্লাহর হালালকৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণকে অন্যায় মনে করা হতো। বর্তমান বিশ্বেও কোন কোন জাতির মধ্যে এসব প্রচলন দেখা যায়।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহ ও তাদের শরী'আতে এসব বাড়াবাড়ির অবসান ঘটানো হয়েছে। তারা মানুষের সামনে মানবাধিকারকে তুলে ধরেছে। কেবল শান্তি ও সন্ধির সময় ই নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রে, জিহাদের ময়দানেও প্রাণবিনাশী শত্রুর অধিকার সংরক্ষণে সচেতনতা শিক্ষা দিয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক কাজের জন্য নির্ধারিত সীমা লংঘন করাকে অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ ও নিজ অধিকারের ব্যাপারে ক্ষমা, মার্জনা ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং অপরের অধিকার প্রদানে যত্নবান হওয়ার নীতি শিক্ষা দিয়েছে।

সুতরাং মুমিনের সকল কাজ হবে মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। এতে যেমন কোন বাড়াবাড়ি থাকবে না, তেমনি থাকবে না সীমালংঘনও। কেননা মানব জীবনে চরমপন্থা যেমন দূষণীয় তেমনি সীমালংঘনও বর্জনীয়। মুমিনের সকল কাজ নম্রতা, ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার মাধ্যমে সম্পন্ন হ'তে হবে, যার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণ। যাতে মানবতার জন্য কোন অমঙ্গল ও অকল্যাণ থাকবে না। যার মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ হবে সমুন্নত, যে আদর্শ দেখে অমুসলিমরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর এটাই মুমিনের একমাত্র ব্রত হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদেরকে সকল কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বনের তাওফীক দান করুন- আমীন!

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 ইসলামে নিজের উপর বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ

📄 ইসলামে নিজের উপর বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ


নিজের উপরে কঠোরতা আরোপের মাধ্যমে দ্বীনে বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন শরী'আত সম্মত নয়। আহনাফ ইবনে কায়েস আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَلَكَ الْمُتَنَطِّعُونَ، قَالَهَا ثَلَاثًا 'সীমালংঘনকারীরা ধ্বংস হোক। এটা তিনি তিনবার বলেন'। তিনি বলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ خُذُوا مِنَ الْأَعْمَالِ مَا تُطিيقُوْনَ، فَإِنَّ اللهَ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوْا، وَإِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ مَا دَامَ وَإِنْ قَلْ 'হে মানব সকল! তোমরা তোমাদের সাধ্যমত আমল কর। আর আল্লাহ প্রতিদান বন্ধ করবেন না, যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হও। আল্লাহ্র নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে স্থায়ী আমল, যদিও তা পরিমাণে কম হয়'।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আমাদের মাঝে খুৎবা দিচ্ছিলেন। সেখানে এক লোক দণ্ডায়মান ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, সে হচ্ছে আবু ইসরাঈল। সে মানত করেছে যে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে বসবে না, ছায়া গ্রহণ করবে না, কথা বলবে না এবং ছিয়াম পালন করবে। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তাকে বল, কথা বলতে, ছায়া গ্রহণ করতে, বসতে এবং ছিয়াম পূর্ণ করতে'।

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার নিকট আসলেন, এমতাবস্থায় তার নিকট এক মহিলা উপবিষ্ট ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কে? আয়েশা (রাঃ) বললেন, এ অমুক মহিলা, যিনি অতি ছালাতগুযার (তিনি একজন বড় মুছল্লী, যিনি দিন-রাত নফল ছালাত আদায় করেন, এমনকি রাতেও ঘুমান না)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, থাম, (এ মহিলা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য নয়)। তোমাদের পক্ষে (ফরয ব্যতীত) ঐ পরিমাণ (নফল) ইবাদত করা উচিত, যতটুকু তোমাদের সাধ্যে কুলায়। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ পরিশ্রান্ত হবেন না (অর্থাৎ ইবাদত করতে করতে মানুষ বৃদ্ধ হয়ে যায়, ক্লান্ত হয়ে যায়, পরিশ্রান্ত হয়ে যায়। আর তখন সে নিজেই অপারগ হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ ছওয়াব প্রদানে অপারগ হন না। তিনি অসীম ছওয়াব প্রদানকারী)। দ্বীনি কর্মকাণ্ডে আল্লাহ্র নিকট প্রিয় ও পসন্দনীয় (নফল) ইবাদত হচ্ছে ঐ ইবাদত, যা ইবাদতকারী অব্যাহত রাখতে পারে'।

আল্লাহ যেসব জিনিস হালাল করেছেন, তা মানুষ নিজের জন্য হারাম করতে পারে না। এটা তার জন্য সমীচীন নয়, বৈধও নয়। আল্লাহ বলেন, قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِيْنَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآয়َاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُوْনَ 'বলুন, আল্লাহ্র সাজ-সজ্জাকে যা তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তু সমূহকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুন, এসব নে'আমত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য এবং ক্বিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্য। এমনিভাবে আমি আয়াত সমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্য, যারা অনুধাবন করে' (আ'রাফ ৭/৩২)।

ছাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সান্নিধ্যে থাকলে তাদের অবস্থা এক রকম থাকতো, আবার পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির সংস্পর্শে গেলে অবস্থা ভিন্ন হ'ত। এ পরিস্থিতির কথা ছাহাবাগণ রাসূলের নিকট পেশ করলে তাদের প্রতি সহজকরণে ও জটিলতা দূরীকরণে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন। হানযালা আল-উসয়্যেদী হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা আবু বকর (রাঃ) আমার সাথে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করল, হে হানযালা! তুমি কেমন আছ? তিনি বলেন, আমি বললাম, হানযালা মুনাফিকী করছে। আবু বকর বললেন, সুবহানাল্লাহ, তুমি কি বল? তিনি বলেন, আমি বললাম, আমরা যখন রাসূলের নিকটে থাকি, তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন (উপদেশ দেন), যেন আমরা চাক্ষুস দেখছি। অতঃপর আমরা যখন রাসূলের নিকট থেকে বেরিয়ে আসি, আমরা আমাদের স্ত্রী-পরিজন, সন্তান-সন্ততির সাথে মিলিত হই, অর্থ-সম্পদের সাথে জড়িয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছু ভুলে যাই। আবু বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমিও এরূপ অবস্থার সম্মুখীন হই। তখন আমি ও আবু বকর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে (মুনাফিকী করছে)। রাসূল (ছাঃ) বললেন, সেটা কি? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি তখন আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, এমনিভাবে যেন আমরা সরাসরি/চাক্ষুস দেখছি। কিন্তু আপনার নিকট থেকে বের হয়ে যখন আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততির সাথে মিলিত হই, সম্পদের সাথে জড়িয়ে পড়ি, তখন অনেক কিছু বিস্মৃত হই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যার হাতে আমার জীবন সে সত্তার কসম! আমার নিকট থাকতে তোমরা যে অবস্থায় থাক, অনুরূপ যদি সর্বদা স্থায়ীভাবে থাকতে এবং স্মরণে রাখতে, তাহ'লে ফেরেশতারা তোমাদের শয্যায় (বিছানায়) ও তোমাদের পথে এসে তোমাদের সাথে মুছাফাহা (করমর্দন) করত। কিন্তু হে হানযালা! মাঝে মাঝে বা কখনো কখনো (এরূপ হবে) এটা তিনি তিনবার বললেন'।

টিকাঃ
৬৭. মুসলিম হা/২৬৭০।
৬৮. বুখারী, হা/২২০, ৫৪১৩।
৬৯. বুখারী হা/৬২১০।
৭০. বুখারী হা/৪৩, মুসলিম হা/৭৮৫; নাসাঈ হা/১৬২৪; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪২, পৃ. ৭৫।
৭১. মুসলিম, হা/২৭৫০।

📘 মধ্যমপন্থা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা 📄 ইসলাম মধ্যপন্থী ধর্ম

📄 ইসলাম মধ্যপন্থী ধর্ম


ইসলাম একটি মধ্যপন্থী ধর্ম। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, 'অনুরূপভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থী জাতি করেছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও। আর রাসূল তোমাদের উপর সাক্ষী হন' (বাক্বারাহ ২/১৪৩)। সুতরাং ইসলাম এমন একটি মধ্যপন্থী ধর্ম যাতে বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের কোন স্থান নেই। ইহুদীরা তাদের নবীদেরকে হত্যা করেছিল। নাছারারা তাদের নবীকে উপাস্য বানিয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَأَرْسَلْنَا إِلَيْهِمْ رُسُلاً كُلَّمَا جَاءَهُمْ رَسُوْلٌ بِمَا لاَ تَهْوَى أَنْفُسُهُمْ فَرِيقًا كَذَّبُوا وَفَرِيقًا يَقْتُلُوْনَ 'আমি বনী ইসরাঈলের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তাদের কাছে অনেক পয়গম্বর প্রেরণ করেছিলাম। যখনই তাদের কাছে কোন পয়গম্বর এমন নির্দেশ নিয়ে আসত যা তাদের মনে চাইত না, তখন তাদের অনেকের প্রতি তারা মিথ্যারোপ করত এবং অনেককে হত্যা করে ফেলত' (মায়েদাহ ৫/৭০)।

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللهِ وَيَقْتُلُوْনَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ حَقٌّ وَيَقْتُلُونَ الَّذِيْنَ يَأْمُرُونَ بِالْقِسْطِ مِنَ النَّاسِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ 'নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে এবং পয়গম্বরগণকে হত্যা করে অন্যায়ভাবে, আর সেসব লোককে হত্যা করে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয়, তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন' (আলে ইমরান ৩/২১)। ইহুদীরা নবীগণের প্রতি এমন কর্ম ও গুণ-বৈশিষ্ট্য আরোপ করত যা তাঁদের অনুসারী সাধারণ মুমিনদের প্রতি আরোপ করাও সমীচীন নয়, নবীগণ তো দূরের কথা। তারা সুলায়মান (আঃ)-এর প্রতি জাদুবিদ্যা চর্চা, অতঃপর কুফরী এবং মূর্তি পূজার অপবাদ আরোপ করে। আল্লাহ তাদের একথা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতঃ তাকে সর্বৈব মিথ্যা আখ্যায়িত করে বলেন, كبرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِباً 'কত কঠিন কথা তাদের মুখ থেকে বের হয়। তারা যা বলে তা তাতো সবই মিথ্যা' (কাহফ ১৮/৫)।

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কিতাবে তাদের ধারণাসমূহ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, '(ইহুদী-নাছারারা) ঐ সবের অনুসরণ করে থাকে, যা সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। (তাদের দাবী অনুযায়ী) সুলায়মান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত এবং বাবেল শহরে হারূত ও মারূত দুই ফেরেশতার উপরে যা নাযিল হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। বস্তুতঃ তারা (হারূত-মারূত) উভয়ে একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা এসেছি পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তুমি (জাদু শিখে) কাফির হয়ো না। কিন্তু তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যার দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। অথচ আল্লাহ্র আদেশ ব্যতীত তদ্বারা তারা কারো ক্ষতি করতে পারত না। লোকেরা তাদের কাছে শিখত ঐসব বস্তু যা তাদের ক্ষতি করে এবং তাদের কোন উপকার করে না। তারা ভালভাবেই জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করবে, তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্মবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানত। যদি তারা ঈমান আনত এবং আল্লাহভীরু হ'ত, তবে আল্লাহ্র কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান পেত, যদি তারা জানত' (বাক্বারাহ ২/১০২-১০৩)।

তারা তাদের পরিবর্তিত তাওরাতে কোন কোন নবীর প্রতি এমনসব বিষয় আরোপ করেছে, যা তাঁদের লজ্জাকর, অমর্যাদাকর চরিত্র প্রমাণ করে। এছাড়াও বিভিন্ন রকম বিশৃংখলা-বিপর্যয় তারা সৃষ্টি করেছিল, যা তাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছিল। যেমন তারা ধারণা করত এবং বলতো উযাইর আল্লাহ্ পুত্র (তওবা ৯/৩০)। অনুরূপভাবে নাছারাদের আক্বীদা-বিশ্বাসও ছিল পরিবর্তিত ও ভ্রান্ত। তারা ধারণা করত যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহ্ পুত্র আল্লাহ। কুরআনে এই উভয় সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত বিশ্বাস সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, 'ইহুদীরা বলে যে, উযাইর আল্লাহ্ পুত্র এবং নাছারারা বলে মাসীহ (ঈসা) আল্লাহ্ পুত্র। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। তারা তাদের পণ্ডিত ও সংসার বিরাগীদেরকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মা'বুদের ইবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র' (তওবা ৯/৩০-৩১)।

ইহুদীদের যুলুম ও সীমালংঘনের কারণে তারা আল্লাহ্ শাস্তিতে নিপতিত হয়েছিল। তাদের প্রতি কঠোর বিধান আরোপিত হয়েছিল তাদের নিজেদের উপর কঠোরতা করার কারণে। যেমন বানী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি নিহত হ'লে হত্যাকারী কে তা নিরূপণ করা যাচ্ছিল না। ফলে তাদের মাঝে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়। প্রত্যেকেই সন্দেহ থেকে নিজেকে মুক্ত দাবী করে এবং অন্যের প্রতি সংশয়ের দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সমস্যা মূসা (আঃ)-এর নিকট গেলে তিনি তাদেরকে একটি গাভী যবেহ করে তার একটা অংশ দ্বারা মৃতের গায়ে আঘাত করতে বললেন। যাতে আল্লাহ হত্যাকারীকে চিনিয়ে দিবেন। এমতাবস্থায় তাদের জন্য যরূরী ছিল নবীর নির্দেশ প্রতিপালনে যে কোন একটি গাভী যবেহ করা। কিন্তু তারা বাড়াবাড়ি করল, নবীর নির্দেশকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ শুরু করল। তারা গাভীর গুণাগুণ সম্পর্কে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে লাগল। এতে তারা যত কঠোরতা করেছিল, আল্লাহও তাদের প্রতি কঠিন বিধান আরোপ করলেন। অবশেষে তাদের প্রশ্নের আলোকে বর্ণিত গুণ বিশিষ্ট গাভী যবেহের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনা কুরআনে এভাবে বিবৃত হয়েছে, 'যখন মূসা স্বীয় কওমকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে একটা গাভী যবেহ করতে বলেছেন। তারা বলল, আপনি কি আমাদের সাথে উপহাস করছেন? তিনি বললেন, জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহ্ আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তারা বলল, তাহলে আপনি আপনার পালনকর্তার নিকটে আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন, যেন তিনি বলে দেন, গাভীটি কেমন হবে? তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন গাভীটি এমন হবে, যা না বুড়ী না বকনা বরং দু'য়ের মাঝামাঝি বয়সের হবে। এখন তোমাদের যা আদেশ করা হয়েছে, তা সেরে ফেল। তারা বলল, আপনার প্রভুর নিকটে আমাদের পক্ষ থেকে প্রার্থনা করুন যে, গাভীটির রং কেমন হবে। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, গাভীটি হবে চকচকে গাঢ় পীত বর্ণের, যা দর্শকদের চক্ষু শীতল করবে। লোকেরা আবার বলল, আপনি আপনার প্রভুর নিকটে আমাদের পক্ষে প্রার্থনা করুন, যাতে তিনি বলে দেন যে, গাভীটি কিরূপ হবে। কেননা একই রংয়ের সাদৃশ্যপূর্ণ গাভী অনেক রয়েছে। আল্লাহ চাহে তো এবার আমরা অবশ্যই সঠিক দিশা পেয়ে যাব। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, সে গাভীটি এমন হবে, যে কখনো ভূমি কর্ষণ বা পানি সেচনের শ্রমে অভ্যস্ত নয়, সুঠামদেহী ও খুঁৎহীন। তারা বলল, এতক্ষণে আপনি সঠিক তথ্য এনেছেন। অতঃপর তারা সেটা যবেহ করল। অথচ তারা (মনের থেকে) যবেহ করতে চাচ্ছিল না। অতঃপর আমি বললাম, যবেহকৃত গরুর গোশতের একটি টুকরা দিয়ে মৃত ব্যক্তির লাশের গায়ে আঘাত কর। এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন সমূহ প্রদর্শন করেন। যাতে তোমরা চিন্তা কর। অতঃপর তোমাদের হৃদয় শক্ত হয়ে গেল। যেন তা পাথর, এমনকি তার চেয়েও শক্ত। পাথরের মধ্যে এমন আছে, যা থেকে ঝরণা প্রবাহিত হয়, এমনও আছে যা বিদীর্ণ হয়, অতঃপর তা থেকে পানি নির্গত হয় এবং এমনও আছে যা আল্লাহর ভয়ে খসে পড়তে থাকে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন' (বাক্বারাহ ২/৬৭-৭৪)।

ইহুদীরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ প্রতিপালন না করে যুলুম করেছে, ন্যায়পরায়ণতার সীমাঅতিক্রম করেছে। এমনকি আল্লাহ ও রাসূলের অবাধ্যতা করেছে। যে কারণে শাস্তি স্বরূপ অনেক পবিত্র জিনিস তাদের জন্য হারাম ছিল, তাদের নিজেদের কঠোরতার কারণে তাদের উপর অনেক কঠিন শারঈ বিধান আরোপিত হয়েছিল। যেমন গোনাহ থেকে তওবার জন্য আত্মহত্যা, কাপড়ে লেগে যাওয়া নাজাসাত (অপবিত্রতা) থেকে পবিত্রতা লাভের জন্য ঐ অপবিত্র স্থান কেটে ফেলা। জীব-জন্তুর চর্বি, নখর বিশিষ্ট প্রত্যেক প্রাণী এবং গণীমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) তাদের জন্য হারাম ছিল। ইবাদতে কছর করা নির্দিষ্ট স্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।

فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيراً، وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا 'বস্তুতঃ ইহুদীদের জন্য আমি হারাম করে দিয়েছি বহু পুত-পবিত্র বস্তু যা তাদের জন্য হালাল ছিল, তাদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দানের দরুন। আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায়ভাবে। বস্তুতঃ আমি কাফেরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক আযাব' (নিসা ৪/১৬০-৬১)।

পক্ষান্তরে মুসলমানরা তাদের নবী মুহম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। যে সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি যে অহী নাযিল হয়, তা ব্যতীত দ্বীনের ব্যাপারে তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা বলেন না। আর তাঁর পুংখানুপুংখ অনুসরণ ও তাঁর প্রতি সহমর্মী হ'তে উম্মতে মুসলিমা আদিষ্ট। আল্লাহ আরো বলেন, وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُوْلٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ 'আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ তো নয়। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন' (আলে ইমরান ৩/১৪৪)। আল্লাহ বলেন, وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى، إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوْحَى 'তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কোন কথা বলেন না। নিশ্চয়ই এটা (কুরআন) অহী ব্যতীত নয় যা প্রত্যাদেশ করা হয়' (নাজম ৫৩/৩-৪)।

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعاً الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْনَ 'বলুন, হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ্র রাসূল। সমগ্র আসমান ও যমীনে তাঁর রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহ্র উপর, তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ্ উপর এবং তাঁর সমস্ত কালামের উপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হ'তে পারে' (আ'রাফ ৭/১৫৮)। তিনি আরো বলেন, বলুন, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। বস্তুতঃ যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফিরদেরকে ভালোবাসেন না' (আলে ইমরান ৩/৩২)। তিনি অন্যত্র বলেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْলِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا 'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে' (আহযাব ৩৩/২১)।

মুসলমানদেরকে রাসূলের সাথে কথা-বার্তা ও তাঁকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْতِ النَّবিيِّ وَلَا تَجْهَرُوْর لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ 'হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচু স্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচু স্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না' (হুজুরাত ৪৯/২)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মানুষ ছিলেন। তিনি মানবীয় ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। যেমন অন্ধ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতুম দ্বীন শিক্ষার জন্য রাসূলের দরবারে এসে প্রশ্ন করেন। কিন্তু তখন তাঁর সামনে কুরাইশের সম্ভ্রান্ত লোকেরা উপবিষ্ট ছিল। যাদের ইসলাম কবুলের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী ছিলেন। তাই আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মে মাকতূমের প্রশ্নের উত্তর দেননি। এজন্য আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ভর্ৎসনা করেন। তিনি বলেন, 'তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো। অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশে তার উপকার হতো। পরন্তু যে বেপরোয়া, আপনি তার চিন্তায় মশগুল। সে শুদ্ধ না হ'লে আপনার কোন দোষ নেই। যে আপনার কাছে দৌড়ে আসলো, এমতাবস্থায় যে, সে ভয় করে, আপনি তাকে অবজ্ঞা করলেন। কখনও এরূপ করবেন না, এটা উপদেশ বাণী। অতএব যে ইচ্ছা করবে, সে একে গ্রহণ করবে' (আবাসা ৮০/১-১২)।

অনুরূপভাবে বদর যুদ্ধে বন্দীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করে তাদের ছেড়ে দিলে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, مَا كَانَ لِنَبِيِّ أَنْ يَكُوْنَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُنْخِنَ فِي الأَرْضِ تُرِيدُوْনَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ، وَلاَ كِتَابٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. 'ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখিরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। যদি একটি বিষয় না হতো যা পূর্বে থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহ'লে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌঁছত' (আনফাল ৮/৬৭-৬৮)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কৃত ইজতেহাদ ও তার জন্য কুরআন মাজীদের তিরস্কার প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষ ছিলেন। এ বিষয়টি আরো সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ে ওঠে খেজুর গাছের তাবীরের (পরাগায়নের) ঘটনায়। রাফে' ইবনু খাদীজ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহ্ নবী (ছাঃ) মদীনায় আসলেন। তখন মদীনার লোকেরা খেজুর গাছে তাবীর করতো, তারা বলতো যে, তারা খেজুর গাছে পরাগায়ন করছে (পুরুষ ফুলের রেণু স্ত্রী ফুলে লাগাচ্ছে)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমরা এটা কেন কর? তারা বলল, আমরা এমনিতে করে থাকি। তিনি বললেন, যদি তোমরা এটা না করতে তাহলে ভাল হতো। ফলে তারা এ কাজ ছেড়ে দিল। এতে ফুল ঝরে গেল বা ফলন হ্রাস পেল। রাবী বলেন, তারা এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহর নিকটে উল্লেখ করলে তিনি বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ مِنْ رَأْيِ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ 'আমি একজন মানুষ। যখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীনের কোন বিষয়ে নির্দেশ দেব তখন তা গ্রহণ করবে। আর যখন আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে কোন ব্যাপারে তোমাদেরকে নির্দেশ দেব, তাহলে অবশ্যই আমি একজন মানুষ'।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা চার রাক'আতের স্থলে পাঁচ রাক'আত ছালাত আদায় করেন ভুলবশতঃ। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের পাঁচ রাক'আত ছালাত পড়ালেন। আমরা তখন বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! ছালাত কি বেশি করা হয়েছে? তিনি বললেন, সেটা কি? ছাহাবীগণ বললেন, আপনি পাঁচ রাক'আত পড়েছেন। তিনি বললেন, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُوْنِي، وَإِذَا شَكٍّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلْيَتَحَرَّ الصَّوَابَ فَلْيُتِمَّ عَلَيْهِ ثُمَّ لِيُسَلِّمْ ثُمَّ يَسْجُدُ سَجْدَتَيْنِ 'আমি একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও তেমন ভুলে যাই। সুতরাং যখন আমি ভুলে যাব, তখন তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। তোমাদের কেউ যদি ছালাতের মধ্যে সন্দেহ করে তাহলে সে সঠিকের দিকে মনোযোগ দিবে এবং তার উপরে ছালাত পূর্ণ করবে। তারপর দু'টি সিজদা করবে। অতঃপর তিনি সাহু সিজদাহ করলেন'।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মানুষ ছিলেন। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় যখন তাঁর একটি নিকটে বিচার মীমাংসার জন্য আসে, তখন তিনি বলেন, 'নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ। আমার নিকট বিবাদ (মীমাংসার জন্য) আসে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যে অপরের চেয়ে অধিক স্পষ্টভাষী। আমি ভাবি নিশ্চয়ই সে সত্য বলেছে। তখন আমি তার পক্ষে রায় (সিদ্ধান্ত) দেই। আর আমি যদি কোন মুসলমানের হকের ব্যাপারে তার পক্ষে রায় দেই। তাহলে জেনে রাখ সেটা জাহান্নামের টুকরা। অতএব সে এটা গ্রহণ করুক অথবা পরিত্যাগ করুক'।

আবার মানুষের ন্যায় রাযী-খুশি ও রাগ-ক্রোধ তাঁর মধ্যে ছিল। আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, আনাসের মা উম্মু সুলাইমের নিকট একজন ইয়াতীম বালিকা ছিল। রাসূলুল্লাহ ঐ ইয়াতীম বালিকাকে দেখে বললেন, তুমি কি সেই? তুমি বড় হবে কিন্তু তোমার বয়স বেশি হবে না। ইয়াতীম বালিকাটি উম্মে সুলাইমের নিকট কাঁদতে কাঁদতে গেল। উম্মু সুলাইম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হয়েছে, হে বেটি? মেয়েটি বলল, আল্লাহ্ নবী আমার জন্য বদ দো'আ করেছেন, আমার বয়স যেন বেশি না হয়। সুতরাং আমার বয়স কখনই বেশি হবে না। তখন উম্মু সুলাইম দ্রুত তার ওড়না মাটিতে টানতে টানতে বের হ'লেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাক্ষাৎ পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে উম্মু সুলাইম! তোমার কি হয়েছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহ্ নবী (ছাঃ)! আমার ইয়াতীম মেয়ের জন্য বদ দো'আ করেছেন কি? রাসূল (ছাঃ) সেটা কি হে উম্মু সুলাইম? তিনি বললেন, মেয়েটি ধারণা করছে, আপনি দো'আ করেছেন যেন তার বয়স বেশি না হয় এবং পার্শ্ব দেশের চুল বড় না হয়। রাবী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাসলেন এবং বললেন, তুমি জান না যে, আল্লাহ্র সাথে আমার শর্ত আছে। তিনি বলেন, আমি বললাম, إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ أَرْضَى كَمَا يَرْضَى الْبَشَرُ وَأَغْضَبُ كَمَا يَغْضَبُ الْبَشَرُ فَأَيُّمَا أَحَدٍ دَعَوْتُ عَلَيْهِ مِنْ أُمَّتِي بِدَعْوَةٍ لَيْسَ لَهَا بِأَهْلٍ أَنْ يَجْعَلَهَا لَهُ طَهُوْرًا وَزَكَاةً وَقُرْبَةً يُقَرِّبُهُ بِهَا مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ،'নিশ্চয়ই আমি একজন মানুষ। মানুষের মতই আমি সন্তুষ্ট ও রুষ্ট হই। আমি কখনও উম্মতের কারো জন্য বদ দো'আ করলে, সে তার হকদার হবে না। আমি কেবল তার পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা ও কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র নৈকট্য কামনায় তা বলে থাকি'।

ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে নিজেদের জীবনের চেয়ে অধিক ভালবাসতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু হিশাম হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট ছিলাম। তিনি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর হাত ধরেছিলন। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আপনি সবকিছু থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়, কিন্তু আমার জীবন থেকে নয়। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তুমি ততক্ষণ মুমিন হ'তে পারবে না, যতক্ষণ আমি তোমার নিকটে তোমার জীবন অপেক্ষাও প্রিয় না হব। ওমর (রাঃ) তাঁকে বললেন, আল্লাহ্র কসম! এখন আপনি আমার জীবনের চেয়েও আমার নিকট অধিক প্রিয়। নবী করীম (ছাঃ) বললেন, হে ওমর! এখন তুমি মুমিন হ'তে পেরেছ'।

হিজরত কালে আবূ বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে উদ্ধত হয়েছিলেন রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য। 'ছাওর' গুহায় পৌঁছে তিনি রাসূলকে বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমার পূর্বে আপনি এ গুহায় প্রবেশ করবেন না। কেননা এর মধ্যে কোন কিছু থাকলে আমাকে আক্রমণ করবে, আপনি নিরাপদ থাকবেন। অতঃপর তিনি গুহায় প্রবেশ করে ঝাড়ু দিলেন। তিনি তাতে গর্ত পেলেন। তখন তার পরিধানের লুঙ্গি ছিঁড়ে গর্তমুখ বন্ধ করলেন। কিন্তু দু'টি গর্ত বাকী রয়ে গেল। তাতে তিন পা দিয়ে রাখলেন। অতঃপর রাসূলকে বললেন, প্রবেশ করুন। রাসূল (ছাঃ) ভিতরে ঢুকে আবু বকরের ক্রোড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেলেন। গর্ত থেকে আবু বকর (রাঃ)-এর পায়ে দংশন করল, তিনি রাসূলের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার ভয়ে অনড় থাকলেন। কিন্তু এক ফোঁটা অশ্রু রাসূলের মুখে পড়লে, তিনি বললেন, হে আবু বকর! তোমার কি হয়েছে? বললেন, আমাকে দংশন করেছে, আপনার জন্য আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক। রাসূল (ছাঃ) দংশিত স্থানে থুথু লাগিয়ে দিলে ব্যথা চলে গেল।

ছাহবীগণ যুদ্ধের ময়দানে নিজের জীবন বিপন্ন করেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে রক্ষা করতেন। কায়স ইবনু হাযেম (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওহোদ যুদ্ধে তালহার হাতে বর্মের নিচে পরিধেয় চামড়ার পোশাক দেখেছি, যা দ্বারা তিনি রাসূল (ছাঃ)-কে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, ওহোদ যুদ্ধে আবু তালহা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর সামনে থেকে ঢাল হিসাবে (মানববর্ম হয়ে) তাকে রক্ষা করছিলেন। আবু তালহা একজন দক্ষ তীরন্দাজ ব্যক্তি ছিলেন। এদিন তিনি দু'টি বা তিনটি ধনুক ভেঙ্গেছিলেন। তিনি (রাবী) বলেন, এক লোক তীর ভর্তি একটি থলে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ওটা আবু তালহাকে দাও। তিনি (আনাস) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) এদিক-ওদিক তাকিয়ে কওমের দিকে দেখছিলেন। তখন আবু তালহা বললেন, হে আল্লাহর নবী (ছাঃ)! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক। আপনি এদিক-ওদিক তাকাবেন না। যাতে বিরোধী পক্ষের তীরের কোন একটি আপনার শরীরে লেগে যায়। আপনার বক্ষ আমার বক্ষের আড়ালে থাকবে। আর (আনাস বলেন,) আমি আয়েশা বিনতু আবু বকর ও উম্মু সুলাইমকে দেখেছিলাম। এমন অবস্থায় যে তারা উভয়ে কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন, এমনকি আমি তাদের পায়ের মল দেখেছিলাম। তারা উভয়ে পিঠে করে পানির মশক বহন করে এনে সৈন্যদের মুখের কাছে ধরছিলেন (অর্থাৎ তারা সৈন্যদের পানি পান করাচ্ছিলেন)। অতঃপর ফিরে যাচ্ছিলেন, আবার মশক পূর্ণ করে নিয়ে এসে সৈন্যদের মুখের সামনে ধরছিলেন। আর তন্দ্রার কারণে আবু তালহার হাত থেকে দু'বার তরবারি পড়ে গিয়েছিল। যেখানে ইহুদীরা তাদের নবীদেরকে হত্যা করতো, সেখানে রাসূলের প্রতি ছাহাবায়ে কেরামের এই আকৃত্তিম ভালবাসার তুলনা কোথায়!

ছাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছেন, তারা তাঁর প্রতি সহমর্মী ছিলেন। তাদের ঈমানী শক্তি, আমলে ছালেহের মাধ্যমে আল্লাহ্ আনুগত্য, দ্বীন, নবী কারীম (ছাঃ) এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের জন্য তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা তাদেরকে উত্তম জাতিতে পরিণত করেছিল, যাদেরকে মানুষের কল্যাণের জন্য আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল। আর তারা আল্লাহ্ সন্তোষ ও রেযামন্দির হকদার হয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةِ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ 'তোমরাই উত্তম জাতি। মানবতার কল্যাণে তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ কর, অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান কর এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর' (আলে ইমরান ৩/১১০)। তিনি আরো বলেন, إِنَّ الَّذِيْنَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُوْلَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ ، جَزَاؤُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَداً رَّضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ - رَبَّهُ 'যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন করে, তারাই সৃষ্টির সেরা। তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্য যে, তার পালনকর্তাকে ভয় করে' (বাইয়েনাহ ৯৮/৭-৮)। তিনি আরো বলেন, 'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হ'লেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন' (ফাতহ ৪৮/১৮)।

ইহুদী-নাছারারা একদিকে নবী-রাসূলগণকে স্বয়ং আল্লাহ জ্ঞান করত, আবার তাঁদের নির্দেশ অমান্য করত, তাঁদের অবাধ্যতা করত এমনকি তাঁদেরকে হত্যা পর্যন্ত করত। পক্ষান্তরে উম্মতে মুহাম্মাদী তাদের নবীকে একজন মানুষ ও আল্লাহর বান্দা হিসাবে বিশ্বাস করে, তাঁর আনীত বিধানকে যথাযথভাবে মান্য করে এবং রাসূলকে অকৃত্রিমভাবে ভালবাসে, যা এ আলোচনায় সুস্পষ্ট হয়েছে। এজন্য এ জাতিকে মধ্যপন্থী উম্মত বলা হয়েছে।

টিকাঃ
৭২. ওয়াসাতিয়াতুল ইসলাম, পৃঃ ১০৩।
৭৩. মুসলিম হা/২৩৬২।
৭৪. বুখারী, হা/৩৮৬ 'ছালাত' অধ্যায়, 'কিবলার দিকে মুখকরণ' অনুচ্ছেদ; মুসলিম, হা/৮৯২।
৭৫. বুখারী হা/২২৭৮।
৭৬. মুসলিম হা/২৬০৩।
৭৭. বুখারী হা/৬১৪২।
৭৮. ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃঃ ১৬৪।
৭৯. বুখারী হা/৩৭৫৬।
৮০. মুসলিম হা/১৮১১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px